মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৪

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৩ 


৩০

 মারুলা চলে গেল বনের পথে দক্ষিণ দিকে, ভল্লা আর রামালি রওনা হল নোনাপুর গ্রামের দিকে। যেতে যেতে ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “কী বুঝছিস, রামালি? ভয় করছে না তো?”

“ভয় যে করছে না, তা নয় ভল্লাদাদা। করছে, তবে সেটা প্রাণের ভয় নয়। এতবড়ো একটা ষড়যন্ত্র, যার পেছনে রয়েছে আমাদের রাষ্ট্র, আমাদের প্রশাসন। ভয় হচ্ছে তার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারব কিনা। তোমাদের কথায় অনেক কিছুই বুঝলাম। কিন্তু সে বোঝায় বেশ কিছু ফাঁক থেকে যাচ্ছে। আর এটাও বুঝছি না, এই পুরো প্রক্রিয়াতে আমার অবস্থানটা কোথায়? এই দুটো ব্যাপার বুঝতে চাই। তবে এখন নয়, নিরিবিলিতে কোন এক সময় আলোচনা করব...”।

ভল্লা বলল, “সেই ভালো। এবার তোকে সব কিছু খুলে বলার সময় এসেছে। ও হ্যাঁ, দুপুরে খাওয়ার আগে তুই ছোট মুখে কিছু বড়ো কথা বলতে চেয়েছিলি, কী কথা বলতো?”

রামালি হাসল, বলল, “আমার মুখ এখনও ছোটই আছে ভল্লাদাদা, কিন্তু কথাগুলো আরও বড়ো হয়ে উঠেছে, তোমার আর মারুলাদাদার আলোচনা শুনতে শুনতে। সে কথাও এখন তোলা থাক। কিন্তু একটা কথা বলো তো, ভল্লাদাদা, তুমি কি সত্যিই প্রধানমশাইয়ের জন্যে দুশ্চিন্তায় রয়েছ?”

ভল্লা একটু চমকে উঠল, তাকাল রামালির মুখের দিকে। তারার আলোয় রামালির মুখটা অস্পষ্ট, কিন্তু চোখদুটো চিকচিক করছে, তাকিয়ে আছে ভল্লার দিকে। ভল্লা একটু চিন্তা করে বলল, “প্রধানমশাইয়ের জন্যে যে খুব চিন্তায় আছি, সে কথা হয়তো সত্যি নয়। কিন্তু কমলিমায়ের জন্যে ভীষণ চিন্তা হচ্ছে। মায়েরা যেমন হন আর কি, নরম মনের মানুষ, সহজ-সরল। বহু বছর আগে পুত্রদের হারিয়েছেন, এখন যদি চোখের সামনে স্বামীর এমন অসম্মানের মৃত্যু হয়। কমলিমায়ের পক্ষে এই ধাক্কা সহ্য করা শক্ত হবে”।

রামালি কিছু বলল না। ভল্লা আবার বলল, “কমলিমায়ের মুখটা মনে পড়লেই…এই যে এতদূরে এসে এইসব রাজকার্য করছি… মাঝে মাঝে মনে হয়, যা কিছু করছি, ঠিক করছি কি… কোনটা যে কর্তব্য, আর কোনটা করণীয় নয়…সেটাই আজকাল কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে রে, রামালি…”! পাশাপাশি চলতে চলতে কেউ কোন কথা বলল না অনেকক্ষণ। কিছুক্ষণ পর রামালি বলল, “আমরা বনের সীমান্তে চলে এসেছি ভল্লাদাদা, এখানেই রণপাগুলো রেখে, চলো গ্রামে ঢুকি”।

 কমলিমায়ের বাড়ির পিছনের বেড়া ডিঙিয়ে ভল্লা আর রামালি ঢুকল। এবারে আর কোন সংকেত না দিয়ে, ভল্লা নিঃশব্দে সামনের উঠোনে গিয়ে, দাওয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দেখল কমলিমায়ের ঘরের দরজার পাল্লা ভেজানো, ফাঁক দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছে। ভল্লা তিনধাপ সিঁড়ি বেয়ে দাওয়ায় উঠে দরজার সামনে গিয়ে খুব নীচু স্বরে ডাকল, “মা, মা রে, এখনও ঘুমোসনি?” কোন সাড়া পেল না। ভল্লা সন্তর্পণে দরজার পাল্লায় চাপ দিল, একটু ফাঁক হতে দেখল, জুজাক শুয়ে আছেন খাটিয়ার বিছানায়। তাঁর মাথার দিকে মেঝেয় বসে আছেন কমলিমা। হাঁটুতে কনুইয়ের ভর দিয়ে রাখা হাতের ওপর মাথাটি রেখে চোখ বুজে বসে আছেন। দীপের ম্লান আলোতে তাঁর মুখটা কিছুক্ষণ দেখল ভল্লা। অসহায় ক্লান্ত মুখে জমে আছে জীবনের যাবতীয় বিষণ্ণতা। ভল্লা নিঃসাড়ে কাছে গিয়ে বসল, কমলিমায়ের হাঁটুতে হাত রাখল। কমলিমা চোখ মেলে তাকালেন। দু চোখে কোন কৌতূহল নেই, বিস্ময় নেই, আনন্দ নেই...। জিজ্ঞাসা করলেন, “কতক্ষণ এসেছিস, চোখটা একটু লেগে গিয়েছিল রে। কেমন আছিস ভল্লা?”

“কী চেহারা করেছিস রে মা? এ ভাবে নিজেকে কষ্ট দিলে প্রধানমশাইকে সারিয়ে তুলতে পারবি? তার আগেই তুইই তো মারা পড়বি রে মা? খাওয়দাওয়া বন্ধ করেছিস, ঘুমোচ্ছিস না”।

“কে বললে, খাচ্ছি না, ঘুমোচ্ছি না? সবই করছি। জীবন কারও জন্যে থেমে থাকে নাকি? এই তো গতকাল সকালে বটতলির সনাতন কবিরাজ এল। প্রধানকে দেখে গেল। ওষুধ-পথ্যি বুঝিয়ে দিল। আধমরা একটা মানুষকে ওষুধ কী ভাবে খাওয়াবো বল তো? সেদিন থেকে প্রধানের কোন সাড় নেই – শুধু প্রাণটুকুই কোনমতে ধুকধুক করছে! দিনে দশবার করে নাকের নীচে হাত রাখি - শ্বাস পড়ছে তো? বুকের ওপর কান পাতি – ধুকধুক করছে তো! আচ্ছা, সনাতন কবিরাজকে কে পাঠাল বল তো। তুই? তুই ছাড়া আর কে পাঠাবে? কবিরাজদাদা কবে আসবে জানিস? তাকে কেন ধরে নিয়ে গেল রে, আস্থানের আঁটকুড়ির ব্যাটারা? কী অপরাধ করেছে সে? ডাকাতি? হত্যা? কবিরাজদাদা থাকলে, প্রধান এতদিনে ঠিক উঠে বসত...”।

ভল্লা কমলিমায়ের দুহাঁটুতে হাত রেখে মুখের দিকে তাকিয়ে কথা শুনছিল। কান্নায় ভেঙে না পড়েও, এমন কথার হাহাকার সে কোথাও কোনদিন শোনেনি।

“দরজায় কে দাঁড়িয়ে রে? তোর সঙ্গে এসেছে বুঝি? দরজায় দাঁড়িয়ে কেন? ভেতরে আসতে বল”। রামালি নিঃশব্দে দরজা দিয়ে মুখ বাড়াল, ঘরের ভেতরে ঢুকল। “ও মা রামালি? ঘরে এসে বস। শুনলাম তোর কাকিমা তোকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। তুই এখন ভল্লার সঙ্গেই থাকিস। প্রধান তোর কাকার সঙ্গে দেখা করতে যাবে বলেছিল। সে আর হল কই? তার আগেই এসব। তা বেশ করেছিস। ভাসুরপো, ভাইপো এ সম্পর্কগুলো আজকাল বহুদূরের সম্পর্ক বাবা... কোন ভরসা নেই, কোন বিশ্বাস নেই। কে জানে কবে তোর খাবারে বিষ দিয়ে তোকে হয়তো মেরেই ফেলত...তার থেকে এ বরং ভালই হল...নিজের জীবনটা নিজের মতো গড়ে নে। আমাদের দিন তো শেষ হয়ে এল, দেখছিস। গ্রামপ্রধানকেই ধরে চোরের মার মার রাজার রক্ষীরা। শুনলাম কবিরাজদাদাকে এমন করে ধরে নিয়ে গেছে, যেন সে ডাকসাইটে অপরাধী। সাধারণ মানুষের মান-সম্মান-মর্যাদার আর কানাকড়ির মূল্যও নেই রাজশক্তির কাছে”

ভল্লা কমলিমায়ের একটা হাত নিজের হাতে তুলে নিয়ে বলল, “তুই এত ভেঙে পড়ছিস কেন, মা? দেখিস সব ঠিক হয়ে যাবে। প্রধানমশাই আবার উঠে দাঁড়াবেন। কবিরাজমশাইও ফিরে আসবেন…এত ভাবিস না…”।

কমলিমা ভল্লার হাতের মুঠিতে থাকা নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুই নাকি আমাদের ছেলেদের নিয়ে দল গড়েছিস? শুনতে পাই, তাদের লড়াই করতে শেখাচ্ছিস?” চোখ তুলে তিনি ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “সত্যি না কি রে?” এই মানসিক অবস্থার মধ্যেও কমলিমা আচমকা এমন একটা প্রশ্ন করে বসবেন, ভল্লা আদৌ অনুমান করতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে সত্যি না মিথ্যে কোনটা বলা সমীচীন হবে চট করে ভেবে পেল না। ভল্লার পিছনেই বসে থাকা রামালি বলল, “আমরা হাত-পা গুটিয়ে, ঘাড় হেঁট করে, বসে থাকবো, জেঠিমা? গ্রামের এতবড়ো অপমানটা আমরা বসে বসে দেখে যাব? শোধ নেব না?”

কমলিমা অবিশ্বাসী চোখে রামালির মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে, অস্ফুট স্বরে বললেন, “শোধ নিবি…?” একটু থেমে আবার বললেন, “রাজশক্তির বিরুদ্ধে… কী বলছিস রে?”

“হ্যাঁ জেঠিমা, আমাদের মরতে হবে জানি… কিন্তু আমাদের মারার আগে ওরাও টের পাবে, মৃত্যুর গন্ধ কাকে বলে …। সেটাই বা কম কি, জেঠিমা?”

কমলিমা কোন উত্তর দিলেন না, একইভাবে তাকিয়ে রইলেন রামালির দুই চোখের দিকে। আহত-অচেতন প্রধানমশাইকে গ্রামের মানুষরা সেদিন যখন ধরাধরি করে বাড়িতে নিয়ে এল। তাদের মুখে সব কথা শুনে তিনি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। সেদিন থেকে শোক, দুঃখ, বেদনার কোন অনুভূতিই আর অবশিষ্ট ছিল না তাঁর মনে। আজ হঠাৎই তাঁর সেই নির্বাক দুই চোখ ভাসিয়ে নেমে এল অশ্রুধারা।


চলবে...

সোমবার, ১ জুন, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/১

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/শেষ পর্বাংশ "]

পঞ্চম পর্ব /পর্বাংশ  - ১


আমাদের ধর্ম বিশ্বাসের পরিণতি

 প্রাককথা

আগের পর্বগুলিতে ৭০,০০০ বি.সি.ই থেকে মোটামুটি ১৩০০ সি.ই. পর্যন্ত হোমোস্যাপিয়েন্স নামক ভারতীয় মানব প্রজাতির ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক ক্রমবিকাশের “আনুমানিক তত্ত্ব” এবং প্রামাণিক তথ্য সংগ্রহ সম্পূর্ণ হল। এবার এই সমস্ত তথ্যগুলির একত্রে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একজন ভারতীয় হোমোস্যাপিয়েন্স হিসেবে, ১৩০০ সি.ই.-তে আমরা ঠিক কোথায় এসে পৌঁচেছিলাম – সে বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা থাকলে আমাদের আধুনিক আচরণের যৌক্তিকতা খুঁজে পেতে হয়তো সুবিধে হবে।

 এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, ১৩০০ সি.ই.-র ধারণা থেকে ২০২৬ সি.ই.-র আধুনিকতার আঁচ কীভাবে পাওয়া সম্ভব? তার উত্তরে বলা যায়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক ধারণার দিক থেকে ১৩০০ সি.ই. এবং ২০২৬ সি.ই.-র মধ্যে আকাশ-পাতাল বদল ঘটেছে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল, আমাদের ধর্মীয় আচরণ ও ধারণায় যেটুকু বদল ঘটেছে, তার তাৎপর্য এবং গুরুত্ব যৎকিঞ্চিৎ। সে কথা এই পর্ব শেষে আশা করি বোঝা যাবে।

বৈদিক ধর্ম থেকে বিচ্যুত ব্রাহ্মণ্যধর্ম মোটামুটি কবে হয়েছিল, সে বিষয়ে আমরা আলোচনা করেছি, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্বে, এবং কবে থেকে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম হিন্দু ধর্মে মোড় নিতে শুরু করল তার ইঙ্গিতও আমরা পেয়েছি, আগের পর্বগুলিতে। এবার কী ভাবে এবং কেনই বা ব্রাহ্মণ্য ধর্ম হিন্দুধর্মতে রূপান্তরিত হল, সে আলোচনাই কিছুটা বিস্তারে করা যাক।

ব্রাহ্মণ্য ও হিন্দু শাস্ত্রের গ্রন্থসম্ভার অজস্র, তার প্রত্যেকটির আলোচনা এখানে সম্ভব নয়, এবং আমার মনে হয় তার প্রয়োজনও নেই। তবে সাধারণ ভাবে আমরা আমাদের ধর্মাচরণ ও ধর্ম বিশ্বাসের সমর্থনে ও প্রসঙ্গে যে যে শাস্ত্র, পুরাণ ও কাব্যগ্রন্থগুলির সচরাচর উল্লেখ করে থাকি, সেগুলির মধ্যেই আমার এই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখব।

৫.১ ষড়দর্শন

প্রথমেই শুরু করা যাক হিন্দু ধর্মের দর্শন তত্ত্ব নিয়ে। হিন্দু ধর্মের মূল যে যে দর্শন তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে – সেই ছটি দর্শনের কথাই আমরা এই গ্রন্থে আলোচনা করব। অন্যান্য বহু দর্শন যেগুলি এই ছটি দর্শনেরই আরও সূক্ষ্মতর বা উচ্চতর মতামত কিংবা আরো অজস্র দর্শন যেগুলি বহুদিনই অপ্রচলিত, সেগুলির কোথাও কোথাও উল্লেখ আসতে পারে।            

যে ছটি দর্শন ব্রাহ্মণ্য ও হিন্দু ধর্মতত্ত্বের মূল, সেগুলিকে একত্রে ষড়দর্শন বলা হয়। এই ছটি দর্শন হল, সাংখ্য, পাতঞ্জল, বৈশেষিক, ন্যায়, মীমাংসা ও বেদান্ত। 

৫.১.১ সাংখ্য দর্শন

সাংখ্য দর্শনের স্রষ্টা কপিল মুনি। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর কোন সময়ে এই দর্শনের সৃষ্টি। যদিও এর কিছু কিছু তত্ত্বকথা ওই সময়ের আগে থেকেই চিন্তাশীল ঋষি, মুনিদের ভাবনাতে এবং আলোচনায় আসতে শুরু করেছিল। কপিলদেব সেই সকল বিক্ষিপ্ত আলোচনাগুলিকে সুসংহত সম্পূর্ণ করে একটি তত্ত্ব রচনা করলেন, তার নাম দিলেন সাংখ্য। পরবর্তী কালে যত দর্শন-তত্ত্বই রচনা হয়ে থাক না কেন, এই তত্ত্বের কাছে তারা প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ঋণী। এই তত্ত্ব প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল এবং সে সময় ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেদের সঙ্গে সাংখ্য পাঠও আবশ্যিক ছিল। এই কারণেই শ্রীমদ্ভাগবত গীতার বিভূতিযোগ অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কপিলমুনিকে নিজের অংশ-অবতার বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন (এই গ্রন্থের ২.৬.৪ অধ্যায় দেখুন)। শোনা যায় গৌতমবুদ্ধ ছাত্রাবস্থায় চার-বেদ ও সাংখ্যতে অসামান্য ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন।

ভারতবর্ষে কপিলমুনির স্মৃতি বিজড়িত পুণ্যভূমির অভাব নেই। সেগুলির মধ্যে সব থেকে বিখ্যাত গঙ্গাসাগরের কপিলমুনির মন্দির। গয়াতে ব্রহ্মযোনি পাহাড়ের গায়ে যে কপিলধারা আছে, তার পাশেও দুটি প্রাকৃতিক গুহাকে কপিলমুনির সাধন ক্ষেত্র বলা হয়। আবার নর্মদার কপিলধারা প্রপাতের পাশেই আছে কপিলেশ্বর শিবের মন্দির ও কপিলমুনির তপস্যা ক্ষেত্র[1]। অথচ কপিলাবস্তু, জনশ্রুতি অনুযায়ী যেখানে কপিলমুনির আশ্রম ছিল ও সাংখ্য তত্ত্বের চর্চা হত – হয়তো সেখানেই তাঁর কোন শিষ্যের থেকে গৌতমবুদ্ধ সাংখ্য পাঠ করেছিলেন - এই কপিলাবস্তুকে ঘিরে কপিলমুনির কোন পৌরাণিক কাহিনী পাওয়া যায় না। প্রবল বৌদ্ধ বিদ্বেষের কারণেই কী হিন্দু শাস্ত্রের এই ইচ্ছাকৃত বিস্মৃতি? কে জানে?                   

সাংখ্য দর্শনের মূল তত্ত্বটি হল, পঁচিশ সংখ্যক বিষয় বা পদার্থ – যার থেকে এই জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়। এই পঁচিশটি পদার্থ এবং বিষয়গুলি হল এরকমঃ-

পঞ্চ মহাভূত – মৃত্তিকা, জল, বায়ু, অগ্নি এবং আকাশ। জগতের সকল জীবদেহ এই পঞ্চভূত থেকেই গড়ে উঠেছে।

পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়– চোখ, কান, নাক, জিভ এবং ত্বক। এই পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে আমাদের চারপাশের যে জ্ঞানের প্রত্যক্ষ অনুভব হয়, তাকে তন্মাত্র বলে। সেই কারণে তন্মাত্রও পাঁচটি।

পঞ্চ তন্মাত্র – রূপ, শব্দ, গন্ধ, রস এবং স্পর্শ।

পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় – হাত, পা, বাক, পায়ু এবং উপস্থ (স্ত্রী এবং পুরুষের জননাঙ্গ)। এই পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় দিয়েই আমরা সমস্ত কাজ করি, হাঁটা-চলা করি, খাই-দাই, কথা বলি, মলমূত্র পরিত্যাগ করি এবং সন্তান উৎপাদনের জন্য স্ত্রী-পুরুষে সঙ্গম করি। 

এই কুড়িটি বিষয়কে নিয়ন্ত্রণ করে, আরও পাঁচটি বিষয় – প্রকৃতি, পুরুষ, মহৎ-তত্ত্ব, অহংকার এবং মন।

প্রকৃতি জড় পদার্থ এবং কিন্তু সকল কার্যের কারণ। জড় পদার্থ আবার কাজ করবে কী করে? এই সন্দেহের উত্তরে সাংখ্য বলছে, প্রকৃতি তিনটি গুণের সাহায্যে কাজ করতে পারে। সেই তিনটি গুণ হল সত্ত্ব, রজঃ, তমো। তাতেও ঠিক স্পষ্ট হল না। উদাহরণ দিলে কিছুটা সহজ হবে। কাঠ জড় পদার্থ। কিন্তু তার মধ্যে আছে দাহিকা শক্তি। কোন ভাবে কাঠে অগ্নি সংযোগ করতে পারলে, সেই কাঠই আলো দেয়, উত্তাপ দেয়। সেই আগুনে রান্না করা যায়, শীতের রাত্রে হাত সেঁকে নেওয়া যায়, জংলী পশুদের ভয় দেখানো যায়, কখনো কখনো প্রতিবেশীর ঘরে আগুনও ধরানো যায়। একই ভাবে প্রকৃতি জড় হলেও, চেতনার প্রভাবে সত্ত্ব, রজ বা তমোগুণের অধিকারী হয়ে উঠতে পারে।

পুরুষ হল চেতনস্বরূপ, কিন্তু নির্বিকার এবং অকর্তা, অর্থাৎ কোন কার্যই করেন না। কোন কার্যের পরিণামও ভোগ করেন না। পুরুষ এবং প্রকৃতির সংযোগ হলেই, মহৎ-তত্ত্ব, অহংকার এবং মনের কার্যপ্রণালী শুরু হয়ে যায়, অর্থাৎ সত্ত্ব, রজঃ ও তমো গুণের ক্রিয়াকলাপ আরম্ভ হয়ে যায়। সত্ত্বগুণে কাঠে আগুন জ্বলে ওঠে, রজঃগুণে আলো এবং উত্তাপের আনন্দ উপভোগ করে অথবা তমোগুণে প্রতিবেশীর ঘরে আগুন লাগায়। কিন্তু এই আগুন জ্বলে ওঠা, আলো ও উত্তাপের আরাম কিংবা প্রতিবেশীর ঘরের আগুন থেকে, প্রকৃতি ও পুরুষের কিছু আসে যায় না। এই তিন অবস্থা হলেই বা কী, না হলেই বা কী? তারা যেমন ছিল, তেমনই থাকবে, অবিচল, উদাসীন, নির্বিকার। এই তিন অবস্থার পরিণাম বা ফল ভোগ করবে মানুষ, যার মধ্যে মহৎ-তত্ত্ব, অহংকার এবং মন আছে।  

মহৎ-তত্ত্ব বুদ্ধি স্বরূপ, যা দিয়ে আমরা বিচার করি, ভালো-মন্দ, শুভাশুভ, পাপ-পুণ্য, দুঃখ-সুখ। অহংকারের অর্থ আমিত্ব– যার থেকে আমার সন্তান, আমার স্বামী, আমার বংশ, আমিই ধনী, আমি পণ্ডিত এমন ধারণা আসে। মন হল মানুষের চেতনা – এই মনই মহত্তত্ত্ব এবং অহংকারকে নিয়ন্ত্রণ করে। 

সাংখ্য দর্শনের সব থেকে আশ্চর্য বিষয় হল এখানে কোথাও ঈশ্বর বা দেবতার অস্তিত্ব নেই। পুরোটাই বস্তুবাদী ভাবনা। প্রত্যক্ষ জড় আর জীবের, বিশেষতঃ মানুষের জীবন তত্ত্ব। এই তত্ত্বে জন্ম-মৃত্যু এবং একজন মানুষের জীবনে পাপ-পুণ্য, শুভ-অশুভ কাজ এবং তার কারণের সন্ধান করা হয়েছে। বৈদিক ধর্মের প্রাথমিক স্তরে এই তত্ত্ব দারুণ কার্যকরী এক তত্ত্ব হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু বৈদিক সমাজ থেকে পরবর্তী কালে ব্রাহ্মণ্য সমাজ প্রতিষ্ঠার সময় এই তত্ত্বে দেখা গেল বিশাল বিপত্তি। এখানে ঈশ্বর তো নেইই, এমনকি কোন দেবতাও নেই! তাহলে এত মন্ত্র-টন্ত্র বলে, এত উপচার দিয়ে দেবতাদের উদ্দেশে যে এত বড়ো বড়ো যজ্ঞের আয়োজন, তার যৌক্তিকতা কোথায়? ব্রাহ্মণেরা সময় নষ্ট করলেন না, তাঁরা তাড়াতাড়ি আরেকটি দর্শন তত্ত্ব রচনা করতে বাধ্য হলেন, পাতঞ্জল দর্শন। প্রত্যক্ষ জড় ও জীবের সঙ্গে জুড়ে দিলেন, পরোক্ষ এক বিষয় – যে বিষয় ছাড়া ব্রাহ্মণ্য তত্ত্ব দাঁড়ায় না। 

৫.১.২ পাতঞ্জল দর্শন

ঋষি পতঞ্জলি এই দর্শন রচনা করেছিলেন, তাই এই দর্শনের নাম পাতঞ্জল। তিনি সাংখ্য দর্শনের পুরোটাই মেনে নিলেন, অর্থাৎ পঁচিশটি বিষয়ের তত্ত্ব, তার সঙ্গে শুধু যোগ করে দিলেন ঈশ্বরতত্ত্ব। অর্থাৎ পাতঞ্জল দর্শন ছাব্বিশ বিষয়-তত্ত্বের দর্শন। সাংখ্যর পুরুষকে ঋষি পতঞ্জলি দুটি পুরুষে বিভক্ত করলেন, একজন পরমপুরুষ অন্যজন পুরুষ। অর্থাৎ পরমপুরুষ এক এবং অদ্বিতীয়, আবার তিনিই অসংখ্য রূপে বিভাজিত হয়ে পুরুষ হয়েছেন, এবং মানুষ তো বটেই, সমস্ত জীবের মধ্যেই তিনি পুরুষরূপে অবস্থান করছেন। পরবর্তী সময়ে এই পুরুষকে আত্মাও বলা হয়েছে, এবং ঈশ্বর হয়েছেন পরমাত্মা। আরো পরবর্তী হিন্দু ধর্মমতে পরমাত্মা হয়েছেন পরমব্রহ্ম, বৈষ্ণবদের কাছে তিনি ভগবান বিষ্ণু এবং শৈবদের কাছে তিনিই দেবাদিদেব শিব। কিন্তু সেকথা আসবে পরে।



[1] তপোভূমি নর্মদা – প্রথম খণ্ড – পৃঃ ৩৯-৪০

চলবে...

শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ৮

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ৭ " 


 

সুনেত্রর মোবাইলটা যখন বেজে উঠল, তখন পৌনে বারোটা। স্ক্রিনে “কনি কলিং” দেখে সুনেত্র বেশ অবাক হল। এই কদিনে সুকন্যা একবারও ফোন করেনি। তাদের আলাপচারিতা যা কিছু হচ্ছে সবই মেলে। তার চেম্বারে সেসময় একজন পেশেন্ট ছিল। বয়স্ক লোক, রিটায়ার্ড, প্রায়ই আসেন। বিপত্নীক, একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, একমাত্র ছেলে আর ছেলের বউ চাকরি করে। সারাটা দিন বুড়োর সময় কাটে না। তাই পয়সা খরচ করে তার কাছে আসেন অলীক অসুখের গল্প করতে। আজও এসেছে, তার কমপ্লেন – “ডাক্তার বাবু, কদিন ধরেই সকালবেলায় বাওলটা ঠিক সাফ হচ্ছে না। তার ওপর মলের রংটাও...”। ফোনটা ধরে সুনেত্র ইশারায় বৃদ্ধকে একটু ওয়েট করতে বলে, চেম্বারের বাইরে এল, “হ্যাঁ বল”বাইরে বসার ঘরেও চারজন বসেছিল, তাকে বেরোতে দেখে সকলে সম্ভ্রমে নড়ে চড়ে বসল। কথা শুনতে শুনতে প্যাসেজ পার হয়ে নিজের বসার ঘরে ঢুকল সুনেত্র। 

“ব্যস্ত? এখন কথা বলা যাবে”? কনির স্বর একটু চাপা আর যেন কান্না ধরা।

“হুঁ, বলা যাবে। কি হয়েছে তোর? শরীর খারাপ”?

“কেন বলোতো”?

“গলাটা কেমন যেন ধরা ধরা শোনাচ্ছে। কাঁদছিলি নাকি”? সুকন্যা কোন উত্তর দিল না।

“কি হল, উত্তর দিচ্ছিস না? শশাংকবাবু কিছু বলেছে? ঝগড়া-টগড়া হয়েছে নাকি”? কোন উত্তর পেল না সুনেত্র। কিন্তু ফোনে শুনতে পাচ্ছিল সুকন্যার কান্নাময় নিঃশ্বাসের শব্দ।

“আরে, দাম্পত্যে একটু-আধটু কলহ হয়েই থাকে। আমার চেয়ে তোর তো অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। সেই কি যেন পড়েছিলাম, বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া। এর জন্যে এত কান্নাকাটি করছিস কেন”? সুনেত্র হা হা করে একটু হাসল।

“বাজে বকা রাখো। আজ একবার আসবে, প্লিজ। তোমাকে...” সুকন্যা কথাটা শেষ করল না। অধীর অপেক্ষায় সুনেত্র কানের মধ্যে চেপে ধরল ফোনটা। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরেও সুকন্যা কিছু বলল না দেখে সুনেত্র আবেগের সঙ্গে জিজ্ঞেস করল, “কি হয়েছে রে, কনি”?

“তোমাকে...তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে, সুনুদা। আসবে, প্লিজ”

“এখন? এখনই? আমি তো এখন চেম্বারে। পেশেন্ট রয়েছে চার-পাঁচজন। ঘন্টাখানেক পরে গেলে চলবে না? এই ধর দেড়টা নাগাদ”?

“চলবে। এসো কিন্তু, প্লিজ”

সুকন্যা ফোনটা কেটে দিতে, সুনেত্র কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল ঘরের মাঝখানে। কনি কী চাইছে তার কাছে, মধ্য দুপুরের এই নির্জনে? দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে ফিরে গেল তার ছেড়ে আসা চেম্বারে, তার জন্যে অপেক্ষারত বৃদ্ধের কোষ্ঠ সাফাইয়ের নিদান দিতে। যাওয়ার পথে ফোনটা আবার বেজে উঠল, কনি কলিং।

“হ্যাঁ বল, আবার কি হল”?

“তোমার তো নিশ্চই খাওয়া হয়নি দুপুরে”?

“না”

“তাহলে তুমি এলে আমার সঙ্গেই তুমি খাবে”

“এসবের কি খুব দরকার ছিল”?

“ছিল নয় আছে। তুমি এসো, তখন কথা হবে”ফোন কেটে দিল কনি।

এখন কনির স্বর স্বচ্ছ, কান্নার বদলে তার কণ্ঠে খুশির আবেশ।

 

চেম্বারে এসে সুনেত্র দেখল, বৃদ্ধ আগের মতোই নিশ্চিন্তে বসে আছেন, কোন তাড়া নেই। সে চেম্বারে ঢুকতেই বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন, “এমার্জেন্সি কল বুঝি”? সুনেত্র তখনো কনির চিন্তা থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি, তাই আনমনে জিজ্ঞেস করল, “কিছু বলছিলেন”?

“ফোন রিসিভ করে উঠে গেলেন, তাই জিজ্ঞেস করছিলাম, এমার্জেন্সি কল বোধহয়”?

“হুঁ”সংক্ষেপে উত্তর সারল সুনেত্র। এমার্জেন্সি মানে? এরকম এমার্জেন্সি সুনেত্র জীবনে কোনদিন ফেস করেনি। সুনেত্র ভাবল।

“আপনারা সত্যি এত অকুপায়েড, দু মিনিট যে বসে কথা বলবেন, তারও সোয়াস্তি নেই”

“সে যাক, আপনার প্রবলেমটা বলুন, অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখেছি আপনাকে”হাল্কা হাসি মুখে সুনেত্র বলল।

“খুবই দুশ্চিন্তায় রয়েছি, জানেন। সকালে বাওল সাফ না হলে কি যে অস্বস্তি হয়। সারাটা জীবন কাজের মধ্যে ডুবে থেকেছি। দিনরাত এক করে দিয়েছি বলতে পারেন। এসব প্রবলেম কোনদিন ছিল না, জানেন? রিটায়ারমেন্টের পর এই কটা বছর কিচ্ছু করার নেই সারাদিন, জানেন। বসে থেকে শুয়ে থেকে সর্ব অঙ্গে যেন জং ধরে উঠছে। বাওলের আর দোষ কি! তারপরে জানেন, মলের রংটাও...”

“এই দুটো ট্যাবলেট দিলাম। প্রথমটা দিনে দুবার, ব্রেকফাস্টের আগে একটা আর রাত্রে খাবার আগে একটা। সেকেণ্ড ট্যাবলেটটা একবার - রাতে শোবার আগেপাঁচদিনের কোর্সকেমন থাকবেন জানাবেন”বৃদ্ধ ভদ্রলোকের কথা শুনতে শুনতেই প্রেসিক্রিপসন লিখছিল সুনেত্র। লেখা হয়ে যেতে ভদ্রলোকের দিকে এগিয়ে দিল প্রেসক্রিপসনটা।

“কিন্তু আপনি তো আমার প্রব্লেমটা পুরো শুনলেনই না”স্পষ্টতঃই একটু হতাশ বৃদ্ধ ভদ্রলোক।

“আপনার সঙ্গে কি স্যার, আমার আজকের সম্পর্ক”? মুখে মাখোমাখো হাসি নিয়ে সুনেত্র বলল, “আপনার শরীরের খবর আপনার চেয়ে আমি ভালো জানি, আপনার মা কিংবা আপনার ওয়াইফের মতো”বিগলিত হেসে বৃদ্ধ শার্টের বুক পকেট থেকে টাকা বের করতে করতে বললেন, “সেই জন্যেই তো, আপনার ওপর চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করি, ডাক্তারবাবু। মোক্ষম বলেছেন কিন্তু, সব ডাক্তার আর পেশেন্টের রিলেশান, স্বামী-স্ত্রীর মতো হলে আর ভাবনা থাকত না। আপনি আমার চেয়ে অনেকটাই ইয়ং, বাট আই রেস্পেক্ট ইয়োর ডায়াগন্সিস অ্যান্ড ট্রিটমেন্ট”সুনেত্রর হাতে তুলে দিলেন পাঁচটা একশ টাকার নোট, সুনেত্র একটা নোট বৃদ্ধকে ফেরত দিয়ে বলল, “সবার থেকে পাঁচশ নিই, কিন্তু আপনার থেকে চারশই যথেষ্ট। ওনলি ফর ইউ, স্যার”

টেবিলের ডানদিকে পায়ার ওপরের দিকে ফিট করা বেলের সুইচ টিপতেই, রিসেপশনিস্ট মিলকি পাঠিয়ে দিল নেক্সট পেশেন্টকে। চেম্বারের দরজা ঠেলে ঢুকল এক মহিলা, সঙ্গে মলিন মুখের একটি ছেলে। বৃদ্ধ ভদ্রলোক অগত্যা নিরুপায় হয়েই নমস্কার করে বেরিয়ে গেলেন চেম্বার থেকে।

পরের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ৯ "


বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /২

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১




দ্বিতীয় স্কন্ধ - দ্বিতীয় পর্ব

শ্রীশুকদেব বললেন, “মহারাজ, আমার বলা এই ধারণা সামান্য নয়, এই ধারণা থেকে বিশ্বসৃষ্টির সামর্থ হয়ে থাকে। সৃষ্টির শুরুতে ব্রহ্মা এই ধারণা দিয়েই নিশ্চিত বুদ্ধি লাভ করেছিলেন এবং শ্রীহরিকে পরিতুষ্ট করে, প্রলয়কালে তাঁর যে সৃষ্টির স্মৃতি লোপ পেয়েছিল, তা আবার ফিরে পেয়েছিলেন। এই ভাবে অব্যর্থ সৃষ্টিশক্তির বলে তিনি পূর্বকল্পের মতোই এই বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন।

এই কারণে, বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা বুদ্ধি স্থির রেখে অর্থাৎ ভোগ্যবস্তুতে সুখের লেশমাত্র না রেখে, শুধু দেহধারণের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সংগ্রহে চেষ্টা করবেন এবং যদি ওই দ্রব্য অন্য কোনভাবে পাওয়া যায়, তাহলে অতিরিক্ত সংগ্রহের চেষ্টাকে পণ্ডশ্রম মনে করে, সে বিষয়ে বিরত থাকবেন। ভূমিশয্যা থাকতে অন্য শয্যার প্রয়োজন কী? স্বাভাবিক বাহু থাকতে উপাধানের কী দরকার? যখন অঞ্জলি আছে, তখন নানা ধরনের তৈজসপত্রের কী দরকার? দিক-বল্কল থাকতে পট্টবস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা পণ্ডশ্রম নয় কী? যারা নিজেদের ফলে অন্যের পুষ্টি সাধন করে, সেই বৃক্ষরাজি কী ফল ভিক্ষা দানে বিমুখ হয়েছে? নদীসমূহ কী শুকিয়ে গিয়েছে? সমস্ত গিরিগুহার মুখ কী বন্ধ হয়ে গিয়েছে? ভগবান অজিত কী শরণাগতদের রক্ষা করেন না? বিনা কষ্টে পাওয়া এই সমস্ত বস্ত্র, ভোজন, পান ইত্যাদি সুলভ থাকা সত্ত্বেও জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা কিসের জন্য ধনগর্বে অন্ধ ধনীদের ভজন করেন? অতএব শ্রী ভগবান জীবের মনে নিজেই প্রকাশিত আছেন, তিনিই জীবের ভজনার ধন, তিনিই নিত্য সত্য আত্মা, এবং প্রিয়তম বিষয়; সংসারে আসক্তি ত্যাগ করে তাঁর ভজনা করলে পরমানন্দ অনুভব হয় এবং সংসাররূপ অনর্থের মূল অবিদ্যা অর্থাৎ অজ্ঞান দূর হয়ে থাকে।

হে রাজন, এর আগে আপনাকে আমি বৈরাজ পুরুষের ধারণার কথা বলেছি। 

[বৈরাজ শব্দটির অর্থ ব্রহ্মসম্বন্ধীয়। আমাদের শাস্ত্রে ব্রহ্মকে বলা হয় ধারণাতীত, অবাঙ্মনসোগোচর - অর্থাৎ তাঁকে আমাদের মননে উপলব্ধি করা যায় না, কিংবা তাঁকে কথা দিয়েও বর্ণনা করা যায় না। তবুও তিনি যে আছেন সে সম্বন্ধে ধারণা করা যায়। তিনি এই বিশ্বের শুধু সৃষ্টিকর্তাই নন, তিনি বিশ্বের পালয়িতাও। তিনি একদিকে যেমন এই জগতের সমস্ত উদ্ভিদ, জীব ও জড় সৃষ্টি করেছেন, আবার তেমনই তাদের জীবন ধারণের জন্যে পরষ্পরের উপর নির্ভরশীল আশ্চর্য এক বাস্তুতন্ত্রও নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। আমাদের পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় দিয়ে আমরা তাঁর স্থূল অস্তিত্ব বুঝতে পারি না। কিন্তু আমাদের চারপাশে চোখ মেলে তাকালে তাঁর অমোঘ উপস্থিতি সর্বত্র টের পাওয়া যায়। এই ধারণাকেই "বৈরাজ পুরুষের ধারণা" বলা হয়েছে।]               

 

ঈশ্বরের মূর্তিধারণা

এখন ভগবানের শ্রীমূর্তির ধারণা বর্ণনা করছি শুনুন। কোন কোন ভক্ত হৃদয়ের আকাশে প্রাদেশ-প্রমাণ অর্থাৎ তর্জনী ও অঙ্গুষ্ঠের অগ্রভাগের ব্যবধান পরিমাপের চতুর্ভুজ পুরুষকে ধারণা করে থাকেন। তাঁর চারটি হাত শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্মে সুশোভিত, প্রসন্ন মুখ, আয়ত কমললোচন ও কদম্বকেশরের মতো পীতবর্ণ বসন। তাঁর বাহু মহারত্নখচিত সোনার অঙ্গদে কমনীয়, মাথায় উজ্জ্বল মহারত্নময় সোনার কিরীট, কানে সোনার কুণ্ডল নিরুপম শোভায় মণ্ডিত। যোগেশ্বরগণ তাঁদের হৃদয় কমল আসনে তাঁর পায়ের পল্লব স্থাপন করেন। তাঁর বুকে শ্রীবৎস চিহ্ন আঁকা, তাঁর গলায় সোনার সুতোর গ্রন্থিতে কৌস্তুভ মণি এবং অম্লানকান্তি বনমালা বিরাজিত। তিনি মেখলা, অঙ্গুরীয় ও নূপুর, কঙ্কণ ইত্যাদি ভূষণে বিভূষিত এবং তাঁর স্নিগ্ধ অমল কুঞ্চিত নীল কেশে কমনীয় মুখের হাসির আভায় ভুবন মুগ্ধ। তাঁর উদার লীলাময় হাস্য দৃষ্টিতে অনন্ত করুণার উদ্রেক।

হে মহারাজ, শ্রীহরির চরণযুগল থেকে শুরু করে হাস্য পর্যন্ত সকল অবয়ব ধ্যান করবেন, যে যে অঙ্গ অনায়াসে স্ফূরিত হবে, সেই অঙ্গ ত্যাগ করে অন্যান্য অঙ্গ ধ্যান করতে হবে। এইভাবেই মন থেকে চঞ্চলতা দূর হয়ে মন নির্মল হয়। শ্রীভগবান পরাবর; পর অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ ব্রহ্মা প্রমুখ এঁনার অবর অর্থাৎ কনিষ্ঠ। ইনি বিশ্বেশ্বর ও সর্বসাক্ষী; যতদিন পর্যন্ত এই ভগবানের প্রতি প্রেমভক্তির উদয় না হয়, ততদিন প্রত্যেকদিনের প্রয়োজনীয় কর্মের অনুষ্ঠান সেরে, নিষ্ঠা ভরে, এই পুরুষের স্থূলরূপ চিন্তা করবেন। আসন্নমৃত্যু ব্যক্তির যা কর্তব্য, আমি বর্ণনা করলাম। এখন ওই ব্যক্তি যদি নিজের দেহত্যাগের সঙ্কল্প করে থাকেন, তা হলে পুণ্যক্ষেত্র অথবা উত্তরায়ণ কালের দিকে মন না দিয়ে, স্থির ও সুখকর আসনে উপবেশন করে প্রাণায়ামে পঞ্চপ্রাণ জয় করবেন এবং মনে ইন্দ্রিয়দের সংযত করবেন। তারপর নিজের নির্মল বুদ্ধি দিয়ে মনকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেই বুদ্ধিকে ক্ষেত্রজ্ঞে লয় করবেন। যে আত্মা বুদ্ধি প্রভৃতিকে নিজের দৃশ্য বিষয় ও নিজেকে তাদের দ্রষ্টা বলে মনে করেন, সেই আত্মা কে ক্ষেত্রজ্ঞ বলে। ক্ষেত্রজ্ঞের শুদ্ধ স্বরূপ আছে, তাঁকে শুদ্ধ জীবাত্মা বলে। ক্ষেত্রজ্ঞ আত্মাকে শুদ্ধ জীবাত্মায় লয় করে, জীবকে ব্রহ্মে লয় করতে হয়। তারপর পরমা শান্তি লাভ করে, সকল কর্তব্য কর্ম থেকে বিরত থাকবেন, কারণ মুক্ত ব্যক্তির সকল কর্তব্যের অবসান হয়ে থাকে।

মহারাজ, যে দেবতারা জগৎ ও প্রাণীদের উপর আধিপত্য করে থাকেন, তাঁরাও কালের বশীভূত কিন্তু ওই কাল, যে ব্রহ্মস্বরূপের কথা আপনাকে বললাম, তার উপর আধিপত্য বিস্তারে সমর্থ নয়, সুতরাং দেবতারা কার উপর আধিপত্য করবে? শুদ্ধ ব্রহ্মস্বরূপে সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ, অহঙ্কার, বুদ্ধিতত্ত্ব বা প্রকৃতি কিছুই অবস্থান করতে পারে না। যিনি আত্মস্বরূপ লাভ করতে ইচ্ছা করেন, তিনি জগতের যাবতীয় বস্তুকে, “এতে আত্মা নেই, এতে আত্মা নেই” বলে পরিত্যাগ করেন এবং দেহকেই আত্মা বলে যে ভ্রান্ত জ্ঞান হয়েছিল, সেই জ্ঞানকেও ত্যাগ করেন, তারপর তিনি শ্রীবিষ্ণুর পরমপদ নিত্য আলিঙ্গন করেন। যদি তিনি দেহ ত্যাগ করে সদ্য মুক্তি পেতে চান, তাহলে, প্রথমে পাদমূল দিয়ে মূলাধার অর্থাৎ গুহ্যদ্বার নিরুদ্ধ করে, অক্লান্তভাবে প্রাণবায়ুকে ছটি স্থানের মধ্যে দিয়ে ঊর্ধে উন্নীত করবেন। প্রথমে নাভি অর্থাৎ মণিপূরচক্রে অবস্থিত প্রাণবায়ুকে হৃদয় অর্থাৎ অনাহতচক্রে তুলে এনে, উদান বায়ুর গতি অনুসরণ করে কণ্ঠের নীচে অবস্থিত বিশুদ্ধচক্রে তুলে আনবেন। পরে মনকে সংযত করে ওই বায়ুকে ধীরে ধীরে তালুমূলে অর্থাৎ বিশুদ্ধচক্রের আগে নিয়ে আসবেন। তারপর চোখ, কান, নাক ও মুখ এই সাতটি দ্বার রুদ্ধ করে প্রাণকে ভ্রূমধ্যে অবস্থিত আজ্ঞাচক্রে তুলে আনবেন। ভোগবাসনা যদি একান্তই ত্যাগ করে থাকেন, তাহলে অর্ধমূহুর্তকাল অপেক্ষা করে, ব্রহ্মরন্ধ্র ভেদ করে পরব্রহ্মে মিলিত হবেন এবং সেই মূহুর্তেই দেহ ও ইন্দ্রিয় সকল পরিত্যাগ করবেন।

হে রাজন, যোগেশ্বরগণের লিঙ্গশরীর বায়ুর থেকেও সূক্ষ্ম; তাঁরা লিঙ্গশরীরে ভূলোক, প্রেতলোক ও স্বর্গলোক এই ত্রিভুবনের মধ্যে অবস্থিত যে কোন লোকে অথবা এর বাইরে মহর্লোকে, এমনকি ব্রহ্মাণ্ডের বাইরেও যেতে পারেন। তাঁদের শক্তি অতুলনীয়, তাঁরা উপাসনা, তপস্যা, অষ্টাঙ্গযোগ ও সমাধিজ্ঞান দিয়ে যে শক্তিলাভ করেন, মানুষ সাধারণ কর্ম দিয়ে সেই শক্তি লাভের কল্পনাও করতে পারে না।


মহামুক্তি ও ঈশ্বর-লীন   

মহারাজ, সুষুম্না নামে একটি নাড়ী দেহস্থ সকল চক্র ভেদ করে সহস্রার পর্যন্ত গিয়েছে, তারপর সেই নাড়ী আকাশপথ পার হয়ে ব্রহ্মলোক পর্যন্ত বিস্তৃত আছে। যোগী ওই জ্যোতির্ময় ব্রহ্মপথ ধরে, প্রথমে অগ্নিলোকে উপস্থিত হন, সেখানে নির্মল হয়ে অর্থাৎ আসক্ত না হয়ে আরো উঁচুতে শিশুমারচক্র অর্থাৎ তারারূপ নারায়ণের অধিষ্ঠানভূমি লাভ করেন, অর্থাৎ সূর্য থেকে আরম্ভ করে ধ্রুবলোক পর্যন্ত যেতে পারেন। শ্রীবিষ্ণুর এই চক্র, বিশ্বের নাভি স্বরূপ, কারণ ওই জ্যোতিশ্চক্রই সূর্য ইত্যাদি নক্ষত্রের আশ্রয়স্থান। যোগী এই স্থান পার হয়ে নির্মল লিঙ্গশরীরে ব্রহ্মবিদদের বন্দনীয় মহর্লোকে যেতে পারবেন। এই স্থানে যাওয়ার সামর্থ স্বর্গবাসীদেরও নেই। এই স্থানে মহর্ষিরা কল্পান্তকাল পর্যন্ত মহানন্দে বাস করেন। ওই যোগী যদি ওই লোকে বাস করতে ইচ্ছা করেন, তাহলে এক কল্প কাল পর্যন্ত বাস করতে পারেন, পরে কল্পের অবসানে যখন অনন্ত ভগবানের মুখের আগুনে বিশ্ব দগ্ধ হতে থাকে, তখন সেই লোক পর্যন্ত সেই উত্তাপ অনুভব করা যায়। তখন তিনি দ্বিপরার্ধকাল স্থায়ী ব্রহ্মলোকে অর্থাৎ সত্যলোকে যেতে পারেন। এই লোকে শোক, জরা, মৃত্যু বা অন্য কোন বিষয়ে উদ্বেগের সম্ভাবনা থাকে না। সত্যলোকবাসিদের শুধুমাত্র মানসিক দুঃখের অনুভব থাকে। “সংসারী লোক শ্রীভগবানের ধ্যানপথ ভুলে এই মনোহর লোকে আসতে পারছে না এবং সংসারের দুঃখে পীড়িত হচ্ছে” এই চিন্তাই তাঁদের চিত্তে করুণার সৃষ্টি করে ও মানসিক ক্লেশ উৎপন্ন করে। তা না হলে অন্য কোন দুঃখ তাঁদের অনুভব হয় না।

হে মহারাজ, যাঁরা এই সত্যলোকে আসেন, তাঁদের তিন রকমের গতি আছে। যাঁরা উৎকৃষ্ট পুণ্যের বলে এই লোকে আসেন, তাঁরা অন্য কল্পে যাঁর যেমন পুণ্য, সেই পুণ্যের অধিকারী হয়ে জন্মগ্রহণ করেন। যাঁরা হিরণ্যগর্ভ নারায়ণের উপাসনাবলে এই লোক লাভ করেন, তাঁরা দ্বিপরার্ধকাল শেষ হলে ব্রহ্মার সঙ্গে মুক্তিলাভ করেন। আর যাঁরা ভগবানের ভক্ত, তাঁরা স্বেচ্ছায় ব্রহ্মাণ্ড ভেদ করে বৈষ্ণবপদ অর্থাৎ বিষ্ণুলোকে চলে যেতে পারেন। হে মহারাজ, তাঁদের ব্রহ্মাণ্ড ভেদ করার প্রক্রিয়া কিরকম, বলছি শুনুন।

ভগবানের ভক্ত প্রথমে লিঙ্গদেহকে পার্থিব অর্থাৎ পৃথিবীতত্ত্বে নির্মাণ করে, নির্ভয়ে ব্রহ্মাণ্ডের পার্থিব আবরণ ভেদ করেন। তারপর জলময় মূর্তিতে জলের আবরণ, অনলমূর্তিতে অগ্নিলোক, বায়ুমূর্তিতে বায়ুলোক, ও আকাশমূর্তিতে পরমাত্মার আকাশরূপ আবরণ ভেদ করে থাকেন। এই সকল আবরণ ভেদ করার সময়, তাঁরা ওই সকল লোক ভোগ করতে করতেই যান। যোগী ঘ্রাণ দিয়ে গন্ধ, জিহ্বা দিয়ে রস, দৃষ্টি দিয়ে রূপ, চর্ম দিয়ে স্পর্শ ও কান দিয়ে আকাশগুণ শব্দ উপভোগ করতে থাকেন এবং কর্ম ইন্দ্রিয় দিয়ে কাজও করতে থাকেন। এইভাবে তিনি স্থূল ও সূক্ষ্ম ভূত অতিক্রম করে তাদের আবরণস্বরূপ অহঙ্কারতত্ত্বে পৌঁছে যান। এই অহঙ্কারতত্ত্ব তিন প্রকারের, তামস, রাজস ও সাত্ত্বিক। তামস থেকে জড় সূক্ষ্ম ভূতসমূহ, রাজস থেকে বহির্মুখ দশ ইন্দ্রিয় এবং সাত্ত্বিক থেকে মন ও ইন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবতাদের সৃষ্টি হয়। এই তিন অহঙ্কারের সঙ্গে নিজের লিঙ্গদেহকে এক করে, তিনি বিজ্ঞানতত্ত্ব অর্থাৎ মহত্তত্ত্ব লাভ করেন। এই মহত্তত্ত্বের সঙ্গে নিজের লিঙ্গশরীরকে এক করে, তিনি নিখিল গুণের লয়স্থান প্রকৃতিতে পৌঁছে যান। তারপর প্রকৃতিরূপে আনন্দময় হয়ে সকল উপাধি অর্থাৎ দেহ পরিত্যাগ করে শান্ত ও পরমানন্দস্বরূপ অবিকৃত পরমাত্মাকে লাভ করেন। যিনি এই ভাগবতী গতি লাভ করতে পারেন, তাঁকে আর সংসারে ফিরে আসতে হয় না”

তারপর শ্রীশুকদেব বললেন, “মহারাজ, আপনার কাছে সদ্যমুক্তি ও ক্রমমুক্তি, দুটি পথের কথাই বর্ণনা করলাম। এই বর্ণনা আমার নিজের কল্পনা থেকে বানিয়ে বলা নয়এই দুই সনাতন পন্থা বেদেও বলা হয়েছে। আগে ভগবান বাসুদেব, ব্রহ্মার আরাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে, তাঁকে উপদেশ দিয়েছিলেন। সংসারবদ্ধ জীবের মুক্তির জন্য তপস্যা, যোগ ইত্যাদি নানান পথ আছে, কিন্তু এর মতো সুখকর ও নির্বিঘ্ন পথ আর দ্বিতীয় নেই। এই পথ অনুসরণ করলে, ভগবান বাসুদেবে ভক্তিযোগ উৎপন্ন হয়।

হে রাজন, যে বিষয় আমাদের পরিচিত অর্থাৎ যাকে আমরা আগেই অনুভব করেছি, সেই বিষয়েই আমাদের রতি হতে পারে। কিন্তু যে বিষয় কোনদিন আমাদের অনুভব হয় নি, সে বিষয়ে রতি হওয়া অসম্ভব। সুতরাং শ্রীহরি আগে আমাদের অনুভবে না এলে, কিভাবে তাঁর প্রতি রতি আসা সম্ভব এমন চিন্তা করবেন না। এর কারণ আপনাকে বুঝিয়ে বলছি, মন দিয়ে শুনুন।

আমাদের বুদ্ধি প্রভৃতি যা কিছু দেখা যায়, সবই জড়, তা হলে এই যে সব জড় পদার্থ রয়েছে, তার সাক্ষ্য কে দিচ্ছে? শ্রীহরিই একমাত্র দ্রষ্টা বা সাক্ষী; তিনিই সর্বভূতের অন্তর্যামীরূপে থেকে বুদ্ধি প্রভৃতিকে প্রকাশ করছেন। অতএব তিনি না থাকলে জড় বুদ্ধির প্রকাশ হত না, এই প্রমাণে আমরা আমরা শ্রীহরিকে অনুভব করতে পারছি। এছাড়া অন্য এক প্রমাণেও শ্রীভগবানের অস্তিত্ব অনুভব করা যায়। আমরা দেখতে পাই, কুঠার বা অন্য কোন যন্ত্র নিজে নিজে কোন কাজই করতে পারে না, তাদের ব্যবহারের জন্য অন্য একজন পৃথক কর্তার প্রয়োজন হয়। সেই রকম, আমাদের বুদ্ধি কিংবা অন্যান্য বৃত্তি যন্ত্র ভিন্ন আর কিছুই নয়, অথচ এরা সকলেই জড়। তাহলে কে এই বুদ্ধি নামক যন্ত্রটিকে ব্যবহার করে, জ্ঞান নামক কর্মটিকে সম্পন্ন করছেন? এই ভাবে অনুমানের প্রমাণ দিয়েও একজন স্বতন্ত্র কর্তা ঈশ্বর আছেন, এই অনুভব করা যায়। সাধুব্যক্তিরা শ্রীভগবানকে আত্মরূপে প্রকাশমান বলে সর্বদাই অনুভব করে থাকেন। যাঁরা এই ভগবানের কথামৃত শ্রবণরূপ ওষ্ঠ দিয়ে পান করেন, তাঁদের বিষয়ের স্পর্শে মলিন চিত্ত পবিত্র হয় এবং তাঁরা শ্রীভগবানের চরণপদ্মে অবস্থান করে থাকেন।


মানুষের কর্তব্য 

শ্রীশুকদেব বললেন, “হে মহারাজ, জীব বহু যোনিতে জন্ম নিতে নিতে দৈবযোগে মনুষ্যত্ব লাভ করেতাদের মধ্যে যাঁরা জ্ঞানী এবং জ্ঞানীদের মধ্যেও যাঁরা মুমুক্ষু অর্থাৎ মুক্তির ইচ্ছা করেন, তাঁদের কর্তব্য সম্বন্ধে আপনি যা প্রশ্ন করেছিলেন, তার উত্তরে শ্রীহরিকথা শোনা একটি অবশ্য কর্তব্য বলেই আমি উল্লেখ করলাম। যাঁদের মন্দবুদ্ধি তাঁরা নানা দেবতার ভজনা করেন। যিনি ব্রহ্মতেজ কামনা করেন, তিনি বেদপতি ব্রহ্মার উপাসনা করেন। এইভাবে, যাঁরা ইন্দ্রিয়ের দক্ষতা কামনা করেন তাঁরা ইন্দ্রের, সন্তান কামনায় দক্ষ ও অন্য প্রজাপতির, ঐশ্বর্যকামী শ্রীদুর্গার, তেজ কামনাকারী অগ্নির, ধনের প্রত্যাশীরা বসুগণের ও বীরত্বের কামনায় রুদ্রগণের উপাসনা করে থাকেন। যাঁরা অন্নের প্রার্থী তাঁরা অদিতির, স্বর্গ কামনায় দ্বাদশ আদিত্যের, সুষ্ঠু রাজ্যপরিচালনায় বিশ্বদেবগণের, কৃষি ও বাণিজ্যের কামনায় সাধ্যগণ, আয়ুর বাসনায় অশ্বিনীকুমারদ্বয়, পুষ্টির জন্যে পৃথিবীদেবী, প্রতিষ্ঠার কামনায় লোকমাতা দ্যাবাপৃথিবীর, রূপের সাধনায় গন্ধর্বগণের, স্ত্রীর কামনায় অপ্সরা উর্বশীর ভজনা করেন। সকলের উপর আধিপত্যকামী পরমেষ্ঠী ব্রহ্মার, যশ প্রার্থী যজ্ঞেশ্বের বিষ্ণুর, ধনসঞ্চয়ের জন্য প্রচেতার, বিদ্যার জন্য গিরীশের, দাম্পত্যসুখের কামনায় সতী উমাদেবীর, ধর্মের জন্য উত্তমশ্লোক বিষ্ণুর, বংশবিস্তারের জন্য পিতৃগণের, বিঘ্ন নিবৃত্তির জন্য যক্ষগণের উপাসনা করেন। রাজত্বের কামনায় মন্বন্তরের অধিপতি দেবগণের, শত্রুবিনাশের জন্য রাক্ষসগণের, ভোগের ইচ্ছায় সোমের এবং বৈরাগ্য কামনায় প্রকৃতির প্রকৃত অধিষ্ঠাতা ঈশ্বরের যজনা করেন।

কিন্তু যিনি উদারবুদ্ধি, একান্ত ভক্ত, তাঁর এই সকল কামনা থাকুক কিংবা না থাকুক, অথবা তাঁহার মোক্ষলাভের অভিলাষ থাকুক, তিনি তীব্র ভক্তিযোগে পরমেশ্বরের ভজনা করেন। হে রাজন, হরিকথা শুনতে শুনতে প্রথমে জ্ঞানের উদয় হয়, এই জ্ঞানে রাগ, দ্বেষ প্রভৃতি নিবৃত্ত হয়, এবং সকল বিষয়ে বৈরাগ্য জন্মায়। বৈরাগ্যের উদয়ে চিত্তে প্রসন্নতা আসে ও ভক্তিযোগের উদয় হয়, এই পন্থাকেই শাস্ত্রে কৈবল্য পথ বলা হয়ে থাকে” 

শ্রী শৌণক বললেন, “ভরতকুলতিলক রাজা পরীক্ষিৎ এইসব কথা শোনার পর বেদজ্ঞ ও পরমব্রহ্মদর্শী শুকদেবকে আর কী জিজ্ঞাসা করলেন, আমাদের শুনতে ইচ্ছা হয়। পাণ্ডুকুলতিলক পরীক্ষিৎ ও ব্যাসনন্দন শ্রী শুকদেব দুজনেই ভগবান বাসুদেব পরায়ণ। অতএব এই দুই সাধু ব্যক্তির উরুগায় অর্থাৎ মহাযশা ভগবানের গুণাবলীপূর্ণ মহৎ কথার প্রসঙ্গ নিশ্চয়ই হয়ে থাকবে। সূর্যদেব প্রত্যেকদিন উদিত ও অস্তমিত হয়ে মানুষের আয়ুক্ষয় করছেন, অতএব ভগবান বাসুদেবের পুণ্যকথা ছাড়া অন্য সকল প্রসঙ্গই বৃথা কালক্ষয় করে। তরুসমূহ কি জীবন ধারণ করে না? কর্মকারের ভস্ত্রা অর্থাৎ বায়ু সঞ্চালন যন্ত্র কি শ্বাসক্রিয়া করে না? গ্রামের অন্যান্য পশু কি ভোজন ও রতিক্রিয়ায় কাল হরণ করে না? অতএব কেবল জীবনধারণ, শ্বাসক্রিয়া, ভোজন ও মিথুন মানব জীবনের উদ্দেশ্য নয়। শ্রীকৃষ্ণের মধুরিমা যে মানুষের কানে পৌঁছায়নি, সে ব্যক্তি কুকুরের মতো অবজ্ঞার পাত্র, গ্রাম্য শূকরের মতো মলিন বিষয়ে আসক্ত, উটের মতো  বিষয়রূপ কষ্টকর কাঁটা চর্বণে ব্যস্ত এবং গাধার মতো অপরের ভার বৃথা বহন করে।

হে সূত, মানবের যে দুই কান শ্রীহরির গুণকথা না শোনে, সেই কান দুইটি ছিদ্র মাত্র। যে জিহ্বা ভগবানের মধুর চরিত্র কীর্তন না করে, সেই জিভ ব্যাঙের জিভের মতো। যে উত্তমাঙ্গ অর্থাৎ মাথা মুকুন্দের পায়ে অবনত না হয়, সেই মাথা মূল্যবান মুকুটে শোভিত হলেও বৃথা ভারের মতো। যে হাত ভগবানের সেবায় ব্যবহৃত হয় না, সেই হাত কঙ্কন-বলয় শোভিত হলেও, শবদেহের হাতের মতোই কুৎসিত। যে চোখ শ্রীহরির মূর্তি লক্ষ্য করেনা, সেই চোখ ময়ুরপুচ্ছের মতো, যে পা শ্রীহরি ক্ষেত্রে গিয়ে ধন্য হয় না, সেই পা গাছের শিকড়ের মতো। যে ব্যক্তি মুকুন্দের চরণধুলা মাথায় নেয়নি কিংবা তাঁর চরণের তুলসীপাতার গন্ধের ঘ্রাণ নেয়নি, সেই মানুষ জীবন্মৃত। যে হৃদয় শ্রীকৃষ্ণ নামে বিগলিত হয়ে আনন্দের অশ্রুধারা ও অঙ্গে পুলক সৃষ্টি না করে, সন্দেহ নেই, সেই হৃদয় পাথরের মতোই নিষ্প্রাণ।

হে সূত, অভক্তের সমস্তই ব্যর্থ হয়ে যায়। ভক্তচূড়ামণি ব্যাসনন্দন আর যা যা বলেছিলেন, আপনি আমাদের সবিস্তারে বর্ণনা করুন”

পরের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /৩ "


নতুন পোস্টগুলি

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ৯

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য " ...