বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/৯

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  



["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের অষ্টম পর্বাংশ -
 " ধর্মাধর্ম - ৪/৮ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.) 

নবম পর্বাংশ 


৪.৫.১ গুহামন্দির

গুহামন্দির নির্মাণ শুরু করেছিলেন সম্রাট অশোক, সে কথা আগেই বলেছি। এই গুহামন্দিরগুলি গয়ার কাছে বরাবর পাহাড়ে তিনি নির্মাণ করিয়েছিলেন আজীবিক সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীদের জন্য। এই গুহাগুলির নির্মাণে কাঠের কাঠামোর অনুকরণ করা হয়েছিল, অর্থাৎ কাঠের স্তম্ভ-কড়ি-বরগার আদলেই পাথরের দেওয়াল ও ছাদ খোদাই করা হয়েছিল। যদিও গুহাগুলির মসৃণ দেয়ালের পালিশ ছিল দেখবার মতো। বোঝা যায় একই দক্ষ শিল্পীরা সম্রাট অশোকের স্তম্ভগুলিরও পালিশ করেছিলেন। 

গয়ার কাছে বরাবর গুহামন্দিরের  প্রবেশ পথ
সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে মোটামুটি ২৫০ বিসিই-তে নির্মিত  

    এর পরে সাতবাহন রাজাদের সময় দক্ষিণ ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে অনেকগুলি গুহামন্দির নির্মিত হয়েছিল। তার মধ্যে সবথেকে প্রাচীন পুণার কাছে ভাজা গুহা। এই গুহাগুলির একটির শেষ প্রান্তে পাথর কেটে স্তূপের আকার দেওয়া হয়েছিল এবং এই স্তূপটি ঘিরে পিছনে ছিল, প্রদক্ষিণ পথ। এই গুহাগুলির দেওয়াল খোদাই করে অষ্টভুজ স্তম্ভ বানানো হয়েছিল এবং মন্দিরের ছাদ ছিল কিছুটা উত্তলাকারের (vaulted), তাতেও কাঠের বড়োবড়ো বরগার মতো করে পাথর খোদাই করা হয়েছিল। এরপরে সম্ভবতঃ খ্রীষ্টাব্দর শুরুতে কারলি গুহা বানানো হয়েছিল। এই গুহার চৈত্যটি অনেক বেশি অলংকৃত এবং গুহাগুলিও সুসজ্জিত। গুহার সামনে পাথর কেটে সুন্দর বারান্দা, সামনের দেওয়ালে জানালা এবং তিনটি প্রবেশ দ্বারে যুগলমূর্তির চমৎকার রিলিফ তৈরি করা হয়েছিল।

মহারাষ্ট্রে অজন্তার গুহামন্দির শ্রেণী  

    তবে সব থেকে বিখ্যাত হল মহারাষ্ট্রের অজন্তার গুহামন্দিরগুলি। মোট সাতাশটি গুহা অশ্বক্ষুরাকৃতি পাহাড়ের গায়ে খোদাই করে বানানো হয়েছিল। এই গুহাগুলির প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছিল বি.সি.ই দ্বিতীয় শতাব্দীতে এবং শেষদিকের গুলি মোটামুটি সপ্তম শতাব্দী সি.ই.-তে। অদ্ভুত সুন্দর ভাস্কর্য এবং গুহার দেওয়ালে আঁকা চিত্রগুলি সারা বিশ্বকে মুগ্ধ করেছে। যদিও দেওয়াল-চিত্রগুলি ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে আসছে। এই গুহামন্দিরগুলি সবই বৌদ্ধ ধর্মীয়।

অজন্তা থেকে প্রায় আটচল্লিশ কি.মি. দূরের ইলোরার গুহামন্দিরগুলি আরও বেশি সুন্দর। এখানে প্রায় চৌঁত্রিশটি গুহামন্দির রয়েছে, যাদের নির্মাণকাল পঞ্চম থেকে অষ্টম শতাব্দী সি.ই.-তে। এই গুহাগুলি সবই হিন্দুধর্মীয় এবং হিন্দু দেবদেবীদের প্রচুর মূর্তি খোদিত আছে। এই মূর্তিগুলির ভাস্কর্যও অনবদ্য। তবে এগুলির মধ্যে সবথেকে আশ্চর্য এবং সুন্দর গুহামন্দির হল কৈলাসনাথ মন্দির। এই মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন, দক্ষিণের রাষ্ট্রকূট সম্রাট প্রথম কৃষ্ণ, যাঁর রাজত্বকাল ৭৫৬ থেকে ৭৭৩ সি.ই.। এতদিনের গুহামন্দিরগুলি  ছিল পাহাড়ের গা থেকে পাথর কাটা শুরু করে, পাথর কেটে পাহাড়ের ভেতরের দিকে বড়োবড়ো গুহা নির্মাণ। কিন্তু ছোট সম্পূর্ণ একটি পাহাড়কেই ওপর থেকে নিচে পর্যন্ত কেটে মন্দিরের আদলে বানিয়ে তোলা হয়েছে কৈলাস মন্দির। এই মন্দিরের গায়ের অজস্র প্যানেলে পুরাণ, রামায়ণ এবং মহাভারতের নানান কাহিনীর অজস্র রিলিফ নিখুঁত সৌন্দর্যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সাধারণ ভাবে আমরা যে কোন মন্দির নির্মাণ শুরু করি ভিত থেকে, শেষ করি মন্দিরের চূড়ায়। এক্ষেত্রে এই মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে, সম্পূর্ণ বিপরীত পদ্ধতিতে, অর্থাৎ চূড়া থেকে শুরু করে শেষে হয়েছে মন্দিরের ভিত। এই বিপরীত নির্মাণের পরিমিতি এবং প্রাক-পরিকল্পনা ভাস্কর কিংবা ভাস্করদের চূড়ান্ত দক্ষতার পরিচয়। উপরন্তু মন্দিরের গায়ে খোদাই করেছেন, অজস্র নিখুঁত রিলিফ প্যানেল। অনন্য এই নির্মাণ এর আগে এবং পরে ভারতবর্ষে তো বটেই, বিশ্বের আর কোথাও হয়েছে বলে শোনা যায় না। তবে পাথর কেটে মন্দির বানানোর কাজ আরও হয়েছে, যেমন সপ্তম শতাব্দী সি.ই.-তে চেন্নাই থেকে আশি কিলোমিটার দূরের মামল্লপুরমে।

ভারতে গুহামন্দিরের শেষ নিদর্শন মুম্বাই থেকে সামান্য দূরের এলিফ্যান্টা দ্বীপের গুহাগুলি। এই গুহাগুলির হিন্দু দেবদেবীদের মূর্তি, বিশেষ করে ত্রিমূর্তি – ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের মূর্তিগুলি বিখ্যাত। এই গুহামন্দিরগুলি অনেকে বলেন পঞ্চম থেকে নবম শতাব্দীর মধ্যে বানানো আবার অনেকে বলেন, পঞ্চম শতাব্দীর মাঝামাঝি এগুলির নির্মাণ শেষ হয়ে গিয়েছিল।

৪.৫.২ মন্দির

গুপ্তযুগের আগেকার কোন মন্দিরের প্রত্ন-নিদর্শন এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এর থেকে এমন প্রমাণ হয় না, যে তার আগে ভারতীয়দের মনে মন্দির নির্মাণের কোন ধারণা ছিল না। বরং এমন অনুমান করা যায়, ইঁট-কাঠ-মাটি দিয়ে বানানো মন্দিরগুলি আমাদের সময় পর্যন্ত এসে পৌঁছয়নি।

সবথেকে প্রাচীন মন্দিরের প্রত্ননিদর্শন পাওয়া গেছে, তক্ষশিলা শহরের ধ্বংসাবশেষ থেকে, জায়গাটির আধুনিক নাম জনদিয়াল। মন্দিরটির নির্মাণে স্পষ্ট গ্রীক প্রভাব দেখা যায়। বিশেষজ্ঞরা অনুমান করেন, এটি জরথ্রুস্টিয়ান মন্দির। গ্রীক প্রভাবে নির্মিত মন্দিরের আরও একটি নিদর্শন পাওয়া গেছে, কাশ্মীরের মার্তণ্ড বা সূর্য মন্দিরে। খ্রিষ্টিয় অষ্টম শতাব্দীতে নির্মিত এই মন্দিরের বাস্তু-পরিকল্পনা পরবর্তী কালের ভারতীয় মন্দিরের সঙ্গে সম্পূর্ণ মেলে না।  সেই কারণেই অনুমান করা হয় এগুলির নির্মাণ হয়েছিল গ্রীস বা পারস্য এবং ভারতীয় রীতির মিশ্র অনুসরণে। গুপ্তযুগের বেশ কয়েকটি মন্দিরের প্রত্ন-নিদর্শন পাওয়া যায়, তার মধ্যে অন্যতম হল ঝাঁসি থেকে সামান্য দূরের দেওগড় মন্দির, সম্ভবতঃ ষষ্ঠ শতাব্দীর নির্মাণ। এই মন্দির পাথর দিয়ে বানানো, এবং দেওয়ালে পাথরের জোড়গুলি মজবুত করার জন্যে লোহার রড ব্যবহৃত হয়েছিল। এর শীর্ষে পাথরের ছোট্ট একটি টাওয়ার আছে।

জম্মু ও কাশ্মীরের অনন্তনাগে অবস্থিত মার্তণ্ড (সূর্য মন্দির) -
মোটামুটি খ্রিস্টিয় অষ্টম শতাব্দীতে নির্মিত।   

    গুপ্তযুগে হিন্দু মন্দিরের যে স্থাপত্য নিয়ম প্রচলিত হয়েছিল, সেই নিয়ম আজও বর্তমান। জমি থেকে বেশ কিছুটা উঁচু যে ভিতের ওপর সমগ্র মন্দিরটি নির্মিত হত, তাকে বলা হত “বিমান”। এই বিমানের মধ্যে সব থেকে ছোট অন্ধকার প্রকোষ্ঠটিকে বলা হয় “গর্ভগৃহ”। এই গর্ভগৃহেই প্রধান দেবতার মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। গর্ভগৃহকে ঘিরে বৃত্তাকার যে অলিন্দ বানানো হত, তার নাম “প্রদক্ষিণ”। এই পথে ভক্তরা প্রধান দেবতাকে প্রদক্ষিণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বিমানের ওপরে গর্ভগৃহের সামনে বানানো হত প্রশস্ত হলঘর, যার নাম “মণ্ডপ”। এই মণ্ডপ থেকে সমবেত ভক্তরা বিগ্রহ দর্শন করতেন, পূজা এবং প্রার্থনা নিবেদন করতেন। মণ্ডপে যাওয়ার আগে আরও একটি হলঘর বানানো হত, যার নাম “অর্ধমণ্ডপ”। জমি থেকে প্রশস্ত সিঁড়ি বেয়ে বিমানে উঠে – ভক্তরা যাতে তাঁদের বিক্ষিপ্ত চঞ্চল মনকে দেবতার প্রতি স্থির-নিবিষ্ট করতে পারেন, সেই উদ্দেশেই এই অর্ধমণ্ডপ বানানো হত। গর্ভগৃহ ও প্রদক্ষিণ, মণ্ডপ এবং অর্ধমণ্ডপের ছাদ গুলিকে “শিখর” বলা হত। প্রত্যেকটি শিখরের উচ্চতা আলাদা হত। স্বাভাবিক ভাবেই গর্ভগৃহের শিখর সব থেকে উঁচু এবং সবথেকে অলংকৃত হত। এই শিখরের গঠন বৃত্তাকার থেকে চতুর্ভুজ কিংবা বহুভুজ হত এবং আকার হত পিরিমিডিয় বা নিচে থেকে শীর্ষের দিকে ক্রমশঃ সরু (tapering)পরবর্তীকালে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে মন্দিরের গঠন ও আকার অনেক বিশদ এবং বিস্তৃত হলেও মূল কাঠামোতে তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি। ভারতবর্ষের মন্দির স্থাপত্যের দুটি ঘরানা পৃথিবী বিখ্যাত হয়েছে, তার একটি দাক্ষিণাত্য এবং অন্যটি উড়িষ্যা বা কলিঙ্গ ঘরানা। স্থাপত্য এবং নির্মাণ প্রকৌশল নিয়ে অনেকগুলি “শিল্পশাস্ত্র” এবং “বাস্তুশাস্ত্র”-এর গ্রন্থও এসময়ে রচিত হয়েছিল।

খ্রীষ্টিয় সপ্তম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত দক্ষিণ ভারতের মন্দির স্থাপত্য এবং ভাস্কর্য শিল্পের সুবর্ণ যুগ বলা যায়। দক্ষিণ ভারতের স্থাপত্যে পহ্লব, চোল, রাষ্ট্রকূট ও চালুক্য রাজবংশের অবদান অবিস্মরণীয়। এই পর্যায়ের নির্মিত মন্দিরগুলি অনেক বেশি ব্যাপ্ত এবং বিস্তৃত। প্রকৃতপক্ষে দক্ষিণ ভারতে মন্দির স্থাপত্যের আলাদা ঘরানার সূত্রপাত করেছিলেন পহ্লব রাজ নরসিংহবর্মণ (৬৪২-৬৮৮ খ্রীষ্টাব্দ), তাঁর সমুদ্র সৈকতে বানানো মামল্লপুরমের মন্দির থেকে। পরবর্তী কালে গোপুরম (প্রবেশদ্বার), বিমান, গর্ভগৃহ, অলিন্দ, নাটমন্দির, মণ্ডপ, মহামণ্ডপ নিয়ে দক্ষিণ ভারতের মন্দিরগুলি বিশাল এবং বিস্তৃত আকার নিয়েছিল। এর সঙ্গে মন্দিরের প্রাঙ্গণে আরও যুক্ত হয়েছিল বাঁধানো সরোবর, ফুলের বাগান, কোষাগার, যাত্রীনিবাস, ভাণ্ডারগৃহ ইত্যাদি। এই সব কিছু সুরক্ষিত রাখতে নির্মাণ করা হত বিশাল পাথরের প্রাচীর। মূল মন্দিরের শিখরের উচ্চতা এবং অলংকরণও হয়ে উঠেছিল বিশদ। সমগ্র দক্ষিণ ভারত জুড়েই এমন আশ্চর্য এবং অপরূপ বহু মন্দির আজও সগৌরবে বিরাজমান।

সেই তুলনায় উত্তরভারতের অধিকাংশ প্রধান শহরের মন্দিরগুলির আজ আর কোন অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। যেগুলি আছে সেগুলি পরবর্তীকালে পুনর্নির্মিত। এমনকি বিখ্যাত বারাণসীর বিশ্বনাথ মন্দিরও মাত্র কয়েকশ বছর আগে পুনর্নির্মিত। উত্তর ভারতের কয়েকটি অঞ্চলে বেশ কিছু মন্দির আজও স্বমহিমায় টিকে আছে যেমন উড়িষ্যা, বুন্দেলখণ্ড এবং গুজরাটের মন্দিরগুলি। উড়িষ্যার ভুবনেশ্বর, কোণার্ক এবং পুরীর অনবদ্য শৈলীর মন্দিরগুলির নির্মাণ কাল অষ্টম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যে। বুন্দেলখণ্ডের প্রধান দর্শনীয় স্থাপত্যগুলির নির্মাণকাল দশম এবং একাদশ শতাব্দীতে। এর মধ্যেই আছে বিশ্ববিখ্যাত খাজুরাহোর মন্দিরগুলি। এই মন্দিরগুলির গঠন কলিঙ্গ ঘরানার থেকে অনেকটাই আলাদা এবং উত্তরভারতের মন্দির স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য অনুসারী। গুজরাটের সোলাংকি রাজবংশ একাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে অনেকগুলি জৈন এবং হিন্দু মন্দির স্থাপনা করেছিলেন। তার মধ্যে অনেকগুলির স্থাপত্য এবং অলংকরণে অনবদ্য শৈলীর প্রকাশ ঘটেছে, যেমন মাউন্ট আবুর জৈন মন্দির। এর অপরূপ সৌন্দর্য আজও মানুষকে মুগ্ধ করে রাখে।

 

৪.৫.৩ ভাস্কর্য

মৌর্য আমলে পাথর খোদাই করে ভাস্কর্য নির্মাণের শুরু এবং সাঁচি, ভারহুত, সারনাথ এবং আরও কিছু অঞ্চলে তার নিদর্শন পাওয়া গেছে এবং তার কিছু কিছু বর্ণনা আগেই দিয়েছি। ভারতীয় ভাস্কর্যের নতুন যুগের সূত্রপাত হয়েছিল কুষাণ যুগে, গান্ধার শিল্পের হাত ধরে এবং ভারতে এই গান্ধার শিল্পের কেন্দ্র ছিল মথুরায়। যদিও মথুরার ভাস্কর্য শিল্পের শুরু হয়তো খ্রীষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতেই। এই সময়ে তাঁরা জৈনধর্মের পৃষ্ঠপোষকতায়, পাথরের ফলকে দিগম্বর তীর্থংকরের ধ্যানস্থ মূর্তি খোদাই করেছিলেন। তাছাড়া মথুরা স্তূপের রেলিংয়ের গায়ে প্রচুর যক্ষীমূর্তিও খোদাই করেছিলেন। এই যক্ষীদের অতিরঞ্জিত পয়োধর ও নিতম্ব এবং ক্ষীণতম কটি, এই শিল্পের অন্যতম বিশেষত্ব। এই যক্ষীমূর্তিগুলির নৃত্যের ভঙ্গিমা এবং তাদের অঙ্গের বিভিন্ন অলংকারের সূক্ষ্মতা নিঃসন্দেহে শিল্পীদের দক্ষতাকেই প্রকাশ করে।

কুষাণ যুগে, বিশেষ করে সম্রাট কণিষ্ক, মথুরা ঘরাণার এই ভাস্করদের প্রভূত পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। মথুরার কাছেই মাট নামক একটি গ্রামে, যেখানে হয়তো সম্রাট কণিষ্কের শৈত্যাবাস ছিল, সেখানে একটি ছোট ধর্মস্থানে (chapel) বেশ কয়েকজন কুষাণ রাজা এবং রাজকুমারদের মূর্তিখোদাই করা হয়েছিল। এখানেই সম্রাট কণিষ্কের মুণ্ডহীন একটি পূর্ণ মূর্তিও পাওয়া গেছে। যেখানে সম্রাট কণিষ্ক মধ্য-এশিয়ার প্রচলিত ভারি পোষাক, বুটজুতো পরে দাঁড়িয়ে আছেন, এক হাতে তাঁর তলোয়ার আর অন্য হাতে ঢাল।

বৌদ্ধধর্মের হীনযানী মতে এতদিন কোথাও বুদ্ধদেবের মূর্তি চিত্রিত হয়নি, তাঁর পরিবর্তে নানান প্রতীক ব্যবহার করা হত, যেমন ধর্মচক্র, অশ্বত্থ গাছ, সিংহ ইত্যাদি। কণিষ্কের আমলে বৌদ্ধধর্মের মহাযানী শাখার উদ্ভব হওয়াতে, মহাযানী বৌদ্ধরা গান্ধার এবং মথুরার মূর্তিগুলি এবং তীর্থংকরের ধ্যানস্থ মূর্তি দেখেই যে ভগবান বুদ্ধের মূর্তি বানানোয় উৎসাহী হয়েছিলেন সেকথা অনুমান করাই যায়। অতএব কুষাণ সাম্রাজ্যের পতন হয়ে গেলেও মহাযানী মতের বিপুল পৃষ্ঠপোষকতায়, বুদ্ধদেব, বোধিসত্ত্বের মূর্তি এবং তাঁর জাতকের নানান কাহিনী নিয়ে অজস্র চিত্র ফুটে উঠতে লাগল পাথরের ফলকে। শুধু উত্তরভারতেই নয়, দক্ষিণভারতেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ল দ্রুত। যার ফলে সাতবাহন আমলের নির্মাণ (খ্রীষ্টিয় দ্বিতীয়-তৃতীয় শতাব্দী) অমরাবতী স্তূপের প্রস্তর ফলকে বুদ্ধদেব এবং জাতকের নানান কাহিনী এবং বেশকিছু পূর্ণ অবয়ব বুদ্ধমূর্তিও দেখতে পাওয়া যায়। যার নিদর্শন সাঁচি বা ভারহুত স্তূপে নেই। অমরাবতী স্তূপের প্রভাবে পরবর্তী কালে সিংহল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতেও, তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি অনুযায়ী অনুরূপ মূর্তির প্রচলন শুরু হয়ে গিয়েছিল।

তবে ভারতীয় শিল্পের উৎকর্ষ দেখা গেল চতুর্থ থেকে পঞ্চম শতাব্দীতে, যে সময়ে সারনাথ স্তূপের শেষ পুনর্নিমার্ণের কাজ হয়েছিল। সারনাথে বুদ্ধদেবের মূর্তিটিই হয়তো প্রথম, যার মধ্যে ভারতীয় আধ্যাত্মিক সত্ত্বা ভাষা পেয়েছে কঠিন পাথরের মূর্তিতে। ধ্যানস্থ ভঙ্গীতে ভগবান বুদ্ধ বসে আছেন। তাঁর পেলব অবয়বে কোথাও পেশিশক্তির প্রকাশ ঘটেনি। প্রশান্ত মুখে মৃদু হাসির আভাস, দুই চোখ অর্ধ নিমীলিত, তাঁর হাতের চাঁপার কলির মতো নিখুঁত সুন্দর আঙুলে ধর্মচক্র মুদ্রা। তাঁর মাথার পিছনে অলংকৃত জ্যোতির্বলয়। দুপাশে দুই আকাশচারী উপদেবতা যেন তাঁর কথা শুনছেন। সার্থক এই মূর্তিটিই যেন নির্দিষ্ট করে দিল, পরবর্তী ভারতীয় সমস্ত শিল্পের, সে চিত্র হোক বা ভাস্কর্যের, মানদণ্ড।

ভারতীয় শিল্পের রূপরেখা ও তার বিধিবিধানকে ষড়ঙ্গ বলা হয়, সে বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা নিশ্চয়ই অপ্রাসঙ্গিক হবে না। 

৪.৫.৪ ভারতীয় শিল্পের ষড়ঙ্গ

শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর “ভারতশিল্পে ষড়ঙ্গ” নিবন্ধে মূলতঃ চিত্র নিয়ে বললেও, ভাস্কর্য সম্পর্কেও এই তত্ত্ব সমান কার্যকরী, সেকথা পাঠক নিশ্চয়ই বুঝবেন।

আচার্য বলেছেন, আলেখ্যর ছয়টি অঙ্গ – যেমন রূপভেদ, প্রমাণ, ভাব, লাবণ্য-যোজনা, সাদৃশ্য আর বর্ণিকাভঙ্গ।

রূপভেদ–এই জগতে আমরা যা কিছু দেখি, তার থেকে একটি বা কয়েকটি বিষয় বেছে নিয়ে শিল্পী ছবি আঁকেন। সেই বিষয়ের বিশেষ ব্যক্তি, প্রাণী, গাছপালা অথবা বস্তুর বাহ্যিক রূপ সম্পর্কে শিল্পীর স্পষ্ট ধারণা থাকা উচিৎ। অর্থাৎ চিত্রটি পুরুষ কিংবা নারীর, অল্প অথবা বেশি বয়সী, কোন দেশের, কোন শ্রেণির ইত্যাদি সকল বিষয়েই শিল্পীর স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। উপরন্তু হরিণের চিত্র দেখে কোন সাধারণ দর্শক যদি সেটিকে শিং-না-গজানো ভেড়া বলে মনে করেন, তাহলে বুঝতে হবে, শিল্পীর রূপভেদ সম্পর্কে ধারণা অপ্রতুল।

প্রমাণ –রূপভেদের পরেই অথবা একই সঙ্গে এসে পড়ে প্রমাণ অর্থাৎ সামঞ্জস্যপূর্ণ আকার। যেমন নর ও বানরের অবয়বের কিছু সাদৃশ্য আছে আবার বেশ কিছু বৈসাদৃশ্য আছে। বানরের শরীরে লেজ না দিলেই বানর নর হয়ে যায় না, কিংবা নরের শরীরে প্রচুর লোম, বানরোচিত মুখাবয়ব, একটি লেজ অথবা চারটি হাত এঁকে দিলেই নর বানর হয়ে যায় না। এই দুইয়ের মধ্যে আছে সূক্ষ্ম মাপ-জোক, অঙ্গ-সংস্থান এবং বিশেষ ভঙ্গিমা – সেটাই প্রমাণ। প্রাচীন শিল্পসাধকরা শিল্পমূর্তিকে পাঁচটি শ্রেণীতে ভাগ করেছেন, যেমন নর, ক্রূর, আসুর, বালা এবং কুমার। এই পাঁচশ্রেণীর মূর্তির জন্যে তাঁরা বিভিন্ন শ্রেণীর তাল ও মান নির্দেশ করেছেন। এই তাল ও মান হল – সামঞ্জস্য এবং মাপ-জোক অথবা এক কথায় বলা চলে প্রোপোরশনস (proportions)যেমন নরমূর্তি হবে দশতাল; ক্রূরমূর্তি দ্বাদশতাল; আসুরমূর্তি ষোড়শতাল; বালামূর্তি পঞ্চতাল এবং কুমারমূর্তি ষট্‌তাল। শিল্পীর নিজ মুষ্টির এক-চতুর্থাংশকে বলে এক আঙুল। এরকম দ্বাদশ আঙুল বা তিন মুষ্টিতে হয় এক তাল।

শিল্পাচার্য আরও বলেছেন, রাম, কৃষ্ণ, নৃসিংহ, ইন্দ্র, অর্জুন প্রভৃতির মূর্তি নরমূর্তি অর্থাৎ দশ তাল। চণ্ডী, ভৈরব, বরাহ প্রভৃতি দ্বাদশ তালের ক্রূরমূর্তি। হিরণ্যকশিপু, রাবণ, কুম্ভকর্ণ, মহিষাসুর প্রভৃতি ষোড়শ তালের আসুরমূর্তি। বটকৃষ্ণ বা গোপাল প্রভৃতি পঞ্চতালের বালামূর্তি এবং বামন, কৃষ্ণসখা প্রভৃতির ষট্‌ তালের কুমারমূর্তি। শুধু তাই নয়, দেহের বিভিন্ন অংশ, হাত-পায়ের মাপ কোন মূর্তিতে কত হবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া আছে, নর ও নারী মূর্তির প্রভেদ সহ। এ বিষয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে এত নিয়ম-কানুন, নির্দিষ্ট মাপ-জোক দিয়ে, বৈচিত্রময় মূর্তি কী করে আসবে - সবই তো একঘেয়ে এক ছাঁচের বানানো মনে হবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। মোটামুটি একই প্রোপোরশনে পৃথিবীতে কোটি কোটি মানব শরীর জন্ম নিচ্ছে, অথচ তাদের প্রত্যেকেরই চেহারায় নিজস্ব ব্যক্তিত্ব রয়েছে।

ভাব - চিত্রের বহিরঙ্গ বিষয়ে রূপভেদ এবং প্রমাণের কথা হল, এবার আসবে অন্তরঙ্গ রূপ অর্থাৎ ভাব। ভাবের কিছুটা আমরা বুঝতে পারি ভঙ্গী দেখে, কিছুটা আমরা অনুভব করি হৃদয়ে। একটি মেয়ে ছবিতে গালে হাত দিয়ে বসে কিছু ভাবছে, অথবা এক যুবক কোমরের তলোয়ারের মুঠ শক্ত হাতে চেপে ধরেছে, এই ছবির ভাব খুবই সরল বুঝতে খুব অসুবিধে হয় না। কিন্তু ভাবের রাজ্য সর্বদা এতটা সহজ নাও হতে পারে, যেমন ধ্যানী বুদ্ধের মূর্তি বা ছবি। আসলে এই ভাবরাজ্যেই শিল্পী এবং দর্শকের অন্তরের আত্মীয়তা। শিল্পী কখনই তাঁর শিল্পে ভাবের পূর্ণপ্রকাশ করেন না, তাতে ভাবের মাধুর্য নষ্ট হয়ে যায়। শিল্পী কিছুটা ইঙ্গিত এবং আভাস দিয়ে থেমে যান, সে আভাস ধরা পড়তে হবে দর্শকদের মনে। দর্শক যখন কল্পনায় ভাবের নাও ভাসিয়ে মুগ্ধ হতে থাকবেন, তখনই শিল্পীর ভাবনা সার্থক, সার্থক দর্শকের শিল্পী সত্ত্বা। 

লাবণ্য-যোজন –লাবণ্য শব্দের উৎপত্তি লবণ থেকে, অতএব লাবণ্য-যোজনা অর্থ লবণ যোগ করা। শ্রীযুক্ত নারায়ণ সান্যাল মহাশয় আমাদের মতো সাধারণ লোকের পক্ষে বোঝার সুবিধের জন্যে লিখেছেন, মাছের তরকারি রান্নার সময়, মাছ, আলু, পটল এই সব উপাদান বিচারকে যদি আমরা “রূপভেদ” বলি, আর উপাদানের পরিমাণের অনুপাতে নানান মশলা প্রয়োগ যদি হয় “প্রমাণ”, তাহলে সেই তরকারিতে সঠিক লবণ প্রয়োগই হচ্ছে, লাবণ্য-যোজনা। সঠিক পরিমাণে, সঠিক সময়ে লবণ না দিলে যত উৎকৃষ্ট মশলাই দেওয়া হোক, তরকারির স্বাদ আসে না। সঠিক সময়েও, কারণ, তরকারি নামানোর মুহূর্তে লবণ দিলে তরকারির উপাদানগুলি সুচারু লাবণ্যময় হয়ে ওঠে না, আলুর ভেতরে কিংবা মাছের অন্তরে লবণ ঢুকবে না।

এই স্থূল উপমার পরে, শ্রী রূপ গোস্বামীপাদের শ্লোক থেকে আরেকটি উপমা দিলে লাবণ্য-যোজনার সঠিক তাৎপর্য বোঝা যাবে। একটি মুক্তোকে তার আকার, আয়তন, রঙ সবই ছবি এঁকে বোঝানো যায়। কিন্তু মুক্তার সর্বাঙ্গে যে তরলিত ঢলঢল আভা সেটির তো কোন রূপভেদ বা প্রমাণ দেওয়া যায় না। কিন্তু যে শিল্পী তাঁর চিত্রে মুক্তোর এই আভাটিকে প্রকাশ করতে পারেন, তিনি তাঁর চিত্রে লাবণ্য-যোজনা করেন।

 সাদৃশ্য– সাদৃশ্য মানে সদৃশ ভাব অর্থাৎ উপমা। কাব্যে এবং সাহিত্যে উপমার প্রয়োগ আমরা সকলেই জানি, যেমন চন্দ্রবদন। এক্ষেত্রে চাঁদের মতো গোল মুখের কথা আমরা ভাবি না, কিন্তু তার শান্ত ঔজ্জ্বল্যের কথা বুঝতে পারি। করকমল বলতে পদ্মের মতো পবিত্র পেলবতার কথা বুঝি। বীরের বর্ণনায় সিংহ-কটি অর্থাৎ সিংহের মতো কোমর বলতে, তার হিংস্রতা নয়, শরীরের নমনীয় ক্ষিপ্রতার কথা বুঝি। এই সাদৃশ্য দিয়েই শিল্পী তাঁর চিত্রের বা মূর্তির বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে থাকেন।

 বর্ণিকা-ভঙ্গ – ষড়ঙ্গের শেষ কিন্তু সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বর্ণিকা-ভঙ্গ। এটি হচ্ছে তুলি ও রঙের প্রয়োগ। যে শিল্পীর বর্ণিকা-ভঙ্গে দক্ষতা নেই, তার অন্য পাঁচটি অঙ্গে দক্ষতা থাকা-না-থাকা সমান। এর আগের পাঁচটি অঙ্গ তত্ত্বকথা দিয়ে বোঝা সম্ভব, কিন্তু এই অঙ্গটি শিল্পীর নিজস্ব প্রতিভা ছাড়া আয়ত্ব করা সম্ভব নয়। এই বিষয়ে শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ বলেছেন, “ ...তুলিটি ঠিক কতটুকু (রঙে) ভিজাইব, তাহার আগায় কতটা রঙ তুলিয়া লইব ও ঝাড়িয়া ফেলিব এবং সেই রঙ সমেত ভিজা তুলিটি কতটুকু চাপিয়া অথবা কতখানি না চাপিয়া কাগজের উপর বুলাইয়া দিব – ইহারই সম্বন্ধে প্রমা লাভ করা হইতেছে ষড়ঙ্গের বর্ণিকা-ভঙ্গ নামে শেষশিক্ষা বা চরম শিক্ষা”। 

এরপর সারনাথ, অজন্তা, ইলোরা, কোনার্ক, খাজুরাহোর মতো বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানে যখনই বেড়াতে যাবেন, ভারতীয় শিল্প-ভাস্কর্যের এই ষড়ঙ্গ তত্ত্বগুলি আশা করি মনে পড়বে।  


চিত্রঋণঃ উইকিপিডিয়া 

                                পরের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/১০ "

বুধবার, ৪ মার্চ, ২০২৬

এক যে ছিলেন রাজা - ১৬শ পর্ব

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "


      


[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের আগের পর্ব - এক যে ছিলেন রাজা - ১৫শ পর্ব "



২৯ 

মহারাণি সুনীথার শয়ন কক্ষে প্রবেশ করেই মহর্ষি ভৃগু বললেন, “মহারাণির জয় হোক! আপনার অভিলাষ মন্ত্রীমণ্ডলীতে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে! এই মূহুর্ত থেকে আপনি রাজ্য পরিচালনা এবং প্রশাসনিক সমস্ত দায়িত্ব থেকে মুক্ত”।  মহারাণি সুনীথা মহর্ষির দিকে কিছুক্ষণ নির্বাক তাকিয়ে রইলেন। তাঁর মুখমণ্ডলের ছায়াপাত দীপের আলোকেও স্পষ্ট ধরা পড়ল মহর্ষি ভৃগুর চোখে।

মহর্ষি ভৃগুর আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা দাসী পদ্মবালা বলে উঠল, “খুব ভালো হয়েছে, ঠাকুর। রাজকুমারীকে সারাদিন বাইরের লোকজনেরা এসে তিক্তবিরক্ত করে তুলত – নানান সমস্যায়। সে সব আর থাকবে না। রাজকুমারী এখন থেকে পুত্রসেবায় এবং পূজার কাজে, অনেক বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন! বেশ হল, খুব ভালো হল”।

দাসী পদ্মবালার কথায় মহারাণি সম্বিত ফিরে পেলেন, অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, “যা বলেছিস, পদ্ম! গুরুদায়িত্ব থেকে মুক্তি পাওয়াতে নিজেকে খুব হাল্কা লাগছে এখন। কিন্তু মন্ত্রীমণ্ডলী এত সহজে, এত তাড়াতাড়ি, আমার অনুরোধ মেনে নিল?”

মহর্ষি ভৃগু বললেন, “আপনার অনুরোধ, আমাদের সকলের কাছে আদেশ – সে আদেশ আমরা কোনদিন অমান্য করেছি, মহারাণি? আমাদের আরও সিদ্ধান্ত হয়েছে, আপনি সপুত্র রাজাবেণের নবনির্মিত উদ্যানবাটিকায় অবস্থান করবেন”।

মহারাণি সুনীথা চমকে উঠে বললেন, “কেন?”

আচার্য বিশ্ববন্ধু অত্যন্ত বিনীত স্বরে বললেন, “মহারাণি, যদি অভয় দেন তো, রাজাবেণের স্বাস্থ্য সম্বন্ধে আমার দু একটি বক্তব্য আছে”।

মহারাণি অত্যন্ত সন্দিগ্ধ চোখে মহর্ষি ভৃগুর দিকে তাকিয়ে, আচার্য বিশ্ববন্ধুর দিকে মুখ ফেরালেন, বললেন, “বলুন, আচার্য”!

“বিগত মাসাধিককাল রাজাবেণের স্বাস্থ্যের উল্লেখযোগ্য কোন উন্নতি হয়নি। আমাদের ধারণা, স্থান পরিবর্তনে তাঁর স্বাস্থ্যের উন্নতি সম্ভব। বিশেষতঃ, তাঁর নিজ হাতে নির্মিত উদ্যানবাটিকায় বসবাস তাঁর মানসিক তৃপ্তির কারণ হতে পারে! অত্যন্ত যত্নে ধীর গতি অশ্বশকটে যাওয়ার পথে, তাঁর মনে হতে পারে, এই পথে অশ্ব ছুটিয়ে তিনি বীর দর্পে কতবার আসা যাওয়া করেছেন! সেই সব স্মৃতি তাঁর মনে ফিরিয়ে আনতে পারে, প্রবল উদ্দীপনা!

নিজের রুচি ও শিল্পবোধ অনুযায়ী তিনি ওই উদ্যানবাটিকাকে নিজের হাতে সাজিয়ে তুলেছেন, তিল তিল সৌন্দর্য আহরণ করে...। কত বিচিত্র ধরনের পুষ্পতরু এনে তিনি উদ্যান বানিয়েছেন। আশ্চর্য সুন্দর সব প্রজাতির পাখি ও পশুর সংগ্রহশালা বানিয়ে তুলেছেন সেখানে। অভূতপূর্ব দীপমালা এবং অনিন্দ্যসুন্দর মৃৎ-পুত্তলি সংগ্রহ করে স্থাপনা করেছেন সেই উদ্যানে। সেই উদ্যানে পদার্পণ মাত্রই, আমাদের বিশ্বাস, তিনি অনুভব করবেন সুস্থ হয়ে ওঠার প্রবল ইচ্ছাশক্তি।”

মহারাণি সুনীথা জিজ্ঞাসা করলেন, “ইচ্ছাশক্তিতে কী হয়?”

“ইচ্ছাশক্তিতে কী না হয়, মহারাণি? ইচ্ছাশক্তিহীন মানুষ মৃতবৎ! রাজাবেণের মস্তিষ্ক অচল নয় মহারাণি, দিনের পর দিন, মাসের পর মাস শয্যাশায়ী থাকতে থাকতে তিনি কি কোনোদিন এই চিন্তা করবেন না, এইভাবে নির্জীব জড়ের মতো বেঁচে থেকে কী লাভ? এর থেকে শ্রেয়ঃ...!” আচার্য বিশ্ববন্ধু কথা শেষ না করেই বাক্যান্তরে চলে গেলেন, বললেন, “ইচ্ছাশক্তি উজ্জীবিত হলে, তিনি নিজ পায়ে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করতে পারেন, কথা বলার চেষ্টা করতে পারেন...সেটাই আমরা সকলে চাইছি, মহারাণি”।

কুঞ্চিত ভ্রূ মহারাণি তীক্ষ্ণ চোখে আচার্য বিশ্ববন্ধুর দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “আপনার তেমনই বিশ্বাস? আপনাদের আয়ুর্বেদশাস্ত্রে এমনই বলে?”

“বলে মহারাণি। গতানুগতিকতা ছেড়ে নতুন পরিবেশে গেলে অনেক সময় চমকপ্রদ ফল পাওয়া যায়। বিশেষ করে, ওই উদ্যানবাটিকা ছিল মহারাজ বেণের স্বপ্ন! অসুস্থ হওয়ার আগে তিনি অজস্রবার ওখানে গিয়েছেন, নির্মাণকাজের পর্যবেক্ষণ করেছেন। প্রত্যেকটি খুঁটিনাটি তিনি নিজে হাতে সাজিয়েছেন! সেই স্বপ্নপূরণ নিজের চোখে দেখার অনুভূতি তাঁকে উদ্দীপিত করতে পারে”!

মহারাণি গভীর দৃষ্টিতে পুত্রবেণের মুখের দিকে তাকালেন, রাজাবেণের দুই চোখ এখন নিমীলিত। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “তাই হোক। কবে যেতে হবে বলবেন!”

আচার্য বিশ্ববন্ধু বিনীত স্বরে বললেন, “হয়তো, এই সপ্তাহেই! আপনাকে পূর্বাহ্নেই জানিয়ে দেব, মহারাণি”।

এতক্ষণ দাসী পদ্মবালা চুপ করে সব কথা শুনছিল, এখন বলল, “এক দিকে ভালই হল, রাজকুমারী, যতই তুমি রাজ্য শাসন থেকে দূরে থাকো, প্রজারা তোমার কাছে যখন তখন এসে দাঁড়াতোই। তাদের অভাব অভিযোগের কথা তোমার কাছে বলতে এলে, তুমি কি তাদের ফিরিয়ে দিতে পারতে রাজকুমারী? পারতে না! তার থেকে একটু নির্জনে দূরে থাকাই ভালো! বেণ সুস্থ হলে আমরা তো আবার ফিরেই আসবো, তাই না?”

আচার্য বিশ্ববন্ধু বললেন, “অবশ্যই পদ্মাদেবী”।

উত্তরে দাসী পদ্মবালা বলল, “কিন্তু কদিন আগে রাজপথে বিষ্ণুমন্দিরের সামনে কিছু চারণকবির গান শুনছিলাম। পথের লোকরা, ব্যাপারীরা তাদের ঘিরে ধরে গান শুনছিল, আমিও শুনলাম”।

মহারাণি সুনীথা একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, “এখন তোর চারণ গানের কথা মনে পড়ল, পদ্ম? অবান্তর কথা তুই এতও বলতে পারিস!”

“না গো রাজকুমারী, তুমি এদিকে সর্বদা ব্যস্ত থাকো বলে বলা হয়নি। তারা বলছিল, কে এক পৃথু আর অর্চ্চির কথা। তারা নাকি রাজাবেণের মানসপুত্র ও কন্যা। ভগবান বিষ্ণুর অংশ-অবতার। ওই পৃথুই নাকি রাজা হবে, আর অর্চ্চি হবে তার রাণি। তাতে দেশ নাকি শস্যে-সম্পদে, শান্তি-সুখে ভরে উঠবে”।

বিস্মিত মহারাণি মহর্ষি ভৃগুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “সে আবার কী? এসবের অর্থ কী, মহর্ষিঠাকুর? আপনি কিছু জানেন?”

মহর্ষি ভৃগু বললেন, “আজ মন্ত্রীমণ্ডলের সভাতেও এই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হল। শুনলাম, উত্তরের কোন অরণ্যবাসী তপস্বী এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। তাঁর কথা শুনেই এই চারণকবিরা দেশে দেশে ওই গান গেয়ে বেড়াচ্ছে”!

“কিন্তু পুত্র বেণের মানস পুত্র এবং কন্যা? তারা কীভাবে আসছে?”

“ঈশ্বরের হয়তো সেরকমই অভিলাষ, তাঁর লীলার কথা কে বলতে পারে?”

মহর্ষি ভৃগুর উত্তরে মহারাণি সুনীথা বিদ্রূপের সুরে বললেন, “আপনিও বলতে পারেন না, মহর্ষিঠাকুর? শুনেছি আপনি সর্বজ্ঞ?”

মহর্ষি ভৃগু দৃঢ়স্বরে বললেন, “মহারাণি, মানুষ আজন্ম নিয়তির বশীভূত, তার পক্ষে সর্বজ্ঞ হওয়া সম্ভব নয়!  তবে রাজাবেণের কোষ্ঠী বিচার করে আমরাও দেখেছি, তাঁর শরীরে এখন বিষ্ণুর অবস্থান। রাজাবেণের অঙ্গ থেকে তাঁর মর্ত্যলোকে অবতীর্ণ হওয়ার লগ্ন আসন্নপ্রায়”!  মহারাণি সুনীথা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন, মহর্ষি ভৃগুর মুখের দিকে, কিছু বললেন না। মহর্ষি ভৃগু আরও বললেন, “আচার্য বিশ্ববন্ধু রাজাবেণের স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য, আপনাদের নতুন উদ্যানে অবস্থানের যে পরামর্শ দিলেন, আমারও অভিমত তাই। আপনারা এই জনবহুল রাজভবন ও এই ভবনের অন্দরমহলের জটিল আবর্ত থেকে বেরিয়ে, নির্জন উদ্যানবাটিকায় কিছুদিন নিশ্চিন্তে বাস করুন। সেখানেই হোক ভগবান বিষ্ণুর অলৌকিক অবতরণ!”

মহারাণি সুনীথা উত্তেজিত হয়ে বললেন, “এর অর্থ আপনিও ওই অলৌকিক ঘটনায় বিশ্বাস করছেন?”

“করছি মহারাণি! আমার ধারণা, মহারাজ অঙ্গের সম্পূর্ণ বংশ পরিচয় জানলে, আপনিও বিশ্বাস করবেন। সংক্ষেপে সেই বৃত্তান্ত আপনাকে বর্ণনা করছি শুনুন। ভগবান ব্রহ্মার পুত্র স্বায়ম্ভূব মনু ও তাঁর পুত্র শতরূপার দুই পুত্র প্রিয়ব্রত ও উত্তানপাদ। তাঁরা দুজনেই ভগবান বাসুদেবের অংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন! রাজা উত্তানপাদের দুই পত্নী – সুনীতি ও সুরুচি, তাঁদের মধ্যে সুরুচি রাজা উত্তানপাদের অত্যন্ত প্রেয়সী ছিলেন, কিন্তু সুনীতি নয়। সুনীতির বালক পুত্র ধ্রুব, বিমাতা সুরুচির অবহেলা ও বাক্যবাণে ক্রুদ্ধ হয়ে, অরণ্যে গিয়ে ঘোরতর তপস্যা করেছিলেন, এবং স্বয়ং ভগবান শ্রীবিষ্ণুর দর্শন ও অনুগ্রহ লাভ করেছিলেন। মহামতি ধ্রুবের দুই পত্নী ইলা ও ভ্রমি। ভ্রমির পুত্র বৎসর। বৎসরের ছয় পুত্রের মধ্যে জ্যেষ্ঠ পুত্র পুষ্পার্ণ। পুষ্পার্ণেরও ছয় পুত্রের মধ্যে কনিষ্ঠ ব্যুষ্ট। ব্যুষ্টের পুত্র সর্বতেজা, সর্বতেজার অন্য নাম চক্ষুঃ। এই চক্ষুর পুত্রই চাক্ষুষ মনু। চাক্ষুষ মনুর দ্বাদশ পুত্রের মধ্যে কনিষ্ঠ উল্মুক। এই উল্মুকই মহারাজ অঙ্গের পিতা”। মহর্ষি ভৃগু একটু বিরতি দিয়ে মহারাণি সুনীথার মুখের দিকে তাকালেন, মহারাণি সুনীথা বিহ্বল হয়ে শুনছিলেন, মহারাজ অঙ্গের বংশ-পরিচয়।

মহর্ষি ভৃগু বললেন, “মহারাণি, অতএব আপনি বুঝতেই পারছেন মহারাজ অঙ্গের বংশ কত মহান এবং এই বংশের প্রতি ভগবান ব্রহ্মা এবং শ্রীবিষ্ণুর পক্ষপাত ও অনুগ্রহ রয়েছে শুরুর থেকেই! অতএব আমি এই বংশের প্রতি ভগবান বিষ্ণুর আরও একবার অনুগ্রহের কথা জেনে ও শুনে এতটুকুও বিস্মিত বা বিচলিত হইনি। উপরন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস ভগবান স্বয়ং অবতীর্ণ হচ্ছেন, তাঁর সঙ্গে আসছেন সনাতনী কমলার অংশ অবতার এবং সেই লগ্নের খুব বিলম্ব নেই আর”! মহর্ষি ভৃগুর এই কথায় কক্ষে উপস্থিত সকলেই অভিভূত হয়ে রইল। মহারাণি সুনীথা গভীর চিন্তামগ্ন হয়ে বসে পড়লেন, পুত্রের শয্যার পাশে। দাসী পদ্মবালা অবাক তাকিয়ে রইল মহর্ষি ভৃগুর দিকে।

মহর্ষি ভৃগু সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে আচার্য বিশ্ববন্ধুকে ইঙ্গিত করে, অস্ফুট স্বরে মহারাণি সুনীথাকে বললেন, “রাত্রি প্রথম প্রহর অতিক্রান্ত মহারাণি, আমাদের এখন অনুমতি দিন। আপনি বিশ্রাম করুন। অযথা দুশ্চিন্তায় এসময় নিজেকে পীড়িত করবেন না, মহারাণি, আমাদের উপর আস্থা রাখুন, যা হবে, তাতে সকলেরই মঙ্গল হবে”। মহারাণি সুনীথা কোন উত্তর দিলেন না, মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন। আচার্য বিশ্ববন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে, মহর্ষি ভৃগু মহারাণির কক্ষত্যাগ করে, অলিন্দ দিয়ে ধীরপায়ে হাঁটতে লাগলেন, সদরের দিকে।


এর পরের পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১৭শ পর্ব "



সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১১

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


  



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১০  



 

সকালে মাঠ থেকে ফিরে, সে সোজা গিয়েছিল, সেই দুই গাছের নীচেযে দুই গাছের ওপরের মাচায় রাখা আছে কালকের আনা অস্ত্রশস্ত্রগুলো। মাচা থেকে একটা দা কোমরে গুঁজে নিল, তারপর চারটে বাঁশ নামাল নীচেয়। ওখানেই বসে বাঁশগুলোকে ছেঁটে বানিয়ে ফেলল একজোড়া রণপা। বাঁশের নীচের প্রান্ত থেকে হাত দেড়েক ওপরে একটা করে শক্ত ফেঁকড়ি রাখা আছে। দুহাতে দুটো-দুটো বাঁশ ধরে, দুদিকের ফেঁকড়িতে পা রেখে সে চড়ে পড়ল রণপায়। তারপর দ্রুত দৌড়ে চলল নিজের কুটিরের দিকে। বহুদিন পর এই রণপা তাকে এনে দিল স্বাচ্ছন্দ্য আর আত্মবিশ্বাস।

নিজের কুটিরে এসে দুজোড়া রণপা সে লুকিয়ে ফেলল, গভীর ঝোপের ভেতর। তারপর একটু বিশ্রাম করে সামান্য কিছু রান্না করল। স্নান সেরে খাওয়াদাওয়া করে, সে কুটিরের সামনে বসল। এখন আর কোন কাজ নেই ভল্লার। বসে বসে চিন্তা করা ছাড়া।

নোনাপুর গ্রামের পরিস্থিতি এখন কেমন হতে পারে, সেটাই চিন্তা করছিল ভল্লা। তাজা জোয়ান এক ছেলের সাপের দংশনে মৃত্যু হলে, সে পরিবারটি মানসিক দিক থেকে ধ্বস্ত হয়ে যায়। কমলিমা ও জুজাকেরও দুই ছেলে সাপের ছোবলে মারা গিয়েছিল। ভয়ংকর এই অভিঘাতে পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-পরিজনও বেশ কিছুদিন নির্মোহ উদাসীন হয়ে ওঠে। কোন জীবনই যে নিত্য নয়, সে কথা কে না জানে। কিন্তু এমন এক একটা ঘটনা যেন চোখে আঙুল দিয়ে সকলকে বুঝিয়ে দেয়। জীবন এই আছে, এই নেই। তারা যেন অনুভব করতে পারে, আড়ালে বসে থাকা ভাগ্যদেবতার ক্রূর হাসি। ভল্লার ধারণা হানোর এই মৃত্যু-শোক তার ছেলেদের পক্ষে কিছুটা হলেও রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়াল। ছেলেরা সত্যিই রামকথা দেখতে গিয়েছিল কিনা। নাকি তারাই আস্থানে ডাকাতি করতে গিয়েছিল। এসব ভাবনা চিন্তা করার মতো সুস্থির মতি গ্রামের অধিকাংশ মানুষেরই আপাতত নেই। এই বিষণ্ণতা কাটিয়ে, সকলে যখন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে, ততদিনে আস্থানের ডাকাতির ঘটনা গুরুত্ব হারাবে। তবে ভল্লার ভয় কবিরাজমশাই এবং গ্রামপ্রধান জুজাককে। দুজনেই অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং বহুদর্শী।          

ভল্লা সতর্ক হল। কিছুক্ষণ থেকেই কুটিরের পিছন দিক থেকে সে চার-পাঁচজনের পায়ের শব্দ পাচ্ছিল। আর কানে আসছিল তাদের চাপা কথাবার্তার আওয়াজ। এই অসময়ে কে হতে পারে? আস্থানের রক্ষীরা? তাদের তো এখানে আসার কথা নয়। “ভল্লাদাদা ঘরে আছো?” এবার অপরিচিত গলার ডাক শুনতে পেল ভল্লা। আস্থানের রক্ষীরা তাকে নিশ্চয়ই ভল্লাদাদা বলে পীরিত দেখাতে আসবে না। সামনের পথ ঘুরে পাঁচজন ছোকরা এসে দাঁড়াল ভল্লার সামনে। ভল্লা কোন কথা বলল না, জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে রইল তাদের দিকে।

“আমরা আসছি, পাশের রাজ্য থেকে ভল্লাদাদা। আমাদের গ্রামের নাম বটতলি। আমরা পাঁচজন বন্ধু তোমার কাছে সাহায্যের জন্যে এসেছি। আমি মিলা, এরা ভট্টা, জনা, পুনো আর সুরো”।

ভল্লা বিরক্তির সঙ্গে বলল, “আমি সকলকে অকাতরে সাহায্য বিতরণ করে থাকি, এ সংবাদ তোমাদের কে দিল? যাই হোক, বসো। নিজের রাজ্য ছেড়ে আমার কাছে এসেছ সাহায্য চাইতে, এ খবর চাপা থাকবে না। বিপদে পড়বে – সেটা জানো তো?”

জনা খুব দৃঢ় স্বরে বললে, “বিপদকে আমরা ভয় পাই না”।

ভল্লা তাচ্ছিল্যের হাসি মুখে নিয়ে বলল, “খুব আনন্দ পেলাম শুনে। আসন্ন বিপদকে যদি কেউ বুঝতেই না পারে, সে বিপদকে ভয় পাবে কেন? একটি শিশু যখন জ্বলন্ত প্রদীপের শিখা ধরতে যায়, তাকে সাহসী বলব, না বীর বলব, আমি আবার ঠিক বুঝে উঠতে পারি না”।

মিলা চুপ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ভল্লার দিকে, তারপর বলল, “এই জন্যেই তো আমরা তোমার সাহায্য চাইতে এসেছি”।

ভল্লা বলল, “কিসের সাহায্য?”

মিলা বলল, “আমাদের অঞ্চলে পাশাপাশি অনেকগুলি গ্রাম মিলে আমরা একজোট হয়ে উঠছি। আমরা লড়তে চাই”।

ভল্লা বলল, “গ্রামের মানুষদের সঙ্গে নিয়ে লড়াই? বাস্‌রে। কার বিরুদ্ধে”?

“কেন? আমাদের রাজার বিরুদ্ধে! রাজাকে তো সামনে পাবো না, তার প্রতিনিধি বিষয়পতির বিরুদ্ধে”। মিলা বলল।

“বুঝলাম। কিন্তু হঠাৎ তোমরা রাজার ওপর এমন খেপে উঠলে কেন? যতদূর জানি, তোমাদের রাজা বেশ ধার্মিক রাজা। প্রজাদের নিজের সন্তানের মতোই মনে করেন। তোমাদের রাজ্যে কোথাও কোন বিদ্রোহ বা অসন্তোষের কথাও কোনদিন শুনিনি”।

“ঠিকই, এতদিন আমরাও আমাদের রাজাকে খুবই শ্রদ্ধা-ভক্তি করতাম। কিন্তু ইদানীং তাঁর যে উপসর্গ উপস্থিত হয়েছে, তাকে মতিভ্রম ছাড়া আর কী বলা যায়, আমরা জানি না”।

ভল্লা বলল, “বলো কী? এই বয়সে নারীতে আসক্তি?”

মিলা জিভ কেটে বলল, “ছি ছি, তা নয়। বরং ধর্মাচরণে অত্যধিক আসক্ত হয়ে পড়েছেন”।

“আচ্ছা? অতিধার্মিক রাজাও এখন তোমাদের গাত্রদাহ? বেশ, সে কী রকম, শুনি?”

মিলা তার চার সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে বলল, “ভল্লাদাদা, এই দিকের গ্রামগুলিতে চাষবাসের অবস্থা যেমন তুমি দেখছ, আমাদের গ্রামগুলিতেও একই অবস্থা। কোথাও কোথাও আরও সঙ্গিন। আমরা গ্রামিকদের মাধ্যমে বিষয়পতির কাছে বার বার অনুরোধ করেছি – কিছু কিছু কুয়ো বানিয়ে যদি সেচ ব্যবস্থার সুরাহা করা যায়। কিংবা বৃষ্টির জল ধরে রাখার জন্যে যদি কিছু পুকুর বানানো যায়। কিন্তু সে কথায় কেউ কোনদিন কর্ণপাতই করল না। অথচ বিগত দু তিন বছরে, গ্রামে গ্রামে ধর্মস্থান এবং দেবালয় বানানোর ধুম পড়ে গেছে। ভল্লাদাদা, মানুষের পেটে দুবেলা দুমুঠো অন্ন যদি না জোটে, তারা দেবালয় নিয়ে কী করবে বলো তো?”

“ওই সব দেবালয়ে কোন দেবতার পুজো হচ্ছে?”

“দেবরাজ ইন্দ্রের। তিনি নাকি বৃষ্টির দেবতা! গ্রামে গ্রামে তাঁর পুজো হলে, তিনি সন্তুষ্ট হয়ে আমাদের প্রচুর বৃষ্টি দিতে পারেন”।

“ভালই তো। দেবতারা এত ধরনের কৃপা-বর্ষণ করতে পারেন, আর দুমুঠো মেঘ এনে সাত-কলসি বৃষ্টি-বর্ষণ করতে পারবেন না? তা এই মন্দির কারা বানাচ্ছে, তোমাদের গ্রামের মানুষরাই তো?”

“না ভল্লাদাদা। গ্রামের মানুষদের কাছে পয়সা কোথায়? এই মন্দির বানিয়ে দিচ্ছে প্রশাসন”।

“তাতেই বা মন্দ কি? গ্রামের মানুষ কাজ পাচ্ছে, কিছু মানুষের উপার্জন হচ্ছে...”।

“হ্যাঁ কিছু মানুষ কাজ পাচ্ছে, শ্রমিকের কাজ। সে তো সামান্য। আমরা মন্দির নির্মাণের কী জানি? মন্দিরের আসল কাজ তো করছে বাইরে থেকে আসা শিল্পী ও কুলিকরা। এমনকি আমাদের মাটি ভাল নয় বলে, এখানকার ইঁটও ব্যবহার করা হচ্ছে না। ইঁট বানিয়েও কিছু মানুষের উপার্জন হতে পারত। আমাদের কোন জমির মাটিতে ইঁট বানালে, সে জমিতে ছোটখাটো একটা পুকুরও গড়ে উঠতে পারত। কিন্তু না, মন্দিরের ইঁট, পাথর, চূণ, সুরকি, বালি - অন্যান্য যাবতীয় উপকরণ সবই আসছে বাইরে থেকে। রাজধানীর বড়ো বড়ো বণিকরা সেই সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করছে”।

মিলা চুপ করে কিছুক্ষণ মাথা নীচু করে বসে রইল। ভল্লা কোন কথা বলল না। উদাস চোখে ধৈর্য ধরে উপস্থিত পাঁচজনের মুখভাব লক্ষ্য করতে লাগল মন দিয়ে।

মিলা একটু পরে বলল, “রাষ্ট্রীয় অর্থের এই বিপুল অপচয় আমরা যতই দেখছি, আমাদের রক্তে আগুন জ্বলছে, ভল্লাদাদা। মন্দির নির্মাণের নামে, রাজধানী থেকে গ্রাম পর্যন্ত - প্রশাসনের সর্বস্তরের সঙ্গে বণিকদের গড়ে উঠেছে ভয়ানক এক বোঝাপড়ার জাল। আমাদের গ্রাম-মণ্ডলের সদস্য থেকে গ্রামিক, বিষয়পতিরা দ্রুত অবস্থাপন্ন হয়ে উঠছে। পাশের বাড়ির প্রতিবেশীরা যখন অর্ধাহারে কাল কাটাচ্ছে, ওরা প্রচুর আহার, আমোদ ও উল্লাসে উচ্ছৃঙ্খল”।

মিলা সামান্য বিরতি দিতেই, ভল্লা একটু ঠাট্টার সুরে বলল, “তোমরাই মণ্ডল-সভার সদস্যদের নির্বাচন করো, গ্রামিককেও নির্বাচন করো, তাই না? তারা কিনা তোমাদের ভাগ না দিয়ে উপরি-উপার্জনে আহ্লাদ করছে? ওদের প্রতি তোমাদের ঈর্ষা এবং রাগ হওয়াটা স্বাভাবিক”।

মিলা এবার হতাশ সুরে বলল, “আমাদের বিদ্রূপ করছ, ভল্লাদাদা? ঈর্ষা যে করছি না, তা নয়। কিন্তু তার থেকেও বেশি, আমরা ভয় পাচ্ছি। গ্রামের পরিবেশটাই বিষিয়ে উঠছে প্রতিদিন। পরিশ্রমী কৃষক, কর্মকার, কুম্ভকার সকলেই হতাশাগ্রস্ত। তাদের ধারণা হচ্ছে পরিশ্রমের কোন মূল্য নেই। মূল্য আছে শুধু শঠতা, তঞ্চকতা আর বঞ্চনার। এভাবে চললে গ্রামগুলি আর গ্রাম থাকবে না। হাতে গোনা কিছু উদর-সর্বস্ব বিলাসী মানুষের শোষণে ও শাসনে, গ্রাম হয়ে উঠবে মরণাপন্ন হতে থাকা শীর্ণ-কংকালসার অজস্র হতদরিদ্র মানুষের আবাস”।

মিলা চুপ করে গেল। অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বলল না। ভল্লাও কোন উত্তর দিল না। বেশ কিছুক্ষণ পর  মিলা হঠাৎই উঠে দাঁড়াল, বলল, “সন্ধে নামছে, আমরা এখন চলি, ভল্লাদাদা। অনেক আশা নিয়ে এসেছিলাম...”।

মিলার কথায় অন্য চারজনও উঠে দাঁড়াল। উঠে দাঁড়াল ভল্লাও, মিলার দু-কাঁধে হাত রেখে বলল, “তোরা যে কাজের সংকল্প করেছিস, তাতে এত সহজে হতাশ হলে চলবে, মিলা? নাকি ঝট করে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব? তোদের ভল্লাদাদা তো আর দেবরাজ ইন্দ্র নয়। সে তোদের মতোই জীবনের আগুনে দগ্ধ হতে থাকা জলজ্যান্ত মানুষ...”। ভল্লার “তুই” সম্বোধনের আন্তরিকতা এবং সহানুভূতির কথায় ওরা পাঁচজনেই উচ্ছ্বসিত আবেগে বলে উঠল, “ভল্লাদাদা...”।

ভল্লা বলল, “ঠিক কী ধরনের সাহায্য তোরা আমার থেকে চাইছিস খুলে বল তো”।

মিলা উৎসাহ নিয়ে বলল, “এদিককার ছেলেদের তুমি যেমন লড়াকু বানিয়ে তুলছ, আমাদেরও সেভাবে তৈরি করে তোল। আমরা লড়তে চাই, ভল্লাদাদা”।

“সে না হয় শিখলি, কিন্তু খালি হাতে তো আর লড়াই করা চলে না। অস্ত্রশস্ত্র চাই তো, সে সব পাবি কোথায়?”

“আমাদের গ্রাম থেকে চার ক্রোশ দূরে সীমান্তরক্ষীদের স্থায়ী শিবির আছে। সেখান থেকে লুঠ করে আনব”।

“পাগল হয়েছিস? আত্মহত্যা করার এতই যখন শখ, তখন জলে ডুবে মর না, কিংবা বিষ খেয়ে। খালি হাতে সীমান্ত রক্ষীদের শিবির থেকে অস্ত্র লুঠ করতে যাবি? একজনও সেখান থেকে বেঁচে ফিরতে পারবি? ভেবেছিলাম, তোরা অনেককিছু ভেবেচিন্তে এসেছিস – কিন্তু এ তো একেবারেই ছেলেমানুষী...। তোদের বা আশেপাশের গ্রামে ধনী মানুষদের টাকা-পয়সা কেমন আছে? ডাকাতি করে লাভ হবে? নাকি ছুঁচো মেরে শুধু হাতেই গন্ধ হবে?”

“তা আছে। অন্ততঃ দশ-বারো ঘর তো আছেই যাদের বিস্তর টাকা”।

“তাদের দিয়েই শুরু কর না। অস্ত্রশস্ত্র যোগাড়ের জন্যে টাকা চাই। টাকা যোগাড় হলে, অস্ত্রের ব্যবস্থা আমি করে দেব। আরও একটা উপায় আছে। রাজধানীর বণিকরা মন্দির বানানোর সামগ্রী পাঠাচ্ছে বলছিলি না? কিসে পাঠাচ্ছে – নিশ্চয়ই গোরু বা ঘোড়ার শকটে? তার থেকেও কিছু টাকাকড়ি আয় করা যায় – ধরা যাক প্রতি পাঁচ গাড়ি পাথর বা ইঁটের জন্যে একটা তামার মুদ্রা”।

মিলারা পাঁচজনেই উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, “বাঃ এ তো খুব সহজ”।

ভল্লা মুচকি হেসে বলল, “কোনটাই সহজ নয় বৎস। তোদের হাতে টাকা তুলে দেওয়ার জন্যে বণিকরা সর্বদা মুখিয়ে রয়েছে – এরকম ভাবছিস কেন? এ সবের জন্যেও সাহস লাগে – কৌশল জানতে হয়। ঠিকঠাক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারলে – গাড়ি-পিছু তোদের পাওনা বণিকরাই নিয়মিত মিটিয়ে দেবে”।

মিলা বলল, “তুমি আমাদের শিখিয়ে দাও ভল্লাদাদা”।

ভল্লা বলল, “সে না হয় দিলাম। কিন্তু এমন যদি হয়, এরকম বেশ কিছু পয়সা জমিয়ে তোরা নিজেরাই ধনী হয়ে উঠলি। তোরাই গ্রামমণ্ডল গড়ে – তোদের মধ্যে একজন কেউ গ্রামিক হয়ে উঠলি। তারপর পায়ের ওপর পা তুলে রাজার হালে দিন কাটাতে শুরু করলি। লড়াই-টড়াই সব গেল চুলোর দুয়োরে। গ্রামের সকলের মঙ্গলের জন্যে তোদের এই বিপ্লব করার স্বপ্ন পড়ে রইল পথের ধারের আস্তাকুঁড়ে! কাঁচা টাকা বড়ো সাংঘাতিক – সে টাকা যদি সোনা বা রূপোর হয় - তার ঝিলিকে চোখ, মন এবং মাথা ঘুরে যায় রে...”।

    মিলা কিছু একটা বলতে চাইছিল, ভল্লা ঠোঁটে আঙুল রেখে বলল, “এখন আর কোন কথা নয় – যা যা বললাম, ভাবনা-চিন্তা করে, পাঁচ-সাতদিন পরে আসিস – রাত হয়েছে, এখন বাড়ি যা”।


পরের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১২ "


রবিবার, ১ মার্চ, ২০২৬

মাথার পোকা



স্মৃতি মেদুর এই রম্যকথার শুরু - " লিটিং লিং - পর্ব ১ "


এর আগের পর্ব - " পরিবর্তিনি সংসারে... "

 

‘স্‌স্‌স্‌স্‌শিল কুট্‌ঔ’

স-এ তীক্ষ্ণ সিটি দিয়ে শুরু করে, কণ্ঠের অদ্ভূত ইয়ডলিংয়ে ‘ঔ’ হেঁকে সামনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায় বিহারি শিল কুটোনোওয়ালা।  তার ডাক শুনে দৌড়ে বারান্দায় গেল পান্না।

ওই লোকটি তার চেনা, কয়েকদিন আগেই মা ওর থেকে শিল নোড়া কুটিয়েছিল। শিলকুটোনোর সময় পান্না বসেছিল তার সামনে। ছোট্ট ছেনিতে হাতুড়ির ঠুকঠুক ঘায়ে সে খড়খড়ে করে তুলেছিল শিল আর নোড়ার মসৃণ হয়ে যাওয়া গা। হাতুড়ির আঘাতে ছেনির আগায় মাঝে মাঝেই ছিটকে উঠছিল ছোট্ট ছোট্ট ফুলকি আর পাথরের মিহিন কুচি। বিহারী শিলকুট্‌নেওয়ালা তাকে সতর্ক করেছিল, “হঠ যাও খোখাবাবু, আঁখমে পাত্থর গিরবা করেগা, তো বহোত দরদ হোবে”।

মাও ঘরের ভেতর থেকে বলেছিলেন, “ওখান থেকে সরে আয় ভুট্‌কু, চোখে লাগবে”। পান্না তার ডাকনাম হলেও, সোনা ছোটপুত্রকে আদর করে ডাকেন ভুট্‌কু। পান্না একটু সরে এসে উঠে দাঁড়িয়েছিল, আর অবাক হয়ে দেখেছিল ছেনির ঘায়ে ছোট্ট ছোট্ট গর্তে বুনে ওঠা মাছের নকশা, আর তার পাশে যেন অজস্র বৃষ্টির ধারাশিল কুটোনো হয়ে গেলে বিহারী ডাক দিয়েছিল, “লিয়ে যান, মাজী, হোইয়ে গেলো”

মায়ের সাহায্য হবে ভেবে, পান্না শিল তুলে ঘরের ভেতরে আনতে যাওয়াতে, শিলকুটোনোওয়ালা বলেছিল, “বহোৎ ভারি, তুমি শকবে না, খোখাবাবু, ছোড় দো, মাজি লিয়ে যাবে” এবং পিছন থেকে মা হাঁ হাঁ করে উঠেছিলেন, “তুই কখনো শিল তুলতে পারিস ভুট্‌কু? পায়ে পড়লে আঙুল থেঁতলে যাবে, সর সর, আমি দেখছি”। 

তুলে নেওয়ার আগে শিল আর নোড়ার গায়ে হাত বুলিয়ে দেখে নিচ্ছিলেন মা, ঠিকঠাক খসখসে হল কি না, বিহারী কুটনোওয়ালা বলল, “দিখা লাগবে না, মাজি, ছোমাস কুছু করতে হোবে না, দেখে লিবেন”

“ছমাস যাবে, না ছাই যাবে, একমাসেই পাথরের গা তেলা হয়ে যায়”সোনার কথায় টেনে টেনে হেসেছিল বিহারী কুটনেওয়ালা, “ওইসান না হলে, হামাদের ভি চলবে কী করে, মাজি?”

সোনা আর কথা বাড়াননি, শিল-নোড়া তুলে ঘরে এনে, পান্নার হাতে দশপয়সা দিয়ে বলেছিলেন, “যা তো গিয়ে দিয়ে আয়”একটা দায়িত্ব পেয়ে উত্তেজিত পান্না দৌড়ে গিয়ে পয়সাটা তুলে দিল কুটনোওয়ালার হাতে। উপার্জিত অর্থ পেয়ে খুশী কুটনোওয়ালা পান্নার দিকে তাকিয়ে হাসল। তারপর কোমরে বাঁধা ময়লা বটুয়া বের করে, তার মধ্যে রাখল পয়সাটা। তারপর বেরিয়ে গেল ছেনি-হাতুড়িওয়ালা ছোট্ট চটের ব্যাগ নিয়ে। রাস্তায় নেমে, হাঁক দিল, “স্‌স্‌স্‌স্‌শিল কুটঔ”

ঘরে এসে শিশু পান্না জিজ্ঞাসা করেছিল, “শিল কোটালে কেন গো, মা?”

“শিল-নোড়ার গা তেলতেলে মসৃণ হয়ে গেলে, মশলা বাঁটতে অসুবিধে হয় যে! আদা, পেঁয়াজ তাও বাঁটা যায়, কিন্তু শিল-নোড়া খসখসে না হলে পোস্ত, সরষে, ধনে, জিরে বাঁটাই যায় না!”

 

আজ পান্নাকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, সেই কুটনোওয়ালা জিজ্ঞাসা করল, “মাজিকো বোলো, শিল কুটতে হোবে?” তার কথায় পান্না ঘরে ঢুকে মাকে জিজ্ঞাসা করল, “মা, মা, সেই শিলকুটোনোওয়ালা আজ আবার এসেছে, আজও শিল কোটাবে?”

সোনা বালতিতে বাসি জামাকাপড় ভেজাচ্ছিলেন, ভুরু কুঁচকে তাকিয়েও হেসে ফেললেন, বললেন, “বলেছিল ছমাস যাবে, সাতদিন না হতেই আজ আবার এসেছে? বলে দাও, দরকার হলে, তুমিই ওকে ডাকবে” এরকম একটা দায়িত্ব পেয়ে পান্না অভিভূত হয়ে গেল, অবাক আনন্দে বলল, “আমি ডাকবো, মা?”

সোনা স্মিতমুখে বললেন, “হুঁ, তুমিই তো ডাকবে...কত্তো বড়ো হয়ে গেছো তুমি, আমার আর চিন্তা কী? এখন থেকে তুমিই তো ডাকবে!” পান্না আবার দৌড়ে গেল বারান্দায়, অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা শিলকুটোনোওয়ালাকে, ঘাড় নাড়িয়ে বলল, “আজ নয়, দরকার হলে, আমিই তোমায় ডাকবো, কেমন?”

 

২  

এ সময় এজমালির বাথরুমটাও খালি থাকেদোতলার ভাড়াটেরা স্বামী স্ত্রী দুজনেই অফিসে বেরিয়ে যায়। বাথরুমে ঢুকে, একরাশ ভেজানো জামাকাপড় মেঝেয় ফেলে, তাতে বার সাবান ঘষতে বসলেন সোনা। বাইরে দাঁড়িয়ে পান্না ব্যস্ত মায়ের দিকে চুপ করে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ ঘাড়ের কাছে এলিয়ে পড়েছে আলগাবাঁধা খোঁপা। কপালের ওপর দু একটা আলগা চুলের গুছি। কপালে, নাকের ডগায়, চিবুকে জমে উঠেছে, বিন্দুবিন্দু ঘাম। সাবান ঘষা, থুবি দিয়ে কাচার সঙ্গে সঙ্গে বেজে উঠছে মায়ের হাতের শাঁখা, নোয়া, পলা আর সোনার চুরি।

পান্না ঘুম থেকে ওঠার আগে থেকে সোনার কাজ শুরু হয়ে যায়। উনুন ধরানো, ঘর ঝাঁট দেওয়া, কুটনোকোটা, বাঁটনা বাঁটা, রান্না-বান্না, এঁটো থালাবাসন ধোয়ার পর, এই জামাকাপড় কাচতে বসা...মায়ের কাজের যেন অন্ত নেই!  বাবা অফিসে, দাদা স্কুলে। এখন কে হবে তার সঙ্গী? কিছুক্ষণ মায়ের কাজ দেখে, সে আবার চুপচাপ বারান্দায় গেল। এই সময় মায়ের কাছে ঘ্যানঘ্যান করলে, বকুনি জুটবে, হয়তো পিঠে দু একটা চড়-চাপড়ও।

প্রাক দ্বিপ্রহরে সামনের রাস্তাটাও একটু ফাঁকা, পথচারীর সংখ্যা কমপাড়ার বড়োরা সবাই অফিসে, ছোটরা, যারা তার মতো ছোটও নয়, তারাও সবাই স্কুলে। বিহারি টানা-রিকশাওয়ালারা সকাল থেকে বেরিয়েছিল, এখন এক এক করে ফিরছে। রিকশাগুলো রাস্তার ধারে, পান্নাদের বারান্দা ঘেষে দাঁড় করিয়ে, এখন একটু বিশ্রাম নেবে। উল্টোদিকের টিউবওয়েল থেকে জল ভরে আনবে ঘটিতে। তারপর কাগজের ঠোঙা থেকে কিনে আনা ছাতু ঢালবে কানা উঁচু কাঁসার  থালায়সেই ঠোঙাতেই থাকে দুটুকরো পেঁয়াজ, দুটো কাঁচা লংকা, একটু তেঁতুলের আচার। থালার ওপর চূড়ো করা ছাতুর কোল ভেঙে থালাতেই একটু জল নিয়ে ছাতু ভিজিয়ে গোল্লা পাকিয়ে মুখে তুলবে। কখনো পেঁয়াজ, কখনো লংকায় কামড় দেবে, কখনো জিভের ডগায় ঠেকাবে তেঁতুলের আচার। খাওয়া সেরে তারা টিউবওয়েলে গিয়ে থালা এবং ঘটি সুন্দর করে মেজে নেবে। রাস্তার বাঁদিকে বিশাল পুরোনো বাড়িটার একতলায়, ওদের একটা ঘর ভাড়া নেওয়া আছে। সেই ঘরে থাকে না কেউ। সেই ঘরে থাকে ওদের ওই থালা-বাটি-ঘটি। এক আধটা ধুতি। চটের বস্তায় জড়ানো ওদের বিছানা। একপাশে থাকে কয়লা, ঘুঁটে, কেরাসিন তেলের শিশি, তোলা উনুন। ওদের ওই ঘরের সামনের বারান্দাতে, রাত্রে ওরা রুটি আর সবজি বানিয়ে খায়। তারপর গরমের সময়, অনেক রাত অব্দি নিজেদের মধ্যে গল্প করে, তাদের গ্রামের খেতি-জমিন, গায়-ভ্যাঁয়েস, গেঁহু, চানা...। তারপর অনেক রাতে ওই বাড়ির রোয়াকে বিছানা বিছিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। মতিহারি, ছাপরা থেকে আসা বিশ-পঁচিশ জন দেহাতি মানুষের বৈচিত্র্যহীন দিনযাপনের এই চিত্রগুলি মুখস্থ হয়ে গেছে পান্নার

বারান্দায় দাঁড়িয়ে রিকশাওয়ালাদের ফিরে আসা দেখতে দেখতে, পান্নার মনে পড়ল, কিছুদিন আগেই রথের মেলা থেকে সে একটা বাঁশি কিনে এনেছিল। মেলায় দেখা সেই বাঁশিওয়ালার ঝুড়িতে ছিল একগাদা বাঁশি, আর একটা বাঁশি হাতে নিয়ে সে খুব সুন্দর সুর তুলছিল বাঁশিতে। সেই সুরে মুগ্ধ পান্না বাঁশি কেনার জন্য বায়না ধরল। অবশেষে বাবার একটা হাত ধরে ঝুলে পড়ে, দুপয়সা দিয়ে একটা বাঁশি কিনতে বাধ্য করিয়েছিল বাবাকে বাড়িতে এনে সে বাঁশিটা বাজাতে চেষ্টা করেছে অনেক। কিন্তু যতবার ফুঁ দিয়েছে কিছুতেই সুর বেরোয় নি। বরং বিদঘুটে ভাঙাগলা এক আওয়াজ বেরোচ্ছিল

সেই বাঁশিটা নিয়েই এখন সে ক্যাঁ ক্যাঁ বাজাতে লাগল। সোনা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন ছেলেকে বাঁশির বিচ্ছিরি আওয়াজটা তাঁর কানে লাগছিল, বিরক্তির সৃষ্টি করছিলকিন্তু তাও কিছু বললেন না, ছেলেটাই বা করে কী? এই বয়সের বালক চঞ্চল ও অস্থির তো হবেই, গ্রামের বাড়িতে থাকলে, সমবয়সী পড়শী ছেলেমেয়েদের সঙ্গে হুটোপুটি, দৌড়োদৌড়ি করলে, একটু আনন্দ পেত, মজা পেত। কিন্তু কলকাতার এই একখানা ঘরের বাসায় সেই উপায় কই? তাছাড়া, তিনি নিজেও চান না, এই পাড়ার ছেলেপিলেদের সঙ্গে ছাড়তে। কলকাতার লোকজন সম্বন্ধে তাঁর একটা ভীতি মনের মধ্যে কাজ করে। এখানে ছেলে-ধরা কিংবা ছেলেকে বখাটে বানিয়ে তোলার হরেক আয়োজন এবং কে জানে তাঁর ছেলের জন্যেই ওই সব লোকেরা উদ্গ্রীব হয়ে আছে হয়তো বা!

 

 

“ভুটকু আয়, ছাদে কাপড় মেলতে যাবো”সোনার কাপড়-চোপড় কাচা হয়ে গেছিল। বালতিতে আধভেজা কাপড় চোপড় নিয়ে তিনি দোতলার সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে পান্নাকে ডাকলেন। পান্না বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাঁশিতে ফুঁ দিচ্ছিল। দৌড়ে এসে মায়ের সামনের সিঁড়িতে লাফিয়ে উঠল।

সোনা বললেন, “ওকি, ঘরের দোরটা ভেজিয়ে দিলি না?”

পান্না বলল, “আমরা এখনই নেমে আসবো তো” সোনা একটু অধৈর্য কণ্ঠে বললেন, “তা হলেই বা, বেড়াল-টেড়াল আছে। উটকো লোকজনও ঢুকে পড়তে পারে। যা চেপে দিয়ে আয় দরজাটা”। পান্না আবার দৌড়ে নেমে দরজাটা চেপে দিল, তারপর মুখে কু-উ-উ-উ আওয়াজ তুলে একছুট্টে উঠে গেল সিঁড়ির মাথায়। সেখানে দাঁড়িয়ে বলল, “কই এসো?”। সোনা হাসলেন, তাঁর ডানহাতের বালতিতে ভেজা কাপড়ের যথেষ্ট ওজন, এক এক ধাপ উঠতে উঠতে বললেন, “অত তাড়াতাড়ি পারি? দেখছিস না, আমার হাতে বালতি”! 

“আমায় দাও না, বালতিটা”। সিঁড়ির মাথায় উঠে সোনা বালতিটা নামালেন। হাতটা ভেড়ে গিয়েছিল, একটু জিরিয়ে নিতে থামলেন। পান্না বালতিটা তোলার চেষ্টা করছিল, পারল না, বলল, “বাব্বাঃ কী ভারি? তুললে কী করে, মা?”

বালতি তুলে দোতলা থেকে ছাদের সিঁড়ির দিকে এগোতে এগোতে সোনা বললেন, “চল, ছাদে চল”। এবারে পান্না আর তাড়তাড়ি উঠল না, মায়ের আগে আগে সিঁড়ির একধাপ একধাপ উঠতে লাগল। সে বুঝতে পারছিল, ওই ভারি বালতিটা নিয়ে এতগুলো সিঁড়ি ভেঙে ছাদে ওঠা মোটেই মজার ব্যাপার নয়।

ছাদের দরজা খুলে খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে পান্না আবার আনন্দে দৌড়ে নিল খানিকবাঁশি বাজাতে বাজাতে ছুটোছুটি করতে লাগল ছোট্ট ছাদের এ কোণ থেকে সে কোণে তার মাথার থেকেও উঁচু প্যারাপেটের আড়ালে আশেপাশের বাড়ি তেমন দেখা না গেলেও, মাথার ওপর উন্মুক্ত আকাশ তাকে অদ্ভূত মুক্তির স্বাদ এনে দিল।

সোনা ছাদের কাপড় মেলা দড়ির নীচে বালতি রেখে, ভেজা কাপড়গুলো চেপে নিংড়ে দড়িতে টাঙাতে শুরু করলেন। অধিকাংশ কাপড় দড়িতে মেলে দেওয়ার পর, নিংড়োনো জলটা জমে ছিল বালতিতে। বাঁশির একঘেয়ে বেসুর ডাকে বিরক্ত হয়ে পান্না, নতুন কিছু করার উৎসাহে, বালতির জলে ডুবিয়ে দিল বাঁশিটা। তারপর অন্যপ্রান্তে ফুঁ দিতেই এবার আর শব্দ হল না, জলের মধ্যে গুলগুল করে উঠল বুদবুদ। ক্ষণস্থায়ী সেই বুদবুদের গায়ে সূর্যের আলোয় খেলতে লাগল সপ্তবর্ণ। কী আশ্চর্য, অবাক করা কাণ্ড। বাঁশিতে ফুঁ দিলে শুধু আওয়াজই নয়, সাতরঙা রংও ফুটে ওঠে স্বচ্ছ জলে! অবাক পান্না চিৎকার করে উঠল, “মা, মা, দেখ, কী সুন্দর রঙ...”।

শ্রান্ত সোনা শেষ কাপড়টা নিঙড়ে দড়িতে শুকোতে দিতে দিতে দেখলেন ছেলের কীর্তি, ক্লান্ত স্বরে বললেন, “বাঃ, ভারি সুন্দর তো, আমার ভু্‌ট্‌কুটা কত কী শিখে ফেলল!” 

 

সব জামা কাপড় শুকোতে দেওয়ার পর সামান্য অবসর। সোনা ছাদের আলসেতে ভর দিয়ে একটু দাঁড়ালেন, রাস্তার ওপারের মাসিমাও ছাদে এসেছিলেন গুল দিতে। সোনাকে দেখে মাসিমা হাসিমুখে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার কাপড় শুকোতে দেওয়া হল, বৌমা?”

শাড়ির আঁচলে মুখ মুছে সোনা বললেন, “হ্যাঁ, মাসিমা। আপনি এই দুপুর রোদ্দুরে ছাদে কী করছেন”?

“গুল দিতে এসেছিলাম। আমারও হয়ে গেল, এবার নীচেয় যাবো, চান-টান করবো”।

“কয়লার গুল?”

“হ্যাঁ, কয়লার গুঁড়ো জমা হয়েছিল, একগাদা। আজ দিয়ে ফেললাম”।

“তাই? আমাদের কয়লার চৌবাচ্চাটাও গুঁড়োয় আদ্দেক ভরে গেছে। একমণের বস্তা ঢাললে উপচে পড়ে, চৌবাচ্চায় পুরোটা ধরে না। ভাবছিলাম, কয়লার গুঁড়ো ফেলে দেব, কিন্তু...”।

“ফেলে দেবে কী গো, বৌমা, দুদিন সময় করে, গুল দিয়ে ফেল, পনেরদিনের জ্বালানি হয়ে যাবে”!

“তাই তো! কিন্তু কী করে গুল দেব মাসিমা?”

“ও মা, তাও জানো না। কয়লার গুঁড়োর সঙ্গে একটু মাটি আর ভাতের ফ্যান মিশিয়ে, গুল বানিয়ে রোদ্দুরে শুকিয়ে নাও, বাস্‌ গুল তৈরি! গাঁয়ে থাকতে তোমরা গুল বানাতে না?”

শহরের আদব-কায়দা না জানা সোনা, একটু যেন লজ্জা পেলেন, বললেন, “তা না মাসিমা, আমাদের ওদিকে ঘুঁটে, ধানের তূষ আর কাঠকুটোতেই রান্না-বান্না হয়ে যায়। কয়লা ব্যবহার হয়, তবে কম। তাতে যেটুকু গুঁড়ো হয়, তার ধিকিধিকি জ্বালনে ধানসেদ্দ কিংবা রোজকার দুধের জ্বাল দিতেই খরচা হয়ে যায়”

“তোমাদের বাড়ি বদ্দোমানে, না? কতায় বলে “জেলার সেরা বদ্দোমান, আর কলার সেরা মত্তোমান”। তার মানে তোমরা ঘটি। তোমরা তো তাও ভালো, তোমাদের ওপরে যে বাঙালরা ভাড়া থাকে, তাদের রীতকরণ দেখেছো? যেমন কতাবাত্তা, তেমন আচার-আচরণ। খাইসে, ইসে, পোলা, মাইয়া – শুঁটকি মাছও খায়, তোমরা গন্ধ পাও না? ছ্যা, ছ্যা, আমার তো নাকে কাপড় দিলেও গা গুলোয়!”

সোনা এ কথার কোন উত্তর না দিয়ে একটু হাসলেন, তিনি জানেন বাড়িওয়ালি মাসিমা, আড়ালে তাঁদের সম্বন্ধেও অনেক কথা বলে থাকেন। তাঁরাও ভাড়াটে, কিন্তু ঘটি – অতএব বাঙাল ভাড়াটেদের তুলনায় তাঁরা মন্দের ভালো! কিন্তু শুধু ভাড়াটে বলেই নয়, বাড়িওয়ালী মাসিমা একবার শুরু করলে, এ পাড়ার সকল প্রতিবেশী – বাড়িওয়ালা এবং ভাড়াটে নির্বিশেষে – সকল পরিবারের দোষ, ত্রুটির হাঁড়ির খবর সরবরাহের দায়িত্ব পালন করে থাকেনকার বাড়িতে স্বামী-স্ত্রীতে বনিবনা নেই। কার বাড়ির কর্তার চরিত্র দোষ আছে। ওপাশের কোন বাড়িতে ভর দুপুরবেলা প্রায়ই এক উটকো পুরুষ ঢোকে, বিকেল হলেই বেরিয়ে যায়! বৌটাকে জিজ্ঞাসা করলে বলে, পিসতুতো দাদা! চোখে অদ্ভূত ইশারা এবং মুখে রহস্যের হাসি নিয়ে, মাসিমা বলেন, “অ বৌমা, কেমন পিসতুতো দাদা গো, দুপুর ছাড়া অন্য সময়ে তার আসার সময় হয় না?”

যে মহিলার সম্পর্কে মাসিমা এই গোপন সংবাদ দিলেন, সে মহিলাকে সোনা চেনেন। অত্যন্ত বিষণ্ণ মুখের নির্বিকার নিঃসন্তান এক মহিলা! পাড়ার কারো সঙ্গে তেমন মেশেন না। মুখরোচক এই সংবাদে সোনা এতটুকুও কৌতূহলী না হওয়ায়, মাসিমা মোটেই হতাশ হলেন না, বরং আরো উত্তেজিত হয়ে বললেন, “ওই বউয়ের আরো কিত্তি শুনলে, তুমি আঁতকে উঠবে বৌমা! শুধু পিসতুতো দাদাই নয়, আরো একজন আসে, হ্যাঁ গো! বলে, ওর দেওর, সে নাকি ওর বরের খুড়তুতো ভাই! সেও আসে ওই দুপুরেই! ভদ্দোরনোকের পাড়ায় এ সব কী বলো তো, বউমা? ছি ছি ছি”। তারপর চোখের অদ্ভূত এক ইঙ্গিত করে, মাসিমা গা দুলিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, “আমি কী ভাবি জানো তো বৌমা, যদি দুজনে একই দিনে একই সময়ে এসে উপস্থিত হয়? তখন ওই মাগি কী করবে, বল দেকি? হি হি হি হি...”!    

মাসিমাকে আর বাড়তে না দিয়ে, সোনা বললেন, “আমি আসি মাসিমা, নীচেয় রাজ্যের কাজ পড়ে আছে, ছেলেটাকেও চান করাতে হবেভুটকু নীচেয় চ।  আসছি, মাসিমা”

 

 

পান্না একমনে বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে, বালতির জলের মধ্যে বুদবুদ তৈরি করছিল, বুদবুদের গায়ে নানা রঙের রামধনু সৃষ্টি করছিল! সোনা সে বালতিটা টেনে নিয়ে ঝাঁঝরির মুখে ঢেলে দিলেন জলটা। তারপর খালি বালতি হাতে নিয়ে পান্নার দিকে তাকিয়ে বললেন, “চঃ, নীচেয় যাই। নাওয়া খাওয়া সেরে একটু শুই। সেই ভোর থেকে যা চলছে”।

সোনা ছাদের সিঁড়ির মুখে দাঁড়ালেন, দেখলেন পান্না আসছে না, মুখ হাঁড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে ছাদের মাঝখানে। “কী রে, আয়! নীচেয় যাবি না?” পান্না নিরুত্তর। তার মনের মধ্যে তখন প্রচণ্ড ক্ষোভ এবং অভিমান। মা বিনা বাক্যে ঝাঁঝরির মুখে জলটা ঢেলে দিলেন? একবারের জন্যেও তাঁর মনে হল না, পান্নার কথা, পান্নার নতুন আবিষ্কারের কথা! এমন নিষ্ঠুর মায়ের সঙ্গে সে আর কোন কথা বলবে না!

সোনা এতক্ষণে যেন ব্যাপারটা আন্দাজ করলেন, বললেন, “সোনু তোমার সেই রামধনুর জলটা ফেলে দিয়েছি বলে, মায়ের ওপর রাগ করেছো? আচ্ছা, বাবা আচ্ছা, আমার ঘাট হয়েছে, এর পরের দিন, তোমার জন্যে অনেকটা সাবান জল রেখে দেব। কেমন? এখন চলো, নীচেয় যাই”। পান্না এতটুকুও বিচলিত হল না, মায়ের এই প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও সে একই ভাবে ঘাড় শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল।

সোনা এবার বললেন, “বেশ, থাকো তুমি দাঁড়িয়ে, আমি নীচেয় চললাম”।  সোনা তিন চার ধাপ নেমে গেলেন সিঁড়ি দিয়ে, তারপর একটু অপেক্ষা করে আবার উঠে এলেন, দেখলেন, পান্না একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে, এবার তাঁর ধৈর্যের বাঁধ টুটল, বললেন, “পান্না, সোজা কথায় নীচেয় আসবি, নাকি পিঠটা ফাটাবো?”

মায়ের কণ্ঠস্বর এবং ওই “পান্না” ডাক, পান্নাকে ভয় পাইয়ে দিল, সে বুঝল, মা রেগে গেছেন। মায়ের হাতের দু একটা চড় চাপড়ের স্বাদ, এর আগে সে দু একবার পেয়েছে! সেই স্মৃতি মনে করে, সে আস্তে আস্তে নীচেয় নেমে এল। 

নীচেয় নেমে সোনা হাতের বালতি রেখে, পান্নার হাতে গামছা দিয়ে বললেন, “যাও, সোনু মাথায় তেল দিয়ে ঝপ করে চান সেরে এসো। তোমার হলে, আমি যাবো। ততক্ষণ আমি ঘর দোর একটু গুছিয়ে নিই”।

মায়ের কণ্ঠের স্বাভাবিক সুরে, পান্না তার হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস আবার ফিরে পেল, ঘরের এক কোণে সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল, মেঝের দিকে তাকিয়ে। সোনা কাজ সারছিলেন, পান্নাকে লক্ষ্য করেননি। কিছুক্ষণ পরে তিনি খেয়াল করলেন, পান্না মুখভার করে ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে আছে...একটু মায়া হল, আবার বিরক্তও হলেন, “আর ভাল লাগছে না, সোনু, যা না তেল মেখে চানটা করে আয়, না”। পান্না আড়চোখে মায়ের মুখটা দেখল এবং একই ভাবে দাঁড়িয়ে রইল।

আর সেই সময়েই রাস্তা থেকে হাঁক শোনা গেল, “দাঁআআআআআতের পোকা, বেএএএএর করি”।

বৃদ্ধা এক পৃথুলা মহিলা, পরনে সাদা থান আর সাদা ব্লাউজ, হাতে মাঝারি সাইজের পেটমোটা একটা কাপড়ের থলি। মাথার পেছনদিকে বড়ি করে বাঁধা সাদা-কালো চুলের খোঁপা। এই সময়েই সে রোজ আসে, দাঁতের পোকা বের করতে। এ পাড়ার মেয়ে-বউদের দাঁতে ব্যথা হলে, তারা ডেন্টিস্টের চেম্বারে গিয়ে দাঁত বের করে বসে পড়ার কথা কেউ চিন্তাও করে না। পুরুষহীন নির্ঝঞ্ঝাট দুপুরে এই বৃদ্ধা তাদের দাঁতের ‘চিকিচ্ছে করে’তার হাতের কারসাজিতে ব্যথা হওয়া দাঁত থেকে বের হয়ে আসে মুড়ির মতো দেখতে জ্যান্ত বড়ো পোকা! পোকা বের করে দেওয়ার পর দাঁতের গোড়ায় ঘষে দেওয়া কোন ওষুধের গুণে, ব্যাথা সেরে যায় বেশ কদিনের জন্যে। আশ্চর্য তার হাত যশ। পাড়ার মেয়েরা বৃদ্ধা ওই মহিলাকে বলে “বেদে বুড়ি”!

সোনা ওই বেদে বুড়ির ডাক শুনেই বলে উঠলেন, “দাঁড়া তো, ওই বেদে বুড়িকে ডাকি, আমার ছেলের মাথার পোকাগুলোকে সব বের করে দিক। সেদিন হারুর মা, ওকে ডেকে হারুর মাথার সব পোকা বের করে নিয়েছে”!

পান্না এবার সত্যি সত্যি ভয় পেল, মাথার ভেতরে পোকা থাকা এবং সেই পোকা বের করা ব্যাপারটা তার বুদ্ধির বাইরে! সে ভয়ে ভয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করল, “তারপর, হারুর কী হল, মরে গেল?”

সোনা মুখ টিপে হেসে বললেন, “বালাই ষাট মরবে কেন? পোকাগুলো বের করে দেওয়াতে হারু একদম লক্ষ্মী ছেলে হয়ে গেল, ওর মা যখন যা বলত, সব শুনত। কক্‌খনো দুষ্টুমি করত না! ডাকবো বেদে বুড়িকে?”

পান্না হারু বা হারুর মা কাউকেই চেনে না, কিন্তু মায়ের ওপর রাগ করে আর অবাধ্য হওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে, সে দৌড়ে গেল বাথরুমে। চৌবাচ্চার মধ্যে মগ ডুবিয়ে সে জল ঢালতে লাগল মাথায়। জল ঢালার আওয়াজের মধ্যেও, সে বেদে বুড়ির ডাক শুনতে পেল, “দাঁআআআআআতের পোকা, বেএএএএর করি”। তবে শব্দটা বেশ দূরের শব্দ, মা এখন ডাকলেও বেদে বুড়ির সে ডাক শোনার সম্ভাবনা কম। পান্না নিশ্চিন্তে মাথায় জল ঢালতে ঢালতে হৈ হৈ করে গান ধরল, “গানে প্রজাপতি পাখায় পাখায় রঙ ছড়ায়, এ গানে রামধনু তার সাতটি রঙ ঝরায়...”।

সোনার মুখে প্রশ্রয়ের মৃদু হাসি, অস্ফুট স্বরে বললেন, “পাগল, সত্যি সত্যিই আমার এ ছেলেটার মাথায় পোকা আছে!” 

..০০..       

পরের পর্ব - " আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে...পর্ব ১ "

                

            

 

 


নতুন পোস্টগুলি

ওঁ শান্তিঃ (নাটিকা)

  এর আগের গল্প - "  জঙ্গী ব্যবসা   " এর আগের নাটক - "  চ্যালেঞ্জ - নাটক  "  এর আগের নাটক - "  এক দুগুণে শূণ্য ...