বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /৫

   এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১




দ্বিতীয় স্কন্ধ - পঞ্চম পর্ব

 শ্রীব্রহ্মার বিষ্ণু-লীলা বর্ণন (আগের পর্বের শেষাংশ)     

একবার সরোবরের জলের মধ্যে এক কুমীর এক গজেন্দ্রকে আক্রমণ করেছিল। কুমীরের কবল থেকে পরিত্রাণের জন্য, সেই হস্তী তাঁর শুঁড়ে একটি পদ্মফুল নিয়ে শ্রীহরির স্তব করে বলেছিলেন, “হে আদি পুরুষ, অখিল লোকের নাথ, তোমার সমস্ত কীর্তিই পবিত্র এবং তুমি ভুবনের মঙ্গল সাধন করে থাকো”অচিন্ত্যশক্তি ভগবান, শরণাগত সেই হস্তীবীরের প্রার্থনায়, গরুড়ের পিঠে চড়ে সেই স্থানে এসেছিলেন, এবং নিজের চক্র দিয়ে সেই কুমীরকে হত্যা করে সেই হস্তীর প্রাণরক্ষা করেছিলেন। তারপর সেই হাতীর শুঁড় স্পর্শ করে তাঁকে উদ্ধার করেছিলেন।

তারপর তিনি অদিতির গর্ভে জন্ম নিয়ে বামনরূপে বিখ্যাত হয়েছিলেন। তিনি দ্বাদশ আদিত্যের  মধ্যে সবথেকে কনিষ্ঠ হয়েও গুণে সবার শ্রেষ্ঠ ছিলেন, কারণ তিনি তিন পদক্ষেপে ত্রিভুবন জয় করেছিলেন। ভগবান এই বামনরূপে দৈত্যরাজ বলির থেকে তিনপদ পরিমাণ ভূমি ভিক্ষার ছলে ত্রিভুবন গ্রহণ করেছিলেন। তিনি এই নিখিল বিশ্বের প্রভু, তিনি ইচ্ছা করলে বলির থেকে শক্তি প্রয়োগে এই ত্রিলোক জয় করে নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি, কারণ ভক্ত বলি নিজের ধর্মমাগেই অবস্থান করছিলেন এবং প্রভু তাঁর ভক্তকে প্রাপ্য পদ থেকে বিচ্যুত করা উচিৎ মনে করেননি। এই কারণে তিনি ভিক্ষার অছিলায় বলিকে রাজ্যভ্রষ্ট করেছিলেন। হে নারদ, গুরু শুক্রাচার্য তাঁকে নিবারণ করলেও, মহারাজ বলি নিজের প্রতিজ্ঞায় অচল রইলেন, এবং শ্রীহরির দুই পদক্ষেপে স্বর্গ ও মর্ত অধিকার হতে দেখেও নিরস্ত হলেন না, বরং নিজের দেহ শ্রীহরির তৃতীয় পদ রাখার জন্য সমর্পণ করলেন। যিনি শ্রীবিষ্ণুর চরণতলে নিজের মাথা সমর্পণ করতে পারেন, তাঁর মতো ভক্তের কাছে ত্রিলোকের রাজত্ব তুচ্ছ বিষয় সন্দেহ নেই। বস্তুতঃ, ভগবান তাঁর অকিঞ্চিৎকর রাজ্য হরণ করে, তাঁর অনিষ্ট করেননি, বরং তাঁকে নিজের শ্রীচরণে আশ্রয় দিয়ে তিনি তাঁর মহা উপকার করেছিলেন।

হে নারদ, হংস অবতারে সেই ভগবান তোমার অখণ্ড ভক্তিভাবে পরিতুষ্ট হয়ে, তোমাকে ভাগবত নামক জ্ঞানযোগ উপদেশ দিয়ে তোমার আত্মতত্ত্ব উপলব্ধি করিয়েছিলেন। তারপর শ্রীহরি ধন্বন্তরিরূপে অবতীর্ণ হয়ে নিজের নামের প্রভাবেই মহারোগগ্রস্ত জনগণের রোগ আশু উপশম করেছিলেন। আগে দৈত্যরা অমৃতময় যজ্ঞভাগ রুদ্ধ করে রেখেছিল, তিনি এই অবতারে তার উদ্ধার সাধন করলেন ও পৃথিবীতে আয়ুর্বেদের প্রবর্তন করলেন। একবার ক্ষত্রিয়গণ মতিভ্রমে বেদ ও ব্রাহ্মণের বিদ্বেষী হয়ে, পৃথিবীর বিনাশে উদ্যত হয়েছিলেন। উগ্রবীর্য পরশুরাম অবতারে তিনি তীক্ষ্ণ পরশু দিয়ে একুশবার ক্ষত্রিয়দের বিনাশ করে, পৃথিবীকে নির্বিঘ্ন করেছিলেন।

শ্রী ব্রহ্মা কর্তৃক শ্রীবিষ্ণুর অবতার লীলার ভবিষ্যবাণী 

[এতক্ষণ শ্রীব্রহ্মা নারদকে সত্য যুগে শ্রীবিষ্ণুর নানান অবতার লীলার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা করলেন। এবার তিনি নারদের কাছে ত্রেতা যুগ থেকে শুরু করে দ্বাপরের শেষ পর্যন্ত শ্রীবিষ্ণুর বিচিত্র অবতার লীলারও সংক্ষিপ্ত বর্ণনা করছেন। অর্থাৎ তাঁর ও নারদের মধ্যে এই যে কথোপকথন হচ্ছে সেই ঘটনাগুলি ভবিষ্যতে ঘটবে!]         

একবার আমার প্রতি প্রসন্ন হয়ে, মায়াপতি শ্রীভগবান নিজের অংশে চারভাইয়ের সঙ্গে শ্রীরামরূপে, ইক্ষ্বাকুবংশে জন্ম গ্রহণ করবেন। পিতৃসত্যপালনের জন্য ভাই লক্ষ্মণ ও ভার্যা সীতাদেবীর সঙ্গে তিনি বনগমন করবেন এবং সেখানে দশানন রাবণ তাঁর সঙ্গে বিবাদ করে বিনষ্ট হবেন। ত্রিপুর দহনকারী শ্রীরুদ্রের মতো শ্রীরামচন্দ্র শত্রুপুরী লঙ্কাকে ধ্বংস করার জন্য সমুদ্রতীরে উপস্থিত হলে, সমুদ্র তাঁকে লঙ্কা যাবার পথ করে দেবেন। দশদিকের অধিপতি রাবণ সীতা হরণের মতো অপরাধ করেও, নিজের শক্তির অহংকারে নিজের ও শত্রুসৈন্যদের মধ্যে নির্ভয়ে বিচরণ করবেন এবং শ্রীরামচন্দ্র তাঁকে অনায়াসে হত্যা করবেন।

তারপর অসুরেরা রাজবংশে জন্ম নিয়ে, নিজের দুর্ধর্ষ সৈন্যদলের সাহায্যে পৃথিবীতে অশেষ অত্যাচার করবে। সেইসময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজের অংশ বলরামের সঙ্গে জগতের ভূভারহরণের জন্যে জন্মগ্রহণ করবেন। এই কৃষ্ণ সাক্ষাৎ ভগবান। ইনি শৈশবে, পূতনা রাক্ষসী বধ, তিনমাস মাত্র বয়সে শকটভঞ্জন এবং যমলার্জুন ভঙ্গ করবেন। একবার যমুনার বিষজল পান করে ব্রজের বালকগণ ও গবাদি মূর্ছিত হয়ে পড়লে, কৃষ্ণ তাঁর সুধাময় দৃষ্টিপাতে সকলকে সুস্থ করে তুলবেন। তারপর কালিন্দীর বিষজল পরিশোধনের জন্য উগ্রবীর্য ও লোলজিহ্বা মহাসর্প কালিয়কে দমন করে, যমুনার জলে বিহার করবেন। একবার জননী যশোদা, কৃষ্ণকে বাঁধার জন্যে যত রশি নিয়ে আসবেন, সবই কম পড়ে যাবে, কিছুতেই শিশু কৃষ্ণকে বাঁধতে পারবেন না। একবার কৃষ্ণ হাই তোলার ছলে জননী যশোদাকে নিজের মুখের মধ্যে চোদ্দভুবন দেখাবেন, মাতা যশোদা ওই দৃশ্যে ভয় পেয়ে যাবেন এবং কৃষ্ণের অচিন্ত্য মহিমার পরিচয় লাভ করবেন।

ইনি নন্দ মহারাজকে বরুণের বন্ধন থেকে মুক্ত করবেন। ময়দানবের পুত্র ব্যোমাসুর পাহাড়ের গুহায় গোপদের লুকিয়ে রাখলে, তিনি তাদের উদ্ধার করে নিয়ে আসবেন। গোপগণ কোন সাধন, ভজন করেন না, তাঁরা দিনের বেলায় কাজে ব্যস্ত থাকেন এবং রাত্রে ক্লান্ত হয়ে ঘুমোনকৃষ্ণ তাঁদের বৈকুণ্ঠে স্থান দান করবেন। এর চেয়ে অলৌকিক লীলা আর কী হতে পারে? নন্দ প্রমুখ গোপগণ ইন্দ্রের উদ্দেশে যজ্ঞ করতেন। কৃষ্ণের উপদেশে তাঁরা ইন্দ্রের পূজা বন্ধ করবেন ও তাতে ইন্দ্র ক্রুদ্ধ হয়ে, বৃন্দাবন বিনাশ করার জন্য  সাতদিন ধরে অবিরল ধারায় প্রবল বর্ষণ করবেন। কৃষ্ণের তখন মাত্র সাত বৎসর বয়স, তিনি বাম হাতে সাতদিন ধরে ছাতার মতো গিরি গোবর্ধনকে ধরে থাকবেন, এবং পাহাড়ের নীচে বৃন্দাবনের সমস্ত মানুষ ও গবাদি পশুকে বৃষ্টির প্রকোপ থেকে রক্ষা করবেন।

চাঁদের জ্যোৎস্নামাখা এক রজনীতে রাসকেলি করার সময়, কৃষ্ণর মূরলীর অপূর্ব সূরের মূর্ছনায় ব্রজকিশোরীরা অনঙ্গ বাণে পীড়িত হয়ে ঘরের বাইরে বের হলে, কুবেরের অনুচর শঙ্খচূড় তাদের সকলকে হরণ করবে। তখন কৃষ্ণ সেই শঙ্খচূড়ের মস্তক ছিন্ন করে গোপিনীদের উদ্ধার করবেন। এছাড়া, বলভদ্রের হাতে প্রলম্ব, ধেনুক, দ্বিবিদ বানর, বল্কল ও রুক্মি প্রভৃতির মৃত্যু ঘটবে। ভীম ও অর্জুনদের সঙ্গে থেকে কৃষ্ণ, বলদৃপ্ত ধনুর্ধর কাম্বোজ, মৎস্য, কুরু, সৃঞ্জয় ও কৈকয়দের জীবন অবসান করবেন। তাঁর পুত্র শম্বরাসুর, মুচুকূন্দ যবনকে সংহার করবেন। তিনি নিজে বকাসুর, কেশী, বৃষাসুর, চানুর মুষ্টিকা প্রমুখ মল্লবীর, কুবলয়াপীড় গজ, কংস, পৌণ্ড্রক সাল্ব, নরকাসুর, দম্ভবক্র, সপ্তবৃষ ও বিদূরথকে সংহার করবেন। বৎস নারদ, এই বিষয়ে কোন সংশয় করো না। কৃষ্ণই সর্বময়, এই হেতু বলদেব, ভীম, অর্জুন প্রমুখ বীরশ্রেষ্ঠ তাঁরই মূর্তিভেদ। তিনি ভিন্ন ভিন্ন রূপে সকল অসুর ও রাজাদের সংহার করবেন, সকলকে বৈকুণ্ঠধাম প্রদান করবেন।

তারপর কালের প্রভাবে মানবের বুদ্ধির হ্রাস ও পরমায়ু অল্প হতে থাকলে, বেদশাস্ত্র তাদের কাছে দুর্বোধ্য মনে হবে। তখন সত্যবতীর গর্ভে ব্যাসরূপে অবতীর্ণ হয়ে, বেদ বৃক্ষকে বহু শাখাতে বিভক্ত করবেন। তারপর দেবদ্বেষী অসুরগণ বেদমার্গ অবলম্বন করে, তার প্রভাবে ময়দানবের সাহায্যে অদৃশ্য মায়াপুরী বানিয়ে লোকসকলের উপর অত্যাচার করবে। তখন তাদের মতিভ্রম সৃষ্টি করার মানসে শ্রীহরি নয়নশোভন বুদ্ধবেশ ধারন করে বহু রকমের উপধর্মের উপদেশ করবেন। যখন সজ্জন ব্রাহ্মণের ঘরেও আর শ্রীহরি কথা শোনা যাবে না, ব্রাহ্মণেরা বেদদ্বেষী পাষণ্ডী হয়ে উঠবেন, শূদ্রেরা নরপতির আসন গ্রহণ করবে এবং স্বধা, স্বাহা, বষট্‌ প্রভৃতি মন্ত্র উচ্চারণ হবে না, তখন ভগবান যুগের শেষে কল্কিরূপ ধারণ করে কলির নিগ্রহ করবেন।


নারদকে ভাগবত প্রচারে শ্রীব্রহ্মার আদেশ 

সৃষ্টিকালে তপস্যা, আমি ব্রহ্মা, নয় প্রজাপতি ঋষি; স্থিতিকালে ধর্ম, বিষ্ণু, মনুগণ, অমরগণ ও ক্ষত্রিয় ভূপালগণ এবং সংহার কালে অধর্ম, হর, ক্রোধের বশীভূত সর্প ইত্যাদি ও অসুর প্রভৃতি যা কিছু আবির্ভূত হয়, তার সবই সর্বশক্তিমান শ্রী হরির মায়া বিভূতি অর্থাৎ অচিন্ত্য মায়ার বিচিত্র প্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়।

হে নারদ, শ্রী ভগবানের মহিমা আমি সংক্ষেপে বর্ণনা করলাম; বিস্তারিত বর্ণনা কেউই করতে পারবে না। যদি কোন জ্ঞানীব্যক্তি পৃথিবীর যাবতীয় ধুলিকণা গুণতে সমর্থ হন, তাঁর পক্ষেও শ্রীবিষ্ণুর অচিন্ত্য বিভূতির গণনা করা সম্ভব হবে না। আমি ও তোমার অগ্রজ ঋষিগণ এই মায়াময় পুরুষের মহিমার সীমা খুঁজে পাইনি, অন্যদের কথা আর কী বলব? এই অনন্ত ভগবান যাঁদের প্রতি করুণা করেন, তাঁরা যদি অকপট চিত্তে তাঁর শ্রীচরণকে একমাত্র আশ্রয় ভাবেন, তাহলেই তাঁরা এই দেবমায়া জানতে ও উপলব্ধি করতে সমর্থ হন। এই শেয়াল, কুকুরের খাদ্য দেহের প্রতি তখন তাঁদের, “আমি” বা “আমার” এই মমতা আর থাকে না।  অতএব শ্রীভগবানের করুণাই জীবের মুক্তিলাভের একমাত্র উপায়, অন্য কোন পথ আর দেখা যায় না।

বৎস নারদ, সৎসঙ্গ ঘটলে সকলেই তাঁর মায়া উপলব্ধি করতে পারে। স্ত্রী, শূদ্র, হূন, শবর প্রভৃতি পাপজীবও ত্রিবিক্রম হরির ভক্তদের চরিত্র অনুকরণ করে, তাঁর মায়া জানতে পারেন ও বুঝতে পারেন। এমনকি হংস, গজ, শুক, সারিকা প্রভৃতি তির্যক জাতিও ভক্তের কৃপায় তাঁর মায়া অতিক্রম করতে সমর্থ হয়। অতএব, মানুষ, যারা তাঁর রূপ, মনে ধারণা করতে পারে, তাদের কথা আর কী বলব? ভগবানের যে রূপ মনে ধারণা করা উচিৎ, সে বিষয়ে তোমায় বলছি শোনো। মুনিরা যাঁকে ব্রহ্মা বলে জানেন, তিনিই ভগবানের স্বরূপ। ওই স্বরূপ নিত্য আনন্দময় ও শোকরহিত। ওই স্বরূপে নিরন্তর পরমা শান্তি বিরাজিত থাকায়, নিত্য সুখের কখনো ব্যাঘাত হয় না এবং সম অর্থাৎ ভেদরহিত হওয়ায় ভয়রহিত। কারণ “আমি” ও “তুমি” এই ভেদজ্ঞান না থাকলে ভয় উৎপন্ন হয় না। বস্তুর বিভিন্ন বর্ণ ও আকার হওয়ায় এবং আমাদের ইন্দ্রিয়সকল আলাদা আলাদা হওয়ায়, আমাদের সর্বদা যে জ্ঞান আহরণ হচ্ছে,  সেই জ্ঞান বিচিত্র অর্থাৎ ভিন্ন ভিন্ন বলে বোধ হচ্ছে। কিন্তু পরমজ্ঞান স্বরূপে এই বিভিন্নতার বোধ হয় না, কারণ ওই জ্ঞান বিশুদ্ধ অর্থাৎ মলিনতাহীন। বৎস, এই বিষয়ে একটি গভীর সিদ্ধান্ত আছে, মন দিয়ে শোনো।

আমাদের অন্তঃকরণ বিষয় সম্পর্কে ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তিত হচ্ছে, ওই পরিবর্তনের অবস্থাকে অন্তঃকরণের বৃত্তি বলে। বিষয়ের যা কিছু মলিনতা, তা বৃত্তিতেই থাকে, সেই বৃত্তি শুদ্ধ জ্ঞানকে স্পর্শ করতে পারে না। আমি কখনও নিজেকে আমার থেকে আলাদা বলে ভাবতে পারি না। বেদ ব্রহ্মের পরিচয় দেয়, কিন্তু সেই স্বরূপকে শব্দ দিয়ে জ্ঞেয় বলা যায় না; কারণ তাহলে ব্রহ্ম শুধু জ্ঞানস্বরূপ নয়, জ্ঞেয়স্বরূপ হয়ে পড়েন অতএব বেদ শব্দদিয়ে আমাদের ভ্রম নিবৃত্তি করে মাত্র, ব্রহ্মের বোধ উৎপন্ন করে না। যা আত্মা ও সত্য নয়, সেই ব্রহ্মাণ্ড ও তার মধ্যে স্থিত দেহকে আমাদের আত্মা ও সত্য বলে ভ্রম আছে, বেদ সেই ভ্রমকে সংশোধন করে এবং তখন আত্মস্বরূপ নিজেই প্রকাশিত হয়। তূষ অপসারণ করে, যেমন তণ্ডুলকণার সংস্কার করা যায়, তেমনি রূপ মায়া অপসারণ করে ব্রহ্মস্বরূপের সংস্কার করতে হয়, নয়তো সঠিক উপলব্ধি হয় না। ব্রহ্মস্বরূপ লাভ হলে, অন্য কোন বিষয় বা বস্তু পাওয়ার থাকে না এবং করার উপযুক্ত কোন কর্মও অবশিষ্ট থাকে না। ওই অবস্থা লাভের আগে শ্রীভগবানই সব কর্মের ফল দান করে থাকেন এবং সকল কর্মের প্রবৃত্তি দান করে থাকেন।

ব্রাহ্মণেরা শম, দম প্রভৃতি গুণের অনুসরণে যে সব শুভ কর্মের অনুষ্ঠান করেন, শ্রীভগবানই সেই সমস্ত কর্মের প্রবর্তক। তিনি শুভ কর্মের ফল স্বরূপ স্বর্গ ইত্যাদি ফল দান করে থাকেন। যিনি শুভ কর্মের অনুষ্ঠান করেন, কালক্রমে তাঁর মৃত্যু হলে স্বর্গলাভের সম্ভাবনা কোথায়, এমন ভাবার কোন অবকাশ নেই। কারণ যে সকল ভূতবস্তুতে দেহ নির্মিত হয়, মৃত্যুতে সেই দেহ বিনষ্ট হয় ঠিকই, কিন্তু তাতে জীবত্মার কোন অনিষ্ট হয় না। কারণ জীবাত্মা অজ অর্থাৎ দেহের সঙ্গে তাঁর জন্ম ও মৃত্যু হয় না। এই জীবাত্মাই দেহান্তে, শ্রীভগবানের কৃপায় স্বর্গ ইত্যাদি নানান ফল ভোগ করে থাকেন”

শ্রীব্রহ্মা বললেন, “বৎস নারদ, বিশ্বভাবন শ্রীহরির স্বরূপ ও মহিমা তোমার কাছে সংক্ষেপে বর্ণনা করলাম। শ্রীভগবান স্বয়ং আমাকে যে উপদেশ দিয়েছিলেন, এই সেই ভাগবতএই ভাগবতে ভগবানের বিভূতি সংক্ষেপে বর্ণনা করেছি, তুমি বিস্তারিতভাবে এর প্রচার করো। সকলের আত্মা ও অখিল বিশ্বের আধার শ্রীহরির পাদপদ্মে যাতে মানুষের ভক্তি সঞ্চার হয়, তুমি সেইভাবে শ্রীহরিলীলা বর্ণনা করো, শুধু তত্ত্বের আলোচনা করে, ভক্তিরসের ব্যাঘাত করো না। যদিও ভগবানের লীলা মায়া ছাড়া ঘটে না, তবুও যিনি এই ভগবানের সেই সব মায়ার বর্ণনা করেন ও শ্রদ্ধার সঙ্গে শোনেন, তাঁদের সেই মায়া মুগ্ধ করতে পারে না”

চলবে...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /৫

   এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ "  এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ " এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১...