এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ১ "
শেষ পর্ব
ডাক্তাররা বর্ষায় আর
শীতে খুব খুশি হয়ে ওঠেন – কারণ রুগীর সংখ্যা বেড়ে ওঠে। উকিলরা বড়োলোক বখাটে ছোকরাদের
কেলোর কিত্তির কেস হাতে এলে আনন্দিত হন – রাতকে দিন করতে প্রচুর অর্থ আমদানি হয়।
ইন্টিরিয়ার ডিজাইনার, বড়োলোকের আদুরি বউ চারহাজার ব.ফু.র ফ্ল্যাট সাজিয়ে মনের মতো
বানিয়ে দেওয়ার বায়না নিয়ে এলে খুশি হন। অভিনেতারা নতুন ছবিতে অভিনয়ের জন্যে
প্রযোজকের ফোন পেলে নেচে ওঠেন। লেখা মনোনীত হয়ে বিখ্যাত পত্রিকার সম্পাদকের দপ্তর
থেকে ফোন পেলে, উঠতি লেখক আনন্দে আত্মহারা হয়ে আরেকটি গল্প লিখতে বসে যান।
ঠিক তেমনি, আন্তর্জাতিক
খ্যাতি সম্পন্ন, স্বর্ণপদক প্রাপ্ত, তান্ত্রিককূলচূড়ামণি বাবা কাত্যায়ন, আজ একটু
হাল্কা মেজাজে রয়েছেন। বাবা কাত্যায়ন এখন রত্নধরের আসার অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে
অপেক্ষা করছেন। সদরের দরজা এখন বন্ধ। তাঁর চেম্বারের লাগোয়া দরজা দিয়ে
বাড়ির ভেতর থেকে তিনি ধরাচূড়ো ছেড়ে, ফ্রেস হয়ে এসেছেন। তাঁর পরনে একখানা বারমুডা।
খালি গা। মাথার জটা উধাও হয়ে, মাথা ভর্তি টাক, অল্প আলোতেও চকচক করছে। কপালের
সিঁদুরের টিপ ধুয়ে এসেছেন। রুদ্রাক্ষের মালা, রঙিন পাথরের মালা সবই খুলে রেখে
এসেছেন বাড়িতে। এই বেশে দেখলে, কেউ তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন, স্বর্ণপদক
প্রাপ্ত, তান্ত্রিককূলচূড়ামণি বলে মনে করবে না, সে তিনি ভালোভাবেই জানেন। কিন্তু
তাও সারাদিন রাত ওই ধরাচূড়ো পড়ে বসে থাকা তাঁর পোষায় না।
তাঁর স্বনামধন্য বাবা,
তারাপীঠ-কামরূপ-কংকালীতলাখ্যাত বাবা জটেশ্বরের মাথায় কিন্তু অরিজিনাল জটা ছিল। আর সারাদিন
রক্তাম্বর আর ধরাচূড়ো সব পড়ে থাকতেন। তাঁর দাপটও ছিল আলাদারকমের। অনেক তাবড় তাবড় তালেবর মানুষজন
তাঁর পায়ে এসে বডি ফেলত। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার অনেক রাত করে লুকিয়ে আসত; যাতে
পাব্লিক না দেখতে পায়।
আজকালকার মতো তখনো গয়নার
দোকানের ভেতর বুকচাপা খুপরি চেম্বারে জ্যোতিষী বসার এত হিড়িক পড়েনি। এখনকার জ্যোতিষীরা
সবাই অরিজিনাল। পরশুরাম, অগস্ত্য, কপিল, মরীচি,
অত্রি, অঙ্গিরা, ভৃগু, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু, বশিষ্ঠ - পুরাণের কাল থেকে সবাই উঠে এসেছেন কলির
কলকাতায়। কলকাতার বুদ্ধিমান, বিজ্ঞানমনস্ক ও সংস্কৃতিবান বাঙালীকে ভাগ্য বিপর্যয়
থেকে বাঁচানোর জন্যে। তাতেও হচ্ছিল না, এখন আবার শুরু হয়েছে কম্পিউটারের ঠিকুজি
বানানো, তিনশ পঁচাশি টাকা আর জাতকের ডি.ও.বি., জন্মক্ষণ আর নার্সিংহোমের ঠিকানা
বলে দিলেই হল। পনের মিনিটের মধ্যে এ-ফোর সাইজে পনের পাতার ঠিকুজি হাতে পাওয়া যায়।
অষ্টোত্তরি দশা, বিংশোত্তরি দশা, ফলাফল, উপকার, প্রতিকার কিচ্ছু বাকি থাকে না।
বাবা জটেশ্বরের সময় একশ টাকার ঠিকুজি বানাতে
পনের-বিশ দিন লেগে যেত। তখনকার একশ টাকা আজকের হাজার দুয়েকের সমান। ঠিকুজি বানাতেন
ভটচাজ্জি আর চক্কোত্তি কাকুরা। তাঁদের সঙ্গে বাবার হিসেব ছিল ঠিকুজি প্রতি
চল্লিশটাকা। আমাদের ষাট টাকা নিট লাভ। ভটচাজ্জি আর চক্কোতি কাকুরা সরকারি আপিসে
চাকরি করতেন, মাইনে ছিল মাস গেলে দেড়শ দুশো টাকা। ঠিকুজি বানানোটা ছিল তাঁদের উপরি
রোজগার। একএকটা ঠিকুজি বানাতে দিন পাঁচ-ছয় সময় লাগত, রাত জেগে হলুদ হ্যান্ডমেড
পেপারের ওপর ফাউন্টেন পেনে লিখে রোল পাকিয়ে দিয়ে যেতেন সকালবেলা। এগরোল নয় – ভাগ্য-রোল।
সে সময় দিনকালই ছিল
অন্যরকম। লোকের মনে ভক্তি-ছেদ্দা ছিল। ভীতি-প্রীতি ছিল। এমন দিন আসছে, বাবা
জটেশ্বর বুঝতে পারতেন। এই লাইনে না এসে, তিনি তাঁর ছেলে কাত্যায়নকে লেখাপড়া করে,
চাকরি বাকরি দেখারই পরামর্শ দিতেন বারবার। কিন্তু হল না। বাবা জটেশ্বরবাবার দেওয়া
মাদুলি, তাবিজ, পাথর, রত্ন ধারণ করেও, কাত্যায়ন কিছুতেই আর ক্লাস এইটের গণ্ডি
পেরোতে পারল না। অগত্যা, জীবনে করে খাওয়ার পৈতৃক এই পথটাই কাত্যায়নবাবাকে বেছে
নিতে হল। রক্তাম্বর পড়ে বসতেই হল বাবার রেখে যাওয়া তেলচিটে রোঁয়াওঠা হরিণের চামড়ার
আসনে!
সামনের দেয়ালে বাবার বড়ো
একটা ছবি টাঙানো। মেঝেতে পাতা অজিনাসনের ওপর পদ্মাসনে বসা, জটাজুটধারী যোগী। সোজাসুজি তাকিয়ে আছেন বাবা কাত্যায়নের দিকে।
বাবা কাত্যায়নের মনে হল,
বাবা যেন বলছেন, “বারবার তোকে বলেছিলাম রে, কেতো, এ লাইনে আসিস না। এসব জিনিষ লোকে
আর তেমন খাচ্ছে না, পুজো-টুজো, তন্ত্র-মন্ত্রকে লোকে বুজরুকি ভাবে। তাছাড়াও তুই
একটু মেনিমুখো টাইপ, আমাদের লাইনে একটু গলাবাজি, হম্বিতম্বি করলে লোকে ভয় পায়,
সমঝে চলে, ভক্তি করে। তোর দ্বারা এসব হবে না। এখনো বলছি, সময় আছে, কাউকে ধরে-টরে
কোন নামকরা রত্ন বা গয়নার দোকানে ঢুকে পড়, বেঁচে যাবি। এ.সি.
লাগানো, ঝাঁ চকচকে চেম্বার, রোজগারের থার্টি পার্সেন্ট কমিসন দিয়েও, যা পাবি মন্দ
নয়। তার সঙ্গে এটাও থাক না সাইড বিজনেস হয়ে। আমার ভয় হচ্ছে রে, কেতো আর কদিন এই
ধান্দা চালাতে পারবি!”
বাবা কাত্যায়ন মনে মনে
বললেন, “আমার ভবিষ্যৎটা কী দাঁড়াবে একটু বলে দাও না, বাবা”। পিঠের ওপর কি যেন একটা
পড়ল থপাস করে। অবাক হয়ে বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে দেখলেন বাবা কাত্যায়ন, যেন বাবার
বাজখাঁই গলা শুনতে পেলেন, “চটি পেটা করবো, হতভাগা বাঁদর। তুই জানিস না, ভবিষ্যতের
কথা আমাদের দু একটা বাই চান্স লেগে গেলেও, আমরা ভবিষ্যৎ বদলাতে পারি না”।
ঘাড় ঘুরিয়ে বাবা
কাত্যায়ন দেখলেন, তাঁর বাঁদিক দিয়ে গোদা একটা টিকটিকি সরসরিয়ে চলে গেল, মা কালীর
মূর্তির আড়ালে। অ, ওই ব্যাটাই তবে সিলিং থেকে তাঁর পিঠে পড়েছিল, আর তিনি ভাবলেন
কিনা তাঁর বাবার চটির চাপড়! বাবা কাত্যায়ন মুখে হাল্কা হাসি নিয়ে দেয়াল ঘড়িটার
দিকে তাকালেন, আটটা বেজে ছেচল্লিস। মান্ধাতার আমলের ঘড়িটার সেকেণ্ডের কাঁটা এক এক
ঘর চলার সময় খুব চাপা একটা শব্দ শোনা যায়, ছিঃ ছিঃ ছিঃ ছিঃ। ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে ওই
শব্দটা কানে এলেই, তাঁর মনে হয়, ঘড়িতো নয়, শালা বিবেক!
রত্নধর পাশের ঘরের দরজা
ঠেলে, ঘরে ঢুকলো। বাবা কাত্যায়ন খেঁকিয়ে উঠলেন একটু, “কী করছিলি, কি, এতক্ষণ”?
“ব্যাটা টাকা নিয়ে
আসেনি। মোটে পাঁচশ টাকা অ্যাডভান্স ঠেকাতে এসেছিল। বাকি অ্যাডভান্স কাল দিয়ে যাবে”।
“তুই কত চেয়েছিল?”
“দশ হাজার”।
“দঅঅঅঅশ হাআআআআজার?
রতনা, দিন দিন তুই একটা চামার হয়ে উঠছিস। তা শেষমেষ কত দিল?”
“দশই দিল, বউকে বসিয়ে
রেখে, এটিএম থেকে তুলে আনল”। ঘড়ির ছিঃ ছিঃ ছিঃ ছিঃ আওয়াজটা আবার যেন বাবা
কাত্যায়নের কানে এল।
বাবা কাত্যায়ন খ্যাঁ
খ্যাঁ করে হেসে নিলেন খানিকটা, বললেন, “তুই পারিস ও বটে”। তক্তপোশের তলা থেকে একটা
বোতল আর দুটো গেলাস বের করতে করতে রত্নধর বলল, “না পারলে হবে, কেতোদা? তুমি যা
পাইকারি হারে রত্ন ধারনের কথা বললে, কাল বিকেলে যদি কোন গয়নাদোকানের জ্যোতিষীর
কাছে যেত, সে আর ফিরে আসত তোমার কাছে”?
দুটো গেলাসে পরিমাণ মতো মদ ঢেলে রত্নধর তেলচিটে খাবার জলের ঢাউস বোতল থেকে
জল ঢালল, কলকল আওয়াজে।
বাবা কাত্যায়নের দিকে
একটা গেলাস এগিয়ে দিতে দিতে বলল, “তুমি মুরগি যখন ধরেছ, কেতোদা, আমি জবাই না করে
ছাড়ি? এই যে আজ দশহাজার টাকা নিয়ে ওদের গেঁথে ফেললাম, যাক না কোথায় যাবে? ঠিক ফিরে
আসবে দেখে নিও”।
বাবা কাত্যায়ন, গেলাসের
মদে অনামিকা ডুবিয়ে, মাটিতে তিনবার ছিটে ফেললেন। তারপর বললেন, “চিয়ার্স”। রত্নধরও
চিয়ার্স বলল, তারপর দুজনে একসঙ্গেই গেলাসে চুমুক দিলেন।
চুমুক দেওয়ার পর গেলাস
মেঝেয় রেখে রত্নধর বলল, “একসঙ্গে এতগুলো রত্ন না দিলেই পারতে, কেতোদা, কাস্টমার
চমকে যায়। নেহাত বউটা বোকা-সোকা, নইলে এ মাল নিগ্ঘাত কেটে পড়ত”।
তক্তপোষের তলা থেকে একটা
কাঁচা লংকার প্যাকেট আর নুনের ডাব্বা বের করল রত্নধর। একটা খবরের কাগজ এনে তার
মধ্যে গোটা বিশেক লংকা আর এক খাবলা নুন রাখল।
কচমচিয়ে দুটো লংকা
চিবিয়ে, বাবা কাত্যায়ন বলল, “ধ্যাত শালা,
তোরা ওসব বুঝবি না, আমি বুঝি। কেটে যাবে বলে, এ মক্কেল ধরা দেয়নি। বেটাদের সাধ্যি নেই
কিন্তু সাধ অনেক। নিজেদের মনে মনেই সারাটাদিন এরা ঘ্যানর ঘ্যানর করে, বুঝেছিস?
বিকাশদার মতো একটা ঝাঁ চকচকে ফ্ল্যাট চাই, কিন্তু বিকাশের মতো দারুণ কাজ করে
প্রমোশন পাওয়ার ক্ষমতা নেই। পরিমলদার মতো একটা গাড়ি চাই, পরিমলদা চাকরি ছাড়াও
অনলাইনে শেয়ার কেনাবেচা করে। অনুপদার মতো দু বছরে একবার ফরেন ট্যুর করতে চাই, অথচ
অনুপদার মতো ঠিকাদার কিংবা সাপ্লায়ারদের থেকে কমিসন খাওয়ার সাহস নেই। মিলনের
ছেলেটা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে, তুখোড় ইংরিজি বলে আর হেবি স্মার্ট, স্কুলের ফিজ বছরে
সাড়েচার লাখ...”।
অবাক হয়ে রত্নধর বললে, “তুমি
গুরু এ লোকগুলোর নাম জানলে কি করে, কেতোদা? তুমি এত ভালো হাত দেখতে পারো,
বন্ধুবান্ধব, কোলিগদের নামও বলে দিতে পারো? তুমি, মাইরি জিনিয়াস”।
বাবা কাত্যায়ন গেলাসে আর
এক চুমুক দিয়ে বললেন, “আরে বাবা নামটা ছাড় না, নাম অন্যকিছু হতে পারে; ধরে নে,
এক্স, ওয়াই জেড, কি আসে যায়? আসল ব্যাপারটা হল, ওদের মতো ও সবকিছু পেতে চায়। আর
সেটা না পাওয়ার জন্যে মনের মধ্যে ভরপুর হতাশা। আমার কাছে এসেছে, অলৌকিক কোন
রাস্তায় যদি পাওয়া যায়! যজ্ঞ-টজ্ঞ করে, কিংবা হাতে রত্ন ধারণ করে...”।
“হুঁ, বুঝলাম। কিন্তু ওর
ছোটবেলায় কিছু একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল, এটা কি করে ধরলে”?
গেলাসে লম্বা চুমুক দিয়ে
কাত্যায়ন মুখে দারুণ বোদ্ধার মতো মুচকি হাসি নিয়ে বলল, “একটা ছেলে দুরন্ত বয়সে
কিছু বিপদই যদি না ঘটায়, তো সে ছেলে ছেলেই নয়, ম্যাদামারা ঢ্যাঁড়স। তেমন কিছু না
হলেও, ছোটবেলায় জমিয়ে পক্স হয়নি, বা হাম-মিলমিলে হয়নি, অথবা টাইফয়েড হয়নি, কিংবা
টনসিল অপারেশন হয়নি, এ হতেই পারে না। ছোটবেলায় সাইকেল চড়া শিখতে গিয়ে আমি দাঁত
ভেঙেছিলাম, এই দ্যাখ। সবারই হয়। তোর ছোটবেলায় কিচ্ছু হয়নি”?
“হয় নি আবার, স্কুলের
সাতফুট পাঁচিল টপকে পালাতে গিয়ে, মেরেছিলাম লাফ, বাঁ পায়ের গোড়ালির হাড় সরে গিয়ে
কেলেংকারি কাণ্ড। আজও পূর্ণিমা অমাবস্যায়, বাঁ পাটা কন কন করে”।
গেলাসে চুমুক দিতে দিতে
বাবা কাত্যায়ন তাকিয়ে রইলেন, রত্নধরের দিকে, তারপর বললেন, “শেষমেষ কতোয় রফা করলি”?
রত্নধর খুঁ খুঁ করে
হেসে, গেলাসে লম্বা চুমুক দিল, বলল, “একলাখ আশি দিয়ে শুরু করেছিলাম, একলাখ
পঞ্চান্নয় ফাইন্যাল হল”।
“একলাখ পঞ্চান্ন? তুই তো
ডাকাত রে, রত্নধর। এত দাম?”
“লাও, যার জন্যে করি
চুরি, সেই বলে চোর। সাতখানা রত্ন, তার সঙ্গে সোনার আংটি, রূপোর আংটি, রূপোর চেন,
বাণি, তুমি কি ভাবছ বিশ-পঁচিশে হয়ে যাবে”?
বাবা কাত্যায়ন একটু
উৎসুক হয়েই জিগ্যেস করলেন, “তা, ফেলে থুয়ে, আমাদের কত থাকবে মনে হয়”?
মৃদু হেসে রত্নধর বলল, “চল্লিশতো
থাকা উচিৎ, কাল “রত্নখনি”তে কথা বললে ফাইন্যাল বোঝা যাবে”।
বাবা কাত্যায়নের গলায়
এখন যেন একটু অসহায় সুর, তিনি বললেন, “দ্যাখ কি হয়। চল্লিশও নেহাত মন্দ নয়।
এল.আই.সি.র একটা প্রিমিয়াম বাকি পড়ে গেছে, ওটা দিয়ে দেওয়া যাবে”।
দুজনের খালি গেলাসে আবার
মদ আর জল দিয়ে ভরে তুলল রত্নধর, বাবা কাত্যায়নের দিকে গেলাস বাড়িয়ে জিগ্যেস করল, “বউয়ের
হাত দেখে স্বামীর জন্মমাসটা কি করে ঠিকঠাক বলে দিলে বলো তো, কেতোদা”?
“ধুর ব্যাটা, ঠিকঠাক
বলতে পারলাম কই? আন্দাজ করেছিলাম, চোত নয়তো মাঘ। মিলল না, বলল আষাঢ়”।
“সে ঠিক আছে, কিন্তু
চোত, মাঘ, আষাঢ় - তিনমাসের ফল যে একই, সেটা তো ধরে ফেলেছিলে”!
গেলাসে চুমুক দিতে গিয়ে
বিষম খেলেন, বাবা কাত্যায়ন। সামলে নিয়ে হ্যা হ্যা করে হাসতে হাসতে বললেন, “ও ওই
শ্লোকটা? “চৈত্রমাঘাষাঢ় মাসঞ্চ আপ্নোতি জাতকঃ সমফলং”? ও শ্লোকের রচয়িতা কে জানিস?
বাবা কাত্যায়ন শাস্ত্রী। হে হে হে হে। সংস্কৃত শ্লোকটোক শুনলে পাব্লিক খুব বিশ্বাস
করে ফেলে, ভাবে শাস্ত্রে আছে। মোক্ষম কাজ দেয়। ও যদি ভাদ্র বলতো, তাহলে শ্লোকটা হত
“চৈত্রভদ্রামাঘ মাসঞ্চ আপ্নোতি জাতকঃ সমফলং”!
রত্নধর বাবা কাত্যায়নের কথায়
খুব হাসতে লাগল খুঁ খুঁ করে, বাবা কাত্যায়নও হাসতে হাসতে গেলাসে লম্বা চুমুক
দিলেন, তারপর শসা চিবোনোর মতো কচকচিয়ে চারটে কাঁচালংকা চিবিয়ে, এক চিমটি নুন
ফেললেন জিভে, তারপর বললেন, “মানুষের আর একটা বড়োগুণ কী বলতো, নিজেকে সবসময় “একঘর”
ভাবা। যে কোন বিষয়ে ব্যাপক জানে। বোকা, হাঁদা বললে রেগে যাবে, কিন্তু সাধাসিধে
ভালোমানুষ বল, হেবি খাবে। ঘরে বউ, অফিসে বস - যা বলে, মেনে নেয়, তেলকে জল বললে
কিংবা জলকে তেল বললে, যা বলেছেন, স্যার বলে। কিন্তু তাকে তুই স্পষ্টবাদী বল, হেবি
ভাও খাবে। দুটো পয়সার জন্যে আর নিজের ধান্দার জন্যে, লোক যা খুশি করে, কিন্তু তাকে
ন্যায়বাদী, বিবেকি বল, বুক ফুলে এই অ্যাত্তোটা “ক্যাও” খেয়ে নেবে”।
লম্বা চুমুকে গেলাস খালি
করে, বাবা কাত্যায়ন হ্যা হ্যা হ্যা হ্যা করে হাসতে লাগলেন। রত্নধর বলল, “আরেকটু
দেব নাকি, কেতোদা, তুমি আজ মাইরি চোঁ চোঁ করে টানছো। নেশা হয়ে গেলে, বউদি খুব রাগ
করবে”।
“চোপ শালা। তান্ত্রিকদের
কোনদিন নেশা হয় না। আমায় কি পেঁচো পেয়েছিস, যে গন্ধ শুঁকলেই মাতাল! মাই ফাদার ওয়াজ
এ তান্ত্রিক, আই অ্যামি হিজ সান, ওনলি সান, আমিও তান্ত্রিক। আমাদের মদে নেশা হয়
না, রে ব্যাটা। “সুরা পান করিনে আমি, সুধা খাই জয় কালী বলে। মন-মাতালে মাতাল করে,
মদ-মাতালে মাতাল বলে” “। হেঁড়ে গলায় গান গেয়ে উঠলেন বাবা কাত্যায়ন। রত্নধর চমকে উঠে,
ঠোঁটে আঙুল দিয়ে আস্তে গাইতে বলল।
“কেতোদা, কি হচ্ছে কি?
বৌদি শুনতে পেলে আর রক্ষে থাকবে না!”
বৌদির কথায় বাবা
কাত্যায়ন একটু যেন ঝিমিয়ে গেলেন। তাঁর বৌ পুতুলরাণিদেবী তাবিজ-মাদুলি, তন্ত্র–টন্ত্রের ধার
ধারেন না। কোমরের কষিতে শক্ত করে শাড়ির আঁচল বেঁধে সামনে এসে দাঁড়ালে, বহুলোকের
ঘাড় থেকে ভুত-প্রেত নেমে যায়। বাবা কাত্যায়নের মা নমিতাদেবীও এমনই ছিলেন। সত্যি
বলতে তিনিই স্বর্গে যাবার আগে বৌমাকে পই পই করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, এই ভুরুংগে
বজ্জাত পুরুষদুটোকে কিভাবে জব্দ করে রাখতে হয়।
তিনি বলতেন, “বৌমা, আমার
ছেলে বলে, কোলে ঝোল টেনে বলবো, এমন শাউড়ি আমায় পাওনি। ওই বাপ-বেটাকে একটু ঢিলে
দিয়েছ কি, নাগালের বাইরে চলে যাবে। ত্যাকন আর কেঁদেও কূলকিনেরা পাবে না, বৌমা।
সংসারটা তোমার, এতটুকু বেচাল দেখলেই শক্ত হাতে ন্যাজ চেপে ধরবে”। বাবা কাত্যায়ন
দেখেছেন, তাঁর মায়ের হাতে বাবার ন্যাজ কেমন ধরা ছিল। কাজেই বৌকে তিনি খুব সমঝে
চলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে ভেতর বাড়ির দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলেন একবার, ভেজানো আছে দেখে
একটু নিশ্চিন্ত হলেন।
গেলাসে হাল্কা একটা চুমুক দিয়ে বললেন, “হ্যারে, রত্না, টাকা পয়সার
হিসেব কিছু বলছিস না যে, বড়ো?”
“বললাম যে, কেতোদা।
তোমার কাছে কিচ্ছু লুকোই নি তো”।
“অ্যাডভান্স থেকে হাজার
পাঁচেক ছাড়”।
“অসম্ভব কেতোদা, “রত্নখনি”কে
অন্ততঃ আট না দিলে ওরা কিচ্ছু বানাবে না। তোমার মক্কেলের কাছে কথার খেলাপ হয়ে
যাবে। তুমি এখন দেড়হাজার রাখো, দাদা, আমি পাঁচশ” রাখছি। তোমারও চলুক, আমারও চলুক।
তোমার তো তাও মায়ের দান-পেটি আছে, তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে বলো দেখি, দাদা?”
রত্নধর দীর্ঘশ্বাস ফেলে দেড়হাজারটাকা তুলে দিল, বাবা কাত্যায়নের হাতে। বাবা
কাত্যায়ন টাকাকটা গুণে নিয়ে, বারমুডার পকেটে ঢোকালেন।
তারপর গেলাসে আরেক চুমুক
দিয়ে বললেন, “পার্টিকে কবে আসতে বলেছিস?”।
“পরের মঙ্গলবার বলেছি।
কাল দেখি “রত্নখনি” কি বলে? রত্নখনির মালিক আঢ্ঢিবাবুর আজকাল বড্ডো খাঁই জানো,
দাদা। দোকানে সব রেডিমেড মাল আছে, একটু পালিশ করে দেবে, ব্যস। কিন্তু এমন কথা বলবে
যেন, আমাদের থেকে অ্যাডভান্স নিয়ে খাদানে লোক নামাবে রত্ন তুলতে, আর সাগরে ডুবুরি
ডোবাবে মুক্তো তুলতে। ক’বছর আগেও নিজে ফুৎনলে ফুঁ মেরে মুর্শিদাবাদের চোরাই সোনা
দিয়ে নাকছাবি বানাতো। আজ তার দোকানে দুজন কর্মচারী, পাঁচজন কারিগর, চারজন জ্যোতিষী,
চার শিফটে দুনিয়ার লোকের ভাগ্য ঘুরিয়ে দিচ্ছে। আঢ্ঢিবাবু কোনদিন কাউকে হাতও দেখায়
না, আর হাতে বিয়ের আংটি ছাড়া কোন আংটিও পড়ে না। অথচ দেখ, ব্যাটার কি রকম ভাগ্য
ঘুরে গেল। এখন ক্যাশ কাউন্টারে বসেবসে টাকা গোনে, আর ঠ্যাং নাচায়”।
রত্নধরের এই কথায় বাবা
কাত্যায়নও একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে গেলাসে একটা লম্বা চুমুক দিলেন। বললেন, “ভাগ্য কি
আর বদলানো যায় রে, রত্না? যায় না। তাই যদি হতো ক্লাসে সবাই ফাস্ট হতো। সেকেণ্ড বলে
কিছু থাকতো না। দেশের সব লোক প্রধানমন্ত্রী হতো কিংবা টাটা-আম্বানি হতো, অথবা রবি
ঠাকুর হতো। ওসব হতে গেলে এলেম লাগে রে, ক্ষ্যাপা, সে কি আর ওই আঙুলে পাথর ঘষলে হয়?
আমার বাবাই কি আমার আঙুলে কম পাথর পড়িয়েছিলেন, কী হয়েছে? সেই তো তান্ত্রিক সেজেই
লোককে ভুজুং দিচ্ছি”। গেলাস খালি করে, আবার বললেন, “বাড়ি যা রত্না, অনেক রাত হলো।
তবে অন্য কিছু ভাব, এইসব করে বেশিদিন চলবে বলে মনে হয় না”।
“তোমার মতো ন্যায়বাদী,
বিবেকী, তত্ত্বজ্ঞানী, স্পষ্টবাদী এবং ক্ষণ-ক্রোধী
ব্যক্তিও যদি এমন কথা বলে, তাহলে আমাদের কী হবে, দাদা”? রত্নধরের এই কথায় বাবা
কাত্যায়ন কটমট করে তাকালেন, কিছু বললেন না।
বোতল, গেলাস, লংকা, নুন তক্তপোশের
তলায় আবার চালান করে দিয়ে রত্নধর মুচকি হেসে বলল, “আসছি, তাহলে, দাদা? কাল বিকেলে
আবার দেখা হবে”।
বাবা কাত্যায়ন নিঃশব্দ ঘরে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। বিবেকী ঘড়িটা সুযোগ বুঝে একভাবে বলে চলেছে ছিঃ ছিঃ ছিঃ ছিঃ...। চেম্বারের আলো নিভিয়ে বাবা কাত্যায়ন ভেতরে গেলেন, তাঁর হাতে কড়কড়ে দেড়হাজার টাকা। ছোট্ট উঠোন পেরোতে পেরোতে ডাক দিলেন, “কই রে মিনু, তোর মা কোথায় গেল রে...”।
--০০--
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন