ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "
ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১ "
ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "
ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "
ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "
"ধর্মাধর্ম" গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -
গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২
(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)
অথবা
+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।
[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/২ "]
পঞ্চম পর্ব /পর্বাংশ - ৩
৫.১.৪ ন্যায় দর্শন
মহর্ষি গোতম এই দর্শনের প্রবর্তন করেছিলেন। তাঁর আরেকটি নাম অক্ষপাদ, এই কারণে এই দর্শনকে গোতম
বা অক্ষপাদ-দর্শনও বলা হয়ে থাকে। ন্যায় দর্শনের জন্ম খুব সম্ভবতঃ খ্রিষ্টপূর্ব
প্রথম শতাব্দীর শেষদিকে কিংবা খ্রিষ্টাব্দের শুরুর দিকে।
মহর্ষি গোতম বৈশেষিক তত্ত্বের পরমাণুবাদকেই অনুসরণ করেছেন, একমাত্র বিশেষ পদার্থ
ছাড়া স্বীকার করেছেন অন্য সব দ্রব্য পদার্থ। ন্যায় শাস্ত্রে এই তত্ত্বগুলি ছাড়া
আরও ষোলটি পদার্থের অবতারণা করা হয়েছে। এই পদার্থ কিন্তু কোন বস্তু নয়, বরং বিষয় বলাই ভালো।
ন্যায় দর্শন প্রকৃতপক্ষে তর্ক বা বিচার শাস্ত্র। এই শাস্ত্রে তর্ক ও বিচারের
পদ্ধতি এবং তার সঙ্গে প্রমাণ, প্রমেয়, সিদ্ধান্ত ইত্যাদি ষোলটি অঙ্গকে ষোলটি পদার্থ বলা হয়েছে।
যা দিয়ে কোন বিষয়কে নির্দিষ্ট করা যায় তাকেই প্রমাণ বলে। প্রমাণের আবার
রকমফের আছে,
যেমন
প্রত্যক্ষ,
অনুমান, উপমান ও শব্দ। অতএব
অনুমান, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায়
হাইপোথিসিস (Hypothesis)
বলে, সেই অনুমান ভারতীয়
তত্ত্বেও গ্রাহ্য।
পাঁচটি প্রমাণের মধ্যে প্রত্যক্ষ প্রমাণের ব্যাখার প্রয়োজন নেই। অনুমান
প্রমাণের ব্যাখ্যা প্রয়োজন কারণ এটি ন্যায় দর্শনের প্রধান অংশ। খুব সহজ করে বললে, অনুমান হল কার্য দেখে তার
কারণ স্থির করা। যেমন একটা ঘট দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়, একজন মৃৎশিল্পী মাটি দিয়ে এটিকে
গড়েছেন। অথবা ধোঁয়া দেখলে বোঝা যায় তার পিছনে আগুন আছে। এই অনুমানের পাঁচটি অঙ্গ
বা অবয়ব আছে – প্রতিজ্ঞা, হেতু, উদাহরণ, উপনয় ও নিগমন। এগুলির ব্যাখ্যা দেওয়ার থেকে উদাহরণ দিলে
বুঝতে সুবিধে হবে।
ধরা যাক প্রাচীন কালের একদল যাত্রী পাহাড়ি জঙ্গলের পথে দূরদেশে যাত্রা
করছে। পথে সন্ধ্যে হয়ে আসছে, লোকালয়ের কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, অথচ রাত্রিবাসের জন্যে
একটা আশ্রয় তো চাই। হঠাৎ ওই যাত্রীদল দেখল, কিছুটা দূরের পাহাড়ের গায়ে ধোঁয়া
দেখা যাচ্ছে। এই ধোঁয়া দেখে কী কী অনুমান এবং সিদ্ধান্ত করা যায় দেখা যাক, –
১. ধোঁয়া যখন দেখা গেছে, তার পিছনে আগুন অবশ্যই আছে – প্রতিজ্ঞা অর্থাৎ নিশ্চিত
অনুমান।
২. আগুন থাকলে তার ধোঁয়া থাকবেই – এটি হেতু, কারণ তখনকার দিনে কাঠ জ্বেলে আগুন
ধরানো হত (এখনকার গ্যাস বা ইন্ডাকশনে ধোঁয়া বেরোবেই না)।
৩. আগুন যখন জ্বালানো হয়েছে, তখন ওখানে নিশ্চয়ই মানুষ আছে, কারণ মানুষ ছাড়া কেউ আগুন
জ্বালাতে পারে না। - এটি উদাহরণ অনুমান।
৪. মানুষ তার রান্নাঘরে কিংবা অন্য কোন কাজের জন্যেই আগুন ধরিয়েছে –
এটি উপনয় অনুমান।
৫. অতএব ওই পর্বতে মানুষের বসতি অথবা লোকালয় বা গ্রাম আছে, ওইদিকে গেলে রাতের আশ্রয়
মিলতে পারে – এটি নিগমন অনুমান – সিদ্ধান্ত।
উপমান হল জানা বস্তুর ধারণা থেকে অজানা বস্তুকে চিনতে পারা। যে ধাতু
হিসেবে তামা,
ব্রোঞ্জ
চেনে, তার কাছে লোহা অজানা হলেও, সেটা যে একটি ধাতু চিনতে
খুব অসুবিধে হয় না। যে গরুর পাল চেনে, সে ছাগলের পাল দেখেও বুঝতে পারে, এগুলি গৃহপালিত প্রাণী।
এই গেল প্রমাণের কথা। এখন প্রমাণ দিয়ে যে বিষয়ের নিশ্চিত জ্ঞান হয় তাকে
প্রমেয় বলে। ন্যায় শাস্ত্রে প্রমেয় বারো প্রকারের – আত্মা, শরীর, ইন্দ্রিয়, ইন্দ্রিয়ের বিষয়, বুদ্ধি, মন, প্রবৃত্তি, দোষ, প্রেত্যভাব (বারবার জন্ম
ও মৃত্যুর চক্র), ফল, দুঃখ ও অপবর্গ।
অনিশ্চিত বিষয়কে নিশ্চয় করাকে সিদ্ধান্ত বলে। খুব বেশি ভেতরে না ঢুকে
বলা যায়,
প্রমাণ, প্রমেয় ও সিদ্ধান্তের মতো, অন্য পদার্থগুলির মধ্যে
প্রধান হল,
সংশয়, প্রয়োজন, দৃষ্টান্ত, বাদ, বিতণ্ডা, ছল প্রভৃতি মোট ষোলটি
পদার্থ। এই ষোলটি পদার্থ বিচারের অঙ্গ এবং তর্ক-বিতর্কের উপায়।
এই ষোলটি পদার্থ দিয়ে কিসের বিচার করা হবে? শরীর যে আত্মা নয়, তার বিচার হবে এবং
নিশ্চিত সিদ্ধান্ত করে, জ্ঞাত হওয়া যাবে। শরীর যে আত্মা নয়, সেটা জানলে মানুষের
মুক্তি হবে। এই ন্যায় দর্শনে প্রমেয় পদার্থের মধ্যে ঈশ্বরের প্রসঙ্গ কোথাও উল্লেখ
নেই। যা প্রমাণ করা যায় না, তার অস্তিত্ব থাকে কী করে? অর্থাৎ ঋষি গোতমও ছিলেন
নিরীশ্বরবাদী - নাস্তিক!
কিন্তু তাঁর পরবর্তী নৈয়ায়িক পণ্ডিতেরা এই তত্ত্বের “আত্মা” কে দুটি
ভাগে ভেঙে ফেললেন - জীবাত্মা ও পরমাত্মা। তাঁরা আরও বললেন ঈশ্বর কী প্রমাণ সাপেক্ষ
কোন বিষয়?
ঈশ্বর তো
স্বতঃসিদ্ধ-প্রমাণ, তাঁর
জন্যে আবার বিচার কিংবা তর্ক-বিতর্ক কিসের?
পরবর্তী কালে এই বৈশেষিক এবং ন্যায় দর্শনের অজস্র টীকা এবং ব্যাখ্যা
রচনা করেছেন পণ্ডিতেরা। তাঁদের মধ্যে বিখ্যাত কয়েকজন হলেন শঙ্করমিশ্র, বল্লভাচার্য, উদয়ণাচার্য, বার্তিক, বাচষ্পতি মিশ্র, কেশব মিশ্র, গোবর্ধন মিশ্র, জয়দেব মিশ্র, জয়নারায়ণ তর্কপঞ্চানন
প্রমুখ। এক সময়ে এই বঙ্গের নবদ্বীপ এবং ভট্টপল্লী (ভাটপাড়া) ছিল এই ন্যায় শাস্ত্র
চর্চার অন্যতম সেরা পীঠস্থান। শ দেড়েক বছর আগে পর্যন্ত সারা দেশের শিক্ষার্থীরা
ন্যায়-শাস্ত্র পাঠ করতে আসতেন নবদ্বীপ এবং ভাটপাড়ায়।
৫.১.৫ মীমাংসা দর্শন
মহর্ষি জৈমিনি এই দর্শনের প্রবক্তা, এবং খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দী
থেকে খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর কোন সময় এই দর্শন-তত্ত্বের সূচনা হয়। এই দর্শনকে
জৈমিনি দর্শনও বলা হয়। মীমাংসা দর্শনের প্রধান কাজ, বেদের কর্ম-যোগের তাৎপর্য
বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা। মীমাংসা ও বেদান্তের দর্শন-তত্ত্ব খুব ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত
এবং বেশ কিছু ক্ষেত্রে একে অপরের পরিপূরকও বটে। দুই তত্ত্বের এই নিবিড় সম্পর্কের
স্বীকৃতিস্বরূপ বেদান্তকে উত্তর-মীমাংসা অর্থাৎ পরবর্তী ব্যাখ্যা বলা হয়, আর মীমাংসা যেহেতু
বেদান্তের থেকে অনেকটাই পূর্ববর্তী তত্ত্ব, সেই কারণে একে পূর্ব-মীমাংসা বলা
হয়।
বেদের জটিল রীতি ও প্রথা প্রকরণগুলিকে, সঠিক উপলব্ধি ও অনুসরণের সুবিধার
জন্যে মীমাংসা সেগুলির সরল ব্যাখ্যা ও পদ্ধতি শিক্ষা দেয়। উপরন্তু, বেদের কর্তৃত্বকে
প্রতিষ্ঠা করতে,
মীমাংসা
বিস্তারিত কিছু জ্ঞানতত্ত্বের সৃষ্টি করেছে, সেই তত্ত্বগুলি বেদান্তও প্রায়
সম্পূর্ণতঃ স্বীকার করে নিয়েছে। মীমাংসা বলে, দুই ধরনের জ্ঞান আছে – প্রত্যক্ষ
ও পরোক্ষ। পরোক্ষের আবার পাঁচটি বিভাগ আছে, অনুমান, উপমান, শব্দ, অর্থপত্তি এবং অনুপলব্ধি। আমরা এর
আগের দর্শন-তত্ত্বগুলির আলোচনায় প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান ও শব্দ নিয়ে আলোচনা করেছি।
এখন করব অর্থপত্তি ও অনুপলব্ধি নিয়ে।
নিশ্চিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য না পাওয়া গেলেও কোন বিষয়ের পারিপার্শ্বিক
পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে যে আনুমানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তাকে অর্থপত্তি বলা হয়।
উদাহরণ দিলে বিষয়টা স্পষ্ট হবে, - সারাদিন উপবাসে থেকেও কোন ব্যক্তি যদি দিন কে দিন মোটা হতে
থাকেন, তাহলে অর্থপত্তি করা যায়
যে, তিনি নিশ্চয়ই রাত্রে
সকলের অগোচরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত আহার করেন (অথবা তিনি হাইপোথাইরয়েডিজ্মে
ভুগছেন)।
কোন বিষয়ের অকস্মাৎ অনুপস্থিতির কারণে আমাদের যে উপলব্ধি হয়, তাকে অনুপলব্ধি বলে। হঠাৎ
প্রচণ্ড ঝড়ে বিশাল গাছের উপড়ে পড়ায় আমাদের অনুপলব্ধির চেতনা আসে – এই তো কিছুক্ষণ
আগেও অত্তো বড়ো সজীব গাছটা দাঁড়িয়েছিল, এখন আর নেই? এই তো গতকালই সন্ধেয় ক-বাবুর সঙ্গে বসে চা খেতে খেতে আড্ডা
দিলাম, তিনি আজ ভোরে মারা গেলেন?
মীমাংসা আরও বলেছে, যদিও সঠিক জ্ঞান আমাদের জীবনের পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
একটি বিষয়,
কিন্তু
ঘটনাচক্রে,
তত্ত্বের
নানান ব্যখ্যায় আমাদের ভ্রান্তি আসাও সম্ভব। যেমন, যদিও দড়ি ও সাপ সম্বন্ধে আমাদের
প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান আছে, কিন্তু আবছা আলোয় আমাদের দড়িকে সাপ বলে ভ্রম হয়ে থাকে। এর
কারণ সাপ সম্বন্ধে সাধারণ মানুষ সর্বদাই অত্যন্ত স্পর্শকাতর থাকে। এই বিষয়টিকে
মীমাংসা-দর্শন নাম দিয়েছে অখ্যাতিবাদ অর্থাৎ অলীক ভাবনার ভ্রান্তি।
মীমাংসা যাবতীয় বিষয়ভুক্ত এই বাস্তব জগতকে স্বীকার করে। মীমাংসার মতে, পঞ্চ ইন্দ্রিয় ও পঞ্চ
তন্মাত্র-ময় জীবসমূহ নিয়েই এই জগতের সৃষ্টি। এই জীবদেহের মধ্যেই অস্থায়ীভাবে আত্মা
অধিষ্ঠান করেন এবং সেই আত্মাই জীবকে সৎ ও অসৎ কর্মে প্ররোচিত করেন। এর ফলস্বরূপ
জীব তার নিজ নিজ কর্ম অনুযায়ী এই জগতের বিষয় উপভোগ করে অথবা কষ্টভোগ করে।
জীবাত্মার সংখ্যা অসীম এবং নিত্য। কিন্তু ইহলোকের জীবদেহে আত্মা যখন
আবদ্ধ থাকে,
জীবের সৎ ও
অসৎ কর্মের জন্যে তাদের পুনর্জন্ম গ্রহণ করতে হয়। আত্মার নিজস্ব কোন চেতনা নেই, কিন্তু যখনই জীবের মন, ইন্দ্রিয় এবং তন্মাত্রর
সঙ্গে তার সংযোগ হয়, তখনই
তার জাগরণ ঘটে। এই অবস্থা উপলব্ধি করা যায় সুষুপ্তির সময়, সে সময় জীবের সম্যক চেতনার অভাবে
আত্মাও নির্বিকার থাকে।
যেহেতু সকল মানুষকেই জীবনধারণের জন্যে সর্বদাই কর্মে নিযুক্ত থাকতে হয়, সেহেতু বেদ সকল মানুষকেই
কর্মযোগ সাধনার উপদেশ দেয়। এই কর্ম প্রধানতঃ দুই প্রকারের, নিত্য কর্ম – যেমন, জীবনধারণের জন্য উপার্জন, আহার, স্নান, নিদ্রা ইত্যাদি এবং
নৈমিত্তিক কর্ম অথবা বৈদিক কর্ম, যেমন যজ্ঞ, ধ্যান, যোগ, উপাসনা ইত্যাদি।
একজন মানুষের সর্বোচ্চ লক্ষ্য হওয়া উচিৎ মোক্ষ, অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যুর নিরন্তর চক্র
থেকে মুক্তি। এই পর্যায়ে মানব-আত্মার সকল দুঃখ ও বেদনা থেকে মুক্তি মেলে, যদিও চেতনাহীন আত্মার
দুঃখ ও আনন্দের কোন অনুভূতি নেই। এই মোক্ষলাভের উপায় প্রসঙ্গে মীমাংসারও সহজ উত্তর, নিত্য ও নৈমিত্তিক
কর্মযোগ। তবে কোন কর্মের একটিও কাম্য-কর্ম হলে চলবে না। মনোগত বাসনা বা কামনা
পূরণের জন্য যে কোন কর্মই হল কাম্য-কর্ম। অতএব কাম্য-কর্মের সঙ্গে মনে আসে লোভ, মায়া, হিংসা, ঈর্ষা, প্রভৃতি রিপু। তবে
অজ্ঞাতে কৃত কোন পাপের প্রায়শ্চিত্ত কামনায় যদি যজ্ঞ করা হয়, সেটি কাম্য-কর্ম হলেও সেই
কর্মে কোন বাধা নেই।
এই প্রসঙ্গে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শ্রীগীতায়, অর্জুনকে বলেছেন,
“কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।
মা কর্মফলহেতুর্ভূর্মা তে সঙ্গোঽস্ত্বকর্মণি।।
তোমার অধিকার শুধুমাত্র কাজ করায়, কর্মফলে তোমার অধিকার নেই।
কর্মফলের প্রত্যাশায় যেমন কোন কাজ করা উচিৎ নয়, তেমনই কর্মত্যাগের মতিও যেন তোমার
না হয়”। (গীতা/২/৪৭)[1]
নিত্য ও নৈমিত্তিক কর্মে চিত্তশুদ্ধি হয়। বিপরীতে এই দুই কর্ম না করলে
হয় প্রত্যবায়দোষ (অকর্ম বা নিষ্কর্মের ত্রুটি), তাতে মোক্ষলাভের পথ দুরূহ হয়ে
ওঠে। নিত্য ও নৈমিত্তিক কর্মের অনুষ্ঠানে প্রারব্ধ কর্মফল নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।
প্রারব্ধ কর্মফল হল পূর্বজন্মে কৃত যাবতীয় কর্মের ফল। অতএব এই জন্মে পূর্বজন্মের
প্রারব্ধ ফল নিষ্ক্রিয় করতে পারলে এবং ইহজন্মে একটিও কাম্য-কর্ম না করলে, পরের জন্মের জন্য কোন
প্রারব্ধ কর্মফল আর বকেয়া হবে না। অর্থাৎ পুনর্জন্ম হবে না, মোক্ষলাভ ঘটবে।
মীমাংসা দর্শনে আরেকটি প্রশ্নের অবতারণা করা হয়েছে, সেটি হল ঈশ্বরের অস্তিত্ব
আছে বা নেই। যেহেতু এই বিশ্ব জগতের যাবতীয় উপাদানের (পঞ্চভূত) অস্তিত্ব রয়েছে
অনাদি কাল থেকেই এবং আত্মার অদৃষ্ট বা প্রারব্ধ কর্মই সকল সৃষ্টি প্রকরণের নিয়ামক, সেক্ষেত্রে সৃষ্টি
সম্পাদনে ঈশ্বরের তো কোন ভূমিকাই থাকছে না!
এখানেই মীমাংসা দর্শন অনন্য। কারণ এই দর্শন বেদকেই ঈশ্বরের আসনে
প্রতিষ্ঠা করেছে এবং অস্বীকার করেছে বেদের সৃষ্টিকর্তাকে। শুধু পরমেশ্বরকেই নয়, বেদে উল্লিখিত সকল
দেবতাদেরও – ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ প্রমুখ – যাদের
উদ্দেশ্যে বেদ নানা যজ্ঞের বিধান নির্দিষ্ট করেছিল, সেই দেবতারাও এই তত্ত্বে
অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়লেন! কাজেই এমন সিদ্ধান্ত করাই যায় মীমাংসা দর্শনের এই নিরীশ্বর
দৃষ্টিভঙ্গির জন্যেই, পরবর্তীকালে
হিন্দু-দর্শনের মূল তত্ত্বগুলি থেকে ব্রাত্য হয়ে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও এই দর্শনের
গুরুত্ব রয়ে গেছে, কারণ, বেদান্ত দর্শন বুঝতে
পূর্ব-মীমাংসার বেদ ব্যাখ্যা ও বেদতত্ত্ব-জ্ঞান অত্যন্ত প্রয়োজন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন