বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /৪

  এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১




দ্বিতীয় স্কন্ধ - চতুর্থ পর্ব

শ্রী ব্রহ্মার পরমেশ্বরের পরিচয় বর্ণন

শ্রীব্রহ্মা বললেন, “বৎস নারদ, এখন এই বৈরাজ পুরুষ অর্থাৎ অনন্তরূপী ভগবানের বিভূতি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করি, শোন। এই পুরুষের মুখ বাক্যের ইন্দ্রিয় ও তার অধিষ্ঠাত্রী দেবতা বহ্নির, ত্বক ইত্যাদি সপ্তধাতু গায়ত্রী প্রমুখ সাত ছন্দের, জিভ হব্য অর্থাৎ দেবতাদের অন্ন, কব্য অর্থাৎ পিতৃগণের অন্ন, অমৃত অর্থাৎ মানুষের অন্ন ও ওই অন্নের মধুর ইত্যাদি ছয়টি রসের উৎপত্তির স্থান। ওই মহাপুরুষের নাক থেকে প্রাণসমূহ ও বায়ু, ঘ্রাণের ইন্দ্রিয়শক্তি থেকে অশ্বিনীকুমারদ্বয়, ওষধিসমূহ এবং সামান্য ও বিশেষ যত ধরনের গন্ধ আছে, সবই উৎপন্ন হয়েছে। এই পুরুষের চোখ থেকে রূপ ও তার প্রকাশক তেজের, নয়ন গোলক সুর্য ও স্বর্গলোকের, কর্ণ দিকসকল ও তীর্থসমূহের এবং শ্রবণ ইন্দ্রিয়শক্তি আকাশ ও শব্দের উৎপত্তিস্থানএঁনার গা থেকে নিখিল বিশ্বের সার অর্থাৎ শক্তি ও সৌন্দর্য এবং ত্বক থেকে স্পর্শ, বায়ু ও যজ্ঞসমূহ। বৃক্ষসমূহ ও যে সকল উদ্ভিজ্জ যজ্ঞের উপচার, সে সবই তাঁর রোমরাজি; তাঁর কেশ থেকে মেঘসমূহ, গোঁফদাড়ি থেকে বিদ্যুৎ এবং পা ও হাতের নখ থেকে শিলা ও লোহা।

যে সকল লোকপালগণ পালন করে থাকেন, তাঁরা সকলেই এই পুরুষের বাহু থেকে সৃষ্টি হয়েছেন। এই পুরুষের পদচারণায় ভূর্ভূবঃ স্বঃ - এই তিন লোকের আশ্রয় এবং শ্রীহরির চরণ কমল থেকেই প্রাপ্ত বস্তুর রক্ষা, ভয় থেকে উদ্ধার ও নিখিল কাম্য বস্তুর সিদ্ধিলাভ হয়। সলিল, শুক্র, সৃষ্টি, মেঘ ও প্রজাপতি এই পুরুষের শিশ্ন। হে নারদ, এঁর পায়ু অর্থাৎ গুহ্যদ্বার থেকে যম, মিত্র এবং গুহ্যেন্দ্রিয়শক্তি থেকে হিংসা, অলক্ষ্মী, নরক ও মৃত্যু সৃষ্টি হয়েছে। এই মহাপুরুষের পৃষ্ঠভাগ পরাভব, অধর্ম ও অজ্ঞানের; নাড়ী নদ ও নদীসমূহের এবং অস্থিসংস্থান পর্বতসমূহের উৎপত্তিস্থান। জ্ঞানীরা বলেন, প্রকৃতি, অন্নশস্যের সারাংশ, সকল সমুদ্র ও সকল প্রাণির লয় এই পুরুষের উদরে এবং মানুষের লিঙ্গশরীর এঁনার হৃদয়ে নিষ্পন্ন হয়ে থাকে।

বৎস নারদ, তুমি ও সনক প্রমুখ কুমারগণ, শ্রীরুদ্র, বুদ্ধি ও চিত্ত এই পরম পুরুষের অন্তঃকরণ থেকে উৎপন্ন হয়েছে। সোনা থেকে বানিয়ে তোলা কুণ্ডল যেমন সোনা ছাড়া কিছুই নয়, তেমনই পরমেশ্বর থেকে সৃষ্টি হওয়া এই বিশ্ব তাঁর থেকে আলাদা নয়। অতএব, আমি, তুমি, ভব, তোমার অগ্রজ সনককুমারেরা এবং এই সমস্ত মরীচি প্রমুখ মহর্ষি, সুর, অসুর, নর, নাগ, বিহঙ্গ, মৃগ, সরীসৃপ, গন্ধর্ব, অপ্সরা, যক্ষ, রক্ষ, ভূত, গণ, উরগ, পশু, পিতৃগণ, সিদ্ধ, বিদ্যাধর, চারণ, বৃক্ষ ও জল, স্থল, আকাশে বিচরণশীল যাবতীয় জীব, গ্রহ, নক্ষত্র, ধূমকেতু, তারা, তড়িৎ ও মেঘ এবং ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমান যাবতীয় বস্তু ও বিষয় এই পরম পুরুষ থেকে ভিন্ন নয়। তিনি এই অনন্ত বিশ্বকে আবৃত করে অবস্থান করছেন, এমনকি এই বিশ্ব অতিক্রম করেও তিনি বিরাজ করছেন – অর্থাৎ এই বিশ্বের থেকেও বৃহত্তর স্বরূপে তিনি বিরাজিত”

শ্রীব্রহ্মা বললেন, “নারদ, শ্রীভগবান ব্রহ্মাণ্ডের আত্মা হয়েও নিত্যমুক্ত থাকেন। কারণ তিনি মরণশীল কর্মফলের অতীত হয়ে, অভয় ও আনন্দ স্বরূপে বিরাজ করছেন। তাঁর অচিন্ত্য অপার মহিমা, কেউ নির্দিষ্ট করতে পারে না। ভূর্লোক, ভূবর্লোক ও স্বর্লোক – এই তিন ভুবনের মধ্যে জীব যে সুখ ভোগ করে, সেই সুখ নশ্বর। এর উপরে আছে মহর্লোক, কিন্তু সেখানেও সুখ চিরস্থায়ি নয়, কারণ কল্পের অবসান কালে, সংকর্ষণের মুখের আগুনে তিনলোক যখন দগ্ধ হয়, তখন সেই তাপ মহর্লোক বাসী ঋষিদেরও উত্তপ্ত করে তোলে। এই কারণে ভৃগু প্রমুখ মহর্ষিরা মহর্লোক ত্যাগ করে, তারও উপরে অবস্থিত জনলোকে আশ্রয় নেন। এই জনলোক অমৃত অর্থাৎ অবিনাশী সুখের স্থান হলেও ক্ষেম অর্থাৎ অবিচ্ছিন্ন মঙ্গলের স্থান নয়; কারণ কল্পান্তে তাঁদেরও মহর্লোক থেকে আসা তাপিত জীবকে দেখতে হয়। জনলোকের ঊর্ধে তপোলোক ক্ষেম অর্থাৎ অবিচ্ছিন্ন মঙ্গলের জায়গা হলেও, ওই লোক অভয় স্থান নয়। তপোলোকের ঊর্ধে একমাত্র সত্যলোকই অভয় অর্থাৎ মোক্ষভূমি।

যাঁরা ব্রহ্মচর্য ব্রতে নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী, বনস্থ যতি অর্থাৎ ভিক্ষুকাশ্রমী, তাঁদের অপ্রজ বলে, কারণ তাঁরা প্রজা অর্থাৎ সন্তান উৎপন্ন করেন না। অপ্রজ ঋষিরা ত্রিলোকের অতীত স্থানসমূহে বাস করে থাকেনকিন্তু যাঁরা ব্রহ্মচর্য ব্রত পালন না করে, গৃহস্থ আশ্রম পালন করেন, ত্রিলোকী তাঁদের বাসস্থান। একই আত্মার অবস্থা অনুযায়ী, এই প্রকার আলাদা আলাদা অধিকার লাভ হয়। মার্গ দুই রকমের; কর্ম অবিদ্যামার্গ এবং ভগবানের উপাসনা বিদ্যামার্গ। যে সকল ক্ষেত্রজ্ঞ অর্থাৎ জীব অবিদ্যামার্গ অবলম্বন করেন, তাঁরা নানা রকম বিষয়সুখ ভোগ করে। কিন্তু যাঁরা বিদ্যামার্গ আশ্রয় করেন, তাঁরা অপবর্গ অর্থাৎ মুক্তিলাভ করেন।

বৎস নারদ, ব্রহ্মাণ্ডে অবস্থিত জীবসমূহের নানান ফল বৈচিত্র তোমাকে বর্ণনা করলাম, এখন বৈলক্ষণ্য বলছি, শোন। যে ঈশ্বর থেকে প্রথমতঃ প্রকৃতি সংক্ষুব্ধ হয়ে সোনার আকারের অণ্ড ও পরে নানা উপাদানে বিভক্ত হয়ে বিরাট দেহরূপে প্রকাশ হয়, সেই ঈশ্বর ঐ অণ্ড ও দেহের অতীত। যেমন সৌরমণ্ডলের অধিষ্ঠাতা দেব সূর্য নিজের কিরণে বিশ্ব উদ্ভাসিত করলেও, নিজের মণ্ডলের বাইরে অতীত অবস্থায় অবস্থান করেন, তেমন ঈশ্বরও ঐ অণ্ড ও ভূত, ইন্দ্রিয় ও গুণরূপে বিচিত্র বিরাট দেহের অতীত অবস্থায় নিরন্তর বিরাজ করছেন।

হে পুত্র, যখন আমি এই মহাপুরুষের নাভিকমল থেকে উৎপন্ন হয়েছিলাম, সেই কালে এই বিরাটদেহের অন্তর্যামী পুরুষের অবয়ব ছাড়া যজ্ঞ সাধনের কোন সামগ্রীই না পেয়ে, তাঁর অবয়ব থেকেই যজ্ঞের যাবতীয় সামগ্রী, উপচার, আচার, অনুষ্ঠান, বেদ ও স্বাহা মন্ত্র সংগ্রহ করেছিলাম। এই বিশ্ব ভগবান নারায়ণে প্রতিষ্ঠিত আছে। আমি তাঁর আজ্ঞায় সৃষ্টি করে থাকি এবং হর তাঁর আদেশেই সংহার লীলা করে থাকেন। ভগবান নিজে শ্রীবিষ্ণুরূপে মায়ার অধীশ্বর হয়ে নিখিল বিশ্বের প্রতিপালন করে থাকেন। আমি স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা নই, আমার যা কিছু শক্তি, সমস্তই শ্রীহরির করুণাপ্রভাবে। আমি বেদময়, তপোময় ও প্রজাপতিদের বন্দনীয় প্রভু হয়েও এবং নিপুণ যোগ সমাধিতে অবস্থান করেও, আমার প্রভুর তত্ত্ব জানতে পারিনি। আকাশ যেমন নিজের সীমা নিজে নির্দিষ্ট করতে পারে না, তেমনি ভগবানও নিজের তাঁর মায়ার ইয়ত্তা করতে পারেন না; সুতরাং অন্য কেউ তাঁর মায়ার প্রভাব কিভাবে আন্দাজ করতে পারবে?  তিনি নিজের মায়ার সীমা নির্দিষ্ট করতে পারেন না বলে, তাঁকে অসর্বজ্ঞ মনে কোর না। কারণ যে বস্তু অনন্ত, তাকে অনন্ত বলে মনে করলে সর্বজ্ঞতায় কোন হানি হয় না। কেউ আকাশকুসুম না জানলে, তার বিজ্ঞতার কোন হানি হয় কী?

ভগবানের যে তত্ত্ব আমরা সম্যক উপলব্ধি করতে পারি না, তার কিছু আভাস দিচ্ছি শোন। তিনি সত্যস্বরূপ অর্থাৎ একমাত্র তাঁরই অস্তিত্ব আছে, বাকি কারো প্রকৃত অস্তিত্ব নেই। যখন সেই অস্তিত্বের জ্ঞান হয়, তখন সেই জ্ঞান ঘট ও পটের জ্ঞানের মতো বিচ্ছিন্ন বা খণ্ডিত হয় না; ওই জ্ঞানকে বিশুদ্ধ ও কেবলজ্ঞান বলে। আমরা অন্যান্য বস্তুর জন্ম-মরণ, বিকার দেখে থাকি, কিন্তু তিনি জন্ম ও বিনাশ রহিত হওয়ায় নির্বিকার স্বরূপে বিরাজিত। তিনি নিখিল বিশ্বে পূর্ণরূপে বিরাজ করছেন, অতএব তাঁর ক্ষয় বা বৃদ্ধি সম্ভব নয়। সবার উপরে তাঁর অচিন্ত্য মহিমা এই যে, সৃষ্টিকালে যখন তাঁকে দ্বৈতসত্ত্বারূপে মনে হচ্ছে, তখনও তিনি অদ্বয়স্বরূপেই বিরাজ করছিলেন।

বৎস নারদ, যখন দেহ, ইন্দ্রিয় ও মন প্রসন্ন ভাব আয়ত্ত্ব করে, তখনই মুনিরা এই পরমতত্ত্ব উপলব্ধি করতে পারেন। যখন অসজ্জনের কুতর্কজালে বুদ্ধি আচ্ছন্ন হয়, তখন তিনি অন্তর্হিত হন। আগে সহস্রশীর্ষা পুরুষ বলে যাঁর কথা তোমাকে বললাম, তিনি ভূমা ভগবানের আদ্য অবতার। ইনিই প্রকৃতির প্রবর্তক। যদিও সকল পদার্থই ভগবানের অংশ, তাও তারা ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত হয়। কাল, স্বভাব এবং কার্য ও কারণের সমষ্টি স্বরূপা প্রকৃতি ভগবানের শক্তি। মহত্তত্ত্ব, অহঙ্কারতত্ত্ব, সত্ত্ব ইত্যাদি গুণ, পঞ্চ মহাভূত, ইন্দ্রিয়সমূহ, সমস্ত স্থাবর ও জঙ্গম পদার্থ, বিরাট সমষ্টি শরীর ও স্বরাট অর্থাৎ সমষ্টি জীব, ভগবানের কার্য। আমি ব্রহ্মা, শ্রীরুদ্র ও শ্রীবিষ্ণু তাঁর গুণাবতার। এই নিখিল বিশ্বে যা কিছু সাকার, নিরাকার ও অদ্ভূত বর্ণ বিষয় এবং পদার্থ, সেই সবই ভগবানের বিভূতি। হে পুত্র, শ্রীভগবানের যে সমস্ত অবতারকে ঋষিরা প্রধানতঃ লীলাবতার বলেন, যাঁদের চরিত্রকথা শুনলে কানের এবং মনের মলিনতা দূর হয়, সেই মধুর লীলাময় অবতারগণের চরিত্র অতিসংক্ষেপে কীর্তন করছি। এই অমৃত পান করে আত্মাকে তৃপ্ত করো”


 শ্রীব্রহ্মার বিষ্ণুর অবতারত্বের মহিমা বর্ণন

শ্রীব্রহ্মা বললেন, “এই অনন্ত ভগবান যখন যজ্ঞের উপকরণ থেকে নিজের অবয়বকে বরাহমূর্তিরূপে, পৃথিবীর উদ্ধারে উদ্যত হয়েছিলেন, সেই সময় আদি দৈত্য হিরণ্যাক্ষ সমুদ্র থেকে উঠে ভগবানকে আক্রমণ করেছিলেন। দেবরাজ ইন্দ্র যেমন বজ্র দিয়ে পর্বত বিদীর্ণ করে থাকেন, তেমনই তাঁর দাঁতের আঘাতে তিনি দৈত্য হিরণ্যাক্ষর বক্ষ বিদীর্ণ করেছিলেন। তারপর প্রজাপতি রুচির ঔরসে ও আকুতির গর্ভে সুযজ্ঞ নামে আবির্ভূত হয়ে নিজের ভার্যা দক্ষিণাদেবীর গর্ভে  সুষম নামক দেবগণকে সৃষ্টি করেছিলেন। তিনিই পরে দেবরাজ ইন্দ্র হয়ে ত্রিভুবনের সকল উপদ্রব হরণ করেছিলেন। এই কারণে, তাঁর মাতামহ স্বায়ম্ভূব মনু, তাঁকে পরে “হরি” নাম দিয়েছিলেন। তারপর তিনি প্রজাপতি কর্দমের ঔরসে দেবহূতির গর্ভে নয় ভগিনীর সঙ্গে কপিল নামে জন্ম নিয়েছিলেনতিনি নিজের মাতাকে ব্রহ্ম উপদেশ দিয়েছিলেন এবং ওই ব্রহ্মবিদ্যার প্রভাবে, মাতা দেবহূতি আত্মমলিনতা ত্যাগ করে, কপিলগতি অর্থাৎ মুক্তি লাভ করেছিলেন।

তার আগে, মহর্ষি অত্রির আরাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে, ভগবান তাঁকে বর দিয়ে বলেছিলেন, তোমাকে অন্য আর কী বর দেব, আমি তোমাকে আমাকেই দান করলাম। এই বলে তিনি মহর্ষির পুত্রের ইচ্ছা পূর্ণ করার জন্য তাঁর গৃহে পুত্র হয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তিনি নিজেই নিজেকে দান করেছিলেন, তাই তিনি দত্ত অর্থাৎ দত্তাত্রেয় নাম নিয়েছিলেন। যদু, হৈহয় প্রভৃতি রাজগণ ঋষি দত্তাত্রেয়র কাছে ব্রহ্মতত্ত্ব উপলব্ধি করে মোক্ষলাভ করেছিলেন। আমি বিবিধ লোক সৃষ্টির ইচ্ছায় ভগবানের তপস্যা করায়, তিনি চার কুমার, সনক, সনন্দন, সনাতন ও সনৎকুমার রূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ওই চার কুমারের আত্মবিদ্যার উপদেশে মুনিরা নিজেদের অন্তরে সেই তত্ত্ব সাক্ষাৎ করেছিলেন, পূর্বকল্পের প্রলয়ে এই আত্মবিদ্যা ও গুরু পরম্পরা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল, তিনি চারকুমারের রূপে সেই বিদ্যা ও প্রথা আবার শুরু করলেন।

তারপর তিনি প্রজাপতি ধর্মের ঔরসে ও দক্ষ কন্যা মূর্তিদেবীর গর্ভে নারায়ণ ও নর এই দ্বিমূর্তিতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। অনঙ্গের সেনারূপিনী অপ্সরাগণ, এঁদের তপস্যা ভাঙতে এসেছিল। কিন্তু কোন নিয়মের ব্যতিক্রম দেখতে না পেয়ে খুব ভয় পেয়েছিল, ঋষিরা যদি অভিশাপ দেন। শ্রীরুদ্র রোষদৃষ্টিতে কামদেবকে ভস্ম করে দিয়েছিলেন, কিন্তু যে ক্রোধ নিজের হৃদয়কে পুড়িয়েছিল, সেই ক্রোধকে তিনি দগ্ধ করতে পারেননি। যেখানে ক্রোধজয়ী নারায়ণের হৃদয়ে ক্রোধই ঢুকতে ভয় পায়, সেখানে কাম কী করে আশ্রয় পাবে?

[শ্রীরুদ্র অর্থাৎ ভগবান শিব যে ক্রোধকে সংযম করতে পারেননি, সেই বিষয়টি নিয়ে শ্রীব্রহ্মা হাল্কা করে একটু খোঁচা দিয়ে বললেন, শ্রীবিষ্ণুর অবতার নর ও নারায়ণ কিন্তু ক্রোধ এবং কাম সংযম করে স্বর্গের অপ্সরাদের নাকাল করেছিলেন, কিন্তু তাঁদের ভস্ম করে দেননি।]    

পিতা উত্তানপাদের সামনে জননীর সপত্নী সুরুচিদেবীর কটুবাক্যে বালক ধ্রুব তপস্যা করতে বনে গিয়েছিলেন, ভগবান তাঁর স্তবে প্রসন্ন হয়ে তাঁকে নিত্য ধ্রুবলোক প্রদান করেছিলেন। ঊর্ধতন ভৃগু প্রমুখ ঋষি ও অধস্তন সপ্তর্ষিগণ এই ধ্রুবলোকের মহিমা কীর্তন করে থাকেন। ব্রাহ্মণদের অভিশাপে কুপথগামী রাজা বেণের পৌরুষ ও ঐশ্বর্য দগ্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং তিনি নরকে পতিত হয়েছিলেন। সেই সময়ে ঋষিদের প্রার্থনায় ভগবান, রাজা বেণের পুত্র রূপে জন্ম নিয়ে পৃথু নাম নিয়েছিলেন। মহারাজ পৃথু রাজা বেণকে পুন্নামক নরক থেকে রক্ষা করেছিলেন এবং জগতের পালনের জন্যে পৃথিবীকে দোহন করে প্রচুর অন্ন ও শস্য উৎপন্ন করেছিলেন। তারপর নাভির ঔরসে ও সুদেবী অর্থাৎ মেরুদেবীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করে ঋষভ নাম নিয়ে জড়যোগ ও নিত্যসমাধিযোগ আশ্রয় করেছিলেন। তিনি মুক্তসঙ্গ হওয়ায়, তাঁর ইন্দ্রিয়সমূহ প্রশান্তভাব ধারণ করেছিল এবং স্বরূপে অবস্থানের কারণে তাঁর সর্বত্র সমদর্শন হয়েছিল। ঋষিগণ এই পদকে পরমহংসগণের বরণীয় পদ বলে বর্ণনা করে থাকেন।

[এই কুপথগামী রাজা বেণ এবং তাঁর দেহজাত পুত্র পৃথুর জন্মের অলৌকিক কাহিনীকে বাস্তবমুখী পুনর্নির্মাণ করেছি "এক যে ছিলেন রাজা" উপন্যাসে - এই ব্লগেই ধারাবাহিক উপন্যাসটি পড়ে নিতে পারেন এই লিংক থেকে - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "]       

বৎস নারদ, একবার আমার এক যজ্ঞের অনুষ্ঠানে, ভগবান হয়গ্রীবরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং নিশ্বাসের সঙ্গে নিজের নাসিকাছিদ্র দিয়ে বেদের বাণী প্রকাশ করেছিলেন। সেই সময়ে অখিল দেবতার আত্মা শ্রীহরির সোনার বরণ অঙ্গ বেদময় এবং কর্মকাণ্ডময় হয়েছিল। যুগের অন্তিমকালে তিনি মৎস্যমূর্তি ধারণ করে পৃথিবী ও নিখিল জীবের আশ্রয় হয়েছিলেন। বৈবস্বত মনু তাঁর এই রূপ উপলব্ধি করেছিলেন। মহাভয়ংকর প্রলয়ের সময়, আমার মুখ থেকে বেদসমূহ স্খলিত হওয়ায়, ভগবান সেই বেদরাশি উদ্ধার করে, অনন্ত যুগান্তসলিলে মহানন্দে বিহার করেছিলেন। অমর ও দানবগণ অমৃত লাভের জন্য একবার ক্ষীরোদ সমুদ্র মন্থন করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আদিদেব শ্রীহরি কূর্মমূর্তি ধারণ করে, মন্থনদণ্ডরূপ মন্দারগিরিকে নিজের পিঠে ধারণ করেছিলেন। দেবতাগণের ভয়হারী ভগবান, কুটিল ভ্রূ ও ভয়ংকর দাঁতযুক্ত বদনে অট্টহাস্যময় ভয়ংকর নৃসিংহ মূর্তি ধারণ করেছিলেন। নিজের উরুতে রেখে, নৃসিংহদেব অত্যাচারী দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপুকে তাঁর নখের আঘাতে হত্যা করেছিলেন।

চলবে...


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /৪

  এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ "  এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ " এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ...