এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
আরেকটি ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
৯
মেনগেটের সামনে দিবাকর গাড়ি
দাঁড় করাতেই রামশরণ লোহার গেট খুলে দিল। দিবাকর গাড়িটা ভেতরে ঢুকিয়ে দাঁড় করাল সদর
দরজার সামনে। হর্নের আর গাড়ির আওয়াজে দরজা খুলে দরজার ফ্রেমে এসে দাঁড়াল কনি। পরনে
হলুদ রংয়ের তাঁতের শাড়ি, ঘন খয়েরি চওড়া পাড়, শাড়ির জমিনে একই রঙের বুটি। পিঠের ওপর
ছড়ানো এলো চুল। কপালে একই রঙের ছোট্ট বিন্দি। সুকন্যার দিকে তাকিয়ে, গাড়ি থেকে
নামতে কয়েক মুহূর্ত দেরি হয়ে গেল সুনেত্রর।
সিঁড়ির সামনে এগিয়ে এসে উজ্জ্বল
চোখে, প্রসন্ন মুখে সুকন্যা বলল, “এসো”। এখন তার সদ্য স্নাত নির্মল মুখে কোন কান্নার ছায়া নেই। তখন কেন কাঁদছিল
কনি? ভাবতে ভাবতে ঘরে ঢুকল সুনেত্র।
“আমার কিন্তু বীভৎস খিদে
পেয়েছে, সুনুদা, চট করে হাত মুখ ধুয়ে বসে পড়ো আগে, একসঙ্গে খাবো। হারু খাবার দিয়ে
দাও। সুনুদার সারথি দিবাকরকেও খাইয়ে দিও কিন্তু”।
ভেতর থেকে হারুর গলা পাওয়া গেল,
“টেবিলে প্লেট দিয়ে দিয়েছি বৌদিমণি, বসলেই সার্ভ করে দেব”।
“দিবাকর বোধহয় খেয়ে নিয়েছে, ও
তো বাড়ি থেকে খাবার আনে” সুনেত্র বলল।
“ঠিক আছে, তুমি চাপ নিও না তো,
সুনুদা। দুপুরবেলা বাড়িতে এসে কেউ অভুক্ত থাকবে, এটা আমার একেবারেই সহ্য হয় না”। সুনেত্র আর কিছু বলল না, বেসিনে গিয়ে হাত ধুয়ে নিল, পাশে কনি দাঁড়িয়েছিল
হাতে তোয়ালে নিয়ে। তোয়ালেতে হাত মুছে, সুনেত্র বলল, “হঠাৎ একেবারে নেমন্তন্ন, তার ওপর আবার লাঞ্চ, কী ব্যাপার বলতো”?
“বসো তো আগে, তারপর সব কথা হবে”।
সুনেত্র এবং সুকন্যা দুজনেই
ডাইনিং টেবিলে সামনাসামনি বসল। হারু অপেক্ষা করছিল। দুজনকে প্লেট এগিয়ে দিল।
একধারে রাখল ঝিরিঝিরি করলা ভাজা। তারপর ভাত। খাওয়া শুরু করতে সুকন্যা বলল, “জানি
না, এতদিনে তোমার খাওয়ার অভ্যেসগুলো পাল্টে গিয়েছে কিনা”।
“ভাবিস না, একই আছে, প্রথম পাতে
ঈষৎ তিক্ততা আজও ভালোবাসি। আমার ফেভারিট, তখনও ছিল, আজও আছে। বাট, এরপর কী?
“আরে এটা তো শেষ করো আগে। এটাই
শেষ করলে না, তার আগে পরেরটার চিন্তা। রহু ধৈর্যং। ক্রমশঃ প্রকাশ্য”।
“বাবা, খেতে বসে সাসপেন্স? ওসব
তো আগে হতো, আজকাল তো সারি সারি আহার্য পাত্রে-পাত্রে সাজিয়ে রেখে দেওয়ার নিয়ম,
মনোমত খাবার তুলে নিতে হয় প্লেটে”।
“একি তোমার বুফে নাকি? এ হচ্ছে
সামনে বসিয়ে, থালায় ব্যঞ্জন সাজিয়ে, তালপাতার পাখা নাড়তে নাড়তে খাওয়ানো। আজকাল এসি
হয়ে গিয়ে তালপাতার পাখাই হাওয়া হয়ে গেছে। না হলে...”
“রাজলক্ষ্মী না অভয়া?” করলা
ভাজা শেষ করে ভাত ভাঙল সুনেত্র। হারু ভাতের ওপর বিউলির ডাল দিল এক হাতা। তারপরে
আলু পোস্ত।
“তুমি আর যাই হও, সুনুদা,
শ্রীকান্ত হওয়ার মতো গুণ বলো গুণ, দোষ বলো দোষ - কোনটাই নেই। তোমার সুগারের বালাই
নেই তো? নিজেই ডাক্তার যখন থাকলেও, কন্ট্রোল করে চলো নিশ্চয়ই”।
“আলু রয়েছে বলে বলছিস? নাঃ, সারা
জীবনটাই যেহেতু তিক্ততামাখা, তাই আমার রক্তে মিষ্টত্বের বাহুল্য এখনও খুঁজে পাইনি।
হারু আর একটু ডাল দাও তো, ভাতগুলো জুত করে মাখি”।
“আরে রে করছো কি? সবভাতগুলো
মেখে ফেললে, মাছ দিয়ে কি খাবে?”
“মাছ, এর পরে না খেলেই কি নয়?
অনেকদিন পর এমন স্বাদের বিউলিডাল-আলুপোস্ত খাচ্ছি, নাই বা হলো মাছ। আমার না আছে আলুর
দোষ এবং না আমি “পঞ্চ-ম”-এর রসিক। শ্রীকান্ত হবার এলেম নেই ঠিকই, কিন্তু বরং
অনেকটা তোর সেই দাদুর মতো কিম্ভূতকিমাকার। আমিষহীন জীবনে বিধবার একমাত্র মুখরোচক
বিলাসিতা পোস্ত। সে আলুর হোক, ঝিঙের হোক কিংবা পোস্তর বড়া। এটা তো মানবি?”
“তুমি কি বিধবা”?
“মোটেই না, ঠিকঠাক বললে
অকৃতদার, কিন্তু বৈধব্যের থেকে তার খুব কি পার্থক্য থাকে”।
“থাকে না? কি বলছ তুমি, সুনুদা।
তোমার জীবন নিয়ন্ত্রণহীন আজগুবি বাতাসের মতো। তার যত্র তত্র যা খুশী করে ফেলার
অদ্ভূত প্রবণতা। আর বিধবাদের পুরোটাই তো নিয়ন্ত্রণ, বদ্ধ ঘরের বুকচাপা বাতাস।
একঘেয়েমির গন্ধমাখা”। সুনেত্র কিছু বলল না। একটু
হাসল। হারু চট করে সুনেত্রর পাতে বেশ বড়সড় একটা পাবদা মাছ নামিয়ে দিল। সেই পাবদা
সরষের রসে আপ্লুত।
“হারু, তুমিও এভাবে আমার
সর্বনাশ করতে মেতে উঠলে কেন বলো তো”? হারু হাসল, বলল, “পোস্ত মাখা ভাতটা শেষ করে
ফেলুন, স্যার। তারপর আরেকটু ভাত দিই, সরষের ঝোল দিয়ে মেখে নিন”।
খাওয়া দাওয়া সেরে, হাতমুখ ধুয়ে
ড্রয়িং রুমে বসতেই সুনেত্রর হাতে একটি সাজা পান বাড়িয়ে দিল সুকন্যা। নিজেও একটি
পান মুখে নিয়ে গম্ভীর মুখে বলল, “আজ আর
মুখোমুখি পান খাওয়া হল না, সুনুদা, সোফায় মুখোমুখি বসেই পান চিবোতে হবে”।
হেসে ফেলল সুনেত্র, তারপর বলল, “এই কথাটা এমন গম্ভীর মুখে – জজ
সায়েবের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার মতো – বলবার
কী আছে?”
“না মানে, তুমি হয়তো আঁচ করে রেখেছিলে
- আজও সেই রাত্রের মতো, জড়িয়ে ধরে মুখোমুখি পান খাওয়া হবে – সে কথাই বলছিলাম।
কিন্তু সে তো আর হল না”। আড়চোখে সুনেত্রর দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুকন্যা
বলল।
সুকন্যার তিরছি নজর এবং
দীর্ঘশ্বাস ফেলাটুকু খুবই উপভোগ করল সুনেত্র, তারপর হাসিমুখে বলল, “তাতে তো মনে
হচ্ছে তোরই মনে হুতাশ বেশি”!
“ওরকম চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলছ,
কেন? বিকাশ রায়ের মতো?” সুকন্যা একটু ঝাঁজ মিশিয়ে বলল, “সব দোষ আমারই না? তুমি
একবারে গঙ্গাজলে ধোয়া তুলসী পাতা...”।
সুকন্যার চোখে চোখ রেখে সুনেত্র
সোফা ছেড়ে উঠে গেল সুকন্যার সামনে, নাটকীয় ভাবে হাঁটু গেড়ে বসল মেঝেয়। তারপর
দুহাতে চুল ধরে টেনে নামাল সুকন্যার মাথাটা, এবং মুখ তুলে সুকন্যার উন্মুখ অধরে
ডুবিয়ে দিল নিজের ঠোঁট। দীর্ঘ চুম্বনে আবিষ্ট রইল দুজনেই। উভয়ের হৃৎ-স্পন্দনের গতি
এতটাই বেড়ে উঠল, এসি চলা নিঃশব্দ ঘরে দুজনেই শুনতে পেল দুটি হৃদয়ের কলধ্বনি।
“ছাড়ো, কেউ এসে পড়বে...”, অস্ফুটে
বলল সুকন্যা। সুনেত্র ছেড়ে দিল। মেঝে থেকে উঠে আবার সোফায় বসল। সুকন্যার দিকে
তাকাল। খুব মনোযোগ দিয়ে সুকন্যা এখন এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুল এবং শাড়ির আঁচল ঠিক করছিল
– দীর্ঘ সময় ধরে। এতটাই কি বিস্রস্ত হয়েছে সুনেত্রর কুন্তল এবং অঞ্চল, মনে হল না
সুনেত্রর। বরং, তার মনে হল, ওই সময়টুকুতে সে গুছিয়ে নিতে চাইছে উথাল-পাথাল হয়ে
যাওয়া তার অন্তরটাকে।
দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে সুনেত্র নিজের দিকেও তাকাল এবার। তার আধা-আধুরী জীবনে এই মাধুরীটুকু যেন পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা। বড়ো ইচ্ছে হয় – আজ, এতদিন পরেও তার শুকিয়ে ওঠা ইচ্ছে-লতায় আসুক কিশলয়, ধরুক মুকুল। শীতের শীর্ণ রুক্ষতার পর যেমন আসে বাসন্তী উজ্জীবন।
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন