শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ৬

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ৫ " 


ষষ্ঠ পর্ব


সোমবার/রাতঃ এগারোটা বিয়াল্লিশ।

 আদরের কনি,

ঘরের একটা জানালা দীর্ঘদিন না-খোলা ছিল, গতকাল তুই সেটা খুলে দিলি। খোলা হাওয়ায় বুকটা ভরে উঠল আর চোখে এসে লাগল আলোর উদ্ভাস। এত ভালো লাগছিল, মনে হচ্ছিল স্বপ্ননিজেকে এমনিতেই মনে হচ্ছিল নেশাগ্রস্ত, তাই শশাঙ্কবাবু বার বার বলা সত্ত্বেও হুইস্কির নেশায় সেটাকে কাটাতে মন চাইছিল না। শশাঙ্কবাবু কী ভাবলেন কে জানে, তুই সামলে নিস।

ত হপ্তার শেষ দুটো দিন ছিলাম না, তাই আজ চেম্বারে খুব চাপ ছিল। তোদের ওখান থেকে ফিরে মাথার তলায় হাত রেখে টানটান বিছানায় শুয়ে তোর কথা যে দু দণ্ড ভাবব তার অবকাশই পেলাম না। মিনিট পনের ঘরে ছিলাম টয়লেটে একটু ফ্রেশ হবার জন্যে, তার মধ্যেই দু দুবার তাগাদা দিয়ে গেল রিসেপশনের মেয়েটি। মানুষ যে কেন এত অসুখে ভোগে কে জানে? নিজেদের সুখের জন্যেই একটু সুস্থ থাকতে পারে না? আজ যদি এরা না ভুগত, চিন্তা করে দ্যাখ, তোর চিন্তার বন্দরে আমি নোঙর ফেলে মাপতে পারতাম বিস্তর জলের তল – একে বাঁও, দুইয়ে বাঁও হয়তো বা। সে যাক শেষমেষ যেতেই হল চেম্বারে। সকলা নটা থেকে দুপুর একটা, কুড়ি জনের বেশি সাধারণত দেখি না। আজ একেবারে পঁয়ত্রিশজন! ধমকে ওঠার আগেই মিলকি বলে উঠেছিল – বকবেন না স্যার, কিচ্‌ছু করার নেই। শুক্রবার, শনিবার থেকে সব্বাই ফোন করে করে এমন রিকোয়েস্ট করে রেখেছিল যে ফেরাতে পারিনি। মিলকি আমার রিসেপসনিস্ট।

সকলের নিরাময়ের বিধান দিতে দিতে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ি আর কি! ঘরে এলাম প্রায় সাড়ে তিনটে নাগাদ। চান খাওয়া করে একটু রেস্ট না নিতেই আবার ডাক পড়ল নার্সিং হোমে, সেখানে দুজন ক্রিটিক্যাল পেশেন্ট অ্যাটেণ্ড করে আবার সন্ধ্যের চেম্বার সাতটা থেকে।

এখন রাত এগারোটা আট। পাশের বাড়ির টিভিতে কোন বাংলা সিরিয়াল চলছে, নাটকীয় মুহূর্তে উচ্চৈঃস্বর মিউজিক ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। নিশ্চিন্ত শব্দহীন চারিপাশ। এখন শুধু তুই আর আমি। আর কেউ নেই আমার সময়ে ভাগ বসাতে।

কি করছিস এখন? ঠিক একখুনি? ঘুমিয়ে পড়েছিস? নাকি উল্টোদিকের সোফায় পা তুলে দিয়ে সিরিয়াল দেখছিস? দুই জা, ননদ আর শাশুড়ির লাগাতার ক্যাঁচাল মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে চলেছিস? নাকি বিছানায় শুয়ে বই পড়ছিস? কি বই? ইন্টারেস্টিং না একটু বোর? বই পড়তে পড়তে কি আমার কথাও তোর মনে আসছে? যে পাতাটা খুলে পড়া শুরু করেছিলি, সেই পাতাতেই কি আটকে রয়েছিস অনেকক্ষণ – আমার ভাবনায়? ভাবিস কী না ভাবিস, আমার ভাবতে ভাল লাগছে যে তুই আমার কথা ভাবছিস। এই যে আমি তোকে মেল লিখছি, তার মানে তোর কথাই তো ভাবছি। তুইই তো রয়েছিস আমার সারাটা মন জুড়ে। এর কি কোন টেলিপ্যাথিক এফেক্ট হতে পারে না?

আমার কাজের মাঝে, কান্নাহাসির দোলা তুমি থামতে দিলে না যে। আমায় পরশ করে প্রাণ সুধায় ভরে তুমি যাও যে সরে – বুঝি আমার ব্যথার আড়ালেতে দাঁড়িয়ে থাকো, ওগো দুখজাগানিয়া।

এখনো কি তুই দাঁড়িয়ে আছিস, কনি? অন্ততঃ মনে মনে হলেও! আমার কিন্তু ভাবতে ভালো লাগে তুই আজও যেন দাঁড়িয়ে আছিস শুধু আমারই জন্যে।

 ভালোবাসা নিস।

 তোর সুনুদা

 

মঙ্গলবার/রাতঃ বারোটা দশ

প্রিয় কনি,

শীতের শীর্ণতোয়া পাহাড়ি নদী দেখেছিস খুব কাছ থেকে? তরতরিয়ে স্বচ্ছ জল বয়ে যায়। জলের মধ্যে খেলে বেড়ানো ছোট্ট ছোট্ট মাছ, জলের নীচেয় নুড়ি পাথর সব - সব দেখা যায়। উজ্জ্বল রোদ্দুরে চিক চিক করে স্বচ্ছতা। আর বর্ষার প্লাবনে সেই নদীই যখন জলপ্রবাহে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে, তার বুকে তখন ঘোলা জল। জলের মধ্যে, জলের নীচে কী কী রহস্য জমা করা আছে কিছুই দেখা যায় না।

এতদিন অদর্শনে শীর্ণ স্মৃতির বহতায় যা ছিল স্বচ্ছ, সেদিন তোর সঙ্গে দেখা হবার পর কেমন যেন সব ঘেঁটে ঘুলিয়ে ঘ হয়ে গেল। দেখা না হলেই বুঝি ভালো ছিল। বেশ তো ছিলাম/ছিলি – কেন যে সেদিন গাড়িটা খারাপ হল মাঝ রাস্তায়! উথাল পাথাল হয়ে উঠেছে সব চিন্তা আর ভাবনা। কত কথাই যে বলতে ইচ্ছে জাগছে – কিন্তু বলা হয়ে উঠছে না হে আমার কনি, পরস্ত্রী!

গতকাল আমার মেলের উত্তর দিসনি। মেল খোলার অবকাশ হয়নি, নাকি উত্তর দিবি না ঠিক করেছিস?

 ভালো থাকিস, ভালোবাসা নিস।

তোর সুনুদা।

 

বুধবার/দুপুরঃ দুটো বত্রিশ

 সুনুদা,

 ভালোই তো আছো, বস, একদম রসে ভরা রসবড়া। এতটুকুও টসকাওনি।  

তোমার প্রথম ও দ্বিতীয় – দুটো মেলই পড়েছি যথাযথ সময়েই। এমনিতেই তোমার সঙ্গে (নাকি তোমার প্রিয় রবিঠাকুরের ভাষায় “তোমার সনে” বলব?) এতদিন পর দেখা হবার একটা হ্যাং ওভার তো ছিলই, তার ওপর তোমার ওরম মেল, বোবা হয়ে গিয়েছিলাম। আজও তুমি এভাবে ভাবতে পারো? আজও কি আমি তোমার কাছে একই রয়ে গেলাম! মনে হল তাই আর বুকের মধ্যে জমাট বাঁধল দীর্ঘশ্বাস – কী কথা ছিল বলবার? কী কথা আর আছে বলবার? সমস্ত ভাবনা আমাকে বোবা করে দিল, সুনুদা।

 তোমার স্বভাবটা আর পাল্টালো না, সুনুদা। এমন মন আকুল করা বক্তব্য শেষ করলে “পরস্ত্রী” দিয়ে? হেমন্তের চাঁদনি রাতে কাশবনে হারিয়ে যাবার লোভ দেখাও আবার মাথায় হিম লেগে ঠান্ডা লাগার ভয়ও দেখাও। শীতের ঝরাপাতার বনে হারিয়ে যাওয়ার ডাক দাও কিন্তু পথ হারানোর ভয়ে বনে ঢুকতেও মানা করো। আমি তো হারাতে চেয়েছিলাম তোমার ডাকে – কিন্তু বারবার তুমিই দিয়েছ পিছুটান।

পিছুটান ভুলে একবার ডেকেই দেখো আমায়, আমি আজও আছি শুধু

 তোমারই কনি।

 

বুধবার/রাতঃ ১১:৪৫

কনি,

তোকে ডাকিনি একথাটা তোর মুখে মানায় নাডেকেছিলাম, তোকেই ডেকেছিলাম, সমস্ত অন্তর থেকে। এমন আহ্বান, নাঃ আহ্বান নয়, আবাহন আর কেউ কোনোদিন করতে পেরেছে বলে আমার অন্ততঃ বিশ্বাস হয় না। তুই সেদিনের সে ডাক ফিরিয়ে দিয়েছিলি। হয়তো তেমন ভরসা করতে পারিসনি। অথবা আমার ডাকে সেসময় সাড়া দিলে তোকে এবং আমাকে যে ঝঞ্ঝার মুখে পড়তে হতো, সে আশঙ্কায় বিকল হয়েছিলি তুই। সেই ঝড়ের রাতে তোর নিরাপদ ঘরের দুয়ার রুদ্ধ রেখেছিলি। খিড়কির দরজাতেও এতটুকুও ফাঁক রাখিসনি। পাছে উড়ে যায় সব বাঁধনের শিকল, এলোথেলো হয়ে যায় তোর সহজ জীবনের যাবতীয় পথচলা।

সেই ঝড় থেমে গেছে কবেই। পিছল পথে পা টিপে টিপে আমি পৌঁছে গিয়েছি, একা এক নির্জন পথের পরিত্যক্ত পান্থশালায়। আমি তোকে আমার সঙ্গে সেদিন মাত্র সাত পা হাঁটতে বলেছিলাম, কনি, তাহলেই আমরা জীবনের অনন্ত পথচলার সঙ্গী হয়ে উঠতে পারতাম। সে তো হয়ে উঠল না কনি। সেদিন আমার সেই ডাকে তুই মুখ ফিরিয়েছিলি, কনি, আজ কোন অধিকারে তোকে ডাকি বল তো? তোকে খুব কাছে পাবার লোভটুকুও এখন রয়ে গেছে বহুদিন পিছনে ফেলে আসা অস্ফুট স্মৃতিতে। যে স্মৃতি একটা লোহার সিন্দুকে ভরে, শিকলে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে, নিজের হাতে বিসর্জন দিয়েছিলাম গভীর এক কুয়োর জলে। সে সিন্দুকটা জলে পড়ার সময় আওয়াজ উঠেছিল - ঝপ্‌পাস। আমার স্মৃতিতে এখন রয়ে গেছে শুধু ওই আওয়াজটুকুই!

আজ তোকে ডাকতে গেলে, আমার একা এই নির্জন ঘরে সেই শব্দটাই কানে আসছে বারবার। এই শব্দটুকু ছাড়া আর যে কিছুই অবশিষ্ট নেই, 

তোর সুনুদার।

চলবে...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ৬

   এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য " ...