শনিবার, ২১ মার্চ, ২০২৬

মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ৫

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "



এর আগের পর্ব - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ৪ 


পঞ্চম পর্ব   


১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বাংলার নবাব সিরাজকে পরাস্ত করে ভারত শাসনের সূচনা করেছিল, ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি নামক ব্রিটিশ বণিক সংস্থা। অর্থাৎ সে সময় ভারতের কিছু অঞ্চলে শুরু হয়েছিল কোম্পানি রাজ। এই সময়ের প্রধান তিনটি অঞ্চল হল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, বম্বে প্রেসিডেন্সি এবং ম্যাড্রাস প্রেসিডেন্সি। এই প্রত্যেকটি প্রেসিডেন্সিতে ছিল আলাদা মুদ্রা ব্যবস্থা। কোম্পানি আমলে ব্রিটিশ বণিকরা মুঘল সম্রাটদের অনুমতি সাপেক্ষে মুদ্রা প্রকাশের ক্ষমতা পায়। যেমন বেঙ্গল রেসিডেন্সির মুদ্রা ছাপানো হত কলকাতার টাঁকশালে, মুঘল বাদশা দ্বিতীয় আলমগির (১৭৫৪ - ১৭৫৯) এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় শাহ আলমের (১৭৬০-১৮০৬) নামে।

১৭৫৭ সালে কলকাতার প্রথম টাঁকশাল স্থাপিত হয়েছিল যে জায়গায় – সেটি এখনকার বিবাদি বাগের জিপিও-র কাছাকাছি। সে সময় বাংলায় প্রচলিত “টাকা-আনা-পাই” মুদ্রা-মূল্য অনুযায়ী এই মুদ্রাগুলি ছাপা হয়েছিল। সেই হিসাবটি ছিল এইরকম – 

এক মোহর ছিল প্রায় ১৫ টাকার সমান  

এক টাকা = ১৬ আনা = ৬৪ পয়সা = ১৯২ পাই।  

এক আনা = ৪ পয়সা (Pice)

এক পয়সা = ৩ পাই।

সেকালে সাধারণ মানুষ মোহরের কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারত না, তাদের কাছে একটি টাকা অর্থাৎ ষোল আনাই ছিল পূর্ণ-প্রাপ্তির প্রতীক। ঠাকুর রামকৃষ্ণ তাঁর ভক্ত নাট্যকার গিরিশ ঘোষকে “ষোল আনা কৃপা” দান করেছিলেন, গিরিশ ঘোষ সেই প্রাপ্তিতে ঠাকুরের চরণ-বন্দনা করেছিলেন আনন্দাশ্রু দিয়ে।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে পাই-পয়সা-আনার মূল্যমান বুঝে ওঠা সম্ভব নয়। তবে একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টা কিছুটা স্পষ্ট হবে। আজও উত্তর কলকাতায় বেশ কিছু “পাইস-হোটেল” চালু আছে – এই হোটেলগুলিতে সে সময় এক পয়সায় ভরপেট ভাত-ডাল-তরকারি খাওয়া যেত বলেই এই হোটেলগুলির নাম হয়েছিল পাইস হোটেল। বলাবাহুল্য, আজকের দিনে পাইস হোটেলগুলির মালিকরা একপয়সায় ভাত খাওয়াতে পারেন না – আধুনিক মূল্যমান অনুযায়ীই তাঁরা দাম নির্ধারণ করেন।    

অথবা, ১৯৫৩ সালের পয়লা জুলাই কলকাতা শহরে ট্রামের ভাড়া এক পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় ট্রাম কোম্পানি, তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের অনুমতি নিয়ে। তার প্রতিবাদে সিপিআইয়ের ডাকে সাধারণ জনগণ এবং বিশেষ করে ছাত্র সমাজ উত্তাল হয়ে উঠেছিল, স্তব্ধ করে দিয়েছিল শহরের জীবনযাত্রা।

অতএব এক পয়সার মূল্যমান ১৯৫৩ সালেই যদি এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে এর থেকে একশ-দেড়শ বছর আগে তার মূল্যমান কেমন ছিল কিছুটা অনুমান করা যায়।

 মূল প্রসঙ্গে আবার ফিরে আসি। ভারতে কোম্পানি-রাজের সমাপ্তি হয়েছিল ১৮৫৭ সালে – ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের ঠিক পরে পরেই - অর্থাৎ ১৮৫৮ সালে ভারত শাসনের দায়িত্ব নিয়েছিল ব্রিটিশ পার্লামেন্ট।

শাসন ব্যবস্থা হাতে নিয়েই ১৮৬২ সালে, ব্রিটিশ-রাজের সরাসরি তত্ত্বাবধানে যে সোনার মোহর এবং অন্যান্য মুদ্রার প্রচলন হয়েছিল – সেটি নীচের ছবিগুলিতে দেখা যাবে –

রাণি ভিক্টোরিয়ার ছবি সহ মোহর

 

এর পর যেমন যেমন ব্রিটিশ সিংহাসনে রাজা বদল হয়েছে, বদল হয়েছে মুদ্রাগুলিও –

 

রাজা সপ্তম এডোয়ার্ডের (১৯০১-১৯১০) নামাঙ্কিত মুদ্রা।  

 

 রাজা পঞ্চম জর্জের (১৯১০ - ১৯৩৬) নামাঙ্কিত মুদ্রা।

 ১৯৩৯ সালে শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ – শেষ হয়েছিল ১৯৪৫ সালে। যুদ্ধের কারণে রূপোর সরবরাহে ব্যাপক ঘাটতি দেখা দেওয়ায় - মুদ্রায় রূপোর শতকরা পরিমাণ হ্রাস করে সকল মূল্যমানের নতুন মুদ্রা চালু করতে হয়েছিল। এই সময়কার এক পয়সার মুদ্রাগুলি ছিল অভিনব এবং সুদর্শন –

     

১৯৪৫/ ১৯৪৭ সালের এক পয়সার ব্রিটিশ মুদ্রা

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে রাখি – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, নেতাজী সুভাষচন্দ্রের সৈন্য দল (Indian National Army - INA) উত্তরপূর্ব ভারতের মিজোরাম, মণিপুর ও নাগাল্যাণ্ডের কিছু অংশ ব্রিটিশদের থেকে অধিকার করে নিয়েছিলেন। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত সেই স্বাধীন আংশিক-ভারতে ব্রিটিশ মুদ্রার ব্যবহার নিষিদ্ধ করে দিয়ে, তিনি চালু করেছিলেন জাপানি টাকা ও মুদ্রা ব্যবস্থা।

 ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হওয়ার পরেও তিন বছর ভারতে ব্রিটিশ মুদ্রা ব্যবস্থাই চালু ছিল। ১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারি আমাদের সংবিধান রচিত হওয়ার পর, ওই বছর ১৫ই আগষ্ট তারিখে ভারতের নিজস্ব মুদ্রার প্রচলন শুরু হয়। বদলে দেওয়া হয় মুদ্রার মূল্যমান ব্যবস্থাও – আগের টাকা-আনা-পয়সা-পাইয়ের হিসাব বাতিল করে, শুরু হয় দশমিক পদ্ধতির মুদ্রা ব্যবস্থা। অর্থাৎ এখন আর ১৬ আনা বা ৬৪ পয়সার টাকা নয় – এক টাকার মূল্যমান হল একশ নয়া পয়সা – অর্থাৎ এই পয়সাও আর আগের পয়সা নয় – নয়া (নতুন) পয়সা।  

 

Rupee One

Nickel
10gms
Circular
28 mm

Fifty Naye Paise

Nickel
5 gms
Circular
24 mm


Twenty Five Naye Paise

Nickel
2.5 gms
Circular
19 mm



Ten Naye Paise

Cupro-Nickel
5 gms
Eight Scalloped
23 mm (across scallops)

Five Naye Paise

Cupro-Nickel
4 gms
Square
22 mm (across corners)



Two Naye Paise

Cupro-Nickel
3 gms
Eight Scalloped
18 mm (across scallops)



One Naya Paisa

Bronze
1.5 gms
Circular
16 mm



আধুনিক ভারতীয় মুদ্রা – ২০১৯

20
Twenty Rupees

Center: Nickel-brass

Ring: Nickel silver

Dia – 27 mm

10

Ten Rupees

Center: Copper-Nickel

Ring: Aluminium-Bronze

Dia – 27 mm

5

Five Rupees

Nickel-brass

Dia – 25 mm

2

Two Rupees

Stainless steel

Dia - 23 mm

1

One Rupee

Stainless steel

Dia – 20 mm

 

সেই সিন্ধু সভ্যতার কাল থেকে ধরলে, ভারতের মুদ্রার ইতিহাস প্রায় সাড়ে-চার/পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো। প্রকৃতপক্ষে এই মুদ্রা চর্চা থেকে সমকালের অনেক না বলা ইতিহাস বেশ স্পষ্টভাবে ধরা দেয় আমাদের কাছে। কোন সম্রাট বা রাজা কিংবা বণিক সংঘের প্রচলন করা মুদ্রার গুণমান দেখে বোঝা যায় সে সময় দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং ব্যবস্থা কেমন ছিল। তাঁদের রাজকোষে মোটামুটি কত পরিমাণ সোনা বা রূপো সঞ্চিত ছিল। কারণ খুব স্বাভাবিক ভাবেই রাজকোষে সোনা ও রূপোর সঞ্চয়ের ওপরেই নির্ভর করে কোন সাম্রাজ্যের বা রাজ্যের কিংবা আধুনিক কোন দেশের স্বচ্ছলতা অথবা অর্থ সংকট।

বোঝা যায় অন্তর্দেশীয় ব্যবসা বাণিজ্য কেমন ছিল সে তথ্যও। বিশ্বের নানান দেশে খুঁজে পাওয়া আমাদের মুদ্রা অথবা আমাদের দেশে খুঁজে পাওয়া বিদেশী মুদ্রার সম্ভার থেকে সহজেই আন্দাজ করে নেওয়া যায় - বিশ্বের কোন কোন দেশের সঙ্গে কোন কোন সময়ে আমাদের বাণিজ্য সম্পর্ক কেমন ছিল। সে সম্পর্ক কবে থেকে শুরু হয়েছিল, কবে শেষ হয়েছিল এবং কেনই বা সে সম্পর্ক টুটে গেল? একই ভাবে, বাংলার পাল যুগের মুদ্রা যদি পাওয়া যায় তক্ষশিলা অথবা কেরালার বন্দরে। কিংবা চোল রাজাদের মুদ্রা যদি পাওয়া যায় কনৌজ বা ত্রিপুরায় – তার থেকেও জানা যায় সেকালের আন্তর্দেশীয় বাণিজ্যের রূপরেখাও।

আবার অনেক মুদ্রা থেকে জানা যায় সম্রাট বা রাজা কোন ধর্মে বিশ্বাসী, কোন দেবদেবীর ভক্ত। সে রাজার চেহারা কেমন, যুদ্ধ জয় আর রাজ্য শাসন ছাড়াও সে রাজার আর কি কি গুণ ছিল – এসব তথ্যও।

এমনকি কোন কোন যুগে কোন কোন ধাতু কত পরিমাণে মিশিয়ে মুদ্রা বানানো হয়েছিল – তার থেকে সাক্ষাৎ টের পাওয়া যায় সেই যুগের ধাতুবিজ্ঞান এবং শিল্পীদের ধাতুবিদ্যার দৌড়।

অর্থাৎ কোন এক যুগের কয়েকটি মুদ্রা পেলেই, একালের বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, প্রত্নবিদ, ঐতিহাসিক, সমাজবিজ্ঞানী, এমনকি অপরাধ-বিজ্ঞানীরাও খুঁজে পান অজস্র তথ্য ও তত্ত্বের ভাণ্ডার। অপরাধ-বিজ্ঞানীদের কথা বললাম, কারণ সে যুগেও নকল মুদ্রার প্রচলন কি কম ছিল?

সভ্যতার হাত ধরে, সারা বিশ্বেই আজকাল মুদ্রার ব্যবহার কমছে। মুদ্রা না থাকলে শেষ হয়ে যাবে কত না গল্প ও কাহিনীর মায়াজাল। হারিয়ে যাবে গুপ্তধনের সন্ধানে, রবিঠাকুরের দেওয়া সংকেত “তেঁতুল বটের কোলে/দক্ষিণে যাও চলে/ঈশান কোণে ঈশানী/কহে দিলাম নিশানী" অথবা সত্যজিতের "মুড়ো হয় বুড়ো গাছ হাত গোন ভাত পাঁচ দিক পাও ঠিক ঠিক জবাবে। ফাল্গুন তাল জোড় দুই মাঝে ভুঁই ফোড় সন্ধানে ধন্দায় নবাবে।"

আগে মুদ্রা বহনের জন্যে মোটা কাপড়ের তৈরি বটুয়া ব্যবহৃত হত। দরিদ্ররা চুরি-ডাকাতির ভয়ে ময়লা, তেলচিটে বটুয়া লুকিয়ে বেঁধে রাখত কোমরে ধুতির আড়ালে। ধনীদের সুদৃশ্য মখমলি কাপড়ের বটুয়া বহন করত বিশ্বাসী দেহরক্ষীরা। মুদ্রার পরিবর্তে যখন থেকে এল এক টুকরো কাগজ, যাকে বলে নোট। সেই নোটও লুকিয়ে রাখার জন্যে দরিদ্র ও নিম্নবিত্তদের জামা বা প্যাণ্টে বানানো হত চোরা-পকেট। স্বচ্ছলদের জন্যে বানানো হল সুদৃশ্য পার্স বা ওয়ালেট।     

কিন্তু সে নোটও এখন ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে। টাকাকে এখন ছোঁয়া যায় না, দেখাও যায় না, নিছক সংখ্যা হিসেবে দেখা যায়, এক নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেটের যোগসাজশে মোবাইল ফোন অথবা ল্যাপটপের পর্দায় “ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন”।     

সেই সব নোট আর অধরা টাকার গল্প আসবে পরের পর্বে।

পরের পর্ব - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ৬ "

কৃতজ্ঞতাঃ 

https://www.rbi.org.in/commonman/english/Currency/Scripts/Ancient.aspx 

বং Wikipedia.   

শুক্রবার, ২০ মার্চ, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১১

   ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  



["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের দশম পর্বাংশ -
 " ধর্মাধর্ম - ৪/১০ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.) 

একাদশ পর্বাংশ 


৪.৫.৮ বিজ্ঞান

৪.৫.৮.১ মহাকাশ ও পৃথিবী

বৈদিক বিশ্ব ছিল খুবই সহজ সরল, উপরে স্বর্গ, নিচেয় এই পৃথ্বী, আর এই দুইয়ের মাঝে আছে অন্তরীক্ষ বা বায়ু। স্বর্গের কাছাকাছি কোথাও সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্ররা ঘুরে বেড়ায় এবং অন্তরীক্ষে ঘুরে বেড়ায় যত পাখি, মেঘ এবং উপদেবতারা। বৈদিক সাহিত্যের ঋষিরা সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে খুব একটা চিন্তিত ছিলেন না। তাঁরা সরল কিন্তু গভীর মননশীল প্রজ্ঞার দর্শন নিয়েই বড়ো প্রশান্তির জীবন যাপন করতেন।

কিন্তু পরবর্তী কালে, বৈদিক দর্শন থেকে অনেকটাই সরে আসা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিদগ্ধ পণ্ডিতেরা যখন বৌদ্ধ, জৈন এবং সুপ্রাচীন অনার্য ধর্মীয় শাখাগুলির কাছে যথেষ্ট শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেন, তখন বৈদিক প্রজ্ঞার সীমায় বন্দি না থেকে, তাঁরা সুপ্রাচীন সৃষ্টিতত্ত্ব, বিশ্বতত্ত্ব নিয়ে জটিল সব তত্ত্ব ও কাহিনি রচনা শুরু করলেন। এই কাহিনি রচনার শুরু খ্রিস্টপূর্ব মোটামুটি দ্বিতীয় শতাব্দীর কোন এক সময় থেকে।

প্রথমতঃ তাঁরা এই মহাবিশ্বকে কল্পনা করলেন ব্রহ্মাণ্ড – যার স্থূল অর্থ ব্রহ্মের অণ্ড। এই ব্রহ্মাণ্ড একুশটি অঞ্চল বা বিভাগে বিভক্ত। উপর থেকে ধরলে পৃথিবী বা মর্ত্যের স্থান সপ্তম। পৃথিবীর উপরের ছয়টি স্তরে আছে ঊর্ধলোক। পৃথিবীকে বলা হয় ভূলোক এবং এর ঊর্ধের ছ’টি লোক হল, ভুবঃ, স্বঃ, মহঃ, জন, তপঃ এবং সত্য বা ব্রহ্মলোক। এগুলিকে স্বর্গও বলা হয়। বিভিন্ন স্বর্গের সুখের মাত্রা আলাদা এবং মর্ত্যলোকের পুণ্যসঞ্চয়ের মাত্রা অনুযায়ী বিভিন্ন স্বর্গলাভ হয়ে থাকে। ভূলোক এবং ছটি স্বর্গলোকের কথা অবিশ্যি বেদেও উল্লেখ আছে। পৃথিবীর নিচের সাতটি স্তরে আছে সপ্ত পাতাল, যেমন, অতল, বিতল, সুতল, তলাতল, মহাতল, রসাতল ও পাতাল। পাতালের পরেও আছে সাতটি স্তর, সেগুলি নরক, যেমন তমিস্রা, অন্ধতমিস্রা, রৌরব, কুম্ভীপাক, কালসূত্র, শূকরমুখ, অন্ধকূপ। পুণ্য সঞ্চয়ের মতো পাপ সঞ্চয়েরও মাত্রা আছে, সেই মাত্রা অনুসারে, মৃত্যুর পর মৃদু থেকে ভয়ংকর কষ্টদায়ক নরকে যেতে হত।

সে যাই হোক, স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল ও নরকের ধারণা যে বিদগ্ধ পণ্ডিতেরা কল্পনা করেছিলেন, তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল একটাই, সমসাময়িক প্রচলিত ধর্মগুলির থেকে নিজেদের শ্রেষ্ঠতা প্রতিপন্ন করা। তাঁরা সাধারণ মানুষকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হলেন, পুণ্য ও পাপ এবং তার ফলে প্রাপ্য পুরষ্কার ও তিরষ্কারের ধারণা। তাঁদের উচ্চারিত প্রত্যয়ী মন্ত্রের ব্যাখ্যায়, কথকতায়, ধর্মকথায় কল্পনার জগতের দুয়ার খুলে গেছিল সাধারণ মানুষের মনে। তাঁরা আশ্চর্য হয়েছিলেন, অভিভূত হয়েছিলেন, এবং বিশ্বস্ত হয়েছিলেন। আমাদের ছোটবেলাতেও গ্রামের বাড়িতে দেখেছি, বাঁধানো ফ্রেমে আঁকা নরকভোগের রঙিন চিত্রপট। সেখানে যমদূতেরা চোরদের হাত কাটে, পরকীয়া প্রেমিক-প্রেমিকাদের লোহার কাঁটাওয়ালা স্তম্ভ জড়িয়ে শুয়ে থাকতে হয়, ফুটন্ত তেলে পাপীদের ভাজতে ভাজতে (deep fry) যমদূতরা মাথায় ড্যাঙস মারে, ইত্যাদি। এভাবেই সাধারণ মানুষ যখনই বিশ্বস্ত হয়ে উঠতে লাগল, বিদগ্ধ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের প্রশান্ত অধরে ফুটে উঠল সাফল্যের মৃদু হাসি এবং তাঁরা আরও নিবিড় কল্পকাহিনি রচনায় মগ্ন হতে লাগলেন – সেই সব কাহিনিই পুরাণ।

এই তত্ত্বও কিছু বছরের মধ্যে অনেকটাই বদলে গেল, খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর শেষ দিক থেকে খ্রিস্টাব্দ প্রথম দুই শতাব্দীতে। তখন এই বিশ্ব-পৃথিবী হয়ে উঠল মোটামুটি সমতল বিশাল থালা বা রেকাবির মতো। যার কেন্দ্রে আছে মেরুপর্বত, যাকে ঘিরে ঘুরে চলেছে সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ এবং সকল নক্ষত্র। দশদিকে আছে দশ দিকপাল। এই মেরুপর্বতকে ঘিরে আছে জম্বুদ্বীপ। তার চারদিকে ঘিরে রয়েছে লবণ-সমুদ্র। দক্ষিণের এই দ্বীপ-মহাদেশের নাম জম্বুদ্বীপ। জম্বু মানে জাম গাছ, এই অঞ্চলে জামগাছের প্রাচুর্যের জন্যেই এই দ্বীপের নাম জম্বুদ্বীপ। লবণ সমুদ্রকে ঘিরে রয়েছে যে স্থলভূমি তার নাম প্লক্ষদ্বীপ। সেই দ্বীপের নাম প্লক্ষ নামের এক স্বর্ণময় বৃক্ষের নামে। প্লক্ষদ্বীপকে ঘিরে আছে ইক্ষুরস(ঝোলা-গুড়)-সমুদ্র। এই সমুদ্রকে ঘিরে আছে শাল্মলদ্বীপ – এই নাম ওই দ্বীপে একটি শাল্মলী গাছ থাকার কারণে। শাল্মলীদ্বীপকে ঘিরে আছে সুরা-সমুদ্রের বলয়। এভাবেই একের পর এক দ্বীপ ও সমুদ্র আছে যথাক্রমে কুশদ্বীপ-ঘৃতসমুদ্র, ক্রৌঞ্চদ্বীপ-ক্ষীরসমুদ্র, শাকদ্বীপ-দধিমণ্ডসমুদ্র, পুষ্করদ্বীপ-শুদ্ধোদকসমুদ্র। শুদ্ধোদক সমুদ্রের পরে আছে লোকালোক (লোক+অলোক) পর্বত। যতদূর পর্যন্ত সূর্যের আলো পৌঁছায় তার নাম লোক, তার বাইরের দেশগুলি যারা সূর্যালোক বঞ্চিত – তাদের নাম অলোক। (শ্রীমদ্ভাগবত/৫ম স্কন্ধ/ অধ্যায় ২০)            

বিশ্ব-তত্ত্বের শেষ দুটি ধারণা পুরাণ থেকে নেওয়া হয়েছে, যে পুরাণগুলি, বিশেষজ্ঞরা বলেন, মোটামুটি খ্রিস্টাব্দ দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে লেখা শুরু হয়েছিল এবং সর্বশেষ পুরাণ লেখা হয়েছে, খ্রিস্টীয় প্রথম সহস্রাব্দের কাছাকাছি কোন সময়ে। অতএব সহজেই অনুমান করা যায় পুরাণের এই তত্ত্বগুলি মুখে মুখে প্রচলিত ছিল এর কয়েকশ বছর আগে থেকেই। খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার, আমরা দেখেছি, মৌর্য যুগের আগে থেকেই বৈদেশিক বাণিজ্য সূত্রে পারস্য, মেসোপটেমিয়া, মিশর, গ্রিসের মতো দেশগুলির সঙ্গে ভারতের নিবিড় পরিচয় স্থাপিত হয়েছিল। এই পরিচয় না থাকলে বীর আলেকজাণ্ডার ভারতজয়ের স্বপ্ন কেন দেখেছিলেন?  মৌর্যযুগ থেকে এই বৈদেশিক সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়েছে এবং খ্রিস্টপূর্ব শেষ দুটি শতাব্দী থেকে এদেশে রাজত্ব বিস্তার করেছেন, গ্রিক, পার্থিয়ান, শক, কুষাণ, পহ্লব প্রভৃতি জাতি। তা সত্ত্বেও, ব্রাহ্মণ্য এবং হিন্দু পণ্ডিতেরা বিশ্বতত্ত্বের এমন হাস্যকর ধারণা করলেন কেন, সেকথা তাঁরা এবং তাঁদের ভগবান ছাড়া আর কে বলতে পারবেন?

পৌরাণিক গ্রন্থে বিশ্বতত্ত্বের ধারণা যাই হোক, এর পাশাপাশি ভারতীয় বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিশ্ব ও মহাকাশের ধারণা ছিল বিস্ময়কর – এবং সে ধারণার শুরু হয়েছিল বৈদিক এমনকি প্রাক-বৈদিক যুগেও। 

 

৪.৫.৮.২ গণিত

ভারতীয় অংক, বিশেষ করে জ্যামিতি, পরিমিতি, কৌণিক মাপ, সূক্ষ্ম থেকে স্থূল ওজন পরিমাপের নিদর্শন সিন্ধু সভ্যতার শহরগুলিতে আমরা দেখেছি। অতএব যজ্ঞবেদী নির্মাণের থেকে ভারতীয় জ্যামিতি ও পরিমিতির সূচনা এমন ধারণা যে আমাদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে, তার সঙ্গে আমি অন্ততঃ কোন ভাবেই সহমত হতে পারি না। বরং আর্যরা বৈদিক যজ্ঞবেদী নির্মাণের নানান মাপ-জোক শিখেছে অনার্য মানুষদের থেকেই।

কিন্তু এরপর এই বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশ সম্পর্কে খুব স্পষ্ট কিছু জানা না গেলেও, যখন থেকে লিপি বা লিখিত তথ্য পাওয়া গেছে, সে সময় ভারতীয় বিজ্ঞানীদের প্রজ্ঞা ও সাফল্য চমকপ্রদ। লিখিত তথ্য থেকে জানা যায় মোটামুটি খ্রিস্টাব্দ তৃতীয় এবং চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যেই ভারতীয় বিজ্ঞানীরা জ্যামিতি ও পরিমিতিতে প্রভূত উন্নতি করে ফেলেছিলেন এবং আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন নিরপেক্ষ সংখ্যা (Abstract Number) এবং বীজগণিত।

নিরপেক্ষ সংখ্যা হল বিশেষ একধরনের লিপি, যা দিয়ে শুধু মাত্র সংখ্যাই বোঝানো যায়। যেমন, , , ৯ – এগুলি নিরপেক্ষ সংখ্যা, কিন্তু যখনই ৩ দিন, ৪ কি.মি. বা ৯ জন বলা হবে তখন সেগুলি নানান বিষয়ের নির্দিষ্ট পরিমাপ বোঝাবে। এই নিরপেক্ষ সংখ্যা আবিষ্কার, ভারতীয় বিজ্ঞানীদের অনন্য সৃষ্টি, যার ওপরে আধুনিক বিজ্ঞানের সকল শাখাই দাঁড়িয়ে আছে। উপরন্তু, এই নিরপেক্ষ সংখ্যার বৈশিষ্ট্য হল দশটি মাত্র লিপি - ১ থেকে ৯ এবং ০ দিয়ে পৃথিবীর বৃহত্তম সংখ্যা অতি সহজে এবং সংক্ষেপে লিখে ফেলা যায়। এই সংখ্যার জাদু ধরা পড়বে একটি উদাহরণ দিলে, ১২৩৪ সংখ্যাটি সমসাময়িক রোমান ভাষায় লিখতে গেলে, MCCXXXIV দাঁড়াবে। ১২৩৪ সংখ্যাটিকে যদি আমরা ভাঙি – তাহলে সংখ্যাটি দাঁড়ায় – ১০০০+২০০+৩০+৪, এই অনুযায়ী  M(১০০০), CC(২০০), XXX(৩০), IV(৪)। এভাবেই আমরা তিরিশ কোটি সংখ্যাটি, অংকের নিয়মে লিখে ফেলতে পারি, x ১০কিন্তু রোমান ভাষায় তিরিশ কোটি লেখার প্রচেষ্টা থেকে বিরত রইলাম।   

এই লিপির মধ্যে ০ (শূন্য) সংখ্যাটির গুরুত্ব সীমাহীন, সীমাহীন সংখ্যা লিখতে। এই লিপির প্রথম লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায় গুজরাটের ৫৯৫ সি.ই.-র একটি শিলালিপি থেকে, অতএব অনুমান করা যায় এর শিলালিপি লেখার অনেক আগে থেকেই শূন্য সংখ্যার ব্যবহার জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এই শিলালিপির প্রায় সমসময়ে, এই সংখ্যার ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে, সিরিয়া এবং সুদূর ভিয়েতনামে! এইসংখ্যা-লিপির আবিষ্কার কে করেছিলেন সঠিক জানা যায় না, খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর একটি পাণ্ডুলিপিতেও – “বকশালী পাণ্ডুলিপি” -এই সংখ্যা-লিপির ব্যবহার দেখা গেছে। ৪৯৯ সি.ই.তে লেখা বিখ্যাত গণিতবিদ আর্যভট্ট, তাঁর গ্রন্থে এই সংখ্যালিপি ব্যবহার করেছিলেন। অতএব বিখ্যাত গণিতবিদ আর্যভট্ট সংখ্যা বা শূণ্যের আবিষ্কর্তা নন, তাঁর আগেই এগুলির সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল।

গণিতবিদ আর্যভট্টের বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে অবদান অবিশ্বাস্য। জ্যামিতিতে, ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল – ভূমির অর্ধেক এবং লম্ব উচ্চতার গুণফল, বৃত্তের ক্ষেত্রফল নির্ণয় করতে – পাই (π)-এর দশমিকের পর চার সংখ্যা পর্যন্ত অভ্রান্ত মান নির্ণয় – ৩.১৪১৬। প্রসঙ্গতঃ  তিনি প্রথম সংখ্যার দশমিক হিসেব আবিষ্কার করেছিলেন। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রচলিত চান্দ্র-বছরের জটিল হিসাবের পরিবর্তে তিনি সৌর-বছরের প্রচলনের প্রস্তাব দেন এবং তাঁর সৌর বছরের হিসেব আধুনিক হিসেবের তুলনায় প্রায় নিখুঁত – ৩৬৫.৩৫৮৬৮০৫ দিন! তিনিই বিশ্বে প্রথম পৃথিবীকে একটি গোলক কল্পনা করেছিলেন এবং মত দিয়েছিলেন পৃথিবী তার নিজের অক্ষে ঘোরে। তিনিই প্রথম সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন, পৃথিবীর ছায়া পড়ে চাঁদে গ্রহণ হয় এবং চাঁদ সামনে চলে আসে বলে সূর্যগ্রহণ হয়। তার আগে পর্যন্ত পৌরাণিক ধারণা ছিল রাহু নামের এক রাক্ষসের অমর মুণ্ড চাঁদকে এবং সূর্যকে গ্রাস করে। ইংরেজদের হাত ধরে পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের স্পর্শ না আসা পর্যন্ত ভারতীয় পণ্ডিত বা অশিক্ষিত সমাজের এই বিশ্বাসকে আর্যভট্ট এতটুকুও প্রভাবিত করতে পারেননি। বরং তাঁর অনেকগুলি সিদ্ধান্ত প্রচলিত ব্রাহ্মণ্যধর্মের মনঃপূত না হওয়াতে, সম্ভবতঃ তাঁর পরবর্তী গণিতবিদ ব্রহ্মগুপ্ত সেগুলিকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন।

আর্যভট্টের সামান্য পরে বরাহমিহির জ্যোতির্বিদ্যার (Astronomy) সঙ্গে জ্যোতিষচর্চা (Astrology) এবং রাশিফল বা কোষ্ঠী বিচারকেও যুক্ত করে দিয়েছিলেন। আর্যভট্ট জীবিত থাকলে নিশ্চয়ই এর প্রতিবাদ করতেন। কারণ জ্যোতির্বিদ্যা এবং জ্যোতিষচর্চার সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রেই মেলে না, এমনকি বিপরীত কথা বলে। বরাহমিহিরের “পঞ্চসিদ্ধান্তিকা” গ্রন্থে সমসময়ের জ্যোতির্বিদ্যার পাঁচটি ঘরানার সংকলন এবং আলোচনা করেছিলেন। তার মধ্যে দুটি সিদ্ধান্তের কথা আগেই বলেছি, “রোমক” এবং “পৌলিশ” সিদ্ধান্ত।

এই সময়ে আরবের প্রজ্ঞাবান মানুষদের সঙ্গে ভারতের বিজ্ঞানীদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। আরবের পণ্ডিত মহলে ভারতের আয়ুর্বেদ, জ্যোতির্বিদ্যা এবং গণিতের খুবই সমাদর ছিল। একসময় বাগদাদ সম্রাটের (খলিফা) রাজসভায় অনেক ভারতীয় পণ্ডিত আমন্ত্রিত হয়েছিলেন এবং সেখানেই তাঁরা বসবাস করতেন। এই বাগদাদ আরবি পণ্ডিতদের মাধ্যমেই পরবর্তী কালে, ভারতীয় গণিত ইউরোপের বিদ্বান সমাজে পৌঁছেছিল।


৪.৫.৯ ধর্ম

এই সময়ে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম হিন্দু ধর্মে পরিবর্তিত হয়ে গেছে। নতুন ধর্মের ধর্মশাস্ত্রগুলি নতুন করে রচনা করা হচ্ছে নতুন আঙ্গিকে, নতুন ভাবনা, নতুন আদর্শ এবং দর্শনে। এই হিন্দুধর্মের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবেই বৌদ্ধধর্মও অনেকটা হীনবল হয়ে উঠল। ভারত থেকে হীনযানী মত প্রায় দুষ্প্রাপ্য হতে বসল, মহাযানী মতও দুর্বল হয়ে গেল, কারণ মহাযানী শাখা ভেঙে উদ্ভব হল নতুন শাখা বজ্রযানী মত। বিপুল এই পরিবর্তনের কথা সবিস্তারে আসবে পরবর্তী ও অন্তিম পর্বে। তার আগে দেখা নেওয়া যাক হর্ষ পরবর্তী ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।

পরের পর্ব " ধর্মাধর্ম - ৪/১২ "

বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/২

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "


  আগের পর্ব ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ "


   ৩

সৃষ্টি তত্ত্ব

শ্রীসূত বললেন, “সৃষ্টির আদিতে ভগবান লোক সৃষ্টি করার জন্যে পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় (চোখ, কান, নাক, জিভ ও ত্বক), পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় (মস্তিষ্ক, হাত, পা, পায়ু ও উপস্থ), মন ও পঞ্চ মহাভূত (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম), এই ষোলটি অংশে রচিত পুরুষ মূর্তি ধারণ করেছিলেন। যিনি কারণসমুদ্রে যোগনিদ্রায় শয়ান ছিলেন এবং যাঁর নাভিরূপ হ্রদে উৎপন্ন পদ্ম থেকে প্রজাপতিগণের পিতা ব্রহ্মার আবির্ভাব হয়েছিল, ইনিই সেই নারায়ণ। বীজ থেকে যেমন বৃক্ষ উদ্গত হয়, তেমনি অক্ষয় বীজস্বরূপ আদি নারায়ণ মূর্তি থেকেই নিখিল অবতার মূর্তি আবির্ভূত হয়ে থাকে। অবতারগণের লীলা অবসান হলে, তাঁরা আবার ওই মূর্তির মধ্যেই লীন হয়ে যান। শ্রীনারায়ণের নাভি পদ্ম থেকে ব্রহ্মা আবির্ভূত হয়ে মরীচি প্রমুখ প্রজাপতিগণের সৃষ্টি করেন এবং সেই প্রজাপতিগণ দেবতা, নর ও পশু প্রভৃতি ইতর জীবের সৃষ্টি করেছিলেন।

এই পদ্মনাভ নারায়ণ প্রথম অবতারে সনৎকুমার প্রমুখ ব্রাহ্মণরূপে দুষ্কর ব্রহ্মচর্য ব্রত পালন করেছিলেন। দ্বিতীয় অবতারে যজ্ঞপতি শ্রীহরি বরাহরূপে, রসাতল থেকে পৃথিবীকে উদ্ধার করেছিলেন, সৃষ্টির অবস্থানের জন্য। দেবর্ষি নারদ তাঁর তৃতীয় অবতার। এই অবতারে ভগবান পঞ্চরাত্র নামে বৈষ্ণবতন্ত্র প্রকাশ করেছিলেন। মানুষ কর্ম করেও কিভাবে কর্মবন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারে এই তন্ত্রে সেই তত্ত্ব প্রকাশ করেছেন। চতুর্থ অবতারে ইনি ধর্মের পুত্র নর ও নারায়ণ দুই ঋষি* রূপে আত্মার শান্তির জন্য দুশ্চর তপস্যা করেছিলেন। সিদ্ধ মুনিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কপিল তাঁর পঞ্চম অবতার। এই মূর্তিতে আসুরি নামক ব্রাহ্মণকে কাল প্রভাবে লুপ্ত হতে যাওয়া সাংখ্যশাস্ত্র উপদেশ দিয়েছিলেন। সাংখ্য সমস্ত তত্ত্বের নির্ণায়ক তত্ত্ব। ষষ্ঠ অবতারে অত্রিপত্নী অনসূয়ার পুত্র হয়ে জন্মগ্রহণ করেন এবং অলর্ক ও প্রহ্লাদকে আত্মবিদ্যা উপদেশ দিয়েছিলেন। তারপর সপ্তম অবতারে রুচি ও আকূতির পুত্র যজ্ঞ নামে জন্মগ্রহণ করে, স্বায়ম্ভূব মন্বন্তর পালন করেছিলেন। অষ্টম অবতারে নাভি ও মেরুদেবীর পুত্র ঋষভ নামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শান্ত গুণের অনুসরণে চার আশ্রমের কর্তব্য পরমহংসগণের পথ প্রকাশ করেছিলেন।

[*এই নর ও নারায়ণ দুই ঋষিকে শাস্ত্রমতে আমরা আরও দু বার পেয়েছি, দ্বাপরে শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন রূপে আর এই কলি যুগে শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দ রূপে।]  

হে বিপ্রগণ, নবম অবতারে শ্রীহরি ঋষিদের প্রার্থনায় পৃথু* নরপতি রূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং পৃথিবীতে ওষধির সৃষ্টি করেছিলেন। এই অবতার অত্যন্ত রমণীয় বলে কথিত আছে। চাক্ষুষ মন্বন্তরের অবসানে, যখন মহাপ্লাবন ঘটেছিল, তখন বৈবস্বত মনুকে একটি নৌকায় বসিয়ে তিনি মৎস্য অবতার রূপে জগতের জীবকে রক্ষা করেছিলেন। এই অবতার তাঁর দশম অবতার রূপ। একবার দেবতা ও অসুরেরা মন্দর পর্বত দিয়ে সমুদ্র মন্থন করেছিলেন, একাদশ অবতারে তিনি কূর্মরূপ ধারণ করে ওই মন্দর পর্বতের আধার স্বরূপ হয়েছিলেন। দ্বাদশ অবতারে ধন্বন্তরি ও ত্রয়োদশ অবতারে মোহিনী রূপ ধারণ করেছিলেন এবং অসুরদের মুগ্ধ করে দেবতাদের সুধা পান করিয়েছিলেন। চতুর্দশ অবতারে শ্রীনারায়ণ ভয়ংকর নৃসিংহমূর্তি ধারণ করে, মহা শক্তিধর হিরণ্যকশিপুকে নিজের উরুদেশে রেখে, নখের সাহায্য তার বক্ষ চিরে হত্যা করেছিলেন। পঞ্চদশ অবতারে শ্রী হরি বামনরূপে বলিরাজের যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং তাঁকে স্বর্গ থেকে বিচ্যুত করার জন্যে তিন পদ পরিমাপ ভূমি যাঞ্চা করেছিলেন।

[* পৃথু নরপতি রূপে শ্রীহরির  অবতীর্ণ হওয়ার ঘটনাটিকেই আমি উপন্যাস রূপে এই ব্লগে উপস্থাপিত করেছি - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "] 

ষোড়শ অবতারে ক্ষত্রিয় নৃপতিগণকে ব্রাহ্মণ বিদ্বেষী দেখে অতি উগ্র পরশুরাম রূপে, পৃথিবীকে একুশবার নিঃক্ষত্রিয় করেছিলেন। সপ্তদশ অবতারে পরাশর ও সত্যবতীর পুত্র ব্যাসদেব রূপে অবতীর্ণ হয়ে, অল্পবুদ্ধি মানবদের কল্যাণের জন্য সমস্ত বেদকে ভিন্ন ভিন্ন শাখায় বিভক্ত করেছিলেন। অষ্টাদশ অবতারে দেবকার্যে রঘুকুলে শ্রীরামচন্দ্র রূপে আবির্ভূত হয়ে সমুদ্রবন্ধন ও লঙ্কাবিজয় ইত্যাদি ঐশ্বর্য প্রদর্শন করেছিলেন। একোনবিংশ ও বিংশ অবতারে ভগবান নারায়ণ, যদুবংশে বলরাম ও কৃষ্ণরূপে অবতীর্ণ হয়ে ধরণী থেকে পাপের ভার হরণ করেছিলেন। এরপর একবিংশ অবতারে, কলিযুগের শুরুতে দেব বিদ্বেষীদের মোহ সৃষ্টির জন্যে কীকট প্রদেশে অজনের পুত্র বুদ্ধ নামে খ্যাত হবেন। কলিযুগের অবসানে রাজগণ দস্যুর মতো আচরণ করলে, ব্রাহ্মণের পুত্র হয়ে কল্কি নাম ধারণ করবেন, এবং সেটিই হবে তাঁর দ্বাবিংশ অবতার।

[এখানে শ্রীহরির বাইশটি অবতারের কথা বলা হল - যার মধ্যে শেষ অবতার - কল্কি ভূভার হরণ করতে কবে আসবেন কে জানে? প্রসঙ্গতঃ বিষ্ণুর দশাবতার হল পূর্ণ-অবতার এবং বাকি বারোটি অংশ-অবতার।]

হে দ্বিজগণ, ক্ষয়শূণ্য সরোবর থেকে যেমন সহস্র সহস্র জলধারা নির্গত হয়, তেমনই নিখিল আবির্ভাবের মূলাধার শ্রীহরির থেকে অসংখ্য অবতার আবির্ভূত হন। মহাতেজ ঋষিগণ, মনুসমূহ, সকল দেবতা ও প্রজাপতি, সকলেই শ্রীভগবানের কলা অর্থাৎ বিভূতি। যে অবতারের কথা আগে বললাম, তাঁদের কেউ কেউ শ্রী নারায়ণের অংশ, কেউ কেউ তাঁর কলা। মৎস্য, কূর্ম, নৃসিংহ প্রমুখ তাঁর অংশ এবং সনৎকুমার, কপিল, নারদ প্রমুখ তাঁর কলা। কিন্তু কৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান। অসুরেরা যখন জগতে নানান উৎপীড়ন করে, অবতারগণ যুগে যুগে আবির্ভূত হয়ে জগতের শান্তি ও মঙ্গল বিধান করেন। যে ব্যক্তি শুদ্ধচিত্তে সকালে ও সন্ধ্যায় ভগবানের এই জন্ম রহস্য কীর্তন করেন কিংবা শোনেন, তিনি সংসারের অশেষ দুঃখ থেকে নিস্তার পান।

[এখানে আবার বলা হচ্ছে "মৎস্য, কূর্ম, নৃসিংহ প্রমুখ তাঁর অংশ" অর্থাৎ অংশ-অবতার, পূর্ণ-অবতার নয়। শ্রীকৃষ্ণ আবার অবতার নন, তিনি সাক্ষাৎ ভগবান।] 

এইবার বলি, দেহ সম্বন্ধ থাকলেও কিভাবে জীবের মুক্তি পাওয়া সম্ভব। জীবের আত্মা চৈতন্যস্বরূপ, কিন্তু স্থূলদেহ ভগবানের মায়ায় বিরচিত। এই দেহকেই যখন আত্মা বলে বোধ হয়, তখনই জীব মায়ার বন্ধনে বাঁধা পড়ে। অজ্ঞব্যক্তি হাওয়ার বেগে ভেসে চলা মেঘকে দেখে আকাশ ভেসে চলেছে মনে করে কিংবা ধুলিঝড়ের ধূসর বর্ণ বায়ুতে আরোপ করে, বায়ুকেই ধূসর বর্ণ মনে করে। তেমনই অবিবেকী জীব সর্বসাক্ষী চেতনে, জড় ও দৃশ্য দেহকে আরোপ করে, দেহই আত্মা এই ভ্রান্ত ধারণায় আচ্ছন্ন হয়। এই স্থূল দেহ ছাড়াও আরেকটি সূক্ষ্ম দেহ আছে, সেই দেহকে লিঙ্গ দেহ বলে। ওই দেহকে দেখা যায় না কিংবা শোনাও যায় না, ওই দেহে হাত, পা ইত্যাদি কোন অবয়বও নেই। এই কারণে লিঙ্গ দেহকে অব্যক্তও বলা যায়। স্থূলদেহের বিনাশে, এই লিঙ্গদেহই জন্ম ও মরণের বশে বার বার সংসার দশা ভোগ করে। যতদিন অবিদ্যা বা অজ্ঞান, আত্মার স্বরূপকে আচ্ছন্ন করে রাখে, মনে নানান বিভ্রান্তি, দ্বিধা ও দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। কিন্তু যখন বিদ্যা অর্থাৎ তত্ত্বজ্ঞানের উদয় হয়, তখন তত্ত্বজ্ঞ পুরুষ পরমানন্দে বিরাজ করেন।

পরমেশ্বর ও জীবে প্রভেদ এই যে, পরমেশ্বর স্বতন্ত্র পুরুষ, কিন্তু জীব মায়ার অধীন। তিনি নির্লিপ্তভাবে সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় করছেন। মানুষ যেমন দূর থেকে ফুলের গন্ধ উপভোগ করে, সর্বভূতের অন্তর্যামী ছয় ইন্দ্রিয়ের নিয়ন্তা পরমেশ্বর, সম্পূর্ণ অনাসক্ত হয়ে ইন্দ্রিয়ের সকল বিষয় ঠিক তেমন ভাবেই গ্রহণ করে থাকেন। ভক্তিহীন জ্ঞানীরা তর্ক বিতর্ক ও কৌশলে তাঁর নাম, রূপ ও লীলার তত্ত্ব কখনোই বুঝতে পারে না। যিনি এই চক্রপাণি পরমপুরুষের চরণপদ্মের সৌরভে সর্বদা অকপট আনন্দ অনুভব করেন, তিনিই এই বিশ্ববিধাতার মহিমা উপলব্ধি করতে পারেন। এই জগতে আপনারা ধন্য, কারণ অখিল লোকপতি বাসুদেবে আপনাদের ঐকান্তিকী রতি উৎপন্ন হয়েছে।

এই শ্রীমৎভাগবত পুরাণ সকল বেদের সমান। ভগবান বেদব্যাস লোকহিতের জন্য সকল বেদ ও ইতিহাসের সার সংগ্রহ করে হরিলীলাপূর্ণ এই মহাপুরাণ রচনা করেছিলেন। জিতেন্দ্রিয় যোগীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নিজের পুত্র শুকদেবকে, ভুবনমঙ্গল এই গ্রন্থ রচনা করে পাঠ করতে দিয়েছিলেন। ব্রহ্মশাপগ্রস্ত মহারাজ পরীক্ষিৎ আমৃত্যু অনশনে যখন গঙ্গাতীরে বসেছিলেন, সেই সময় অন্যান্য মহর্ষিদের সঙ্গে মহারাজ পরীক্ষিৎকেও শ্রী শুকদেব এই গ্রন্থের বর্ণনা শুনিয়েছিলেন। হে বিপ্রগণ, যখন মহাতেজা ব্রহ্মর্ষি শুকদেব এই পুরাণ সকলকে শোনাচ্ছিলেন, সেই মহৎ সভায় আমিও উপস্থিত ছিলাম। আমার বুদ্ধি অনুসারে, এই পুরাণের অর্থ আমি যতদূর অবধারণ করতে পেরেছি, আপনাদের কাছে তাই আমি বর্ণনা করবো”। 

 

সুদীর্ঘ যজ্ঞে দীক্ষিত ঋক বেদজ্ঞ বৃদ্ধ শৌনক বললেন, “হে সূত, ভগবান শুকদেব যে ভাগবত পুরাণের কথা কীর্তন করেছিলেন, সেই পুরাণ আমাদের কাছে বর্ণনা করুন। শুনেছি, ব্যাসদেব মহাভারত ইত্যাদি ধর্মশাস্ত্র রচনা করেছিলেন, তিনি আবার কোন সময়ে, কোথায় এবং কী উদ্দেশে এই পুরাণ রচনা করলেন? আপনি বললেন, তাঁর পুত্র শুকদেব এই পুরাণ কীর্তন করেছেন, কিন্তু তা কী করে সম্ভব? কারণ তিনি মহাযোগী, সর্বভূতে সমদর্শী, শত্রুমিত্র ভেদজ্ঞান রহিত। মোহবন্ধনের অতীত এবং ব্রহ্মে একনিষ্ঠ থেকে তিনি গোপনে বিচরণ করেন। তাঁকে দেখলে হিতাহিত বোধশূণ্য এক বালকের মতো মনে হয়। একবার প্রব্রজ্যা নিয়ে, তিনি নগ্ন দেহেই বেরিয়ে পড়েছিলেন, তাঁকে ফিরিয়ে আনতে ব্যাসদেব ছুটেছিলেন পুত্রের পিছনে। পথের পাশে থাকা একটি সরোবরের জলে একদল সুন্দরী অপ্সরা স্নান করছিল, তারা মহাযোগী কিন্তু যুবক শুকদেবকে দেখে লজ্জা পেল না, কিন্তু বৃদ্ধ ব্যাসদেবকে দেখে তারা লজ্জায় বস্ত্র পরে ফেললএই ঘটনায় অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে, ব্যাসদেব ওই অপ্সরাদের এর কারণ জিগ্যেস করলে, অপ্সরা রমণীরা বলেছিল, আপনার পুত্রের দৃষ্টি পবিত্র, তিনি যুবক হলেও তাঁর দৃষ্টিতে নারীপুরুষ ভেদ নেই, কিন্তু আপনার সেই ভেদজ্ঞান রয়েছে।

তিনি উন্মত্ত ও মূকের মতো ঘুরতে ঘুরতে, কুরুজাঙ্গাল অতিক্রম করে হস্তিনাপুরে যখন পৌঁছলেন, তাঁকে নগরবাসীরা চিনতে পারল কী করে? তাঁর সঙ্গে রাজর্ষি পরীক্ষিতের আলোচনাই বা কিভাবে সম্ভব হল? তিনি গৃহস্থের মঙ্গলের জন্য গৃহস্থবাড়িতে গোদোহন কালের বেশী থাকেন না, সেই যোগী শুকদেব সুদীর্ঘ সময় ধরে এই পুরাণ কীর্তন ও ব্যাখ্যা কী করে করলেন? হে সূত, অভিমন্যুপুত্র পরীক্ষিৎ ভক্তদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তাঁর অতি আশ্চর্য জন্ম ও কর্ম বৃত্তান্ত আমাদের কাছে বর্ণনা করুন। পাণ্ডুবংশতিলক মহাবীর সম্রাট পরীক্ষিৎ তাঁর যৌবনেই রাজ্যলক্ষ্মী ত্যাগ করে, কিসের কারণে অনশনে প্রাণ বিসর্জনের সংকল্প করেছিলেন? যাঁরা ভগবানের চরণে আত্ম সমর্পণ করেন, তাঁরা নিজের জন্য কিছুই করেন না, লোকহিতের জন্যেই তাঁরা প্রাণধারণ করেন। অতএব, মহারাজ কিসের জন্য পরমবৈরাগ্য অবলম্বন করে নিজের দেহও পরিত্যাগ করলেন? আপনি বেদ ছাড়া সকল শাস্ত্রেই পারদর্শী, অতএব আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আমাদের তৃপ্তি দান করুন”

[গোদোহন কাল - অর্থাৎ একটি গাই দুইতে যতটা সময় লাগে - এখনকার হিসেবে মিনিট পাঁচ-দশ বড় জোর।]

[বেদজ্ঞ ঋষি শৌণক, এই পুরাণ কথক সূত্রধর অর্থাৎ সূতকে বলছেন, "আপনি বেদ ছাড়া সকল শাস্ত্রেই পারদর্শী", অর্থাৎ সূত্রধর যেহেতু অব্রাহ্মণ - তিনি সব শাস্ত্রে পারদর্শী হতে পারেন - কিন্তু বেদের বিদ্যায় তিনি 'লবডংকা'। ঋষি শৌণকের এই শ্লেষটুকু বেশ লক্ষ্যণীয় বিষয় সন্দেহ নেই।]  

সূত বললেন, “দ্বাপর যুগের অবসানকাল আসন্ন হলে, ঋষি পরাশর ও বসুকন্যা সত্যবতীর পুত্র হয়ে, যোগী ব্যাসদেব শ্রীহরির অংশে জন্মগ্রহণ করেন। একদিন সূর্যোদয়কালে সরস্বতীর পবিত্র জলে স্নান আহ্নিক সেরে, ব্যাসদেব তাঁর বদরিকা আশ্রমে ধ্যানে বসলেন। ত্রিকালজ্ঞ ঋষি দিব্যনেত্রে অনুভব করলেন, কালের অমোঘ প্রভাবে যুগধর্মের বিপর্যয় ঘটতে চলেছে। তিনি দেখলেন, জীবের স্থূলদেহ শক্তিহীন এবং মানুষ শ্রদ্ধাহীন, সত্ত্বগুণরহিত, মন্দমতি, অল্পায়ু ও ভাগ্যহীন হতে চলেছে। সর্বজ্ঞ মুনি বেদব্যাস মানুষের এই অবস্থা দেখে চতুর্বর্ণ ও চার আশ্রমের কিসে মঙ্গল হয়, এই চিন্তা করলেন। তিনি চিন্তা করলেন, বৈদিক যজ্ঞ ইত্যাদি অনুষ্ঠানে মানুষের চিত্তশুদ্ধি হয়, অতএব যজ্ঞ ক্রিয়া অনুষ্ঠান যাতে লুপ্ত না হয়ে যায়, সেই ইচ্ছাতে বেদকে ঋক, সাম, যজুঃ ও অথর্ব এই চার ভাগে বিভক্ত করলেন এবং ইতিহাস ও পুরাণকে পঞ্চম বেদ হিসাবে গ্রন্থিত করলেন।

মহর্ষি হৈল ঋকবেদজ্ঞ, মহর্ষি জৈমিনি সামবেদজ্ঞ এবং বৈশম্পায়ন যজুঃ বেদে পারদর্শী ছিলেন। মুনি সুমন্ত মারণ, উচাটন প্রভৃতি অথর্ব বেদে উল্লেখ করা দারুণ আভিচারিক কর্মে সুনিপুণ ছিলেন। আমার পিতা রোমহর্ষণ ইতিহাস ও পুরাণে বিশেষ অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন। ঋষিরা নিজ নিজ শিষ্যদের মধ্যে নিজ নিজ বেদের বহুল প্রচার করতে শুরু করলেন। অত্যন্ত অজ্ঞান ব্যক্তিও যাতে বেদের তত্ত্ব বুঝতে পারে, ব্যাসদেব সেই ভাবেই বেদের বিভাগ করেছিলেন। স্ত্রীলোক, শূদ্র ও পতিত জাতির বেদ চর্চায় অধিকার না থাকায়, তাদের সকলের চিত্তশুদ্ধি ও মঙ্গলের জন্য ঋষি বেদব্যাস মহাভারত নামে বিশাল আখ্যায়িকা রচনা করলেন।

[মুনি সুমন্ত মারণ, উচাটন প্রভৃতি অথর্ব বেদে উল্লেখ করা দারুণ আভিচারিক কর্মে সুনিপুণ ছিলেন। এই মারণ-উচাটনের কথা বলা হলেও -  সমাজের মূল ব্রাহ্মণদের প্রকৃত আপত্তি ছিল, সুমন্ত মুনির মতো কৃতী বৈদ্যরা মানুষ ও পশুর শব ব্যবচ্ছেদ করতেন (dissection) জীবদেহের আভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিন্যাস প্রত্যক্ষ করতে। মুনি সুমন্ত অথর্ব বেদে সুনিপুণ - অর্থাৎ শাস্ত্রমতে তিনি চতুর্বেদী - (আধুনিক মতে) চৌবে - অর্থাৎ বৈদ্য। এই বৈদ্যরাও আদিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন কিন্তু তাঁরা ওই আভিচারিক কর্মে সুদক্ষ হওয়ায়, পরবর্তী কালে এবং আজও উত্তরভারতের বহু স্থানে সমাজ তাঁদের পতিত বা ভ্রষ্ট-ব্রাহ্মণ হিসেবে গণ্য করে। ব্রিটিশ যুগে ডিগ্রিধারী ডাক্তারদের আগে, সারা ভারতে বৈদ্যরাই ছিলেন মানুষ ও গৃহপালিত পশুর চিকিৎসক। কিন্তু হলে কি হবে, ব্রাহ্মণদের সঙ্গে একত্রে পংক্তিভোজন এবং দেব-দেবীর পূজার্চনায় তাঁদের অনুমতি ছিল না।]     

একদিন ধর্মবিৎ ঋষি বেদব্যাস অপ্রসন্ন চিত্তে নির্জন সরস্বতীর তীরে বসে, চিন্তা করলেন, “আমি নিষ্ঠার সঙ্গে ব্রতধারণ করে দেব, অগ্নি ও গুরুজনের সমুচিত পূজা ও তাঁদের আজ্ঞা প্রতিপালন করেছি। শূদ্ররাও যাতে ধর্মের গূঢ় তত্ত্ব বুঝতে পারে, সেই উদ্দেশে মহাভারতের ছলে সকল বেদের সারাংশ প্রকাশ করেছি। কিন্তু কী আশ্চর্য, আত্মায় ব্রহ্মতেজ ও পূর্ণতা উপলব্ধি করেও, মনে হচ্ছে আমার স্বরূপ লাভ হয়নি। যে ভক্তিধর্ম অচ্যুত ও ভক্তদের অত্যন্ত প্রিয়, আমি সেই ভক্তিধর্মের বিস্তারিত রূপ কীর্তন করিনি বলেই কী আমার আত্মাকে বিচ্ছিন্ন এবং অপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে?”

ঋষি যখন নির্জনে বসে, এই রকম চিন্তা করছেন, সেই সময় তাঁর সামনে এসে উপস্থিত হলে দেবর্ষি নারদ। 

পরের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৩ "


বুধবার, ১৮ মার্চ, ২০২৬

এক যে ছিলেন রাজা - ১৮শ পর্ব

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "


      


[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের আগের পর্ব - এক যে ছিলেন রাজা - ১৭শ পর্ব "


৩১ 

যজ্ঞস্থলে বেণপুত্র পৃথুর রাজ্যাভিষেক ও বিবাহের অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন হল। অনুষ্ঠানের শেষে তাঁরা যুগলে রাজপুরোহিত এবং আশ্রমের আচার্যদের প্রণাম করলেন; মন্ত্রীমণ্ডলীর সকলের সঙ্গে পরিচিত হলেন, আন্তরিক সম্ভাষণ করলেন।

 তারপর প্রকাশ্য রাজসভায় মহারাজ পৃথুর বন্দনাগীত শুরু করলেন রাজভট্ট। বন্দনা শেষ হতেই তিনি ঘোষণা করলেন, মহারাজা পৃথুর আগমন বার্তা, “ত্রিলোকের পিতা ভগবান ব্রহ্মার মানসপুত্র স্বায়ম্ভূব মনু হইতে প্রাচীন কালে যে পূত রাজবংশের উদ্গম হইয়াছিল - সেই মহান্‌ স্বায়ম্ভূব এবং তৎপত্নী রত্নগর্ভা শতরূপার দুই পুত্র প্রিয়ব্রত ও উত্তানপাদ ভগবান বাসুদেবের অংশে ধরাতলে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন - মহারাজা উত্তানপাদ ও তাঁর পুণ্যব্রতা পত্নী সুনীতির মহাপুণ্যবান বালক পুত্র ধ্রুব, কঠোর তপস্যায় ভগবান বিষ্ণুর সাক্ষাৎলাভ করিয়া, স্বয়ং ভগবান শ্রীহরির আশীর্বাদ ও অনুগ্রহ লাভ করতঃ সসাগরা ধরিত্রীকে স্বীয় সন্তানের ন্যায় সুদীর্ঘকাল প্রতিপালন করিয়া অক্ষয় বৈকুণ্ঠলাভ করিয়াছিলেন – এই অনুপমবংশললাম ছিলেন মহারাজ অঙ্গ - তাঁহার তুল্য ধর্মপরায়ণ, প্রজারঞ্জক নৃপতি ভূভারতে কদাপি দৃষ্টিগোচর হয় নাই –  প্রজাপিতা মহারাজ অঙ্গের পুত্র অরাতিমর্দন মহারাজ বেণের মানসপুত্র শ্রী পৃথু ভগবান বিষ্ণুর অংশ-অবতার এবং মানসকন্যা শ্রীমতী অর্চ্চি সনাতনী কমলার অংশ রূপে প্রবোধিণী একাদশীর পুণ্য তিথিতে ধরণীতে আবির্ভূত হইয়াছেন। আজ কার্তিক মাসের পুণ্য পূর্ণিমা তিথিতে প্রজ্জ্বলন্ত অগ্নিদেব, শ্রীশ্রীব্রহ্মা, শ্রীশ্রীবিষ্ণু, ভগবান ভব, দেবরাজ শ্রীইন্দ্রাদি সকল দেবতাদের সম্যক উপস্থিতিতে কীর্তিমান শ্রীপৃথুর রাজ্যাভিষেক যজ্ঞ সুসম্পন্ন হইল। ঐ যজ্ঞানুষ্ঠানেই মহারাজ শ্রীপৃথু ও শ্রীমতী অর্চ্চি পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হইয়া এই রাজ্যেই বৈকুণ্ঠলোকের প্রতিষ্ঠা করিলেন। স্বায়ম্ভূবকূলতিলক দেবোপম দম্পতি আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় পিতৃমাতৃতুল্য মহারাজা ও মহারাণীকে রাজসভায় পদার্পণ করতঃ আমাদিগকে কৃতার্থ করিবার নিবেদন করিতেছি...”।

সভার বাইরে অপেক্ষমাণ জনতা একসঙ্গে বারবার জয়ধ্বনি করে উঠল, “জয় মহারাজ পৃথুর জয়, জয় মহারাণি অর্চ্চির জয়”!

 

 রাজভট্টের ঘোষণা ও আবাহন সমাপ্ত হতেই, প্রশস্ত সুসজ্জিত দ্বারপথে প্রথমেই প্রবেশ করল সুশৃঙ্খল নিরাপত্তাবাহিনী। নিরাপত্তারক্ষীরা পূর্ব নির্দিষ্ট স্ব স্ব স্থানে স্থিত হওয়ার পর দ্বারপথে দেখা দিলেন রাজপুরোহিত। বামহস্তে সরস্বতীর পূতবারি পূর্ণ তাম্রঘট, দক্ষিণহস্তে পঞ্চপত্রমঞ্জরী দিয়ে ঘটের মন্ত্রঃপূত বারি সিঞ্চন করতে করতে তিনি সভাস্থলে প্রবেশ করলেন।  তাঁর অনুবর্তী হলেন রাজদম্পতি, তাঁদের অনুবর্তী হলেন মহামন্ত্রী বিমোহন, সকল মন্ত্রীমণ্ডলী এবং সর্বশেষে আশ্রমের পঞ্চ আচার্য এবং দুই আশ্রমকন্যা।                       

রাজ সিংহাসনে উপবেশন করলেন, মহারাজা পৃথু, তাঁর বাম দিকে বসলেন, মহারাণি অর্চ্চি। সিংহাসনের দুই পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন মহামন্ত্রী বিমোহন এবং রাজপুরোহিত। সিংহাসনের পিছনে দাঁড়ালেন, মন্ত্রীমণ্ডলী ও আশ্রমের আচার্যগণ ও দুই আশ্রমকন্যা। সকলের অবস্থান স্থিত হলে, রাজভট্ট সভামধ্যে উপস্থিত বৈদেশিক রাজন্যবর্গ, রাষ্ট্রদূত ও মন্ত্রীদের গুরুত্ব ও প্রভাব অনুযায়ী একে একে পরিচয় ঘোষণা করতে লাগলেন। এই পদ্ধতি অত্যন্ত দীর্ঘ এবং বিরক্তিকর কিন্তু বিদেশনীতির বিচারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ! সিংহাসনে উপবিষ্ট রাজদম্পতি করজোড়ে স্মিতমুখে রাজভট্টের ঘোষণা অনুধাবণ করছিলেন। প্রত্যেক পরিচয়ের সমাপ্তিতে, সভাসদবৃন্দ “সাধু, সাধু” ধ্বনিতে স্বাগত জানাচ্ছিলেন রাজদম্পতিকে এবং ক্রমে ক্রমে অধৈর্য হতে থাকা জনতা অধিকতর উৎসাহে গর্জন করে উঠছিল, “জয় মহারাজ পৃথুর জয়, জয় মহারারাণি অর্চ্চির জয়”!

জনতার সম্মিলিত জয়ধ্বনি, ভয়ংকর মেঘগর্জনের মতো কাঁপিয়ে তুলছিল সেই সভাগৃহ। বারবার জলদগম্ভীর জয়ধ্বনিতে কল্যাণী, যিনি বর্তমানে মহারাণি অর্চ্চি, অসহায় হরিণীর মতো কেঁপে উঠছিলেন। মহারাণি অর্চ্চি কনুইয়ের চাপে মহারাজ পৃথুর দৃষ্টি আকর্ষণ করে অস্ফুটস্বরে বললেন, “আর্যপুত্র, আমার ভয় করছে”।

মহারাজা পৃথু প্রশ্রয়ের হাসি চোখে নিয়ে, প্রিয়তমা রাণিকে অস্ফুটে বললেন, “ভয় কী, আমি তো আছি!” মহারাজ পৃথুর চোখে চোখ রেখে মহারাণি অর্চ্চি অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে গেলেন, তিনি স্বামীর দুই চোখে দেখতে পেলেন অদ্ভূত এক শক্তি – এ দৃষ্টি কদাপি অর্চনের নয়, এ দৃষ্টি মহারাজা পৃথুর!  

 

কারণ বিগত সন্ধ্যার রাজপ্রাসাদে নির্জন সাক্ষাতেও অর্চন কল্যাণীর দুটি হাত ধরে কেঁদে ফেলেছিল, বলেছিল, “এ আমি কিছুতেই পারবো না, কল্যাণী, পারবো না। আমার চোখে এখনো ভাসছে আমাদের গ্রাম, মাঠ-ঘাট, দীঘির নিবিড় পার, নদীর নিরালা স্রোত। আমাদের হৃদয়ে রয়েছে পিতামাতার স্নেহময়শাসন, ভ্রাতা ও ভগিনীদের কপটকলহমাখা শ্রদ্ধা -  সেই সব কিছু ছেড়ে রাজা সাজতে আমি পারবো না। আমি আজ রাত্রেই মহর্ষি ভৃগু এবং আচার্য সুনীতিকুমারকে বলব, আমার অক্ষমতার কথা, বলব, গুরুদেব, আমাকে ক্ষমা করুন। আমাকে মুক্তি দিন! আমাকে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিন, আমাদের সেই গ্রামে, আমাদের পিতামাতার স্নেহচ্ছায়ায়”!

সে সময় কুমারী কল্যাণীই সান্ত্বনা দিয়েছিল অর্চনকে, বলেছিল, “তা আর হয় না, অর্চন। মহর্ষি এবং আচার্যদের এই পরিস্থিতিতে ফেলে তুমি পালিয়ে যাবে? আবেগের বশে এখন হয়তো তুমি একথা বলছো, কিন্তু তুমি চলে গেলে, আচার্যগণ যে অসহ্য অপমানিত হবেন, সে কথা তোমার যখনই মনে পড়বে তুমি অনুশোচনায় দগ্ধ হবে - সারাজীবন, অহরহ। আমার মুখের দিকে তাকাও অর্চন, আমি বিশ্বাস করি, তুমি পারবে। মহর্ষি ভৃগু এবং আচার্যগণও বিশ্বাস করেন তুমিই পারবে! হে প্রিয়, তুমি নিজেকে বিশ্বাস করো, শান্ত হও, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করো নিজেকে”!               

 

মহারাজ পৃথু করজোড়ে স্মিতমুখে রাজভট্টের ঘোষণা শুনতে শুনতেও অনুভব করলেন, কল্যাণী অবাক নয়নে তাকিয়ে আছেন তাঁর মুখের দিকে। কল্যাণীর এই বিস্ময়ের কারণ তিনি জানেন। গতকাল সন্ধ্যাতেও অর্চন নামের সেই তরুণ দ্বিধাগ্রস্ত ছিল, তার পিছনে ফেলে আসা জীবনের সারল্যে ফিরে যাবে, নাকি আলিঙ্গন করে নেবে রাজকীয় জীবনের এই জটিল আবর্তকে? কিন্তু আজ প্রভাতে অভিষেকের মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে, তাঁকে ঘিরে ঘটতে থাকা সকল রাজকীয় অনুষ্ঠান, তাঁর নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য নিয়োজিত অজস্র মানুষের শ্রদ্ধা, তাঁকে ধীরে ধীরে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করে তুলছে। এই সভাস্থলে উপস্থিত ভিন্নদেশের রাজন্যবর্গ, মহামান্য অতিথিবৃন্দ, এঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন এই রাজ্যের বিপক্ষীয়, তাঁরা এখানে উপস্থিত হয়েছেন নবীন রাজার ব্যক্তিত্ব বিচার করতে। আচার্য সুনীতিকুমার এই বোধ তাঁর মধ্যে সঞ্চারিত করেছেন, দীর্ঘ কয়েকমাসে। আজ সিংহাসনে উপবেশনের পর তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ী -  বিপক্ষীয়দের সামনে তাঁকে শিষ্ট অথচ বলিষ্ঠ এক নৃপতির ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠতেই হবে।

উপরন্তু সভাগৃহের বাইরে, উপস্থিত ওই যে জনতা, যাঁদের নির্দিষ্ট কাউকেই তিনি চেনেন না। একদিন তিনি নিজেও ওদের মধ্যেই জনৈক ছিলেন, অথচ ভাগ্যক্রমে আজ তিনি রাজা! এখনও পর্যন্ত তাঁর ব্যক্তিগত কোন কীর্তিই নেই, তবুও ওই জনতা সম্পূর্ণ আস্থায় তাঁর জয়ধ্বনি দিয়ে চলেছে বারংবার। প্রতিবার জয়ধ্বনির গর্জনে তাঁর মনে হচ্ছে তিনি আর সাধারণ অর্চন নন, তিনিই মহারাজ পৃথু, এই বিশ্বাস – তাঁর প্রতি ন্যস্ত এই দায়িত্বের প্রতিদান তাঁকে করতেই হবে! চারণকবিদের গানে যে মহারাজ পৃথুর কীর্তির কথা পল্লবিত হয়ে চলেছে এতদিন, তিনিই সেই মহারাজ পৃথু, তাঁকে অতিক্রম করতেই হবে ওইসকল কীর্তির চূড়া!

কিছুক্ষণ আগেও এই মহারাজ পৃথুকে অর্চন নিজেই চিনতেন না, চিনছেন প্রতি পলে, অতএব আজকে তাঁকে দেখে কল্যাণী, প্রিয়তমা মহারাণি অর্চ্চি যে বিস্মিত হবেন, তাতে আর আশ্চর্য কী?    

 পরিচয় ও সৌজন্য পর্ব শেষ হল, রাজভট্ট সমাপ্তি ঘোষণায় বললেন,  “উপস্থিত সম্মানীয় রাজন্যবর্গ এবং সম্মানীয় অতিথিবর্গ এই অনুষ্ঠানে আপনাদের উপস্থিতির জন্য আমাদের নব রাজদম্পতির পক্ষ থেকে অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আজ এই অনুষ্ঠান এখানেই সমাপ্ত হোক। আপনারা নিজ নিজ স্কন্ধাবারে দ্বিপ্রাহরিক আহারের পর কিঞ্চিৎ বিশ্রাম গ্রহণ করুন। সন্ধ্যার পর প্রাসাদ প্রাঙ্গণে থাকবে নৃত্য ও গীতের অনুষ্ঠান। সেখানে আপনাদের উপস্থিতির জন্য আমাদের রাজদম্পতি আপনাদের আন্তরিক আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। আপনারা আশীর্বাদ করুন আমাদের রাজদম্পতিকে – তাঁদের জয় হোক, শুভ হোক, মঙ্গলময় হোক তাঁদের নতুন জীবন – মঙ্গল হোক এই রাজ্যের – মঙ্গল হোক এই রাজ্যের সকল রাজ্যবাসীর”।

করজোড়ে রাজা পৃথু ও রাণি অর্চ্চি সকলকে বিদায় অভিবাদন করলেন, তারপর উপস্থিত সকলের সঙ্গে ধীরপায়ে সভাস্থলের বাইরে এলেন। দ্বারের সম্মুখে অপেক্ষারত সুসজ্জিত অশ্বশকটে তাঁরা উঠে বসলেন। অশ্বশকট মৃদু গতিতে রাজপ্রাসাদের দিকে চলতে শুরু করল। নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাইরে অপেক্ষারত সহস্র জনগণ আবার গর্জন করে উঠল, “জয় মহারাজা পৃথুর জয়। জয় মহারাণি অর্চ্চির জয়”। মহারাজা পৃথু বামহাতে রাণি অর্চ্চির ডানহাতটি চেপে ধরলেন, হাস্যমুখে আশীর্বাদের ভঙ্গীতে হাত তুললেন জনগণের উদ্দেশে। দুপাশের হর্ম্যরাজির অলিন্দ থেকে বর্ষিত হতে লাগল পুষ্পরাশি।


পরের পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - শেষ পর্ব


নতুন পোস্টগুলি

ওঁ শান্তিঃ (নাটিকা)

  এর আগের গল্প - "  জঙ্গী ব্যবসা   " এর আগের নাটক - "  চ্যালেঞ্জ - নাটক  "  এর আগের নাটক - "  এক দুগুণে শূণ্য ...