রবিবার, ২০ জুলাই, ২০২৫

প্রমোশন

 এর আগের বড়োদের গল্প - " কনে দেখা আলো





পরির বাড়িতে একতলার বসার ঘরে হুড়মুড়িয়ে ঢুকেই নিখিল দেখল অচেনা এক ভদ্রলোক বসে আছেন। নিখিল একটু হকচকিয়ে কী বলবে ভাবছে, কিন্তু তাকে দেখেই ভদ্রলোক এমন দাপটের সঙ্গে কথা বলা শুরু করে দিলেন, যেন অনেক দিনের চেনা।  

“বসুন, বসুনআরে, এখানে নয়, এখানে নয়, ওই...ওই...চেয়ারটায়”চেয়ারটা সন্তর্পনে একটু দূরে সরিয়ে খুব সাবধানে নিঃশব্দে বসল নিখিল। মনে হল চেয়ারটা যেন ফঙ্গবেনে কাচের, একটু এধার ওধার হলেই ভেঙে চুরচুর হয়ে যাবে। নিখিলের বসাটা মন দিয়ে লক্ষ্য করার পর ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, “হুঁ, হুট করে একেবারে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লেন, তা কাকে চাই?”

নিখিল খুব আমতা আমতা করে বলল, “আামি নিখিল, ইয়ে মানে... পরি...মানে পরিচিতা নেই?”

ভদ্রলোক একটু অবাক হয়ে গমগমে গলায় বললেন, “খি আশ্চর্য, পরির বাড়িতে পরি থাকবে না তো, কে থাকবে? তা আপনি কী পরিচিতার খুব পরিচিত?”

ভদ্রলোকের আলতো ধমকে নিখিল একটু যেন এলোমেলো হয়ে গেল, বলল, “আজ্ঞে, হ্যাঁ আমি আর পরিচিতা একই কলেজে পড়েছি, সেই থেকেই আমরা পরিচিতা....ইয়ে মানে... ও আমার পরিচিত এবং খুব ভালো বন্ধু”

নারকেলের বাস্‌নার পুরুষ্টু ঝাঁপালো দুই ভুরু কুঁচকে ভদ্রলোক নিখিলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “পরি এখন তো আর কলেজে পড়ে না, পাস করে চাকরি করছে। তা আপনি কী এখনো কলেজেই, নাকি কাজ কম্মো কিছু যোগাড় হয়েছে?”

নিখিল ভীষণ বিনীত স্বরে বলল, “না, না পরির সঙ্গেই কলেজ থেকে পাস করে গেছি, আর কাজ বলতে, হ্যাঁ, অকাজ-কাজ দুটোই করি বৈকি!”

নাকমুখ কুঁচকে ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, “কাজ বলতে যদি চাকরি ধরে নিই, তাহলে অকাজটা কী?”

নিখিল একটু গর্ব করে বলল, “অকাজ মানে, ওই একটু আধটু লেখালেখি করি”।

ভদ্রলোক বিরক্ত মুখে বললেন, “লেখালেখি করেন? মানে লেখক? তা কী ধরনের ইয়ে লেখা হয় শুনি?”

ভদ্রলোকের কৌতূহলে নিখিল খুব উৎসাহ পেল, বলল, “বেশীর ভাগ ছোট গল্প, স্যার, বড়দের জন্যে, ছোটদের জন্যে। তাছাড়াও দু একটা উপন্যাস...”

“অ, চার্লস ডিকেন্স? ডেভিড কপারফিল্ড, এ টেল অব টু সিটিজ গোছের, নাকি মপাসাঁ গোছের”?

নিখিল অবাক হয়ে হাঁ করে তাকিয়ে রইল, কিছুক্ষণ। তারপর খুব মৃদুস্বরে বলল, “আমি স্যার বাংলায় লিখি, ইংরিজিতে নয়!”

“বা-আং-লা-আ-য়?” ভদ্রলোক নাক কুঁচকে বললেন, “বঙ্কিম, শরৎ, রবিঠাকুরের পর, বাংলায় কেউ লেখে? চোখে পড়েনি তেমন!”

নিখিল কোন উত্তর দিল না। চোখের সামনে এমন একটি স্পেসিমেন সে দেখতে পাবে কোনদিন স্বপ্নেও ভাবেনি। ২০২৫-এর এই ভ্যাপসা শ্রাবণে, ইংরিজি সাহিত্য বলতে কেউ চার্লস ডিকেন্সের নাম বলবে, ভাবা যায় না। এমন অঘটন আজও হয়? তার মনে হল, এই পুজোর ছুটিতে তুঙ্গভদ্রা কিংবা নর্মদা বেসিনে টিরানোসোরস খুঁজতে গেলে, কেমন হয়? বলা যায় না, এরকমই দু একপিস সেখানে, এখনো হয়তো ঘুরে বেড়াচ্ছে! কিছু না বলে, সে তাকিয়ে রইল ভদ্রলোকের দিকে।

নিখিলের কোন উত্তর না পেয়ে ভদ্রলোক আরো উৎসাহী হয়ে বললেন, “ফ্রম শেক্সপিয়ার থেকে আপ টু ডিকেন্স পর্যন্ত, এক্সসেপ্ট ইংলিশ লিট্‌রেচার ছাড়া, ইন দিস প্ল্যানেট, আর কিছু হয় না”তারপর একটু থেমে, করুণাঘন গলায় আরো বললেন, “আমি বাংলাকে মোটেই ডিজহার্টেন করছি না, আফটার অল ইট ইজ মাই মাদার্স ল্যাংগোয়েজ। তবে সাহিত্যের কথা যদি বলতেই হয়, তাহলে বলব, ইন কম্প্যারিজন্‌ উইথ দেম তুলনা করলে, বাংলা ইজ আ মেয়ার ছাইল্ড” “ছাইল্ড” কথাটা বলার সময় দু কাঁধ ঝাকিয়ে যা শ্রাগ করলেন, সে দেখার মতো! অবিকল ষাটের দশকের মার্লন ব্রাণ্ডো টাইপ।  

ভদ্রলোক নিখিলের মুখের দিকে তাকিয়ে তার প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করলেন, তারপর বললেন, “আপনাকে “তুমি” বললে কিছু মনে করবে না, নিশ্চয়ই! তুমি যখন পরির বন্ধু, “তুমি” বলতেই পারি”

নিখিল বিনয়ের অবতার হয়ে বলল, “মনে কী করবো, তুমিই বলবেন, স্যার”।

ভদ্রলোক সম্মতির ঘাড় নেড়ে বললেন, “ওয়েল, যে কথা হচ্ছিল, সে কথায় ফিরে আসি। সাহিত্য হিসেবে বাআংলাআ... এই যেমন ধরো, সাগরসঙ্গমে নবকুমার। তুমি অধম বলিয়া আমি উত্তম না হইব কেন? ঠিইইক আআছে, চলে যায়। তবে কি না, সেই ইয়েটা ঠিক পাওয়া যায় কী? মানে, কী বলতে চাইছি বুঝতে পারছো নিশ্চয়ই”

নিখিল ভাবলেশহীন মুখে বলল, “আজ্ঞে, সে তো বটেই! জলের মতো পরিষ্কার। এ আর না বোঝার কী আছে? একটু ইয়েই যদি না পাওয়া যায়, তা হলে আর সাহিত্য লিখে বা পড়ে লাভ কী?”

ভদ্রলোক খুব উজ্জ্বল মুখে নিখিলকে সমর্থন করে বললেন, “এক্স্যাক্টলি। তারপরে যেমন ধরো, রথের মেলা হইতে ঘরে ফিরিয়া রাধারাণী দেখিল টাকায় নাম লেখা আছে রুক্মিণী কুমার রায়। এখানেও কোথায় যেন সেই ইয়েটার একটা অভাব রয়ে গেল। তোমার কী তাই মনে হয় না?”

“আজ্ঞে একশ বার মনে হয়। মনে না হয়ে উপায় আছে? ওই ইয়েটুকু ছাড়া কী আর ইয়ে হয়?”

“তুমি কেমন লিখছো, তা আমি জানি না। আর সে জানার আমার প্রবৃত্তিও হয় না। কারণ আমি আবার কোন কিছুর মুখের ফেস ভ্যালুতে যাই না। সেটা আমার দোষ বা গুণ যাই বলো। আমি আসলে যে কোন বিষয়ের গভীরে না গিয়ে, কোন ধারণা তৈরি করতে পারি না”

নিখিল উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠল, “দারুণ বলেছেন, স্যার। অন্য কিছুর ফেস ভ্যালুতে গেলেও, মুখের ফেস ভ্যালুতে কক্‌খনো যেতে নেই”

ভদ্রলোক উজ্জ্বল চোখে নিখিলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি বেশ ইন্টেলিজেন্ট। তোমার সাধারণ কমন সেন্স জ্ঞানও খুব পরিষ্কার”

নিখিল গদ্গদ স্বরে বলল, “থ্যাংকিউ স্যার, থ্যাংকিউ”

নিখিলের কথায় পাত্তা না দিয়ে ভদ্রলোক আবার বললেন, “বাংলা সাহিত্য একটা সময় তো গুলে খেয়েছি, হে। সব কথা বলতে গেলে, রাত ভোর হয়ে যাবে”

“তা হোক না, স্যার। আপনার থেকে দু একটা কণাও যদি পাই, আমার কাছে সেটাই সম্পদ হয়ে থাকবে। আমার সময়ের কোন অভাব নেই, স্যার”

“আরে তোমার সময়ের কথা কে ভাবছে, হে? কিন্তু তাই বলে আমার সময়ের কোন মূল্যই নেই বলতে চাও? সাতখানা কোম্পানীর আমি ডিরেক্টর! হতভাগা চেয়ারম্যানগুলো আমাকে ছাড়া একপাও চলতে পারে না। এই অজিত লাহিড়ি ছাড়া কোম্পানীগুলো এতদিনে ডকে উঠে যেত, হে”

নামটা শুনে নিখিল একটু চমকে উঠল। এ নাম তো সে পরির মুখে বহুবারই শুনেছে! পরির প্রবাসী কাকা, দারুণ নাকি পণ্ডিত লোক! এলাহাবাদ ইউনিভার্সিটির নামকরা প্রফেসর! পরির মুখে এঁনার নামে, সে এত প্রশংসা শুনেছে, নিখিল অনেকবার ঈর্ষাও অনুভব করেছে, এই ভেবে যে, পরি কাকে বেশি ভালোবাসে, তাকে নাকি তার এই কাকাকে? পরির মুখে শুনে এই ভদ্রলোক সম্পর্কে তার ধারণা হয়েছিল মহান, কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে জালিস্য জালি লোক! তার ওপর প্রফেসর-ট্রফেসর কিচ্‌ছু নয়, সাতখানা কোম্পানীর ডিরেক্টর! এযে একেবারে ঢপের চপ, ছ্যাঃ। পরিকে চেপে ধরতে হবে তো!

অজিতবাবু নিখিলের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর আবার শুরু করলেন, “নাও আয়াম রানিং সিক্সটিসিক্স। আর কতদিন টানতে পারবো হে! মাঝে মাঝে মনে হয় এসব ছেড়ে ছুড়ে, শেষ কটা বছর আরামে ছুটি কাটাই। কিন্তু দায়িত্ব? আমার কলমের একটি খোঁচায় অনেকেরই পেটের ভাত বন্ধ হয়ে যাবে, হে, পেটের ভাত বন্ধ হয়ে যাবে। তা তো আর হতে দিতে পারি না! যতদিন ঈশ্বর ক্ষমতা দেবেন, চালিয়ে দিয়ে যাই সংসারগুলো। আমি চোখ বুজলে, তিনিই যা করার করবেন। তবে হ্যাঁ, তোমাদের ওই ঈশ্বর-টীশ্বরেও আমার তেমন আস্থা নেই”

“আজ্ঞে, আপনিই তো কত লোকের অন্নদাতা, আপনিও তো ঈশ্বরের মতোন”

“আরে না, না। ওসব তেমন কিছু নয়। নিজের কথা অন্যের কাছে ঢাক পিটিয়ে আমি বলি না, বা বলতে পছন্দও করি না। যাক গে, যে কথা বলছিলাম। তোমাদের এই রবিঠাকুরকে ধরো আমাদের ছোট নদী চলে আঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে...এভাবে একটা দেশের সর্বনাশ করার কী যুক্তি আমি বুঝে পাই না”

নিখিল আশ্চর্য হয়ে বলল, “দেশের সর্বনাশ?”

“সর্বনাশ নয়, কী বলছ হে? এমনিতেই ইওরোপ, আমেরিকার সাধারণ মানুষ, ভারত সম্বন্ধে খুব ধোঁয়াটে একটা ধারণা নিয়ে থাকে। হাতি, জটাওয়ালা সাধু। কুম্ভমেলা। সাপের খেলা, আগুনে ঝাঁপ, রোপ ট্রিক্সভারতে শিশুমেয়েদের জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। বিবেকানন্দ পড়েছ? তিনি এক আমেরিকান ভদ্রলোকের এরকম প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, “হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন, ভারতে পুরুষরাই সন্তান ধারণ করে”! তার মানে আমরা সবাই পুরুষের গর্ভজাত! হা হা হা হা, ব্যাপারখানা বুঝে দেখ একবার। তা এরকম একটা পরিস্থিতির মধ্যে নদী নিয়ে এমন কবিতা না লিখলেই চলছিল না? ছোট নদী। বোশেখ মাসে হেঁটে লোকজন, গাড়ি পার হয়ে যায়। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা নাইবার কালে গামছায় জল নিয়ে মাথায় ঢালে, মাছ ধরে। এ সব কেন? উনি একবারও ভেবে দেখলেন না, এর পর, ওই নদীতে ব্রিজ বানানোর জন্যে কিংবা ইরিগেসানের ড্যাম বানানোর জন্যে, কোনো ফরেন ব্যাংক বা ইনভেস্টার আমাদের দেশে আসবে? তারা হাসবে না? বলবে না - ইন সামার ভেরি লিট্‌ল্‌ ফ্লো অফ ওয়াটার ইন রিভার, পিপ্‌ল্‌ ওয়াক অন ইট, নো ব্রিজ ইজ রিকয়ার্ড টু ক্রস দ্য রিভার? বিশ্বকবি হয়ে, এমন একটা কবিতা লেখা অবিমিশ্রতা নয়?”

নিখিল পুলকিত হয়ে বলল, “ছি ছি ছি ছিঃ। একেবারে অবিমিশ্র অবিমৃষ্যতা, বৈকি!”

“তবে? তারপরে ধরো তালগাছ। তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে সব গাছ ছাড়িয়ে। ছাড়িয়ে তো ছাড়িয়ে, তাতে হয়েছেটা কী? তালগাছ থেকে কী পাই কি আমরা? তাল? বছরে এক-দুদিন, তালের মাড়ি ঘষে বের করে, কটা ফুরুলি, তালক্ষীর, তালের রুটি। গরমের শুরুতে তালশাঁসলক্ষ্মীপুজোয় তালের ফোঁপোল। তাছাড়া তালপাতার ভেঁপু, তালপাতার সেপাই। ছোটলোকের নেশার জন্যে তাড়ি। আর একটু আধটু তালগুড়! এর জন্যেই এত হইচই, কবিতা? কেন আমগাছকে প্রোমোট করা যেত না? কিংবা নারকেল? আম, নারকেল আর নারকেলের নানান প্রোডাক্ট কম এক্সপোর্ট হয়? এর থেকে আমাদের কম ডলার আমদানি হয়? এর কোন উত্তর আছে তোমার কাছে?” নিখিল কোন উত্তর দিল না। তাকিয়ে রইল ফ্যালফ্যাল করে।  

ভদ্রলোক মাথা নেড়ে বললেন, “নেই, আমি জানি কোন উত্তর নেই। আরেকটা এক্সামপ্ল নমুনা দিই। শুধু বিঘে দুই ছিল মোর ভুঁই, আর সবই গেছে ঋণে। সবই যখন ঋণে চলে গেল, তখন বাকি এই দুবিঘে নিয়েই বা এত আদিখ্যেতা কেন? বাবু তো ফ্রিতে জমি নেবেন, কিংবা লেঠেল দিয়ে জমি কেড়ে নেবেন, এমন তো বলেননি। বলেছিলেন, এ জমি লইব কিনে! তা হলে? বাবু একটা বাগান করেছেন, তার সঙ্গে আরো দু বিঘে হলে তাঁর বাগানটা আরো সুন্দর সাজাতে পারবেন। একটা বাগানের প্রোডাকসান জানো? কত ফল-ফুরুলি, কত রকমের ফুল। বাবুরও লাভ, দেশ এবং দশেরও লাভ। তাছাড়া গাছ লাগান, প্রাণ বাঁচান। এক একটা গাছ মানে কতটা অক্সিজেন? পরিবেশের কতটা উন্নতি? সেদিকটা ভেবে দেখবেন না? সে সব দিকে না গিয়ে, উপেনের পেন নিয়ে উনি সেন্টিমেন্টে সুড়সুড়িওয়ালা কবিতা লিখে ফেললেন? আমি তো বলবো ঘোরতর অন্যায় করলেন। জমি অধিগ্রহণ নিয়ে যে বিক্ষোভ আর ভুল বোঝাবুঝি সে কী ওই উপেনকে দিয়েই শুরু নয়?”

নিখিলের মনে হল, কথায় কথায় অজিতবাবু বেশ উত্তেজিত এবং রেগে উঠলেন! সে কোন কথা না বলে, চুপ করে শুনতে লাগল। ভদ্রলোক একটু থেমে থেকে, খুব চিন্তা করতে করতে বললেন, “তবেএএএ একটা গল্প বরং বেশ লেগেছিল”

“তাই? আপনার ভাল লেগেছিল? বলেন কী? কোনটা বলুন তো?”

“ভদ্রলোকের মোটামুটি একটা লেখার হাত তো ছিলই, সেটা তো আর অস্বীকার করা যায় না। ছুটি। সেই যে ফটিকের গল্প। বাপ মরা দুরন্ত ছেলেটাকে মামা এসে নিয়ে গেল, নিজের কাছে রেখে মানুষ করবে বলে। তারপর মামীর অবহেলা, মুখঝামটা। তারপর তো কদিনের জ্বরে মারাই গেল ছোঁড়া”

“হুঁ। খুব প্যাথেটিক গল্পটা, এমন প্রাণবন্ত দুরন্ত একটা ছেলে...”

“অ্যাই, তোমাদের ওমনি নাকে কান্না শুরু হয়ে গেল। গল্পটার আসল বিষয়বস্তুটাই তোমরা ধরতে পারোনি...”

নিখিল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ভদ্রলোকের দিকে। ভদ্রলোক খুব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, “ফটিক মামার বাড়ি যাওয়ার সময় নৌকায় নদী পার হয়েছিল। সে নদী বেশ গভীর...একে বাঁও মেলে না। দুয়ে বাঁও মেলেএএএএ না। বলি কিছু বুঝতে পারলে? এটাই ওই গল্পের সারকথা। ছোট নদীর বর্ণনা দিয়ে যে ভুল হয়েছিল, এই গল্পে তার প্রায়শ্চিত্ত হল!”

নিখিল একটু অধৈর্য হয়ে বলল, “এই কটা লেখা ছাড়া আপনি রবিঠাকুরের কবিতা-টবিতা, গল্প-টল্প বেশি কিছু পড়ার সময় পাননি মনে হয়!”

অজিতবাবু খুব তাচ্ছিল্যে মুখ বেঁকিয়ে বললেন, “ন্যা, ন্যাঃ, পড়ার প্রবৃত্তিও হয়নি। আমাদের শিক্ষাদপ্তরের মাথা মাথা লোকেরা অনেক মাথা ঘামিয়ে আমাদের পাঠ্য বইয়ের সিলেবাস বানান। তাঁরা বুঝে শুনে বেছেবুছে কয়েকটি স্যাম্পল আমাদের পড়ার জন্যে সিলেক্ট করে থাকেন। বলি, ভাত রাঁধতে গিয়ে তুমি কী হাঁড়ির সব চাল টিপে টিপে দেখ? বলো না, কটা চাল টেপ?”

“আজ্ঞে দু একটা”।

“অ্যাঅ্যাঅ্যাই...তারপর ধরো মাংস রান্নার সময়, সব মাংসের টুকরো কী চেখে চেখে দেখ, সেদ্ধ হল কী না, তেল-মশলা-নুন ঠিকঠাক হল কী না?” নিখিল অসম্মতিতে ঘাড় নাড়তে অজিতবাবু বললেন, “ঠিক সেরকম, ওই স্যাম্পলগুলি মন দিয়ে পড়লেই বোঝা যায় কার কত দৌড়, বুঝলে না? আমার আবার পল্লবগ্রাহীতা ব্যাপারটা ঠিক পছন্দ নয়, আমি যাই অনেক গভীরে ডিপরুটেড শেকড় পর্যন্ত। আর সেভাবেই পড়ে বুঝতে পেরেছি, আর কিছু পড়ার দরকার নেই! শুনেছি রবিঠাকুর তাঁর সারাজীবনে গাদা-গুচ্ছের লিখেছেন! তিনি অনর্থক খেটেছেন বলেই, আমাকেও সময় নষ্ট করে, সব পড়তে হবে, তুমি কী আমাকে অতই আহাম্মক ঠাউরেছ?”

“আজ্ঞে না, আপনি পাঁচটা কোম্পানির ডিরেক্টর, আপনার কত দায়িত্ব...”।

“রাবিশ। পাঁচটা নয় সাত-সাতখানা কোম্পানির আমি ডিরেক্টর”।

“স্যরি স্যার, ভুল হয়ে গেছে”।

“স্যরি বললেই হয়ে গেল? অবিশ্যি তোমাকেই বা বকাবকি করে লাভ কী? বাঙালী ঘরেই তো তোমার জন্ম, তোমার আর দোষ কী? বাঙালীরা ইংরিজির সব কিছু সরিয়ে, “স্যরি”-টুকুকেই সার মেনেছে! বলি পড়াশুনো কোথায় করেছো, নিশ্চয়ই বাংলা মিডিয়মে”?

“আজ্ঞে হ্যাঁ, প্রমদারঞ্জন মাল্টিপার্পাস হাইস্কুল”।

মুখ টিপে হেসে অজিতবাবু বললেন, “ওই ভুলটা আমি আর করিনি, আমার নেক্সট জেনারেশনকে আমি ইংলিশ মিডিয়ামে পড়িয়েছি। নিজের পুত্র এবং কন্যা বলে গর্ব করছি না, তারা সত্যিই মানুষের মতো মানুষ হয়েছে। ইংরিজিতে তারা যখন কথা বলে, কে বলবে তারা সায়েবের বাচ্চা নয়! ওরা ভাইবোনে নিজেদের মধ্যে ইংরিজিতেই কথা বলে, আর যখন তারা গল্প করে, আমি যে আমি এত ইংরিজি ভক্ত, সেও কেমন ভ্যাবলা মেরে থাকি। আফটার অল আমারও তো ব্যাকগ্রাউন্ড ওই বাংলা মিডিয়াম কী না? এই বয়েসে এখনও একটা কমপ্লেক্স কাজ করে, আর কী!”

“এই কমপ্লেক্সকে কম বলে ছোট করবেন না, স্যার, বরং বেশিপ্লেক্সই বলুন”!

নিখিলের মন্তব্যে কান না দিয়ে অজিতবাবু বলতেই লাগলেন, “আমার পুত্রকন্যা দুজনেই বাংলা লিখতেও পারে না, পড়তেও পারে না। বলতে পারে, বাট তাতে এত হিন্দি আর ইংরিজি থাকে...তাকে বাংলা না বলাই ভালো। একটা কথা তো স্বীকার করবে, বাংলা হচ্ছে আদতে ছোটলোকের ভাষা। চাষাভুষো, কেরানি-মজুরদের ভাষা, আমজনতার ভাষা! সে ভাষা ভদ্র, অ্যারিস্টোক্র্যাট, ব্লুব্লাড সমাজে একেবারেই অচল”।

এই সময় নিখিলের মোবাইলটা বেজে উঠল, ফোন তুলে পর্দায় দেখল, পরি কলনিখিল অজিতবাবুর থেকে ইশারায় অনুমতি নিয়ে ঘরের বাইরে বারান্দায় এল, অজিতবাবুর ব্যাপারটা খুব যেন মনঃপূত হল না, তাঁর কথা বলার বেশ একটা মুড এসেছিল, তাতে বাধা পড়াতে নাক-মুখ কুঁচকে “হুঁ” বললেন।

ফোন কানেক্ট করে নিখিল বলল, “তুই কোথায় রে? তোদের বাড়িতে কতক্ষণ এসে বসে আছি, আর তোর দেখা নেই”!

“ও মা, তাই? নীচেয় কী করছিস?”

“তোর বাড়িতে এমন একটা জিনিষ আমদানি করেছিস, আগে বলবি তো! ওফ জান কয়লা করে দিল, মাইরি”।

“কেন বল তো?”

“তোদের বসার ঘরে ঢোকামাত্র এক ভদ্রলোকের খপ্পরে পড়েছি, এর চে কোন টেররিস্টের পাল্লায় পড়লেও শান্তিতে থাকতাম”।

“কে? কাকু? এঃ রাম। তোকে তো বলাই হয়নি। তুই এক কাজ কর, সিঁড়ি দিয়ে একদম ছাদে চলে আয়!”

“ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পালানোর থেকে, সামনের সদর দরজা দিয়ে পালানো সহজ নয়?”

“আঃ বাজে বকিস না, যা বলছি শোন। চটপট ছাদে আয় ”।

ফোনটা কেটে দিল পরি। নিখিল আর সময় নষ্ট না করে একবার বসার ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে, জোড়া জোড়া সিঁড়ি টপকে দৌড়ে উঠে গেল ছাদে। পরি দাঁড়িয়েছিল সিঁড়ির মাথায়। নিখিলের হাত ধরে ছাদের এক কোণে নিয়ে গিয়ে বলল, “কাকু কী বলছিলেন, রে তোকে?”

“এই কী তোর সেই কাকু? যার প্রশংসায় তুই একেবারে পঞ্চমুখ!”

“হ্যাঁ। ছোটবেলায় আমাদের বাবা-মা মারা যাবার পর, উনিই আমাদের দুই ভাইবোনকে নিজের ছেলেমেয়ের মতো মানুষ করেছেন। আমাদের জন্যে বিয়ে-থাও করেননি। ভাবা যায়?”

“সে কী? উনি যে বললেন, ওঁনার ছেলে-মেয়েকে ইংরিজি মিডিয়ামে পড়িয়ে চৌখোস সায়েব বানিয়েছেন!”

পরি ভীষণ অবাক হয়ে বলল, “যাঃ, কাকু তোকে তাই বলেছে?” 

“তবে? তার ওপর তুই বলেছিলি উনি নাকি বিরাট পণ্ডিত লোক, প্রচুর পড়াশুনো...কিন্তু এত ভুলভাল ভাঁট বকেন কেন? তুই বলেছিলি, উনি এলাহাবাদ না কোথাকার ইউনিভার্সিটির প্রফেসর...কিন্তু উনি তো বললেন, উনি সাতটা কোম্পানির ডিরেক্টার!”  

“কোম্পানীর ডিরেক্টার? কাকু বলেছেন? তোকে? কী বলছিস?”

“হ্যাঁরে বাবা, তা নাহলে আমি জানব কী করে? তাছাড়া ওঁনার বাংলা ভাষা আর সাহিত্যের ওপর এত আক্রোশ কেন বল তো?”

পরি নিখিলের কথা শুনে এত অবাক হল যে, হাঁ করে তাকিয়ে রইল নিখিলের মুখের দিকে। মাথায় হাত দিয়ে বলল, “দাঁড়া দাঁড়া, তুই যা বলছিস কাকুর সম্বন্ধে, তাতে আমার মাথা ঘুরছে...কিছুই বুঝতে পারছি না”!

এই সময় পরির মোবাইলে রিং হল, পরি ফোন তুলে দেখল কাকু কল করেছেনকানেক্ট করে বলল, “হ্যাঁ কাকু, বলো”। তারপর অনেকক্ষণ শুনল, নিখিল পরির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, মনে মনে ঠিক করল, এমন পাগল আর ভণ্ড লোকের হাত থেকে পরিকে বাঁচাতেই হবে!  

“....”

“কাকু, কাকু তুমি যে কী না...” পরির কথায় নিখিল মনে মনে শূণ্যস্থান পূরণ করল, ...যন্তোর জিনিষ একখানা!

“....”

“হা হা হা হা ... সত্যি তুমি পারোও কাকু। আমাকে অব্দি চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলে! হা হা হা হা... ” পরির হাসি যেন আর থামতেই চায় না, দেখে নিখিলের গা জ্বলে উঠল। 

“....”  

“আসছি, আসছি। হ্যাঁ গো, দুজনেই আসছি”। ফোনটা অফ করে, পরি নিখিলের মুখের দিকে তাকালো, তারপর আবার হাসতে লাগল খুব...।

নিখিল একটু রেগেই গেল, “কী এত হাসছিস বলতো হ্যা হ্যা করে, এত হাসির কী হল?”

পরি নিখিলের হাত ধরে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বলল, “কাকু আমাদের এক্‌খুনি নীচেয় ডাকছে...চল...”

নিখিল থমকে গেল, বলল, “না, আমি আর যাবো না ওই মালের কাছে?”

পরি হাসতে হাসতেই বলল, “তুই আমার কাকুকে মাল বললি? নীচেয় চল, তারপর তোর হচ্ছে”।

প্রিয় কাকুকে “মাল” বলা সত্ত্বেও পরিকে হাসতে দেখে নিখিল খুব অবাক হল, তার ওপর পরি তার হাত ধরে টানছিল, তাই নিচেয় নামতে বাধ্য হল।

নীচের বসার ঘরে ঢুকে, পরি বলল, “এই যে কাকু তোমার পালিয়ে যাওয়া আসামী” বলেই হাসতে লাগল ওড়নায় মুখ চেপে। অজিতবাবুও হো হো করে কিছুক্ষণ হাসলেন, তারপর হাসতে হাসতেই বললেন, “আরে বসো, বসো, নিখিল। পুরো ব্যাপারটা তোমায় এখন খুলেই বলি, পরি তো সেই কবে থেকে তোমার প্রশংসায় একেবারে পঞ্চমুখ...হা হা হা হা ... ওই দেখ, কেমন লজ্জা পাচ্ছে মেয়েটা...হা হা হা ...তুই এখন এ ঘর থেকে যা, নিখিলের জন্যে মিষ্টি-টিষ্টি নিয়ে আয় আর সবার জন্যে চা...বেচারা খুব বিভ্রান্ত... হা হা হা ... ওর সঙ্গে ততক্ষণ আমার প্রাইভেট টকটা সেরে নিই”।

পরি রান্নাঘরে চলে যেতে কাকু, নিখিলের দিকে তাকিয়ে মজা পাওয়া মুখে বললেন, “এই ক’ বছরে, পরির মুখে তোমার এত প্রশংসা শুনেছি, সে আর বলার নয়! তোমার নাকি এত বুদ্ধি, তত বুদ্ধি। লেখাপড়ায় ভালো। তার পরে এই লেখ, সেই লেখ। আমার পরিকে তুমি এই ভালোবাস, সেই ভালোবাসসে সব শুনে আমার খুব হিংসে হত, বুঝলে, ভীষণ হিংসে! ভাবতাম আমার সেই ছোট্ট মেয়েটা তার প্রিয় কাকু ছাড়াও এমন কোন্‌ ছেলে পেল, যে একেবারে তার মাথা ঘুরিয়ে দিল। তাই এবারে ঠিক করেছিলাম, তোমাকে বাজিয়ে দেখবো। তোমাকে আগে থেকে কিছু বলতে, পরিকে আমিই মানা করেছিলাম। পরির সঙ্গে আমার চ্যালেঞ্জ ছিল, তোমাকে বোকা না বানাতে পারলে আমি তোর কাকুই নই”!

অজিতবাবুর গলাটা আবেগে কেমন যেন কেঁপে উঠল, আবেগের সেই সংক্রমণে নিখিলও অভিভূত। সশ্রদ্ধ চোখে সে অজিতবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, কোন কথা বলল না। নিজেকে সামলে নিয়ে অজিতবাবু আবার বললেন, “আজ সকালে ফ্লাইটে আসার সময় এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হল, বুঝলে? আমার পাশের সিটে বসেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত শিল্পপতি, ভদ্রলোকের নামটা আর বললাম না, সে আর তোমাদের জেনে কাজ নেই! আলাপ হবার পর, একঘন্টার জার্নিতে তিনি যা যা বলেছিলেন, সেই কথাগুলোই আমি একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তোমাকে বলে কেমন চমকে দিলাম, বলো?” তারপর একটু থেমে হাসি হাসি মুখে আবার বললেন, “নিজের মূর্খামিকেও কী ভাবে গভীর পাণ্ডিত্যের অহঙ্কারে মুড়িয়ে বাতেলা দেওয়া যায়, ভদ্রলোকের কাছে শেখার আছে বৈকি!  তবে তোমার সব লেখাই আমি পড়েছি, মানে পরিই পড়িয়েছে... আয়াম প্রাউড অফ ইউ, নিখিল।”

এই সময় পরি একটা ট্রেতে কিছু স্ন্যাক্স আর তিন কাপ চা নিয়ে ঘরে এল। অজিতবাবু তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ছ্যাঃ, শুধুই স্ন্যাক্স, মিষ্টি-টিষ্টি কিচ্‌ছু নেই? তোদের দুজনের যে একই সঙ্গে প্রমোশন হচ্ছে, সেই আনন্দে কিছু খাওয়া-দাওয়া হবে না?”

পরি ও নিখিল একসঙ্গে অবাক হয়ে বলে উঠল, “প্রমোশন?”

কাকু দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে ঝাঁপালো দুই ভুরু নাচিয়ে বললেন, “তুমি ছিলে বয়ফ্রেণ্ড, আর তুই গার্লফ্রেণ্ড, খুব শিগ্‌গিরি হবি পতি-পত্নী, এটা যদি প্রমোশন না হয়, তাহলে আর কোনটা প্রমোশন?” বলেই হা হা হা হা করে হাসতে লাগলেন প্রাণ খুলে।

নিখিল আর পরি দুজনেই অজিতবাবুকে প্রণাম করল।

নিখিল অস্ফুট গলায় বলল, “কাকু আপনি রিয়্যালি গ্রেট”।

অজিতবাবু নিখিলের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “ইউ টু”!

পরি কাকুর পাশে সোফার হাতলে বসে, কাকুর গলা জড়িয়ে ধরল, অজিতবাবু পরির মাথায় হাত রেখে বললেন, “আমার খেপি মাটা, আমার পাগলি মাটা”, বলতে বলতে আনন্দে তাঁর দুচোখ ঝাপসা হয়ে এল।

..০০..      

এর পরের বড়োদের গল্প - " বুনো ওল "

       

 

      

শুক্রবার, ১৮ জুলাই, ২০২৫

প্রদীপ্তা মুখার্জি (কুটু)-র আত্মকথন - বিশ্বলোকের সাড়া - শেষ পর্ব

 বিশ্বলোকের সাড়া - শেষ পর্ব 

প্রদীপ্তা মুখার্জি (কুটু)


আছ অন্তরে চিরদিন

 লিখতে বসলে কত কিছুই মনে পড়ে যায়। স্মৃতির দরজাগুলো যেন খুলে যায় একে একে—সেই পুরনো দিনের আলো-আঁধারি, হারিয়ে যাওয়া মুখ, চেনা গন্ধ। তবে সব স্মৃতি যে শুধুই সুখের, তা নয়। কিছু কিছু স্মৃতি থাকে, যেগুলোর রেশ মনে থেকে যায় গভীর এক ক্ষত হয়ে, চির বিষণ্ণতার সুরে বাঁধা পড়ে যায় মনের গহনে।

আমার প্রথম এলবাম রেকর্ড করার অনুপ্রেরণাটা যার কাছে থেকে পেয়েছিলাম—তা্র কথা না বললে আমার এই লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তিনি আমার প্রিয় এক বন্ধু রাহুল।

রাহুল আমার গান দারুণ ভালোবাসত। ওর সেই চোখের উজ্জ্বলতা, যখন কোনো গান শুনে বলত—‘এই তো, এটাই তুমি' -- আজও যেন কানে বাজে। রাহুল আর ওর স্ত্রী, মৌসুমি, দুজনেই আমার খুব ঘনিষ্ঠ। এমনকি, আমাদের দুই পরিবারও যেন একে অপরের আত্মীয় হয়ে উঠেছিল। ওর মা, যাকে আমি ‘মাসিমা’ বলে ডাকি, আমাকে নিজের সন্তানের মতোই স্নেহ করেন।

একবার আমি কলকাতায় গিয়ে, ওদের বাড়িতে দেখা করতে গিয়েছি। জমিয়ে আড্ডা – খাওয়া-দাওয়া হচ্ছে। হঠাৎই রাহুল বলে উঠলো “তুমি সিরিয়াসলি গানের জন্য পারফর্ম করো না কেন? তোমাকে তো মঞ্চে দেখার কথা, তোমার তো আরও অনেকদূর যাওয়া উচিত”।

মনের অন্দরে শিহরণ জাগানো সেই কথাগুলো আমি আজও ভুলতে পারিনি, কখনও পারবও না। কারণ সেই মুহূর্ত থেকেই আমার অন্তরে শুরু হয়েছিল ভাঙন – এতদিন যত দ্বিধা ছিল, ছিল সংকোচ ও কুন্ঠা। সাগর সৈকতে বানানো বালির বাঁধের মতোই ধুয়ে মুছে গিয়েছিল রাহুলের ওই আত্মবিশ্বাসী প্রশ্নে এবং আদেশে! ওই কথাগুলোই আমাকে ঠেলে দিয়েছিল মঞ্চের দিকে — নিজেকে প্রকাশ করার এবং নিজের কথা সঙ্গীতের মাধ্যমে সকলের কাছে পৌঁছে দিতে যে সাহস প্রয়োজন – সেই সাহসটাই যুগিয়ে ছিল রাহুল।

আজ যখন পেছনে তাকাই, বুঝি — রাহুল শুধু একজন বন্ধু নয় - ও ছিল আমার গানের সবচেয়ে বড়ো ভক্ত।

আরেকটা ট্রিপে আমি কলকাতায় গিয়েছি, হঠাৎ রাহুল বলল, “তোমায় অ্যালবাম রিলিজ করতে হবে"। ওর কথার মধ্যে ফুটে উঠল শুধু নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নয়, তার সঙ্গে ছিল অলঙ্ঘনীয় এক আদেশ এবং আগুনের মতো উৎসাহ। বলল, “কুটু, তুমি রাজি হয়ে যাও। বাকি সব আয়োজন আমি করে দিচ্ছি।” 

রাহুল আমায় একরকম জোর করেই নিয়ে গেল স্বনামধন্য শিল্পী অর্ঘ্য সেনের কাছ – উনি ছিলেন রাহুলের পূর্ব পরিচিত। অর্ঘ্যদা আমার গান শুনতে চাইলেন।

আমি বেশ আড়ষ্ট হয়ে গাইলাম - একটু ভয় ভয়ও করছিল। স্বাভাবিক, এত বড় একজন নামকরা শিল্পীর সামনে হঠাৎ, একেবারে বিনা প্রস্তুতিতে গান পরিবেশন করতে হয়েছিল! কিন্তু একটা গান শুনে উনি খুশি হয়ে আরও গাইতে বললেন। তারপর বললেন, রেকর্ডিংয়ের জন্য ওঁনার মিউজিশিয়ানদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে।  

এইভাবেই, একরকম রাহুলের প্রবল উৎসাহেই আমার প্রথম অ্যালবাম রিলিজ হলো। সেই অ্যালবামের সঙ্গীত পরিচালনায় ছিলেন স্বয়ং অর্ঘ্য সেন। অবশ্য তার পরের অ্যালবামের জন্য আমি পেয়েছিলাম রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাদির আশীর্বাদ ও সাহায্য।

সে এক অন্য গল্প—আমার জীবনের আরেকটা অধ্যায়।

রেকর্ডিং-এর কথা বলতে বলতে একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। প্রথম অ্যালবাম রেকর্ডিংয়ের সময় আমরা উঠেছিলাম রাহুলের বাড়িতে। মাসিমা আর মৌসুমীর আদর-যত্ন - কী খাবো, কী পরবো - সব কিছুই ওঁদের উপর। দুজনের আন্তরিক স্নেহের ছায়াতেই কয়েকটা দিন কেটেছিল।

যাই হোক, রেকর্ডিং-এর প্রথম দিন পৌঁছেছি স্টুডিওতে। তিনটা গানের টেক হওয়ার পর ছিল লাঞ্চ-ব্রেক। আমার কানে এল, খুব কাছেই ভালো বিরিয়ানি পাওয়া যায়। আমি তো শুনেই বিরিয়ানি খাওয়ার জন্যে লাফিয়ে উঠলাম! সবার জন্য বিরিয়ানি আনানো হলো, মিউজিশিয়ানরাও ছিলেন, আমার মিউজিক অ্যারেঞ্জার মানবদা, অর্থাৎ স্বনামধন্য মানব মুখার্জি, আমার দাদা–বৌদি, আমার দুই দিদি, তাঁদের একজন এসেছিলেন দিল্লি থেকে, সবাইকে নিয়ে জম্পেশ খাওয়া-দাওয়া আর আনন্দ হল খুব।

কিন্তু বিরিয়ানি খাওয়ার পর, আবার রেকর্ডিং শুরু করতেই দেখি, আমার গলা আর উঠছেই না!

বেশ কয়েকবার চেষ্টার পর মানবদা হাল ছেড়ে দিয়ে, হেসে বললেন, “আজ আর থাক… ম্যাডাম, বিরিয়ানির ঘিয়ের জন্যে, মনে হচ্ছে, আপনার গলা বসে গেছে – আগামীকাল ঠিক হয়ে যাবে”।

একটা দারুণ শিক্ষা হল সেদিন।

 

পরদিন আবার স্টুডিওর জন্য যখন বেরোচ্ছি, মাসিমা হাতে একটা টিফিন বাক্স দিয়ে বললেন, “আজ আর বিরিয়ানি খেও না যেন… এটায় ভাত আর হালকা মাছের ঝোল দিয়ে দিলাম।”

সেদিন সত্যি বলছি—চোখে জল এসে গিয়েছিল। আজও ভাবলেই চোখ ভিজে আসে। এত স্নেহ, এত মমতা—পাওয়ার যোগ্য হতে পেরেছি কি না জানি না, কিন্তু আজও উনি আমার কাছে এক মাতৃসমা।

সেবার আমরা কলকাতায় গিয়েছিলাম একসঙ্গে, অনেকেই ছিলাম রাহুলের বাড়িতে। হৈচৈ, আড্ডা, গান, গল্প — আমার স্মৃতিতে আজও রঙিন। সবাই মিলে আবার ফিরেও এসেছিলাম নিউজিল্যান্ডে। 

রাহুল তখন প্রাইভেট সেক্টরে কাজ করত। দারুণ আবৃত্তি করত, দুর্দান্তভাবে উপস্থাপন করত কলকাতা দূরদর্শনে। ফিরে এসে ফোনে ওর সঙ্গে কত কথা হয়েছিল। ওর কিছু নতুন প্রোজেক্টের কথাও বলেছিল। 

কিন্তু, এর ঠিক কিছুদিন পরেই, আমাদের এক কমন বন্ধু ফোন করে জানালো, রাহুল আর নেই। আকস্মিক এই সংবাদের জন্যে আমরা কোনভাবেই প্রস্তুত ছিলাম না। সত্যি বলতে, প্রথম শুনে বিশ্বাসই করিনি। ভাবতেই পারিনি – অত প্রাণোচ্ছল উদার মনের বন্ধুটির সঙ্গে আর কোনোদিন দেখা হবে না। ফোনেও ওর কথা আর আমরা শুনতে পাবো না। এভাবেই আমাদের সবাইকে ছেড়ে, হঠাৎ একদিন চলে গেল রাহুল। খবর পাওয়ার পরেই, আমি ছুটে গিয়েছিলাম কলকাতায়, মৌসুমী আর মাসিমার পাশে দাঁড়াতে।

আজ এখন মনে হয়, আমি যে এত গানের অনুষ্ঠান করছি, নতুন নতুন রেকর্ডিং করছি, ইউটিউবে, স্পটিফাইতে আমার গান পৌঁছে যাচ্ছে কত শত মানুষের কাছে — রাহুল থাকলে কী আনন্দই না পেতো! উচ্ছ্বসিত হত, গর্বিত হত।

আজও মৌসুমীর সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব অটুট। মৌসুমী আর মাসিমা আমাদের পরিবারের অত্যন্ত আপন মানুষ। ভালো লাগার, হৃদয়ের মানুষ।

 

 

লহরীর পরে “লহরী” তুলে...

সাম্প্রতিক কালের কিছু সুন্দর অভিজ্ঞতা দিয়ে শেষ করছি আমার এই স্মৃতিকথন।

 “লহরী” - গোবরডাঙার এক শান্ত কোণে গড়ে ওঠা এক সুরের পাঠশালা। ছোট্ট ছোট্ট  ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্করা এখানে শেখে গান, তবলা, হারমোনিয়াম, অন্যান্য যন্ত্র আর সুরে-তালে বাঁধা জীবনের গল্প।

এটা যেন গানের স্কুল নয়। যেন এক পরিবার, যার প্রাণপুরুষ বিশ্বজিত— একাধারে গায়ক, তবলাবাদক, শিক্ষক, আর সবথেকে বড় কথা—এক সুরেলা হৃদয়ের মানুষ।

আমার সঙ্গে বিশ্বজিত আর র‍্যালির পরিচয় হয়েছিল প্রায় তেরো বছর আগে। দেখা হতে হতে কেটে গিয়েছিল বছর পাঁচেক। কলকাতার এক সঙ্গীতানুষ্ঠানে আমি গান গেয়েছিলাম, আর বিশ্বজিত তবলায় সঙ্গত করেছিল। অনুষ্ঠান শেষে আমায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, তার নিজের শহর—গোবরডাঙায়, তাদের বাড়ি, আর লহরী গানের স্কুলে।

প্রথমবার সেই পরিবেশে পা রেখেই মনে হয়েছিল, আমি যেন বহুদিনের চেনা একটা জায়গায় ফিরে এসেছি।

এর পর আমি যতবারই লহরীতে গেছি, ততবারই ওখানকার ছাত্রছাত্রীরা, শিশু থেকে বড়রা— আমাকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরেছে, এমনভাবে ভালোবেসেছে — যেন আমি কখনোই বাইরের কেউ ছিলাম না।

 বিশ্বজিত-র‍্যালি আজ আমাকে “দিদিভাই" বলে ডাকে। আমার ছোট ভাই আর ভাইবৌ এর মতো, কিন্তু আমার সংগীত জীবনে ওদের অবদান অনেকখানি।

আমি যখন গানের থেকে একটু একটু করে সরে যাচ্ছিলাম, তখন সেই টান আবার ফিরিয়ে এনেছিল বিশ্বজিৎ।

 এই ২০২৫ সালের মার্চ মাসে, লহরী-র পঞ্চম বার্ষিকী অনুষ্ঠানের বিশেষ আমন্ত্রণে আমি উপস্থিত ছিলাম।

সেই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ধরনের গান, নাচ—মঞ্চ যেন বাংলার সুরে তালে ভরে উঠেছিল। সাজসজ্জা, পরিবেশনা, ভালোবাসা—সব মিলিয়ে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

 

আমি আজ বলতে পারি—লহরী আমারও এক ঠিকানা।

বিশ্বজিত, র‍্যালি, ওদের পরিবারের কাছ থেকে আমি পেয়েছি অসীম ভালোবাসা, সম্মান আর যে আতিথেয়তা, তা সত্যিই ভোলার নয়।

প্রতিবার ওদের বাড়ি থেকে ফিরে আসার সময়, মনে হয় — এই জায়গাটা শুধু গানের নয়, আমার মনেরও একটা কোণা দখল করে আছে।


এই স্মরণিকা আপাততঃ এখানেই শেষ করলাম। হয়তো আবার কোনদিন ফিরে আসব, নতুন নানান অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে। যাবার আগে সকলকে জানাই আমার প্রণাম, নমস্কার, আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। তার সঙ্গে রইল দুটি গানের উপহার - 

আমি কেবলই স্বপন করেছি বপন

 যদি জানতেম আমার কিসের ব্যথা



--০০--

সুরক্ষিতা - পর্ব ৮

 এই উপন্যাসের আগের পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ৭

 

আজ কাজে যায়নি মালতী। শরীরটা ঠিক যুতে নেই। কাল ফেরার সময় ট্রেন থেকে নেমে গোটা রাস্তাটা বৃষ্টিতে ভিজতে হয়েছিল, আজ সকাল থেকে মাথা ভার, নাক দিয়ে জল ঝরছে, সারা গতরে ব্যথা। এইরকম ব্যথা হয়েছিল প্রথম কাজ করতে যাওয়ার পরদিন সকালে। সেদিনও ঘুম থেকে উঠে সারা শরীরে ভীষণ বেদনা অনুভব করেছিল মালতী। গোটা ডানহাত, বগল, কাঁধের চারপাশ, কোমর আর দাবনা দুটো মনে হচ্ছিল যন্ত্রণায় ভেঙে যাচ্ছে। সেদিন ভেবেছিল কাজে বের হবে না, কিন্তু বিমলামাসি ডাকতে এসে, জোর করে নিয়ে গিয়েছিল বলেছিল এ হল অতিরিক্ত কাজের জন্যে অনভ্যাসের ব্যথা, প্রথম প্রথম কদিন এমন হয়।  ওই ব্যথা নিয়ে ঘরে শুয়ে থাকলে আরো বাড়বে। আজকে কষ্ট হবে কাজ করতে, কিন্তু ব্যথার উপশম হবে তাড়াতাড়ি। সত্যি, সেদিন বিকেলে কাজ সেরে ফেরার পরে তার গতরের ব্যথাটা ছিল, কিন্তু তেমন কিছু নয়।

কিন্তু আজ কাজে বেরোনোর সময় বিমলামাসি তার শরীর খারাপ শুনে বলল, “বাদলার জলে একটু ঠান্ডা লেগেচে, শুয়ে থাক, ভাল হয়ে যাবে। তাছাড়া মাজে মাজে বাবুদের বাড়ি কামাই না দিলে, দাম থাকে না...।”

 

বিমলামাসি বেরিয়ে যাওয়ার পরে, মালতী মুখটুক ধুয়ে এক গেলাস চা বানিয়ে বসল ঘরের দোরগোড়ায়। আজও আকাশ ভারি হয়ে আছে। বৃষ্টি হচ্ছে না, কিন্তু শুরু হতে কতক্ষণ! দিন কয়েক আগের আর কালকের বর্ষাতে বিমলামাসির ঘরের সামনের জমিটুকু সবুজ ফন্‌ফনে সতেজ আগাছায় ভরে উঠেছে।

তার স্বামী হলধর পোল্লের দূর কোন এক সম্পর্কের মাসি হয় এই বিমলামাসিঅল্প বয়সে বিধবা। কমবয়সে এদিক সেদিক নাকি বদনাম রটেছিল। তাই হলধর পোল্লে এক পাড়াতে থাকলেও এই মাসির খোঁজখবর তেমন রাখত না। বিমলামাসিও বোনপোর মন বুঝে, গায়ে পড়ে বেশি মাখামাখি দেখাত না। তবে হলধরের মৃত্যুর খবর পেয়ে যেভাবে দৌড়ে এসেছিল। এবং তারপর থেকে বুকে করে তাকে আর তার মেয়ে ছবিকে যে ভাবে আগলে রেখেছে। সর্বদা সঠিক দিশা দেখিয়েছে। তাতে মালতী ভাবে, যৌবনের এক আধটা ভুল মানুষের চরিত্রকে কিছুতেই পালটে দিতে পারে না। নিঃসন্তান, সঙ্গীহীন মেয়েমানুষটা, তার মতোই – কিংবা তার থেকেও বড়ো দুখী। তার তো তাও একটা অবলম্বন আছে, ছবি। কিন্তু বিমলামাসির? কেউ নেই। বিমলামাসি, তাকে আর তার মেয়েকে সত্যি বড় ভালোবাসে।

বিমলামাসিই তাকে প্রস্তাব দিয়েছিল, তাদের ভাড়ার বাসাটা ছেড়ে এইখানে চলে আসতে। ছবি নেই। মালতী বেরিয়ে যায় সেই সক্কালবেলায়, ফেরে রাত্রে। কি দরকার মাস মাস বাসার ভাড়া গুণে? বিমলামাসির একটা ঘর তো খালি পড়েই আছে, মালতী চলে এলে ঘরটারও সুরাহা হয়, আর মাস মাস বাসাভাড়ার টাকাটাও সাশ্রয় হয়। মালতী ভেবে দেখেছিল, প্রস্তাবটা মন্দ নয়, বেশ ভালই। তার মনে একটু কিন্তু কিন্তু ছিল, সে বিমলামাসিকে মাসে মাসে কিছু টাকা ভাড়া বাবদ ধরে দেবার কথা বলেছিল, কিন্তু বিমলামাসি আমল দেয়নি। মালতী বার বার বলাতে উত্তর দিয়েছিল- -“তোর যকন এতই সংকোচ, ও টাকাটা আমার নামে রেকারিনে ব্যাংকে ফেলে রাক, ছবির বে’তে ওটাই ধর আমি ওকে দেলাম”।

এই ছয়-সাত বছরে মালতী এখন অনেকটাই থিতু। মহাজনের পঞ্চাশ হাজার বেড়ে চলেছে। যদিও মালতীর নিজের রোজগারের অনেকটাই ব্যয় হয়ে যায় নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষে, ট্রেনে যাওয়া আসা, খাওয়া দাওয়া, জামা কাপড়, দায়-বিপদ সারতে। তবে সবচেয়ে যেটা নিশ্চিন্তের কথা সেটা হচ্ছে ছবির মাইনে, ছবি এখন সাড়ে পাঁচ হাজার পায়, আর তার পুরোটাই প্রায় সঞ্চয় হয়ে চলেছে ব্যাংকে। ছবির অন্য খরচ মাস্টারদিদিই সব দিয়ে দেন। তেল, সাবান, মুখে মাখার ক্রিম-টিম সব। পুজোর সময় তো বটেই, তা ছাড়াও জামা-কাপড়ও কিনে দেন দরকার মতো।

নিজের মেয়েকে যতো দেখছে, ততই অবাক হচ্ছে মালতী। বিশ্বাসই হয় না, তার সেই ছোট্ট মেয়েটা কিভাবে এত তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে উঠল, বিশাল বটবৃক্ষের মতো। মাঝে মাঝে মনে হয় তার মেয়েটা কি পাথর হয়ে গেছে? চরম স্বার্থপর আর নিষ্ঠুর? তাদের এই লাইনে অন্যান্য কাজ করা মেয়েদের মতো? মালতী এত দুঃখের মধ্যেও কিছুতেই ভুলতে পারে না, সে চাষী ঘরের মেয়ে। বেঁচে থাকার জন্যে প্রতি নিয়ত লড়তে লড়তেও সে ভুলে যায়নি তার মূল্যবোধ – তার মায়া, মমতা আর আবেগ।

ছবি যেদিন প্রথম মিঠুদের বাড়িতে কাজে লাগল, মালতী আশা করেছিল ছবি খুব কান্নাকাটি করবে। বাড়ি ফেরার জন্যে বায়না করবে। ছবিকে সামলাবে কিভাবে সেই সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই মালতী সেদিন বিকেলে বিমলামাসির সঙ্গে ওদের ফ্ল্যাটে গিয়েছিল। কিন্তু মেয়েকে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল মালতী। কোন কান্না নেই। মুখখানি একটু ম্লান ঠিকই, কিন্তু ঠোঁটের অদ্ভূত মায়াবী হাসিটুকু তার চোখ এড়ায়নি। তবে কি ছবি তার পর হয়ে গেল? মায়ের ওপর তীব্র অভিমানে? বাবা মারা যাবার কয়েকমাসের মধ্যেই বাপ-সোহাগী মেয়েকে ইস্কুল ছাড়িয়ে, নিজেদের ঘর-বাড়ি ছাড়িয়ে, পরের ঘরে কাজে লাগানোর জন্যে? সেদিন ফেরার সময় সারাটা পথ, ঘরে ফিরে সারাটা রাত কেঁদেছিল মালতী – “আমি কি জেনে শুনে সাধ করে তোরে কাজে লাগিয়েচি, মা রে? কি করব বল দিকি....”?

বিমলামাসি তাকে অনেক বুঝিয়েছিল –“মিঠু প্রায় ওর সমবয়সী - বছর দুয়েকের বড়ো হয়তো, বন্ধুর মতো। মিঠুর মাও লোক খুব ভাল, তবে ওর বাপটা শুনেচি খুব খিটকেল ধরনের - সন্দেহবাতিক মেনিমুখো ব্যাটাছেলে। কারোর সঙ্গেই তার বনে না। তা ওর বাবা তো সারাটা দিন থাকেও না বাড়িতে। কাজেই ছবিমার যদি ওখানে মন বসেই যায়, তার জন্যে এত দুক্কু করছিস কেন, বল দিকি মালতী”? মনকে বুঝিয়েছিল মালতী, সত্যি তাই যেন হয়, তার সেই এক রত্তি মেয়েটা যেন মায়া মমতা সব খুইয়ে স্বার্থপর হয়ে পাথর না বনে যায়।

মাস্টারদিদির বাড়িতেই মালতী প্রথম কাজে লেগেছিল, ঘরদোর মোছা, থালা-বাসন ধোওয়া। মাস্টারদিদি মানুষ ভাল। শান্ত মানুষ। কোন রাগারাগি, চেঁচামেচি নেই। তবে বড় দুঃখী। মালতী ভাবে নানান মানুষের নানান দুঃখ। তার নিজের একরকম দুঃখ। মিঠুর মায়ের একরকম দুঃখ। আবার দেখ, এই মাস্টারদিদি, কত বড় ইস্কুলে কত কত মেয়েকে ন্যাকাপড়া শেকায়, তারও কি না দুঃখ? অমন সোনার মতো দেখতে একমাত্র ছেলে, সে কেমন যেন ব্যাঁকাট্যারা, অষ্টাবক্রকথা বলতে পারে না। চলতে পারে না। বিছানায় উঠে বসতে পারে না। এক গেলাস জল খাবারও তার সাধ্যি নেই। মাস্টারদিদি মালতীকে অনেকবারই বলেছিল একটা ভাল মেয়ে দেখে দেবার জন্যে, যে সারাক্ষণ ও বাড়িতেই থাকবে আর ওঁর ছেলে বিট্টুর দেখাশোনা করবে। ছবির কথা যে মালতীর মনে হয়নি তা নয়, কিন্তু সে কথা মনে স্থান দেয়নি মালতী। কারণ ছবি তার মিঠুদিদির সঙ্গে ভালোই আছে। তাছাড়া তার মনে হয়েছিল, এই বাড়িতে থেকে সারাক্ষণ ওই ছেলের সেবা করতে করতে আর তার হাগা-মোতা সামলাতে সামলাতে, তার ছবির মনটাও পঙ্গু হয়ে যেতে পারে। মালতী কোনভাবেই চায় না, তার ছবি সারাটা জীবন পরের বাড়ি খেটে খাক। একটু টাকাকড়ি জমলেই, ভালো চাকরি-বাকরি করা ছেলে দেখে ছবির বিয়ে দিয়ে দেবে মালতী। ব্যস, তারপর ছবি আর সব ছেড়ে নিজের সংসার করুক গুছিয়ে। যেমনটা মালতী নিজে পেয়েছিল, কিন্তু ভাগ্য তাকে ভোগ করতে দেয়নি!

মালতী ভেবেছিল একরকম, কিন্তু হয়ে গেল অন্যরকম। মিঠুর সঙ্গে এক বিকেলে ছবি গিয়ে কি জাদু দেখাল কে জানে, মাস্টারদিদি একদম নাছোড় হয়ে গেলেন। মাস্টারদিদি প্রথমে কথা বলেছিল মালতীর সঙ্গেই। মালতী এড়িয়ে গিয়েছিল। মাস্টারদিদি হাল ছাড়েননি, নিজে গিয়ে মিঠুর মায়ের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। মিঠুর মা নিমরাজি হয়েছিলেন। মালতীর মতোই তাঁরও দৃঢ় ধারণা ছিল, তাঁর সঙ্গে এবং বিশেষ করে মিঠুর সঙ্গে ছবির যা সম্পর্ক তাতে ছবি নিশ্চয়ই যেতে চাইবে না

কিন্তু ছবির কাছে কথাটা যখন বলা হল, সবাইকে অবাক করে দিল ছবি, এক কথায় রাজি হয়ে গেল কাজটা করতে। সে কি শুধু টাকার জন্যে? মিঠুদের বাড়িতে ছবির মাইনে ছিল বারোশ টাকা, থাকা-খাওয়া ফ্রি আর পুজোয় জামা কাপড়। মাস্টারদিদি বলেছিল সাড়ে তিন হাজার, থাকা-খাওয়া, তেল সাবান ফ্রি, পুজোয় জামাকাপড়। বাড়তি তেইশশ’ টাকার জন্যেই কি ছবি এমনটা করল? মাসে মাসে এতগুলো টাকা বেড়ে যাওয়া তাদের জীবনে ভীষণ বড় ব্যাপার, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। তবু মালতীর পছন্দ হয়নি ব্যাপারটা। ছবি টাকাটাই দেখল? একবারও ভাবল না, মিঠু আর মিঠুর মায়ের ভালোবাসার কথা? একবারও ভাবল না, তার কাজটা কি হবে, একটা অসুস্থ – বিকলাঙ্গ ছেলের সর্বদা সেবা করে যাওয়া সারাটা দিন। কোন সঙ্গী নেই - সাথী নেই, কোন বৈচিত্র্য নেই, একঘেয়ে বিরক্তিকর কাজ।

ছবির এই সিদ্ধান্ত মালতীকে ভীষণ দ্বিধায় রেখেছে আজও। একদিকে বাড়তি এতগুলি টাকার সঞ্চয়, তাদের দিয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা। সেদিক থেকে ভাবলে ছবি হয়তো ঠিক করেছেকিন্তু অন্যদিকে মিঠুদের আন্তরিক ভালোবাসা আর সুস্থ জীবন ছেড়ে, অসুস্থ জীবনের সঙ্গে জুড়ে যাওয়া, মালতীর মনে হয় মিঠুদের সঙ্গে ভীষণ বড়ো অবিশ্বাসের কাজ হয়েছে এটা। মিঠু এতদিন পরে আজও, প্রায়ই আসে ছবির কাছে। বেশ কয়েকবার দেখাও হয়েছে মালতীর সঙ্গে মাস্টারদিদির বাড়িতে। সে তো শুধু ভালোবাসার টানেই না কি? ছবি কি কিছুটা হলেও অকৃতজ্ঞ নয়, মিঠুদের কাছে?

ঘরের ভেতর থেকে মোবাইলটা বেজে উঠল। ফোনটা কিনে দিয়েছিল ছবি। ফুরিয়ে যাওয়া চায়ের গ্লাসের কানায় বসে থাকা মাছিদের তাড়িয়ে মালতী উঠল। মেঘলা দিনে বেলা বোঝা যাচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু অনেকটা সময় গড়িয়ে গেছে আকাশ-পাতাল ভাবনায়। ফোনটা হাতে নিয়ে, পর্দার আঁকিবুকি দেখে সে বুঝল ছবির ফোন, সবুজ সুইচ টিপে কানে নিল ফোনটা, “বল”।

“মা, কোথায় তুমি? আজ কাজে আসনি”?

“না রে সকালে শরীর খারাপ লাগতেসিল – তাই আর যাইনি”

“কি হয়েছে? জ্বর”?

“জ্বর নয়, তবে ওরকমই, জ্বর-জ্বর ভাব, মাথা ভার, গায়ে ব্যাতা”

“তুমি দিদুর সাথে চলে এলে না কেন, আমার কাছে? বিশ্রাম হতো। দরকার হলে ডাক্তারও দেখিয়ে নেওয়া যেত”

    “ধুর, তেমন কিছু নয় রে, আজ একটু আরাম করলেই সেরে যাবে”

“কিছু খেয়েছ, সকাল থেকে? রান্নাবান্না কিছু করেছ”?

“চা খেয়েচি। আর এই তো রান্না চাপাব ...”

“আমি জানি তো। এখন কটা বাজছে বলো তো, পৌনে একটা। সকাল থেকে কিছু খাওনি, এখনো রান্না করোনি...নিশ্চই দরজায় বসে আবোল-তাবোল ভাবছিলে। এর জন্যেই তোমাকে বলছিলাম, মা, তুমি আমার কাছে চলে এলে না কেন? না খেলে শরীর খারাপ তো আরো বাড়বে ...মা, শুনচ?

“শুনচি রে, মা শুনচি। তুই কি আমাকে দেখতে পাচ্চিস নাকি, বলতো? এতক্ষণ কি করচি না করচি সব তুই বুজে ফেললি...”

“আমি কি তোমায় চিনি না ভাবচো? একা একা ঘরে তুমি কী করবে আমি জানি না? শরীর খারাপ বলে চুপচাপ শুয়ে কাটাবে তুমি? ওসব কতা রাকো, তুমি এখন উটে যা হোক কিচু একটু ফুটিয়ে নাও। আবার পুকুরে নাইতে যেও না যেন। বাদলার জলে শরীর আরো ধরে নেবে। বালতির তোলা জলে গাটা ধুয়ে নিও...এই অবেলায় মাতা ভিজিও না মোটেই, চুল শুকোবে না, বিপদ আরো বাড়বে”

“বেশি বকিস না, ছবি। অবাক করলি বটে, আমি তোকে পেটে ধরেছিলাম, না তুই আমাকে? এমন করচিস, জ্বর যেন আর কারো হয় না। তোর সব কাজ হয়ে গেচে? খাওয়াদাওয়া সেরেচিস”?

“হুঁ, কাজ সেরে, বিট্টুকে খাবার খাইয়ে এই ওষুধ খাওয়ালাম, ও ঘুমোচ্চে। আজ তুমি এলে না দেকে, তোমাকে ফোন করলাম। তোমার জন্যে একটু সুজির হালুয়া আর হরলিক্স বানিয়ে রেকেচিলাম, সেটা আমাকেই একন গিলতে হবে, দুপুরে ওই খেয়ে নোব, ব্যস। কাল কিন্তু শরীর খারাপ লাগলেও চলে আসবে দিদুর সঙ্গেবুজেচ? একন যাও যা বললাম করো, উটে কিচু মুকে দাও”।

“আমাকে উপদেশ ঝাড়ছিস আর নিজে খাবি সুজি আর হরলিক, সোমত্ত মেয়ে ওই খেয়ে তোর পেট পুরবে?

“আচ্ছা, আচ্ছা, এ পোড়া পেট কিসে পুরবে আমার চে তুমি না হয় ঢের বেশীই জান, আমি কিন্তু আবার ফোন করব, আর মিচে কতা বললে ঠিক ধরে ফেলব...হাসল ছবি...একন রাকচি”।

মালতীর ঠোঁটে হাল্কা হাসি, দুচোখে মায়ার আলো, মালতীর খুব ইচ্ছে হচ্ছে এই মূহুর্তে ছবির চিবুক ছুঁয়ে চুমু খেতে, মালতীর চোখে জল ভরে উঠলমালতী শব্দহীন মোবাইলের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ফোন রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে পড়ল – চান খাওয়া না করলে এই মেয়ে তাকে ছাড়বে না


এই উপন্যাসের পরের পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ৯ " 

মঙ্গলবার, ১৫ জুলাই, ২০২৫

লিটিং লিং - পর্ব ১


 

কচি ছেলেকে কোলে নিয়ে বউমাঠাকরেন আর ছোড়দিমণি উঠে পড়লেন গাড়ির ছইয়ের ভিতর। ছইয়ের ভিতর খড় বিছিয়ে নরম গদি, তার ওপরে পরিষ্কার বিছানার চাদর। তার ওপরে গুছিয়ে বসলেন বউমা ঠাকরুন, কোলে একবছরের ছেলেকে নিয়ে, আর ছোটদিমণি বসলেন তাঁর গা ঘেঁষে। গোলাপের ছবি ছাপা লোহার ট্রাংক, তার সঙ্গে অনেকগুলি পুঁটলি। সেই সব পুঁটলিতে আছে - কচি ছেলে বার বার হিসি করে ফেলবে, হাগুও  করে ফেলতে পারে, তাই কাচা কাপড়ের টুকরো - পুরোন ধুতি, শাড়ি ছিঁড়ে তৈরি করা। সে শাড়ির আবার পাড় ছিঁড়ে দিতে হয় আগেই - কারণ শক্ত পাড়ের ঘষায় শিশুর কোমল ত্বকে ব্যথা লাগতে পারে। অন্য এক পুঁটলিতে আছে, শুকনো চিঁড়ে, গুড়ের পাটালি, বাতাসা, নারকেলের নাড়ু। আরেকটা বড়ো পুঁটুলিতে এত্তো মুড়ি, পথে খিদে পেলে সবার খাওয়া চলবে। মাটির কলসিতে আছে খাবার জল। পথ তো নেহাত কম নয়। বড়দাঠাকুর বলছেন পনের-বিশ ক্রোশ, আর গাড়ির গাড়োয়ান ভরতকা বলল, “লা গো বড়দাঠাকুর, লা - লয় লয় করে তিরিশ, পঁইতিরিশ কোশ তো হবেই! এই তো সেদিনকারে তোমার বে দে আনলোম ওই গাঁ থেকে, আমি জানবো নে”?

যুবতী বউ আর তরুণী শালীর কাছে বেইজ্জত হবার ভয়ে, বড়দাঠাকুর খুব তাচ্ছিল্য করে জবাব দিলেন, “যাও, যাও, তুমি একেবারে সরকারি আমিন হয়ে উঠেছ, ভরতকা। মনে হচ্ছে, চেন ফেলে জরিপ করে দেখে এসেছ কতটা দূর?”

ভরতকাকার প্রাণখোলা হাসিতে, পাশে বসে থাকা সাদা বলদদুটোও একটু যেন চমকে গেল, হাসি থামিয়ে ভরতকা বলল, “তা যা বলেচো, বড়দাঠাকুর, তবে হ্যাঁ, দু এক কোশ কমবেশি হতে পারে, তার বেশি লয়”ভরতকা কথাও বলে, কাজও করে। বউমাঠাকরুনরা গাড়ির ভেতরে বসে গেছেন, সে দেখেছে। তাই চটপট হাতে, ছইয়ের পিছনে তুলে দিতে লাগল, শ্বশুরবাড়ি থেকে বউমার বাপের বাড়ির জন্য পাঠানো নানান শুভেচ্ছা তত্ত্ব। তার মধ্যে আছে একটা বড়োসড়ো কুমড়ো, দশ বারোটা নারকেল, বেয়াইমশাই লাউ খেতে খুব ভালোবাসেন, চাল থেকে সবে পেড়ে আনা দুটো নধর লাউ। বেতের ধামায় সের পাঁচেক গোবিন্দভোগ চাল, ছেলেপুলেরা পায়েস খাবে। নলেন গুড়ের নাগরি চারটে, এবারে খেজুর গাছের জিরেনে খুব রস এসেছিল, তাই একটু কড়া পাকে জ্বাল দেওয়া চারটে খেজুরগুড়ের পাটালি। রাজস্থানী কড়ির বড়ো বয়ামে গব্য ঘি।

 

সব জিনিষপত্র একে একে গুছিয়ে তুলে দেওয়ার পর, ভরতকা বড়দাঠাকুরকে বলল, “থালে রওনা হওয়া যাক, বড়দাঠাকুর। বেলা বাড়িয়ে আর লাভ কী? অনেকটা পথ, এখনই রওনা হলে, তাও বেলাবেলি পৌঁচে যাওয়া যাবে”বড়দাঠাকুরের অনুমতির অপেক্ষা না করে ভরতকা মুখে আওয়াজ তুলল, “হুরররর, হ্যা দ্দ্যাক, বসে আছে দুটো য্যান নবাব পুত্তুর, ওঠ ওঠ, হুরররর হ্যাট হ্যাট”

অলস বসে বসে জাবর কাটতে থাকা বলদ দুটো উঠে দাঁড়াল ভরতকার ভাষায়। ভোর ভোর ডাবায় ভরা সরষের ঝাঁজালো খোল মেশানো জল-বিচালি তারা ভরপেট খেয়ে নিয়েছে। বেশ কিছুক্ষণ আর খাবার চিন্তা নেই। ভরতকা তাদের পাছায় চাপড় দিতে দিতে ডেকে আনল গাড়ির সামনে, তারপর নিজের শরীরের ভারে নামিয়ে নিল গাড়ির সামনের দিক। মুখে “হা, হা, হা হা, অ্যাদ্দ্যাক অ্যাদ্দাক, আব্বর নাকি রে”? বলতে বলতে প্রথম বলদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিল জোয়াল, এবার দ্বিতীয়টাকেও ঠিক জায়গায় এনে, বাঁশের গোঁজ দিয়ে, জোয়ালের সঙ্গে বেঁধে ফেলল বলদ দুটোকে। এবার দুই বলদের কাঁধে সমান ভাবে চাপ দিয়ে, তুড়ুক লাফ মেরে উঠে বসল, গাড়ির একদম সামনে, দুই বলদের মাঝখানে ফালি জায়গাতে। সেখানেও চারটি খড় বিছিয়ে বসার জায়গা করা আছে, আর সেই আসনের তলাতেই গোঁজা আছে পাঁচন গাছটা। ভরতকা গাড়িতে চেপে বসাতে, গাড়ি এবার জমির সঙ্গে সমান্তরাল হয়ে গেল; ভরতকার ভারে, জোয়াল চেপে বসল দুই বলদের কাঁধে। গাড়ির সমস্ত ভার সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ল দুই চাকা ও দুই বলদের কাঁধে। বলদেরা নড়াচড়া করে, নিজেদের চার পায়ের ওপর সামলে নিল সেই ভার। বলদের পক্ষে এখন আর কোন মতেই এই ভার ছাড়িয়ে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

ভরতকা পাঁচন গাছটা হাতে নিয়ে দুই হাত জড়ো করে, পুবের সূর্যের দিকে তাকিয়ে নমস্কার করল, তারপর বড়দাঠাকুরের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, “কি ভাবচো, বল দিকি, ভাবতে ভাবতে বেলা কাবার করে দেবে নাকি? উটে পড়ো, উটে পড়ো, দুগ্‌গা দুগ্‌গা বলে”

বড়দাঠাকুর বাড়ির দরজার ফ্রেমে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “চললাম, মা, সাবধানে থেকো আমাদের জন্য চিন্তা করো না” 

মা বললেন, “আয় বাবা, আয়। বৌমাকে বলিস পৌঁছসংবাদ দিয়ে একটা পোস্টকার্ড লিখতে, কচি ছেলেকে নিয়ে এতটা পথ...দুগ্‌গা দুগ্‌গা। মা, মাগো, মা বিপত্তারিণী, সব দিক দেখো মা”মা যখন জোড়হাত কপালে ঠেকিয়ে নমস্কার করছেন ইষ্টদেবতাকে, বড়দাঠাকুর লাফিয়ে উঠে বসলেন, ভরতকার পিছনে, ঠিক যেখানটায় ছই শেষ হয়েছে, সেই চওড়া জায়গাটায়। নিজে গুছিয়ে বসার পর, কোলে তুলে নিলেন বছর ছয়েকের ছেলেকে, তারপর পাশে আরাম করে বসিয়ে তার কাঁধে হাত রেখে কাছে টেনে নিলেন - আদরও হল, আবার নিরাপত্তাও হল। তারপর বললেন, “ভরতকা, চালাও দেখি তোমার রথ”

ভরতকা হাসল, কথার উত্তর না দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “চ না, র‍্যা! দাঁড়োয়ে দাঁড়োয়ে কতা শুনতেচে দ্যাখো, যেন কত বুঝদেরে হয়েচে, হুরররর, হ্যাট”

অচল অবস্থা থেকে গাড়িকে চালু করতে একটু বেশি শক্তি লাগে, চাকা একবার গড়াতে শুরু করলে, অনেক সহজ হয়ে যায় চলতে থাকা। বলদদুটোর লেজে হালকা মোচড় দিয়ে ভরতকা আবার বেজে উঠল, “টান, টান, হুরররর, হ্যাট, মুখ নেড়ে ভোর ভোর এক নাদা খোল বিচুলিতো পেটে পুরলি, বাপ আমার, এবার গতরটাকে একটু নাড়া, হুরররর”

লেজের ব্যাথায় আর ভরতকার কথায়, বলদদুটো বেশ জোরের সঙ্গে টানতে লাগল জোয়ালটা, আর তারপরই গাড়িটা গড়াতে শুরু করল। লেজের থেকে হাত সরিয়ে ভরতকা, দুই বলদের পিঠে হালকা চাপড় দিল, যেন বলতে চাইল, ‘ব্যথা একটু দিয়েছি, বাপ, ওটা মনে রাখিস না’। হাতের ভাষা বুঝে বলদদুটো স্বাভাবিক ভাবে হাঁটতে লাগল তাদের স্বাভাবিক চলার ছন্দে, তাদের গলায় বাঁধা ঘন্টির ধ্বনিও ছন্দোময় হয়ে উঠল, লিটিং লিং লিটিং লিং টিংলি টিং

 

 

গাড়ি চলছে। ছইয়ের সামনে পর্দা ফেলা, ছইয়ের পিছনেও পর্দা ফেলা। এই গাঁয়ের বউ বাপের বাড়ি যাচ্ছে, তাই বলে উটকো লোক বউয়ের মুখ দেখবে নাকি? এমন অসৈরণ হতে আছে? তাছাড়াও বলদের ক্ষুরের আঘাতে, গাড়ির চাকার নিকে, মেটে রাস্তায় ধুলো ওড়ে বিস্তর। রাঢ় বাংলার মাটির রঙ গিরি, সে মাটির ধুলো চুলের কালো বর্ণকে ধূসর লালচে করে দেয়, আর সেই ধুলোয় কিচকিচ করে চোখের কোল, ঠোঁটের কষ আর দাঁত। পর্দা থাকলে, সেটা অনেকটাই রক্ষে হয়, তবু ফাঁক ফোকর তো আর বন্ধ করা যায় না।

আব্রু আর নিয়মকানুনের মজাই হল, তাকে ভেঙে ফেলার মধ্যে। চেরা বাঁশের কাঠামোর ওপর চাপানো, বেতের বোনা ছইয়ের ভেতরের দিকে কাপড়ের পাড় দিয়ে যতই নকশা করা থাক না কেন, কতক্ষণ আর তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা সম্ভব সেই একঘেয়ে শিল্পকর্ম? আর সঙ্গে যদি থাকে শৈশবের সঙ্গী সেই ছোট্ট বোনটি, যে এখন জীবনের ধর্মে মোটেই আর ছোট্ট নেই এবং হয়তো দু এক বছরের মধ্যে সেও চলে যাবে অজানা এক শ্বশুরবাড়িতে, তাহলে? তার সঙ্গে এই নির্জন ছইয়ের মধ্যে কিছুটা চপল হওয়াই যায়, কিছুটা খুনসুটি করাই যায়কোলে দুধের শিশু ঘুমিয়ে রয়েছে বলেই, বউমাঠাকরুণ যে তিনকেলে বুড়ি হয়ে গিয়েছে এমন তো আর নয়!

“ওই, ওই যে দেখতে পাচ্ছিস, মণি? ওই যে রে জোড়া নারকেল গাছের ওপাশে পুকুরটা - দেখতে পাচ্ছিস না? ওই পুকুরেই আমরা রোজ যাই স্নান করতে”পর্দার একটুখানি ফাঁক করে বৌমাঠাকরুন তার বোনকে শ্বশুরবাড়ির গ্রাম চেনাতে লাগলেন

“বাবা, বেশ দূর তো, রে দিদি, তোদের বাড়ি থেকে”মণি উত্তর দিল।

“ধুর তেমন কিছু না, আমরা কি আর এই বড়ো রাস্তা ধরে আসি নাকি? আমরা তো যাই পাছ দুয়োর দিয়ে বেরিয়ে, মাঠের আল পথ দিয়ে। এই পুকুরে নাইতে খুব মজা, জানিস মণি, গরমের দিনেও জলের ভেতরটা এমন ঠাণ্ডা থাকে, ডুব দিলেই, আঃ কি শান্তি। গরম কালের বিকেলে আমরা গা ধুতে আসি রোজ”মণি চোখ বড়ো বড়ো করে জিগ্যেস করল,

“একা, একা”?

“পাগল, হয়েছিস? তাই কেউ ছাড়ে? ঘরের বউ একা ঘর থেকে বেরোলেই রাইকিশোরী হয়ে যায়, তা জানিস”? মুখ টিপে হেসে বউঠাকরুন আবার বললেন, “সেজ থাকে, ও বাড়ির ননদরা থাকে, জায়েরা থাকে, পাড়া প্রতিবেশীদের বউ-ঝিরাও থাকে, সবাই মিলে যাই”

“ও বাড়ি, মানে”

“ওরা আমাদের জ্ঞাতি। তোর জামাইবাবুর ছোট কাকার ঘর। আর যায় সামন্তবাড়ির বউ-ঝিরা, আমাদের বাড়ির ডানদিকেই ওদের বাড়ি, একই পাঁচিলের এপার আর ওপার”

খুব গম্ভীর মুখ করে মণি বলল, “দিদি, আমার জামাইবাবু, তোর কে হয় রে”?

খুব রাগ রাগ ভাব আনতে গিয়েও পারলেন না বৌমাঠাকরুণ, ফিক করে হেসে ফেলে, মণির চুলের লম্বা বেণী ধরে টানলেন, বললেন, “খুব ফাজিল আর ডেঁপো হয়েছিস তো? পাঁচ বছরের বড় দিদিকে আর দিদি বলে মান্যিই করছিস না! দাঁড়া, মাকে বলে, এই বোশেখেই তোর গলাতেও বিয়ের মালা পড়াচ্ছি, তখন হাড়ে হাড়ে টেরটি পাবি, তোর জামাইবাবু আমার কে হয়!”

মণির গালে হাল্কা লজ্জার রঙ লাগল, তবুও খুব তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বলল, “আহা, আমি তাই বললাম বুঝি? বিয়ে করতে আমার বয়েই গেছে, এখন আমি বিয়ে করবই না”

“আচ্ছা? তা কখন করা হবে শুনি? বাবাকে বলে, তাহলে তো স্বয়ম্বরের ব্যবস্থা দেখতে হয়”

“আঃ, দিদি, ভাল হবে না বলে দিচ্ছি”ঠোঁট ফুলিয়ে রাগ দেখাল মণি। বউমাঠাকরুণ হেসে ফেলল বোনের এই সংকোচ ও লজ্জা দেখে। বুঝতেও পারল, তার বোনটি আর ছোট্টটি নেই, তার মনের মধ্যে এখন বাসা বাঁধছে নিজের বাসা, নিজের সংসারের স্বপ্ন। মেয়েরা ঠিক বোঝে, এই বিষয়ে আর কোন ঠাট্টার মধ্যে গেল না বউমাঠাকরুণ, তবে মনে মনে ঠিক করে নিল, বাড়ি গিয়ে মাকে বলতে হবে। অন্য প্রসঙ্গ এনে বললেন, “আমার এক ননদ আছে, তার এই মাঘে বিয়ে, আমি চলে আসছি শুনে, তার সে কি কান্না জানিস তো”?

অবাক হয়ে মণি জিগ্যেস করল, “কেন”?

হাসতে হাসতে বৌমাঠাকরুন বললেন, “‘ও বৌদি গো, তুমি ওই সময় না থাকলে, আমি কোজ্জাবো গো? আমার যে খুব ভয় করবে গো’আমার তো সেই শুনে এত হাসি পাচ্ছে, এদিকে হাসতেও পারছি না। অনেক কষ্টে হাসি চেপে খুব গম্ভীর হয়ে বললাম, বিয়ের দিনে ভয় পায় না, এমন ডাকাবুকো মেয়ে আমি দেখিনি, ঠাকুজ্জি। ও কিছু না, দেখ সব ঠিক হয়ে যাবে। তাছাড়া আমি না থাকলেই বা, তোমার আরো বৌদিরা, দিদিরা রয়েছে। বন্ধুরা রয়েছে। ভয় কি? তখন কি বলল জানিস? বলল, ‘ও বৌদি গো, তোমাকে আমি কি নজরে দেখি তুমি জানোনা গো। আর জন্মে তুমি নিশ্চই আমার মায়ের পেটের দিদি ছিলে গো’”

“যাঃ, তুই হাসছিস? বেচারি তোকে কত ভালোবাসে দেখ”    

“ভালোবাসে না, ছাই। আদিখ্যেতা। অমন কুচুটে মেয়ে আর দুটো দেখিনি। কেউ ওকে দেখতে পারে না। এর কথা তাকে, তার কথা ওকে, এই করে যাচ্ছে, সারাটা দিন। এ বাড়িতে এসে প্রথম প্রথম বুঝতে পারিনি, বিশ্বাস করে অনেক কথা বলে ফেলতাম। ওমা, সব এসে তোর জামাইবাবুর মায়ের কাছে লাগাত, আর কান ভাঙানি দিত। এখন আমিও ওই, ওপর ওপর চলি”      

এতক্ষণ মায়ের কোলে একইভাবে অসাড়ে ঘুমোচ্ছিল, এখন ছেলেটা একটু নড়ে উঠল। বৌমাঠাকরুণ মূহুর্তের মধ্যেই দিদি থেকে মা হয়ে উঠলেন। এতক্ষণ যে চপলা দিদিটি বোনের সঙ্গে সখীর মতো গপ্পো করছিলেন, তার মুখের দিকে তাকিয়ে মণি এখন অবাক হয়ে গেল। তার মুখে আর এতটুকুও চপলতা নেই, মুখময় মাতৃত্বের মমতা, দু চোখে অদ্ভূত মায়া  

বছর সাতেক আগে এই দিদির যখন বিয়ে হল, দিদির বয়েস তখন সতের। আটবোন আর দুই ভাইয়ের মধ্যে এই দিদি – নদিদি; নদিদির পরে ফুলদিদি, তারপর সে। বিয়ের আগে এই নদিদির খুব ন্যাওটা ছিল তারা, সারাদিন তার পায়ে পায়ে ঘুরে বেড়াত। সমস্ত দিনের মধ্যে তাদের কতবার যে ঝগড়া হত, আবার ভাব হত, তার আর হিসেব নেই। বিয়ের পরদিন দিদি যখন শ্বশুরবাড়ি আসার জন্য রওনা হয়েছিল, মণিকে বুকে নিয়ে সে কি কান্না! মণির কেন যেন মনে হয়েছিল, দিদি তাকে ছেড়ে থাকতে পারবে না, কয়েকদিন বাদেই আবার ফিরে আসবে ঠিক সেই দিদি, এখন নরম নরম দুই হাতে ছেলের কাঁধে আর পাছায় চাপড় দিচ্ছে। মুখে গুনগুন আওয়াজে ঘুম পাড়ানি সুর তুলছে। এখন তার দুই হাতের শাঁখা, পলা, নোয়া আর সোনার চুরিতে সুর উঠতে লাগল ঠিন ঠিনিক ঠিন। মণি খুব মন দিয়ে দিদিকে যখন দেখছিল, বাইরে তখন বলদদুটো একই তালে গাড়িটা টেনে নিয়ে চলেছে, লিটিং লিং লিটিং লিং টিংলি টিং

 

 

 

“সকাল সকাল কোথায় যাওয়া হচ্ছে গো, ভাইপো? তাও আবার গাড়ি হাঁকিয়ে”? সুদেবকাকা গরুর গাড়ি আসতে দেখে মাঝপথ ছেড়ে ধারের দিকে দাঁড়িয়েছিলেন।

বড়দাঠাকুর হাত জোড় করে নমস্কার করে বললেন, “প্রণাম গো কাকা, এই যাচ্ছি, একটু শ্বশুরঘর”সুদেবকাকা একগাল হাসলেন, তাঁর গালে এবং চোখের কোলে অভিজ্ঞতার ভাঁজ। হাতের পাঁচন নিয়েই ভরতকাও জোড়হাতে প্রণাম করল, মাথা নিচু করে।

সুদেবকাকা হাসতে হাসতে বললেন, “তা বেশ, বেশ। ভালো থাকো বাবা, খুব ভালো থাকো। তা একটু কেন গো, যাচ্ছো যখন পুরোটাই যাও না। হা হা হা হা। বৌমা, খোকা সবাই ভাল আছে তো, বাবা? ভরত তোমরাও সব ভাল আছ তো, ভাই? তা হীরকবাবু, এবার যে পাঠশাল যাবার সময় হয়ে আসছে, দাদুভাই। আর তো স্বস্তি থাকবে না, বাপু?” বলে চোখ কুঁচকে একটু হাসলেন।

পুরুষের পক্ষে শ্বশুরবাড়ি যাওয়াটা তেমন সম্মানের ব্যাপার নয় যেন, তাই বড়দাঠাকুর লজ্জা লজ্জা মুখে হাসলেন, ঘাড় নেড়ে সবাই ভাল আছে সায় দিয়ে ছেলেকে বললেন, “হীরু, দাদুকে নমো করো”তারপর সুদেবকাকাকে বললেন, “কাকিমা, ভাই বোনেরা সকলে ভালো আছেন তো কাকা? কাকিমাকে আমার প্রণাম দেবেন। কাকিমাকে বলবেন, ফিরে এসে একদিন আপনাদের ওখানে আসব”

কথা বলতে বলতে গাড়ি পার হয়ে গেল, সুদেবকাকা পথের ওপর নেমে এসে হাত তুলে আশীর্বাদের ভঙ্গি করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখলেন, তিনি জানেন খোকাকে কোলে নিয়ে বউমা পর্দার আড়ালে তাঁর দিকেই দেখছেন। বউমার ডাগর দুই মায়াময় চোখের দৃষ্টিতে তিনি নিজের কন্যার অনুভব পান। তাঁর পরনে হাঁটু অব্দি খাটো ধুতি, গায়ে বুকখোলা ফতুয়ার ভেতর সাদা পৈতে দেখা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর তিনি পিছু ফিরে হাঁটতে শুরু করলেন। বড়দাঠাকুর তাঁর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, “সুদেবকা মানুষটা বড়ো ভালো, জানো ভরতকা। খুব প্রাণখোলা, সবার খোঁজখবর রাখে।”

কথা বলার ফাঁকে বলদদুটো একটু ঢিলে হয়ে গিয়েছিল, ভরতকা তার শক্ত হাতের আঙুলে বলদের পিঠে খোঁচা দিয়ে বলল, “তোরা দুটোতে খুব স্যায়না হয়েচু, ন্যা? কতা বলচি দেকেই অমনি গতর ছেড়ে দিলি? যা বলেচ বড়দাঠাকুর, অমন সজ্জন দেকা যায় না। সব্বোদা হাসিমুক আর সব্বার সঙ্গে হাসিমুকে কতা বলেন। দেবদ্বিজেও যেমন ভক্তি, তেমনে ছোটবড়ো সকলেরেই ভালোবাসেন। এমন মানুষ আজকাল আর দেকা যায় কই? অথচ ভগমানের কি বিধেন বলো দেকি, এমন লোকেরাই কিনা পাঁজর ভাঙা দুক্কো বয়ে বেড়াচ্ছে!”

 

পর্দার আড়াল দিয়ে দেখা আটকানো যায়, কথা তো আর আটকানো যায় না। বৌমাঠাকরুণ চুপটি করে শুনছিলেন সব। এখন পিছনের পর্দা অল্প ফাঁক করে জোড় হাতে প্রণাম করলেন, সুদেবকাকার চলে যাওয়া দেখতে দেখতে মণিকে বললেন, “এই মানুষটা বড়ো দুঃখী মানুষ জানিস? আমাদের বাড়ি মাঝে মাঝেই আসেনআমার হাতের চা খাবেন বলে, আর আমাকে দেখতে পাবেন বলে”

মণি কিছুটা অবাক হল, বলল, “যতই হোক বাইরের লোক, তোকে দেখতে আসেন মানে?”

“হ্যাঁরে, মাঝে মাঝেই আমাকে দেখতে আসেন। সুদেবকাকার বড়ো মেয়ের বিয়ে হয়েছিল, আমার এ বাড়িতে আসার মাস ছয়েক আগে। ওঁনার চার ছেলে, দুই মেয়ে। ওই মেয়েই ছিল সবার বড়ো। প্রায় আমারই বয়সী”

“ছিল বলছিস কেন?”

“বছর ছয়েক আগে মারা গেছে, শুনেছি চার মাসের পোয়াতি ছিল”

“তাই? এ মা, মারা গেল কি করে?”

“জানি না, শ্বশুরবাড়ি থেকে বলে, পুকুরের শানবাঁধানো ঘাটে পা পিছলে পড়ে গিয়ে মাথায় চোট পেয়েছিল। তাতেই নাকি মারা গেছে। আর লোকে বলে, শ্বাশুড়ির কথায়, ওর স্বামী নাকি নোড়া ছুঁড়ে মেরেছিল কপালে। সেই চোটে উঠোনেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিল, আর ওঠেনি। কেউ তুলেও দেখেনি; অনেকক্ষণ নড়াচড়া করছে না দেখে, কাছে গিয়ে দেখে পোড়াকপালি মরে গেছে”

“ইস, কি বলছিস, দিদি?” আতঙ্কে মণি দিদির হাতটা চেপে ধরল।

“হ্যাঁ রে, সুদেবকাকাকে জিগ্যেস করলে কিছুই বলেন না, শুধু কাঁদেন। আর বলেন, তোকে মা অবিকল আমার সেই মরে যাওয়া মেয়ের মতো দেখতে। তাই তোকে বারবার দেখতে আসি। সাবধানে থাকিস, মা। যে যাই বলুক, খুব ঠাণ্ডা থাকবি মা, খুব ঠাণ্ডা থাকবি। মেয়েদের জ্বালা, বড়ো জ্বালা, মাআর একটা কথা সর্বদা মনে রাখিস মা, ভেজা খড়ে আগুন দিলে ধোঁয়া ওঠে ঠিকই, কিন্তু শুকনো খড়ের মতো জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যায় না। মেয়েরা মা বসুন্ধরা, সর্বংসহা – তাদের সব সইতে হয়” বৌমাঠাকরুণ পর্দার ফাঁক দিয়ে সুদেবকাকার পিছন ফিরে পথচলা দেখতে দেখতে বললেন, “মানুষটা মনে মনে সর্বদা কাঁদছেন, কিন্তু বাইরে হাসি দিয়ে সেটা ঢেকে রেখেছেন”

বউমাঠাকরুণের দুচোখের কোলে জল টলটল করে উঠল। ঘোমটার কাপড় একটু টেনে মুখটা আড়াল করে, কান্নার আবেগ সামলালেন, তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কোলের ছেলের দিকে তাকিয়ে হাল্কা হাল্কা পা নাচিয়ে ছেলেকে আদর করতে লাগলেন। মণির মুখেও এখন কোন কথা নেই, সে ভাবছে, মানুষ এমন নৃশংসও হতে পারে! এতদিন একসঙ্গে ঘর করার পর, যে পত্নীর গর্ভে নিজের সন্তান – সেই পত্নীকেও এভাবে হত্যা করা যায়? এমন হত্যা করে, দোষীরা পারও পেয়ে যায়? থানা-পুলিশ, সরকার–আইন, পাপ-পুণ্য, স্বর্গ-নরক তাহলে কাদের জন্যে? অসহায় ওই বৃদ্ধ পিতা, মৃতা কন্যার স্মৃতি মনে নিয়ে পুড়ে চলেছেন দিবারাত্র, ভেজা খড়ের মতো...ধোঁয়া হচ্ছেন, কিন্তু জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছেন না!

সকলেই যে যার নিজের মতো ভাবনায় মগ্ন, সকলেই চুপ, শুধু গাড়ীর একঘেয়ে গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঘণ্টা বেজে চলেছে, লিটিং লিং লিটিং লিং টিংলি টিং

এর পরের পর্ব - " লিটিং লিং - শেষ পর্ব "


নতুন পোস্টগুলি

নামকরণ

     এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২   "        শাশুড়িমায়ের জিম্মায় ফুটকিকে রেখে বিজলি আজই স্কুলে জয়েন করলেন। মাসখানেকের...