শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ১২

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১১ 


১২ 

“সদর দরজা থেকে বাইরের ঘরে ঢুকতেই আমার শ্বশুর দেখলাম আমার অপেক্ষাতেই যেন দাঁড়িয়ে আছেন। আমার  দিকে তাকিয়ে চশমাটা খুলে, করজোড়ে বললেন, “আমরা তোমার সঙ্গে অন্যায় করেছি, মা। ভয়ংকর ভুল করেছি আমরা”।

“আপনি পিতৃতুল্য, আমার সামনে হাতজোড় করবেন না, প্লিজ। ভুল যে হয়েছে, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু এখন তো সে নিয়ে অনুশোচনা করে লাভ নেই, বাবা। আমাদের উচিৎ সেই ভুলটাকে কী করে শোধরানো যায়, সেই চিন্তা করা”। কথাটা শেষ হতেই দেখলাম ভেতরের দিকে যাওয়ার দরজায় দাঁড়িয়ে রয়েছে শাশুড়ি।

ঝনঝন করে তিনি ঝাঁজিয়ে উঠে বললেন, “ছেলের বউয়ের সামনে হাতজোড় করে নাটুকে নাকে-কান্না কেঁদে তুমি এখন ভালো সাজছ? তোমার পয়সায়, তোমার আয়োজনে, তোমার গুণধর ছেলের এই বিয়ে হল, আর আজ পনেরদিনের মধ্যেই তোমার মনে হল অন্যায় হয়ে গেছে?”

শ্বশুরমশাই বললেন, “তোমাদের সক্কলকে বলেছিলাম - পইপই করে বলেছিলাম, ওকে কোন রিহ্যাবে রেখে নেশা ছাড়িয়ে, সুস্থ করে, তারপর বিয়েটা হোক। তুমিই বলেছিলে ছেলেদের অমন একটু-আধটু উড়ুনচণ্ডিপনা বিয়ের আগে থাকে। বিয়ের জল গায়ে পড়লেই সব ঠিক হয়ে যাবে। বলনি?”

“বলেছিলে তো নিয়ে যাওনি কেন, তোমার ওই গুষ্টির পিণ্ডি রিহ্যাবে? তোমার হাতে-পায়ে কেউ দড়ি বেঁধে রেকে দিয়েছিল... সব কি আমাকেই করতে হবে...”।

এই জঘন্য বিতণ্ডার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে আমার ঘৃণা হচ্ছিল। আমি শাশুড়ির পাশ কাটিয়ে শোবার ঘরে ঢুকলাম। দেখলাম পিন্টু উঠে বসেছে, আমাকে ঢুকতে দেখে লজ্জায় মাথা নামাল, বলল, “সরি সুকু, এক্সট্রিমলি সরি, আর কখনো এমন হবে না। দেখে নিও, প্রমিস”।

আমি কোন উত্তর না দিয়ে, রান্নাঘরে গেলাম। খুঁজে পেতে লেবু, নুন, চিনি বের করে, একগ্লাস সরবৎ বানিয়ে নিয়ে এলাম পিন্টুর জন্যে, বললাম, “ধরো, এটা খেয়ে নাও, ভালো লাগবে”। তখনও কানে আসছিল শ্বশুর-শাশুড়ির বাক-যুদ্ধ।

সুবোধ বালকের মতো গ্লাসটা খালি করে আমার মুখের দিকে তাকাল, পিন্টু। আমি খালি গ্লাসটা হাতে নিয়ে বললাম, “এবার সোজা টয়লেটে ঢুকে পড়ো, জামা-প্যান্ট ছেড়ে চান-টান করে ফ্রেশ হয়ে নাও”।

পিন্টু উঠল, মিনমিনে সুরে বলল, “তুমি রাগ করনি তো?”

“খুশি হওয়ার মতো কিছু করেছ, বলে তোমার মনে হচ্ছে?”

পিন্টু কথা বাড়াল না আর, কাচা পাজামা-পাঞ্জাবি নিয়ে টয়লেটে ঢুকল। আমি দ্রুত হাতে, বিছানার চাদর বালিশের ওয়াড় সব তুলে ফেলে নতুন করে বিছানা সাজালাম। দুটো ধূপ জ্বেলে ঘরের দু কোণে রাখলাম। সব মিলিয়ে ঘরের পরিবেশটা মন্দের ভাল হল।

 এভাবেই শুরু হল আমার দাম্পত্য জীবনটা, সুনুদা।

স্বাভাবিক অবস্থায় পিন্টু কিন্তু খুব খারাপ মানুষ ছিল না। ইঞ্জিনিয়ার কিন্তু কাঠখোট্টা নয়, নানান রকমের বই পড়ার অভ্যেস ছিল, গান-টান ভালোবাসে। রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভক্ত। ঠাট্টা, ইয়ার্কিতেও খারাপ নয়, ভদ্রজনোচিত রসিক বলা যায়। কিন্তু তার এই চরিত্রটা ছিল ক্ষণস্থায়ী, অনেকটা সূর্যোদয় – সূর্যাস্তের মতো। অর্থাৎ সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে তার দেহের শিরায় শিরায় যেন তৃষ্ণার হাহাকার উঠত – কোথা গেলে পাই, কোথায় জুড়াই, দগ্ধ প্রাণের তিয়াসা...। এটা কোথায় শুনেছিলাম, বা পড়েছিলাম মনে নেই এবং যদ্দূর মনে পড়ছে গানটা ভগবদ্ভক্তির নেশায় গাওয়া বা লেখা। সে গানের আমি ভয়ংকর অপপ্রয়োগ করলাম জানি। কিন্তু আমার জীবনে আমি বুঝেছি, একজন নেশাখোরের কাছে মদের বোতলই ঈশ্বর, বাকি সব মায়া। তার কাছে বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তান, ঈশ্বর-দেবতা কিচ্ছু না – কিছুই না।

আরেকটা কথা বলি পিন্টু ভালো থাকুক এটা ওর মা চাইতেন না, হয়তো এটা তাঁর মানসিক ব্যাধি বিশেষ। দু’দিন বা তিনদিন পরপর পিন্টু অফিস করে নেশা না করে বাড়ি ফিরলে (আমি বুঝতে পারতাম, নেশার গ্রাস থেকে মুক্ত করতে নিজের সঙ্গে কতখানি যুঝে চলেছে ও) ওর মায়ের গাত্রদাহ হত। ছেলে বুঝি বউয়ের আঁচলে বাঁধা পড়ে গেল, স্ত্রৈণ হয়ে গেল ছেলে। বিশ্বাস করবে না হয়তো, কিন্তু আমার প্রতি অদ্ভূত এক ঈর্ষার আগুন জ্বলতে দেখেছি ওঁর চোখে। আমার আড়ালে উনি ছেলেকে কি মন্ত্র বা মন্ত্রণা দিতেন জানি না, দেখা যেত পরের দিনই সে নেশা করে বেশ রাত করে বাড়ি ফিরত। গর্বিত আনন্দে শাশুড়িকে এক-দুবার জনান্তিকে বলতেও শুনেছি, পুরুষমানুষ একটু-আধটু নেশা-ভাঙ না করলে আবার পুরুষ কিসের?

পিন্টুর বাবা ছিলেন স্বাভাবিক স্বভাবের মানুষ, সন্ধের পরে পরে সুস্থ অবস্থায় পিন্টু বাড়ি ফিরলে বড়ো আনন্দ পেতেন। উঁচু গলায় হাঁক পাড়তেন – “বৌমা, পিন্টু এসে পড়েছে, দু’কাপ চা করো তো, দুজনে মিলে বেশ আরাম করে খাই”। স্বামীর আনন্দে আমার শাশুড়ির মুখে নামত কালো মেঘের ছায়া। আমার দাম্পত্য নিয়ে আমি অস্থির ছিলাম, সুনুদা, কিন্তু পিন্টুর বাবা-মায়ের দাম্পত্যের রহস্যটা কোনদিন আমার মাথায় ঢোকেনি। সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর মানসিকতা নিয়ে এই দুই মানুষ কিভাবে কাটিয়ে দিলেন এতগুলি বছর? পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীরা নাকি বীভৎস বঞ্চনা ও অত্যাচারের শিকার। অথচ এই পুরুষটি জীবনের অধিকাংশ সময়টাই কাটিয়ে দিলেন, নিজের স্বভাববিরুদ্ধ কাজের বাধ্যতা নিয়ে – এটাকেই কী অ্যাডজাস্টমেন্ট বলে, সুনুদা?

দাম্পত্যের এই দ্বন্দ্বের মধ্যেও অনেকেরই সন্তান হয়, আমারও হল, বিয়ের প্রায় দেড় বছর পর। প্রসবের আগে আমি মা-বাবার কাছে ছিলাম, প্রায় মাস তিনেক।  অফিস ছুটির পর প্রথম প্রথম পিন্টু ও বাড়িতে প্রায় রোজই যেত। ধীরে ধীরে ও বাড়িতে তার উপস্থিতির হার কমতে লাগল। পাঁচ-সাতদিন পর পর ও যখন আসত – ওর চেহারা দেখেই বুঝতাম – ও আবার নেশা শুরু করেছে।

নার্সিং হোমে যেদিন ভর্তি হলাম, তার পরের দিন সকালে আমার পুত্র সন্তানের জন্ম হল। আমার মা বললেন, “ছেলে অবিকল তোর মুখ পেয়েছে, সুকু, মাতৃমুখী ছেলে খুব সুখী হয়। আর পিন্টুর মা বললেন, “আহা, শৈশবের পিন্টুর মুখটাই যেন বসানো তোমার ছেলের মুখে, বৌমা”।

পিন্টু এল একটু বিকেল করে। আমার বেডের কাছাকাছি আসা মাত্র আমার মনটা বিতৃষ্ণায় ভরে উঠল। বাবাকে আনন্দ করে তার ছেলে দেখাতে গিয়ে, আমার সিস্টারও টের পেলেন সেই শিশুর পিতা মদ্যাসক্ত। সেও নাক-মুখ কুঁচকে ওর দিকে তাকাল, আমার দিকেও একবার, বলল, “পেশেন্টের ঘরে বেশিক্ষণ থাকবেন না...”।

পিন্টু আমার কাছে এসে বলল, “আমি সরি, সুকু...”।

দাঁতে দাঁত চেপে আমি চাপা গলায় হিসহিসিয়ে উঠলাম ক্রোধে, বললাম “কত হাজার বার, কত লক্ষ বার সরি, বলবে তুমি? একপেট মদ গিলে এসেছ, প্রথম সন্তানের মুখ দেখতে?”

“ওরা, জোর করল খুব...কিছুতেই না করতে পারলাম না...”।

তীব্র ঘৃণা আর বিবমিষায় মুখ ঘুরিয়ে রইলাম আমি। পিন্টু বেবি-কটের দিকে যেতেই, আমি আবার ফোঁস করে উঠলাম, “আমার বাচ্চার গায়ে তুমি হাত দেবে না... বেরিয়ে যাও...”।

দুপায়ে দাঁড়ানো সরীসৃপ আমি কোনদিন দেখিনি, আদৌ আছে কিনা জানি না। কিন্তু সেদিন দেখলাম, সেই নার্সিং হোমের ঘরে, আমার সামনে। পিন্টু আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। সিসটার বোধহয় অপেক্ষা করছিলেন, পিন্টূ বেরিয়ে যেতেই ঘরে এলেন, তারপর রুম ফ্রেশনার ছড়িয়ে দিলেন ঘরের চারদিকে। বললেন, “বড়দির ভিজিটের সময় হয়ে গেছে, ঘরের মধ্যে ঢুকে এরকম বিশ্রী গন্ধ পেলে তিনি কুরুক্ষেত্র বাধাবেন, ম্যাডাম”।

ওঁর বড়দি মানে আমার ডাক্তার ম্যাডাম, আমার মায়ের থেকেও বয়স্কা মহিলা। মায়ের মুখে শুনেছি, আমার জন্মও ওঁনার হাতেই হয়েছিল। ওঁনার ওপরে আমার বাবা-মায়ের অনন্ত ভরসা ও বিশ্বাস। পেশেন্টদের উনি যেমন স্নেহ করেন, তেমনি অবাধ্য হলে, বা কোন কারণে বিরক্ত হলে পেশেন্টের ধুলো ঝেড়ে দিতে এতটুকু দ্বিধা করেন না।

পিন্টু বেরিয়ে যাওয়ার মিনিট পনের পরে ঘরে এলেন, পিন্টুর বাবা-মা। শ্বশুরমশাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে বললেন, “কেমন আছিস, মা?” কিন্তু আমি সে কথার উত্তর দেওয়ার আগেই, খরখরে গলায়, পিন্টুর মা বললেন, “পিন্টুটা অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ছুটি নিয়ে, তার ছেলের মুখ দেখতে এল, তাকে তুমি কিনা দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলে? ছি ছি ছিঃ”।

রাগে ও ঘৃণায় আমার মাথা ঝনঝন করে উঠল, বললাম, “তাড়াতাড়ি ছুটি নিয়ে সে বন্ধুদের নিয়ে মদ খেতে গিয়েছিল, মা। এক পেট মদ গেলার পর হঠাৎ তার পিতৃত্ব জেগে ওঠায়, সে এখানে এসেছিল”।

বেবিকটের সামনে দাঁড়িয়ে সিস্টার আমার পুত্রের ন্যাপি পরীক্ষা করছিলেন, তিনি বেশ রূঢ় কণ্ঠে বললেন, “এখানে জোরে কথা বলবেন না, এটা নার্সিং হোম”।

আগুন ঝরানো চোখে শাশুড়িমা আমার দিকে একবার তাকিয়ে, বাইরে বেরিয়ে গেলেন। শ্বশুরমশাই আমার কাছে এসে, আমার মাথায় হাত রেখে খুব নীচু স্বরে বললেন, “ভালো আছিস তো, মা?”

আমি ঘাড় নেড়ে বললাম, ভালো আছি।

“কিন্তু...কিন্তু এরা তোকে, ভালো থাকতে যে দেবে না, মা...তিল তিল করে তোকে শেষ করে ফেলবে...”। আমি অবাক হয়ে তাঁর দুই চোখের দিকে তাকালাম। নিজের ছেলে আর স্ত্রী সম্পর্কে মনে কতখানি বিতৃষ্ণা থাকলে এমন কথা “পরের মেয়ে”-কে বলা যায়, তুমি বলো তো, সুনুদা? সিসটার-মহিলাও তাঁর দিকেই তাকিয়েছিলেন, তাঁর দু চোখেও এখন মমতা।

আমি কোন উত্তর দিলাম না, উত্তরে কীই বা বলতাম? একটু পরে আমার শ্বশুরমশাই আবার বললেন, “যা হবার তা হয়ে গেছে, সে শোধরানোর এখন আর অন্য উপায় নেই, মা। কিন্তু তুই আমার মেয়ে হলে, এই শেকল ভেঙে আমি তোকে মুক্ত করে নিয়ে আসতাম। আর একথা... আর একথা তোর বাবাকেও - তাঁর হাতদুটো ধরে ক্ষমা চেয়ে নিয়েই, আমি বলব। আমি এখন আসছি রে মা, মন শক্ত করে ভেবে দেখিস আমার কথাগুলো...”। এই কথা বলে তিনি দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। বিছানায় শুয়ে আমার মনের মধ্যে ঝড় বইতে লাগল। উনি যে মুক্তির কথা বললেন, সেটা নিশ্চয়ই ডিভোর্স!

কথাটা আমার মনে যে এর আগে আসেনি তা নয় – কিন্তু বাবা-মা কী ভাববেন, আমাদের আত্মীয়-পরিজনরা কী ভাববেন, এমনকি আমার শ্বশুরমশাইও কী মনে করবেন – এসব চিন্তা করেই কথাটা মন থেকে মুখে আনতে পারিনি। কিন্তু আজ তো তিনিই আমাকে মুক্ত করে দিয়ে গেলেন – আমার মনে সাহস সঞ্চারিত করলেন। আমাকে মুক্তি-পথের দিশা দেখিয়ে গেলেন।    

মিনিট দশেক পরে ডাক্তার-ম্যাডাম এলেন, মমতাময়ী মাতৃমূর্তি যেন।

“কিরে, কেমন আছিস? মিষ্টি খাওয়াবি না? এত বড়ো প্রমোশন হল তোর?”

“প্রমোশন”? আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

“সে কি রে? মা হয়ে গেলি যে। এতদিন তুই ছিলি বাবা-মায়ের মেয়ে, শ্বশুর-শাশুড়ির বৌমা, স্বামীর স্ত্রী। গতকাল থেকে হলি বেবির মা, এটা প্রমোশন নয়? ছেলের নাম-টাম কিছু ভাবলি?” কথা বলতে বলতেই তিনি আমার টেম্পারেচার চার্ট, কয়েকটা টেস্ট রিপোর্টে চোখ বুলিয়ে নিলেন, আমার পাল্‌স্‌, হার্টবিট চেক করলেন, বললেন, “বাঃ পারফেক্ট মাদার। সব চিন্তা ছেড়ে এখন ছেলের নামের কথা ভাব”। এরপর সিস্টারকে কিছু নির্দেশ দিয়ে বললেন, “চলি রে, তোর বাবা-মা বাইরে অপেক্ষা করছেন”।

উনি বেরিয়ে যেতেই বাবা-মা ঢুকলেন। দুজনেরই মুখ গম্ভীর থমথমে। পিন্টুর বাবা-মার সঙ্গে কি ওঁদের নীচেয় দেখা হয়েছিল? কোন বচসা হয়েছে? পিন্টুর বাবা কি আমার বাবাকে ডিভোর্সের পরামর্শ দিয়ে দিয়েছেন? আমি অজানা এক দুশ্চিন্তায় শঙ্কিত হলাম।

চলবে....



বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /৬

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১




দ্বিতীয় স্কন্ধ - ষষ্ঠ পর্ব

রাজা পরীক্ষিতের তত্ত্ব কৌতূহল

মহারাজ পরীক্ষিৎ বললেন, “হে তত্ত্বজ্ঞ ব্রহ্মন, ব্রহ্মা দেবর্ষি নারদকে গুণাতীত শ্রীহরির গুণবর্ণনা করার জন্যে নির্দেশ দিলে, তিনি যাদের কাছে যেমন বর্ণনা করলেন, আমি সেই ভুবনমঙ্গল তত্ত্বকথা শুনতে ইচ্ছা করি। আমি আমার নিঃসঙ্গ মনকে শ্রীকৃষ্ণে সমর্পণ করে, যেভাবে আমার শরীর ত্যাগ করতে পারি, সেই বিষয়ে আমাকে উপদেশ করুন। নদী ও পুকুরের জলকে শরৎকাল যেমন নির্মল করে তোলে, তেমনই শ্রীকৃষ্ণ শ্রবণের দ্বার দিয়ে হৃদয়কমলে প্রবেশ করেন ও মনের নিখিল মালিন্য দূর করে দেন। প্রবাস থেকে ঘরে ফিরে আসা ব্যক্তি যেমন আবার প্রবাসে যাবার ক্লেশ মেনে নিতে পারে না, তেমনি মনের মালিন্যহীন কৃষ্ণভক্ত, তাঁর চরণমূলও পরিত্যাগ করতে ইচ্ছা করেন না। হে তপোধন, দেহ জড়পদার্থে তৈরি এবং আত্মার সঙ্গে ওই জড়পদার্থের কোন সম্বন্ধ নেই; সেক্ষেত্রে দেহের সঙ্গে আত্মার যে সংযোগ ঘটে থাকে, তার কি কোন কারণ আছে, এই বিষয়ে জানতে ইচ্ছা করি। জীবের যেমন নির্দিষ্ট সংখ্যক ও পরিমাণের অবয়ব আছে, সেইরকম যে পুরুষের নাভিকমল থেকে এই বিশ্বচরাচর সৃষ্টি হয়েছে, তাঁরও নির্দিষ্ট সংখ্যক ও পরিমাণের অবয়ব আছে, সে কথা আপনি আগেই বলেছেন। লৌকিক পুরুষ এবং ওই অলৌকিক মহাপুরুষের মধ্যে যে প্রভেদ রয়েছে, সেই তত্ত্বটি কৃপা করে নির্দেশ করুন।

পদ্মযোনি ব্রহ্মা যাঁর কৃপায় ভূতসমূহকে সৃষ্টি করে থাকেন, সকলের অন্তর্যামী সেই ভগবান মায়া ত্যাগ করে, কোন স্বরূপে অবস্থান করেন? মহাকল্প ও খণ্ডকল্পের পরিমাণ, যেভাবে কালের অনুমান করা যায়, তার প্রকার; ভূত, ভবিষ্যত ও বর্তমান শব্দে যে কালের উপলব্ধি হয়, সেই বিষয় এবং পিতৃগণ ও দেবগণের পরমায়ু ও তার পরিমাণ বর্ণনা করুন। এই যে কাল সূক্ষ্ম ও স্থূলভাবে লক্ষ্য করা যায়, তার আকার কেমন? শুভাশুভ কর্মের ফলে যে সকল লোক লাভ হয়, সেই সকল লোক কেমন এবং তাদের সংখ্যা কত? জীব কেমন দেহ পেলে, পাপ ও পুণ্য কর্মের একত্র স্থিতি সম্ভব হয়? জীবগণের মধ্যে কে, কেমন কর্ম করলে কোন গতি লাভ হয়? ভূর্লোক, পাতাল, দিকসমূহ, আকাশ, গ্রহ, নক্ষত্র, পাহাড়, নদী, সমুদ্র ও দ্বীপসমূহের এবং ঐসব স্থানের অধিবাসী জীবদের উৎপত্তি কিভাবে ঘটে? ব্রহ্মাণ্ডের বাইরের ভাগ ও ভিতরের ভাগের পরিমাণ কত? যুগ সকলের সংখ্যা, পরিমাণ ও ধর্ম এবং যুগে যুগে শ্রীহরির অবতারলীলা সবিস্তারে কীর্তন করে, আমাকে কৃতার্থ করুন। মানবগণের স্বাভাবিক ধর্ম কি এবং তাদের নিজের নিজের বর্ণ ও আশ্রম অনুযায়ী কেমন ধর্ম পালন করা উচিৎ?

হে ব্রহ্মন, বিভিন্ন ব্যবসায় নিযুক্ত হয়ে মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে, তাদের কেমন ব্যবহার আশ্রয় করা উচিৎ? রাজর্ষিগণ ও পতিত জীবের কেমন ধর্ম অনুসরণ করা উচিৎ? প্রকৃতি প্রভৃতি তত্ত্বসমূহের সংখ্যা ও লক্ষণ কী এবং কোন তত্ত্ব কারণরূপে, কোন কার্য উৎপন্ন করে? কিভাবে দেবতাদের আরাধনা করা উচিৎ এবং অষ্টাঙ্গযোগের বিধি কেমন, সে বিষয়ে শোনার ইচ্ছা আছে? অণিমা ইত্যাদি যোগে, যোগেশ্বরগণ সিদ্ধি লাভ করে, কোন গতি লাভ করেন ও কিভাবে তাঁদের লিঙ্গশরীর লয় হয়? ঋক, সাম প্রভৃতি বেদ, আয়ুর্বেদ প্রভৃতি উপবেদ, ধর্মশাস্ত্র, পুরাণ ও ইতিহাসের লক্ষণ কী? অগ্নিহোত্র ইত্যাদি বৈদিক কর্ম; কূপ, পুষ্করিণী ইত্যাদি স্মৃতি বিহিত পূর্ত কর্ম; এই সকল জানার বিষয় কৃপা করে বর্ণনা করুন। ধর্ম, অর্থ ও কাম এই ত্রিবর্গ কিভাবে নির্বিঘ্নে সাধন করা যায়? প্রলয়ের সময় সকল জীবের দেহ প্রকৃতিতে লীন হয়ে যায়, কিভাবে আবার তাদের সৃষ্টি হয়, কিভাবেই বা পাষণ্ডীদের সৃষ্টি হয়? আত্মা কিভাবে বদ্ধ, মুক্ত ও স্বরূপ অবস্থায় অবস্থান করে? ভগবান সৃষ্টিকালে নিজের মায়ায় যেমন বিবিধ লীলা করে থাকেন, প্রলয় কালে মায়া পরিত্যাগ করে সাক্ষীর মতো অবস্থান করেন, সেই বিষয়েও জানতে ইচ্ছা হয়।

হে মুনিবর, যে যে বিষয় আমি জিজ্ঞাসা করলাম, সেই সব বিষয় আমার জানা ছিল না, অতএব এতদিন ওই বিষয়ের প্রশ্ন আমার মনে উদয় হয়নি; এখন ওই সব বিষয়ে আমি শরণাগত জেনে, আপনার থেকে সবিস্তার বর্ণনার অনুরোধ করছি। স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মা যেমন সকল তত্ত্বের জ্ঞাতা, আপনিও সেই রকমই তত্ত্বদর্শী। হে ব্রহ্মন, অনশনব্রতে আমার চিত্ত এতটুকুও বিচলিত হয়নি, কারণ আপনার বর্ণনার সমুদ্র থেকে অচ্যুতের লীলারূপ অমৃত সৃষ্টি হচ্ছে এবং আমি সেই সুধা পান করে পরিতৃপ্তি পাচ্ছি”

শ্রীসূত বললেন, “হে ঋষিগণ, মহারাজ পরীক্ষিৎ মুনিবর শুকদেবকে ভগবানের কথা বিষয়ে প্রশ্ন করায়, তিনি অত্যন্ত প্রীত হলেন এবং কল্পের শুরুতে স্বয়ং ভগবান, ব্রহ্মাকে যে মহাপুরাণ উপদেশ করেছিলেন, সেই ভাগবত কীর্তন করলেন। পাণ্ডুকুলতিলক যা যা প্রশ্ন করেছিলেন, সেই সকল প্রশ্নের উত্তর দেওয়া শুরু করলেন”


ব্রহ্মর্ষি শুকদেবের উত্তর   

শ্রীশুকদেব বললেন, “হে রাজন, আদিদেব ব্রহ্মা জগতের পরমগুরু; কারণ তিনিই ভক্তিরহস্যের প্রথম উপদেষ্টা। তিনি যখন শ্রীবিষ্ণুর নাভিকমলে বসেছিলেন, তখন পূর্বকল্পে সৃষ্টির স্মৃতি তাঁর বিন্দুমাত্র মনে পড়েনি এবং এই বিষয়ে তিনি যখন চিন্তা করছিলেন, তখন ষোড়শ ও একবিংশ বর্ণের যোগে “তপ” এই বাক্য দুবার শুনতে পেলেন। এই শব্দ কে উচ্চারণ করল জানার জন্য তিনি চারদিকে তাকালেন, কিন্তু কাউকেই দেখতে পেলেন না। নিজের আসনে বসে চিন্তা করতে করতে তাঁর মনে হল, “তপ” অর্থাৎ কেউ আমাকে তপস্যা করতে নির্দেশ দিল; এবং তিনি তপস্যায় মগ্ন হলেন। ব্রহ্মা যে “তপ” কে তপস্যার অর্থ ধরেছিলেন, সে উপলব্ধি অব্যর্থ ছিল এবং যে তপস্যায় লোকসমূহের প্রকাশ হয়, সেই তপস্যায় দিব্য সহস্র বছর অতিবাহিত করেছিলেন।

[আজকাল সোশাল মিডিয়ায় বিখ্যাত চিত্রপরিচালক ঋত্বিক ঘটকের একটি উক্তি প্রায়ই ভাইরাল হয়ে ফিরে ফিরে আসে - "ভাবো, ভাবো, ভাবার চেষ্টা করো"। ব্রহ্মার কানে আসা দুবার "তপ", "তপ" শব্দটিও যেন অনুরূপ, কেউ যেন তাঁকে নির্দেশ দিলেন, "যোগনিদ্রা শেষে জেগে উঠে অমন ভ্যাবলার মতো বসে থেক না, ("ভাবো ভাবো") "তপস্যা করো, তপস্যা করো"। তপস্যায় অনেক দুর্বোধ্য বিষয়ও সম্যক উপলব্ধি করা যায়"। কয়েকটি অনুচ্ছেদ পরেই আমরা জানতে পারব শ্রী বিষ্ণুই ব্রহ্মাকে ওই প্রত্যাদেশ দিয়েছেলেন।]        

ব্রহ্মার এই আরাধনায়, ভগবান তাঁকে বৈকুণ্ঠলোক দর্শন করালেন। এই লোক নিখিল লোকের উপরে অবস্থিত, সুতরাং সবথেকে উৎকৃষ্ট। এই ধামে ক্লেশ, মোহ ও ভয় নেই। এই স্থানে রজঃ, তমঃ গুণের অস্তিত্ব নেই, এই ধাম বিশুদ্ধ সত্ত্বগুণে নির্মিত। এই লোকে কাল কবলে কেউ বিনাশ হয় না। এই পরম রমণীয় বৈকুণ্ঠলোকে সুর ও অসুরদের বন্দিত শ্রীহরির পার্ষদ্গণ বিহার করেন। তাঁরা সকলেই উজ্জ্বলকান্তি, পদ্মনেত্র, পীতাম্বর, চতুর্ভুজ, অতি কমনীয়, সুকুমার ও প্রভামণ্ডিত। এই লোকে লক্ষ্মীদেবী নারায়ণের চরণসেবা করছেন; বিলাসভরে তাঁর অঙ্গ দুলছে এবং বসন্ত সহচর ভ্রমরেরা তাঁর স্তুতিগান করছে।

ব্রহ্মা জগৎপতি ভক্তবৎসল শ্রীপতিকে দেখে ধন্য হলেন। তিনি দেখলেন, তাঁর সেবকদের করুণা করার জন্য শ্রীভগবান সর্বদাই উন্মুখ; তাঁর করুণাঘন দৃষ্টি দর্শকের মনে আনন্দ সৃষ্টি করে। তিনি চতুর্ভুজ ও পীতাম্বর, তাঁর মাথায় রত্নখচিত মুকুট, শ্রবণে কুণ্ডল এবং তাঁর বক্ষের বামদিকে স্বর্ণরেখায় লক্ষ্মীদেবী অঙ্কিত। তিনি সিংহাসনে বসে আছেন এবং প্রকৃতি, পুরুষ, মহত্তত্ত্ব, অহংকারতত্ত্ব, একাদশ ইন্দ্রিয়, পঞ্চ মহাভূত, পঞ্চ সূক্ষ্মভূত – এই পঞ্চবিংশ শক্তি নিজেদের বিক্রম ত্যাগ করে তাঁকে ঘিরে রেখেছে। তিনি অসংখ্য শক্তিযুক্ত হয়েও নিজের স্বরূপে বিরাজ করছেন, এই কারণেই তাঁকে ঈশ্বর বলা হয়ে থাকে।

ব্রহ্মা তাঁকে দেখে আনন্দে আপ্লুত হলেন, তাঁর অংগ পুলকিত হল এবং দু চোখে আনন্দে অশ্রুধারা বইতে লাগল। তিনি নতমস্তকে ভগবানের চরণকমল বন্দনা করলেন। ভগবান শ্রীব্রহ্মার করস্পর্শ করে, হাস্যমুখে মধুর স্বরে বললেন, “হে বেদগর্ভ, তুমি সৃষ্টির ইচ্ছায় যে দীর্ঘ তপস্যা করেছ, তাতে আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। কূটযোগীগণ সুদীর্ঘ কাল কপট তপস্যা করলেও আমি তাদের দর্শন দিই না। তোমার মঙ্গল হোক, আমিই বরদাতা, অতএব তোমার ঈপ্সিত বর প্রার্থনা করো। তুমি নিজের তপস্যার ফলেই, তোমার  বৈকুণ্ঠ দর্শন হল, এমন মনে কোর না। কারণ, আমিই তোমাকে “তপ, তপ” প্রত্যাদেশ দিয়ে, তপস্যার কথা বলেছিলাম, আমিই তোমাকে তপস্যায় প্রবৃত্ত করেছিলাম। তপস্যা আমার হৃদয় অর্থাৎ জ্ঞানময়ী শক্তি, আমিই নিজেই তপস্যার আত্মা অর্থাৎ স্বরূপ। আমি তপস্যা দিয়েই বিশ্বর সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় করে থাকি। দুশ্চর তপস্যাই আমার বীর্য অর্থাৎ শক্তি”

শ্রীব্রহ্মা বললেন, “হে নাথ, আপনি সর্বভূতের বুদ্ধিতে উপস্থিত থাকেন এবং আপনার অব্যর্থ জ্ঞানদৃষ্টিতে সকল প্রাণীর মনের ইচ্ছা  আপনি বুঝতে পারেন। তবুও আমার মনের ইচ্ছা আপনাকে বলছি, আপনি পূর্ণ করে, আমাকে কৃপা করুন। হে মাধব, আমি অনলস হয়ে আপনার সৃষ্টির আদেশ পাল করব, কিন্তু সৃষ্টির সময়, অহংকার যেন আমাকে আচ্ছন্ন না করে। আপনি আমার করস্পর্শ করে, আমার সঙ্গে সখার মতো আচরণ করলেনএই কারণে যখন নির্বিকার চিত্তে উত্তম, মধ্যম ও অধম বিভাগে জীবসকল সৃষ্টি করব, তখন “আমিই স্বতন্ত্র সৃষ্টিকর্তা”, এই উৎকট বোধ আমাকে যেন গ্রাস না করে”

["রথ ভাবে আমি দেব পথ ভাবে আমি, মূর্তি ভাবে আমি দেব, হাসে অন্তর্যামী"। কবিগুরুর এই ছড়াতেও সেই ভাবাভাবি - অর্থাৎ দর্প-ভাবনার চিত্রটি বড়ো সুন্দর ভাবে পরিষ্ফুট। যদিও ব্রহ্মাই সবকিছু সৃষ্টি করতে চলেছেন, কিন্তু তিনি "আমিই সৃষ্টিকর্তা" এই দর্প-ভাবনা থেকে মুক্তি চাইছেন, কারণ তিনি জানেন সকল সৃষ্টির একমাত্র কারণ ভগবান শ্রীহরি - তিনি তো নিমিত্ত মাত্র।]      

শ্রীভগবান বললেন, “শাস্ত্রজ্ঞান, অনুভব, ভক্তি ও তার সাধন তোমাকে বলছি, শোন। আমার যেমন স্বরূপ, আমার যেমন সত্ত্বা এবং যেমন আমার রূপ, গুণ ও কর্ম, এই সমস্ত বিষয়ের তত্ত্বজ্ঞান, আমার প্রসাদে তোমার অন্তরে প্রকাশ হোক। সৃষ্টির আগে আমি কেবলমাত্র অবস্থান করে থাকি, কোন কার্যের অনুষ্ঠান করি না। স্থূল, সূক্ষ্ম ও তাদের কারণস্বরূপ প্রকৃতি আমার মধ্যেই লীন থাকায়, তাদের প্রকাশ ঘটে না। সৃষ্টির পরেও আমিই বর্তমান থাকি। দৃষ্টিগোচর এই বিশ্বও আমি এবং বিশ্বের প্রলয় হলেও আমিই অবশিষ্ট থাকিযার প্রভাবে পদার্থের বাস্তব অস্তিত্ব না থাকলেও অব্যক্তরূপে আত্মায় প্রকাশ পায় এবং যার জাদুতে বস্তু বর্তমান থাকলেও তার অস্তিত্ব বোঝা যায় না, তাকেই মায়া বলে। আমার সত্ত্বা কেমন হয়, তোমাকে বলছি শোন। ছোট ও বড়ো সকল বস্তুই মহাভূত উপাদানে রচিত হয়। যখন বস্তু তৈরি হয়, তখন মহাভূতের সকল উপাদানকে সেই বস্তুতেই দেখা যায়, সুতরাং উপাদান সকল বস্তুতে প্রবেশ করেছে এমন মনে হয়। কিন্তু যখন পর্যন্ত বস্তু রচনা না হয়, তখনও মহাভূত উপাদানসমূহ কারণ রূপে বর্তমান থাকে, কিন্তু বস্তুতে যেন অপ্রবিষ্ট মনে হয়। এই ভাবে মহাভূতকে যেমন বস্তুতে কখনো প্রবিষ্ট এবং কখনো অপ্রবিষ্ট বলে মনে হয়, তেমনই আমাকেও পদার্থসমূহে প্রবিষ্ট ও অপ্রবিষ্টরূপে উপলব্ধি হয়।

এখন সাধনের প্রকার বলছি, মন দিয়ে শোন। যখন কার্যে কারণের উপলব্ধি ঘটে, তখন তাকে কার্যবস্তুতে কারণের অন্বয় বলে। মৃত্তিকা কারণ ও ঘট কার্য। ঘটে যে মাটির উপলব্ধি হয়, তাকেই কার্যে কারণের অন্বয় বলে। যখন ঘট ভেঙে যায়, তখন আর ঘট থাকে না, কিন্তু কারণরূপ মৃত্তিকা পড়ে থাকে। একেই কার্য থেকে কারণের ব্যতিরেক বলে।  যখন জীব জাগ্রত অবস্থায় থাকে, তখন তাদের মধ্যে জ্ঞানস্বরূপে আমি বর্তমান থাকি, সুতরাং সৃষ্টি কালে জগতের সঙ্গে আমার অন্বয় থাকে। কিন্তু সমাধি অবস্থায় যখন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড লয় হয়ে যায়, তখনও আমি চৈতন্যস্বরূপে বর্তমান থাকি। অতএব অন্বয় ও ব্যতিরেক, এই উভয় অবস্থাতেই আমিই সত্য রূপে অবস্থান করি, সুতরাং আমিই সত্য আত্মা, বাকি সব মিথ্যা। তুমি পরম সমাধি অর্থাৎ একাগ্র চিত্তে আমার এই মতের অনুষ্ঠান করো, বিভিন্ন কল্পে যখন তুমি সৃষ্টি করতে থাকবে, “আমিই কর্তা” তোমার মধ্যে এই অভিমান কখনো স্পর্শ করতে পারবে না”

শ্রীশুকদেব বললেন, “শ্রীহরি জনগনের পরমেষ্ঠী অর্থাৎ পরম অধিপতি ব্রহ্মাকে এই উপদেশ দিয়ে তাঁর সামনে অন্তর্হিত হলেন। সর্বভূতময় ব্রহ্মা জোড়হাতে তাঁর বন্দনা করলেন এবং পূর্বকল্পের মতো বিশ্ব সৃষ্টিতে নিযুক্ত হলেন। শ্রীনারায়ণ ব্রহ্মাকে যে চতুঃশ্লোকী ভাগবত সংক্ষেপে উপদেশ করেছিলেন, ব্রহ্মা নিজের প্রিয় পুত্র নারদকে দশ লক্ষণযুক্ত ভাগবত পুরাণ সবিস্তারে বর্ণনা করেছিলেন। তারপর শ্রীনারদ সরস্বতীতীরে পরমব্রহ্মে ধ্যাননিরত মহাতেজা ব্যাসদেবকে এই ভাগবত উপদেশ করেছিলেন। এবার বৈরাজ পুরুষ থেকে এই বিশ্ব কিভাবে উদ্ভূত হল, আপনার এই প্রশ্নের এবং অন্যান্য সকল প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি, শুনুন”

চলবে...


মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৭

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৬ 


৩৩ 

ভল্লা বাসায় ফিরল যখন, মধ্যাহ্ন পার হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। রণপাজোড়া ঝোপের আড়ালে রেখে বাসায় ঢুকে দেখল, রামালি রান্না করে ঢাকা দিয়ে রেখে গেছে। ভল্লা একটু নিশ্চিন্ত হল এবং বুঝতে পারল, আরাম ব্যাপারটা তার মধ্যে ঢুকে পড়ছে। এই অবেলায় বাসায় ফিরে, স্নান করে, রান্না করে যে তাকে খেতে হল না, সেটাতেই সে পরম স্বস্তি পেল। তার কাছে এই কাজগুলো আগে অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু আজকাল তার প্রত্যাশা বাড়ছে, বাড়ছে রামালির ওপর নির্ভরতা।

ভল্লা ধীরে সুস্থে পুকুরে গেল, ধুতি-জামা কেচে বেশ সময় নিয়ে স্নান করল। খাওয়াদাওয়ার পাট চুকিয়ে যখন উঠল, ততক্ষণে বেলা গড়িয়ে গেছে। অপেক্ষা করতে লাগল, রামালির। আজকে মহড়ায় কত দূর কে এগোলো, সেটা জানার জন্যেই সে উদ্গ্রীব। ছোঁড়াগুলো এতদিনে সত্যিকার লড়াই করার জন্যেই তৈরি হচ্ছে। ভল্লার আশা এই মহড়া তাদের মানসিক ভাবেও অনেকটা এগিয়ে দেবে। অতএব এখন তাদের মনের ভাবগতিক কেমন বুঝতে পারলে ভল্লার পক্ষে এর পরের ধাপে পা রাখতে সুবিধে হবে।

অন্যদিনের তুলনায় রামালি আজ একটু তাড়াতাড়িই ফিরল। রণপাজোড়া রেখে উঠোনে দাঁড়িয়ে ভল্লাকে দেখে জিজ্ঞাসা করল, “কখন ফিরলে? খেয়েছো”?

ভল্লা রামালির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল, হ্যাঁ – বলল, “তুই আজকে তাড়াতাড়ি চলে এলি?”

“ছেলেরা সকলেই আজ মেতে উঠেছিল মহড়াতে - কেউই দুপুরে খেতে বাড়ি যায়নি। আমি আর শল্কু ছাড়া। আমি অবশ্য খাওয়াদাওয়া করে মহড়াতে গিয়েছিলাম। কিন্তু শল্কু আর ফেরেনি”।

“শল্কু ফেরেনি? কেন? ও মহড়া কেমন দিল?”

“তুমি থাকতে সেই একবারই যা করেছিল, তারপর তো সারাক্ষণ বসেই রইল। খাওয়ার সময় কেউ বাড়ি যাবে না শুনে, সবাইকে খারাপ একট গালাগাল দিয়ে চলে গেল। ব্যস্‌, তারপর আর ফেরেনি”।

“বাকিদের কী অবস্থা?”

“আমার তো ভালই মনে হল, বিশেষ করে আহোক, বিনেশ, সুরুল, মইলি, দীপান, অমরা…। এই তো আসার আগে ওরা তোমার মতো না পারলেও, পুতুলের বুকের কালো দাগটা ছুঁয়ে ফেলেছে”।

“আর তুই?”

“কাল সকালে তুমি মাঠে যাবে তো? তখন তুমিই দেখে নিও”, লাজুক হেসে রামালি উত্তর দিল।

কিন্তু শল্কুটা বেশ ভাবিয়ে তুলল তো। হতভাগা মনে হচ্ছে গণ্ডগোল পাকাবে। বাঁদরটা লড়াইয়ের কিছু শিখলই না, কিন্তু নেতা হবার শখ ষোল আনা?”

“তুমি চলে যাওয়ার পর, শল্কু আমাকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি তো দিনের বেলা কোথাও যাও না, তুমি  গেলে কোথায়? আমি বললাম, জানিনা। তাতে আমাকে চিমটি কেটে বেশ কিছু কথা শোনালো। আমিও শান্তভাবেই, তার উত্তর দিলাম। আমার কথা শুনে ছেলেদের সবাই আমাকেই সমর্থন করল। তারপর থেকেশল্কু গোঁজ হয়ে আলাদা বসে রইল। খেতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত সাক্ষীগোপাল হয়ে আমাদের মহড়া দেখতে লাগল”।

ভল্লা বলল, “জলে নামার আগেই শামুকের খোলে পা কাটবে? মনে হচ্ছে আবার একটা ঝামেলা পেকে উঠছে…”। ভল্লা মাথা নীচু করে গভীর চিন্তায় ডুব দিল।  রামালি ঘর থেকে থালা-বাসন বের করে পুকুরের দিকে যেতে যেতে বলল, “ভল্লাদাদা আমি এখনই আসছি”।

রামালি ফিরে এসে যখন প্রদীপ জ্বেলে,  রান্নার যোগাড়ে বসল, বালিয়া ডাকল “ভল্লাদাদা, আছ? রামালি?”

রামালি সাড়া দিল, আয় আয় সবাই আছি”।

হাতে একজোড়া রণপা নিয়ে, বালিয়া উঠোনের ভেতরে এসে বলল, “ভল্লাদাদা তোমরা এখনও সংবাদ পাওনি মনে হয়”।

“কিসের সংবাদ?” ভল্লা বালিয়ার দিকে উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে বলল। রামালিও ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল বালিয়ার দিকে। বালিয়া মাটিতে বসতে বসতে বলল, “প্রধানমশাই মারা গেছেন। সন্ধের একটু আগে”।

ভল্লা এবং রামালি দুজনেই চমকে উঠল, “কী বলছিস?”

“হুঁ। সন্ধের মুখোমুখি, তোমার এখানে আসার জন্যে আমি প্রস্তুত হচ্ছিলাম। তখনই সংবাদটা এল। ভেবেছিলাম আজ আসব না। বাবা বললেন, তুই যা, আমি যাচ্ছি প্রধানমশাইয়ের বাড়ি। তুই কাজ সেরে ওখান চলে যাস। দাহ কাজে তোর থাকাটা জরুরি”।

ভল্লা এবং রামালি কেউ কোন কথা বলল না। রামালি রান্না করতে লাগল মন দিয়ে। ভল্লা চুপ করে বসে রইল অনেকক্ষণ। তারপর বলল, “কেমন বানালি দেখা। তোকে যখন যেতে হবে, তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিই তোকে!” বালিয়া রণপা জোড়া ভল্লার হাতে তুলে দিল। ভল্লা উঠে গিয়ে ওগুলো আলোর কাছে নিয়ে গেল। রণপার তলায় লোহার খুড়ো, আর ওপরে বল্লমের ফলা। খুঁটিয়ে দেখে খুশিই হল। জিজ্ঞাসা করল, “এই দুটো করতে কত ব্যয়  হল তোদের?” বালিয়া একটু ইতস্তত করে বলল, “আমাদের কাছে কিছু লোহা ছিল, সেটা দিয়েই এদুটো বানিয়েছি। বাবা বললেন, এরকম পাঁচজোড়া বানাতে এক তাম্রমুদ্রা লাগবে। তবে এখন তো শুনছি লোহার দাম অনেকটাই বেড়ে গেছে, নতুন লোহা কিনে কাজটা করতে আরও কিছু বেশি খরচ হবে। হয়তো চার জোড়ার জন্যে এক তাম্রমুদ্রা পড়বে। কিন্তু তার আগে বলো, আমাদের হাতের কাজ তোমার পছন্দ হল কিনা। তা নাহলে…”।

ভল্লা খুঁটিয়ে লক্ষ্য করতে করতে বলল, “এখন দেখে তো ভালই লাগছে, তবে কাল দিনের আলোতে দেখলে আরও ভাল বুঝতে পারবো। তুই এখন যা, বালিয়া। কাল সন্ধের পর আসিস, তোকে কিছু টাকা দেব, আর…ও হ্যাঁ, দিনে এরকম কটা বানাতে পারবি?”

“ধরো, তিন জোড়া, খুব জোর চার জোড়া”।

“বাঃ চলবে। কাল আসিস তোকে আরও চার জোড়া রণপা দিয়ে দেব”।

“আজ কিছু দেবে না?”

ভল্লা বালিয়ার মাথায় হাত রেখে বলল, “না ভাই, আজ নয়। আজ তুই এখান থেকেই প্রধানমশাইয়ের বাড়ি যা, গ্রামের সবার সঙ্গে তোর থাকাটা জরুরি, নয়তো কেউ কেউ তোকে সন্দেহ করবে…আজ নয়, কাল নিয়ে যাস”।

বালিয়া উঠে দাঁড়াল, বলল, “তাহলে আমি আসি ভল্লাদাদা। কাল আবার আসব এইরকম সময়েই। রামালি চললাম, রে”।

রামালি উঠে দাঁড়িয়ে, বালিয়ার কাঁধে হাত রেখে বলল, “আমার হয়ে প্রধানমশাইয়ের পায়ে একটা প্রণাম করিস, বালিয়া। মানুষটা বুক দিয়ে আমাদের গ্রামটাকে এতদিন রক্ষা করে এসেছেন… তাঁর যে এভাবে মৃত্যু হবে...ভাবা যায় না”।

বালিয়া চলে যেতে ভল্লা রামালিকে বলল, “তুই একবার ঘুরে আসতে পারিস, রামালি। আমার না হয় সকলের সামনে গ্রামে ঢোকা সম্ভব নয়। কিন্তু তুই তো যেতেই পারিস”। রামালি রান্না করতে করতে বলল, “আমি যাবো, ভল্লাদাদা। তবে এখন নয়,  পরে – প্রধানমশাইকে শ্মশানে নিয়ে যাক”। একটু চুপ করে থেকে বলল, “এখন গেলে, কমলি-মায়ের কাছে নিশ্চয়ই গ্রামের সব মহিলারা থাকবে। সেখানে থাকবে আমার কাকিও। সকলের সামনে কাকি কী বলে বসবে কে জানে? তার ওপর শল্কু তো ওখানে থাকবেই – সেও আমার বিরুদ্ধে কাকিকে ইন্ধন যোগাতে ছাড়বে না। আমার পক্ষে, তোমার পক্ষে এবং আমাদের দলের অন্য ছেলেদের পক্ষেও, ব্যাপারটা স্বস্তির হবে না! শ্মশানে কাকি যাবে না, আর সেখানে আমাদের ছেলেদের সামনে  শল্কু কোন গণ্ডগোল পাকাবার সাহস পাবে বলে আমার মনে হয় না”।

ভল্লা রামালিকে কিছু বলতে গিয়েও থমকে গেল, বেড়ার ওপাশ থেকে পায়ের শব্দ কানে এল তার, হাঁক দিল, “কে ওখানে?” “আরে চেল্লাস না। আসছি দাঁড়া। রামালি, তোর রণপাজোড়া রেখে দিলাম ঝোপের ভেতর। ঠিক আছে?” একটু পরেই মারুলা এসে দাঁড়াল উঠোনের মাঝখানে। ভল্লার পাশে বসতে বসতে বলল, “কী রাঁধছিস, রামালি? আমারও দুটো জুটবে তো?”

অন্যদিনের মতো হাসিমুখে নয়, রামালি একটু গম্ভীর মুখে উত্তর দিল, “ও নিয়ে ভেব না, মারুলাদাদা, এখন থেকে আমার হাতেই তোমার রাতের খাওয়াটা বাঁধা পড়ে গেছে...”।

মারুলা বলল, “সে জানি, কিন্তু তুই মুখটা অমন হাঁড়ির মতো করে রেখেছিস কেন? ভল্লা শালা বকেছে, না পেঁদিয়েছে?”

ভল্লা বলল, “মারুলা তোর চ্যাংড়ামিগুলো আপাততঃ বন্ধ রাখ। আমাদের কারও মন ভালো নেই...নোনাপুরের গ্রামপ্রধান জুজাক মারা গেছে। আজ সন্ধের একটু আগে”।

মারুলা বলল, “মারা গেছে? কী বলছিস?” সকলেই চুপ করে রইল। মনে মনে সকলেই নিজের মতো গভীর চিন্তায় মগ্ন রইল অনেকক্ষণ। কিন্তু  হঠাৎই বেশ কিছু পায়ের শব্দ কানে আসতে সকলে সতর্ক হয়ে উঠল। ভল্লা মারুলাকে ইশারা করতে, মারুলা নিমেষের মধ্যে গাঢাকা দিল ভল্লার বাসার পিছনে ঝোপের ধারে। বাইরে থেকে খুব চাপা গলায় কেউ ডাকল, “ভল্লাদাদা রয়েছো? আমি মিলা, বটতলি থেকে আমরা এসেছি”।

ভল্লা নিশ্চিন্ত হয়ে ডাকল, “রয়েছি। চলে আয় মিলা”। বটতলির পাঁচজন ভেতরে এসে ভল্লার সামনে মাটিতে বসার আগে, নমস্কার করল ভল্লাকে। মিলার হাতে ছোট্ট একটা পুঁটলি। সেটা কোলের কাছে নিয়ে, চাদরের আড়াল করে মিলা রামালির দিকে সন্দেহের চোখে তাকাল। লক্ষ্য করে ভল্লা বলল, “ওর সঙ্গে তোদের পরিচয় হয়নি না? ও রামালি। নোনাপুরের ছেলে। ঘরবাড়ি ছেড়ে এখন আমার সঙ্গেই থাকে। এদিকের দলটার সর্দার হয়ে উঠছে দিন-কে-দিন। ওর সামনে সব কথাই বলতে পারিস। কোন অসুবিধে নেই। রামালি, তোর রান্না হয়ে গেছে?  তুইও আমাদের সঙ্গে বস না”। রামালি উঠে এসে বটতলির ছেলেদের থেকে একটু দূরত্ব রেখে মাটিতেই বসল।

মিলা বলল, “এদিকের ছেলেরা শুনছি অস্ত্র চালনায় বেশ সড়গড় হয়ে উঠছে। আমরা কবে থেকে শুরু করব, ভল্লাদাদা?”

ভল্লা বলল, “আশা করি সাত-দশ দিনের মধ্যে কিছু অস্ত্র হাতে আসবে। ততদিন তোরা সাধারণ শরীরচর্চাই শুরু কর না। অস্ত্রচর্চার আগে সেটাও তো শিখতে হবে”।

মিলা বলল, “তুমি দেখিয়ে দেবে তো? রামালিদের মহড়ার মাঠে, আমরা শুরু করতে পারি না?”

ভল্লা বলল, “একই মাঠে দু’দল একসঙ্গে চর্চা! তাই হয় নাকি? ওরা অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে যে। দু একদিন পরে দেখবি দুদলের মধ্যে ঝটাপটি শুরু হয়ে যাবে”।

মিলা কোলের ওপরে রাখা পুঁটলিটা বের করে মাটিতে রাখল। গিঁট খুলে পুঁটলির জিনিষগুলো মেলে ধরল ভল্লা এবং রামালির সামনে। দুজনেই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “এগুলো পেলি কোথায়?”

মিলা তিনটে ছোট বটুয়া তুলে বলল, “এ গুলোতে মোট ২৭৫টা রূপোর মুদ্রা আছে, ভল্লাদাদা। আর এই সোনার গয়নাগুলো…এতে কিছু কিছু মণি-রত্নও আছে। পেয়েছি ডাকাতি করে। তুমিই তো রাস্তা দেখিয়েছিলে, ভল্লাদাদা!”

ভল্লা অবাক চোখে মিলার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। বলল, “এ কদিনের মধ্যেই ডাকাতি করে ফেললি? কটা বাড়ি”?

মিলা বলল, “মাত্র তিনটে বাড়িতে। তবে এখন আর ডাকাতি করতে সাহস হচ্ছে না। কারণ পরপর তিনটে ডাকাতির সংবাদ, চারদিকের গ্রামে-গ্রামে প্রচার হয়ে গেছে। বড়োলোকেরা সতর্ক হচ্ছে, সুরক্ষা ব্যবস্থা বাড়াচ্ছে। বুঝতে পারছি, আমাদের পুরোন, মরচে ধরা অস্ত্র নিয়ে আর এগোন সম্ভব নয়। নতুন অস্ত্র-শস্ত্র চাই। তার থেকেও জরুরি, ঠিকঠাক লড়াই করাটাও শিখতে হবে, বুঝতে হবে”।

ভল্লা রামালিকে বলল, “রামালি, ওদের মহড়ার মাঠটা উত্তরের মাঠে করলে কেমন হয়? যেখানে আমরা মাঝেমধ্যে বসি”? রামালি একটু চিন্তা করে বলল, “ভালই হবে। কালকে দিনের বেলা চলে এসো, দেখিয়ে দেব। বড়ো গাছ নেই, ছোটছোট ঝোপঝাড়। একটু পরিষ্কার করতে হবে। তোমাদের কতজনের দল”?

মিলা বলল, “শুরুতে আমরা ছিলাম পনেরজন। এখন ধরো আরও দশজন”।

রামালি বলল, “হয়ে যাবে, চল্লিশ-পঞ্চাশজনের পক্ষেও ও মাঠটা যথেষ্ট”।

ভল্লা বলল, “কাল থেকেই তোরা শুরু কর। ভোরভোর এদিকে চলে আয়। প্রথমে ক্রোশ তিনেক দৌড়ে নিবি। মনে রাখিস, হাঁটা নয়  - রীতিমতো দৌড়তে হবে, দ্রুত…”।

জনা অবাক হয়ে বলল, “দৌড়বো? দৌড়ে কী হবে?”

ভল্লা হেসে ফেলল, বলল, “অনেক কিছু হবে, হাত-পায়ের জোর বাড়বে। শরীরের মেদ ঝরবে, দেহ এখনকার থেকে অনেক সচল, ক্ষিপ্র হবে। তারপর অস্ত্র এসে গেলে শুরু হবে অস্ত্রের মহড়া”।

মিলা তার পুঁটলিতে আবার গিঁট বাঁধল, বলল, “এগুলো তুলে রাখো, ভল্লাদাদা। অস্ত্র কেনার জন্যে এটাই আমাদের প্রথম অগ্রিম”।

“পাগল নাকি? আমি ওই টাকা, গয়নাগাঁটি এখন রাখবো কোথায়? দেখছিস তো আমার ঘরদোরের অবস্থা। তোরা ওগুলো এখন নিয়ে যা… অস্ত্রশস্ত্র হাতে এসে গেলে আমি তোদের বলব, তখন নিয়ে আসিস”।

“কী বলছো, ভল্লাদাদা? আমরাই বা এই জিনিষ সামলাবো কী করে? রক্ষীদের যদি সন্দেহ হয়, যদি বাড়িতে হানা দেয়…ধরা পড়ে যাবো হাতে নাতে…”

“মিলা, ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা কর...এরকম হুট করে তোরা সোনাদানা-টাকাপয়সা নিয়ে চলে আসবি, জানব কেমন করে? তোর রূপোর মুদ্রার দায়িত্ব আমি নিতে পারি, কিন্তু সোনা? কতভরি ওজন, সোনায় খাদ কত – সে সব আমি বা তুই জানব কী করে? গয়নার দাম ঠিক করতে পারবে একমাত্র স্বর্ণকার... এখানে আশেপাশের গ্রামে আমি স্বর্ণকার পাবো কোথায়?”

“ঠিকই বলছ, ভল্লাদাদা। কিন্তু এখন তোমার কাছে সব কিছু রেখে যাওয়া ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় নেই”।

ভল্লা চিন্তিত মুখে বলল, “তোদের অবস্থা আমি বুঝতে পারছি, কিন্তু শুরুতেই আমাদের মধ্যে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের একটা ধন্দ ঘনিয়ে উঠতে পারে...সেটাতেই আমি ভয় পাচ্ছি...”।

মিলা ভল্লার একটা হাত ধরে বলল, “ভল্লাদাদা, আমাদের মনে অবিশ্বাসের কোন জায়গাই নেই। আমাদের অস্ত্র চাই, তোমার টাকা চাই – ব্যস্‌। এই পুঁটলি তোমায় দিয়ে যাচ্ছি। আর কাল আমরা দৌড় শেষ করে এখানেই আসব। তুমি আমাদের মাঠে নিয়ে গিয়ে মহড়া দেখাবে...আজ চলি”।      

মিলারা চলে যাওয়ার পর মারুলা আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। ভল্লার পাশে বসে বলল, “বেশ ঝামেলায় পড়লি ভল্লা। এগুলো নিয়ে এখন কী করবি”? ভল্লা বলল, “করব আবার কী? তুই নিয়ে গিয়ে শষ্পককে দিবি। আস্থানের কোষাগারেই পৃথক কোন সিন্দুকে এখন থাক। আর বলবি, বীজপুরের সেই স্বর্ণকারকে দিয়ে গয়নাগুলোর কত দাম হতে পারে, সেটাও যেন জেনে রাখে”।

মারুলা চিন্তান্বিত গলায় বলল, “তাহলে আমি এখনই বেরিয়ে যাই, ভল্লা। শষ্পক ঘুমোতে যাওয়ার আগেই তোর ওই পুঁটলি তার হাতে তুলে না দিলে, রাত্রে আমার ঘুম হবে না”।

রামালি বলল, “বা রে, আমি যে তোমার জন্যে রান্না করলাম? তার কী হবে? চট করে বেড়ে দিচ্ছি খেয়ে যাও!”

ভল্লা বলল, “সেই ভালো, রামালি আমরাও চল, মারুলার সঙ্গে খেয়ে নিই”।

রামালি বলল, “তুমি যাবে?”

মারুলা জিজ্ঞাসা করল, “তোরা এত তাড়াতাড়ি খাবি কেন? কোথায় যাবি”?

ভল্লা বলল, “নোনাপুর যাবো”।

“আচ্ছা, গ্রামপ্রধানের সৎকারে যাবি? রামালি যেতেই পারে, কিন্তু তোর ওখানে যাওয়া কি উচিৎ হবে?”

রামালি দুজনের হাতে থাল তুলে দিয়ে নিজেরটা নিয়ে বসল মাটিতে। ভল্লা খাওয়া শুরু করার আগে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল, “কোনটা উচিৎ আর কোনটা অনুচিত...সবই কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে রে, মারুলা”। 

চলবে...


সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/৪

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/৩ "]

পঞ্চম পর্ব /পর্বাংশ  - ৪

৫.১.৬ বেদান্ত দর্শন

মধ্য যুগ থেকে আজ পর্যন্ত সব থেকে প্রচলিত এবং আলোচিত দর্শন বেদান্ত। বেদান্তের একমাত্র ভাবনা ব্রহ্ম। ব্রহ্মের ধারণা এবং ব্রহ্ম-উপলব্ধির দর্শনই বেদান্ত। বেদান্ত দর্শন সম্পূর্ণ বেদ-নির্ভর এবং এর নাম থেকেই স্পষ্ট যে, এটি বেদের অন্ত বা শেষ অর্থাৎ উপনিষদকে মূলতঃ অনুসরণ করেছে। যদিও বেদান্ত উপনিষদ ছাড়াও ব্রহ্মসূত্র এবং গীতার তত্ত্বের উপরও নির্ভরশীল।  

যাঁর থেকে জগতের উৎপত্তি এবং যাঁর জন্যে জগতের স্থিতি ও লয় হয়, তিনিই ব্রহ্ম। ব্রহ্ম সত্য-স্বরূপ, জ্ঞান-স্বরূপ ও অনন্ত-স্বরূপ। তিনি অদ্বিতীয় অর্থাৎ তিনি ছাড়া অন্য কোন বিষয় থাকতে পারে না। তিনিই সত্য, বাকি আর সব অসত্য। কিন্তু তিনি সৎ[1]-স্বরূপ রয়েছেন বলেই জগতের অস্তিত্ব রয়েছে এমন ধারণাও একরকমের ভ্রম। সে কথায় পরে আসছি।

মাটি দিয়ে যে ঘট বানানো হয়, তাতে মাটি হল উপাদান-কারণ এবং যিনি ওই ঘট বানিয়েছেন, অর্থাৎ কুম্ভকার নিমিত্ত-কারণ। সৃষ্টির আদিতে অদ্বিতীয়-স্বরূপ পরমেশ্বরই ছিলেন, আর কিছুই ছিল না। সেক্ষেত্রে তাঁকেই জগতের নিমিত্ত এবং উপাদান-কারণ বলতে হয়। মাটি যেমন পরিণত এবং পরিমার্জিত হয়ে ঘট হয়ে ওঠে, তিনি কিন্তু নিজে পরিণত অথবা বিকৃত হয়ে এই জগতের সৃষ্টি করেননি। কারণ তিনি নির্বিকার এবং অব্যয়, কারণ তিনি নিত্য অর্থাৎ কোন অবস্থাতেই তাঁর পরিবর্তন সম্ভব নয়।

অতএব মাটি যেমন ঘটের পরিণাম-উপাদান, সেরকম ব্রহ্ম এই জগতের পরিণাম-উপাদান হতে পারেন না। যদিচ আপাতদৃষ্টিতে তাই মনে হয়। এই বিষয়ে এই দর্শনে একটি অতি প্রচলিত উদাহরণ ব্যবহার করা হয়, অন্ধকারে দেখলে রজ্জু অর্থাৎ দড়িকে সাপ বলে মনে হয়। কিন্তু আলোতে দেখলে রজ্জু, রজ্জুই থাকে। অর্থাৎ “রজ্জুতে সর্পভ্রম”-এর মতোই, আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে, ব্রহ্মে জগৎ-ভ্রম হয়ে থাকে। এই ধরনের ভ্রমাত্মক উপাদানের ধারণাকে বেদান্তের ভাষায় বিবর্ত-উপাদান বলে, অতএব ব্রহ্ম জগতের বিবর্ত-উপাদান কারণ।

এই ভ্রমকে দূর করার জন্যে মায়া তত্ত্ব আনা হয়েছে। মায়া পরব্রহ্মের শক্তি-স্বরূপ। তিনি মায়াবচ্ছিন্ন (মায়ার প্রভাবে বিভক্ত) হলেই জগতের উৎপত্তি হয়। কিন্তু তিনি যদি নিত্য এবং মুক্ত হন, তাহলে তিনি বিভক্ত হচ্ছেন কী করে? এই সংশয় দূর করার জন্যে বৈদান্তিকেরা একটি উদাহরণ দিয়েছেন। পাতায় ভরা গাছের নিচে বসে আকাশের দিকে তাকালে, মনে হয় আকাশ যেন ছোট ছোট টুকরোয় ভাগ হয়ে গেছে, কিন্তু আসলে আকাশ একটাই থাকে। তেমনি ব্রহ্ম মায়াবচ্ছিন্ন হলেও বাস্তবে অবচ্ছিন্ন হন না। এই একই অনুভবের কথা আমরা ভগবান বুদ্ধের ক্ষেত্রেও শুনেছি, বোধিবৃক্ষের নীচে বসে একটি অশ্বত্থ পাতার আড়ালে থাকা আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি জীবনের অনাত্মতা ও অনিত্যতা উপলব্ধি করেছিলেন (অধ্যায় ৩.২.২)। 

বেদান্তের মতে ব্রহ্ম নির্গুণ, নিরাকার, নির্বিকার, অবাঙ্মনসোগোচর (তাঁকে কথা বা চিন্তা দিয়ে উপলব্ধি করা যায় না) ও চিন্ময়-স্বরূপ এবং বাস্তবে জীব ও পরব্রহ্মে তেমন কোন পার্থক্য নেই। অজ্ঞান জীবের যখন প্রকৃত জ্ঞানলাভ হয়, তখনই জীবও পরব্রহ্ম হয়ে যায়। জীব ও ব্রহ্মের এই অভেদ-জ্ঞানের সাধনার পথই বেদান্তের দর্শন। বেদান্তের এই পরব্রহ্ম ভাবনা বেদের সংহিতা ও ব্রাহ্মণ অংশে পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় উপনিষদে। অতএব বেদান্ত দর্শনের প্রধান প্রমাণ উপনিষদ। উপনিষদের কয়েকটি বাক্যকে বেদান্ত “মহাবাক্য” বলে উল্লেখ করে থাকে। যেমন “অয়মাত্মা ব্রহ্ম” – এই আত্মাই ব্রহ্ম, “অহং ব্রহ্মাস্মি – আমিই ব্রহ্ম, “তত্ত্বমসি” – তুমি সেই ব্রহ্ম। এই জ্ঞান অর্জন করার জন্য শম, দম, উপরতি, তিতিক্ষা ও সমাধির অভ্যাস করতে হয়। সমাধির পর, “আমিই ব্রহ্ম” এই উপলব্ধি হয় এবং চৈতন্য-স্বরূপ জীব-আত্মা পরমাত্মায় লীন হয়ে যায়। একেই “নির্বাণ, মুক্তি বা মোক্ষ” বলে।

বেদান্তে ব্রহ্মজ্ঞানের জন্যে চারটি সাধনপথের কথা বলা হয়েছে, তাকে একত্রে সাধন চতুষ্টয় বলে, যেমন,

১. নিত্যানিত্য-বস্তু বিবেক – অর্থাৎ ব্রহ্মই নিত্য এবং অন্য সমুদয় বস্তু অনিত্য এই বিচার।

২. ইহামুত্র (ইহলোকে এবং পরলোকে) ফল-ভোগ-বিরাগ[2][4] অর্থাৎ ঐহিক ও পারলৌকিক সুখ-ভোগ-বিরাগ।

৩. শম-দমাদি সাধন-সম্পত্তি অর্থাৎ শম, দম, উপরতি (নিবৃত্তি), তিতিক্ষা (ধৈর্য), সমাধান অর্থাৎ ঈশ্বর-বিষয়ক শ্রবণাদিতে একাগ্রচিত্ততা এবং শ্রদ্ধা অর্থাৎ গুরুর উপদেশে ও বেদান্ত শাস্ত্রে অখণ্ড বিশ্বাস। শম অর্থাৎ মনকে শান্ত করা। সকল ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করা, অর্থাৎ দম বা দমন করা। সকল সকাম অর্থাৎ ফলের আশায় করা কর্ম থেকে নিবৃত্ত হওয়াই উপরতি। শীত-গ্রীষ্ম এবং যাবতীয় দুঃখ-শোক সহ্য করে ধৈর্য রাখাই তিতিক্ষা।  আর আলস্য ও মনের ভ্রান্তি দূর করে একাগ্র ও নিবিষ্ট মনে পরব্রহ্মের চিন্তনই সমাধান – অর্থাৎ সমাধি। 

৪. মোক্ষাভিলাষ অর্থাৎ মোক্ষের জন্য তীব্র আকাঙ্খা।

এই রকম জ্ঞানের অভ্যাস যাঁরা করতে পারেন না, তাঁদের জন্যে অন্য ব্যবস্থাও আছে। তাঁরা প্রথমে প্রণব অর্থাৎ ওঁ-কার অবলম্বন করে পরমাত্মার উপাসনা করবেন। মাণ্ডুক্য-উপনিষদে এই উপাসনার সবিস্তার বর্ণনা দেওয়া আছে। এই উপাসনার তাৎপর্য হল, জাগ্রৎ, স্বপন, সুষুপ্তি এই তিন অবস্থার অধিষ্ঠাতা ও সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের কারণ অদ্বিতীয়-স্বরূপ পরমাত্মাই প্রণবের প্রতিপাদ্য। অতএব যাঁরা ব্রহ্ম-জিজ্ঞাসু কিন্তু দুর্বল অধিকারী তাঁদের পক্ষে ওঁ-কার মন্ত্রের উপাসনা করাই অবশ্য কর্তব্য। ওই উপনিষদে বলা হয়েছে, প্রণব ধনুকের মতো, আর জীবাত্মা যেন তির, প্রণব উপাসনা-রূপ ধনুক থেকে জীবাত্মার তির ছুঁড়ে পরমব্রহ্ম-রূপ লক্ষ্য ভেদ করতে হবে। তির যেমন লক্ষ্যে বিদ্ধ হয়ে থাকে, জীবাত্মাও সেরকম পরমাত্মায় অধিষ্ঠিত হয়ে যায়।

বেদান্ত শাস্ত্র ব্রাহ্মণ্য ধর্মের তুলনায় কিছুটা উদারপন্থী, যাগ-যজ্ঞের অনুষ্ঠান না করলেও ব্রহ্ম-জিজ্ঞাসু ব্যক্তির ব্রহ্ম-সাধনায় পূর্ণ অধিকার ছিল। নিজের নিজের বর্ণ ও আশ্রমের ধর্মাচরণ করলে ভাল, কিন্তু না করলেও তত্ত্বজ্ঞানের ইচ্ছা হলে, যে কোন ব্যক্তি এই সাধনা করতে পারেন।

সাংখ্য, বৈশেষিক এবং ন্যায় দার্শনিকদের মনে এমন সংশয় আসে, যে ঈশ্বরই যদি সকল জীব ও মানুষের সৃষ্টি করে থাকেন, তাহলে মানুষের এমন বিভিন্ন অবস্থা হয় কেন? কেউ দুঃখী, কেউ সুখী, কেউ ধনী, কেউ দরিদ্র, কেউ চিররুগ্ন, কেউ বা স্বাস্থ্যবান। ঈশ্বর কি তবে সমদর্শী নন, তিনি কি পক্ষপাত দোষে দুষ্ট? এই সংশয় দূর করে বেদান্ত বলেছেন, ঈশ্বর নির্বিকার এবং সমদর্শী। জীব বা মানুষের অবস্থার ভেদ হয় তার নিজেরই কর্ম দোষে। পূর্ব জন্মে যে যেমন কাজ করে, পরের জন্মে সে তেমনই ফল ভোগ করে থাকে। এই প্রসঙ্গে তাঁরা ঈশ্বরকে মেঘের সঙ্গে তুলনা করেন। তাঁরা বলেন, মেঘ বৃষ্টি হয়ে নেমে ক্ষেত্রকে সরস করে, তার থেকে বিভিন্ন শস্য - যব, ধান, গম ইত্যাদি পুষ্ট হয়। এক্ষেত্রে মেঘ একই হলেও, যব, গম বা ধানের চরিত্র এক নয়, সেই কারণে তাদের পুষ্টি ভিন্ন, তাদের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন। তেমনই ঈশ্বর দেবতা, মানুষ ও অন্যান্য জীব সৃষ্টির সাধারণ কারণ, কিন্তু তাদের অবস্থা ভেদের জন্য তিনি দায়ী নন। দেবতা যে দেবতা হয়েছেন, কিংবা মানুষ যে মানুষ হয়েছে, সে সবই তাদের পূবর্জন্মের কর্মফলে। এই কারণ অসাধারণ কারণ, এর জন্যে সম্পূর্ণতঃ দায়ী দেবতা, মানুষ বা পশুরা।

এই মত অগ্রাহ্য না করে, সাংখ্য দার্শনিকেরা প্রশ্ন করতে পারেন, ঈশ্বর যখন প্রথম জীব সৃষ্টি করেছিলেন, তখন তো কোন জীবের পূর্বজন্ম-কৃত কর্মফলের গুণ বা দোষ থাকতে পারে না, তাহলে দেব, মানুষ এবং পশুদের বিভেদ হল কেন? এই সংশয়ের উত্তরে বৈদান্তিকেরা বলেন, ঈশ্বর যেমন অনাদি, তাঁর সৃষ্টিও অনাদি। ঈশ্বর অনাদি হতে পারেন, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি অনাদি হয় কী করে? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় ঈশোপনিষদের শান্তি পাঠে – “ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুচ্যতে। / পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে।। / ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ”।

(সন্ধি ভাঙলে – ওঁ পূর্ণম্‌ অদঃ পূর্ণম্‌ ইদম্‌ পূর্ণাৎ পূর্ণম্‌ উচ্যতে। / পূর্ণস্য পূর্ণম্‌ আদায় পূর্ণম্‌ এব অবশিষ্যতে।। /ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।)

অর্থাৎ ব্রহ্মাণ্ডে নিরাকার রূপে যিনি পূর্ণ, এই জগতে সাকার রূপেও তিনি পূর্ণ, পূর্ণ থেকেই পূর্ণের সৃষ্টি, পূর্ণ থেকে পূর্ণ গ্রহণ করলেও, পূর্ণই অবশিষ্ট থাকেন। হে পরমাত্মন, সকল বিঘ্নের শান্তি হোক। অর্থাৎ ব্রহ্ম এই জগতের ঊর্ধে, আবার এই জগতের সর্বত্রই তিনি ব্যাপ্ত। এই জগতের সৃষ্টি কিংবা বিনাশে তিনি কোনভাবেই প্রভাবিত হন না। [বাংলা অনুবাদ-লেখক।]

এই পূর্ণতার সংজ্ঞা যদি অসীম (Infinity) ধরা যায়, সেক্ষেত্রে অসীম থেকে অসীম নিলেও, অবশিষ্ট অসীমই থাকেন বৈকি!

 ৫.২.১ বেদান্তে ব্রহ্ম ধারণা

উপনিষদ তথা বেদান্তে পরমপুরুষ ব্রহ্মের স্বরূপ কি, তার আভাস মেলে ছান্দোগ্য উপনিষদের ষষ্ঠ অধ্যায়ের ত্রয়োদশ খণ্ডের দুটি শ্লোকে। ব্রহ্ম বিষয়ে এই আলোচনা করছেন ঋষি আরুণি ও তাঁর পুত্র শ্বেতকেতু[3]। 

(পিতা) – “এই লবণ জলে ফেলে প্রাতঃকালে আমার কাছে এস”। শ্বেতকেতু তাই করলেন।

পিতা তাঁকে বললেন, “বৎস, (গত) রাত্রে যে লবণ জলে ফেলেছিলে, সেটি নিয়ে এস”। তিনি (শ্বেতকেতু) লবণের অনুসন্ধান করেও পেলেন না, যদিও সেটি জলেই বিলীন হয়ে বিদ্যমান ছিল।

(পিতা) – “বৎস, এই জলের উপরিভাগ থেকে আচমন কর; কেমন বোধ হচ্ছে?”। “লবণাক্ত”।

“মধ্যভাগ থেকে আচমন কর; কেমন বোধ হচ্ছে?” “লবণাক্ত”।

“অধোভাগ থেকে আচমন কর; কেমন বোধ হচ্ছে?” “লবণাক্ত”।

“এই জল ফেলে দিয়ে আমার কাছে এসে বস”। শ্বেতকেতু তখন তাই করলেন, (এবং) “ওই লবণ সর্বদাই বিদ্যমান ছিল”, (এই কথা বলতে বলতে ফিরে এলেন)।

পিতা তাঁকে বললেন, “এই জলের মধ্যে বিদ্যমান থাকলেও যেমন তুমি লবণকে দেখেতে পেলে না, তেমনি হে সৌম্য, এই দেহমধ্যেই সৎ (ব্রহ্ম) বিদ্যমান আছেন”। (ছান্দোগ্য/৬/১৩/১,২) [স্বামী গম্ভীরানন্দ সম্পাদিত উপনিষদ্‌ গ্রন্থাবলী – দ্বিতীয় খণ্ড (ছান্দোগ্যপনিষদ্‌) (উদ্বোধন কার্যালয়) থেকে সহজ বাংলায় অনুবাদ - লেখক।]



[1] ভারতীয় দর্শনে সত্য বা সৎ বলতে truth বা honest বোঝায় না, সৎ কথার অর্থ that who exists – অতএব সৎ এবং সত্য বলতে শাশ্বত, চিরন্তন বা চিরস্থায়ী। এবং অসৎ মানে নশ্বর, অস্থায়ী ইত্যাদি।  

[2] ইহামুত্রফলভোগবিরাগঃ” – বেদান্তসার।

[3] এই শ্বেতকেতু ও তাঁর পিতা  আরুণি বা উদ্দালকের কথা আমরা আগেই জেনেছি ২.৫.৩ অধ্যায়ে – এই শ্বেতকেতুই আর্য সমাজে নারীপুরুষের যথেচ্ছ মিলনের অবসান ঘটিয়ে, বিবাহ প্রথার প্রচলন করেছিলেন।  

পরের পর্ব - " ধর্মাধর্ম - ৫/৫ "

নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৫/৫

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম তৃত...