মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৯

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৮ 


৩৫ 

দুপুরের খাওয়ার পর ভল্লা আর রামালি গেল এদিকের মহড়ার মাঠে। ছেলেরা ঘাম আর মাটি মাখা শরীরে পূর্ণ উদ্যমে মহড়া করে চলেছে। ভল্লা কিছু বলল না, ওদের পাশে গিয়ে বসল। বিনেশ আর দীপান রণপা চেপে দৌড়তে দৌড়তে ভল্ল ছোঁড়ার মহড়া দিচ্ছিল। ভল্লা মন দিয়ে দেখল। খুশিই হল। চেঁচিয়ে বলল, “তোরা আগের মহড়াটা একবার করে দেখা তো। দেখি কেমন শিখেছিস, ভুলে গেলি কিনা?”

দুজনেই রণপা থেকে নেমে আগের মহড়াটা তিনবার করে দেখাল। নিখুঁত লক্ষ্যভেদ না হলেও, প্রায় নিখুঁত বলা যায়। ভল্লা ওদের ডাকল, বিনেশ আর দীপান হাঁফাতে হাঁফাতে এসে বসল ভল্লার সামনে। এবার রামালি, মইলি আর সুরুল নামল মহড়ায়। ভল্লা ভুরু কুঁচকে বলল, “রামালি বলছিল, তোরা নাকি ঠিকঠাক লক্ষ্যভেদ করতে পারছিস, কিন্তু কই একটু ফস্কে যাচ্ছে যে?” দীপান বিনেশের দিকে তাকিয়ে মাথা চুলকে বলল, “সে তো তোমার জন্যে -তুমি সামনে এসে দাঁড়ালেই বুকের ভেতরটা কেমন দুরদুর করে – তোমার মতো ঠিকঠাক পারবো তো?”

ভল্লা হেসে উঠল হো হো করে, বলল, “বোঝো, আমার ভয়ে তোদের হাত কাঁপছে! কিন্তু যুদ্ধে যখন নামবি, ওই সূক্ষ্ম ভুলের ওপরই তোদের জীবন-মৃত্যু নির্ভর করবে রে হতভাগা! লক্ষ্যভেদের সময় যুধিষ্ঠির এবং অন্য সকলে – ওখানে উপস্থিত সব্বাইকে দেখতে পাচ্ছিল – গুরুদেব দ্রোণকে, নিজেদের ভাইদের। আকাশ, গাছপালা, পাতা, ফুল – সবকিছু। আর অর্জুন দেখেছিল শুধু পাখির চোখ – আর কিচ্ছু না। অর্জুনের লক্ষ্যভেদের গল্প শুনিসনি?”

ভল্লার পাশে বসা ছেলেরা সকলেই ভল্লার কথা শুনল। কেউ কিছু বলল না। কথাবার্তার ফাঁকে সে রামালি, মইলি আর সুরুলের মহড়া দেখছিল মন দিয়ে। তিনজনেই নিখুঁত – প্রতিবার। ভল্লা খুব খুশি হল, বলল, “মনে হচ্ছে তোরা আজ দুপুরে খেতে যাসনি?”

“নাঃ যাইনি। আজ থেকে আর যেতে হবে না। বাড়ি থেকে খাবার দিয়ে যাবে”।

ভল্লা ভীষণ অবাক হল, “তার মানে?”

আহোক বলল, “প্রধানমশাইয়ের মৃত্যুটা গ্রামের সবাইকে নাড়িয়ে দিয়েছে ভল্লাদাদা। বাবা-কাকাদের তো বটেই, বিশেষ করে মা-কাকিমাদেরও। বলেছেন এতটা পথ হেঁটে তোরা খেতে আসবি, ফিরে যাবি...অকারণ সময় নষ্ট। তোদের আসতে হবে না, ঠিক সময়ে খাবার পৌঁছে যাবে। চাষের সময় ঠিক যেভাবে মাঠে খাবার পাঠায় বাড়ির মেয়েরা...সেভাবে”

ভল্লা অস্ফুট স্বরে বলল, “কী বলছিস”?  অনেকক্ষণ কেউই কোন কথা বলল না। মহড়া শেষে রামালি, মইলি আর সুরুলও এসে বসল ওদের সঙ্গে। “সকলের এই আশীর্বাদের মর্যাদা যে আমাদের রাখতেই হবে...” ভল্লা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “...সে কথা ভুলিস না। আয়, এবার ভাবনা চিন্তার মহড়া করা যাক”। ভল্লা মাঝখানে কিছুটা জায়াগা রেখে সকলকে গোল হয়ে ঘিরে বসতে বলল।

তারপর উঠে গিয়ে মাটিতে দাগ কাটতে লাগল, গাছের ছোট একটা ডাল দিয়ে। চৌকো ঘর কেটে বলল, “এই হচ্ছে ধর আস্থানের সীমানা। চারপাশেই কাঠের বেড়া আছে – আর দুপাশে আছে আস্থানে ঢোকার দরজা। পশ্চিমে রাজপথের সামনের দরজাটাই প্রধান, সারা দিন-রাত ওখানে কড়া প্রহরা থাকে। রাত্রে ছজন প্রহরী থাকবেই থাকবে। কিন্তু পূবের দরজাটা প্রায় সবসময়েই বন্ধ থাকে। একমাত্র পণ্যবাহী গোযান ঢোকা বা বেরোনোর সময়, ওই দরজা খোলা হয়। রাত্রে ওদিকেও প্রহরী থাকে, কিন্তু কম – খুব বেশি হলে দু-তিনজন। তারাও গভীর রাত্রে অন্ধকার কোনায় বসে ঝিমোয়।

এবারে লক্ষ্য কর। পূবদিকের দরজা দিয়ে ঢুকে, ডানদিকে রক্ষীদের থাকার জন্যে এই রকম বড়ো বড়ো দুটো ঘর আছে। তার পাশে পশুশালা। সেখানে থাকে বেশ কিছু ঘোড়া, কয়েকটা গাধা আর বলদ, কিছু দুধেল গাইও। তার পরেই কিছুটা জায়গা জুড়ে থাকে করাধ্যক্ষের পালকি, কিছু কাঠের শকট, গোশকট আরও অনেক ধরনের হাবিজবি কাজের দ্রব্য-যন্ত্রপাতি।

এবার আসছি এই উত্তরদিকে – এখানে পরপর বেশ কিছু ঘর আছে, যেখানে থাকে করণিক আর কাছারির কর্মচারীরা। তারপরেই এইখানে আছে বিশাল রান্নাঘর, আর তার পাশেই পাচক এবং নানান ভৃত্যদের থাকার জায়গা।

এবারে চলে আসছি এই পশ্চিমের দিকে। এদিকে আছে কোষাধ্যক্ষ, তার সহকারী কর্মচারী এবং একটু উচ্চপদের কর্মীদের থাকার জায়গা। ওখানে রক্ষীসর্দার উপানুও থাকে। কোষাধ্যক্ষ আর উপানুর ঘরের ঠিক মাঝখানে আছে কোষাগার। এই যে এইখানে একটু জায়গা ছেড়ে আরেকটা পাকশালা আছে এবং তার পাশেই ছোটছোট ঘরে থাকে পাচক ও বিশেষ ভৃত্যরা। এগুলো সবই করাধ্যক্ষ ও অন্য উচ্চপদের আধিকারিকদের জন্যে।

এবারে আসছি দক্ষিণ দিকে। এদিকে তিনখানা বড়োবড়ো ঘর আছে যেখানে শস্য জমা রাখা হয় – প্রয়োজন মতো ঘরের সামনেই বিশাল দাঁড়ি-পাল্লা খাড়া করা হয়। তাই দেওয়ালের ধারে ধারে রাখা থাকে ভারি ভারি লোহার ওজন। এক থেকে চল্লিশ সেরের। অন্ধকারে চট করে চোখে পড়বে না, কিন্তু পায়ে লেগে হোঁচট খেলেই সর্বনাশ। এই তিনটে শস্যভাণ্ডারের পাশেই – এই দক্ষিণপশ্চিম কোনায় - আছে বন্দীশালা। অবশ্য এই বন্দীশালাতে কবিরাজমশাইকেও রেখেছে কিনা আমি জানি না – সেটা দেখতে হবে। কারণ বন্দীশালায় সাধারণতঃ কর না দিয়ে পালিয়ে বেড়ানো লোকদেরই শাস্তির জন্যে রাখা হয়।

এবার আসি মাঝখানের খোলা জায়গাতে। এই যে এইখানে বসানো হয় করাধ্যক্ষের বিশাল শিবির। তার মধ্যেও তিনটে কক্ষ থাকে। একটায় ওঁনার কার্যালয়। এটা সভাকক্ষ – গোপন কথাবার্তার জন্যে। আর অন্যটা ওঁনার শয়ন এবং প্রসাধন কক্ষ। এই শিবিরের চারধারে বুক সমান উঁচু শক্ত বেড়া, তার বাইরে সাজানো ফুল গাছের সারি।

এই শিবির ছাড়া আস্থানের অন্যান্য সব ঘরই ইঁটের ঘর। অর্থাৎ স্থায়ী। কিন্তু শিবিরটা করাধ্যক্ষের সঙ্গে আসে এবং চলে যায়। করাধ্যক্ষের সঙ্গে অনেক লোকজন যেমন আসে, তাঁর সঙ্গে তারা চলেও যায়। কিন্তু কিছু কিছু লোক সারা বছরই থাকে। আস্থানের দেখাশোনা, টুকটাক কাজকম্ম করে...”।

  ভল্লা কথা শেষ করে বসল, বলল, “নকশাটা মাথার মধ্যে গেঁথে নে। একজায়গায় বসে দেখিস না। ঘুরে ঘুরে দেখ। তাতে দরজা দিয়ে ঢুকে বাঁদিকে কোনটা ডানদিকে কোনটা – মাথার মধ্যে বসে যাবে। দুটো কথা বলে রাখি – আমরা আস্থানে ঢুকব পূবের দরজা দিয়ে কারণ ওদিকের প্রহরা বেশ দুর্বল…। আর করাধ্যক্ষের শিবিরে আমরা ঢোকার চেষ্টাও করব না”।

ভল্লা চুপ করে বসে ছেলেদের লক্ষ্য করছিল আর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল ছেলেদের প্রশ্নের। ওরা যদি নকশা দেখে নিয়ে ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে যায়, তাহলে বুঝতে হবে ভল্লার এতদিনের পরিশ্রম এবং প্ররোচনার অনেকটাই বৃথা গিয়েছে।

প্রথম প্রশ্নটা করল, মইলি, “পূবের দরজা দিয়ে ঢুকে বাঁদিকের ঘরগুলো রক্ষীদের বললে না?”

সুরুল বলল, ”হুঁ রক্ষীদের। ভল্লাদাদা ওদের ঘরের চালগুলো কি টালির?”

ভল্লা হাসল, বলল, “হ্যাঁ। কেন পাতার ছাউনি হলে আগুন ধরাতিস? ওকথা ভুলেও ভাবিস না, আগুন লাগলে আস্থানের ওইটুকু জায়গায় এমন হুটোপাটি শুরু হবে – আমাদের আসল কাজই পণ্ড হয়ে যাবে”।

সুরুল বলল, “রক্ষীগুলোকে শুরুতেই কিছুটা জব্দ করতে পারলে…”

রামালি বলল, “ঘোড়াগুলোকে দড়ি কেটে তাড়িয়ে দেওয়া যায় না, ভল্লাদাদা?”

আহোক বলল, “উঁহু, সেটা শুরুতে করা যাবে না। মাঝ রাত্রে আচমকা ঘোড়ার দল ছুটতে শুরু করলে, তাদের ক্ষুরের শব্দে আস্থানের সকলেই সজাগ হয়ে যাবে। ঘোড়াদের তাড়াতে গেলে আমাদের কাজ সেরে বেরিয়ে আসার ঠিক আগে করতে হবে…”।

রামালি বলল, “হুঁ ঠিকই বলেছিস। কিন্তু ঘোড়ার সামনে গিয়ে দড়ি কাটবে কে? শুনেছি ওরা ভয় পেলে পেছনের জোড়াপায়ে এমন লাথি ছোঁড়ে - বুকে লাগলে – পাঁজর ভেঙে মৃত্যু অনিবার্য”।

সুরুল বলল, “আচ্ছা, আস্থানে ঢোকার পর আমরা দু তিনজন গিয়ে সব ঘরের শিকল তুলে দিই যদি… ব্যাটারা থাক না ভেতরে। রাত্রে কজন রক্ষী প্রহরায় থাকবে ভল্লাদা – জনা দশ-বারো?  সে আমরা সামলে নেব”।

বিশুন বলল, “বাঃ এটা ভালো বুদ্ধি”।

ভল্লা মুখে মুচকি হাসি নিয়ে বলল, “তোদের ভাবনা-চিন্তাগুলো বেশ ভালই ঠেকছে। এক কাজ কর – তোদের সবাইকে কালকের পুরো দিনটা সময় দিলাম। পরিকল্পনাটা নিয়ে নিজেদের মধ্যে চিন্তা কর। কে কোন কাজের দায়িত্ব নিবি সেটাও ঠিক করে ফেল। আজ রাত্রে আমি রামালিকে নিয়ে একটা কাজে যাবো…ফিরবো কাল রাত্রে। আমাদের পরশু সকালে আবার দেখা হবে। তা বলে মহড়ায় যেন এতটুকু ফাঁক না পড়ে। পরশু সন্ধের পর নতুন মহড়া শুরু হবে”।

“সে কি? অন্ধকারে দেখব কী করে?” দলের চার-পাঁচজন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল।

ভল্লা হাসল, বলল, “আলোর জন্যে মশালের ব্যবস্থা করা যাবে। আমরা তো অন্ধকারেই আস্থান আক্রমণ করব, তাই না? আধো অন্ধকারে লক্ষ্যভেদ করাটাও শিখতে হবে না?”

কেউ কিছু বলল না। ভল্লা একটু পরে বলল, “বিকেল শেষ হতে চলল, এবার তোরা বাড়ি যা। আর মনে রাখিস আজকের এই আলোচনার কথা ভুলেও কারও সঙ্গে আলোচনা করবি না। শল্কুর সঙ্গেও না। মনে থাকবে? যাবার আগে নকশাটা ভালো করে মুছে ফেল”।

মইলি বলল, “থাক না ভল্লাদাদা। ওটা থাকলে আমাদের আলোচনা করতে সুবিধে হবে তো”।

ভল্লা বলল, “উঁহু, মুছে ফেলতে হবে। যখন দরকার এঁকে নিবি, কিন্তু আলোচনার শেষে প্রত্যেকবার মুছতেই হবে। আমরা চলে যাবার পর কারো চোখে পড়ে গেলে – এবং সে যদি চতুর হয় – বুঝে ফেলবে সব”।

মইলি মাথা চুলকে বলল, “মুছে ফেললে, আঁকব কী করে – সবটা কী আর মনে আছে?”

বিশুন পাতা সমেত গাছের একটা ডাল নিয়ে এসেছিল, সেটা দিয়ে দাগগুলো মুছতে মুছতে বলল, “চিন্তা করিস না, আমার মনে আছে”। “আমারও” একে একে বলল, সুরুল, আহোক এবং আরও দু-একজন।

ভল্লা খুশি হয়ে হাসল, মইলির কাঁধে হাত রেখে বলল, “এবার বাড়ি যা। পরশু দেখা হবে”।

রামালি বলল, “ভল্লাদাদা, আমাদের সঙ্গে মইলি, বিশুন আর আহোক যাবে। ভল্লর জন্যে বাঁশের টুকরোগুলো কাটা আছে - নিয়ে যাবো সবাই মিলে”।

“কাটা হয়ে গেছে? বাঃ, এটা একটা কাজের কাজ হয়েছে”।

 ভল্লারা বাসায় ফিরে দেখল বালিয়া বসে আছে, বসে আছে বটতলির মিলা, জনারাও। জনাদের নিয়ে রণপাগুলো লুকিয়ে রাখার জায়গাটা দেখাতে নিয়ে গেল রামালি। আর ভল্লা তার পাথরের আসনে বসে বলল, “বালিয়া, এসে গেছিস? ভালই হয়েছে। রণপার কাজটা এখন কদিন বন্ধ থাক…তার আগে এই টুকরো বাঁশগুলোর আগায় ফলা বসিয়ে ভল্ল বানিয়ে দে তো চটপট…। কতগুলো আছে রে মইলি?”

“এখন ছাব্বিশ জোড়া আছে, আর দশ জোড়া হবে… ওগুলো পরে দেব”।

“ছাব্বিশ জোড়া – মানে বাহান্নটা ফলা, কতদিনে করতে পারবি, বালিয়া?”

“দিন চারেক”।

“বাঃ, তারপর রণপার কাজ শুরু করে দিবি, কেমন? তুই আহোক-মইলিদের সঙ্গে যা – বাঁশগুলো নিয়ে যেতে সুবিধে হবে। তোরা একটু বস, আমি আসছি – যাবো আর আসবো”।

ভল্লা অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। একটু পরেই রামালি ফিরে এল, ওদের দেখে বলল, “কী রে তোদের বসিয়ে রেখে ভল্লাদাদা কোথায় গেল?”

“জানি না। ভল্লাদাদা বলল, যাবো আর আসবো, তোরা বস”। রামালি প্রদীপ জ্বালাল, উনুনের সামনে কাঠকুটো যোগাড় করে রাখল। তারপর মাটিতে বসল ওদের সঙ্গে।

“কমলিমা কেমন আছে রে, আহোক?”

“ভালো না। আমি তো যেতে পারিনি। মা আর দিদির মুখে শুনেছি। কেমন যেন হয়ে গেছেন। প্রধানমশাই মারা যাওয়ার পর একবারের জন্যেও কাঁদেননি। ভাবতে পারিস?”

ভল্লা এসে ঢুকলো, ওদের কথার শেষটুকু শুনে জিজ্ঞাসা করল, “কে কাঁদেনি রে, আহোক?”

“কমলিমায়ের কথা বলছিলাম, ভল্লাদাদা”। ভল্লা হাতের বটুয়া থেকে চারটে রূপোর মুদ্রা বের করে, বালিয়ার হাতে দিয়ে বলল, “কমলিমা কাঁদবেন, ভাবিস না। তিনি আমাদের জন্যেই অপেক্ষা করছেন। এই চারটে রূপো আপাততঃ রাখ, বালিয়া। লোহার জন্যে কাজ যেন না আটকায়। আর দেখছিস তো, এরা কী রকম লড়ছে… তোরা তাড়াতাড়ি অস্ত্র দিতে না পারলে…আমাদের সব কাজই আটকে যাবে”।

“জানি ভল্লাদাদা”, বালিয়া বলল।

চারজনে চার বোঝা বাঁশের টুকরো পিঠে নিয়ে অন্ধকার জঙ্গলে মিশে গেল রণপা চড়ে।

ওরা চলে যেতে রামালি বলল, “পুকুর থেকে ঘুরে আসছি, ভল্লাদা”।

“আজ পাঁচজনের রান্না করিস। কাল সকালে আমাদের লাগবে”। রামালি বেরিয়ে গেল - তাকে রান্নার যোগাড় করতে হবে। 


চলবে...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৯

   এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য " ...