ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "
ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১ "
ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "
ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "
"ধর্মাধর্ম" গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -
গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২
(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)
অথবা
+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।
[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "]
পঞ্চম পর্ব /পর্বাংশ - ২
৫.১.৩ বৈশেষিক সিদ্ধান্ত বা দর্শন
ঋষি কণাদ এই দর্শনের প্রবর্তক। ঋষি কণাদের আবির্ভাবকাল ২০০ বি.সি.ই-র
কাছাকাছি কোন সময়ে। কপিল মুনি যেমন তাঁর সাংখ্য দর্শনে প্রকৃতি ও পুরুষকে নিত্য
স্বীকার করেছেন,
কণাদ নটি
পদার্থকে নিত্য বলে সাব্যস্ত করেছেন, যেমন পৃথিবী বা মাটি, জল, বায়ু, তেজ, আকাশ, কাল, দিক, আত্মা ও মন। ঋষি কণাদ এগুলিকে
নিত্য দ্রব্য-পদার্থ বলেছেন। এদের মধ্যে জল, বায়ু, মৃত্তিকা, তেজ - এই চার জড় পদার্থের
শুধুমাত্র পরমাণুগুলিই নিত্য, কিন্তু পরমাণু-সমষ্টি নিত্য নাও হতে পারে। যেমন মাটি এবং
মাটির পরমাণু নিত্যদ্রব্য হলেও, মাটি থেকে বানানো কলসি নিত্যদ্রব্য নয়।
কণাদ বলছেন, পরমাণুই সৎ-স্বরূপ নিত্য পদার্থ, তার আর কোন কারণ নেই। আমরা চোখের
সামনে যা কিছু দেখতে পাই, সবই এই জড় পদার্থ থেকেই সৃষ্টি হয়েছে, গাছ-পালা, লতা, গুল্ম, ঘটিবাটি, হাতা-খুন্তি, এমনকি যাবতীয় জীবজগৎ।
কিন্তু তাদের আকার বিভিন্ন বলেই আমাদের মনে হয় তারাও বিভিন্ন। কিন্তু অবিভাজ্য
পরমাণু এতই ক্ষুদ্র, তাকে
তো চোখে দেখা যায় না। তাহলে কী করে মাটি, জল, বায়ু ও তেজের পরমাণুকে আলাদা করে বোঝা যাবে? কী করেই বা বোঝা যাবে
তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য? ঋষি কণাদ এখানে বললেন, এই দ্রব্যপদার্থগুলির পরমাণুতে
“বিশেষ” নামের আরেকটি পদার্থ আছে, যার থেকে পরমাণুগুলির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। তিনি
বললেন, অদৃষ্ট (অদৃশ্য) এই বিশেষ
গুণময় পরমাণুদের সংযোগেই বিশ্বসংসারের সৃষ্টি হয়ে থাকে। “বিশেষ” এই পদার্থের
কারণেই এই দর্শনের নাম বৈশেষিক দর্শন।
এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভাল, ঋষি কণাদের পরমাণু তত্ত্ব কোনভাবেই আধুনিক পদার্থ বা রসায়ন
বিজ্ঞানের অণু-পরমাণুর যে ধারণা, তার সমগোত্রীয় নয়। ঋষি কণাদের পরমাণু চারটি
দ্রব্য-পদার্থের অবিভাজ্য ক্ষুদ্রতম কণা, তার বেশী কিছু নয়। উদাহরণে বলা যায় – জলকে তিনি নিত্য
দ্রব্য বলেছেন,
কিন্তু আমরা
জানি জল হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের একটি যৌগ, অর্থাৎ আধুনিক বিজ্ঞানের পরমাণুর
সঙ্গে, ঋষি কণাদের পরমাণুর কোন
সম্পর্কই থাকতে পারে না। ঋষি কণাদের
পরমাণু ধারণার স্বপক্ষে ছান্দোগ্য উপনিষদের ষষ্ঠ অধ্যায়ের দ্বাদশ খণ্ডের দুটি
শ্লোকের উল্লেখ করব। পিতা আরুণি ও পুত্র শ্বেতকেতুর কথোপকথন নিয়ে এই দুটি খণ্ড
রচিত।
(পিতা) – “এই (সুবিশাল বট) বৃক্ষ থেকে একটি বট ফল আহরণ কর”।
(পুত্র) – “এই যে, ভগবন্”। (পিতা) –
“ভাঙো”।
(পুত্র) – “ভগবন্, ভাঙা হয়েছে”। (পিতা) – “এতে কি দেখছ”?
(পুত্র) – “অণুর মতো বীজসমূহ”।
(পিতা) – “এদের একটিকে ভাঙো”।
(পুত্র) - “ভগবন্, ভাঙা হয়েছে”। (পিতা) –
“এতে কি দেখছ”?
(পুত্র) – “কিছুই না, ভগবন্”। (ছান্দোগ্য/৬/১২/১)
(পিতা) তাঁকে বললেন, “হে সৌম্য, বীজের এই যে সূক্ষ্মাংশটি দেখতে পাচ্ছ না, সেই সূক্ষ্মাংশ থেকেই
উৎপন্ন হয়ে এই মহাবট বৃক্ষটি তোমার সামনে বিদ্যমান রয়েছে। হে সৌম্য, শ্রদ্ধা অবলম্বন কর”।
(ছান্দোগ্য/৬/১২/২) [অনুবাদ – লেখক]
ঋষি কণাদ এই তত্ত্বে সিদ্ধান্ত দিলেন, অপসর্পণ ও উপসর্পণ, খাওয়া-দাওয়া, চলা-ফেরা – জীবের যাবতীয়
কর্মের কারণ কোন না কোন দ্রব্যপদার্থের পরমাণু এবং তার বিশেষ দ্রব্য – যাকে চোখে
দেখতে পাওয়া যায় না। “অপসর্পণ” মানে মৃত্যুর পর দেহ ছেড়ে মন বা আত্মা-র বাইরে চলে
যাওয়া এবং “উপসর্পণ” মানে অন্য দেহে মনের প্রবেশ। এভাবেই অগ্নির ঊর্ধমুখী শিখা, বায়ুর তির্যকগতি, মেঘ, বিদ্যুৎ, বজ্রপাত, ভূমিকম্প, বৃষ্টি, ঝড়-ঝঞ্ঝা, উদ্ভিদের দেহে রসের
সঞ্চার, জীবের জীবন ও মৃত্যু –
অর্থাৎ জগতের সবকিছুই, চোখে
দেখা যায় না এমন কিছু পরমাণু এবং বিশেষ দ্রব্যের নির্দিষ্ট সংযোগ।
আশ্চর্যের বিষয় হল, মহর্ষি কণাদও কিন্তু তাঁর এই বৈশেষিক তত্ত্বে সরাসরি কোন
ঈশ্বরের প্রস্তাব দিলেন না। এই তত্ত্বের কোথাও তিনি ঈশ্বরের হস্তক্ষেপের কথা
উল্লেখ করলেন না। অতএব তাঁর তত্ত্বকেও “নাস্তিক” তত্ত্ব বলাই যায়। কিন্তু তাঁর
তত্ত্বের পরবর্তী ব্যাখ্যাকাররা এই অদৃষ্ট-বিশেষ দ্রব্যের ব্যাখ্যাতে জীবাত্মা এবং
পরমাত্মা এনে ফেলে, এই
তত্ত্বকে আস্তিক তত্ত্ব বানিয়ে তুলেছিলেন।
ভারতীয় দর্শন মানেই ধর্মতত্ত্ব এবং জীব, বিশেষ করে মানবের মঙ্গল সাধন।
অতএব ঋষি কণাদ ধর্মের বিষয়ে বললেন, দু প্রকারের ধর্ম হয়, অভ্যুদয় এবং নিঃশ্রেয়স। অভ্যুদয়
মানে সমৃদ্ধির ইষ্টসাধন এবং নিঃশ্রেয়স মানে স্বর্গলাভ এবং সংসারের যাবতীয়
দুঃখ-কষ্টের নিবৃত্তি – এক কথায় মুক্তি। মুক্তি হলে শরীরের সঙ্গে মন বা আত্মার
সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। ঋষি কণাদ মুক্তির উপায় সম্পর্কে বললেন, আত্ম-কর্ম সম্পন্ন হলেই
মুক্তি লাভ হয়। এই আত্ম-কর্ম কী?
বৈশেষিক তত্ত্বে সাতটি পদার্থের উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন দ্রব্য, গুণ, কর্ম, সামান্য, বিশেষ, সমবায় এবং অভাব। প্রথম
পদার্থ দ্রব্যের কথা আগেই বলেছি। এখন অন্য পদার্থগুলি কী, সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক।
গুণ পদার্থ চব্বিশটি – রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ, সংখ্যা, পরিমাণ, পৃথকত্ব, সংযোগ, বিয়োগ, পরত্ব, অপরত্ব, বুদ্ধি, সুখ, দুঃখ, ইচ্ছা, দ্বেষ ও প্রযত্ন। ঋষি কণাদ এই সতেরটি পদার্থর উল্লেখ
করেছিলেন। পরবর্তী টীকাকারগণ তার সঙ্গে আরও সাতটি যোগ করেছেন, শব্দ, গুরুত্ব, দ্রবত্ব, স্নেহ, সংস্কার, পাপ ও পুণ্য।
কর্ম পদার্থ পাঁচটি – উৎক্ষেপণ, অবক্ষেপণ, আকুঞ্চন, প্রসারণ ও গমন।
সামান্যপদার্থ –বস্তু বা জীবের জাতিগত ধর্ম অর্থাৎ তাদের সাধারণ ধর্মকে
সামান্য ধর্ম বলে । যেমন ধাতুর ধর্ম তার ধাতব বৈশিষ্ট্য, গরুর বা বাঘের ধর্ম তাদের নিজস্ব
বৈশিষ্ট্য।
বিশেষ পদার্থ – বিশেষ পদার্থের কথাও আগেই বলেছি।
সমবায় পদার্থ – সম্বন্ধ-বিশেষের নাম সমবায়। যেমন ঘটের সঙ্গে মাটির
সম্বন্ধ,
বস্ত্রের
সঙ্গে সুতোর সম্বন্ধ কিংবা কর্তার সঙ্গে কর্মের সম্বন্ধ।
অভাব পদার্থ – অভাবের অর্থ কোন কিছুর অস্তিত্ব না থাকা। এই অভাবও চার প্রকারের। যেমন প্রথমতঃ প্রাগভাব
(প্রাক্+অভাব) –কোন বস্তু সৃষ্টি হওয়ার আগে যে অবস্থা থাকে, যেমন মাটি আছে কিন্তু ঘট
বানানো হয়নি। অতএব ঘট এখানে প্রাগভাব পদার্থ। দ্বিতীয়তঃ ধ্বংসাভাব – কোন বস্তু
নষ্ট হলে বা মৃত্যু হলে যে অভাব হয়, যেমন ঘট বানানোর পর ভেঙে গেল, ঘট এখানে ধ্বংসাভাব পদার্থ।
তৃতীয়তঃ ভেদাভাব – দুই বস্তুর মধ্যে প্রভেদ বোঝা যায় – যেমন মাটি দিয়ে তৈরি ঘট এবং
মাটির বাড়ির মধ্যে ভেদ-অভাব পদার্থ লক্ষ্য করা যায়, যদিও দুটিই মাটি থেকেই নির্মিত। চতুর্থতঃ
অত্যন্তাভাব পদার্থ –ঘট ও বস্ত্রের মধ্যে যে অভাব সেই অভাবকে অত্যন্তাভাব পদার্থ
বলা হয়েছে। দুটি বস্তুর উপাদান সম্পূর্ণ আলাদা। এই অভাব পদার্থের বিষয়টি ঋষি
কণাদের তত্ত্বে ছিল না, এটিও পরবর্তী ব্যাখ্যাকাররা আরোপ করেছিলেন।
এখন ঋষি কণাদ বলছেন, এই যে ছ’ প্রকার পদার্থের - দ্রব্য থেকে সমবায় –
তত্ত্বজ্ঞানই হল আত্মকর্ম। এই তত্ত্বজ্ঞানের জন্যে শ্রবণ, মনন এবং নিদিধ্যাসনের অনুশীলন
করতে হয়। এই তত্ত্বজ্ঞান হলেই দেহ যে আত্মা নয় সেই উপলব্ধি আসে। তখন মন থেকে
রাগ–দ্বেষ বিলুপ্ত হয়। রাগ-দ্বেষ দূর হয়ে গেলে ধর্মাধর্মে প্রবৃত্তি থাকে না।
ধর্মাধর্মের প্রবৃত্তি না থাকলে পুনর্জন্ম হয় না। আর পুনর্জন্ম না হলেই দুঃখ থাকে
না। অতএব সকল দুঃখের অবসানই মোক্ষ।
ঋষি কণাদ যে সময়ে পরমাণু এবং তার সঙ্গে বিশেষ পদার্থের তত্ত্ব নিয়ে
এসেছিলেন,
সেটিকে
পরবর্তী কালের ব্যাখ্যাকাররা যদি ঈশ্বরের ছাঁচে না ফেলে, ঋষি কণাদের পথেই আরও গভীরে
হাঁটতেন,
হয়তো তাঁরাই
বিশ্বের পদার্থবিদ্যা এবং রসায়নে পথিকৃৎ হতে পারতেন। কিন্তু তা হবার নয়, কারণ সর্ব বিষয়েই ঈশ্বরের
উপপত্তি ভারতীয় মস্তিষ্কের “বিশেষ পদার্থ” যে!
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন