ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "
ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "
ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "
ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "
আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "
ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "
ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "
ছোটদের প্রবন্ধ -গল্প - " আগুনের পরশমণি - পর্ব ১ "
এর আগের গল্প - " মানিকজোড় "
এর আগের পর্ব - " ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ১ "
পর্ব - ২
৩
সূর্য ঘড়ি, জল ঘড়ি দিয়ে যে সূক্ষ্ম সময়ের পরিমাপ করা যায় না, তাছাড়া তাদের
নানান সমস্যার কথা গত পর্বেই লিখেছি। সে সব সমস্যা মিটিয়ে নতুন কিছু বানিয়ে সময়ের
পরিমাপ করার চেষ্টা কম হয়নি সে যুগে। কিন্তু দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর এমন ঘড়ি তৈরি
সম্ভব হল এই সেদিন, মোটামুটি ৯৯৬ খ্রীষ্টাব্দে। এই ঘড়িগুলিই প্রথম দিককার
যান্ত্রিক ঘড়ি। এই ঘড়ি বানানোর বিষয়ে সে যুগে কাদের অবদান সবথেকে বেশি, সেটা জানলে
ভীষণ আশ্চর্য হবে! সে যুগে যান্ত্রিক ঘড়ি বানানোর ব্যাপারে সব থেকে বেশি আগ্রহ ছিল
চার্চের monk বা সন্ন্যাসীদের। ৯৯৬ সালে আবিষ্কার করা প্রথম যে
যান্ত্রিক ঘড়ির কথা উল্লেখ করলাম, সেই ঘড়ি যিনি বানিয়েছিলেন, তিনিই পরবর্তী কালে
জার্মানের ম্যাগড়েবুর্গ (Magdeburg) শহরের পোপ হয়েছিলেন, নাম পোপ সিলভেস্টা
টু (Pope Sylvester
II)। চার্চের ধর্মীয় অনুষ্ঠান,
রীতিনিয়মের জন্যে সময়ের সূক্ষ্ম পরিমাপ এতটাই জরুরি ছিলে যে, ধর্ম আলোচনার সঙ্গে
সঙ্গে ঘড়ি বানানোতেও তাঁরা গভীর মনোনিবেশ করতেন। তবে সে ঘড়ির আর অস্তিত্ব নেই।
সবচেয়ে প্রাচীন যে যান্ত্রিক ঘড়ি লণ্ডন সায়েন্স মিউজিয়ামে রাখা আছে, সেটি চতুর্দশ
শতাব্দীর এক সন্ন্যাসীর বানানো। তাঁর নাম পিটার লাইটফুট (Peter Lightfoot),
তিনি গ্ল্যাসটনবেরির (Glastonbury) সন্ন্যাসী ছিলেন।
যান্ত্রিক
ঘড়ির রহস্যটা বুঝতে গেলে প্রথমেই এস্কেপমেন্ট (Escapement) ব্যাপারটা বোঝা দরকার।
ইংরিজিতে to escape মানে পালানো, সে তো জানোই। যান্ত্রিক
ঘড়ির মধ্যে পালানো আর ধরে ফেলা এই চলতে
থাকে নিরন্তর। পাশের ছবিটা দেখলে ব্যাপারটা বুঝতে সুবিধে হবে।
ছবিতে দেখ অনেক খাঁজকাটা একটা লোহার চাকা রয়েছে, যার কেন্দ্রে একটা পিন
দিয়ে তাকে এক জায়গায় ধরে রাখা হয়েছে। ধরে আছে মানে চাকাটা নড়াচড়া করতে পারবে না,
কিন্তু পিনটাকে অক্ষ করে ঘুরতে পারবে। এই
চাকার পিছনে ঝোলানো থাকে তিরের ফলার মতো দেখতে লম্বা লোহার একটা কাঠি, ওই তিরের
ফলার দুই ধারে হুকের মতো খাঁজ কাটা আছে। ওই তিরের মতো কাঠিটাও নড়বে চড়বে না,
কিন্তু তার ভরকেন্দ্রে, মাথার কাছে ছোট্ট ছিদ্রটাকে অক্ষ করে দু পাশে দুলতে পারবে।
এইবার ওই লোহার কাঠিটাকে নির্দিষ্ট মাপে যদি দোলানো যায়, তাহলে তার
হুকের ধাক্কায় লোহার চাকাটা ঘুরবে, কিন্তু দুলতে থাকা তিরের অন্য হুকের জন্যে
চাকাটা মাত্র এক ঘাটের বেশি ঘুরতে পারবে না। অর্থাৎ তিরের ধাক্কায় চাকাটা যেন
পালাতে চাইছে, কিন্তু অন্য ঘাটটা চাকাটাকে পালাতে দিচ্ছে না। এই ব্যাপারটাই
এস্কেপমেন্টের মূল তত্ত্ব।
এবার তীরের মতো কাঠিটাকে দোলানোর জন্যে প্রথমদিকে ভারি
ওজন ঝোলানো হত, পরের দিকে স্প্রিংয়ের সঙ্গে পেণ্ডুলাম এবং তারও পরে ব্যলান্স-হুইল
(balance wheel) ব্যবহার করা হত।
খাঁজকাটা ওই চাকার নাম হুইল গিয়ার (wheel gear)। দুলতে
থাকা ওই কাঠি আর হুইল গিয়ারের ধাক্কার থেকেই আওয়াজ হত “টিক-টক” বা “টিক-টিক” আর
সেই থেকে কিছু দিন আগে পর্যন্ত, ঘড়ি আর ওই আওয়াজ সমার্থক হয়ে উঠেছিল।
ভারি ওজন ঝোলানো ঘড়িগুলো আকারে বিশাল বড়ো আর ভারি হত। এই
ঘড়িগুলি সাধারণতঃ বড় বড়ো চার্চের মাথায় কিংবা শহরের প্রধান জায়গায় বেশ উঁচু ঘড়িঘর
বানিয়ে তার মাথায় বসিয়ে রাখা হত। ওই সব ঘড়িতে প্রহর ঘোষণার জন্যে ঘড়ির সঙ্গে বড় বড়
ঘন্টাও রাখা হত। প্রতি ঘন্টায় সে সব ঘন্টা গম্ভীর আওয়াজ তুলে বাজত, ঢং ঢং। শহরের
লোক নানান কাজে ব্যস্ত থাকলেও ঘন্টা শুনে বুঝতে পারতো কটা বাজে। আমাদের দেশে সময়ের
পরিমাপ ঘটিকা বা ঘন্টা (hour) এইভাবেই
পেতল বা অন্য ধাতু দিয়ে বানানো ঘন্টা (bell)-র
সঙ্গে প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে।
পেণ্ডুলাম ঘড়ি
১৫৮০ সালে ইটালির গ্যালিলিও গ্যালিলি পেণ্ডুলাম আবিষ্কার করলেন এবং তিনি আবিষ্কার করলেন আশ্চর্য এক তত্ত্ব। একটি সাধারণ পেণ্ডুলাম বলতে সুতোয় ঝোলানো একটি বল বা ওজনকে বোঝায়, ওই সুতো যতো সূক্ষ্ম ও হাল্কা হবে পেণ্ডুলাম তত ভালো কাজ করবে, অবিশ্যি সুতোটা যথেষ্ট শক্তও হতে হবে, যাতে বলটি ছিঁড়ে না পড়ে যায়। এবার ওই সুতোর অন্য প্রান্তটি কোন একটি কীলক বিন্দুতে (pivot point) ঝুলিয়ে, যদি দুলিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে সুতোয় বাঁধা বলটি নির্দিষ্ট গতিতে ডান থেকে বাঁদিকে সমান দূরত্বে দুলতে (oscillate) থাকে। আদর্শ শর্ত (ideal conditions) অনুযায়ী এই বলটির অনন্তকাল একই দূরত্বে, একই গতিতে দুলতে থাকার কথা, কিন্তু বাস্তবে তা হয় না, কারণ, সূক্ষ্ম ভরহীন সূতো (mass-less rod or thread) দিয়ে ভরগোলক (mass bob) ঝোলানো অসম্ভব, যাকে কেন্দ্র করে পেন্ডুলাম দুলবে, সেই কীলকটি ঘর্ষণহীন (frictionless pivot) হওয়াও অসম্ভব। তাছাড়া আছে বাতাসের ঘর্ষণ।
ওপরের ছবিদুটি হিউজেন্স সায়েবের বানানো প্রথম পেণ্ডুলাম ঘড়ির ছবি। বাঁদিকের ছবিটি বাইরে থেকে ঘড়ির চেহারা, আর ডানদিকের ছবিটি ঘড়ির অন্দরের কলকব্জার ছবি। দুটি ছবিতেই পেণ্ডুলামের গোলকদুটি চিনতে পারছো নিশ্চয়ই। ওই পেণ্ডুলামের সাহায্যে এস্কেপমেন্ট সিস্টেম কাজে লাগিয়ে এই ঘড়ি বানানো হয়েছিল। প্রথম দিকের এই ঘড়িতে দিনে মাত্র এক মিনিটের ভুল (error) হতো!
| গ্র্যাণ্ডফাদার ক্লক |
১৭০০ সালের এরকমই একটি গ্র্যাণ্ডফাদার ক্লক দোরাব টাটাজি
মুম্বাইয়ের প্রিন্স অব ওয়েল্স্ মিউজিয়ামে দান করেছিলেন। এই ঘড়ির ডায়ালে তামিল
ভাষায় ১ থেকে ১২ সংখ্যা লেখা আছে। মনে করা হয়, ঊনিশ শতকের প্রথম দিকে মাদ্রাজের
শিল্পকলা স্কুল থেকে এটির বাইরের বাক্সটি বানানো হয়েছিল, সেই সময়েই তামিল ভাষায়
সংখ্যাগুলি লেখা হয়েছিল।
ক্লিমেন্ট সায়েবের পরে কয়েক বছরের মধ্যে পেণ্ডুলাম ও এস্কেপমেন্ট পদ্ধতির অনেক উন্নতি হয়ে ঘরের দেওয়ালে ঝোলানোর মতো সুদৃশ্য ছোট ঘড়ি, প্রচুর পরিমাণে বানানো শুরু হয়ে গেল। সে সব ঘড়ি আমাদের ছোটবেলাতেও অনেক উচ্চবিত্ত বাড়িতেই দেখা যেত। এইগুলিকেই আমরা দেওয়াল-ঘড়ি (wall clock) বলতাম
আকারে বড়ো হোক কিংবা ছোট, পেণ্ডুলাম ঘড়ি, বড় হল ঘরের মেঝেয় বসিয়ে কিংবা ঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে রেখে সময় দেখার জিনিষ। পথে ঘাটে, দূর বিদেশের অপরিচিত জায়গায় সময় জানতে গেলে সে ঘড়ি কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়। তাছাড়া পেণ্ডুলাম ঘড়ি ভালো কাজ করে, একজায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে অথবা ঝুলে থাকলে, একটু নড়াচড়া হলেই ঘড়ি বিগড়ে যেত। অতএব, আকারে ছোট্ট, পকেটে রাখা যায় এবং ঠিকঠাক সময়ও দেখা যায় এমন ঘড়ির ভাবনা চিন্তা শুরু হয়ে গেল।
তথ্য ও চিত্র ঋণঃ - আই আই টি, কানপুর ও উইকিপিডিয়া।
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন