এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
আরেকটি ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
১১
আজ ছিল রবিবার। রবিবারে তার চেম্বার
বন্ধ থাকে। তবুও তার রাতের
খাওয়া-দাওয়া সারতে সারতে সাড়ে দশটা বেজেই গেল। রান্নাঘরে শম্পাদিদির কাজ শেষ করে বেরোতে আরও মিনিট পনের সময় লাগল। সদর দরজা বন্ধ করে, শোবার ঘরের
টেবিলে একটু শান্তিতে বসে সুনেত্র যখন ল্যাপটপ চালু করল, তখন রাত প্রায় সোয়া
এগারোটা। বেশ কিছুদিন সুনেত্র সুকন্যাকে কোন মেল করেনি। আজ ইচ্ছা হচ্ছিল, বেশ
লম্বা একটা মেল করবে। আজ সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত সুকন্যা তার কাছেই ছিল, এই ঘরে, শোবার
ঘরের লাগোয়া ব্যালকনিতে, এমনকি রান্নাঘরেও। দুজনের জন্যে দুপুরের খাবার বানাতে
ব্যস্ত শম্পাদিদির সঙ্গেও ছিল
অনেকক্ষণ।
মূল্যবান ধূপ নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার
পরেও তার সুগন্ধ যেমন টের পাওয়া যায় ঘরের প্রতিটি কোণে, সুনেত্র আজ সেভাবেই যেন
টের পাচ্ছিল সুকন্যার অস্তিত্ব – তার মনের অন্দরে তো বটেই – এমনকি এই বাড়ির সমগ্র
আবহে। খুব সম্ভবতঃ শারদীয় উল্টোরথে ছোটবেলায় সুচিত্রা সেনের পরপর কয়েকটি বিশেষ
মুডের পৃষ্ঠা-জোড়া সাদাকালো ফটো দেখেছিল সুনেত্র। সেগুলির নীচে লেখা ছিল নানান
ক্যাপশন - বিস্মিতা, শঙ্কিতা, আনন্দিতা, লজ্জিতা, বিরহিনী, উৎকণ্ঠিতা... ঠিকঠাক
মনে নেই, তবে এরকম ধরনের। আজ সারাটা দিন সুকন্যার
মুখের দিকে
তাকিয়েই কাটিয়ে দিল সুনেত্র। এত দীর্ঘ সময়
ধরে, সুকন্যাকে এতটা কাছে কোনদিন পায়নি
সুনেত্র। হয়তো অনেকের মধ্যে ওকে খুঁজে নিয়ে চকিত চোখের কথা শুনেছে এবং বলেছে। কিংবা
আধো-আলো-আঁধারি গঙ্গার ধার ধরে হাতে হাত রেখে হেঁটে চলা, সদা-শঙ্কিত মনে। এই বুঝি
চেনা কেউ দেখে ফেলবে, আচমকা বলে উঠবে – আরে সুনু, তুই এখানে? ওটা কে? তোর পিসতুতো
বোন না? এসময় এখানে কী করছিস?
কিন্তু আজ? ধরা পড়ে যাওয়ার শঙ্কাহীন মনে অনেকক্ষণ - অনেক
কথা দুজনের। যদিও সব কথা মুখ ফুটে বলা হল না, বলার দরকারও ছিল না তেমন। শব্দময়
কথোপকথনের থেকে নিঃশব্দ আলাপন যে কতটা গভীর হয়, সে কথা সুনেত্র জানে। মুখ ফুটে
অজস্র কথা বলার চেয়েও প্রতিটি কথা কান পেতে শোনা ও অনুভব করার মধ্যেই যে লুকিয়ে
থাকে অনন্ত মাধুর্য - সে কথাটাও আজই প্রথম জানল সুনেত্র – তার এই মধ্য বয়সের উপান্তে।
ল্যাপটপে মেলবক্স খুলে খুব অবাক হল সুনেত্র, কনির দুটো মেল এসেছে – একটা প্রায় দেড়ঘন্টা আগে, আরেকটা মিনিট কুড়ি আগে। আগের মেলটাই প্রথম খুলল সুনেত্র। ছোট্ট চিঠি,
“সুনুদা,
আজকের দিনের স্মৃতিটা মনের গভীরে কী ভাবে সাজিয়ে রাখা যায়
বলো তো? দোহাই তোমার, “সোনার ফ্রেমে” বলো না। অথবা মনের মণিকোঠায় বলো না – অন্য
কিছু ভাবো। যতদিন না আমার মনোমত ফ্রেমটা তুমি খুঁজে এনে আমার হাতে তুলে দেবে,
ততদিন আমার নিরিবিলি মনের বাঁধা ঘাটেই রয়ে যাবে আজকের সকল স্মৃতি।
তোমার কনি”।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুনেত্র পরের মেলটা খুলল, সুদীর্ঘ চিঠি। এত বড়ো চিঠি কনি কোনদিন লেখেনি – সেই কাগজ-কলমের যুগেও। অভিযোগ করলে বলত, তোমার বাগানে তুমি যেমন কথার চাষ করো, আমি তো তেমন করি না। তাই তোমার আছে কথার ঝুড়ি, আমার আছে একটি বা দুটি শিশিরে ভেজা সদ্যফোটা ফুল। সেটাকে তোমার যদি যৎকিঞ্চিৎ মনে হয়, তাহলে আমি নাচার। সেই কনি কী এত লিখল? ইন্টারেস্টিং! সুনেত্র চিঠিটা শুরু করার আগে একটা সিগারেট ধরাল, তারপর...
“সুনুদা,
শুনেছি সিদ্ধির নেশায় মানুষের মুখে নাকি তুবড়ি ছোটে।
আবোলতাবোল কথা আর অকারণ হাসিতে নিজের মধ্যে নিজেই মজে থাকে আনন্দে। তুমি কি সিদ্ধি
পুড়িয়ে ঘরে ধোঁয়া ভরে রেখেছিলে? নয়তো আজ আমার এমন ভূতে পাওয়া দশা হল কেন? আমার বাচাল
বকবকানিতে কিংবা তুচ্ছমুচ্ছ কারণে হেসে গড়িয়ে পড়ার বাড়াবাড়ি দেখে তোমার মাথা
ধরেনি? অবশ্য মাথা ধরলেও তুমি কী আর বলবে? নিজেই ডাক্তার – সকলের চোখের আড়ালে একটা
ট্যাবলেট, ঘুট করে কখন জলের সঙ্গে মেরে দেবে – কেউ টেরও পাবে না।
আজ গোটা দিনটা – সেই তুমি যখন অনিমেষকে বাড়ি পাঠিয়ে, আমার
হাত ধরে তোমার নির্জন নীড়ে আমায় টেনে নিয়ে গেলে। আর সন্ধেবেলায় তোমার গাড়িতে করে
আমার বাড়িতে তুমি যখন পৌঁছে দিয়ে গেলে। বিশ্বাস কর সুনুদা, এই দুটো মাত্র ঘটনা
ছাড়া, সারাটা দিন আমি কী করেছি, কী বলেছি, কতবার হেসেছি – কিচ্ছু মনে নেই। তুমি কি
জান, সুনুদা - এই দুবারই আমি আকাশে-বাতাসে শুনেছি শঙ্খ ধ্বনি? তুমি শুনতে পাওনি,
না? কিন্তু আমার দুই কান অত্যন্ত লোভীর মতো শুনেছে সেই শঙ্খ রব। তখন মনে হয়েছিল এই
ধ্বনি মাঙ্গলিক, কিন্তু এখন তোমাকে এই মেল লিখতে বসে মনে হচ্ছে সে ধ্বনি অমঙ্গলের সংকেত।
মনে হচ্ছে আমার জীবনে আবার আসছে নতুন এক ভাঙনের পর্ব...।
তুমি ভাবছ, আমার জীবনে আগে এক বা একাধিক ভাঙনের পর্ব ঘটেছিল
নাকি, যে আবার আসছে নতুন একটা? এসেছিল, সুনুদা, এসেছিল। অন্ততঃ দু’বার তো বটেই –
কখনো কখনো মনে হয় আরও বেশি। সেই ভাঙনে শেকড়-ছেঁড়া গাছের মতো যে ভেঙে পড়েছি তা নয়, তাহলে
তো একদিক থেকে ভালই হত, সব ল্যাঠা চুকে যেত। কিন্তু সেটাও হয়নি – আমার জীবন-তরুর
প্রতিটা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘুণ বাসা বেঁধেছে। নিশুতি রাতে ঘুণ পোকার আওয়াজ শুনেছ,
সুনুদা? আমি শুনেছি। আমাদের বাড়িতে, তোমার মনে আছে কিনা জানি না, বাইরের ঘরে আম বা
জামকাঠের একটা চৌকি ছিল। সেই চৌকির কাঠে ঘুণপোকা বাসা বেঁধেছিল। নিশুত রাত্রে কখনো
কোন কারণে ওই ঘরে ঢুকলেই আমি শুনতে পেতাম ঘুণদের কাঠ কাটার শব্দ। দিনের বেলায় কাঠের
গায়ে থাকা ক্ষুদ্র ছিদ্রে কাঠি ঢুকিয়ে দেখেছি – আশ্চর্য গভীর রন্ধ্র। কাঠির খোঁচায়
বেরিয়ে আসত পাউডারের মতো কাঠের গুঁড়ো – হয়তো তার মধ্যেই থাকত দু একটা ঘুণপোকা! সে পোকাকে
চিনতে পারিনি, তার চেহারা কেমন জানি না। কিন্তু বেশ কয়েক বছর হল, অহোরাত্র আমার
ভিতরে সেই আওয়াজ শুনতে পাই।
তোমার মনে আছে নিশ্চয়ই। আমার বিয়ের সময় তুমি বড়ো উদাসীন হয়ে
গিয়েছিলে, সুনুদা। তুমি তখন পি.জি. করতে গিয়েছিলে চণ্ডীগড়ে। আমাকে তুমি কিছু
জানাওনি, কিন্তু মামীমার থেকে শুনেছিলাম – তোমার নাকি একদম ছুটি নেই – ইন্টার্নশিপ
না হাউস্টাফশিপের ডিউটি নাকি এমনই ভয়ংকর। আমার বিয়ের আটমাস আগেই তোমার প্রস্তাব
আমি প্রত্যাখ্যান করেছিলাম বলে, তীব্র অভিমানে তুমি আমার সঙ্গে আর কোন যোগাযোগই রাখোনি।
অতএব আমার দিক থেকে তোমার প্রতি অভিমান করাটা হয়ে উঠেছিল অকারণ অপচয়।
আবার এটাও ঠিক, তুমি না আসাতে বেশ স্বস্তি পেয়েছিলাম। তুমি
কাছাকাছি থাকলেই, তোমার সঙ্গে চোখাচোখি হত। এক-আধবার তোমাকে স্পর্শ করার ইচ্ছে যে
জাগত না, সে কথাই বা বলি কী করে? তুমি যে আমাকে তোমার জীবনের পথে একসাথে চলার আবাহন
করেছিলে! তোমার সেই আহ্বানকে আমি যে বুকে পাথর বেঁধে (এ কথাটা যথেষ্ট নাটকীয় হয়ে
উঠল জেনেও লিখলাম) প্রত্যাখ্যান করেছিলাম, সে কথাও মনে পড়ত বারবার। এবং কে জানে
ছাদনাতলায় তোমার হয়তো ডাক পড়তো আমার পিঁড়ি তুলে ধরে আমাকে সাতপাক ঘোরানোর জন্যে। পিঁড়িতে
বসে তোমার কাঁধে ভর রেখে শুভদৃষ্টির সময় – আমি কি পারতাম তোমার দিকে একবারও না
তাকিয়ে বরের মুখের দিকে তাকাতে?
আমার যে দেহ ও জীবনের ভার তুমি নিজের কাঁধে তুলে নিতে
চেয়েছিলে সুনুদা, সেই কাঁধে ভর রেখে আমি কোন আনন্দে শুভদৃষ্টি করতে পারতাম বলো তো?
সে সময় তোমার কাঁধে আমার দেহের আংশিক ভারটুকুও কি তোমার কাছে তখন অসহনীয় মনে হত
না? আমি তোমাতে আমার জীবন সমর্পণ করতে পারিনি, কিন্তু তাই বলে তোমার কাঁধে আমার দেহের
ভার কোন লজ্জায় চাপাতাম বলো তো?
আমার বিয়েটা নির্বিঘ্নেই ঘটে গেল। আমাদের পক্ষের বয়স্কা
মহিলারা প্রায় সকলেই বললেন, “অনেক ভাগ্যি করে এমন বর পেয়েছিস, সুকু। দেখিস খুব
সুখী হবি তুই।” তখন ভেবেছিলাম, তাঁরা আমায় আশীর্বাদ করলেন, কিন্তু আজ মনে হয় তাঁরা
অজান্তে আমার ভাগ্যকে বিদ্রূপই করেছিলেন।
অষ্টমঙ্গলা পার হল, নিয়ম মেনে আমি বাপের বাড়ি এলাম সাত
দিনের জন্যে। আমার বর আমাকে আমাদের বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে চলে গিয়েছিল – শুধু সেইদিন
নয়, আমার বর একটিও রাত্রিবাস করেনি তার শ্বশুরবাড়িতে। নির্দিষ্ট সপ্তাহ পার হয়ে
গেল, আমাকে নিতে বর এল না। ওদের বাড়ি থেকে খবর এল, আমাদের বাড়ি থেকেই কেউ যেন আমাকে
ওবাড়িতে পৌঁছে দেয়। অপ্রত্যাশিত এই সংবাদে বাবা-মা দুজনেই হতবাক এবং উদ্বিগ্ন হয়ে
উঠলেন – নানান দুশ্চিন্তায় তাঁদের ঘুম টুটল। মা আমাকে নির্জনে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন,
অনেক কথা, শাশুড়ি কেমন, শ্বশুর কেমন, জামাই কেমন। আমার এক বিবাহিতা ননদ ছিল, সেই
বা কেমন? তারপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “হ্যারে সত্যি করে বল তো, তোর সঙ্গে জামাইয়ের
বা ও বাড়িতে কারো সঙ্গে কোন বচসা বা মনোমালিন্য হয়নি তো?”
কি বলি বলো তো, সুনুদা? যে কোন বাড়িতে বিয়ের পরেও তার উৎসবীয়
রেশ চলে বেশ কিছুদিন। ও বাড়িতে সাতদিন যে ছিলাম, প্রকৃত অর্থে কার সঙ্গে আমার
ঘরোয়া বেশে এবং পরিবেশে পরিচয় হওয়া সম্ভব ছিল বলো তো? সারাদিন সকলে মিলে, অন্ততঃ
একশ বার জিজ্ঞেস করেছে – “কোন অসুবিধে হচ্ছে না তো, বৌমা/ অথবা বৌদি?” এই
প্রশ্নসমুহে সত্যিই কি কোন আন্তরিকতা থাকে? সকলেই তো জানে, অপরিচিত পরিবেশে নতুন
বধূ হয়ে এসেছে পরের ঘরের যে কন্যাটি – তার নানান অসুবিধে, অস্বস্তি হবেই। তা বলে,
সে কি সবাইকে সাতকাহন করে বলতে বসবে, হ্যাঁ আমার এইএই-ওইওই অসুবিধে হচ্ছে? আর তুমি তো জানো, সুনুদা, যথেষ্ট কারণ থাকলেও,
কোনদিনই আমি বচসা-প্রবণ কিংবা মনোমালিন্য-প্রবণ মেয়ে নই। আমার মা এবং বাবাও কি
সেকথা জানতেন না?
আমাকে সঙ্গে নিয়ে ও বাড়িতে বাবা নিজেই গেলেন। সকাল
দশটা-সাড়ে দশটা হবে। বাবা আমার শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে বাইরের ঘরে বসে আলাপ শুরু
করলেন – সে আলাপ কিছুটা শুনেই আমার মনে হল যেন অতিরিক্ত সহৃদয়-হৃদ্যতায় মাখামাখি। উপস্থিত
গুরুজনদের প্রণামপর্ব সেরে আমি শোবার ঘরে (সেই ঘরটার কথা মনে পড়লে, আজও আমার শরীর
ঘৃণায় শিউরে ওঠে, সুনুদা) ঢুকলাম, দেখলাম আমার বর শ্রীমান জ্যোতিষ – বিছানায় আশ্চর্যরকমের
বিশ্রীভাবে শুয়ে আছে। ঘরের সবকটি জানালা বন্ধ, যার ফলে বেশ ছায়াচ্ছন্ন – ঘরের মধ্যে কদর্য গন্ধময় বদ্ধ বাতাস। আমার
সঙ্গে ছিলেন শাশুড়ি, তিনি আমার বরের কাঁধে ঠেলা দিয়ে ডাকলেন, “অ্যাই, পিন্টু, ওঠ
কত বেলা হল, উঠে দেখ বৌমা এসেছে...ওঠ, উঠে পড়”। পিন্টু হল তোমার ভগ্নীপতির ডাকনাম
বুঝতেই পারছ।
বার তিনেক ধাক্কা খেয়ে পিন্টু কোন রকমে চোখ মেলে তাকাল – কিছুটা
ঘোলাটে লাল চোখ, নির্বিকার চোখের দৃষ্টি - কোন কিছুই যেন তার দৃষ্টিতে ধরা দিচ্ছে
না। ধরা দিলেও তার মস্তিষ্কে পাঠানো চোখের চিত্রগুলি স্পষ্ট হচ্ছে না। আমি বিরক্ত,
ক্ষুব্ধ এবং কিছুটা ক্রুদ্ধ হয়েই ঘরের তিনটে বন্ধ জানালাই হাট করে খুলে দিলাম।
শাশুড়ি বললেন, “কাল থেকেই ওর শরীরটা খারাপ, কিনা...”।
আমি পিন্টুর দিকে তাকালাম, সকালের উজ্জ্বল আলোয় তার চোখ
কুঁচকে গেছে। ভুরুর কাছে বাঁ হাতে তুলে আড়াল করছে আলো। আর সেই হাতে দেখলাম, কব্জির
ওপর থেকে কনুই পর্যন্ত শুকনো রক্তমাখা একটা কাটাদাগ।
“জানালাগুলো খুললে কেন?” পিন্টু বিরক্ত হয়ে জড়ানো গলায় বলে
উঠল। কিন্তু উঠে বসতে চেষ্টা করল না, হয়তো উঠে বসার অবস্থা তখনও ওর হয়নি।
সে কথার কোন উত্তর না দিয়ে শাশুড়িকে জিজ্ঞেস করলাম, “এমন
শরীর খারাপ কি ওর প্রায়ই হয়? ডাক্তার দেখানো হয়েছে?”।
উনি আমতা আমতা করে বললেন, “না...ইয়ে মানে প্রায়ই হবে কেন...
তাই আবার হয় নাকি? এবারই হল...সেরে উঠবে সন্ধে পর্যন্ত...ডাক্তার ডেকে... ডাকব?
ডাক্তার ডেকে লাভ হবে কি?”
বিছানায় বসতে প্রবৃত্তি হল না। ছোট একটা টুলে বসে আমি
শাশুড়ির দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে জিজ্ঞ্রেস করলাম, “শাক দিয়ে মাছ ঢাকবেন, মা, তাতে
কারো কোন উপকার হয় না – কাল কত রাত্রে ফিরেছে?”
আমার সরাসরি প্রশ্নে উনি ভেতরে ভেতরে টলে গেলেন, নিজের এবং
নিজের পুত্রটির আত্মরক্ষার্থে একটু রূঢ় স্বরে বললেন, “কী বলতে চাইছ, বৌমা? পিন্টু
নেশা করেছে? বললাম না, একটু শরীর খারাপ হয়েছে...”?
“নেশার কথা তো আমি বলিনি, মা?”
“তাই তো বলতে চাইছ? বলতে আর বাকি কী রাখলে?”
“বেশ। আপনি কি এই ব্যাপারটা নিয়ে আমার সঙ্গে তর্কাতর্কি করতে
চাইছেন? আমাদের তর্কাতর্কিতে এই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, মনে করছেন? খুব ভালো,
তাহলে আমিও প্রস্তুত হয়ে নিই...” বলে আমি ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে শাড়ির আঁচলটা কোমরে
বেঁধে নিলাম শক্ত করে, যাকে গাছ-কোমর বলে আর কি। তারপর আবার বললাম, “এক মিনিট আমি
আসছি, আমার বাবাকে আমি বিদায় জানিয়ে আসি...আজ এখনই আপনাদের স্বরূপটা বাবা জেনে
যাবেন...এটা আমার মনঃপূত হচ্ছে না”। ওঁনার উত্তরের অপেক্ষা না করে আমি বেরিয়ে গেলাম
ঘর থেকে। বসার ঘরে বাবার সামনে গিয়ে বললাম, “তুমি বাড়ি যাও বাবা, বেলা
বাড়ছে...এরপর রোদ চড়া হয়ে উঠবে...একটা ট্যাক্সি ধরে নিও...”।
বাবা রীতিমতো থতমত খেয়ে গিয়েছিলেন। ঝড়ের বেগে আমার ঘরে
ঢোকা, ওভাবে বাবাকে সেদিন চলে যেতে বলা আমার উচিৎ হয়নি মোটেই।
আমার কথাটা আমি উইথড্র করে নিলাম, সুনুদা, ওই যে বলেছিলাম,
“কোনদিনই আমি বচসা-প্রবণ কিংবা মনোমালিন্য-প্রবণ মেয়ে নই”। কথাটা ভুল বলেছিলাম –
এর আগে এমন দেয়ালে-পিঠ-ঠেকে-যাওয়া পরিস্থিতিতে কোনদিন পড়িনি, কাজেই আমার এই গুণের
(নাকি দোষের?) বার্তাটি আমার কাছে কোনদিন ধরা দেয়নি যে!
আমার আচরণে
বাবা চূড়ান্ত আশ্চর্য হলেন। মুখ তুলে তিনি আমার চোখে চোখ রাখলেন এবং ধীরে ধীরে
তাঁর মুখটা, স্পষ্ট দেখলাম, পাণ্ডূর-বর্ণ হয়ে উঠল। এই “পাণ্ডূর” কথাটা শরৎচন্দ্রের
বইতে অনেকবার পেয়েছি। অভিধানে দেখেছি এর অর্থ মলিন, বিষণ্ণ। আজন্ম তাঁর পরমস্নেহে
লালিত কন্যার চোখের দিকে চেয়ে, আমার অন্তরে ঘটে চলা গভীর যন্ত্রণার অভিব্যক্তি
অনুভব করে, তাঁর মন সেদিন নিছক বিষণ্ণ বা মলিন হয়নি – সত্যিই পাণ্ডূর হয়ে উঠেছিল।
আমি জানি একথা তিনি বাড়ি ফিরে তাঁর কন্যার মাতা – অর্থাৎ তাঁর স্ত্রীর সঙ্গেও সহজে
ভাগ করে নিতে পারবেন না। নিজের অন্তরেই তিনি দগ্ধ হতে থাকবেন অহরহ, সারাজীবন ধরে।
বাবা আমার
চোখে চোখ রেখেই অস্ফুটে বললেন, “তুই কি আমার সঙ্গে ফিরে যাবি, মা?”
“না, বাবা,
এখন আর তা হয় না”।
“ঠিক আছে,
আমি তাহলে চলি, বেয়াইমশাই” আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, “সাবধানে থাকিস্, মা...কোন
অসুবিধে হলে, কোন দ্বিধা করিস না, আমায় বলতে...”। এই কথা বলে, বাবা বেরিয়ে গেলেন
বাড়ি থেকে। আমি তাঁর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ, দুই চোখ ভরে উঠতে
চাইছিল অশ্রুতে, রুদ্ধ করলাম। এখন তো কান্নার সময় নয়”।
সুনেত্র সিগারেটের
প্যাকেট আর লাইটারটা নিয়ে উঠে গেল, ছাদে যাওয়ার সিঁড়ির লাইট জ্বালিয়ে ছাদে গেল।
অন্ধকার ছাদে দাঁড়িয়ে তারাভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। ঝলমল করছে আকাশ
এবং কিছুটা অস্পষ্ট ছায়াপথ। তার বাবা-মা, কনির বাবা-মা কেউই আর ইহলোকে নেই। লোককথা
বলে তাঁরা নাকি তারা হয়ে বিরাজ করছেন ওই আকাশে। তাকিয়ে আছেন তাঁদের সন্তানদের
দিকে...। সুনেত্র একটা সিগারেট ধরালো।
কনির সঙ্গে
আর কোনদিনই সে ভাবে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেনি সুনেত্র। সে ভেবেছিল কনি এখন
পরস্ত্রী, তার সংসারে কোনভাবেই উঁকি মারা তার উচিৎ নয়। উচিৎ নয় তার সাংসারিক কোন
ব্যাপারে নাক গলানো। কিন্ত মা-বাবা, পিসি-পিসেমশাইয়ের সঙ্গে তো তার যোগাযোগ
বিচ্ছিন্ন হয়নি। তাঁরা কেউ কনির এই দুঃসহ জীবনের কথা কেন কোনদিন তাকে বলেননি? কনির
কথা জিজ্ঞেস করলে, তাঁরা এড়িয়ে যেতেন, বলতেন, ভালোয়-মন্দয় মিশিয়ে সংসারে যেমন থাকা
যায়...। অবশ্য এ কথার পরে সুনেত্রও কোনদিন কনির সংবাদ আরও গভীরে জানতেও চায়নি।
সে জানলেই
বা কী করত? কনিকে তার সংসার থেকে উপড়ে তুলে আনত। কনি নিজেই কি তাতে রাজি হত? যে
মেয়ে বাবা-মা, মামা-মামীমার মুখ পুড়বে ভেবে তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল। সেই
মেয়ে তার ভরা সংসার, শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামীকে ছেড়ে তার সঙ্গে বেরিয়ে এলে, তার
বাবা-মা, মামা-মামীমার মুখ কি একটু কম পুড়ত? নাকি অনেক বেশি পুড়ত?
সুনেত্র
দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে ধোঁয়া ছাড়ল অনেকটা। এবং হঠাৎ তার মনে পড়ল প্রথম দিন কনির
গাড়িতে যার সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় হয়েছিল তার নাম তো শশাঙ্ক মিত্র। এদিকে কনি তার বরের
নাম লিখেছে জ্যোতিষ, ডাকনাম পিন্টু। জ্যোতিষের সঙ্গে কনির কি ডিভোর্স হয়েছিল? শশাংক
কি কনির দ্বিতীয় বর? সিগারেটটা মাটিতে ফেলে চপ্পলের নীচে পিষে দিয়ে নীচেয় নামল
সুনেত্র।
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন