১
কাজের ফাঁকে ফাঁকেই সোনা পান্নাকে
পড়ানো শুরু করে দিলেন। প্রথম দিকে মুখে মুখে পাখি পড়ানোর মত। ঘরের কাজ সারতে
সারতে, তিনি নানান প্রশ্ন করতেন আর উত্তরও বলে দিতেন। সূর্য কোনদিকে ওঠে। সপ্তাহে
কটা দিন। পক্ষ কতদিনে হয়। ক মাসে হয় বছর। গ্রহ কি, নক্ষত্র কি? মুখে মুখে যোগ,
বিয়োগ, গুণ, ভাগ। এভাবে কিছুদিন চলার পর দুপুরে খাওয়ার পর হীরুর পুরোন বইগুলো নিয়ে
পড়াতে বসলেন। স্লেট আর চকপেন্সিল দিয়ে লেখাতেও শুরু করলেন। ভোর থেকে উঠে রান্না-বান্না
ছাড়াও নানান কাজ সেরে দুপুরে খাওয়ার পর যদিও ক্লান্তিতে তাঁর দুই চোখ ঝামড়ে ঘুম
আসে, তবু নিয়ম করে তিনি রোজ বসেন পুত্র পান্নাকে নিয়ে। বাংলা বর্ণমালা, ইংরিজি
বর্ণমালা লেখা অভ্যাস করান। বাংলা এবং ইংরিজি সংখ্যা লেখাও অভ্যাস করান। মায়ের হাত
ধরেই পান্না একে একে পার হয়ে চলল বর্ণ পরিচয় প্রথম ও দ্বিতীয়ভাগ, নিজে পড়, নিজে
শেখ, ফার্স্ট বুক অব রিডিং ইত্যাদির পর্ব।
দীর্ঘ এই প্রস্তুতি চলতে চলতেই স্কুলে ভর্তির জন্যে পান্না পরীক্ষা
দিল। পরীক্ষার দিন পনের পরে অচ্যুত খুব দুশ্চিন্তা নিয়েই স্কুলে গিয়েছিলেন -
অ্যাডমিশান লিস্টে পান্নার নাম আছে কিনা দেখতে! পান্নার নাম সে লিস্টে ছিল! বাড়ি
ফেরার সময় বড়ো এক মাটির হাঁড়িতে অনেক রসগোল্লা কিনে অচ্যুত বাড়ি ফিরলেন। সোনার হাতে
রসগোল্লার হাঁড়ি দিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, “পান্নাটারও একটা হিল্লে হয়ে গেল,
বুঝলে?”।
দু চোখে খুশির চিকিমিকি আলো নিয়ে সোনা বললেন, “তবে? তুমি যে বলতে, আমার
ভুট্কু, হীরুর মতো নয়, বোকাসোকা হাঁ-করা...হাত-মুখ ধুয়ে এসো, মিষ্টি দিচ্ছি, খাও...”।
সোনা দুটো প্লেটে দুই ছেলেকে দুটো করে দিলেন, আর অচ্যুতের জন্যে চারটে
আনলেন অন্য প্লেটে। কলতলা থেকে ঘরে ঢুকেই অচ্যুত প্লেটের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এতো
কেন? দুটো দাও। তোমার কই?”
“আমি খাচ্ছি, তোমরা খাও না?”
চৌকিতে আরাম করে বসে, একটা রসগোল্লা মুখে পুরে বললেন, “বুঝেছ, যে
স্বপ্ন নিয়ে গাঁ ছেড়ে আসা, তার প্রথম ধাপটা হল। কলকাতার সেরা স্কুলে দুজনেই ভর্তি
হয়ে গেল। এবার বাকিটা...”।
কাঁসার গেলাসে খাবার জল এনে অচ্যুতের প্লেটের পাশে রেখে সোনা বললেন,
“সব হবে, দেখে নিও, আমাদের এত কষ্ট কী ভগবান দেখতে পাচ্ছেন না?” দুই পুত্রের দিকে
তাকিয়ে অচ্যুত বড়ো তৃপ্তির হাসি হাসলেন। সোনা আরো চারটে রসগোল্লা এনে হিরুকে দুটো
দিলেন, পান্নার প্লেটেও দুটো।
পান্না খুব জোরে মাথা নেড়ে, ইঁড়ো পেটে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “আমি আর
খাবো না, মা। আমার পেট ভরে গেছে। ওদুটো তুমি খাও”। তার ঘাড় নেড়ে কথা বলার ভঙ্গিতে
আত্মবিশ্বাসের পাকামি, সোনার চোখ এড়াল না, তিনি বেশ উপভোগ করলেন পান্নার এই বড়ো হয়ে ওঠার অনুভব।
স্নেহের হাসিমাখা মুখে বললেন, “আচ্ছা বেশ, আমি একটা খাচ্ছি, আরেকটা তুই খেয়ে নে”।
পান্না রাজি হল না, বলল, “নাঃ তুমি দুটো খাও”। পান্নার প্লেট থেকে
তুলে, সোনা একটা রসগোল্লায় কামড় দিয়ে বললেন, “এত্তো আনলে কেন? খাবে কে?”
রসগোল্লা শেষ করে অচ্যুত গেলাসের জল খেলেন ঢকঢক করে, তৃপ্তির ছোট্ট
ঢেঁকুর তুলে বললেন, “সন্ধ্যেবেলায় লাইব্রেরিতে পাড়ার অনেক লোকজন আসে, ওদের ডাকবো। খুশি
হবে সবাই। দশ বারোজন হবে, সবার কুলোবে না?”
“আমি তো গুনিনি। কত এনেছো, আমার তো দেখে মনে হল, তাতেও বেশি হবে”।
অচ্যুত হাসতে হাসতে বললেন, “পঞ্চাশটা, তার ওপর আবার দুটো ফাউ দিয়েছে”।
“তবে? আরামসে হবে। শোনো না, ওবাড়ির দিদি আমায় খুব ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল।
বলেছিল, হিন্দু-হেয়ার-সংস্কৃত ওসব বড়ো বড়ো স্কুল... ওসব স্কুলে এক পুঁটুলি করে না
দিলে, নাকি ছেলে ভর্তি হয় না। সন্ধেবেলায় হিরুর হাত দিয়ে কটা মিষ্টি পাঠিয়ে দেব?”
“কেন দেবে না, একশ বার দেবে!”
“কিন্তু, কিছু ভাববে না তো?”
“কী আবার ভাববে?”
“ওদের দু ছেলের কেউই নাকি ভর্তি হতে পারেনি, ওরা অন্য স্কুলে পড়ে। আজ
আমি মিষ্টি দিলে হয়তো ভাববে, আমরা পুঁটলি ভরা টাকা দিয়ে ভর্তি করেছি? হয়তো ভাববে, মিষ্টি
দিয়ে আমরা দেমাক দেখাচ্ছি”?
“যারা ভাবার, তুমি মিষ্টি দাও
বা না দাও তারা ভাববেই। কিন্তু এমন আনন্দটা পাড়াপড়শিদের সঙ্গে ভাগ না করে নিলে
চলবে কেন? ও সব নিয়ে অত ভেবো না তো, তুমি!”
এর আগে মা আর বাবাকে এত খুশি হতে পান্না কোনদিন দেখেনি। আর এই খুশির
কারণ যে সে নিজে, সেটাও টের পাচ্ছে বেশ! তার
মনে এখন যে অনুভূতি সেটা নিছক আনন্দের নয়, অন্য কিছুর। সেটা ঠিক কী, তা সে জানে
না, বড় হতে হতে সে একদিন বুঝবে, এরই নাম সাফল্য! সন্ধেবেলা পাড়ার অনেক জ্যেঠু – কাকুরা
এলেন। সকলেই খুব প্রশংসা করলেন দুই ভাইয়ের। এক কাকু, বললেন, “তুইও পান্না, আমিও
পান্না। আমারও নাম পান্না, জানিস তো? তুই আর আমি আজ থেকে ভাই-ভাই, বুঝলি?” হেসে
পান্নার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলেন। তাঁদের মধ্যে সব থেকে বয়স্ক এ পাড়ার
গণ্য-মান্য বিজয় জ্যেঠু বললেন, “আপনি দেখালেন বটে অচ্যুতবাবু, এ পাড়ায় আমার
সাতপুরুষের বাস, এ পাড়ার কোন ছেলে হিন্দু স্কুলে পড়েছে...কই তেমন তো মনে আসছে না!
আর আপনি এই কবছর আগে এপাড়ায় ভাড়া এসে, দুই ছেলেকেই ঢুকিয়ে ফেললেন? নাঃ আপনাকে আর
বৌমাকেও...বলিহারি যাই...এ একেবারে যেন অসাধ্য সাধন! আপনার ছেলেদুটিও যে রত্ন, এ
কথা স্বীকার করতেই হবে”। পান্নাকাকু সেকথার জের টেনে হাসতে হাসতে বললেন, “হীরক আর
পান্না, যেমন নাম তেমনই কাম...”!
সোনা বাইরে বের হননি, মাথায় ঘোমটা টেনে রান্নাঘরের দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে
সব শুনছিলেন। পান্না দাঁড়িয়েছিল দরজার সামনে। তার দায়িত্ব ছিল, কাকু-জ্যেঠুদের
মিষ্টি দেওয়া, খাবার জল দেওয়া – অন্তরালে থাকা মায়ের সাহায্য করা। হঠাৎ পান্না
দেখল, ঘোমটার মধ্যে মুখ ঢেকে মা যেন কাঁদছেন! কী আশ্চর্য, সব্বাই আনন্দ করছে, কত
কত ভালো ভালো কথা বলছে, কিন্তু মা কাঁদছেন কেন? পান্না মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মায়ের
হাতে নাড়া দিয়ে মৃদুস্বরে জিগ্যেস করল, “ও মা, কাঁদছো কেন?”
ঘোমটা সামান্য ফাঁক করে, মুখে আঙুল দিয়ে সোনা পান্নাকে ইশারা করলেন,
চুপ। পান্না আরো অবাক হয়ে দেখল, মায়ের মুখে অদ্ভূত এক মায়ার হাসি, কিন্তু তাঁর
দুচোখ ভেসে যাছে অশ্রুতে! সোনা একটা হাত ধরে পান্নাকে কাছে টেনে নিলেন, পান্নার
মাথায় হাত রেখে, ঘোমটার খুঁট দিয়ে চোখদুটো মুছে নিলেন; তারপর এক মুখ হাসি নিয়ে
পান্নাকে অস্ফুট স্বরে বললেন, “কই কাঁদছি?”
চলবে...
খুবই ভালো । চালাও বন্ধু ।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ
উত্তরমুছুন