রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬

মহীরূহ

 বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক

    


এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২ " 

এর আগের বড়োদের গল্প - " অপর্ণা "


 

সে এক বিশাল বটগাছ। বিশাল বেড়ের গুঁড়ি মাঝখানে। অনেকটা জায়গা জুড়ে চারপাশে অজস্র ঝুড়ি নামিয়ে বেশ সবল অধিষ্ঠান। মাথার ওপর সতেজ পাতার নিটোল আচ্ছাদন। জ্বলন্ত গ্রীষ্মেও স্নিগ্ধ ছায়ার অনাবিল আশ্বাস। আশ্রিত পক্ষিকূলের কলকাকলিতে প্রাণবন্ত সারাটাদিন।

পরশের মনে হয় এমন একটা গাছ আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই থাকা দরকার কাছে হোক বা দূরে। কিছুটা বিশ্রাম, কিছুটা শান্তির জন্যে। নিরাপদে, নিশ্চিন্তে দু’দণ্ড বসার জন্যে, বসে ভাবার জন্যে। আর সবচেয়ে বেশী দরকার নিজেকে খুঁজে পাওয়ার জন্যে। যেখানে বার বার এক দৌড়ে পৌঁছে যাওয়া যাবে অল্প আয়াসে। চোর চোর খেলায় বার বার বুড়ি ছুঁয়ে ফেলার মতো।

এমন একটা গাছ সত্যিই ছিল। আজও হয়তো আছে স্বমহিমায়। সেখানে যেতেই হবে একদিন। পথ যদিও আগের চেয়ে সুগম হয়েছে। তবু মনে হয় অনেক দূরের সে পথ, এ জীবনে পার হওয়া সম্ভব হবে না আর। তবু চেষ্টা করে যেতে হবে বারবার। অন্ততঃ আরেকবার সেই গাছটার কাছে পৌঁছে যেতে চায় পরশ। সে উপলব্ধি করে যেদিন পৌঁছে যাবে সেদিন সেও গাছই হয়ে যাবে। সুদীর্ঘ কালের নীরব এবং নিরপেক্ষ সাক্ষী হয়ে সে তাকিয়ে থাকবে কখনো মাটির দিকে কখনো আকাশের দিকে। 

 

পরশের দেশের বাড়ি খুব দূর নয় কলকাতা থেকে। ভোরে হাওড়া থেকে ট্রেন। স্টেসনে নেমে বাস। সওয়া নটা নাগাদ বাস থেকে নেমে বাসস্টপের পাশেই নারাণ ময়রার দোকানে মন্ডা আর রসগোল্লা খেয়ে পথচলা শুরু। বাসস্টপ থেকে একটু এগোলেই বড় একটা গ্রাম একটা মসজিদ, দুটো মন্দিরের পাশ কাটিয়ে...।

বাবার যে একটা ডাকনাম আছে সেটা প্রায় ভুলেই গেছিল পরশ। বাড়িতে বাবার পরিচিত যাঁরা আসেন পাড়ার বা অফিসের কলিগ, সকলেই জীবনবাবু বা জীবনদা ডাকেন। বাবা সবার বড় বলে কাকা ও পিসিমারা ডাকেন বড়দা। দিদিমা, বড়মামা ডাকেন জীবন বলে, বাকিরা সবাই ছোট তাই জামাইবাবু। একমাত্র ঠাকুমা ডাকতেন মান্তু বলে। দাদুকে পরশ দেখেনি, আর ঠাকুমাও চলে গেলেন বেশ কবছর হল। কাজেই বাবার ডাকনামটা প্রায় ভুলতেই বসেছিল।

পথে বাবার পরিচিত নানা বয়সের মানুষজনের সঙ্গে কথাবার্তা হচ্ছিল। চলছিল প্রণাম দেওয়া এবং নেওয়া। কখনো বা আলিঙ্গন। সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণ। পাশে থেকে পরশ দেখছিল, শুনছিল। বাবাও যে কোনসময় ছোট ছিলেন, স্কুলে গেছেন, দৌরাত্ম্য করেছেন স্কুলে, পাড়ায়, গ্রামে। কানমলা, গাঁট্টা খাওয়ার মতো অপরাধ যে বাবাও কোনদিন করতে পারেন, এটা কোনদিন মনেই হয়নি পরশের। এইসব গ্রামগুলির মাঠে ঘাটে রাস্তার ধুলোয়, পুকুরের জলে তার ছোট্ট বাবার বড়ো হয়ে ওঠার কাহিনী মিশে আছে। বাস্তবিক এখানে না এলে, পরশের কাছে এইসব অভিনব সংবাদ অধরা থেকে যেত চিরদিন।

গ্রামটা পার হয়ে বেশ কিছুটা আবাদি জমি। তারপর ডাঙা জমির ওপর সেই বটগাছটা। অনেক দূর থেকেই চোখে পড়ে। পড়বেই না পড়ে উপায় নেই, এমনই অমোঘ তার উপস্থিতি।

এই গাছটার নীচে আয় একটু বসি

আর কদ্দুর বাবা, এখান থেকে?

অনেকখানি, ধর যতটা এলাম এতক্ষণ, ততটাই হবে প্রায়। সামনের এই মাঠটা পার হয়ে, ওই যে অনেক গাছপালা ওইটে আমাদের গ্রাম

পরশ দূরের দিকে তাকিয়ে আন্দাজ করার চেষ্টা করে দূরত্বটা।

এই গাছটা আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখছি। একইরকম বিশাল। যে গ্রামটা পার হয়ে এইমাত্র এলাম ওখানেই আমরা পড়তে আসতাম। পাঠশালা থেকে ফেরার পথে এইখানে হয়ে যেতাম

কি করতে এখানে?

তোরা কি করিস স্কুল ছুটির পর। বাবার চোখে দুষ্টু দুষ্টু মজার আলো।

খেলি

আমরাও খেলতাম। তোদের স্কুলে ছোটদের জন্যে দোলনা, সি-স, বানিয়ে রাখা আছে। আমাদের ছোটবেলায় এটাই আমাদের খেলার জায়গা ছিল। ঝুলে থাকা এই ঝুড়ি থেকে ঝুলতাম দুলতাম। হাত পা ছড়ে যেত। বাড়িতে ধরা পড়লে মা পেটাত খুব। বলত দস্যি ছেলে কোনদিন পড়ে গিয়ে হাত-পা ভাঙবি যে

ঠাকুমা মারত তোমাকে? দেখে তো মনে হয়নি কোনদিন। আমাদের তো কোনদিন বকেছেন বলেও মনে পড়ে না

তোরা তো নাতি। তোদেরকে তো ভালবাসবেই। আমাদের এদিকে, একটা কথা আছে, “টাকার চেয়ে সুদ মিষ্টি”। আমাদের মায়ের কাছে আমরা হলাম যেন টাকা, আর তোরা হচ্ছিস সুদ। অনেক কষ্টে, অনেক যত্নে ছেলেমেয়েদের সুস্থভাবে বড়ো করে তোলার পরেই না আসে সুদ, অতএব তার মিষ্টত্ব স্বাভাবিক। তাছাড়া বয়েস হলে মানুষ অনেক শান্ত হয়ে যায় না? আমি, তোর মা তোকে কম পিটিয়েছি ছোটবেলায়। বাবা লাজুক হাসেন। দেখবি, তোর যখন ছেলেমেয়ে হবে, ভীষণ ভীষণ আদর করব। তোরা শাসন করতে গেলে, মারধোর করতে গেলে, দেখবি বাধা দেব। উপদেশ দেব বাচ্চারা অমন একটু-আধটু করতেই পারে

 বাবার চোখের দৃষ্টি ভীষণ নরম আর মায়াময়। এই বটগাছের মতোই যেন। ভীষণ স্নিগ্ধ ছায়াঘেরা।

 এতটা পথ হেঁটে আসতে কষ্ট হয়নি তো তোর? এই গরমে

নাঃ, কষ্ট হয়নি, বাবা

তোদের তো অব্যেস নেই

তোমার যেন আছে। তুমিও তো কলকাতাতে ট্রাম বাস ট্যাক্সিতেই অভ্যস্ত বহুকাল

তা ঠিক। তবে কি জানিস, আমাদের বনেদটা তৈরি হয়েছিল এই কষ্ট দিয়েই। নাঃ, ভুল বললাম। তখনকার দিনে এগুলোকে কেউ কষ্ট বলে ভাবতাম না। ভাবনা তো দূরের কথা, মাথাতেই আসত না। এছাড়া যে অন্য কিছু হওয়া সম্ভব, সেই চেতনাটাই ছিল না যে! পাঠশালা ছেড়ে আমরা যে হাইস্কুলে পড়তাম, সেটা এই তল্লাটের একমাত্র হাইস্কুল। আমাদের গ্রাম থেকে মাইল পাঁচেক দূরে। রোজ সাইকেলে যেতাম। সবাই, সে যত ধনীই হোক বা দরিদ্র, একই ভাবে রোজ মাইল দশেক প্রায় সাইকেল চালাতাম। কিন্তু সত্যিকার কষ্টটা হত বর্ষাকালে। যখন মাঠ ঘাট প্রায়ই ডুবে থাকত জলে, আর মাঝে মাঝে বান আসত নদীতে। তখন তো আর সাইকেল চলবে না, পায়ে হাঁটা ছাড়া উপায় কি?

কিছুক্ষণ থেমে বাবা আবার বললেন, “আমরা গেছি, আমাদের আগেও বাবা কাকারা গেছেন, আমাদের পরেও বহুদিন চলেছে এইভাবে। স্কুল থেকে ফিরে মাঠে দৌড়িদৌড়ি করেছি বল নিয়ে। এই ভাবেই যুগ যুগ ধরে চলে আসছিল আমাদের সেই জীবনযাত্রা। একসঙ্গে যাওয়া আসা করতাম এক গাঁয়ের ছেলেরা। ফাজলামি, পেছনে লাগা, মাঝে মাঝে বদমায়েসি সবই ঘটত চলার পথেই। সবার অলক্ষ্যে গড়ে উঠত এক একটা সম্পর্ক। অনেককে মেনে নেওয়ার, অনেকের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দেওয়ার এক অদ্ভূত সম্পর্ক গড়ে উঠত এই নিত্য পথ চলায়

আমরা যারা শহরে থাকি, আরামে যাওয়া আসা করি, আমরা কি এই সম্পর্কটা মিস করি?

ডেফিনিটলি। ক্লাসে কতটুকু সময় পাস বন্ধুত্ব করার - টিফিনের সময়টুকু ছাড়া? স্কুল ছুটি হলেই সবাই বেরিয়ে পড়িস কেউ স্কুল বাসে, কেউ ভাড়ার গাড়ি, কেউ নিজের গাড়ি। কেউ কেউ ট্রামে, বাসে বা পায়ে হেঁটে। যাই বলিস আমরা যে স্মৃতি বয়ে চলেছি তোরা তার ভগ্নাংশও কল্পনা করতে পারবি না। সব স্মৃতিই আনন্দের বা সুখের নয়। স্মৃতিও গাছের মতোই। কেউ ফল দেয়, ফুল দেয়। কেউ কাঁটা দেয়। কেউ কিচ্ছু দেয় না দেয় শুধু শান্তি। এই বটগাছটার মতো

 বাবা চুপ করে গিয়েছিলেন। চোখ বন্ধ। মনে হয় গভীর কোন চিন্তায় মগ্ন। পরশ কলকাতায় বাবাকে এত কথা বলতে শোনেনি কোনদিন। বাবা বরাবরই গম্ভীর এবং বাংলা সিনেমার বাবাদের মতো ভয়ংকর না হলেও, সমীহ কাড়া দূরত্ব বজায় রাখতেন সবসময়েই। 

এই গ্রাম, এই মহীরুহ বট, দীর্ঘ অদর্শনের পর এত পরিচিত জন, বাবাকে বিচলিত করেছে। হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো ফিরে আসছে চোখের সামনে ফ্ল্যাশব্যাক হয়ে, আবেগে ভাসিয়ে দিয়ে।

অনেকক্ষণ পর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাবা তাকালেন, মুখে লাজুক হাসি, বললেন, তোদের ভাষায় বললে, বোর হলি তো?

নাঃ, একদম না। পরশ হাসে। বরং ভীষণ ভাল লাগছে। আসার সময় বহুদূর থেকে এই জায়গাটা দেখে সত্যি দারুণ লাগছিল। চারিদিকে বহুদূর বিস্তৃত মাঠ, জমি, আশেপাশে কিছু এলেবেলে তালগাছ। তার মধ্যে এই গাছটির সুপ্রাচীন অস্তিত্ত্ব। নিমেষে মন ভাল হয়ে গেল। কিন্তু এতক্ষণ বসার পর মনে হচ্ছে এই গাছটার বোধহয় কোন জাদু আছে। অনেস্টলি বাবা, এখানে না এলে, তোমাকে এভাবে হয়তো চিনতামই না। তোমাকে এত কথা আমি অন্ততঃ কোনদিন বলতে শুনিনি। অনেক না বলা কথা তোমার ভেতরে জমা ছিল। আজ তুমি প্রকাশ করলে। তুমি আজ যখন বলছিলে বাবা, আমার চোখের সামনে থেকে পর্দাটা যেন সরে গেল। তোমাদের সেই শান্ত নিস্তরঙ্গ ফেলে আসা দিনগুলো যেন ফুটে উঠল চোখের সামনে। রিয়েলি, এই গাছটা জাস্ট গাছ নয়, যেন যেন - কি বলব যেন একটা ব্যক্তিত্ত্ব। বাবা মুচকি মুচকি হাসছিলেন।

লজ্জা পেয়ে পরশ বলে, হেসো না, বাবা। আমার মনে হল তাই বলে ফেললাম, ব্যস

হাসছিলাম তোর কথা শুনে নয়” – হাসি মুখেই বাবা বললেন ভাল লাগল তোর ফিলিংসটা। বুঝলাম আমার ছেলে হিসেবে তুই খুব একটা খারাপ নোস

দেখলে তো বাবা, তোমার রবি ঠাকুরের ভাষায়, এতদিন আমাদের চেনাশোনা ছিল, আজ থেকে জানাশোনা-র সূত্রপাত হল পরশের মুখে ফাজিল হাসি।

তোর মুখে রবীন্দ্রনাথ! কবে পড়লি শেষের কবিতা’”?

না না অতোটা আশাবাদী হয়ো না, ক্যাসেটটা শুনছিলাম একদিন

পড়িস, সুযোগ পেলেই পড়িস। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া জীবনটাকে চিনতে বেশ অসুবিধে হয়

অ্যাই, তোমার আবার শুরু হল। রবি ঠাকুরে অবসেসন তোমার আর পাল্টাবার নয়

কি এমন ঘটল যে - যার জন্যে অন্তুতঃ এই বিষয়ে নিজেকে পাল্টে ফেলতে হবে!

তোমার ঘটেনি, কিন্তু আমার ঘটেছে। গম্ভীর মুখে পরশ ব্যক্ত করে।

কি? বাবার চোখে বিস্ময়।

এতদিন তোমার গাম্ভীর্যের ধাক্কায় তোমাকে ওরে বাব্বা ভাবতাম। আজ থেকে শুধু বাবা - খুব ভালোবাসার প্রিয়জন বাবা ভাবব

এতটা ম্যাচিওরড হয়ে গেছিস তুই, বুঝিনি তো!

একটু পরে বললেন, নে ওঠ, এখনো অনেকটা পথ যেতে হবে 

 

অনেকটা পথ যেতে হবে। তাই আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বের হল পরশ। তার গন্তব্য অনেকটাই দূর - জোকা পার হয়েও বেশ কিছুটা। রাজারহাট থেকে তিনটে নাগাদ বেরিয়েও ফোর্থ ফেজ-এর গেট অব্দি পৌঁছতে প্রায় পাঁচটা বাজিয়ে ফেলল পরশ। পার্কিংয়ে গাড়ি লক করতে করতে লক্ষ্য করল বাবা বারান্দায় বসে আছেন। পরশ হাত নাড়ল। বাবা কোন রেসপন্স করলেন না। হয়তো খেয়াল করেননি। আজ তো তার আসার কথা ছিল না, কাজেই পথ চেয়ে প্রতীক্ষায় থাকবেন এমনটাও নয়।

একটু দূর পরে বটে, কিন্তু বেশ ভাল এই হোমটা। অনেকটা জায়গা জুড়ে ক্যাম্পাস। বাড়িটাও বেশ বড়। অনেক গাছপালা, বড় বাগান, সুন্দর সাজানো। ব্যবস্থাপত্রও ভালোই। পরশ এদিক ওদিক অন্যান্য বৃদ্ধাবাস সম্পর্কে যা শুনেছে, তার তুলনায় এটা ওয়েল ম্যানেজড আর ওয়েল মেন্টেন্ড।

নীচের কাউন্টারের রেজিস্টারে নাম ধাম লিখে পরশ জোড়া জোড়া সিঁড়ি পার হয়ে দোতলায় উঠল। লম্বা করিডর ও দীর্ঘ বারান্দা পার হয়ে বাবার পিছনে দাঁড়াল পরশ। বাবা একই ভাবে বসে আছেন সামনের বড় গাছটার দিকে তাকিয়ে। পরশ গাছ-টাছ তেমন চেনে না, তবে গাছটা ঋজু, সুঠাম আর শাখাপ্রশাখা সমেত বেশ ঝাঁকালো জম্পেশ গাছ। বাবা সেটার দিকেই নিবিষ্ট তাকিয়ে আছেন।

 বাবা, কেমন আছ? খুব নরম গলায় ডাকতে পারল পরশ। বাবা কোনমতেই যেন চমকে না ওঠেন। অথবা বাবার এই নিবিড় একাকিত্বটুকু ভাঙতে তার যেন দ্বিধা।

ঘরে চেয়ার আছে, টেনে নিয়ে বোস। বাবা নির্দেশ দিলেন। ঘাড় ঘোরালেন না। মাথা তুললেন না। একইভাবে বসে রইলেন সামনের দিকে চেয়ে। পরশ বাবার ঘর থেকে চেয়ার এনে বাবার পাশে বসল।

কেমন আছ, বললে না তো?

তোরা কেমন আছিস। বৌমা, ঊশ্রী। ভাল আছে সবাই?

হ্যাঁ, সবাই ভাল আছে

ঊশ্রীর স্কুল এখন ছুটি না? নিয়ে আসতে পারতিস। অনেকদিন দেখিনি মেয়েটাকে

টিউশন, নাচের ক্লাস। পড়ার প্রচন্ড চাপ...

অস্বস্তি হচ্ছিল পরশের কথাগুলো বলতে। আজ সকালে এই নিয়ে অশান্তি হয়ে গেল খানিকটা। পরশের কন্যা ঊশ্রী আসতে চেয়ে মায়াবী চোখে বার বার দেখছিল পরশের দিকে। ওর মা প্রীতি কিছুতেই আসতে দিল না। একই অজুহাতে যেগুলো একটু আগে পরশ বাবাকে বলল। পরশ জানে, ঊশ্রী এলে বাবা এমন উদাসীন বসে থাকতে পারতেন না। ছোট্ট চঞ্চল পাখির মতো সে উড়ে আসত, দাদুর গলা জড়িয়ে ধরত। বাবার এই নিবির্কার বসার ভঙ্গি টুটে এলোমেলো হয়ে যেত অন্ততঃ এই সময়টুকুর জন্যে। পরশকেও ভাবতে হতো না কিভাবে সামাল দেবে বাবার এই উদাসীনতা।

 আজন্মই ঊশ্রী ভীষণ দাদু ন্যাওটা। স্কুল থেকে ফিরে জুতো খুলেই ঝাঁপিয়ে পড়ত দাদুর কোলে। গলা জড়িয়ে পিঠে চেপে পড়ত। স্কুলের কথা কোন বন্ধু কী বলল, কোন আন্টি কী বলল কল কল করে বলে যেত অনর্গল। ওর মা বকত। বলত দাদুকে বিরক্ত না করতে। বাবা আপত্তি করলে বলত, বাবা নাকি আদিখ্যেতা দেখিয়ে নাতনীর বারোটা বাজাচ্ছেন! আর রাগটা গিয়ে পড়ত ঊশ্রীর ওপর। চড়চাপড় মারধোর খেয়েছে কত, তবু ঊশ্রী সুযোগ পেলেই চলে যেত তার দাদুর কাছে।

আজও মেয়েটা লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে দাদুর জন্যে। পরশের মনে হয়। আজ সকালে প্রীতি যখন ঊশ্রীর আসাটা নাকচ করে দিল, মেয়েটার মুখটা ব্যাথায় পাথর হয়ে গেল। পরশ ঠিক করল খুব শিগ্‌গির সে আবার আসবে এবং ঊশ্রীকে নিয়ে আসবে সঙ্গে। প্রয়োজন হলে জোর করেই।

মুখোমুখি দুজনেই বসে চুপচাপ। অস্বস্তির পাহাড় সরিয়ে পরশ আবার জিগ্‌গেস করে, তুমি কিন্তু বললে না, বাবা, কেমন আছ?

বাবা কোন উত্তর দিলেন না। মাছি তাড়ানোর মতো ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বললেন, রোববার ছেড়ে আজকে হঠাৎ চলে এলি, অফিসে ছুটি নিয়ে? অফিসে কাজকর্ম সব ঠিকঠাক চলছে? বাবা পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন পরশের দিকে।

হুঁ, চলছে, ঠিকঠাক চলছে সব

পরশ বলল কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য হল না যেন। বাবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে পরশের ফাঁকটুকু যেন ধরা পড়ে গেল। স্নেহ, ভালোবাসা এবং সমস্ত সম্পর্কের টান থেকে উপড়ে নিজের বাবাকে ঠেলে দিয়েছে এই একাকিত্বের নিশ্ছিদ্র জগতে। কতোটুকুই বা দূর তার বাসা থেকে এই হোম তবু যেন মনে হয় সীমাহীন দূরত্ব। অনন্ত সময় যেন পার হয়ে যায় এখানে পৌঁছতে। এ নিয়ে অফিসে, পাড়ায় আড়ালে আলোচনা হয় কানে আসে তারও। শীতল সম্পর্কের ঘেরাটোপে আবদ্ধ পরশ লজ্জায় মাথা নত করে। মনে মনে বলে কিছুই ঠিক নেই, বাবা, কিচ্ছু ঠিক নেই।

এই গাড়িটা কবে নিলি। গতবার তো এটা দেখিনি

তুমি দেখেছ? তখন নীচে থেকে হাত নাড়লাম, ভাবলাম তুমি খেয়াল করনি। রিসেন্টলি নিয়েছি। মাস তিনেক হল

কিছুটা উজ্জ্বল হয় পরশ, পুত্রের সাফল্যে কোন পিতা না গবির্ত হয়?

আগেরটা কি গোলমাল করছিল কিছু?

না তেমন কিছু নয়। নতুন মডেল। লেটেস্ট ফেসিলিটি। বেটার মাইলেজ। তাই পাল্টে ফেললাম   

ভেরি গুড”। তারপর খুব ভেঙে ভেঙে উচ্চারণ করলেন, "নতুন মডেল। বেটার মাইলেজ। লেটেস্ট ফেসিলিটি”।

পরশ নিশ্চিত কথাগুলো আর যাই হোক নিছক প্রশংসা নয়। প্রতিটি কথায় উনি শ্লেষ মিশিয়েছেন চায়ের সঙ্গে কড়া চিনি মেশানোর মতো। প্রসঙ্গটা এড়াতে, অবান্তর জেনেও পরশ আচমকা জিজ্ঞেস করে ফেলল, বাবা, একবার দেশের বাড়ি যাবে?

হঠাৎ?

অনেকদিন যাওয়া হয় না। বহুদিন, তাই না? তাছাড়া ঊশ্রীওতো দেখল না আমাদের গ্রাম। ঘরবাড়ি

বেশ তো যাও না, ঘুরে এসো। আজকাল তো হাঁটতেও হয় না, গাড়ি যাবার মতো রাস্তা হয়ে গেছে শুনেছি। তবে গেলে শীতের সময় যেও। গরমে ঊশ্রীর বড় কষ্ট হবে

তুমি যাবে না”? 

দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাবা উত্তর দিলেন, নাঃ, কী হবে আর ওসবে, যাবার কোন মানে হয় না”।

তোমার সেই বটগাছটার কথা মনে আছে, বাবা।?

কোনটা? তোর সেই ব্যক্তিত্ববান বটগাছটি?

বাবার মুখে মৃদু হাসি। হাসিটা পুরোন কথা মনে পড়ে যাওয়ার জন্যে। নাকি পরশের প্রতি সামান্য বিদ্রূপ। পরশ ঠিক বুঝল না।

চলো না, বাবা, একবার। শুধু তুমি আর আমি। আর কেউ না। দুজনে অনেকক্ষণ বসে থাকব সেই গাছের নীচে। কোন কথা বলার ইচ্ছে হলে বলব। না, তো না   

পরশের কণ্ঠে মিনতির সুর। বাবা পরশের দিকে তাকালেন। তারপর পরশের কাঁধে হাত রাখলেন। কাঁধে বাবার স্পর্শ নিরাপত্তার এক অদ্ভূত বোধ সঞ্চার করল পরশের মনে। বাবা কিছু বললেন না। তাকিয়ে রইলেন সামনের গাছটার দিকে। পরশের কাঁধে মৃদু চাপ দিয়ে হাত সরিয়ে নিলেন। নিজের কোলের ওপর জড়ো করে রাখলেন হাতদুটি। খুব জোরে শ্বাস নিলেন - সে আর হয় না। আর কখনো হবার নয়। বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

কেন বাবা? দেখ গেলে ভালোই লাগবে

না রে, এই বেশ আছি আমি। এই বারান্দায় এই ভাবেই বসে থাকি সারাটাদিন। মাঝে মাঝে গান চালিয়ে দিয়ে আসি। রবীন্দ্রনাথ শুনি। এই ছোট্ট গন্ডিটুকুর বাইরে কী আছে, কী ঘটছে সে সব জেনে, আমার আর কী যাবে আসবে, বলতে পারিস? পেছনে ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছি যে সব সম্পর্ক, তাদের থেকে না পারব মন খুলে কিছু নিতে, না পারব দিতে।

আজ আমরা যে যেখানে দাঁড়িয়ে, তার সব দায় তোর, এমন ভাবিস না। এটা ভালো নয়। এই ভাবনা তোকে কোন লক্ষ্যে পৌঁছতে দেবে না, অথচ মানসিকভাবে নিঃশেষ হয়ে যাবি ধীরে ধীরে। কাছে থেকেও তুই যে এত কম আসিস। তুই কি আসতে পারিস না? পারিস, কিন্তু আসিস না সঙ্কোচে। কোন মুখে দাঁড়াব বাবার সামনে? কোন সান্ত্বনার কথা শোনাব এই ভাবনায়। সবই বুঝি।

নিজেকে বিপন্ন করি এই চিন্তায় যে, তুই নিজেকে কোথাও জুড়তে পারছিস না অন্তর থেকে। না আমার সঙ্গে। না বৌমার সঙ্গে। এমনকি তোর সন্তান ঊশ্রীও বঞ্চিতা হচ্ছে তার প্রকৃত পাওনা থেকে। বোঝা যাক বা না যাক, তোর কোলিগ, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া প্রতিবেশী কেউ মেনে নিচ্ছে না তোর এই ছেঁড়াখোঁড়া সম্পর্কের টানাপোড়েন। মেনে নেওয়া সম্পর্ক আর মনে নেওয়া সম্পর্কের মধ্যে দুস্তর ব্যবধান। সে সম্পর্ক যত কাছের বা দূরেরই হোক না কেন

 সন্ধে হয়ে এল। হোমের গাছে গাছে বাসা বাঁধা পাখিরা ফিরে এসে ব্যাপক কিচিরমিচির করছে। শাঁখের আওয়াজ পাওয়া গেল না। প্রদীপ জ্বালালো না কেউ। ইলেকট্রিক আলো জ্বলে উঠছে সব জায়গায়। ধূপের মৃদু গন্ধ এসে লাগল নাকে, কেউ জ্বালিয়েছে - হয়তো কোন ঘরে বা রিসেপশনে। বাবা অনেকগুলি কথা বলার পর চুপচাপ বসে রইলেন। পরশ একবার উঠে বাবার ঘরের লাইটটা অন করে দিয়ে এল। করিডোর আর বারান্দার লাইট এসে জ্বালিয়ে দিয়ে গেল হোমের একজন, কাছাকাছি এল। ওদের দুজনকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে কিছু বলল না। চলে গেল।

 ঊশ্রীর কোন ক্লাস হল যেন, আজকাল এইসব ব্যাপারগুলো আর মনে রাখতে পারি না

সেভেন

কেমন করছে পড়াশোনা?

ওই একরকম। পড়তে চায় না। পড়ায় মন নেই

মারধোর করিস নাকি খুব?

নাঃ ওর মা করে, একটু আধটু। খুব জেদি মেয়েটা -কিছুটা স্টাবোর্ন

 বাবা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। মাথা নাড়লেন বার বার। বললেন, এমনটা কি হবার কথা ছিল? বৌমাও চান নি। তুমিও না। কেউ না। কিন্তু ঘটে যাচ্ছে এইসব। অনিবার্য পরিণতির দিকেই চলছে সব কিছু। অমোঘ নিয়তির মতো

খুব চঞ্চল আর বিভ্রান্ত লাগছে বাবাকে। যেন অতিষ্ঠ। উঠে দাঁড়ালেন। হতাশায় বিবর্ণ মুখ। কিছুটা রূঢ় ভাবে বললেন, তুমি এসো। আর থেকো না এখানে। তোমার দেরী হয়ে যাবে ফিরতে। আবার অশান্তি হবে। ভীষণ কষ্ট পাবে মেয়েটা

পরশ উঠে দাঁড়াল। কিছু বলতে পারল না। কথাগুলো কতটা সত্যি তার চেয়ে বেশী আর কে জানে?

আসছি, বাবা

এসো। আবার এসো। খুব অসুবিধে না হলে ঊশ্রীকে আনবে পরেরবার

 পরশ এগিয়ে গিয়েও আবার ফিরে আসে। প্রণাম করে বাবাকে। সমস্ত অন্তর নত হয়ে আসে তার এই সমর্পণে। বাবা কাঁধে হাত রাখেন একবার। অস্ফুটে বললেন, সাবধানে যেও

পরশ নীচে নেমে এল। খুব ধীরে ধীরে। তার শরীরে শক্তি আর নেই যেন। নীচে পার্কিং লটে গাড়ির দরজা খুলে তাকাল দোতলার বারান্দায়। বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। পরশ হাত তুলতে গিয়েও নিরস্ত হল। মাথা নীচু করে কিছু ভাবল এবং একটা কথা মনে পড়ল হঠাৎ - “টাকার চেয়ে সুদ মিষ্টি”। বহুদিন আগে বাবা বলেছিলেন। তাঁর জীবনে ঊশ্রীর সান্নিধ্যের মাধুর্যটুকু উপভোগের সময়েই সে কি তার বাবাকে চরম বঞ্চিত করল না – তাঁকে নিঃসঙ্গ একাকীত্বের শেকলে বেঁধে?  ক্লান্ত বিষণ্ণ শরীরটা গাড়ির সিটে ছেড়ে দিয়ে, সে গাড়ি স্টার্ট করল।

নীরব উদাসীনতায় ঋজু এক মহীরূহের মতোই বারান্দায় বসে রইলেন তার বাবা। আশে পাশে স্নিগ্ধ ছায়া মেলে। 

-০০-

শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ১২

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১১ 


১২ 

“সদর দরজা থেকে বাইরের ঘরে ঢুকতেই আমার শ্বশুর দেখলাম আমার অপেক্ষাতেই যেন দাঁড়িয়ে আছেন। আমার  দিকে তাকিয়ে চশমাটা খুলে, করজোড়ে বললেন, “আমরা তোমার সঙ্গে অন্যায় করেছি, মা। ভয়ংকর ভুল করেছি আমরা”।

“আপনি পিতৃতুল্য, আমার সামনে হাতজোড় করবেন না, প্লিজ। ভুল যে হয়েছে, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু এখন তো সে নিয়ে অনুশোচনা করে লাভ নেই, বাবা। আমাদের উচিৎ সেই ভুলটাকে কী করে শোধরানো যায়, সেই চিন্তা করা”। কথাটা শেষ হতেই দেখলাম ভেতরের দিকে যাওয়ার দরজায় দাঁড়িয়ে রয়েছে শাশুড়ি।

ঝনঝন করে তিনি ঝাঁজিয়ে উঠে বললেন, “ছেলের বউয়ের সামনে হাতজোড় করে নাটুকে নাকে-কান্না কেঁদে তুমি এখন ভালো সাজছ? তোমার পয়সায়, তোমার আয়োজনে, তোমার গুণধর ছেলের এই বিয়ে হল, আর আজ পনেরদিনের মধ্যেই তোমার মনে হল অন্যায় হয়ে গেছে?”

শ্বশুরমশাই বললেন, “তোমাদের সক্কলকে বলেছিলাম - পইপই করে বলেছিলাম, ওকে কোন রিহ্যাবে রেখে নেশা ছাড়িয়ে, সুস্থ করে, তারপর বিয়েটা হোক। তুমিই বলেছিলে ছেলেদের অমন একটু-আধটু উড়ুনচণ্ডিপনা বিয়ের আগে থাকে। বিয়ের জল গায়ে পড়লেই সব ঠিক হয়ে যাবে। বলনি?”

“বলেছিলে তো নিয়ে যাওনি কেন, তোমার ওই গুষ্টির পিণ্ডি রিহ্যাবে? তোমার হাতে-পায়ে কেউ দড়ি বেঁধে রেকে দিয়েছিল... সব কি আমাকেই করতে হবে...”।

এই জঘন্য বিতণ্ডার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে আমার ঘৃণা হচ্ছিল। আমি শাশুড়ির পাশ কাটিয়ে শোবার ঘরে ঢুকলাম। দেখলাম পিন্টু উঠে বসেছে, আমাকে ঢুকতে দেখে লজ্জায় মাথা নামাল, বলল, “সরি সুকু, এক্সট্রিমলি সরি, আর কখনো এমন হবে না। দেখে নিও, প্রমিস”।

আমি কোন উত্তর না দিয়ে, রান্নাঘরে গেলাম। খুঁজে পেতে লেবু, নুন, চিনি বের করে, একগ্লাস সরবৎ বানিয়ে নিয়ে এলাম পিন্টুর জন্যে, বললাম, “ধরো, এটা খেয়ে নাও, ভালো লাগবে”। তখনও কানে আসছিল শ্বশুর-শাশুড়ির বাক-যুদ্ধ।

সুবোধ বালকের মতো গ্লাসটা খালি করে আমার মুখের দিকে তাকাল, পিন্টু। আমি খালি গ্লাসটা হাতে নিয়ে বললাম, “এবার সোজা টয়লেটে ঢুকে পড়ো, জামা-প্যান্ট ছেড়ে চান-টান করে ফ্রেশ হয়ে নাও”।

পিন্টু উঠল, মিনমিনে সুরে বলল, “তুমি রাগ করনি তো?”

“খুশি হওয়ার মতো কিছু করেছ, বলে তোমার মনে হচ্ছে?”

পিন্টু কথা বাড়াল না আর, কাচা পাজামা-পাঞ্জাবি নিয়ে টয়লেটে ঢুকল। আমি দ্রুত হাতে, বিছানার চাদর বালিশের ওয়াড় সব তুলে ফেলে নতুন করে বিছানা সাজালাম। দুটো ধূপ জ্বেলে ঘরের দু কোণে রাখলাম। সব মিলিয়ে ঘরের পরিবেশটা মন্দের ভাল হল।

 এভাবেই শুরু হল আমার দাম্পত্য জীবনটা, সুনুদা।

স্বাভাবিক অবস্থায় পিন্টু কিন্তু খুব খারাপ মানুষ ছিল না। ইঞ্জিনিয়ার কিন্তু কাঠখোট্টা নয়, নানান রকমের বই পড়ার অভ্যেস ছিল, গান-টান ভালোবাসে। রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভক্ত। ঠাট্টা, ইয়ার্কিতেও খারাপ নয়, ভদ্রজনোচিত রসিক বলা যায়। কিন্তু তার এই চরিত্রটা ছিল ক্ষণস্থায়ী, অনেকটা সূর্যোদয় – সূর্যাস্তের মতো। অর্থাৎ সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে তার দেহের শিরায় শিরায় যেন তৃষ্ণার হাহাকার উঠত – কোথা গেলে পাই, কোথায় জুড়াই, দগ্ধ প্রাণের তিয়াসা...। এটা কোথায় শুনেছিলাম, বা পড়েছিলাম মনে নেই এবং যদ্দূর মনে পড়ছে গানটা ভগবদ্ভক্তির নেশায় গাওয়া বা লেখা। সে গানের আমি ভয়ংকর অপপ্রয়োগ করলাম জানি। কিন্তু আমার জীবনে আমি বুঝেছি, একজন নেশাখোরের কাছে মদের বোতলই ঈশ্বর, বাকি সব মায়া। তার কাছে বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তান, ঈশ্বর-দেবতা কিচ্ছু না – কিছুই না।

আরেকটা কথা বলি পিন্টু ভালো থাকুক এটা ওর মা চাইতেন না, হয়তো এটা তাঁর মানসিক ব্যাধি বিশেষ। দু’দিন বা তিনদিন পরপর পিন্টু অফিস করে নেশা না করে বাড়ি ফিরলে (আমি বুঝতে পারতাম, নেশার গ্রাস থেকে মুক্ত করতে নিজের সঙ্গে কতখানি যুঝে চলেছে ও) ওর মায়ের গাত্রদাহ হত। ছেলে বুঝি বউয়ের আঁচলে বাঁধা পড়ে গেল, স্ত্রৈণ হয়ে গেল ছেলে। বিশ্বাস করবে না হয়তো, কিন্তু আমার প্রতি অদ্ভূত এক ঈর্ষার আগুন জ্বলতে দেখেছি ওঁর চোখে। আমার আড়ালে উনি ছেলেকে কি মন্ত্র বা মন্ত্রণা দিতেন জানি না, দেখা যেত পরের দিনই সে নেশা করে বেশ রাত করে বাড়ি ফিরত। গর্বিত আনন্দে শাশুড়িকে এক-দুবার জনান্তিকে বলতেও শুনেছি, পুরুষমানুষ একটু-আধটু নেশা-ভাঙ না করলে আবার পুরুষ কিসের?

পিন্টুর বাবা ছিলেন স্বাভাবিক স্বভাবের মানুষ, সন্ধের পরে পরে সুস্থ অবস্থায় পিন্টু বাড়ি ফিরলে বড়ো আনন্দ পেতেন। উঁচু গলায় হাঁক পাড়তেন – “বৌমা, পিন্টু এসে পড়েছে, দু’কাপ চা করো তো, দুজনে মিলে বেশ আরাম করে খাই”। স্বামীর আনন্দে আমার শাশুড়ির মুখে নামত কালো মেঘের ছায়া। আমার দাম্পত্য নিয়ে আমি অস্থির ছিলাম, সুনুদা, কিন্তু পিন্টুর বাবা-মায়ের দাম্পত্যের রহস্যটা কোনদিন আমার মাথায় ঢোকেনি। সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর মানসিকতা নিয়ে এই দুই মানুষ কিভাবে কাটিয়ে দিলেন এতগুলি বছর? পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীরা নাকি বীভৎস বঞ্চনা ও অত্যাচারের শিকার। অথচ এই পুরুষটি জীবনের অধিকাংশ সময়টাই কাটিয়ে দিলেন, নিজের স্বভাববিরুদ্ধ কাজের বাধ্যতা নিয়ে – এটাকেই কী অ্যাডজাস্টমেন্ট বলে, সুনুদা?

দাম্পত্যের এই দ্বন্দ্বের মধ্যেও অনেকেরই সন্তান হয়, আমারও হল, বিয়ের প্রায় দেড় বছর পর। প্রসবের আগে আমি মা-বাবার কাছে ছিলাম, প্রায় মাস তিনেক।  অফিস ছুটির পর প্রথম প্রথম পিন্টু ও বাড়িতে প্রায় রোজই যেত। ধীরে ধীরে ও বাড়িতে তার উপস্থিতির হার কমতে লাগল। পাঁচ-সাতদিন পর পর ও যখন আসত – ওর চেহারা দেখেই বুঝতাম – ও আবার নেশা শুরু করেছে।

নার্সিং হোমে যেদিন ভর্তি হলাম, তার পরের দিন সকালে আমার পুত্র সন্তানের জন্ম হল। আমার মা বললেন, “ছেলে অবিকল তোর মুখ পেয়েছে, সুকু, মাতৃমুখী ছেলে খুব সুখী হয়। আর পিন্টুর মা বললেন, “আহা, শৈশবের পিন্টুর মুখটাই যেন বসানো তোমার ছেলের মুখে, বৌমা”।

পিন্টু এল একটু বিকেল করে। আমার বেডের কাছাকাছি আসা মাত্র আমার মনটা বিতৃষ্ণায় ভরে উঠল। বাবাকে আনন্দ করে তার ছেলে দেখাতে গিয়ে, আমার সিস্টারও টের পেলেন সেই শিশুর পিতা মদ্যাসক্ত। সেও নাক-মুখ কুঁচকে ওর দিকে তাকাল, আমার দিকেও একবার, বলল, “পেশেন্টের ঘরে বেশিক্ষণ থাকবেন না...”।

পিন্টু আমার কাছে এসে বলল, “আমি সরি, সুকু...”।

দাঁতে দাঁত চেপে আমি চাপা গলায় হিসহিসিয়ে উঠলাম ক্রোধে, বললাম “কত হাজার বার, কত লক্ষ বার সরি, বলবে তুমি? একপেট মদ গিলে এসেছ, প্রথম সন্তানের মুখ দেখতে?”

“ওরা, জোর করল খুব...কিছুতেই না করতে পারলাম না...”।

তীব্র ঘৃণা আর বিবমিষায় মুখ ঘুরিয়ে রইলাম আমি। পিন্টু বেবি-কটের দিকে যেতেই, আমি আবার ফোঁস করে উঠলাম, “আমার বাচ্চার গায়ে তুমি হাত দেবে না... বেরিয়ে যাও...”।

দুপায়ে দাঁড়ানো সরীসৃপ আমি কোনদিন দেখিনি, আদৌ আছে কিনা জানি না। কিন্তু সেদিন দেখলাম, সেই নার্সিং হোমের ঘরে, আমার সামনে। পিন্টু আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। সিসটার বোধহয় অপেক্ষা করছিলেন, পিন্টূ বেরিয়ে যেতেই ঘরে এলেন, তারপর রুম ফ্রেশনার ছড়িয়ে দিলেন ঘরের চারদিকে। বললেন, “বড়দির ভিজিটের সময় হয়ে গেছে, ঘরের মধ্যে ঢুকে এরকম বিশ্রী গন্ধ পেলে তিনি কুরুক্ষেত্র বাধাবেন, ম্যাডাম”।

ওঁর বড়দি মানে আমার ডাক্তার ম্যাডাম, আমার মায়ের থেকেও বয়স্কা মহিলা। মায়ের মুখে শুনেছি, আমার জন্মও ওঁনার হাতেই হয়েছিল। ওঁনার ওপরে আমার বাবা-মায়ের অনন্ত ভরসা ও বিশ্বাস। পেশেন্টদের উনি যেমন স্নেহ করেন, তেমনি অবাধ্য হলে, বা কোন কারণে বিরক্ত হলে পেশেন্টের ধুলো ঝেড়ে দিতে এতটুকু দ্বিধা করেন না।

পিন্টু বেরিয়ে যাওয়ার মিনিট পনের পরে ঘরে এলেন, পিন্টুর বাবা-মা। শ্বশুরমশাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে বললেন, “কেমন আছিস, মা?” কিন্তু আমি সে কথার উত্তর দেওয়ার আগেই, খরখরে গলায়, পিন্টুর মা বললেন, “পিন্টুটা অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ছুটি নিয়ে, তার ছেলের মুখ দেখতে এল, তাকে তুমি কিনা দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলে? ছি ছি ছিঃ”।

রাগে ও ঘৃণায় আমার মাথা ঝনঝন করে উঠল, বললাম, “তাড়াতাড়ি ছুটি নিয়ে সে বন্ধুদের নিয়ে মদ খেতে গিয়েছিল, মা। এক পেট মদ গেলার পর হঠাৎ তার পিতৃত্ব জেগে ওঠায়, সে এখানে এসেছিল”।

বেবিকটের সামনে দাঁড়িয়ে সিস্টার আমার পুত্রের ন্যাপি পরীক্ষা করছিলেন, তিনি বেশ রূঢ় কণ্ঠে বললেন, “এখানে জোরে কথা বলবেন না, এটা নার্সিং হোম”।

আগুন ঝরানো চোখে শাশুড়িমা আমার দিকে একবার তাকিয়ে, বাইরে বেরিয়ে গেলেন। শ্বশুরমশাই আমার কাছে এসে, আমার মাথায় হাত রেখে খুব নীচু স্বরে বললেন, “ভালো আছিস তো, মা?”

আমি ঘাড় নেড়ে বললাম, ভালো আছি।

“কিন্তু...কিন্তু এরা তোকে, ভালো থাকতে যে দেবে না, মা...তিল তিল করে তোকে শেষ করে ফেলবে...”। আমি অবাক হয়ে তাঁর দুই চোখের দিকে তাকালাম। নিজের ছেলে আর স্ত্রী সম্পর্কে মনে কতখানি বিতৃষ্ণা থাকলে এমন কথা “পরের মেয়ে”-কে বলা যায়, তুমি বলো তো, সুনুদা? সিসটার-মহিলাও তাঁর দিকেই তাকিয়েছিলেন, তাঁর দু চোখেও এখন মমতা।

আমি কোন উত্তর দিলাম না, উত্তরে কীই বা বলতাম? একটু পরে আমার শ্বশুরমশাই আবার বললেন, “যা হবার তা হয়ে গেছে, সে শোধরানোর এখন আর অন্য উপায় নেই, মা। কিন্তু তুই আমার মেয়ে হলে, এই শেকল ভেঙে আমি তোকে মুক্ত করে নিয়ে আসতাম। আর একথা... আর একথা তোর বাবাকেও - তাঁর হাতদুটো ধরে ক্ষমা চেয়ে নিয়েই, আমি বলব। আমি এখন আসছি রে মা, মন শক্ত করে ভেবে দেখিস আমার কথাগুলো...”। এই কথা বলে তিনি দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। বিছানায় শুয়ে আমার মনের মধ্যে ঝড় বইতে লাগল। উনি যে মুক্তির কথা বললেন, সেটা নিশ্চয়ই ডিভোর্স!

কথাটা আমার মনে যে এর আগে আসেনি তা নয় – কিন্তু বাবা-মা কী ভাববেন, আমাদের আত্মীয়-পরিজনরা কী ভাববেন, এমনকি আমার শ্বশুরমশাইও কী মনে করবেন – এসব চিন্তা করেই কথাটা মন থেকে মুখে আনতে পারিনি। কিন্তু আজ তো তিনিই আমাকে মুক্ত করে দিয়ে গেলেন – আমার মনে সাহস সঞ্চারিত করলেন। আমাকে মুক্তি-পথের দিশা দেখিয়ে গেলেন।    

মিনিট দশেক পরে ডাক্তার-ম্যাডাম এলেন, মমতাময়ী মাতৃমূর্তি যেন।

“কিরে, কেমন আছিস? মিষ্টি খাওয়াবি না? এত বড়ো প্রমোশন হল তোর?”

“প্রমোশন”? আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

“সে কি রে? মা হয়ে গেলি যে। এতদিন তুই ছিলি বাবা-মায়ের মেয়ে, শ্বশুর-শাশুড়ির বৌমা, স্বামীর স্ত্রী। গতকাল থেকে হলি বেবির মা, এটা প্রমোশন নয়? ছেলের নাম-টাম কিছু ভাবলি?” কথা বলতে বলতেই তিনি আমার টেম্পারেচার চার্ট, কয়েকটা টেস্ট রিপোর্টে চোখ বুলিয়ে নিলেন, আমার পাল্‌স্‌, হার্টবিট চেক করলেন, বললেন, “বাঃ পারফেক্ট মাদার। সব চিন্তা ছেড়ে এখন ছেলের নামের কথা ভাব”। এরপর সিস্টারকে কিছু নির্দেশ দিয়ে বললেন, “চলি রে, তোর বাবা-মা বাইরে অপেক্ষা করছেন”।

উনি বেরিয়ে যেতেই বাবা-মা ঢুকলেন। দুজনেরই মুখ গম্ভীর থমথমে। পিন্টুর বাবা-মার সঙ্গে কি ওঁদের নীচেয় দেখা হয়েছিল? কোন বচসা হয়েছে? পিন্টুর বাবা কি আমার বাবাকে ডিভোর্সের পরামর্শ দিয়ে দিয়েছেন? আমি অজানা এক দুশ্চিন্তায় শঙ্কিত হলাম।

চলবে....



বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /৬

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১




দ্বিতীয় স্কন্ধ - ষষ্ঠ পর্ব

রাজা পরীক্ষিতের তত্ত্ব কৌতূহল

মহারাজ পরীক্ষিৎ বললেন, “হে তত্ত্বজ্ঞ ব্রহ্মন, ব্রহ্মা দেবর্ষি নারদকে গুণাতীত শ্রীহরির গুণবর্ণনা করার জন্যে নির্দেশ দিলে, তিনি যাদের কাছে যেমন বর্ণনা করলেন, আমি সেই ভুবনমঙ্গল তত্ত্বকথা শুনতে ইচ্ছা করি। আমি আমার নিঃসঙ্গ মনকে শ্রীকৃষ্ণে সমর্পণ করে, যেভাবে আমার শরীর ত্যাগ করতে পারি, সেই বিষয়ে আমাকে উপদেশ করুন। নদী ও পুকুরের জলকে শরৎকাল যেমন নির্মল করে তোলে, তেমনই শ্রীকৃষ্ণ শ্রবণের দ্বার দিয়ে হৃদয়কমলে প্রবেশ করেন ও মনের নিখিল মালিন্য দূর করে দেন। প্রবাস থেকে ঘরে ফিরে আসা ব্যক্তি যেমন আবার প্রবাসে যাবার ক্লেশ মেনে নিতে পারে না, তেমনি মনের মালিন্যহীন কৃষ্ণভক্ত, তাঁর চরণমূলও পরিত্যাগ করতে ইচ্ছা করেন না। হে তপোধন, দেহ জড়পদার্থে তৈরি এবং আত্মার সঙ্গে ওই জড়পদার্থের কোন সম্বন্ধ নেই; সেক্ষেত্রে দেহের সঙ্গে আত্মার যে সংযোগ ঘটে থাকে, তার কি কোন কারণ আছে, এই বিষয়ে জানতে ইচ্ছা করি। জীবের যেমন নির্দিষ্ট সংখ্যক ও পরিমাণের অবয়ব আছে, সেইরকম যে পুরুষের নাভিকমল থেকে এই বিশ্বচরাচর সৃষ্টি হয়েছে, তাঁরও নির্দিষ্ট সংখ্যক ও পরিমাণের অবয়ব আছে, সে কথা আপনি আগেই বলেছেন। লৌকিক পুরুষ এবং ওই অলৌকিক মহাপুরুষের মধ্যে যে প্রভেদ রয়েছে, সেই তত্ত্বটি কৃপা করে নির্দেশ করুন।

পদ্মযোনি ব্রহ্মা যাঁর কৃপায় ভূতসমূহকে সৃষ্টি করে থাকেন, সকলের অন্তর্যামী সেই ভগবান মায়া ত্যাগ করে, কোন স্বরূপে অবস্থান করেন? মহাকল্প ও খণ্ডকল্পের পরিমাণ, যেভাবে কালের অনুমান করা যায়, তার প্রকার; ভূত, ভবিষ্যত ও বর্তমান শব্দে যে কালের উপলব্ধি হয়, সেই বিষয় এবং পিতৃগণ ও দেবগণের পরমায়ু ও তার পরিমাণ বর্ণনা করুন। এই যে কাল সূক্ষ্ম ও স্থূলভাবে লক্ষ্য করা যায়, তার আকার কেমন? শুভাশুভ কর্মের ফলে যে সকল লোক লাভ হয়, সেই সকল লোক কেমন এবং তাদের সংখ্যা কত? জীব কেমন দেহ পেলে, পাপ ও পুণ্য কর্মের একত্র স্থিতি সম্ভব হয়? জীবগণের মধ্যে কে, কেমন কর্ম করলে কোন গতি লাভ হয়? ভূর্লোক, পাতাল, দিকসমূহ, আকাশ, গ্রহ, নক্ষত্র, পাহাড়, নদী, সমুদ্র ও দ্বীপসমূহের এবং ঐসব স্থানের অধিবাসী জীবদের উৎপত্তি কিভাবে ঘটে? ব্রহ্মাণ্ডের বাইরের ভাগ ও ভিতরের ভাগের পরিমাণ কত? যুগ সকলের সংখ্যা, পরিমাণ ও ধর্ম এবং যুগে যুগে শ্রীহরির অবতারলীলা সবিস্তারে কীর্তন করে, আমাকে কৃতার্থ করুন। মানবগণের স্বাভাবিক ধর্ম কি এবং তাদের নিজের নিজের বর্ণ ও আশ্রম অনুযায়ী কেমন ধর্ম পালন করা উচিৎ?

হে ব্রহ্মন, বিভিন্ন ব্যবসায় নিযুক্ত হয়ে মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে, তাদের কেমন ব্যবহার আশ্রয় করা উচিৎ? রাজর্ষিগণ ও পতিত জীবের কেমন ধর্ম অনুসরণ করা উচিৎ? প্রকৃতি প্রভৃতি তত্ত্বসমূহের সংখ্যা ও লক্ষণ কী এবং কোন তত্ত্ব কারণরূপে, কোন কার্য উৎপন্ন করে? কিভাবে দেবতাদের আরাধনা করা উচিৎ এবং অষ্টাঙ্গযোগের বিধি কেমন, সে বিষয়ে শোনার ইচ্ছা আছে? অণিমা ইত্যাদি যোগে, যোগেশ্বরগণ সিদ্ধি লাভ করে, কোন গতি লাভ করেন ও কিভাবে তাঁদের লিঙ্গশরীর লয় হয়? ঋক, সাম প্রভৃতি বেদ, আয়ুর্বেদ প্রভৃতি উপবেদ, ধর্মশাস্ত্র, পুরাণ ও ইতিহাসের লক্ষণ কী? অগ্নিহোত্র ইত্যাদি বৈদিক কর্ম; কূপ, পুষ্করিণী ইত্যাদি স্মৃতি বিহিত পূর্ত কর্ম; এই সকল জানার বিষয় কৃপা করে বর্ণনা করুন। ধর্ম, অর্থ ও কাম এই ত্রিবর্গ কিভাবে নির্বিঘ্নে সাধন করা যায়? প্রলয়ের সময় সকল জীবের দেহ প্রকৃতিতে লীন হয়ে যায়, কিভাবে আবার তাদের সৃষ্টি হয়, কিভাবেই বা পাষণ্ডীদের সৃষ্টি হয়? আত্মা কিভাবে বদ্ধ, মুক্ত ও স্বরূপ অবস্থায় অবস্থান করে? ভগবান সৃষ্টিকালে নিজের মায়ায় যেমন বিবিধ লীলা করে থাকেন, প্রলয় কালে মায়া পরিত্যাগ করে সাক্ষীর মতো অবস্থান করেন, সেই বিষয়েও জানতে ইচ্ছা হয়।

হে মুনিবর, যে যে বিষয় আমি জিজ্ঞাসা করলাম, সেই সব বিষয় আমার জানা ছিল না, অতএব এতদিন ওই বিষয়ের প্রশ্ন আমার মনে উদয় হয়নি; এখন ওই সব বিষয়ে আমি শরণাগত জেনে, আপনার থেকে সবিস্তার বর্ণনার অনুরোধ করছি। স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মা যেমন সকল তত্ত্বের জ্ঞাতা, আপনিও সেই রকমই তত্ত্বদর্শী। হে ব্রহ্মন, অনশনব্রতে আমার চিত্ত এতটুকুও বিচলিত হয়নি, কারণ আপনার বর্ণনার সমুদ্র থেকে অচ্যুতের লীলারূপ অমৃত সৃষ্টি হচ্ছে এবং আমি সেই সুধা পান করে পরিতৃপ্তি পাচ্ছি”

শ্রীসূত বললেন, “হে ঋষিগণ, মহারাজ পরীক্ষিৎ মুনিবর শুকদেবকে ভগবানের কথা বিষয়ে প্রশ্ন করায়, তিনি অত্যন্ত প্রীত হলেন এবং কল্পের শুরুতে স্বয়ং ভগবান, ব্রহ্মাকে যে মহাপুরাণ উপদেশ করেছিলেন, সেই ভাগবত কীর্তন করলেন। পাণ্ডুকুলতিলক যা যা প্রশ্ন করেছিলেন, সেই সকল প্রশ্নের উত্তর দেওয়া শুরু করলেন”


ব্রহ্মর্ষি শুকদেবের উত্তর   

শ্রীশুকদেব বললেন, “হে রাজন, আদিদেব ব্রহ্মা জগতের পরমগুরু; কারণ তিনিই ভক্তিরহস্যের প্রথম উপদেষ্টা। তিনি যখন শ্রীবিষ্ণুর নাভিকমলে বসেছিলেন, তখন পূর্বকল্পে সৃষ্টির স্মৃতি তাঁর বিন্দুমাত্র মনে পড়েনি এবং এই বিষয়ে তিনি যখন চিন্তা করছিলেন, তখন ষোড়শ ও একবিংশ বর্ণের যোগে “তপ” এই বাক্য দুবার শুনতে পেলেন। এই শব্দ কে উচ্চারণ করল জানার জন্য তিনি চারদিকে তাকালেন, কিন্তু কাউকেই দেখতে পেলেন না। নিজের আসনে বসে চিন্তা করতে করতে তাঁর মনে হল, “তপ” অর্থাৎ কেউ আমাকে তপস্যা করতে নির্দেশ দিল; এবং তিনি তপস্যায় মগ্ন হলেন। ব্রহ্মা যে “তপ” কে তপস্যার অর্থ ধরেছিলেন, সে উপলব্ধি অব্যর্থ ছিল এবং যে তপস্যায় লোকসমূহের প্রকাশ হয়, সেই তপস্যায় দিব্য সহস্র বছর অতিবাহিত করেছিলেন।

[আজকাল সোশাল মিডিয়ায় বিখ্যাত চিত্রপরিচালক ঋত্বিক ঘটকের একটি উক্তি প্রায়ই ভাইরাল হয়ে ফিরে ফিরে আসে - "ভাবো, ভাবো, ভাবার চেষ্টা করো"। ব্রহ্মার কানে আসা দুবার "তপ", "তপ" শব্দটিও যেন অনুরূপ, কেউ যেন তাঁকে নির্দেশ দিলেন, "যোগনিদ্রা শেষে জেগে উঠে অমন ভ্যাবলার মতো বসে থেক না, ("ভাবো ভাবো") "তপস্যা করো, তপস্যা করো"। তপস্যায় অনেক দুর্বোধ্য বিষয়ও সম্যক উপলব্ধি করা যায়"। কয়েকটি অনুচ্ছেদ পরেই আমরা জানতে পারব শ্রী বিষ্ণুই ব্রহ্মাকে ওই প্রত্যাদেশ দিয়েছেলেন।]        

ব্রহ্মার এই আরাধনায়, ভগবান তাঁকে বৈকুণ্ঠলোক দর্শন করালেন। এই লোক নিখিল লোকের উপরে অবস্থিত, সুতরাং সবথেকে উৎকৃষ্ট। এই ধামে ক্লেশ, মোহ ও ভয় নেই। এই স্থানে রজঃ, তমঃ গুণের অস্তিত্ব নেই, এই ধাম বিশুদ্ধ সত্ত্বগুণে নির্মিত। এই লোকে কাল কবলে কেউ বিনাশ হয় না। এই পরম রমণীয় বৈকুণ্ঠলোকে সুর ও অসুরদের বন্দিত শ্রীহরির পার্ষদ্গণ বিহার করেন। তাঁরা সকলেই উজ্জ্বলকান্তি, পদ্মনেত্র, পীতাম্বর, চতুর্ভুজ, অতি কমনীয়, সুকুমার ও প্রভামণ্ডিত। এই লোকে লক্ষ্মীদেবী নারায়ণের চরণসেবা করছেন; বিলাসভরে তাঁর অঙ্গ দুলছে এবং বসন্ত সহচর ভ্রমরেরা তাঁর স্তুতিগান করছে।

ব্রহ্মা জগৎপতি ভক্তবৎসল শ্রীপতিকে দেখে ধন্য হলেন। তিনি দেখলেন, তাঁর সেবকদের করুণা করার জন্য শ্রীভগবান সর্বদাই উন্মুখ; তাঁর করুণাঘন দৃষ্টি দর্শকের মনে আনন্দ সৃষ্টি করে। তিনি চতুর্ভুজ ও পীতাম্বর, তাঁর মাথায় রত্নখচিত মুকুট, শ্রবণে কুণ্ডল এবং তাঁর বক্ষের বামদিকে স্বর্ণরেখায় লক্ষ্মীদেবী অঙ্কিত। তিনি সিংহাসনে বসে আছেন এবং প্রকৃতি, পুরুষ, মহত্তত্ত্ব, অহংকারতত্ত্ব, একাদশ ইন্দ্রিয়, পঞ্চ মহাভূত, পঞ্চ সূক্ষ্মভূত – এই পঞ্চবিংশ শক্তি নিজেদের বিক্রম ত্যাগ করে তাঁকে ঘিরে রেখেছে। তিনি অসংখ্য শক্তিযুক্ত হয়েও নিজের স্বরূপে বিরাজ করছেন, এই কারণেই তাঁকে ঈশ্বর বলা হয়ে থাকে।

ব্রহ্মা তাঁকে দেখে আনন্দে আপ্লুত হলেন, তাঁর অংগ পুলকিত হল এবং দু চোখে আনন্দে অশ্রুধারা বইতে লাগল। তিনি নতমস্তকে ভগবানের চরণকমল বন্দনা করলেন। ভগবান শ্রীব্রহ্মার করস্পর্শ করে, হাস্যমুখে মধুর স্বরে বললেন, “হে বেদগর্ভ, তুমি সৃষ্টির ইচ্ছায় যে দীর্ঘ তপস্যা করেছ, তাতে আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। কূটযোগীগণ সুদীর্ঘ কাল কপট তপস্যা করলেও আমি তাদের দর্শন দিই না। তোমার মঙ্গল হোক, আমিই বরদাতা, অতএব তোমার ঈপ্সিত বর প্রার্থনা করো। তুমি নিজের তপস্যার ফলেই, তোমার  বৈকুণ্ঠ দর্শন হল, এমন মনে কোর না। কারণ, আমিই তোমাকে “তপ, তপ” প্রত্যাদেশ দিয়ে, তপস্যার কথা বলেছিলাম, আমিই তোমাকে তপস্যায় প্রবৃত্ত করেছিলাম। তপস্যা আমার হৃদয় অর্থাৎ জ্ঞানময়ী শক্তি, আমিই নিজেই তপস্যার আত্মা অর্থাৎ স্বরূপ। আমি তপস্যা দিয়েই বিশ্বর সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় করে থাকি। দুশ্চর তপস্যাই আমার বীর্য অর্থাৎ শক্তি”

শ্রীব্রহ্মা বললেন, “হে নাথ, আপনি সর্বভূতের বুদ্ধিতে উপস্থিত থাকেন এবং আপনার অব্যর্থ জ্ঞানদৃষ্টিতে সকল প্রাণীর মনের ইচ্ছা  আপনি বুঝতে পারেন। তবুও আমার মনের ইচ্ছা আপনাকে বলছি, আপনি পূর্ণ করে, আমাকে কৃপা করুন। হে মাধব, আমি অনলস হয়ে আপনার সৃষ্টির আদেশ পাল করব, কিন্তু সৃষ্টির সময়, অহংকার যেন আমাকে আচ্ছন্ন না করে। আপনি আমার করস্পর্শ করে, আমার সঙ্গে সখার মতো আচরণ করলেনএই কারণে যখন নির্বিকার চিত্তে উত্তম, মধ্যম ও অধম বিভাগে জীবসকল সৃষ্টি করব, তখন “আমিই স্বতন্ত্র সৃষ্টিকর্তা”, এই উৎকট বোধ আমাকে যেন গ্রাস না করে”

["রথ ভাবে আমি দেব পথ ভাবে আমি, মূর্তি ভাবে আমি দেব, হাসে অন্তর্যামী"। কবিগুরুর এই ছড়াতেও সেই ভাবাভাবি - অর্থাৎ দর্প-ভাবনার চিত্রটি বড়ো সুন্দর ভাবে পরিষ্ফুট। যদিও ব্রহ্মাই সবকিছু সৃষ্টি করতে চলেছেন, কিন্তু তিনি "আমিই সৃষ্টিকর্তা" এই দর্প-ভাবনা থেকে মুক্তি চাইছেন, কারণ তিনি জানেন সকল সৃষ্টির একমাত্র কারণ ভগবান শ্রীহরি - তিনি তো নিমিত্ত মাত্র।]      

শ্রীভগবান বললেন, “শাস্ত্রজ্ঞান, অনুভব, ভক্তি ও তার সাধন তোমাকে বলছি, শোন। আমার যেমন স্বরূপ, আমার যেমন সত্ত্বা এবং যেমন আমার রূপ, গুণ ও কর্ম, এই সমস্ত বিষয়ের তত্ত্বজ্ঞান, আমার প্রসাদে তোমার অন্তরে প্রকাশ হোক। সৃষ্টির আগে আমি কেবলমাত্র অবস্থান করে থাকি, কোন কার্যের অনুষ্ঠান করি না। স্থূল, সূক্ষ্ম ও তাদের কারণস্বরূপ প্রকৃতি আমার মধ্যেই লীন থাকায়, তাদের প্রকাশ ঘটে না। সৃষ্টির পরেও আমিই বর্তমান থাকি। দৃষ্টিগোচর এই বিশ্বও আমি এবং বিশ্বের প্রলয় হলেও আমিই অবশিষ্ট থাকিযার প্রভাবে পদার্থের বাস্তব অস্তিত্ব না থাকলেও অব্যক্তরূপে আত্মায় প্রকাশ পায় এবং যার জাদুতে বস্তু বর্তমান থাকলেও তার অস্তিত্ব বোঝা যায় না, তাকেই মায়া বলে। আমার সত্ত্বা কেমন হয়, তোমাকে বলছি শোন। ছোট ও বড়ো সকল বস্তুই মহাভূত উপাদানে রচিত হয়। যখন বস্তু তৈরি হয়, তখন মহাভূতের সকল উপাদানকে সেই বস্তুতেই দেখা যায়, সুতরাং উপাদান সকল বস্তুতে প্রবেশ করেছে এমন মনে হয়। কিন্তু যখন পর্যন্ত বস্তু রচনা না হয়, তখনও মহাভূত উপাদানসমূহ কারণ রূপে বর্তমান থাকে, কিন্তু বস্তুতে যেন অপ্রবিষ্ট মনে হয়। এই ভাবে মহাভূতকে যেমন বস্তুতে কখনো প্রবিষ্ট এবং কখনো অপ্রবিষ্ট বলে মনে হয়, তেমনই আমাকেও পদার্থসমূহে প্রবিষ্ট ও অপ্রবিষ্টরূপে উপলব্ধি হয়।

এখন সাধনের প্রকার বলছি, মন দিয়ে শোন। যখন কার্যে কারণের উপলব্ধি ঘটে, তখন তাকে কার্যবস্তুতে কারণের অন্বয় বলে। মৃত্তিকা কারণ ও ঘট কার্য। ঘটে যে মাটির উপলব্ধি হয়, তাকেই কার্যে কারণের অন্বয় বলে। যখন ঘট ভেঙে যায়, তখন আর ঘট থাকে না, কিন্তু কারণরূপ মৃত্তিকা পড়ে থাকে। একেই কার্য থেকে কারণের ব্যতিরেক বলে।  যখন জীব জাগ্রত অবস্থায় থাকে, তখন তাদের মধ্যে জ্ঞানস্বরূপে আমি বর্তমান থাকি, সুতরাং সৃষ্টি কালে জগতের সঙ্গে আমার অন্বয় থাকে। কিন্তু সমাধি অবস্থায় যখন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড লয় হয়ে যায়, তখনও আমি চৈতন্যস্বরূপে বর্তমান থাকি। অতএব অন্বয় ও ব্যতিরেক, এই উভয় অবস্থাতেই আমিই সত্য রূপে অবস্থান করি, সুতরাং আমিই সত্য আত্মা, বাকি সব মিথ্যা। তুমি পরম সমাধি অর্থাৎ একাগ্র চিত্তে আমার এই মতের অনুষ্ঠান করো, বিভিন্ন কল্পে যখন তুমি সৃষ্টি করতে থাকবে, “আমিই কর্তা” তোমার মধ্যে এই অভিমান কখনো স্পর্শ করতে পারবে না”

শ্রীশুকদেব বললেন, “শ্রীহরি জনগনের পরমেষ্ঠী অর্থাৎ পরম অধিপতি ব্রহ্মাকে এই উপদেশ দিয়ে তাঁর সামনে অন্তর্হিত হলেন। সর্বভূতময় ব্রহ্মা জোড়হাতে তাঁর বন্দনা করলেন এবং পূর্বকল্পের মতো বিশ্ব সৃষ্টিতে নিযুক্ত হলেন। শ্রীনারায়ণ ব্রহ্মাকে যে চতুঃশ্লোকী ভাগবত সংক্ষেপে উপদেশ করেছিলেন, ব্রহ্মা নিজের প্রিয় পুত্র নারদকে দশ লক্ষণযুক্ত ভাগবত পুরাণ সবিস্তারে বর্ণনা করেছিলেন। তারপর শ্রীনারদ সরস্বতীতীরে পরমব্রহ্মে ধ্যাননিরত মহাতেজা ব্যাসদেবকে এই ভাগবত উপদেশ করেছিলেন। এবার বৈরাজ পুরুষ থেকে এই বিশ্ব কিভাবে উদ্ভূত হল, আপনার এই প্রশ্নের এবং অন্যান্য সকল প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি, শুনুন”

পরের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /৭ "


নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /৭

  এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ "  এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ " এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ...