শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৪

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৩ 


১৪ 

চিঠিটা শেষ করে সুনেত্র একটা সিগারেট ধরাল। মধ্যরাত্রি এখন, ঘড়িতে সোয়াদুটো। ঘরের সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। সামনে রাস্তার ধারে স্ট্রিট লাইট – রাত্রিতেও নিশীথের বোধ আনতে দেয় না নাগরিক সভ্যতায়। জনহীন আলোকিত পিচের রাস্তাটা যেন লম্বা হয়ে শুয়ে আছে আরামে। দু একটা কুকুর এদিক ওদিক থেমে থেমে কিছু শুঁকতে শুঁকতে হেঁটে বেড়াচ্ছে অকারণ। ওদিকের বড়ো বকুল গাছের ঝাঁকড়া মাথায় একটা বাচ্চা কাক – থেকে থেকে ডেকে উঠছে। বাচ্চাটার মা-কাকটা বাসা থেকে উড়ে যাচ্ছে এদিক সেদিক খাবারের সন্ধানে। শহরের পথে ঘাটে কাকদের খাওয়ার মতো কিছু না কিছু আবর্জনা সর্বদাই পড়ে থাকে। বিশেষ করে মোড়ের মাথায় বিকেল থেকে রাত দশটা পর্যন্ত বসে, নানান মুখরোচক খাবারের অস্থায়ী পসরা। রাস্তায় পড়ে থাকা বা ফেলে যাওয়া খাদ্যের সেই অবশিষ্টাংশ থেকেই মা-কাক কিছু কিছু তুলে এনে ফিরে আসছে বাসায় – ক্ষুধার্ত বাচ্চাটা মায়ের মুখ থেকে খাবার নেওয়ার সময় গলা থেকে আনন্দের অদ্ভূত আওয়াজ তুলছে।

 অধিকাংশ জীবজগতে প্রকৃতি মাতৃত্বকে আশ্চর্য এক দায়িত্ববোধ উপহার দিয়েছে। সে দায়িত্ব কোন কারণে বিপন্ন হওয়ার উপক্রম হলেই, মা-নামক জীবসত্ত্বাটি ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে। সে প্রাণপণ চেষ্টা করে তার বাচ্চাকে সেই বিপদ থেকে বাঁচানোর। ওই বিনিদ্র কাক-মা এই মধ্যরাত্রেও তার ক্ষুধার্ত ছানাটির জন্য খাদ্য সংগ্রহের চেষ্টা করে যাচ্ছে। যদি এখনই কোন ব্যক্তি ওই গাছের নীচে এখন দাঁড়ায়, এবং গাছের ওপরের দিকে সন্দেহজনক ভাবে তাকায়, ওই কাক-মা সতর্ক হবে। সজাগ করে তুলবে ওর আশেপাশে থাকা কাক-সমাজকেও। তারপর বিপজ্জনক মনে হলে সকলে মিলে লড়তে শুরু করবে বিপদটিকে তাড়াতে।

কনির ক্ষেত্রেও যেন ব্যাপারটা সেরকমই ঘটেছিল। ওর শ্বশুরবাড়ির প্রতিকূলতার সঙ্গে অনেকটা অ্যাডজাস্ট করে কনি নিজের জীবনটাকে কিছুটা হলেও যেন বাজি রেখেছিল। কিন্তু নিজের সন্তান আসার পরেই সে বুঝেছিল, সেই প্রতিকূলতাকে আর প্রশ্রয় দেওয়াটা হয়ে উঠবে বিপজ্জনক। তার পক্ষে তো বটেই, কিন্তু তার চেয়েও বড়ো কথা তার সন্তানের পক্ষে। একটা শিশু বড়ো হয়ে ওঠে মায়ের এবং বাবার ছায়ায়, আশেপাশে আরও থাকেন ঠাকুমা-দাদু, আত্মীয়-পরিজন। এসবের মধ্যে সন্তানের পিতা এবং ঠাকুমাই যদি নির্ভরযোগ্য না হয়, সন্তান বড়ো হওয়ার আগেই হয়ে উঠবে অসুস্থ। শারীরিক না হোক, মানসিক অসুস্থ তো বটেই। অতএব, এ কথা পরিষ্কার, ওই সময়ে কনির হাতে খুব বেশি অপশন তেমন ছিল না। অপশন ছিল দুটো, নিজের জীবনের মতো সন্তানের বড়ো হয়ে ওঠার প্রত্যেকটি দিনকে অ্যাডজাস্ট করে নেওয়া অথবা সমস্ত প্রতিকূলতা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। খুব স্বাভাবিক ভাবেই কনি দ্বিতীয় অপশনটাই বেছেছে।

এই বিষয়টাতে সুনেত্র তেমন অবাক হয়নি। কিন্তু তার কাছে আশ্চর্যের বিষয় হল, তার মা সুকুর এই বৈবাহিক সম্পর্কের টানাপড়েনের কথা তাকে প্রায় কিছুই বলেননি। কেন? তিনি যে এ ব্যাপারের কিছুই জানতেন না, এমন হতেই পারে না।

একথা সত্যি চণ্ডীগড়ের পড়া শেষ করে, কর্মসূত্রে সে প্রায় আট-দশ বছর দিল্লি-হরিয়ানার বিখ্যাত কয়েকটি হসপিটালের সঙ্গে সে নিজেকে যুক্ত রেখেছিল। তার মুখ্য কারণ কলকাতার তুলনায় ওদিকের বিখ্যাত প্রাইভেট হসপিট্যালগুলির কাজের পরিবেশ অনেকটাই উন্নতই ছিল। তাছাড়া, ওরা যথেষ্ট লোভনীয় ফেসিলিটি এবং রেমিউনারেশনও দিত। অন্য আরেকটি একটি কারণ হল, কলকাতায় ফিরে এসে জীবিকার সন্ধান করে স্থায়ীভাবে ফিরে আসার কোন ইচ্ছাই তার মনের মধ্যে সেই সময় স্থান পায়নি। অবশ্যই, এই দ্বিতীয় কারণের পিছনে ছিল, তার জীবনে কনির না আসা, এবং কনির বিয়ে হয়ে যাওয়া। তার মনের গোপন এই কথাটা কি মা এবং পিসিমা বুঝতে পেরেছিলেন?

কিন্তু ঘটনা যাই হোক, সুনেত্রর সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ তো কোনদিনই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। মোটামুটি নিয়মিতই - এক-দেড়মাস অন্তর সে কলকাতায় যাওয়া আসা করেছে। কলকাতায় এলে পিসিমা-পিসেমশাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে যায়নি, তেমন একবারও হয়েছে বলে তো তার মনে পড়ছে না। সে সময় কনির সঙ্গেও তার দেখা হয়েছে অনেকবার। মা-বাবা, পিসিমা-পিসেমশাই একসঙ্গে তার হরিয়ানা এবং পরে দিল্লির বাসাতেও বেশ কয়েকবার গিয়েছেন। ওঁদের নিয়ে সে আনন্দ করেই দিল্লি, আগ্রা, ফতেপুরসিক্রি, মথুরা, বৃন্দাবন, কুরুক্ষেত্র, পানিপথ এবং চণ্ডীগড়, অমৃতসর পর্যন্ত ঐতিহাসিক এবং পৌরাণিক সকল দর্শনীয় স্থানেই গিয়েছে। কিন্তু কেউ কোনদিন কনির এই বিপর্যয়ের কথা তাকে ঘুণাক্ষরেও জানতে দেননি কেন?

চণ্ডীগড় থেকে পাশ করে বেরোনোর পরেই তার বিয়ের জন্যেও উঠে পড়ে লেগেছিল, সুনেত্রর মা এবং পিসিমা। দুজনের থেকেই সে বারবার শুনেছিল, সুনেত্রর মতো “লাখে এক” বর পাওয়ার জন্যে চেনা-শোনা এবং পরিচিত মহলের বিবাহযোগ্যা কনারা নাকি চতুর্দশীতে শিবের মাথায় জল ঢালছেন বালতি বালতি। সেই জল অপচয় বন্ধ করার জন্যেই আমার বিয়ে হওয়াটা জরুরি। আমার জন্যে এই বিবাহ প্রস্তাবের প্রবল প্রকোপ চলেছিল প্রায় বছর ছয়েক। তারপর ধীরে ধীরে সকলেই ক্লান্ত হয়ে পড়লেন, বিষণ্ণ হলেন এবং একসময় সকলে ক্ষান্তও হলেন।

তাঁদের ক্ষুব্ধ মনের শেষ খেদোক্তি ছিল, “হ্যারে সত্যিসত্যিই তুই বিয়ে করবি না...এ কি ধনুকভাঙা পণ রে তোর? তোকে আজীবন আগলে রাখতে আমরা কেউই থাকব না, একথাটা মনে রাখিস। আমরা যখন চোখ বুজবো তখন টের পাবি কত ধানে কত চাল। বুড়ো বয়সে তখন বাধ্য হয়ে ছাদনাতলায় দাঁড়াবি টাকে টোপর পরে। আমরা তো আর তখন দেখতে আসবো না - যা পারিস করিস...”।

সে সব কথা মনে পড়ে যাওয়াতে সুনেত্র মুচকি হাসল। বহু বছর হল সে তার মা-বাবা, পিসিমা-পিসেমশাই সবাইকেই হারিয়েছে। কিন্তু আজও তাঁরা সকলেই উজ্জ্বল হয়ে বিরাজ করছেন তার স্মৃতিতে। তাঁদের অকুন্ঠ স্নেহ-ভালোবাসা, প্রশ্রয় ও হিতাকাঙ্ক্ষার স্মৃতি আজও তাকে জীবনের সঠিক পথচলার দিশা নির্দেশ করে।

তার বাবা মারা যাবার সঙ্গেসঙ্গেই সে দিল্লি থেকে পাততাড়ি গুটোনোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং বিখ্যাত কর্পোরেট হসপিটালের ঊর্ধতন কমিটিতে সে নির্দ্বিধায় জমা করেছিল তার ত্যাগপত্র। কিন্তু কমিটি তার ত্যাগপত্র নাকচ করে প্রস্তাব দিয়েছিল, “রিজাইন করছেন কেন? আপনি জানেন কলকাতা এবং হলদিয়ায় আমাদের এই কর্পোরেট হসপিট্যালের ব্র্যাঞ্চ রয়েছে। আপনার যেখানে সুবিধে, আপনি স্বচ্ছন্দে জয়েন করতে পারেন, একই শর্তে এবং একই রেমিউনারেশনে”। এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার কোন কারণই সুনেত্র খুঁজে পায়নি, অতএব সে সানন্দেই কমিটির প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছিল এবং জয়েন করেছিল হলদিয়ায়। দীর্ঘদিন দিল্লিতে থাকার অভ্যাসে, সুনেত্র কলকাতার শহরের জটিল রাজনৈতিক আবর্তে মানিয়ে নিতে অসুবিধে হওয়ার কথা চিন্তা করেই, হলদিয়াতে জয়েন করেছিল। সেদিন তো বটেই, আজও তার মনে হয়, কলকাতার থেকে হলদিয়ার রাজনৈতিক জটিলতা কিছুটা হলেও কম। রাজনীতি ব্যাপারটা তো আর লোকসভা বা বিধানসভার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তার বিস্তার সর্বত্র। কর্পোরেট কোম্পানির উচ্চতম স্তর থেকে নিম্নতম স্তর পর্যন্ত তার অবাধ যাতায়াত।

অতএব রাজধানীর পাট চুকিয়ে সে হলদিয়াতেই স্থায়ী ভাবে চলে এসেছিল। বাবার ক্রিয়া-কর্ম শেষে মাকেও সঙ্গে নিয়ে এসেছিল তার হলদিয়ার কোয়ার্টারে। মা অবশ্য একটু আপত্তি করেছিলেন, বলেছিলেন, “আমার স্বামী-শ্বশুরের ভিটে ছেড়ে তোর সঙ্গে হলদিয়ায় গিয়ে থাকব, কোন দুঃখে, সুনু?”

সুনেত্র বলেছিল, “আমার দুঃখে, মা”।

“সে আবার কি? তোর আবার দুঃখ কিসের?”

“আমার ঘরে যে ভাত-জল করার কোন লোক নেই, মা। ঠিক সময় মতো আমার বিয়েটা তো দিলে না...! এখন তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে বলো, যে তোমার সুনুর মর্জিমাফিক ঠিকঠাক তিনবেলা ভাত-জলের যোগাড় করে দেবে?”

সুনেত্রর পিঠে তার মা আদরের থাবড়া মেরে হেসে বলেছিলেন, “এখনও বেলা বয়ে যায়নি, সে লোক গোকুলে বাড়ছে। তুই একবার হ্যাঁ বললেই, তোর কাছে তাকে হাজির করে দেব, সুনু। তোর বাবার বাৎসরিক কাজ মিটলেই তোদের চার-হাত এক হয়ে যাবে”।

“হুঁঃ, তোমার এই দামড়া ছেলেকে বিয়ে করার জন্যে মেয়ের বাবারা এবং মেয়েরাও একেবারে জলছাড়া মাছের মতো হাঁকপাঁক করছে বৈকি! তুমি তোমার এই ছেলেটিকে আজও হীরের আংটি বিশেষ মনে করো, তাই না, মা? হীরে-টিরে কিচ্ছু নয়, আসলে পলকাটা কাচের, যাকে আমেরিকান ডায়মণ্ড বলে। সত্যি বলতে, আমি খুব ভয় পাই মা। পরের ঘরের কোন মেয়ে এসে ঘাড়ে চাপবে। সে অহর্নিশ আমাকেই বোঝাতে চাইবে, আমি আমার বাবা-মায়ের আসল রূপটাই চিনি না, জানি না। আমার ওই বাবা, মা, পরিজন সব্বাই কুচুটে, বদমাইশ নাম্বার ওয়ান...। সংসার নামক একটি আজব সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার জন্যে, আমাকে চুপ মেরে ভ্যাবলাকান্ত সেজে থাকতে হবে। তোমাদেরকে দূরে ঠেলে দিয়ে, চিনেও যেন চিনি না এমন ভান করতে হবে...। না মা, অত ঝক্কি আমার পোষাবে না... এই বেশ আছি। তুমি যদি আমার সঙ্গে একান্তই না যেতে চাও, তোমাকে জোর করব না। নিজেদের দুবেলা দুমুঠো ভাত-ডাল যোগাড়ের আশায়, আমাকে দুবেলা রান্না করে দেওয়ার মানুষ, ভারতবর্ষে অজস্র অঢেল পাওয়া যায়, মা। তাতেই আমার চলে যাবে...”।

সুনেত্রর এই কথার পর নিজের গোঁ ধরে ছেলের সঙ্গে যাবেন না, কোন মায়ের পক্ষেই বলা সম্ভব না। সুনেত্রর মাও পারলেন না। উঠে যাওয়ার সময় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “তোমার মন যে কোথায় বাঁধা আছে সে কি আর আমি বুঝি না, বাপু - সব বুঝি। কবে যাবি হলদিয়া, আমিও যাব তোর সঙ্গে, ব্যাগ-ট্যাগ গোছানোর সুযোগ দিবি তো?”

সুনেত্র অবাক হয়ে বলেছিল, “কী বোঝো তুমি, মা? আমার মন কোথায় বাঁধা আছে?”

“সে সব তো কবেই চুকেবুকে গেছে, ভেবে আর লাভ কি?  কবে যেতে হবে বলিস। কটা দিন সময় দিস, আমাকে এদিকটাও গুছিয়ে যেতে হবে তো...”।  

এই কথাটুকুর মধ্যে মা কোন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন স্পষ্ট হয়নি সুনেত্রর কাছে। কখনো মনে হয়েছে কনির সঙ্গে তার সম্পর্কের কথাই বলতে চেয়েছিলেন। কখনো মনে হয়েছে কনি নয়, মায়ের হয়তো অন্য কোন মেয়েকে পুত্রবধূ করে ঘরে নিয়ে আসার স্বপ্ন দেখেছিলেন। অপেক্ষা করতে করতে সেই মেয়েটি নিশ্চয়ই কোন একদিন চলে গেছে অন্য কারোর ঘরে, তাদের সংসারের আলো হয়ে।

সুনেত্র বহুদিন ভেবেছে সময়মতো মাকে একদিন চেপে ধরে বলবে, “আমার মনের তরী ঠিক কোন ঘাটে বাঁধা আছে বলো তো, মা?”

কিন্তু  কোনদিন বলতে পারেনি কিছুটা সংকোচে কিছুটা ভয়ে। মনে হয়েছে, মা হয়তো তার কথা শুনেই নস্যাৎ করে দেবেন, “ধূর, তখন কী মনে হয়েছিল, কী বলতে কী বলেছিলাম, অতশত আর মনে রাখতে পারি না বাপু”।

অথবা সত্যিই যদি মন খুলতেন এবং বলতেন, “তখন তো আমার কথা শুনলি না সুনু, একেবারে ধনুকভাঙা পণ করে বসে রইলি। তোর জন্যে খুব ভালো একটি মেয়ে দেখেছিলাম। আমার স্কুলের ক্লাসমেট বিশাখার মেয়ে, ভারি মিষ্টি। দেখতে ডানা কাটা পরি নয়, তবে অনেকটা আমাদের সুকুর মতো, খুব হাসিখুশি প্রাণখোলা। তোর জন্যে বছর খানেক অপেক্ষার পর, ভালো ঘরে, ভালো বরে, বিশাখা ওর মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিল”।

তাহলে? সে মাঝেমাঝেই কল্পনার জগতে বিভোর থেকেছে এই চিন্তায় যে, মা হয়তো এতদিনে সুকুর সঙ্গে তার সম্পর্কের গভীরতাটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছেন। তিনি বুঝেছেন কনির অন্যত্র বিয়ে দেওয়ার জন্যেই তাঁর সুনু বিয়ে না করার পণ নিয়েছে। অসামাজিক জেনেও, সুনুর পিসিমা সুলেখার সঙ্গে আলোচনা করে, সুনু আর সুকুর সম্পর্কটাকে যদি মেনে নেওয়া যেত, তাহলে ছেলে-মেয়েদুটোর জীবন এমন এলোমেলো হয়ে যেত না। মনে মনে এই ভাবনাটাকে কতভাবে যে সুনেত্র লালন করেছে, এত বছর ধরে পোষণ করে আনন্দ পেয়েছে...! পাছে তার এই গোপন এবং অলীক আনন্দটুকুও হারিয়ে যায় – সেই ভয়েও সে মাকে কোনদিন আর জিজ্ঞেস করতে ভরসা পায়নি।

 নাঃ রাত শেষ হতে চলল প্রায় – মোবাইলের পর্দায় দেখল সাড়ে তিনটে। শোবার আগে শেষ সিগারেটটা ধরিয়ে বারান্দা থেকে ঘরে এল সুনেত্র, বারান্দার দরজাটা বন্ধ করে চলে এল শোবার ঘরে। আলো নিভিয়ে, অন্ধকার ঘরে বিছানায় শুয়ে সিগারেট টানতে লাগল বুকের ওপর অ্যাশট্রেটা রেখে। আলো না থাকলেও ঘর আঁধার হয়নি। স্ট্রিট লাইটের তিরছি আলোয়, চোখ চলে পরিষ্কার। মাথার ওপরে পাখা ঘুরছে বনবনিয়ে। সিগারেটের শেষ পাফটুকু অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিয়ে, সরিয়ে রাখল মাথার কাছে রাখা টেবিলে। তারপর পায়ের বালিশ টেনে, কাত হয়ে আরামে চোখ বুজল। আগামী কাল সোমবার – ইংরিজি মতে অবশ্য মানডে শুরু হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। সকাল সকাল দুটো নার্সিং হোমে দৌড়তে হবে দুজন পেশেন্টকে অ্যাটেণ্ড করতে। তারপর চেম্বারে বসতে হবে সকাল নটা থেকে। ঘুমটা এখন জরুরি।   

চলবে... 



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৪

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য " ...