মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২৫

ধর্মাধর্ম - ৩/৩





["ধর্মাধর্ম"-এর তৃতীয় পর্বের দ্বিতীয় পর্বাংশ পড়ে নিতে পারেন এই সূত্র থেকে "ধর্মাধর্ম - ৩/২"


তৃতীয় পর্ব - তৃতীয় পর্বাংশ

(৬০০ বিসিই থেকে ০ বিসিই)


৩.২.৩ মহাজ্ঞানী গৌতম

গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে গৌতম অনুভব করলেন জগতের সমস্ত প্রাণ এবং জড় – সমস্ত উদ্ভিদ, খনিজ, তৃণ, লতাগুল্ম, সকল প্রাণী এমনকি মানুষও এখন তাঁর অন্তরেই অবস্থান করছে। তিনি দেখতে পেলেন নিজের সমস্ত অতীত জীবন। তিনি নিজের অন্তরে অজস্র জগতের উত্থান-পতন, অজস্র নক্ষত্রের সৃষ্টি ও বিনাশ প্রত্যক্ষ করলেন। তিনি তাঁর অন্তরে জগতের সমস্ত জীবের আনন্দ ও দুঃখ অনুভব করলেন। তিনি অনুভব করলেন, তাঁর প্রতিটি দেহকোষেই ধরা পড়েছে স্বর্গ ও মর্ত এবং ত্রিকাল - অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ। সেদিন রাত্রি প্রথম প্রহরে তাঁর এই অনুভব ঘটল।

আরও গভীর ধ্যানে তিনি দেখলেন অগণিত কাল ধরে, অগণিত জীবের জন্ম এবং মৃত্যু। সমুদ্রে নিরন্তর ঢেউ গড়ে ওঠে এবং ভাঙে, কিন্তু সমুদ্রের যেমন জন্ম বা মৃত্যু নেই, লক্ষকোটি জীবের জন্ম-মৃত্যু হলেও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোন ক্ষতিবৃদ্ধি হয় না। জন্ম-মৃত্যু যে একটা বাহ্যিক ধারণা, সে কথা বুঝতে পারলে দুঃখভোগ থাকে না, মনে আসে প্রশান্তি। জন্ম-মৃত্যু চক্রের রহস্য বুঝতে পেরে গৌতম এখন মৃদু হাসলেন। তাঁর হাসিটি রাতের অন্ধকারে ফুটে উঠল উজ্জ্বল একটি ফুলের মতো।  

গৌতম আরও নিবিষ্ট ধ্যানে নিমগ্ন হলেন, কিন্তু তখনই ভয়ংকর গর্জনে বিদ্যুৎ চমকাল এবং ঘন মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেল আকাশের চাঁদ ও যত নক্ষত্র। শুরু হল তুমুল বৃষ্টি। অশ্বত্থগাছের নিচে গৌতমও ভিজতে লাগলেন, বৃষ্টির অঝোর ধারায়, কিন্তু তাও তিনি মগ্ন রইলেন নিবিষ্ট ধ্যানে। এই সময় গৌতমের চেতনায় বিকশিত হল আরেকটি সত্য। তিনি দেখলেন জীব যাবতীয় দুঃখভোগ করে তার অজ্ঞানের জন্যে। তারা ভুলে যায় সকল জীবের উদ্ভব একই মাটিতে। অজ্ঞান তাদের মনে এনে দেয় দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, লোভ, মোহ, ঈর্ষা, সন্দেহ, অবিনয় এবং অবিশ্বাস। শান্ত হয়ে আমরা যদি মনের গভীরে ডুব দিতাম, আমরা নিজেরাই উপলব্ধি করতে পারতাম সকল দুঃখ-দুশ্চিন্তার অবসান। আমাদের মনে সঞ্চারিত হত সহমর্মীতা এবং ভালোবাসা।

গৌতম এখন দেখলেন, উপলব্ধির সঙ্গে ভালোবাসার নিবিড় যোগাযোগ। উপলব্ধি ছাড়া ভালোবাসার অস্তিত্ব নেই। প্রতিটি মানুষের স্বভাব বা চরিত্র নির্ভর করে তার শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক অবস্থার ওপর। আমাদের একবার যদি এমন উপলব্ধি হয়, আমরা অত্যন্ত নিষ্ঠুর মানুষকেও ঘৃণা করতে পারব না, বরং তার শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের চেষ্টা করব। অতএব সহমর্মীতা এবং ভালোবাসা আসে উপলব্ধি থেকে। আর উপলব্ধি আসে মনন থেকে। জীবনের প্রতিটি মূহুর্তের, অন্তর কিংবা বাহিরের প্রতিটি ঘটনার মনন আমাদের উপলব্ধি বাড়িয়ে তোলে। আমাদের মুক্তি এবং প্রজ্ঞালাভের অনন্য উপায় হল মনন। সৎ উপলব্ধি, সৎ চিন্তা, সৎ বাক্য, সৎ কর্ম, সৎ জীবন, সৎ প্রচেষ্টা, সৎ মনন এবং সৎ মনোযোগ জীবনকে আলোকিত করে। গৌতম এই আটটি পথকে বললেন অষ্টমার্গ, আটটি মহা পথ।

তখন বৃষ্টি থেমে গেছে, মেঘ সরে গেছে, আকাশে আবার উজ্জ্বল হয়েছে চাঁদ ও তারা। গৌতমের মনে হল, বিগত হাজার জন্ম ধরে তিনি যেন বন্দী ছিলেন এক কারাগারে, এখন সেই কারাগার উন্মুক্ত। অজ্ঞান ছিল সেই কারাগারের প্রহরী। ঘন মেঘে আচ্ছন্ন আকাশে যেমন ঢাকা পড়ে গিয়েছিল উজ্জ্বল চাঁদ ও নক্ষত্ররা, তেমনি অজ্ঞানের আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে মানুষের উপলব্ধি। যার থেকেই সৃষ্টি হয় যত ভ্রষ্ট চিন্তা, ভ্রান্ত ধারণা, কল্পিত তত্ত্ব এবং জীবনের যত দুঃখভোগ। অষ্টমার্গ অনুসরণ করে মানুষ অজ্ঞান প্রহরীকে একবার পরাস্ত করতে পারলেই, অদৃশ্য হবে কারাগার, কোনদিন তা আর ফিরে আসবে না।

সন্ন্যাসী গৌতম হাসলেন, মনে মনে বললেন, “ওহে প্রহরী, আমি তোমাকে এখন চিনেছি। কত জন্ম ধরে তুমি আমায় জন্ম-মৃত্যুর বন্ধনে বেঁধে রেখেছিলে? কিন্তু এখন আমি তোমাকে স্পষ্ট চিনে গিয়েছি, এখন থেকে তুমি আমাকে আর কোন বাঁধনে বাঁধতে পারবে না”। আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি দেখলেন ভোরের শুকতারা। এই তারা এর আগেও এই আসনে বসে কতবার তিনি দেখেছেন। কিন্তু আজ যেন তার গায়ে এসেছে হীরকের উজ্জ্বল দ্যুতি। গৌতম উপলব্ধি করলেন, শুকতারা একই আছে, কিন্তু তিনিই উজ্জ্বল হয়েছেন অন্তরের আলোকে। তাঁর মনের সমস্ত তমসার বিনাশ হয়ে তিনি পেয়েছেন মহাজাগরণ, মহান প্রজ্ঞা।

একে একে তাঁর মনে পড়ল সবার কথা, পিতা শুদ্ধোদন, মাতা, মাসি গৌতমী, পত্নী যশোধরা, পুত্র রাহুল। তাঁর বন্ধুরা, কপিলাবস্তুর প্রাসাদ, উদ্যান, রাজ্যের সাধারণ জনগণ সবার কথা। তিনি কথা দিয়েছিলেন, পথের সন্ধান পেলেই তিনি সকলের সঙ্গে ভাগ করে নেবেন সেই অভিজ্ঞতা। আজ তিনি পেয়েছেন। তিনি অন্তরে অনুভব করলেন, জগতের সকল প্রাণীর জন্যেই অনন্ত করুণা এবং ভালোবাসা।

সূর্যোদয় হতেই তিনি আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন এবং তখনই তাঁর চোখে পড়ল বালক মোষপালক স্বস্তি দৌড়ে আসছে। তিনি হাসলেন। কিন্তু দৌড়ে আসতে আসতে কিছুটা আগেই স্বস্তি থমকে গেল, অবাক চোখে তাকিয়ে রইল গৌতমের মুখের দিকে।

গৌতম স্মিতমুখে ডাকলেন, “স্বস্তি, কাছে আয়”।

স্বস্তি জোড় হাতে তাঁর দিকে এগিয়ে গেল, নিচু হয়ে প্রণাম জানিয়ে বলল, “গুরুদেব, আজকে আপনাকে একদম অন্যরকম লাগছে কেন?”

গৌতম আরও এগিয়ে স্বস্তিকে কাছে টেনে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তাই? ঠিক কী রকম লাগছে বল তো?”

স্বস্তি গৌতমের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “ঠিক কী বলতে পারব না, তবে একদম অন্যরকম। আপনি যেন কোন নক্ষত্রের মতো। সবে ফুটে ওঠা পদ্মফুলের মতো। কিংবা... কিংবা... গয়াশীর্ষ পাহাড়চূড়ার ওপরে পূর্ণিমার চাঁদের মতো”।

গৌতম হেসে ফেললেন, বললেন, “বাবা, তুই যে আজ একেবারে কবি হয়ে উঠলি রে? সে যাক, আজ এত সকাল সকাল চলে এলি যে? মাঠে যাসনি? তোর মোষেরপাল কোথায়?”

স্বস্তি বলল, “প্রভু মোষদের নিয়ে আজ জমিতে গেছেন চাষ করতে, আস্তাবলে আছে শুধু বাছুরগুলো। কাজেই আজ কাজ একটু হালকা। তবে ঘাস কাটতে হবে। মাঝরাত্রে মেঘের গর্জন আর প্রচণ্ড বৃষ্টি হল, আমাদের বিছানা, ঘরদোর ভিজে গিয়েছিল সব, তাই ঘুম এল না আর। তখনই মনে হয়েছিল, আপনি গাছতলায় একা একা কী করছেন, কেমন আছেন ঝড়-বৃষ্টিতে? ভোর হতেই গোয়ালে গিয়ে কাস্তে আর লাঠিটা নিয়ে তাই দৌড়ে এলাম আপনাকে দেখতে”।

গৌতম স্বস্তির হাত ধরে বললেন, “আজকে আমার সব থেকে আনন্দের দিন, রে স্বস্তি। পারলে তোরা সব্বাই একবার আসিস বিকেলের দিকে। তোর ভাইবোনদেরও সঙ্গে আনতে ভুলিস না যেন। কিন্তু এখন যা, তাড়াতাড়ি ঘাস-টাস কেটে তোর কাজগুলো সেরে আয়”।

সেদিন দুপুরে সুজাতা যখন খাবার নিয়ে এল, দেখল গৌতম অশ্বত্থগাছের নিচে তাঁর আসনেই বসে আছেন। তাঁর মুখ ভোরের সূর্যের মতোই উজ্জ্বল এবং সুন্দর। তাঁর অনুদ্বিগ্ন শরীরে এখন প্রশান্তি এবং আনন্দজ্যোতি। এর আগেও সুজাতা তাঁকে এভাবে অশ্বত্থগাছের নিচে বহুদিন, বহুবার বসে থাকতে দেখেছে, কিন্তু আজ তাঁকে যেন অন্যরকম দেখাচ্ছে! তারও মন আনন্দ ও শান্তিতে ভরে উঠল। সুজাতা কলাপাতায় তাঁর খাবার সাজিয়ে এগিয়ে দিল, তারপর জোড়হাতে দাঁড়িয়ে রইল সামনে।

গৌতম তার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলেন, বললেন, “আমার পাশে এস বস, সুজাতা। এই ক’মাস ধরে প্রতিদিন তুই আমায় খাবার আর জল দিয়ে গেছিস, তার জন্যে আমি তোর কাছে কৃতজ্ঞ। আমার জীবনে আজকের দিনটা সব থেকে আনন্দের, যে পথ আমি এতদিন খুঁজছিলাম, সেই মহামার্গের সন্ধান পেয়ে গেছি। তোরাও সবাই আজ আনন্দ কর। সবার কাছে এই মহান পথের প্রচার করতে, খুব শিগ্‌গিরিই আমি বেরিয়ে পড়ব”।

সুজাতা অভিমানী স্বরে জিজ্ঞাসা করল, “আপনি আমাদের ছেড়ে চিরদনের মতো চলে যাবেন?”

গৌতম স্মিতমুখে বললেন, “যেতে তো হবেই, মা, কিন্তু তাই বলে চিরদিনের মতো ছেড়ে যাব না। যাওয়ার আগে আমি তোদেরও দেখাব সেই পথের সন্ধান, যে পথ আমি আবিষ্কার করেছি”। সুজাতা ঠিক ভরসা পেল না যেন, আরও কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিল, তার আগেই গৌতম বললেন, “আরও কটা দিন আমি তোদের কাছেই থাকব, তোদের সবাইকে বুঝিয়ে দেব, আমার খুঁজে পাওয়া পথের সন্ধান। তারপর রওনা হব আমার উদ্দিষ্ট পথে, কিন্তু আমি আবার ফিরেও আসব, তোদের সকলকে দেখতে”।

গৌতমের খাওয়া হয়ে যেতে সুজাতা যখন গ্রামে ফেরার জন্যে উঠে দাঁড়াল, গৌতম তাকেও বললেন, গ্রামের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নিয়ে, বিকেলের দিকে আবার আসতে।

 

৩.৩.১ গৌতম বুদ্ধ

বিকেলে বেশ কিছু ছেলেমেয়ে এল। সকলেই এসেছে স্নান করে, পরিষ্কার কাপড় পরে। স্বস্তি এসেছে, তার ভাইবোন, রূপক, নন্দবালা আর ভীমাকে নিয়ে। দাদা নালকের সঙ্গে এসেছে সুজাতা, পরনে তার গজদন্ত রংয়ের সুন্দর শাড়ি।  হাতে একঝুড়ি ফল আর খাবার। স্বস্তির বোন নন্দবালা এসেছে, পরনে কচি কলাপাতা রঙের শাড়ি, আর ভীমা এসেছে গোলাপি শাড়ি পরে। ছেলেমেয়েরা সবাই যখন গৌতমকে ঘিরে অশ্বত্থ গাছের নিচে বসল, মনে হল ঘাসের ওপর যেন নানারঙের গুচ্ছগুচ্ছ ফুল ফুটেছে। সুজাতা নিয়ে এসেছে একঝুড়ি ছাড়ানো নারকেল আর তালের মিছরি। নন্দবালা এনেছে একঝুড়ি পাকা লেবু। রূপক গৌতমকে অনেকটা নারকেলের শাঁস দিল, মিছরি দিল, নন্দবালা দিল একটি লেবু।

সকলেই খেতে আরম্ভ করার পর সুজাতা বলল, “ভাই-বোনেরা, আমাদের গুরুদেবের জীবনে আজকের দিনটা খুবই আনন্দের। আজ তিনি মহামার্গের সন্ধান পেয়ে গেছেন। আমার কাছেও এই দিনটি খুবই আনন্দের দিন। আমরা সবাই তাই এখানে এসেছি, আজকের বিশেষ এই দিনটি উদ্‌যাপন করতে। হে গুরুদেব, আমরা জানি আপনি চিরদিন আমাদের সঙ্গে থাকতে পারবেন না। কঠিন তপস্যা করে পাওয়া আপনার এই মহাজ্ঞানের যতটুকু আমাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব, সেটুকুই বলুন”। কথাটা বলে সুজাতা করজোড় এবং নত হয়ে শ্রদ্ধা জানাল মহাজ্ঞানী গৌতমকে, সুজাতাকে দেখে অন্য ছেলেমেয়েরাও উঠে দাঁড়াল এবং একই ভঙ্গিতে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাল।

মহাজ্ঞানী গৌতম সকলকে হাতের ইশারায় বসতে বললেন, তারপর বললেন, “তোরা সকলেই খুব সরল এবং বুদ্ধিমান ছেলে ও বুদ্ধিমতী মেয়ে। যে মহামার্গের সন্ধান আমি পেয়েছি, সে হয়তো গভীর এবং সূক্ষ্ম, কিন্তু তোদের পবিত্র ও সরল মনে এর ধারণা করা খুব কঠিন হবে না।

এই যে এখন আমরা লেবু খাচ্ছি, ছেলেমেয়েরা, আমরা খুব মন দিয়ে খাচ্ছি কি? খুব নিষ্ঠার সঙ্গে আমরা কি এই লেবুর খোসা ছাড়াচ্ছি? খোসা ছাড়িয়ে, লেবুর প্রত্যেকটি কোয়া মুখে নিয়ে আমরা মন দিয়ে এর স্বাদ নিচ্ছি কি? আমরা এই লেবুর গন্ধ, স্বাদ - মিষ্টতা, অম্লতা সঠিক উপভোগ করছি কি? নাকি যেমন তেমন করে, লেবু ছাড়িয়ে খেতে হয়, তাই খেয়ে ফেলছি। নন্দবালা আমাকে যে লেবুটি দিয়েছে, তাতে নটি কোয়া আছে। আমি এই লেবুর নটি কোয়াই কিন্তু নিষ্ঠা ভরে মন দিয়ে উপভোগ করতে চাই। যাতে এই লেবু, তার স্বাদ, গন্ধ, এবং তার সঙ্গে নন্দবালা ও তোদের সকলকে এবং এই সুন্দর বিকেলটা আমার সারাজীবন মনে থাকে।

ছেলেমেয়েরা, নিষ্ঠা নিয়ে, এই লেবুটি খাওয়া মানে, মনটা লেবুতেই নিবিষ্ট রাখা। গতকাল কী কী হয়েছিল, অথবা আগামীকাল কী কী ঘটতে পারে সেসব চিন্তা থেকে তোদের মনকে দূরে রেখে, এখন এই বর্তমান সময়ে যা ঘটছে তাতেই মনোনিবেশ করা। তার মানে এইখানে এই সময়ে তোদের মন, শরীর এবং চিন্তাকে - একবিন্দুতে স্থির রাখা। এই লেবুতে যেমন কোয়া রয়েছে, তেমনি আমাদের একএকটি দিনে থাকে আটটি কোয়া বা প্রহর। আমাদের এই লেবুটির প্রত্যেকটি কোয়া খাওয়ার মতো, আমরা যদি অন্য সব চিন্তা ভুলে দিনের প্রত্যেকটি প্রহরের কাজ - সে যে কোন কাজই হোক না কেন, ঘরের কাজ, বাবা-মায়ের সেবা, ভাইবোনদের দেখাশোনা, মোষ চারণ, নদীর চড়ায় ঘাস কাটা, খাওয়াদাওয়া, খেলাধুলো, ঘুমোনো – নিষ্ঠার সঙ্গে করতে থাকি, আমরা প্রত্যেকটি কাজই উপভোগ করতে পারব। আর যদি তা না করি, যে কোন কাজকেই মনে হবে বোঝা, ভুল হবে, হতাশা আসবে, বাবা-মা, কিংবা কর্মদাতা প্রভু বকাবকি করবে, জীবন দুঃসহ মনে হবে। সুজাতা?”

বলুন গুরুদেব”। সুজাতা জোড়হাতে উত্তর দিল।

তোর কী মনে হয়, যে মন দিয়ে কাজ করে, তার কী বেশি ভুল হয়?”

না, গুরুদেব, যে মন দিয়ে কাজ করে, তার খুব কমই ভুল হয়। আমার মা বলেন, একটি মেয়ের হাঁটাচলা, দাঁড়িয়ে থাকা, কথা বলা, হাসা, কাজ করা – সব ব্যাপারেই মন দেওয়া উচিৎ, নয়তো নিজের এবং অন্যদের দুঃখের কারণ হতে হয়”।

ঠিক তাই, সুজাতা। কথাটা শুধু মেয়েদের জন্যে নয়, ছেলেদের জন্যেও জরুরি। সব কাজেই যে মনোযোগ দেয়, সে সর্বদাই সতর্ক থাকে, সে কী করছে, কী বলছে, কী ভাবছে। এমন মানুষ সেই সেই কাজ, কথা বা চিন্তা সহজেই এড়িয়ে যেতে পারে, যার কারণে তার বা অন্যদের হয়তো দুর্ভোগ আসতে পারত। ছেলেমেয়েরা, মনঃসংযোগ করা মানে, সর্বদা বর্তমানে থাকা। তার নিজের এবং তার চারপাশে কী ঘটে চলেছে সে সম্বন্ধে সর্বদা সচেতন থাকা। তাতে নিজের এবং আশেপাশের সকলের সঙ্গেই পারষ্পরিক বোঝাপড়া বেড়ে ওঠে। পারষ্পরিক বোঝাপড়া বাড়লে বেড়ে ওঠে আমাদের সহিষ্ণুতা এবং ভালোবাসা। একই পরিবারে, বা একই সমাজে যখন পারষ্পরিক বোঝাপড়া তৈরি হয়, তখনই একে অপরকে মেনে নিতে সুবিধে হয়, সুবিধে হয় ভালোবাসতে। সেক্ষেত্রে দুঃখ-কষ্টের বোঝা আপনা থেকেই হাল্কা হয়ে যায়। তোর কী মনে হয়, স্বস্তি? একজন যদি অন্যকে সঠিক বুঝতে না পারে, সেখানে ভালোবাসা কতটা গভীর হয়?”

গুরুদেব, ঠিকঠাক বুঝতে না পারলে, কাউকেই ভালোবাসা যায় না। এমনই একবার ঘটেছিল, আমাদের আদরের বোন ভীমার সঙ্গে। ভীমা তখন খুব ছোট্ট, একদিন রাত্রে ও খুব কাঁদছিল, কিছুতেই থামানো যাচ্ছিল না। ওর দিদি নন্দবালা এক সময় ধৈর্য হারিয়ে, ভীমাকে একটা থাপ্পড় লাগাল, ভীমার কান্না থামার বদলে আরও বেড়ে গেল। আমি ভীমাকে কোলে নিলাম, দেখলাম ওর গায়ে হাল্কা জ্বর রয়েছে। জ্বর হয়েছিল, হয়তো মাথাব্যথাও করছিল বলেই ও কাঁদছিল, আমরা কেউই বুঝিনি। আমি ডেকে বলতে, বালাও এসে ওর কপালে হাত দিয়ে দেখল, হ্যাঁ জ্বর রয়েছে। বোনের কষ্টে বালার চোখে জল এল, ও ভীমাকে কোলে নিয়ে বুকে চেপে ধরল, ঘুমপাড়ানি গান গাইতে লাগল গুনগুন করে। একটু পরেই ভীমা কান্না থামিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল, যদিও তখনও তার জ্বর একটুও কমেনি। গুরুদেব, আমার মনে হয়, বালা প্রথমে ভীমার কষ্টটা বুঝতে পারেনি, বুঝতে যখন পারল, সমস্যার সমাধানও হয়ে গেল। সেই কারণেই আমার মনে হয়, একে অন্যকে সঠিক বুঝতে না পারলে, ভালোবাসা সম্ভব নয়”।

ঠিক তাই, স্বস্তি। ভালোবাসা তখনই সম্ভব যখন সঠিক বোঝাপড়া থাকে। অতএব ছেলেমেয়েরা, সারা দিনের যা কিছু কাজ, সব করবি সচেতন মনে। অন্যকে সঠিক বোঝার চেষ্টা কর। দেখবি নিজেদের মধ্যে ভালোবাসা আরও কত গভীর হয়ে ওঠে। এই মহান পথই আমি আজ আবিষ্কার করেছি”।

স্বস্তি জোড়হাতে জিজ্ঞাসা করল, “এই পথকে কী আমরা “সচেতন পথ” বলতে পারি?”

গৌতম হাসলেন, বললেন, “বাঃ বেশ বলেছিস, “সচেতন পথ” – এই পথই আমাদের নিয়ে যাবে জাগরণের দিকে।”

সুজাতাও জোড়হাতে জিজ্ঞাসা করল, “আপনি বলছিলেন, আপনার মহাজাগরণ হয়েছে। আমাদের এখানে মহাজ্ঞানকে আমরা বলি “বুধ” আর মহাজ্ঞানীকে বলি, “বুদ্ধ”। আপনাকে আমরা “বুদ্ধ” বলে ডাকতে পারি, গুরুদেব?”

গৌতম খুশি মনে সম্মতি দিলেন। সুজাতার দাদা নালক, এখানে ছেলেমেয়েদের মধ্যে সে সবার বড়ো, জোড়হাতে বলল, “সুজাতার মুখে আপনার কথা অনেক শুনেছি। এখন আপনার “সচেতন পথ”-এর শিক্ষাও পেলাম। যে অশ্বত্থগাছের নিচে আপনি এতদিন তপস্যা করলেন, কাছাকাছি অঞ্চলে ওই গাছটিই সব থেকে সুন্দর। ওই গাছের নিচেই আপনার মহাজ্ঞান লাভ হয়েছে, তাই আমরা ওই গাছটিকেও স্মরণীয় করতে চাই। আমাদের মাগধী ভাষায় “বুধ” কথা থেকে আরেকটি কথা আসে “বোধি”, যার অর্থ জ্ঞান, যে গাছের নিচে আপনার মহাজ্ঞান লাভ হল, সেই গাছকে আমরা “বোধি বৃক্ষ” বলতে চাই।

গৌতম এবারও হাসিমুখেই সম্মতি দিলেন। তিনি মনে মনে আশ্চর্য এক আনন্দও অনুভব করলেন। তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি অতি সাধারণ এই ছেলেমেয়েরা, তাঁর প্রথম ধর্মশিক্ষাতেই এমন অভিভূত হয়ে পড়বে। যার জন্যে তিনি এবং এই অশ্বত্থবৃক্ষ পেয়ে যাবে এমন অবিস্মরণীয় নাম। এই নামই, তিনি স্থির করলেন, সারা জীবন বহন করবেন সসম্মানে। আজ থেকে তিনি নিজের পরিচয় দেবেন গৌতমবুদ্ধ।

নন্দবালা এবার জোড়হাতে বলল, “অন্ধকার হয়ে আসছে, আমাদের এখনই ঘরে ফেরা উচিৎ। কিন্তু হে বুদ্ধ, আমরা আপনার থেকে আরও অনেককিছু শিখতে চাই, আমরা আবার সবাই আসব”। ছেলেমেয়েরা সকলেই করজোড়ে গৌতমবুদ্ধকে নত হয়ে শ্রদ্ধা জানাল। তাঁর মনে হল, ছেলেমেয়েদের করজোড় যেন একএকটি পদ্মের কলি, পূর্ণ বিকশিত হবার অপেক্ষায় রয়েছে। তিনি স্থির করলেন, তিনি আরও কিছুদিন থেকে যাবেন। এই ছেলেমেয়েদের মধ্যেও তিনি মহাজাগরণের বীজ বপন করে যাবেন। তিনিও পেয়ে যাবেন কিছুটা বাড়তি সময়, এই শান্তি এবং আনন্দ উপভোগ করতে করতে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা স্থির করে নেবেন। ছেলেমেয়েরা বিকেলের ম্লান আলোয় পাখির মতো আনন্দে কলকাকলি করতে করতে ফিরে গেল তাদের গ্রামে।

গৌতমবুদ্ধ এখন রোজই নৈরঞ্জনা নদীর তীরে হাঁটতে হাঁটতে অনেকক্ষণ ধ্যান করেন। তারপর নদীতেই স্নান করেন।  তারপর কখনো নদীর পাড়ে, কখনো বা বোধিবৃক্ষের নিচে বসে ধ্যানে নিমগ্ন থাকেন। তাঁর চোখে এখন সব কিছুই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ওই বহতা নদী, নদীর দুই পাড়ের তৃণ, আকাশ, নক্ষত্র, পিছনের পাহাড়, অরণ্য, এই বোধিবৃক্ষ, সারাদিন এই গাছের কলকাকলি মুখর পাখির দল, এমনকি প্রত্যেকটি ধূলিকণা - সব কিছুই তাঁর জীবনসঙ্গী। তাঁর জীবনে প্রত্যেকের গুরুত্ব অপরিসীম। দীর্ঘ সাধনার পর এই মহাজ্ঞান বা বোধি তিনি অর্জন করেছেন। তিনি উপলব্ধি করেছেন, এই বোধি বাইরে থেকে আরোপিত কোন ধারণা নয়। এই বোধি রয়েছে সমস্ত মানুষের অন্তরেই, এমনকি প্রত্যেক প্রাণীর অন্তরেও। এ তত্ত্ব তারা জানে না, তারা অনুভব করতে পারে না। তারা জন্ম-মৃত্যু নিয়ে গড়া সীমিত জীবনের অর্থ সন্ধান করে ফেরে বাইরে বাইরে। গৌতমবুদ্ধ নিজের অন্তরেই আবিষ্কার করতে পেরেছেন সেই মহাপথ, যে পথে পৌঁছে যাওয়া যায় মহাবোধের অনন্ত সাগরে। তিনি উদ্ভাসিত হয়েছেন মহাজাগরণে, তিনি মুক্ত হয়েছেন।

তাঁর মনে পড়ল, অনেকেই তাঁর এই আবিষ্কারের অপেক্ষায় আছে। কপিলাবস্তু শহরে তাঁর পরিবারের সকলে, রাজগৃহের রাজা বিম্বিসার। তিনি নিজেও এখন সকল মানুষের অন্তরে এই মহাজাগরণের আলো পৌঁছে দিতে উদ্গ্রীব। তাঁর মনে পড়ল তাঁকে ছেড়ে যাওয়া সেই পাঁচ সন্ন্যাসীর কথাও। তাঁরা সাধনার যে স্তরে ছিলেন, তাঁদের পক্ষে এই বোধিলাভ সহজ হবে। তাঁরাও হয়ে উঠতে পারবেন গৌতমবুদ্ধের প্রচারসঙ্গী।

ছেলেমেয়েরা এখন তাঁর কাছে রোজই আসে। গৌতমবুদ্ধ খুব খুশী হন ওরা এলে। গ্রামের এই সরল প্রথাগত শিক্ষাহীন ছেলেমেয়েরাও তাঁর কথা মন দিয়ে শোনে। তিনি লক্ষ্য করেছেন, তাদের আচরণেও তাঁর শিক্ষার প্রভাব পড়েছে। বাপ-মা মরা স্বস্তি মোষচারণ করে, সে এবং তার পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র শূদ্র-দাস, গ্রামে ওরা অছ্যুত। সুজাতা স্বচ্ছল বৈশ্য পরিবারের মেয়ে। তিনি দেখেছেন, সুজাতা এবং তার ভাই-বোন, আজকাল স্বস্তির ভাই-বোনদের সঙ্গে খাবার ভাগ করে, একসঙ্গেই খায়। সুজাতা আর নন্দবালা এখন ঘনিষ্ঠ বন্ধু, ভীমাকে নিজের ছোটবোনের মতোই আদর করে সুজাতা। সুজাতা আর নন্দবালা গৌতমবুদ্ধের জন্যে একটি কাপড় নিয়ে এল একদিন। টুকটুকে লাল কাপড়টি দুজনে মিলে সেলাই করেছে। গৌতমবুদ্ধ খুশি হলেন খুব, এই কাপড়টি তাঁর খুবই দরকার ছিল। নদীর ধার থেকে পাওয়া সেই মৃতদেহের কাপড়টিও এখন পুরোনো হয়েছে এবং কেচে দিলে, না শুকনো পর্যন্ত তাঁর অসুবিধে হয়। সুজাতা যখন জানল, গৌতমবুদ্ধের পুরোনো বস্ত্রটি ছিল নদীর ধার থেকে কুড়িয়ে আনা মৃতদেহের আবরণ, সে কেঁদেই ফেলল। বলল, ওই মেয়েটি ছিল, তাদেরই বাড়ির দাসী, নাম রাধা, জ্বর-বিকারে মারা গিয়েছিল। গুরুদেব এতদিন সেই বস্ত্রটি ব্যবহার করে আসছেন! সুজাতা আর নন্দবালা নিজেরা চুপিচুপি ঠিক করে নিল, আরেকটি বস্ত্র তারা খুব শিগ্‌গিরি উপহার দেবে গৌতমবুদ্ধকে।

সুজাতার আরও দুই প্রিয় বান্ধবী বালাগুপ্তা আর জোতিলিখা। কিছু একটা কারণে বালাগুপ্তা আর জোতিলিখার মধ্যে ঝগড়া হয়ে যাওয়াতে, এখন দুজনের বাক্যালাপ বন্ধ। ওরা সুজাতার সঙ্গে আসে, কিন্তু বালাগুপ্তা আর জোতিলিখা পাশাপাশি না বসে, অনেকটা দূরে বসে। একদিন বালাগুপ্তা গৌতমবুদ্ধকে বন্ধুত্ব নিয়ে কিছু বলতে বলল। দুই বান্ধবীর দূরে বসা লক্ষ্য করে গৌতম বুদ্ধ স্মিতমুখে বললেন, “তাহলে তোদের একটা কাহিনী বলি শোন। বহু বহু বছর আগে আমি একবার হরিণ হয়ে জন্মেছিলাম”। ছেলেমেয়েরা সবাই ভীষণ আশ্চর্য হল এবং মজাও পেল, বলল, “আপনি হরিণ ছিলেন?”

শুধু আমি না রে, আমরা সবাই, তোরাও। আমাদের আগের আগের জন্মে আমরা কখনো ছিলাম, মাটি, পাথর, শিশিরবিন্দু, বায়ু, জল বা আগুন। কখনো ছিলাম, শ্যাওলা, ঘাস, গাছ, পোকামাকড়। কখনো ছিলাম মাছ, কচ্ছপ, পাখি কিংবা হরিণ, বাঘ, ঘোড়া, কুকুর। আমি সেই সব জন্মের কথা ধ্যানে জানতে পেরেছি, দেখতেও পেয়েছি। এক জন্মে আমি ছিলাম, পাহাড়চূড়ার এক বিশাল পাথর। আরেক জন্মে ছিলাম চাঁপাগাছ। এরকমই আরেক জন্মে আমি ছিলাম বনের হরিণ। আমার বন্ধু ছিল একটি দোয়েল আর কচ্ছপ। হয়তো তোদের মধ্যেই কেউ ছিলি সেই দোয়েল, কেউ বা সেই কচ্ছপ। আর ছিল একজন ব্যাধ।

আমরা তিন বন্ধু মিলে বাস করতাম এক অরণ্যে, সেই অরণ্যে ছিল একটি সরোবর। সেই সরোবরের জলে থাকত কচ্ছপ, দোয়েল থাকত গাছে আর আমি ঘুরে বেড়াতাম সেই অরণ্যের তৃণভূমিতে। সরোবরে আমি যখন জল খেতে যেতাম, আমাদের রোজ দেখা হত, আমরা খুব গল্প করতাম আর মজা করতাম। একদিন এক ব্যাধ সেই সরোবরে যাওয়ার পথেই ফাঁদ পেতে রেখেছিল আমাকে ধরার জন্যে। বুঝতে পারিনি, বিকেলের দিকে সরোবরে যখন জল খেতে যাচ্ছিলাম, ধরা পড়ে গেলাম। ভয়ে আমি চেঁচিয়ে উঠতে, জল থেকে উঠে এল কচ্ছপ, গাছ থেকে নেমে এল দোয়েল। আমি তো ভয়ে তখন দিশাহারা, ওরা দুজন কীভাবে আমাকে বাঁচানো যায়, সেই চিন্তা করতে লাগল। দোয়েল বলল, “কচ্ছপভাই, তোমার ধারালো দাঁত আর শক্ত চোয়াল দিয়ে হরিণের বাঁধন কাটতে চেষ্টা করো। ততক্ষণ আমি ব্যাধকে সামলাচ্ছি, ও যাতে চট করে এদিকে না আসতে পারে”। কচ্ছপ আমার পায়ের দড়ি কাটতে শুরু করল, আর দোয়েল উড়ে গেল ব্যাধের বাড়ির দিকে।

ব্যাধের বাড়ির পাশের একটা আমগাছে বসে দোয়েল সারারাত পাহারা দিল। খুব ভোরে ব্যাধ হাতে মস্ত ছুরি নিয়ে যেমনি ঘরের দরজা খুলে বেরিয়েছে, তার মুখের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল দোয়েল। ডানার ঝাপটানি আর পায়ের নখ দিয়ে খিমচে দিল ব্যাধের মুখচোখ। আচমকা সেই আক্রমণে ব্যাধটা বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিল, সে ঘরে ঢুকে পড়ে অনেকক্ষণ বিশ্রাম নিল। তারপর আবার ছুরি হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরোতে গেল পিছনের দরজা দিয়ে। এবারও দোয়েল একইভাবে তার মুখে চোখে খিমচে দিল। পরপর দুবার এমন হওয়াতে ব্যাধ আর সেদিন বেরোলই না। কিন্তু পরের দিন ভোরে দোয়েল দেখল ব্যাধ মাথায় পাগড়ি বেঁধেছে, মুখটাও ঢেকে রেখেছে গামছায়। তার হাতে আজও ছিল ভয়ংকর সেই ছুরিটা।

দোয়েল তাড়াতাড়ি উড়ে এল আমাদের কাছে। বলল, “কত দেরি কচ্ছপভাই, আজ আর ব্যাধকে আটকাতে পারলাম না। সে এদিকেই আসছে”। কচ্ছপ আমার তিন পায়ের দড়ি কেটে ফেলেছিল, বাকি ছিল একটাই। সেটারও অর্ধেক হয়ে এসেছিল, গাছের ওপর থেকে দোয়েল বলল, “ওই ব্যাধ আসছে, হরিণভাই। তুমি একবার লাফ মেরে, ঝটকা দিয়ে দড়িটা ছিঁড়ে ফেলতে পারো কিনা দেখ না”। আমি তাই করলাম আর দড়ির শেষটুকু সত্যিই ছিঁড়ে গেল। আমি মুক্ত হয়ে সামান্য দূরের ঝোপের আড়াল থেকে দেখতে লাগলাম ব্যাধটা এবার কী করে।

ব্যাধটা আমাকে দেখতে পেয়েছিল, ফাঁদের কাছে এসে কচ্ছপকে দেখে তার বুঝতে বাকি রইল না, আমি ফাঁদে পড়েছিলাম, আর কচ্ছপই সেই ফাঁদের দড়িগুলো কেটে দিয়েছে। সে রেগে গিয়ে কচ্ছপকেই ধরল, তারপর গামছায় বেঁধে ঝুলিয়ে নিল কাঁধে। আমি পালাতে পারলেও কচ্ছপ পারেনি। কচ্ছপ এমনিতেই আস্তে হাঁটে, তার ওপর তখন সে ভীষণ ক্লান্ত, টানা দু’রাত এবং একদিন ধরে সে তার দাঁত দিয়ে দড়িগুলো চিবিয়েছে। তাড়াতাড়ি হেঁটে সরোবরের জলে নেমে যাওয়ার মতো শক্তিও, তার তখন অবশিষ্ট ছিল না।

কচ্ছপ ধরা পড়তে দোয়েল আমার কাছে এল, বলল, “হরিণভাই, কচ্ছপকে বাঁচাতেই হবে। তুমি এক কাজ করো, ভুলিয়ে-ভালিয়ে ব্যাধকে তুমি একটু দূরের দিকে টেনে আনো। ও নিশ্চয়ই কচ্ছপের বোঝা নিয়ে তোমার দিকে দৌড়বে না, কোথাও নামিয়ে রাখবে, তখন আমি যা করার কিছু একটা করব”। তাই করলাম, ব্যাধের সামনে সামনে আমি ঘোরাঘুরি করে ঘাস খেতে লাগলাম। ব্যাধটা মনে করল, গতকাল খেতে না পেয়ে আমি নিশ্চয়ই দুর্বল, একটু দৌড়লেই আমাকে ধরে ফেলতে পারবে। সে গামছায় বাঁধা কচ্ছপটাকে মাটিতে রেখে আমার দিকে দৌড়ে এল। আমিও একটু সরে গেলাম, ব্যাধও আমার পিছনে আসতে লাগল। ওদিকে দোয়েল আর কচ্ছপ দুজনে মিলে গামছার বাঁধন কেটে ফেলল। তারপর ধীরে ধীরে হেঁটে গিয়ে কচ্ছপ নেমে পড়ল সরোবরের জলে। দোয়েল আবার আমার কাছে এসে খবর দিল, “হরিণভাই, আর ভয় নেই, তুমি পালাও। কচ্ছপ সরোবরে নেমে পড়েছে”। দোয়েলের কথা শুনে আমি দৌড় লাগালাম বনের গভীরে। ব্যাধটা হতাশ হয়ে ফিরে গেল সরোবরের কাছে, গিয়ে দেখল তার গামছাটা ছেঁড়া আর আশেপাশে কচ্ছপটাও নেই। জব্দ হয়ে ঘরে ফিরে গেল হতাশ ব্যাধটা।

বিকেলে সেই সরোবরের ধারে আমরা আবার তিন বন্ধু একত্র হলাম। কী যে আনন্দ হয়েছিল সেদিন, তিন বন্ধু মিলে কতক্ষণ গল্প করলাম, হাসলাম, মজা করলাম”। ছেলেমেয়েরা সকলেই মন দিয়ে গল্প শুনছিল, শেষ হতে গৌতমবুদ্ধ জিজ্ঞাসা করলেন, “বহুদিন আগের ওই ঘটনায় আমি ছিলাম হরিণ, তোদের মধ্যে কী কেউ কচ্ছপ ছিলি?” সুজাতা এবং অন্য তিনজন হাত তুলে বলল, “আমি”। গৌতমবুদ্ধ হাসলেন, বললেন, “আর সেই দোয়েল?” এবার হাত তুলল স্বস্তি, জোতিলিখা আর বালাগুপ্তা, বলল, “আমি”।

সুজাতা জোতিলিখা আর বালাগুপ্তাকে বলল, “তোরা সেই জন্মে যদি দুজনে মিলে একটি দোয়েল হয়ে থাকিস, তাহলে এই জন্মে কী দুই দোয়েলে ঝগড়া হতে পারে? এই জন্মে আমাদের মধ্যেও তো অমন বন্ধুত্ব হয়ে উঠতে পারে, ওই হরিণ, দোয়েল আর কচ্ছপের মতো?”

বালাগুপ্তা উঠে দাঁড়িয়ে জোতিলিখার সামনে গেল, জোতিলিখার দুই হাত ধরল নিজের দুহাতে। জোতিলিখা বালাগুপ্তকে জড়িয়ে ধরল, তারপর একটু সরে পাশে বসার জায়গা করে দিল বালাগুপ্তকে। গৌতমবুদ্ধ মুগ্ধ আনন্দে হাসলেন, বললেন, “বাঃ তোরা গল্পটা বেশ বুঝেছিস তো! গল্পটা মনে রাখিস আর সর্বদা লক্ষ্য করে দেখিস, এমন কত ঘটনা আজও ঘটে চলেছে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে”। গৌতমবুদ্ধ উপলব্ধি করলেন, জটিল ও সূক্ষ্ম তত্ত্বকথার থেকে এমন গল্পগাছা, সাধারণ মানুষ এবং ছেলেমেয়েদের মনকে খুব সহজেই নাড়া দিতে পারবে।

৩.৩.২ ধর্মচক্র

গৌতমবুদ্ধ উরুবিল্ব গ্রাম ছেড়ে একদিন বেরিয়ে পড়লেন। ছেলেমেয়েদের সকলেই এসেছিল তাঁকে বিদায় জানাতে। সকলের চোখেই জল, গৌতমবুদ্ধ স্মিত মুখে সবার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন, তারপর বললেন, “আমার এই মহামার্গ আবিষ্কারের পেছনে তোদের সব্বার সাহায্যের কথা আমার চিরকাল মনে থাকবে, আমি তোদের সবার কাছেই কৃতজ্ঞ। কিন্তু তোদের ছেড়ে আমাকে যেতেই হবে। সবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে আমার নতুন বার্তা, প্রত্যেককে জানাতে হবে মুক্তি-পথের সন্ধান। যেটুকু তোদের শিখিয়ে গেলাম, সেগুলি মনে রাখিস এবং নিয়মিত অভ্যাস করিস। আমি দূরে গেলেও, তোদের মনের মধ্যেই এভাবেই থাকবো সর্বদা। আর কথা দিচ্ছি, সুযোগ পেলেই আমি আবার ফিরে আসবো তোদের কাছে। সুজাতা, চোখের জল মুছে, আমায় হাসি মুখে বিদায় দে, মা”।

ছেলেমেয়েরা তাঁর সঙ্গে এল গ্রামের সীমানা পর্যন্ত। গ্রাম ছেড়ে কিছুদূর গিয়েই তাঁর সঙ্গে পথেই দেখা হল এক সন্ন্যাসীর। সন্ন্যাসী তাঁকে দেখেই জোড়হাতে এগিয়ে এলেন, তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, “হে সন্ন্যাসি, আপনার চেহারা অদ্ভূত জ্যোতির্ময় এবং আপনার মুখে দেখছি আশ্চর্য প্রশান্তি। আপনার নাম কী? আপনার আচার্যই বা কে?”

গৌতমবুদ্ধ বললেন, “আমি গৌতমবুদ্ধ। আমি অনেক আচার্যের কাছেই শিক্ষা পেয়েছি, কিন্তু এখন আমার কেউ আচার্য ছিলেন না। আপনার নাম কী? আর আপনি কোথা থেকে আসছেন?”

আমার নাম উপক। আমি আচার্য রুদ্রক রামপুত্রের আশ্রম ছেড়ে এই আসছি”।

আচার্য রুদ্রক ভালো আছেন তো?”

আচার্য রুদ্রক এই কয়েকদিন আগেই দেহরক্ষা করেছেন”।

গৌতম বুদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কী কোন সময় আচার্য আলাড় কালামসের আশ্রমে ছিলেন?”

ছিলাম। কিন্তু তিনিও বছরখানেক হল গতায়ু হয়েছেন”।

হতাশ গৌতমবুদ্ধ জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কী সন্ন্যাসী কৌণ্ডিল্যর নাম শুনেছেন?”

শুনেছি বৈকি। যতদূর জানি কৌণ্ডিল্য এবং আরও চারজন সন্ন্যাসী বারাণসীর কাছে ঋষিপত্তনের মৃগদাবে রয়েছেন এবং আজকাল ওখানেই তপস্যা করছেন। এবার আমাকে যেতে হবে, গৌতম, আমার যাত্রার পথ বহুদূর”। গৌতমবুদ্ধ জোড়হাতে সন্ন্যাসীকে বিদায় দিলেন। তিনি স্থির করলেন, নৈরঞ্জনা নদীর ধার দিয়েই তিনি হাঁটবেন। এই নদী যেখানে গঙ্গায় মিশেছে, সেই পর্যন্ত গিয়ে, তিনি গঙ্গার পাড় দিয়ে পশ্চিমে হেঁটে পৌঁছবেন পাতালিগ্রাম। সেখানে গঙ্গা পার হয়ে কিছুটা গেলেই বারাণসী, কাশী রাজ্যের রাজধানী।

কৌণ্ডিল্য, ভদ্রিক, অশ্বজিৎ, বপ্র আর মহানামা, সেদিন মৃগদাবে সবে ধ্যানে বসছেন, লক্ষ্য করলেন, দূর থেকে একজন সন্ন্যাসী তাঁদের দিকেই আসছেন। একটু কাছে আসতে তাঁরা চিনতে পারলেন, এ সেই সন্ন্যাসী সিদ্ধার্থ। ভদ্রিক সিদ্ধার্থকে চিনতে পেরেই অন্যদের বললেন, “সিদ্ধার্থ মাঝপথেই তপস্যা ছেড়ে দিয়েছিল। সে এখন ভাত খায়, দুধ খায়, বাচ্চাদের সঙ্গে এমনকি মেয়েদের সঙ্গেও হেসে হেসে কথা বলে। সিদ্ধার্থ আর সন্ন্যাসীই নয়। অতএব তার সঙ্গে আমরা কোন কথা বলব না। সামনে এসে দাঁড়ালেও আমরা তাকে কোন সম্মান দেখাবো না”।

কিন্তু গৌতমবুদ্ধ যখন শান্ত পায়ে তাঁদের সামনে স্মিতমুখে দাঁড়ালেন, সন্ন্যাসীরা তাঁদের প্রতিজ্ঞার কথা ভুলে গেলেন। গৌতমবুদ্ধের উজ্জ্বল প্রশান্ত উপস্থিতিতে তাঁরা সকলে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন এবং করজোড়ে মাথা নত করে শ্রদ্ধা জানালেন। কৌণ্ডিল্য তাঁর হাতের ভিক্ষাপাত্র গ্রহণ করলেন। মহানামা দৌড়ে গিয়ে তাঁর হাত ও পা ধোয়ার জল আনলেন। ভদ্রিক কাঠের পিঁড়ি এনে দিলেন বসার জন্যে। বপ্র তালপাতার পাখা দিয়ে হাওয়া করতে লাগলেন। অশ্বজিৎ একধারে দাঁড়িয়ে রইলেন, গৌতমবুদ্ধের নির্দেশের অপেক্ষায়।

সামান্য বিশ্রামের পর পাঁচজন সন্ন্যাসী গৌতমবুদ্ধকে ঘিরে বসলেন। সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে স্মিতমুখে  গৌতমবুদ্ধ বললেন, “আমি যে পথের সন্ধান করছিলাম, প্রিয় বন্ধুরা, সেই মহামার্গ আমি আবিষ্কার করেছি। আমি তোমাদেরও সেই পথ দেখাব”। কথাটা পাঁচজন সন্ন্যাসীর কারো খুব একটা বিশ্বাস হল না যেন, তাদের মনে এখনও সন্দেহ রয়েছে। কৌণ্ডিল্য বললেন, “সিদ্ধার্থ, তুমি তো মাঝপথে তপস্যাই ছেড়ে দিয়েছিলে। আমরা দেখেছি তুমি ভাত খাচ্ছিলে, দুধ খাচ্ছিলে, গ্রামের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে গল্প করছিলে। কীভাবে তুমি মুক্তির পথ খুঁজে পেয়ে গেলে?”

গৌতমবুদ্ধ স্নিগ্ধ শান্ত স্বরে বললেন, “সে কথাই আমি তোমাদের বলতে এসেছি। দেখ, যে দুটি চরম পথের কথা এতদিন আমরা শুনেছি, সন্ন্যাসীদের সেই দুটো পথই ত্যাগ করা উচিৎ। প্রথমটি হল ভোগ, দ্বিতীয়টি কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন। এই দুই পথেই আসে চরম ব্যর্থতা। এই দুই পথকে এড়িয়ে আমি যে পথ আবিষ্কার করেছি, সে পথের নাম “মধ্যম পন্থা”, এই পথেই আমি পেয়েছি মহাজ্ঞান এবং মুক্তির সন্ধান”। তাঁর কণ্ঠস্বরে ছিল এতটাই আত্মপ্রত্যয়, পাঁচজন সন্ন্যাসীই এবার শ্রদ্ধা-নিবিড় চোখে করজোড়ে তাকিয়ে রইলেন বুদ্ধের মুখের দিকে।

বুদ্ধ আরও বললেন, “এই মধ্যম পন্থার সাধনা দিয়েই আমি আরও আটটি পথের সন্ধান পেয়েছি, যার নাম “অষ্টাঙ্গিক মার্গ”। সম্যক দর্শন, সম্যক সঙ্কল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক জীবিকা, সম্যক প্রচেষ্টা, সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধি। এই আটটি আচরণ আয়ত্ত করতে পারলে, আমরা চারটি আর্য বা শ্রেষ্ঠ সত্য উপলব্ধি করতে পারবো। এই চারটি আর্যসত্য হল দুঃখ, দুঃখের হেতু, দুঃখ নিরোধ, দুঃখনিরোধ মার্গ।

দুঃখ-সত্য হল জন্ম, জরা, ব্যাধি, মৃত্যু – শোক সন্তাপ, দুশ্চিন্তা, প্রিয়জনের বিরহ অথবা বিয়োগ, দুর্জনের অত্যাচার। আরও দুঃখ হল, যা পেতে চাইছি, তা না পাওয়া এবং যা চাইনি তাই পেয়ে যাওয়া। শেষ দুটি দুঃখের উদাহরণ দিলে বুঝতে সুবিধে হবে, অনেকদিন ধরেই আমি অত্যন্ত কম দায়িত্বের কিন্তু প্রচুর আয় ও সুখ-সুবিধে যুক্ত একটি উত্তম চাকরি চেয়েছি, পাইনি। জেল খাটতে চাইনি, কিন্তু রাতারাতি ধনী হওয়ার আশায় ঘুঁষ নিয়ে, ধরা পড়ে জেল খাটছি।

দুঃখ-হেতু-সত্য হল, তৃষ্ণা অর্থাৎ ভোগের আকাঙ্খা বা কামনা। এই তৃষ্ণার জন্যেই রাজায়-রাজায় যুদ্ধ হয়। মাতা-পুত্র, পিতা-পুত্র, ভাই-ভাই, ভাই-বোন, প্রতিবেশী কিংবা মিত্র-মিত্রের মধ্যে বিবাদ উপস্থিত হয়।

দুঃখ-নিরোধ-সত্য হল, মন থেকে তৃষ্ণার নিরোধ এবং বিনাশ। তৃষ্ণার বিনাশ হলে উপাদান অর্থাৎ বিষয় অথবা সম্পদের আকাঙ্খা নিরোধ হয়। তখন দুঃখ-হেতুর নিরোধ হয় অর্থাৎ অন্য মানুষের সঙ্গে বিবাদের সৃষ্টি হতে পারে না।

দুঃখনিরোধ-মার্গ সত্য হল, সেই পথ যে পথে দুঃখ নিরোধ সম্ভব। সে ওই অষ্টাঙ্গিক মার্গ, যার কথা আগেই বলেছি। এই আটটি মার্গকে প্রজ্ঞা, শীল এবং সমাধি ভাবেও বিভক্ত করা যায়। যেমন, সম্যক দর্শন, সম্যক সঙ্কল্প হল প্রজ্ঞা। সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক জীবিকা হল শীল। আর সম্যক প্রচেষ্টা, সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধি হল সমাধি।

প্রজ্ঞা হল, সম্যক বা সঠিক দর্শন বা দৃষ্টি – এই দৃষ্টি কায়িক, বাচনিক এবং মানসিক, সু ও কুকর্ম বিষয়ে প্রজ্ঞা দেয়। যেমন কায়িক সুকর্ম হল হিংসা না করা, চুরি না করা, ব্যাভিচার না করা। বাচনিক সুকর্ম হল সত্য বলা, প্রিয় কথা বলা, পিছনে কথা না বলা (অর্থাৎ চুকলি না কাটা) এবং আজেবাজে না বকে সুচিন্তিত অর্থপূর্ণ কথা বলা। মানসিক সুকর্ম হল লোভ না করা, বন্ধুত্ব, করুণা, সহমর্মীতা এবং অভ্রান্ত ধারণা। মানুষ প্রায় সর্বদাই আজন্ম-লালিত কিছু ধারণায় আবদ্ধ থাকে। সেই ধারণাতেই আটকে না থেকে নতুন পরিবেশে, নতুন যুগে ধারণাকে সচল এবং উন্মুক্ত রাখাই হল অভ্রান্ত ধারণা। প্রজ্ঞার মধ্যে আরও রয়েছে সম্যক সঙ্কল্প – রাগ, হিংসা, প্রতিহিংসাবিহীন সঙ্কল্পকেই সম্যক সঙ্কল্প বলে।

শীল কথার অর্থ সদাচার – ভালো স্বভাব।  তার মধ্যে সম্যক বাক্য হল বাচনিক সুকর্ম, যার কথা আগেই বলেছি। সম্যক কর্ম হল কায়িক সুকর্ম। সম্যক জীবিকা হল জীবনধারণের প্রয়োজনে সৎ জীবিকা। অস্ত্র, প্রাণী, মাংস, নেশা ও বিষদ্রব্যের উৎপাদন ও এগুলির বাণিজ্য সংক্রান্ত সকল কাজই অসৎ জীবিকা। 

সমাধি বিভাগে সম্যক প্রযত্ন হল ইন্দ্রিয়ের সংযম এবং কুচিন্তা ত্যাগ করে সুচিন্তায় মানসিক স্থিতি। আমাদের দেহ, আমাদের দুঃখ-সুখ, শোক-আনন্দ সবই ক্ষণস্থায়ী, এই কথাটি সর্বদা মনে রাখাই হল সম্যক স্মৃতি। সম্যক সমাধি হল মনের একাগ্রতা। সমাধি অর্থাৎ সাধনা বা ধ্যান করে মনের যাবতীয় বিক্ষেপ দূর করা সম্ভব”।

বুদ্ধের কথা শেষ হওয়ার আগেই সন্ন্যাসী কৌণ্ডিল্য অন্তরে অনুভব করলেন অবর্ণনীয় আনন্দ-জ্যোতি। তাঁর শরীরে লাগল শিহরণ এবং মুখে প্রশান্ত হাসি। বুদ্ধর চোখ এড়াল না, তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “কৌণ্ডিল্য, তুমি কী পেয়েছ আলোর সন্ধান”? সন্ন্যাসী কৌণ্ডিল্য জোড় হাতে নত হয়ে বুদ্ধের চরণ স্পর্শ করলেন, বললেন, “হে মহাগুরু সিদ্ধার্থ, আমাকে আপনার শিষ্যত্বে অনুমতি দিন, আপনার সহায়তায় আমিও চাই এমনই জাগরণ”। অন্য চার সন্ন্যাসীও বুদ্ধের চরণে নিজেদের সমর্পণ করলেন, তাঁর শিষ্যত্বের অনুগ্রহ প্রার্থনা করলেন। বুদ্ধ তাঁদের পাঁচজনকেই হাত ধরে দাঁড় করালেন, তারপর স্মিত মুখে বললেন, “উরুবিল্বর ছেলেমেয়েরা আমার নাম দিয়েছে “বুদ্ধ”, আর এই মহাজাগরণের নাম দিয়েছে “বোধি”। আজ থেকে তোমরাও আমায় “গৌতমবুদ্ধ” নামেই ডাকবে”।

গৌতমবুদ্ধ ঋষিপত্তনে (আজকের সারনাথ) পৌঁছেছিলেন এবং পাঁচ সন্ন্যাসীকে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত করেছিলেন ৫২৮ বি.সি.ই-র আষাঢ় মাসের পূর্ণিমার দিন। বৌদ্ধধর্মে এই দিনটি আজও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। এই ঋষিপত্তনেই তিনি থাকলেন বর্ষার চারটি মাস। তাঁর সাহায্যে এবং সন্ন্যাসীদের একনিষ্ঠ সাধনায় পাঁচজনেই উপলব্ধি করলেন, পরম সত্য। কিছুদিনের মধ্যে তাঁরা সকলেই হয়ে উঠলেন আলোকপ্রাপ্ত অর্হৎ। গৌতমবুদ্ধ স্মিতমুখে বললেন, “এখন আমরা আর একা নই, আমরা এখন সঙ্ঘ। এই সঙ্ঘের সদস্যরা সম্যকভাবে প্রাজ্ঞ জীবনযাপন করবে। আমাদের এই সঙ্ঘ জাগরণের বীজ নিয়ে বেরিয়ে পড়বে এবং রোপণ করবে সর্বত্র”। শুধু ওই পাঁচজন অর্হৎই নন, বর্ষা শেষে ওই ঋষিপত্তনেই আরও ষাটজন মুক্তিকামী মানুষ তাঁর কাছে দীক্ষা নিয়ে ভিক্ষু হলেন।

 অর্হৎ কৌণ্ডিল্য গৌতমবুদ্ধের অনুমতি নিয়ে ভিক্ষুদের দীক্ষিত করার একটি পদ্ধতি নির্দিষ্ট করে দিলেন।

১. সন্ন্যাস গ্রহণে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা গৌতমবুদ্ধ কিংবা অর্হৎ-দের কাছে, তাদের ইচ্ছার কথা নিবেদন করত।  দীর্ঘ আলাপ ও নানান প্রশ্নোত্তরে অর্হৎ-রা সন্তুষ্ট হলে, তবেই তাদের দীক্ষার অনুমোদন দেওয়া হত।

২. দীক্ষা গ্রহণের শুরুতেই মুণ্ডন করতে হত মাথার চুল, দাড়ি ও গোঁফ। তারপর নদী বা সরোবরে স্নান করে, পরতে হত বিশেষ বস্ত্র। সাধারণ ধুতি-চাদরের মতো নয়, সেটি পরারও বিশেষ ধরণ ছিল – কাঁধ থেকে গোড়ালি পর্যন্ত আবৃত থাকত সেই বসনে – শুধু ডান কাঁধ আর ডান হাত থাকত উন্মুক্ত। বসন পরার এই বিশেষ পদ্ধতি শিখতে হত দীক্ষা-রত সন্ন্যাসীদের।  

৩. এরপর দীক্ষাগুরুর সামনে নতজানু হয়ে বসত দীক্ষাপ্রার্থী সন্ন্যাসী, কমলপুটে তিনটি মন্ত্র তিনবার শপথের মতো উচ্চারণ করতে হত, “বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি, ধর্মং শরণং গচ্ছামি, সংঘং শরণং গচ্ছামি”। যিনি আমায় জীবনের পথ দেখাবেন, আমি সেই বুদ্ধের আশ্রয় গ্রহণ করলাম। যে আমায় উপলব্ধি ও ভালোবাসার পথ দেখাবে, আমি সেই ধর্মের আশ্রয় গ্রহণ করলাম। যে আমাকে সচেতন সহযোগীতার পথ দেখাবে আমি সেই সংঘের আশ্রয় গ্রহণ করলাম।

৪. দীক্ষাগ্রহণ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলে, দীক্ষিতের প্রথম পাঠ নির্দিষ্ট মাপের ভিক্ষাপাত্র নিয়ে লোকালয়ে ভিক্ষা করা। ভিক্ষাপাত্র একবার পূর্ণ হলেই লোকালয় থেকে আশ্রমে ফিরতে হত। সেখানেই সকলের সঙ্গে বসে সেই ভিক্ষালব্ধ খাদ্য নিবিষ্ট মনে আহার করতে হত। নির্দিষ্ট পরিমাণ ভিক্ষা গ্রহণের এই প্রাত্যহিক অনুষ্ঠান দিয়েই শুরু হত দীক্ষিতদের সাধনা। এই সাধনায় দীক্ষিতের অহংকার, লোভ ও ঔদ্ধত্য বিনাশ হয়, বাড়ে ধৈর্য এবং মানসিক স্থিতি।           

ঋষিপত্তন ছাড়ার আগে  গৌতমবুদ্ধ  শিষ্য অর্হৎ এবং ভিক্ষুদের নির্দেশ দিয়ে গেলেন, “হে ভিক্ষুগণ! বহুজনের হিতের জন্য, বহুজনের সুখের জন্যে, সমস্ত জীবের প্রতি সহমর্মীতা নিয়ে বিচরণ কর। একসঙ্গে দুজন নয়, একলা পথ চলো। আমিও এবার বের হবো – আমার উপলব্ধির আলো পৌঁছে দিতে হবে, রাজগৃহ নগর, উরুবিল্ব গ্রামের ঘরে ঘরে”। বুদ্ধদেব আষাঢ়ী পূর্ণিমায় যে ধর্মপ্রচার শুরু করেছিলেন, কিছুদিনের মধ্যেই সেই প্রচারের রথ ধর্মচক্রে ভর করে দৌড়ে চলল গোটা গাঙ্গেয় উপত্যকায়।  


পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " ধর্মাধর্ম - ৩/৪ "

সোমবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২৫

এক যে ছিলেন রাজা - ২য় পর্ব

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "




                         এই উপন্যাসের প্রথম পর্ব - "এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব

[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক বিশ্লেষণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]



রাজার ওই ঘোষণাতে অত্যন্ত বিচলিত হলেও গতকাল হাট থেকে ফিরতে ফিরতে একটু সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছিল বলে, আচার্য বেদব্রত তাঁর অভিন্নহৃদয় বন্ধু আচার্য ধর্মধরের বাড়ি যাননি। আজ আচার্য ধর্মধরের বাড়িতে গিয়ে যখন উপস্থিত হলেন, আকাশে আলো ফুটলেও, সূর্যোদয়ের একটু বিলম্ব ছিল। বাঁশের আগল খুলে আচার্য ধর্মধরের অঙ্গনে পা দিয়েই দেখলেন ধর্মধর শিশুপুত্রকে কোলে নিয়ে নিমের দাঁতন করছেন। শিশুর অব্যক্ত স্বরের বক্তব্য বোঝা না গেলেও, আচার্য ধর্মধর তার সঙ্গে এই ভোরের নির্মল আকাশ, শীতল বাতাস, আধফোটা আলো, জাগ্রত পক্ষিকুল নিয়ে ভাবগম্ভীর আলোচনায় ব্যস্ত। এই অসময়ে বেদব্রতকে দেখে ধর্মধর একটু অবাক হলেন, বুঝলেন অত্যন্ত জরুরি কিছু বিষয় আছে। ইশারায় বেদব্রতকে বললেন, আসন নিয়ে দাওয়ায় উঠে বসতে, তারপর বাড়ির অন্দরে গেলেন শিশুপুত্রকে নিয়ে

তিনধাপ সিঁড়ি বেয়ে মাটির দাওয়ায় উঠে, বেদব্রত আড়া থেকে দুটি আসন পাড়লেন। তাঁর আচরণে বোঝা যায়, এই গৃহে তাঁর নিত্য যাতায়াত আছে। দাওয়াতে সামনাসামনি দুটি আসন পেতে একটিতে বসলেন বেদব্রত, তারপর অপেক্ষা করতে লাগলেন বন্ধু ধর্মধরের জন্যে। দাওয়ায় বসে ডানদিকে তাকিয়ে তিনি দেখতে লাগলেন পরিষ্কার নিকোনো অঙ্গনের সীমানায় ফুল গাছের সারি। ভোরের স্নিগ্ধ আলোর স্পর্শে সদ্যফোটা অজস্র ফুলের রঙে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে সমস্ত অঙ্গন।  সেই অঙ্গনের মাঝখানে ছোট্ট মন্দিরের চূড়ায় পূত তুলসীগাছটি এই গৃহে মঙ্গলের সঞ্চার করছে। এই গৃহের প্রতিটি কোণায় গৃহিণীর কল্যাণী হাতের ছোঁয়া স্পষ্ট উপলব্ধি করলেন বেদব্রত। বেদব্রত মগ্ন হয়ে দেখতে লাগলেন, পূব আকাশটাকে রঙের প্লাবনে ভাসিয়ে সূর্যদেবের উদয়।

“কী ব্যাপার, বেদ, এত সকাল সকাল? কোন বিপদআপদ নয় তো?” ধর্মধরের প্রশ্নে বেদব্রত ফিরে তাকালেন, বললেন, “না, না, যে বিপদের আশংকা তুমি করছো, তেমন কিছু নয়। এ অন্য বিপদ, বোসো, বলছি”। ধর্মধর সামনের বিছানো আসনে বসলেন। কিছু বললেন না, তাকিয়ে রইলেন বেদব্রতর মুখের দিকে।

বেদব্রত বললেন, “কালকে হাটে গেছিলাম”।

“সে তো তুমি কাল যাওয়ার সময় বলেই গেলে। আমাদের কিছু আনতে হবে কিনা, তুমি তাও জিজ্ঞাসা করেছিলে। কিন্তু...” 

“সেখানে মহারাজ বেণের একটি ঘোষণা শুনলাম। এই ঘোষণা শোনা অব্দি আমি খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছি। বলতে পারো কাল প্রায় সারারাত আমার ঘুম হয়নি”।

“কি এমন ঘোষণা, বেদ, তোমার রাতের ঘুম কেড়ে নিল?” এবার ধর্মধরের কণ্ঠেও উদ্বেগের সুর।

ধীমান বেদব্রত গতকাল শোনা সেই ঘোষণার হুবহু পুনরাবৃত্তি করলেন, ঘোষণার একটি বর্ণও তিনি ভুলে যাননি। ঘোষণাটি শুনে ধর্মধর বললেন, “কী বলছো, বেদব্রত? আমাদের এতদিনের চর্চিত বেদমন্ত্র, যজ্ঞবিধান সমস্ত ত্যাগ করে, এখন শুধু মহারাজা বেণের জন্যে স্তোত্রমন্ত্র রচনা করতে হবে? এতদিন পরম ঈশ্বরের আলোচনায়, ভজনায় এবং যজ্ঞে আমরা ঋদ্ধ হয়েছিসে সমস্ত বৃথা হয়ে যাবে অত্যাচারী ও স্বৈরাচারী এক রাজার দম্ভে!”

“তাই কি হতে পারে, ধর্ম? যত বড়ো শক্তিশালী রাজাই হোন না কেন, আমাদের সনাতন ধর্মের বিনাশ তাঁর পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। আমাদের জন্যে ভাবছি না, ধর্ম। আমি ভাবছি, এই রাজার অত্যাচারে এবং অবিচারে ভেঙে পড়বে সাধারণ মানুষের মনোবল আর বিশ্বাস। সমাজের কাছে সে হবে এক সাংঘাতিক অভিশাপ”।

দুই বন্ধু চুপ করে বসে রইলেন অনেকক্ষণ। দাওয়া থেকে বসে দুজনেই তাকিয়ে রইলেন উদিত বালার্কের দিকেএকসময় দুজনেই অস্ফুট উচ্চারণে বললেন, “জবাফুলের মতো বর্ণময়, হে মহাদীপ্ত কশ্যপপুত্র, সর্ব কলূষহারী হে দিবাকর, তোমাকে প্রণাম করি”  কিন্তু এই স্তোত্র মহারাজ বেণের স্তব নয়, অতএব জ্ঞানতঃ তাঁরা দুজনেই মহারাজ বেণের অসম্মান করে, শাস্তিযোগ্য অপরাধ করলেন!

দুটি ছোট মাটির পাত্রে কবোষ্ণ জলে সামান্য মধু ও কিছুটা লেবুর রস মেশানো পানীয় নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন ধর্মধরের পত্নী শান্তশ্রী। সকাল সকাল দুই বন্ধুকে মুখোমুখি চুপ করে বসে থাকতে দেখে শান্তশ্রী বিস্মিত হলেন। এই দুই বন্ধুর সখ্যতা তিনি উপভোগ করেন। এই সংসারে আসার পর থেকেই তিনি অনুভব করেছেন আচার্য বেদব্রত তাঁর প্রিয় অগ্রজের মতোই শুভাকাঙ্ক্ষী। দুজনের এই বিষণ্ণ বসে থাকায় তিনি বিশেষ উদ্বিগ্ন হলেন। দুজনের হাতে পাত্র দুটি তুলে দিতে দিতে বললেন, “বেদদাদা, তোমাকে চিন্তিত দেখছি, বাড়িতে সকলে ভালো আছেন তো? এই প্রচণ্ড গ্রীষ্মে তোমার ছেলেমেয়েরা কেউ অসুস্থ হয়নি তো? সুমেধাদিদি ভালো আছেন তো”?

আচার্য বেদব্রত মুখ তুলে শান্তশ্রীর দিকে তাকালেন, মৃদু হেসে বললেন, “সবাই কুশলে আছেন। কিন্তু তুমি কী জানো, শান্তাবোন, আমরা দুজনে এই মাত্র কঠোর শাস্তিযোগ্য একটি অপরাধ করে ফেললাম”?

“কী বলছো, বেদদাদা। শাস্তিযোগ্য অপরাধ? সুন্দর এই সকালে, প্রিয় সখার গৃহের দাওয়ায় শান্তভাবে বসে কী অপরাধ করে ফেললে, তোমরা”? দুজনের মুখের দিকে ব্যাকুল চোখে তাকালেন শান্তশ্রী। পতি ধর্মধরকে জিজ্ঞাসা করলেন, “খুলে বলো, আর্যপুত্র, কী হয়েছে”?

আচার্য ধর্মধর বললেন, “আমরা দুজনেই ওই উদিত সূর্যের দিকে তাকিয়ে সূর্যের প্রণাম-মন্ত্র উচ্চারণ করেছি”। কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকার পর, হাসতে হাসতে স্বামী ধর্মধরের পাশে বসে পড়লেন শান্তশ্রী। হাসির বেগ কমলে বললেন, “এ নিশ্চয়ই বেদদাদার বুদ্ধি। সকাল সকাল দুজনে মিলে আমার সঙ্গে তোমরা কৌতুক করছো? ওফ, তোমাদের মুখ দেখে আমি এতটুকুও অনুমান করতে পারিনি, তোমাদের এই অভিনয়...” কথা বলতে বলতে থেমে গেলেন শান্তশ্রী, কারণ এতক্ষণে তিনি লক্ষ্য করলেন, তাঁর হাসিতে ওঁরা কেউই যোগ দেননি। দুজনের মুখই আগের মতো বিষণ্ণ। শান্তশ্রী এবার অশুভ কোন ইঙ্গিত পেলেন, বললেন, “কী হয়েছে, বেদদাদা? সকাল সকাল কী সংবাদ নিয়ে এসেছো, তুমি?”

গতকাল হাটে শোনা রাজার নির্দেশের কথা বলে, বেদব্রত বললেন, “এখন থেকে যা কিছু পুজো, মন্ত্রের উচ্চারণ সব হবে শুধুমাত্র রাজা বেণের জন্য। তোমার অঙ্গনের ওই তুলসীমন্দির ভেঙে ফেলতে হবে। ওখানে গড়তে হবে মহারাজ বেণের মূর্তি। তোমার গৃহের মঙ্গলাসনে অধিষ্ঠিত ভগবান বিষ্ণুকে আজ এখনই ত্যাগ করতে হবে, সেই আসনে বসাতে হবে মহারাজ বেণকে।”

চমকে উঠলেন শান্তশ্রী, আর্ত কণ্ঠে বললেন, “এই সুন্দর প্রভাতে এই ভয়ংকর অমঙ্গলের কথা উচ্চারণ করতে তোমার বুক কাঁপল না, বেদদাদা?” শান্তশ্রীর কথার অনেকক্ষণ কেউ উত্তর দিলেন না, বেশ কিছুক্ষণ পর ধর্মধর বললেন, “এখন থেকে আমাদের শিষ্যদের শেখাতে হবে মহারাজা বেণের মহিমা স্তোত্র এবং তাঁর মহান্‌ জীবনীগাথা। অধ্যাপক হিসেবে মহারাজা বেণকে আদর্শ পুরুষ করে গড়ে তুলতে হবে আমাদের, আগামী প্রজন্মের সামনে”

অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বললেন না। কিছুক্ষণ পর উচ্ছিষ্ট মাটির পাত্র দুটি তুলে নিয়ে শান্তশ্রী ধীর পায়ে, ঘরের মধ্যে চলে গেলেন। তাঁর চলার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আচার্য বেদব্রত, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “কী করা যায় বলতো, ধর্মধর? আমাদের প্রত্যেক ঘরে শান্তশ্রীর মতো এমনই কল্যাণী নারীরা, স্বামী, পুত্র সংসারের মঙ্গলের জন্যে ভগবান বিষ্ণু অথবা দেবাদিদেব মহাদেবের বিগ্রহে নিশ্চিন্ত ভরসা রাখেনতাঁদের হঠাৎ যদি আজ বলা হয়, ঐসব বিগ্রহ ফেলে দিয়ে রাজা বেণের বিগ্রহ পুজো করো, কী ঘটবে ভাবতে পারছো”?

“এর একটা বিহিত দরকার, বেদ। এতদিন মহারাজা বেণের অনেক অত্যাচার, অনাচারের কথা শুনেছি, কিন্তু এই নির্দেশ সমস্ত সীমাই লঙ্ঘন করেছে। এত অনাচার অসহ্য, বেদ। প্রয়োজন হলে, বিদ্রোহ করতে হবে। লড়াই করতে হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই রাজার পরিবর্তন চাই।”

“ঠিক কথা, ধর্মএই রাজার পতন চাই। কিন্তু চাই বললেই তো বদল হবে না। উত্তেজিত হয়ে বাইরের লোকের কাছে একথা আর বলো না, ধর্ম। এ রাজা অত্যাচারী, দাম্ভিক। এ রাজা শিক্ষিতজনের সম্মান বোঝে না”।

“কী বলতে চাইছো, তুমি? আমরা হাত পা গুটিয়ে ঘরে বসে থাকবো? ধর্মপথ ছেড়ে আমরা অধর্মের সহচর হবো? এভাবে আপস করে বাঁচার কোন অর্থ হয়, বেদ?”

“পতঙ্গ আগুনের মধ্যে ঝাঁপ দিলে অগ্নির কোন ক্ষতি হয় না, কিন্তু অকারণ দগ্ধ হয়ে মরে পতঙ্গ। আমাদের কিছু একটা করতে হবে। কিন্তু একলা তুমি আর আমি নই, সকলে মিলে, সমবেতভাবে। আমাদের সকলের এখন গুরুদেব ভৃগুর কাছে যাওয়া উচিৎ, সঠিক পথের সন্ধান তিনিই দিতে পারবেন আমার বিশ্বাস হয় না, এই ঘোষণায় তাঁর থেকে বেশি বিচলিত আর কেউ হতে পারেন। কারণ পরোক্ষ হলেও, আজকের এই পরিস্থিতির জন্যে তিনি এবং আমরাও কিছুটা দায়ী”!

এই সময়ে আচার্য ধর্মধরের গৃহ প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়াল জনা পনের বালকতারা সকলেই আচার্য বেদব্রতকেও চেনে। তারা একসঙ্গে প্রণত হয়ে বলল, “প্রণাম, আচার্য ধর্মধর, প্রণাম আচার্য বেদব্রত”।

বালকদের প্রণাম স্বীকার করে, আচার্য বেদব্রত বললেন, “তোমাদের সকলের কল্যাণ হোক, বৎস। এখন কিছুদিনের জন্যে আশ্রমের সকল পাঠ স্থগিত থাকবে। তোমরা নিজ নিজ গৃহে ফিরে যাও। পিতামাতাকে বলো, দুশ্চিন্তা না করতে। আচার্য ধর্মধর ঠিক সময়মতো তোমাদের কর্তব্য নির্দেশ করবেন”।

একজন কৌতূহলী বালক জিজ্ঞাসা করল, “কাল সন্ধ্যায় আমার পিতার এক মিত্র আমার পিতাকে যে সংবাদ দিয়েছিলেন, তা উনি বিশ্বাস করেননি। বলেছিলেন অপপ্রচার, এমনটা হতেই পারে না। সে সংবাদ কী তবে সত্য, গুরুদেব”? দাওয়া থেকে নেমে বেদব্রত এগিয়ে গেলেন সেই বালকের দিকে। তার মাথায় হাত রেখে বললেন, “সে সংবাদ সত্য, কিন্তু তোমাদের মতো বালকের, এ আলোচনা উচিৎ নয়, বৎস। বাড়ি গিয়ে পিতামাতাকে যা সত্য তাই বলবে”। তারপর সকলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমাদের ছুটি পেতে ভালো লাগে না? তোমাদের বয়সে এমন হঠাৎ পাওয়া ছুটিতে আমার তো দারুণ আনন্দ হত”।   

সকল বালকের মুখে সরল হাসি দেখে, আচার্য বেদব্রতও হাসলেন, বললেন, “বর্ষার সময় কিংবা তীব্র শীতের সময় তোমাদের যেমন মাসাধিক কাল পাঠ বন্ধ থাকে, ধরে নাও না, এটাও সেরকম আর একটা দীর্ঘ ছুটি”বালকের দল এবার কোলাহল করে উঠল আনন্দে। আচার্যদের বিদায়ী প্রণাম করার কথা ভুলে, তারা পিছন ফিরে দৌড় লাগাল পথ ধরেআচার্য বেদব্রত হাসি মুখে দেখলেন, ওদের দৌড়ে চলে যাওয়া, ওদের আনন্দ উচ্ছ্বাস।

তারপর পিছন ফিরে বললেন, “উড়নিটা গায়ে দিয়ে নাও, ধর্ম। চলো গুরুদেব যজ্ঞশীলের সঙ্গে একবার দেখা করে আসি। উনি কী ভাবছেন, কী করছেন জানা দরকার”।

“তোমার বার্তা শোনার পর থেকে কিছুই ভালো লাগছে না, বেদ। তাই চলো। ঘরে বসে থাকলে আরো দুশ্চিন্তা বাড়বেএকটু দাঁড়াও, এই ফাঁকে শ্রীনারায়ণের পায়ে একটু পুষ্প-বারি দিয়ে আসি”।

আচার্য বেদব্রত ম্লান হেসে বললেন, “যাও, ধর্ম, আরেকটি রাষ্ট্রবিরুদ্ধ কাজ সম্পন্ন করে এসো”।

 

আচার্য বেদব্রত ও ধর্মধর যখন আচার্য যজ্ঞশীলের গৃহে পৌঁছলেন, সূর্য তখন প্রায় মধ্যগগনে। তাঁদের ডাক শুনে দরজায় এসে দাঁড়াল, আচার্য যজ্ঞশীলের দ্বিতীয়া কন্যা কিশোরী চারুকান্তি। ওঁদের দেখে চারুকান্তি উচ্ছ্বসিত হতে গিয়েও, সংযত হয়ে গেল, মুখে সলজ্জ একটু হাসি নিয়ে বলল, “কতদিন পরে তোমরা এলে, খুল্লতাত? বেদকাকা তো আমাদের ভুলেই গেছে, ধর্মকাকা তাও কয়েক মাস আগে একবার এসেছিলে গৃহে সকলের কুশল তো”? এই বলে দুজনেরই চরণস্পর্শ করে প্রণাম করল চারুকান্তি।

বেদব্রত বললেন, “আয়ুষ্মতি হ, চিরকল্যাণী হ, আমাদের সব কুশল। তোরাও সকলে ভালো আছিস তো, মা”?

ধর্মধরও আশীর্বাদ করলেন। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, “তোর পিতা কোথায়, মা”?

“পিতা, একটু আগে পাঠগৃহের দিকে গেলেন, ওখানেই আছেন”।

“ওখানে পাঠ চলছে নাকি”? ধর্মধর উদ্বিগ্নস্বরে জিজ্ঞাসা করলেন।

“না, না। কিছুদিনের জন্যে আশ্রমের পাঠ স্থগিত আছে। তোমরা যাও, পিতা তোমাদের সব কথা বলবেন”। লাজুক হেসে চোখ নামাল কিশোরী চারুকান্তি।


গৃহসীমার অন্য প্রান্তে আচার্য যজ্ঞশীলের পাঠগৃহ। বাসস্থান ও পাঠগৃহের মধ্যে বাঁশের বেড়া দেওয়া সীমানা। আশ্রমের বেড়ার দরজার আগল খুলে ঢোকার সময় ধর্মধর বললেন, “গুরুদেব যজ্ঞশীল, আমাদের মতোই আশ্রমের পাঠ বন্ধ রেখেছেন?”

“না ধর্মধর, আমার মনে হয়, কারণ অন্য। আমার অনুমান, কুমারী চারুকান্তির বিবাহ উপলক্ষে আশ্রমের পঠনপাঠন গুরুদেব আগে থেকেই স্থগিত রেখেছিলেন”।

বেদব্রতর দিকে অবাক হয়ে তাকালেন।

“শাস্ত্রচর্চা করতে করতে তুমি আর অন্য কোনদিকে দৃষ্টি দাও নাচঞ্চলা চারুকান্তির সলজ্জ আচরণ তোমার চোখ এড়িয়ে গেল, ধর্ম? বিবাহযোগ্যা কিশোরী অকারণ লজ্জা পায়, যখন পিতৃগৃহে তার বিবাহের আয়োজন চলতে থাকে। আসন্ন নতুন জীবনের প্রতি তীব্র আকর্ষণ, পাছে অপরের কাছে ধরা পড়ে যায়! তাই অকারণ লজ্জা আসে, তখন অতিরিক্ত সংযমের আশ্রয় নিতে হয়। সত্য কিনা জানি না, তবে চারুকান্তির আচরণে আমার সেরকমই মনে হল। এখন গুরুদেব যজ্ঞশীলের কাছে সব সংবাদ পাওয়া যাবে। ওই তো, আচার্য যজ্ঞশীল পাঠঘরে বসে রয়েছেন”।                 

      

আচার্য যজ্ঞশীলকে প্রণাম করে, বেদব্রত ও ধর্মধর বসলেন তাঁর সামনের আসনে। আশীর্বাদ করে আচার্য যজ্ঞশীল বললেন, “গতকাল সকালেই গুরুদেব ভৃগুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এলাম। ইচ্ছা ছিল, আজ তোমাদের ওদিকেই যাবো। কিন্তু আজ সকাল থেকে যা সংবাদ পাচ্ছি, তাতে সব স্থগিত করতে হলো। তোমরা কোন সংবাদ পাওনি”?

আচার্য বেদব্রত বললেন, “পেয়েছি গুরুদেব, আর সেই কারণেই আপনার কাছে আসা। আমাদের আশ্রমে ছুটি ঘোষণা করেছি, বলেছি দীর্ঘ দিনের জন্য পাঠ স্থগিত”

“ঠিক করেছ, বেদ। আজ সকালে শুনলাম, কিঞ্চিৎ দূরবর্তী গ্রামের দুই পাঠশালায় পাঠ চলছিল, চার পাঁচজন নগররক্ষী এসে ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে তাদের পাঠঘর। এক আচার্যকে প্রহার করেছে মারাত্মক, অন্য আচার্যকে বন্দী করে নিয়ে গিয়েছে কোটালের কাছে। আমার আশ্রমে একমাসের পাঠ স্থগিত রেখেছিলাম আমার দ্বিতীয়া কন্যা চারুর বিবাহ অনুষ্ঠানের জন্য। না হলে আমার উপরেও হামলা হতো। আজকের এই অকস্মাৎ ঘটনায় সম্পূর্ণ হতবুদ্ধি হয়ে গেছি, এখন কোনটা কর্তব্য কোনটা অকর্তব্য কিছুই ঠিক করে উঠতে পারছি না। মাত্র নয় দিবস পরেই চারুর বিবাহ উপলক্ষে গৃহে অতিথি সমাগম শুরু হয়ে যাবে। কিন্তু, বাড়িতে কিছু বলিনি এখনও। এই বিবাহ এখন কি আর সম্ভব”?

আচার্য ধর্মধর জিজ্ঞাসা করলেন, “কেন সম্ভব নয়, গুরুদেব? আমাদের গৃহে কন্যার বিবাহে রাজার কী ভূমিকা থাকতে পারে?”

উত্তরে বেদব্রত চিন্তিত মুখে বললেন, “রাজার ভূমিকা নয়, ধর্ম। ভূমিকা ভগবান শ্রীনারায়ণের আর অগ্নিদেবতার। আমাদের বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয় এই দুই ঈশ্বরের মঙ্গল আশীর্বাদে। গৃহীর ঘরে কন্যাদান ও কন্যার বিবাহ অনুষ্ঠান অত্যন্ত তাৎপর্যময় একটি মাংগলিক অনুষ্ঠান। এখন এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কন্যার বিবাহ অনুষ্ঠান করতে হবে মহারাজ বেণের বিগ্রহের সামনে, ব্যাপারটা তুমি কল্পনা করতে পারছো, ধর্ম? আমি পারছি আর আতঙ্কে শিউরে উঠছি”। আচার্য ধর্মধর এতক্ষণে যেন বুঝতে পারলেন, ঘটনার গুরুত্ব, নির্বাক বসে রইলেন।

ম্লান হেসে আচার্য যজ্ঞশীল জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার কন্যার কত বয়স হল, বেদ? তুমি কী কন্যার বিরহ বেদনা এখন থেকেই কল্পনায় উপলব্ধি করছো”?

সলজ্জ হেসে বেদব্রত বললেন, “আজ্ঞে গুরুদেব, মাত্র তিন বৎসর। কিন্তু এই উপলব্ধি আমার হয়েছিল, আমার কন্যাকে প্রথম ক্রোড়ে নিয়েই! নিষ্পাপ দুই নয়নের সেই অসহায় নির্ভরতা, মুখের সেই স্বর্গীয় হাসি আর আমার বক্ষে তার চঞ্চল ক্ষুদ্র দুই পায়ের পদাঘাত, আমাকে এই উপলব্ধি এনে দিয়েছিল, গুরুদেব। সেই প্রাণপ্রিয় কন্যাকে আমি সম্প্রদান করবো, রাজা বেণের বিগ্রহকে সাক্ষী মেনে? আপনার কন্যা সুশীলা চারুকে দেখে আমার মনে হচ্ছে, এ অন্যায়। এ পাপ”।

আচার্য বেদব্রতর এই আবেগে সকলেই অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে, আচার্য যজ্ঞশীল জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার কী মত, বৎস বেদব্রত? আমার চারুর বিবাহ কি তবে স্থগিত রাখব? কিন্তু বরপক্ষ যদি স্বীকার না করে”?

“আপনার বৈবাহিক কে, আমি জানি না, গুরুদেব। কিন্তু তিনিও কী চাইবেন, তাঁর গৃহলক্ষ্মীকে এই অমঙ্গল অনুষ্ঠানের মধ্যে বরণ করে নিতে?”

“তিনি এই রাজ্যের অধিবাসী নন, তবে তোমরাও তাঁকে চেন। তিনি পশ্চিমে সৌরাষ্ট্রের একটি মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ, নাম তপোব্রত। মহর্ষি ভৃগুর শিষ্য। আমাদের থেকে বেশ কয়েক বছরের অগ্রজ। গতবার গুরুদেবের আশ্রমে সমাবর্তনের সময়, তিনি আমার চারুকে দেখে পুত্রবধূ করার প্রস্তাব করেন। তাঁর পুত্র, কল্যাণীয় সৌম্যব্রতও পিতার মহাবিদ্যালয়েই অধ্যাপক হিসাবে সদ্য যোগ দিয়েছে। সেও উপস্থিত ছিল ঐ সমাবর্তনে। চারুর এই সৌভাগ্যের সংবাদ আমি গুরুদেবকেও বলেছিলাম। তিনি সানন্দেই এই সম্পর্কের অনুমোদন দিয়েছিলেন”       

“আমার মনে হয় গুরুদেব, কোনরকম সিদ্ধান্তের আগে, আমাদের সকলের একবার গুরুদেব ভৃগুর সঙ্গে দেখা করা উচিৎ। আজ আর সম্ভব নয়, কিন্তু কাল প্রত্যূষে নিশ্চিত”।

“ঠিকই বলেছ, বেদব্রত, দ্বিপ্রহর অনেকক্ষণ অতিক্রান্ত। কাল প্রত্যূষেই আমরা রওনা হবো”।

“কাল তোমরা কোথায় যাবে, বাবা”? কুমারী চারুকান্তি কখন পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে কেউ লক্ষ্যই করেননি। তাকে দেখে, তার কথায় সকলের মন থেকে দুশ্চিন্তা কিঞ্চিৎ লঘু হয়ে গেল।

আচার্য বেদব্রত কপট বিষণ্ণ মুখে বললেন, “আমাদের ত্যাগ করে দূরদেশে চলে যাচ্ছিস, মা? আমরা কি তোর এতই অনাত্মীয়”?

“আমি কী করবো, বলো, বেদকাকা, পিতাই তো সব স্থির করেছেন!”

“ও, তার মানে, এই বিবাহে তোর মনে এতটুকুও ইচ্ছা নেই”?

“বা রে, আমি বুঝি তাই বললাম? আমি জানি না, যাও”। লজ্জায় চারুর দুই গালে রক্তিম আভা ফুটে উঠল। উপস্থিত সকলেই এমনকি পিতা যজ্ঞশীলও উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন কন্যার এই আচরণে। তাঁদের মনের মধ্যে জমে ওঠা বিষাদের বোঝা, এক পলকে সরে গেল এই খুশীর আবহে

অপ্রস্তুত চারুকান্তির অধরে এখনো লাজুক হাসি, সে লজ্জানত চোখে বলল, “মা অন্ন বেড়ে বসে আছেন। বেলা গড়িয়ে বিকেল হতে চললএক্ষুণি না গেলে মা কিন্তু রণক্ষেত্র বাধাবেন। এই বলে দিলাম”  

আচার্য বেদব্রত তৎক্ষণাৎ আসন ছেড়ে উঠে পড়লেন, বললেন, “ওরে বাপরে, রাজার আদেশ অমান্য করলে পরিত্রাণের উপায় হতে পারে, কিন্তু গৃহিণীর আদেশ সর্বদা শিরোধার্য। যান গুরুদেব অন্দরে যান, ভোজন সেরে আসুন”।

বিস্মিত চারুকান্তি কটিতটে হাত রেখে বলল, “আর তোমরা? তোমরা যাবে না বুঝি? মা তো তোমাদের জন্যেও অন্ন বেড়ে বসে আছেন”।

“আমাদের জন্যেও! চলো হে, ধর্ম, চলো। আজকের সকালটা ততটা মন্দ শুরু হয় নি, কী বলো? মধ্যাহ্নে অন্নপূর্ণার প্রসাদ পাওয়ার ভাগ্য নিয়েই তো আমাদের সেই সকালের শুরু”

পিতা যজ্ঞশীলের হাত ধরে ঘরের দিকে এগিয়ে চলল চারুকান্তি। পিছনে চললেন বেদব্রত ও ধর্মধর।

পরের পর্ব পাশের সূত্রে - "  এক যে ছিলেন রাজা - ৩য় পর্ব


রবিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০২৫

আবার আসিব ফিরে...

 



এর আগের পর্ব
- " বকের মৃত্যু "



রোজই পরীক্ষা দিয়ে ফিরে এলে মা, বাবা যখন জিগ্যেস করতেন – পরীক্ষা কেমন হল? আমার জবাব ছিল – মোটামুটি। কারণ আমার মনে হয়েছিল, এই উত্তরটাই সবচেয়ে নিরাপদ। খারাপ বললে এখন ওঁদের মন খারাপ হবে, ভালো বললে দারূণ আশায় বুক বাঁধবেন। পরে রেজাল্ট খারাপ বের হলে ভীষণ হতাশ হবেন। কাজেই - মোটামুটি। আমার সরলা মা অতশত বুঝতে না পারলেও, বাবা ঠিকই বুঝেছিলেন, আর মাকে ডেকে বলেছিলেন –

-‘তোমার ঘুনুসোনা, এখন বেশ লায়েক হয়ে উঠেছে, বুঝেছ? চালাকি-টালাকিগুলো বেশ শিখে যাচ্ছে দিন দিন’। এই কথায় মা অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন বেশ কিছুক্ষণ, কিন্তু তাঁর স্নেহদৃষ্টিতে আমার চেহারায় লায়েকির কোন লক্ষণ খুঁজে না পেয়ে, তিনি হতাশ হয়েছিলেন, আমার প্রতি বাবার বিপক্ষপাতিত্বে।

পরীক্ষার পর আমরা আমাদের সময়টাকে বেশ সুন্দর সাজিয়ে ফেললাম। নুন শো অথবা এবং ম্যাটিনী শোতে সিনেমা একদিনে দুটি শো আমাদের বহুদিনই দেখতে হত নেশার বিপুল টানে! আমাদের রাজ্যের সীমানা ছিল উত্তরে শ্যামবাজারের মিত্রা সিনেমাহল থেকে মধ্য কলকাতায় ধর্মতলার হলগুলি। মাঝে গ্রেস, বীণা, পূরবী, ছবিঘর, অরুণা ইত্যাদি। দক্ষিণের হল পর্যন্ত রাজ্যবিস্তারের ইচ্ছে তখনো গড়ে ওঠেনি। শুরু হল বাংলা, হিন্দী আর ইংরেজি সিনেমার মহোৎসব। প্রথম দিন দেখলাম রাজেশ খান্না আর হেমা মালিনীর “মেহবুবা”আমার জীবনের প্রথম বাণিজ্যিক হিন্দী সিনেমা দর্শন। মুগ্ধ হতে কিছু বাকি রইল না। সুন্দর বর্ণবিন্যাস, অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য, হেমার নিখুঁত সৌন্দর্য ও নৃত্য, কিশোর-লতা-মান্নার অনবদ্য গান মনকে নেশাগ্রস্ত করে ফেলল। প্রথমদিনেই নেশায় বুঁদ হয়ে বুঝে ফেললাম এ জিনিষের স্বাদ নিত্য চাই, অনেক অনেক। বম্বের সিনেমা জগতের নেশায় কেন গোটা ভারতবাসী বুঁদ - তা বুঝতে দেরী হল না একটুও। কাজেই সোম থেকে শনি, আমাদের বিরামহীন সিনেমা দর্শন চলতে লাগল। বেশীর ভাগ হিন্দী, তার সঙ্গে বাংলা, ইংরেজি সিনেমাও চলতে লাগলতবে হিন্দী ছবির তুলনায় অন্যান্য সিনেমায়, নেশার মৌতাত হত বেশ ফিকে। স্বাভাবিক কারণেই রোববারটা বাদ থাকত, কারণ ওইদিন বাবা বাড়িতে থাকতেন।

আর বাকি সময়টা চলতে লাগল বইপড়া। আমাদের বাসার ঠিক উল্টোদিকেই ছিল এক সমৃদ্ধ পাঠাগার, স্বরাজ পাঠাগার, বাবা ছিলেন তার সক্রিয় সভ্য। তার ওপর বই ইসু করতেন যিনি, আমি ছিলাম তাঁর বিশেষ স্নেহধন্যকাজেই মায়ের পরামর্শে আমি যখন তাঁকে বললাম বঙ্কিম, শরৎ, বিভূতি, তারাশঙ্কর পড়তে চাই – তিনি আপ্লুত হলেন আমার আগ্রহে, বললেন, “বল কি হে, ওসব বই বহুদিন কেউ খোঁজও করে নাএসব পড়তে তোমায় কেউ বলেছে, বুঝি”? 

আমি বললাম, “হ্যাঁ, মা। বলেছেন বাংলা সাহিত্য বুঝতে গেলে শুরু থেকে শুরু করা উচিৎ - মানে বঙ্কিম থেকে...”

-‘ঠিক কথা। ভেরি গুড। এক কাজ কর, তুমি ভিতরে চলে এসো – ওই যে ওইদিকে, ওই আলমারিতে আছে, পছন্দমতো তুমি বেছে নিয়ে যাও...ভেতরে চলে এসো’ পাঠাগারের ভিতরে ঢুকে নিজে হাতে বই বেছে নেওয়ার বিরল অধিকার পেয়ে, ঢুকে পড়লাম ভিতরেঅজস্র বইয়ে সাজিয়ে রাখা সারি সারি বুক-শেল্ভবই, বই আর বই। পুরোনো বইয়ের অদ্ভূত গন্ধে গোটা হলঘরটি পরিপূর্ণ। 

আমাকে ভিতরের দিকে নিয়ে গিয়ে একটি বুক-শেল্ভের সামনে দাঁড় করিয়ে তিনি বললেন, ‘এইখানেই, তুমি যা খুঁজছ সব পেয়ে যাবে। বুক-শেল্ভে দ্যাখ লেখকের নামের লেবেল দেওয়া আছে, তাছাড়াও প্রত্যেক বইতে দেওয়া আছে বইয়ের নম্বর। ক্যাটালগ থেকেও দেখে নিয়ে খুঁজে নিতে পারো, যে বইটি তোমার চাই। আর কোন অসুবিধে হলে, আমার কাছে চলে এসো, কেমন’?

উনি চলে যাওয়ার পর বেশ অনেকক্ষণ আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম বুক-শেল্ভ গুলো। বিবর্ণ, ধূলিধূসর অবহেলিত বুকশেল্ভের বুকে থরে থরে সাজানো আমাদের বঙ্গসাহিত্যের দিকদর্শক সাহিত্যিকদের রচনা। বহুদিন সে বইগুলি কেউ ছুঁয়েও দেখেনি। আমার পাঠ্যবইয়ে এঁদের সকলের সঙ্গেই অল্পবিস্তর আলাপ আছে, কিন্তু সে নগণ্য। আজ আমি তাঁদের দরজায় দাঁড়িয়ে আছি, বঙ্গ সাহিত্যের বিবিধ অমূল্য রতন ভাণ্ডার আমার সামনে – অপেক্ষা শুধু তুলে নেওয়ার।

সারাটাজীবন আমি কোন ধাঁধার বা কোন কূট প্রশ্নেরই সঠিক উত্তর দিতে সক্ষম হইনি। কিন্তু আজ আমায় যদি কেউ প্রশ্ন করেন “কোন জিনিষ গোগ্রাসে গিললেও বদহজম হয় না”? এর অব্যর্থ উত্তর আমার জানা – বই, বই আর বই

বাস্তবিক ওই সময়ে দুটি জিনিষের নেশায় আমি বুঁদ হয়ে থাকতাম – সিনেমা আর বই। সিনেমার নেশা কেটে গিয়েছিল কয়েকবছরের মধ্যেই, কিন্তু পড়ার নেশা আজও বয়ে চলেছি। যেকোন বই হাতে পেলেই পড়ে ফেলার চেষ্টা আজও করে চলেছি নিরন্তর। প্রত্যেকটি বই - ভাল হোক, মন্দ হোক – সবটা বুঝি বা না বুঝি, কোন না কোন ভাবে আমাকে ঋদ্ধ করে চলেছে প্রতিনিয়ত।

প্রথম দিন শুরু করলাম বঙ্কিমের ‘কপালকুণ্ডলা’ বইখানা দিয়েবাবার নামে ইসু করিয়ে বইটি যখন নিলাম, লাইব্রেরিয়ান ভদ্রলোক খুব প্রীত হলেন। বেশ অনেকক্ষণ বইটিতে বঙ্কিমের অনবদ্য রচনাশৈলী নিয়ে আমাকে পাঠ দিলেনঅন্যান্য সভ্যবৃন্দ যারা নিক কার্টার, হেডলি চেজ কিংবা ইয়ান ফ্লেমিংযের তপ্ত বঙ্গানুবাদ নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন আমার পিছনে, তাঁরা খুব বিরক্ত হচ্ছিলেন আমাদের এ হেন আলাপে। ভাবখানা – এই হচ্ছে বুড়োদের দোষ, একটা বাচ্চাকে পেয়ে খুব জ্ঞান ঝাড়ছে...।

মাঝের একদিন পরে বইটি ফেরৎ দিয়ে যখন আরেকটি বই আনতে গেলাম, সেই ভদ্রলোক খুব বেদনা অনুভব করেছিলেন, বলেছিলেন, ‘ভাল লাগল না, না? তোমাদের বয়েসের পক্ষে একটু শক্ত, কিন্তু...’

‘পড়া হয়ে গেছে, জেঠু, আজ অন্য বই নেব, “দুর্গেশনন্দিনী”’

‘পড়া হয়ে গেছে? একদিনে? সত্যি বলছো? অসম্ভববলোতো নবকুমারের মা ও বোনেরা কপালকুণ্ডলার কি নাম রেখেছিল?

‘মৃণ্ময়ী’

‘বাঃ লুৎফা আসলে কে’?

‘নবকুমারের প্রথম স্ত্রী, ধর্মান্তরের আগে নাম ছিল পদ্মাবতী’

‘বাবাঃ – ভেরি গুড ? শেষমেস নবকুমার আর কপালকুণ্ডলার কি হল বলো দেখি’?

‘শেষটা কেমন যেন, দুজনেই নদীর জলে ডুবে মারা গেল’ আমি বললাম।

‘না, বাবা আমার আর কিছু বলার নেইআজ থেকে এই লাইব্রেরিতে তোমার অবাধ যাওয়া আসা। তোমাদের মতো ছেলেদের জন্যেই তো লাইব্রেরি খোলা সার্থক। তবে একটা কথা বাবা, কোনদিন কোন বইকে অসম্মান করো না’

এরপর থেকে ওই লাইব্রেরি থেকে প্রায় বছর তিনেক লাগাতার অজস্র বইয়ের পাঠ নিয়েছি। বাংলা ভাষার মহীরূহ থেকে নবীন প্রজন্মের সাহিত্যিকদের সঙ্গে আমার যাবতীয় যোগসাজশের সূত্রপাত ও ভিত্তি স্থাপন ওই লাইব্রেরির মাধ্যমেই। এখানে বলে রাখা ভাল, ওই সময়ে রবীন্দ্রনাথ প্রায় কিছুই পড়িনি, চেষ্টাও করিনি। কারণ, তখনই আমার মনে হয়েছিল উনি নিজেই একটি সম্পূর্ণ গ্রন্থাগার। ওঁনার জন্যে সযত্নে তোলা রইল পরবর্তী জীবন এবং সারা জীবন।

কিন্তু আজ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথকে পড়ে শেষ আর করতে পারলাম না। কারণ আমার মনে হয় তাঁর এক একখানি গ্রন্থের মধ্যেই থাকে অনেক গ্রন্থের আভাস। তাঁর প্রত্যেকটি রচনা – গান, কবিতা, উপন্যাস, গল্প, নাটক... যেন বহুধা বর্ণের অদ্ভূত সমাহার। এক এক বয়সে, বিভিন্ন মানসিক পর্যায়ে তাঁর একই রচনা ভিন্নতর মাত্রায় ধরা দেয়, মেলে ধরে তার বিচিত্র রূপের বর্ণচ্ছটাএকই গ্রন্থ প্রত্যেক বার পাঠে নতুন চেতনার জন্ম হয়, বিকশিত হয় নিত্য নতুন বোধ।

আমি নিশ্চিত, এই এক জীবনে তাঁকে পড়ে শেষ করা হয়তো সম্ভব, কিন্তু অসম্ভব তাঁর রচনার চরম উপলব্ধি। তিনি ঈশ্বরের মতোই সুমঙ্গল রহস্যময়, তাই যদি আরেকবার ফিরে আসার কোন দুর্বোধ্য উপায় থেকেও থাকে, তাহলে আবার আসিব ফিরে এবং অবশ্যই এই বাংলার তীরে...। শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথের জন্যেই।

 __০০__

এর পরের পর্ব - " "চিনি"লে না... "

শনিবার, ২২ নভেম্বর, ২০২৫

বায়স্‌কোপ

এর আগের ছোটদের গল্প - " বেড়াল





 

জানালার পাল্লায় কাক বসলে মা ঠাকুমারা বরাবর যা করেন, সেদিন আমিও তাই করতে গেলাম, বললাম, হুস, হুস। কাকটা চোখ মটকে মুখ ঘোরাল, উড়েও গেল না, ভয়ও পেল না। এবার আমি যেমনি হাত বাড়িয়ে আবার হুস হুস বলতে যাবো, কাকটা এক আঙুল তুলে বলে উঠল, “অ্যাই, অ্যাই, চুপ, একদম চুপ, কাক-এ ভয় দেখাচ্ছ কাকে? তোমার মা-ঠাম্মা হুস বললে, আমরা উড়ে যাই ঠিকই, কিন্তু ভয়ে নয়, ওঁরা গুরুজন, ওঁদের মান্যি করেই উড়ে যাই। তাছাড়া তুমি কাকতাড়ুয়াও তো নও, যে তোমাকে ভয় পেতে হবে। সবে তো ক্লাস থ্রিতে পড়ো, নেহাতই পুঁচকে ছেলে, তুমি হুস বললেই উড়ে যাবো, এমনটা মনেও করো না। আমরা দুবার ডাকলে তোমাদের কাকা হয়, হয় না? তার মানে আমরাও কি তোমার একধরনের কাকা হই না? এটুকু কৃতজ্ঞতা তোমার থেকে আমরা আশা করতেই পারি, নয় কি?”

কাকের কথায় আমার খুব রাগ হল, আচ্ছা করে দুকথা শুনিয়ে দেবার জন্যে বললাম, “যতো বড়ো ঠোঁট নয় তোমার, তত বড়ো কথা? তুমি আমার কাকা হবে? আমার কাকা আমাকে কত ভালোবাসে, জানো? কত লেখাপড়া জানে, জানো?”

কাকটা খা খা হেসে উঠল, বলল, “তোমার কাকা তোমার পেছনে লাগে না? বলে না, ক্লাস থ্রি খায় ব্রি? এরপর ক্লাস ফোর-জুতো চোর”?

আমি একটু থতমত খেলাম, এ কথাগুলো কাকটা জানল কী করে? বললাম, “তাতে কি? সে তো মজা করে বলে, সে কি সত্যি নাকি? কিন্তু তুমি কী করে সে কথা জানলে”?

কাকটা ঘাড় দুলিয়ে বেজায় বোদ্ধার মতো ঘাড় চুলকোল, তারপর গম্ভীর গলায় বলল, “তুমি কী ভেবেছিলে, তোমাদের কাকা-ভাইপোর কথা কাকপক্ষীতেও টের পাবে না! হেঃ, তোমরা নিজেদের বিশাল বুদ্ধিমান আর আমাদের এত তুচ্ছ ভাবো বলেই তোমাদের এই দশা। আচ্ছা কলসির তলানি জল খাবার উপায় তোমাদের কে শিখিয়েছিল? সেই যে সেই কাকের গল্পটা, পড়োনি”?

গল্পটা পড়েছি বৈকি, আর সেই কাকের কথা মনে করে আমি বেশ একটু দমে গেলাম, বললাম, “তাতে কী, অমন বুদ্ধির গল্প তোমাদের থেকে শেয়ালদের অনেক বেশি, শেয়ালের গল্পও অনেক পড়েছি”।

কাকটা খা খা করে হেসে বলল, “যাক, কাক আর শেয়ালের বুদ্ধি যে তোমাদের থেকে কম নয়, সেটা নিজে নিজেই স্বীকার করে ভালোই করলে। আমাকে বেশি বকতে হল না। আচ্ছা, ইংরিজি পড়ো তো, কাকের ইংরিজি জানো?”

আমি ফুঃ করে মুখে একটা শব্দ করে বললাম, “এ আর এমন কি শক্ত, ক্রো মানে কাক”।

কাকটা আমার বাহাদুরিকে গুরুত্বই দিল না, বলল, “ক্রমে ক্রমে সব বুঝতে পারবে যে আমরা কাকেরা তোমাদের সব দিক খেকেই ঘিরে রেখেছি। ক্রমের মধ্যেও ক্রো মানে আমরাই রয়েছি, হে হে, এটা কি লক্ষ্য করলে? বিক্রম, পরাক্রম, আক্রমণ, মন দিয়ে দেখ এ সবের একদম মাঝখানে রয়েছি আমরাই। ক্রমাগত মানে কাকের মা এসেছেন, একথাটা তোমরা মানবে না জানি, কিন্তু আমার সঙ্গে তর্ক করতে গিয়ে যে ঘোল খেয়ে যাবে, সেটাও বলে রাখছি, কারণ তক্র মানে ঘোল। ব্যাঁকা কথায় মানুষদের সঙ্গে পেরে ওঠা শক্ত, তাই তোমাদের কোন বক্রোক্তিতেই আমরা কিছু মনে করি না। আমরা জলে বাস করি না কিংবা কুমীরের সঙ্গে লড়াইও করিনা, কিন্তু তাও তোমরা কুমীরের নাম দিয়েছ নক্র। তোমাদের মতিগতি বোঝা ভার।  

আচ্ছা, একটা কথা বলতো, আমাদের ওপর তোমাদের এত রাগ, আবার এই কাকদের নিয়েই তোমাদের নানান বায়নাক্কা। কাক ডাকলে গাছ থেকে তাল খসে পড়ে, এমন আমি কোনদিন দেখিনি, কিন্তু কাকতালীয় ঘটনার নানান ঘনঘটা তোমরাই বানিয়ে ছেড়েছতুমি এখনও ছোট্ট তোমার এখনও গজায়নি, তোমার বাবা কাকার কিন্তু কাকপক্ষ আছে, তার মানে জানো, জুলফি! আমরা তো আর তোমাদের মতো বিছানায় আরাম করে ভোঁসভোঁসিয়ে ঘুমোই না, আমরা ঘুমের মধ্যেও সতর্ক থাকি, তাকে তোমরা বলো কাকনিদ্রা। কাকজ্যোৎস্না্র রাতে, তোমরা কত কি দেখে যে ভয় পাও, ভাবলে আমরা হেসে কুটোপাটি হই। শীতকালে কনকনে ঠাণ্ডায় তোমরা যখন চানের ঘরে ফাঁকি দাও, তোমার ঠাকুমা বলেন না, বালু কাকচান করে এলি? হে হে হে। তোমরা শহরের ছেলে বড় বড় দীঘি দেখইনি, দীঘির পরিষ্কার স্বচ্ছ জলকে কাকচক্ষু বলে, তা জানো? নিমফলকে তোমরা কাকফল বলো, আর বকফুলের গাছকে বলো কাকশীর্ষ। হে হে হে, তারপরেও তোমরা কাক তাড়াও?

ও হ্যাঁ আরেকটা কথা, কোনদিন কাকতাড়ুয়া দেখেছ?”

ক্রমান্বয়ে কাকের এত কথায় আমি বেশ দমে গিয়েছিলাম, ঘাড় নেড়ে বললাম, না। তখন কাক বক্র হাসিমুখে আবার বলল, “শহরে তোমাদের মতো ছেলেরা থাকতে কাকতাড়ুয়ার দরকার হয় না। সে সব দেখা যায় গ্রামের দিকে ক্ষেত-জমিতে। আর দেখা যায়, তোমার কাকার ল্যাপটপে, কিংবা বাবার পি.সি.তে, দেখে নিও, পড়ে নিও  পি.সি. বলতে মনে পড়ল, কাকের ভাল নাম বায়স, আর এই BIOS ছাড়া তোমাদের কম্পিউটারের সব কারিকুরি খতম, হে হে হে, তোমার কাকাকে জিগ্যেস করে নিও, কথাটা বিশ্বাস না হলে। আর পুরোনো দিনে দাদু ঠাকুমাদের জিগ্যেস করো, তখন সিনেমাকে বলতো বায়োস্কোপ, যদিও বায়সদের সিনেমা হলে ঢোকার কোন স্কোপ তখনও ছিল না, আজও নেই।

যাকগে, যে কথা বলছিলাম, কাকতাড়ুয়া কিন্তু কাকদের তাড়ানোর জন্যে নয়, বরং পুঁচকে পুঁচকে পাখিদের ভয় দেখানোর জন্যে, চড়াই, শালিক, বুলবুলি, ঘুঘু, এইসব। ওরাই তোমাদের শস্যের দানা-বীজ খেয়ে ফেলে, ওদের তাড়ানোর জন্যে কাকতাড়ুয়া খাড়া করা হয়। আমরা ক্ষেত-জমি, ফাঁকা জায়গার বড়ো একটা কাছ ঘেঁষি না, কাজেই আমাদের কাকতাড়ুয়ার কেলে হাঁড়ি মাথায়, গোল্লা চোখমুখ দেখলে, হাসিই পায়, ভয় পাওয়া তো কা কস্য পরিবেদনা। ক্রোমোজোমের ক্রমোন্নতিতে ক্রোম্যাগনন থেকে তোমরা হোমো স্যাপিয়েন্স হয়েছ, একটু আধটু হোম-ওয়ার্ক করো, আমাদের দেখলেই হুস হুস করার আগে, আমাদের who’s who  ভালো করে জেনে নাও। হে হে হে” এরপর কাকটা আর বসল না, উড়ে গেল মাঠ পেরিয়ে গাছপালার দিকে।

-০০-

         

                               এর পরের ছোটদের গল্প - " ঝিঙের জগৎ

 


নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৪/৬

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু -  "  ধর্মাধর্ম - ১/১  " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - "  ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম ...