শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০২৫

প্রদীপ্তা মুখার্জি (কুটু)-র আত্মকথন - বিশ্বলোকের সাড়া - পর্ব ৪

 

 বিশ্বলোকের সাড়া - চতুর্থ পর্ব 

প্রদীপ্তা মুখার্জি (কুটু)


কেমন করে গান কর, হে গুণী 

সেই কোন মেয়েবেলা থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঙ্গে আমার নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে – সে কথা ভাষায় প্রকাশ করা আমার পক্ষে দুঃসাধ্য। বড় হতে হতে তাঁর গান যত শুনেছি, শিখেছি, এবং গেয়েছি, ততই মনে হয়েছে তাঁর অজস্র লেখা – বিশেষতঃ তাঁর প্রতিটি গান কী আশ্চর্য বর্ণময়। প্রতিটি ঋতুর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে – আমাদের মনের যাবতীয় সূক্ষ্ম আবেগকে এমন বাণীময় সুরে আলোকোজ্জ্বল করে তুলেছেন তিনি কোন জাদুতে। মাঝে মাঝে মনে হয় - বয়েসের সঙ্গে সঙ্গে আমার মননে তাঁর গানের যে পূর্ণতার পরশ পেয়েছি – সে হয়ত একজন্মে সম্পূর্ণ হওয়ার নয়। জন্মান্তর বলে সত্যিই যদি কিছু থেকে থাকে – পার হয়ে যাবে হয়ত আরেক জন্ম –  কে জানে হয়তো আরও অনেক জন্ম।  

 আমার সংগীতসাধনার এই সুদীর্ঘ পথচলায় এমন একটি পূর্ণতার ভাবনা আমার মনে সবে যখন বাসা বাঁধতে শুরু করেছিল - কবির ভাষাতেই যাকে বলতে হয় –

       “যা দেখেছি যা পেয়েছি

        তুলনা তার নাই।

        এই জ্যোতিঃসমুদ্র-মাঝে

        যে শতদল পদ্ম রাজে

        তারি মধু পান করেছি

        ধন্য আমি তাই - ”

বাস্তবিক ঠিক এমন মানসিকতার মধ্যেই শুরু হল আমার নতুন পথ চলা। নিজের গায়কী সত্ত্বার উদ্ভাবন। সেই দিনটি ছিল একান্ত ঘরোয়া, আন্তরিক এক সান্ধ্যসঙ্গীতের আসর। সেখানে আমিও আমন্ত্রিত ছিলাম। আর সেখানেই ঘটে গেল আমার জীবনের মোড় ঘোরানো এক ঘটনা—প্রথম দর্শন, প্রথম শ্রবণ—এক মহান শিল্পীর সঙ্গে। এমন একটি মুহূর্ত যে আমার সঙ্গীত-জীবনে উদয় হবে, তা কোনোদিন কল্পনাতেও আসেনি। কখনও কখনও জীবন এমন কিছু সৌন্দর্য নিয়ে আসে যা স্বপ্নকেও ছাপিয়ে যায়—এ যেন এক অলৌকিক স্পর্শ, এক অভাবনীয় আশীর্বাদ।

সেই আসরে পরিচয় হল উস্তাদ গুলাম আব্বাস খানজির সঙ্গে। বিশ্ববরেণ্য এই হিন্দুস্তানী শাস্ত্রীয় ও গজল শিল্পী, যাঁর কণ্ঠে বহমান এক প্রাচীন ঐতিহ্য—মিয়াঁ তানসেনের উত্তরাধিকারী রামপুর সাহাসওয়ান ঘরানার শ্রেষ্ঠতম রূপ। তাঁর গলায় ছিল যাদু, তাঁর সুরে ছিল এক অন্তর্লীন ব্যঞ্জনা। তাঁর প্রতিটি তান যেন সময়কে থমকে দাঁড় করিয়ে দেয়। তাঁর প্রতিটি আলাপন শ্রোতাকে নিয়ে যায় ঊর্ধলোকের পবিত্র এক জগতে। আমি আপ্লুত হলাম, বিমুগ্ধ হলাম।

এভাবেই জীবনের পটে আঁকা হল এক অনির্বচনীয় অধ্যায়ের শুরু - এক অনন্যসাধারণ শিল্পীর সম্যক সাহচর্য।

এই পরম সৌভাগ্য সামান্য এক পরিচয় নয়, এ এক অন্তর্জাগরণের মুহূর্ত—যেখানে আমার সংগীতসাধনা যেন এক নবজন্ম  খুঁজে পেল। স্বরবিতানের স্বরলিপি অনুসরণ কিংবা অনুকরণ করে এতকাল যে গান আমি চর্চা করেছি – উস্তাদজি মহার্ঘ আসন বিছিয়ে আমাকে বসিয়ে দিলেন সেই সঙ্গীতের খাস দরবারে।  এই যাত্রা শুরু হয়েছে তাঁর আশীর্বাদ ও সান্নিধ্যে, আমি  অন্তরে গভীরভাবে অনুভব করি—এ পথ আমায় নিয়ে চলবে আরও উচ্চতর সাধনার দিকে। সে সাধনায় আমার পাথেয় হোক – আপনাদের সকলের শুভেচ্ছা এবং আন্তরিক আশীর্বাদ।  তিনটি গানের নৈবেদ্যে এখানে রইল –

ও যে মানে না মানা  - গানটি প্রধানতঃ আমার গাওয়া হলেও, কিছুটা অংশ উস্তাদজীর গাওয়া প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীত।

তেরে মেরে মিলন কি ইয়ে র‍্যায়না  - উস্তাদজী ও আমার যৌথ সঙ্গীত। 

দিল সে তেরি নিগাহ্‌ - অষ্টাদশ শতাব্দীর অসাধারণ উর্দু কবি মির্জা গালিবের এই গজলটিতে সুর দিয়েছেন উস্তাদজি।  

অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো

স্মৃতির মণিমুক্তোর ভাণ্ডার হাতড়ে কত কথাই যে মনে পড়ে! তখনই মনে হয়, এসবই আমার ওপর ঈশ্বরের আশীর্বাদ।

একসময় আমি একজন নামী ফটোগ্রাফারের সঙ্গে কাজ করতাম, তাঁর নাম রস ক্লেটন (Ross Clayton)তাঁর মূল পেশা ছিল মেডিক্যাল ফোটোগ্রাফি, কিন্তু তিনি পোর্ট্রেট আর ল্যাণ্ডস্কেপ স্টাডিতেও ছিলেন সিদ্ধহস্ত। সেই কাজেই আমি তাঁকে কখনো সখনো সামান্য কিছু সাহায্য করেছি। সেই সূত্রে রস-এর সঙ্গে গিয়েছিলাম পৃথিবীবিখ্যাত ফটোগ্রাফার ব্রায়ান ব্রেক (Brian Brake)-এর প্রদর্শনী দেখতে। সেখানেই প্রথম দেখলাম তাঁর নামকরা ছবি, “Monsoon Girl”, যার সাবজেক্ট আর কেউ নয়, আমাদের অতি পরিচিতা অপর্ণা সেন। ওঁর পিতা শ্রীযুক্ত চিদানন্দ দাশগুপ্তর বন্ধু ব্রায়ানের লেন্সে ধরা পড়েছে কিশোরী অপর্ণার বৃষ্টিস্নাত মুখ, ফটোগ্রাফির জগতে অমর হয়ে গেছে ওই চিত্রপট।

সেই সন্ধ্যায় প্রদর্শনীর workshop জমা হওয়া উপস্থিত অতিথিশিল্পী ও দর্শকরা যখন শুনলেন, আমিও ভারতবর্ষের কলকাতার কন্যা, তাঁরা ধরে নিলেন, আমি নিশ্চয়ই Monsoon Girl-এর পরিচিতা। তাঁরা আমাকে কিছু বলার জন্যে অনুরোধ করলেন। আমি বললাম, ব্যক্তিগতভাবে ওঁকে চিনি না, তবে উনি বাংলা তথা ভারতের একজন প্রখ্যাতা অভিনেতা ও চিত্রপরিচালক। উনি কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের নিমন্ত্রিত বিচারক হয়েছিলেন এবং এই সব পরিচয় ছাড়াও তিনি একজন চিন্তাশীল লেখক। সেদিন এসব কথা বলতে বলতে আমি বারবার রোমাঞ্চিত হয়ে উঠছিলাম এই গৌরবে যে, কলকাতা বা ভারতের পরিচিতি শুধু শুধু গরিব এবং পিছিয়ে পড়া দেশ হিসেবে নয়, সেখানে পাঁচ হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যের ইতিহাস ছাড়াও এমন অনেক কিছু আছে, যার স্বীকৃত বিশ্বজোড়া।

বেশ কয়েকবছর আগে কলকাতার এক নামি ব্যাণ্ড “চন্দ্রবিন্দু” এসেছিল অকল্যাণ্ডে অনুষ্ঠান করতে। ব্যাণ্ডের এক গায়কের পুত্র, নিজি-র ক্রিকেট অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসনের বিরাট ভক্ত, তার আবদার কেনের একটি ছবি তার চাই। উদ্যোক্তাদের সকলেই জানতেন, আমরা তোরঙার বাসিন্দা, আর কেনও তোরাঙার গর্ব। সেই উদ্যোক্তাদের একজন (আমাদের খুবই অন্তরঙ্গ বন্ধু) বাড়ি থেকে ফোনে আমাকে বললেন, “কুটুদি, আমি বলেছি, তোমরা কেনকে চেনো, সেই শুনে একজন তোমার সাথে কথা বলতে উদ্গ্রীব...”। তারপর “চন্দ্রবিন্দু”-র সেই শিল্পীর বিনীত অনুরোধ পেলাম, “দিদি, আমায় একটা ছবি অন্ততঃ দেবেন, না হলে আমার পুত্র আমাকে বাড়িতে ঢুকতে দেবে না, কান্নাকাটি জুড়ে দেবে। বলবে, আমি নিজি ঘুরে গেলাম অথচ কেন-এর একটা ছবিও নিয়ে যেতে পারলাম না?” পুত্রের প্রতি পিতার গভীর এই স্নেহ দেখে আমি খুবই আনন্দ পেলাম।

উইলিয়ামসন পরিবারের সঙ্গে আমাদের পরিচিতি ক্রিকেট সূত্রেই। আমাদের পুত্র আবীর কেনের সঙ্গেই ক্রিকেট খেলেছে, পাঁচ-ছ বছর থেকে – স্কুল দলে, আঞ্চলিক ও প্রাদেশিক দলে। সেই দলের কোচ এবং ম্যানেজার ছিল আমার স্বামী কাজল।

আমি সেই রাত্রেই ফোন করলাম কেন-এর বাড়িতে, ওর মা জানালেন, কেন তখন দেশের বাইরে। আমার অনুরোধ শুনে তিনি খুবই খুশি হলেন, পুত্রের খ্যাতি এবং ভক্তজন সুদূর ভারতবর্ষেও ছড়িয়ে রয়েছে শুনলে কোন মা উচ্ছ্বসিত না হবেন?  তার পরের দিনই উনি কাজলের অফিসে পোঁছে দিয়েছিলেন, কেনের সই করা ফটো।

এ ব্যাপারটা আমরা ভারতীয় প্রেক্ষীতে হয়তো ভাবতে পারিনা।  কিন্তু এদেশে এটাই স্বাভাবিক। জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে গেলেও তারকারা দূর আকাশের অধরা নক্ষত্র হয়ে যায় না।  কেন শুধু ব্যাটসম্যান হিসেবে নয়, অধিনায়ক হিসেবেও চূড়ান্ত সফল, তার প্রমাণ মিলেছে, গত বিশ্বকাপের এবং টেস্টচ্যাম্পিয়ন্স কাপের ফাইন্যালে। কেন শুধু ক্রিকেটার হিসেবে নয়, খুব বড়ো মনের মানুষ হিসেবেও অত্যন্ত জনপ্রিয়।

এই প্রেক্ষীতে আরেকটি ঘটনার কথাও বলতে চাই, সেবার ভারত নিজি সফরে এসেছিল ওয়ান-ডে সিরিজ খেলতে।  তোরঙার স্টেডিয়ামেও একটা ম্যাচ হয়েছিল, সেখানে আমরাও উপস্থিত হয়েছিলাম খেলা দেখতে। আমরা যখন মাঠে ঢুকে স্টেডিয়ামের দিকে এগোচ্ছি, কেন নেট প্র্যাকটিস সেরে ফিরছিল প্যাভিলিয়নের দিকে। আমাদের দেখতে পেয়ে, কেন এগিয়ে এল, আমাদের সঙ্গে হাত মেলালো, কয়েকটা কথা বলে চলে গেল প্যাভিলিয়নে। বিশ্ববিখ্যাত তারকার এমন সৌজন্য আমাদের অভিভূত করেছিল নিঃসন্দেহে। এর বিপরীতে, কয়েক বছর আগের কোন এক ম্যাচে ভারতীয় টিমের জনৈক বাঙালী খেলোয়াড়কে মাঠে উপস্থিত বেশ কিছু বাঙালী দর্শক বাংলায় ডেকেও কোন সাড়া পাননি। তিনি ফিরেও দেখেননি, সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করেছিলেন, ভারতীয় এবং বাঙালী দর্শকদের। হতে পারে ভারতবর্ষে জনপ্রিয়তার উন্মত্ততা, তারকাদের জনস্রোত থেকে দূরে থাকতে শেখায়। অথবা হয়তো তাঁদের অহমিকা গগনচুম্বী। এখানকার সমাজে এমনটা কখনো চোখে পড়েনি, তারকা খেলোয়াড়, বিশ্বজয়ী অ্যাথলিট, এমনকি প্রধানমন্ত্রীকেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সহৃদয় আলাপে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। খ্যাতি বা ক্ষমতা এখানকার মানুষদের মধ্যে দূরত্ব গড়ে দেয় না। এঁদের সকলেই এই মূল্যবোধে বিশ্বাস করেন যে, তাঁরা নিজেদের গুণেই সাফল্য এবং খ্যাতি অর্জন করেন ঠিকই, কিন্তু জনগণের জন্যেই তাঁদের এই জনপ্রিয়তার গৌরব।  


চলবে...


সুরক্ষিতা - পর্ব ৭

এই উপন্যাসের আগের পর্ব -  " সুরক্ষিতা - পর্ব ৬ "



শুভময়ীদেবী নজর রাখছিলেন প্রতিষ্ঠার ওপর। কারণ হাফইয়ার্লিতে অংকের খাতা দেখতে গিয়েই তিনি টের পেয়েছিলেন, এই মেয়ে অংকে ডুববে। অন্যান্য সাবজেক্টের ডিটেল নম্বর তিনি খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, নেহাত মন্দ নয়, ভালোভাবেই উৎরে যাবে। কিন্তু অংকে বেশ বিপদ আছে। একই আবাসনে থাকার দরুণ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর স্কুলের বাইরেও দেখা হয় মাঝে মধ্যেই, তাতে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি না হলেও, সৌজন্য সম্পর্ক একটা তৈরি হয়েইছিল। কাজেই, হাফইয়ার্লির পরে তিনি প্রতিষ্ঠাকে নিজের ঘরে ডেকে বলেছিলেন, “প্রতিষ্ঠা, তোমাকে ডেকেছিলাম, তোমার অংকের নাম্বারের জন্যে”।

প্রতিষ্ঠা শ্রাগ করে বলেছিল, “হ্যাঁ, ম্যাম, আপনার হাত থেকে নম্বর বের করতে পারিনি”। হেসে ফেলে শুভময়ীদেবী বলেছিলেন, “কী বলছ কি প্রতিষ্ঠা, তোমার কি ধারণা, আমি ইচ্ছে করে তোমায় নাম্বার দিইনি? সিলি মিস্টেকস, স্টেপ-জাম্পস, লট অফ আনঅ্যাটেম্পটেড সাম্‌স্‌, তোমাকে নম্বরটা দিই কোথায় বলো তো? বি সিরিয়াস, প্রতিষ্ঠা, আর ক’মাস পর মাধ্যমিক পরীক্ষার এক্সটার্নাল এক্সামিনার কিন্তু তোমাকে পার্সোনালি চিনবেন না। আমি যেটুকু মার্কস দিয়েছি, সেটাও পাবে কিনা আমার সন্দেহ আছে”একটু থেমে আবার বললেন, “আমি কিন্তু তোমাকে ভয় দেখাতে বা ওয়ার্ন করার জন্যে ডাকিনি, প্রতিষ্ঠা। আমি বলতে চাইছি, অন্য সাবজেক্টে তুমি মাচ বেটার পজিসনে আছ, মে বি, অংকটা ইজ নট ইয়োর কাপ অফ টি, বাট, অংকর জন্যে টোটাল রেজাল্টটা খুব খারাপ করে ফেলাটাও কিন্তু কোন কাজের কথা নয়”

“ম্যাম, আমি কিন্তু চা খাই না”। প্রতিষ্ঠা মিচকে হেসে উত্তর দিয়েছিল। শুভময়ীদেবী অবাক হয়েছিলেন, তাঁর সিরিয়াস কথার উত্তরে প্রতিষ্ঠার এরকম বাচাল উত্তরে আর হাসিতে।

তিনি ধৈর্য হারাননি, মৃদু হেসে বলেছিলেন, “এনিওয়ে, প্রতিষ্ঠা, আমার উপদেশ তোমার ভাল নাও লাগতে পারেবাট অ্যাজ ইয়োর টিচার, আই কান্ট শ্রাগ অফ মাই রেসপনসিবিলিটি। তাই বলছিলাম, বি সিরিয়াস অ্যাবাউট ইট, অ্যান্ড ট্রাই হার্ড টু ইমপ্রুভ ইয়োরসেল্‌ফ। ইফ ইউ থিংক ইউ নিড মাই হেল্প, এনি টাইম, ইন দি স্কুল অর অ্যাট মাই হোম, ইউ আর ওয়েলকাম। আমি কিন্তু খুব সিরিয়াসলি বলছি, প্রতিষ্ঠা, আমি রিয়্যালি উইলিং টু হেল্প ইউ আউট -”

প্রতিষ্ঠা মুখ নীচু করে কথাগুলো শুনছিল, শুভময়ীদেবীর কথা শেষ হতে বলল, “ঠিক আছে, ম্যাম, থ্যাংকস আ লট। আমি আরেকবার চেষ্টা করে দেখি, আদারওয়াইজ আই ডেফিনিটলি উইল কামডাউন টু ইউ। লেট মি হ্যাভ অ্যানাদার চ্যান্স, ম্যাম”।

“ওকে, প্রতিষ্ঠা, আই রিয়্যালি লাইক ইয়োর স্পিরিট। বাট, আরেকটা কথা বলে দিই, অংকের দিকে একটু বেশি নজর দাও, কিন্তু এতটাও বেশি কন্‌সেন্‌ট্রেট করে ফেল না, যাতে অন্য সাবজেক্টগুলোর প্রিপেরেসান অ্যাফেক্টেড হয়। কি বলতে চাইছি, আশা করি বুঝেছ, আর খুব বেশি সময় নেই, নাউ ইউ নিড এ ব্যালান্স্‌ড্‌ স্টাডি”। কোন কথা বলেনি প্রতিষ্ঠা, মাথা নেড়ে উঠে পড়েছিল, শুভময়ী আন্টির সামনে থেকে।

প্রতিষ্ঠা চেষ্টা যে করেনি, তা নয়, কিন্তু অংকে খুব একটা উন্নতি করতে পারল না এবং সেটা ধরা পড়ল টেস্টের রেজাল্টে। আর তিন-সাড়ে তিন মাস পরেই ফাইন্যাল, প্রতিষ্ঠা এবার সত্যি খুব নার্ভাস ফিল করল, কারণ এই সাবজেক্টটা কিছুতেই তার আয়ত্তে আসছে না। পরীক্ষা হলের বাইরে সে কন্‌ফিডেন্ট, কিন্তু কোয়েশ্চেনস পাওয়ার পর, খাতায় অংক শুরু করলেই মনে হচ্ছে, ঠিক করছি তো? এ অংকটা এভাবেই সল্‌ভ্‌ করেছিলাম কি? কনফিউস্‌ড্‌ হয়ে যাচ্ছে বারবার, অংক মিলছে না, সময় নষ্ট হচ্ছে, তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে আরো বেশী ভুল হচ্ছে প্রসিডিয়রে। কাজেই এবার আর সে জিদ করল না, শুভময়ীদেবীর পরামর্শে শুভময়ীদেবীর ফ্ল্যাটে যাওয়া শুরু করল।

শুভময়ীদেবীর স্কুল শনিবারে হাফ আর রোববার পুরো ছুটি থাকে। প্রথমদিন শনিবার বিকেলে প্রতিষ্ঠা শুভময়ীদেবীর ফ্ল্যাটে গেল, সঙ্গে ছিল ছবি। ছবিকে সঙ্গী করার কোন দরকার ছিল না, প্রতিষ্ঠা চায়ওনি ছবি তার সঙ্গী হোক। কিন্তু প্রতিষ্ঠার মা একরকম জোর করেই ছবিকে সঙ্গে পাঠিয়েছিলেন। সেদিন বসার ঘরের সোফায় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে বসে শুভময়ীদেবী বললেন, “প্রতিষ্ঠা, আমরা কিন্তু এখন নতুন আর কিচ্ছু শিখব না। তার আর সময় নেই। বরং আমরা যেটুকু জানি, সেটুকুই বারবার প্র্যাকটিস করব। বারবার। যাতে তার মধ্যে কোন ভুল আর না হয়। ব্যস্‌, এইটুকু যদি তুমি খুব সিনসিয়ারলি করো, তুমি লেটার পাবে না ঠিকই, কিন্তু যথেষ্ট ভাল মার্কস পেয়ে যাবে, সেটুকুই এখন আমাদের লক্ষ্য, তাই না?

প্রতিষ্ঠা ঘাড় নেড়ে সায় জানাতে, শুভময়ীদেবী আবার বললেন, “ভেরি গুড। আমার কাজ হচ্ছে, তোমাকে গাইড করা, আর তোমার প্র্যাকটিসটাকে মনিটর করা। আমি বলছি তোমাকে প্রতিষ্ঠা, যে কটা দিন এখনো বাকি আছে ফাইন্যালের, একটু খাটলে আমরা ভালই রেজাল্ট করব। সো নাউ লেট আস স্টার্ট অ্যাফ্রেস, ফরগেটিং দ্য পাস্ট”

ছবি এতক্ষণ খুব মন দিয়ে শুনছিল শুভময়ীদেবীর কথা। তাঁর সবকথা না বুঝলেও, তাঁর চেহারা, ব্যক্তিত্ব আর সহৃদয় ব্যবহার ছবির ভীষণ ভালো লাগল। সে বসার ঘরের মেঝেয় বসে ভাবতে লাগল তার ফেলে আসা অসম্পূর্ণ ইস্কুল জীবনের কথা, আর দেখতে লাগল এই ঘর, তার সাজ-সজ্জা।                 

মিঠুদিদিদের থেকে এই ফ্ল্যাটটা বেশ অন্যরকম। সদর দিয়ে ঢুকেই এই বসার ঘর। তার বাঁদিকে সামনের সোফায় বসে ছোট টেবিলে নিচু হয়ে মিঠুদিদি অংক কষছে। মিঠুদিদির দিদিমণি বসে আছেন মিঠুদিদির পাশেই। ছবি যেদিকে বসে আছে তার ডানদিকে একটা পর্দা ঢাকা দরজা। পাখার হাওয়ায় অল্প দুলছে। দরজার পরে ছাদ থেকে মেঝে পর্যন্ত বইয়ে ভরা কাঠের দেওয়াল আলমারি। কাঁচের পাল্লা দিয়ে ঢাকা। কত বই, কত বই। এই সঅঅব বই পড়ে ফেলেছেন মিঠুদিদির দিদিমণি! এত বই না পড়লে বুঝি দিদিমণি হওয়া যায় না? খাওয়ার টেবিলের পিছনে আরেকটা খোলা দরজা, বাইরে বারান্দা। অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকতে থাকতে ছবির একঘেয়ে লাগছিল, ভাবছিল বারান্দায় যাবে কিনা। মিঠুদিদির দিদিমণি কি কিছু বলবেন, সে যদি উঠে এখন বারান্দায় যায়? ছবি একবার তাকাল ওদের দিকে, দুজনেরই খুব গম্ভীর মুখ, মিঠুদিদি লিখছে আর দিদিমণি দেখছেন খাতার দিকে।

বারান্দার দিকে যাওয়ার জন্যে ছবি নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াতে, কেউ একজন অদ্ভূত স্বরে চেঁচাল, কি বলল বোঝা গেল না। ভয় পেয়ে ছবি মিঠুদিদি আর দিদিমণির দিকে তাকাল। নাঃ, ওরা তো তাকে লক্ষ্যও করেনি, আর আওয়াজটা এসেছে তার ডান দিকের ঘর থেকে, যার দরজায় পর্দা দুলছে। ভয় পেয়ে ছবি আবার একই জায়গায় বসে পড়লকিন্তু বসার পরেও আওয়াজটা আবার এল,

“অ্যা...ও...ও....ও..অ্যা...ও...ও....ও..। অ্যা...ও...ও....ও..”।

ছবি ভয় পেল ঠিকই, কিন্তু কৌতূহলও হল, কে এভাবে চেঁচাচ্ছে? সে আবার তাকাল, মিঠুদিদি আর দিদিমণি একইভাবে খাতার ওপর ঝুঁকে আছে, ওরা শুনতে পায়নি। ছবি ঝুঁকে বসে পর্দাটা একটু ফাঁক করে ঘরের ভিতরে তাকাল। একটা ছেলে খাটে শুয়ে, ঘাড় ফিরিয়ে দরজার দিকেই তাকিয়ে আছে। ছবির সঙ্গে চোখাচোখি হতে, ছেলেটা বীভৎস মুখ করল। তারপর খুব চেষ্টা করতে লাগল উঠে বসার। পারছিল না, হাতে ভর দিয়ে কোমর থেকে ওপরের শরীরটা একটু তুলছিল, কিন্তু বারবার হড়কে যাচ্ছিল হাতদুটো। ছবি লক্ষ্য করল, ছেলেটার হাত আর পা দুটো ভীষণ সরু, শক্তিহীন, কেমন যেন নিয়ন্ত্রণহীন এলোমেলো। উঠে বসার চেষ্টায় ছেলেটার মুখ আরো বিকৃত আর বীভৎস হয়ে উঠছিল বারবার।

ছবি এমন কোনদিন দেখেনি। কিন্তু এটুকু বুঝল ছেলেটা অসহায়। কথা বলতে পারে না। বিছানায় উঠে বসার সাধ্যটুকুও নেইহাত-পা-মুখ চোখ কোন কিছুই তার স্বাভাবিক নয়। কত বয়েস হবে ছেলেটার? এটা কী অসুখ? কোনদিন কি এ অসুখ সারবে? এই ছেলেটা কি কোনদিন পারবে স্বাভাবিক হেঁটে চলে বেড়াতে, কথা বলতে? ছবি উঠে দাঁড়াল, পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকল, ছেলেটার একটা হাত আর পিঠে সাপোর্ট দিয়ে বসিয়ে দিল বিছানায়। ছেলেটা আগের মতোই মুখ বিকৃত করল, যেন মুখ ভেঙাল। কিন্তু ছবি বুঝতে পারল, ছেলেটা মোটেই মুখ ভেঙাচ্ছে না, তার মুখটা ওরকমই বেঁকে যায়। বসে থাকতে থাকতেই ছেলেটা আবার পিছন দিকে হেলে পড়ছিল, অসহায় হাতে ভর দিয়ে বসে থাকতে চাইছিল ছেলেটা, কিন্তু পারছিল না। ছবি আবার সোজা করে বসিয়ে দিল, তারপর ছেলেটার পিছনে দুটো বালিশ সাজিয়ে দিল, যাতে আর পড়ে না যায়।

ছেলেটাকে বসানোর সময় একটা হাত ধরেছিল ছবি, কি কঠিন সেই হাত। বিছানায় বসিয়ে দেওয়ার পর, ছেলেটা ছবির হাতে হাত রেখেছিল, তার হাতের তালুটাও অসম্ভব শক্ত আর নিষ্ঠুর মনে হল তার। এই হাত এই শরীর কোন মানুষের নয় যেন। প্রত্যেকটি মানুষেরই শরীরের স্পর্শে কোন না কোন ভাষা সঞ্চারিত হয় অন্য শরীরে। সে ভাষা ভাল হতে পারে, মন্দ হতে পারে। ভালবাসার হতে পারে, হতে পারে ঘৃণার বা ক্রোধের। কিন্তু এ ছেলের শরীর একদম বোবা, নির্বিকার, পাথরের মতো কঠিন, ভাবলেশহীন। ছবি ছেলেটাকে খুব মন দিয়ে দেখছিল, হঠাৎ ছেলেটা আগের মতোই আওয়াজ করল, “অ্যা...ও...ও....ও..”।

ছবি ওর মুখের দিকে তাকাল। হাত, ঘাড়, চোখ ঘুরিয়ে কিছু একটা বোঝাতে চাইছে তাকে, কি? কী চাইছে ছেলেটা? আশেপাশে তাকা ছবি, বিছানার মাথার দিকে একটা ছোট টেবিলে জলের বোতল আর গ্লাস। একটা খেলনা, ট্যামটেমি, ঘোরালে আওয়াজ করে। বেশ কিছু ওষুধের ফয়েল, দুটো শিশি। একটা রুমালের মতো কাপড়...।

ছবি ট্যামটেমিটা বাজাল। ক্যারক্যারক্যার...। ছেলেটা খুব জোরে ঘাড় ঝাঁকাল, বলল, “অ্যা...ও...ও....ও..”।

তার মানে এটা চাইছে না। ছবি জলের গ্লাস আর বোতল দেখাল, ছেলেটা বলল, “অ্যা...ও....অ্যা...ও...”

ছবির মনে হল, জল খেতেই চাইছে। গেলাসে জল ঢালল- আদ্দেকটা, গেলাসটা নিয়ে কাছে যেতে ছেলেটা হাত বাড়াল না, গলা বাড়িয়ে ঠোঁটের এমন একটা ভঙ্গি করল, ছবি বুঝতে পারল, জলটা খাইয়ে দিতে হবে। গেলাসটা ঠোঁটের কাছে ধরতে ছেলেটা গেলাসে মুখ নিয়ে জল খেতে লাগল। জলে চুমুক দিতে আওয়াজ হচ্ছিল, ঢোঁক গিলতেও আওয়াজ হচ্ছিল, আর গলার হাড়টা বারবার ওঠানামা করছিল জল ঢোঁক গেলার সময়। ওইটুকু জল খেতে কতক্ষণ সময় নিল ছেলেটা! ছবি একদৃষ্টিতে দেখছিল ছেলেটাকে, কি অসহায় এই ছোট্ট জীবনটা। ভীষণ মায়ায় তার চোখে জল এসে গেল, জল খাওয়া হতে রুমালটা দিয়ে ছেলেটার মুখ মুছে দিল ছবি। ছেলেটা আবার মুখ বেঁকিয়ে ভীষণ করে তুলল নিজেকে, এটাই কি ছেলেটার হাসি?

বাঃ, কি সুন্দর ওকে বসিয়ে দিয়েছিস, জলও খাওয়ালি! তোর নাম কি রে”?

ছবির পিছনে দিদিমণি কথা বললেন, ট্যামটেমির আওয়াজ পেয়ে তিনি এ ঘরে ঢুকেছিলেন, কিছু বলেননি। দেখছিলেন ছবিকে। সংকোচে আর ভয়ে ছবি সরে এল, বলল, “ছবি, ছবি পোল্লে”।

“পোল্লে? তুই কি মালতীর মেয়ে নাকি”? ছবি ঘাড় নেড়ে সায় দিল।

“তোর কথা তোর মা খুব বলে, তুই নাকি সিক্স পর্যন্ত লেখাপড়া করেছিস? তুই প্রতিষ্ঠাদের বাড়িতে থাকিস”? ছবি মুখ নীচু করে রইল।

“বিট্টু হাসছে বিট্টু কতদিন পরে হাসছে, তুই জানিস না রে, ছবি...”! সদাশান্ত শুভময়ীদেবীরও কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে এল।


                                    এই উপন্যাসের পরের পর্ব -  " সুরক্ষিতা - পর্ব ৮ "


বৃহস্পতিবার, ১০ জুলাই, ২০২৫

ভূতের মুখে রামনাম


এর আগের ছোটদের গল্প - " তপু ও হেডস্যার "

 


                                                                        

    সকাল ছটা নাগাদ আমরা চারবন্ধু এসে তেরাস্তার মোড়ে দাঁড়ালাম। এখান থেকে ডানদিকের রাস্তা ধরে কিছুটা গেলেই শ্যামলদের বাড়িটা। ওখানেই শ্যামল গত রাত্রে শুতে এসেছিল। আমরা সবাই, এমনকি আমার বাবা-মা-দাদাও পঞ্চাশবার বলেছিল – রাত্রে ও বাড়িতে না থাকতে। হতভাগা কারো কথায় কান দিল না। আমাদের বাড়িতে খাওয়াদাওয়া সেরে সাড়ে নটা নাগাদ বেরিয়ে পড়ল। সঙ্গে নিল একটা শতরঞ্চি, মাথার বালিশ, একটা মশারি আর চাদর। এক বোতল জল, একটা গল্পের বই আর টর্চ। আমরাও ওর সঙ্গে এসেছিলাম – এই মোড় অব্দি। তখনও ওকে বুঝিয়েছিলাম – জেদ না করে, ফিরে আসতে। শোনেনি, বলেছিল, নিজের বাড়িতে নিজের বিছানায় ঘুমোনোর মজাই আলাদাই। চলি রে, গুডনাইট।

গতকাল শ্যামল ওর বাড়ির দিকে চলে যাওয়ার পর আমরা কিছুক্ষণ এই মোড়েই দাঁড়িয়েছিলাম। আমরা ঠিক করেছিলাম আজ সকাল হলেই ওর বাড়িতে আমরা একসঙ্গে হানা দেব। হতভাগাটা বেঁচে আছে না মরে গেছে সেটা তো দেখতে হবে!    

 

শ্যামলের জন্যে কেন আমরা সকলেই এত উদ্বিগ্ন সে কথাটা বলি। ওদের বাড়িটা কয়েক বছর হল খালি পড়ে আছে – কেউ থাকে না। বেচারার বাবা-মা মারা গেছেন ওর ছোট বেলাতেই। দূর সম্পর্কের এক পিসি থাকতেন ওদের বাড়িতে, তিনিও মারা গেলেন বছর ছয়েক আগে। লেখাপড়ায় ব্রিলিয়ান্ট শ্যামল  – অর্থাৎ শ্যামলেন্দু, পাঁচ বছর আগে উচ্চ শিক্ষার জন্যে যখন বিদেশ গেল, ও বাড়িতে থাকার মতো আর কেউই রইল না। সব ঘরে এবং সদর দরজায় তালা দিয়ে ও বেরিয়ে গিয়েছিল – চাবির গোছাটা রেখে গিয়েছিল আমাদের বাড়িতে।

দীর্ঘদিন বাড়িতে কেউ বসবাস না করলে যা হয় – শ্যামলদের বাড়িটাও প্রায় হানাবাড়ি হয়ে উঠছিল। চারপাশে ঝোপঝাড় - আগাছার জঙ্গল। বাড়ির দেওয়ালে পুরু শ্যাওলার আস্তর – ছাদের আলসেতে দুটো চারটে বট-অশথের চারা...। সত্যি বলতে বাড়িটার দিকে তাকালে দিনের বেলাতেও গাটা কেমন ছমছম করে উঠত। তার ওপর ও পাড়ার লোকদের মুখে শুনেছি – রাত্রে অন্ধকার বাড়ির ভেতর থেকে কেমন যেন হাড়হিম করা শব্দ হয়। কারা যেন চাপা গলায় কথা বলে, হাসে, এমনকি কাঁদেও! এ ছাড়াও ওদের বাড়ির ঝোপঝাড় থেকে মাঝে মধ্যেই বেরিয়ে আসত – দু একটা গোখরো, কেউটে...। স্বাভাবিকভাবেই পাড়ার লোক এলাকাটা এড়িয়ে চলতে লাগল।  

এত বছর বাদে গতকাল বিকেলে শ্যামল আমাদের বাড়ি এল। বলছিল, এখন থেকে ও এখানেই থাকবে। এখান থেকেই কলকাতার অফিসে যাওয়া আসা করবে। ওর আসার খবর পেয়ে আরো তিন বন্ধু এল, জিতু, বিনু আর বাবু। স্কুলে পড়ার প্রথমদিন থেকে কলেজের শেষদিন পর্যন্ত আমাদের পাঁচজনের বন্ধুত্বে কোনদিন এতটুকু আঁচড় পড়েনি। ছোটবেলা থেকেই পাড়ায়-ঘরে আমরা পাণ্ডব নামে পরিচিত ছিলাম। আমাদের মধ্যে শ্যামল  লেখাপড়ায় সব থেকে ভালো ছিল – কলেজ পাশ করে সে বাইরে চলে গেল – আমরাও লেখাপড়া শেষ করে কাজে লেগে গেলাম। অতএব এতদিন পরে শ্যামলেন্দু ফিরে আসায় আমরা সকলেই খুব খুশি হয়েছিলাম সন্দেহ নেই।

 

যথেষ্ট সাহস সঞ্চয় করে আমরা চারবন্ধু শ্যামলের বাড়ির সামনে দাঁড়ালাম। গেট দিয়ে ঢুকে চারপাশটা লক্ষ্য করেই বুকের ভেতরটা কেমন গুরগুর করে উঠল। চারদিকেই কেমন যেন অস্বস্তিকর অমঙ্গলের লক্ষণ। বিনু আর জিতু আমাদের মধ্যে সব থেকে সাহসী, বলল, চল ভেতরে ঢুকি। নীচের সদর দরজাটা ভেজানো ছিল – ঠেলতেই খুলে গেল। একতলার চারটে ঘরেই তালাবন্ধ। বাঁদিকে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। শ্যামলের ঘরটা দোতলায়।  ও যখন এখানে থাকত - কতবার এসেছি আমরা। দোতলায় উঠে সিঁড়ির ডানদিকের দ্বিতীয় ঘরটা শ্যামলের।

শ্যামলের ঘরের দরজাটাও ভেজানো। বিনু ডাকল, “শ্যামল, উঠেছিস?”

কোন সাড়া না পেয়ে আমি দরজায় ঠেলা দিলাম। খুলে গেল। মেঝেয় পাতা শতরঞ্চিতে শ্যামল শুয়ে আছে - আমাদের দিকে পিছন ফিরে। কিন্তু ওর মুখটা দরজার দিকে ফেরানো এবং বিস্ফারিত দুই চোখ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। বিছানা থেকে একটু তফাতে জলের বোতলটা গড়াচ্ছে। খোলা বইটা উলটে পড়ে আছে একটু দূরে। মশারির তিনটে খুঁট খোলা এবং কেউ যেন সেটাকে ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে, বিছানা থেকে একটু দূরে।



ভালো করে দেখার জন্যে আমি ঘরের ভিতরে ঢুকতে যাচ্ছিলাম, জিতু জামার কলার ধরে আমায় বাইরে টেনে এনে ফিসফিস করে বলল, “শ্যামলটা তো মরেছে...তুইও মরবি নাকি? এখানে আর এক মূহুর্তও নয়...পাড়ার সবাইকে খবর দিই – চল...”। বিনু আমার হাত ধরে সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নামতে লাগল, পিছনে জিতু আর বাবু।

 

খবরটা পাড়ায় চাউর হতে বেশি সময় লাগল না। দত্তজ্যেঠু আমাদের পাড়ায় বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি, তিনি আমাদের কথা শুনে বললেন, “এখন কেউ ও বাড়িতে যাবি না। বাইক নিয়ে দুজন এখনই বেরিয়ে যা, থানায় গিয়ে খবরটা জানিয়ে আয়। তারা যা ভালো বুঝবে তাই করবে”।

পাড়ার বয়স্ক সকলেই তাঁকে সমর্থন করলেন, জিতুর বাবা বললেন, “ঠিক বলেছেন দত্তদা। বারবার মানা করা সত্ত্বেও শ্যামল নিজের দোষে মারা পড়ল। এখন আর আমাদের কী করার আছে?”

বিনুর কাকিমা বললেন, “ঠিক কথা। কথায় বলে - ডানপিটে ছেলেদের বেঘোরে মরণ হয় - এর মধ্যে কেউ যদি নাক গলিয়েছিস - তার ঠ্যাং আমি ভাঙবো, এই বলে রাখলাম। যা করার পুলিশকে করতে দে”।

আমার বাবা বাড়িতে ছিলেন না, বাজারে গিয়েছিলেন। পাড়ার মুখে ভিড় দেখে, থলে ভর্তি বাজার নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন, জিজ্ঞাসা করলেন, “কী হয়েছে দত্তদা? সবাই বাইরে কেন?”

দত্তজ্যেঠু অবাক হয়ে বললেন, “সেকিরে জগু, কিছুই শুনিসনি? শ্যামলতো কাল রাত্রে মারা গেছে – মটকানো ঘাড় নিয়ে ওর ঘরের বিছানাতেই পড়ে আছে তার দেহটা...”।

বাবা চমকে উঠে বললেন, “কী সাংঘাতিক কাণ্ড, কারা করল এসব? কিন্তু...”।

বিনুর কাকিমা বললেন, “কারা করল – সে কথা মুখে না আনাই ভালো দাদা। কিসের থেকে কী হয় – বলা যায়?”

জিতুর বাবা বললেন, “দত্তদা বলেছেন – যত তাড়াতাড়ি সম্ভব থানায় খবর দিতে... আমাদেরও তাই মত...”

বাবা বললেন, “কিন্তু...”।

দত্তজ্যেঠু একটু বিরক্ত হয়েই বললেন, “আবার কিন্তু কিসের জগু?” জগু আমার বাবার নাম - জগদানন্দ।

বাবা বললেন, “আমি তো শ্যামলকে পানুর চায়ের দোকানে বসে থাকতে দেখলাম...আমাকে দেখে জিজ্ঞাসা করল, কাকু বাজার হয়ে গেল? আপনাদের বাড়ি গিয়েছিলাম – স্বপনকে অনেক বার ডাকলাম – সাড়াই দিল না। সকাল সকাল কোথায় যে গেল...। তাই পানুদার দোকানে এলাম চা খেতে”। “কোথায় আর যাবে – তুমি বাড়ি এসো বাবা...আমি এগোচ্ছি” - বলে আমি চলে এলাম – হাতে ভারি থলে – তাই আর দাঁড়াইনি”।

আমরা তো বটেই, উপস্থিত সকলে স্তম্ভিত হয়ে গেল বাবার কথা শুনে। কারো মুখে কোন কথা নেই। আমার ঠাকুমা এতক্ষণ চুপ করে সবার কথা শুনছিলেন, বললেন, “বাজারের থলিটা ঘরে রেখে আয়, জগু – খুব জোর বেঁচে গেছিস ওই থলিটার জন্যে”।

বাবার হাত থেকে বাজারের থলিটা নিয়ে আমিই দৌড়ে বাড়িতে রেখে এলাম। তারপর ফিরে এসে যা শুনলাম – মাথা থেকে পা পর্যন্ত শিউরে উঠল। শ্যামল এখন নাকি নিশি হয়ে সবাইকে ডেকে ডেকে বেড়াচ্ছে...।  নিশি হচ্ছে এক ধরনের ভূত, নিজের দল ভারি করার জন্যে সে নাকি বন্ধু-বান্ধব, চেনাজানাদের ডেকে ডেকে বেড়ায়। যে সেই ডাকে সাড়া দিয়ে তার সঙ্গে যায় – ব্যস্‌, সেখানেই তার শেষ। পরাণপাখিটা ফুড়ুৎ করে উড়ে যায় নিশির সঙ্গে, আর পড়ে থাকে তার প্রাণহীন দেহটা। আমার আর বাবার ভাগ্য খুব ভালো। কারণ আমি শ্যামলের ডাকে সাড়া দিইনি আর বাবা ভারি থলির জন্যে শ্যামলের কাছে যেতে পারেননি। কী ভয়ংকর বিপদ থেকে যে আমরা পরিত্রাণ পেয়েছি – সে কথা ভেবে, আমি আরও একবার শিউরে উঠলাম।

ওই জমায়েতে বয়স্করা সকলেই যখন তাঁদের শোনা ভয়ংকর সব অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন, সেই সময়েই ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল শ্যামল। সামনে এসে বলল, “এ রাম, তোরা সব এখানে? আর আমি তোদের খুঁজতে খুঁজতে হয়রানকিন্তু কী ব্যাপার রে? এত ভিড় কেন এখানে? কী হয়েছে?”

উপস্থিত সক্কলে হতবাক দাঁড়িয়ে রইলাম শ্যামলের মুখের দিকে তাকিয়ে। একটু পরে বিনুর কাকিমা আমার ঠাকুমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “ও খুড়িমা, ভূতের মুখে কোনোদিন রাম নাম শুনেছ?”

ঠাকুমা আমতা আমতা করে বললেন, “না বাপু, আমাদের কালে এসব শুনিনি। আজকাল সবই যেন পালটে যাচ্ছে”!

ঘটনার ঘনঘটায় হতভম্ব হয়ে গেলেও, শ্যামল বেঁচে আছে জেনে খুব আনন্দ পেয়ে আমি বললাম, “তুই...তুই তার মানে মারা যাসনি? দিব্যি বেঁচে আছিস...!”

“আমি মরে গেছি? কোন দুঃখে মরব রে, হতভাগা? ওঃহো বুঝেছি...তোরা তো রাম ভীতুরে...”। বলে শ্যামল হাসতে লাগল হো হো করে। দত্তজ্যেঠু খুব বিরক্ত হয়ে বললেন, “তোর এত হাসি পাচ্ছে কেন, শ্যামল?”

শ্যামল খুব লজ্জা পেয়ে বলল, “দোষটা আমারই জ্যেঠু। গতকাল ও বাড়িতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত স্বপনরা আমাকে বারবার নিষেধ করেছিল। বলেছিল ও বাড়িতে নির্ঘাৎ ভূত আছে। শুনে ভয় যে করেনি তা নয় - তবুও জিদ করেই গিয়েছিলাম। বিছানা করে রাত্রে শোয়ার পরেও বেশ ভয় ভয় করছিল। কিন্তু মোমবাতির আলোয় বই পড়তে পড়তে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম – বুঝতেও পারিনি। পাখিদের ডাকাডাকিতে ঘুম ভাঙল খুব ভোরে। আমার ঘরে শুয়ে এত ধরনের বিচিত্র পাখির ডাক আগে কোনদিন শুনিনি, জ্যেঠু – আজ সকালে যেমন শুনলাম। বুঝতে পারলাম ভূত-টূত কিস্‌সু নেই – ওসব আমাদের কল্পনা। আসলে প্রকৃতিই আমাদের পরিত্যক্ত বাড়িটাকে ঘিরে ফেলেছে।

নীচেয় নেমে বাড়ির চারদিকটা কিছুক্ষণ ঘুরলাম। আমকে দেখেই বেশ কিছু প্রাণী সট্‌সট্‌ ঢুকে পড়ল ঝোপঝাড়ের পিছনে – মনে হল মেছোবেড়াল আর ভাম। একটা নেউলকেও দেখলাম। তাদের সবারই ভাবখানা – আমাদের জগতে তুমি আবার কে হে, উড়ে এসে জুড়ে বসলে? এদের প্রায় সকলেই রাতচরা প্রাণী, বুঝলাম এদের চলাফেরার আওয়াজ কিংবা ডাকাডাকি শুনেই আশেপাশের মানুষ ভয় পায়। তখনই মনে হল স্বপনদের সঙ্গে একটু মজা করলে কেমন হয়?

ওপরে গিয়ে মশারিটা খুলে ছুঁড়ে দিলাম একদিকে। জলের বোতলটা গড়িয়ে দিলাম মেঝেয় – আর বইটা খোলা অবস্থায় রেখে দিলাম একটু দূরে। তারপর গায়ের জামাটা খুলে উলটো করে পরলাম। বোতাম লাগানো দিকটা রইল পিঠের দিকে... ব্যস্‌। অপেক্ষায় রইলাম কখন স্বপনরা আসে।

ছটা দশ নাগাদ সিঁড়িতে পায়ের শব্দ পেলাম। আমি বিছানায় শুয়ে পড়ে চাদরটা টেনে নিলাম বুক অব্দি। কারণ জামা উলটে বুককে পিঠ বানানো যায় – কিন্তু পাদুটোকে তো উল্টোনো যায় না। তারপর হাতদুটোও চাদরের ভেতর লুকিয়ে নিলাম। ওরা এসে ঘরের দরজা ঠেলতেই স্থির চোখে তাকিয়ে রইলাম ওদের দিকে। ওরা ভাবল আমি ঘাড় মটকে মারা গেছি। স্বপন ঘরের ভেতরে আসছিল – কিন্তু জিতু ওকে টেনে বাইরে নিয়ে গেল। স্বপন ঘরে ঢুকলে আমি ধরা পড়ে যেতাম – চোখের পাতা না ফেলে কতক্ষণ আর একভাবে তাকিয়ে থাকা যায়?”

শ্যামলের কথা শেষ হতে আমরা সকলেই হাসতে লাগলাম, বললাম, “হতভাগা খুব ঠকালি, আমাদের”!

শ্যামল লাজুক হেসে বলল, “ব্যাপারটা যে এতদূর গড়াবে, আমি বুঝিনি জ্যেঠু... এক্সট্রিমলি সরি”।

আমার ঠাকুমা হাসতে হাসতে শ্যামলের একটা কান ধরে বললেন, “তুই কেন সরি হবি, বাবা? তুই তো আমাদের সকলের চোখ খুলে দিলি রে,  হতভাগা ডানপিটে - দস্যি ছেলে”!

  ---০০---


এর পরের ছোটদের গল্প " ব্যাঘ্র যখন ব্যগ্র "

                            

বুধবার, ৯ জুলাই, ২০২৫

বিসর্জন

এর আগের নাটুকে গল্প " চ্যালেঞ্জ  "  





 দুগ্‌গা

“ওফ আর পারা যাচ্ছে না। এই অষ্টমীর দিনেই বড্ডো ধকল যায়। সকাল থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুজো নাও, অঞ্জলি নাও। তারপর সন্ধিপুজোর যোগাড় সারা হলে, সন্ধি পুজো নাও। একটানা এতক্ষণ, পা দুটো ভেরিয়ে যায়। আআআআঃ (মস্ত হাই), মণ্ডপের কাঠের মেঝেয় বসে পাদুটো ছড়িয়ে বসে কী আরাম! লক্ষ্মী ওদিকটা লক্ষ্য রাখিস তো, হুট করে এদিকে কেউ যেন চলে না আসে”।

“দেখেছি, মা। সবাই নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। ওরা তো আমাদের থেকেও ক্লান্ত। পারে নাকি আর?”

“যাক আর তো দুটো দিন, নবমী পুজো আর দশমীর বরণ। ব্যস, তারপরেই ফিরে যাওয়া”।

“আমার ফিরে যাওয়াই সার। আবার তো ফিরে আসতে হবে, পাঁচদিন পরেই পূর্ণিমাতে”।

“সে আর কী করবি, বাছা? দুটো পয়সার জন্যে আকুলিবিকুলি করছে মানুষগুলো। তোকে পুজো দিয়ে তারা একটু সুখে সম্পদে থাকতে চায়, এইটুকু বৈ তো না”।

“সে ঠিক আছে। কিন্তু আমার জার্নিটা দেখছো না? কাতু আসে কার্তিকের শেষে, প্রায় মাসদেড়েক পরে। আমাদের মধ্যে সরুটা খুব সেয়ানা, সে আসে সাড়ে তিন-চারমাস পড়ে, বেশ ঠাণ্ডার সময়। যত ঝক্কি আমার আর গণুদার। গণুদা এই কদিন আগে আগে একা এসেছিল, আবার আমাদের সঙ্গে এল। আর আমাকে গিয়েই আবার ফিরে আসতে হবে!”

সরু হাসতে হাসতে বলল, “অ্যাই দিদি, তোর হিংসে হচ্ছে, বুঝি? দাঁড়া একটু গান শোন, তাহলেই দেখবি মনটা ভালো হয়ে যাবে! মন থেকে রাগ টাগ সব পরিষ্কার হয়ে যাবে!”

“অ সরু, তুই আবার এই রাত দুপুরে বীণা নিয়ে বসলি? তোরা হাঁসটাও তো এবার হাসবে, মা”।

“একটু শোনো না, মা। নতুন একটা সুর সেধেছি। শুনে, বলো না, কেমন হয়েছে?”

“না শুনিয়ে তুই কী আর ছাড়বি, বোন। শোনা, তাড়াতাড়ি শোনা”। গণুদা বললেন।

খুশি হয়ে সরু বললেন, “থ্যাংকিউ, গণুদা”।

বীণায় সুন্দর সুর বেজে উঠল সকলে চোখ বন্ধ করে শুনছিলেন। সরুর হাতে সত্যি জাদু আছে। পিড়িং পিড়িং শব্দে কী যে আশ্চর্য সুর বের করে ফেলে, মনটা হালকা হয়ে যায়। শরীরের ক্লান্তিও দূর হয়ে যায়। কিন্তু হঠাৎ অচেনা গলার আওয়াজ পেয়ে সকলেই একটু চমকে উঠলেন।  

 

“তুমি বীণা বাজাতে পারো, আমাকে শিখিয়ে দেবে?” সরুর হাঁটুতে ছোট্ট ছোট্ট হাত রেখে একটি মেয়ে জিগ্যেস করল। সকলেই একটু সতর্ক হয়ে উঠলেও, মা তেমন উতলা হলেন না, বললেন, “থাক থাক, বাছা। তোরা সব ব্যস্ত হস না। ও‌ ছোট্ট পুঁচকে মেয়ে। বড়দের মতো এখনো কুচুটেপনা শেখেনি। ও আমাদের দেখে ফেললে কোন ক্ষতি নেই। তোর নাম কী রে, মা?”

“আমার নাম? আমার নাম দুগ্‌গা”  

দুগ্‌গা নাম শুনে সরু হেসে ফেললেন, বললেন, “ওয়াও, হোয়াট আ সারপ্রাইজ”! 

লক্ষ্মী বললেন, “এতে আর আশ্চর্য হবার কী আছে? আমার নামের মেয়েরা কাজের মাসি বা কাজের দিদি হয়। “অ লক্ষ্মী, এঁটো থালাবাসন কটা চট করে ধুয়ে দাও না গো”। লক্ষ্মী অবিকল বাড়ির গিন্নিদের মতো বললেন। “আর তোর নাম রাখে না, তোর নামের বানানের জন্যে। এমন খটোমটো বানান, ইংরিজিতে তাও একটু সহজ, কিন্তু বাংলায়? বাপরে!”

গণুদা বললেন, “বোঝো কাণ্ড। তোরা আবার নাম নিয়ে পড়লি কেন?” ছোট্ট মিষ্টি মেয়েটার নাম দুগ্‌গা শুনে মা দুগ্‌গা খুব খুশি হয়েছেন, কিন্তু মেয়েরা দুঃখ পাবে বলে, গম্ভীরভাবে বললেন, “ও লক্ষ্মী, ওসব ভাবিস কেন, মা? নামে কী আসে যায়। হ্যাঁরে, সরু কোন এক সায়েব যেন বলেছিল ?”

“সেক্সপিয়ার”। সরু বললেন। মা বললেন, “ওই ওই। গোলাপকে ঘেঁটু বললে, গোলাপ ঘেঁটু হয়ে যায় বুঝি?”

সরু হিহি করে হেসে বললেন, “মা, তুমি না যাতা। ঠিক ওভাবে বলে নি, তবে অনেকটা ওরকমই”।

 

ছোট্ট দুগ্‌গা দূর থেকে দাঁড়িয়ে গত মাস খানেক ধরেই এঁদের প্রতিমা গড়ে উঠতে দেখেছে। আর এ কদিন ধরে দেখেছে কত কত লোক, ছেলে মেয়ে, বুড়োবুড়ি সুন্দর সুন্দর নতুন জামাকাপড়, শাড়িটাড়ি পরে রোজ এসে পুজো দেয়। আরতি দেখে। চারদিকে আলোর সাজ। সকাল সন্ধ্যে অজস্র ফুল, ধুপ, ধুনোর গন্ধ। গোটা পাড়াটাই সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। এই পুজোর সময় সব কিছুই ভালো, শুধু ঢাক বাজে, কাঁসর ঘন্টা বাজে, শাঁখ বাজেআর মাসিমা, কাকিমারা জিভ নাড়িয়ে ঊলু দেয়। মা সামনে আসতে পারে না, একটু দূর থেকে দেখে চলে যায়। যাঁর পুজো হচ্ছে, তাঁর নাম দূর্গা, সেই দূর্গা যে দুগ্‌গাও, সে কথাটি সেই মেয়েটি তো আর জানে না। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। তাই নির্জন মণ্ডপে উঠে এসে, বড়ো দিদির মতো দেখতে মেয়েটির হাঁটুতে ছোট্ট হাত রেখে দাঁড়িয়েছিল।

বীণা বাজাচ্ছিল যে মেয়েটি, সে তার দিদির মতোই দেখতে, তবে তার দিদি এত ফর্সা নয়। পরনের শাড়িটাও এত সুন্দর, ঝলমলে, ভাল নয়। এই দিদিটা গলায়, হাতে, পায়ে যে এত গয়না পরেছে, তার দিদির তাও নেই। তার ওপর সকলের কথাবার্তা শুনে দুগ্‌গা একটু ঘাবড়ে গেল। ভয় পাওয়া বড়ো বড়ো চোখে তাকিয়ে রইল সরুর মুখের দিকে। সরু মুখ নামিয়ে তাকালেন দুগ্‌গার দিকে, মিষ্টি হেসে বললেন, “বীণা শিখবি? কিন্তু একদিনে তো হবে না, সোনা! অনেক দিন ধরে শিখতে হবে। তোর বাড়ি কোথায়?”

দুগ্‌গা সরুদিদির কথায় কিছুটা আশ্বস্ত হল। অনেক দূরের দিকে হাত বাড়িয়ে সে দেখাল, বলল, “ওই হোথা”। দুগ্‌গার কথায় সরু হেসে ফেললেন, মজাও পেলেন, ঘাড় ঝাঁকিয়ে বললেন, “কোথা?”

“দুলে পাড়া। আমার বাবা, বলরাম দুলে। ঢাক বাজায়। আমার ছোড়দা ঘনশ্যাম ঘন্টা বাজায়”। তারপর হাত তুলে দেখালো, মণ্ডপের নীচে মাটির এক কোণে ঢাকের পিছনে গুটিশুটি শুয়ে আছে একজন লোক আর একটা ছেলে - সেদিকে।

সরু দুগ্‌গার থুতনিতে হাত দিয়ে হাল্কা আদর করে বললেন, “তুই বাবার সঙ্গে এসেছিস, ঠাকুর দেখতে?” দুগ্‌গা ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলল। এতক্ষণ সরু আর দুগ্‌গার কথা শুনছিলেন, এখন একটু উদ্বিগ্ন সুরে মা বললেন, “ও সরু। ওকে ছুঁয়ে ফেললি যে, লোকে দেখে ফেললে কুরুক্ষেত্র বাধাবে”।

“ছুঁয়ে ফেললে কী হয়েছে, মা? আমাদের কী জাত যাবে? দেবতার কী জাত আছে মা?”

“আমাদের জাতের কথা কে ভাবছে, বাছা? তা নয়। কিন্তু ভোর হতে দেরি নেই। লোকেদের কেউ দেখে ফেললে এক কাণ্ড বাধিয়ে বসবে। আমাদের কিছুই হবে না। ওদের তাড়িয়ে দেবে, মারধোর করবে। হয়তো...” ভয়ংকর কথাটা মা বলতে পারলেন না।

লক্ষ্মীও বললেন, “সত্যি, তোরই বা অত আদিখ্যেতা দেখানোর দরকারটা কী শুনি? দু চারটে কথা বলে সরিয়ে দে। কী থেকে কী হয় বলা যায়?”

সরু কিছুটা বিরক্ত হলেন এবার, বললেন, “তোমরা একটু বেশীই ভাবছো, মা। ওসব আগেকার দিনে হতো। আজকাল ছেলেমেয়েরা কত লেখাপড়া শিখছে। বুঝতে শিখছে। কম্পিউটার, ইন্টারনেট সারাবিশ্বের পড়াশুনো এখন হাতের মুঠোয়। এ মেয়েটি ভারি মিষ্টি, আমি একে বীণা শেখাবো। ওর মনের যতো সুর, আমি ওর হাতে বসিয়ে দেবোদেখো, বড় হয়ে ও কেমন বীণা বাজায়”।

“কী জানি বাপু, আমার মন কিন্তু কু গাইছে, সরু। ওকে দূরে সরে যেতে বল”।

 

মানদাসুন্দরী রাত থাকতেই উঠে পড়েন। কোমর বেঁকে গেছে, হাঁটুতে জোর পান না, তবুও এ সময় তাঁর মন্দিরতলায় রোজ আসা চাই। এখন তো আবার দূর্গাপুজো হচ্ছে, জগজ্জননী মা ছেলেমেয়েদের নিয়ে এসেছেন, বাপের ঘরে। তাঁর না এলে চলে? বিড়বিড় করে দূর্গাস্তোত্র বলতে বলতে তিনি এসে দাঁড়ালেন মণ্ডপের সামনে। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁর বুক জুড়িয়ে গেল। একটিমাত্র শিশুপুত্র নিয়ে তিনি বিধবা হয়েছিলেনবহু দুঃখকষ্ট সহ্য করে তাকে বড়ো করেছেন। বিয়ে দিয়েছেন। একটি নাতি আর একটি নাতনি নিয়ে তাঁর ভরা সংসার হবার কথা ছিল। হল না, আঁটকুড়ির বেটি, ছেলের বউটার জন্যে। তাঁর শিবের তুল্য ছেলের কানে কুমন্ত্রণা দিয়ে, ফুসলে আলাদা হয়ে গেল। বেশ ক’বছর হল, মানদাসুন্দরী আবার অসহায় বেধবা।

স্তোত্র আওড়াতে আওড়াতে চোখ বন্ধ করে জোড়হাত করলেন মানদাসুন্দরী, মা দূর্গার কাছে আকুতি জানালেন, “ও মা, শেষ বয়সে একটু সুখ আর শান্তি দাও, মা। আমার ভোলাকে, আমার বুকে ফিরিয়ে দাও মা।” আবেগের বশে তাঁর দু চোখে জল চলে এল। চোখ মেলে, সকল প্রতিমার মুখের দিকে তাকাতে গিয়ে তাঁর চোখে পড়ল, সরস্বতী মায়ের হাঁটু ধরে, ওই ছুঁড়িটা কে? ঝাপসা চোখে ঠিক দেখছেন তো? নাঃ, ঠিকই তো দেখছেন, একটা হতভাগী মেয়ে। যেমন তার শাঁকচুন্নীর মতো চেহারা, তেমনি তার জামাকাপড়ের ছিরি। নিশ্চয়ই কোন ছোটনোকের মেয়েঝ্যাঁটা মার, ঝ্যাঁটা মার, আকাচা কাপড়ে ঠাকুরের গায়ে কেমন লেপটে ছুঁয়ে আছে দেখো।

তাঁর কর্কশ খনখন স্বরে নবমীর স্নিগ্ধ ভোর চমকে উঠল, “ওরে ও আবাগীর বেটি, তুই ওখানে কেন রে, হতচ্ছাড়ি? দেব্‌তার পিতিমে কী তোর খেলার পুতুল? নেমে আয় নেমে আয়, শিগ্‌গিরি। কী আস্পদ্দা রে, তোর? কার মেয়ে তুই, কোন পাড়ায় বাড়ি”। ছোট্ট দুগ্‌গা ভয়ে আতঙ্কে দৌড়ে নামতে গিয়ে মণ্ডপের সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে পড়ল মাটিতে। কাঠের সিঁড়ির কোণায় লেগে তার হাঁটু ছড়ে গেল। মণ্ডপে তিন দেবী শিউরে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, “ইস্‌, আহা রে”।

মানদাসুন্দরী দেবী ছুঁতে পারবেন না, তা নাহলে তিনি চুলের মুঠি ধরে মেয়ের ঝিঁকুটি নাড়িয়ে দিতেন। তিনি আগুন ঝরানো চোখে এগিয়ে চললেন, হাঁটু চেপে বসে থাকা দুগ্‌গার দিকে, দুগ্‌গার ক্ষতে রক্ত জমছে। মানদাসুন্দরীর চেঁচামেচিতে বলরাম দুলের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। ঘুমভাঙা চোখে সমস্ত ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সেও শিউরে উঠল আতঙ্কে।

সে দৌড়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল, মানদাসুন্দরীর পায়ের কাছে, “মা ঠাকরেন, আমার মেয়েরে ছেড়ে দ্যান, মা ঠাকরেন, ছোট মেয়ে বুঝতে পারে নাই, করে ফ্যালেচে। আমি ওকে খুব পিটবো, খুব বকবো, পুজোর থানে আর কোনদিন আনবুনি”

আগুনে যেন ঘি পড়ল, মানদাসুন্দরী বিকৃত স্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন, “তোর মেয়ে, হারামজাদা? দুলে, ছোটলোক? তোদের এতদূর আস্পদ্দা? ঠাকুরের গায়ে হাত দিস? ওরে অ সিধু, অ স্বপ্না, অ দেবু, কোতায় গেলি সব, এদিকে যে অনাছিস্টির কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে... এখনো ঘুমিয়ে থাকবি? বলি দেশে কী জাতধর্ম, সৈরণ অসৈরণ কিছুই থাকবে নি কো? কিছু করবি? নাকি আমি অনত্থ বাধাবো?”

মানদাসুন্দরীর চেঁচামেচি শুনে দৌড়ে এল সবাই।

“কী হয়েছ, ঠাকুমা?”

“হবার আর বাকি কী রইল, বাছা? সারারাত ওই ছোটলোকের দল যে পিতিমে নিয়ে পুতুল খেলা করছে, বলি আর হবে কী?”

দেবাশীষ গেল মেয়েটির কাছে। সিদ্ধার্থ মাটিতে মাথানীচু করে বসে থাকা বলরামের দিকে এগিয়ে গেল।

“কী হয়েছে, বলরামদা? কী করেছ?”

“আমরা ঘুমোচ্ছিলাম, আমার ওই মেয়েটা কখন উঠে গিয়ে, মায়ের গায়ে হাত দিয়ে ফেলেছে। আর কোনদিন ওকে পুজোয় আনবুনি সিধুবাবু। ছোট মেয়ে জানেনা, এবারের মতো ক্ষ্যামাঘেন্না করে দাওআজই ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি। কোনদিন আর পুজোয় আনবুনি”হাঁটুর ব্যাথায়, ভয়ে বিবর্ণ মেয়েটিকে দেবাশিষ সামনে আনল।

সিদ্ধার্থ বলল, “আরে, এ তো রক্ত পড়ছে। দেবু তুই ওকে তোর বাড়ি নিয়ে যা, ব্যাণ্ডএড-টেড কিছু আছে? ফার্স্ট এড করে দে। কী নাম রে তোর?” মেয়েটি নাম বলতে আর ভরসা পেল না, চুপ করে মাথা নিচু করে রয়েছে, তার চোখ থেকে জল ঝরছে। বলরাম বলল, “আমার মেয়ে বাবু, নাম দুগ্‌গা”।

“সেকি? আজকের দিনে দুগ্‌গামায়ের চোখে জল? ছি ছি ছি”।

মানদাসুন্দরী অবাক হয়ে দেখছিলেন, ছোকরাদের কাণ্ড, দেখে আর থাকতে পারলেন না, তীব্রস্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন, “তোরা কী পাগল হলি নাকি? একি অধম্মের কাণ্ড, ওই মেয়েকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় কর বলছি, নাহলে ঘোর অমঙ্গল”।

সিদ্ধার্থ দুগ্‌গাকে কোলে তুলে নিল, বলল, “আর কাঁদিস না, চল, আমার সঙ্গেঊর্মি, আমার বোন, তোকে পেলে আর ছাড়বে না। কী রে যাবি না ঊর্মিদিদির কাছে?”

অশ্রুভেজা চোখেও দুগ্‌গা ফিক করে হাসল, সিদ্ধার্থদাদার কাঁধের ওপর দিয়ে তাকিয়ে রইল মণ্ডপের দিকে। সরুদিদি হাসছেন

* * *

 

গল্পটা শেষ করে, আলপনা মোবাইলে একটা নম্বর খুঁজে ডায়াল করল। আলপনা একটা বাংলা পত্রিকার সম্পাদক। রিং হচ্ছে, তিনবার রিং হবার পর উত্তর এল, “হ্যালো।”

“হ্যালো, বিষ্ণুদা। আলপনা বলছি। আপনার পাঠানো গল্পটা, পড়লাম। থ্যাংকুউ, দারুণ মিষ্টি একটা গল্প। খুব সুন্দর মেসেজও রয়েছে একটা”

“ওয়েলকাম, ভাই। কিন্তু কোন গল্পটার কথা বলছো বলো তো?”

“বা রে, যেটা আমাদের পত্রিকার জন্যে পাঠালেন। “দুগ্‌গা”। ভুলে গেলেন?”

“ওঃ দুগ্‌গা? ভালো লেগেছে তোমার? অনেক ধন্যবাদ ভাই”।

“ওটা আমরা পরের সংখ্যায় ছাপছি। ভুলে অন্য কোথাও আবার দিয়ে দেবেন না যেন। আপনার যা ভুলো মন”।

“হা হা হা হা। যা বলেছো। তবে গল্পটা সাজানো, মিথ্যে - তাই ভুলে গেছিলাম। সত্যিটা ভুলতে পারি না যে!”

“তার মানে? গল্পের আবার সত্যি মিথ্যে কী? কী যে বলেন, দাদা?”

“জীবনের সত্যি নিয়ে গল্প - কটা হয় বলো তো? অধিকাংশই তো সাজানো গল্প”।

“হুঁ, তাই? এই গল্পের সত্যি কিছু আছে নাকি, দাদা। বলুন না শুনি”। আলপনা হালকা গলায় বলল।

“সিরিয়াসলি শুনবে? মিষ্টি নয় কিন্তু”।

“আচ্ছা, সে আমি বুঝবো। আমি একজন সম্পাদক, ভুলে যাবেন না। হা হা হা হা”।

“তা ঠিক। সম্পাদককে অনেক যন্ত্রণাই পুষে রাখতে হয়। শুনবে, তাহলে?”

“শিয়োর, বলুন”।

“বলছি। গল্প প্রায় সবটাই থাকবে, ওই শেষের দিকে কিছুটা...

“মানদাসুন্দরীর চেঁচামেচি শুনে দৌড়ে এল সবাই। তাদের নিঃশ্বাসে তীব্র মদের গন্ধ। গতকাল রাত থেকে শুরু হয়েছে নেশার আয়োজন, এখনো চলছে।

“কী হয়েচে অ্যাই বুড়ি? ভোর রাতে পাড়া মাতায় তুলেচিস কেন?”

“হবার আর বাকি কী রইল, বাছা? সারারাত ওই ছোটলোকের দল যে পিতিমে নিয়ে পুতুল খেলা করছে, বলি আর হবেটা কী?”

দেবু গেল মেয়েটির কাছে। সিধু মাটিতে মাথানীচু করে বসে থাকা বলরামের দিকে এগিয়ে গেল। তারা দুজনেই টলছে।   

“কী হয়েছে বে, অ্যাই বলরাম? কী করেছিস?”

“আমরা ঘুমোচ্ছিলাম, আমার ওই মেয়েটা কখন উঠে গিয়ে, মায়ের গায়ে হাত দিয়ে ফেলেছে। আর কোনদিন ওকে পুজোয় আনবুনি সিধুবাবু। ছোট মেয়ে জানেনা, এবারের মতো ক্ষ্যামাঘেন্না করে দাও। আজই ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি। কোনদিন আর পুজোয় আনবুনি”। হাঁটুর ব্যাথায়, ভয়ে বিবর্ণ মেয়েটিকে দেবু সামনে আনল। ঘোলাটে চোখে সিধু তাকিয়ে দেখল মেয়েটাকে। তার মুখে চিকচিকে হাসি, বলল।

“আবে, এর তো রক্ত পড়ছে। কী নাম রে তোর?” মেয়েটি নাম বলতে আর ভরসা পেল না, চুপ করে মাথা নিচু করে রইল, তার দু চোখ ভরা জল

বলরাম বলল, “আমার মেয়ে বাবু, নাম দুগ্‌গা”।

“দুগ্‌গা? দুগ্‌গা দুগ্‌গা” সিধু মেয়েটিকে কোলে তুলে নিল, বলল, “আজকের দিনে দুগ্‌গার চোখে জল কেন বাওয়া?”মানদাসুন্দরী অবাক হয়ে দেখছিলেন, ছোকরাদের কাণ্ড, দেখে আর থাকতে পারলেন না, তীব্রস্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন, “তোরা কী পাগল হলি নাকি? এ কী অধম্মের কাণ্ড, ওই মেয়েকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় কর বলছি, নাহলে ঘোর অমঙ্গল”

সিধুর ডান হাতটা ঢাকা পড়ে গেল দুগ্‌গার পুজোর আগেই সদ্য কেনা সুন্দর ফুলফুল ছাপ ফ্রকের তলায়।

ধমকে উঠল জোর গলায়, “অ্যাই বুড়ি, চোপ।  আর একটা কথা বললে, গলা টিপে খালে ভাসিয়ে দেবো” তারপর অদ্ভূত একটা বিকৃত হাসি মুখে নিয়ে, দুগ্‌গাকে বলল, “আর কাঁদিস নি, চল আমার সঙ্গে” দুগ্‌গার চোখের জল শুকিয়ে এসেছে, অদ্ভূত আতঙ্কে সে তাকিয়ে আছে সিধুর দিকে। তার ছোট্ট জীবনে এমন ভয় সে কোনদিন পায়নি। সে ছোট্ট ছোট্ট হাতে সিধুর ফ্রকের আড়ালে থাকা হাতটা টেনে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করতে লাগল। পারল না। তাকে কোলে নিয়ে সিধু হাঁটতে লাগল ভোরের মাঠের দিকে। আকাশে এখনো আলো ফোটেনি। পাখিদের ঘুম ভাঙতে শুরু করেছে। দুগ্‌গা ছোট্ট পাখির মতো ছটফট করে ছাড়া পেতে চাইছিল, পারছিল না। ভয়ে চিৎকার করে উঠল। অন্যহাতে সিধু তার মুখটা চেপে ধরল।

হতভম্ব বলরাম চিৎকার করে উঠল, “ও বাবু, দুগ্‌গাকে কোথায় নে যাচ্ছেন, বাবু?  দুগ্‌গা, ও দুগ্‌গা”। দেবু সিধুর একটু পিছনে ছিল। ফিরে দাঁড়িয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আর একটা কথা বললে না, তুইও যাবি। মেয়েটাও মায়ের ভোগে যাবে...”।

 

“বিষ্ণুদা, প্লিজ এ গল্পটা মোটেই সত্যি নয়। আপনি মিথ্যে বলছেন। প্লিজ চুপ করুন”।

“তাই? তোমার মিথ্যে মনে হচ্ছে? থাক তাহলে আর বলব না। তবে শেষটা শুনবে না? সেদিন দুপুরের দিকে দুগ্‌গাকে পাওয়া গিয়েছিল, কিছুটা দূরে খালের ধারে। মৃতা এবং উলঙ্গ, সে কথা বলাই বাহুল্য। তোমার যখন ভালো লাগছে না, আর কিছু বলবো নানা বললেও বুঝতে পারছো নিশ্চয়ই!”

আলপনা অস্ফুট গলায় বলল, “রাখছি, বিষ্ণুদা”।

“এক মিনিট, গল্পটা ছাপছো কী? ছাপলে কোনটা? আগেরটা? তাহলে কোন সমস্যা নেই - খুব নিরাপদ। সন্ধেবেলার চায়ের আসরে নিশ্চিন্তে আলোচনা করতে পারবে - সত্যি বিষ্ণুদার কলমে জাদু আছে। আর যদি পরেরটা ছাপতে চাও, গল্পের নাম দিও “বিসর্জন”। দশমীর দিন ওই খালেই মা দূর্গারও বিসর্জন হয়েছিল। বিসর্জনের পর জলে ভেজা, রঙ ওঠা, খড় বেরিয়ে আসা, সে কী বীভৎস কদর্য সব প্রতিমা। রাখি? ভালো থেকো”।

 

..০০..


এর পরের গল্প " মৃত্যুর মিছিল "

নতুন পোস্টগুলি

নামকরণ

     এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২   "        শাশুড়িমায়ের জিম্মায় ফুটকিকে রেখে বিজলি আজই স্কুলে জয়েন করলেন। মাসখানেকের...