সোমবার, ১১ মে, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১৮

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/১৭ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)

অষ্টাদশ পর্বাংশ  


৪.৮.১১ চোল বা চোড়

তামিল চোল শব্দের অর্থ “ভবঘুরে”, অনেকে বলেন, সংস্কৃত “চোর” থেকে চোড় শব্দের সৃষ্টি, অথবা দক্ষিণ ভারতের “কোল” নামে প্রাক-আর্য জনগোষ্ঠীরাই চোল। যাই হোক না কেন, চোলরা ছিলেন দক্ষিণ ভারতেরই প্রাচীন জনগোষ্ঠীর মানুষ। যদিও পরবর্তীকালে তাঁরা নিজেদের পৌরাণিক সূর্যবংশীয় বলে পরিচয় দিয়েছেন।

প্রাচীন চোল-মণ্ডলম বলতে পেন্নার এবং ভেল্লারু (ভেল্লার) এই দুই নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলকে বোঝায়, অর্থাৎ আজকের তাঞ্জোর, ত্রিচিনোপল্লি এবং পাণ্ডুকোট্ট রাজ্যের কিছুটা। এই সীমানা অবশ্য চোল রাজাদের ক্ষমতা ও শক্তি অনুযায়ী কখনো বেড়েছে, কখনো কমেছে।

চোল বা চোড়দের নাম প্রথম শোনা যায় চতুর্থ শতাব্দী বি.সি.ই-র বৈয়াকরণ কাত্যায়নের পাণিনি-ভাষ্যে। এঁদের নাম মহাভারতে এবং সম্রাট অশোকের শিলা নির্দেশেও পাওয়া যায়। তিনি মৌর্য সাম্রাজ্যের সীমানার বাইরে বন্ধু রাজ্য হিসেবে চোল বা চোড়দের নাম উল্লেখ করেছিলেন। এরপর সিংহলের বৌদ্ধ গ্রন্থ “মহাবংশ” থেকে জানা যায়, দ্বিতীয় শতাব্দী বি.সি.ই-র মাঝামাঝি কোন সময়ে জনৈক চোল রাজা ইলার সিংহল দ্বীপ জয় করেন এবং দীর্ঘদিন রাজত্ব করেন। এরপর তামিল সাহিত্য গ্রন্থ “সঙ্গম”- থেকে জানা যায়, খ্রীষ্টিয় কয়েক শতাব্দী ধরে বেশ কয়েকজন মহিমান্বিত চোল রাজার কথা, যাঁরা সুবিচার এবং দানের জন্যে বিখ্যাত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন, ইলাঞ্জেটচেন্নির পুত্র করিকাল। তাঁর সময়েই নাকি চোল রাজ্যের বিস্তার এবং প্রভাব বৃদ্ধি ঘটেছিল। তিনি পাণ্ড্য ও চেরা রাজাদের এবং বেশ কিছু আঞ্চলিক গোষ্ঠী-প্রধানদের পরাস্ত করে চোলরাজ্য সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এরপর যে রাজার নাম পাওয়া যায়, তিনি হলেন পেরুনারকিল্লি, তিনি রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন এবং রাজা করিকালের মতোই অনেক কীর্তি স্থাপনা করেছিলেন। কিন্তু তৃতীয় এবং চতুর্থ শতাব্দী সি.ই.-তে চোলরাজ্য কিছুটা ম্লান হয়ে পড়ে, পল্লব, পাণ্ড্য এবং চেরদের ক্রমাগত আক্রমণে।

চোল বংশের নতুন রাজত্বের শুরু করেছিলেন রাজা বিজয়ালয়। যদিও তাঁর সঙ্গে প্রাচীন চোলদের সম্পর্কের সঠিক সন্ধানসূত্র পাওয়া যায় না। ৮৫০ সি.ই.-র কাছাকাছি কোন সময়ে তিনি পল্লবদের সামন্তরাজা হয়ে রাজত্ব শুরু করেছিলেন। শোনা যায় তিনি তাঞ্জাভুর বা তাঞ্জোর অবরোধ করে, পাণ্ড্য রাজার সামন্তরাজা মুত্থারাইয়ার প্রধানকে পরাজিত করেন।

প্রথম আদিত্যঃ রাজা বিজয়ালয়ের পর তাঁর পুত্র প্রথম আদিত্য ৮৭৫ সি.ই.-তে রাজা হয়েছিলেন। তিনি পরাক্রমশালী রাজা ছিলেন, এবং পল্লবরাজ অপরাজিত বর্মনকে পরাজিত করে, তোণ্ডামণ্ডলম অধিকার করে নিয়েছিলেন ৮৯০ সি.ই.-তে। তারপর পশ্চিমা-গঙ্গদের রাজধানী তালকড়ও নাকি অধিকার করে নিয়েছিলেন। তিনি শৈব ছিলেন, বেশ কিছু শিব মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন।

প্রথম পরান্তকঃ প্রথম আদিত্যের পুত্র প্রথম পরান্তক যখন রাজা হলেন, তখন চোল রাজ্যের সীমানা বিশাল – পূর্বের কলহস্তী এবং উত্তরের মাদ্রাজ (চেন্নাই), দক্ষিণে কাবেরী পর্যন্ত। তাঁর ৯০৭-৫৩ সি.ই.-র রাজত্বকালে এই সীমা তিনি আরও বাড়িয়েছিলেন। প্রথমে তিনি অধিকার করলেন পাণ্ড্য রাজা জয়সিংহের রাজ্য, যার জন্যে জয়সিংহকে সিংহলে পালাতে হয়েছিল। এই জয়ের পর তিনি “মাদুরাইকোণ্ডা” উপাধি নিয়েছিলেন। এরপর তিনি পল্লবরাজাদের সরিয়ে নেল্লোর পর্যন্ত পল্লব রাজ্য অধিকার করে নিলেন। অবশ্য তাঁর সিংহল বিজয়ের প্রচেষ্টা সফল হয়নি এবং পরবর্তীকালে রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় কৃষ্ণ তাঞ্জোর এবং কাঞ্চী অবরোধ করে ফেলেছিলেন। রাষ্ট্রকূটদের সঙ্গে যুদ্ধে প্রথম পরান্তকের জ্যেষ্ঠ পুত্র মারা গিয়েছিলেন, এবং শোনা যায় তৃতীয় কৃষ্ণ বিনা বাধায় রামেশ্বরম পর্যন্ত বিজয় অভিযান করেছিলেন। এই সময় চোলরাজ্য ভয়ংকর বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছিল এবং এখান থেকে উদ্ধার পেতে তাঁদের বহুদিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল। প্রথম পরান্তকও শৈব ছিলেন, তিনিও তাঁর পিতার মতো অনেক মন্দির প্রতিষ্ঠা করিয়েছিলেন। তাঁর সময়েই চিদাম্বরমের শিব মন্দিরের গর্ভগৃহ সোনায় মুড়ে দেওয়া হয়েছিল।

৯৫৩ সি.ই.-তে পরান্তকের মৃত্যুর পর বেশ কিছুদিন চোলদের খুব স্পষ্ট কোন ইতিহাস পাওয়া যায় না। শোনা যায় তাঁর দুই পুত্র গণ্ডারাদিত্য এবং অরিঞ্জয় রাজা হয়েছিলেন। তারপরে অরিঞ্জয়ের পুত্র সুন্দরচোল এবং তাঁর পুত্র দ্বিতীয় আদিত্য করিকাল এবং উত্তমচোল রাজা হয়েছিলেন। এঁরা সকলেই দুর্বল রাজা ছিলেন, এবং চোল রাজত্বে উল্লেখযোগ্য কোন প্রভাব ফেলতে পারেননি।

প্রথম-রাজরাজ(৯৮৫-১০১৪ সি.ই.) - সুন্দরচোলের পুত্র প্রথম-রাজরাজ রাজা হওয়ার পর চোলরাজ্যের আবার গৌরবময় পর্যায়ের সূচনা হয়েছিল। তিনি যখন রাজা হলেন, তখন চোল রাজ্যের বিশৃঙ্খল অবস্থা। কিন্তু তাঁর পরাক্রম, বুদ্ধি এবং রণদক্ষতা চোলরাজ্যকে দাক্ষিণাত্যের প্রধান রাজবংশ করে তুলেছিল। প্রথমেই তিনি চেরদের রাজ্য জয় করলেন, চের রাজ্যের কান্ডালুর ধ্বংস করলেন। এরপর জয় করলেন মাদুরা, সেখানকার পাণ্ড্য রাজা অমরভুজঙ্গকে বন্দী করলেন। এরপর জয় করলেন কোল্লাম এবং পশ্চিমঘাট পর্বতের দুর্গ শহর উদাগাই (উটি) এবং মালাইনাড়ু (কুর্গ)। এরপর তিনি উত্তর সিংহল জয় করে, ওই অঞ্চলের নাম রাখলেন, মুম্মদি চোলামণ্ডলম। এরপর তিনি গঙ্গবাড়ি এবং নোলাম্বাপাড়ি জয় করে মহীশূরের অধিকাংশ নিজের আয়ত্ত্বে আনলেন। রাজরাজের এই পরাক্রম স্বাভাবিকভাবেই চালুক্যরা ভাল চোখে দেখেননি, অতএব চালুক্যদের সঙ্গেও যুদ্ধ শুরু হল। তবে চালুক্য রাজ তৈলপের ৯৯২ সি.ই.-র লিপি থেকে জানা যায়, তিনি চোলদের গর্ব খর্ব করে দিয়েছিলেন। যদিচ তৈলপের পুত্র সত্যাশ্রয় (৯৯৭-১০০৮ সি.ই.) যখন রাজা ছিলেন, তখন চোলরা রাজরাত্তপাড়ি অধিকার করে চালুক্য রাজ্যের ভয়ংকর ক্ষতি করেছিলেন।

এরপর তিনি প্রাচ্য চালুক্যদের রাজ্য ভেঙ্গি অধিকার করেছিলেন, কিন্তু প্রাচ্য চালুক্যদের রাজা বিমলাদিত্য রাজরাজের বশ্যতা আদায় করেছিলেন। এই বশ্যতার পরিবর্তে রাজা বিমলাদিত্যকে, রাজরাজ তাঁর কন্যা, কুণ্ডাবাইকে দান করেছিলেন। এরপরেও তিনি কলিঙ্গ এবং লাক্ষাদ্বীপ ও মালদিভস জয় করেছিলেন। এভাবেই রাজরাজ সমগ্র তামিলনাড়ু, মহীশূরের অধিকাংশ অঞ্চল, কলিঙ্গ, সিংহল এবং অন্যান্য দ্বীপপুঞ্জ জয় করে, একক প্রচেষ্টায় চোল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছিলেন।

প্রথম রাজরাজের কৃতিত্ব শুধু মাত্র রাজ্য জয়েই নয়, তিনি বেশ কিছু বিস্ময়কর মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন, যা আজও আমাদের কাছে পরম গৌরবের বিষয়। যেমন তাঞ্জোরের শিবমন্দির, নিজের নামেই তিনি এই মন্দিরের নামকরণ করেছিলেন, “রাজরাজেশ্বর”।  শিব মন্দির ছাড়াও তিনি বিষ্ণু মন্দিরও নির্মাণ করিয়েছিলেন। বৌদ্ধ সঙ্ঘের জন্যে নেগাপতনমে একটি গ্রাম দান করেছিলেন। এই বিহারের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্মাতা ছিলেন সাগরপাড়ের মালয়-উপদ্বীপের রাজা শৈলেন্দ্র এবং বৌদ্ধ সন্ন্যাসী শ্রীমার-বিজয়তুঙ্গবর্মন।

প্রথম-রাজেন্দ্র গঙ্গাইকোন্ডা (১০১৪-৪৪ সি.ই.) - পিতার আসনে বসে প্রথম-রাজেন্দ্র, পিতার মতোই যোগ্যতা দেখিয়েছিলেন। তিনি পিতার প্রতিষ্ঠা করা সাম্রাজ্য অক্ষুণ্ণ তো রেখেছিলেনই, উপরন্তু জয় করেছিলেন, ইডিতুড়াইনারু (রায়চূর জেলা), বনবাসী (উত্তর কানারা), কোলিপ্পাক্কাই (কুলপক), মন্নাইক্কড়ক্কম (সম্ভবতঃ মান্যখেট)। এরপর তিনি জয় করেছিলেন সমগ্র সিংহল, যার উত্তর অংশ জয় করেছিলেন, তাঁর পিতা প্রথম রাজরাজ। এরপর তিনি পাণ্ড্য এবং কেরালাও অধিকার করে নিয়েছিলেন এবং সেখানে তাঁর পুত্র জাতবর্মনসুন্দরকে প্রশাসনিক প্রধান পদে বসিয়ে, ওই অঞ্চলের নাম দিয়েছিলেন, “চোল-পাণ্ড্য”। এরপর প্রথম-রাজেন্দ্র উত্তরের দিকে বিজয় অভিযানে মন দিলেন। একে একে তিনি জয় করলেন, ওড্ড-বিষয় (ওড্র-উড়িষ্যা), কোশলাইনাড়ু (দক্ষিণ কোশল), দন্তভুক্তির (দাঁতন- মেদিনীপুর) ধর্মপাল, তক্কন-লাঢ়মের (দক্ষিণ রাঢ়) রণশূর, বাংলাদেশের (পূর্ববঙ্গ) গোবিন্দচন্দ্র, মহীপাল, উত্তির-লাঢ়ম (উত্তর রাঢ়)। এই বিজয় অভিযানের সময়কাল মোটামুটি ১০২১ থেকে ১০২৫ সি.ই.।

                                    মানচিত্র ঋণঃ উইকিপিডিয়া। 

    প্রথম-রাজেন্দ্রর এই বিজয় অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতা প্রদর্শন, রাজ্য অধিকার করা নয়। অতএব তাঁর এই বিজয় অভিযানে কোন স্থায়ী ফল হল না, শুধু বঙ্গে কয়েকজন কর্ণাটকী সেনা প্রধান রয়ে গেলেন, পরবর্তীকালে যাঁরা সম্ভবতঃ সেনবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আর ফেরার পথে তিনি নিজের দেশে কয়েকজন শৈব পণ্ডিত বা সন্ন্যাসীকে নিয়ে গেলেন গঙ্গা পাড়ের কোন রাজ্য থেকে।

ভারতের ইতিহাসে প্রথম রাজেন্দ্রই প্রথম সম্রাট যিনি ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরের বেশ কিছু দেশে প্রভূত প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিলেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মলাক্কা প্রণালীকে তাঁর নৌবহর এবং বাণিজ্যতরী দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্ষ্মের (Khmer) বা কম্বোজ সাম্রাজ্যের সঙ্গে তাঁর শুধু যে নিবিড় বাণিজ্য সম্পর্কই প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তা নয়, দুই সাম্রাজ্যের মধ্যে স্থাপিত হয়েছিল গভীর হার্দিক সম্পর্কও। দুটি সাম্রাজ্যের মধ্যে সংস্কৃতি, শিল্প এবং ধর্মচিন্তার গভীর আদানপ্রদানও শুরু হয়েছিল। কম্বোজে অবস্থিত (আজকের কম্বোডিয়া) সুবিখ্যাত আঙ্কোর-ভাট মন্দির এবং ওই অঞ্চলের আরও অনেক বিক্ষিপ্ত মন্দির আজও সেই সুসম্পর্কের স্মৃতিই বহন করে চলেছে। কম্বোজ সাম্রাজ্যের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার কারণে দক্ষিণ চিনের সঙ্গেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ভারতের বাণিজ্য সম্পর্ক।  এবং শুধু এই পূর্বদিকেই নয়, সম্রাট প্রথম রাজেন্দ্রর এই বাণিজ্যিক নৌবহরের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল পশ্চিম দিকের আরব উপমহাদেশ, উত্তর আফ্রিকা, আন্তোলিয়া (এশিয়া মাইনর) এবং তুর্কিয়ে সাম্রাজ্য পর্যন্ত।

        আঙ্কোর ভাট মন্দির, কম্বোজ (কম্বোডিয়া) - চিত্র ঋণ - https://www.britannica.com/         

প্রথম-রাজেন্দ্র নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার নাম “গঙ্গাইকোণ্ডাচোলাপুরম” (আধুনিক গঙ্গাকুণ্ডপুরম)। এই রাজধানীতে তিনি দুর্ধর্ষ রাজপ্রাসাদ এবং মন্দির, সরোবর, স্থাপত্য নির্মাণ করিয়েছিলেন, কিন্তু কালের নির্মম নিয়মে সে সবই এখন ধ্বংসস্তূপ।

প্রথম রাজাধিরাজঃ (১০৪৪-৫২ সি.ই.) -প্রথম-রাজেন্দ্রর পুত্র প্রথম রাজাধিরাজ ১০৪৪ সি.ই.তে সিংহাসনে বসলেও, তিনি যুবরাজ হয়ে পিতার প্রশাসনে সহায়তা করেছে ১০১৮ সি.ই. থেকে। পিতার বহু অভিযানেই তিনি সফল সঙ্গী ছিলেন। কিন্তু চালুক্যরাজ প্রথম-সোমেশ্বর আহবমল্লের সঙ্গে যুদ্ধে ১০৫২ সি.ই.তে কোপ্পমের রণক্ষেত্রে তিনি প্রাণ হারান।

দ্বিতীয় রাজেন্দ্র দেব (১০৫২-৬৩ সি.ই.) –চালুক্যদের সঙ্গে নিরন্তর যুদ্ধ করেছেন, কিন্তু চোল সাম্রাজ্যের সীমা অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।

বীর রাজেন্দ্র (১০৬৩-৭০ সি.ই.) - দ্বিতীয় রাজেন্দ্রর পর রাজা হলেন, তাঁর ভাই বীর রাজেন্দ্র। তাঁর সময়ে চালুক্য ছাড়াও অন্যান্য রাজ্যের রাজাদের আক্রমণ ও বিদ্রোহ দমনেই তাঁর রাজত্বকাল শেষ হয়েছিল। যদিও তিনি তাঁর কন্যার সঙ্গে চালুক্য রাজকুমারের সঙ্গে বিবাহ দিয়ে, চালুক্যদের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন।

প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ (১০৭০-১১২২ সি.ই.) – বীর রাজেন্দ্রর পর তাঁর পুত্র অধিরাজেন্দ্র কিছুদিনের জন্য রাজা হয়েছিলেন, কিন্তু তিনি সিংহাসন অধিকারে রাখতে পারেননি বা অকাল মৃত্যু হয়েছিল। তাঁর পরে রাজা হয়েছিলেন প্রথম কুলোত্তুঙ্গ। চোলরাজ প্রথম-রাজরাজের কন্যা কুণ্ডাবাইয়ের সঙ্গে ভেঙ্গির চালুক্য রাজ বিমলাদিত্যের বিবাহ হয়েছিল। তাঁদের পুত্র রাজরাজ বিষ্ণুবর্ধনের সঙ্গে বিবাহ হয়েছিল চোলরাজা প্রথম-রাজেন্দ্রর কন্যা অম্মাঙ্গ দেবীর। তাঁদের পুত্রের নাম দ্বিতীয়-রাজেন্দ্র চালুক্য ওরফে প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ। প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ আবার বিবাহ করেছিলেন, চোলরাজ দ্বিতীয়-রাজেন্দ্রদেবের কন্যা মধুরান্তকীকে। অতএব অনুমান করা যায়, যেহেতু এই সময়ে চোল রাজপরিবারে সিংহাসনে বসার মতো যোগ্য কোন উত্তরাধিকারী পাওয়া যায়নি এবং যেহেতু তাঁর ধমনীতে চালুক্যদের থেকে চোল রক্তের পরিমাণ বেশি ছিল, সেহেতু প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ চোল রাজ্যের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন। সে যাই হোক, প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ চোল সাম্রাজ্যের বিস্তার মোটামুটি অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছিলেন। যদিও হোয়সল, পরমার, প্রাচ্য-গঙ্গ, পশ্চিমা-চালুক্যদের সঙ্গে যুদ্ধ বিবাদ লেগেই ছিল।

প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ ধর্মীয় এবং সাহিত্য বিষয়ে উৎসাহী ছিলেন। তিনি শৈব ছিলেন, কিন্তু বৌদ্ধ বিহারের জন্যেও অনেক দান করেছিলেন। কিন্তু যে কোন কারণেই হোক তিনি বৈষ্ণব আচার্য রামানুজমের ওপর বিরক্ত হয়ে, তাঁকে শ্রীরঙ্গম (ত্রিচিনোপল্লি) ছাড়তে বাধ্য করেন।  আচার্য রামানুজমকে হোয়সল রাজ বিত্তিগবিষ্ণুবর্ধনের মহীশূর রাজ্যে নিরাপদ আশ্রয় নিতে হয়েছিল। তিনি জয়গোণ্ডন, যিনি “কলিঙ্গত্তুপ্পারনি”-র রচয়িতা এবং আদিয়ারক্কুনাল্লারের, যিনি “শিলপ্পধিকারম”-গ্রন্থের রচয়িতা, পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

 পরবর্তী চোলরাজা

প্রথম-কুলোত্তুঙ্গর মৃত্যুর পর রাজা হয়েছিলেন তাঁর পুত্র বিক্রম চোল (১১২২-৩৩ সি.ই.)। তিনি বৈষ্ণব ছিলেন এবং তাঁর সময়ে আচার্য রামানুজম আবার চোলরাজ্যের শ্রীরঙ্গমে ফিরে এসেছিলেন। তাঁর পরে রাজা হয়েছিলেন দ্বিতীয়-কুলোত্তুঙ্গ (১১৩৩-৪৭ সি.ই.), দ্বিতীয়-রাজরাজ (১১৪৭-৬২ সি.ই.) এবং দ্বিতীয়-রাজাধিরাজ (১১৬২-৭৮ সি.ই.)। এঁরা সকলেই দুর্বল রাজা ছিলেন এবং এঁদের সময়ে চোল সাম্রাজ্য তার গৌরব দ্রুত হারাতে থাকে। হোয়সল, সিংহল, কেরালা সকলেই চোল সাম্রাজ্য থেকে নিজেদের স্বাধীন করে ফেলেছিলেন। তারপরে তৃতীয়-কুলোত্তুঙ্গ (১১৭৮-১২১৬ সি.ই.) দীর্ঘদিন রাজত্ব করলেও, অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন করতে পারেননি। এই সময় থেকেই পাণ্ড্য রাজাদের আধিপত্যে চোলরাজ্যের মূল সীমানাও খণ্ডিত হতে থাকে। মোটামুটি ১২৬৭ সি.ই.তে দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে চোলরাজ্য তার অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছিল।

চলবে...



রবিবার, ১০ মে, ২০২৬

ভাগ্যের পাথর - পর্ব ১

   

এর আগের রম্যকথা - " নিত্যযাত্রী "


পাড়ার বিশাখা বৌদির সঙ্গে হরিপদর বৌয়ের গলায় গলায় ভাব। বিশাখাবৌদির ননদের বড়ো জায়ের কাকিমা এক মহাতান্ত্রিকের খবর দিয়েছেন, বাবা কাত্যায়ন তন্ত্রার্ণববিশাখাবৌদি হরিপদর বৌকে বলেছে, হরিপদকে নিয়ে গিয়ে বাবা কাত্যায়নের সামনে ফেলে দে, তারপর দেখ তোদের কপাল কেমন খুলে যায়! হরিপদর বাবা ছিলেন বৈষ্ণব, হরির একান্ত ভক্ত। যখন তখন হরিপদর নাম ধরে ডাকলে, তাঁর নাকি হরিনামও করা হবে, তাই ওই নাম। কিন্তু প্রথম বিড়ি খেয়ে হরিপদ যেদিন বাড়িতে ধরা পড়েছিল, “হতভাগা হোর‍্যা, তুই বিড়ি খাওয়া ধরেছিস, হতচ্ছাড়া”? বলে পিঠে গুম গুম কিল বসিয়েছিলেন তার বাবা, সেদিন শ্রীহরি কাছে পিঠে কোথাও ছিলেন কি না, কে জানে?

আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন, স্বর্ণপদক প্রাপ্ত, তান্ত্রিক-কূল-চূড়ামণি বাবা কাত্যায়নের কাছে হরিপদ ও তার বৌ প্রথম গিয়েছিল মঙ্গলবারের সন্ধেতে। উত্তরকলকাতার ঠনঠনে কালিবাড়ির কাছে, ৮০ থেকে ১০০ বছরের পুরোনো বাড়ির একতলায়, মাথা নোয়ানো দরজাওয়ালা গুমোট ঘরে বাবার চেম্বার। হরিপদ ফেডেড জিন্স দেখেছে, এখানে এসে প্রথম দেখল, ফেডেড অজিন। নিচু জলচৌকির উপর বিছানো রোঁয়াওঠা হাতপা ছড়ানো হরিণের চামড়ার পিঠে বাবা কাত্যায়ন বসে আছেন বাবু হয়ে। মাথায় বিড়েবাঁধা তেলচিটে জটা। পোড় খাওয়া তামাটে কপালে দেড় ইঞ্চি চওড়া সিঁদুরের তিলক। গলায় রুদ্রাক্ষ, আর রংচঙে পাথরের মালা। দু হাতেও রুদ্রাক্ষের মালার বালা। খালি গা, ভালুকের মতো লোমওলা বুকে ধবধবে মোটা পৈতে। পরনে হ্রস্ব একটি রক্তাম্বর, ঘরের গুমোট গরমে সেটাও গুটিয়ে তোলা, উরুর অনেকখানি উপরে। সামান্য নড়চড়ায় বিপজ্জনক হয়ে ওঠা কিছু আশ্চর্যের নয়।

বাইরে জুতো খুলে এসে, ঘরে ঢুকে ওরা দুজনে বাবাকে প্রণাম করলপায়ের নখগুলো বাবার জন্মের পর থেকে নরুনের সংস্পর্শ রহিত, দেখেই বোঝা যায়। অন্য একজনের হস্ত রেখা বিচার করছিলেন, আর ফিসফিস করে কথা বলেছিলেন চশমার উপর দিয়ে রক্তচক্ষু তুলে ওদের দেখলেন, বললেন, “অফিসে বড়ো অশান্তি, না রে? তারা মার কাছে এসে পড়েছিস যখন আর চিন্তা নেই, যা বোস ওইখানটাতে”। 

হরিপদর বউ মুগ্ধ নেত্রে বাবার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর, হরিপদর কানের কাছে ফিস ফিস করে বলল, “দেকলে, বিশাকাদি ঠিকই বলেছিল, বাবা পুরো অন্তজ্জামি”হরিপদ ঘাড় দুলিয়ে সম্মতি দিল অপেক্ষা করতে লাগল বাবা কখন ডাকেনএকটু ভয়ও যে করছিল না তা নয়, বাবা যদি সত্যিই অন্তর্যামী হন, হরিপদর যৌবন কালে অনেক কেলেংকারির কথা আছে, যা হরিপদর বৌ জানে না। সে সব ফাঁস হয়ে গেলেই হয়েছে আর কি!

 মোটা কাঠের কড়ি-বর্গাওয়ালা নিচু ছাদের ঘর। সিলিংএ ঝুলে ঘাড় দোলাচ্ছে ফ্যানটা। দেখে মনে হল এ ফ্যানটা এই বাড়ির থেকেও পুরোনো। বৃটিশ জমানার হাল হকিকত বিস্তর দেখে এসেছে এখন বাবার কীর্তি দেখে অনবরত ঘাড় দুলিয়ে চলেছে। আওয়াজ উঠছে ঘট ঘট ঘট ঘট। মেঝে থেকে দেওয়ালের ফুটতিনেক অব্দি টকটকে লাল প্লাসিক পেন্টের আস্তর। বাকি দেওয়াল থেকে সিলিং ঘন সবুজ রঙের প্লাস্টিক পেণ্ট করাঘরে তিনটে ছানার জিলিপির মতো দেখতে সিএফএল জ্বলছে। রঙের জেল্লায় একটুও আলো ফুটছে না। বাবার বাঁ হাতের সামনে কাঠের একটা বহু পুরোনো ডেস্ক। তার ওপরে লেখার প্যাড আর ফাউন্টেন পেন। সামনে কালির দোয়াত।  ডেস্কের এক পাশে গুচ্ছের কোণা দুমড়ানো কাগজের তাড়া।

ডেস্কের ওপাশে মা কালীর কুচকুচে কালো মূর্তি। ফুট চারেক উঁচু। টকটক করছে তাঁর মুখের চারপাশ, জিভ, হাতের তালু আর চরণতল। চরণতলে শুয়ে আছেন দেবাদিদেব মহাদেব। মায়ের উপরের একহাতে বরাভয়, অন্য হাতে টিনের পাতলা খড়্গ। নিচের একহাতে কাটা মুণ্ডু, অন্য হাত খালি। গলায় নরমুণ্ড মালা। মায়ের লজ্জা নিবারণ হয়েছে অজস্র কাটা হাত ও পায়ের মালায়। মায়ের গলায় ঝুলছে একগোছা রক্তজবার মালা, একদম টাটকা। অনালোকিত এই ঘরের আলোয়, মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে, হরিপদর আবার মনে হল, বাবা কাত্যায়ন যদি সত্যিই অন্তর্যামী হন, তাহলে কী হবে?

 

যে লোকটি হাত দেখাতে এসেছিল, তার মনে হচ্ছে হয়ে গেল, কাত্যায়ন বাবা, জোরে বলে উঠলেন, “যাঃ, বেশি ভাবিস না। যেমন বললাম, মায়ের ওপর ভরসা করে, সব মেনে চল। তোর ভালো দিন আসছে, মনে রাখিস”।

“সবই আপনার কৃপা, বাবা” বাবার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে করতে বলল ভদ্রলোক।

“ছি, ছি। অমন কথা মুখেও আনিস না রে, ব্যাটাআমি কৃপা করার কে রে? কৃপা করছেন, জগত্তারিণী মহামায়া, মা তারাওই মাকে প্রণাম কর, মা-ই তোকে ঠিক পথে চালিয়ে এখানে নিয়ে এসেছেন। সামনের ঘোর অমাবস্যায় নীল সরেস্বতী মহাকালী যজ্ঞের আয়োজন কর, যেটুকু বিপদের জের এখনো আছে, কেটে যাবে একদম”।

“এই অমাবস্যায় হবে না, বাবা। ছেলেটার সামনে পরীক্ষা”।

“পরেরটায় দ্যাখ, নয়তো তার পরেরটা? মা অপেক্ষায় থাকবেন, চিন্তা করিস না”।

ঘাড় নেড়ে ভদ্রলোক মায়ের পায়ে প্রণাম করে উঠে যেতে বাবা কাত্যায়ন হরিপদদের ডাকলেন, “মন্ত্রে তন্ত্রে, পুজো পাঠে কিছুতেই তোর বিশ্বাস হয় না, না রে? সবটাই বুজরুকি, কি বল”?

“কি বলছেন, বাবা, বিশ্বাস না থাকলে আপনার কাছে, আসতাম”? হরিপদর বউ চমকে বলে উঠল।

“তোর কথা বলছি না, রে পাগলি? তোর স্বামীর কথা বলছি। দে তোর হাতটা বাড়া। ডানহাত নয় রে, বাঁ হাত, মেয়েছেলেদের বাঁহাত আর ব্যাটাছেলেদের ডানহাতে লেখা থাকে তাদের নিয়তি। আয়, আরেকটু সরে আয় তোর স্বামী সেই থেকে সব দেখে চলেছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। তান্ত্রিক-বাবাটা লোক কেমন। জোচ্চোর কিনা। চুক্কি মারছে, নাকি সত্যি কিছু জানে? তাই না রে। ভক্তি আন রে ব্যাটা, মনে ভক্তি আন”।

হরিপদর বউ আরেকটু সামনে সরে বসতে, বাবা কাত্যায়ন তার বাঁহাতটা ধরে কোলের উপর রাখলেন, বললেন, “ন্যায়নিষ্ঠ, বিবেকী, তত্ত্বজ্ঞানী, স্পষ্টবাদী এবং ক্ষণক্রোধীকি তোর স্বামীর মধ্যে এই গুণগুলো নেই”? হরিপদর গা জ্বলছিল কারণ, কথা বলতে বলতে বাবা কাত্যায়ন তাঁর কোলে তার বউয়ের হাতটা রেখে বিপজ্জনকভাবে ডলছিলেন

“ময়লা, ময়লা। ময়লা আমাদের সবখানে। ময়লা আমাদের মনে। ময়লা আমাদের দৃষ্টিতে। ময়লা আমাদের অতীত জীবনে। হাতের ময়লা না তুললে কি আর হাতের রেখা ফুটে ওঠে”? হরিপদর পাপী মন এবার চমকে উঠল, বাবা কাত্যায়ন কি সত্যি অন্তর্যামী?

“আজকের যুগে তোর স্বামীর মতোন লোক অচল। এমন লোওওওক অচঅঅঅঅল। একটুতেই রেগে ওঠে। অন্যায় করতে দেখলে ওপরওলাদেরও ছেড়ে কথা কয় না। এমন আহাম্মক। ওপরওলাদের তেল মাখাতে পারে না। উলটে কটকট করে সত্যি কথা শুনিয়ে দেয়! আশে পাশে সবাই দুনম্বরি পয়সা পকেটে ঢোকাচ্ছে, তোর স্বামী ন্যায় দেখছে, নীতি দেখছে। বিবেকের কুটুস কাটুস কামড় খাচ্ছে। ওর চেয়ে বয়সে ছোট, কিস্‌সু জানে না, আকাট মুখ্যু। শুধু তেল মেরে মেরে প্রমোশন পেয়ে কোথায় চলে গেল। তুই কতদিন একই জায়গায় পচছিস, দাঁড়া আমি বলছি, তা বছর সাতেক তো হবেই”?

সামনে বসে বিস্ফারিত চোখে এতক্ষণ হরিপদর বউ বাবার কথা শুনছিল, বউয়ের পিছনে বসে হরিপদও শুনছিল। বাবার এই  কথায় দুজনেই একসঙ্গে হুমড়ি খেয়ে পড়ল বাবার পায়ে। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে হরিপদর বউ বলল, “আপনি সব জানেন, বাবা। আপনার কাচে কিচ্চুটি গোপন নেই, আপনি অন্তজ্জামী। আটবছর ধরে ও একই জায়গায় পড়ে রয়েচেওর ওপরওলাগুলো কি যে বিষ নজরে ওকে দ্যাকে, সে আপনি জানেন, বাবা। আপনাকে এর একটা বিহিত করতেই হবে।”

“উতলা হোস না। শান্ত হস্বামীর জন্যে কত কী করতে হয়, সাধ্বী মেয়েদের। দাঁড়া তোর হাতটা এবার দেখি”। রক্তাম্বরে ঢাকা পড়ে যাওয়া হাতটা নিয়ে বাবা এবার খুব মন দিয়ে দেখতে লাগলেনহরিপদ আর তার বৌ দম বন্ধ করে অপেক্ষায় রইল বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে।

“ভৌম দোষ কি জানিস”?

“না বাবা, জানি না”।

“তোর ভৌম দোষ আছে। খুব খারাপ দোষ, সে কথা উচ্চারণ করতেও মন শিউরে ওঠেতোর স্বামী ছোটবেলায় মস্ত এক ফাঁড়া থেকে বেঁচে উঠেছিল না”?

“হ্যাঁ উঠেছিল, তো। আমার শ্বাশুড়ি মায়ের মুখে শুনেছি। বলো না গো, চুপ করে আছো কেন? বাবার কাছে সব খুলে বলতে হয়”। হরিপদর বউ কান্না ধরা গলায় বলল। হরিপদ বাবা কাত্যায়নের অলৌকিক ক্ষমতায় একদম কাবু হয়ে গেল, আমতা আমতা করে বলল, “আমি তখন ক্লাস ফোর কি ফাইভে পড়ি। আমাদের স্কুলের পুকুরের গায়েই একটা বড়ো আমগাছ ছিল। সেই আমগাছ থেকে আম পাড়তে গিয়ে ডাল ভেঙে পড়েছিলাম পুকুরের জলে...”।

“পড়তেই হবে। পঞ্চমে শনি আর তৃতীয়ে মঙ্গল। একেবারে মোক্ষম মৃত্যুর যোগ। বেঁচে থাকার কথাই নয়। বেঁচে আছে সপ্তমে বৃহষ্পতি ছিল বলে। সে যাত্রায় রক্ষে পেলেও এবারে কিন্তু ভীষণ সংকট। আজ থেকে মোটামুটি দু বছর বাদে, মোটামুটিই বা কেন? তোর জন্ম মাসটা কবে? চোত না মাঘ”?

“আজ্ঞে বাবা, আষাঢ় মাসে”।

“ওই একই হল। চৈত্রমাঘাষাঢ় মাসঞ্চ আপ্নোতি জাতকঃ সমফলং অর্থাৎ কিনা, চোত, মাঘ কিংবা আষাঢ় মাসের জাতকদের ভাগ্যফল একই হয়ে থাকে”চোখ বন্ধ করে বাবা কাত্যায়ন কিছু চিন্তা করে আবার বললেন, “আজ থেকে ঠিক এক বছর ন মাস পড়ে তোর বৈধব্য যোগ রয়েছে। বৈধব্য যোগ কিংবা ভৌম দোষ, জীবনে খুবই কঠিন সংকটময় কাল”।

রুদ্ধ কান্না আবার উথলে নিয়ে হরিপদর বউ বলল, “তাহলে আমার কী হবে, বাবা। কোন কী উপায় নেই? একটা কিছু উপায় আপনাকে করতেই হবে, বাবা”।

“শনিকে সামলানো যায়, কেতু কে সামলানো যায়, কিন্তু শনি আর কেতু একসঙ্গে হলে রক্ষা পাওয়া মুশকিলচারদিক থেকে ছেঁকে ধরেছে শত্রুরা। ভেতরে শত্রু, বাইরে শত্রু। মুখে মিষ্টি হাসি, মিষ্টি কথা, কিন্তু পিঠে ছুরি বসিয়ে যাচ্ছে, খুব কাছের লোকরাও কর্মক্ষেত্রে রাহুর দৃষ্টি, তোর কত্তাকে মাথা তুলে দাঁড়াতে দিচ্ছে না”।  

“ওসব আমি কিচ্চুটি জানি না বাবা, এই আমি আপনার চরণে পড়ে থাকবো, যতক্ষণ না আপনি এর বিহিত করছেন”। হরিপদর বউ বাবা কাত্যায়নের চরণ ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল।

“আহা, আহা করিস কি? করিস কি? মেয়েছেলের চোখের জল, আমি যে আবার সহ্য করতে পারি নে। আছে আছে, উপায় আছে, কিন্তু সে তো আমার হাতে নেই রে! সে আছে আমার খ্যাপা মায়ের হাতে। কুপিত গ্রহশান্তির জন্যে খরচের ব্যাপারে কিন্তু কোন কার্পণ্য করলে চলবে না”।

“বাবা, খরচ আগে, না আমার মানুষটা আগে? মানুষ বাঁচলে অনেক টাকা রোজগার করবে, বাবা। আপনি শুধু উপায় বলুন”।         

“অতি উত্তম। কই হে, রত্নধর, শুনলে তো সব কথা”?

লাল ফতুয়া পড়া রত্নধর ঘরেই দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসেছিল, এতক্ষণ চোখেই পড়েনি। ছায়া মাখা লাল দেয়ালে মিশে ছিল তার চিমসে হাড়গিলে শরীর। সামনে সরে এসে জোড়হাতে বলল, “আজ্ঞে শুরু থেকে সবই দেখলাম, বুঝলাম এবং শুনলাম, গুরুদেবএখন আদেশ করুন”

“ছ রতির পীতাম্বরি নীলা, মধ্যমায়। আট রতির রক্ত প্রবাল অনামিকায়। চার রতির সিংহলী চূণী কনিষ্ঠায়। চার রতির বসরাই মুক্তা তর্জনীতে। ছ”রতির পান্না, ছ”রতির গোমেদ আর চার রতির পোখরাজ”।

হরিপদ অধৈর্য হয়ে বলে উঠল, “বাবা, হাতে অত আঙুল কোথায়”? বাবা অভয় হাত তুলে বললেন,

“সব বলে দেব। কথার মাঝখানে কথা বলিস না, মূর্খ। রত্নধর কি বলছিলাম যেন”? রত্নধর প্যাডে লিখতে লিখতে বলল, “আজ্ঞে, গুরুদেব, নীলা, পলা, চূণী, মুক্তো, পান্না, গোমেদ, -পোখরাজ। শুধু হীরে আর ক্যাট্‌স্‌ আইদুটো বাকি রয়ে গেল”।

“হ্যাঁ ঠিক আছে। নীলা, আর পলা বসবে রূপোর আংটিতে। চূণি আর মুক্তো সোনার আংটিতে। বাকি পান্না, গোমেদ আর পোখরাজ রূপোর চেনে বসিয়ে ঊর্ধ্ববাহুতে ধারণ করতে হবে। এসব হচ্ছে তোর স্বামীর জন্যে বুঝেছিস? তোর জন্যে তেমন কিছু না হলেও চলে যায়। তবুও চার রতির পান্না আর ছরতির গোমেদ ধারণ করলে লাভ বৈ কোন ক্ষতি তো নেই।  তারা তারা, মাগো, তাড়া। রত্নধর আমার এখন মাতৃসেবার সময় হয়েছে। তুমি ওদের নিয়ে ও ঘরে যাও, তোমাদের এই অর্থ অনর্থের টানা-পোড়েনের মধ্যে আমি থাকতে চাই না, ওসবে আমার একেবারেই রুচি হয় না”।  হরিপদর বউ এবং হরিপদ শেষ বারের মতো প্রণাম করে বলল, “বাবা, সব ঠিক হয়ে যাবে তো”?

“চেষ্টা তো করছি রে, পাগলি? এখন সবই মায়ের ইচ্ছে। সব কটা রত্ন সামনের মঙ্গলবারের মধ্যে আমার কাছে নিয়ে আয়। দেরি করিস না। কটা রত্ন এ মাসে ধারণ করবি, পরের মাসের মাইনে পেলে বাকিগুলো! ওসব কথা মনেও ঠাঁই দিস নে। যত দেরি করবি, ততই গুঁড়ি মেরে বিপদ ঘনিয়ে আসবে...। আমার কাছে নিয়ে আসবি, মায়ের চরণ ধোয়া জলে আমি শোধন করে দেব। বলে দেব রত্ন ধারণ করার মোক্ষম সময় আর দিন। তারপর রাখলে মা তারাই রাখবেন, মারলে তিনিই মারবেন”।

“তাই হবে, বাবা, তাই হবে। আপনি যে একটা উপায় বলে দিয়েছেন, এ যে আমাদের কি ভাগ্যি, বাবা। বাবা আপনার দক্ষিণা”?

“ও কথা মুখেও আনিস না রে, ওরে পাগলি, আমি যে দক্ষিণা নিতে পারি নামায়ের সেবায় আবার দক্ষিণা কি রে? মায়ের আদেশ, “কাত্যায়ন, শোকেতাপে, সংসারের জ্বালায় পোড়া-মানুষগুলো, তোর কাছে আসে বিপদ থেকে মুক্তি পেতে। তোর অন্ন বস্ত্রের অভাব আমি রাখবো না, বাবা। তুই শুধু ওদের থেকে কোন পয়সা নিতে পাবি না”। ন্যাংটা মায়ের আমি ন্যাংটা ব্যাটা, আমার আবার অভাব কিসের, যে টাকা হাতাবো? যা কিছু দিবি মায়ের পায়ের কাছে রাখা ওই দান-পেটিতে ঢেলে দে। তবে মায়ের সেবায়, দুশো একান্নর নিচে না দেওয়াই ভালো, ওর কমে মায়ের সেবা হয় না”।

 হরিপদর কানে কানে হরিপদর বউ কিছু বলল। হরিপদ, তিনশ টাকা আর একটাকার একটা কয়েন গুঁজে দিল মায়ের পায়ের কাছে রাখা দান-পেটির স্লটে বাবা নির্লিপ্ত চোখে দেখে বললেন, “যা। এবার আমার মায়ের সঙ্গে  আলাপের সময় হলওঘরে গিয়ে সব রত্নের মাহাত্ম্য বুঝে নে রত্নধরের থেকে শুভকাজে দেরি করিস না, তাড়াতাড়ি যা। মা তারা, তাড়া, তাড়া, সবার বিপদ তাড়া, বিপত্তারিণী মাগো”

চলবে...

শনিবার, ৯ মে, ২০২৬

ওঁ শান্তিঃ (নাটিকা)

  এর আগের গল্প - " জঙ্গী ব্যবসা "

এর আগের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক " 

এর আগের নাটক - " এক দুগুণে শূণ্য




 

[প্রাককথাঃ ব্রহ্মশাপের কারণে তক্ষকের দংশনে রাজা পরীক্ষিতের যখন এক অলৌকিক মৃত্যু হয়েছিল, তখন তাঁর পুত্র জন্মেজয় ছিলেন নাবালক। সাবালক হয়ে তিনি হস্তিনাপুরের পিতৃ-সিংহাসনে বসে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তাঁর পিতার হত্যাকারীদের বিনাশ করবেন। তাঁর মন্ত্রীসভা (এই মন্ত্রীসভার অনেকেই ছিলেন রাজা পরীক্ষিতেরও মন্ত্রীমণ্ডলে!) সিদ্ধান্ত করলেন সর্পদংশনই রাজা পরীক্ষিতের মৃত্যুর একমাত্র কারণ, এবং পরামর্শ দিলেন, সর্পসত্র যজ্ঞে সর্পবংশ ধ্বংস করলেই তাঁর পিতার মৃত্যুর প্রতিশোধ হতে পারে। সেই পরামর্শ মেনে রাজা জন্মেজয় সর্পযজ্ঞ করেছিলেন।

মহাভারতে তাৎপর্যপূর্ণ কিছু ইঙ্গিতসহ এই ঘটনার পূর্ণ বিবরণ আছে, যার থেকে গভীর এক ষড়যন্ত্রের আভাস পাওয়া যায়। সেই নিয়েই এই নাটিকা- “ওঁ শান্তিঃ”।]                    

 

পাত্র-পাত্রী

নির্মল – মহামন্ত্রী

বিভূতি – রাজগুরু

বিজু - সেনাপতি

 শৃঙ্গী, কৃশ, মহামুনি শমীক, মহামুনি কশ্যপ,  ব্রাহ্মণবেশী নাগরাজ

 

[নাটক শুরু হতে সামান্য দেরি। পিছনে পর্দা নিয়ে মঞ্চেই মুখোমুখি বসে আছেন তিনজন। তিনজনে নিজেদের মধ্যে কিছু কথা বলছে। তিনজনের মধ্যে দুজন বয়স্ক, একজন হাট্টাকাট্টা যুবক। বয়স্ক দুজনের, একজন বিভূতি, অন্য জন নির্মল, আর ছোকরা বিজয়, ডাক নাম বিজু। যুবকের পরনে জামা-প্যান্ট। বয়স্ক দুজনের পরনে ধুতি। নাটক শুরুর প্রথম ঘণ্টা শেষ হতে, ওদের আলাপ শোনা গেল।]

 

বিজুঃ   নাটকটা তুমি ভালই লেখ, নির্মলদা। কিন্তু এই মহাভারত-টারত না চটকে, অন্য কিছু নিয়ে লেখ না, কেন? কত কী বিষয় রয়েছে! যেমন ধরো রাজনীতি। দুর্নীতি। ষড়যন্ত্র। হত্যা। রহস্য।

নির্মলঃ  কেন তোর কী মনে হয়, মহাভারতে ওসব নেই?

বিজুঃ   কী জানি দাদা। মহাভারত মানেই চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করা ডায়ালগ। সত্যের জয়, মিথ্যের ভয়। আজগুবি যত মেসেজ। পাবলিক নেয় না। 

নির্মলঃ  তা পাবলিক কী নেয় শুনি?

বিজুঃ  এই তো গতবার পুজোয় “খেলাধুলো” ক্লাব নাটক নাবাল, “সংসারের সং”। লিখেছিল প্রকাশ দস্তিদার। প্যানপেনে ফ্যামিলি ড্রামা, কিন্তু সব মিলিয়ে কমপ্লিট প্যাকেজ। প্রতিটা সিনে পাবলিকের কী ক্ল্যাপ। যেন হাজার হাজার পায়রা উড়ছে!

বিভূতিঃ ও নির্মল, এ যে এখনও বাবুদের মতো পায়রা ওড়াতে চায়।

নির্মলঃ তা ভালো। কিন্তু বিজু আমার নাটক মহাভারত নিয়ে হলেও, তাতে তো লম্বা চওড়া ডায়ালগ থাকে না।

বিজু:    না, তা থাকে না।

নির্মলঃ  চকচকে ঝকঝকে পোষাক, মুকুট-গয়না কিছুই তো থাকে না।

বিভূতিঃ না, না কিচ্‌ছু থাকে না। মহাভারত মনেই হয় না। মনে হয়ে ঘরের দাওয়ায় বসে আটপৌরে আলোচনা হচ্ছে।

বিজুঃ   তা ঠিক।

নির্মলঃ  আর নাটকে মেসেজ যা দিই, তাতে হাততালি মেলে না। তবে পাবলিক মাথা চুলকোয়। চিন্তা করে। চিন্তার তো আওয়াজ হয় না, বিজু!

 

[দ্বিতীয় ঘন্টা পড়ল]

 

বিভূতিঃ ঘন্টার আওয়াজ শুনলে, নির্মল। নাটক শুরু কর।

নির্মলঃ  ইয়েস। গেট রেডি। মেকআপ করে নাও চটপট। এখনই নাটক শুরু হবে।

 

[পর্দা পিছনে নিয়ে, মঞ্চের সামনে বসেই তিনজন মেকআপ সেরে নিল। বিজুর হাতে প্লাস্টিকের তলোয়ার। বিভূতি জামা খুলে খালি গা, তার কাঁধে পৈতে, হাতে রুদ্রাক্ষের মালা। নির্মল মাথায় চাপিয়ে নিল একটা টুপি, তার মাথাভরা চুল আর নেই, যেন মাথা জোড়া বিশাল টাক। এতক্ষণ যে ভাবে বসেছিল, সে ভঙ্গিগুলোও পাল্টে গেল। বিজু উঠে দাঁড়াল, তার ভঙ্গিতে বীর ভাব, সে এখন সেনাপতি। কুচুটে ব্রাহ্মণের ছদ্মবিনয়ী ভাব নিয়ে বসল বিভূতি, রাজগুরু। আর দুনিয়ার যত চিন্তা মাথায় নিয়ে, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত নির্মল, মহামন্ত্রী। সকলেই প্রস্তুত, সকলেই চিত্রার্পিতের মতো স্থির।]

 

[তৃতীয় ঘন্টা পড়ল]

 

সেনাপতিঃ       মন্ত্রিমশাই, গুরুদেব, আপনারা আমার প্রণাম নেবেন। প্রাসাদের সব সংবাদ কুশল তো?   

মহামন্ত্রিঃ         আশীর্বাদ নাও, সেনাপতি। আপাত দৃষ্টিতে প্রাসাদের সব খবরই ভাল। দুশ্চিন্তার কারণ নেই, তবে চিন্তা আছে!

রাজগুরুঃ        [জপ করছেন, যেন মৌনব্রত, হাত তুলে আশীর্বাদের ভঙ্গি করলেন।]

মহামন্ত্রীঃ         বস, সেনাপতি বস। তারপর সীমান্তের খবর কী? যুদ্ধ-বিগ্রহের কোন আশঙ্কা নেই তো?

                 [সেনাপতি বসল।]   

সেনাপতিঃ       বিলক্ষণ, নেই আবার? শত্রুরা তো মুখিয়ে আছে, আক্রমণ করার জন্যে। সরাসরি যুদ্ধে পেরে উঠবে না জেনে, ঘাপটি মেরে বসে আছে। আর চোরাগোপ্তা লোক ঢুকিয়ে লাগাতার ঝামেলা পাকিয়ে চলেছে। অসতর্ক হবার কোন জো নেই। এই সময়েই পেলাম রাজামশাইয়ের জরুরি তলব। দৌড়ে এলাম।

রাজমন্ত্রিঃ        রাজামশাইয়ের দেখা পাবে কাল সকালে - রাজসভায়। এখন আমরাই তোমাকে ডেকেছি, খুব জরুরি একটা আলোচনার জন্যে।

সেনাপতিঃ       সে আলোচনাটা একটু তাড়িতাড়ি সেরে ফেলা যায় না, মন্ত্রিমশাই? পাঁচমাস পরে সীমান্ত থেকে ফিরে...। ঘর থেকে বেরোনোর মুখেই বালিকা কন্যা সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়ালো, বলল, এতদিন পরে এলে, বাবা, তুমি এখনই আবার কোথায় যাচ্ছো? মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি তার চোখ ছল ছল করছে। অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়েছে। তাকে কোলে নিয়ে বুঝিয়ে সুঝিয়ে মায়ের কোলে রেখে তবে বেরোতে পারলাম।

 রাজগুরুঃ       হে হে হে, প্রাণ হাতে নিয়ে ঘোরা ফেরা করাই আপনাদের কাজ। এই ঘোড়া নিয়ে ঘুরছেন টগবগ করে, আর এই হয়তো বুকে শত্রুর তির বিঁধে টপকে পড়লেন ঘোড়ার পিঠ থেকে। কখন কী হয়, বলা যায়? আপনাদের জীবন যেন পদ্মপাতায় জল।   

সেনাপতিঃ       তবে? আমাদের সঙ্গে কার তুলনা? (একটু চাপা স্বরে) আমরাই তো যুদ্ধক্ষেত্রে জীবন দিয়ে লড়ি, সীমান্ত রক্ষা করি। অন্যরাজ্য জয় করে, ধন সম্পদ এনে রাজকোষ ভরে তুলি। আমাদের জন্যেই রাজ্য আর রাজাদের এত ঠাটবাট, চমকদমক, ফুর্তিফার্তা। বলি রাজাকে রাজা বানায় কে? আমরাই তো, নাকি? 

রাজগুরুঃ        কথাটা খুব মন্দ বলেননি, সেনাপতি মশাই। তবে আমরাও কিছু কম যাই না, এটা তো মানবেন? এই আমরা যদি, মন্ত্র-টন্ত্র পড়ে, যুদ্ধে যাবার শুভ দিনক্ষণ না দেখে দিই, রাজ্যজয় করা যেত কি? ঠিক ঠিক দেবতাকে, মোক্ষম লগ্ন দেখে, তাঁদের মনোমত ভোগ দিয়ে, ইন্দ্র, অগ্নি, পবন, সূর্য, চন্দ্র সক্কলকে আমরা হাতের মুঠোয় ধরে রাখি বলেই না, রাজ্যের, রাজার, সমস্ত লোকজনের এত জয় জয়কার, এত সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি।   

সেনাপতিঃ       ঠাকুরমশাই, আমাদের ওদিকে একবার চলুন না, আপনার শান্তিজলের কুণ্ডটা নিয়ে!

রাজগুরুঃ        কোথায়?

সেনাপতিঃ       কেন, সীমান্তে? আমাদের সকলকে এক সঙ্গে বসিয়ে মাথায় একছিটে করে জল দেবেন, আর মন্তর ঝাড়বেন, ওঁ শান্তিঃ, ওঁ শান্তিঃব্যস, যুদ্ধের বালাই চিরকালের মত ঘুঁচে যাবে।

রাজগুরুঃ        ধুর খ্যাপা, তাই কখনো হয় নাকি? মনটাকে মায়া থেকে, মোহ থেকে তুলে আনতে হয়। মনের মধ্যে অহংকার, লোভ, হিংসার লেশমাত্র থাকলে হবে না। তবে না শান্তি আসবে!

সেনাপতিঃ       তা মনের এই দারুণ দারুণ ব্যাপার স্যাপারগুলো কার থাকা জরুরি, ঠাকুরমশাই? যে জল নেবে তার, নাকি যিনি জল ছিটোবেন, তাঁর?

রাজগুরুঃ        তা মন্দ বলেননি, ভায়া। সত্যি বলতে দুজনের পক্ষেই জরুরি। তবে আমরা কিনা ব্রাহ্মণ, তাই ওগুলো আমাদের পক্ষে কম হলে ক্ষতি হয় না; কিন্তু অন্যদের পক্ষে একেবারে অনিবার্যরকম জরুরি। হে হে হে হে।

সেনাপতিঃ       (মিচকে হেসে) তার মানে এই শান্তি-টান্তি ব্যাপারগুলো বলছেন, পুরোটাই গোলা ব্যাপার?

রাজগুরুঃ        নির্ঘাৎ, তবে মুখ ফুটে বলতে নেই, এই আর কি!

মহামন্ত্রিঃ         [কথার ভঙ্গিতে বেশ বিরক্তি] আপনাদের এই ডেঁপো কথাবার্তা আর কতক্ষণ চলবে বলুন দেখি? আপনারা দুজনেই রাজ্যের দুই স্তম্ভ, কিন্তু আপনাদের বাচালতা দেখে স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছি।  

সেনাপতিঃ       চুপচাপ আর কতক্ষণ বসে থাকা যায়, বলুন দেখি? তাই এই বিশ্রম্ভালাপ, বুঝলেন না? কিন্তু আপনি খুব দুশ্চিন্তায় রয়েছেন মনে হচ্ছে। কী ব্যাপার বলুন তো?

মহামন্ত্রিঃ          আমার আবার কিসের দুশ্চিন্তা? কিছুই না।

সেনাপতিঃ       উহুঁ, সে বললে শুনছি না, কিছু একটা চিন্তার মধ্যে নিশ্চয়ই আছেন। এতক্ষণ এখানে বসে রয়েছি, কথাই বলছেন না; যাও বা বলছেন কেমন যেন বিরক্তির ভাব। এ সবই দুশ্চিন্তার লক্ষণ। কী হয়েছে বলুন না, রাজামশাই কিছু হুজুগ তোলার মতলব ভাঁজছেন, নাকি? বলুন না, মন্ত্রিমশাই, সমস্যার কথা ভাগ করে নিলে, অনেক সময় তার সমাধানও বেরিয়ে আসে। অবিশ্যি ব্যক্তিগত কোন ব্যাপার হলে আমি জোর করব না।

মহামন্ত্রিঃ         আরে না, না, এই বয়েসে আবার ব্যক্তিগত কী? ছেলেমেয়েদের বিয়ে থা হয়ে যে যার মতো সংসার ধর্ম পালন করছে। আমরা বুড়োবুড়ি খাইদাই গান গাই। আমাদের আবার সমস্যা কী?

সেনাপতিঃ       তা হলে? তার মানে পারিবারিক কোন সমস্যা নয়, সমস্যাটা এখানকার, মানে এই রাজসভার। (চাপা স্বরে) রাজা তাঁর অকালের কুমড়ো শালাটিকে সহমন্ত্রি করে, আপনার ঘাড়ে চাপাতে চাইছে নাকি?

মহামন্ত্রিঃ         হা হা হা, না, না, সে সবও কিছু নয়। এই রাজার সেই দাদুর আমল থেকে রাজসভায় আছি, এর বাবাকেও সামলেছি। রাজা আমাকে যথেষ্ট ভক্তিছেদ্দা করে। সব ব্যাপারে, এ রাজাও বাপ ঠাকুদ্দাদের মতই, আমাকে মান্যিগণ্যিও করে, তবে...

সেনাপতিঃ       তবে? আর কী সমস্যা? রাজকোষে ধনসম্পদ উপচে পড়ছে। গত চার পাঁচ বছর বর্ষা ভাল হওয়াতে, চাষবাস ভালই হয়েছে, জনগণ কর দিতেও কোন কারচুপি করেনি। আমার গুপ্তচরদের থেকে যা জেনেছি, দেশের মানুষ মোটামুটি খুশিই আছে। কোথাও কোন বিক্ষোভ বা বিদ্রোহের কোন সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না, তাহলে আর সমস্যা কিসের?

মহামন্ত্রিঃ         ঠিক তাই, কোন সমস্যাই নেই, কিন্তু রাজা নিজেই সমস্যা ডেকে আনতে চাইছেন, অন্ততঃ আমার সেই রকমই ভয় হচ্ছে।

সেনাপতিঃ       কি রকম?

মহামন্ত্রিঃ         রাজামশাই হঠাৎ কদিন ধরে আমাকে চেপে ধরেছেন, তাঁর পিতার মৃত্যুর জন্যে কে বা কারা দায়ী, আমাকে খুলে বলতে হবে।

সেনাপতিঃ       এতে সমস্যা কোথায়? পিতার মৃত্যুর সময়, আমাদের রাজা নিতান্ত বালক ছিলেন। তিনি এখন বড়ো হয়েছেন, পিতার অকালমৃত্যুর কথা জানতে চাইবেন না? অন্তঃপুরের মহিলা মহলে আবাল্য নানান গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর যা শুনেছেন, সে সব কথার সত্যতা বুঝতে চাইছেন আর কি? এর জন্যে আপনি চিন্তা করছেন কেন?

মহামন্ত্রিঃ         সেনাপতিমশাই, আমরা সবাই রাজপিতার মৃত্যুর কারণ জানি। আমি আর ঠাকুরমশাই চোখের সামনেই সেই ঘটনা ঘটতে দেখেছি। কি ঠাকুরমশাই, চুপ করে রয়েছেন কেন, বলুন না, দেখেননি?

রাজ গুরুঃ       দেখেছি বৈকি, চোখের সামনে দেখেছি। এখনও সে দৃশ্য মনে পড়লে শিউরে উঠি। সব্বাই ছিলাম, কিন্তু কোন প্রতিকারও করতে পারিনি। আপনার কী মনে হয়, সে ঘটনার কোন প্রতিকার করতে পারিনি বলে, রাজামশাই আজ বিচার করে আমাদের সাজা দেবেন?

মহামন্ত্রিঃ         আমাদের শাস্তি দেবেন? কে জানে, দিতেও পারেন। কিন্তু আমার সে ভয় হচ্ছে না। রাজা এখন সদ্য যুবক, তাঁর পিতার মৃত্যুর পর আজ পর্যন্ত তাঁর গায়ে আমরা কোন আঁচ লাগতে দিইনি। কখনো কোন কঠিন পরিস্থিতিতেও তাঁকে পড়তে হয়নি। এখন পিতার মৃত্যুর জন্য যারা যারা দায়ী, সেই কথা শুনে উত্তেজিত হয়ে, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রায় যাওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। সেই ভয়ংকর মৃত্যুর জন্যে কে দায়ী আমরা জানি। সেই ব্যক্তি যদিও আজ আর নেই, কিন্তু তার রাজ্য কতটা শক্তিশালী সে কথাও আমরা সকলেই জানি।

সেনাপতিঃ       মন্ত্রীমশাই নাগরাজ্যের কথা বলছেন বোধ হয়। শক্তিতে আমাদের সমকক্ষ বলাই যায়, লড়াই হলে জয়পরাজয় যাই হোক, ক্ষতির পরিমাণ যা হবে, তা সামলে ওঠা কঠিন হবে সন্দেহ নেই। এই কারণেই আপনি এমন চিন্তাগ্রস্ত বুঝতে পারলামএমন কী কিছু করা যায় না, যাতে সাপও মরে কিন্তু লাঠি না ভাঙে?

মহামন্ত্রিঃ         আছে বৈকি, সে উপায় আছে। বহুদিন - প্রায় আঠারো বিশ বছর আগের কথা, সাধারণ লোক সে সব দিনের কথা অনেকটাই ভুলে গেছে। এতদিন পরে কিছু কিছু ঘটনা একটু অন্য চোখে দেখতে বা দেখাতে পারলে, ঘটনার তীব্র তিক্ততা হয়তো কমানো সম্ভব, সেক্ষেত্রে আমাদের এই রাজ্য ও রাজ্যবাসী - উভয়েরই মঙ্গল। 

সেনাপতিঃ       মন্ত্রীমশাই, রাজামশাইকে এই ঘটনার পূর্ণ বিবরণ একদিন না একদিন, আমাদের বলতেই হবে। আপনি চাইছেন, রাজামশাইয়ের কাছে আপনি যে ঘটনার কথা বর্ণনা করবেন, আমরাও যেন সেই কথার সমর্থন করি। 

রাজামশাইঃ      একদম ঠিক। পাঁচজন পাঁচরকম বললে, রাজামশাইয়ের কাছে আমরা বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবো। আমাদের মধ্যেই কেউ ওই ঘটনার ষড়যন্ত্রে হয়তো জড়িত, এমন সন্দেহও তাঁর মনে আসা বিচিত্র নয়।

সেনাপতিঃ       আমাদের সকলের মঙ্গলের জন্য এটুকু আমরা করতেই পারি। রাজ্যের এমন সুখ, সমৃদ্ধি ও শান্তির সময়, একটা বড়সড় যুদ্ধের দিকে রাজ্যের মানুষকে ঠেলে দেওয়াতে আমি তো কোন যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি না। কী বলেন, ঠাকুরমশাই?

রাজ গুরুঃ       আমরা কোনদিনই যুদ্ধের খুব একটা পক্ষে তো নই ভাই, একমাত্র আত্মরক্ষা আর আপৎকাল ছাড়া! আর অকারণ যুদ্ধে কার কী মঙ্গল হয়, আমার তো জানা নেই।

সেনাপতিঃ       তার মানে আমরা কেউই চাইছি না যুদ্ধটুদ্ধ হোক। তাহলে মন্ত্রীমশাই, এখন আপনিই রাজার হত্যা বলুন, হত্যা কিংবা মৃত্যু বলুন মৃত্যু - কিভাবে হয়েছিল, সে কথা বর্ণনা করুন। সেই ঘটনার সময় আমি রাজধানীতে ছিলাম না। ফিরে এসে যা শুনেছিলাম, তার অনেকটাই অলৌকিক বলে মনে হয়েছিল। কিছুটা বিশ্বাসযোগ্য, কিছুটা মনে হয়েছিল গুজব। আজ আমারও সত্যটা জানা হয়ে যাবে।     

মহামন্ত্রিঃ         (কিছুক্ষণ দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে কি়ছু চিন্তা করলেন) তাহলে একদম শুরু থেকেই শুরু করি। কী বলেন, ঠাকুরমশাই?

রাজ গুরুঃ       দুশ্চিন্তা করবেন না মন্ত্রীমশাই, সব ঠিক হয়ে যাবে। আপনি বলুন, আমিও একবার  ঝালিয়ে নিই আমার দেখা, শোনা আর বোঝা সেই ঘটনার সঙ্গে, কোথাও কোন অসঙ্গতি রইল কিনা

মহামন্ত্রিঃ         পঞ্চপাণ্ডব মহাপ্রস্থানে যাওয়ার সময়, তাঁরা পৌত্র পরীক্ষিৎকে যখন সিংহাসনে অভিষিক্ত করলেন, গোটা ভারতভূমি তখন শত্রুহীন। রাজা যুধিষ্ঠির তার ক বছর আগেই রাজসূয় যজ্ঞ করেছিলেন, তাতে সসাগরা এই ভারতের সমস্ত রাজাই তাঁর সার্বভৌমত্ব মেনে নিয়েছিলরাজা পরীক্ষিৎ আচার আচরণে কিংবা চিন্তা ভাবনা়য়, তাঁর পিতামহদের থেকে কোন অংশে কম ছিলেন না। কিন্তু নিজেদের জীবনের নানান কঠিন পরিস্থিতির চাপে, তাঁরা যেভাবে নিজেদের পাথরের মতো কঠোর করে তুলেছিলেন, সেই দাদুদের স্নেহের ছায়ায় থাকা রাজা পরীক্ষিৎ তো আর সেই সুযোগ পাননি। তাই খুব সামান্য এক ঘটনায় নিজের নিয়তিকেই তিনি যেন মৃত্যুর দিকে ডেকে নিলেন।  

রাজ গুরুঃ       হ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাসেদিন মৃগয়া করতে গিয়ে যে হরিণটাকে তিনি তির মারলেন, সেটা আঘাত পেল, কিন্তু সে আঘাত মারাত্মক না হওয়ায়, পালিয়ে গেল ঘন বনের মধ্যে। বোধহয় রাজার মনে হয়েছিল -  আমি রাজা পরীক্ষিৎ, মস্ত বীর, আমার হাতের তির খেয়েও কিভাবে হরিণটা বেঁচে গেল! তিনি জেদ করেই সেই হরিণের পিছনে দৌড়ে বেড়াতে লাগলেন। অনেকক্ষণ ছুটোছুটি করেও সে হরিণতো ধরতেই পারলেন না, উল্টে বনের মধ্যে পথ হারিয়ে চূড়ান্ত হয়রান হলেন। ক্ষিদে, তেষ্টায় হাক্লান্ত রাজা বনের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে দেখতে পেলেন এক ঋষির কুটির।

মহামন্ত্রিঃ         সেই কুটিরে গিয়ে মুনির কাছে তিনি তৃষ্ণার জল, কিংবা ক্ষুধার অন্ন বা ফলমূল কিছুই চাইলেন না। কারণ তিনি রাজা! তিনি মুনির কাছে জানতে চাইলেন, মুনিবর, আপনি এদিক দিয়ে কোন আহত হরিণকে পালাতে দেখেছেন? সে কোনদিকে পালাল, বলতে পারবেন?

রাজ গুরুঃ       সেদিন আবার মুনি মৌনব্রতে ছিলেন, চট করে উত্তর দিতে পারলেন নাকিন্তু রাজা পরীক্ষিতের তখন মেজাজ সপ্তমে, তিনি অতশত বুঝতে যাবেন কোন দুঃখে? বেশ ক’বার একই প্রশ্ন করেও, তিনি মুনির উত্তর না পেয়ে, প্রচণ্ড ক্রোধে কুটিরের বাইরে পড়ে থাকা একটা মরা সাপ ধনুকের ডগায় তুলে এনে মুনির গলায় মালার মতো পরিয়ে দিলেন।

সেনাপতিঃ       মরা সাপ, মুনির গলায়? ছি ছি, দেশের রাজার আরেকটু ধৈর্য ধরা উচিৎ ছিল না?

রাজ গুরুঃ       ছিলই তো। রাজা পরীক্ষিতের স্বভাবে এমন ঔদ্ধত্য এর আগে কিন্তু কোনদিন দেখিনি।

সেনাপতিঃ       তার মানে ওই মুনিই রাজাকে শাপ দিয়ে দিলেন? মুনিরা যেমন দিয়ে ফেলেন আর কি!

মহামন্ত্রিঃ         না রে বাবা, সে কি আর যে সে মুনি ছিলেন? তিনি হচ্ছেন মহামুনি শমীক। তিনি ভালমন্দ কিছুই বললেন না। তিনি তো তখন মৌন! বরং ক্ষমাই করে দিলেন।  

সেনাপতিঃ       সে কি, আমি যে শুনেছিলাম কোন এক মুনি রাজাকে শাপ দিয়েছিলেন?

রাজ গুরুঃ       ঠিকই শুনেছেন, তবে সে মুনি শমীক নন, তাঁর ছেলে শৃঙ্গীসেদিন শৃঙ্গী ভগবান ব্রহ্মার ধ্যান সেরে কুটিরের দিকেই ফিরছিলেন। পথে দেখা হল, তাঁর বাল্যবন্ধু, আরেক ঋষিপুত্র কৃশের সঙ্গে। এই শৃঙ্গী ছিলেন খুব তেজস্বী তাপস, কিন্তু কৃশ তেমন না; একটু হাল্কা আর ডেঁপো ধরনের...

[অন্ধকার হয়ে এল। পর্দা নেমে এল]

        

 

 

[পর্দা সরে গেল, পিছনে বনের পটভূমিবনের পথে দুই তরুণের দেখা]

 

কৃশঃ            আরেঃ, শৃঙ্গী যে, অনেক দিন পর তোর সঙ্গে দেখা হল। এই অবেলায় কোথা থেকে ফিরছিস বলতো?

শৃঙ্গীঃ            ব্রহ্মার ধ্যান করতে গিয়েছিলাম গুরুদেবের আশ্রমে। রোজই যাই, এই সময়েই ফিরি। তারপর তোর কী খবর বল, কী করছিস আজকাল?

কৃশঃ            আমার আর কী খবর? সেই একই। জানিস তো সবই, কেউ বলে বয়াটে, কেউ বলে অকালের কুমড়ো।

শৃঙ্গীঃ             কই, আমি তো তেমন কিছু শুনিনি!

কৃশ             তুই আর আমাদের কথা শুনবি কী করে? তুই তো শুনি এখন খুব নাম করা তপস্বী, তোর খুব তেজ একেবারে আগুনের মতো, বাস্‌ রে!  

শৃঙ্গীঃ            কৃশ, তোর আর কিছু বলার আছে? সেই ভোর থেকে ধ্যান অভ্যেস করে আমি এখন ক্লান্ত, তার ওপর বাবাও কুটিরে আমার অপেক্ষায় রয়েছেন। আমি এখন চলি রে, তাড়া আছে, পরে কোন একদিন না হয় কথা বলা যাবে!

কৃশঃ            আরে দাঁড়া দাঁড়া, তোর বাবার কথায় মনে পড়ল। ওদিক থেকে আসার সময় দেখলাম, তোর বাবা গলায় মরা সাপের মালা নিয়ে বসে আছেন। বেড়ে মানিয়েছে কিন্তু, যা যা তাড়াতাড়ি বাড়ি যা। হ্যা হ্যা হ্যা হ্যা।

শৃঙ্গীঃ             অ্যাই, কৃশ দাঁড়া, কী বললি? বাবার গলায় মরা সাপের মালা? তার মানে?

কৃশঃ            বোঝো, তুই নাকি কড়া তপস্বী, তোরা নাকি অনেক আগে থেকে, অনেক দূর থেকেও সব কিছু জেনে যাস, বুঝে যাস! আর এই খবরটা জানিস না? হাসালি মাইরি, হ্যা হ্যা, হ্যা। তার মানে তোতে আর আমাতে, আহামরি কিছু ফারাক নেই বলছিস?   

শৃঙ্গীঃ             বাজে কথা বলে আমার মাথা গরম করাস না, কৃশ, কী হয়েছে, আমাকে খুলে বল।

কৃশঃ            আমার ওপর মাথা গরম করিসনি, শৃঙ্গী, আমি কী করেছি বল? তুই রেগে গিয়ে কটমট করে তাকালে, ভস্ম হয়ে যাবো, এক টিপ নস্যির মতো মাটিতে ছাই হয়ে পড়ে থাকবো, নির্ঘাৎ।

শৃঙ্গীঃ            [প্রচণ্ড রাগত স্বরে] কৃশ, অনেকক্ষণ তোর রঙ্গকৌতুক শুনলাম। আমার ধৈর্যের সীমা আছে ভুলে যাস না।

কৃশঃ            এই রে, সত্যি সত্যি রেগে গেলি যে। দাঁড়া, দাঁড়া বলছি। তোদের কুটিরের একটু দূরে আমরা বসে আড্ডা মারছিলাম, আর ছিলিম টানছিলাম। হঠাৎ দেখি রাজা পরীক্ষিৎ হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে আসছেন, বনের ভিতর থেকে। সে কী চেহারা রে বাবা, কাঁটায় ছেঁড়া কাপড়চোপড়, উস্কো-খুস্কো চুল। আর মুকুটটা বগলে ধরা। প্রথমে ভাবলাম, ভুল দেখেছি, নেশাটা নিশ্চয়ই আজ মাত্রা ছাড়িয়েছে। তারপর চোখ কচলে ভাল করে দেখলাম, নাঃ, রাজাই বটে। আমরা তো সঙ্গে সঙ্গে ঝোপের আড়ালে গা ঢাকা দিলাম। বলা যায় না, আমরা নেশা করছি দেখতে পেলে, হয় আমাদের উপদেশ দেবে, নয়তো শূলে চড়াবে।    

শৃঙ্গীঃ             তারপর? তারপর?

কৃশঃ            কুটিরের দরজার কাছেই তোর বাবা ধ্যানে বসেছিলেন। তাঁকে দেখতে পেয়েই রাজা জিজ্ঞেস  করল, এদিক দিয়ে কোন আহত হরিণকে পালাতে দেখেছেন? কোনদিকে গেল বলতে পারবেন? তোর বাবা কোন উত্তর দিলেন না।    

শৃঙ্গীঃ             [কণ্ঠে উদ্বেগ] উত্তর দেবেন কোত্থেকে তিনি তো মৌনব্রতে রয়েছেন!

কৃশঃ            সে তো তুই জানিস আর তোর বাবা জানে! হে হে হে হে। রাজা তো আর জানে না। রাজা উত্তর না পেয়ে, রাগে গজগজ করতে করতে কুটিরের বাইরে বেরিয়ে এল। তোদের ঘরের পাশে একটা মরা সাপ পড়েছিল, সেটাকে ধনুকের ডগা দিয়ে তুলে এনে তোর বাবার গলায় পরিয়ে দিল, মালার মতো। তাতেও তোর বাবা কোন কথা বললেন না, চোখ মেলে তাকালেন না। তাতে রাজা আরো রেগেমেগে খ্যাপা মোষের মতো বেরিয়ে এল ঘর থেকে, তারপর ফিরে গেল বনের পথে, যেদিক থেকে এসেছিল, সেই দিকে। 

শৃঙ্গীঃ             বাবা, কিচ্ছু বললেন না, এত কাণ্ডের পরেও!

কৃশঃ            [শৃঙ্গীর কাঁধে চাপড় মেরে] ভয় পেয়েছেন, বুঝলি না? যতই তোরা মন্ত্রসিদ্ধি, তপস্যা, ধ্যান এসব নিয়ে নাচানাচি করিস না কেন, আসলে রাজার ক্ষমতার কাছে সবই তুশ্চুআসল শক্তি হচ্ছে রাজশক্তি। একথা এতদিন তুই স্বীকার করতিস না, এবার অন্ততঃ স্বীকার কর। তোর বাবার মতো বিখ্যাত মুনিকেই এত বড়ো অপমান করে, রাজা যখন পার পেয়ে গেল, তখন তোরা ওই তেজ-টেজ নিয়ে যে বগল বাজাস, সেটা আর নিশ্চয়ই করবি না, কী বল? আর আমাদেরও এত তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করবি না। [কণ্ঠে তীব্র বিদ্রূপ]    

শৃঙ্গীঃ            কৃশ, এ কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে বাবা কী করেছেন, কেন করেছেন, আমি জানি না। তবে আমি বলছি তোকে কৃশ, কঠোর তপস্যা করে, যদি সামান্য কিছু শক্তিও অর্জন করে থাকি, তাহলে ওই উদ্ধত অহংকারী রাজা আজ থেকে সাতদিনের মাথায়, সাপের দংশনে মারা যাবে। হ্যাঁ এই আমার অভিশাপ, তীব্র বিষধর তক্ষক দংশন করবে রাজার মাথায়, বিষের জ্বালায় জ্বলে মরবে ওই রাজা। আমার এই কথা মিথ্যা হবার নয়, দেখে নিস।  

কৃশঃ            হুঁ, বলিস কী? এত একেবারে চরম অভিশাপ? হে হে হে, ঠিক আছে সাতদিন অপেক্ষাই করব, না হয়। দেখাই যাক তোর কত ক্ষ্যামতাতবে যাই বলিস, তোর মধ্যে তাও যেন একটা গনগনে রাগের আঁচ পাচ্ছি, তোর বাবার মধ্যে কেমন যেন ম্যাদামারা ভাব, এত নাম ডাক, কিন্তু কোন রোখঠোক নেই, না বাপু এ আমার...। আচ্ছা, আচ্ছা, ঠিকাছে, ঠিকাছে, রাগ করিস কেন? তোরাও যদি সত্যিকথা শুনতে রাগ করিস, তাহলে রাজাদের আর দোষ কী? যা, যা, তুই এখন বাড়ি যা, আমিও ওদিকে অন্য কোন আসর দেখি।

 

[দুজনে দুপাশে দ্রুত চলে গেল, মঞ্চ অন্ধকার হয়ে এল। যখন আলো এল, বনের পটভূমিকায় একটি কুটির, তার মধ্যে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় বসে আছেন মহামুনি শমীক, তাঁর গলায় মরা সাপ, মালার মতো ঝুলছে। শৃঙ্গী খুব সন্তর্পণে বাবার গলা থেকে সাপটি খুলে নিয়ে ফেলে এল কুটিরের বাইরে। ]

 

শৃঙ্গীঃ            [পায়ের কাছে বসে, তীব্র আক্ষেপের কণ্ঠে] বাবা, আমার বাবা, তোমার মতো লোকের সঙ্গে যে এমন দুর্ব্যবহার করতে পেরেছে, তার চরম শাস্তির বিধান আমি করেছি, বাবা। আমি তাকে অভিশাপ দিয়েছি, আজ থেকে সাতদিনের মাথায়, সাপের দংশনে তার মৃত্যু নিশ্চিত।

মহামুনি শমীকঃ  কী সর্বনাশ, এ তুই কী করেছিস, শৃঙ্গী। রাজার আচরণে তো আমার ব্রত ভঙ্গ হয়নি, কিন্তু তোর এই কথায় যে আমায় ব্রত ভঙ্গ করতে হল, দুরাচারী, উদ্ধত, অহংকারী পুত্র। ছিঃ ছিঃ ছিঃ। তিনি আমাদের সকলের রাজা, তিনিই আমাদের ভরণ করেন, পোষণ করেন। আমাদের দুর্ধর্ষ শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করেন। আমাদের অন্নবস্ত্রের সংস্থান করেন, যাতে আমরা নিশ্চিন্তে তপস্যায় সিদ্ধি লাভ করতে পারি। সেই রাজা আজ আমাদের কুটিরে এসেছিলেন, অনাহুত অতিথি হয়ে। আমি জানি তিনি তখন পথশ্রমে আর হতাশায় পরিশ্রান্ত ছিলেন। তাঁকে আমি সামান্য তৃষ্ণার জল দিয়েও সেবা করতে পারলাম না, আমার মৌনব্রতের জন্যে। অপরাধ আমার। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি তো আমার কোন ক্ষতি করেননি, আমার গলায় মরা সাপটি পরিয়ে দিয়ে গিয়েছেন মাত্র। এইটুকু অপরাধে তুই তাঁকে মৃত্যুর অভিশাপ দিলি? তোর এই অপরাধের কোন ক্ষমা নেই, শৃঙ্গী। তোর তপস্যা, তোর ধ্যান, উপাসনা সবই ব্যর্থ।

শৃঙ্গীঃ            [গলায় একটু অভিমান] আমার তপস্যা ব্যর্থ হতে পারে, বাবা, কিন্তু আমার কথা ব্যর্থ হতে পারে না, আমি নিশ্চিত। যে কথা আমি বলে ফেলেছি, তার অন্যথা হওয়া অসম্ভব।

মহামুনি শমীকঃ  সে আমি জানি। ওরে মূর্খ, অভিশাপ দেওয়ার আগে ক্ষমা করতে শেখ, নম্র হতে শেখ, নয়তো তুইও ধ্বংস হবি। আমার সামনে থেকে তুই দূর হয়ে যা, আর আমার প্রিয় শিষ্য গৌরমুখকে পাঠিয়ে দে। তাকে আমি রাজসভায় পাঠাবো। রাজা পরীক্ষিতের কাছে সে যাবে, তাঁর কাছে সমস্ত ঘটনার কথা জানিয়ে আসবে। তারপর রাজা যদি প্রতিকারের কোন ব্যবস্থা করতে পারেন তো, তাঁর পক্ষেও মঙ্গল, মঙ্গল আমাদের সকলের।

 

[পর্দা নেমে এল, অন্ধকার হয়ে এল মঞ্চ]

 

 

 

[পর্দা সরে যেতে, অবিকল প্রথম দৃশ্যের মঞ্চ সজ্জা, এবং পাত্ররা]

 

মহামন্ত্রীঃ         মহামুনি শমীকের দূত হয়ে কিশোর-তাপস গৌরমুখ, রাজসভায় এসে রাজাকে সকল কথা জানিয়েছিলেন। রাজা পরীক্ষিৎ তাঁকে এতটুকুও অনাদর বা অসম্মান করেননি। তাঁকে বিদায় দেওয়ার সময়, রাজা বলেছিলেন হে তাপস, আপনার গুরুদেব মহামুনি শমীককে গিয়ে বলবেন, তিনি যেন আমাকে ক্ষমা করেন এবং আমার প্রতি সর্বদা প্রসন্ন থাকেন।

রাজগুরুঃ        গৌরমুখের থেকে সব কথা শোনার পর, মহারাজ পরীক্ষিৎ একটিমাত্র স্তম্ভের উপর একটি নিরাপদ প্রাসাদ নির্মাণের আদেশ দিলেন। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে, অতি বিশ্বস্ত কয়েকজন প্রিয় পারিষদ ছাড়া সেই প্রাসাদে আর কারো যাওয়ার অনুমতি ছিল না। ছ’ছটা দিন পার হয়ে গেল নিরাপদে, কোন ঘটনাই ঘটল না। সপ্তমদিনের দুপুরবেলা, রাজার প্রাসাদ অনেকটাই যেন নিশ্চিন্ত, সকলের মনে আশা, হয়তো কোনভাবে এই অভিশাপ থেকে রাজা মুক্ত হয়েই যাবেন। আর ঠিক তখনই শহরের কিছুটা বাইরের রাজপথে অদ্ভূত এক ঘটনা ঘটছিলওই রাজপথ ধরে মহামুনি কশ্যপ আসছিলেন রাজ প্রাসাদের দিকে, পথে এক বট বৃক্ষের তলায় বসে থাকা এক তেজস্বী ব্রাহ্মণ যুবক তাঁকে ডাকলেন। কশ্যপ তাঁর ডাকে পিছন ফিরে তাকালেন,

                

[মঞ্চ অন্ধকার হয়ে এল, সামনে নেমে এল রাজপথের দৃশ্যপট। পথের ধারে বটগাছের তলায়, এক সুপুরুষ দীর্ঘদেহী ব্রাহ্মণ বসে আছেন, আর মহামুনি কশ্যপ চলেছেন, রাজপ্রাসাদের দিকে]

 

ব্রাহ্মণঃ          মহামুনি কশ্যপ, আমার প্রণাম নিন। এই ভরদুপুরে রোদ্দুরের মধ্যে হনহন করে কোথায় চলেছেন? আসুন না, এই গাছের ছায়ায় বসে একটু বিশ্রাম নিন।

মহামুনি কশ্যপঃ  অ, আপনি ব্রাহ্মণ, তাহলে একটু বসতেই পারি। এখান থেকে রাজপ্রাসাদ কতদূর বলতে পারেন? আমার আবার একটু তাড়া আছে।

ব্রাহ্মণঃ          এখান থেকে বড়ো জোর অর্ধ দণ্ডের পথ, বিকেলের অনেক আগেই পৌঁছে যেতে পারবেন। তা এত তাড়া কিসের রাজপ্রাসাদে যাবার?

মহামুনি কশ্যপঃ  রাজার যে ভীষণ বিপদ, শোনেননি? আজ সন্ধ্যের আগেই রাজার সর্প দংশনে মৃত্যু।

ব্রাহ্মণঃ          হ্যাঁ শুনেছি বটে, আমার যদিও সেকথায় বিশ্বাস হয়নি। তবে রাজার ভাগ্যে মৃত্যু যদি থাকেই, আপনি ব্যস্ত হয়ে কী করবেন? আপনি কী তাঁর ভাগ্য পাল্টাতে পারবেন? ভাগ্য কী বদলানো যায়, মহামুনি?

মহামুনি কশ্যপঃ  আপনি বোধহয় জানেন না, আমি মহাসঞ্জীবনী মন্ত্রে এবং ওষধিতে সিদ্ধ। যে কোন সদ্যমৃতের দেহে, আমি প্রাণ ফিরিয়ে দিতে পারি।

ব্রাহ্মণঃ          বলেন কী? এ কোনদিন সম্ভব? মৃতদেহে প্রাণ সঞ্চার? হা হা হা, কিছু মনে করবেন না, মহামুনি, কথাটা ঠিক হজম হল না। ধরুন এই, এই যে গাছটাকে, আমি যদি বিষ দিয়ে মেরে ফেলি, আপনি পারবেন একে আবার আগের অবস্থায় বাঁচিয়ে তুলতে?

মহামুনি কশ্যপঃ  বেশি কথায় কাজ কী? পরীক্ষা করেই দেখা যাক না। ভালই হবে, রাজার সামনে যাবার আগে, আমার ক্ষমতার আরেকবার যাচাইও হয়ে যাবে।

ব্রাহ্মণঃ          বাঃ বেশ, তাহলে দেখাই যাক।

 

[ব্রাহ্মণ সামনের অশ্বত্থ গাছের কাণ্ডে বিষ প্রয়োগ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই, সতেজ সবুজ গাছ, জ্বলে শুকনো কংকালের মতো হয়ে গেল। এবার মহামুনি কশ্যপ সেই মরা গাছে পবিত্র জল সিঞ্চন করে, তাঁর সঞ্জীবনী মন্ত্র পাঠ করলেন। আশ্চর্য, সেই মরা গাছের ডালে আবার নতুন পাতা গজিয়ে উঠল, কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই গাছ অবিকল আগের মতোই সতেজ সবুজ দাঁড়িয়ে রইল মাটির উপর। যেন কিছুই হয়নি তার]

                

[উচ্ছ্বসিত স্বরে] আশ্চর্য, হে মহামুনি কশ্যপ, আপনার ক্ষমতা আশ্চর্য, অদ্ভূতআপনার মন্ত্রসিদ্ধিতে আমার আর কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু তবু আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস  না করে পারছি না, আপনি রাজাকে বাঁচাতে চাইছেন কেন? মহামুনি শমীককে অপমান করার জন্যে, রাজা ব্রাহ্মণের শাপগ্রস্ত হয়েছেন। আপনি নিজেও মহামুনি হয়ে, তাঁর প্রাণ বাঁচিয়ে, সেই ব্রহ্মশাপকে ব্যর্থ করতে চাইছেন কেন?

মহামুনি কশ্যপঃ  নির্জলা সত্যি কথা বললে, আমার এখানে আসার আসল উদ্দেশ্য - বেশ কিছু অর্থ উপার্জন। রাজাকে এই বিপদ থেকে যদি উদ্ধার করতে পারি, রাজা নিশ্চয়ই খুশি হয়ে প্রচুর সোনা, চাষের জমি আর গর্ভবতী গাভি দান করবেন। এই পুরষ্কার লাভ ছাড়া আমার অন্য আর কোন মহান উদ্দেশ্য নেই।

ব্রাহ্মণঃ          বাঃ বেশ, খুব ভালো কথাকিন্তু হে মহামুনি, যদি কোন ক্রমে আপনি রাজার জীবন ফিরিয়ে দিতে ব্যর্থ হন? না মানে, আপনি অন্য ভাবে নেবেন না....আমার কথাটা আপনি একটু মন দিয়ে শুনুন। আপনি এই যে অশ্বত্থ গাছের প্রাণ ফিরিয়ে দিলেন, সেই গাছের উপর কিন্তু কোন ব্রহ্মশাপ ছিল না। আর এই গাছের নিয়তিতেও আজকেই যে ওর মৃত্যু হবে, এমন কোন কথাও ছিল না। কিন্তু রাজার ব্রহ্মশাপ রয়েছে, ব্রাহ্মণের কথা নিয়তির মতোই, নড়চড় হবার জো নেই।  সেক্ষেত্রে যদি, আবারও বলছি, ‘যদি’, আপনি ব্যর্থ হন, তখন? আপনার অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যও ব্যর্থ হবে। তার ওপর সমাজে আপনার যে একটা সম্মান আছে, খ্যাতি আছে, তারও অনেকটাই ক্ষতি হয়ে যাবে, তাই না? লোকে বলবে, মহামুনি কশ্যপ, সকলের প্রাণ ফেরাতে পারেন না, রাজা পরীক্ষিতের পারেননি তখন?

মহামুনি কশ্যপঃ  সত্যি করে বলুন তো, আপনি কে? আপনার কথায় আপনাকে আর ব্রাহ্মণ বলে মনে হচ্ছে না, আমার মনে হচ্ছে, ব্রাহ্মণের বেশে আপনি কোন রাজপুরুষ। আপনি কে?

ব্রাহ্মণঃ          [হাসি] বলব, সব কথাই বলব, মহামুনি। এখন দয়া করে আমার প্রস্তাবটা শুনুন না। আপনি মনে মনে যে পরিমাণ অর্থ লাভের আশা করে রাজার প্রাসাদে যাচ্ছিলেন, আমি যদি তার থেকেও বেশি অর্থ আপনাকে দিই, রাজপ্রাসাদে না যাওয়ার জন্যে? তাহলেও কী আপনি রাজপ্রাসাদেই যাবেন?

মহামুনি কশ্যপঃ আপনি কে?

ব্রাহ্মণঃ          আমার পরিচয় আমি ঠিক সময়েই দেব, মহামুনি। কিন্তু আমি যে কথাগুলি বলছি সে কথা কিন্তু হাল্কা প্রতিশ্রুতি নয়। আপনি এখান থেকেই যদি নিজের আশ্রমে ফিরে যান, আপনার হাতে আমি এখনই, এইখানে, আপনার আশার থেকেও অনেক বেশি অর্থ দান করবো।

মহামুনি কশ্যপঃ  আপনি কে আমি জানি না, কিন্তু আপনি যে সাধারণ কেউ নন বেশ বুঝতে পারছি। আর এও বুঝতে পারছি, রাজা পরীক্ষিতের বিরুদ্ধে শুধু ব্রহ্মশাপই নয়, আপনাদের মতো ক্ষমতাশালী ও অর্থবানের ষড়যন্ত্রও রয়েছে। মনে হচ্ছে ব্রহ্মশাপটা উপলক্ষ মাত্র। অতএব আমার মতো নিরীহ ব্রাহ্মণের এর মধ্যে জড়িয়ে পড়ার কোন মানেই হয় না। আমার প্রয়োজন মতো অর্থ যদি আমি পেয়ে যাই, আমি রাজার প্রাসাদে যাবো না, কথা দিলাম, আমার আশ্রমে ফিরে যাবো

ব্রাহ্মণঃ          বাঃ, অতি বিচক্ষণ ও উত্তম বিবেচনা, মহামুনি কশ্যপ। আপনাকে আরেকবার প্রণাম। আমার অনুচরেরা গরুর গাড়িতে সোনার মুদ্রা আর নানান উপহার দিয়ে আপনাকে সঙ্গে নিয়ে আপনার আশ্রমে পৌঁছে দিয়ে আসবে। আর কাল সকালে, আপনার আশ্রমে পৌঁছে যাবে পাঁচশ’ সবৎসা তরুণী গাভী। তারপর আমার অনুচরেরা কাল সকালে আপনাকে কৃষিজমিও দেখিয়ে দেবে, সেখান থেকে পছন্দমতো, যতটা খুশি আপনি নিয়ে নেবেন। ও হ্যাঁ, ভালো কথা, এই দানেও যদি আপনি সন্তুষ্ট না হয়ে থাকেন, কোন সংকোচ করবেন না, মহামুনি।

মহামুনি কশ্যপঃ  হে রাজা, এই পুরষ্কার ও অনুগ্রহ আমার কাছে আশাতীত। আমি সন্তুষ্ট।

ব্রাহ্মণঃ          আপনার কাজে লাগতে পেরে, আপনাকে খুশি করতে পেরে, আমি কৃতার্থ হলাম, হে মহামুনি। বিদায়ের আগে আমার পরিচয়টুকুই বা বাকি থাকে কেন? হে মহামুনি, আমি নাগরাজা - আমার প্রভাব, প্রতিপত্তি ও ক্ষমতা তেমন কিছুই হয়তো নয়, কিন্তু আপনার মতো পণ্ডিতের কাছে সে তথ্য অজানাও নয়, আশা করি। আমার প্রণাম নেবেন। এখন দয়া করে আমায় অনুমতি দিন, মহামুনি, ওদিকে আপনাকে অনেকটা পথ ফিরতে হবে, আর এদিকে আমারও অনেক জরুরি কাজ সারা বাকি।  

 

[নাগরাজ হাতে তালি দিতেই এক অনুচর উপস্থিত হল সেখানে। নাগরাজ তাকে কিছু নির্দেশ দিতে দিতেই, মঞ্চ অন্ধকার হয়ে এল, রাজপথের দৃশ্য সরে গেল, আবার যখন আলো ফিরে এল, দেখা গেল প্রথম দৃশ্যের সভাগৃহ]

 

সেনাপতিঃ       ওরেব্বাবা, উৎকোচ, ষড়যন্ত্র মিলিয়ে এ যে একেবারে দুর্নীতির চূড়ান্ত!

মহামন্ত্রিঃ         ঠিক তাই, সমস্ত ঘটনার কথা জানলে, রহস্যের তল খুঁজে পাওয়া যায় না, হে।

সেনাপতিঃ       মহামুনি কশ্যপকে বিদায় করিয়ে, নাগরাজ কী করলেন, মন্ত্রিমশাই?

মহামন্ত্রিঃ         এই, এর পর থেকে পুরো ঘটনাটাই ঝাপসা, অস্পষ্ট। আন্দাজ করা যায়, কিন্তু প্রমাণ করা যায় না। কিছুটা অলৌকিক আবার অনেকটাই যেন অবিশ্বাস্য!  

[কিছুক্ষণ থেমে থাকার পর]

তখন, সূর্য অস্ত যেতে আর সামান্যই বাকি। রাজার নিরাপদ প্রাসাদের নিভৃত কক্ষে চারজন অচেনা ব্রাহ্মণ এসে উপস্থিত হল। তারা কী করে, ঢোকার অনুমতি পেল, বিশ্বস্ত প্রহরীরা কেন তাদের ঢুকতে দিল, জানা যায় না। সেই ব্রাহ্মণদের হাতে ছিল, প্রচুর ফল, অনেক মিঠাই। তারা নাকি এসেছিল, রাজার মঙ্গল ও দীর্ঘ আয়ুর জন্যে আশীর্বাদ করতে। তারা সকলে আশীর্বাদ করে, রাজার হাতে তুলে দিল ফলের ডালি। সেই ফল রাজা নিজেই ভাগ করে, আমাদের সকলের হাতে তুলে দিয়ে, একটা মাত্র ফল নিজের জন্যে রাখলেন। আমরা, এমনকি রাজাও তখন নিশ্চিত, ব্রহ্মশাপ ব্যর্থ হয়েছে, কারণ সুর্য তখন প্রায় দিগন্তে। মৃত্যুর করাল ভয় থেকে মুক্তি পাওয়া রাজা, খুব স্বাভাবিক ভাবেই, তখন একটু প্রগলভ, একটু যেন ছেলেমানুষ হয়ে উঠেছিলেন। তিনি হস্তিনাপুরের রাজা, অচেনা লোকের হাতের ফল, নিরাপত্তার কারণেই তিনি কখনো খাননি, খাওয়ার নিয়মই ছিল না। কিন্তু সেদিন খেলেন। আর নিজের হাতের ফলটিতে কামড় দিয়েই তিনি দেখতে পেলেন, সেই ফলের মধ্যে বাসা বেঁধেছে, ছোট্ট একটি পোকা! ছোট্ট, তামাটে রঙের সামান্য একটি পোকা। অতগুলো ফলের মধ্যে আমরাও যারা সেই ফল খাচ্ছিলাম, কোন ফলেই আমরা পোকা পাইনি। কিন্তু রাজার ফলেই ছিল পোকা - ব্যাপারটা আশ্চর্য নয়!

রাজগুরুঃ        নিয়তি, নিয়তি। নিয়তি ছাড়া এর কোন ব্যাখ্যা হয় না।

মহামন্ত্রিঃ         ঠিক, যেখানে যুক্তি কাজ করে না, সেখানে নিয়তি আর ভাগ্য এসেই যায়! পোকা দেখে রাজা যদি তখনই ফলটা জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিতেন ...নাঃ, রাজা তা করলেন না, তিনি ওই ছোট্ট পোকাটিকে তালুতে নিয়ে আমাদের দেখালেন, তারপর নিজের গলায় পোকাটিকে রেখে বাচালের মতো হাসতে হাসতে বললেন, মন্ত্রিমশাই দেখুন, ওহে সভাসদগণ দেখ, আজ সপ্তমদিনও শেষ হয়ে এল, সন্ধ্যে হবো হবো। কোন সাপ আমাকে দংশন করতে পারল না। এখন এই তুচ্ছ কীট যদি আমায় দংশন করে, তাহলেই সব যথাযথ সমাধা হয়। সেই ব্রাহ্মণের শাপও ব্যর্থ হয় না, আর আমার আয়ুও শেষ হয় না।

রাজগুরুঃ        মন্ত্রিমশাই, সেই দৃশ্যের কথা মনে পড়লে আজও আমার সমস্ত শরীর শিউরে ওঠে। ওফ, সে কী ভয়ংকর!

মহামন্ত্রিঃ         রাজার কথা শেষ হতে না হতেই, সেই কীট বিশাল এক বিষধর সাপ হয়ে উঠল, রাজার কণ্ঠ জড়িয়ে ধরে, বিশাল ফণা বিস্তার করে, নিমেষের মধ্যে ছোবল মারল রাজার মাথায়। তারপর কী এক বিস্ফোরণে ভেঙে পড়ল সেই নিরাপদ প্রাসাদের দেওয়ালসেই অচেনা ব্রাহ্মণেরা, সেই অলৌকিক সাপ, এই বিশৃঙ্খলার সুযোগে যেন মিশে গেল, আসন্ন সন্ধ্যার ছায়ায়। আর বিষে নীল হয়ে যাওয়া আমাদের মৃত রাজা পড়ে রইলেন, তাঁর রাজাসনে। বিশ্বস্ত, অনুগত দেহরক্ষীরা তখন কোথায়? মহামুনি কশ্যপ তখন হয়তো গরুরগাড়িতে বসে, লণ্ঠনের আলোয় সোনার মুদ্রা গুনছেন!

সেনাপতিঃ       এ তো হত্যা।

মহামন্ত্রিঃ         হতে পারে, এ হত্যাই! কিন্তু এই হত্যার দায় কার?

সেনাপতিঃ       নাগরাজ। আমি নিশ্চিত, নাগরাজ। মহারাজ যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে বশ্যতা স্বীকার করেছিল ঠিকই, কিন্তু মন থেকে মেনে নিতে পারেনি। তাই এই ষড়যন্ত্র, এই প্রতিশোধ   

মহামন্ত্রিঃ         কী করে নিশ্চিত হচ্ছেন? কোন প্রমাণ দিতে পারবেন? শুধু নাগরাজাই কেন? সেই যে মহামুনি শমীকের ছেলে অভিশাপ দিল, সে দায়ী নয় কেন? ব্রহ্মশাপ তো ব্যর্থ হয় নাযদি ব্রহ্মশাপ ব্যর্থ ধরেই নিই, আমাদের দেশের ব্রাহ্মণরা সেটা মেনে নেবেন কী? তাঁরা কি স্বীকার করবেন, ব্রহ্মশাপ-টাপ আসলে কিছুই নয়। এই ঘটনা তার আড়ালে অন্য এক ষড়যন্ত্র? তাতে তাঁদের প্রাধান্য অটুট থাকবে তো? 

সেনাপতিঃ       ঠাকুরমশাই চুপ করে কেন? কিছু বলুন? এই মৃত্যু কি ব্রহ্মশাপের ফল?

রাজগুরুঃ        আসল কথাটা হচ্ছে, ওইদিন, ওইভাবেই রাজার মৃত্যু ধার্য ছিল, বাকি সব্বাই উপলক্ষ।

সেনাপতিঃ       কিন্তু, এই ভাবেই রাজার মৃত্যু কে ধার্য করেছিলেন?

রাজগুরুঃ        অবাক করলেন, কে আবার? নিয়তি, মহাকাল। যাঁর কবল থেকে আমার আপনার কারো রেহাই নেই।

সেনাপতিঃ       অসুখ, মৃগয়ায় শ্বাপদের আক্রমণ, অগ্নিকাণ্ড, বজ্রপাত বা ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক ঘটনা অথবা ক্ষত্রিয় বীর হিসেবে, যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর হাতে মৃত্যু – মহাকালের হাতে অনেক, অনেক উপায় ছিল। তা না করে, তিনি হঠাৎ মহামুনি কশ্যপকে উৎকোচ দিয়ে ঘরে ফেরাবেন কেন? রাজার নিরাপত্তার ঘেরাটোপের মধ্যেও, হয়তো উৎকোচ দিয়েই, চার ব্রাহ্মণকে ঢোকাতে হল কেন? সেই ব্রাহ্মণরাও ছদ্মবেশী সন্দেহ নেই। ফলের মধ্যে কীট, সেই কীটই হয়ে গেল বিষধর সাপ। তারপর আবার বিস্ফোরণ। ঠাকুরমশাই, একজন লোককে মারতে মহাকালকে এত কাঠখড় পোড়াতে হল?

রাজগুরুঃ        [প্রচণ্ড ক্রোধে] আপনি নাস্তিক, আপনি ঈশ্বরের বিধানকে বিদ্রূপ করছেন?

সেনাপতিঃ       না। ঈশ্বরের নাম ভাঙিয়ে যারা তঞ্চকতা করে, সেইসব মানুষদের আমি মুখোস খুলছি।

রাজগুরুঃ        আপনি কে? ঈশ্বরের কার্য-কারণের হিসাব নেওয়ার অধিকার কে আপনাকে দিয়েছে?

সেনাপতিঃ       আমি নিজের জীবনকে বাজি রেখে, এই দেশ, এই দেশের সাধারণ মানুষ, এই দেশের রাজাকে রক্ষা করি; যদি বলি সেই অধিকারে?

মহামন্ত্রিঃ         যাচ্চলে, আপনারা নিজেদের মধ্যেই ঝগড়া করতে শুরু করলেন যে। শান্ত হোন, আপনারা দুজনেই শান্ত হোনআপনাদের ঝগড়া থেকে কোন সমাধান বের হবে কি?

                 [সকলেই চুপ করে বসে রইলেন মাথা নীচু  করে।]

                 আমি কদিন ধরে এই কথাটাই চিন্তা করে দুশ্চিন্তায় ছিলাম। রাজা এই সমস্ত ঘটনা শুনে, যদি জানতে চান, কে তাঁর পিতার মৃত্যুর জন্য দায়ী? আমি কী জবাব দেব? শমীকপুত্র শৃঙ্গী, নাকি মহামুনি কশ্যপ, নাকি সেই চার অচেনা ব্রাহ্মণ? সেক্ষেত্রে রাজা যদি ক্রুদ্ধ হয়ে, সেই ব্রাহ্মণদের হত্যার আদেশ দেন, গোটা দেশ অশান্ত হয়ে ওঠার সমূহ সম্ভাবনা। অথবা যদি আমি নাগরাজকেই সরাসরি দায়ী করি আর তিনি যদি বলেন, নাগরাজ্যের বিরুদ্ধে এখনই যুদ্ধের আয়োজন করুন, তাতেও কি দেশের মঙ্গল হবে?

সেনাপতিঃ       নাঃ, দুটোর কোনটাই আমাদের কাম্য নয়

রাজগুরুঃ        কাম্য তো নয়ই, কিন্তু এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী হতে পারে, আমার তো মাথায় কিছু আসছে না।

মহামন্ত্রিঃ         আমার মাথায় আছে, যদি আপনাদের সাহায্যের আশ্বাস পাই, আমি এর সমাধান করতে পারবো।

সেনাপতিঃ       দেশের মঙ্গলের জন্যে আমি সব সাহায্য করতে প্রস্তুত।

রাজগুরুঃ        আমিও। কিন্তু সমাধানটা কী?     

মহামন্ত্রিঃ         রাজনীতি। সহজ, সরল রাজনীতি।

সেনাপতিঃ       তার মানে?

মহামন্ত্রিঃ         এই ঘটনায় আমি সম্পূর্ণ দায়ী করবো নাগকে।

সেনাপতিঃ       নাগকে, মানে সেই নাগরাজাকে?

রাজগুরুঃ        না, আমি বোধহয় বুঝতে পেরেছি, নাগ মানে সাপও হয়। অবোলা সাপ, কেউ কেউ নিরীহ, কেউ বা বিষধর।

মহামন্ত্রিঃ         ঠিক, নাগরাজ বলতে আমি যদি সাপেদের রাজাকে বোঝাই? শেষমেষ সাপের কামড়েই তো রাজার মৃত্যু। তিনি হয়তো সব শুনে বলবেন, সাপেদের বংশ, নির্বংশ করে ছাড়বো।

রাজগুরুঃ        হ্যাঁ, সে তো করাই যাবে। আমাদের শাস্ত্রে সর্পসত্র বলে যজ্ঞের কথাও আছে, সেখানে যজ্ঞের আগুনে সাপদের আহুতি দেওয়া হয়। সে আমি বেশ আয়োজন করে ফেলতে পারবো। দেশের যত্তো বাঘা বাঘা ব্রাহ্মণপণ্ডিতদের নেমন্তন্ন করে, প্রচুর সোনা আর গাভি দান করলে, কেউ কোন কথাও বলবে না।

সেনাপতিঃ       যাক, এত কিছুর পর আমরা একজনকে ঠিকই দাঁড় করাতে পারলাম, তাহলে? যাকে নিরুপদ্রবে, শান্তিতে, মনের মতো শাস্তি দেওয়া যাবে। সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না। ওঁ শান্তিঃ।  

রাজগুরুঃ        হ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যা, রাজনীতিতে কী না হয়? মন্ত্রিমশাই, আপনার মাথা বটে একখান, ধন্যি আপনি।

মহামন্ত্রিঃ        সেরেছে, আপনি আমার মাথাটাকেই দায়ী করলেন না তো? তাহলে তো আমার আবার মাথা ব্যথার কারণ হয়ে উঠবে, ঠাকুরমশাই।


সকলের সমস্বরে হাসি।

                

[পর্দা নেমে এল]

সমাপ্ত

                         

 

নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১০

 এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ "  এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ " এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও...