এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
আরেকটি ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
১০
নিজের হাতে দু কাপ চা বানিয়ে
নিয়ে এল সুনেত্র, কনির সামনে এক কাপ রেখে, নিজের কাপটা নিয়ে উল্টোদিকের সোফায় বসতে
বসতে বলল, “এই যে তুই হুটপাট চলে আসছিস, যখন তখন লম্বা লম্বা ফোন করছিস, আমি তোর
বাড়ি যাচ্ছি, চর্ব্যচোষ্য খেয়ে আসছি, এ সব লোকের চোখে পড়ছে কিন্তু, কনি। তোর
নিরিবিলি নির্ঝঞ্ঝাট জীবনে উটকো ঝামেলা বয়ে আনছিস। তোকে সতর্ক করার জন্যেই বললাম
কথাগুলো”।
“লোকের আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই
বুঝি”?
“আছে বৈকি, বিস্তর কাজ আছে।
কিন্তু আমাদের আশেপাশে পাড়া প্রতিবেশী লোকদের, নিজেদের নানান কাজের ঝামেলার মধ্যে
এটা একটা রিলিফ বলতে পারিস। এই আলোচনা আর পরচর্চায় ওদের ভালো সময় কাটে, মনের অবসাদ দূর হয়। লাগাম মুক্ত কল্পনা আর অনুমান করে
নিতে পারে মনের আনন্দে”।
“বদনামে ভয় পাবো তো আমি, তোমার
এত দুশ্চিন্তা কেন? নাকি তুমিই ভয় পাচ্ছো? তোমার তো কোন পিছুটান নেই সুনুদা! সংসার
নেই, বউ নেই, ছেলেপুলে নেই... ও আচ্ছা, বুঝেছি, চরিত্রহীন ডাক্তারের পসার কমে যায়।
তরুণী-যুবতী মহিলারা তোমার চেম্বারে আসতে ভয় পাবে, বলবে ডাক্তারটা চরিত্রহীন,
লম্পট। সেই জন্যেই নিজে সাবধান না হয়ে, আমাকে সতর্ক হতে উপদেশ দিচ্ছো?”
সুনেত্র হেসে ফেলল, হাসতে হাসতে
জিজ্ঞেস করল, “চায়ে চিনি ঠিক আছে? লিকার বেশি হয়ে যায়নি তো?”
“কথা ঘুরিও না সুনুদা। অনেক
আগেই তোমাকে আমি ঠিক চিনে গেছি। ধান্দাবাজ ফুলে ফুলে উড়ে মধু খাওয়া নির্লজ্জ
প্রজাপতি তুমি। যুবতী মহিলাদের কথায় একেবারে হেসে গড়িয়ে পড়লে যে, খুব মনে ধরেছে
কথাটা, না?”
কনির দিকে মজার দৃষ্টিতে তাকিয়ে
থেকে একটা সিগারেট ধরিয়ে সুনেত্র বলল, “তুই তো আর যুবতী নোস। তাহলে আমার থেকে তোর
এত ভয় কিসের?”
“তোমার থেকে ভয়? সে গুড়ে বালি,
তোমার থেকে আমি কোন দিনই ভয় পাইনি। আসলে তোমার মধ্যে ভয় পাওয়ার মতো কোনদিন কোন এলিমেন্টের
অস্তিত্বই ছিল না, আজও নেই। ভদ্রলোকের চাদর চাপানো নিখুঁত মেনিমুখো ভিজে বেড়াল তুমি”।
“তুই কী আজ আমার মধ্যে ঘাপটি
মেরে বসে থাকা, ঝিমোনো বাঘটাকে খুঁচিয়ে জাগাতে চাইছিস”?
সুকন্যার বাঁকা অধরে
তাচ্ছিল্যের হাসি। মাথা ঝাঁকিয়ে চুল পিঠের দিকে সরিয়ে বলল, “একটা সিগারেট দাও তো,
সুনুদা। ধরিয়ে দিও। তোমরা নিজেদের কী ভাবো বলো তো? ভাগ্যিস শত খানেক মাইলের মধ্যে বন-জঙ্গল
নেই, অতএব কোন বাঘ-টাঘও নেই, তাই তারা তোমার কথাটা শুনতে পেল না! শুনতে পেলে
রেললাইনে মাথা দিতো বেচারা। নয়তো হাইওয়েতে দুরন্ত বেগে ছুটে চলা এক্সপ্রেস বাসের
সামনে আচমকা ঝাঁপ মারত! তুমি নাকি ঝিমোনো বাঘ?”
নতুন একটা সিগারেট ধরিয়ে সুকন্যার
হাতে তুলে দিতে দিতে সুনেত্র বলল, “নই?”
সিগারেটটা ঠোঁটে নিয়ে হালকা টান
দিয়ে সুকন্যা বলল, “ছ্যাঃ। সিগারেটের ফিল্টারটা ভিজিয়েও তো দিতে পারতে! এই দৌড়
নিয়ে তুমি নাকি বাঘ? আমি যে তোমার স্পর্শ পেতেই চাইছিলাম, সেটুকু বোঝার মুরোদও
নেই?”
“আমার স্পর্শ পেতে সিগারেট
ভেজাতে হবে কেন? স্বয়ং আমিই তো উপস্থিত রয়েছি”!
“সে তো রয়েইছ, কিন্তু কোনদিন
পেরেছো কি, তোমার স্পর্শ দিয়ে বন্য বন্যায় আমাকে ভাসিয়ে দিতে? পারোনি!”
জোর ফুঁতে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে
সুকন্যা আবার বলল, “অধিকার কেউ দেয় না, সুনুদা, কেড়ে নিতে হয়। এমনভাবে ছিনিয়ে নিতে
হয়, যাতে ফেরার পথ না থাকে। বাঁধা পড়তে হয়
আজীবন, আদতে সে জীবন মরণদশা জেনেও। হোক না সে জীবন অবিরত বিষ পান, হোক না সে মরণে
অহরহ অমৃত মুক্তি”।
সুনেত্র একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল
সুকন্যার চোখের দিকে। কিছু বলল না, সে আরো যেন কিছু শোনার অপেক্ষায় উদ্গ্রীব। সুকন্যা
অধরে হাসি নিয়ে বলল, “কী লোভীর মতো আমার কথা শুনছো তুমি, সুনুদা। অথচ এ কথাগুলো
কবেই আমি সাজিয়ে রেখেছিলাম, আমার দু চোখের তারায়। তুমি পড়তেই পারোনি তখন। আজও কি পড়তে
পেরেছ? পারোনি। পারলে আজ লজ্জার মাথা খেয়ে আমার ভালোবাসাকে উলঙ্গ দাঁড় করাতে হত
তোমার সামনে?”
সুকন্যা শেষ হয়ে আসা সিগারেটের
টুকরোটা অ্যাস্ট্রের মধ্যে গুঁজে দিয়ে মাথা নীচু করে কিছুক্ষণ ভাবল, তারপর হঠাৎ
ঘাড়ের ঝাঁকুনিতে কপালে নেমে আসা চুলের ঢল সরিয়ে বলল, “আজ উঠি, সুনুদা। ফোন করবো”। সুকন্যার হঠাৎ এই ভাব পরিবর্তনে একটুও অবাক হল
না, সুনেত্র, মৃদু হেসে বলল, “আসবি? ঠিক আছে। আসিস আবার। আজ একেবারে নাড়িয়ে দিলি
আমার অন্দরমহল পর্যন্ত। এর উত্তর আমি দেব, তবে এখন নয়, অন্য কোন সময়...অথবা কে
জানে হয়তো আজই... ”।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে উচ্ছ্বসিত
হাসিতে চপল হয়ে উঠল সুকন্যা, আঁচলে কিছুটা হাসি আড়াল করে সুকন্যা বলল, “আমি জানি,
তোমার সব উত্তর মিলবে তোমার মেলে। ওখানেই মনের কথা মেলে ধরার তোমার দায়হীন সুযোগ। আর
মন ধাঁধানো কথার মার প্যাঁচে মার খাই আমি এক অবলা নারী...”!
ওর কোন বিদ্রূপই গায়ে মাখল না
সুনেত্র, অস্ফুট উদাসী গলায় বলল, “ভেতরে বাইরে আমার কোন কিছুই তোর অজানা নয়। আমাকে
আমার থেকেও অনেক বেশি করেই তুই জানিস, বুঝিস। নিজের ভুলগুলি মনে করে যখনই যন্ত্রণা
পাস, তখনই আমার এই দেয়ালে মাথা ঠুকিস বারবার। তুই ভাল করেই জানিস এই দেয়াল – দায়িত্বহীন,
প্রাণহীন, সংবেদহীন নিরেট পাথরের দেয়াল নয়। তুই জানিস, এই দেয়ালে নিশ্চিন্তে মাথা
ঠোকা যায় এবং বারবার সংঘাতেও তোর মাথা কখনো আহত হবে না। বরঞ্চ তোর নিবিড়
যন্ত্রণাসমূহ শুষে নিয়ে, সেই দেয়ালটাই নিঃশব্দে আরও...আরও সজীব হয়, পরম মমতায় তোর
সমস্ত দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত হতে থাকে...। আসিস। আবার আসিস”।
সুকন্যা বড়বড়ো চোখ মেলে তাকিয়ে
রইল কিছুক্ষণ, তারপর নিঃশব্দে দ্রুত পায়ে চলে গেল দরজার বাইরে। সুনেত্রও তার পিছনে
পিছনে গিয়ে, সুকন্যার ড্রাইভারকে গিয়ে বলল, “অনিমেষ, ম্যাডামের যেতে একটু দেরি
হবে, তুমি ফালতু ওয়েট করে কী করবে? এখন চলে যাও”।
সুনেত্রর ডাকে অনিমেষ গেট খুলে বাইরে
এসে দাঁড়িয়েছিল, বলল, “ঠিক আছে স্যার, ম্যাডাম আমাকে মিস কল দিলেই আমি চলে আসব”।
সুনেত্র সামান্য চিন্তা করে বলল,
“নাঃ, অনিমেষ, তোমাকে আসতে হবে না...হয়ে গেলে তোমার ম্যাডামকে আমিই ড্রপ করে দিয়ে
আসব”।
মস্ত ঘাড় নেড়ে অনিমেষ গাড়িতে
উঠে বসল, এবং স্টার্ট দিয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল। সুনেত্র ঘাড় ফিরিয়ে সুকন্যার
দিকে তাকিয়েই দেখল, তার দুই ভ্রূ কুঞ্চিত এবং দুই নয়ন সঙ্কুচিত। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে
তাকিয়ে আছে, তার মুখের দিকে। সুনেত্র হাসল, বলল, “কী দেখছিস”?
“তোমার ওই হাসিটা দেখলেই আজকাল
আমার গা জ্বলে যায়। বলি মতলবটা কি তোমার?” সুকন্যার কণ্ঠে ঈষৎ ঝাঁজ টের পেল
সুনেত্র – কিন্তু সে কপট ঝাঁজ, তার মধ্যে সে বরং টের পেল সমর্পণের সৌরভ।
সুকন্যার ডান হাতটি ধরে, হাসতে
হাসতে সুনেত্র নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতে বলল, “গা জ্বলা নিয়ে ভাবিস না। আমার
কাছে বার্নল আছে, স্পেসিমেন ফাইল, একদম ফ্রি...আয়”।
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন