বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /৪

  এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১




দ্বিতীয় স্কন্ধ - চতুর্থ পর্ব

শ্রী ব্রহ্মার পরমেশ্বরের পরিচয় বর্ণন

শ্রীব্রহ্মা বললেন, “বৎস নারদ, এখন এই বৈরাজ পুরুষ অর্থাৎ অনন্তরূপী ভগবানের বিভূতি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করি, শোন। এই পুরুষের মুখ বাক্যের ইন্দ্রিয় ও তার অধিষ্ঠাত্রী দেবতা বহ্নির, ত্বক ইত্যাদি সপ্তধাতু গায়ত্রী প্রমুখ সাত ছন্দের, জিভ হব্য অর্থাৎ দেবতাদের অন্ন, কব্য অর্থাৎ পিতৃগণের অন্ন, অমৃত অর্থাৎ মানুষের অন্ন ও ওই অন্নের মধুর ইত্যাদি ছয়টি রসের উৎপত্তির স্থান। ওই মহাপুরুষের নাক থেকে প্রাণসমূহ ও বায়ু, ঘ্রাণের ইন্দ্রিয়শক্তি থেকে অশ্বিনীকুমারদ্বয়, ওষধিসমূহ এবং সামান্য ও বিশেষ যত ধরনের গন্ধ আছে, সবই উৎপন্ন হয়েছে। এই পুরুষের চোখ থেকে রূপ ও তার প্রকাশক তেজের, নয়ন গোলক সুর্য ও স্বর্গলোকের, কর্ণ দিকসকল ও তীর্থসমূহের এবং শ্রবণ ইন্দ্রিয়শক্তি আকাশ ও শব্দের উৎপত্তিস্থানএঁনার গা থেকে নিখিল বিশ্বের সার অর্থাৎ শক্তি ও সৌন্দর্য এবং ত্বক থেকে স্পর্শ, বায়ু ও যজ্ঞসমূহ। বৃক্ষসমূহ ও যে সকল উদ্ভিজ্জ যজ্ঞের উপচার, সে সবই তাঁর রোমরাজি; তাঁর কেশ থেকে মেঘসমূহ, গোঁফদাড়ি থেকে বিদ্যুৎ এবং পা ও হাতের নখ থেকে শিলা ও লোহা।

যে সকল লোকপালগণ পালন করে থাকেন, তাঁরা সকলেই এই পুরুষের বাহু থেকে সৃষ্টি হয়েছেন। এই পুরুষের পদচারণায় ভূর্ভূবঃ স্বঃ - এই তিন লোকের আশ্রয় এবং শ্রীহরির চরণ কমল থেকেই প্রাপ্ত বস্তুর রক্ষা, ভয় থেকে উদ্ধার ও নিখিল কাম্য বস্তুর সিদ্ধিলাভ হয়। সলিল, শুক্র, সৃষ্টি, মেঘ ও প্রজাপতি এই পুরুষের শিশ্ন। হে নারদ, এঁর পায়ু অর্থাৎ গুহ্যদ্বার থেকে যম, মিত্র এবং গুহ্যেন্দ্রিয়শক্তি থেকে হিংসা, অলক্ষ্মী, নরক ও মৃত্যু সৃষ্টি হয়েছে। এই মহাপুরুষের পৃষ্ঠভাগ পরাভব, অধর্ম ও অজ্ঞানের; নাড়ী নদ ও নদীসমূহের এবং অস্থিসংস্থান পর্বতসমূহের উৎপত্তিস্থান। জ্ঞানীরা বলেন, প্রকৃতি, অন্নশস্যের সারাংশ, সকল সমুদ্র ও সকল প্রাণির লয় এই পুরুষের উদরে এবং মানুষের লিঙ্গশরীর এঁনার হৃদয়ে নিষ্পন্ন হয়ে থাকে।

বৎস নারদ, তুমি ও সনক প্রমুখ কুমারগণ, শ্রীরুদ্র, বুদ্ধি ও চিত্ত এই পরম পুরুষের অন্তঃকরণ থেকে উৎপন্ন হয়েছে। সোনা থেকে বানিয়ে তোলা কুণ্ডল যেমন সোনা ছাড়া কিছুই নয়, তেমনই পরমেশ্বর থেকে সৃষ্টি হওয়া এই বিশ্ব তাঁর থেকে আলাদা নয়। অতএব, আমি, তুমি, ভব, তোমার অগ্রজ সনককুমারেরা এবং এই সমস্ত মরীচি প্রমুখ মহর্ষি, সুর, অসুর, নর, নাগ, বিহঙ্গ, মৃগ, সরীসৃপ, গন্ধর্ব, অপ্সরা, যক্ষ, রক্ষ, ভূত, গণ, উরগ, পশু, পিতৃগণ, সিদ্ধ, বিদ্যাধর, চারণ, বৃক্ষ ও জল, স্থল, আকাশে বিচরণশীল যাবতীয় জীব, গ্রহ, নক্ষত্র, ধূমকেতু, তারা, তড়িৎ ও মেঘ এবং ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমান যাবতীয় বস্তু ও বিষয় এই পরম পুরুষ থেকে ভিন্ন নয়। তিনি এই অনন্ত বিশ্বকে আবৃত করে অবস্থান করছেন, এমনকি এই বিশ্ব অতিক্রম করেও তিনি বিরাজ করছেন – অর্থাৎ এই বিশ্বের থেকেও বৃহত্তর স্বরূপে তিনি বিরাজিত”

শ্রীব্রহ্মা বললেন, “নারদ, শ্রীভগবান ব্রহ্মাণ্ডের আত্মা হয়েও নিত্যমুক্ত থাকেন। কারণ তিনি মরণশীল কর্মফলের অতীত হয়ে, অভয় ও আনন্দ স্বরূপে বিরাজ করছেন। তাঁর অচিন্ত্য অপার মহিমা, কেউ নির্দিষ্ট করতে পারে না। ভূর্লোক, ভূবর্লোক ও স্বর্লোক – এই তিন ভুবনের মধ্যে জীব যে সুখ ভোগ করে, সেই সুখ নশ্বর। এর উপরে আছে মহর্লোক, কিন্তু সেখানেও সুখ চিরস্থায়ি নয়, কারণ কল্পের অবসান কালে, সংকর্ষণের মুখের আগুনে তিনলোক যখন দগ্ধ হয়, তখন সেই তাপ মহর্লোক বাসী ঋষিদেরও উত্তপ্ত করে তোলে। এই কারণে ভৃগু প্রমুখ মহর্ষিরা মহর্লোক ত্যাগ করে, তারও উপরে অবস্থিত জনলোকে আশ্রয় নেন। এই জনলোক অমৃত অর্থাৎ অবিনাশী সুখের স্থান হলেও ক্ষেম অর্থাৎ অবিচ্ছিন্ন মঙ্গলের স্থান নয়; কারণ কল্পান্তে তাঁদেরও মহর্লোক থেকে আসা তাপিত জীবকে দেখতে হয়। জনলোকের ঊর্ধে তপোলোক ক্ষেম অর্থাৎ অবিচ্ছিন্ন মঙ্গলের জায়গা হলেও, ওই লোক অভয় স্থান নয়। তপোলোকের ঊর্ধে একমাত্র সত্যলোকই অভয় অর্থাৎ মোক্ষভূমি।

যাঁরা ব্রহ্মচর্য ব্রতে নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী, বনস্থ যতি অর্থাৎ ভিক্ষুকাশ্রমী, তাঁদের অপ্রজ বলে, কারণ তাঁরা প্রজা অর্থাৎ সন্তান উৎপন্ন করেন না। অপ্রজ ঋষিরা ত্রিলোকের অতীত স্থানসমূহে বাস করে থাকেনকিন্তু যাঁরা ব্রহ্মচর্য ব্রত পালন না করে, গৃহস্থ আশ্রম পালন করেন, ত্রিলোকী তাঁদের বাসস্থান। একই আত্মার অবস্থা অনুযায়ী, এই প্রকার আলাদা আলাদা অধিকার লাভ হয়। মার্গ দুই রকমের; কর্ম অবিদ্যামার্গ এবং ভগবানের উপাসনা বিদ্যামার্গ। যে সকল ক্ষেত্রজ্ঞ অর্থাৎ জীব অবিদ্যামার্গ অবলম্বন করেন, তাঁরা নানা রকম বিষয়সুখ ভোগ করে। কিন্তু যাঁরা বিদ্যামার্গ আশ্রয় করেন, তাঁরা অপবর্গ অর্থাৎ মুক্তিলাভ করেন।

বৎস নারদ, ব্রহ্মাণ্ডে অবস্থিত জীবসমূহের নানান ফল বৈচিত্র তোমাকে বর্ণনা করলাম, এখন বৈলক্ষণ্য বলছি, শোন। যে ঈশ্বর থেকে প্রথমতঃ প্রকৃতি সংক্ষুব্ধ হয়ে সোনার আকারের অণ্ড ও পরে নানা উপাদানে বিভক্ত হয়ে বিরাট দেহরূপে প্রকাশ হয়, সেই ঈশ্বর ঐ অণ্ড ও দেহের অতীত। যেমন সৌরমণ্ডলের অধিষ্ঠাতা দেব সূর্য নিজের কিরণে বিশ্ব উদ্ভাসিত করলেও, নিজের মণ্ডলের বাইরে অতীত অবস্থায় অবস্থান করেন, তেমন ঈশ্বরও ঐ অণ্ড ও ভূত, ইন্দ্রিয় ও গুণরূপে বিচিত্র বিরাট দেহের অতীত অবস্থায় নিরন্তর বিরাজ করছেন।

হে পুত্র, যখন আমি এই মহাপুরুষের নাভিকমল থেকে উৎপন্ন হয়েছিলাম, সেই কালে এই বিরাটদেহের অন্তর্যামী পুরুষের অবয়ব ছাড়া যজ্ঞ সাধনের কোন সামগ্রীই না পেয়ে, তাঁর অবয়ব থেকেই যজ্ঞের যাবতীয় সামগ্রী, উপচার, আচার, অনুষ্ঠান, বেদ ও স্বাহা মন্ত্র সংগ্রহ করেছিলাম। এই বিশ্ব ভগবান নারায়ণে প্রতিষ্ঠিত আছে। আমি তাঁর আজ্ঞায় সৃষ্টি করে থাকি এবং হর তাঁর আদেশেই সংহার লীলা করে থাকেন। ভগবান নিজে শ্রীবিষ্ণুরূপে মায়ার অধীশ্বর হয়ে নিখিল বিশ্বের প্রতিপালন করে থাকেন। আমি স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা নই, আমার যা কিছু শক্তি, সমস্তই শ্রীহরির করুণাপ্রভাবে। আমি বেদময়, তপোময় ও প্রজাপতিদের বন্দনীয় প্রভু হয়েও এবং নিপুণ যোগ সমাধিতে অবস্থান করেও, আমার প্রভুর তত্ত্ব জানতে পারিনি। আকাশ যেমন নিজের সীমা নিজে নির্দিষ্ট করতে পারে না, তেমনি ভগবানও নিজের তাঁর মায়ার ইয়ত্তা করতে পারেন না; সুতরাং অন্য কেউ তাঁর মায়ার প্রভাব কিভাবে আন্দাজ করতে পারবে?  তিনি নিজের মায়ার সীমা নির্দিষ্ট করতে পারেন না বলে, তাঁকে অসর্বজ্ঞ মনে কোর না। কারণ যে বস্তু অনন্ত, তাকে অনন্ত বলে মনে করলে সর্বজ্ঞতায় কোন হানি হয় না। কেউ আকাশকুসুম না জানলে, তার বিজ্ঞতার কোন হানি হয় কী?

ভগবানের যে তত্ত্ব আমরা সম্যক উপলব্ধি করতে পারি না, তার কিছু আভাস দিচ্ছি শোন। তিনি সত্যস্বরূপ অর্থাৎ একমাত্র তাঁরই অস্তিত্ব আছে, বাকি কারো প্রকৃত অস্তিত্ব নেই। যখন সেই অস্তিত্বের জ্ঞান হয়, তখন সেই জ্ঞান ঘট ও পটের জ্ঞানের মতো বিচ্ছিন্ন বা খণ্ডিত হয় না; ওই জ্ঞানকে বিশুদ্ধ ও কেবলজ্ঞান বলে। আমরা অন্যান্য বস্তুর জন্ম-মরণ, বিকার দেখে থাকি, কিন্তু তিনি জন্ম ও বিনাশ রহিত হওয়ায় নির্বিকার স্বরূপে বিরাজিত। তিনি নিখিল বিশ্বে পূর্ণরূপে বিরাজ করছেন, অতএব তাঁর ক্ষয় বা বৃদ্ধি সম্ভব নয়। সবার উপরে তাঁর অচিন্ত্য মহিমা এই যে, সৃষ্টিকালে যখন তাঁকে দ্বৈতসত্ত্বারূপে মনে হচ্ছে, তখনও তিনি অদ্বয়স্বরূপেই বিরাজ করছিলেন।

বৎস নারদ, যখন দেহ, ইন্দ্রিয় ও মন প্রসন্ন ভাব আয়ত্ত্ব করে, তখনই মুনিরা এই পরমতত্ত্ব উপলব্ধি করতে পারেন। যখন অসজ্জনের কুতর্কজালে বুদ্ধি আচ্ছন্ন হয়, তখন তিনি অন্তর্হিত হন। আগে সহস্রশীর্ষা পুরুষ বলে যাঁর কথা তোমাকে বললাম, তিনি ভূমা ভগবানের আদ্য অবতার। ইনিই প্রকৃতির প্রবর্তক। যদিও সকল পদার্থই ভগবানের অংশ, তাও তারা ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত হয়। কাল, স্বভাব এবং কার্য ও কারণের সমষ্টি স্বরূপা প্রকৃতি ভগবানের শক্তি। মহত্তত্ত্ব, অহঙ্কারতত্ত্ব, সত্ত্ব ইত্যাদি গুণ, পঞ্চ মহাভূত, ইন্দ্রিয়সমূহ, সমস্ত স্থাবর ও জঙ্গম পদার্থ, বিরাট সমষ্টি শরীর ও স্বরাট অর্থাৎ সমষ্টি জীব, ভগবানের কার্য। আমি ব্রহ্মা, শ্রীরুদ্র ও শ্রীবিষ্ণু তাঁর গুণাবতার। এই নিখিল বিশ্বে যা কিছু সাকার, নিরাকার ও অদ্ভূত বর্ণ বিষয় এবং পদার্থ, সেই সবই ভগবানের বিভূতি। হে পুত্র, শ্রীভগবানের যে সমস্ত অবতারকে ঋষিরা প্রধানতঃ লীলাবতার বলেন, যাঁদের চরিত্রকথা শুনলে কানের এবং মনের মলিনতা দূর হয়, সেই মধুর লীলাময় অবতারগণের চরিত্র অতিসংক্ষেপে কীর্তন করছি। এই অমৃত পান করে আত্মাকে তৃপ্ত করো”


 শ্রীব্রহ্মার বিষ্ণুর অবতারত্বের মহিমা বর্ণন

শ্রীব্রহ্মা বললেন, “এই অনন্ত ভগবান যখন যজ্ঞের উপকরণ থেকে নিজের অবয়বকে বরাহমূর্তিরূপে, পৃথিবীর উদ্ধারে উদ্যত হয়েছিলেন, সেই সময় আদি দৈত্য হিরণ্যাক্ষ সমুদ্র থেকে উঠে ভগবানকে আক্রমণ করেছিলেন। দেবরাজ ইন্দ্র যেমন বজ্র দিয়ে পর্বত বিদীর্ণ করে থাকেন, তেমনই তাঁর দাঁতের আঘাতে তিনি দৈত্য হিরণ্যাক্ষর বক্ষ বিদীর্ণ করেছিলেন। তারপর প্রজাপতি রুচির ঔরসে ও আকুতির গর্ভে সুযজ্ঞ নামে আবির্ভূত হয়ে নিজের ভার্যা দক্ষিণাদেবীর গর্ভে  সুষম নামক দেবগণকে সৃষ্টি করেছিলেন। তিনিই পরে দেবরাজ ইন্দ্র হয়ে ত্রিভুবনের সকল উপদ্রব হরণ করেছিলেন। এই কারণে, তাঁর মাতামহ স্বায়ম্ভূব মনু, তাঁকে পরে “হরি” নাম দিয়েছিলেন। তারপর তিনি প্রজাপতি কর্দমের ঔরসে দেবহূতির গর্ভে নয় ভগিনীর সঙ্গে কপিল নামে জন্ম নিয়েছিলেনতিনি নিজের মাতাকে ব্রহ্ম উপদেশ দিয়েছিলেন এবং ওই ব্রহ্মবিদ্যার প্রভাবে, মাতা দেবহূতি আত্মমলিনতা ত্যাগ করে, কপিলগতি অর্থাৎ মুক্তি লাভ করেছিলেন।

তার আগে, মহর্ষি অত্রির আরাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে, ভগবান তাঁকে বর দিয়ে বলেছিলেন, তোমাকে অন্য আর কী বর দেব, আমি তোমাকে আমাকেই দান করলাম। এই বলে তিনি মহর্ষির পুত্রের ইচ্ছা পূর্ণ করার জন্য তাঁর গৃহে পুত্র হয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তিনি নিজেই নিজেকে দান করেছিলেন, তাই তিনি দত্ত অর্থাৎ দত্তাত্রেয় নাম নিয়েছিলেন। যদু, হৈহয় প্রভৃতি রাজগণ ঋষি দত্তাত্রেয়র কাছে ব্রহ্মতত্ত্ব উপলব্ধি করে মোক্ষলাভ করেছিলেন। আমি বিবিধ লোক সৃষ্টির ইচ্ছায় ভগবানের তপস্যা করায়, তিনি চার কুমার, সনক, সনন্দন, সনাতন ও সনৎকুমার রূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ওই চার কুমারের আত্মবিদ্যার উপদেশে মুনিরা নিজেদের অন্তরে সেই তত্ত্ব সাক্ষাৎ করেছিলেন, পূর্বকল্পের প্রলয়ে এই আত্মবিদ্যা ও গুরু পরম্পরা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল, তিনি চারকুমারের রূপে সেই বিদ্যা ও প্রথা আবার শুরু করলেন।

তারপর তিনি প্রজাপতি ধর্মের ঔরসে ও দক্ষ কন্যা মূর্তিদেবীর গর্ভে নারায়ণ ও নর এই দ্বিমূর্তিতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। অনঙ্গের সেনারূপিনী অপ্সরাগণ, এঁদের তপস্যা ভাঙতে এসেছিল। কিন্তু কোন নিয়মের ব্যতিক্রম দেখতে না পেয়ে খুব ভয় পেয়েছিল, ঋষিরা যদি অভিশাপ দেন। শ্রীরুদ্র রোষদৃষ্টিতে কামদেবকে ভস্ম করে দিয়েছিলেন, কিন্তু যে ক্রোধ নিজের হৃদয়কে পুড়িয়েছিল, সেই ক্রোধকে তিনি দগ্ধ করতে পারেননি। যেখানে ক্রোধজয়ী নারায়ণের হৃদয়ে ক্রোধই ঢুকতে ভয় পায়, সেখানে কাম কী করে আশ্রয় পাবে?

[শ্রীরুদ্র অর্থাৎ ভগবান শিব যে ক্রোধকে সংযম করতে পারেননি, সেই বিষয়টি নিয়ে শ্রীব্রহ্মা হাল্কা করে একটু খোঁচা দিয়ে বললেন, শ্রীবিষ্ণুর অবতার নর ও নারায়ণ কিন্তু ক্রোধ এবং কাম সংযম করে স্বর্গের অপ্সরাদের নাকাল করেছিলেন, কিন্তু তাঁদের ভস্ম করে দেননি।]    

পিতা উত্তানপাদের সামনে জননীর সপত্নী সুরুচিদেবীর কটুবাক্যে বালক ধ্রুব তপস্যা করতে বনে গিয়েছিলেন, ভগবান তাঁর স্তবে প্রসন্ন হয়ে তাঁকে নিত্য ধ্রুবলোক প্রদান করেছিলেন। ঊর্ধতন ভৃগু প্রমুখ ঋষি ও অধস্তন সপ্তর্ষিগণ এই ধ্রুবলোকের মহিমা কীর্তন করে থাকেন। ব্রাহ্মণদের অভিশাপে কুপথগামী রাজা বেণের পৌরুষ ও ঐশ্বর্য দগ্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং তিনি নরকে পতিত হয়েছিলেন। সেই সময়ে ঋষিদের প্রার্থনায় ভগবান, রাজা বেণের পুত্র রূপে জন্ম নিয়ে পৃথু নাম নিয়েছিলেন। মহারাজ পৃথু রাজা বেণকে পুন্নামক নরক থেকে রক্ষা করেছিলেন এবং জগতের পালনের জন্যে পৃথিবীকে দোহন করে প্রচুর অন্ন ও শস্য উৎপন্ন করেছিলেন। তারপর নাভির ঔরসে ও সুদেবী অর্থাৎ মেরুদেবীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করে ঋষভ নাম নিয়ে জড়যোগ ও নিত্যসমাধিযোগ আশ্রয় করেছিলেন। তিনি মুক্তসঙ্গ হওয়ায়, তাঁর ইন্দ্রিয়সমূহ প্রশান্তভাব ধারণ করেছিল এবং স্বরূপে অবস্থানের কারণে তাঁর সর্বত্র সমদর্শন হয়েছিল। ঋষিগণ এই পদকে পরমহংসগণের বরণীয় পদ বলে বর্ণনা করে থাকেন।

[এই কুপথগামী রাজা বেণ এবং তাঁর দেহজাত পুত্র পৃথুর জন্মের অলৌকিক কাহিনীকে বাস্তবমুখী পুনর্নির্মাণ করেছি "এক যে ছিলেন রাজা" উপন্যাসে - এই ব্লগেই ধারাবাহিক উপন্যাসটি পড়ে নিতে পারেন এই লিংক থেকে - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "]       

বৎস নারদ, একবার আমার এক যজ্ঞের অনুষ্ঠানে, ভগবান হয়গ্রীবরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং নিশ্বাসের সঙ্গে নিজের নাসিকাছিদ্র দিয়ে বেদের বাণী প্রকাশ করেছিলেন। সেই সময়ে অখিল দেবতার আত্মা শ্রীহরির সোনার বরণ অঙ্গ বেদময় এবং কর্মকাণ্ডময় হয়েছিল। যুগের অন্তিমকালে তিনি মৎস্যমূর্তি ধারণ করে পৃথিবী ও নিখিল জীবের আশ্রয় হয়েছিলেন। বৈবস্বত মনু তাঁর এই রূপ উপলব্ধি করেছিলেন। মহাভয়ংকর প্রলয়ের সময়, আমার মুখ থেকে বেদসমূহ স্খলিত হওয়ায়, ভগবান সেই বেদরাশি উদ্ধার করে, অনন্ত যুগান্তসলিলে মহানন্দে বিহার করেছিলেন। অমর ও দানবগণ অমৃত লাভের জন্য একবার ক্ষীরোদ সমুদ্র মন্থন করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আদিদেব শ্রীহরি কূর্মমূর্তি ধারণ করে, মন্থনদণ্ডরূপ মন্দারগিরিকে নিজের পিঠে ধারণ করেছিলেন। দেবতাগণের ভয়হারী ভগবান, কুটিল ভ্রূ ও ভয়ংকর দাঁতযুক্ত বদনে অট্টহাস্যময় ভয়ংকর নৃসিংহ মূর্তি ধারণ করেছিলেন। নিজের উরুতে রেখে, নৃসিংহদেব অত্যাচারী দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপুকে তাঁর নখের আঘাতে হত্যা করেছিলেন।

চলবে...


বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬

খাই খাই - শেষ পর্ব

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ -গল্প - " আগুনের পরশমণি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ১ "


আগের পর্ব - " খাই খাই - পর্ব ১ "

 
শেষ পর্ব


৩ 

  চাল থেকে রান্না করা খাদ্য কিংবা গম ভাঙানো আটার রুটি থেকে যে পরিমাণ সহজপাচ্য পুষ্টি ও ভিটামিন্‌স্‌ পাওয়া যায়, অন্য কোন খাদ্যে তেমন পাওয়া যায় না।  নিচের চার্ট থেকে তোমরা বুঝতে পারবে, সমপরিমাণ খাদ্যের কী গুণাগুণঃ-

 

সাদা চাল

(১০০ গ্রাম)

গমের রুটি (২টি)

(১০০ গ্রাম)

পাঁঠা/ভেড়ার মাংস*

(১০০ গ্রাম)

কার্যকারিতা

ক্যালোরি

২২৩

২৬০

১৯৯

খাদ্য থেকে পাওয়া শরীরের শক্তির পরিমাণ

টোটাল ফ্যাট

০.৩ গ্রাম

৮ গ্রাম

৯.৩ গ্রাম

পরিমিত পরিমাণে শরীরে শক্তি দেয়, অতিরিক্ত ফ্যাট শরীরের ক্ষতি করে।

কোলেস্টেরল

০.০০

০.০০

৯৩ মিগ্রা

স্বল্পমাত্রা কোলেস্টেরল শরীরের উপকারী

সোডিয়াম

১ মিগ্রা

৯৫ মিগ্রা

১১৫ মিগ্রা

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে।  

ক্যালসিয়াম

১ মিগ্রা

২ গ্রাম

 

হাড়ের পক্ষে উপকারী।

আয়রন

১ মিগ্রা

 

৪ মিগ্রা

রক্তের লাল কণিকার জন্য উপকারী।

পটাসিয়াম

৩৫ মিগ্রা

 

৩৪৮ মিগ্রা

রক্তচাপ ও মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে।

ম্যাগনেসিয়াম

৩ মিগ্রা

 

 

হাড়ের পক্ষে উপকারী।

কার্বোহাইড্রেট

২৮ গ্রাম

২০ গ্রাম

মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে।

প্রোটিন

২.৭ গ্রাম

৩ গ্রাম

২৮ গ্রাম

পেশীর গঠনে সাহায্য করে।

ফাইবার

০.৪ গ্রাম

৩ গ্রাম

 

হজমের পক্ষে উপকারী।

ভিটামিন বি১২

 

৩.৮ মাইক্রোগ্রাম

রোগ প্রতিরোধ, খাদ্যের পরিপাক, শরীরের বৃদ্ধি।

ভিটামিন বি৩

 

৫.৫ মিলিগ্রা

রোগ প্রতিরোধ

ভিটামিন বি৬

৫ মিগ্রা

 

 

রোগ প্রতিরোধ

*আদিম যুগের মানুষ পশু শিকারে কোন বাছবিচার করতে পারত না, পাঁঠা বা ভেড়ার তুলনায় সে মাংস ছিল অনেক শক্ত, এবং দুষ্পাচ্য, সেই সব মাংসের পুষ্টিগুণ যোগাড় করা এখন বেশ কষ্টকর।

ওপরের চার্ট থেকে বুঝতেই পারছো, সমপরিমাণ ভাত ও রুটিতে, খাদ্যগুণে খুব একটা তফাৎ নেই – এবং  খাদ্য থেকে শরীরে পাওয়া শক্তিও (ক্যালোরি) প্রায় সমান। এই খাদ্য থেকে পাওয়া শক্তিকে যদি খাদ্যশক্তি (food energy) বলি, তাহলে এই শক্তি দিয়ে আমরা সারাদিনের সব কাজ করার ক্ষমতা পাই। এই খাদ্যশক্তি কম হতে থাকলে, আমরা দুর্বল হতে থাকি, অসুস্থ হতে থাকি, কখনো কখনো স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারাই। আবার প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্যশক্তিও, আমাদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে, আমরা মেদবহুল হয়ে, কর্মক্ষমতা হারাতে থাকিসারাদিনে একজন পূর্ণবয়স্ক অফিস/স্কুল/কলেজে চাকরি করা আধুনিক মানুষের মোটামুটি ২০০০ ক্যালোরি শক্তির প্রয়োজন! যাঁরা খেলাধুলো করেন, কিংবা শ্রমজীবী মানুষ – তাঁদের এই ক্যালোরি অনেক বেশি দরকার।

এবার এই হিসেবে আদিম মানুষদের কথা যদি চিন্তা করা যায়, তাঁদের সকলকেই জঙ্গলে, পাহাড়ে, পশু শিকারের জন্যে প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে হত, অতএব তাঁদের দিনে চার/পাঁচ হাজার ক্যালোরির কম শক্তি হলে চলত বলে মনে হয় না। সেক্ষেত্রে অন্ততঃ চার কিলো মাংস নিয়ে তাঁদের বসতেই হতো, যাতে হাড়গোড় ফেলে দিয়ে, পেটে কেজি দুই-আড়াই হাড়হীন সলিড মাংস যায়। প্রত্যেকদিন দলের সকলের ভরপেট মাংসের যোগাড়ের জন্যে কত পশু শিকার করতে হত এবং কাজটা কতটা বিপজ্জনক ও পরিশ্রমের আশা করি বুঝতে পারছো?          

অতএব, প্রধানতঃ পশুমাংসের উপর নির্ভরশীল মানুষ যেদিন থেকে, ধান এবং গমজাত খাদ্যকে প্রধান খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করতে লাগল, তাদের আচার-আচরণ, চিন্তা-ভাবনা এবং জীবন ধারায় অতি দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে লাগল। ওই রিরি আর মিকার আশ্চর্য আবিষ্কারের ফলেই, আমরা যে আদিম মানুষ থেকে আজকের মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছি, এ কথাটা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করতে আমার একটুও দ্বিধা নেই!    

 

 ওপরে চাল, গম আর মাংসের পুষ্টির যে চার্ট দিয়েছি, সেটা থেকে আমরা এটুকু বুঝতে পেরেছি, শুধু ভাত, শুধু রুটি অথবা শুধু মাংস দিয়ে মানুষের শরীরের প্রয়োজনীয় খাদ্য শক্তি অর্জন করা বেশ শক্ত। সেক্ষেত্রে মাংস-ভাত, কিংবা মাংস-রুটি, অথবা মাংস-ভাত-রুটি সঠিক পরিমাণে খেলে আমাদের সহজে শক্তিলাভ হয়, সব খাবারের মিলিত নানান পুষ্টিতে শরীর সুস্থ হয়, আবার খেতেও ভালো লাগে।

ধান, গম আবিষ্কারের পর, ধীরে ধীরে আদিম মানুষ যতো কৃষিনির্ভর হতে লাগল, ততই তাদের প্রাত্যহিক খাদ্য চিন্তা কমতে লাগল, তার কারণ - প্রত্যেকদিন ভোরে উঠে শিকারে যাওয়া, সারাদিন দুর্গম জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে মনোমত পশু পাওয়া বা না পাওয়ার অনিশ্চয়তা, শিকার করার সাফল্য ও ব্যর্থতার দুশ্চিন্তা ও বিপদ এবং দিনের শেষে পশু বয়ে এনে, তাকে খাদ্য বানানো - সব মিলিয়ে সে ছিল প্রাণান্ত পরিশ্রম! তারপর ক্লান্তিতে বিধ্বস্ত শরীরে পরের দিন ভোরে আবার শিকারে যাওয়ার দুশ্চিন্তা নিয়ে রাত্রের ঘুম! এইভাবেই দিনের পর দিন, মাস, বছর কেটে যেত – অবকাশ বা অবসরের জন্য প্রচণ্ড বর্ষার দিনগুলো ছাড়া, অন্য কোন সময়ই ছিল না!

অন্যদিকে বছরে পাঁচ-ছমাস অনেক কম বিপজ্জনক পরিশ্রম করে, কৃষিকাজে উৎপন্ন ফসল থেকে সারাবছরের খাদ্যসংস্থান, পরিবারের প্রত্যেকের হাতে এনে দিল পর্যাপ্ত অবসর। এই নিশ্চিন্ত অবসর সময়টা মানুষ নিজেদের মতো করে ব্যবহার করতে শিখল। 

আগুনের ব্যবহার এবং তারপর চাষবাস শিখে, রান্না করা খাবার গ্রহণের পরিমাণ কমে যাওয়ায় মানুষের পৌষ্টিক তন্ত্র অনেক হাল্কা হতে লাগল; রান্না করা খাবার চিবোনো অনেক সহজ হয়ে যাওয়ায়, চোয়ালের পেশী এবং দাঁতের গঠন বদলে গিয়ে, মানুষের মুখ ও মাথার গঠনও বদলাতে লাগল। খাবার সময় কমে গিয়ে এবং খাবারের বৈচিত্র্য বেড়ে যাওয়ার ফলে, শুধু খাওয়া, ঘুম আর বেঁচে থাকার চিন্তা ছাড়াও মানুষের হাতে অনেকটা সময় বেঁচে রইল। সেই সময়টা ব্যবহার হতে লাগল নানান চিন্তা ভাবনায়, অতএব বেড়ে গেল মস্তিষ্কের ব্যবহার। সেই চিন্তাভাবনা যত সুসংহত হল, মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ হতে লাগল দ্রুত। আগে শুধু কাঁচা বা অর্ধসিদ্ধ মাংস খেতে এবং হজম করতে যে পরিমাণ পুষ্টি-শক্তি ক্ষয় হত, এখন সেই উদ্বৃত্ত পুষ্টি মস্তিষ্কের শক্তি বাড়িয়ে চলল। অভিনব চিন্তা ভাবনা থেকে মানুষ ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল আরো উন্নতির দিকে; আরো সুস্থ, নিরাপদ, নিশ্চিন্ত জীবনের দিকে।    

যারা খুব কাজের মানুষ তারা অবসর সময়েও বসে না থেকে, নানান ফন্দি ফিকির করে, পশুপালন আয়ত্ত করে ফেলল। গরু, মোষ, ছাগল, ভেড়া পালন করে, দুধ, মাংস এই সব খাদ্যের সহজ যোগান যেমন নিশ্চিত করল, তেমনি পশুদের কাজে লাগিয়ে চাষবাসের কাজেও প্রভূত সুবিধে হয়ে গেল।  কেউ চাকা আবিষ্কার করে, মাঠ থেকে ফসল বয়ে আনার ছোট গাড়ি আবিষ্কার করে ফেলল। কেউ কেউ মাঠ থেকে ফসল বয়ে আনার জন্যে গড়গড়িয়ে চাকা চলার মতো রাস্তা বানিয়ে ফেলল! কেউ কেউ চিন্তাভাবনা করে আবিষ্কার করতে লাগল, কৃষিকাজের সুবিধের জন্য নানান যন্ত্রপাতি। কাঠের লাঙ্গল, ধান ভাঙার ঢেঁকি, পাথরের দুই চাকার মধ্যে চেপে ডাল কিংবা গম গুঁড়ো করার জাঁতাকল। নিত্য প্রয়োজনের জন্য গৃহস্থালী হাঁড়ি, কলসী, থালা, বাটি, নানান তৈজসপত্রাদি। এইভাবে জেগে উঠল মানুষের কারিগরী সত্ত্বা! গড়ে উঠতে লাগল নানান বৃত্তি - কুম্ভকার, সূত্রধর, কর্মকার, বাস্তুকার আরো কত!

বয়স্কদের কেউ কেউ বসে বসে লক্ষ্য করতে লাগল প্রকৃতি এবং ঋতুর পরিবর্তন। শুরু হয়ে গেল, সূর্য ও চাঁদ এবং নক্ষত্রদের চিনে, দিন গোনা, পক্ষ, মাস, ঋতু ও বছর গোনা। তাঁদের মাথার মধ্যে বাসা বাঁধতে শুরু করল অঙ্ক এবং হিসেব! জেগে উঠল মানুষের জ্যোতির্বিজ্ঞানী সত্ত্বা। কারণ সেই হিসেবেই প্রাক-বর্ষায় জমি প্রস্তুত করা, প্রথম বর্ষায় বীজ বপন, শরৎ পার করে, হেমন্তে পাকা ফসল কাটার আনন্দময় দিনগুলো আসে

এই আনন্দ থেকেই জন্ম নিতে লাগল নানান উৎসব। মানুষের প্রথম উৎসব হয়তো নবান্ন।  যে উৎসব আজও সারা ভারতে পালন করা হয়, ভিন্ন ভিন্ন নামে, কিন্তু একই মকরসংক্রান্তির দিনে। এই উৎসব পাকা ফসল ঘরে তোলার উৎসব। এই উৎসব ঘিরেই শুরু হয়ে গেল পাখিদের সুরে সুর মিলিয়ে গান বাঁধা। নানান বাদ্য আবিষ্কার করে বাজনা বাজানো! নাচ, গান, বাদ্য নিয়ে জেগে উঠল মানুষের শিল্পীসত্ত্বা – কেউ হল নট-নটী, কেউ বাদক-বাদিকা কিংবা গায়ক-গায়িকা!

অভিজ্ঞ, বৃদ্ধ মানুষেরা, যাঁরা কায়িক শ্রম আর তেমন করতে পারেন না, তাঁরাও চিন্তা করতে লাগলেন, এই মানবজীবন নিয়ে! এই জীবন কোথা থেকে এল, এই জীবনের উদ্দেশ্য কী? এই জগতের প্রকৃতি, জীব, জড় ও মানুষের সৃষ্টিকর্তা কে? সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, নক্ষত্র কার নির্দেশ মেনে এমন নিয়মিত? সূর্য আলো দেন, উত্তাপ দেন, মেঘ সৃষ্টি করেন, মেঘ বৃষ্টি ঝরায়, মাটিতে উপ্ত বীজ থেকে উদ্ভিদ জন্ম নেয়। আর চন্দ্র সেই উদ্ভিদের বৃদ্ধি দেন, ফল দেন, শস্যে রস ও পুষ্টি সঞ্চার করেন। মানুষের মধ্যে জেগে উঠল আশ্চর্য দার্শনিক সত্ত্বা। তাঁরা নিজেরাই চিন্তাভাবনা করে এই ধরনের নানান প্রশ্নের উত্তর খুঁজে, মুখে মুখে বানিয়ে তুললেন ছন্দবদ্ধ জ্ঞান, যার নাম বেদ, উপনিষদ! তাঁরা ঋষি, মুনি, তাঁরা আজও আমাদের কাছে অদ্ভূত চিন্তাশীল জ্ঞানী হিসেবে অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র!

শিকারী আদিম মানুষদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল, নিষ্ঠুর প্রতিকূল প্রতিবেশে বেঁচে থাকার একমাত্র তাগিদ। দয়া, মায়া, মমতা, করুণা - মনের এই ধরনের সুকুমার প্রবৃত্তি জেগে ওঠার মতো পরিস্থিতিই ছিল না। যেটুকু ছিল, সেটুকুও অব্যক্ত, অস্পষ্ট। শিকারের নৃশংসতা ভুলে গিয়ে, কৃষিকাজে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে তাদের মনের প্রকৃতিও দ্রুত বদলে যেতে লাগল! তাদের এখন বছরের অনেকটা সময় কাটে, সিক্ত শীতল মাটি, মেঘ মেদুর আকাশ, অবিরল বর্ষণে পূর্ণ হতে থাকা হরিৎ শস্য ক্ষেত্র। এই সংস্পর্শ মানুষের মনকে অনেক নরম, স্নিগ্ধ করে তুলতে লাগল। এমনকি, ফসল কাটার পর শূণ্য জমির দিকে তাকিয়েও তাদের মনের মধ্যে বেজে উঠতে লাগল রিক্ততার সুরসেই সুরে তাদের মনে বাজতে লাগল সবুজ শস্যের সজীব মাধুর্য এবং তার বিপরীতে ফসল ফলানো শস্যের মৃত্যুর নিঃস্বতা! বেড়ে উঠল পারিবারিক এবং সামাজিক বন্ধনের নিবিড়তাপরিবারের, সমাজের, গ্রামের অসুস্থ, দুর্বল মানুষের জন্য, সুস্থ মানুষদের মনে এল সহানুভূতি। কীভাবে এই অসুস্থ মানুষগুলিকে নীরোগ করা যায়, সেই চিন্তা এবং ব্যাকুলতা থেকে ধীরে ধীরে কিছু মানুষ ঝুঁকলেন চিকিৎসাচর্চায়। নানান লতাগুল্ম, শিকড়, পাতা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে করতে গড়ে উঠতে লাগল আয়ুর্বেদশাস্ত্র। অসহায়, অক্ষম মানুষদের প্রতিও তারা অনুভব করতে লাগল, দয়া -  নিঃস্বার্থ দান হয়ে উঠল মানুষের পরম পুণ্যকর্ম।  

 

শিকারী আদিম মানুষেরা ছোট ছোট দলে যাযাবর হয়ে ঘুরে বেড়াত, এক জঙ্গল থেকে অন্য জঙ্গলে। এই দলগুলির অধিকাংশই হত মূলতঃ বৃহত্তর পারিবারিক সূত্রে বাঁধা। একটি দলের মানুষেরা, সাধারণতঃ অন্য দলের মানুষদের এড়িয়ে চলত। কখনো কখনো মুখোমুখি বা কাছাকাছি হলে, দুই দলে বেঁধে যেত প্রচণ্ড লড়াই, দুই দলেরই অনেক মানুষ হতাহত হত। এই লড়াই হত, প্রধানতঃ কোন এলাকার কিংবা জঙ্গলের দখল নিয়ে, কারণ একই জঙ্গলে দুই শিকারী দলের জন্য অসম্ভব ছিল পর্যাপ্ত পশুর যোগাড়!

কৃষিকাজ শিখে ফেলার পর এক একটা দল, বিস্তৃত ব্যবধানে গড়ে তুলতে লাগল এক একটা গ্রাম। প্রথম দিকে কৃষিক্ষেত্র নিয়ে তাদের মধ্যে রেষারেষি ছিল, উৎপন্ন ফসল লুঠ করে নেওয়ার প্রবণতাও ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে লাগল সখ্যতা, আদানপ্রদানের সম্পর্ক। এর পিছনেও ছিল মানসিক পরিবর্তন, শিকারী মনের নিষ্ঠুর হিংস্রতা থেকে মানুষ হয়ে উঠতে লাগল সহমর্মী এবং সহিষ্ণু। এক গ্রামের উদ্বৃত্ত ফসল দিয়ে অন্য গ্রামের উৎপন্ন যন্ত্রপাতি, তৈজসপত্রাদি বিনিময়ের মাধ্যমে গড়ে উঠতে লাগল বাণিজ্য সম্ভাবনা। ধীরে ধীরে একধরণের মানুষ বাণিজ্যকেই বৃত্তি করে নিয়ে, পণ্য নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন দূর দূরান্তের গ্রামে, সমাজে নতুন এই শ্রেণীর নাম হল বণিক। এই বাণিজ্য থেকে কৃষিনির্ভর সাধারণ গ্রামগুলিও সমৃদ্ধ হতে হতে, তার গায়ে ছোঁয়াচ লাগল অর্থনীতির!

এই বণিকেরাই হয়ে উঠলেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরের যোগসূত্র। তাঁরা যত দূর দেশে যান, ততই নানান পরিবেশ, নানান মানুষের সংস্পর্শে আসেন। দূর দূর গ্রামের বৈশিষ্ট্যবার্তা তাঁরাই বহন করতেন অন্য গ্রামে। তাঁদের পরোক্ষ সংযোগে গড়ে উঠতে লাগল বৃহত্তর মানুষের সমাজ, সে সমাজ কয়েকখানা মাত্র গ্রামে আর সীমাবদ্ধ রইল না, ব্যাপ্ত হতে লাগল বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। এক এক গ্রামের ভিন্ন ভিন্ন রীতি-নীতি, আচার-ব্যবহার, জ্ঞান-বিদ্যা - পরষ্পরকে প্রভাবিত করে, গড়ে উঠতে লাগল সার্বজনিক দেশাচার। গড়ে উঠতে লাগল সর্বজনমান্য এক সামাজিক বিধি বিধান, যার নাম ধর্ম। ধর্ম যা ধরে থাকে মানুষকে, ধর্ম যা বেঁধে রাখে সমাজকে। এই ধর্ম কোন একক ব্যক্তির জীবনদর্শন নয়, এই ধর্ম সর্বজনের হিতের জন্য, সমাজের সকল মানুষের মঙ্গলের জন্য – সার্বজনীন, সনাতন।

এতক্ষণ যা কিছু বললাম, সবই অত্যন্ত ভালো, সুন্দর এবং যেন স্বপ্নের মতো। কিন্তু কৃষিকাজেও সর্বদাই যে সাফল্য আসবে, তেমনটা আজও হয় না, তখনও হত না। কৃষিকাজের অনেকটাই নির্ভর করে প্রকৃতির মর্জির উপর, যে বছর সুবর্ষা হয়, সে বছর ফসল খুব ভালো হয়। মাঝে মাঝে অতিবৃষ্টিতে মাঠে অতিরিক্ত জল জমে, গাছ পচে যায়, ফসল হয় না, কোন বছর আবার অনাবৃষ্টিতে ফসল হবার আগেই মাঠের গাছ শুকিয়ে মরে যায়। দু এক বছর এমন হলে, একটু কষ্টে হলেও বিপদ হয়তো সামলে নেওয়া যায়, কিন্তু এমন অনেক অনেক বছর অনাবৃষ্টি হলে অবস্থা সঙ্গীন হয়ে ওঠে।

আজকের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যুগেও যাঁরা কৃষিজীবী, তাঁদের কৃষির জন্য আজও প্রকৃতি ও সুবর্ষার উপরেই সব থেকে বেশি নির্ভর করতে হয়।

খরার কথা যেমন বললাম, তেমনই ছিল (এবং আজও আছে) অতিবৃষ্টি। এই অতিবৃষ্টিতে নদী প্লাবিত হয়ে, ভাসিয়ে দেয় দুই পাশের গ্রাম ও কৃষিক্ষেত্র, নষ্ট করে দেয় ফসল ফলার সম্ভাবনা। সে যুগের সীমিত ক্ষমতায় বন্যা ও খরার থেকে রক্ষা পেতে কিছু কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হত। যেমন বন্যার জল আটকাতে, নদীর দুপাড়ে উঁচু বাঁধ নির্মাণ। বর্ষার জলকে সঞ্চিত করার জন্যে গ্রামের ভেতরে কিংবা বাইরে পুকুর, দীঘি খনন। কিন্তু সে ব্যবস্থা ছিল অপ্রতুল এবং আজও আমাদের উন্নত প্রযুক্তির নানান সেচব্যবস্থায় (irrigation system) এই সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান সম্ভব হয়নি।

সেই যুগের তুলনায় আজকের দিনে অনেক উন্নতি ও প্রগতি হওয়া সত্ত্বেও, আমাদের দেশে আজও কৃষিজীবীদের কাছে কৃষিকাজ অনেকটাই প্রকৃতি-নির্ভর অসম এক লড়াই এবং অত্যন্ত কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। লক্ষ লক্ষ গ্রামের মাঠে মাঠে তাঁরা কতটা পরিশ্রম করেন তার খবরও রাখি না আমরা। তাঁদের কঠোর পরিশ্রমের ফসলে আমরা দুবেলার নিশ্চিন্ত পুষ্টি পেয়ে বিজ্ঞানের নানান চর্চায় ব্যস্ত থাকি। আমরা শহরের আরামদায়ক অভ্যস্ত জীবনে যখন দূরদর্শন, কম্পিউটার এবং চৌখস-দূরভাষের পর্দায় আধুনিক বিজ্ঞানের অদ্ভূত সাফল্যে বারংবার উচ্ছ্বসিত হই, তখন হাজার হাজার বছর ধরে কৃষিজীবী ওই মানুষগুলির অবদানের কথা কী ভুলে থাকবো? আজও কি আমরা স্বীকার করে নেব না, যে ওঁদের পরিশ্রমের ফসলেই আমাদের সকলের বিদ্যা-বুদ্ধি ও এই বিজ্ঞানচর্চার বাড়বাড়ন্ত?! বিজ্ঞানের পাঠশালায়, আধুনিক বিজ্ঞানের নানান জটিল বিষয় থাকতে, হঠাৎ ধান-গম নিয়ে এই লেখাটা তাই মোটেই অপ্রাসঙ্গিক নয়।

 --০০--


নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৫/৩

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম তৃতী...