এই সূত্রে - " ঈশোপনিষদ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "
এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ "
বাদরায়ণপুত্র শ্রীশুক
বললেন, “মহারাজ, এই মহাপুরাণে সর্গ, বিসর্গ, স্থান, পোষণ, ঊতি, মন্বন্তরসমূহ,
ঈশকথা, নিরোধ, মুক্তি ও আশ্রয় এই দশ রকমের বিষয় বর্ণিত হয়েছে। এই দশটি বস্তুর
মধ্যে দশম বস্তুটিই সর্ব প্রধান। এই বস্তুর তত্ত্বজ্ঞানের জন্য মহাজন অন্য নয়টির
বর্ণনা করে থাকেন।
[মহাভারত ও চার বেদের সংকলক মহর্ষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাসের আরেকটি নাম বাদরায়ণ, তাঁর পুত্র মহর্ষি শুকদেব।]
পরব্রহ্ম থেকে প্রকৃতির তিনগুণের
বৈষম্য হয়ে মহত্তত্ত্ব, অহংকারতত্ত্ব, শব্দ ইত্যাদি পঞ্চ তন্মাত্র, আকাশ প্রভৃতি
মহাভূত ও ইন্দ্রিয়সকল সৃষ্টি হয় এবং তারপর বিরাট অর্থাৎ ব্রহ্মাণ্ড দেহ নির্মাণ
করে, এই দুই ধরনের সৃষ্টিকে সর্গ বলে। বৈরাজপুরুষ অর্থাৎ ব্রহ্ম থেকে যে চরাচর
সৃষ্টি হয় তাকে বিসর্গ বলে। বৈকুণ্ঠ অর্থাৎ ভগবান জীবের দুঃখহরণ করে, তাদের পালন
করেন, তাকে স্থান বলে। এই ভাবে পালিত জীবগণের মধ্যে, তিনি নিজের ভক্তদের প্রতি যে
কৃপা দেখান, তাকে পোষণ বলে। কর্ম থেকে যে বাসনার সৃষ্টি হয়, সেই বাসনাকে ঊতি বলে।
মন্বন্তরের অধপতিদের যে ধর্ম, তাকে মন্বন্তর বলে। নানা উপাখ্যানে শ্রীহরি ও তাঁর
ভক্তদের যে চরিত্র বর্ণনা করা হয়, তাকে ঈশকথা বলে। প্রলয়কালে শ্রীহরি যোগনিদ্রায়
অবস্থা করলে, জীবগণ নিজ নিজ শক্তি নিয়ে তাঁর মধ্যে লয় হয়ে যায়, সে লয়কে নিরোধ বলে।
জীব অবিদ্যার বশে নিজের মধ্যে কর্তৃত্ব আরোপ করে থাকে; যখন সেই জীব নিজের ভ্রান্ত
ধারণা ত্যাগ করে ব্রহ্মস্বরূপে অবস্থান করে, তখন সেই অবস্থাকে মুক্তি বলে। যাঁর
থেকে এই নিখিল বিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় হয়, তিনিই দশম পদার্থ – আশ্রয়;
শাস্ত্রে তিনিই ব্রহ্ম ও পরমাত্মা বলে বর্ণিত হন।
যে জীব চক্ষু ইত্যাদিকে আমার
ইন্দ্রিয় মনে করেন, তাঁকে আধ্যাত্মিক পুরুষ বলে এবং সূর্য প্রমুখ যে সকল দেবতা ওই
ইন্দ্রিয়সকলের অধিষ্ঠাতা অর্থাৎ যাঁদের শক্তিতে ইন্দ্রিয় কর্ম করতে পারে, তাঁদের
আধিদৈবিক পুরুষ বলে। যিনি আধ্যাত্মিক তিনিই আধিদৈবিক পুরুষ; কারণ উভয়েই একই
উপাদানে নির্মিত। যে দেহতে সকল ইন্দ্রিয় ও তাদের অধিষ্ঠাতা দেবতারা অবস্থান করে,
দুই প্রকার বিভাগ সৃষ্টি হয়েছে, সেই দেহকে আধিভৌতিক পুরুষ বলে। এই তিন পুরুষ কেউই
আত্মা নয়, কারণ তারা পরষ্পরনির্ভর; একটির অভাবে অন্যটির অস্তিত্ব বোধ করা যায় না।
দৃশ্য পদার্থ দেখা গেলে অনুমান করা যায় চক্ষু নামক একটি ইন্দ্রিয় আছে এবং দর্শন
কর্তা একজন জীব আছে। একইভাবে দর্শনের প্রবৃত্তিদাতা একজন দেবতাও আছেন অনুমান করা
যায়। কিন্তু যিনি এই তিনের সাক্ষীরূপে অবস্থান করছেন, তিনিই পরমাত্মা, তিনিই দশম
পদার্থ আশ্রয় বলে অভিহিত হয়েছেন। তিনি একইসঙ্গে তিনটি বিষয়ের উপলব্ধি করতে পারেন,
কিন্তু ওই তিন বিষয়ের উপর তাঁর অস্তিত্ব নির্ভর করে না। এই কারণে তিনিই স্বতন্ত্র
ভাবে নিখিল বিশ্বের আশ্রয়, সুতরাং তিনিই নিত্য সত্য; আর যা কিছু সমস্তই মায়াময়
অনিত্য।
মহাপ্রলয়ে সমস্ত জীব প্রকৃতিতে
এবং প্রকৃতি পরব্রহ্মে লীন থাকেন। যখন ব্রহ্মে সৃষ্টি করার ইচ্ছা হয়, তিনি
প্রকৃতিতে ঈক্ষণ করেন অর্থাৎ তাঁর ইচ্ছায় প্রকৃতিতে চাঞ্চল্য উপস্থিত হয় এবং তিন
গুণের বৈষম্য ঘটে যায়। এইভাবে যিনি প্রকৃতিকে সংক্ষুব্ধ করেন, তাঁকে প্রথম
পুরুষাবতার বলে। সংক্ষুব্ধ প্রকৃতিতে প্রথমতঃ মহত্তত্ত্বের আবির্ভাবে প্রকৃতি
অণ্ডের আকার গ্রহণ করে, পুরুষ সেই অণ্ডের মধ্যে প্রবেশ করে অন্তর্যামীরূপে অবস্থান
করেন। তারপর সেই অণ্ডকে দুইভাগে বিভক্ত করে, অর্ধেক অংশ শুদ্ধ জলে পূর্ণ করেন,
অর্থাৎ আগেকার মহত্তত্ত্ব থেকে অহংকারতত্ত্ব এবং পৃথিবীতত্ত্ব পর্যন্ত সমস্ত
তত্ত্ব প্রকাশ করেন। ঐ সকল তত্ত্বের মহাসমষ্টিকে কারণ অর্ণব বলে। তারপর সেই পুরুষ
ওই সকল তত্ত্বের কিছু কিছু পরিমাণ নিয়ে নিজের ইচ্ছাশক্তির প্রভাবে মিশ্রণ করে
বিভিন্ন উপাদান নির্মাণ করেন। সেই উপাদান দিয়েই তিনি হিরণ্ময় ব্রহ্মাণ্ড তৈরি
করেন। এই বার সেই হিরণ্ময় ব্রহ্মাণ্ড নিজের জঠরে রেখে তিনি কারণ অর্ণবে সহস্রবছর
যোগনিদ্রায় অবস্থান করেন, অর্থাৎ এই ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির পর বহুদিন সৃষ্টির কাজ
স্থগিত হয়ে থাকে। ঐ আদি পুরুষের আরেকটি নাম নর, তাঁর থেকেই ওই কারণবারির সৃষ্টি
হওয়ায় ঐ কারণবারির আরেকটি নাম নারা। ভগবান ওই নারা আশ্রয় করে যোগনিদ্রায় শুয়ে
থাকেন বলেই, তাঁর অন্য আর এক নাম নারায়ণ। এই নারায়ণ দ্বিতীয় পুরুষাবতার এবং এই
পুরুষের প্রভাব অচিন্ত্য। এঁনার অনুগ্রহেই সকল উপাদান, কর্ম, কাল, স্বভাব ও জীব
কার্য করার ক্ষমতা পায় এবং ইনি অপেক্ষা করলেই সকলে অক্ষম হয়ে পড়ে।
তারপর যোগনিদ্রার অবসানে, নারায়ণ
নিজের মায়াশক্তির প্রভাবে, হিরণ্ময় অণ্ডকে অধিদেব, অধ্যাত্ম ও অধিভূত এই তিন ভাগে
বিভক্ত করে থাকেন। নারায়ণের ক্রিয়াশক্তিতে তাঁর হৃদয়রূপ আকাশ থেকে ইন্দ্রিয়শক্তি,
মনঃশক্তি ও দেহশক্তির আবির্ভাব ঘটে এবং তাঁর ক্রিয়াশক্তি থেকে সূক্ষ্ম মহাপ্রাণের
প্রকাশ হয়। এই প্রাণকেই সূত্র বলে। ভৃত্য যেমন সর্বদা রাজার অনুসরণ করে, তেমনই এই
প্রাণ ক্রিয়াশীল হলে সকল ইন্দ্রিয় ক্রিয়াশীল হয় এবং প্রাণ ক্রিয়া থেকে বিরত হলে,
তারাও বিরতি লাভ করে। প্রাণ সঞ্চালন ক্রিয়া শুরু করলে, পুরুষের অন্তরে ক্ষুধা ও
তৃষ্ণার সৃষ্টি হয়, তখন পুরুষের ভোজন ও পান করার ইচ্ছা হয় এবং মুখ প্রকাশিত হয়।
তারপর মুখ থেকে অধিষ্ঠান তালু, ইন্দ্রিয় জিভ, বিষয়
নানা রস ও দেবতা বরুণ আবির্ভূত হন। এদের মধ্যে অধিষ্ঠান ও বিষয় অর্থাৎ তালু ও
নানান স্বাদের রসকে অধিভূত, ইন্দ্রিয় অর্থাৎ জিভকে অধ্যাত্ম এবং দেবতা অর্থাৎ
বরুণকে অধিদৈব বলা হয়। তিনি বাক্য উচ্চারণ করতে চাইলে, তাঁর মুখ থেকে অগ্নি ও
বাক্যের ইন্দ্রিয় এবং এই উভয় থেকে বাক্য উচ্চারণ ক্রিয়া আবির্ভূত হয়। এই ভাবেই
প্রাণবায়ুর চাঞ্চল্যে সমস্ত ইন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠান, তাদের ক্রিয়া, বিষয় এবং দেবতাদের
ধীরে ধীরে আবির্ভাব হতে থাকে”।
শ্রীশুকদেব বললেন, “হে রাজন
আপনাকে অধিদৈবদের কথা বললাম, এখন আমি তাদের অংশ ধাতু প্রভৃতির স্বরূপ বলছি, শুনুন।
স্থূল ও সূক্ষ্ম চর্ম, মাংস, রুধির, মেদ, মজ্জা ও অস্থি এই সাতটি ধাতু ভূমি, অপ ও
তেজ থেকে উৎপন্ন এবং প্রাণ আকাশ, জল ও বায়ুময়। রূপ ইত্যাদি গুণ থেকে চোখ ইত্যাদি
ইন্দ্রিয়ের সৃষ্টি, এই কারণেই বিষয়ের দিকে আকৃষ্ট হওয়ায় এদের স্বভাব। এই গুণসমূহ
অহংকার তত্ত্ব থেকে উৎপন্ন হয়। এই কারণে বস্তুতঃ সুন্দর না হলেও, অহংকারের বশে
বিষয়কে সুন্দর বলে ভ্রম হয়। মন হর্ষ, দুঃখ
ইত্যাদি সকল প্রকার বিকারের আত্মা অর্থাৎ স্বরূপ এবং বিবেকশক্তিকেই বুদ্ধি বলা হয়।
মহারাজ, আপনার কাছে ভগবানের এই
স্থূল রূপ বর্ণনা করলাম। এই স্থূল সমষ্টি পৃথিবী, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম,
অহংকারতত্ত্ব, মহত্তত্ত্ব ও প্রকৃতি এই আটটি আবরণে আবৃত। এছাড়া ভগবানের আর একটি
অতি সূক্ষ্ম রূপ আছে, যা বাক্য ও মনের অতীত। এই রূপ যেহেতু বর্ণ এবং আকারহীন, সেহেতু
স্থূল রূপের মতো এর উৎপত্তি, স্থিতি ও লয় নেই। এই রূপ অব্যক্ত হওয়ায় অতীন্দ্রিয়
অর্থাৎ ইন্দ্রিয় দিয়ে এই রূপকে অনুভব করা যায় না। ভগবানের এই উভয় রূপই মায়া দিয়ে
তৈরি, সেই কারণে জ্ঞানীরা এই দুই রূপকে সত্য বলে স্বীকার করেন না। আগে যে
মহত্তত্ত্বের কথা বলেছি, সেই তত্ত্বের সৃষ্টিকর্তা ভগবান ব্রহ্মা হয়ে নাম, রূপ ও
ক্রিয়া সৃষ্টি করেন। তিনি বাস্তবে কর্মহীন হলেও মায়ায় কর্মযুক্ত হন। ব্রহ্মা
আবির্ভূত হয়ে প্রজাপতি, মনু, দেবতা, ঋষি, পিতৃগণ, সিদ্ধ, চারণ, গন্ধর্ব, বিদ্যাধর,
অসুর, গুহ্যক, কিন্নর, অপ্সরা, নাগ, সর্প, কিংপুরুষ, নর, মাতৃগণ, রক্ষঃ, পিশাচ,
ভূত, প্রেত, বিনায়ক, কুষ্মাণ্ড, উন্মাদ, বেতাল, যাতুধান, গ্রহ, মৃগ, খগ, পশু,
বৃক্ষ, গিরি ও সরীসৃপ সকলের সৃষ্টি করে থাকেন। তিনি প্রাণিসমূহকে স্থাবর ও জঙ্গম
এই দুই ভাগে এবং জলচর, স্থলচর ও খেচর প্রাণিদের জরায়ুজ, অণ্ডজ, স্বেদজ ও উদ্ভিজ্জ
এই চারভাগে বিভক্ত করে সৃষ্টি করে থাকেন। এইভাবে বিবিধ সৃষ্টির হেতু এই যে, যে
যেমন কর্ম আচরণ করে, সে সেইরকম গতি পেয়ে থাকে। পুণ্যফলে উত্তম, পাপফলে অধম ও মিশ্র
কর্মের ফলে মিশ্র গতি লাভ হয়।
সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই তিন গুণই
সুর, নর ও নারকীয় গতি প্রাপ্তির কারণ। এই তিনটি গুণ অপর দুই গুণের সঙ্গে মিশ্রিত
থাকায়, তাদের তারতম্য অনুসারে তিনটি গুণ প্রত্যেক তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে নয় প্রকারের
গতির সৃষ্টি করে থাকে। এইভাবে রজোগুণী মানুষ সত্ত্বগুণের আধিক্যে ব্রাহ্মণত্ব এবং
তমোগুণের আধিক্যে শূদ্রত্ব পেয়ে থাকে। তির্যক, নর ও সুরগণের মধ্যে, ভগবান অবতাররূপে
বারবার অবতীর্ণ হয়ে ধর্মরূপে বিশ্বের পালন করেন। তারপর প্রলয়ের সময় উপস্থিত হলে,
বায়ু যেমন মেঘসমূহকে সংহার করে, কালাগ্নি রুদ্ররূপে ভগবান নিজের সৃষ্টিকেই বিনাশ
করেন।
হে রাজন, আপনার কাছে এই মহাকল্প
ও খণ্ডকল্পের বিষয় সংক্ষেপে বর্ণনা করলাম। মহাকল্পে মহত্তত্ত্ব ইত্যাদি সৃষ্টি ও খণ্ডকল্পে স্থাবর ইত্যাদি সৃষ্টি হয়ে
থাকে। সমস্ত মহাকল্প ও খণ্ডকল্পের এটাই সাধারণ নিয়ম। কালের স্থূল ও সূক্ষ্ম পরিমাণ
এবং কল্পের লক্ষণ ও মন্বন্তর ইত্যাদি বিভাগ আপনাকে পরে সবিস্তারে বলব, এখন পাদ্মকল্পের
বিবরণ শুনুন”।
শ্রীশৌণক বললেন, “হে সূত, আপনি
বলেছিলেন, ভক্তশ্রেষ্ঠ বিদুর বন্ধু, পরিজন ত্যাগ করে পৃথিবীতে নানান তীর্থে ভ্রমণ
করেছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে মৈত্রেয় মুনির আত্মজ্ঞান বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। বিদুরের
সঙ্গে তাঁর কী কী কথা হয়েছিল, বন্ধুদের ছেড়ে বিদুর যেভাবে তীর্থ ভ্রমণ করলেন এবং
পরে আবার ফিরে এলেন, সেই সকল কথা আমাদের বর্ণনা করুন”।
শ্রীসূত বললেন, “আপনারা যেমন জিজ্ঞাসা করলেন, মহারাজ পরীক্ষিতও শ্রীশুকদেবকে একই কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন। বিদুর ও মৈত্রেয়র আলোচনা নিয়ে শ্রীশুকদেব রাজাকে যা যা উত্তর দিয়েছিলেন, আমিও আপনাকে সেই ভাবেই বলছি শুনুন”।