মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৩

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২২ 

 

সন্ধের মুখোমুখি মহড়ার মাঠ থেকে রামালি ফিরল, ওর সঙ্গে এল বালিয়া। ভল্লা বালিয়াকে দেখে খুশি হল, বলল, “আয় বালিয়া, বস। আজকাল তুই আর মহড়ায় যাস না। রামালির থেকে শুনলাম, লড়াই-টড়াই করা তোর নাকি পোষাবে না”। বালিয়া মাটিতে বসল, ইতস্ততঃ করে বলল, “হ্যাঁ ভল্লাদাদা, আমার বাড়ির যা পরিস্থিতি, সেটাই একটা বড়ো লড়াই। তারওপর বাইরের লড়াই আর পেরে উঠবো না”।

“কেন? কী পরিস্থিতি বাড়ির?”

“সংসারে আমরা তিনভাই, চারবোন, ভল্লাদাদা – আর বাপ-মা, বুড়ি ঠাকমা। ভাইবোনদের মধ্যে আমিই সবার বড়ো। বছর খানেক আগে, বাবার ডান কাঁধে একটা ফিক ব্যথা হয়েছিল, তারপর থেকে ওই হাতে আর ভারি কাজ করতে পারে না। তুমি তো জানো, ভল্লাদাদা, কামারের কাজই হল গরম লোহায় ভারি হাতুড়ির ঘা মারা। সে কাজটা বাবা আর পারছে না। এখন আমাকেই বাবার কাজগুলো করতে হচ্ছে। বাবা সঙ্গে থাকে, সাহায্য করে। আমি যদি সারাদিন তোমার এখানে মহড়ায় থাকি, আমাদের এতগুলো পেট উপোস করে মরবে, ভল্লাদাদা”।

“ঠিকই করেছিস, বালিয়া। আমি তো পরিবারকে ডুবিয়ে লড়াইয়ে নামতে বলিনি। কিন্তু তাও তুই আমাদের সাহায্য করতে পারিস করবি?”

“আমি করব সাহায্য?” বালিয়া অবাক হয়ে রামালির দিকে তাকাল, “কী সাহায্য, ভল্লাদাদা”?

“আমাদের রণপাগুলো দেখেছিস তো? ওর তলার দিকে লোহার খুড়ো লাগাতে হবে। এই ধর আঙুল চারেক গভীর লোহার এমন বাটি বানাতে হবে, যার মধ্যে রণপার ডগাটা একদম সেঁটে বসে যাবে। পারবি?”

“পারব, বল্লমের ফলা তো আমরা বানাই। এক্ষেত্রে ফলাটা থাকবে না শুধু বাঁশের মাথায় চেপে বসার মুণ্ডিটা তোমার লাগবে”।

“একদম ঠিক। ব্যাপারটা তুই বুঝেছিস, পারবি। ওই সঙ্গে কিন্তু বল্লমের ফলাও লাগবে”।

“কতগুলো?”  

“অনেক, আপাততঃ ধর পঁচিশ জোড়া। প্রত্যেকটা রণপা – একদিকে যেমন তাড়াতাড়ি চলতে-ফিরতে কাজ দেবে, তেমনি, মাটিতে নেমে পড়লে, সেটা বল্লম হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে”।

“অনেক লোহা লাগবে, লোহা কিনতে যে প্রচুর অর্থও লাগবে ভল্লাদাদা?”

ভল্লা রামালির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, “বালিয়া কী বলছে রে, রামালি?”

রামালি হেসে ফেলল, বলল, “ভল্লাদাদা তোকে কি বিনা মূল্যে দিতে বলেছে? অর্থ না দিলে, তুই করবি কী করে কাজটা?”

বালিয়া একটু কিন্তু কিন্তু করে বলল, “না মানে, ভল্লাদাদা বলল, সাহায্য করতে হবে, তাই ভাবলাম...সাহায্য করে তো আর অর্থ নেওয়া যায় না”।

ভল্লা হো হো করে হেসে উঠল, বলল, “কত লোক জনগণকে সাহায্য করে, জনগণের সেবা করে বড়োলোক হয়ে যাচ্ছে রে, বালিয়া...আর তুই...। সে যাকগে, এক একটা রণপা বানাতে কত খরচ হবে, এবং কতদিন লাগবে, সেটা আমাকে বল। লোহা তোকেই কিনতে হবে...ভালো লোহা - ভেজাল মেশানো নয়...আমরা শুধু মুল্য ধরে দেব। কবে বলতে পারবি?”

একটু চিন্তা করে বলল, “একটা দুটো রণপা কি এখন পাওয়া যাবে? তাহলে আমি বাবার সঙ্গে কথা বলে, কাল জানিয়ে দিতে পারব”।

রামালি বলল, “তুই যে দুটো চড়ে আমার সঙ্গে এলি, সে দুটোই নিয়ে যা। কিন্তু গ্রামে রণপা চড়ে ঢুকবি না। হাতে করে নিয়ে যাবি তোদের ভাটিতে”।

ভল্লা দুটো ব্যাপারে অবাক হল এবং খুশিও হল। বালিয়া রণপা চড়া শিখে নিয়েছে! আর রামালি নিজে থেকেই কিছু কিছু সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেছে। এটা ভল্লার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভল্লা বলল, “রামালি যেমন বলল, তাহলে তাই কর। আর মনে রাখবি, কাজটা গোপনে করতে পারলে ভালো হয়। যা কিছু আদান-প্রদান, রাত্রে করাই ভালো। দিনের আলোয় কক্ষণো নয়। তোদের ভাটিতেও কাজটা যতটা সম্ভব লুকিয়ে করতে হবে – এতগুলো বল্লমের ফলা বানাতে দেখলে – সকলের মনেই সন্দেহ হবে – সাবধান”।

“সাবধানেই করব, ভল্লাদাদা। দুটো রণপার নমুনা নিয়ে, আমি কাল একটু রাত্রের দিকেই আসব, তুমি পরীক্ষা করে দেখে নিও। ঠিক-ঠাক থাকলে পরেরগুলোও বানাতে শুরু করব”।

“তাই আসিস”।

বালিয়া উঠে পড়ল, ঝোপের ওপাশ থেকে দুটো রণপা বের করে চড়ে পড়ল, বলল, “আসি গো ভল্লাদাদা, রামালি আসছি”। এই অন্ধকারেও বালিয়া খুব সাবলীল হেঁটে গেল বনের পথে, ভল্লা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “বালিয়া রণপায়ে এমন হাঁটা কবে শিখল রে, রামালি? এই অন্ধকারের মধ্যেও দিব্যি চলে গেল তো...”!

রামালি উনুন জ্বালিয়ে রান্নার যোগাড় করতে করতে মুচকি হেসে তাকাল ভল্লার দিকে, বলল, “কেউ কেউ এমন থাকে গো, ভল্লাদাদা – যারা চুপচাপ কাজ করতে এবং শিখতে ভালোবাসে”। প্রদীপের ম্লান আলোতেও রামালির চোখমুখের উজ্জ্বলতা ভল্লার দৃষ্টি এড়ালো না, কিছু বলল না। মনে মনে ভাবল, সে তো তোকে দেখেই বুঝছি, রামালি।

 

বালিয়া চলে যাওয়ার দণ্ড দুয়েক পরেই মারুলার ডাক শোনা গেল। “ভল্লা আছিস? নাকি কোথাও চড়তে বেরিয়েছিস?” নিঃশব্দে উঠোনে ঢুকে মারুলা ভল্লার পাশেই বসল। রামালিকে দেখে বলল, এ ছোকরা কবে থেকে তোর রান্না করছে ভল্লা? দেখি কেমন রাঁধতে পারিস”! রামালি হাসল, বলল, “আচ্ছা। একটু দেরি হবে কিন্তু”।

“সে হোক, আমার কোন তাড়া নেই”।

ভল্লা বলল, “ও রামালি। আমার নিত্য সহচর, ডানহাত। চৌখস ছেলে। ওকে তুই রাঁধুনি ভেবে বসলি নাকি?”

মারুলা বলল, “আচ্ছা? সে কথা আমি কী করে জানব? আমি ভাবলাম, সাক্ষীগোপালের মতো বসে বসে তুই বুঝি আমোদ করছিস”।

ভল্লা বলল, “গতকালকেই বণিক অহিদত্ত এসেছিল, আর আজ তুই উদয় হলি। ভাবছি তোদের মতলবটা কী? শালা নির্বাসনে এসেও তোদের জন্যে একটু শান্তি পাবো না? আস্থানের কী খবর বল। কবিরাজমশাই কেমন আছে? কবে ছাড়া পাবেন কিছু জানিস?”

মারুলা উত্তর দেওয়ার আগে রামালির দিকে ইঙ্গিত করে ইশারায় জিজ্ঞাসা করল, ওর সামনে বলা যাবে? ভল্লা চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়ল, বলা যাবে। মারুলা তাও কিছুটা চাপা স্বরে বলল, “শষ্পকমশাই তো  তোদের কবিরাজকে ছেড়ে দিতে পারলেই বাঁচেন। সাপের ছুঁচো গেলার অবস্থা। না পারছেন গিলতে – না পারছেন ফেলতে। এই গ্রাম বা প্রতিবেশী গ্রামগুলি নয়, পাশের রাজ্যের লাগোয়া গ্রামগুলিতেও কবিরাজের অসম্ভব জনপ্রিয়তা। অতএব তাঁকে বিনা দোষে দীর্ঘদিবন্দী রাখলে চারদিকেই বিরূপ সমালোচনায় পড়তে হবে শষ্পককে। সেই ভয়ে শষ্পক তাঁর সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করতে চেয়েছিলেন। আপনাকে আমি এখনই ছেড়ে দেব, একটা মাত্র শর্তে, আপনি যা জেনেছেন, যা বুঝেছেন, সে সব কথা বাইরের কাউকে বলা চলবে না। কেউ কিছু জানতে চাইলেও বলবেন, আমি ওসবের কিছুই জানি না। আমি আদার ব্যাপারী জাহাজের কথা কী করে জানব?

ভল্লা লক্ষ্য করল, রান্নার ব্যস্ততার মধ্যেও রামালি মন দিয়ে মারুলার কথা শুনছে। ভল্লা মারুলাকে জিজ্ঞাসা করল, “কবিরাজমশাই কী বললেন?”

“ঘাড়ত্যাড়া বুড়োর ভয়ানক গোঁ। বললেন, মিথ্যা কথা তো আমি বলতে পারব না, বাবা শষ্পক। কেউ যদি জানতে চায় - সব জেনেবুঝে আমাদের গ্রামের আসন্ন বিপদের কথা তাদের বলব না? এ হতে পারে? সে বাবা তোমরা আমায় মেরেই ফেল আর কেটেই ফেলএ কথাগুলো বলতে বুড়োর গলা এতটুকু কাঁপল না, তাঁর চোখেমুখে এতটুকু ভয়ের লেশমাত্র দেখলাম না। শান্ত ধীর কণ্ঠে শষ্পকের চোখে চোখ রেখে কথাগুলো উনি বললেনঅতএব এই পরিস্থিতিতে কবিরাজবুড়োকে শষ্পক মুক্ত করতেও পারছেন না”।

মারুলা কথা শেষ করার পরে কেউ কোন কথা বলল না। অনেকক্ষণ পর মারুলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “এত জায়গায় ঘুরে বেড়াই, কত রকমের মানুষ দেখেছি।  কিন্তু রাজ্যের এত দূর প্রান্তে, রুক্ষ দরিদ্র এই গ্রামে এসে, এমন একজন মানুষের দেখা পাবো, ভাবতে পারিনি রে ভল্লা”।

তিনজনেই বসে বসে নিজের মনে ভাবতে লাগল কবিরাজমশাইয়ের কথা। একটু পরে মারুলা হঠাৎ বলে উঠল, “আরে রামালি, তোর রান্না কদ্দূর, আমার তো পেটে আগুন জ্বলছে রে…”।

“রান্না তো হয়ে গেছে, খাবার বাড়বো?”

ভল্লা বলল, “হ্যাঁ বেড়ে ফেল। খাওয়াদাওয়া সেরে আমরা তিনজনে বেরোব। অনেক কাজ আছে”।

খাওয়াদাওয়া সেরে ভল্লা বলল, “বালিয়া তো একজোড়া রণপা নিয়ে গেল, আমাদের তো তাহলে হেঁটেই যেতে হবে রে, রামালি”। রামালি বলল, “রণপা আছে। চিন্তা করো না ভল্লাদাদা। আমাকে একটু সময় দাও পুকুর থেকে রান্নার বাসনগুলো চট করে ধুয়ে আনি”।

ভল্লা অবাক হয়ে বলল, “সে তুই ঘুরে আয়। কিন্তু রপা তো আমাদের দুজোড়াই ছিল…”। ভল্লা পুকুরের দিকে যেতে যেতে বলল, “আমি আসছি, একটু দাঁড়াও না, ব্যস্ত হচ্ছো কেন?”। রামালি চলে যেতে মারুলা বলল, “ছেলেটা বেশ সপ্রতিভ তো, ভল্লা! একে পেলি কোথায়”।

“নোনাপুরের ছেলে। ছোটবেলায় বাপ-মাকে হারিয়েছে। কাকা-কাকির কাছে মানুষ। দিনকয়েক আগে দজ্জাল কাকি ওকে তাড়িয়ে দেওয়াতে, আমার সঙ্গে রয়েছে। দারুণ কাজের ছেলে তো বটেই, তার ওপর বুদ্ধিমানও। সব কিছু ঠিকঠাক চললে, ওই এই দিকের নেতা হয়ে উঠবে, এ আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি”।

“বলিস কী? তুই এতটা ভরসা করছিস?”

“শুধু আমি না, তুইও করবি – দুএকদিন দেখ, ভালভাবে পরিচয় হোক”। রামালি পুকুর থেকে ফিরে এল। ঘরের মধ্যে বাসনপত্র গুছিয়ে রেখে, বাইরে বেরিয়ে গেল। ফিরে এল তিন জোড়া রণপা নিয়ে। ভল্লা এবং মারুলার হাতে দুজোড়া দিয়ে বলল, “চলো এবার, কোথায় যাবে”। রণপায়ে চড়তে চড়তে ভল্লা বলল, “তুই কি জানতিস নাকি আজ মারুলা আসবে? এনে রেখেছিলি?”

তিনজনেই রণপায় চড়ে হাঁটতে শুরু করার পর রামালি বলল, “মহড়ার পর ছেলেদের সবাইকে আমি এখানেই রণপা রেখে যেতে বলি – সামান্য দূরে একটা বড়ো গাছের ওপর”। ভল্লা অবাক হয়ে বলল, “কেন?”

রামালি একটু ইতস্ততঃ করে বলল, “আমাদের কাছে রণপা চড়ে ঘোরাঘুরি করাটা একটা আশ্চর্য কৃতিত্বের ব্যাপার, ভল্লাদাদা। তুমি যতই মানা কর, আমাদের মধ্যে দুচারজনের মনে, রণপা চড়ে গ্রামের সবাইকে অবাক করে দেওয়ার লোভ আসতেই পারে। আমি তাই ঝুঁকি নিইনি। গ্রামের লোক আমাদের চালচলনে সন্দেহ করতে শুরু করেছে। তারওপর তাদের সামনে রণপা চড়ে ছুটোছুটি করলে আর দেখতে হবে না…”।

বণিক অহিদত্তকে নিয়ে যে খোলা জায়গায় গিয়েছিল, ভল্লা ওদের নিয়ে সেখানেই গেল। তিনজনে মুখোমুখি বসল। ভল্লা বলল, “এবার বল, মারুলা”।

“এক এক করে, বলি। অহিদত্ত এসেছিল যখন, নিশ্চয়ই জানিস, ওর হাত দিয়েই রাজধানী থেকে অস্ত্র-শস্ত্র আসছে। রওনা হয়ে গেছে, আট-দশ দিনের মধ্যেই মনে হয় এখানে চলে আসবে”।

“হুঁ, বলেছে”

“ওগুলো রাখার জন্যে বেশ বড়ো একটা অস্ত্রাগার বানানো হচ্ছে, তোর বাসা থেকে মোটামুটি ক্রোশ চারেক দূরে। প্রশাসন থেকে তার জন্যে একজন করণিক এবং পর্যাপ্ত রক্ষী নিয়োগ করবে। কিন্তু অস্ত্রাগারের দায়িত্ব থাকবে তোর হাতেই। তোর অনুমতি ছাড়া অস্ত্রাগারের থেকে একটা ছুঁচও বেরোবে না”।

মারুলা একটু অপেক্ষা করল, কিন্তু ভল্লা কোন কথা না বলাতে, আবার বলল, “আস্থানের পাশেই বিস্তীর্ণ জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। সেখানে নির্মাণ হবে রতিকান্তর শীতাবাস”।

“শীতাবাস?” ভল্লা একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞাসা করল।

“হুঁ, শীতাবাস। রাজধানী কদম্বপুরের শৈত্যপ্রবাহ রতিকান্তর সহ্য হচ্ছে না। তাই তাকে এই পশ্চিম সীমান্তে পাঠানো হবে, কারণ এদিকে শীতের প্রকোপ অনেকটাই কম। রাজধানী থেকে লোকজন নিয়ে দুজন স্থপতি এসে গেছে, তারা আস্থানে আছে। কাজ শুরু হল বলে। কথা আছে, শষ্পক এখান থেকে উত্তরে রওনা হওয়ার আগেই, শীতাবাসের প্রধান কক্ষগুলি শেষ করে যাবে। কদম্বপুরে তার প্রমোদভবনটি নাকি আজকাল তার আর তেমন পছন্দ হচ্ছে না। অতএব রতিকান্ত এখানে আসছে শষ্পক আস্থান ছেড়ে যাওয়ার কয়েকদিন আগে। সে এসে কক্ষগুলির রূপচর্চা এবং প্রসাধনী নিজে দাঁড়িয়ে থেকে করাতে চায়”। কথা শেষ করে মারুলা ফিচেল হাসল খিঁক খিঁক করে।

ভল্লা রামালির মুখের দিকে তাকাল, তারার আবছা আলোয় তার মুখভাব তেমন বোঝা গেল না। ভল্লা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “বাঃ”!

মারুলা রীতিমতো ঝেঁজে উঠল, “তুই মাকড়া “বাঃ” বলছিস? আমি শালা একটা সুযোগ পেলে, ওকে কিন্তু প্রাণে মারব না, শুয়োরের বাচ্চাকে খাসি করে ছেড়ে দেব। ঢ্যামনা ভাদুরে কুত্তা, শুধুমাত্র রাজার বউয়ের ভাই বলে, এভাবেই সর্বত্র ফূর্তি লুঠবে?”

ভল্লা বলল, “আঃ মারুলা, রামালি রয়েছে – ছোট ছেলে...ওর সামনে এত গালাগাল করিস না...”।

মারুলা বলল, “ছোট আছে তো কী হয়েছে? বড়ো হবে না? সব কথাই ওর জানা উচিৎ, শোনা উচিৎ - এই গালাগালিগুলোও...”।

“হতভাগাকে মেরে ফেলার চিন্তা আমি অনেকদিন ধরেই করছি, কিন্তু তোর এই বুদ্ধিটা মন্দ নয়, শালা...”।

“কোন বুদ্ধিটা...?”

“খাসি করে দেওয়াটা”।

“তবে? হতভাগার চারপাশে নগ্ন রমণীরা ঘোরাফেরা করছে... আর রতিকান্ত নিজের ওইটা ধরে হাউহাউ করে কাঁদছে...ব্যাপারটা ভাবতে পারছিস ভল্লা? রতিকান্ত আমাদের থেকেও বড়ো মুতিকান্ত হয়ে যাবে, রে ভল্লা, – মোতা ছাড়া অন্য আর কিচ্‌ছু হবে না ওটা দিয়ে...” ভল্লার সমর্থনে উত্তেজিত হয়ে উঠল মারুলা।

ভল্লা হাসল। রামালির দিকে তাকাল। রামালি হাসছে না, শুনছে...। ভল্লা এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল, “রতিকান্তকে এখন ছাড়। তার আগে বল, অস্ত্রাগারের রক্ষণাবেক্ষণ করবে প্রশাসন, সেখান থেকে দু-দশখানা হাওয়া হয়ে গেলে, আমি তো জানতেই পারব না, কিন্তু তার দায় তো আমাদের ঘাড়ে এসে পড়বে...”।

মারুলা বলল, “না রে বাবা, সে সব কি আর রাজধানীর মাথারা ভাবেনি? রাজধানী থেকে যা সরঞ্জাম পাঠাবে, তার বিবরণ তোর কাছে চলে আসবে, চলে যাবে অহিদত্তের কাছেও। রাজধানী থেকে আসার পথেও চুরিচামারি হতে পারে তো। অতএব অস্ত্রাগারে পৌঁছনোর পর গোনাগুণতি করে যা পাওয়া যাবে – সে বিবরণও তোর কাছে চলে আসবে। এরপর তো তুই যেমন যেমন বলবি, সেভাবেই...”।

“বুঝলাম। অস্ত্র-শস্ত্রের দর-টর কিছু ঠিক হয়েছে?”

“না। ওটা আমাদেরই ঠিক করতে হবে...রাজধানী থেকে অহিদত্ত কত দামে কিনেছে সেটা পাঠাচ্ছে।  তারওপর শষ্পক যোগ করবে অস্ত্রাগার নির্মাণ, কর্মচারীদের মাসোহারা, পরিবহনের ব্যয়, অহিদত্তের লভ্যাংশ এবং আরও হয়তো টুকটাক কিছু। এসবের পর আমরা ঠিক করব, মোট কত মূল্য হওয়া উচিৎ। সবশেষে আমরা বসব অহিদত্তের সঙ্গে। কারণ অহিদত্তের টাকা এবং লভ্যাংশ আমাদেরই দিতে হবে”।  মারুলা একটু থেমে রামালির দিকে তাকিয়ে বলল, “কথাগুলি কিন্তু অত্যন্ত গোপনীয়, রামালি। এই ছয়কান ছাড়া আর কোন কানে যেন না যায়”।

রামালি এতক্ষণ মন দিয়েই সব কথা শুনছিল এবং আঁচ করতে চেষ্টা করছিল গভীর ও ব্যাপ্ত এই ষড়যন্ত্রের উদ্দেশ্য কি? তার ধারণায় ষড়যন্ত্র সবসময়েই শত্রুর বিরুদ্ধেই করতে হয়। এখানে শত্রুপক্ষ কে? ঠিক কার বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্র? এই চিন্তার মধ্যে মারুলার আচমকা সতর্কবার্তা শুনে একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “ছয়কান কেন, বলছো মারুলাদাদা – আমরা তো তিনজন এখানে”।

রামালির কথায় মারুলা হেসে উঠল হো হো করে। ভল্লাও হেসে, রামালির কাঁধে হাত রেখে বলল, “তিনজনের কটা কান থাকে? মারুলা ওরকমই – গম্ভীর কথার মধ্যেও চ্যাংড়ামি করাটা ওর চিরকালের স্বভাব”। নিজের বোকামিতে যদিও একটু লজ্জা পেল রামালি, কিন্তু আনন্দও পেল। আজ কিছুক্ষণ আগেই তার সঙ্গে প্রথম পরিচয়, এর মধ্যে তার সঙ্গে ফক্কুড়ি করছে মারুলাদাদা! এর অর্থ মারুলাদাদা তাকে বিশ্বাস করছে। এর পেছনে ভল্লাদাদার হাত নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু কিছুটা হলেও তার কৃতিত্বও কম নয়।

ভল্লা বলল, “এদিকে পাশের রাজ্য থেকেও তো আমাদের কিছু ক্রেতা জুটছে। তারা অস্ত্র-শস্ত্র কিনতে চায়। তাদের কী করবি?”

মারুলা ভল্লার উরুতে চাপড় মেরে বলল, “কী আবার করবি? বেচবি। আমাদের খরচ-খরচা বাদে তিনগুণ দামে! কত চাই তাদের?”

“বলছে তো অনেক কিছু। লম্বা লম্বা বিপ্লবের কথা। কদ্দূর কি দাঁড়াবে জানি না। বলছে আমাদের লড়াই করতে শেখাও, ভল্লাদাদা। আমরা লড়ব”।

“অহিদত্ত জানে?”

“হ্যাঁ, আমিই বলেছি”।

“ধ্যাৎ শালা, অহিদত্তকে বলতে গেলি কেন? ও ব্যাটা তো, ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাবে। শালা সরাসরি বেচে ভাল পয়সা কামাবে”।

“আমি না বললে, ও বুঝি জানবে না? কী যে বলিস না? তবে অহিদত্ত ও রাস্তায় হাঁটবে না। এ কি ধান-গমের ব্যবসা? যাকে খুশি বেচে দিতে পারবে? উলটে সে ভয় পেয়েছে। এ রাজ্য থেকে অস্ত্র কিনে, ও রাজ্যের ছেলেদের অস্ত্র-শস্ত্র বিক্রি করলে, ওদের প্রশাসন একসময় জানতে পারবেই। আর জানতে পারলে, ওর পাছার চামড়া খুলে নিতে কতক্ষণ”?

“আবে, তুই এত ভদ্রলোক কবে হলি রে, ভল্লা? বল পোঁদের খোসা…। তাহলে আর চিন্তা কিসের? শষ্পক যা দাম ঠিক করে দেবে, চোখ বুজে তার ওপর তিনগুণ চাপিয়ে আমরা বেচব...

“হুঁ। তবে কালনেমির লঙ্কাভাগ করে লাভ নেই, ওরা আসুক, পাকা কথাবার্তা হোক। টাকাকড়ির ব্যবস্থা কী করছে, বুঝি, তারপর ভাবব...”।

“ওরা কবে আসবে আবার?”

“হয়তো কাল বা পরশু বা তার পরেরদিন। কিন্তু ওরা যদি সত্যি সত্যি টাকা-পয়সা সঙ্গে নিয়ে চলে আসে, বিপদে পড়ে যাবো”।

“যা শালা, বিপদ আবার কিসের? টাকা আনলে নিয়ে নিবি”।

“আবে গাড়ল, সে টাকা রাখব কোথায়? আমাদের সিন্দুক আছে, নাকি আস্থানের মতো সুরক্ষিত কোষাগার আছে?”

মারুলা কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, “দাঁড়া শষ্পকের সঙ্গে কথা বলে, কাল রাত্রের মধ্যে কিছু একটা ব্যবস্থা করছি। আচ্ছা ধর, বড়সড় একটা সিন্দুক যদি নিয়ে আসি, তালা-চাবি সমেত। সেটাকে মাটিতে কোথাও পুঁতে রাখা যাবে না? নিরাপদে?”

ভল্লা বলল, “মাটিতে পোঁতা থাকবে? কেউ টাকা দিলে বা দরকারে টাকা তোলার সময় আমি আর রামালি কোদাল বেলচা দিয়ে মাটি খুঁড়ব? এমন কথা বলিস না গেঁড়ের মতো”!

মারুলা ফিচেল হাসল, বলল, “আহা কতদিন পর তোর মুখ থেকে একটা গাল শুনলাম রে, হতভাগা – তাও গেঁড়ে বলেই ছেড়ে দিলি, পুরোটা বললি না?”  

ভল্লাও হেসে ফেলল, মারুলার কাঁধে একটা থাবড়া মেরে বলল, “চ্যাংড়ামি নয়, মারুলা - তোরাও ভাব, আমরাও ভাবছি। তাছাড়া আরো একটা সমস্যা আছে। ওরা যদি ডাকাতি করে টাকা যোগাড় করে, তাহলে সোনার গয়না, মণিমুক্তো এনেও হাজির করতে পারে। সে সোনার কতটা খাঁটি, কতটা খাদ, কত রতি, কত ভরি, তার মূল্য কত, কে ঠিক করবে? শষ্পকের সঙ্গে কথা বল। শুধু একখানা সিন্দুক নিয়ে আমরা কী করব? যাক, বার তুই কেটে পড়, অনেক রাত হল। আমি আর রামালি যাবো গ্রামপ্রধানের বাড়ি

মারুলা বলল, “তোর সমস্যার কথাগুলো শুনলে শষ্পকের… হে হে হে… রাতের ঘুম চটকে যাবে!  কাল একটু বেলার দিকে যেতে পারবি? যেখানে অস্ত্রাগার বানানো হচ্ছে?”

“কোথায়, কতদূরে?”

“বললাম যে, তোর বাসা থেকে দক্ষিণে মোটামুটি ক্রোশ চারেক দূরে...কালই চলে আয় না। শষ্পককেও বলব। ওখানে বসে, শষ্পকের সঙ্গে মুখোমুখি কথা বললে...কাজের সুবিধে হবে...আমিও থাকব”।

একটু চিন্তা করে ভল্লা বলল, “কথাটা মন্দ বলিসনি, ঠিক আছে কাল যাবো”।

“সেই ভাল, তাঁতের মাকুর মতো, তোর আর শষ্পকের বার্তা নিয়ে ঘুরছি...”

“কিন্তু কাল রাত্রেও তোকে কিন্তু আসতে হবে মারুলা। দরকার হবে”।

“সে তো আসবই। এখন তো মনে হচ্ছে আমায় রোজই আসতে হবে। এখন চলি রেএই রামালি, রণপা জোড়া নিয়ে যাবো রে? তোদের মহড়ায় কোন অসুবিধে হবে না তো? কাল রাত্রে আসার সময়, আমার রণপা জোড়া নিয়ে আসব, আর তোদের জোড়া ফেরত দিয়ে যাবো”। রামালি একটু চিন্তা করে বলল, “নিয়ে যাও, মারুলাদাদা, চালিয়ে নেব কালকের দিনটা”।

চলবে...


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৩

   এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য " ...