মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৫

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৪ 


৩১

 

পরদিন সকালে ভল্লা বেশ কিছুক্ষণ ছেলেদের অনুশীলন দেখল মন দিয়ে। মনে মনে কিছুটা খুশি যে হল না, তা নয়, তবে মুখে প্রকাশ না করে সবাইকে ডেকে বলল, “আচ্ছা, তোদের কী মনে হয়? যাকে লক্ষ্য করে তোরা বল্লম বা ভল্ল ছুঁড়বি, তারা কি তোর বল্লমটা বুকে নেবার জন্যে – খড়ের ওই পুতুলটার মতো - চুপটি করে বুক চিতিয়ে একজায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবে?” তার এই প্রশ্নের কেউ কোন উত্তর দিতে পারল না।

ভল্লা সকলের মুখের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে আবার বলল, “এই যে তোরা নির্দিষ্ট দূরত্বে একটিমাত্র জায়গায় দাঁড়িয়ে বারবার লক্ষ্যভেদ করার মহড়া দিচ্ছিস, তোদের কি মনে হয়? যুদ্ধের সময়, তোর বিপক্ষের শত্রু ঠিক এতটাই দূরে, স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে?” এবারও তার কথার কেউ উত্তর দিল না।

ভল্লা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল, বলল, “ঠিক আছে। ঠিক আছে। উত্তর দিতে পারলি না বলে, হতাশ হবার কিছু নেই। আজ তোদের নতুন কিছু শেখাবো। শিখতে পারলে, প্রশ্নদুটোর উত্তর তোরা নিজেরাই পেয়ে যাবি। আহোক তোর ভল্লটা দে”।

ভল্লটা হাতে নিয়ে ভল্লা বলল, “তোরা সবাই এসে আমার বাঁ দিকে দাঁড়া, লক্ষ্যভেদের পুতুলটা থাকবে আমার ডান দিকে। তারপর আমাকে মন দিয়ে লক্ষ্য কর”। সকলে ভল্লার বাঁদিকে সার দিয়ে দাঁড়ানোর পর, ভল্লা অনেকটা পিছিয়ে গেল। সেখান থেকে দৌড়ে পুতুলের সামনে এসে হঠাৎ লাফিয়ে উঠল অনেকটা, আর ডানহাতে ভল্ল ছুঁড়ল পুতুলের দিকে। ভল্লটা পুতুলের বুকে আঁকা কালো বৃত্তের মাঝখানে বিঁধে গেল। অবশ্য ভল্লটা ছোঁড়ার পরেও সে থামল না, দৌড়ে এগিয়ে গেল অনেকটা। সেখানে দাঁড়িয়ে ভল্লা বলল, “বোঝা গেল, কিছুটা? দাঁড়া আরেকবার একটু অন্যভাবে দেখাই”। এবার সে আরেকটা ভল্ল নিল সুরুলের থেকে। তারপর ওদিক থেকেই ভল্লা ধেয়ে এল। পুতুলের সামনাসামনি এসে এবার বসে পড়ে ডানহাতে ভল্ল ছুঁড়ল এবং মাটিতে গড়িয়ে এল অনেকটা। হ্যাঁ, এবারও সঠিক জায়গাতেই বিদ্ধ হল ভল্লটা, ঠিক আগের ভল্লর পাশে। মাটি থেকে উঠে দাঁড়াল ভল্লা, বলল, “বোঝা গেল? আজ থেকে এদুটোই তোদের মহড়া। আরেকটা কথা, মহড়ার সময়, অন্য কেউ পুতুলের ওদিকে যাবি না। বুঝতেই পারছিস, এটা বেশ কঠিন মহড়া, প্রথম দিকে লক্ষ্যভ্রষ্ট হবেই। যা, ভল্লদুটো খুলে নিয়ে আয়”।

ভল্লা এবার একধারে মাটিতে বসল, বলল, “নে একে একে শুরু কর, আমি একটু দেখি। আর রামালি, সময় করে, আরও কিছু পুতুল বানিয়ে রাখ, অন্ততঃ পাঁচ-ছটা - এ পুতুলটা আর বেশিদিন টিকবে না”।

ভল্লার দক্ষতার নিদর্শন দেখে ছেলেরা বেশ বিচলিত হয়ে পড়েছিল। ভল্লা তাদের শুরু করতে বললেও তারা   ইতস্ততঃ করতে লাগল। একটু দূরে এক জোট হয়ে তারা নিজেদের মধ্যে নীচুস্বরে জটলা করছিল। ঠিক করতে পারছিল না, শুরুটা করবে কে? এরকম ভাবে লক্ষ্যভেদ করা তাদের পক্ষে যে অসম্ভব! তাও আবার ভল্লাদাদা নিজেই যেখানে বসে আছে। ভল্লা ওদের লক্ষ্য করে মনে মনে বেশ মজা পাচ্ছিল। ওদের কিছুক্ষণ সময় দিল ভল্লা, তারপর ডেকে উঠল, “কীসের এত পরামর্শ করছিস রে তোরা? আহোক, নে তুই শুরু কর। একবারে হবে না, দুবারেও পারবি না, পাঁচবারে নিশ্চয়ই পারবি। নিজেদের মধ্যে গুজুরগুজুর করে লাভ নেই, চলে আয়, চেষ্টা কর…”।

কিছুটা বাধ্য হয়েই আহোক সামনে এল, বাকিরা সকলেই সরে এসে সার দিয়ে দাঁড়াল ভল্লার পাশে। আহোক দৌড় শুরু করল, ভল্লার মতোই পুতুলের সোজাসুজি এসে লাফ দিয়ে ভল্ল ছুড়ল, তারপর দৌড়ে এগিয়েও গেল কিছুটা। না তার ভল্ল লক্ষ্যভেদ করতে পারেনি। পুতুলের পেটের বাঁদিকে বিঁধেছে। ভল্লা চেঁচিয়ে উৎসাহ দিল, “মন্দ হয়নি আহোক, চালিয়ে যা, পারবি, আয় ফিরে আয়…”। ভল্লার মতোই আহোক ওদিক থেকে দৌড়ে এল, সামনাসামনি এসে বসে পড়ে ভল্ল ছুঁড়ে গড়িয়ে গেল বেশ কিছুটা। না, ভল্লটা লক্ষ্যভেদ করতে পারেনি, পুতুলের মাথার ওপরদিকে ঠেকেছে, আরেকটু হলেই গাছের গুঁড়িতে বিঁধত।

ভল্লা আহোকের দিকে তাকাল, আহোক ম্লান মুখে বলল, “পারছি না, ভল্লাদাদা”। ভল্লা হাসল, বলল, “অর্জুনের নাম শুনেছিস? অর্জুনের অর্জুন হয়ে উঠতে ক বছর লেগেছিল, জানিস? প্রায় দশ বছর। এবং তার পরেও স্বয়ং ভগবান মহাদেবের কাছে লড়তে শিখেছিলেন – মোটামুটি চল্লিশ বছর বয়সে। আর হতভাগা তুই ভাবছিস, একবারেই পেরে যাবি? চল, আবার কর, পরপর চারবার…”।

ভল্লাদাদা, আমাদের লক্ষ্য তো শত্রু কে বিনাশ করা, ভল্ল মাথায়, বুকে পেটে যেখানে হোক লাগলেই তো হল”। ভল্লার পাশে দাঁড়িয়ে শল্কু বলে উঠল। ভল্লা বিরক্ত মুখে শল্কুর দিকে তাকাল, তারপর সবার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোদের সবার কি তাই মনে হয়?” কেউই কিছু বলল না। রামালি বলল, “আমি বলব, ভল্লাদাদা? মানে চেষ্টা করব”? ভল্লা বলল, “বলে ফ্যাল, বলে ফ্যাল, তোর মনে যা আসছে, শুনি”।

“এই মহড়ার উদ্দেশ্য, আমাদের দু চোখের সঙ্গে হাতটাকে একই সুতোয় বেঁধে ফেলা। মানে আমরা চোখে যা দেখব, যেটুকু দেখব, প্রয়োজনে সেটাকেই বিঁধতে পারি কিনা...মানে... আমার তাই মনে হচ্ছে, ভল্লাদাদা”, রামালি খুব ইতস্ততঃ করে সঙ্কোচের সঙ্গে বলল।

ভল্লা হাসল, “খুব ভাল, রামালি, অনেকটাই ঠিক বলেছিস। আর একটা জিনিষকেও এর সঙ্গে জুড়তে হবে, আমাদের মনতার মানে আমাদের চোখ, হাত আর আমাদের মন – তিনটেকে একসঙ্গে বাঁধতে পারলেই লক্ষ্যভেদ আমাদের কাছে খুব সহজ হয়ে আসবে। মন কেন বললাম? মন যদি ধীর নিবিষ্ট না থাকে চোখ এবং হাতকে এক সুতোয় বাঁধা যাবে না। প্রচণ্ড ভয় বা বিকট ক্রোধে মন যদি বিচলিত হয়ে যায় – লক্ষ্যভেদ অসম্ভব হয়ে উঠবে”।

একটু থেমে ভল্লা আবার বলল, “শল্কু, একজন শত্রুর কোথায় ভল্লটা বেঁধাবো, সেটাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। তাকে যদি এক ঘায়ে শেষ করতে চাই, তার বুকে বা মাথায় মারব। যদি তাকে আহত করতে চাই, তার কাঁধে বা পায়ে ভল্ল বেঁধাবো। কারণ শত্রুর সবাইকে আমরা নাও মারতে পারি, অনেক সময় আহত শত্রুকে ভয় দেখিয়ে আমরা শত্রুপক্ষের অনেক গোপন সংবাদ বের করে নিতে পারি। তার মানে আমরা যেখানে মারতে চাইছি, ঠিক সেখানেই যেন আমার ভল্লটা লাগে। সেই দক্ষতাটুকু পাওয়ার জন্যেই এই মহড়া। বোঝাতে পারলাম?” ছেলেরা একটু ইতস্ততঃ করে ঘাড় নাড়ল, বুঝেছে।

তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে ভল্লা হাসল, “আচ্ছা আরেকটু খুলে বলি। শল্কু বলল, লক্ষ্য ঠিক না হলেও, শত্রুর গায়ে যেখানে খুশি লাগাতে পারলেই ব্যস্‌, আমাদের জয়। কিন্তু ব্যাপারটা মোটেই তা নয়। ধর লড়াইয়ের সময়, দেখছিস, সামনের লোকটাকে না মারলে, তুই মরবি। তুই তার বুক লক্ষ্য করে ভল্ল ছুঁড়লি, কিন্তু লাগল তার পেটের বাঁদিকে। তাতে লোকটা আহত হল, কিন্তু সে যদি ভালো যোদ্ধা হয়, ওই অবস্থাতেও তোর হৃৎপিণ্ড ফুঁড়ে দেবে। তুই চোখ উলটে পড়তে পড়তে, তখন শল্কুকে জিজ্ঞাসা করবি, এটা কী হল শল্কু, আমি তো ঠিকঠাক লক্ষ্যভেদ করেছিলাম”।

ছেলেরা হেসে উঠল হো হো করে। শল্কু অপ্রস্তুত হল, একটু রেগেও গেল। সকলের সামনে ভল্লাদাদা এভাবে তাকে হ্যাটা করল? ভল্লা তীক্ষ্ণ চোখে লক্ষ্য করল শল্কুর মুখভাব। কিন্তু সকলের দিকে তাকিয়ে বলল, “আহোক, শুরু কর ভাই, একবার হয়েছে, আরও চারবার। তারপর যাবে শল্কু”।

আহোক পরপর চারবার চেষ্টা করল, শেষের দুবার লক্ষ্যভেদ করতে না পারলেও অনেকটাই কাছাকাছি পৌঁছতে পারল। বোঝা গেল ওর হাত এবং চোখ অনেকটাই বশে এসেছে। আহোক ভল্লার সামনে ধপ করে বসে পড়ল, হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, “ভল্লাদাদা, এত দিনে মনে হচ্ছে, সত্যিকারের লড়াই শিখছি। এবারে পারলাম না। তবে পেরে যাবো ঠিক”। ভল্লা হাসল, বলল, “তোরা পারবি না কে বলল? আমরা যারা পেরেছি, তারা কি স্বর্গ থেকে নেমে এসেছি?” তারপর সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “কি রে, তোদের মনে হচ্ছে তোরা পারবি না?” ছেলেদের অনেকেই একসঙ্গে গর্জন করে উঠল, “পারবো”। ভল্লা তাদের উত্তরে বলল, “পারতেই হবে, পারবি না মানে? আরেকবার করে দেখাবো? দাঁড়া দেখাই, তোরা সব মন দিয়ে দেখ”।

ভল্লা আগের মতো একইভাবে দুবার মহড়া দিয়ে দেখালো। দুবারই নিখুঁত লক্ষ্যভেদ করল। ফিরে এসে নিজের জায়গায় বসে বলল, “এবার শল্কু তুই... তারপর রামালি, সুরুল...”।

ভল্লা কিছুক্ষণ বসে ছেলেদের মহড়া দেখল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে নিজের রণপা জোড়া হাতে নিয়ে বলল, “তোরা চালিয়ে যা। আমি একটু বেরোচ্ছি। তাই বলে, ফাঁকি দিস না হতভাগারা। ফাঁকি দিলে, আমার এক কানাকড়িরও ক্ষতি হবে না। ক্ষতি হবে তোদেরই”। ভল্লা রণপায়ে চড়ে সুরুলের থেকে ভল্লটা চাইল। ওটা হাতে নিয়ে দৌড়তে দৌড়তে ভল্লটা ছুঁড়ে দিল, এবারও নিখুঁত লক্ষ্যভেদ। একটু দাঁড়িয়ে ভল্লা বলল, “যেটা শিখছিস, তার পরেই আসবে এই মহড়াটা, ঠিক আছে? আমি চললাম, এখন – সুরুল, ভল্লটা তুলে নিস”। ভল্লা নিমেষের মধ্যেই জঙ্গলের মধ্যে যেন মিলিয়ে গেল।

শল্কু জিজ্ঞাসা করল, “দিনের বেলা ভল্লাদাদা তেমন তো বেরোয় না! আজ হঠাৎ কোথায় গেল রে, রামালি?”

“আমি কী করে জানবো?”

শল্কুর মুখে ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি, বলল, “তুই তো ভল্লাদাদার কোলপোঁছা চেলা রে শালা। রেঁধে বেড়ে দু’বেলা খাওয়াচ্ছিস। তুই জানিস না?”।

রামালি খুব আবেগ ঢেলে বলল, “কাকি বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার পর, হাঘরে আমি কোথায় যাবো, কী করবো যখন ভাবছিলাম। ভল্লাদাদাই আমাকে আশ্রয় দিয়েছে, দুবেলা দুমুঠো অন্নের সংস্থান করেছে। সেই কৃতজ্ঞতাতেই রান্না-বান্না করি, যতটা সম্ভব ভল্লাদাদার যত্ন-আত্তি করতে চেষ্টা করি। তাতে তোদের চোখ টাটালে আমার কিছু করার নেই রে...।” রামালির কণ্ঠ যেন রুদ্ধ হয়ে এল, আবেগে।

আহোক, সুরুল, বিনেশ, দীপান এবং আরো কয়েকজন রামালিকে জড়িয়ে ধরল। সুরুল বলল, “শল্কুদা, ক’দিন ধরেই দেখছি, সুযোগ পেলেই তুমি রামালিদার পেছনে লাগছ... এটা কিন্তু ঠিক নয়। কাকা আর কাকি যখন রামালিদাকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিল, আমরা কে কী করেছি ওর জন্যে? তোমাদের গাঁয়ের কেউ একটা কথাও বলেছে... রামালিদাদার হয়ে ...ওর কাকা-কাকির সঙ্গে? রামালিদাদা, তুমি শান্ত হও, শল্কুদাদার কথায় কান দিও না...”।

দীপান বলল, “সুরুল ঠিকই বলেছে, রামালি। শল্কুর কথায় কিছু মনে করিস না...জানিস তো শালা চিরকালের হিংসুটি...”।

শল্কু ওদের কথাগুলো শুনল, রামালির সঙ্গে ওদের আচরণ লক্ষ্য করতে লাগল। কিছু বলল না, তার মনের মধ্যে এখন ভয়ংকর ক্রোধ। শালা বাপ-মাখেকো হাঘরে রামালি, তার জন্যে সকলের এত সহানুভূতি? আমিও দেখে নেবে শালা। নাকে কেঁদে সকলের মন ভোলানো? করে নে এখন যত পারিস...সুযোগ পেলে...।

রামালি ম্লান হেসে বলল, “না রে কিছু মনে করিনি, ছোটবেলা থেকে এই সব কথা এত শুনেছি, আজকাল তেমন আর গায়ে লাগে না। কিন্তু তাও, আমার দুর্ভাগ্যের কথা যত ভুলে থাকতে চাই...কিছু লোক সেটাতেই খুঁচিয়ে, রক্ত ঝরিয়ে আনন্দ পায়। যাগ্‌গে ছাড়...আমাদের মহড়া আবার চালু করি চল... রক্ত যদি ঝরাতে হয়, শত্রুর রক্ত ঝরাবো...বন্ধুদের নয়...”।

রামালির কথায় ছেলেরা উদ্দীপ্ত হয়ে উঠল, আহোক বলল, “ঠিক বলেছিস, রামালি...আমাদের লক্ষ্য এখন শত্রু বিনাশ...আর কিছু নয়...”।

ছেলেরা সকলেই আবার মহড়া শুরু করল। মাথার ওপর ভল্লা না থাকায়, তারা এখন অনেক সহজ, স্বতঃস্ফূর্ত। সকলে মিলেমিশে পারষ্পরিক সহযোগীতা ও উৎসাহে নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলল।

শল্কু সকলের থেকেই এখন আলাদা। একলা বসে দেখতে লাগল ছেলেদের দলটাকে। রামালি শালা পুরো দলটার নেতা হয়ে উঠতে চাইছে নাকি? শল্কুর মনের মধ্যে আগুন। শত্রুদের তো পরে দেখে নেব, রামালি, তার আগে দেখব তোকে, আর তোর ওই দাদাটাকে - শালা বেজন্মা।

চলবে...

সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/২

   ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "]

পঞ্চম পর্ব /পর্বাংশ  - ২


৫.১.৩ বৈশেষিক সিদ্ধান্ত বা দর্শন

ঋষি কণাদ এই দর্শনের প্রবর্তক। ঋষি কণাদের আবির্ভাবকাল ২০০ বি.সি.ই-র কাছাকাছি কোন সময়ে। কপিল মুনি যেমন তাঁর সাংখ্য দর্শনে প্রকৃতি ও পুরুষকে নিত্য স্বীকার করেছেন, কণাদ নটি পদার্থকে নিত্য বলে সাব্যস্ত করেছেন, যেমন পৃথিবী বা মাটি, জল, বায়ু, তেজ, আকাশ, কাল, দিক, আত্মা ও মন। ঋষি কণাদ এগুলিকে নিত্য দ্রব্য-পদার্থ বলেছেন। এদের মধ্যে জল, বায়ু, মৃত্তিকা, তেজ - এই চার জড় পদার্থের শুধুমাত্র পরমাণুগুলিই নিত্য, কিন্তু পরমাণু-সমষ্টি নিত্য নাও হতে পারে। যেমন মাটি এবং মাটির পরমাণু নিত্যদ্রব্য হলেও, মাটি থেকে বানানো কলসি নিত্যদ্রব্য নয়।

কণাদ বলছেন, পরমাণুই সৎ-স্বরূপ নিত্য পদার্থ, তার আর কোন কারণ নেই। আমরা চোখের সামনে যা কিছু দেখতে পাই, সবই এই জড় পদার্থ থেকেই সৃষ্টি হয়েছে, গাছ-পালা, লতা, গুল্ম, ঘটিবাটি, হাতা-খুন্তি, এমনকি যাবতীয় জীবজগৎ। কিন্তু তাদের আকার বিভিন্ন বলেই আমাদের মনে হয় তারাও বিভিন্ন। কিন্তু অবিভাজ্য পরমাণু এতই ক্ষুদ্র, তাকে তো চোখে দেখা যায় না। তাহলে কী করে মাটি, জল, বায়ু ও তেজের পরমাণুকে আলাদা করে বোঝা যাবে? কী করেই বা বোঝা যাবে তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য? ঋষি কণাদ এখানে বললেন, এই দ্রব্যপদার্থগুলির পরমাণুতে “বিশেষ” নামের আরেকটি পদার্থ আছে, যার থেকে পরমাণুগুলির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। তিনি বললেন, অদৃষ্ট (অদৃশ্য) এই বিশেষ গুণময় পরমাণুদের সংযোগেই বিশ্বসংসারের সৃষ্টি হয়ে থাকে। “বিশেষ” এই পদার্থের কারণেই এই দর্শনের নাম বৈশেষিক দর্শন।

এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভাল, ঋষি কণাদের পরমাণু তত্ত্ব কোনভাবেই আধুনিক পদার্থ বা রসায়ন বিজ্ঞানের অণু-পরমাণুর যে ধারণা, তার সমগোত্রীয় নয়। ঋষি কণাদের পরমাণু চারটি দ্রব্য-পদার্থের অবিভাজ্য ক্ষুদ্রতম কণা, তার বেশী কিছু নয়। উদাহরণে বলা যায় – জলকে তিনি নিত্য দ্রব্য বলেছেন, কিন্তু আমরা জানি জল হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের একটি যৌগ, অর্থাৎ আধুনিক বিজ্ঞানের পরমাণুর সঙ্গে, ঋষি কণাদের পরমাণুর কোন সম্পর্কই থাকতে পারে না।  ঋষি কণাদের পরমাণু ধারণার স্বপক্ষে ছান্দোগ্য উপনিষদের ষষ্ঠ অধ্যায়ের দ্বাদশ খণ্ডের দুটি শ্লোকের উল্লেখ করব। পিতা আরুণি ও পুত্র শ্বেতকেতুর কথোপকথন নিয়ে এই দুটি খণ্ড রচিত।

(পিতা) – “এই (সুবিশাল বট) বৃক্ষ থেকে একটি বট ফল আহরণ কর”।

(পুত্র) – “এই যে, ভগবন্‌”।  (পিতা) – “ভাঙো”।

(পুত্র) – “ভগবন্‌, ভাঙা হয়েছে”। (পিতা) – “এতে কি দেখছ”?

(পুত্র) – “অণুর মতো বীজসমূহ”।  (পিতা) – “এদের একটিকে ভাঙো”।

(পুত্র) -  “ভগবন্‌, ভাঙা হয়েছে”। (পিতা) – “এতে কি দেখছ”?

(পুত্র) – “কিছুই না, ভগবন্‌”। (ছান্দোগ্য/৬/১২/১)

(পিতা) তাঁকে বললেন, “হে সৌম্য, বীজের এই যে সূক্ষ্মাংশটি দেখতে পাচ্ছ না, সেই সূক্ষ্মাংশ থেকেই উৎপন্ন হয়ে এই মহাবট বৃক্ষটি তোমার সামনে বিদ্যমান রয়েছে। হে সৌম্য, শ্রদ্ধা অবলম্বন কর”। (ছান্দোগ্য/৬/১২/২) [অনুবাদ – লেখক]

ঋষি কণাদ এই তত্ত্বে সিদ্ধান্ত দিলেন, অপসর্পণ ও উপসর্পণ, খাওয়া-দাওয়া, চলা-ফেরা – জীবের যাবতীয় কর্মের কারণ কোন না কোন দ্রব্যপদার্থের পরমাণু এবং তার বিশেষ দ্রব্য – যাকে চোখে দেখতে পাওয়া যায় না। “অপসর্পণ” মানে মৃত্যুর পর দেহ ছেড়ে মন বা আত্মা-র বাইরে চলে যাওয়া এবং “উপসর্পণ” মানে অন্য দেহে মনের প্রবেশ। এভাবেই অগ্নির ঊর্ধমুখী শিখা, বায়ুর তির্যকগতি, মেঘ, বিদ্যুৎ, বজ্রপাত, ভূমিকম্প, বৃষ্টি, ঝড়-ঝঞ্ঝা, উদ্ভিদের দেহে রসের সঞ্চার, জীবের জীবন ও মৃত্যু – অর্থাৎ জগতের সবকিছুই, চোখে দেখা যায় না এমন কিছু পরমাণু এবং বিশেষ দ্রব্যের নির্দিষ্ট সংযোগ।

আশ্চর্যের বিষয় হল, মহর্ষি কণাদও কিন্তু তাঁর এই বৈশেষিক তত্ত্বে সরাসরি কোন ঈশ্বরের প্রস্তাব দিলেন না। এই তত্ত্বের কোথাও তিনি ঈশ্বরের হস্তক্ষেপের কথা উল্লেখ করলেন না। অতএব তাঁর তত্ত্বকেও “নাস্তিক” তত্ত্ব বলাই যায়। কিন্তু তাঁর তত্ত্বের পরবর্তী ব্যাখ্যাকাররা এই অদৃষ্ট-বিশেষ দ্রব্যের ব্যাখ্যাতে জীবাত্মা এবং পরমাত্মা এনে ফেলে, এই তত্ত্বকে আস্তিক তত্ত্ব বানিয়ে তুলেছিলেন।

ভারতীয় দর্শন মানেই ধর্মতত্ত্ব এবং জীব, বিশেষ করে মানবের মঙ্গল সাধন। অতএব ঋষি কণাদ ধর্মের বিষয়ে বললেন, দু প্রকারের ধর্ম হয়, অভ্যুদয় এবং নিঃশ্রেয়স। অভ্যুদয় মানে সমৃদ্ধির ইষ্টসাধন এবং নিঃশ্রেয়স মানে স্বর্গলাভ এবং সংসারের যাবতীয় দুঃখ-কষ্টের নিবৃত্তি – এক কথায় মুক্তি। মুক্তি হলে শরীরের সঙ্গে মন বা আত্মার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। ঋষি কণাদ মুক্তির উপায় সম্পর্কে বললেন, আত্ম-কর্ম সম্পন্ন হলেই মুক্তি লাভ হয়। এই আত্ম-কর্ম কী?

বৈশেষিক তত্ত্বে সাতটি পদার্থের উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন দ্রব্য, গুণ, কর্ম, সামান্য, বিশেষ, সমবায় এবং অভাব। প্রথম পদার্থ দ্রব্যের কথা আগেই বলেছি। এখন অন্য পদার্থগুলি কী, সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক।

গুণ পদার্থ চব্বিশটি – রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ, সংখ্যা, পরিমাণ, পৃথকত্ব, সংযোগ, বিয়োগ, পরত্ব, অপরত্ব, বুদ্ধি, সুখ, দুঃখ, ইচ্ছা, দ্বেষ ও প্রযত্ন। ঋষি কণাদ এই সতেরটি পদার্থর উল্লেখ করেছিলেন। পরবর্তী টীকাকারগণ তার সঙ্গে আরও সাতটি যোগ করেছেন, শব্দ, গুরুত্ব, দ্রবত্ব, স্নেহ, সংস্কার, পাপ ও পুণ্য।

কর্ম পদার্থ পাঁচটি – উৎক্ষেপণ, অবক্ষেপণ, আকুঞ্চন, প্রসারণ ও গমন।

সামান্যপদার্থ –বস্তু বা জীবের জাতিগত ধর্ম অর্থাৎ তাদের সাধারণ ধর্মকে সামান্য ধর্ম বলে । যেমন ধাতুর ধর্ম তার ধাতব বৈশিষ্ট্য, গরুর বা বাঘের ধর্ম তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য।

বিশেষ পদার্থ – বিশেষ পদার্থের কথাও আগেই বলেছি।

সমবায় পদার্থ – সম্বন্ধ-বিশেষের নাম সমবায়। যেমন ঘটের সঙ্গে মাটির সম্বন্ধ, বস্ত্রের সঙ্গে সুতোর সম্বন্ধ কিংবা কর্তার সঙ্গে কর্মের সম্বন্ধ।

অভাব পদার্থ – অভাবের অর্থ কোন কিছুর অস্তিত্ব না থাকা।  এই অভাবও চার প্রকারের। যেমন প্রথমতঃ প্রাগভাব (প্রাক্‌+অভাব) –কোন বস্তু সৃষ্টি হওয়ার আগে যে অবস্থা থাকে, যেমন মাটি আছে কিন্তু ঘট বানানো হয়নি। অতএব ঘট এখানে প্রাগভাব পদার্থ। দ্বিতীয়তঃ ধ্বংসাভাব – কোন বস্তু নষ্ট হলে বা মৃত্যু হলে যে অভাব হয়, যেমন ঘট বানানোর পর ভেঙে গেল, ঘট এখানে ধ্বংসাভাব পদার্থ। তৃতীয়তঃ ভেদাভাব – দুই বস্তুর মধ্যে প্রভেদ বোঝা যায় – যেমন মাটি দিয়ে তৈরি ঘট এবং মাটির বাড়ির মধ্যে ভেদ-অভাব পদার্থ লক্ষ্য করা যায়, যদিও দুটিই মাটি থেকেই নির্মিত। চতুর্থতঃ অত্যন্তাভাব পদার্থ –ঘট ও বস্ত্রের মধ্যে যে অভাব সেই অভাবকে অত্যন্তাভাব পদার্থ বলা হয়েছে। দুটি বস্তুর উপাদান সম্পূর্ণ আলাদা। এই অভাব পদার্থের বিষয়টি ঋষি কণাদের তত্ত্বে ছিল না, এটিও পরবর্তী ব্যাখ্যাকাররা আরোপ করেছিলেন।

এখন ঋষি কণাদ বলছেন, এই যে ছ’ প্রকার পদার্থের - দ্রব্য থেকে সমবায় – তত্ত্বজ্ঞানই হল আত্মকর্ম। এই তত্ত্বজ্ঞানের জন্যে শ্রবণ, মনন এবং নিদিধ্যাসনের অনুশীলন করতে হয়। এই তত্ত্বজ্ঞান হলেই দেহ যে আত্মা নয় সেই উপলব্ধি আসে। তখন মন থেকে রাগ–দ্বেষ বিলুপ্ত হয়। রাগ-দ্বেষ দূর হয়ে গেলে ধর্মাধর্মে প্রবৃত্তি থাকে না। ধর্মাধর্মের প্রবৃত্তি না থাকলে পুনর্জন্ম হয় না। আর পুনর্জন্ম না হলেই দুঃখ থাকে না। অতএব সকল দুঃখের অবসানই মোক্ষ।

ঋষি কণাদ যে সময়ে পরমাণু এবং তার সঙ্গে বিশেষ পদার্থের তত্ত্ব নিয়ে এসেছিলেন, সেটিকে পরবর্তী কালের ব্যাখ্যাকাররা যদি ঈশ্বরের ছাঁচে না ফেলে, ঋষি কণাদের পথেই আরও গভীরে হাঁটতেন, হয়তো তাঁরাই বিশ্বের পদার্থবিদ্যা এবং রসায়নে পথিকৃৎ হতে পারতেন। কিন্তু তা হবার নয়, কারণ সর্ব বিষয়েই ঈশ্বরের উপপত্তি ভারতীয় মস্তিষ্কের “বিশেষ পদার্থ” যে!

চলবে...


রবিবার, ৭ জুন, ২০২৬

সম্মোহন

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "

প্রবন্ধ গল্প - " আগুনের পরশমণি - পর্ব ১ "

প্রবন্ধ গল্প - " ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ১ "

প্রবন্ধ গল্প - " খাই খাই - পর্ব ১ "



এর আগের গল্প - " মানিকজোড় 


 

 

বাজারের গেটের ধারে মানিকদার চায়ের দোকান। প্রতি রবিবার বাজার সেরে ওখানে এক কাপ চা খাওয়া আমার বহুদিনের অভ্যাস। পাড়ার অনেকের সঙ্গে দেখা হয়, নানান কথাবার্তা আর খবরের আদান-প্রদান হয়। মানিকদাই হচ্ছে এই তল্লাটের সব খবরের খনি – আর রবিবারটাই হল সে সব খবর তুলে আনার দিন। আজও “মানিকদা, কড়া করে একটা চা দিও”, বলে আমি দোকানের বাইরের বেঞ্চে বসলাম, পায়ের কাছে বাজারের থলিটা রেখে। আর তখনই লক্ষ্য করলাম, দোকানের ভেতরের বেঞ্চে একজন সাধুমহারাজ বসে রয়েছেন আর চায়ের গ্লাসে পাঁউরুটি ডুবিয়ে খাচ্ছেন। তার সামনে ডান হাত মেলে বসে আছেন অমলদা। বেশ কৌতূহল হচ্ছিল, এপাড়ায় এমন সাধুমহারাজ কেউ আছেন, কোনদিন শুনিনি তো।

মানিকদা আমার হাতে চায়ের গেলাস দিতে কাছে এলে নীচু গলায় জিজ্ঞাসা করলাম, “কী ব্যাপার, মানিকদা? তোমার দোকানে সাধুবাবার আবির্ভাব?” মানিকদাও ফিসফিস করে উত্তর দিল, “হিমালয়ের থেকে সোজা এসে এখানেই পা রেখেছেন। খিদে পেয়েছে বললেন, তাই ওই চা আর পাঁউরুটি দিলাম। এরমধ্যেই অনেকে হাত-টাত দেখিয়ে ওঁকে দিয়ে তাদের ভাগ্যবিচার করে নিয়েছে। মাইতিবাবু, চাটুজ্জেমশায়, সেনবাবু, এখন ওই অমলবাবু। যা যা বলছেন – সব নাকি মোক্ষম মিলে যাচ্ছে। তোমার হাতটাও একবার দেখিয়ে নাও না, মুকুল। বিয়ে থা করলে না, একা একা থাক, শরীরগতিক কেমন যাবে...”। মানিকদা দোকানের ভেতরে চলে যেতে, আমি গেলাসে চুমুক দিয়ে সাধুবাবাকে দেখতে লাগলাম।

বেশ হাট্টাকাট্টা জব্বর চেহারাখানি বাবাজির। তার ওপর মাথাভর্তি ঝাঁকড়াচুল নেমে এসেছে ঘাড় অব্দি। কপালে লম্বা সিঁদুরের তিলক। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, দুহাতে রুদ্রাক্ষের বালা। পরনে রক্তাম্বর – খালি গায়ে লাল রঙের একটা চাদর, কাঁধের পৈতেটা বেশ মোটা এবং ধবধবে সাদা। সাধুবাবাজিদের ওপর আমার একেবারেই বিশ্বাস নেই। কিন্তু সব মিলিয়ে এই বাবাজির চেহারায় বেশ একটা ব্যক্তিত্ব আছে সেটা মানতে হবে। বাবাজি চা খেতে খেতে অমলদার সঙ্গে নীচু স্বরে কথা বলছিলেন, আমি শুনতে পাচ্ছিলাম না। এটাও আমার একটু অবাক লাগল। সাধারণতঃ এ ধরনের সাধুবাবাজিরা – সকলকেই তুই-তোকারি করে, আশেপাশের সব লোককে শুনিয়ে ডেকে-হেঁকে কথা বলেন। যাতে সবাই তাঁদের প্রতি আকৃষ্ট হন। কিন্তু ইনি দেখলাম সেরকম না, নীচু স্বরে - প্রায় ফিসফিস করে অমলদার সঙ্গে কথা বলছেন।

চা শেষ করে কিছুক্ষণ বসে রইলাম বেঞ্চে। আজকে যারাই দোকানে আসছে, দেখছি বাবাজিকে নমস্কার করে ভেতরে গিয়ে তাঁর কাছকাছি বসছে। বুঝলাম আজ আর অন্যদিনের মতো আড্ডা জমার আশা নেই। কাজেই উঠে পড়লাম। টেবিলে খালি গেলাসটা রেখে মানিকদাকে চায়ের দাম দিতে দিতে নীচু স্বরে বললাম, “আসি গো মানিকদা, আজ আর আড্ডা জমবে না। সবাই দেখছি নিজেদের ভাগ্য গুছোতেই ব্যস্ত। আমার তো ভাগ্যই নেই, তো গুছোবো কী?”

কথাটা বলে সবে পেছন ফিরেছি, গম্ভীর গলার একটা মন্তব্য কানে এল, “ওহে বাচাল, ভাগ্য নিয়েই মানুষের জন্ম হয়, গোছাতে হয় না। মানুষের আলসেমি আর বোকামিতে সেই ভাগ্যের ওপর যখন পলি জমে ওঠে – আমরা সেই পলি সরিয়ে তার ভাগ্যটাকে একটু মেজেঘষে দিই”।  

কথাটা শুনে আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম, কাপালিক ভদ্রলোক আমার দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন, অর্থাৎ আমাকেই তিনি “বাচাল” বলে ডাকলেন! বাচাল মানে, যে না জেনে, না বুঝে অনেক কথা বলে। আমিও কাপালিক ভদ্রলোকের চোখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। কতক্ষণ মনে নেই, হয়তো আধ মিনিট, তারপর চিন্তা করলাম, এইসব বুজরুক কাপালিকদের কথার উত্তর দেওয়ার মানে হয় না। এদের চালাকির মুখোশ খুলে দিয়েছেন, অনেক অনেক বিজ্ঞানী এবং বিজ্ঞানমনস্ক মানুষরা – কিন্তু তাতেও সাধারণ মানুষের বিশ্বাসে এতটুকুও চিড় ধরেনি। কাজেই আমি মৃদু হেসে বাড়ির পথে পা বাড়ালাম।

 

 

বাড়ি এসে কলমিকে বললাম, “এই নে বাজারের থলিটা ধর। আর ঝট করে এককাপ চা করে খাওয়া তো”।

কলমি মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, “খালি পেটে অত চা খেতে হবে না, মামা। সকালে হয়েছে একবার, আরেকবার খেয়ে এলে মানিককাকুর দোকান থেকে। আমার জলখাবার রেডি, জামাটা খুলে টেবিলে বস, আমি পাঁচমিনিটের মধ্যে পরোটা-আলুভাজা নিয়ে আসছি”। 

কলমি আমার ভাগ্নী হলে কী হবে, আমি ওকে রীতিমতো ভয় পাই। কলমির “হ্যাঁ” মানে হ্যাঁ আর “না” তো না – কথার নড়চড় করে না। কড়া শাসন – অবিশ্যি সে আমার ভালোর জন্যেই। কলমি খুব ভালো মেয়ে, আর আমাকে ভালোওবাসে খুব। তাই বেশি বকাঝকা করতে পারি না। আসলে ওর মা অন্নদাদিদি আমাদের বাড়িতে কাজ করেন আমার ছোট্টবেলা থেকে। আমার মাও খুব ভালোবাসতেন অন্নদাদিদিকে। আমার ছ’বছর বয়েসে বাবা মারা যান, আর মাও চলে গেলেন আমি যখন বিএসসি থার্ড ইয়ারে পড়ি। আমার অসুস্থ মা মারা যাবার বেশ কদিন আগে থেকে, অন্নদাদিদির হাত ধরে অনেকবারই বলেছিলেন, ‘আমি আর বেশিদিন বাঁচবো না রে, অন্ন, আমি চলে গেলে মুকুলকে একটু দেখিস’। এই সব নানা কারণে অন্নদাদিদি ও তার মেয়ে কলমি এবাড়ির আলাদা কেউ নয়। অন্নদাদিদির স্নেহ-আদরে সে সময়ে মায়ের চলে যাওয়ার কষ্টটা সামলে উঠতে, বেশ সুবিধেই হয়েছিল! 

সকালে কলমি আসে, ঘরদোর ঝাড়া-পোঁছা করে, আমার জলখাবার বানিয়ে দিয়ে যায়। একটু বেলায় আসে অন্নদাদিদি। দুপুরের রান্নাবান্না সেরে, আমার খাওয়াদাওয়ার পাট চুকিয়ে বাড়ি ফেরে। কলমির মেয়ে ফুটকি রবিবারদিন মায়ের সঙ্গে এ বাড়িতে আসে। ফুটকি আমার কাছে সকালে লেখাপড়া করে আর আমার সঙ্গে দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে, দিদিমার সঙ্গে বাড়ি ফেরে। ফুটকি ক্লাস থ্রিতে পড়ে।

 কলমি রান্না ঘরে ঢুকে যেতে ফুটকি আমার পাশে এসে বসল, বলল, “দাদু, টোম্যাটো এনেছ? বলেছিলে আজ চাটনি হবে”?

“আমি জামা খুলতে খুলতে বললাম, “একশ বার এনেছি, শীতকালে টম্যাটোর চাটনি - খেজুর, কিসমিস দিয়ে যেমন জমে, তেমন আর কোন সময় হয় না”। ছটফটে ফুটকি সোফা থেকে নেমে দৌড়ে গেল, রান্নাঘরের  দরজার পাশে বসিয়ে রাখা বাজারের থলিটা কাত করে মেঝেয় ঢেলে দিল। মেঝেময় যা ছড়িয়ে পড়ল, তা দেখে আমি আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠলাম, “ফুটকি শিগ্‌গির পালিয়ে আয় এদিকে, কলমি তুই রান্নাঘর থেকে একদম বেরোস না... ওখনাএই দাঁড়া, আমি দেখছি কী করা যায় ...!!”

আমার চিৎকারে ফুটকি আমার পাশে এসে আমার হাঁটু ধরে দাঁড়িয়ে অবাক চোখে আমার মুখের দিকে তাকাল। ওদিকে রান্নাঘরের দরজায় কলমি মেঝেয় ছড়ানো আনাজগুলোর দিকে তাকিয়ে, অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়েছে, মামা?”

রাগে আমার মাথা গরম হয়ে গেল, বললাম, “দেখতে পাচ্ছিস না, নাকি? কিন্তু বাজারের থলির মধ্যে এসব  কোত্থেকে এল? আশ্চর্য তো! ওই সবুজ রঙের সরুসরু সাপগুলো? কিলবিল করছে - ওগুলোর নাম জানিস, চিনিস? আর ওই গোব্দা সবুজ ব্যাংদুটো? আর ওদিকে দেখ, পাঁচটা জোঁক লিটপিট করছে কেমন। জোঁক কী এত মোটা হয়? ব্যাটারা একবার ধরলে শরীরে সব রক্ত এক চুমুকে শেষ করে দেবে, খুব সাবধান। আর ওই প্যাকেটে এত আরশোলাই বা এল কী করে? প্যাকেটটা ভাগ্যে বন্ধ, না হলে এতক্ষণ ফরফরিয়ে ঘরময় উড়ে বেড়াত! অনেক শাঁখ দেখেছি – তবে এমন জ্যান্ত শাঁখকে ঘরের মেঝেয় হেঁটে চলে বেড়াতে কোনদিন দেখিনি! আর ওই টুকটুকে লাল শামুকগুলোও মনে হচ্ছে জ্যান্ত! শামুক এমন লাল টুকটুকে হয় কোনদিন জানতামই না।”

রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে কলমি আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে দাঁড়িয়েই আছে, একটা কথাও বলছে না। বুঝতে পারছি, ব্যাপার দেখে কলমিটাও হতভম্ব হয়ে গেছে! খুবই স্বাভাবিক।

কিন্তু ফুটকি আমার হাঁটু ছেড়ে মেঝেয় পড়ে থাকা আনাজগুলোর সামনে উবু হয়ে বসে হাত বাড়াল, খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল, “ও দাদু, তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি”? তারপর তার ছোট্ট হাতের আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেখিয়ে আমায় বোঝাতে লাগল, “সাপ কোথায় দেখছ, ওগুলো তো বিন্‌স্‌, গাজর, ক্যাপসিকাম, খেজুর, শাঁকালু আর টোমাটো...হি হি হি হি...”।

আমি ছুট্টে গেলাম আর এক ঝটকায় ফুটকিকে কোলে তুলে নিলাম। ফুটকির কথায় পাত্তা না দিয়ে, কলমিকে বললাম, “এগুলোকে নিয়ে এখন কী করা যায় বলতো? আমার তো মাথায় কিছুই আসছে না”।

 এবার খুব ঠাণ্ডা গলায় কলমি বলল, “তুমি ফুটকিকে নিয়ে তোমার ঘরে যাও তো। ওসব আমি এখনই ঝেঁটিয়ে বিদেয় করছি, চিন্তা করো না। আমি তোমার ঘরে জলখাবার দিয়ে আসছি”।

এমনিতেই ভয়ে আমার বুক ধুকপুক করছিল, তারওপর কলমির কঠিন আদেশ শুনে আমি আর তর্ক করতে ভরসা পেলাম না। ফুটকিকে কোলে নিয়ে ঘরেই গেলাম।

ফুটকিকে কোল থেকে নামিয়ে আমি বিছানায় বসলাম। ফুটকিও আমার পাশে বসল, আমার বুকে হাত রেখে বলল, “তোমার শরীর খারাপ লাগছে, দাদু?”

কলমি এই সময়েই দু হাতে দুটো প্লেট নিয়ে ঘরে ঢুকল, তিনটে পরোটাওয়ালা প্লেটটা আমার হাতে দিল আর অন্য প্লেটটা দিল ফুটকিকে – তাতে একটা পরোটা আর আলুভাজা। তারপর একই রকম কঠিন স্বরে বলল, “এই ঘরে বসেই খেয়ে নাও, মামা। ফুটকি, দাদুর কাছেই থাকবি, এই ঘর ছেড়ে বের হলে, তোর পিঠ কিন্তু আস্তো রাখবো না। মনে থাকে যেন”।

ঘরের মেঝেয় বসে আমি আর ফুটকি চুপচাপ খেতে শুরু করলাম। কলমির ভয়ে আমরা দুজনেই একটাও কথা বলছিলাম না। খাওয়া শেষ হতেই কলমি আমার চায়ের কাপ দিয়ে গেল, আর এঁটো প্লেট দুটো তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় বলল, “মামা তুমি চা খেয়ে বিছানায় একটু গড়িয়ে নাও। ফুটকি দাদুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিবি, কেমন? দাদু একটু আরাম পাবে”। ফুটকি এত্তোবড়ো ঘাড় নাড়িয়ে সায় দিল। তারপর কলমি আমার ঘরের দরজাটা চেপে ভেজিয়ে দিয়ে বাইরে চলে গেল। 

 

অন্যদিন কলমি আমায় জলখাবার খাইয়ে ওর বাড়ি চলে যায়। আজ যায়নি। আমাকে আর ফুটকিকে ঘরবন্দী করে রেখে, কলমি ফোন করেছিল সন্ময়কে। সন্ময় আমার সবচে' প্রিয়বন্ধু – ও প্রায়ই আমার বাড়ি আসে আমিও ওর বাড়ি যাই। মাসিমা, মানে সন্ময়ের মা আমাকে সন্ময়ের মতোই খুবই স্নেহ করেন। আমার সেই বাল্যবন্ধু সন্ময় আমাদের এক ডাক্তার বন্ধু সমরকে নিয়ে কখন এসেছে আমি জানতেও পারিনি। আমি তখন অঘোরে ঘুমোচ্ছিলাম। বাইরের ঘরে দুজনকে বসিয়ে, চা দিয়ে, কলমি বাজার থেকে ফেরার পর আমার অদ্ভূত আচরণের কথা সবিস্তারে বলেছে।

সব কথা শুনে সমর জিজ্ঞাসা করল, “তোমার মামা এখন কী করছে?”

কলমি হাসল, বলল, “ঘুমোচ্ছে। আমি চুপিচুপি দরজা খুলে দুবার দেখে এসেছি। আমার মেয়েও আছে, সেও তার দাদুর গলা জড়িয়ে ধরে ঘুমে এক্কেবারে কাদা”।

“এই অবেলায় ঘুমোচ্ছে? কতক্ষণ হল?”

“সন্ময়মামাকে ফোন করেছি সোয়া দশটা নাগাদ, ধরুন সেই সময় থেকেই”।

সন্ময় বলল, “হুঁ - তার মানে প্রায় ঘন্টা দেড়েক। দেখবি নাকি একবার?”

“দেখব তো বটেই – চ ওর ঘরে যাই”।

সন্ময় এগিয়ে গেল, ভেজানো দরজা আস্তে আস্তে খুলে ভেতরে ঢুকল। সমর এসে আমার হাতটা তুলে নিতে আমার ঘুমটা ভেঙে গেল। ঘাড় ফিরিয়ে দুই বন্ধু সমর আর সন্ময়কে দেখলাম, তাদের পিছনে দাঁড়িয়ে কলমি। আর আমার পাশেই গুটিসুটি মেরে ঘুমোচ্ছে ফুটকি। অবাক হয়ে আমি আস্তে আস্তে উঠে বসলাম, যাতে ফুটকির ঘুম না ভাঙে।

আমি নীচু স্বরে বললাম, “আমার কী হয়েছে কি? এরকম অসময়ে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম কেন? তোরা কখন এলি, আর আমার দিকে অমন তাকিয়েই বা রয়েছিস কেন?”

সন্ময় বলল, “তোর কিচ্ছু হয়নি, আমি আর সমর এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, তোর সঙ্গে দেখা করতে এলাম। কলমি বলল, তুই ঘুমোচ্ছিস। এই অসময়ে তুই ফুটকিকে না পড়িয়ে, ঘুমোচ্ছিস কেন? সেটাই দেখতে এলাম”। আমাদের কথাবার্তার মধ্যে সমর তার স্টেথোস্কোপ কানে নিয়ে বুক দেখল, তারপর প্রেসার মাপার যন্ত্র বের করে ফসফসিয়ে প্রেসার মাপতে বসল। সব কিছু হয়ে যেতে আমার চোখের কোল টেনে দেখল, জিভ বের করতে বলল, সব দেখে ঘাড় নেড়ে বলল, “কোন গড়বড় তো নেই! রাত্রে ঘুম-টুম ঠিক হয়েছিল? বাজার থেকে ফিরে কী হয়েছিল? মাথা-টাথা ঘুরে গিয়েছিল নাকি?”

ঘুম থেকে উঠে আমার মাথাটা কেমন যেন ভোম মেরে ছিল। বাজার থেকে ফিরে কী করেছি, কী বলেছি সব ভুলেই গেছিলাম। সমরের কথায় হঠাৎ মনে পড়ে গেল, বললাম, “আর বলিস না, বাজার থেকে ফিরতে ফুটকি বাজারের থলিটা মেঝেয় ঢেলে দিতেই দেখলাম সবুজ রঙের গুচ্ছের সাপ কিলবিল করছে, আরও কী কী সব যেন দেখলাম। অদ্ভূত অদ্ভূত সব প্রাণী বাজারের থলি থেকে ছাড়া পেয়ে মেঝেয় নড়ে চড়ে বেড়াচ্ছে...”!

সমর বলল, “অদ্ভূত, বাজারে উল্টোপাল্টা কিছু খেয়েছিলি?”

আমি একটু রেগেই গেলাম, “মানিকদার দোকানে একটা চা খেয়েছি, উল্টোপাল্টা আবার কী খাব?”

সন্ময় বলল, “আহা, রেগে যাচ্ছিস কেন? কিছু একটা তো হয়েছিল – তা নাহলে... কলমি, মামার বাজারের আনাজগুলো রয়েছে, না কি সব রান্না করে ফেলেছিস?”

কলমি বলল, “সব আছে, ঝুড়িতে তুলে রেখেছি। নিয়ে আসব?” কলমি দৌড়ে গেল এবং ঝুড়িটা এনে সামনে রাখল।

আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম, “এই - এই যে বিন্‌স্‌গুলোকে মনে হয়েছিল জ্যান্ত সাপ, খেজুরগুলোকে জ্যান্ত আরশোলা...কেন এমন হল বল তো?” প্রশ্নটা করলাম সমরকে।

সমর এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে, বলল, “বিশেষ কারুর সঙ্গে বাজারে তোর দেখা হয়েছিল?”

এই কথায় আমার মনে পড়ল সেই কাপালিকের কথা। আমি সেই কাপালিক সম্পর্কে যা যা জেনেছিলাম, এবং যা যা ঘটেছিল সব বললাম। আমার কথা শেষ হতে সবাই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। প্রথম কথা বলল কলমি, “মামা, তোমার ওই সব লোকদের সঙ্গে লাগতে যাওয়ার কী দরকার ছিল? ওরা অনেক কিছু পারে। তোমরা বিশ্বাস করো না, কিন্তু আমরা জানি”।

সন্ময় একটু বিরক্ত হয়েই বলল, “ক বছর পরে মানুষ হয়তো চাঁদে, মঙ্গলে ডেলি প্যাসেঞ্জারি করবে! সেখানে কে এক কাপালিক তার অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে ফিজিক্সের প্রফেসার মুকুল সেনকে এভাবে জব্দ করে দিল?”

সমর মুচকি হাসল, বলল “ধূর, এটাকে অলৌকিক ভাবছিস কেন? এটা তো পিয়র কেস অব হিপ্নোটিজ্‌ম্‌, যাকে বাংলায় বলে সম্মোহন। বোঝা যাচ্ছে ভদ্রলোক আর কিছু না জানুন, সম্মোহনটা জানেন। সম্মোহন না জানলে, ওঁদের চলবে কী করে? আমাদের মুকুল কিছুটা সম্মোহিত হয়েছে ঠিকই – কিন্তু এ কথাও বলব সেই কাপালিক ভদ্রলোক মুকুলকে কাবু করতে পারেননি। পারলে পাজামার পিছনে ডান হাতটা ঘষে সাফ করে, মুকুলও হাত মেলে ধরত ওই ভদ্রলোকের সামনে”।

সন্ময় বলল, “বুঝলাম। কিন্তু মুকুলের মধ্যে এখনও সেই সম্মোহনের রেশ রয়ে যায়নি তো?”

সমর বলল, “আরে না, না, কিচ্ছু না। মুকুল যে ভাবে ঘুমিয়েছে, সে সম্মোহনের রেশ কেটে গেছে। আর কোন চিন্তা নেই”।

আমি ভয়ে ভয়ে কলমিকে বললাম, “আমাদের সকলকে চা খাওয়াবি নাকি, কলমি?”

আমার কথার ভঙ্গিতে কলমি হেসে ফেলল, বলল, “ওরকম ভয়ে ভয়ে বলছ কেন, মামা? সবার জন্যেই চা আনছি – আর তার সঙ্গে অমলেট। একটু বসো”।

কলমির কথায় সমর আর সন্ময় হেসে ফেলল। ওদের হাসির শব্দে এতক্ষণে ঘুম ভাঙলো ফুটকির - অবাক দুই ডাগর চোখ মেলে সে আমার দিকে একবার তাকাল, তারপর দেখতে লাগল তার দাদুর বন্ধুদের।    

--০০--    

    


শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ৯

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ৮ " 


 

মেনগেটের সামনে দিবাকর গাড়ি দাঁড় করাতেই রামশরণ লোহার গেট খুলে দিল। দিবাকর গাড়িটা ভেতরে ঢুকিয়ে দাঁড় করাল সদর দরজার সামনে। হর্নের আর গাড়ির আওয়াজে দরজা খুলে দরজার ফ্রেমে এসে দাঁড়াল কনি। পরনে হলুদ রংয়ের তাঁতের শাড়ি, ঘন খয়েরি চওড়া পাড়, শাড়ির জমিনে একই রঙের বুটি। পিঠের ওপর ছড়ানো এলো চুল। কপালে একই রঙের ছোট্ট বিন্দি। সুকন্যার দিকে তাকিয়ে, গাড়ি থেকে নামতে কয়েক মুহূর্ত দেরি হয়ে গেল সুনেত্রর।

সিঁড়ির সামনে এগিয়ে এসে উজ্জ্বল চোখে, প্রসন্ন মুখে সুকন্যা বলল, “এসো”এখন তার সদ্য স্নাত নির্মল মুখে কোন কান্নার ছায়া নেই। তখন কেন কাঁদছিল কনি? ভাবতে ভাবতে ঘরে ঢুকল সুনেত্র।

“আমার কিন্তু বীভৎস খিদে পেয়েছে, সুনুদা, চট করে হাত মুখ ধুয়ে বসে পড়ো আগে, একসঙ্গে খাবো। হারু খাবার দিয়ে দাও। সুনুদার সারথি দিবাকরকেও খাইয়ে দিও কিন্তু”

ভেতর থেকে হারুর গলা পাওয়া গেল, “টেবিলে প্লেট দিয়ে দিয়েছি বৌদিমণি, বসলেই সার্ভ করে দেব”

“দিবাকর বোধহয় খেয়ে নিয়েছে, ও তো বাড়ি থেকে খাবার আনে” সুনেত্র বলল।

“ঠিক আছে, তুমি চাপ নিও না তো, সুনুদা। দুপুরবেলা বাড়িতে এসে কেউ অভুক্ত থাকবে, এটা আমার একেবারেই সহ্য হয় না”সুনেত্র আর কিছু বলল না, বেসিনে গিয়ে হাত ধুয়ে নিল, পাশে কনি দাঁড়িয়েছিল হাতে তোয়ালে নিয়ে। তোয়ালেতে হাত মুছে, সুনেত্র বলল, “হঠাৎ একেবারে নেমন্তন্ন, তার ওপর আবার লাঞ্চ, কী ব্যাপার বলতো”?

“বসো তো আগে, তারপর সব কথা হবে”

সুনেত্র এবং সুকন্যা দুজনেই ডাইনিং টেবিলে সামনাসামনি বসল। হারু অপেক্ষা করছিল। দুজনকে প্লেট এগিয়ে দিল। একধারে রাখল ঝিরিঝিরি করলা ভাজা। তারপর ভাত। খাওয়া শুরু করতে সুকন্যা বলল, “জানি না, এতদিনে তোমার খাওয়ার অভ্যেসগুলো পাল্টে গিয়েছে কিনা”

“ভাবিস না, একই আছে, প্রথম পাতে ঈষৎ তিক্ততা আজও ভালোবাসি। আমার ফেভারিট, তখনও ছিল, আজও আছে। বাট, এরপর কী?

“আরে এটা তো শেষ করো আগে। এটাই শেষ করলে না, তার আগে পরেরটার চিন্তা। রহু ধৈর্যং। ক্রমশঃ প্রকাশ্য”

“বাবা, খেতে বসে সাসপেন্স? ওসব তো আগে হতো, আজকাল তো সারি সারি আহার্য পাত্রে-পাত্রে সাজিয়ে রেখে দেওয়ার নিয়ম, মনোমত খাবার তুলে নিতে হয় প্লেটে”

“একি তোমার বুফে নাকি? এ হচ্ছে সামনে বসিয়ে, থালায় ব্যঞ্জন সাজিয়ে, তালপাতার পাখা নাড়তে নাড়তে খাওয়ানো। আজকাল এসি হয়ে গিয়ে তালপাতার পাখাই হাওয়া হয়ে গেছে। না হলে...”

“রাজলক্ষ্মী না অভয়া?” করলা ভাজা শেষ করে ভাত ভাঙল সুনেত্র। হারু ভাতের ওপর বিউলির ডাল দিল এক হাতা। তারপরে আলু পোস্ত।

“তুমি আর যাই হও, সুনুদা, শ্রীকান্ত হওয়ার মতো গুণ বলো গুণ, দোষ বলো দোষ - কোনটাই নেই। তোমার সুগারের বালাই নেই তো? নিজেই ডাক্তার যখন থাকলেও, কন্ট্রোল করে চলো নিশ্চয়ই”

“আলু রয়েছে বলে বলছিস? নাঃ, সারা জীবনটাই যেহেতু তিক্ততামাখা, তাই আমার রক্তে মিষ্টত্বের বাহুল্য এখনও খুঁজে পাইনি। হারু আর একটু ডাল দাও তো, ভাতগুলো জুত করে মাখি”

“আরে রে করছো কি? সবভাতগুলো মেখে ফেললে, মাছ দিয়ে কি খাবে?”

“মাছ, এর পরে না খেলেই কি নয়? অনেকদিন পর এমন স্বাদের বিউলিডাল-আলুপোস্ত খাচ্ছি, নাই বা হলো মাছ। আমার না আছে আলুর দোষ এবং না আমি “পঞ্চ-ম”-এর রসিক। শ্রীকান্ত হবার এলেম নেই ঠিকই, কিন্তু বরং অনেকটা তোর সেই দাদুর মতো কিম্ভূতকিমাকার। আমিষহীন জীবনে বিধবার একমাত্র মুখরোচক বিলাসিতা পোস্ত। সে আলুর হোক, ঝিঙের হোক কিংবা পোস্তর বড়া। এটা তো মানবি?”

“তুমি কি বিধবা”?

“মোটেই না, ঠিকঠাক বললে অকৃতদার, কিন্তু বৈধব্যের থেকে তার খুব কি পার্থক্য থাকে”

“থাকে না? কি বলছ তুমি, সুনুদা। তোমার জীবন নিয়ন্ত্রণহীন আজগুবি বাতাসের মতো। তার যত্র তত্র যা খুশী করে ফেলার অদ্ভূত প্রবণতা। আর বিধবাদের পুরোটাই তো নিয়ন্ত্রণ, বদ্ধ ঘরের বুকচাপা বাতাস। একঘেয়েমির গন্ধমাখা”সুনেত্র কিছু বলল না। একটু হাসল। হারু চট করে সুনেত্রর পাতে বেশ বড়সড় একটা পাবদা মাছ নামিয়ে দিল। সেই পাবদা সরষের রসে আপ্লুত।        

“হারু, তুমিও এভাবে আমার সর্বনাশ করতে মেতে উঠলে কেন বলো তো”? হারু হাসল, বলল, “পোস্ত মাখা ভাতটা শেষ করে ফেলুন, স্যার। তারপর আরেকটু ভাত দিই, সরষের ঝোল দিয়ে মেখে নিন”

 

খাওয়া দাওয়া সেরে, হাতমুখ ধুয়ে ড্রয়িং রুমে বসতেই সুনেত্রর হাতে একটি সাজা পান বাড়িয়ে দিল সুকন্যা। নিজেও একটি পান মুখে নিয়ে গম্ভীর মুখে বলল, আজ আর মুখোমুখি পান খাওয়া হল না, সুনুদা, সোফায় মুখোমুখি বসেই পান চিবোতে হবে

হেসে ফেলল সুনেত্র, তারপর বলল, এই কথাটা এমন গম্ভীর মুখে জজ সায়েবের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার মতো বলবার কী আছে?

“না মানে, তুমি হয়তো আঁচ করে রেখেছিলে - আজও সেই রাত্রের মতো, জড়িয়ে ধরে মুখোমুখি পান খাওয়া হবে – সে কথাই বলছিলাম। কিন্তু সে তো আর হল না”। আড়চোখে সুনেত্রর দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুকন্যা বলল।

সুকন্যার তিরছি নজর এবং দীর্ঘশ্বাস ফেলাটুকু খুবই উপভোগ করল সুনেত্র, তারপর হাসিমুখে বলল, “তাতে তো মনে হচ্ছে তোরই মনে হুতাশ বেশি”!

“ওরকম চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলছ, কেন? বিকাশ রায়ের মতো?” সুকন্যা একটু ঝাঁজ মিশিয়ে বলল, “সব দোষ আমারই না? তুমি একবারে গঙ্গাজলে ধোয়া তুলসী পাতা...”।

সুকন্যার চোখে চোখ রেখে সুনেত্র সোফা ছেড়ে উঠে গেল সুকন্যার সামনে, নাটকীয় ভাবে হাঁটু গেড়ে বসল মেঝেয়। তারপর দুহাতে চুল ধরে টেনে নামাল সুকন্যার মাথাটা, এবং মুখ তুলে সুকন্যার উন্মুখ অধরে ডুবিয়ে দিল নিজের ঠোঁট। দীর্ঘ চুম্বনে আবিষ্ট রইল দুজনেই। উভয়ের হৃৎ-স্পন্দনের গতি এতটাই বেড়ে উঠল, এসি চলা নিঃশব্দ ঘরে দুজনেই শুনতে পেল দুটি হৃদয়ের কলধ্বনি।

“ছাড়ো, কেউ এসে পড়বে...”, অস্ফুটে বলল সুকন্যা। সুনেত্র ছেড়ে দিল। মেঝে থেকে উঠে আবার সোফায় বসল। সুকন্যার দিকে তাকাল। খুব মনোযোগ দিয়ে সুকন্যা এখন এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুল এবং শাড়ির আঁচল ঠিক করছিল – দীর্ঘ সময় ধরে। এতটাই কি বিস্রস্ত হয়েছে সুনেত্রর কুন্তল এবং অঞ্চল, মনে হল না সুনেত্রর। বরং, তার মনে হল, ওই সময়টুকুতে সে গুছিয়ে নিতে চাইছে উথাল-পাথাল হয়ে যাওয়া তার অন্তরটাকে।

দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে সুনেত্র নিজের দিকেও তাকাল এবার। তার আধা-আধুরী জীবনে এই মাধুরীটুকু যেন পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা। বড়ো ইচ্ছে হয় – আজ, এতদিন পরেও তার শুকিয়ে ওঠা ইচ্ছে-লতায় আসুক কিশলয়, ধরুক মুকুল। শীতের শীর্ণ রুক্ষতার পর যেমন আসে বাসন্তী উজ্জীবন। 

পরের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১০ "                 


নতুন পোস্টগুলি

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ১০

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য " ...