মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৭

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৬ 


৩৩ 

ভল্লা বাসায় ফিরল যখন, মধ্যাহ্ন পার হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। রণপাজোড়া ঝোপের আড়ালে রেখে বাসায় ঢুকে দেখল, রামালি রান্না করে ঢাকা দিয়ে রেখে গেছে। ভল্লা একটু নিশ্চিন্ত হল এবং বুঝতে পারল, আরাম ব্যাপারটা তার মধ্যে ঢুকে পড়ছে। এই অবেলায় বাসায় ফিরে, স্নান করে, রান্না করে যে তাকে খেতে হল না, সেটাতেই সে পরম স্বস্তি পেল। তার কাছে এই কাজগুলো আগে অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু আজকাল তার প্রত্যাশা বাড়ছে, বাড়ছে রামালির ওপর নির্ভরতা।

ভল্লা ধীরে সুস্থে পুকুরে গেল, ধুতি-জামা কেচে বেশ সময় নিয়ে স্নান করল। খাওয়াদাওয়ার পাট চুকিয়ে যখন উঠল, ততক্ষণে বেলা গড়িয়ে গেছে। অপেক্ষা করতে লাগল, রামালির। আজকে মহড়ায় কত দূর কে এগোলো, সেটা জানার জন্যেই সে উদ্গ্রীব। ছোঁড়াগুলো এতদিনে সত্যিকার লড়াই করার জন্যেই তৈরি হচ্ছে। ভল্লার আশা এই মহড়া তাদের মানসিক ভাবেও অনেকটা এগিয়ে দেবে। অতএব এখন তাদের মনের ভাবগতিক কেমন বুঝতে পারলে ভল্লার পক্ষে এর পরের ধাপে পা রাখতে সুবিধে হবে।

অন্যদিনের তুলনায় রামালি আজ একটু তাড়াতাড়িই ফিরল। রণপাজোড়া রেখে উঠোনে দাঁড়িয়ে ভল্লাকে দেখে জিজ্ঞাসা করল, “কখন ফিরলে? খেয়েছো”?

ভল্লা রামালির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল, হ্যাঁ – বলল, “তুই আজকে তাড়াতাড়ি চলে এলি?”

“ছেলেরা সকলেই আজ মেতে উঠেছিল মহড়াতে - কেউই দুপুরে খেতে বাড়ি যায়নি। আমি আর শল্কু ছাড়া। আমি অবশ্য খাওয়াদাওয়া করে মহড়াতে গিয়েছিলাম। কিন্তু শল্কু আর ফেরেনি”।

“শল্কু ফেরেনি? কেন? ও মহড়া কেমন দিল?”

“তুমি থাকতে সেই একবারই যা করেছিল, তারপর তো সারাক্ষণ বসেই রইল। খাওয়ার সময় কেউ বাড়ি যাবে না শুনে, সবাইকে খারাপ একট গালাগাল দিয়ে চলে গেল। ব্যস্‌, তারপর আর ফেরেনি”।

“বাকিদের কী অবস্থা?”

“আমার তো ভালই মনে হল, বিশেষ করে আহোক, বিনেশ, সুরুল, মইলি, দীপান, অমরা…। এই তো আসার আগে ওরা তোমার মতো না পারলেও, পুতুলের বুকের কালো দাগটা ছুঁয়ে ফেলেছে”।

“আর তুই?”

“কাল সকালে তুমি মাঠে যাবে তো? তখন তুমিই দেখে নিও”, লাজুক হেসে রামালি উত্তর দিল।

কিন্তু শল্কুটা বেশ ভাবিয়ে তুলল তো। হতভাগা মনে হচ্ছে গণ্ডগোল পাকাবে। বাঁদরটা লড়াইয়ের কিছু শিখলই না, কিন্তু নেতা হবার শখ ষোল আনা?”

“তুমি চলে যাওয়ার পর, শল্কু আমাকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি তো দিনের বেলা কোথাও যাও না, তুমি  গেলে কোথায়? আমি বললাম, জানিনা। তাতে আমাকে চিমটি কেটে বেশ কিছু কথা শোনালো। আমিও শান্তভাবেই, তার উত্তর দিলাম। আমার কথা শুনে ছেলেদের সবাই আমাকেই সমর্থন করল। তারপর থেকেশল্কু গোঁজ হয়ে আলাদা বসে রইল। খেতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত সাক্ষীগোপাল হয়ে আমাদের মহড়া দেখতে লাগল”।

ভল্লা বলল, “জলে নামার আগেই শামুকের খোলে পা কাটবে? মনে হচ্ছে আবার একটা ঝামেলা পেকে উঠছে…”। ভল্লা মাথা নীচু করে গভীর চিন্তায় ডুব দিল।  রামালি ঘর থেকে থালা-বাসন বের করে পুকুরের দিকে যেতে যেতে বলল, “ভল্লাদাদা আমি এখনই আসছি”।

রামালি ফিরে এসে যখন প্রদীপ জ্বেলে,  রান্নার যোগাড়ে বসল, বালিয়া ডাকল “ভল্লাদাদা, আছ? রামালি?”

রামালি সাড়া দিল, আয় আয় সবাই আছি”।

হাতে একজোড়া রণপা নিয়ে, বালিয়া উঠোনের ভেতরে এসে বলল, “ভল্লাদাদা তোমরা এখনও সংবাদ পাওনি মনে হয়”।

“কিসের সংবাদ?” ভল্লা বালিয়ার দিকে উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে বলল। রামালিও ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল বালিয়ার দিকে। বালিয়া মাটিতে বসতে বসতে বলল, “প্রধানমশাই মারা গেছেন। সন্ধের একটু আগে”।

ভল্লা এবং রামালি দুজনেই চমকে উঠল, “কী বলছিস?”

“হুঁ। সন্ধের মুখোমুখি, তোমার এখানে আসার জন্যে আমি প্রস্তুত হচ্ছিলাম। তখনই সংবাদটা এল। ভেবেছিলাম আজ আসব না। বাবা বললেন, তুই যা, আমি যাচ্ছি প্রধানমশাইয়ের বাড়ি। তুই কাজ সেরে ওখান চলে যাস। দাহ কাজে তোর থাকাটা জরুরি”।

ভল্লা এবং রামালি কেউ কোন কথা বলল না। রামালি রান্না করতে লাগল মন দিয়ে। ভল্লা চুপ করে বসে রইল অনেকক্ষণ। তারপর বলল, “কেমন বানালি দেখা। তোকে যখন যেতে হবে, তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিই তোকে!” বালিয়া রণপা জোড়া ভল্লার হাতে তুলে দিল। ভল্লা উঠে গিয়ে ওগুলো আলোর কাছে নিয়ে গেল। রণপার তলায় লোহার খুড়ো, আর ওপরে বল্লমের ফলা। খুঁটিয়ে দেখে খুশিই হল। জিজ্ঞাসা করল, “এই দুটো করতে কত ব্যয়  হল তোদের?” বালিয়া একটু ইতস্তত করে বলল, “আমাদের কাছে কিছু লোহা ছিল, সেটা দিয়েই এদুটো বানিয়েছি। বাবা বললেন, এরকম পাঁচজোড়া বানাতে এক তাম্রমুদ্রা লাগবে। তবে এখন তো শুনছি লোহার দাম অনেকটাই বেড়ে গেছে, নতুন লোহা কিনে কাজটা করতে আরও কিছু বেশি খরচ হবে। হয়তো চার জোড়ার জন্যে এক তাম্রমুদ্রা পড়বে। কিন্তু তার আগে বলো, আমাদের হাতের কাজ তোমার পছন্দ হল কিনা। তা নাহলে…”।

ভল্লা খুঁটিয়ে লক্ষ্য করতে করতে বলল, “এখন দেখে তো ভালই লাগছে, তবে কাল দিনের আলোতে দেখলে আরও ভাল বুঝতে পারবো। তুই এখন যা, বালিয়া। কাল সন্ধের পর আসিস, তোকে কিছু টাকা দেব, আর…ও হ্যাঁ, দিনে এরকম কটা বানাতে পারবি?”

“ধরো, তিন জোড়া, খুব জোর চার জোড়া”।

“বাঃ চলবে। কাল আসিস তোকে আরও চার জোড়া রণপা দিয়ে দেব”।

“আজ কিছু দেবে না?”

ভল্লা বালিয়ার মাথায় হাত রেখে বলল, “না ভাই, আজ নয়। আজ তুই এখান থেকেই প্রধানমশাইয়ের বাড়ি যা, গ্রামের সবার সঙ্গে তোর থাকাটা জরুরি, নয়তো কেউ কেউ তোকে সন্দেহ করবে…আজ নয়, কাল নিয়ে যাস”।

বালিয়া উঠে দাঁড়াল, বলল, “তাহলে আমি আসি ভল্লাদাদা। কাল আবার আসব এইরকম সময়েই। রামালি চললাম, রে”।

রামালি উঠে দাঁড়িয়ে, বালিয়ার কাঁধে হাত রেখে বলল, “আমার হয়ে প্রধানমশাইয়ের পায়ে একটা প্রণাম করিস, বালিয়া। মানুষটা বুক দিয়ে আমাদের গ্রামটাকে এতদিন রক্ষা করে এসেছেন… তাঁর যে এভাবে মৃত্যু হবে...ভাবা যায় না”।

বালিয়া চলে যেতে ভল্লা রামালিকে বলল, “তুই একবার ঘুরে আসতে পারিস, রামালি। আমার না হয় সকলের সামনে গ্রামে ঢোকা সম্ভব নয়। কিন্তু তুই তো যেতেই পারিস”। রামালি রান্না করতে করতে বলল, “আমি যাবো, ভল্লাদাদা। তবে এখন নয়,  পরে – প্রধানমশাইকে শ্মশানে নিয়ে যাক”। একটু চুপ করে থেকে বলল, “এখন গেলে, কমলি-মায়ের কাছে নিশ্চয়ই গ্রামের সব মহিলারা থাকবে। সেখানে থাকবে আমার কাকিও। সকলের সামনে কাকি কী বলে বসবে কে জানে? তার ওপর শল্কু তো ওখানে থাকবেই – সেও আমার বিরুদ্ধে কাকিকে ইন্ধন যোগাতে ছাড়বে না। আমার পক্ষে, তোমার পক্ষে এবং আমাদের দলের অন্য ছেলেদের পক্ষেও, ব্যাপারটা স্বস্তির হবে না! শ্মশানে কাকি যাবে না, আর সেখানে আমাদের ছেলেদের সামনে  শল্কু কোন গণ্ডগোল পাকাবার সাহস পাবে বলে আমার মনে হয় না”।

ভল্লা রামালিকে কিছু বলতে গিয়েও থমকে গেল, বেড়ার ওপাশ থেকে পায়ের শব্দ কানে এল তার, হাঁক দিল, “কে ওখানে?” “আরে চেল্লাস না। আসছি দাঁড়া। রামালি, তোর রণপাজোড়া রেখে দিলাম ঝোপের ভেতর। ঠিক আছে?” একটু পরেই মারুলা এসে দাঁড়াল উঠোনের মাঝখানে। ভল্লার পাশে বসতে বসতে বলল, “কী রাঁধছিস, রামালি? আমারও দুটো জুটবে তো?”

অন্যদিনের মতো হাসিমুখে নয়, রামালি একটু গম্ভীর মুখে উত্তর দিল, “ও নিয়ে ভেব না, মারুলাদাদা, এখন থেকে আমার হাতেই তোমার রাতের খাওয়াটা বাঁধা পড়ে গেছে...”।

মারুলা বলল, “সে জানি, কিন্তু তুই মুখটা অমন হাঁড়ির মতো করে রেখেছিস কেন? ভল্লা শালা বকেছে, না পেঁদিয়েছে?”

ভল্লা বলল, “মারুলা তোর চ্যাংড়ামিগুলো আপাততঃ বন্ধ রাখ। আমাদের কারও মন ভালো নেই...নোনাপুরের গ্রামপ্রধান জুজাক মারা গেছে। আজ সন্ধের একটু আগে”।

মারুলা বলল, “মারা গেছে? কী বলছিস?” সকলেই চুপ করে রইল। মনে মনে সকলেই নিজের মতো গভীর চিন্তায় মগ্ন রইল অনেকক্ষণ। কিন্তু  হঠাৎই বেশ কিছু পায়ের শব্দ কানে আসতে সকলে সতর্ক হয়ে উঠল। ভল্লা মারুলাকে ইশারা করতে, মারুলা নিমেষের মধ্যে গাঢাকা দিল ভল্লার বাসার পিছনে ঝোপের ধারে। বাইরে থেকে খুব চাপা গলায় কেউ ডাকল, “ভল্লাদাদা রয়েছো? আমি মিলা, বটতলি থেকে আমরা এসেছি”।

ভল্লা নিশ্চিন্ত হয়ে ডাকল, “রয়েছি। চলে আয় মিলা”। বটতলির পাঁচজন ভেতরে এসে ভল্লার সামনে মাটিতে বসার আগে, নমস্কার করল ভল্লাকে। মিলার হাতে ছোট্ট একটা পুঁটলি। সেটা কোলের কাছে নিয়ে, চাদরের আড়াল করে মিলা রামালির দিকে সন্দেহের চোখে তাকাল। লক্ষ্য করে ভল্লা বলল, “ওর সঙ্গে তোদের পরিচয় হয়নি না? ও রামালি। নোনাপুরের ছেলে। ঘরবাড়ি ছেড়ে এখন আমার সঙ্গেই থাকে। এদিকের দলটার সর্দার হয়ে উঠছে দিন-কে-দিন। ওর সামনে সব কথাই বলতে পারিস। কোন অসুবিধে নেই। রামালি, তোর রান্না হয়ে গেছে?  তুইও আমাদের সঙ্গে বস না”। রামালি উঠে এসে বটতলির ছেলেদের থেকে একটু দূরত্ব রেখে মাটিতেই বসল।

মিলা বলল, “এদিকের ছেলেরা শুনছি অস্ত্র চালনায় বেশ সড়গড় হয়ে উঠছে। আমরা কবে থেকে শুরু করব, ভল্লাদাদা?”

ভল্লা বলল, “আশা করি সাত-দশ দিনের মধ্যে কিছু অস্ত্র হাতে আসবে। ততদিন তোরা সাধারণ শরীরচর্চাই শুরু কর না। অস্ত্রচর্চার আগে সেটাও তো শিখতে হবে”।

মিলা বলল, “তুমি দেখিয়ে দেবে তো? রামালিদের মহড়ার মাঠে, আমরা শুরু করতে পারি না?”

ভল্লা বলল, “একই মাঠে দু’দল একসঙ্গে চর্চা! তাই হয় নাকি? ওরা অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে যে। দু একদিন পরে দেখবি দুদলের মধ্যে ঝটাপটি শুরু হয়ে যাবে”।

মিলা কোলের ওপরে রাখা পুঁটলিটা বের করে মাটিতে রাখল। গিঁট খুলে পুঁটলির জিনিষগুলো মেলে ধরল ভল্লা এবং রামালির সামনে। দুজনেই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “এগুলো পেলি কোথায়?”

মিলা তিনটে ছোট বটুয়া তুলে বলল, “এ গুলোতে মোট ২৭৫টা রূপোর মুদ্রা আছে, ভল্লাদাদা। আর এই সোনার গয়নাগুলো…এতে কিছু কিছু মণি-রত্নও আছে। পেয়েছি ডাকাতি করে। তুমিই তো রাস্তা দেখিয়েছিলে, ভল্লাদাদা!”

ভল্লা অবাক চোখে মিলার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। বলল, “এ কদিনের মধ্যেই ডাকাতি করে ফেললি? কটা বাড়ি”?

মিলা বলল, “মাত্র তিনটে বাড়িতে। তবে এখন আর ডাকাতি করতে সাহস হচ্ছে না। কারণ পরপর তিনটে ডাকাতির সংবাদ, চারদিকের গ্রামে-গ্রামে প্রচার হয়ে গেছে। বড়োলোকেরা সতর্ক হচ্ছে, সুরক্ষা ব্যবস্থা বাড়াচ্ছে। বুঝতে পারছি, আমাদের পুরোন, মরচে ধরা অস্ত্র নিয়ে আর এগোন সম্ভব নয়। নতুন অস্ত্র-শস্ত্র চাই। তার থেকেও জরুরি, ঠিকঠাক লড়াই করাটাও শিখতে হবে, বুঝতে হবে”।

ভল্লা রামালিকে বলল, “রামালি, ওদের মহড়ার মাঠটা উত্তরের মাঠে করলে কেমন হয়? যেখানে আমরা মাঝেমধ্যে বসি”? রামালি একটু চিন্তা করে বলল, “ভালই হবে। কালকে দিনের বেলা চলে এসো, দেখিয়ে দেব। বড়ো গাছ নেই, ছোটছোট ঝোপঝাড়। একটু পরিষ্কার করতে হবে। তোমাদের কতজনের দল”?

মিলা বলল, “শুরুতে আমরা ছিলাম পনেরজন। এখন ধরো আরও দশজন”।

রামালি বলল, “হয়ে যাবে, চল্লিশ-পঞ্চাশজনের পক্ষেও ও মাঠটা যথেষ্ট”।

ভল্লা বলল, “কাল থেকেই তোরা শুরু কর। ভোরভোর এদিকে চলে আয়। প্রথমে ক্রোশ তিনেক দৌড়ে নিবি। মনে রাখিস, হাঁটা নয়  - রীতিমতো দৌড়তে হবে, দ্রুত…”।

জনা অবাক হয়ে বলল, “দৌড়বো? দৌড়ে কী হবে?”

ভল্লা হেসে ফেলল, বলল, “অনেক কিছু হবে, হাত-পায়ের জোর বাড়বে। শরীরের মেদ ঝরবে, দেহ এখনকার থেকে অনেক সচল, ক্ষিপ্র হবে। তারপর অস্ত্র এসে গেলে শুরু হবে অস্ত্রের মহড়া”।

মিলা তার পুঁটলিতে আবার গিঁট বাঁধল, বলল, “এগুলো তুলে রাখো, ভল্লাদাদা। অস্ত্র কেনার জন্যে এটাই আমাদের প্রথম অগ্রিম”।

“পাগল নাকি? আমি ওই টাকা, গয়নাগাঁটি এখন রাখবো কোথায়? দেখছিস তো আমার ঘরদোরের অবস্থা। তোরা ওগুলো এখন নিয়ে যা… অস্ত্রশস্ত্র হাতে এসে গেলে আমি তোদের বলব, তখন নিয়ে আসিস”।

“কী বলছো, ভল্লাদাদা? আমরাই বা এই জিনিষ সামলাবো কী করে? রক্ষীদের যদি সন্দেহ হয়, যদি বাড়িতে হানা দেয়…ধরা পড়ে যাবো হাতে নাতে…”

“মিলা, ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা কর...এরকম হুট করে তোরা সোনাদানা-টাকাপয়সা নিয়ে চলে আসবি, জানব কেমন করে? তোর রূপোর মুদ্রার দায়িত্ব আমি নিতে পারি, কিন্তু সোনা? কতভরি ওজন, সোনায় খাদ কত – সে সব আমি বা তুই জানব কী করে? গয়নার দাম ঠিক করতে পারবে একমাত্র স্বর্ণকার... এখানে আশেপাশের গ্রামে আমি স্বর্ণকার পাবো কোথায়?”

“ঠিকই বলছ, ভল্লাদাদা। কিন্তু এখন তোমার কাছে সব কিছু রেখে যাওয়া ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় নেই”।

ভল্লা চিন্তিত মুখে বলল, “তোদের অবস্থা আমি বুঝতে পারছি, কিন্তু শুরুতেই আমাদের মধ্যে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের একটা ধন্দ ঘনিয়ে উঠতে পারে...সেটাতেই আমি ভয় পাচ্ছি...”।

মিলা ভল্লার একটা হাত ধরে বলল, “ভল্লাদাদা, আমাদের মনে অবিশ্বাসের কোন জায়গাই নেই। আমাদের অস্ত্র চাই, তোমার টাকা চাই – ব্যস্‌। এই পুঁটলি তোমায় দিয়ে যাচ্ছি। আর কাল আমরা দৌড় শেষ করে এখানেই আসব। তুমি আমাদের মাঠে নিয়ে গিয়ে মহড়া দেখাবে...আজ চলি”।      

মিলারা চলে যাওয়ার পর মারুলা আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। ভল্লার পাশে বসে বলল, “বেশ ঝামেলায় পড়লি ভল্লা। এগুলো নিয়ে এখন কী করবি”? ভল্লা বলল, “করব আবার কী? তুই নিয়ে গিয়ে শষ্পককে দিবি। আস্থানের কোষাগারেই পৃথক কোন সিন্দুকে এখন থাক। আর বলবি, বীজপুরের সেই স্বর্ণকারকে দিয়ে গয়নাগুলোর কত দাম হতে পারে, সেটাও যেন জেনে রাখে”।

মারুলা চিন্তান্বিত গলায় বলল, “তাহলে আমি এখনই বেরিয়ে যাই, ভল্লা। শষ্পক ঘুমোতে যাওয়ার আগেই তোর ওই পুঁটলি তার হাতে তুলে না দিলে, রাত্রে আমার ঘুম হবে না”।

রামালি বলল, “বা রে, আমি যে তোমার জন্যে রান্না করলাম? তার কী হবে? চট করে বেড়ে দিচ্ছি খেয়ে যাও!”

ভল্লা বলল, “সেই ভালো, রামালি আমরাও চল, মারুলার সঙ্গে খেয়ে নিই”।

রামালি বলল, “তুমি যাবে?”

মারুলা জিজ্ঞাসা করল, “তোরা এত তাড়াতাড়ি খাবি কেন? কোথায় যাবি”?

ভল্লা বলল, “নোনাপুর যাবো”।

“আচ্ছা, গ্রামপ্রধানের সৎকারে যাবি? রামালি যেতেই পারে, কিন্তু তোর ওখানে যাওয়া কি উচিৎ হবে?”

রামালি দুজনের হাতে থাল তুলে দিয়ে নিজেরটা নিয়ে বসল মাটিতে। ভল্লা খাওয়া শুরু করার আগে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল, “কোনটা উচিৎ আর কোনটা অনুচিত...সবই কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে রে, মারুলা”। 

চলবে...


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৭

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য " ...