বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "
বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "
বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "
বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক "
এর আগের ছোট গল্প - " কোশিশ কিজিয়ে... "
একই কথা ঘ্যানঘ্যান করিস ক্যান্? আর কিছু কথা নাই কি? একশ বার তো বললাম। বহুদিন ধরে তুইই বলেছিলি
গঙ্গা নাইতে যাবি। যাচ্ছি যাবো করে যাওয়া হয়নি। মনিববাড়িতে ছুটি পাওয়া কতটা ঝকমারি
তুই জানিস না? তুইও তো কাজ করিস তিনবাড়িতে। তুই তো বলিস একবেলা কামাই করলে কেমন
মুখঝামটা দেয় তোর গতরপোষা মালকিন ভাবিরা। হবিবগঞ্জের ঘাটে নাইতে
যাওয়া মানে কম করে দুদিনের ধাক্কা। গঙ্গা নাওয়ার জন্যে দুদিনের ছুটি চাইলে তোকে কী
মাথায় নিয়ে নাচত তোর মালকিনরা? নাকি আমাকেই কোলে বসিয়ে আদর করত
গগন দুবে? আরে বাবুরা তো তাদের বিবিদের নিয়ে গঙ্গা নাহানে যায় পুণ্য
সঞ্চয়ের জন্যে। আমাদের আবার পুণ্য কী রে, ছোট জাতের কোন কিছুতেই
পুণ্য হয় না। মুখ বুজে গাধার মতো খেটে যাও, তাতেই আমাদের পুণ্য
– জানিস না?
আমাদের গঙ্গা স্নানের জন্যে কে ভাবে?
দুদিন নয়? রাস্তা কম নাকি? সকালের প্রথম বাস ধরে গেলেও
হবিবগঞ্জ
পৌঁছোতে মাঝ
দুপুর হয়ে
যায়। বাসস্ট্যাণ্ড থেকে গঙ্গার ঘাটও অনেকখানি পথ। ঘাটে গিয়ে চানটান সেরে পুজো
দেওয়া।
তারপর খাওয়া দাওয়া সারতে সারতে বেলা যখন গড়িয়ে যায়, তখন এদিকের লাস্ট
বাসটাও ছেড়ে আসে ওখান থেকে। একটা রাত তো আমাদের থাকতেই হত হবিবগঞ্জে। বিয়ের পর আমরা
বার দুয়েক তো গিয়েছিলাম, তোর মনে নেই? বড্ডো ভুলে যাস তুই –
ভুলিকে
মাইয়া।
তখনকার কথা আর এখনকার কথা এক নয় জানি। সে সময়ের থেকে রাস্তাঘাট ভালো
হয়েছে। বাস-টাসগুলোও আগের মতো ঝড়ঝড়ে গুড়ের ক্যানেস্তারা নয়। কিন্তু তখন আমাদের এখান
থেকে হবিবগঞ্জ পর্যন্ত পুরো রাস্তাটাই ছিল জঙ্গুলে, তেমন কোথাও বাস দাঁড়াত না। সে
জায়গায় এখন কতগুলো স্টপেজ হয়েছে জানিস? মিরপুর আর শিবানী নগরে তো বাস আধঘন্টা করে দাঁড়ায়।
সেখানে গাড়ির ড্রাইভার খালাসিরা ফ্রিতে সামোসা দিয়ে চা নাস্তা করে, বিড়ি
ফোঁকে। লোকজনও নেমে হাটবাজার করে। ও
দুটো
গঞ্জ ছাড়াও কত যে গ্রাম আর বস্তিতে বাস দাঁড়ায়, মাল তোলে,
প্যাসেঞ্জার
তোলে...
প্যাসেঞ্জার মানে যারা বাসে চড়ে যাওয়া আসা করে। ওটা ইংরিজি কথা, এ
দিগড়ে তুই ছাড়া আর সব্বাই জানে। তুই সেই যেমন মুখ্যু ছিলি তেমনই
রয়ে গেলি। গ্রাম
ছেড়ে কোথাও বের হলি না, ভাবিদের সংসার সামলাতে গিয়ে নিজের
সংসারটাই বরবাদ করে ফেললি। বাইরের কারো সঙ্গে ভয়ে বাতচিৎ করলি
না, ডরপোক, কিন্তু তোর যত তকরার সব আমার সঙ্গে। অবিশ্যি আমাকে ছাড়া তোর আর
আছেই বা কে? মরদ বলিস মরদ, দুশমন বলিস দুশমন, সে তো কেবল আমিই।
হা হা হা হা, মুখ্যু বললাম বলে গাল ফোলালি,
ভুলিকে মাই? একথা তোকে আজ প্রথম বললাম বুঝি? সচমুচ
রে,
গোটা দেশে
আজকাল কত উন্নতি হচ্ছে, সে কথা তুই জানিসই না, আমিই কী আর সব জানি। দুবের গদিতে হরেক লোকজন
আসে, তাদের মুখে নানান কথা শুনি। দুবের কাজে বছরে এক আধবার হবিবগঞ্জ
দৌড়তে হয়, তাই
কিছু কিছু চোখে পড়ে।
হবিবগঞ্জে লোকজনের হাতে হাতে এখন ফোন। সারাক্ষণ
খুটখাট করছে,
আর যখন তখন, পথে ঘাটে, বাসে গাড়িতে বকর বকর করে যাচ্ছে। প্রথমবার
পেছন থেকে
এক অওরতকে দেখেছিলাম, ঘোমটার মধ্যে হাত
ঢুকিয়ে নাগাড়ে কথা বলে চলেছে। আশেপাশে কেউ নেই কার
সঙ্গে কথা বলছে? আমি তো তাজ্জব, ভাবলাম পাগলি-টাগলি হবে বুঝি। বেশ
কিছুক্ষণ পর বলল, ছোড়তি হ, তারপর তার কথাও বন্ধ হল, আর হাতটাও
নামাল। দেখলাম শাদি সুদা আওরত হাতে একটা তাসের প্যাকেটের মতো চকচকে চিজ।
তখনও বুঝিনি যে ওটা ফোন।
হে হে হে তোর অমনি গায়ে জ্বালা ধরল? পরের অওরতের দিকে
আমার নজর কেন? গাঁয়েঘরে তুই ছাড়া কারও দিকে চোখ
তুলে তাকিয়েছি, কোনদিন? তুই জানিস না? হবিবগঞ্জে গিয়ে একটু নজর করেছি বলে তুই একেবারে
খেপে উঠলি যে? আরে বুজদিল, কিচ্ছু চোখ নাচাইনি। বউটা বেশ জোরে জোরে কথা বলছিল তাই
চোখ পড়ল। তা নইলে আমি কী আর জানি না, ভুলির মা ছাড়া আমার মতো মরদকে কে আর চোখে হারাবে?
হবিবগঞ্জ থেকে ফিরব বলে আমি বাসে চেপেছিলাম। বাস ছাড়তে একটু
দেরি ছিল বলে খালি খালি বাসে সিটও পেয়ে গেছিলাম জুতসই। আমার উল্টোদিকের
জেনানা সিটে বসেছিল বউটা আর কথা বলছিল চেঁচিয়ে। তাই নজর পড়েছিল। সে
যাক পরে আস্তে আস্তে বাস ভরে উঠতে লাগল, সব সিট ভরে উঠল। আমার পাশে এক ছোঁড়া এসে
বসল, সেও দেখলাম, কানে হাত রেখে বকেই চলেছে, বকেই চলেছে। আড় চোখে তাকে আমি নজর করতে
লাগলাম। তার কথা শেষ হতে দেখলাম, ছোঁড়া চিজটা নিয়ে খুটখুট করতে লাগল। চারচৌকা পাতলা বাক্সের মতো চিজটা বেশ চকচকে, আর টিভির মতো তার ছোট্ট পর্দায় নানান ছবিও দেখা যায়। আমি ছোঁড়াটাকে
পুছলাম, বাপু ওটা কী? আমার মতো ডোকরা বুড়োকে দেখে ছোঁড়া চিজটা ঘুরিয়ে
ফিরিয়ে বলল,
এটা ফোন। কী একটা ফোন যেন বলল, দাঁড়া বলছি, মো, মোব...না না মনে পড়েছে মোবিল ফোন।
তারপর আমাকে বেশ আহম্মক ঠাউরে কত কিছু বলল, এটা দিয়ে
লোকের সঙ্গে কথা কওয়া যায়। গান শোনা যায়। সিনেমা-টিনেমাও দেখা
যায়। আবার হরেক কিসিমের খেলভি খেলা যায়।
নারে তাসের প্যাকেট দিয়ে তো শুধু তাসই খেলা যায়, তা দিয়ে কী আর কথা বলা
যায় নাকি? নাকি গান শোনা যায়? তুই আড় বুঝোই রয়ে গেলি চিরটাকাল, নিজের
চোখে দেখলেও বোধহয় তুই পেত্তয় যেতিস না। আরে বলছি না, তারপর নজর করে দেখলাম,
বাসে বসে থাকা ছোকরা, বুড়ো, ছুঁড়ি, ধুমসি সবার হাতেই ওই ফোন, আর মাঝে
মাঝেই তারা কানে লাগিয়ে কথা কইছে।
পাগল হয়েছিস, আমার চাষাড়ে হাতে ওই ফোন নিয়ে করবটা
কী? কত দাম তাও তো জানি না। আমাদের গাঁয়ে কাউকে তো দেখিনি। গগন দুবের তো টাকায় ছ্যাতলা
পড়ে, তাকেও তো দেখিনি ওই ফোন নিয়ে ঘুরতে। আর কথা বলবই বা কার সঙ্গে? তোর
সঙ্গে? বাসে বসে তোর সঙ্গে কী কথা বলতাম বল দিকি? সারাদিন তুইও খেটে
মরছিস, এদিকে আমিও। ফোনে-টোনে নয়, আমাদের পাঁদাড়ে বসে
গপ্পো
করাতেই মজা। রাত্রে খাওয়ার পর আমি একটা বিড়ি ধরাই আর তুই মুখে মোতিহারি দোক্তা
ঠুসে বসিস গা ঘেঁষে। আমার দুনম্বর বিড়িটা শেষ হবার
আগেই রাক্ষুসে হাঁই তুলতে তুলতে তুই বলিস, চোক টানচে শুই গিয়ে।
হ্যা হ্যা হ্যা রাগ করচিস
কেনে? ওই
রাক্ষুসে মুখেই চুমকুড়ি খেয়েই তো তিন-তিনটে বাচ্চা বিয়োলি? সারা জেবনটা তো গেল তোর
ওই রাক্কুসে মুখের দিকেই চেয়ে। এই বুড়ো বয়েসে আবার দুষ্কুই বা করিস কেনে, রাগই বা
করিস কিসের লেগে? হা হা হা হা...
****
হবিবগঞ্জ চৌমাথার মোড়ে সুখনরাম
হাবিলদারের
ডিউটি। ট্রাফিক সামলায়। এখন অবিশ্যি লকডাউনের চক্করে চারটে সড়কই
ফাঁকা, ট্র্যাফিকের বালাই নেই। তাই সুখনরামের মন মেজাজ খারাপ। ট্র্যাফিক থাকলে
ট্রাকওয়ালা, ঠেলাওয়ালা, ভ্যানওয়ালাদের নিংড়ে তার আমদানি হত ভালই। এখন এই
লকডাউনে সে সব গিয়েছে চুলোর দুয়োরে। ডিউটি দিতে দিতে
নাস্তাপানিরও
কোনদিন অভাব হয়নি সুখনরামের, তিওয়ারির চা, আর গঙ্গেশ দুধাওয়ার
কচোরি,
সামোসায় তার ছিল নিত্য অধিকার। আজকাল লকডাউনে সবই বন্ধ। খোলা আছে শুধু
চুখনলালের পান-বিড়ির দোকান। চুখনের গুটখা আর জর্দার বরাদ্দটা
এখনও চালু আছে, তাই সামোসার খিদে এখন গুটখার রসেই মেটাতে
হচ্ছে।
রাস্তার ধারের নালার ওপর চুখনলালের গুমটি, তার সামনে নালার
রেলিং। সেই রেলিংয়ে ভর দিয়ে সুখনরাম, একমুখ গুটকার লালা নিয়ে তাকিয়েছিল
নির্জন ফাঁকা রাস্তাগুলোর দিকে, ভাবছিল তার পকেট ফাঁকা নসিবের কথাও। তাকিয়ে থাকতে
থাকতে তার চোখে পড়ল লোকটাকে। পরনে ময়লা ধুতি আর কুর্তা গায়ে লোকটা সাইকেল চালিয়ে জগৎপুর যাওয়ার রাস্তার
দিক থেকে আসছে। কোন তাড়া হুড়ো নেই, ধীরে সুস্থে।
তার পেছনের
কেরিয়ারে
আজিব
সাইজের একটা
প্যাকিং, কাঁথা আর কাপড়ে মুড়ে রশি দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। সেটার থেকেও আজিব ব্যাপার
হল, লোকটা হাসছে হ্যা হ্যা করে। আজকাল মোবাইলের দৌলতে আপনমনে
হাসার বা বাতচিৎ করার লোক হামেশা চোখে পড়ে। কিন্তু এ লোকটার চেহারায় মোবাইলে কথা
বলার মতো মনে হচ্ছে না।
শুঁয়োপোকার মতো ভুরু কুঁচকে সুখনরাম তার দুই চ্যালাকে ইশারা
করল। নেশাখোর, বাপে খেদানো মায়ে তাড়ানো এই দুই ছোকরা সুখনরামের
চ্যালা। সুখনরামের ইশারাতে তারা
লরিওয়ালা, ভ্যানওয়ালাদের থেকে তোলা আদায় করে সুখনরামের হাতে গুঁজে দেয়। আজকাল পথে
ঘাটে সবার হাতেই মোবাইল, ফচাৎ করে কে কখন তসবির তুলে আখবারওয়ালা কিংবা হোয়াটসপে
ছড়িয়ে দিলেই হয়েছে আর কি, তার নোকরি খতম, পেট মে লাথ। সারাদিনের তোলা থেকে
চ্যালাদের হাতে দশ-বিশ তুলে দিলে সে ভয়টা থাকে না।
সুখনরামের ইশারা পেয়ে চ্যালা দুটো হায়নার
মতো
লাফিয়ে পড়ল
লোকটার ওপর।
“কোথায় যাচ্ছিস? কেয়া কাম হ্যায়? জানিস না, এখন লকডাউন। বেকার
ঘুমনা-ফিরনা মানা হ্যায়?”
লোকটা সাইকেল থামিয়ে রাস্তায় পা ঠেকিয়ে কাত হয়ে দাঁড়াল, মিনমিন
করে কিছু একটা বলল, সুখনরামের কানে এল না। সুখনরাম এক মুখ গোলাপি লালা নালার
কালো জলে উগরে দিয়ে, কর্কশ গলায় হাঁকাড় দিল “আবে পুছ না, পিছে
কা
হ্যায়?”
লোকটা ভীরু চোখে আগের মতোই মিনমিনে গলায় বলল,
“বিবি”।
সুখনরাম এবং তার দুই চ্যালা এমনকি হাবিলদার সায়েবকে বিনি পয়সায় গুটখা-জর্দা
বিলোনো
চুখনলালও আঁতকে
উঠল, “বিবি? কিসকা?” “মেরি। কাল রাতকো গুজর গয়ি। গঙ্গা
কিনার শমসানে যাচ্ছি”।
“মুর্দা সার্টিপিট দিখা”। চ্যালাদুটো
চেপে ধরল লোকটাকে। বুরবক লোকটা
অবাক তাকিয়ে
রইল ওদের মুখের দিকে। সুখনরামের এক চ্যালা অশ্রাব্য কয়েকটা
গালাগাল
দিল, বলল “কথাটা কানে গেল না? ডক্দরের সই করা মুর্দা সার্টিপিট আছে না নেই?
শ্বশুরা, তুই নিজেই বিবিকে মেরে এখন গঙ্গায় যাচ্চিস? আর আমাদের উল্লু বানাচ্ছিস, ব্যাহ্ন**?”
এমন একটা সমস্যার কথা লোকটার মাথাতেই আসেনি। গত তিন চার
রাত ভুলির মায়ের সেবা শুশ্রূষাতেই সে ব্যস্ত ছিল। তিনদিন তিনরাত যমে মানুষে টানাটানির
পর, গত কাল মধ্য রাতে তার দেহান্ত হওয়াতে লোকটা দুঃখে শোকে ভেঙে পড়েছিল। সারারাত মুর্দা
কোলে বসে থাকার পর হঠাৎ মনে হল, ভুলির মা বহুবারই বায়না করত গঙ্গা নাইতে যাবে। নানান
ঝামেলায় সে আর হয়ে ওঠেনি। সে কথা মনে হতেই কী এক আবেগে সে ভুলির মায়ের শরীরটা চাদরে
জড়িয়ে বেঁধে নিয়েছিল সাইকেলের কেরিয়ারে। তারপর শেষ রাতে সাইকেল নিয়ে পাগলের মতো বেরিয়ে
পড়েছিল হবিবগঞ্জের দিকে। পড়শিদের সবাই মানা করেছিল। শমশান তো এখানেও ছিল, গঙ্গা নেই
তো কী? আশেপাশের গ্রামগঞ্জের মানুষের দেহান্ত হলে কী সবাই হবিবগঞ্জ যায়? কী দরকার হবিবগঞ্জ
যাবার? কেউ কেউ সঙ্গে আসতে চেয়েছিল, তবে অনেকেই বলেছিল, “বিবিকে
লিয়ে বাওরা বন গয়া শ্বশুরা, জানে দো শালে কো, কুছ দূর যানে কা বাদ আপনে আপ ওয়াপস
আয়েগা...”।
জীবন আসে জন্মের নিয়মে আর মৃত্যু আসে জীবনের নিয়মে। কিন্তু শাসক মানুষের
ক্ষমতা চায় সেই নিয়মকে সরকারি আইনে বেঁধে রাখতে। সেই সময়ে এসব কথা তার মাথায় আসেনি।
গ্রামে থাকলে পড়শিরাই ডেথ সার্টিফিকেট
জোগাড় করে, ভুলির মায়ের দাহকার্য সম্পন্ন করে দিতে পারত। কিন্তু এই শহরে সে একজন
সন্দেহজনক বহিরাগত ব্যক্তি। তার পাশে দাঁড়াবার মতো কেউ নেই। তার কথা শোনার মতো
ধৈর্য বা সদিচ্ছাও কারও থাকতে নেই।
খুব দুর্বল কণ্ঠে সে উত্তর দিল, “ইয়াদ নেহি থা, জি”। “শ্বশুরা, ইয়াদ
নেহি থা?” অশ্রাব্য গালাগাল দিয়ে সজোরে থাপ্পড় চালালো সুখনরামের এক চ্যালা। লোকটা
সাইকেল থেকে রাস্তায় ছিটকে পড়ল। কিন্তু ক্যারিয়ারে বাঁধা লাশের প্যাকিংয়ের ঠেকায়
সাইকেলটা পড়ে গেল না, কাত হয়ে দাঁড়িয়েই রইল রাস্তায়। লোকটার মরা বিবিই যেন
সাইকেলটা ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে লোকটার অপেক্ষায়।
চুলের মুঠি ধরে লোকটাকে রাস্তা থেকে তুলে ধরল সুখনরামের এক চ্যালা।
অন্য চ্যালাটা বলা নেই কওয়া নেই আচমকা ঘুঁষি মারল পিছন থেকে লোকটার রগ বরাবর। সরু
ধারায় রক্ত নামতে লাগল নাক দিয়ে, লোকটা কোনমতে
বলার চেষ্টা করল, “গরিব আদমি... কা কসুর মেরা, কাহে মার...”। কথা শেষ হবার আগেই
তার বুকে সজোরে লাথি মারল প্রথম চ্যালা। তিন-চার দিনের বিশ্রাম হীন বিনিদ্র শরীরের
দুর্বলতা ছিলই, তার সঙ্গে ছিল শোকের উন্মত্ততা এবং সুদীর্ঘ পথ সাইকেল চালিয়ে আসার
ক্লান্তি। লাথির আঘাতে লোকটা উপুড় হয়ে ছিটকে পড়ল কঠিন পথের বুকে। ঝাপসা হয়ে এল তার
চোখের আলো।
সুখনরাম মুখের বয়লারে নতুন গুটকা এবং জর্দা ঢালতে ঢালতে দৃশ্যটা উপভোগ
করতে লাগল। দীর্ঘ লকডাউনের নিরিমিষ নির্ঝঞ্ঝাট দৈনন্দিনে এ এক আশ্চর্য রিলিফ। তার
চ্যালারা লোকটাকে মারতে মারতে যখন কিছুটা ক্লান্ত, সুখনরাম, গালভর্তি লালা নিয়ে
মুখ উঁচু করে বলল, “আবে, আব তো রহম কর, শ্বশুরা”। কার প্রতি করুণা - লোকটির প্রতি
নাকি তার চ্যালাদের এত পরিশ্রম থেকে বিরতির জন্যে? রাস্তায়
পড়ে থাকা নির্জীব লোকটাকে ছেড়ে দুজনেই উঠে দাঁড়াল। একজন নীচু হয়ে লোকটির জামার
পকেটগুলো হাতড়াল, কিছুই পেল না। গালাগাল দিয়ে একটা লাথি কষাল লোকটার শরীরে, তারপর
লোকটার কোমরের ধুতির কষি ধরে টান মারতেই ময়লা কাপড়ের গেঁজ বেরিয়ে পড়ল, ছোঁ মেরে
তুলে নিলে সেটা।
এখন আর মোটেই উদাসীন থাকার সময় নয়, মুখের লালা উগরে সুখনরাম ধমকে উঠল,
“ইধর লে আ শ্বশুরা”। বিচ্ছিরি
ময়লা কাপড়ের থলেটা নিয়ে সুখনরামের দুই চ্যালাই উপস্থিত হল, সুখনরাম ইশারা করল খুলে
দেখার জন্যে। ওই ময়লা গেঁজেতে হাত লাগাবার ইচ্ছে তার নেই, কে জানে কোথা থেকে কোভিড ধরে নেয়। পাঁচটা পাঁচশ আর কয়েকটা দুশো -
একশোর, কিছু দশ বিশের খুচরো নোটও রয়েছে। সুখনরাম এবার হাত বাড়াল, সব কটা নোট হস্তগত
করে, দুটো দুশর নোট দুই চ্যালাকে দিয়ে বাকি সবগুলি পকেটস্থ করল। করোনা
ভাইরাসের সংক্রমণ কোন কারেন্সি নোট থেকে কদাচ হয় না, এটুকু টনটনে জ্ঞান সুখনরামের
আছে।
টাকার মায়াতেই হয়তো বা স্নেহমাখা স্বরে রাস্তায় পড়ে থাকা লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“হারামি, মর তো নেহি গয়া?” এতক্ষণ চ্যালাদুটোরও কেমন সন্দেহ হল, হতভাগা সেই থেকে একভাবেই
পড়ে আছে। নড়া-চড়া করছে না কেন?
এ সময় হঠাৎই
শোনা গেল বাইকের আওয়াজ। ডানদিকে তাকিয়ে সুখনরাম আর তার চ্যালাদের মুখ শুকিয়ে গেল। রাউণ্ডে
বেরিয়ে থানাদার সায়েব এদিকেই আসছেন। তিনজনেই রাস্তায় নেমে সায়েবের অপেক্ষা করতে লাগল।
মোড়ের মাথায় এসে অদ্ভূত প্যাকিংসহ সাইকেল আর রাস্তায় পড়ে থাকা লোকটাকে দেখে থানাদার
সায়েব বাইক থামিয়ে দাঁড়ালেন। কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই সুখনরাম স্যালুট ঠুকে বলল, “সুবে
সুবে কেয়া আফৎ আ টপকা, দেখিয়ে না স্যার। এ লোকটা বিবিকে মেরে
ফেলে সাইকেলে গঙ্গার ঘাটে গিয়ে চুপচাপ পুড়িয়ে ফেলার তালে ছিল। আমরা পুছতাছ
করতেই হারামিটা মারামারি শুরু করে দিল!”
“কোথাকার লোক। কোথা থেকে এসেছে?”
“সেটাই তো, স্যার, আমরা পুছতাছ করছিলাম। মুর্দা সার্টিপিট দেখতে
চেয়েছিলাম, বাস, একদম ভড়কে মারতে এল”। থানাদার সায়েব, দূর থেকে লোকটার দিকে তাকিয়ে
বললেন, “উসকো মার তো নেহি ডালা?”
“এক আধ চড়-থাপ্পড় বাস্, ...অ্যায়সে ক্যায়সে মর শক্তা?”
রাস্তায়
মুখ থুবড়ে পড়েছিল লোকটার দেহটা। থানাদারের সন্দেহ হওয়ায় দেহটাকে চিৎ করার নির্দেশ দিল।
সুখনরামের দুই চেলা দুদিক থেকে উল্টে দিল দেহটা। লোকটার গোটা
মুখটাই রক্তাক্ত, স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে আকাশের দিকে। কিছুক্ষণ আগেও সে ছিল জিন্দা, কিন্তু এখন সেও মুর্দা, তার বিবির মত। কে
লিখবে, তার মুর্দা সার্টিপিট?
থানাদার সায়েব ক্রুদ্ধ মুখে ঘুরে তাকাল সুখনরামের দিকে, সপাটে এক
থাপ্পড় লাগাল তার গালে, “কিতনা লুটা, মাদার**”? গালে হাত বোলাতে বোলাতে সুখনরাম
মিনমিন স্বরে বলল, “কুছ ভি নেহি থা, সাব, ঢাইশ করিব, ভিখারি থা শালা”। থানাদার
সায়েব সুখনরামের জামার পকেটে হাত ঢুকিয়ে তুলে নিল সমস্ত টাকা। সেখান থেকে একটা দুশো
টাকার নোট সুখনরামের দুই চ্যালার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, “এক্খুনি একটা ভ্যানে তুলে
দুটো লাশকেই গঙ্গায় ফেলে দিয়ে আয়, কিসি কো পতা চলনা নেহি চাহিয়ে। কিছু গড়বড় নেহি
হোনা চাহিয়ে...”। কথাটা শেষ করল অশ্রাব্য অজাচারের আরও একটা গাল দিয়ে, তারপর বাইকে
স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেলেন থানাদার।
ভ্যানে পাশাপাশি শুয়ে গঙ্গার দিকে চলতে চলতে আকাশের দিকে এক দৃষ্টিতে
তাকিয়ে থেকে মুর্দা লোকটা তার পুঁটলি জড়ানো মুর্দা বিবিকে বলল, “বলেছিলি গঙ্গা
নাইবি, দেখ, আখির হম দোনোকোই এক সাথ গঙ্গাহি তো মিলা!”
পতিতোদ্ধারিণী গঙ্গায় অবগাহন স্নানে পাপ স্খালন হয়। হিন্দু উচ্চ বর্ণের
সমাজপতিরা গঙ্গা স্নান সেরে স্বর্গপথের পথিক হন। সেই পূতসলিলা প্রবাহেই বেওয়ারিশ
লাশ হয়ে ভেসে চলল হিন্দু ছোট জাতের এক দম্পতি। কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের সামান্যতম পরিচয়টুকুও
হারিয়ে যাবে তাদের গলিত শবদেহের সঙ্গে।
..০০..
মন্ত্রমুগ্ধ!
উত্তরমুছুনঅনেক ধন্যবাদ
উত্তরমুছুন