রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬

অপর্ণা

   বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক

    

এর আগের বড়োদের গল্প - " প্রসাদী ফুল "

এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২ " 


এবারে মনোতোষ পালের জবরদস্ত ব্যস্ততা। চোদ্দখানা প্রতিমার অর্ডার আছে তার হাতেগতবারে ছিল মাত্র আটটা। এই কৃতিত্বের পুরোটাই তার ছেলে সিধুর।  ছেলে সিধুর জন্যে গর্বের শেষ নেই মনোতোষের। রীতিমত গ্র্যাজুয়েট পাস করা ছেলে তার। বছর তিনেক আগেও সিধুর খুব ঝোঁক ছিল লেখাপড়ার দিকে আর গ্র্যাজুয়েট পাস দিয়ে চাকরির দিকে। প্রতিমা গড়ার কাজ সিধু করত ঠিকই – কিন্তু মন দিত না তেমন। বাবার পরিশ্রম কিছুটা লাঘব করার জন্যে আর মায়ের তাগিদে একরকম বাধ্য হয়েই সে হেল্প করতো বাবাকে। প্রায় বছর দুয়েক লাগাতার চেষ্টার পরেও কোন চাকরি জোগাড় করতে না পেরে, গত বছর থেকে সিধু মন দিয়েছে প্রতিমা গড়ার কাজে।

মনোতোষের প্রতিমা গড়ার শিক্ষা তার বাবা পরাণ পালের কাছে, সে নিজে প্রতিমা গড়ে চলেছে নয় নয় করে বছর তিরিশেক তো হলই। কিন্তু মনোতোষ দেখেছে সিধুর আঙুলে জাদু আছেসিধুর হাতের ছোঁয়ায় যেন প্রাণ পেয়ে যায় খড়-মাটির প্রতিমাগুলো, এ জিনিষ সে কোনদিন করে উঠতে পারেনি, পারেনি তার বাবা পরাণ পালও। মুগ্ধ চোখে দুদণ্ড চেয়ে থাকতে হয় প্রতিমার মুখের দিকে, তাদের হাত পা শরীরের গড়নের দিকে। প্রতিমার চোখ যেন টলটলে জীবন্ত, ভাষা ফুটে ওঠে তাদের হাতের পেলব আঙুলের ভঙ্গিতে। সিধুর হাতের আঙুল যেন কথা কয় নরম মাটি আর রং-তুলির সঙ্গে।

মনোতোষ নিজে এবং তার বাবাও প্রতিমার রেডিমেড মুখের ছাঁচ কিনে আনত কলকাতা থেকে। প্রতিমার গড়ন বা ভঙ্গি যাই হোক, মুখের আদল থাকত একই ছাঁচের। সে মা দুগ্‌গা, মা লক্ষ্মী, মা সরস্বতী যাই হোক না কেন। গতবার সিধুর কি খেয়াল হল, নিজেই বসে গেল ছাঁচ বানাতে। কটাদিন একমনে বসে, প্যারিস প্লাস্টারে বানিয়ে তুলল মুখের ছাঁচ। তাও এক আধখানা নয় একদম তিন সেট – দুগ্‌গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কাত্তিক গণেশ সব আলাদা মুখএমনকি গতবার সিধু মা কালীর মুখও আলাদা বানিয়েছিল। মনোতোষ যদিও একবার আপত্তি করেছিল, কি হবে আবার নতুন ছাঁচ বানিয়ে, মা দুগ্‌গার মুখই তো চলে যাবে মা কালীতেও, সিধু শোনেনি। সিধুর এই শিল্পীসুলভ আন্তরিকতার ফল মিলেছে এইবার। দুর্গাপ্রতিমার অর্ডার বেড়ে গিয়েছে ছটা, কালীপ্রতিমার অর্ডারও বিস্তর আসছে! 

অর্ডার আছে চোদ্দটা কিন্তু কঞ্চির কাঠামোতে খড় বেঁধে প্রতিমার আকার গড়ে উঠেছে পনেরটা। বিভিন্ন তাদের গড়ন, বিভিন্ন তাদের ভঙ্গি। এক চালা প্রতিমা, আলাদা আলাদা প্রতিমাদুটো আছে ডায়নামিক - মা দুর্গার সঙ্গে অসুরের ভীষণ লড়াইয়ের মূহুর্তটা যেন স্থির হয়ে আছে আকারে। কিন্তু একটার আকার বুঝতে পারছে না মনোতোষঅর্ডার নেই, কিন্তু সিধু ওটা নিজেই বানিয়েছে। একদম অন্যরকম। মা দুগ্‌গা আর অসুর ছাড়া অন্য আর কেউ নেই। প্রমাণ সাইজের মূর্তি, খুব সাধারণ। মনোতোষের একদম পছন্দ হয়নি। মনোতোষ সিধুকে জিগ্যেস করেছিল, “এটা কী বানাচ্ছিস তুই বল তো? কিছুই তো বুজছি না। অর্ডার ছাড়া প্রতিমা বানিয়ে কী হবে?”

সিধু সেই কাঠামোর দিকে তাকিয়ে বলেছিল “এটা কারোর নয়, এমনিই। আগে তো বানাতে দাও, তারপর দেখো” মনোতোষ অবাক হলেও, কিছু বলল না, ছেলের ওপর তার আস্থা আছে। সে বিশ্বাস করে তার ছেলে একজন প্রকৃত শিল্পী, বাঁধাধরা কাজের বাইরে নতুন কিছু করার তার সাহস আছে, যে সাহস তার ছিল না। ছিল না তার বাবারও তবু তার মনে ধন্দ থাকে, এ যুগের ছেলেছোকরা, কি বানাতে, কি বানিয়ে ফেলে, লোকে আবার দুটো কথা না শুনিয়ে যায়! ঠাকুর দেবতা নিয়ে ছেলেখেলাও একদম পছন্দ হয় না মনোতোষ পালের।

পঞ্চমী বা ষষ্ঠীর দিন সব মূর্তিই রওনা হয়ে যাবে তাদের নির্দিষ্ট গন্তব্যে। একটা প্রতিমার আবার স্পেশাল অর্ডার – মহালয়ার দুদিন আগেই তিনি রওনা হবেন। সেই ক্লাবের সেক্রেটারি বলেছে, কোন এক সাংঘাতিক ভিআইপি নাকি খুব ব্যস্ত। তাঁর হাতে এতটুকু সময়ও নেই। তিনি মহালয়ার দিনই প্রতিমা উদ্বোধন করে ফেলতে চান। কারণ ওই দিন তাঁর হাতে ঘন্টা কয়েক সময় বেঁচে আছে – এবং ওই সময়েই তিনি গোটা দশেক প্রতিমা উদ্বোধন করে ল্যাঠা চুকিয়ে অন্য জরুরি কাজে ঢুকে পড়তে চান।  

পিতৃপক্ষের অমাবস্যাতেই মায়ের মূর্তি উদ্বোধনের ব্যাপারটা তেমন হজম হয়নি মনোতোষের। তবে মনে মনে বিরক্ত হলেও সে কিছু বলতে পারেনি। এই সব ক্লাবের কর্তারা – ছোটা এই শহরেরও হর্তা-কর্তা-বিধাতা। তেঁনারাও বেশ জাঁদরেল ধরনের ভিআইপি, তাঁদের চটিয়ে ভিটে-মাটি চাঁটি করার দুর্বুদ্ধি মনোতোষের কোনদিনই হয়নি।  

অতএব মাঝে আর মাত্র বাইশ দিন। সব কাঠামোর মাটির কাজ শেষ। বাপ ছেলের ব্যস্ততার অন্ত নেই। মিহিন মাটির দুই পরতের পর মসৃণ হয়ে উঠছে প্রতিমার শরীর। পাতলা কাপড়ের ফালিতে নিটোল জুড়ে উঠছে কনুই, কব্জি আর গলার ভাঁজ। নিষ্প্রাণ নিখুঁত মুখ নিয়ে জেগে উঠছে প্রতিমার শরীরি ভাষা। প্রতিমার পীন বক্ষের সুডৌল আদল গড়তে গড়তে মনোতোষ লক্ষ্য করল সিধু একমনে গড়ে চলেছে একটি মেয়ের আর একটি পুরুষের মুখ। কিন্তু ও কার মুখ, কিসের মুখ?

মনোতোষ একটু বিরক্ত হয়ে বলল, ”ওটা কার মুখ বানাচ্ছিস রে? মায়ের মুখ বলে মনে হচ্ছে না তো”?

”মায়ের মুখ বানাচ্ছি না তো মায়ের মুখ না হোক, একটা মেয়ের মুখতো বটে? সব মেয়ের মুখই কি মাদুগ্‌গার পারা হয়”?

“ও মুর্তিটা আসলে কিসের বল দেখি? মাত্র দুখানা হাত - মা দুগ্‌গা তো নয়, আর এদিকে অসুরের চারখানা হাত? কোন শাস্ত্রে এমনটা আছে আমাকে বল দেখি”

“সব কি শাস্ত্রে থাকে? শাস্ত্র বানানো হয়েছিল সে কত্তো যুগ আগে! যারা বানিয়েছিল তাদের ঘরে টিভি ছিল, না কোলে ল্যাপটপ ছিল, না কি হাতে ছিল মোবাইল? শাস্ত্র বদলাতে হবে। তুমি এসব বেকার ভাবচো কেন বলো তো, মূর্তিটা বানাচ্ছি আমার নিজের জন্যে”

“কাজের সময় অকাজে বেকার টাইম বরবাদ করিস ক্যানো? এখনো কত কাজ বাকি আছে সে খেয়াল আছে, তোর”?

“আছে, আছে সব আছে। তুমি টেনসান করো না তো, সব ঠিক ঠাক হয়ে যাবে, সময়মতো” 

 

এই এলাকার প্রধান হিসেবে গণপতি ঘোড়ুইকে সমঝে না চলে উপায় নেই। মহলায়ার দুদিন আগে সকাল সাড়ে নটা নাগাদ গণপতি ঘোড়ুই স্করপিও নিয়ে এসেছেন মনোতোষের বাড়ি, সঙ্গে ক্লাবের আরো চারজন। 

“কি মনোতোষবাবু, প্রতিমা কদ্দূর? আজ ছেলেরা বিকেলের দিকে এসে তুলে নেবে কিন্তু। পরশু উদ্বোধন, মিনিস্টার আসবে ফিঁতে কাটতে”।

মনোতোষ বিগলিত হাসি মুখে হাত কচলাতে কচলাতে বলল, “আপনার প্রতিমা, একদম রেডি স্যার। এখনই নিয়ে যেতে পারেন। এইধারে আসুন, দেখে নিন মনোমত হল কিনা”? লম্বা সিগারেট ধরিয়ে গণপতিবাবু মনোতোষের পিছন পিছন ঢুকে পড়লেন তিরপল ঘেরা টালির চাল দেওয়া মনোতোষের বিশাল কারখানায়। পাঁচ-ছটা বালবের আলোয় বিশাল ঘরের অনেকটাই আলো আঁধারি। পাশাপাশি সাজানো মূর্তির সারি দেখাতে দেখাতে মনোতোষ এগিয়ে নিয়ে চলল গণপতিবাবুকে,  

“এইটে “সবুজ সংঘ”, এটা “নতুন দল”, ওটা “মুচকুন্দপুর আমরা সবাই”, এটা “চাঁপাডাঙা মুক্তি ক্লাব”, আর এই যে, এইটে আপনাদের – মাঝেরপাড়া “নবজীবন সংঘ”“গণপতিবাবু আর তাঁর চার সঙ্গী সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ প্রতিমাগুলিকে নিরীক্ষণ করলেন।

গণপতিবাবু আধখানা সিগারেট পায়ের তলায় নিভিয়ে দিয়ে সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী মনে হচ্ছে, রে তপু, পছন্দ? কিরে প্রদীপ, কিছু বল”?

সকলের চোখেই মুগ্ধ দৃষ্টি, প্রদীপ বলল-

“একদম ফাটিয়ে দিয়েছে গণাদা, একঘর হয়েছে কিন্তু। কি বল তপু?”

তপুও এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল, “কোন কথা হবে না, বস। ফাটাফাটি”।

আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে গণপতিবাবু বললেন, “বলেছিলাম কিনা, মনোতোষ পাল কলকাতার যে কোন শিল্পীর চেয়ে কোন অংশে কম নয়”।

“কি যে বলেন, স্যার। সবই আপনাদের আশীব্বাদ আর মায়ের কৃপা। নিজের ছেলের কথা স্যার না বলাই ভালো, তবু বলব, সিদ্ধেশ্বরের হাতে স্যার মায়ের কৃপা আছে। আপনারা যদি একটু নজর রাখেন – ওর বাপ ঠাকুদ্দাকেও ও মনে হয় ছাড়িয়ে যাবে”

“বটে? এই মূর্তি কি তোমার ছেলেই বানিয়েছে নাকি, হে”?

“বাপ-ব্যাটা দুজনেই বানাই, তবে ওই মুখ আর তুলির টান আজকাল সিধুই দেয়”

“হুঁ। ভেরি গুড। চলুনতো আপনার অন্য প্রতিমাগুলোও দেখি”। গণপতিবাবু এগিয়ে চললেন আরো ভেতরে।  

টুকটাক কিছু কাজ বাকি থাকলেও, চোদ্দখানা সুসজ্জিতা এবং সালংকারা প্রতিমা নিজ নিজ পূজা মণ্ডপে রওনা হবার অপেক্ষায় রয়েছেনসবগুলি প্রতিমা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে গণপতিবাবু স্পষ্টতঃ বেশ আনন্দ পেলেন।

প্রদীপ গণপতিবাবুকে বলল, “গণাদা, কালীঠাকুরটাও তাহলে এরাই বানাক না। অর্ডার দিয়ে দেবেন”?

আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে গণপতিবাবু বললেন, “বলছিস”?

“প্রদীপ একদম ঠিক বলেছে, গণাদা”। অর্ডার দিয়ে দিলেই ভালো”। তপুও সমর্থন করল প্রদীপকে।

 গণপতিবাবু বললেন, “মনোতোষবাবু, আপনাকে আমাদের ক্লাবের কালীঠাকুরও যে বানাতে হবে”।

“একটু মুশকিলে ফেললেন, স্যার। অলরেডি বাইশটা মা কালীর অর্ডার নিয়ে আমরা হিমশিম খাচ্ছি, স্যার কিন্তু আপনি বললে না-ই বা বলি কি করে? আচ্ছা দেখব, স্যার করে দেব যে করে হোক”।

“গুড। ভেরি গুড। ওদিকে আরেকটা কি প্রতিমা বানাচ্ছে, ওই কি আপনার ছেলে”? একটু আড়ালে আধো অন্ধকারে বসে সিধু একমনে তার নিজস্ব প্রতিমায় তুলির টানে ফুটিয়ে তুলছিল ভাষা।

“আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার, ওই আমার ছেলে, সিধু – সিদ্ধেশ্বর পাল, কোন অর্ডারের প্রতিমা নয় স্যার, এমনিই বানাচ্ছে – অল্প বয়সের খামখেয়াল আর কিমাথামুণ্ডু নেই, একদম ফালতু, স্যার”।

“তাই নাকি? কই চলো তো দেখি” গণপতিবাবু এগিয়ে গেলেন, যেদিকে সিদ্ধেশ্বর একমনে প্রতিমা বানাচ্ছিল, সেই দিকে। 

ওরা পাঁচজন এসে তার পিছনে যে দাঁড়িয়েছে, সিধু জানতেই পারল না, এতটাই মনযোগে সে কাজ করছিল। তার প্রতিমা বানানো প্রায় হয়ে এসেছিল, টুকটাক কিছু কাজ বাকি। খুব সাধারণ একটি দ্বিভুজা মেয়ে। পরনে খুবই সাধারণ শাড়ি, নিরাভরণ কাঁধে কলেজের বই নেওয়ার ব্যাগ। তার দু চোখে না আছে রুদ্র অসুরবিনাশিনী দৃষ্টি, না আছে করুণাঘন মাতৃত্ববরং দুচোখে তার ভয়ার্ত ব্যাকুলতাতার দুই করে না আছে কোন প্রহরণ, না আছে বরাভয়ের আশ্বাস। বরং আছে চরম বিপদের থেকে পরিত্রাণের ব্যাকুলতা। তার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে আছে অতি সাধারণ চেহারার এক চতুর্ভুজ ব্যক্তি। মুখে তার লাম্পট্যের হাসি পরনে তার সাধারণ জামা আর লুঙ্গি। তার চেহারা অসুর সুলভ পেশীবহুল নয় ঠিকই – কিন্তু শরীরে তার চরম ঔদ্ধত্য। তার আসল শক্তি প্রশ্রয়, চোখে দেখা যায় না, আড়ালে থাকে। আশে পাশে আর কিছু নেই – না সিংহ, না নিহত মহিষ। 

“সিধু, বাবুমশাইরা এসেছেন তোর কাজ দেখতে” মনোতোষের ডাকে চমকে ঘাড় ফেরাল সিধু। উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করল সকলকে, কিন্তু কোন কথা বলল না। গণপতিবাবু আরো কিছুক্ষণ মন দিয়ে দেখলেন প্রতিমাটি। গণপতিবাবুর কানে কানে তপু কিছু বলল, শোনা গেল না।

“তোমার নাম সিদ্ধেশ্বর তো? তুমি মনোতোষের ছেলে, তাই তো”? গণপতিবাবু জিগ্যেস করলেন সিধুকে।

“আজ্ঞে হ্যাঁ, স্যার” সিধু উত্তর দিল।

প্রতিমার দিকে নির্দেশ করে গণপতিবাবু জিগ্যেস করলেন, “এটা কী হয়েছে”?

“এটা এমনিই বানিয়েছি, তেমন কিছু নয়, স্যার”।

“বল কি হে, তেমন কিছু নয়? আমি তো অনেক কিছু দেখছি হে, অনেক বক্তব্য! বল না হে, তোমার বক্তব্যই বা কি আর মতলবটাই বা কি?” গণপতিবাবু্ তীব্র শ্লেষ নিয়ে জিগ্যেস করলেন সিধুকে।

“সত্যি বলছি স্যার, তেমন কিছু ভেবে বানাই নি” সিধুর কণ্ঠে ভয় –”হঠাৎ মনে হল, তাই”।

“হঠাৎ মনে হল আর বানিয়ে ফেললে? তাও একেবারে “ব্রেকিং নিউজ”, য়্যাঁ? তোমাদের তো ভালোমানুষ বলেই জানতাম, হে। কি মনোতোষ? এইসব প্রতিবাদের ঠিকা আবার কবে থেকে নিজেদের মাথায় তুলে নিলে? এদিকে আবার বলছো কোন মতলব নেই, উঁহু, এসব তো ভালো কথা নয় হে, মনোতোষ” 

 

সাড়ে বারোটার একটু আগে, দুটো ট্রাক নিয়ে ওরা এল। জনা পঁচিশেক ছোকরা। খুব যত্ন করে তুলে নিলে “নবজীবন সংঘ”-এর সব কটি প্রতিমা। আলাদা করে রাখা প্রতিমার সমস্ত শস্ত্রও তুলে নিল ট্রাকে। তারপর সকলে আবার নেমে এল, তাদের হাতে তখন লোহার রড এবং হকি স্টিক। তারা একসঙ্গে ঢুকে পড়ল মনোতোষের কারখানায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোহার রড আর হকি স্টিক দিয়ে ভাঙতে লাগল সমস্ত প্রতিমার হাত আর মাথা। আঘাত করতে লাগল সমস্ত প্রতিমার শরীরে। নির্বাক সুন্দর প্রতিমার মাথাগুলো ভেঙে ভেঙে পড়তে লাগল মেঝেয়। বাধা দিতে এসেছিল মনোতোষ আর সিধু। চারজনে মিলে বাপ আর ছেলেকে বেধড়ক মেরে ফেলে রেখে চলে গেল ঝড়ো হাওয়ার মতো।

 

ওরা চলে যাওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর সিধু উঠে দাঁড়াল এবং বাবাকে ধরে তুলল মেঝে থেকে। সিধুকে জড়িয়ে ধরে মনোতোষ হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল, “আমাদের এখন কি হবে, সিধু? হাতে আর মাত্র পাঁচ-ছদিন। ক্লাবের লোকেরা আসবে প্রতিমা নিতে, কী জবাব দেবো তাদের? মণ্ডপে মণ্ডপে মায়ের সাজানো আসন শূণ্য থাকবে এ বছর”?

 সিধু কোন উত্তর দিল না, বাবাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল সব। সালংকারা সুসজ্জিতা প্রতিমাগুলি এখন ভাঙাচোরা ধ্বংসস্তূপ। কারখানার শেষপ্রান্তে এসে সিধু অবাক হয়ে গেল, তার নিজের জন্যে বানানো অন্যরকম প্রতিমাটি দাঁড়িয়ে আছে অক্ষত। হয়তো ওরা কেউ লক্ষ্য করেনি অথবা সাধারণ মেয়ের মূর্তি দেখে ফেলে রেখে গেছে অবহেলায়।  

“বাবা, দ্যাখো দ্যাখো, এখনও বেঁচে আছে এই মূর্তিটা। ওরা সব ভেঙে ফেলেনি”! মনোতোষ মুখ তুলে তাকিয়ে রইল বেঁচে যাওয়া মূর্তির দিকে।

অস্ফুট স্বরে বলল, “মেয়েটা কে”?

“অপর্ণা”

“অপর্ণা? যাকে ধর্ষণের পর নিষ্ঠুর হত্যা করেছিল লোকগুলো”?

“হুঁ। গণপতি ওকে ঠিকই চিনেছে, এমনকি নিজের দলের লোকটাকেও। দুর্গার মূর্তিকে শিখণ্ডী রেখে ওরা টাকা তোলে, পুজোর নামে টাকা কামানোর জন্যে। তাই মা দুর্গাকে ওরা ভয় পায় না। কিন্তু ওরা ভয় পায় সাধারণ মেয়েকে, ভয় পেয়েছে এই মেয়েটাকেও! ওদের লোকেরা ভেঙে দিয়ে গেল সমস্ত প্রতিমা, অথচ বেঁচে রইল অপর্ণা নামের এই মেয়েটাই”!

“ঠিকই বলেছিস, সিধু। ভিআইপিরা আজ আছে, কাল নেই। বেশিদিন টেকে না। মানুষরাই বেঁচে থাকে, সাধারণ মানুষ। তারাই ভিআইপিদের মাটিতে টেনে নামিয়ে আনে, ধুলোয় মিশিয়ে দেয়।  চটপট তৈরি হয়ে নে, সিধু, কিচ্‌ছু হয়নি। আমরা আবার গড়ে তুলব সমস্ত মূর্তি, চল আর দেরি নয়। এখনও অনেক সময় আছে”।

“কি বলছ, বাবা, আমরা পারব”?

“পারব না মানে? দিন-রাত এক করে দেব, সিধু। উঠে দাঁড়াতেই হবে আমাদের”।  

-**-

   


1 টি মন্তব্য:

নতুন পোস্টগুলি

অপর্ণা

   বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য " বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই " বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনী...