সোমবার, ১ জুন, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/১

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/শেষ পর্বাংশ "]

পঞ্চম পর্ব /পর্বাংশ  - ১


আমাদের ধর্ম বিশ্বাসের পরিণতি

 প্রাককথা

আগের পর্বগুলিতে ৭০,০০০ বি.সি.ই থেকে মোটামুটি ১৩০০ সি.ই. পর্যন্ত হোমোস্যাপিয়েন্স নামক ভারতীয় মানব প্রজাতির ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক ক্রমবিকাশের “আনুমানিক তত্ত্ব” এবং প্রামাণিক তথ্য সংগ্রহ সম্পূর্ণ হল। এবার এই সমস্ত তথ্যগুলির একত্রে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একজন ভারতীয় হোমোস্যাপিয়েন্স হিসেবে, ১৩০০ সি.ই.-তে আমরা ঠিক কোথায় এসে পৌঁচেছিলাম – সে বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা থাকলে আমাদের আধুনিক আচরণের যৌক্তিকতা খুঁজে পেতে হয়তো সুবিধে হবে।

 এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, ১৩০০ সি.ই.-র ধারণা থেকে ২০২৬ সি.ই.-র আধুনিকতার আঁচ কীভাবে পাওয়া সম্ভব? তার উত্তরে বলা যায়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক ধারণার দিক থেকে ১৩০০ সি.ই. এবং ২০২৬ সি.ই.-র মধ্যে আকাশ-পাতাল বদল ঘটেছে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল, আমাদের ধর্মীয় আচরণ ও ধারণায় যেটুকু বদল ঘটেছে, তার তাৎপর্য এবং গুরুত্ব যৎকিঞ্চিৎ। সে কথা এই পর্ব শেষে আশা করি বোঝা যাবে।

বৈদিক ধর্ম থেকে বিচ্যুত ব্রাহ্মণ্যধর্ম মোটামুটি কবে হয়েছিল, সে বিষয়ে আমরা আলোচনা করেছি, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্বে, এবং কবে থেকে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম হিন্দু ধর্মে মোড় নিতে শুরু করল তার ইঙ্গিতও আমরা পেয়েছি, আগের পর্বগুলিতে। এবার কী ভাবে এবং কেনই বা ব্রাহ্মণ্য ধর্ম হিন্দুধর্মতে রূপান্তরিত হল, সে আলোচনাই কিছুটা বিস্তারে করা যাক।

ব্রাহ্মণ্য ও হিন্দু শাস্ত্রের গ্রন্থসম্ভার অজস্র, তার প্রত্যেকটির আলোচনা এখানে সম্ভব নয়, এবং আমার মনে হয় তার প্রয়োজনও নেই। তবে সাধারণ ভাবে আমরা আমাদের ধর্মাচরণ ও ধর্ম বিশ্বাসের সমর্থনে ও প্রসঙ্গে যে যে শাস্ত্র, পুরাণ ও কাব্যগ্রন্থগুলির সচরাচর উল্লেখ করে থাকি, সেগুলির মধ্যেই আমার এই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখব।

৫.১ ষড়দর্শন

প্রথমেই শুরু করা যাক হিন্দু ধর্মের দর্শন তত্ত্ব নিয়ে। হিন্দু ধর্মের মূল যে যে দর্শন তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে – সেই ছটি দর্শনের কথাই আমরা এই গ্রন্থে আলোচনা করব। অন্যান্য বহু দর্শন যেগুলি এই ছটি দর্শনেরই আরও সূক্ষ্মতর বা উচ্চতর মতামত কিংবা আরো অজস্র দর্শন যেগুলি বহুদিনই অপ্রচলিত, সেগুলির কোথাও কোথাও উল্লেখ আসতে পারে।            

যে ছটি দর্শন ব্রাহ্মণ্য ও হিন্দু ধর্মতত্ত্বের মূল, সেগুলিকে একত্রে ষড়দর্শন বলা হয়। এই ছটি দর্শন হল, সাংখ্য, পাতঞ্জল, বৈশেষিক, ন্যায়, মীমাংসা ও বেদান্ত। 

৫.১.১ সাংখ্য দর্শন

সাংখ্য দর্শনের স্রষ্টা কপিল মুনি। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর কোন সময়ে এই দর্শনের সৃষ্টি। যদিও এর কিছু কিছু তত্ত্বকথা ওই সময়ের আগে থেকেই চিন্তাশীল ঋষি, মুনিদের ভাবনাতে এবং আলোচনায় আসতে শুরু করেছিল। কপিলদেব সেই সকল বিক্ষিপ্ত আলোচনাগুলিকে সুসংহত সম্পূর্ণ করে একটি তত্ত্ব রচনা করলেন, তার নাম দিলেন সাংখ্য। পরবর্তী কালে যত দর্শন-তত্ত্বই রচনা হয়ে থাক না কেন, এই তত্ত্বের কাছে তারা প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ঋণী। এই তত্ত্ব প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল এবং সে সময় ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেদের সঙ্গে সাংখ্য পাঠও আবশ্যিক ছিল। এই কারণেই শ্রীমদ্ভাগবত গীতার বিভূতিযোগ অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কপিলমুনিকে নিজের অংশ-অবতার বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন (এই গ্রন্থের ২.৬.৪ অধ্যায় দেখুন)। শোনা যায় গৌতমবুদ্ধ ছাত্রাবস্থায় চার-বেদ ও সাংখ্যতে অসামান্য ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন।

ভারতবর্ষে কপিলমুনির স্মৃতি বিজড়িত পুণ্যভূমির অভাব নেই। সেগুলির মধ্যে সব থেকে বিখ্যাত গঙ্গাসাগরের কপিলমুনির মন্দির। গয়াতে ব্রহ্মযোনি পাহাড়ের গায়ে যে কপিলধারা আছে, তার পাশেও দুটি প্রাকৃতিক গুহাকে কপিলমুনির সাধন ক্ষেত্র বলা হয়। আবার নর্মদার কপিলধারা প্রপাতের পাশেই আছে কপিলেশ্বর শিবের মন্দির ও কপিলমুনির তপস্যা ক্ষেত্র[1]। অথচ কপিলাবস্তু, জনশ্রুতি অনুযায়ী যেখানে কপিলমুনির আশ্রম ছিল ও সাংখ্য তত্ত্বের চর্চা হত – হয়তো সেখানেই তাঁর কোন শিষ্যের থেকে গৌতমবুদ্ধ সাংখ্য পাঠ করেছিলেন - এই কপিলাবস্তুকে ঘিরে কপিলমুনির কোন পৌরাণিক কাহিনী পাওয়া যায় না। প্রবল বৌদ্ধ বিদ্বেষের কারণেই কী হিন্দু শাস্ত্রের এই ইচ্ছাকৃত বিস্মৃতি? কে জানে?                   

সাংখ্য দর্শনের মূল তত্ত্বটি হল, পঁচিশ সংখ্যক বিষয় বা পদার্থ – যার থেকে এই জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়। এই পঁচিশটি পদার্থ এবং বিষয়গুলি হল এরকমঃ-

পঞ্চ মহাভূত – মৃত্তিকা, জল, বায়ু, অগ্নি এবং আকাশ। জগতের সকল জীবদেহ এই পঞ্চভূত থেকেই গড়ে উঠেছে।

পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়– চোখ, কান, নাক, জিভ এবং ত্বক। এই পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে আমাদের চারপাশের যে জ্ঞানের প্রত্যক্ষ অনুভব হয়, তাকে তন্মাত্র বলে। সেই কারণে তন্মাত্রও পাঁচটি।

পঞ্চ তন্মাত্র – রূপ, শব্দ, গন্ধ, রস এবং স্পর্শ।

পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় – হাত, পা, বাক, পায়ু এবং উপস্থ (স্ত্রী এবং পুরুষের জননাঙ্গ)। এই পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় দিয়েই আমরা সমস্ত কাজ করি, হাঁটা-চলা করি, খাই-দাই, কথা বলি, মলমূত্র পরিত্যাগ করি এবং সন্তান উৎপাদনের জন্য স্ত্রী-পুরুষে সঙ্গম করি। 

এই কুড়িটি বিষয়কে নিয়ন্ত্রণ করে, আরও পাঁচটি বিষয় – প্রকৃতি, পুরুষ, মহৎ-তত্ত্ব, অহংকার এবং মন।

প্রকৃতি জড় পদার্থ এবং কিন্তু সকল কার্যের কারণ। জড় পদার্থ আবার কাজ করবে কী করে? এই সন্দেহের উত্তরে সাংখ্য বলছে, প্রকৃতি তিনটি গুণের সাহায্যে কাজ করতে পারে। সেই তিনটি গুণ হল সত্ত্ব, রজঃ, তমো। তাতেও ঠিক স্পষ্ট হল না। উদাহরণ দিলে কিছুটা সহজ হবে। কাঠ জড় পদার্থ। কিন্তু তার মধ্যে আছে দাহিকা শক্তি। কোন ভাবে কাঠে অগ্নি সংযোগ করতে পারলে, সেই কাঠই আলো দেয়, উত্তাপ দেয়। সেই আগুনে রান্না করা যায়, শীতের রাত্রে হাত সেঁকে নেওয়া যায়, জংলী পশুদের ভয় দেখানো যায়, কখনো কখনো প্রতিবেশীর ঘরে আগুনও ধরানো যায়। একই ভাবে প্রকৃতি জড় হলেও, চেতনার প্রভাবে সত্ত্ব, রজ বা তমোগুণের অধিকারী হয়ে উঠতে পারে।

পুরুষ হল চেতনস্বরূপ, কিন্তু নির্বিকার এবং অকর্তা, অর্থাৎ কোন কার্যই করেন না। কোন কার্যের পরিণামও ভোগ করেন না। পুরুষ এবং প্রকৃতির সংযোগ হলেই, মহৎ-তত্ত্ব, অহংকার এবং মনের কার্যপ্রণালী শুরু হয়ে যায়, অর্থাৎ সত্ত্ব, রজঃ ও তমো গুণের ক্রিয়াকলাপ আরম্ভ হয়ে যায়। সত্ত্বগুণে কাঠে আগুন জ্বলে ওঠে, রজঃগুণে আলো এবং উত্তাপের আনন্দ উপভোগ করে অথবা তমোগুণে প্রতিবেশীর ঘরে আগুন লাগায়। কিন্তু এই আগুন জ্বলে ওঠা, আলো ও উত্তাপের আরাম কিংবা প্রতিবেশীর ঘরের আগুন থেকে, প্রকৃতি ও পুরুষের কিছু আসে যায় না। এই তিন অবস্থা হলেই বা কী, না হলেই বা কী? তারা যেমন ছিল, তেমনই থাকবে, অবিচল, উদাসীন, নির্বিকার। এই তিন অবস্থার পরিণাম বা ফল ভোগ করবে মানুষ, যার মধ্যে মহৎ-তত্ত্ব, অহংকার এবং মন আছে।  

মহৎ-তত্ত্ব বুদ্ধি স্বরূপ, যা দিয়ে আমরা বিচার করি, ভালো-মন্দ, শুভাশুভ, পাপ-পুণ্য, দুঃখ-সুখ। অহংকারের অর্থ আমিত্ব– যার থেকে আমার সন্তান, আমার স্বামী, আমার বংশ, আমিই ধনী, আমি পণ্ডিত এমন ধারণা আসে। মন হল মানুষের চেতনা – এই মনই মহত্তত্ত্ব এবং অহংকারকে নিয়ন্ত্রণ করে। 

সাংখ্য দর্শনের সব থেকে আশ্চর্য বিষয় হল এখানে কোথাও ঈশ্বর বা দেবতার অস্তিত্ব নেই। পুরোটাই বস্তুবাদী ভাবনা। প্রত্যক্ষ জড় আর জীবের, বিশেষতঃ মানুষের জীবন তত্ত্ব। এই তত্ত্বে জন্ম-মৃত্যু এবং একজন মানুষের জীবনে পাপ-পুণ্য, শুভ-অশুভ কাজ এবং তার কারণের সন্ধান করা হয়েছে। বৈদিক ধর্মের প্রাথমিক স্তরে এই তত্ত্ব দারুণ কার্যকরী এক তত্ত্ব হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু বৈদিক সমাজ থেকে পরবর্তী কালে ব্রাহ্মণ্য সমাজ প্রতিষ্ঠার সময় এই তত্ত্বে দেখা গেল বিশাল বিপত্তি। এখানে ঈশ্বর তো নেইই, এমনকি কোন দেবতাও নেই! তাহলে এত মন্ত্র-টন্ত্র বলে, এত উপচার দিয়ে দেবতাদের উদ্দেশে যে এত বড়ো বড়ো যজ্ঞের আয়োজন, তার যৌক্তিকতা কোথায়? ব্রাহ্মণেরা সময় নষ্ট করলেন না, তাঁরা তাড়াতাড়ি আরেকটি দর্শন তত্ত্ব রচনা করতে বাধ্য হলেন, পাতঞ্জল দর্শন। প্রত্যক্ষ জড় ও জীবের সঙ্গে জুড়ে দিলেন, পরোক্ষ এক বিষয় – যে বিষয় ছাড়া ব্রাহ্মণ্য তত্ত্ব দাঁড়ায় না। 

৫.১.২ পাতঞ্জল দর্শন

ঋষি পতঞ্জলি এই দর্শন রচনা করেছিলেন, তাই এই দর্শনের নাম পাতঞ্জল। তিনি সাংখ্য দর্শনের পুরোটাই মেনে নিলেন, অর্থাৎ পঁচিশটি বিষয়ের তত্ত্ব, তার সঙ্গে শুধু যোগ করে দিলেন ঈশ্বরতত্ত্ব। অর্থাৎ পাতঞ্জল দর্শন ছাব্বিশ বিষয়-তত্ত্বের দর্শন। সাংখ্যর পুরুষকে ঋষি পতঞ্জলি দুটি পুরুষে বিভক্ত করলেন, একজন পরমপুরুষ অন্যজন পুরুষ। অর্থাৎ পরমপুরুষ এক এবং অদ্বিতীয়, আবার তিনিই অসংখ্য রূপে বিভাজিত হয়ে পুরুষ হয়েছেন, এবং মানুষ তো বটেই, সমস্ত জীবের মধ্যেই তিনি পুরুষরূপে অবস্থান করছেন। পরবর্তী সময়ে এই পুরুষকে আত্মাও বলা হয়েছে, এবং ঈশ্বর হয়েছেন পরমাত্মা। আরো পরবর্তী হিন্দু ধর্মমতে পরমাত্মা হয়েছেন পরমব্রহ্ম, বৈষ্ণবদের কাছে তিনি ভগবান বিষ্ণু এবং শৈবদের কাছে তিনিই দেবাদিদেব শিব। কিন্তু সেকথা আসবে পরে।



[1] তপোভূমি নর্মদা – প্রথম খণ্ড – পৃঃ ৩৯-৪০

চলবে...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৫/১

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম তৃত...