শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ৭

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ৬ " 


 

বেষ্পতিবার/ দুপুরঃ ২:

 সুনুদা,

 শুধু কথা আর কথা। এত কথাও তুমি বলতে পারো।

তোমার কথার জালে জড়িয়ে পড়ে অনেক সময়েই আমার মনে হত, সত্যি সত্যি তুমি কতটা সিরিয়াস? তোমার কথায় এমন একটা অদ্ভূত সুন্দর স্বপ্ন-রাজ্যের হদিশ দিতে, মনে হত আমি যেন এক পরি। ডানাকাটা নয় আস্ত দুটো ডানাওলা। মনে হত, আমি এই দুটো ডানা ছড়িয়ে তোমার মনের দাঁড়ে ঠিকঠাক বসতে পারবো তো? শেষে এমন তো হবে না, বাস্তবের ঝিঙে, পটল, তেল নুন মশলার অভিঘাতে তোমারই স্বপ্নের ডানা খসে পড়ল! আর আমি তোমার কাছে হয়ে উঠলাম রোঁয়া ওঠা পালক ঝরা অপয়া এক শালিক।

সেদিন তোমার ডাকে সাড়া দিইনি, সে ঐ বাস্তবের চিন্তায়। আমাদের ভালোবাসার জন্যে মূল্য বড়ো কম দিতে হত তুমি ভেবেছিলে? তোমার বাড়ি, আমার বাড়ি - আমাদের এই পথচলা - কেউ কি মেনে নিত, বলো? শুধু সপ্তপদ নয়গো, তুমি কি জানো আমি তোমার সঙ্গে লক্ষ যোজন পথ চলতেও উন্মুখ ছিলাম। জীবনতো শুধু পথচলা নয় সুনুদা, এটা তো মানবে? জীবন মানে নির্জনে তোমার বাহুতে মাথা রেখে নিশ্চিন্ত শুয়ে থাকা। জীবন মানে আমার কোলে তোমার মাথা রাখা, আর তোমার চুলে আমার করাঙ্গুলির বিলি কাটা। জীবন মানে তোমার ঘুমন্ত মুখের দিকে মুগ্ধ নেত্রে চেয়ে বসে থাকা।

তোমার ওই কুয়োর জলে ঝপ্‌পাস করে ফেলে দেওয়া ছোট্ট সিন্দুকের মধ্যে, আমাকে কাছে পাওয়ার কতোখানি স্বপ্ন আর কতোখানি বাসনা তুমি ভরতে পেরেছিলে আমি জানি না। আমি কিন্তু সবুজ ঘাসের জমিনে আমার আঁচলের মতো আজও বিছিয়ে রেখেছি, তোমাকে ঘিরে থাকা আমার সমস্ত সত্ত্বা। তোমরা ছেলেরা বড়ো অধৈর্য আর আউপাতালে, একটুতেই হাল ছেড়ে দাও। কেন বলো তো?

একদিন চলো না, সেই কুয়োটার পাড়ে। যে কুয়োর মধ্যে ফেলে দিয়েছিলে তোমার স্মৃতিভরা সিন্দুক। কুয়োতে পড়ে যাওয়া জিনিষ তোলার জন্যে লোক পাওয়া যায়, জানো তো? তাদের একজনকে ধরে তুলে আনি তোমার সিন্দুকটা। কোন চাবিওলা ডেকে সিন্দুকটা না হয় আমিই খুলিয়ে নেব। দেখে নিও, তোমার ক্ষুব্ধ হৃদয়টিকে খুব আদরে আর খুব যত্নে বুকের মধ্যে আজীবন ধরে রাখবে,

 তোমারই কনি।

 বেষ্পতিবার/ রাত ১২:৩৫

আমার কনি, 

আমাকে কি তোর সেই রূপকথার রাক্ষস বলে মনে হয়? যার প্রাণভোমরা লুকিয়ে রাখা থাকত গোপন চাবির সিন্দুকের মধ্যে। তুই কি কোন রাজকন্যা, কুয়োর জল ছেঁচে তুলে আনবি আমার হৃদয়, তারপর তোর বুকে নিয়ে  তাকে পুষবি শুকপাখির মতো? শুকপাখি নাকি সুখ-পাখি? তোর বুকের বাসায় থাকার চির দিনের আশ্বাসেও, সে যদি কোনদিন বিশ্বাস হারায়? যদি সে আঁচড়ে দেয়, ঠুকরে দেয় তোর নরম নরম বুক? বললি না, আমরা ছেলেরা খুব আউপাতালে? আমি যদি ধৈর্য হারাই? এরপর যেদিন যাবো, তোর জন্যে এটিএস নিয়ে যাবো তিন ফাইল। প্রথমটার চব্বিশঘন্টা পরে দ্বিতীয় আর দ্বিতীয়ের বাহাত্তর ঘন্টা পরে তৃতীয়সুখ পাখির নখ এবং চঞ্চুর আঁচড়ে সেপটিক হয়ে যাওয়া কিছু বিচিত্র নয়।

অথবা এমনও তো হতে পারে, তুইই একদিন বিরক্ত হয়ে আমার প্রাণভোমরাটাকে নিজের উরুর ওপর রেখে টিপে মেরে ফেললি, এতটুকুও রক্ত ঘরের মেঝেতে পড়তে না দিয়ে। থোড়ের মতো তোর মসৃণ উরুতে একটা হালকা দাগ হয়ে রয়ে গেলাম কিছুদিন। তারপর সুগন্ধী সাবান, অলিভ অয়েল আর বডি লোশনের প্রাত্যহিক প্রয়োগে সেই দাগটুকুও আর থাকবে না কোথাও। তারপর কোন এক শীতের একান্ত সন্ধ্যায় হঠাৎ আমার কথা মনে হলে, বসন সরিয়ে খুঁজতে থাকবি আমায়। বাম উরু নাকি ডান উরু – কোথায় যেন ছিল সেই দাগটা। তোর মনে হবে, জীবনে কোথাও এতটুকু দাগও রেখে যেতে না পেরে শেষে হয়তো হারিয়েই গেল,

 তোর সুনুদা।

শুক্রবার/ দুপুর ১২:৫৫

সুনুদা,

 আমার ছোটবেলায় আমার এক ব্যাচেলার দাদুর বাড়িতে আমরা মাঝে মাঝে যেতাম। তিনি আমার বাবার দূর সম্পর্কের মামা আর থাকতেন উত্তর কলকাতার অন্যতম প্রাচীন এক বাড়ির উত্তর-পশ্চিম টেরে। দি মোস্ট শ্যাবি অ্যান্ড স্যাঁতসেঁতে কর্ণার দ্যাট আই হ্যাভ এভার সিন ইন মাই লাইফ। তাঁর মালিকানায় ছিল দুটো মাত্র ঘর – একটা বসার, আরেকটা শোবার আর একটা বাথরুম-টয়লেট। তাঁর খাবার আসত পাড়ার একটি দোকান থেকে। আমরা ওঁর বাড়িতে গেলেই খুব ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠতেন, কিছুক্ষণ কথা বার্তার পর তিনি বেরিয়ে যেতেন পাড়ার দোকানে, কিনে আনতেন অনেক খাবার দাবার, আমার জন্যে গাদাখানেক চকলেট, লজেন্স। একবার উনি যখন ছিলেন না, কি খেয়াল হতে আমি ওঁনার শোবার ঘরে ঢুকেছিলাম। বিছানায় ওঁনার তেলচিট ময়লা মাথার বালিশের নীচে দেখেছিলাম একটি বাংলা পর্নোগ্রাফির বই। বইটার দু এক পাতা উল্টে দেখেছিলাম, কি জঘন্য সব ছবি আর লেখা। তাঁর ঘরে অনেক দেয়াল আলমারি, কাঠের আলমারি ছিল, সবকটাই নানান জিনিষে ঠাসা। কিন্তু সেখানে কোথাও একটাও পাঠযোগ্য গল্প উপন্যাসের বই দেখিনি। কি মনে হতে বিছানার তোষক তুলে দেখেছিলাম, তাঁর বিছানার তলায় সাজানো অজস্র বই, সবই ওই রকম অশ্লীল আর অপাঠ্য।

ভদ্রলোক কি ভীষণ আমুদে আর অমায়িক ছিলেন, তোমাকে বলে বোঝাতে পারবো না। আমরা সকলেই তাঁকে বেশ রেসপেক্ট করতাম, কিন্তু সেদিনের পর তাঁর চোখের দিকে আর কোনদিন তাকাতে পারিনি। তাঁর বাড়িতেও আর কোনদিন যাইনি তারপর থেকেকয়েকবছর পর তাঁর যখন মৃত্যুসংবাদ এসেছিল, প্রথমেই আমার মনে হয়েছিল, তাঁর ঘরের সেই বইগুলির কথা। আমরা কেউ যাইনি, বাবা গিয়েছিলেন। বাবাকে জিজ্ঞেসও করতে পারিনি, শয্যার নীচে তাঁর ওই অজস্র বইয়ের কী গতি হয়েছিল!

মায়ের মুখে শুনেছিলাম, আমার ওই দাদু প্রথম যৌবনে একটি মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেনউচ্চবংশ ও ধনী বাড়ির সেই মেয়েটির সঙ্গে আমার দাদুর নাকি সঠিক অর্থে আলাপও ছিল না। বিয়ের প্রস্তাব করা তো অনেক দূরের ব্যাপার। মেয়েটির যথাসময়ে বিয়ে হয়ে যাবার পর, আমার দাদু ধনুকভাঙা পণ করেছিলেন আর বিয়ে থা না করে সারা জীবন কুমার থাকবেন। তাই ছিলেন – তবে তাঁর সঙ্গী হয়েছিল ওই ইতর বইগুলো!

এত কথা বললাম, তোমার ওই চিঠিটা পড়ে। কি জঘন্য আর কদর্য। তোমাকে আমার সেই ব্যাচিলার দাদুর মতোই লাগছে, অস্পষ্ট এক ভালোবাসার কল্পনায় যিনি নিজেকে বিকৃত করে তুলেছিলেন দিন কে দিন।

কোন একটি মেয়ে তার নিখাদ কিন্তু অক্ষম ভালোবাসা দিয়ে যে তোমার জীবন, কোন একদিন ভরে তুলেছিল, সেকথাটা তোমার এখন ভুলে যাওয়াই উচিৎ। প্লিজ, তোমার ওই নোংরা মুখে আর কোনদিন যেন না শুনি, আমার ওই একান্ত আপনার নামটি-

“কনি”

শুক্রবার/রাত্রি ২:১৫

 ওরে আমার কনকনানি,

 দেখলি তোর হুমকিতে ত্রস্ত হয়ে তোকে আর “কনি” বলে ডাকতে ভরসা পেলাম না।

বাপরে, ইৎনা গুস্‌সা? এত রেগে গেলি আমার ওই চিঠিটা পড়ে? তোকে আর ডাকতেও দিবি না, “কনি” বলে? এতটুকু মায়াও কি তোর হল না তোর সুনুদার ওপর? তোর দাদু না হয়, হলেও হতে পারতেন ঠাকুমার সঙ্গে আলাপটুকুও করে উঠতে পারেননি। আমাদের তো তা নয়? আমি তো তোকে বিয়ের প্রস্তাবও করেছিলাম। করিনি বল? হে আমার কনি, সুকন্যা দত্ত, তোকে তো এও বলেছিলাম আমাদের বিয়ের পর তুই একদম আমার হয়ে যাবি, মিসেস সুকন্যা বসু। সে নাম শুনে তুই কি লিখেছিলি মনে আছে, কনি? লিখেছিলি “সুকন্যা বসু” নামটা শুনেই তোর সমস্ত শরীর যেন শিরশির করে উঠেছিল অদ্ভূত এক অজানা আবেগে বলিসনি বল?

তোর দাদুর একান্তই ব্যাডলাক, তিনি যে সময়ের লোক, তখন না ছিল, স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, না ছিল ইন্টারনেট। থাকলে তাঁকে তোর কাছে ধরা পড়তে হত না। অথবা তাঁর মৃত্যুর পর বিছানার তলায় সাজানো বই নিয়েও তাঁর পরিজনদের আতান্তরে পড়তে হত না। মিচকে হেসে পাড়ার ফক্কোর ছেলেদের বলতেও হত না, “বুড়ো শালার খুব রস ছিল তো, কোনদিন বোঝাই যায়নি”। বরং নেট সার্ফিং করে যখন তখন কল্পনার নীল জগতে ঢুকে পড়তে পারতেনভদ্রলোক সারাটা জীবন তাঁর সেই একটিমাত্র মহিলার মধ্যেই ডুবে রইলেন, কল্পনার একটু সুবিধের জন্যে সাহায্য নিয়েছেন ওই বইগুলির। কিন্তু যাই করুন না কেন, আমি দৃঢ় নিশ্চিত, তাঁর একা একা চরম আনন্দের মুহূর্তগুলিতে ওই বই তিনি ছুঁড়ে ফেলে দিতেন। তাঁর মনেও আসত না ওই বইয়ের ছবির শরীর আর মুখগুলো, তাঁর স্বপ্নে আসত তোর সেই হলেও হতে পারত ঠাকুমারই মুখটাই। এটাও কি কম একনিষ্ঠতা? সমাজের সাধারণ মানুষের কাছে এটা ভীষণ অদ্ভূত এক বিকৃতি। কিন্তু সত্যিই বিকৃতি কি?

তোর এই দাদু ভদ্রলোকটি কোনোদিন দুষ্টু পাড়ামুখো হয়েছেন বলেও আমার মনে হয় না। অন্ততঃ আমার তাই বিশ্বাস। যদি হতেন, বাস্তব নারীর সংসর্গে তিনি কবেই ভুলে যেতেন তাঁর সেই মনের মানুষটিকে। সেক্ষেত্রে ধরা পড়লে চরম লজ্জাকর হবে জেনেও, তাঁকে এত বইও কিনতে হত না। তোরা মেয়েরা কেন যে এত একবগ্‌গা, বাঁধা পথে ভাবিস, বুঝি না। এরকম অদ্ভূত কিন্তু নিষ্ফল ভালোবাসা নিয়ে সারাটা জীবন কাটিয়ে দেওয়া, এমন একজন বেচারা মানুষ তোর থেকে শ্রদ্ধা না পান, একটু মায়া কিন্তু পেতেই পারতেন। এভাবে নিজের জীবনটাকে সম্পূর্ণ নিষ্ফলা করে তোলা, এবং মনটাকে এমন নিবিড় স্বপ্নের গহীনে ডুবিয়ে রাখার মানসিকতা - আজকাল কেউ কল্পনাও করতে পারে কি? না, পারে না।

আজকাল কেউ মুখে অ্যাসিড ছোড়ে, কেউ হত্যা করে। কেউ কেউ হত্যা করে, দেহটাকে কুচি কুচি করে কেটে, স্যুটকেশে ভরে গঙ্গায় ফেলে দিতে যায়...।

আমি কিন্তু পেরেছিআমি জানি এই চিঠিটা পড়ে, তুইও স্বীকার করবি, তোকে “কনি” বলে ডাকার অধিকার, ন্যায্যতঃ যদি কারোর থাকে, আর কারও নয়, সে শুধু থাকবে

তোর সুনুদার

শনিবার/সকাল ১১:৩৫

সুনুদা,

আমি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলাম, ভাঙা আয়নার মতো। ঘরের মেঝেতে আমার অজস্র সত্ত্বা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে।

আজ একবার আসবে, প্লিজ। তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।

তোমার কনি।

পুনশ্চঃ ঘরে সাবধানে পা ফেল, আয়নার কাচে পা কেটে না যায়।


চলবে...




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

নামকরণ

     এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২   "        শাশুড়িমায়ের জিম্মায় ফুটকিকে রেখে বিজলি আজই স্কুলে জয়েন করলেন। মাসখানেকের...