["ধর্মাধর্ম"-এর তৃতীয় পর্বের সপ্তম পর্বাংশ পড়ে নিতে পারেন এই সূত্র থেকে "ধর্মাধর্ম - ৩/৭"]
৩.৬.৪. মৌর্যদের পতন এবং পরবর্তী পরিস্থিতি
মোটামুটি ২৩২ বি.সি.ই নাগাদ অশোকের মৃত্যুর
ঘটনাটি খুবই অস্পষ্ট। কোথায় এবং কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল সঠিক জানা যায় না, তবে একটি
বৌদ্ধমতে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল তক্ষশিলায়। অশোক তাঁর সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার হয়তো
দিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর পৌত্র দশরথকে। তবে নানান সূত্র অনুসারে অনুমান করা যায়, বিশাল মৌর্য
সাম্রাজ্য বেশ কয়েকটি টুকরোতে ভেঙে গিয়েছিল। প্রধান গাঙ্গেয় উপত্যকায় মগধের রাজা
ছিলেন দশরথ। দশরথ আজীবিক ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। তাছাড়া পশ্চিম ভারতের রাজধানী
উজ্জয়িনীর রাজা ছিলেন তাঁর আরেক পৌত্র সম্প্রতি। এই সম্প্রতিই পশ্চিম ভারতে জৈন
ধর্ম প্রচারে উৎসাহী পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। কাশ্মীর অঞ্চলের রাজা ছিলেন অশোকের এক পুত্র
জলোকা। অশোকের আরও দুই পুত্রের নাম পাওয়া যায়, কুনাল এবং তিবারা, তাঁদের
সম্বন্ধে নাম ছাড়া তেমন আর কিছু জানা যায় না। এর পরবর্তী ইতিহাস খুবই ঝাপসা, স্পষ্ট করে
কিছুই জানার উপায় নেই।
পৌরাণিক সূত্রে আভাস পাওয়া যায় মোটামুটি ১৮৫
বি.সি.ই-তে মৌর্য বংশের শেষ রাজা বৃহদ্রথকে হত্যা করে, তাঁরই
সেনাপতি পুষ্যমিত্র শুঙ্গ মগধের সিংহাসন অধিকার করেছিলেন। শুঙ্গ বংশের রাজারা
ব্রাহ্মণ্য ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন, শোনা যায় তাঁদের বংশের রাজত্বকালে অন্ততঃ দুবার অশ্বমেধ এবং
একবার বাজপেয় যজ্ঞের আয়োজন হয়েছিল। বৌদ্ধসূত্র অনুযায়ী পুষ্যমিত্র শুঙ্গ নাকি
ঘোরতর বৌদ্ধ বিদ্বেষী ছিলেন এবং তাঁর রাজত্বকালে নাকি অনেক বৌদ্ধ বিহার, মঠ এবং
স্থাপত্য ধ্বংস করা হয়েছিল। বিখ্যাত বৈয়াকরণ এবং দার্শনিক পতঞ্জলি হয়তো
পুষ্যমিত্রের সমসাময়িক ছিলেন। শুঙ্গবংশ মোটামুটি একশ বারো বছর রাজত্ব করেছিল এবং
মোটামুটি ৭৩ বি.সি.ই-তে শেষ শুঙ্গরাজা দেবভূতিকে হত্যা করে সিংহাসনে বসেছিলেন
তাঁরই ব্রাহ্মণ মন্ত্রী বসুদেব। শোনা যায় দেবভূতি অত্যন্ত দুশ্চরিত্র রাজা ছিলেন।
সে সময় শুঙ্গদের আয়ত্তে শুধু মগধরাজ্যটুকুই অবশিষ্ট ছিল।
বসুদেব যে রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তার নাম
কাণ্ব বংশ। তাঁদের প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর রাজত্ব কালে তাঁদের বংশের চারজন রাজা
হয়েছিলেন। তাঁদের সম্বন্ধেও স্পষ্ট কোন ধারণা পাওয়া যায় না। মোটামুটি ২৮
বি.সি.ই-তে কাণ্ব বংশের শেষ রাজাকে হত্যা করে, মগধ জয় করেছিলেন অন্ধ্রের রাজা, নাম হয়তো
সিমুক। এই রাজবংশের নাম সাতবাহন।
মৌর্য পরবর্তী যুগে আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ রাজা
ছিলেন কলিঙ্গের রাজা খারবেল। তাঁর রাজ্যের বিস্তার সম্পূর্ণ কলিঙ্গ এবং উত্তর
অন্ধ্রের অনেকটা। খারবেল জৈনধর্মে নিষ্ঠাবান ছিলেন। অহিংস জৈন হলেও তাঁর রাজ্য জয়
এবং যুদ্ধবিগ্রহে বিশেষ উৎসাহ ছিল। তিনি বেশ কয়েকবার মগধ রাজ্য আক্রমণ করেছিলেন, হয়তো
কিছুদিনের জন্যে মগধ অধিকারও করতে পেরেছিলেন। শোনা যায়, সুদূর
দক্ষিণে তিনি পাণ্ড্য রাজ্যও আক্রমণ করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে কোন এক যবন (গ্রীক)
রাজার সঙ্গে মথুরায় যুদ্ধ হয়েছিল এমনও শোনা যায়। উড়িষ্যার উদয়গিরির হাতিগুম্ফায়
তাঁর একটি শিলালেখ পাওয়া গেছে। সুদীর্ঘ সেই শিলালেখে তাঁর নিজের সম্পর্কে এবং
প্রজাদের মঙ্গলের জন্যে তিনি কী কী কাজ করেছিলেন, তার বর্ণনা লিখে গিয়েছেন। সেই
শিলালেখের শুরু হয়েছে,
এই ভাবে, “অর্হৎ
(জিন)-দের প্রণাম জানিয়ে,
মহামহিম খারবেল,
ঐর, মহান
রাজা, মহামেঘবাহনের
বংশধর, চেদিবংশের
মহিমা বৃদ্ধিকারী, সকল
পরমাগুণ এবং মঙ্গল লক্ষণে ভূষিত, যাঁর সুকীর্তির যশ কলিঙ্গ ছাড়িয়ে চারদিকেই ব্যাপ্ত...”, ইত্যাদি
ইত্যাদি। আর্য শব্দের প্রাকৃত ঐর এবং শ্রেষ্ঠ অর্থেও আর্য শব্দের ব্যবহার তখন
প্রচলিত ছিল। সে যাই হোক খারবেলের মৃত্যুর পর কলিঙ্গ বহুদিন নিস্তব্ধ হয়ে
গিয়েছিল।
উত্তরপশ্চিম ভারতের প্রায় সবটাই মৌর্যদের হাতছাড়া
হয়ে গিয়েছিল। মোটামুটি ১৭৫ বি.সি.ই থেকে গ্রীক ও ব্যাক্ট্রিয়ান রাজাদের উৎসাহী
সেনাপতিদের অনেকেই উত্তর-পশ্চিম ভারতে নিজের নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা
করছিলেন। যাঁদের মধ্যে সব থেকে বিখ্যাত মিনাণ্ডার। তাঁর রাজ্য পশ্চিমের সোয়াত
উপত্যকা, কাবুল
থেকে পূর্বে মগধ রাজ্যের সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। যদিও তাঁর রাজত্বের সময় কাল
মাত্র পনের বছর - ১৫০ বি.সি.ই থেকে ১৩৫ বি.সি.ই। বৌদ্ধ ঐতিহ্যে রাজা মিনাণ্ডারই
রাজা মিলিন্দ। তাঁর সঙ্গে বৌদ্ধ দার্শনিক নাগসেনের বৌদ্ধধর্ম নিয়ে সুদীর্ঘ
প্রশ্নোত্তর পর্ব চলেছিল,
বৌদ্ধদের সেই গ্রন্থের নাম “মিলিন্দ-পন্হ” – যার অর্থ মিলিন্দের প্রশ্নাবলী।
শোনা যায় এর পরেই মিনাণ্ডার বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন।
এরপর আবার গ্রীক এবং ব্যাক্ট্রিয় রাজাদের জয়-বিজয়
এবং আক্রমণ-প্রতিআক্রমণে,
বেশ কিছুদিন ডামাডোল চলতে লাগল। এবং এইসময়েই উত্তর সীমান্ত পথে ভারতে ঢুকতে
লাগল পার্থিয়ান, শক
ইত্যাদি জাতি বা গোষ্ঠী। পার্থিয়ান এবং শকরা ছিল মধ্য এশিয়ার পশুপালক উপজাতি।
সমগ্র উত্তর ভারত জুড়েই তখন অস্থির রাজনৈতিক
পরিস্থিতি। প্রচুর রাজ্য - নিত্য ভাঙছে, নিত্য গড়ছে। বিচিত্র তাদের
শাসনপদ্ধতি। বিচিত্র তাদের সংস্কৃতি। তাদের কোন রাজ্যে রাজশাসন, কোথাও
গোষ্ঠী শাসন (oligarchy),
আবার কোথাও বা দলপ্রধান (chiefdom)। কেউ কেউ ব্রাহ্মণ্য ধর্মে বিশ্বাসী, কেউ বা
বৌদ্ধ অথবা জৈন, কেউ
বা সম্পূর্ণ বিদেশী। আবার কেউ বা অনার্য ধর্মী, অর্থাৎ সুপ্রাচীন কাল থেকেই যাঁরা
পশুপতিদেব, বিশ্দেব
এবং মাতৃকাদেবীর পূজক।
উত্তরের তুলনায় দক্ষিণ ভারতের পরিস্থিতি বরং
অনেকটাই স্থিতিশীল ছিল। তারা তখন প্রাক্-ঐতিহাসিক যুগ থেকে ঐতিহাসিক যুগে পা
রাখতে শুরু করেছে। অশোকের শিলা-নির্দেশে দক্ষিণের যে কটি জনগোষ্ঠীর নাম পাওয়া
গিয়েছিল, চোল, চের, পাণ্ড্য এবং
সাতিয়াপুত্র – তারা মৌর্য সাম্রাজ্যের বশ্যতা স্বীকার করেছিল। মনে করা হয়, মৌর্য
সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে আঞ্চলিক প্রশাসক হিসাবেই তাদের রাজ্যশাসনের অভিজ্ঞতা
সঞ্চয়। তারপর মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর তারা নিজ নিজ এলাকায় রাজ্য গড়ে তুলল। এই
চারটি গোষ্ঠীর সংস্কৃতি ধীরে ধীরে মিলেমিশে গড়ে উঠল তামিলিক সংস্কৃতি। তাদের ভাষা
হয়ে উঠল তামিল এবং লিপি হয়ে উঠল ব্রাহ্মী-তামিল।
বি.সি.ই প্রথম শতাব্দীতে দাক্ষিণাত্যের পশ্চিম
অঞ্চলে আরেকটি শক্তিশালী রাজবংশের সৃষ্টি হয়েছিল, তার নাম সাতবাহন। এই বংশকে
অন্ধ্রবংশও বলা হয়ে থাকে,
কারণ তাদের রাজ্যের সূত্রপাত পূর্বে কৃষ্ণা – গোদাবরীর ব-দ্বীপ থেকে গোদাবরী
বরাবর, পশ্চিমে
আরব সাগর পর্যন্ত। সম্রাট অশোকের শিলানির্দেশে এই অন্ধ্রগোষ্ঠীরও উল্লেখ পাওয়া
যায়। এই অঞ্চলও মৌর্যদের বিজিত রাজ্য নয়, কিন্তু অধীনস্থ রাজ্য ছিল। অতএব
তামিলিকদের মতোই তারাও আঞ্চলিক প্রশাসক ছিল এবং মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর, অন্ধ্রবংশের
প্রথম রাজা সাতবাহন নাম নিয়ে, নতুন রাজবংশের স্থাপনা করেছিলেন।
সাতবাহন বংশের সব থেকে উদ্যোগী রাজা ছিলেন
সাতকর্ণি। তাঁর রাজধানী ছিল প্রতিষ্ঠান নগরে, যার আধুনিক নাম পাইথান। সাতকর্ণি
নর্মদার উত্তরে পূর্ব মালব্য পর্যন্ত রাজ্যবিস্তার করেছিলেন। শকরাজা এবং কলিঙ্গরাজ
খারবেলের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধের কথা শোনা যায়। একসময় সাতবাহন সাম্রাজ্য পশ্চিমে
মহারাষ্ট্রের কিছুটা,
গুজরাট এবং উত্তরপশ্চিমে সিন্ধ প্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সাঁচির একটি
শিলালেখে তিনি নিজেকে “রাজন শ্রী সাতকর্ণি” বলে পরিচয় দিয়েছেন। উত্তরভারতের
সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় হওয়াতে, সাতকর্ণি অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন
করেছিলেন কিন্তু তিনি নিজেকে এক “ক্ষত্রিয়-বিনাশী” ব্রাহ্মণ বলে দাবি করেছেন। মনে
করা হয়, তিনি
মধ্য এবং পশ্চিম ভারতের অনেকগুলি ক্ষত্রিয় গোষ্ঠীরাজ্য অধিকার করেছিলেন, এ তারই
উল্লেখ। সাতবাহন সাম্রাজ্যের শুরু মোটামুটি ৫০ বি.সি.ই-তে এবং তাদের রাজত্বকাল
২৪৮-৪৯ এ.ডি.র কাছাকাছি সময় পর্যন্ত। অতএব যথেষ্ট শক্তিশালী এবং দক্ষ প্রশাসনিক
ব্যবস্থা নিয়েই সাতবাহন সাম্রাজ্য নতুন যুগে (Common Era) পা রেখেছিল।
মৌর্যবংশের চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন জৈন, অশোক ছিলেন
বৌদ্ধ, বিন্দুসার
এবং অশোকের পৌত্র দশরথ ছিলেন আজীবিক। অতএব এই তিন ধর্মই তামিলিক সংস্কৃতিতে আগে
থেকেই মিশে ছিল। শক্তিশালী সাতবাহন সাম্রাজ্য পশ্চিম এবং মধ্য ভারতে আধিপত্য
বিস্তার করায়, তাঁদের
সঙ্গে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে ওঠে, এবং সাতবাহন বংশের পরবর্তী রাজারা
ব্রাহ্মণ্য ধর্মেই বিশ্বাসী ছিলেন।
অতএব তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় ব্রাহ্মণরা তাঁদের
ভাগ্য অন্বেষণে উত্তরের তুলনায় অনেকটাই স্থিতিশীল দক্ষিণভারতে পৌঁছতে শুরু করলেন
তাঁদের ব্রাহ্মণ্যধর্ম নিয়ে। সেখানে শুরু হল ব্রাহ্মণ্য ধর্মের নতুন এক পর্ব।
প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ক্ষাত্রধর্মের শক্তি খাটিয়ে ব্রাহ্মণ্যধর্ম প্রতিষ্ঠার দিকে
না গিয়ে, তাঁরা
কৌশল বদলে ফেললেন। আঞ্চলিক মানুষদের ধর্ম বিশ্বাসগুলি সংগ্রহ করতে করতে বদলে ফেলতে
শুরু করলেন তাঁদের সনাতন ব্রাহ্মণ্যধর্ম। এই প্রসঙ্গের বিস্তারিত আলোচনা আসবে
পরবর্তী পর্বে।
৩.৬.৪ সমসাময়িক বাণিজ্য পরিস্থিতি
ভগবান মহাবীর এবং ভগবান বুদ্ধের সময় থেকেই আমরা
বেশ কিছু শ্রেষ্ঠী এবং বণিকের নাম জেনেছি, যাঁদের ধনসম্পদের কোন সীমা ছিল না
এবং সমাজে তাঁদের অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল। অশোকের দ্বিতীয়
রাণি কারুবাকী ছিলেন বিদিশার সম্পন্ন বণিকদুহিতা। সম্রাট অশোকের সঙ্গে কারুবাকীর
পিতার যথেষ্ট সৌহার্দ্য ছিল বলেই হয়তো, তাঁদের সাক্ষাৎ ও পরিচয় হয়েছিল এবং
ভালোবেসে বিয়ে করতে কোন অসুবিধে হয়নি। বণিক অনাথপিণ্ডিক কোশল রাজকুমার জেতকে হতবাক
করে দিয়েছিলেন তাঁর দান করা বিপুল সম্পদসম্ভারে। ব্রাহ্মণ্য ধর্মে বণিকের সামাজিক
স্থান ছিল তৃতীয় বর্ণের বৈশ্যস্তরে। অতএব অব্রাহ্মণ্য রাজা এবং সম্রাটের আমলে, আরও স্পষ্ট
করে বললে, ব্রাহ্মণ্য-বিরোধী
সামাজিক পরিবেশে বণিকরা যে তাদের প্রাপ্য সম্মান, সামাজিক প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক
সুযোগ-সুবিধে পাচ্ছিলেন সে কথা বলাই বাহুল্য। এবং যাঁদের কারণে তাঁদের এই সামাজিক
সম্মান লাভ, কৃতজ্ঞতাবশতঃ
সেই ভগবান মহাবীর ও বুদ্ধদেবের জন্যে তাঁরা মুক্ত হস্তে দান করেছিলেন – দুই ধর্মের
প্রচার এবং সংগঠনে।
এই বণিকদের রাজনৈতিক গুরুত্বও ছিল অপরিসীম, কারণ একদিকে
প্রচুর বাণিজ্য কর দিয়ে তাঁরা যেমন রাজ্যের রাজস্ব বৃদ্ধি করাতেন, অন্যদিকে
নানান উপহার এবং দৈব-দুর্বিপাকে রাজাদেরকে অর্থ সাহায্য (অথবা ঋণ) দিয়ে রাজাদের
ওপর প্রভূত প্রভাবও বজায় রাখতেন। আজ থেকে মাত্র কয়েকশ’ বছর আগে (১৭৫৬-৫৭ সি.ই.), নবাব
সিরাজদ্দৌলাকে সরিয়ে ক্লাইভ ও তাঁর অনুগত মিরজাফরকে সিংহাসনে বসাতে বণিক মহতাব
চাঁদ ও স্বরূপ চাঁদের (ইতিহাসে যাঁরা “জগৎ শেঠ” (Banker of the World) উপাধিতে
বিখ্যাত) ভূমিকা এবং তাঁদের বিপুল অর্থব্যয়ের হিসেব জানলে চমকে উঠতে হয়। অতএব
রাজাকে রাজা বানিয়ে তুলতে (king-maker) বণিকসম্প্রদায়ের প্রভাব আজও যেমন আছে, সে সময়েও
ছিল – এমন অনুমান করাই যায়। কেন অনুমান করা যায় সে কথায় আসার আগে, সমসাময়িক
ভারতীয় বাণিজ্যের ব্যাপ্তি এবং বিস্তার বিষয়ে একটু আলোচনা করা যাক।
বৌদ্ধ এবং জৈন শাস্ত্রে শ্রেষ্ঠীবহুল যে যে নগরের
নাম পাওয়া যায় সেগুলি হল শ্রাবস্তী, বিদিশা, গান্ধার
(তক্ষশিলা), পাটলিপুত্র, উজ্জয়িনী।
এবং সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ যে যে বন্দর শহরের নাম পাওয়া যায়, সেগুলি হল
পশ্চিমে ভৃগুকচ্ছ (গুজরাটের ভারুচ), সোপারা ও কল্যাণ (মহারাষ্ট্রে
মুম্বাইয়ের কাছাকাছি),
পূর্বে তাম্রলিপ্তি এবং চন্দ্রকেতুগড় (পশ্চিমবঙ্গ) এবং দক্ষিণে কোডাঙ্গালুর
(কোচি, কেরালা), কোরকাই, আলাগনকূলম, আরিকামেডু
(তামিলনাড়ু), মসুলিপতনম
(অন্ধ্র) ইত্যাদি। গুজরাটের ভারুচ এবং অন্ধ্রের মসুলিপতনম ছাড়া, সবগুলিই এখন
গুরুত্বহীন জনপদ, কারণ
সমুদ্র অনেকটাই সরে গেছে,
এই শহরগুলি থেকে। এই বন্দর শহরগুলি থেকে যে যে সামগ্রী রপ্তানি হত, তার মধ্যে
প্রধান ছিল,
ক. মশলা - লবঙ্গ, এলাচ, দারচিনি, জয়িত্রি, জায়ফল, পান, সুপুরি, তেজপাতা এবং
ভীষণ দামি ছিল গোলমরিচ। মশলাগুলির ব্যাপক চাহিদা ছিল গ্রীস, মিশর এবং
পরবর্তী কালে রোমান সাম্রাজ্যেও। শোনা যায় গোলমরিচ রপ্তানি করেই, ভারতীয়
বণিকেরা সব থেকে বেশি রোমান স্বর্ণমুদ্রা অর্জন করতেন। এই প্রসঙ্গে সুপুরি নিয়ে
একটা মজার কথা বলি। সুপুরির প্রধান উৎস ছিল আসাম, পূর্ব ও উত্তর-পূর্বভারত। সে
অঞ্চলে তার নাম ছিল গুয়া, যে কারণে আসামের রাজধানি গুয়াহাটি
(গুয়ার হাট)। বাংলার বণিকেরা শোনা যায় এই গুয়াহাটি থেকে নদীপথে তাম্রলিপ্তি বন্দর
এবং সেখান থেকে সমুদ্রপথে পশ্চিম উপকূলের সোপারা বন্দরে গুয়া বা গুবাক পৌঁছে দিত।
সোপারা বন্দর থেকে গুয়া রপ্তানি হত আরব, মিশর এবং গ্রীসে। মিশরীয়রা এই ফলের
নাম দিয়েছিল “সোপারার ফল”। পরবর্তীকালে এই “সোপারার ফল” নামটি সমগ্র ভারতবর্ষেই
“সুপুরি” হয়ে উঠেছিল এবং অসম ও উত্তরপূর্বের কিছু কিছু অঞ্চল ছাড়া, গুয়া
শব্দটির আর তেমন প্রচলন নেই। বাংলার চণ্ডীমঙ্গল কাব্যগুলিতে (যদিও অনেক পরবর্তী
কালের- পঞ্চদশ বা ষোড়শ শতাব্দীর রচনা) বলা হয়েছে, বাংলার বণিকেরা সুপুরির ব্যবসা করে
নাকি মাণিক্য অর্জন করতেন! অতএব সুপুরি রপ্তানিও যথেষ্ট লাভজনক ব্যবসা ছিল।
খ.
বস্ত্র – কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বঙ্গদেশ ও অসমের চার রকম বস্ত্রের প্রশংসা
পাওয়া যায় - দুকূল, পত্রোর্ণ, ক্ষৌম এবং
কার্পাসিক। বঙ্গের দুকূল বস্ত্র খুবই সূক্ষ্ম – অর্ধস্বচ্ছ এবং মসৃণ, সাপের
খোলসের মতো। এই বস্ত্রের চাহিদা ছিল মিশর, গ্রীস এবং পরবর্তী কালে রোম
সাম্রাজ্যের রাজপরিবারেও। ক্ষৌম একটু মোটা বস্ত্র – সাধারণের পরার জন্যে। পত্রোর্ণ সাদা বা ধোয়া কৌষেয় বস্ত্র - এণ্ডি বা
মুগার বস্ত্র। ষষ্ঠ শতাব্দীতে লেখা “অমরকোষে” পত্রোর্ণের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে – এক
বিশেষ কীট পাতার মধ্যে উর্ণা (জাল) সৃষ্টি করে, সেই উর্ণা থেকে বানানো হত পত্রোর্ণ
বস্ত্র। সেরা কার্পাসিক বস্ত্র অর্থাৎ কাপাস তুলোর বস্ত্র তৈরি হত মাদুরা, কলিঙ্গ, কাশী, বঙ্গ, বৎস জনপদে।
তুলো থেকে অতি সূক্ষ্ম বস্ত্র বানানোর প্রযুক্তি সম্পূর্ণভাবেই ভারতীয়। বি.সি.ই-র
দ্বিতীয় শতাব্দী থেকেই ভারতের ধুনুরিরা ধুনুক (cotton carders’ bow) দিয়ে তুলে
ধুনে, বাছাই
করা হাল্কা তুলো দিয়ে সূক্ষ বস্ত্র বানিয়ে দেশে বিদেশে চমক লাগিয়ে দিয়েছিলেন।
গ. এছাড়া নানান বিলাস দ্রব্য যেমন, হাতির দাঁত
এবং হাতির দাঁতের নানান উপহার সামগ্রী। মুক্তা এবং নানান ধরনের দামি পাথর, বিশেষ করে
পান্না – অলংকারে বসানোর জন্যে, চন্দনকাঠ এবং মহার্ঘ আসবাব বানানোর জন্যে আবলুস (ebony) কাঠ।
বস্ত্রের শুভ্রতা রাখার জন্যে নীল (indigo)। কয়েকশ বছর আগেও ব্রিটিশ রাজত্বে
সমগ্র বঙ্গ এবং বিহারের চাষীদের ওপর এই নীল চাষের অত্যাচার মারাত্মক বিভীষিকার
সৃষ্টি করেছিল। ইওরোপের নীলের চাহিদা বহুদিনের।
ঘ. পোষ্যপ্রাণী – বাঁদর, ময়ুর, কাকাতুয়া, টিয়া, মোনাল, চিতা
ইত্যাদি। রোমান রাজপরিবারে এই পোষ্য প্রাণীদের দারুণ চাহিদা ছিল।
ঙ. ওষধি – নানাবিধ ওষধি মলম বা প্রলেপ, গাছ-গাছড়া, পান, প্রসাধনী ও
গন্ধ সামগ্রী এবং বিশেষ করে যৌন শক্তি বর্ধক ওষধির ভীষণ চাহিদা ছিল।
রোমান ঐতিহাসিক প্লিনি অভিযোগ করেছিলেন, রোম
সাম্রাজ্য তাদের বিলাসিতার সামগ্রী আমদানির জন্যে পূর্বের দেশগুলিতে বছরে অন্তত
৫৫০০ লক্ষ সেসটার্স ব্যয় করে।
যদি পূর্বের দেশগুলির মধ্যে ভারতের ভাগে এর পঞ্চমাংশ ব্যবসাও প্রতিবছর এসে থাকে
তাহলে তার মূল্য ছিল ১২,৫৬,৭৫,০০০ গ্রাম
রূপো! অতএব শ্রেষ্ঠীদের ধনসম্পদের পরিমাণ কিছুটা আন্দাজ করা যায় বৈকি!
বিদেশে সবকিছুই যে রপ্তানি হত, তা নয়, বিদেশ থেকে
অনেক জিনিষ আমদানিও হত,
যেমন, সোনা
ও রূপোর মুদ্রা, নানান
ধরনের সুরা, গন্ধদ্রব্য, প্রসাধনের
জন্যে জলপাই তেল, কাচ
ইত্যাদি।
এত গেল বৈদেশিক বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, এর সঙ্গে
ছিল নিবিড় অন্তর্দেশীয় বাণিজ্য। অন্তর্দেশীয় বাণিজ্য চলত প্রধানতঃ নদীপথে এবং
স্থলপথে। তক্ষশিলা থেকে পাটলিপুত্র হয়ে, তাম্রলিপ্তি পর্যন্ত প্রাচীন দীর্ঘতম
স্থলপথের কথা আগেই বলেছি। তাছাড়াও দেশ জুড়ে ছড়িয়ে ছিল নদী এবং সমুদ্রের উপকূলবর্তী
পথের অন্তর্জাল। গাধা,
খচ্চর, ঘোড়া, বলদের গাড়ি, উত্তর-পশ্চিমের
মরু-অঞ্চলে উঠের পিঠেও বাণিজ্য সামগ্রী বহন করে বণিকদের বড়ো বড়ো দল (caravan) একত্রে
চলাফেরা করত। নদীগুলি পার হওয়ার জন্যে সেতু ছিল না, ফেরি নৌকা ব্যবহৃত হত। এই স্থলপথে
দেশের অভ্যন্তরে তো বটেই এমনকি তক্ষশিলা হয়ে সুদূর আরব এবং পারস্য সাম্রাজ্যের
বিভিন্ন নগরীতেও বাণিজ্য সম্ভার পৌঁছে যেত। আবার তক্ষশিলা থেকে বেগ্রাম এবং
বামিয়ান হয়ে উত্তরে অক্সাস (আমু দরিয়া) নদী পথে আরল সাগর এবং পশ্চিমে ক্যাস্পিয়ান
সাগর, কৃষ্ণ
সাগর এবং ভূমধ্য সাগর পর্যন্ত এই বাণিজ্যিক আদান-প্রদানের নিদর্শন পাওয়া যায়।
বামিয়ানের বৌদ্ধ উপনিবেশ যে যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল, তার নিদর্শন পরবর্তীকালে বানিয়ে তোলা
(৫০৭ সি.ই.) বামিয়ান বুদ্ধমূর্তিগুলি থেকে বোঝা যায়। যদিও ২০০১ সালের মার্চে, এই
মূর্তিগুলি ধ্বংস করে,
আফগানিস্তানের তালিবান প্রশাসন তাঁদের ধর্মের অনুশাসনকে চরিতার্থ করেছেন।
ভারতীয় বণিকরা এই পথের ওপর অনেকগুলি শহরে, তাঁদের বাণিজ্য আবাসও গড়ে তুলেছিল, যেমন কাশগড়, ইয়ারকান্দ, খোটান, মিরন, কুচি, খারাশহর এবং
তুরফান। এই পথের অনেকটাই সুদূর অতীত থেকে চীন ও মধ্য এশিয়া যাতায়াতের রেশম পথের (silk route) সঙ্গে
সংযুক্ত। আশ্চর্যের বিষয়,
এই বণিকদলগুলির সঙ্গে প্রত্যেকটি জায়গাতেই পৌঁছে গিয়েছিলেন বৌদ্ধধর্মের
প্রচারকরাও!
স্থল-বাণিজ্যে পণ্য সামগ্রীর কোন সীমা ছিল না।
পূর্ব ভারত থেকে যেত নানান ধরনের বস্ত্র, পান, সুপুরি, নারকেল, মুক্তা, উৎকৃষ্ট ধান
বা চাল, তামা
বা ব্রোঞ্জের তৈজসপত্র,
মাটির পাত্র। দক্ষিণদেশ থেকে আসত দামি পাথর – পান্না, প্রবাল, সোনা, মুক্তা, কড়ি, শঙ্খ, নানান মশলা।
পশ্চিম থেকে আসত রূপো,
তামা, ব্রোঞ্জ, লোহা এবং
খনিজ লবণ। আরব এবং পারস্য দেশ হয়ে সুদূর মিশরে হাতি এবং গণ্ডার রপ্তানি হওয়ার কথাও
শোনা যায়, আবার
উল্টোদিকে আরব থেকে ভারতে আমদানি করা হত ভালো জাতের ঘোড়া।
দেশ জুড়ে এই নিবিড় বাণিজ্যিক অন্তর্জাল গড়ে তুলত
এবং নিয়ন্ত্রণ করত বিভিন্ন শহরের ব্যবসায়ী শ্রেণী বা পুগা (পালি ভাষায় সমিতি বা
সমবায়) (guilds)। সমিতির
প্রধানরা সকলেই বংশপরম্পরায় সম্পন্ন বণিক হতেন। সর্বস্তরে তাঁরা তাঁদের অর্থ লগ্নী
করতেন, সমুদ্রগামী
জাহাজ থেকে নদীপথে চলা বাজরা। গাছের গুঁড়ি কেটে বড়ো বড়ো নৌকা বানানো হত, অনেকগুলি
গুঁড়ি পাশাপাশি বেঁধে জাহাজ বানানো হত। ভারতের পশ্চিম উপকূল থেকে এই সব জাহাজ
লোহিত সাগর পর্যন্ত চলে যেত বাণিজ্য করতে। প্লিনির বর্ণনায় পাওয়া যায়, ভারতের
বৃহত্তম জাহাজের ওজন ছিল প্রায় ৭৫ টন এবং সাতশ জন পর্যন্ত নাবিক সে জাহাজে যাত্রা
করতে পারত! শুধু পশ্চিমের দেশগুলিতেই নয়, বাণিজ্য সম্ভার নিয়ে পূর্ব উপকূলের
বন্দর তাম্রলিপ্তি থেকে পূর্বের বার্মা, জাভা, কম্বোজ, শ্যাম, সুমাত্রা
দ্বীপেও বণিকেরা নিয়মিত যাওয়া আসা করত।
ব্যবসায়ী সমবায় বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন পেশার
দক্ষ শিল্পীদের দিয়ে সামগ্রী বানিয়ে নিত। উৎপন্ন সমস্ত সামগ্রীর গুণগত মান নিয়মিত
পরীক্ষা করার জন্যে থাকত পরিদর্শকমণ্ডলী। গুণগত মান নিশ্চিত করে, সামগ্রীর
গায়ে, ব্যবসায়ী
সমিতি তাদের নিজস্ব মোহর (seal)
ছাপ দিয়ে দিত। বিখ্যাত সমবায়গুলির মোহর দেশে-বিদেশে সুপরিচিত ছিল। স্পষ্টতঃ
বাণিজ্যের উন্নতি নির্ভর করত এই মোহরগুলির বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর। ব্যবসায়ী
সম্প্রদায় প্রত্যেকটি সামগ্রীর আন্তর্দেশীয় এবং অন্তর্দেশীয় মূল্যও নির্ধারণ করে
দিত, যাতে
কোন অসৎ খুচরো বণিক (retailer)
অত্যধিক লাভের লোভে স্বদেশে কিংবা বিদেশের গ্রাহকদের ঠকাতে না পারে। সমবায়
থেকেই রাষ্ট্র বা রাজ্যের বাণিজ্য করও মিটিয়ে দেওয়া হত, মিটিয়ে
দেওয়া হত বিদেশের আমদানি এবং রপ্তানি শুল্ক। মৌর্য যুগে বাণিজ্য সামগ্রীর মূল্যের, এক পঞ্চমাংশ
ছিল উৎপাদন কর এবং উৎপাদন করের এক পঞ্চমাংশ ছিল বাণিজ্য কর। কৌটিল্যের
অর্থশাস্ত্রে এই কর ফাঁকি দিলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা ছিল।
ব্যবসায়ী সমবায়ের প্রধানরা অত্যন্ত ধনী ছিলেন, এর উদাহরণ
আমরা আগেই পেয়েছি। তাঁরা মহাজনী প্রথায় ঋণও দিতেন। সাধারণতঃ এই ধরণের ঋণের সুদ ছিল
বছরে শতকরা পনের টাকা। কিন্তু সামুদ্রিক বাণিজ্যের মতো ঝুঁকির ব্যবসার ক্ষেত্রে
তাঁরা ঋণ দিতেন শতকরা ষাটটাকা বাৎসরিক সুদে। রাজারা বিভিন্ন সময়ে পারষ্পরিক রাজ্য
জয় করলেও, বিজিত
রাজ্যের এই ধরনের প্রভাবশালী ও বিত্তশালী বণিক সম্প্রদায়কে তাঁরা সাধারণতঃ
ঘাঁটাতেন না। বরং নিজেদের স্বার্থেই তাঁদের সঙ্গে মৈত্রী এবং সদ্ভাব রাখার চেষ্টা
করতেন। যার ফলে এই ধরনের সমবায়গুলি সারা দেশ জুড়ে মোটামুটি নিশ্চিন্ত প্রভাবে
তাঁদের বাণিজ্য চালু রাখতে পারতেন। কোন রাজা কাকে জয় করলেন কিংবা কোন রাজা
রাজ্যচ্যুত হলেন, তাতে
এই বণিক সম্প্রদায়ের খুব একটা এসে যেত না।
তবে অযোগ্য রাজার প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে, পথেঘাটে, নদীপথে
কিংবা সমুদ্রপথে ডাকাতি,
লুঠপাট – এক কথায় অরাজকতা বেড়ে গেলে। কিংবা বিলাসী রাজারা খেয়াল খুশী মতো
অযৌক্তিক কর বাড়িয়ে চাপ সৃষ্টি করলে, সেই রাজারা বণিকদের মাথাব্যথার কারণ
হয়ে উঠতেন। এরকম কোন রাজার ওপর বণিকরা
বিরক্ত হয়ে উঠলে, প্রতিবেশী
বা উৎসাহী বিরোধী রাজাকে তাঁরা পরোক্ষে সাহায্যই করতেন। আমরা আগেই দেখেছি
নন্দরাজারা সাম্রাজ্যের সমস্ত ভূমি ও ভূমিসম্পদ কর যোগ্য করে তুলেছিলেন। নতুন এই
নিয়মে সাধারণের মনে বিক্ষোভ আসা অস্বাভাবিক নয়। উপরন্তু শোনা যায়, নন্দবংশের
শেষ রাজা ধননন্দ ছিলেন সীমাহীন রমণীবিলাসী উচ্ছৃঙ্খল রাজা এবং অযোগ্য প্রশাসক।
অতএব শক্তিশালী ধননন্দকে সরিয়ে অনেকটাই দুর্বল চন্দ্রগুপ্তকে সিংহাসনে বসানোর
পেছনে বণিক সম্প্রদায়ের অকুণ্ঠ সাহায্য যে ছিল, এমন মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে।
৩.৬.৫ ভারতের প্রথম সুবর্ণ যুগ
এই পর্বের প্রাককথায়, ৬০০ বিসিই
থেকে ০ বিসিই পর্যন্ত সময়কালকে আমি “সুবর্ণ যুগ” বলেছিলাম। আশা করি সে বিষয়ে আর
খুব বেশি ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। এই যুগে অখণ্ড ভারতবর্ষ, এক দেশ - এক
মহাদেশ হয়ে সমকালীন বিশ্বের কাছে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। ভারতের চিন্তা-ভাবনা-দর্শন
নির্দিষ্ট রূপ নিয়ে বিস্তার লাভ করছিল, দেশের ভিতরে এবং বাইরে। এই
ভাবনা-চিন্তার প্রসার ও প্রচারের হাত ধরে সারা দেশের শিক্ষিত সম্প্রদায় ধীরে ধীরে
সাক্ষর হয়ে উঠছিল। তাদের ভাবনা-চিন্তায় প্রভাব ফেলছিল বিশ্বের অনেকগুলি প্রাচীন
সভ্যতা – যেমন পারস্য,
মিশর, গ্রীস, ব্যাক্ট্রিয়া, রোম; পশ্চিমের
বেশ কিছু যুদ্ধবাজ পশুপালক উপজাতিও – শক, পার্থিয়ান, কুষাণ। এইসব
বিদেশী ভাবনা চিন্তার সঙ্গে দেশজ অনার্য-ব্রাহ্মণ্য-জৈন-বৌদ্ধ দর্শন মিলেমিশে -
একই সূত্রে বেঁধে ফেলছিল সুদূর চট্টগ্রাম থেকে কান্দাহার, কাশ্মীর
থেকে কন্যাকুমারীর ভারতবাসীকে। অঞ্চলভেদে তাদের ভাষা এক নয়, খাদ্যাভ্যাস, আচার-আচরণও
বিচিত্র – কিন্তু ভাবনা-চিন্তা এবং মূল প্রথা ও রীতিতে তাদের আশ্চর্য ঐক্য।
রাজনৈতিক স্বার্থে প্রাদেশিকতার বিষ আজ আমাদের মনে সঞ্চারিত হলেও, ব্যক্তিগত
পরিসরে সেই ঐতিহ্য আজও বহন করে চলেছেন প্রত্যেকটি সাধারণ ভারতবাসী।
তৃতীয় পর্ব সমাপ্ত
পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "
তৃতীয় পর্বের চিত্র ঋণঃ
১) https://commons.wikimedia.org/wiki/File:Jetvan_bharhut.JPG
২) https://en.wikipedia.org/wiki/Pillars_of_Ashoka
তৃতীয় পর্বের মানচিত্র ঋণঃ https://en.wikipedia.org/wiki/Maurya_Empire#/media/File:Maurya_Empire,_c.250_BCE_2.png
তৃতীয় পর্বের গ্রন্থঋণ ও তথ্যঋণঃ
১) The Penguin
History of Early India : Dr. Romila Thapar
২) কল্পসূত্র – ভদ্রবাহু (জৈন আগম শাস্ত্রের অংশ) – বঙ্গানুবাদ শ্রী
বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়।
৩) Old path
white clouds : Mr. Thich Nhat Hanh
৪) বুদ্ধচরিত – অশ্বঘোষঃ ভাষান্তর শ্রী সাধনকমল চৌধুরী
৫) বৌদ্ধ দর্শন – রাহুল সাংকৃত্যায়নঃ অনুবাদ শ্রীধর্মাধার মহাস্থবির
৬) গৌতম বুদ্ধ – ডঃ বিমলাচরণ লাহা
৭) Mauryan Empire – Mr Ranabir Chakravarti, Jawaharlal Nehru
University, India – The Encyclopedia
of Empire, First Edition. Edited by Mr John M. MacKenzie.
৮) Candragupta Maurya and his importance for Indian history – Mr
Johannes Bronkhorst, University of Lausanne, Switzerland– publication at:
https://www.researchgate.net, uploaded on 15 November 2015.
৯) The Oxford History of India – Late Vincent Smith; Revised by Sir
Mortimer Wheeler and Mr A. L. Basham (1981)
১০) The wonder that was India – A. L. Basham
১১) Asoka’s Edicts
– Dr. Amulyachandra Sen – Published by Indian Institute of Indology (July 1956)
১২) বাঙ্গালীর
ইতিহাস (আদি পর্ব) – ডঃ নীহাররঞ্জন রায়।