শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৫

গীতা - ৪র্থ পর্ব

এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব " 






 [এর আগের ৩য় পর্ব - কর্মযোগ পড়া যাবে পাশের সূত্রে "গীতা - ৩য় পর্ব"]



চতুর্থ অধ্যায়ঃ জ্ঞানযোগ


৪/১

শ্রীভগবানুবাচ

ইমং বিবস্বতে যোগং প্রোক্তবানহমব্যয়ম্‌।

বিবস্বান্‌ মনবে প্রাহ মনুরিক্ষ্বাকবেঽব্রবীৎ।।

শ্রীভগবান্‌ উবাচ

ইমং বিবস্বতে যোগং প্রোক্তবান্‌ অহম্‌ অব্যয়ম্‌।

বিবস্বান্‌ মনবে প্রাহ মনুঃ ইক্ষ্বাকবে অব্রবীৎ।।

শ্রীভগবান বললেন – আমি এই অব্যর্থ মুক্তিদায়ক কর্মযোগের কথা সূর্যকে বলেছিলাম। সূর্য তাঁর নিজের পুত্র মনুকে এবং মনু তাঁর পুত্র ইক্ষ্বাকুকেও এই কথা শুনিয়েছিলেন

 

৪/২

এবং পরম্পরাপ্রাপ্তমিমং রাজর্ষয়ো বিদুঃ।

স কালেনেহ মহতা যোগো নষ্টঃ পরন্তপঃ।।

এবং পরম্পরা-প্রাপ্তম্‌ ইমং রাজর্ষয়ঃ বিদুঃ।

সঃ কালেন ইহ মহতা যোগঃ নষ্টঃ পরন্তপঃ।।

হে বীর অর্জুন, এই ভাবেই এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে এই যোগের কথা রাজর্ষিগণ জানতে পেরেছিলেন। দীর্ঘ সময়ের প্রভাবে এখন সেই যোগ এই জগৎ থেকে হারিয়ে গিয়েছে।

 

৪/৩

স এবায়ং ময়া তেঽদ্য যোগঃ প্রোক্তঃ পুরাতনঃ।

ভক্তোঽসি মে সখা চেতি রহস্যং হ্যেতদুত্তমম্‌।।

স এবায়ং ময়া তে অদ্য যোগঃ প্রোক্তঃ পুরাতনঃ।

ভক্তঃ অসি মে সখা চ ইতি রহস্যং হি এতৎ উত্তমম্‌।।

তুমি আমার ভক্ত ও প্রিয় বন্ধু, তাই আমি সেই প্রাচীন কর্মযোগের কথা আজ তোমাকে বললাম। কারণ এই কর্মযোগ রহস্যময় হলেও খুবই কল্যাণকর।

 

৪/৪

অর্জুন উবাচ

অপরং ভবতো জন্ম পরং জন্ম বিবস্বতঃ।

কথমেতদ্বিজানীয়াং ত্বমাদৌ প্রোক্তবানিতি।।

অর্জুন উবাচ

অপরং ভবতঃ জন্ম পরং জন্ম বিবস্বতঃ।

কথম্‌ এতৎ বিজানীয়াং ত্বম্‌ আদৌ প্রোক্তবান্‌ ইতি।।

অর্জুন বললেন – তোমার জন্ম অনেক পরে আর সূর্যের জন্ম তোমার অনেক আগে। কাজেই সৃষ্টির শুরুতে তুমি সূর্যকে কর্মযোগের কথা শুনিয়েছিলে, তা কি করে জানব?

 

৪/৫

শ্রীভগবানুবাচ

বহূনি মে ব্যতীতানি জন্মানি তব চার্জুন।

তান্যহং বেদ সর্বাণি ন ত্বং বেত্থ পরন্তপ।।

শ্রীভগবান্‌ উবাচ

বহূনি মে ব্যতীতানি জন্মানি তব চ অর্জুন।

তানি অহং বেদ সর্বাণি ন ত্বং বেত্থ পরন্তপ।।

শ্রীভগবান বললেন – হে শত্রুহারী অর্জুন, এই জন্মের আগে আমি, এমনকি তুমিও, অনেক জন্ম কাটিয়ে গিয়েছি। সেই সব জন্মের কথা আমি জানি, কিন্তু তুমি সে সব ভুলে গিয়েছ।

 

৪/৬

অজোঽপি সন্নব্যয়াত্মা ভূতানামীশ্বরোঽপি সন্‌।

প্রকৃতিং স্বামধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া।।

অজঃ অপি সন্‌ অব্যয়াত্মা ভূতানাম্‌ ঈশ্বরঃ অপি সন্‌।

প্রকৃতিং স্বাম্‌ অধিষ্ঠায় সম্ভবামি আত্মমায়য়া।।

আমার জন্মান্তর নেই, আমার আত্মার কোন পরিবর্তন হয় না, আমি এই জগতের সমস্ত জীবের নিয়ন্ত্রণকারী ঈশ্বর। তা সত্ত্বেও, আমি সত্ত্ব, তমঃ, রজঃ-প্রকৃতির এই তিনগুণের শক্তি দিয়ে, আমার নিজের মায়াতেই আমি বারবার দেহধারণ করে থাকি।

     

৪/৭

যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।

অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্‌।।

যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানিঃ ভবতি ভারত।

অভ্যুত্থানম্‌ অধর্মস্য তৎ আত্মানং সৃজামি অহম্‌।।

হে অর্জুন, সমাজে যখনই ধর্মের বাঁধন শিথিল হয় এবং অধর্মের শক্তি বাড়তে থাকে, তখনই আমি নিজেকে সৃষ্টি করি এবং দেহ ধারণ করি।

 

৪/৮

পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্‌।

ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।।

পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্‌।

ধর্ম-সংস্থাপন-অর্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।।

ধার্মিক ব্যক্তিদের পরিত্রাণ এবং দুষ্ট লোকের বিনাশের জন্যে, অর্থাৎ সমাজে আবার ধর্মপ্রতিষ্ঠার জন্যে আমি যুগে যুগে অবতার দেহ ধারণ করি।

 

৪/৯

জন্ম কর্ম চ মে দিব্যমেবং যো বেত্তি তত্ত্বতঃ।

ত্যক্ত্বা দেহং পুনর্জন্মং নৈতি মামেতি সোঽর্জুন।।

জন্ম কর্ম চ মে দিব্যম্‌ এবং যঃ বেত্তি তত্ত্বতঃ।

ত্যক্ত্বা দেহং পুনর্জন্মং ন এতি মাম্‌ এতি সঃ অর্জুন।।

হে অর্জুন, যে ব্যক্তি আমার এই অদ্ভূত জন্ম ও অলৌকিক কর্মের কথা সঠিক বুঝতে পারেন, সেই ব্যক্তি দেহ ত্যাগের পর আমার সঙ্গেই মিলিত হন, তাঁর পুনর্জন্ম হয় না।

 

৪/১০

বীতরাগভয়ক্রোধা মন্ময়া মামুপাশ্রিতাঃ।

বহবো জ্ঞানতপসা পূতা মদ্ভাবমাগতা।।

বীত-রাগ-ভয়-ক্রোধাঃ মন্ময়া মাম্‌ উপাশ্রিতাঃ।

বহবঃ জ্ঞানতপসা পূতা মৎ-ভাবম্‌ আগতা।।

আসক্তি, ভয় ও ক্রোধ ত্যাগ করে, আমার প্রতি একনিষ্ঠ এবং আমাকেই একমাত্র ভরসা করে, বহু ব্যক্তি জ্ঞান চর্চা ও তপস্যায় পবিত্র হয়েছেন এবং আমার স্বরূপ লাভ করেছে।।    

 

৪/১১

যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্‌।

মম বর্ত্মানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ।।

যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তান্‌ তথা এব ভজামি অহম্‌।

মম বর্ত্ম অনুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ।।

যে ব্যক্তি যে ভাবে আমার উপাসনা করে, আমি সেই ভাবেই তাদের সকলকে অনুগ্রহ করে থাকি। হে পার্থ, যে কোন ভাবেই হোক মানুষ শুধুমাত্র আমারই পথ অনুসরণ করে।

 

৪/১২

কাঙ্ক্ষন্তঃ কর্মণাং সিদ্ধিং যজন্ত ইহ দেবতাঃ।

ক্ষিপ্রং হি মানুষে লোকে সিদ্ধির্ভবতি কর্মজা।

কাঙ্ক্ষন্তঃ কর্মণাং সিদ্ধিং যজন্ত ইহ দেবতাঃ।

ক্ষিপ্রং হি মানুষে লোকে সিদ্ধিঃ ভবতি কর্মজা।

ইহলোকে কর্ম করে খুব সহজেই মনোমত সিদ্ধিলাভ হয়, আর সেই সিদ্ধি লাভের আশাতেই মানুষ নানান দেবতার পুজো করে।

 

৪/১৩

চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ।

তস্য কর্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকর্তারমব্যয়ম্‌।।

চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণ-কর্ম-বিভাগশঃ।

তস্য কর্তারম্‌ অপি মাং বিদ্ধি অকর্তারম্‌ অব্যয়ম্‌।।

তিনগুণ ও কর্মের বিভাগ অনুসারে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চার বর্ণের সৃষ্টি আমিই করেছি। কিন্তু আমি এই সৃষ্টির কর্তা হলেও, আমাকে অকর্তা বলেই জানবে। কারণ মানুষ তার নিজের কর্ম অনুসা্রেই এই চার বর্ণের অধিকারী হয়।

  

৪/১৪

ন মাং কর্মাণি লিম্পন্তি ন মে কর্মফলে স্পৃহা।

ইতি মাং যোঽভিজানাতি কর্মভির্ন স বধ্যতে।।

ন মাং কর্মাণি লিম্পন্তি ন মে কর্মফলে স্পৃহা।

ইতি মাং যঃ অভিজানাতি কর্মভিঃ ন সঃ বধ্যতে।।

না কোন কর্ম আমাকে স্পর্শ করতে পারে, না কর্মফলে আমার কোন তৃষ্ণা আছে। যে ব্যক্তি আমাকে এই ভাবে উপলব্ধি করতে পারেন, তিনি কোন কর্মের বাঁধনেই আবদ্ধ হন না।

 

৪/১৫

এবং জ্ঞাত্বা কৃতং কর্ম পূর্বৈরপি মুমুক্ষুভিঃ।

কুরু কর্মৈব তস্মাত্ত্বং পূর্বৈঃ পূর্বতরং কৃতম্‌।।

এবং জ্ঞাত্বা কৃতং কর্ম পূর্বৈঃ অপি মুমুক্ষুভিঃ।

কুরু কর্ম এব তস্মাৎ তম্‌ পূর্বৈঃ পূর্বতরং কৃতম্‌।।

আমার এই স্বরূপের অনুভব নিয়ে, পরমমুক্তি লাভের জন্যে তোমার আগেও অনেক ব্যক্তি কর্ম করে গিয়েছেন। অতএব তুমিও সেই প্রাচীন পন্থা অনুসরণ করেই কর্ম করতে থাক।

  

৪/১৬

কিং কর্ম কিমকর্মেতি কবয়োঽপ্যত্র মোহিতঃ।

তত্তে কর্ম প্রবক্ষ্যামি যজ্‌জ্ঞাত্বা মোক্ষ্যসেঽশুভাৎ।।

কিং কর্মঃ কিম্‌ অকর্ম ইতি কবয়ঃ অপি অত্র মোহিতঃ।

তৎ তে কর্ম প্রবক্ষ্যামি যৎ জ্ঞাত্বা মোক্ষ্যসি অশুভাৎ।।

কোনটা সঠিক কর্ম আর কোনটা নয়, এই নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যেও বিভ্রান্তি আছে। অতএব যেটুকু জানলে সমস্ত অমঙ্গল থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, সেই কর্মের কথাই তোমায় এখন বলব।

 

৪/১৭

কর্মণো হ্যপি বোদ্ধব্যং বোদ্ধব্যঞ্চ বিকর্মণঃ।

অকর্মণশ্চ বোদ্ধব্যং গহনা কর্মণো গতিঃ।।

কর্মণঃ হি অপি বোদ্ধব্যং বোদ্ধব্যম্‌ চ বিকর্মণঃ।

অকর্মণঃ চ বোদ্ধব্যং গহনা কর্মণঃ গতিঃ।।

সঠিক কর্ম, নিষিদ্ধ কর্ম, এমনকি অকর্মের কথাও জেনে রাখা প্রয়োজন, কারণ কর্মের সম্পূর্ণ তত্ত্বটি জটিল।

 

৪/১৮

কর্মণ্যকর্ম যঃ পশ্যেদকর্মণি চ কর্ম যঃ।

স বুদ্ধিমান্‌ মনুষ্যেষু স যুক্তঃ কৃৎস্নকর্মকৃৎ।।

কর্মণি অকর্ম যঃ পশ্যেৎ অকর্মণি চ কর্ম যঃ।

স বুদ্ধিমান্‌ মনুষ্যেষু স যুক্তঃ কৃৎস্ন-কর্মকৃৎ।।

যে ব্যক্তি কর্মের মধ্যে থেকেও নিজেকে কর্মহীন মনে করেন এবং কর্মত্যাগী হয়েও নিজেকে কর্মরত মনে করেন, মানুষের মধ্যে তিনিই বুদ্ধিমান, তিনিই কর্মযোগী এবং সকল কর্মের কর্তা।

 

৪/১৯

যস্য সর্বে সমারম্ভাঃ কামসংকল্পবর্জিতাঃ।

জ্ঞানাগ্নিদগ্ধকর্মাণং তমাহুঃ পণ্ডিতং বুধাঃ।।

যস্য সর্বে সম-আরম্ভাঃ কাম-সংকল্প-বর্জিতাঃ।

জ্ঞান-অগ্নি-দগ্ধ-কর্মাণং তম্‌ আহুঃ পণ্ডিতং বুধাঃ।।

কামনা ও কর্মফলের প্রত্যাশা ছেড়ে যে ব্যক্তি সর্বদা কর্ম প্রচেষ্টায় মগ্ন থাকেন, জ্ঞানের আগুনে তাঁর সমস্ত আসক্তি নষ্ট হয়ে যায়। জ্ঞানীগণ এইরকম ব্যক্তিকেই পণ্ডিত বলেন।

 

৪/২০

ত্যক্ত্বা কর্মফলাসঙ্গং নিত্যতৃপ্তো নিরাশ্রয়ঃ।

কর্মণ্যভিপ্রবৃত্তোঽপি নৈব কিঞ্চিৎ করোতি সঃ।।

ত্যক্ত্বা কর্ম-ফল-আসঙ্গং নিত্য-তৃপ্তঃ নিরাশ্রয়ঃ।

কর্মণি অভিপ্রবৃত্তঃ অপি ন এব কিম্‌ চিৎ করোতি সঃ।।

কর্মফলের আসক্তি ত্যাগ করার জন্য তিনি সবসময়ই আনন্দিত থাকেন, বিষয়ের প্রাপ্তি কিংবা প্রাপ্ত বিষয়ের সুরক্ষার জন্যে তাঁর কোন আশ্রয়ের প্রয়োজন হয় না। এই ব্যক্তিরা সর্বদা কর্ম করতে থাকলেও যেন কিছুই করছেন না।

   

৪/২১

নিরাশীর্যতচিত্তাত্মা ত্যক্তসর্বপরিগ্রহঃ।

শারীরং কেবলং কর্ম কুর্বন্নাপ্নোতি কিল্বিষম্‌।।

নিরাশীঃ-যত-চিত্ত-আত্মা ত্যক্ত-সর্ব-পরিগ্রহঃ।

শারীরং কেবলং কর্ম কুর্বন্‌ ন আপ্নোতি কিল্বিষম্‌।।

যাঁর বিষয়ের কামনা নেই, সমস্ত ভোগ্যবস্তু ত্যাগ করে যাঁর মন ও ইন্দ্রিয় সংযত, শুধু দেহধারণের জন্য যিনি কাজ করেন, পাপ কিংবা পুণ্য তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না।

   

৪/২২

যদৃচ্ছালাভসন্তুষ্টো দ্বন্দ্বাতীতো বিমৎসরঃ।

সমঃ সিদ্ধাবসিদ্ধৌ চ কৃত্বাপি ন নিবধ্যতে।।

যদৃচ্ছা-লাভ-সন্তুষ্টঃ দ্বন্দ্ব-অতীতঃ বিমৎসরঃ।

সমঃ সিদ্ধৌ অসিদ্ধৌ চ কৃত্বা অপি ন নিবধ্যতে।।

খুব সামান্য প্রাপ্তিতেও যিনি সন্তুষ্ট থাকেন, যাঁর ঈর্ষাহীন মন সুখ দুঃখ বোধের অনেক ঊর্ধে, সাফল্য কিংবা ব্যর্থতায় যিনি পার্থক্য অনুভব করেন না, কাজ করলেও তিনি সংসারে আবদ্ধ হন না।     

 

৪/২৩

গতসঙ্গস্য মুক্তস্য জ্ঞানাবস্থিতচেতসঃ।

যজ্ঞায়াচরতঃ কর্ম সমগ্রং প্রবিলীয়তে।।

গত-সঙ্গস্য মুক্তস্য জ্ঞান-অবস্থিত-চেতসঃ।

যজ্ঞায় আচরতঃ কর্ম সমগ্রং প্রবিলীয়তে।।

বিষয়ের প্রতি আসক্তিহীন এবং আত্মজ্ঞানে যাঁর মন স্থির, তাঁর সমস্ত কর্ম আচরণ, যজ্ঞ অনুষ্ঠানের সমান হয়ে ওঠে।

     

৪/২৪

ব্রহ্মার্পণং ব্রহ্ম হবির্ব্রহ্মাগ্নৌ ব্রহ্মণা হুতম্‌।

ব্রহ্মৈব তেন গন্তব্যং ব্রহ্মকর্মসমাধিনা।।

ব্রহ্ম অর্পণং ব্রহ্ম হবিঃ ব্রহ্মা-গ্নৌ ব্রহ্মণা হুতম্‌।

ব্রহ্ম এব তেন গন্তব্যং ব্রহ্ম-কর্ম-সমাধিনা।।

কারণ, ব্রহ্মের স্বরূপ উপলব্ধি করেছেন যে জ্ঞানী, তিনি যজ্ঞের অর্পণ, যজ্ঞের আহুতি, যজ্ঞের অগ্নি এবং যজ্ঞের হোতা, সকলের মধ্যেই ব্রহ্ম উপলব্ধি করেন। কাজেই সমাহিত চিত্তে কর্ম সাধনাতেও ব্রহ্মরূপ দর্শন হয়।

   

৪/২৫

দৈবমেবাপরে যজ্ঞং যোগিনঃ পর্যুপাসতে।

ব্রহ্মাগ্নাবপরে যজ্ঞং যজ্ঞেনৈবোপজুহ্বতি।।

দৈবম্‌ এব অপরে যজ্ঞং যোগিনঃ পর্যুপাসতে।

ব্রহ্মা-অগ্নৌ অপরে যজ্ঞং যজ্ঞেন এব উপজুহ্বতি।।

কোন কোন যোগী নানান দেবতার পুজায় নিষ্ঠার সঙ্গে যজ্ঞ অনুষ্ঠান করেন। আবার অনেকে ব্রহ্মরূপ যজ্ঞের অগ্নিতে, যজ্ঞের সমস্ত অর্পণ আহুতি দিয়ে থাকেন।

 

৪/২৬

শ্রোত্রাদীনীন্দ্রিয়াণ্যন্যে সংযমাগ্নিষু জুহ্বতি।

শব্দাদীন্‌ বিষয়ানন্য ইন্দ্রিয়াগ্নিষু জুহ্বতি।।

শ্রোত্র-আদীনি ইন্দ্রিয়াণি অন্যে সংযম-অগ্নিষু জুহ্বতি।

শব্দ-আদীন্‌ বিষয়ান্‌ অন্য ইন্দ্রিয়-অগ্নিষু জুহ্বতি।।

অনেক যোগী কান, ত্বক, চোখ, জিহ্বা ও নাক এই পঞ্চইন্দ্রিয়কে সংযমের আগুনে আহুতি দেন। আবার কোন কোন যোগী শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধ এই পঞ্চ বিষয়কে ইন্দ্রিয়ের আগুনে আহুতি দেন।

 

৪/২৭

সর্বাণীন্দ্রিয়কর্মাণি প্রাণকর্মানি চাপরে।

আত্মসংযমযোগাগ্নৌ জুহ্বতি জ্ঞানদীপিতে।।

সর্বাণি ইন্দ্রিয়-কর্মাণি প্রাণ-কর্মানি চ অপরে।

আত্ম-সংযম-যোগ-অগ্নৌ জুহ্বতি জ্ঞান-দীপিতে।।

জ্ঞানের আলোকে উজ্জ্বল অনেক যোগী, সমস্ত ইন্দ্রিয়ের কর্ম এবং সমস্ত জীবন ধারণের কর্ম, তাঁদের আত্ম সংযমরূপ যজ্ঞের আগুনে আহুতি দিয়ে থাকেন।

 

৪/২৮

দ্রব্যযজ্ঞাস্তপোযজ্ঞা যোগযজ্ঞাস্তথাঽপরে।

স্বাধ্যায়জ্ঞানযজ্ঞাশ্চ যতয়ঃ সংশিতব্রতাঃ।।

দ্রব্য-যজ্ঞাঃ তপঃ-যজ্ঞাঃ যোগ-যজ্ঞাঃ তথা অপরে।

স্বাধ্যায়-জ্ঞান-যজ্ঞাঃ চ যতয়ঃ সংশিত-ব্রতাঃ।।

কেউ কেউ দ্রব্যদানরূপ যজ্ঞ করেন। কেউ তপস্যারূপ যজ্ঞ করেন। কেউ কেউ প্রাণায়াম ইত্যাদি সাধনারূপ যজ্ঞ করেন। আবার কোন কোন যোগী, কঠিন ব্রত নিয়ে বেদ ও শাস্ত্রজ্ঞানের চর্চারূপ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন।

 

৪/২৯

অপানে জুহ্বতি প্রাণং প্রাণেঽপানং তথাঽপরে।

প্রাণাপানগতী রুদ্ধা প্রাণায়ামপরায়ণাঃ।।

অপানে জুহ্বতি প্রাণং প্রাণে অপানং তথা অপরে।

প্রাণ-অপান-গতী রুদ্ধা প্রাণায়াম্‌-পরায়ণাঃ।।

[নিঃশ্বাসের বায়ুকে প্রাণবায়ু ও প্রশ্বাসের বায়ুকে অপানবায়ু বলে।] কোন কোন যোগী অপানবায়ুতে প্রাণবায়ু এবং প্রাণবায়ুতে অপানবায়ুর আহুতি দেন। অর্থাৎ প্রাণ ও অপানবায়ুর গতিরোধ করে কুম্ভক প্রাণায়ম অভ্যাস করেন।

     

৪/৩০

অপরে নিয়তাহারাঃ প্রাণান্‌ প্রাণেষু জুহ্বতি।

সর্বেঽপ্যেতে যজ্ঞবিদো যজ্ঞক্ষপিতকল্মষাঃ।।

অপরে নিয়ত-আহারাঃ প্রাণান্‌ প্রাণেষু জুহ্বতি।

সর্বে অপি এতে যজ্ঞবিদঃ যজ্ঞ-ক্ষপিত-কল্মষাঃ।।

কোন কোন যোগী আবার ভোজন-আহারে সংযত হয়ে জীবনের সমস্ত প্রয়োজনকে শুদ্ধ জীবনের জন্য আহুতি দেন। এতক্ষণ এই যে বারোটি যজ্ঞের পদ্ধতি বর্ণনা করলাম, এই সমস্ত যজ্ঞকারীই তাঁদের যজ্ঞ অনুষ্ঠান করে পাপমুক্ত হন।

    

৪/৩১

যজ্ঞশিষ্টামৃতভুজো যান্তি ব্রহ্ম সনাতনম্‌।

নায়ং লোকোঽস্ত্যযজ্ঞস্য কুতোঽন্যঃ কুরুসত্তম।।

যজ্ঞ-শিষ্ট-অমৃত-ভুজঃ যান্তি ব্রহ্ম সনাতনম্‌।

ন অয়ং লোকঃ অস্তি অযজ্ঞস্য কুতঃ অন্যঃ কুরুসত্তম।।

যজ্ঞের প্রসাদ অমৃতসমান, যিনি অমৃতসমান এই যজ্ঞের ফল ভোগ করেন তিনিই সনাতন ব্রহ্মকে লাভ করেন। হে কুরুশ্রেষ্ঠ, যজ্ঞহীন ব্যক্তির ইহলোকেই কোন স্থান নেই, তো অন্যলোকে স্থান কোথায়?

   

৪/৩২

এবং বহুবিধা যজ্ঞা বিততা ব্রহ্মণো মুখে।

কর্মজান্‌ বিদ্ধি তান্‌ সর্বানেবং জ্ঞাত্বা বিমোক্ষ্যসে।।

এবং বহুবিধাঃ যজ্ঞাঃ বিততাঃ ব্রহ্মণঃ মুখে।

কর্মজান্‌ বিদ্ধি তান্‌ সর্বান্‌ এবং জ্ঞাত্বা বিমোক্ষ্যসে।।

ব্রহ্মের বেদরূপ উক্তিতে এই প্রকার অনেক যজ্ঞের কথা সবিস্তারে বলা আছে। কর্মযোগ থেকেই এই সমস্ত যজ্ঞপদ্ধতির সৃষ্টি, এই কথাটা জেনে রাখো। আর এই জ্ঞানই তোমাকে মুক্তির পথ দেখাবে।

   

৪/৩৩

শ্রেয়ান্‌ দ্রব্যময়াদ্‌ যজ্ঞাজ্‌ জ্ঞানযজ্ঞঃ পরন্তপ।

সর্বং কর্মাখিলং পার্থ জ্ঞানে পরিসমাপ্যতে।।

শ্রেয়ান্‌ দ্রব্যময়াৎ যজ্ঞাৎ জ্ঞান-যজ্ঞঃ পরন্তপ।

সর্বং কর্ম অখিলং পার্থ জ্ঞানে পরিসমাপ্যতে।।

হে শত্রুহারী, সাংসারিক দ্রব্যবস্তু সাজানো যজ্ঞঅনুষ্ঠানের থেকে জ্ঞানযজ্ঞ শ্রেষ্ঠ। হে পার্থ, জগতের সমস্ত কর্ম পরমতত্ত্বজ্ঞানের উপলব্ধিতেই নিষ্পত্তি হয়।

 

৪/৩৪

তদ্বিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া।

উপদেক্ষ্যন্তি তে জ্ঞানং জ্ঞানিনস্তত্ত্বদর্শিনঃ।।

তৎ বিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া।

উপদেক্ষ্যন্তি তে জ্ঞানং জ্ঞানিনঃ তত্ত্বদর্শিনঃ।।

এই জ্ঞানের উপলব্ধির জন্যে, প্রণাম, বিনম্র জিজ্ঞাসা এবং আন্তরিক সেবায় তত্ত্বদর্শী জ্ঞানীকে প্রসন্ন করবে এবং তিনিই তোমাকে সেই পরমতত্ত্ব বর্ণনা করবেন

 

৪/৩৫

যজ্‌জ্ঞাত্বা ন পুনর্মোহমেবং যাস্যসি পাণ্ডব।

যেন ভূতান্যশেষেণ দ্রক্ষ্যস্যাত্মন্যথো ময়ি।।

যৎ জ্ঞাত্বা ন পুনঃ মোহম্‌ এবং যাস্যসি পাণ্ডব।

যেন ভূতানি-অশেষেণ দ্রক্ষ্যস্য আত্মনি অথো ময়ি।।

হে পাণ্ডব, এই পরমতত্ত্ব উপলব্ধির পর আর কখনো তুমি এমন মোহে আবদ্ধ হবে না। এই জ্ঞানে তুমি অসীম ব্রহ্ম থেকে সমস্ত জীবজগৎকে, এমনকি আমাকেও নিজের আত্মার মধ্যেই দেখতে পাবে।

  

৪/৩৬

অপি চেদসি পাপেভ্যঃ সর্বেভ্যঃ পাপকৃত্তমঃ।

সর্বং জ্ঞানপ্লবেনৈব বৃজিনং সন্তরিষ্যসি।।

অপি চেৎ অসি পাপেভ্যঃ সর্বেভ্যঃ পাপকৃত্তমঃ।

সর্বং জ্ঞানপ্লবেন এব বৃজিনং সন্তরিষ্যসি।।

যদি তুমি জগতের সমস্ত পাপীদের থেকেও ভয়ংকর পাপিষ্ঠ হও, তাও এই পরমতত্ত্ব জ্ঞানের জাহাজ তোমাকে সংসার সমুদ্র পার করে দেবে।

 

৪/৩৭

যথৈধাংসি সমিদ্ধোঽগ্নির্ভস্মসাৎ কুরুতেঽর্জুন।

জ্ঞানাগ্নিঃ সর্বকর্মাণি ভস্মসাৎ কুরুতে তথা।।

যথা এধাংসি সমিদ্ধঃ অগ্নিঃ ভস্মসাৎ কুরুতে অর্জুন।

জ্ঞান-অগ্নিঃ সর্বকর্মাণি ভস্মসাৎ কুরুতে তথা।।

হে অর্জুন, জ্বলন্ত আগুন যেমন কাঠের স্তূপকে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলে, ঠিক তেমনই এই পরমতত্ত্বজ্ঞানের আগুন সমস্ত কর্মকে দগ্ধ করে দেয়।

  

৪/৩৮

ন হি জ্ঞানেন সদৃশং পবিত্রমিহ বিদ্যতে।

তৎ স্বয়ং যোগসংসিদ্ধঃ কালেনাত্মনি বিন্দতি।।

ন হি জ্ঞানেন সদৃশং পবিত্রম্‌ ইহ বিদ্যতে।

তৎ স্বয়ং যোগ-সংসিদ্ধঃ কালেন আত্মনি বিন্দতি।।

ইহলোকে এই পরমতত্ত্ব ব্রহ্মজ্ঞানের মতো পবিত্র আর কিছুই নেই। দীর্ঘকাল নিষ্ঠার সঙ্গে কর্মযোগ চর্চা করার পর নিজের আত্মায় এই ব্রহ্মজ্ঞানের উপলব্ধি আসে।

 

৪/৩৯

শ্রদ্ধাবান্‌ লভতে জ্ঞানং তৎপরঃ সংযতেন্দ্রিয়ঃ।

জ্ঞানং লব্ধ্বা পরাং শান্তিমচিরেণাধিগচ্ছতি।।

শ্রদ্ধাবান্‌ লভতে জ্ঞানং তৎপরঃ সংযত-ইন্দ্রিয়ঃ।

জ্ঞানং লব্ধ্বা পরাং শান্তিম্‌ অচিরেণ অধিগচ্ছতি।।

শ্রদ্ধাশীল, জ্ঞানের জন্যে উৎসুক, ইন্দ্রিয় সংযমী ব্যক্তিরাই এই পরমতত্ত্ব উপলব্ধি করতে পারেনএই জ্ঞান উপলব্ধির পরেই পরম শান্তি অনুভব করা যায়।

  

৪/৪০

অজ্ঞশ্চাশ্রদ্দধানশ্চ সংশয়াত্মা বিনশ্যতি।

নায়ং লোকোঽস্তি ন পরো ন সুখং সংশয়াত্মনঃ।।

অজ্ঞঃ চ অশ্রদ্দধানঃ চ সংশয়-আত্মা বিনশ্যতি।

ন অয়ং লোকঃ অস্তি ন পরঃ ন সুখং সংশয়-আত্মনঃ।।

অজ্ঞ ব্যক্তি, যার মন অশ্রদ্ধা এবং সংশয়ে পরিপূর্ণ, সে ব্যক্তির বিনাশ ঘটে। যে ব্যক্তির মন সংশয়ে আচ্ছন্ন, ইহলোক কিংবা পরলোক, কোন লোকেই তার সুখ মেলে না।

 

৪/৪১

যোগসংন্যস্তকর্মাণং জ্ঞানসংচ্ছিন্নসংশয়ম্‌।

আত্মবন্তং ন কর্মাণি নিবধ্নন্তি ধনঞ্জয়ঃ।।

যোগ-সংন্যস্ত-কর্মাণং জ্ঞান-সংচ্ছিন্ন-সংশয়ম্‌।

আত্মবন্তং ন কর্মাণি নিবধ্নন্তি ধনঞ্জয়ঃ।।

হে ধনঞ্জয়, যিনি সকল কর্ম পরমার্থ দর্শনের যোগে প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং পরমতত্ত্ব উপলব্ধিতে যাঁর মন থেকে সমস্ত সংশয় দূর হয়েছে, সেই পরমজ্ঞানী ব্যক্তিকে কোন কর্মই আবদ্ধ করতে পারে না।

  

৪/৪২

তস্মাদজ্ঞানসম্ভূতং হৃৎস্থং জ্ঞানাসিনাত্মনঃ।

ছিত্ত্বৈনং সংশয়ং যোগমাতিষ্ঠোত্তিষ্ঠ ভারত।।

তস্মাৎ অজ্ঞান-সম্ভূতং হৃৎস্থং জ্ঞান-অসিনা আত্মনঃ।

ছিত্ত্বা এনং সংশয়ং যোগম্‌ আতিষ্ঠ উত্তিষ্ঠ ভারত।।

অতএব, হে অর্জুন, অজ্ঞতার জন্যে তোমার মনের মধ্যে গড়ে ওঠা এই সংশয়কে, জ্ঞানের কঠোর অস্ত্রে ছিন্ন করো। আসক্তি ত্যাগ করে কর্মযোগের পথ অবলম্বন করো এবং যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হও।

 

জ্ঞানযোগ সমাপ্ত

                            পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " গীতা - ৫ম পর্ব "

বুধবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২৫

গড্ডল

 

এর আগের বড়োদের গল্প -  " বীণাপাণি ভাতের হোটেল"



তোমার নামটা কী যেন হে?

মন্টু, আজ্ঞে, মন্টু মাজি

জেরক্সটা করে আনলে আর অরিজিনালটা কোথায় হারালে, য়্যাঁ। এক নম্বরের গাড়ল তুমি একটি। ঝাও, শিগগির খুঁজে নিয়ে এস। যত্তোসব

সক্কাল সক্কাল ঝাড় খেয়ে গোলগাপ্পি মুখ করে ছোট সায়েবের চেম্বার থেকে বের হল মন্টু।

ব্যাপারটা হয়েছিল কী জেরক্স টেরক্স সাধারণত বিকাশ করায়, বিকাশ আসেনি এখনও। এদিকে ছোট সায়েব চলে এসেছেন অন্য দিনের চেয়ে তাড়াতাড়ি। এসেই ছোট সায়েবের জেরক্স দরকার অগত্যা মন্টু গিয়েছিল জেরক্স করাতে, আর দোকানেই ফেলে এসেছে অরিজিনালটা, তার কপি সায়েবকে জমা করতে গিয়েই বিপত্তি।

বাঁধা দোকান অসুবিধা হবে না। মন্টু দৌড়ে গেল আবার দোকানে। শ্যামল ছিল দোকানে তাকে ব্যাপারটা বলতে মেশিনের ঢাকনা খুলে অরিজিনালটা ফেরত দিল। চলেই আসছিল মন্টু, কী মনে হতে শ্যামলকে জিগ্যেস করল, শ্যামলদা, গাড়ল মানে কী বলো তো, জানো?

মন্টুদের আপিসের সঙ্গে শ্যামলের মাসকাবারি খাতা সিস্টেমে কাজ চলে পুরোটাই ধারে - এ মাসের টাকা পেতে পেতে পরের মাসের শেষ  - তাও আবার কমিসন দিতে হয় বিকাশকে, কপিতে দশ পয়সা। আজ বউনি হবার আগেই মন্টু এসে জেরক্স করাতে তার মেজাজ বিগড়েই ছিল তার ওপর ওই প্রশ্ন শুনে তেলে বেগুনে চটে ঠল শ্যামল, বলল, দ্যাখ মন্টু, বাড়াবাড়ির একটা সীমা আছে - তোদের সঙ্গে খাতা চালাই বলে, যখন তখন আসবি আবার, যা খুশী বলবি.....?

ব্যাপারটা সুবিধের নয় বুঝে মন্টু আমতা আমতা করে কেটে পড় তৎক্ষণাৎ।

     বাড়ি থেকে ছটায় সাইকেলে বেরিয়ে ছটা সাতাশের শেয়ালদা লোকাল ধরে মন্টু বালিগঞ্জ স্টেসন পৌঁছয় সাতটা পনের নাগাদ। সেখান থেকে আপিস অব্দি হেঁটে আসতে আরও মিনিট কুড়ির ধাক্কা। এদিকে নটা থেকে আপিস শুরু। তার আগে বড়, মেজ, ছোট তিন সায়েবের চেম্বার, রিসেপশন ছাড়াও সবার চেয়ার, টেবিল, মনিটার, কি-বোর্ড, মাউস, ফোনের হাতল পরিষ্কার করা, সবার টেবিলে পুরোনো জল পালটে নতুন জল ভরে বোতল রাখা হাজার কাজ। এর মধ্যে ঝাড়ুদার আসে ঘর, টয়লেট সাফ করতে তার আবার একটু হাতটান আছে। নজর না রাখলেই গায়েব হয়ে যায় ছোট খাটো জিনিষপত্র। এসব সেরে পৌনে নটার মধ্যে চায়ের জল চাপাতেই হবে। তাও দুজায়গায় একটা ছোট সসপ্যানে বড়-মেজ-সেজ তিন সায়েবের জন্যে আর অন্যটা ঢাউস সসপ্যানে বাকি সবার জন্যে। চায়েরও দুরকমের কোয়ালিটি আছে, ইস্পেসাল আর চালু।

নটা বাজার পাঁচ/সাত মিনিট আগে থেকে নটা পনের/বিশ অব্দি সবাই চলে আসে। ওই সময়টায় মন্টু মড়ারও সময় পায় না। সবার পছন্দমতো হরেক রকমের চায়ের সাপ্লাই চিনি ছাড়া, কড়া চিনি, ফিকা চিনি, লিকার চা, লিম্বু চা। ভুল চা দিয়ে ফেললেই আবার ঝাড়। 

সেদিন সাড়ে নটা নাগাদ একটু ফাঁক পেয়ে, এক কাপ কড়াচিনি চা নিয়ে মন্টু ভাবতে বসল, সকালের ঘটনাটা নিয়ে। ছোট সায়েব এই মাসখানেক হল এসেছে সব সময়েই যেন চড়ে থাকে, খুব কড়া মেজাজ। অথচ ওঁনার ঘরের এসিটাই সবচেয়ে জোর চলে, একবার ঢুকলেই কেমন যেন শীত ধরে যায়। কিন্তু পান থেকে চুন খসলেই মাথা একদম গরম। সাত ঝামেলার মধ্যে অরজিনাল পেপারটা নাহয় ভুলেই এসেছিল, তা বলে সক্কাল সক্কাল ওভাবে ঝাড়তে হবে? গাড়ল বলতে হবে?

গাড়ল। এই শব্দটা মন্টুকে বহুবার শুনতে হয়েছে ছোটবেলা থেকে। আজকে ছোট সায়েব বলাতে মনে পড়ে যাচ্ছে সব। সিক্সে প্রথম ইংরিজি শেখার সময় মহিমবাবু এক কেলাস ছেলের সামনে তাকে গাড়ল বলেছিলেন। গলায় গলায় বন্ধু নন্দকে টিপিন ঘন্টায় মন্টু গাড়ল মানে জিগ্যেস করাতে নন্দ পাত্তা দেয়নি। পরের দিন এক ফাঁকে তাদের কেলাসের ফাস্ট বয় রাজুকে জিগ্যেস করাতে, ফিচেল হেসে উত্তর দিয়েছিল – “গাড়ল মানে মন্টু মাজি

দু- দুবার চেষ্টা করেও সিক্স থেকে সেভেন উঠতে পারল না মন্টু, ইংরিজি আর অংকের যুগপৎ বজ্জাতিতে। মন্টুর বাবা নিমাই মাজি, গ্রিল কারখানার ওয়েল্ডার; একদিন তার মাকে ডেকে বলল, গাড়লটার নেকাপড়া কিসু হবে নি, কাল আমি ওরে নে’ যাব, হেদয়বাবুকে বলা আসে কম সে কম গিরিল বানানোটা শিখুক। হৃদয়বাবু তার বাবার গ্রিল কারখানার মালিক।

নয় নয় করেও মাস ছয়-সাত গ্রিল কারখানায় কাজ শিখতে চেষ্টার কসুর করে নি মন্টু। বার দশেক হাতে পায়ে ছ্যাঁকা খেল - ওয়েল্ডিং আর গ্যাস কাটিং করা গরম লোহার টুকরোর ওপর হয় দাঁড়িয়ে পড়ে, নয়তো হাত দিয়ে খামচে ধরতে গিয়ে। শেষের দিন ওয়েল্ডিং মেসিনের কানেকসনে হাত দিয়ে চেক করতে গিয়েছিল মেসিনে কারেন্ট আসছে কিনা। কারেন্ট ছিল এবং সেটা সবাই হাড়ে হাড়ে টের পেল, যখন মন্টু এক ঝটকায় চিৎপাৎ হল। বেশ কিছুক্ষণ টোটকা চিকিৎসায় চোখ ওলটানো মন্টু উঠে বসল। ধরাধরি করে সবাই অফিস ঘরে নিয়ে গিয়ে পাখার তলায় বসিয়ে দিল মন্টুকে। সামনেই ভোলাদার চায়ের দোকান থেকে এক গ্লাস গরম দুধও চলে এল মন্টুর সেবায়।

মন্টুর দুধের গ্লাস যখন হাফ, হৃদয়বাবু সবাইকে বললেন কাজে যেতে। ঘরে রইল শুধু মন্টু আর তার বাবা নিমাই মাজি। গম্ভীর গলায় হৃদয়বাবু বললেন,

নিমাই, তুমি এখন বাড়ি যাও মন্টুকে নিয়ে। আর কাল থেকে তোমার ছেলেকে আর এনো না বাপু, কবে কোনদিন কী অঘটন ঘটিয়ে বসবে। হাতে হ্যারিকেন হয়ে, ব্যবসা আমার লাটে উঠবে

না, না, বাবু, আপনি ঠিক কয়েচেন, এই কান মলতেসি, ওরে কাল থিকে আর আনব নি। তবে বাবু, কী যে করি ওটারে লিয়ে একদম হাবা গবা, গাড়ল একখান। না শিখল নেকাপড়া, না শিখল হাতের কাজ। মুখ কাঁচুমাচু করে দাঁড়িয়ে থাকল নিমাই মাজি।

ও নিয়ে ভেব না নিমাই, একটা কিছু হয়ে যাবে ঠিক। তুমি ওকে নিয়ে ঘরে যাও এখন। মন্টুর একটু রেস্ট দরকার

          সেদিন রিকশ করে বাপের সাথে ঘরে ফিরেছিল মন্টু। ঘরে ফেরার পর সব শুনে, তার মা খানিক হাউমাউ করেছিল। বাবাকে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল

ওই সব্বনেশে গিরিলের কারখানায় কচি ছেলেকে কেউ নে যায়? তোমার যেমন বুদ্ধি। কাল থিকে ও আর যাবে নি। কক্‌খনো যাবে নি আর

বাবা কিছু বলে নি, বেরিয়ে গিয়েছিল বাড়ি থেকে।  

গায়ে মাথায় মায়ের হাত বোলানোর আরামে মন্টু ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম ভাঙল শাঁখের আওয়াজে। প্রদীপ দেখিয়ে, ধূপ জ্বেলে, শাঁখ বাজিয়ে মা ঘরে এসে মন্টুকে জেগে ওঠা দেখে খুশি হল খুব। বিছানায় বসে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, কেমন বুজচিস বাবা, বল পাচ্চিস শরীলে? মন্টু ঘাড় নেড়ে সায় দিল।

খিদে পেয়েচে, মুড়ি খাবি? মন্টু আবার ঘাড় নেড়ে সায় দিল। মা বিছানা থেকে নেমে ও ঘরে যাচ্ছিল, মন্টু ক্ষীণ স্বরে ডাকল,

মা, শোন। মা কাছে এল।

কী হয়েছে, বাবা?। মন্টু মায়ের একটা হাত ধরে, বলল,

গাড়ল মানে কী, মা?

তোরে গাড়ল বলেচে? কে বলেচে? যে বলেচে সে নিজেই একখান গাড়ল। বলে মা রেগে দুম দুম করে পা ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল মুড়ি আনতে।  

হৃদয়বাবু হৃদয়হীন নন, সোজা সাপটা ভোলাভালা মন্টুকে তিনি পছন্দই করতেন। ছেলেটার বুদ্ধিসুদ্ধি কম। তা হোক, খাটিয়ে এবং বিশ্বাসী এটুকু তিনি লক্ষ্য করেছিলেন; এমন গুণ আজকের দিনে বিরল। যে আপিসে এখন মন্টু কাজ করে, তারা ঘর বাড়ি তৈরির কাজ করে। এদের সঙ্গে হৃদয়বাবুর অনেকদিনের লেনদেন ও ব্যবসা। সেই সূত্রেই হৃদয়বাবু মন্টুকে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন এই আপিসে। সেও প্রায় আজ বছর পাঁচেক হল।

এর পরে আরো একবার গাড়ল কথাটা শুনতে হয়েছিল, একদম অচেনা লোকের থেকে। বছর খানেক আগে, আপিসে আসার সময়, ঢাকুরিয়ার আগে ট্রেনটা মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেল, সামনে অবরোধ ট্রেন আর যাবে না। কখন অবরোধ উঠবে কে জানে। মন্টু ট্রেন ছেড়ে বড় রাস্তায় এসে বাসে চেপে পড়েছিল আপিসে দেরী হয়ে যাবার ভয়ে। গড়িয়াহাটের মোড়ে চলন্ত বাস থেকে লাফ দিয়েছিল উলটো মুখ করে। পড়তে পড়তেও সামলে গিয়েছিল মন্টু, কিন্তু কানে এসেছিল বাস কন্ডাক্টারের মন্তব্যটা –“দ্যাখ্‌, দ্যাখ্‌, আরেকটু হলে মরত গাড়লটা।  

মন্টু সবার টেবিল থেকে এঁটো চায়ের কাপগুলো নিয়ে এল। সিঙ্কের কল খুলে কাপ প্লেট ধুতে ধুতে ভাবল গাড়ল মানে কী তবে সত্যিই মন্টু মাজি? কাপপ্লেট ধোয়াধুয়ি শেষ হবার আগেই বিকাশ এসে বলল,

সকাল সকাল শ্যামলদাকে, কী বলেচিস, তুই?

কই সেরম কিছু বলিনা তো...

গাড়ল না কি বলেচিস যে? যা, এবার সরকারবাবু কেমন দেয়, দ্যাখ 

এই অফিসের পত্তনের সময় থেকে সরকারবাবু আজ প্রায় বছর বিশেক একই সিংহাসনে সমাসীন। শুরুর দিন থেকে কোম্পানীর লাভ ক্ষতি, সাদা কালোর হিসেব তাঁর হাতে। কোন সায়েব কোন ফুলে তুষ্ট হয় - তার হাল হকিকত নখের ডগায়। যে যতো বড়ো অফিসারই হোক না কেন, তাঁর মাতব্বরি তাকে মানতেই হবে। সরকারবাবুকে বিগড়ে দিলে বড়ো সায়েবদের কানভাঙানি দিয়ে অতিষ্ঠ করে তুলবে যে কোন কলিগের জীবন। কাজেই সরকারবাবুকে সমঝে চলে না এমন কেউ নেই এই অফিসে।

বিকাশের কথায় মন্টুর শরীরটা কেমন ঠাণ্ডা হয়ে এল। এক পেট জল গিলে নিল জলের জগ উল্টে। তবুও গলার শুকনো ভাবটা কাটল না। মিয়োনো মুড়ির মত মন্টু গিয়ে দাঁড়াল সরকারবাবুর টেবিলের সামনে। শ্যামলদা দাঁড়ানো, টেবিলের ওদিকের কোণটা ঘেঁষে চুপচাপ মাথা গোঁজ করে। গলা ঝেড়ে সরকারবাবু সিনেমায় দেখা পাক্কা জজসায়েবি চাল মেরে বলতে শুরু করল,

মন্টু, আজ সকালে জেরক্স করাতে গিয়ে শ্যামলকে তুমি কি বলেচ?

সরকারবাবু অন্য সময় মন্টুকে তুই বলে, এখন তুমি বলছে মানে কেস গড়বড়, এটা মন্টু আগেও লক্ষ্য করেছে।

আজ্ঞে খারাপতো কিচু বলি না। মন্টু শুকনো মিহি গলায় বলে।

সকাল সকাল যেচে পড়ে আমায় গাড়ল বলিস নি? শ্যামল খেঁকিয়ে উঠল।

আঃ, শ্যামল, আপিসের মধ্যে চেঁচামেচি আমি ভালবাসি না। তোমায় তো বললাম আমি দেকচি। খারাপ বলনি, তার মানে শ্যামল বাজে কথা বলচে? শেষ কথাটা মন্টুকে বললেন সরকারবাবু।

আজ্ঞে, তা না। মন্টুর মিনমিনে উত্তর।আসলে আমি...মানে...গাড়ল মানে কি, জানতি...শ্যামলদাকে ...

গাড়লের মানে? তার মানে? সরকারবাবু তাঁর চাকরি জীবনে অনেক থানা-পুলিশ-কোর্ট-কাছারির এঁড়ে সওয়াল ম্যানেজ করেছেন, কিন্তু এমন প্রশ্নে তিনিও হতবাক। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে জিগ্যেস করলেন,

তা তোমার গাড়লের মানে হঠাৎ এমন জরুরি হয়ে উঠল কেন?

খুব করুণ মুখে করে মন্টু আজ সকালের পুরো ইতিহাসটা ঘোষণা করল সবার সামনে। শ্যামলদা খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে উঠল সব শুনে ওই হাসি দেখে মন্টুর, শেয়ালের কথা মনে পড়ল। তাদের বাড়ির পিছনে বাঁশঝাড়ে আছে একপাল। রাত্রে ঝোপেঝাড়ে টর্চ জ্বাললে, মাঝে মাঝে অবিকল ওই ভাবে ধেয়ে আসে অবিকল ওই আওয়াজ, ওইরকম দাঁত... কোন ফারাক নেই।

হাসছিল সবাই। মন্টু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল হলে প্রায় সকলেই হাসছে, তার মানে সবাই শুনেছে সব কথা। এই হাটে হাঁড়ি ভাঙা অপমানটা মন্টুরও গায়ে লাগল। সরকারবাবু হাসেন নি, কিন্তু চোখে মুখে হাসির পরতটা বোঝা যাচ্ছিল, গম্ভীর মুখোসটা মুখে লেগে থাকা সত্ত্বেও। সরকারবাবু বললেন, ঠিক আছে, এখন যা

আস্তে আস্তে হল থেকে বেরিয়ে এল মন্টু, মাথা নীচু করে। এই অপমানের মধ্যেও একটা ব্যাপারে সে নিশ্চিন্ত হল চাকরিটা এখনই যাচ্ছে না। সরকারবাবু তাকে আবার আগের মতোই তুই বলেছেন।  

বিকাশের কি কোন কাজ নেই? সে বসে বসে প্রতিদিন পড়ছিল। ওটা রোজ দেসায়েব নিয়ে আসেন। তার মানে দে সায়েব চলে এসেছেন, বিনা চিনি লিকার চা। দে সায়েবের চায়ের জল বসাল মন্টু। 

দে সায়েবও সরকারবাবুর মতো আদ্যিকাল থেকে আছে এই অফিসে। বড়ো সায়েবদের স্টেনো টাইপিস্ট। আলাদা খুপরি গৌরবে চেম্বার। আগে ছিল টরেটক্কা টাইপ মেসিন পরে ইলেক্ট্রনিক্‌স্‌। সে সব পাট উঠে গেছে বেশ কবছর। বাক্স বাজানো বন্ধ হয়ে কম্পিউটার চলে এসেছে। ইংরিজিতে দখল আর টাইপিংয়ের স্পিডের জন্যে আগে বড়ো সায়েবদের প্রিয় ছিলেন। এখন এক ছোঁড়া অরুণ এসেছে এই বছর পাঁচেক হল। কম্পিউটার জানে কিন্তু ইংরিজি শিখেছে ক্লাস সিক্স থেকে। ড্রাফট বানিয়ে দেসায়েবের থেকে মেরামত করে নেয় ইংরিজিটা। দেসায়েব আর অরুণ একে অপরের পরিপূরক হয়ে টিকে আছে কোন মতে।

অফিসের সময় নটা হলেও দেসায়েব কদাচ সাড়ে দশটার আগে ঢোকেন না। মন্টু চা নিয়ে দেসায়েবের ঘরে ঢুকল প্রায় এগারোটায়। তাকে দেখে দে সায়েব বললেন, কিরে, তোকে নিয়ে কি মহাসভা চলছিল শুনলাম। তুইও কিছু ঘাপলা করেছিস না কি?

আস্তে আস্তে ফুঁ মেরে, আর লম্বা আওয়াজে টান দিয়ে চা পানের অব্যেস দেসায়েবের। ভীষণ ধীর স্থির ভাবে সব কাজ করেন দেসায়েব। এমনকি চোখের পাতা ফেলতেও বেশ সময় নেন তিনি। প্রতিটি কথা মুখ থেকে নামানোর আগে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরখ করে নেন। মন্টুকে নিরুত্তর দেখে আবার বললেন, যাক এতদিনে তুই মানুষ হলি বলতে হবে

কেন, এর আগে কী সিলাম, গাড়ল?

মন্টুর এ হেন ঝাঁঝালো প্রশ্নে দেসায়েবের মতো না-চমকানো লোকও একটু থমকে গেলেন। চা পান থামিয়ে চোখ তুলে বললেন, কী ব্যাপারটা রে, আজ তোরও মেজাজ মনে হচ্ছে চড়া? কী হয়েছে কি?

ঘাপলা যদি করতি পারতুন তো, আজ এই অপমানটা সহ্যি করতি হত না। আমি গাড়ল কিনা, সকলে তাই শুনায় ঘুরায়ে ফিরায়ে...। 

দেসায়েব মৃদু হাসলেন, বললেন, অ্যাই, আমার কাছে ঝাল ঝাড়ছিস কেন, যদি ক্ষমতা থাকে যে বলেছে তাকে বলগে, যা...। সেখানে তো মেনিমুখো।   

দেসায়েব নির্ঝঞ্ঝাটে মানুষ, সাতে পাঁচে থাকেন না। থাকার উপায়ও নেই। কারণ এই অফিসে আজকাল তাঁকে আর প্রয়োজন নেই। দীর্ঘদিন ভাল কাজ করার সুবাদে, আজও তাঁকে পোষা হচ্ছে নিছক চক্ষুলজ্জার খাতিরে। যে কোনদিন অফিস বলতেই পারে দরজা খোলা আছে, হে, কেটে পড়, ফুল অ্যান্ড ফাইন্যাল নিয়ে। তাঁর যা এলেম এই শেষ বয়সে অন্য কোথাও আর কিছু হবারও নয়।

অফিসে এই দেসায়েবের সঙ্গেই মন্টুর যা দুচারটে মনের কথা হয়। সেই অধিকারেই মন্টু একটু ঝাঁজ দেখিয়ে ফেলেছিল। দেসায়েবের কথায় একটু লজ্জা পেল।

সকাল থিকে আমারে লিয়ে যা চলতিসে...

সেটাই তো জিগ্যেস করছি, কী হয়েছে কি?

মন্টু সব কথাই সবিস্তারে বলল দেসায়েবকে। বলে আর কিছু না হোক হাল্কা হল মনে মনে। সব শুনে টুনে দেসায়েব বেশ কিছুক্ষণ গুম মেরে থাকলেন। মন্টু একটু অপেক্ষা করে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। সোয়া এগারোটা বেজে গেছে, আরেক রাউন্ড চা না পেলে আবার হাল্লা শুরু করবে। অফিসের লোকগুলোর দশা দেখে মনে হয়, চা নয় যেন বেঁচে থাকার দাওয়াই নিচ্ছে। না পেলে হেদিয়ে টেঁশে যাবে।

সকলের চা সাপ্লাই করে মন্টু দেসায়েবের জন্যে এক কাপ বিনা চিনি কফি নিয়ে ঢুকল। বড় সায়েবদের জন্যে কফি রাখা থাকে। কখনো সখনো সায়েবরা খায়, আর সরকারবাবু আর দেসায়েবের ইচ্ছে হলে। বাকি কেউ অ্যালাউড নয়।

তখন চাটা রাগের মাথায় বানাইসিলাম, ঠিক হয় নি হবে। এখন এট্টু কফি খান, স্যার। আর বলেন দিকি গাড়ল কথাটা কি - কোন গালাগাল? খুব খারাপ কিছু - নাকি মোটামুটি

কফিতে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে দেসায়েব বললেন, মানে জেনে কী করবি? ধর আমি বললাম গাড়ল মানে খুব খারাপ কিছু। কী করবি? মন্টুর দিকে তাকিয়ে দেসায়েব প্রশ্নটা করলেন। 

মন্টু ইতস্ততঃ করে বলল, তা, সত্যি বটে। কিছুই করতে পারব নি। শুনেও চুপচাপ হজম করতিই হবে। মানেটা সত্যি কি বেজায় খারাপ, স্যার?

না, না, তা নয়। গাড়ল মানে হচ্ছে ভেড়া। তার মানে বোকাসোকা, নিরীহ, ভিড়ের মধ্যে একাকার। আলাদা করে চেনা যায় না। একদম সাধারণ। কিছু বুঝলি? আমরা সবাই। তুই, আমি, এ অফিসে, অটোতে, বাসে, ট্রেনে। রাস্তাঘাটে, চলার পথে। আমরা সবাই সাধারণ। আমরা সকলেই একে অন্যকে নিজের ধান্দা মত, সুবিধে মত গাড়ল বানাই, আবার নিজেরাও প্রায়ই গাড়ল হই। আর অন্য কাউকে গাড়ল ভাবতে পারলে বা বলার সুযোগ পেলে, খুব খুশি হয়ে ভাবি – যাক আমি অন্ততঃ ওর চেয়ে একটু কম গাড়ল। ওইটুকুই তখন আমাদের সান্ত্বনা”।

দে সায়েব কথা থামিয়ে একটু আনমনা তাকিয়ে রইলেন কফির কাপের দিকে, তারপর কফির কাপটা শেষ করে মন্টুর হাতে খালি কাপ প্লেট ফিরিয়ে দিতে দিতে আবার বললেন, মাঝে মাঝেই নেকড়ের পাল ভেড়ার পালের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তারা শিকার তুলে নিয়ে পগার পার হয়। যারা বেঁচে যায়, তারা নিজেদেরকে মনে করে খুব চালাক, আর শিকার হয়ে যাওয়া ভেড়াগুলোকে তারা ভাবে – এক নম্বরের গাড়ল। এই নেকড়েগুলো হচ্ছে ধর অফিসের বড়োবাবু, বস, পাড়ার দাদা, প্রমোটার, পুলিশ, নেতা, মন্ত্রী; যে কেউ হতে পারে”।   

ফোঁস করে শ্বাস ফেলে দেসায়েব আবারও বললেন, “মানে তো বললাম, কি কদ্দূর বুঝলি, তুইই জানিস। মানেটা জেনেই বা তোর কটা হাত পা গজাল, আর কী করবি কে জানে...

আজ্ঞে, কী আর করব সত্যি। ওদিকে যাই গিয়ে সকলের এঁটো কাপপ্লেটগুলো নে এসে ধুই গিয়ে...আর আপনের জন্যি আজ কি টিপিন আনব বলে দেন ... মুড়ি-বাদাম? না চিঁড়ে-বাদাম? ওদিকে আবার সায়েবরা কি বলে দেকি

-০০-       

এর পরের বড়োদের গল্প  - " চ্যালেঞ্জ  " 

নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৪/৬

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু -  "  ধর্মাধর্ম - ১/১  " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - "  ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম ...