এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
আরেকটি ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
৮
সুনেত্রর মোবাইলটা যখন বেজে
উঠল, তখন পৌনে বারোটা। স্ক্রিনে “কনি কলিং” দেখে সুনেত্র বেশ অবাক হল। এই কদিনে
সুকন্যা একবারও ফোন করেনি। তাদের আলাপচারিতা যা কিছু হচ্ছে সবই মেলে। তার চেম্বারে
সেসময় একজন পেশেন্ট ছিল। বয়স্ক লোক, রিটায়ার্ড, প্রায়ই আসেন। বিপত্নীক, একমাত্র
মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, একমাত্র ছেলে আর ছেলের বউ চাকরি করে। সারাটা দিন বুড়োর সময়
কাটে না। তাই পয়সা খরচ করে তার কাছে আসেন অলীক অসুখের গল্প করতে। আজও এসেছে, তার
কমপ্লেন – “ডাক্তার বাবু, কদিন ধরেই সকালবেলায় বাওলটা ঠিক সাফ হচ্ছে না। তার ওপর
মলের রংটাও...”। ফোনটা ধরে সুনেত্র ইশারায় বৃদ্ধকে একটু ওয়েট করতে বলে, চেম্বারের
বাইরে এল, “হ্যাঁ বল”। বাইরে বসার ঘরেও চারজন বসেছিল,
তাকে বেরোতে দেখে সকলে সম্ভ্রমে নড়ে চড়ে বসল। কথা শুনতে শুনতে প্যাসেজ পার হয়ে নিজের
বসার ঘরে ঢুকল সুনেত্র।
“ব্যস্ত? এখন কথা বলা যাবে”?
কনির স্বর একটু চাপা আর যেন কান্না ধরা।
“হুঁ, বলা যাবে। কি হয়েছে তোর?
শরীর খারাপ”?
“কেন বলোতো”?
“গলাটা কেমন যেন ধরা ধরা
শোনাচ্ছে। কাঁদছিলি নাকি”? সুকন্যা কোন উত্তর দিল না।
“কি হল, উত্তর দিচ্ছিস না?
শশাংকবাবু কিছু বলেছে? ঝগড়া-টগড়া হয়েছে নাকি”? কোন উত্তর পেল না সুনেত্র। কিন্তু
ফোনে শুনতে পাচ্ছিল সুকন্যার কান্নাময় নিঃশ্বাসের শব্দ।
“আরে, দাম্পত্যে একটু-আধটু কলহ
হয়েই থাকে। আমার চেয়ে তোর তো অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। সেই কি যেন পড়েছিলাম, বহ্বারম্ভে
লঘুক্রিয়া। এর জন্যে এত কান্নাকাটি করছিস কেন”? সুনেত্র হা হা করে একটু হাসল।
“বাজে বকা রাখো। আজ একবার আসবে,
প্লিজ। তোমাকে...” সুকন্যা কথাটা শেষ করল না। অধীর অপেক্ষায় সুনেত্র কানের মধ্যে
চেপে ধরল ফোনটা। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরেও সুকন্যা কিছু বলল না দেখে সুনেত্র আবেগের
সঙ্গে জিজ্ঞেস করল, “কি হয়েছে রে, কনি”?
“তোমাকে...তোমাকে খুব দেখতে
ইচ্ছে করছে, সুনুদা। আসবে, প্লিজ”।
“এখন? এখনই? আমি তো এখন
চেম্বারে। পেশেন্ট রয়েছে চার-পাঁচজন। ঘন্টাখানেক পরে গেলে চলবে না? এই ধর দেড়টা
নাগাদ”?
“চলবে। এসো কিন্তু, প্লিজ”।
সুকন্যা ফোনটা কেটে দিতে,
সুনেত্র কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল ঘরের মাঝখানে। কনি কী চাইছে তার কাছে, মধ্য দুপুরের
এই নির্জনে? দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে ফিরে গেল তার ছেড়ে আসা চেম্বারে, তার জন্যে
অপেক্ষারত বৃদ্ধের কোষ্ঠ সাফাইয়ের নিদান দিতে। যাওয়ার পথে ফোনটা আবার বেজে উঠল,
কনি কলিং।
“হ্যাঁ বল, আবার কি হল”?
“তোমার তো নিশ্চই খাওয়া হয়নি
দুপুরে”?
“না”।
“তাহলে তুমি এলে আমার সঙ্গেই
তুমি খাবে”।
“এসবের কি খুব দরকার ছিল”?
“ছিল নয় আছে। তুমি এসো, তখন কথা
হবে”। ফোন কেটে দিল কনি।
এখন কনির স্বর স্বচ্ছ, কান্নার
বদলে তার কণ্ঠে খুশির আবেশ।
চেম্বারে এসে সুনেত্র দেখল, বৃদ্ধ আগের মতোই নিশ্চিন্তে বসে আছেন, কোন তাড়া নেই। সে চেম্বারে ঢুকতেই বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন, “এমার্জেন্সি কল বুঝি”? সুনেত্র তখনো কনির চিন্তা থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি, তাই আনমনে জিজ্ঞেস করল, “কিছু বলছিলেন”?
“ফোন রিসিভ করে উঠে গেলেন, তাই জিজ্ঞেস
করছিলাম, এমার্জেন্সি কল বোধহয়”?
“হুঁ”। সংক্ষেপে উত্তর সারল সুনেত্র। এমার্জেন্সি মানে? এরকম এমার্জেন্সি সুনেত্র
জীবনে কোনদিন ফেস করেনি। সুনেত্র ভাবল।
“আপনারা সত্যি এত অকুপায়েড, দু
মিনিট যে বসে কথা বলবেন, তারও সোয়াস্তি নেই”।
“সে যাক, আপনার প্রবলেমটা বলুন,
অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখেছি আপনাকে”। হাল্কা
হাসি মুখে সুনেত্র বলল।
“খুবই দুশ্চিন্তায় রয়েছি,
জানেন। সকালে বাওল সাফ না হলে কি যে অস্বস্তি হয়। সারাটা জীবন কাজের মধ্যে ডুবে
থেকেছি। দিনরাত এক করে দিয়েছি বলতে পারেন। এসব প্রবলেম কোনদিন ছিল না, জানেন?
রিটায়ারমেন্টের পর এই কটা বছর কিচ্ছু করার নেই সারাদিন, জানেন। বসে থেকে শুয়ে থেকে
সর্ব অঙ্গে যেন জং ধরে উঠছে। বাওলের আর দোষ কি! তারপরে জানেন, মলের রংটাও...”
“এই দুটো ট্যাবলেট দিলাম।
প্রথমটা দিনে দুবার, ব্রেকফাস্টের আগে একটা আর রাত্রে খাবার আগে একটা। সেকেণ্ড
ট্যাবলেটটা একবার - রাতে শোবার আগে। পাঁচদিনের
কোর্স। কেমন থাকবেন জানাবেন”। বৃদ্ধ ভদ্রলোকের কথা শুনতে শুনতেই প্রেসিক্রিপসন লিখছিল সুনেত্র। লেখা হয়ে
যেতে ভদ্রলোকের দিকে এগিয়ে দিল প্রেসক্রিপসনটা।
“কিন্তু আপনি তো আমার
প্রব্লেমটা পুরো শুনলেনই না”। স্পষ্টতঃই
একটু হতাশ বৃদ্ধ ভদ্রলোক।
“আপনার সঙ্গে কি স্যার, আমার
আজকের সম্পর্ক”? মুখে মাখোমাখো হাসি নিয়ে সুনেত্র বলল, “আপনার শরীরের খবর আপনার
চেয়ে আমি ভালো জানি, আপনার মা কিংবা আপনার ওয়াইফের মতো”। বিগলিত হেসে বৃদ্ধ শার্টের বুক পকেট থেকে টাকা বের করতে করতে বললেন, “সেই জন্যেই তো, আপনার ওপর চোখ বন্ধ করে
বিশ্বাস করি, ডাক্তারবাবু। মোক্ষম বলেছেন কিন্তু, সব ডাক্তার আর পেশেন্টের
রিলেশান, স্বামী-স্ত্রীর মতো হলে আর ভাবনা থাকত না। আপনি আমার চেয়ে অনেকটাই ইয়ং,
বাট আই রেস্পেক্ট ইয়োর ডায়াগন্সিস অ্যান্ড ট্রিটমেন্ট”। সুনেত্রর হাতে তুলে দিলেন পাঁচটা একশ টাকার নোট, সুনেত্র একটা নোট বৃদ্ধকে
ফেরত দিয়ে বলল, “সবার থেকে পাঁচশ নিই, কিন্তু আপনার থেকে চারশই যথেষ্ট। ওনলি ফর
ইউ, স্যার”।
টেবিলের ডানদিকে পায়ার ওপরের দিকে ফিট করা বেলের সুইচ টিপতেই, রিসেপশনিস্ট মিলকি পাঠিয়ে দিল নেক্সট পেশেন্টকে। চেম্বারের দরজা ঠেলে ঢুকল এক মহিলা, সঙ্গে মলিন মুখের একটি ছেলে। বৃদ্ধ ভদ্রলোক অগত্যা নিরুপায় হয়েই নমস্কার করে বেরিয়ে গেলেন চেম্বার থেকে।
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন