বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/১

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১




  তৃতীয় স্কন্ধ - প্রথম পর্ব


শ্রীশুকদেব বললেন, “অনেকদিন আগে, অখিলেশ্বর ভগবান কৃষ্ণ, আপনার (পরীক্ষিতের) পূর্বপুরুষ পাণ্ডবদের দূত হয়ে এসেছিলেন, তখন তিনি দুর্যোধনের প্রাসাদে বাস না করে, নিজের ঘর মনে করে, বিদুরের ঘরেই বাস করেছিলেনসেই সমৃদ্ধ ঘর ছেড়ে বিদুর বনে গিয়ে ভগবান মৈত্রেয়র সঙ্গে অনেক তত্ত্ব আলোচনা করেছিলেন”

মহারাজ পরীক্ষিৎ বললেন, “মহাত্মা বিদুরের সঙ্গে ভগবান মৈত্রেয়র কোথায় দেখা হয়েছিল? তাঁদের মধ্যে যে আলোচনা হয়েছিল, সে নিশ্চয় অত্যন্ত গভীর তত্ত্বকথা, সে বিষয়ে আমাকে সবিস্তারে জানান”

শ্রীসূত বললেন, “মহারাজ পরীক্ষিতের সাগ্রহ কৌতূহলে মহামুনি শুকদেব অত্যন্ত আনন্দ পেলেন, তিনি বললেন,

বিদুরের হস্তিনাপুর ত্যাগ

শ্রীশুকদেব বললেন, “অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র চিরকালই পুত্রস্নেহেও অন্ধ। ছোটবেলা থেকেই তিনি ও তাঁর পুত্রেরা পাণ্ডুপুত্রদের ক্ষতি করার বারবার চেষ্টা করেছেনতাঁর ছোটভাই পাণ্ডুর মৃত্যুর পর পাণ্ডবদের পাঁচভাই ও পাণ্ডবজননী কুন্তীকে জতুগৃহে পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনা করেছিলেন তাঁরা। সে পরিকল্পনা অবশ্য ব্যর্থ হয়েছিল ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও মহাত্মা বিদুরের সাহায্যে। এরপরে, যুধিষ্ঠিরের মতো সাধু ও সৎ ব্যক্তিকে পাশা খেলতে ডেকে, শঠতা করে হারিয়েছেন কয়েকবার। পাশার মিথ্যে চালে কেড়ে নিয়েছেন তাঁদের রাজ্য অধিকার রাজ্য থেকে বের করে, পাঠিয়েছেন বনবাসে। রাজা ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রেরা, পাণ্ডবদের পাঁচভাইয়ের স্ত্রী দ্রৌপদীকে রাজসভায় সকলের সামনে চরম অপমান করেছেন। পুত্রদের একের পর এক এই রকম কুকীর্তি দেখেও, রাজা ধৃতরাষ্ট্র নীরব থেকেছেন সর্বদা।

পাণ্ডবরা বনবাসের পর ফিরে এলে, দুর্যোধন কথা দিয়েছিলেন, তাদের রাজ্য আবার ফিরিয়ে দেবেন। কিন্তু বাস্তবে, পাণ্ডবরা যখন ফিরে এলেন, তাঁদের দাবি মানলেন না রাজা দুর্যোধন। এই রকম পরিস্থিতিতে পাণ্ডবদের কাছে সরাসরি যুদ্ধ করা ছাড়া আর কোন পথ খোলা রইল না। কিন্তু তাও ধর্মপ্রাণ যুধিষ্ঠির, যুদ্ধ ঘোষণার আগে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র আর রাজা দুর্যোধনের কাছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে দূত হিসেবে পাঠালেন, শান্তির শেষ চেষ্টায়। সে চেষ্টাও ব্যর্থ হল। রাজা দুর্যোধন, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের সামনেই শ্রীকৃষ্ণকে অপমান করলেন এবং তাঁর প্রস্তাব উড়িয়ে দিলেন এককথায়।

এই ঘটনায় ভয় পেয়ে, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র একদিন ছোটভাই বিদুরকে পরামর্শের জন্যে ডাকলেনমহাত্মা বিদুর সেদিন যে কথা বলেছিলেন – সেই সব কথা পরে বিদুর-বাক্য হিসেবে সবাই জেনেছে।

বিদুর বললেন, “হে মহারাজ, যুধিষ্ঠির ও তার পরিবার আজ যে দুঃসহ অপমান ও দুঃখ ভোগ করছে, তার জন্যে তো তুমিই দায়ী।  আজ অর্জুন ও ভীমের মতো মহাবীর আমাদের বিরুদ্ধে রাগে গর্জন করছে। শ্রীকৃষ্ণ কোন সাধারণ মানুষ নন, একথা আপনারা এখনো কেউ বোঝেননি, তিনি স্বয়ং ভগবান। কুন্তীর ছেলেদের সঙ্গে তিনি নিজে আছেন পরমবন্ধু ও আত্মীয় হয়ে। তিনি সঙ্গে থাকা মানে ভারতের অধিকাংশ রাজা, দেবতা, ব্রাহ্মণ ও যদুবীররাও পাণ্ডবপক্ষেই থাকবেন। 

অতএব, হে মহারাজ, এখনো সময় আছে। শ্রীকৃষ্ণকে সম্মানের সঙ্গে ফিরিয়ে আনুন। ফিরিয়ে দিন যুধিষ্ঠিরদের প্রাপ্য রাজ্যভাগ। আপনার এই পুত্রেরা নীতি মানে না, ধর্ম মানে না, ভগবানকে মানে না। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মতো পরমপুরুষকে অপমান করে। আপনার এই পুত্রেরা হতশ্রী, মূর্তিমান অমঙ্গল। আপনি যত তাড়াতাড়ি আপনার এই পুত্রদের, বিশেষ করে দুর্যোধনকে ত্যাগ করবেন, তত তাড়াতাড়ি এই কুরুবংশে, এই হস্তিনাপুরনগরে এবং এই রাজ্যে মঙ্গল ফিরে আসবে”

বিদুর যখন মহারাজকে এই কথা বলছিলেন, দুর্যোধন, দুঃশাসন, কর্ণ, শকুনি সকলেই সামনে ছিলেন। বিদুরের কথায় রাগে আগুন হয়ে উঠলেন দুর্যোধন, তিনি চিৎকার করে বিদুরকে বললেন, “এই দাসীর ছেলেকে, কে এখানে ডেকে আনল? এই দুশ্চরিত্র লোকটা আমাদের অন্নে বেঁচে আছে, কিন্তু সর্বদা শত্রুপক্ষের হয়ে কাজ করে চলেছে। একে প্রাণে মের না। এর থেকে সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে, একে রাজপুরি থেকে তো বটেই, এই রাজ্য থেকেও তাড়িয়ে দাও”

মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের সামনেই দুর্যোধনের এই কথায় বিদুর একটুও বিচলিত হলেন না। তিনি দুঃখও পেলেন না। তিনি মনে মনে ভাবলেন – এ সবই মায়ার লীলা। কুরুবংশ এখন দৌড়ে চলেছে নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে, সেখান থেকে পরিত্রাণের আর উপায় নেই। যিনি এর সমাধান করতে পারতেন, সেই মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র এখনও নীরব। বিদুর আর দেরি করলেন না, আরো কেউ কিছু বলার আগেই তিনি হস্তিনাপুর ছেড়ে এবং রাজ্য ছেড়ে সেই দিনই বেরিয়ে গেলেন। 

দেশভ্রমণ শেষে বিদুরের সঙ্গে উদ্ধবের সাক্ষাৎ

নগর হস্তিনাপুর ছেড়ে, বিদুর বেরিয়ে পড়লেন তীর্থভ্রমণে। যে সমস্ত স্থানে ভগবান বিষ্ণু, ব্রহ্ম এবং রুদ্রের মন্দির আছে, মূর্তি আছে। সেই সব স্থানই পবিত্র তীর্থ। মহাত্মা বিদুর সেই সব তীর্থ দেখে বেড়াতে লাগলেন। সেই সব তীর্থ ভ্রমণের সঙ্গে সঙ্গে তিনি দেখতে লাগলেন অজস্র পাহাড়, পর্বত, অরণ্য, বন-উপবন, নগর, গ্রাম, জনপদ, নদী, সরোবর। তিনি শ্রীকৃষ্ণ ভগবানে নিজের সমস্ত চিন্তা ও মনন সমর্পণ করে, আহারের সংযম করে শুধু ফল খেয়ে থাকতেন। মাটিতে, গাছের তলায় শুয়ে রাত কাটাতেন। তীর্থের জলে স্নান করতেন, পান করতেন। রাজপ্রাসাদের বেশ ছেড়ে তিনি গাছের ছাল পড়ে থাকতেন।

সারা ভারতভূমি ঘুরে তিনি এসে পৌঁছলেন প্রভাসতীর্থে। সেখানে এসে তিনি সংবাদ পেলেন, হস্তিনাপুরের সিংহাসনে এখন যুধিষ্ঠির, শ্রীকৃষ্ণের সাহায্যে তিনিই এখন একচ্ছত্র রাজা। শুনলেন কুরুক্ষেত্রে আঠারো দিনের যুদ্ধে ধৃতরাষ্ট্রের সমস্ত পুত্রেরাই মারা গিয়েছেনএই সংবাদ পেয়ে তাঁর মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেল। তিনি হাঁটতে লাগলেন সরস্বতীর উৎসের দিকে। পথে অনেকগুলি তীর্থে স্নান করলেন, বহু বিষ্ণুক্ষেত্র দেখে তাঁর মন কিছুটা শান্ত হল। এই সব মন্দির দেখলেই তাঁর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা মনে পড়ে যায়। তাঁর খুব জানার ইচ্ছা হল শ্রীকৃষ্ণ কেমন আছেনআর এই সময়েই তাঁর দেখা হয়ে গেল শ্রীকৃষ্ণ সহচর উদ্ধবের সঙ্গে।

উদ্ধবের সঙ্গে দেখা হতেই তিনি আনন্দে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। তাঁর মনের ইচ্ছাই যেন উদ্ধবের মধ্যে উপস্থিত হল। তিনি অধীর আগ্রহে জিজ্ঞেস করলেন, “হে উদ্ধব, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভালো আছেন তো? কৃষ্ণপিতা বসুদেব কেমন আছেন? কেমন আছেন, কৃষ্ণ পুত্র প্রদ্যুম্ন, শাম্ব? কেমন আছেন মহারাজ উগ্রসেন? সাত্যকি ভালো আছেন? শ্রীকৃষ্ণের পত্নী রুক্মিণী, জাম্ববতী নিশ্চয়ই কুশলে আছেন? পথের ধুলোয় কৃষ্ণের পায়ের চিহ্ন দেখে যিনি ব্যকুল হয়ে যান, সেই অক্রুর, কেমন আছেন? যিনি স্বয়ং বিষ্ণুকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন, সেই মহা পুণ্যবতী কৃষ্ণজননী দেবকী কেমন আছেন? অনিরুদ্ধ, কেমন আছেন? হৃদীক ও  সত্যভামার পুত্র চারুদেষ্ণ ও গদ কেমন আছেন?

আর ওদিকে যুধিষ্ঠির রাজা হয়ে রাজধর্ম যথাযথ পালন করছে তো? কৌরব বিনাশের পর অত্যন্ত রাগী বীর ভীমের রাগ কমেছে? কিরাতরূপী মহাদেবও যাঁর তির চালনায় খুশি হয়েছিলেন, সেই মহাবীর অর্জুন ভালো আছে? মাদ্রী সতীন হলেও তাঁর পুত্রদের, মাতা কুন্তী নিজের ছেলের মতোই স্নেহ করেন, সেই নকুল ও সহদেব কেমন আছে?  কুন্তীর কথা আর কি জিজ্ঞেস করবো? মহাবীর পাণ্ডুর মতো স্বামীর মৃত্যুর পরেও তিনি যে জীবন ধারণ করে আছেন, সে শুধু এই পুত্রদের জন্যে;  জীবনের সুখভোগের জন্যে নয়।  মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের জন্যে আমার দুঃখ হয়, হে উদ্ধব। নিজের দুরাত্মা ছেলেদের কথায় মৃত ছোট ভাই পাণ্ডুর ছেলেদের কি কষ্টই না দিয়েছেন। আমাকেও তাঁর রাজ্য থেকে তিনি নির্বাসিত করেছিলেন।

এসব সত্ত্বেও আমি কিন্তু একটুও অবাক হই না, উদ্ধব। এ সবই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মায়া। ছোটবেলা থেকে দুর্যোধনরা যখন পাণ্ডুর ছেলেদের উপর অত্যাচার করতে শুরু করল, শ্রীকৃষ্ণ তখনই তাদের শেষ করতে পারতেন। কিন্তু করেননি। তিনি তখন অন্যান্য দুর্দান্ত ও নিষ্ঠুর রাজাদের বিনাশে ব্যস্ত ছিলেন, যাঁদের অত্যাচারে দেশের সাধারণ ভক্ত ও ধার্মিক মানুষ নিদারুণ কষ্ট পাচ্ছিল। তিনি দুর্যোধনদের ধর্ম পথে আসার সুযোগ দিয়েছিলেনতিনিই যে পরমপুরুষ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং তিনি পৃথিবীতে এসেছেন দুষ্টের দমন করতে, একথাটা দুর্যোধনরা বুঝলই না। ঈর্ষা, মোহ আর অহংকারে অন্ধ হয়েই রইল দুর্যোধন আর তার সকল সঙ্গীরা। ফল যা হবার তাই হল”

উদ্ধবের সংক্ষেপে শ্রীকৃষ্ণমহিমা বর্ণনা

শ্রীশুকদেব বললেন, “বিদুরের এই কথায় উদ্ধব যেন অসাড় হয়ে গেলেন। মাত্র পাঁচ বছর বয়েস থেকেই উদ্ধব কৃষ্ণভক্তিতে ব্যাকুল। খেলার পুতুলকে কৃষ্ণ ভেবে তিনি ওই বয়সেই স্নান খাওয়া ভুলে থাকতেন। আজ এই বৃদ্ধ বয়সে মহাত্মা বিদুরের মুখে কৃষ্ণ কথা শুনে তিনি নিজেকে সামলাতে পারলেন না। তাঁর সারা শরীর শিউরে উঠল, তাঁর দুচোখে বইতে লাগল অশ্রুধারা।

কিছুক্ষণ পর নিজেকে একটু সামলে নিয়ে উদ্ধব বললেন, “হে বিদুর, কৃষ্ণসূর্য অস্ত গেছে। তোমাকে আর তাঁর কি মঙ্গল সংবাদ দেব? আমাদের দুর্ভাগ্য, দুর্ভাগ্য যাদবদের। জলের মধ্যে চাঁদের ছায়া পড়লে মাছরা তাঁকে জলচর জীব বলেই মনে করে, চাঁদ বলে বুঝতে পারে না।  সেরকম যাদবরা কৃষ্ণের সঙ্গে এতদিন থেকেও তাঁকে পরমপুরুষ বলে চিনতেই পারল না। এও কৃষ্ণের মায়া। তিনিই কাউকে বুঝতে দিলেন না, আসলে তিনি কে? তাঁর মায়ায় আচ্ছন্ন হয়েই রইল সমস্ত যদুকুল।

ভগবানের আদি নেই, শেষ নেই। জন্ম নেই, মৃত্যু নেই। জীবের মঙ্গলের জন্যে যোগমায়ার প্রভাবে তিনি নররূপে এলেন। কিন্তু দেখ, সে রূপ এমনই যে চোখ ফেরানো যায় না। সৌন্দর্যের শেষকথা। অলংকার তাঁর অঙ্গের কি শোভা বাড়াত, বরং তাঁর সুকুমার অঙ্গই অলংকারের শোভা বাড়াত। যাঁর শক্তির শেষ নেই, সেই ভগবান অসহায় শিশুর মতো কংসের কারাগারে জন্ম নিয়েছিলেন। তিনি কংসের ভয়ে মথুরা ছেড়ে, নিজের মাকে ছেড়ে, ব্রজে বড়ো হলেন। কংস বধের পর, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কারাগারে বন্দী মা ও বাবাকে প্রণাম করে বলেছিলেন, কংসের ভয়ে আমি তোমাদের সেবা করতে পারিনি, আমাকে তোমরা ক্ষমা করো। এসব কথা মনে পড়লে আমার মন ব্যথায় ভরে ওঠে, বিদুর। আবার মনে হয় এ সবই তো তাঁর লীলা।

তুমিও তো যুধিষ্ঠিরের সেই রাজসূয় যজ্ঞে ছিলে, বিদুর। যেখানে শিশুপাল, চরম অপমান এবং বিদ্বেষ করেও ভগবানের চরণ লাভ করেছিলেন। তুমি ছিলে না, তাই তুমি দেখনি বিদুর, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে অর্জুনের তিরে প্রাণ দেবার সময়, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুধুমাত্র করুণা দৃষ্টিতেই মুক্তি পেয়ে গেল কত ক্ষত্রিয়বীর! প্রতিটি মৃত্যুই হয়ে উঠল ভগবানের চরণে জীবন উৎসর্গের সমান, তাঁরা সকলে পৌঁছে গিয়েছেন কৃষ্ণের পরমধামে।

যিনি ত্রিগুণের অতীত, যিনি পরম ঐশ্বর্যশালী। যাঁর সমতুল্য ব্যক্তি জগতে আর কেউ নেই, কাজেই তাঁর চেয়ে উত্তম আর কে হতে পারে? সেই ব্যক্তিকেও নত হয়ে রাজা উগ্রসেনকে, “হে দেব, দয়া করে আমার নিবেদন শুনুন” বলতে শুনেছি তাঁর এই দাসভাব দেখে, আমরা যারা শুধু তাঁরই দাস, অবাক হয়েছি, দুঃখ পেয়েছি। তাঁর দয়ার কথা কি বলব, বিদুর? শিশুকৃষ্ণকে হত্যা করবে বলে পূতনা রাক্ষসী নিজের স্তনে কালকূট বিষ মাখিয়ে এসেছিল, সেই রাক্ষসীর স্তন্য পানের সময়েই তাকে হত্যা করে, জননীরূপেই তাকে কৃষ্ণ উদ্ধার করেছিলেন।

হে বিদুর, ব্রহ্মার প্রার্থনায় রাজি হয়ে, স্বয়ং ভগবান পৃথিবীর মঙ্গলের জন্যে বসুদেবের পুত্র হয়ে মাতা দেবকীর গর্ভে জন্ম নিয়েছিলেন। পিতা বসুদেব দুর্ধর্ষ কংসের ভয়ে তাঁকে ব্রজপুরে নন্দের পত্নী মা যশোদার কাছে রেখে আসেন। সেখানে নিজের মহিমা গোপন রেখে, তিনি দাদা বলরামের সঙ্গে এগারো বছর ছিলেন। যমুনাতীরের সুন্দর উপবনে গোপবালকদের সঙ্গে তিনিও রোজ গোরু চড়াতেন, আর তাঁর বাঁশির মোহনসুর তুলে, সকল গোপবালকের মধ্যমণি হয়ে খেলে বেড়াতেন। তাঁকে হত্যা করার জন্যে কংস বহুবার মায়াবি অসুরদের পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু বালকরা খড়ের তৈরি সিংহের পুতুলকে যেমন অনায়াসে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে, তিনিও সেই ভয়ংকর অসুরদের বিনাশ করেছিলেন।

একবার কালিয়হ্রদের বিষজল পান করে অনেক গোপবালক ও গরু অচেতন হয়ে গিয়েছিল। শ্রীকৃষ্ণ কালিয় নাগকে দমন করে, সেই জলকে নির্বিষ করেছিলেন এবং সমস্ত গোপবালক ও গরুকে সুস্থ করে তুলেছিলেন। একবার ইন্দ্রপুজো বন্ধ করে, কৃষ্ণের উপদেশে মহারাজ নন্দ গোযজ্ঞের অনুষ্ঠান করেছিলেন। এই ঘটনায় দেবরাজ ইন্দ্র ক্রুদ্ধ হয়ে প্রবল বৃষ্টিপাত করে ব্রজবাসীদের ভয়ার্ত করে তুলেছিলেনতাদের পরিত্রাণের জন্যে, কৃষ্ণ গোবর্ধনগিরিকে ছাতার মতো তুলে ধরে সেই বৃষ্টিধারা রোধ করেছিলেন। আবার এই কৃষ্ণই এক কার্তিকী পূর্ণিমায় মধুর গান গেয়ে, গোপযুবতীদের সঙ্গে খেলা করে, সকলকে মুগ্ধ করেছিলেন”

চলবে... 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/১

 এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ "  এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ " এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও...