এই সূত্রে - " ঈশোপনিষদ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "
এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ "
রাজা পরীক্ষিতের তত্ত্ব কৌতূহল
মহারাজ পরীক্ষিৎ বললেন, “হে
তত্ত্বজ্ঞ ব্রহ্মন, ব্রহ্মা দেবর্ষি নারদকে গুণাতীত শ্রীহরির গুণবর্ণনা করার জন্যে
নির্দেশ দিলে, তিনি যাদের কাছে যেমন বর্ণনা করলেন, আমি সেই ভুবনমঙ্গল তত্ত্বকথা
শুনতে ইচ্ছা করি। আমি আমার নিঃসঙ্গ মনকে শ্রীকৃষ্ণে সমর্পণ করে, যেভাবে আমার শরীর
ত্যাগ করতে পারি, সেই বিষয়ে আমাকে উপদেশ করুন। নদী ও পুকুরের জলকে শরৎকাল যেমন নির্মল
করে তোলে, তেমনই শ্রীকৃষ্ণ শ্রবণের দ্বার দিয়ে হৃদয়কমলে প্রবেশ করেন ও মনের নিখিল
মালিন্য দূর করে দেন। প্রবাস থেকে ঘরে ফিরে আসা ব্যক্তি যেমন আবার প্রবাসে যাবার
ক্লেশ মেনে নিতে পারে না, তেমনি মনের মালিন্যহীন কৃষ্ণভক্ত, তাঁর চরণমূলও পরিত্যাগ
করতে ইচ্ছা করেন না। হে তপোধন, দেহ জড়পদার্থে তৈরি এবং আত্মার সঙ্গে ওই জড়পদার্থের
কোন সম্বন্ধ নেই; সেক্ষেত্রে দেহের সঙ্গে আত্মার যে সংযোগ ঘটে থাকে, তার কি কোন
কারণ আছে, এই বিষয়ে জানতে ইচ্ছা করি। জীবের যেমন নির্দিষ্ট সংখ্যক ও পরিমাণের অবয়ব
আছে, সেইরকম যে পুরুষের নাভিকমল থেকে এই বিশ্বচরাচর সৃষ্টি হয়েছে, তাঁরও নির্দিষ্ট
সংখ্যক ও পরিমাণের অবয়ব আছে, সে কথা আপনি আগেই বলেছেন। লৌকিক পুরুষ এবং ওই অলৌকিক
মহাপুরুষের মধ্যে যে প্রভেদ রয়েছে, সেই তত্ত্বটি কৃপা করে নির্দেশ করুন।
পদ্মযোনি ব্রহ্মা যাঁর কৃপায়
ভূতসমূহকে সৃষ্টি করে থাকেন, সকলের অন্তর্যামী সেই ভগবান মায়া ত্যাগ করে, কোন
স্বরূপে অবস্থান করেন? মহাকল্প ও খণ্ডকল্পের পরিমাণ, যেভাবে কালের অনুমান করা যায়,
তার প্রকার; ভূত, ভবিষ্যত ও বর্তমান শব্দে যে কালের উপলব্ধি হয়, সেই বিষয় এবং
পিতৃগণ ও দেবগণের পরমায়ু ও তার পরিমাণ বর্ণনা করুন। এই যে কাল সূক্ষ্ম ও স্থূলভাবে
লক্ষ্য করা যায়, তার আকার কেমন? শুভাশুভ কর্মের ফলে যে সকল লোক লাভ হয়, সেই সকল
লোক কেমন এবং তাদের সংখ্যা কত? জীব কেমন দেহ পেলে, পাপ ও পুণ্য কর্মের একত্র
স্থিতি সম্ভব হয়? জীবগণের মধ্যে কে, কেমন কর্ম করলে কোন গতি লাভ হয়? ভূর্লোক,
পাতাল, দিকসমূহ, আকাশ, গ্রহ, নক্ষত্র, পাহাড়, নদী, সমুদ্র ও দ্বীপসমূহের এবং ঐসব
স্থানের অধিবাসী জীবদের উৎপত্তি কিভাবে ঘটে? ব্রহ্মাণ্ডের বাইরের ভাগ ও ভিতরের
ভাগের পরিমাণ কত? যুগ সকলের সংখ্যা, পরিমাণ ও ধর্ম এবং যুগে যুগে শ্রীহরির
অবতারলীলা সবিস্তারে কীর্তন করে, আমাকে কৃতার্থ করুন। মানবগণের স্বাভাবিক ধর্ম কি
এবং তাদের নিজের নিজের বর্ণ ও আশ্রম অনুযায়ী কেমন ধর্ম পালন করা উচিৎ?
হে ব্রহ্মন, বিভিন্ন ব্যবসায়
নিযুক্ত হয়ে মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে, তাদের কেমন ব্যবহার আশ্রয় করা উচিৎ?
রাজর্ষিগণ ও পতিত জীবের কেমন ধর্ম অনুসরণ করা উচিৎ? প্রকৃতি প্রভৃতি তত্ত্বসমূহের
সংখ্যা ও লক্ষণ কী এবং কোন তত্ত্ব কারণরূপে, কোন কার্য উৎপন্ন করে? কিভাবে
দেবতাদের আরাধনা করা উচিৎ এবং অষ্টাঙ্গযোগের বিধি কেমন, সে বিষয়ে শোনার ইচ্ছা আছে?
অণিমা ইত্যাদি যোগে, যোগেশ্বরগণ সিদ্ধি লাভ করে, কোন গতি লাভ করেন ও কিভাবে তাঁদের
লিঙ্গশরীর লয় হয়? ঋক, সাম প্রভৃতি বেদ, আয়ুর্বেদ প্রভৃতি উপবেদ, ধর্মশাস্ত্র,
পুরাণ ও ইতিহাসের লক্ষণ কী? অগ্নিহোত্র ইত্যাদি বৈদিক কর্ম; কূপ, পুষ্করিণী
ইত্যাদি স্মৃতি বিহিত পূর্ত কর্ম; এই সকল জানার বিষয় কৃপা করে বর্ণনা করুন। ধর্ম,
অর্থ ও কাম এই ত্রিবর্গ কিভাবে নির্বিঘ্নে সাধন করা যায়? প্রলয়ের সময় সকল জীবের
দেহ প্রকৃতিতে লীন হয়ে যায়, কিভাবে আবার তাদের সৃষ্টি হয়, কিভাবেই বা পাষণ্ডীদের
সৃষ্টি হয়? আত্মা কিভাবে বদ্ধ, মুক্ত ও স্বরূপ অবস্থায় অবস্থান করে? ভগবান
সৃষ্টিকালে নিজের মায়ায় যেমন বিবিধ লীলা করে থাকেন, প্রলয় কালে মায়া পরিত্যাগ করে
সাক্ষীর মতো অবস্থান করেন, সেই বিষয়েও জানতে ইচ্ছা হয়।
হে মুনিবর, যে যে বিষয় আমি
জিজ্ঞাসা করলাম, সেই সব বিষয় আমার জানা ছিল না, অতএব এতদিন ওই বিষয়ের প্রশ্ন আমার
মনে উদয় হয়নি; এখন ওই সব বিষয়ে আমি শরণাগত জেনে, আপনার থেকে সবিস্তার বর্ণনার
অনুরোধ করছি। স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মা যেমন সকল তত্ত্বের জ্ঞাতা, আপনিও সেই রকমই
তত্ত্বদর্শী। হে ব্রহ্মন, অনশনব্রতে আমার চিত্ত এতটুকুও বিচলিত হয়নি, কারণ আপনার
বর্ণনার সমুদ্র থেকে অচ্যুতের লীলারূপ অমৃত সৃষ্টি হচ্ছে এবং আমি সেই সুধা পান করে
পরিতৃপ্তি পাচ্ছি”।
শ্রীসূত বললেন, “হে ঋষিগণ,
মহারাজ পরীক্ষিৎ মুনিবর শুকদেবকে ভগবানের কথা বিষয়ে প্রশ্ন করায়, তিনি অত্যন্ত
প্রীত হলেন এবং কল্পের শুরুতে স্বয়ং ভগবান, ব্রহ্মাকে যে মহাপুরাণ উপদেশ করেছিলেন,
সেই ভাগবত কীর্তন করলেন। পাণ্ডুকুলতিলক যা যা প্রশ্ন করেছিলেন, সেই সকল প্রশ্নের
উত্তর দেওয়া শুরু করলেন”।
ব্রহ্মর্ষি শুকদেবের উত্তর
শ্রীশুকদেব বললেন, “হে রাজন, আদিদেব
ব্রহ্মা জগতের পরমগুরু; কারণ তিনিই ভক্তিরহস্যের প্রথম উপদেষ্টা। তিনি যখন
শ্রীবিষ্ণুর নাভিকমলে বসেছিলেন, তখন পূর্বকল্পে সৃষ্টির স্মৃতি তাঁর বিন্দুমাত্র
মনে পড়েনি এবং এই বিষয়ে তিনি যখন চিন্তা করছিলেন, তখন ষোড়শ ও একবিংশ বর্ণের যোগে “তপ”
এই বাক্য দুবার শুনতে পেলেন। এই শব্দ কে উচ্চারণ করল জানার জন্য তিনি চারদিকে
তাকালেন, কিন্তু কাউকেই দেখতে পেলেন না। নিজের আসনে বসে চিন্তা করতে করতে তাঁর মনে
হল, “তপ” অর্থাৎ কেউ আমাকে তপস্যা করতে নির্দেশ দিল; এবং তিনি তপস্যায় মগ্ন হলেন।
ব্রহ্মা যে “তপ” কে তপস্যার অর্থ ধরেছিলেন, সে উপলব্ধি অব্যর্থ ছিল এবং যে তপস্যায়
লোকসমূহের প্রকাশ হয়, সেই তপস্যায় দিব্য সহস্র বছর অতিবাহিত করেছিলেন।
[আজকাল সোশাল মিডিয়ায় বিখ্যাত চিত্রপরিচালক ঋত্বিক ঘটকের একটি উক্তি প্রায়ই ভাইরাল হয়ে ফিরে ফিরে আসে - "ভাবো, ভাবো, ভাবার চেষ্টা করো"। ব্রহ্মার কানে আসা দুবার "তপ", "তপ" শব্দটিও যেন অনুরূপ, কেউ যেন তাঁকে নির্দেশ দিলেন, "যোগনিদ্রা শেষে জেগে উঠে অমন ভ্যাবলার মতো বসে থেক না, ("ভাবো ভাবো") "তপস্যা করো, তপস্যা করো"। তপস্যায় অনেক দুর্বোধ্য বিষয়ও সম্যক উপলব্ধি করা যায়"। কয়েকটি অনুচ্ছেদ পরেই আমরা জানতে পারব শ্রী বিষ্ণুই ব্রহ্মাকে ওই প্রত্যাদেশ দিয়েছেলেন।]
ব্রহ্মার এই আরাধনায়, ভগবান তাঁকে বৈকুণ্ঠলোক দর্শন করালেন। এই লোক নিখিল লোকের উপরে অবস্থিত, সুতরাং সবথেকে উৎকৃষ্ট। এই ধামে ক্লেশ, মোহ ও ভয় নেই। এই স্থানে রজঃ, তমঃ গুণের অস্তিত্ব নেই, এই ধাম বিশুদ্ধ সত্ত্বগুণে নির্মিত। এই লোকে কাল কবলে কেউ বিনাশ হয় না। এই পরম রমণীয় বৈকুণ্ঠলোকে সুর ও অসুরদের বন্দিত শ্রীহরির পার্ষদ্গণ বিহার করেন। তাঁরা সকলেই উজ্জ্বলকান্তি, পদ্মনেত্র, পীতাম্বর, চতুর্ভুজ, অতি কমনীয়, সুকুমার ও প্রভামণ্ডিত। এই লোকে লক্ষ্মীদেবী নারায়ণের চরণসেবা করছেন; বিলাসভরে তাঁর অঙ্গ দুলছে এবং বসন্ত সহচর ভ্রমরেরা তাঁর স্তুতিগান করছে।
ব্রহ্মা জগৎপতি ভক্তবৎসল
শ্রীপতিকে দেখে ধন্য হলেন। তিনি দেখলেন, তাঁর সেবকদের করুণা করার জন্য শ্রীভগবান
সর্বদাই উন্মুখ; তাঁর করুণাঘন দৃষ্টি দর্শকের মনে আনন্দ সৃষ্টি করে। তিনি চতুর্ভুজ
ও পীতাম্বর, তাঁর মাথায় রত্নখচিত মুকুট, শ্রবণে কুণ্ডল এবং তাঁর বক্ষের বামদিকে
স্বর্ণরেখায় লক্ষ্মীদেবী অঙ্কিত। তিনি সিংহাসনে বসে আছেন এবং প্রকৃতি, পুরুষ,
মহত্তত্ত্ব, অহংকারতত্ত্ব, একাদশ ইন্দ্রিয়, পঞ্চ মহাভূত, পঞ্চ সূক্ষ্মভূত – এই
পঞ্চবিংশ শক্তি নিজেদের বিক্রম ত্যাগ করে তাঁকে ঘিরে রেখেছে। তিনি অসংখ্য
শক্তিযুক্ত হয়েও নিজের স্বরূপে বিরাজ করছেন, এই কারণেই তাঁকে ঈশ্বর বলা হয়ে থাকে।
ব্রহ্মা তাঁকে দেখে আনন্দে আপ্লুত হলেন, তাঁর অংগ পুলকিত হল এবং দু চোখে আনন্দে অশ্রুধারা বইতে লাগল। তিনি নতমস্তকে ভগবানের চরণকমল বন্দনা করলেন। ভগবান শ্রীব্রহ্মার করস্পর্শ করে, হাস্যমুখে মধুর স্বরে বললেন, “হে বেদগর্ভ, তুমি সৃষ্টির ইচ্ছায় যে দীর্ঘ তপস্যা করেছ, তাতে আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। কূটযোগীগণ সুদীর্ঘ কাল কপট তপস্যা করলেও আমি তাদের দর্শন দিই না। তোমার মঙ্গল হোক, আমিই বরদাতা, অতএব তোমার ঈপ্সিত বর প্রার্থনা করো। তুমি নিজের তপস্যার ফলেই, তোমার বৈকুণ্ঠ দর্শন হল, এমন মনে কোর না। কারণ, আমিই তোমাকে “তপ, তপ” প্রত্যাদেশ দিয়ে, তপস্যার কথা বলেছিলাম, আমিই তোমাকে তপস্যায় প্রবৃত্ত করেছিলাম। তপস্যা আমার হৃদয় অর্থাৎ জ্ঞানময়ী শক্তি, আমিই নিজেই তপস্যার আত্মা অর্থাৎ স্বরূপ। আমি তপস্যা দিয়েই বিশ্বর সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় করে থাকি। দুশ্চর তপস্যাই আমার বীর্য অর্থাৎ শক্তি”।
শ্রীব্রহ্মা বললেন, “হে নাথ,
আপনি সর্বভূতের বুদ্ধিতে উপস্থিত থাকেন এবং আপনার অব্যর্থ জ্ঞানদৃষ্টিতে সকল
প্রাণীর মনের ইচ্ছা আপনি বুঝতে পারেন।
তবুও আমার মনের ইচ্ছা আপনাকে বলছি, আপনি পূর্ণ করে, আমাকে কৃপা করুন। হে মাধব, আমি
অনলস হয়ে আপনার সৃষ্টির আদেশ পাল করব, কিন্তু সৃষ্টির সময়, অহংকার যেন আমাকে
আচ্ছন্ন না করে। আপনি আমার করস্পর্শ করে, আমার সঙ্গে সখার মতো আচরণ করলেন। এই কারণে যখন নির্বিকার চিত্তে
উত্তম, মধ্যম ও অধম বিভাগে জীবসকল সৃষ্টি করব, তখন “আমিই স্বতন্ত্র সৃষ্টিকর্তা”,
এই উৎকট বোধ আমাকে যেন গ্রাস না করে”।
["রথ ভাবে আমি দেব পথ ভাবে আমি, মূর্তি ভাবে আমি দেব, হাসে অন্তর্যামী"। কবিগুরুর এই ছড়াতেও সেই ভাবাভাবি - অর্থাৎ দর্প-ভাবনার চিত্রটি বড়ো সুন্দর ভাবে পরিষ্ফুট। যদিও ব্রহ্মাই সবকিছু সৃষ্টি করতে চলেছেন, কিন্তু তিনি "আমিই সৃষ্টিকর্তা" এই দর্প-ভাবনা থেকে মুক্তি চাইছেন, কারণ তিনি জানেন সকল সৃষ্টির একমাত্র কারণ ভগবান শ্রীহরি - তিনি তো নিমিত্ত মাত্র।]
শ্রীভগবান বললেন, “শাস্ত্রজ্ঞান,
অনুভব, ভক্তি ও তার সাধন তোমাকে বলছি, শোন। আমার যেমন স্বরূপ, আমার যেমন সত্ত্বা
এবং যেমন আমার রূপ, গুণ ও কর্ম, এই সমস্ত বিষয়ের তত্ত্বজ্ঞান, আমার প্রসাদে তোমার
অন্তরে প্রকাশ হোক। সৃষ্টির আগে আমি
কেবলমাত্র অবস্থান করে থাকি, কোন কার্যের অনুষ্ঠান করি না। স্থূল, সূক্ষ্ম ও তাদের
কারণস্বরূপ প্রকৃতি আমার মধ্যেই লীন থাকায়, তাদের প্রকাশ ঘটে না। সৃষ্টির পরেও
আমিই বর্তমান থাকি। দৃষ্টিগোচর এই বিশ্বও আমি এবং বিশ্বের প্রলয় হলেও আমিই অবশিষ্ট
থাকি। যার প্রভাবে পদার্থের বাস্তব
অস্তিত্ব না থাকলেও অব্যক্তরূপে আত্মায় প্রকাশ পায় এবং যার জাদুতে বস্তু বর্তমান
থাকলেও তার অস্তিত্ব বোঝা যায় না, তাকেই মায়া বলে। আমার সত্ত্বা কেমন হয়, তোমাকে
বলছি শোন। ছোট ও বড়ো সকল বস্তুই মহাভূত উপাদানে রচিত হয়। যখন বস্তু তৈরি হয়, তখন
মহাভূতের সকল উপাদানকে সেই বস্তুতেই দেখা যায়, সুতরাং উপাদান সকল বস্তুতে প্রবেশ
করেছে এমন মনে হয়। কিন্তু যখন পর্যন্ত বস্তু রচনা না হয়, তখনও মহাভূত উপাদানসমূহ
কারণ রূপে বর্তমান থাকে, কিন্তু বস্তুতে যেন অপ্রবিষ্ট মনে হয়। এই ভাবে মহাভূতকে
যেমন বস্তুতে কখনো প্রবিষ্ট এবং কখনো অপ্রবিষ্ট বলে মনে হয়, তেমনই আমাকেও পদার্থসমূহে
প্রবিষ্ট ও অপ্রবিষ্টরূপে উপলব্ধি হয়।
এখন সাধনের প্রকার বলছি, মন দিয়ে
শোন। যখন কার্যে কারণের উপলব্ধি ঘটে, তখন তাকে কার্যবস্তুতে কারণের অন্বয় বলে।
মৃত্তিকা কারণ ও ঘট কার্য। ঘটে যে মাটির উপলব্ধি হয়, তাকেই কার্যে কারণের অন্বয়
বলে। যখন ঘট ভেঙে যায়, তখন আর ঘট থাকে না, কিন্তু কারণরূপ মৃত্তিকা পড়ে থাকে। একেই
কার্য থেকে কারণের ব্যতিরেক বলে। যখন জীব
জাগ্রত অবস্থায় থাকে, তখন তাদের মধ্যে জ্ঞানস্বরূপে আমি বর্তমান থাকি, সুতরাং
সৃষ্টি কালে জগতের সঙ্গে আমার অন্বয় থাকে। কিন্তু সমাধি অবস্থায় যখন
বিশ্বব্রহ্মাণ্ড লয় হয়ে যায়, তখনও আমি চৈতন্যস্বরূপে বর্তমান থাকি। অতএব অন্বয় ও
ব্যতিরেক, এই উভয় অবস্থাতেই আমিই সত্য রূপে অবস্থান করি, সুতরাং আমিই সত্য আত্মা,
বাকি সব মিথ্যা। তুমি পরম সমাধি অর্থাৎ একাগ্র চিত্তে আমার এই মতের অনুষ্ঠান করো,
বিভিন্ন কল্পে যখন তুমি সৃষ্টি করতে থাকবে, “আমিই কর্তা” তোমার মধ্যে এই অভিমান
কখনো স্পর্শ করতে পারবে না”।
শ্রীশুকদেব বললেন, “শ্রীহরি
জনগনের পরমেষ্ঠী অর্থাৎ পরম অধিপতি ব্রহ্মাকে এই উপদেশ দিয়ে তাঁর সামনে অন্তর্হিত
হলেন। সর্বভূতময় ব্রহ্মা জোড়হাতে তাঁর বন্দনা করলেন এবং পূর্বকল্পের মতো বিশ্ব
সৃষ্টিতে নিযুক্ত হলেন। শ্রীনারায়ণ ব্রহ্মাকে যে চতুঃশ্লোকী ভাগবত সংক্ষেপে উপদেশ
করেছিলেন, ব্রহ্মা নিজের প্রিয় পুত্র নারদকে দশ লক্ষণযুক্ত ভাগবত পুরাণ সবিস্তারে
বর্ণনা করেছিলেন। তারপর শ্রীনারদ সরস্বতীতীরে পরমব্রহ্মে ধ্যাননিরত মহাতেজা
ব্যাসদেবকে এই ভাগবত উপদেশ করেছিলেন। এবার বৈরাজ পুরুষ থেকে এই বিশ্ব কিভাবে
উদ্ভূত হল, আপনার এই প্রশ্নের এবং অন্যান্য সকল প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি, শুনুন”।
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন