ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "
ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১ "
ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "
ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "
ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "
"ধর্মাধর্ম" গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -
গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২
(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)
অথবা
+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।
[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/৪ "]
পঞ্চম পর্ব /পর্বাংশ - ৫
৫.২.১ বেদান্তে ব্রহ্ম ধারণা (আগের পর্বের পরবর্তী অংশ)
এবার কেনোপনিষদ থেকে কয়েকটি শ্লোক উদ্ধৃত করা যাক। প্রথম খণ্ডের প্রথম
শ্লোকে, গুরুদেবের কাছে কোন এক
শিষ্য যেন ব্রহ্ম সম্বন্ধে আমাদের মনে আসা প্রশ্নগুলিরই উত্তর জানতে চেয়েছেন,-
“কার ইচ্ছায় এবং নির্দেশে আমাদের মন চালিত হয়? কার আদেশে প্রধান প্রাণ নিজ কাজে
নিযুক্ত হয়?
কার ইচ্ছায়
মানুষ এত কথা বলে, কোন
জ্যোতির্ময় পুরুষই বা চোখ, কানকে নিয়ন্ত্রণ করেন?” ১/১
(শিষ্যের প্রশ্নের উত্তরে গুরুদেব বলছেন,) “যাঁর শক্তিতে কান শুনতে পায়, মন চিন্তা করে, বাগেন্দ্রিয় কথা বলে, তাঁর শক্তিতেই প্রাণ
উজ্জীবিত হয়,
চোখ দেখতে
পায়। তিনিই সমস্ত ইন্দ্রিয়ের চালক, পণ্ডিতেরা এই তত্ত্ব জেনে আত্মবুদ্ধি ত্যাগ করে, সংসারের ঊর্ধ্বে অমৃতলোক
অনুভব করেন। ১/২
চোখ তাঁকে দেখতে পায় না, বাক্যে তাঁকে বর্ণনা করা যায় না, মনেও তাঁর কল্পনা করা যায় না।
আমরা তাঁর স্বরূপ জানি না, অতএব কী ভাবে তাঁর কথা তোমাকে বলবো, তাও জানি না। ১/৩
আমাদের জানা, এমনকি অজানা সকল বিষয় থেকেই তিনি ভিন্ন, আমাদের পূর্ববর্তী
গুরুদের কাছে এমন ব্যাখ্যাই আমরা শুনেছি। ১/৪
যাঁকে কথায় প্রকাশ করা যায় না, কিন্তু আমাদের বাক্য যিনি
প্রকাশিত করেন,
তাঁকেই তুমি
ব্রহ্ম বলে জানবে – কিন্তু আমরা যাঁর উপাসনা করি, তিনি নন। ১/৫
মন যাঁকে চিন্তা করতে পারে না, অথচ যিনি মনে চেতনার প্রকাশ ঘটান, তাঁকেই তুমি ব্রহ্ম বলে
জানবে – কিন্তু আমরা যাঁর উপাসনা করি, তিনি নন। ১/৬
চোখ যাঁকে দেখতে পায় না, অথচ যিনি আমাদের দৃষ্টিতে আলো দিয়েছেন, তাঁকেই তুমি ব্রহ্ম বলে
জানবে – কিন্তু আমরা যাঁর উপাসনা করি, তিনি নন। ১/৭
কান যাঁকে শুনতে পায় না, অথচ যিনি আমাদের শ্রবণে শব্দের বোধ সঞ্চার করেন, তাঁকেই তুমি ব্রহ্ম বলে
জানবে – কিন্তু আমরা যাঁর উপাসনা করি, তিনি নন। ১/৮
এই প্রাণ যে প্রাণকে উপলব্ধি করতে পারে না, অথচ যিনি আমাদের প্রাণ সঞ্চার
করেন, তুমি তাঁকেই ব্রহ্ম বলে
জানবে – কিন্তু আমরা যাঁর উপাসনা করি, তিনি নন।” ১/৯”
(সম্পূর্ণ কেনোপনিষদের অনুবাদ পড়ে নিতে পারেন এই ব্লগের এই সূত্র থেকে - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ ")
যেখানে উপনিষদের ঋষিগুরু তাঁর শিষ্যদের বলছেন, “আমরা তাঁর স্বরূপ জানি না, অতএব কী ভাবে তাঁর কথা
তোমাকে বলবো,
তাও জানি
না”। বারবার বলছেন, “আমরা
যাঁর উপাসনা করি, তিনি
নন”। সেখানে আমাদের উপলব্ধিতে তিনি ধরা দেবেন, এমন সাহস করি কী করে?
অতএব আমরা দেখতে পেলাম বেদান্ত দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হলেন ব্রহ্ম, তিনি ভিন্ন অন্য কোন দেব
ধারণা নেই। ব্রহ্মই এই জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশের একমাত্র কারণ। বেদান্ত দর্শনের সূত্রপাত
সম্ভবতঃ খ্রিষ্টিয় দ্বিতীয় বা তৃতীয় শতাব্দীর কোন সময়ে ঘটেছিল। কিন্তু আচার্য শংকর
(৭৮৮-৮২০ সি.ই.) সেই বেদান্ত দর্শনকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, আজ ভারতীয় দর্শন বলতে
বেদান্ত দর্শনকেই বোঝায়। আচার্য শংকর যে বেদান্তের মত প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন
– তার নাম অদ্বৈত-বেদান্ত। কিন্তু তাঁর পরেও বেদান্তের অনেকগুলি নতুন নতুন
ব্যাখ্যা ও মত ভারতের বহু অঞ্চলে প্রচলিত হয়েছিল। তাদের নাম উল্লেখ করার আগে, একটা কথা বলে রাখা ভাল, বেদান্তের শাখা ও মত
যতগুলিই হোক না কেন, সবগুলিরই
মূল কিন্তু ব্রহ্ম-ধারণা।
শংকরাচার্য
৭৮৮-৮২০ সিই
অদ্বৈত
ভাষ্কর
৯৯৬-১০৬১ সিই
ভেদাভেদ
যাদবপ্রকাশ
১০০০ সিই
ভেদাভেদ
রামানুজ
১০১৭-১১২৭ সিই
বিশিষ্টাদ্বৈত
মধ্বা
১২৩৮-১৩১৭ সিই
দ্বৈত
নিম্বার্ক
ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষার্ধ
দ্বৈতাদ্বৈত
শ্রীকান্থ
১২৭০ সিই
শৈব-বিশিষ্টাদ্বৈত
শ্রীপতি
১৪০০ সিই
ভেদাভেদাত্মক – বিশিষ্টাদ্বৈত
বল্লভ
১৪৭৯-১৫৪৪ সিই
শুদ্ধাদ্বৈত
শুক
১৫৫০ সিই
ভেদাভেদ
বিজ্ঞানভিক্ষু
১৫৫০ সিই
আত্ম-ব্রহ্মকিয়-ভেদাভেদ
বলদেব
১৭২৫ সিই
অচিন্ত্য-ভেদাভেদ
অদ্বৈত তত্ত্বের স্থূল অর্থ ব্রহ্মর দুটি সত্ত্বার অনস্তিত্ব, অথবা ব্রহ্মার
দ্বৈতসত্ত্বার অনস্বীকার। সেক্ষেত্রে দ্বৈত ও অদ্বৈত তত্ত্বের পার্থক্যটা কোথায়? দুই তত্ত্বের প্রাথমিক
পার্থক্য হল,
দ্বৈত মতে
মোক্ষ অবস্থাতেও মানুষের বাস্তব ব্যক্তিসত্ত্বার অস্তিত্ত্ব থাকে। কিন্তু অদ্বৈত
মতে ব্যক্তিসত্ত্বাও অবাস্তব এবং মুক্তিতে ব্যক্তিসত্ত্বার কোন অস্তিত্ব থাকে না।
[আমরা আবার সেই ৪.৩.২ অধ্যায়ের তথাগতর অস্তিত্ব-অনস্তিত্ব – অর্থাৎ ভগবান বুদ্ধের
“চতুষ্কটিকা” যুক্তিতেই যেন চলে এলাম! এই সূত্র থেকে পড়ে নিতে পারেন - "ধর্মাধর্ম - ৪/৫"] আচার্য শংকর বলছেন, “আমরা যাকে জীব বলি, সেটি ব্রহ্ম থেকে ভিন্ন
নয়। বরং জীব হল সেই ব্রহ্ম, যাঁর সঙ্গে বুদ্ধি, কর্তা এবং ভোক্তা অভিধা আরোপিত
হয়। ব্যক্তি-সত্ত্বার সীমিত আধার অর্থাৎ তার শরীর বা দেহের জন্যেই তাকে
পরম-সত্ত্বার থেকে পৃথক ধারণা হয়। বিচিত্র আকার ও নামের এই দেহ-রূপ ধারণার সৃষ্টি
হয় অজ্ঞান বা অবিদ্যা থেকে। অদ্বৈত মতে এইটুকু ছাড়া দুই সত্ত্বার মধ্যে কোন প্রভেদ
নেই।
দ্বৈত মতে ব্রহ্মকে নয়, শুধুমাত্র ব্যক্তিসত্ত্বাকেই আত্মা বলা হয়। যখন এই আত্মা
জীবের দেহ এবং মনে অধিষ্ঠিত হয় তখন তাকে “জীবাত্মা” বলে। মুক্তিতে জীবাত্মার অভিধা
অদৃশ্য হয়,
ব্রহ্মে
বিলীন হয়,
কিন্তু
সেখানেও অতি নগণ্য হলেও কিছুটা পার্থক্য থেকে যায়। এই বিষয়টি পূর্ণের সঙ্গে তার
ভগ্নাংশের সাযুজ্য হওয়ার মতোই তুলনীয় – এবং ব্যক্তিসত্ত্বা ও ব্রহ্মের এই প্রভেদকে
দ্বৈত মতে “স্বগত-ভেদ” বলে।
অদ্বৈত এই স্বগত-ভেদকে স্বীকার করে না। অদ্বৈতের মতে, মুক্তির পর্যায়ে, ব্রহ্ম ও আত্মা অভিন্ন
হয়ে যায় এবং আত্মা ব্রহ্মই হয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে জীব যখনই তার মন এবং দেহ থেকে
নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে, তখনই আত্মা ও ব্রহ্মর পার্থক্য অবলুপ্ত হয়। এই কারণেই
অদ্বৈত দর্শন ব্যক্তি সত্ত্বাকে জীবাত্মা এবং ব্রহ্মকে পরমাত্মা বলে থাকে।
বেদান্ত তত্ত্বে সবচেয়ে বড়ো সমস্যা দুই সম্পূর্ণ বিরুদ্ধ সত্ত্বার –
ব্রহ্ম এবং বাস্তব জগৎ - সঙ্গতি সাধন। আমরা আগেই জেনেছি ব্রহ্ম হলেন অসীম এক চেতনা, তিনি নির্গুণ, ব্রহ্ম কেমন সেকথা
অবর্ণনীয়। উপনিষদ ব্রহ্মর সংজ্ঞায় বলেছেন, তিনি “সত্য, পরমজ্ঞান ও অসীম”, কিন্তু এ সবই তাঁর লক্ষণ, তাঁর বর্ণনা নয়, এবং এই লক্ষণগুলি থেকে
তাঁর ধারণাও করা যায় না। প্রকৃতপক্ষে, সীমিত ছকে বাঁধা কোন বোধ দিয়েই অসীম, অবিভাজ্য এবং নির্গুণ
বিষয়ের কোন ধারণা করা যায় না।
এই অধ্যায়ের শুরুতেই কেনোপনিষদ থেকে কিছু উদ্ধৃতি দিয়েছিলাম, এবার কেনোপনিষদের তৃতীয়
খণ্ড এবং চতুর্থ খণ্ডের দুটি শ্লোক থেকে একটি আশ্চর্য গল্প শোনাবো, -
“একবার ব্রহ্মই (দেবাসুর যুদ্ধে) দেবতাদের বিজয়ী করলেন। সেই ব্রহ্মের
জন্যেই দেবতারা মহিমান্বিত হলেন। কিন্তু দেবতারা মনে করলেন, “এই বিজয় আমাদের, এই মহিমা আমাদেরই”। (৩/১)
তাঁদের এই চিন্তার কথা ব্রহ্ম জানতে পারলেন, তিনি দেবতাদের মঙ্গলের জন্যে
তাঁদের সামনে যক্ষ বেশে আবির্ভূত হলেন। কিন্তু দেবতারা জানতেও পারলেন না, কে এই যক্ষ। (৩/২)
তাঁরা (দেবতারা) অগ্নিকে বললেন, “হে জাতবেদ, এই যে যক্ষ, যিনি এসেছেন, তিনি কে, জেনে এসো।” অগ্নিদেব
বললেন, “তাই হোক”। (৩/৩)
অগ্নি সেই যক্ষের সামনে গেলে, যক্ষ তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কে?” অগ্নি বললেন, “আমিই অগ্নি, আমি জাতবেদা নামেও
বিখ্যাত”। (৩/৪)
যক্ষবেশী ব্রহ্ম বললেন, “কোন ক্ষমতার জন্যে তুমি বিখ্যাত”? অগ্নি বললেন, “এই পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সে সব আমি দগ্ধ করতে
পারি”। (৩/৫)
“এটিকে দগ্ধ করো দেখি”, বলে যক্ষবেশী ব্রহ্ম অগ্নির সামনে একটি শুষ্ক তৃণ রাখলেন।
সর্ব শক্তি দিয়েও অগ্নি সেই তৃণটিকে দগ্ধ করতে না পেরে ক্ষান্ত হলেন। দেবতাদের
কাছে ফিরে বললেন, “এই
পূজনীয় যক্ষ কে,
জানতে
পারলাম না”। (৩/৬)
এরপর দেবতারা বায়ুকে বললেন, “হে বায়ু, তুমি জেনে এসো তো, এই যক্ষ কে”? বায়ু বললেন, “তাই হোক”। (৩/৭)
বায়ু তাঁর কাছে গেলে, যক্ষ জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কে”? বায়ু বললেন, “আমাকে সবাই বায়ু বলে, মাতরিশ্বা নামেও আমি
বিখ্যাত”। (৩/৮)
যক্ষবেশী ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার কোন দক্ষতার জন্যে তুমি
বিখ্যাত”?
বায়ু উত্তর
দিলেন, “এই পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সে সব আমি উড়িয়ে নিতে
পারি”। (৩/৯)
“এই তৃণ গ্রহণ করো” বলে যক্ষবেশী ব্রহ্ম তাঁর সামনে একটি শুষ্ক তৃণ
রাখলেন। সর্বশক্তি দিয়েও বায়ু সেই তৃণটিকে উড়িয়ে তুলতে সমর্থ হলেন না। তিনি ফিরে
এসে বললেন,
“এই যক্ষ যে
কে, আমি জানতে পারলাম না”।
(৩/১০)
এরপর দেবতারা ইন্দ্রকে বললেন, “হে মঘবন্, আপনিই গিয়ে জেনে আসুন, এই যক্ষ কে”? ইন্দ্র বললেন, “তাই হোক”। ইন্দ্র সামনে
যেতেই যক্ষ অদৃশ্য হয়ে গেলেন। (৩/১১)
তখন সেই আকাশেই বহু সোনার অলংকারে সজ্জিতা এক নারী, উমা হৈমবতী[2] আবির্ভূতা
হলেন। ইন্দ্র তাঁকেই জিজ্ঞাসা করলেন, “এই যক্ষ কে?” (৩/১২)
তিনি (উমা) বললেন, “ইনিই ব্রহ্ম, ব্রহ্মের বিজয়কে নিজেদের মনে করে তোমরা মহিমান্বিত মনে
করছো”। এইভাবেই ইন্দ্র জানতে পারলেন ইনিই ব্রহ্ম”। (৪/১)
যেহেতু অগ্নি, বায়ু এবং ইন্দ্র ব্রহ্মার নিকটে গিয়ে আলাপ করেছেন এবং প্রথমে এঁরাই ব্রহ্মকে উপলব্ধি করেছেন, সেহেতু অন্য দেবতাদের থেকে এঁনারা অধিক উৎকর্ষ লাভ করেছেন। (৪/২)”
(সম্পূর্ণ কেনোপনিষদের অনুবাদ পড়ে নিতে পারেন এই ব্লগের এই সূত্র থেকে - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ৩ ও ৪ ")
এই কাহিনীতে আমরা দেখলাম, বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মের তিন প্রধান দেবতা ইন্দ্র, অগ্নি ও বায়ুর মহিমা পরমব্রহ্ম-র কাছে একান্তই অকিঞ্চিৎকর। এখানে রুদ্র বা বিষ্ণুর কোন উল্লেখই এল না। কিন্তু হিন্দু ধর্মের প্রধান দুই দেবতা বিষ্ণু ও শিব, ব্রহ্মর সমকক্ষ হয়ে ত্রিদেব হয়ে উঠেছেন। এমনকি অনেক গ্রন্থে তাঁদের ব্রহ্মর থেকেও বেশী ঐশ্বর্যবান দেখানো হয়েছে। আর যে স্বর্ণভূষিতা নারী[1] (কোন দেবীও নন?) ইন্দ্রকে ব্রহ্ম সম্বন্ধে অবহিত করলেন তিনি উমা। তিনিই আমাদের আদরের মাতৃরূপা-কন্যা, আশ্বিনে যাঁর আগমনের প্রতীক্ষায় আমরা প্রত্যেক বছর উদ্গ্রীব অপেক্ষায় থাকি। তিনিই আদ্যাশক্তি দুর্গা, হিন্দু ধর্মে তাঁর স্থান ত্রিদেবেরও ওপরে। ব্রাহ্মণ্য পণ্ডিতদের হিন্দু বা পৌরাণিক পণ্ডিত হয়ে উঠতে এতটাই বৈতসী বৃত্তি অবলম্বন করতে হয়েছিল! ভাবলে বিস্মিত হতে হয় বৈকি।
ষড়দর্শন প্রসঙ্গের উপসংহার টানার আগে আমাদের অত্যন্ত প্রিয় সাধককবি
শ্রী রামপ্রসাদ সেনের একটি গান উল্লেখ করি -
“কে জানে কালী কেমন, ষড় দর্শনে না পায় দরশন।
আত্মারামের আত্মা কালী প্রমাণ প্রণবের মতন,
সে যে ঘটে ঘটে বিরাজ করে ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছা যেমন।
কালীর উদরে ব্রহ্মাণ্ড ভাণ্ড, প্রকাণ্ড তা বুঝ কেমন,
যেমন শিব বুঝেছেন কালীর মর্ম, অন্য কেবা জানে তেমন।
মূলাধারে সহস্রারে সদা যোগী করে মনন,
কালী পদ্মবনে হংস সনে হংসী রূপে করে রমণ।
প্রসাদ ভাষে, লোকে হাসে, সন্তরণে সিন্ধু-তরণ,
আমার মন বুঝেছে, প্রাণ বুঝে না; ধরবে শশী হয়ে বামন”।
অতএব সাঁতরে সাগর পার হওয়া অথবা বামন হয়ে চাঁদ ধরতে যাওয়া সম্ভব নয়
বুঝেই, আমরা সাধারণ মানুষজন এই
ষড়দর্শন এবং তার তত্ত্ব উপলব্ধি থেকে মুক্ত থাকার পথটাই বেছে নিয়েছি। আমাদের মধ্যে
যারা নাস্তিক তারা এক কথায় এসব নস্যাৎ করে দিব্যি উন্নাসিক থাকতে পারলেন। কিন্তু
আমাদের মতো যারা ধর্মভীরু আস্তিক তারাও ষড়দর্শন এবং পরমব্রহ্ম বিষয়ে খুব স্পষ্ট
ধারণা করতে পারলাম না। কিন্তু এ বিষয়ে কতিপয় ধর্মগুরু এবং ব্রাহ্মণ পুরোহিতের
দুর্বোধ্য সংস্কৃত শাস্ত্রবাক্যকে শিরোধার্য করে, নিজ-নিজ ভাষায় নিজ-নিজ গোষ্ঠীর
দেবদেবীর চরণে নিজেদের ভক্তি ও বিশ্বাস নিবেদন করতে শুরু করলাম। অর্থাৎ আমরা সেই
দিন থেকেই হিন্দু হয়ে উঠতে লাগলাম। এ কথা এই পর্বের প্রতিটি অধ্যায়েই ধীরে ধীরে
আরও স্পষ্ট হবে।
যাই হোক, ষড়দর্শন
তত্ত্ব নিয়ে আলোচনার এখানেই ইতি টানলাম। প্রসঙ্গতঃ বলি, এই ছয়টি দর্শনের মধ্যে প্রথম
চারটি দর্শনের সৃষ্টি ব্রাহ্মণ্য যুগে এবং শেষ দুটি হিন্দু যুগে – অর্থাৎ সে সময়ে
ব্রাহ্মণ্য-ধর্মের হিন্দুধর্মে রূপান্তর প্রায় হয়ে এসেছে। এবার যে গ্রন্থের ওপর
নির্ভর করে,
আমি ধর্ম
বিষয়ে পরবর্তী আলোচনা করব, সেটি হল মহাভারত। কারণ মহাভারত সম্পর্কে বলাই হয় – “যা নেই
(মহা)ভারতে তা নেই ভারতে”।
[1] হৈমবতী
শব্দের দুটি অর্থই সম্ভব – প্রথমটির উৎস হেম অর্থা সোনা – অতএব স্বর্ণালংকার
ভূষিতা। আবার হিম মানে তুষার – অর্থাৎ হিমালয় কন্যা হিসেবেও হৈমবতী শব্দ নিষ্পন্ন
হতে পারে।
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন