বুধবার, ২৩ জুলাই, ২০২৫

কঠোপনিষদ - ১/১

এই সূত্র পড়া যাবে - " ঈশোপনিষদ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ "



সূচনা

 এই উপনিষদটি কৃষ্ণযজুর্বেদীয় তৈত্তিরীয় শাখার কঠ বা কাঠক ব্রাহ্মণের অন্তর্গত বলে কঠোপনিষদ নামে পরিচিত। এই উপনিষদে যম ও নচিকেতার আখ্যান এবং তাদের কথোপকথনের মাধ্যমে ব্রহ্মবিদ্যার তত্ত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। নচিকেতার এই উপাখ্যানটি অত্যন্ত প্রাচীন, ঋগ্‌বেদে এবং তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণেও নচিকেতার এই উপাখ্যানটির একটু অন্যভাবে উল্লেখ আছে।

কঠোপনষিদের প্রথম যে ভাষ্যটি পাওয়া যায়, সেটি আচার্য শংকরের। তিনিই এই উপনিষদকে দুটি অধ্যায়ে এবং প্রতি অধ্যায়কে তিনটি বল্লীতে বিভক্ত করেন। পরবর্তী কালে মধ্বাচার্য এটিকে অধ্যায়ে ভাগ না করে, ছয়টি বল্লীতে বিভক্ত করেছিলেন। ১৮১৭ সালে রাজা রামমোহন রায় এই উপনিষদের প্রথম বাংলা অনুবাদ করেন। পণ্ডিতেরা এই উপনিষদটিকে সেরা উপনিষদগুলির মধ্যে অন্যতম মনে করেন।

“উত্তিষ্ঠত জাগ্রত

প্রাপ্য বরান্‌ নিবোধত।

ক্ষুরস্য ধারা নিশিতা দুরত্যয়া

দুর্গং পথস্তৎ কবয়ো বদন্তি”।। (১/৩/১৪) 

উপরের শ্লোকটি স্বামী বিবেকানন্দর অত্যন্ত প্রিয় – তাঁর এই বাণীই সেসময় এবং আজও বহু মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং করে চলেছে। শ্লোকটি এই উপনিষদের অন্তর্গত। 

  প্রসঙ্গতঃ W. Somerset Maugham-এর  ১৯৪৪ সালে লেখা বিখ্যাত উপন্যাস The Razor's Edge -এর নামটি এই শ্লোকের "ক্ষুরস্য ধারা" শব্দদুটির অনুবাদ। এই উপন্যাসের নায়ক ছিলেন একজন যুদ্ধ-বিমান চালক, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বীভৎসতা নিজের চোখে দেখে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন এবং উপনিষদের মধ্যে শান্তি ও নতুন এক জীবনের সন্ধান করতে থাকেন। এই উপন্যাসটি নিয়ে হলিউডে সিনেমাও হয়েছে।    

       

 শান্তিপাঠ

 

ওঁ সহ নাববতু, সহ নৌ ভুনক্তু, সহ বীর্যং করবাবহৈ তেজস্বি নাবধীতমস্তু,

মা বিদ্বিষাবহৈ।।

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।

ওঁ সহ নৌ অবতু, সহ নৌ ভুনক্তু, সহ বীর্যং করবাবহৈ তেজস্বি নৌ অধীতম্‌ অস্তু,

মা বিদ্বিষাবহৈ।।

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।

আমাদের দুজনকে তিনি সমভাবে রক্ষা করুন, দুজনকেই সমভাবে (জ্ঞান) লাভ করান, আমাদের উভয়কেই (জ্ঞানলাভের) উপযুক্ত করে তুলুন। আমাদের উভয়ের কাছেই লব্ধজ্ঞান যেন তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। (আমরা যেন পরষ্পরের প্রতি) বিদ্বেষ না করি।  ওঁ শান্তি, সকল বিঘ্নের শান্তি হোক।

 

প্রথম অধ্যায়

প্রথম বল্লী

ওঁ উশন্‌ হ বৈ বাজশ্রবসঃ সর্ববেদসং দদৌ।

তস্য হ নচিকেতা নাম পুত্র আস।। ১/১/১

ওঁ উশন্‌ হ বৈ বাজশ্রবসঃ সর্ববেদসং দদৌ।

তস্য হ নচিকেতা নাম পুত্র আস।। ১/১/১

বাজশ্রবার পুত্র যজ্ঞে ফললাভের জন্য সর্বস্ব দান করেছিলেন। তাঁর এক পুত্র ছিল, নাম নচিকেতা। [বাজ মানে অন্ন, শ্রবঃ মানে যশ - অন্নদান করে যিনি বিখ্যাত হয়েছিলেন, সেই বাজশ্রব-র বংশধরেরা বাজশ্রবা।]

   

তং হ কুমারং সন্তং দক্ষিণাসু নীয়মানাসু

শ্রদ্ধাবিবেশ সোঽমন্যত।। ১/১/২

তং হ কুমারং সন্তং দক্ষিণাসু নীয়মানাসু

শ্রদ্ধা আবিবেশ সঃ অমন্যত।। ১/১/২

যজ্ঞের দক্ষিণা(গবাদি প্রাণী) সমূহ যখন যজ্ঞস্থলে আনা হচ্ছিল, পিতার মঙ্গল চিন্তা করে, বালক নচিকেতার মনে হল,

 

পীতোদকা জগ্ধতৃণা দুগ্ধদোহা নিরিন্দ্রিয়াঃ।

অনন্দা নাম তে লোকাস্তান্‌ স গচ্ছতি তা দদৎ।। ১/১/৩

পীত-উদকাঃ জগ্ধ-তৃণাঃ দুগ্ধ-দোহাঃ নিঃ-ইন্দ্রিয়াঃ।

অনন্দাঃ নাম তে লোকাঃ তান্‌ স গচ্ছতি তাঃ দদৎ।। ১/১/৩

জীবনের শেষ জল পান করে নিয়েছে, শেষ ঘাস-পাতা খেয়ে ফেলেছে, দুধ দেওয়ারও আর ক্ষমতা নেই, নেই সন্তান ধারণের ক্ষমতাও, এমন গাভীসমূহ যিনি দান করেন, তাঁকে দুঃখময় লোকে যেতে হয়।

[এখানে আমার কিছু বক্তব্য আছেঃ উপনিষদ-গ্রন্থ লেখা যখনই হোক, উপনিষদের রচনাকাল - সত্য কিংবা ত্রেতা যুগে। আমার ধারণা সত্যযুগে - যখন অনার্য রাক্ষস, দানবদের অত্যাচার আর্য ঋষিদের ব্যতিব্যস্ত করে তোলেনি। ত্রেতা যুগ শ্রীরামচন্দ্রের যুগ - সে সময় উত্তর থেকে দক্ষিণ ভারতের সর্বত্র অনার্য রাক্ষসদের উপদ্রব প্রশমন করতেই শ্রীরামচন্দ্রের মর্তে আগমন। 

অতএব ধরে নিই সত্যযুগেই উপনিষদ রচিত হয়েছিল। বিভিন্ন পুরাণ থেকে জানা যায় সত্য যুগ ছিল আদর্শ ধর্ম যুগ। সত্য যুগ চতুষ্পদ ধর্মের উপর নির্ভরশীল ছিল - সেই চতুষ্পদ ধর্ম হল - তপস্যা, শুদ্ধি, দয়া ও সত্য। ত্রেতা যুগ ছিল ত্রিপদ ধর্মে নির্ভরশীল - অর্থাৎ চারটি ধর্ম ছিল, কিন্তু তার প্রভাবে এক-চতুর্থাংশ হ্রাস পেয়েছিল। দ্বাপরে ওই ধর্মগুলি অর্ধেক প্রভাব হারিয়ে অর্ধাংশ - অর্থাৎ দ্বিপদ হয়ে উঠল। আর কলির কথা না বলাই ভাল - অত্যন্ত করুণ - তিন-চতুর্থাংশ প্রভাব হারিয়ে, মাত্র একটি মাত্র পায়ের উপর ওই চারটি ধর্ম দাঁড়িয়ে আছে। 

সেক্ষেত্রে, সত্য যুগে - যখন চারটি ধর্ম পূর্ণ মাত্রায় বলবৎ - নচিকেতার পিতা গৌতম যিনি আবার বিখ্যাত দানশীল বাজশ্রব বংশের উত্তরপুরুষ - তিনি যজ্ঞের দান হিসাবে দিচ্ছেন - জরাগ্রস্ত অসুস্থ ধেনুসমূহ !!! যারা জীবনের শেষ জল পান করে ফেলেছে, শেষ তৃণ খেয়ে ফেলেছে, যাদের সন্তানধারণের ক্ষমতা বিলুপ্ত অতএব দুগ্ধদানেও অপারগ! এই ধেনুগুলি তিনি  দক্ষিণা হিসাবে যাদের দিচ্ছেন - তাদের প্রতি তিনি প্রকৃতপক্ষে প্রতারণা করলেন না কি? সত্য যুগেও এমন অনাচার যে ঘটত - সে কথা অবিশ্বাস করার কোন কারণ নেই - কারণ উপনিষদকার ঋষি এই ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন - এবং এই অনাচারের প্রতিকারের জন্য বালক বা তরুণ নচিকেতা বিচলিত হয়ে উঠে বারবার বাবাকে জিজ্ঞেস করেছেন, "পিতা আপনি আমাকে কার হাতে দান করছেন?" এতটুকু লজ্জিত না হয়ে, ক্রুদ্ধ পিতা তরুণ পুত্র নচিকেতাকে প্রকৃতপক্ষে মৃত্যু অভিশাপই দিলেন, বললেন - "তোমাকে আমি মৃত্যুর কাছে দান করলাম"। অর্থাৎ চার ধর্মের - তপস্যা, শুদ্ধি, দয়া ও সত্য - সবগুলিই তিনি লঙ্ঘন করলেন।]                 


স হোবাচ পিতরং তত কস্মৈ মাং দাস্যসীতি।

দ্বিতীয়ং তৃতীয়ং তং হোবাচ মৃত্যবে ত্বা দদামীতি।। ১/১/৪

সঃ হ উবাচ পিতরং তত কস্মৈ মাং দাস্যসি ইতি।

দ্বিতীয়ং তৃতীয়ং তং হ উবাচ মৃত্যবে ত্বা দদামি ইতি।। ১/১/৪

তিনি পিতাকে বললেন, “পিতা, আপনি আমাকে কার কাছে দান করবেন?” (পিতার উত্তর না পেয়ে) তিনি দ্বিতীয় বার, তৃতীয় বার একই প্রশ্ন করলেন। তখন পিতা বললেন, “তোমাকে আমি মৃত্যু (যম)-র কাছে দান করলাম”।


বহূনামেমি প্রথমো বহূনামেমি মধ্যমঃ।

কিং স্বিদ্‌ যমস্য কর্তব্যং যন্ময়াদ্য করিষ্যতি।। ১/১/৫


বহূনাম্‌ এমি প্রথমঃ বহূনাম্‌ এমি মধ্যমঃ।

কিং স্বিদ্‌ যমস্য কর্তব্যং যৎ ময়া অদ্য করিষ্যতি।। ১/১/৫

(নচিকেতা চিন্তা করলেন) “অনেকের মধ্যে আমি প্রথমে থাকি, অনেকের মধ্যে আমি মাঝারি, (কিন্তু কখনও অধম তো নই! সুতরাং) যমের এমন কী প্রয়োজন পড়ল যে, আজ পিতা আমাকেই তাঁর কাছে দান করলেন?”

 

অনুপশ্য যথা পূর্বে প্রতিপশ্য তথাঽপরে।

সস্যমিব মর্ত্যঃ পচ্যতে সস্যমিবাজায়তে পুনঃ।। ১/১/৬

অনুপশ্য যথা পূর্বে প্রতিপশ্য তথা অপরে।

সস্যম্‌ ইব মর্ত্যঃ পচ্যতে সস্যম্‌ ইব আজায়তে পুনঃ।। ১/১/৬

(দুর্বল হয়ে পিতা পাছে সত্যভ্রষ্ট হন, তাই নচিকেতা বললেন,) “হে পিতা, আমাদের পূর্বপুরুষদের (সত্যনিষ্ঠার) কথা চিন্তা করুন, অন্যান্য (সত্যনিষ্ঠ)-দের কথাও চিন্তা করুন। মানুষের জীবন শস্যের মতোই একবার জীর্ণ হয় আবার জন্ম নেয়” (অতএব অনিত্য এই সংসারে সত্যভ্রষ্ট হওয়া উচিৎ নয়)। 

 

বৈশ্বানরঃ প্রবিশত্যতিথির্ব্রাহ্মণো গৃহান্‌।

তস্যৈতাং শান্তিং কুর্বন্তি হর বৈবস্বতোদকম্‌।। ১/১/৭

বৈশ্বানরঃ প্রবিশতি অতিথিঃ ব্রাহ্মণঃ গৃহান্‌।

তস্য এতাম্‌ শান্তিং কুর্বন্তি হর বৈবস্বত উদকম্‌।। ১/১/৭

(যমরাজ তিন রাত্রি ঘরে ছিলেন না, তিনি ফিরলে তাঁর আত্মীয়রা বললেন,) “ব্রাহ্মণ অতিথি অগ্নির মতোই গৃহে প্রবেশ করেন। গৃহস্থ তাঁর (পথশ্রম ও ক্লান্তির) শান্তির ব্যবস্থা করেন। হে যমরাজ, তাঁর পা ধোওয়ার জল আন।   

 

আশাপ্রতীক্ষে সঙ্গতং সুনৃতাং

চেষ্টাপূর্তে পুত্রপশুংশ্চ সর্বান্‌।

এতদ্বৃঙ্‌ক্তে পুরুষস্যাল্পমেধসো

যস্যানশ্নন্‌ বসতি ব্রাহ্মণো গৃহে।। ১/১/৮

আশাপ্রতীক্ষে সঙ্গতং সুনৃতাং

চ ইষ্টাপূর্তে পুত্রপশুন্‌ চ সর্বান্‌।

এতৎ বৃঙ্‌ক্তে পুরুষস্য অল্পমেধসঃ

যস্য অনশ্নন্‌ বসতি ব্রাহ্মণো গৃহে।। ১/১/৮

যার গৃহে ব্রাহ্মণ অনাহারে বাস করেন, সেই অল্পবুদ্ধি মানুষের (শুভ ফলের) আশা, প্রতীক্ষা, সাধু সঙ্গলাভের সুফল, প্রিয়বাক্য বলার ফল, যজ্ঞে পূর্ণ হওয়া ইষ্ট, পুত্র, গবাদি পশু – সকলই বিনষ্ট হয়”।


তিস্রো রাত্রীর্যদবাৎসীর্গৃহে

মেঽনশ্নন্‌ ব্রহ্মন্নতিথির্নমস্যঃ।

নমস্তেঽস্তু ব্রহ্মন্‌ স্বস্তি মেঽস্তু

তস্মাৎ প্রতি ত্রীন বরান্‌ বৃণীষ্ব।। ১/১/৯

তিস্রঃ রাত্রীঃ যৎ অবাৎসীঃ গৃহে

মে অনশ্নন্‌ ব্রহ্মন্‌ অতিথিঃ নমস্যঃ।

নমঃ তে অস্তু ব্রহ্মন্‌ স্বস্তি মে অস্তু

তস্মাৎ প্রতি ত্রীন বরান্‌ বৃণীষ্ব।। ১/১/৯

(নচিকেতাকে অভ্যর্থনা করে যমরাজ বললেন) “হে ব্রাহ্মণ, তুমি নমস্য অতিথি, তুমি অনাহারে তিন রাত্রি আমার গৃহে যেহেতু বাস করেছো, তার জন্যে তোমাকে নমস্কার, এখন ওই তিন রাত্রির জন্যে তুমি তিনটি বর প্রার্থনা কর এবং আমার মঙ্গল হোক”।

 

শান্তসংকল্পঃ সুমনা যথা

স্যাদবীতমন্যুর্গৌতমো মাঽভি মৃত্যো।

তৎপ্রসৃষ্টং মাঽভিবদেৎ প্রতীত

এতৎ ত্রয়াণাং প্রথমং বরং বৃণে।। ১/১/১০

শান্তসংকল্পঃ সুমনা যথা

স্যাৎ বীত-মন্যুঃ গৌতমঃ মা অভি মৃত্যো।

তৎপ্রসৃষ্টং মা অভিবদেৎ প্রতীত

এতৎ ত্রয়াণাং প্রথমং বরং বৃণে।। ১/১/১০

(নচিকেতা বললেন) “হে মৃত্যু, (আমার পিতা) গৌতম যেন আমার প্রতি উৎকণ্ঠাহীন, প্রসন্নমনা এবং বিগতক্রোধ হন। আপনার এখান থেকে মুক্ত হবার পর পিতা আমায় যেন চিনতে পারেন এবং সাদরে গ্রহণ করেন। তিনটির মধ্যে এইটি আমার প্রথম বর”।

[সাধারণ ভাবে যমের গৃহে যায় মৃত মানুষ, অর্থাৎ প্রেত - প্রেতের সঙ্গে মর্ত্যের জীবিত মানুষের কোন পরিচয় থাকে না। নচিকেতা বর চাইলেন, পিতার সঙ্গে আমার যেন সেই সম্পর্ক না হয়]     

 

যথা পুরস্তাদ্ভবিতা প্রতীত

ঔদ্দালকিরারুণির্মৎপ্রসৃষ্টঃ।

সুখং রাত্রীঃ শয়িতা বীতমন্যুস্ত্বাং

দদৃশিবান্‌ মৃত্যুমুখাৎ প্রমুক্তম্‌।। ১/১/১১

যথা পুরস্তাৎ ভবিতা প্রতীতঃ

ঔদ্দালকিঃ আরুণিঃ মৎ-প্রসৃষ্টঃ

সুখং রাত্রীঃ শয়িতা বীত-মন্যুঃ ত্বাং

দদৃশিবান্‌ মৃত্যুমুখাৎ প্রমুক্তম্‌।। ১/১/১১

(যমরাজ বললেন) “ঔদ্দালকি আরুণি তোমার প্রতি আগে যেমন ছিলেন, তোমাকে চিনতে পেরে সেরকমই থাকবেন। তোমাকে মৃত্যুমুখ থেকে বিমুক্ত দেখেও, আমার ইচ্ছায় ক্রোধহীন হয়ে আরো অনেক রাত্রি তিনি সুখনিদ্রায় কাটাবেন”।

[নচিকেতার পিতা গৌতম, ঋষি উদ্দালক ও অরুণের বংশধর, তাই যমরাজ তাঁকে ঔদ্দালকি এবং আরুণি সম্বোধন করেছেন। সকলেই বাজশ্রবা বংশের ঋষি।]   

 

স্বর্গে লোকে ন ভয়ং কিঞ্চনাস্তি

ন তত্র ত্বং ন জরয়া বিভেতি।

উভে তীর্ত্বাঽশনায়াপিপাসে

শোকাতিগো মোদতে স্বর্গলোকে।। ১/১/১২

স্বর্গে লোকে ন ভয়ং কিঞ্চন অস্তি

ন তত্র ত্বং ন জরয়া বিভেতি।

উভে তীর্ত্বা অশনায়া-পিপাসে

শোকাতিগঃ মোদতে স্বর্গলোকে।। ১/১/১২

(নচিকেতা বললেন) “স্বর্গলোকে এতটুকুও ভয় নেই। সেখানে আপনি (মৃত্যু) নেই, জরাগ্রস্ত হবার ভয় নেই। ক্ষুধা ও তৃষ্ণা উভয়কেই অতিক্রম করে, শোকের অনুভব-মুক্ত হয়ে, সকলে স্বর্গে আনন্দ ভোগ করে”।

 

স ত্বমগ্নিং স্বর্গ্যমধ্যেষি মৃত্যো

প্রব্রূহি ত্বং শ্রদ্দধানায় মহ্যম্‌।

স্বর্গলোকা অমৃতত্বং ভজন্ত

এতদ্‌ দ্বিতীয়েন বৃণে বরেণ।। ১/১/১৩

স ত্বম্‌ অগ্নিং স্বর্গ্যম্‌ অধ্যেষি মৃত্যো

প্রব্রূহি ত্বং শ্রদ্দধানায় মহ্যম্‌।

স্বর্গলোকা অমৃতত্বং ভজন্ত

এতৎ দ্বিতীয়েন বৃণে বরেণ।। ১/১/১৩

   হে মৃত্যু, স্বর্গকামী মানুষেরা অগ্নিবিদ্যার তপস্যা করে যে ভাবে স্বর্গ এবং অমরত্ব লাভ করে, সে বিষয় আপনার জানা আছে। শ্রদ্ধাবান আমাকে আপনি সেই বিষয় বলুন, এই আমার প্রার্থিত দ্বিতীয় বর”।    

 

প্র তে ব্রবীমি তদু মে নিবোধ

স্বর্গ্যমগ্নিং নচিকেতঃ প্রজানন্‌।

অনন্তলোকাপ্তিমথো প্রতিষ্ঠাং

বিদ্ধি ত্বমেতং নিহিতং গুহায়াম্‌।। ১/১/১৪

প্র তে ব্রবীমি তৎ উ মে নিবোধ

স্বর্গ্যম্‌ অগ্নিং নচিকেতঃ প্রজানন্‌।

অনন্তলোকাপ্তিম্‌ অথো প্রতিষ্ঠাম্‌

বিদ্ধি ত্বম্‌ এতম্‌ নিহিতম্‌ গুহায়াম্‌।। ১/১/১৪

(যমরাজ বললেন) “হে নচিকেতা, স্বর্গলাভের জন্য অগ্নি বিদ্যার বিষয় আমি ভালোভাবেই জানি। মন দিয়ে শোনো, আমি বলছি। জেনে রাখো, এই বিষয় অনন্তলোক লাভের উপায়, জগতের আশ্রয় এবং বিদ্বানদের অন্তরে প্রতিষ্ঠিত”।   

 

লোকাদিমগ্নিং তমুবাচ তস্মৈ

যা ইষ্টকা যাবতীর্বা যথা বা।

স চাপি তৎ প্রত্যবদদ্‌ যথোক্তমথাস্য

মৃত্যুঃ পুনরেবাহ তুষ্টঃ।। ১/১/১৫

লোকাদিম্‌ অগ্নিং তম্‌ উবাচ তস্মৈ

যা ইষ্টকা যাবতীঃ বা যথা বা।

সঃ চ অপি তৎ প্রত্যবদৎ যথা উক্তম্‌

অথ অস্য মৃত্যুঃ পুনঃ এব আহ তুষ্টঃ।। ১/১/১৫

(যমরাজ নচিকেতাকে) সৃষ্টির আদিতে উপস্থিত অগ্নির বিষয়ে বললেন, কতগুলি ইঁট সংগ্রহ (যজ্ঞবেদী নির্মাণের জন্য) করে অন্যান্য ক্রিয়া (সমিৎসজ্জা, অগ্নিচয়ন, অগ্নিস্থাপন ইত্যাদি) কীভাবে করতে হয়। একনিষ্ঠ নচিকেতাও যমরাজের সকল কথা মন দিয়ে শুনে, তিনি যেমন বলেছিলেন, তেমনই পুনরুক্তি করলেন। নচিকেতার এই একাগ্রতায় যমরাজ আবার সন্তুষ্ট হয়ে বললেন।

  

তমব্রবীৎ প্রীয়মাণো মহাত্মা

বরং তবেহাদ্য দদামি ভূয়ঃ।

তবৈব নাম্না ভবিতাঽয়মগ্নিঃ

সৃঙ্কাং চেমামনেকরূপাং গৃহাণ।। ১/১/১৬

তম্‌ অব্রবীৎ প্রীয়মাণো মহাত্মা

বরং তব ইহ অদ্য দদামি ভূয়ঃ।

তব এব নাম্না ভবিতা অয়ম্‌ অগ্নিঃ

সৃঙ্কাম্‌ চ ইমাম্‌ অনেকরূপাং গৃহাণ।। ১/১/১৬

মহাত্মা (যমরাজ) প্রীত হয়ে তাঁকে বললেন, “আজ আরেকটি বর আমি তোমাকে দান করছি। এই অগ্নি তোমার নামেই প্রসিদ্ধ হবে, আর বহু বর্ণময় এই মালাও গ্রহণ করো”।

[“সৃঙ্কা” শব্দের এক অর্থ মালা, অন্য অর্থ শাস্ত্রসিদ্ধ কর্মবিজ্ঞান, যে কর্মজ্ঞানের-মালা দিয়ে পরমমঙ্গল লাভ করা যায়।]    

 

ত্রিণাচিকেতস্ত্রিভিরেত্য সন্ধিং

ত্রিকর্মকৃৎ তরতি জন্মমৃত্যু।

ব্রহ্মজজ্ঞং দেবমীড্যং বিদিত্বা

নিচায্যেমাং শান্তিমত্যন্তমেতি।। ১/১/১৭

ত্রিণাচিকেতঃ ত্রিভিঃ এত্য সন্ধিম্‌

ত্রিকর্মকৃৎ তরতি জন্মমৃত্যু।

ব্রহ্মজ-জ্ঞম্‌ দেবম্‌ ঈড্যং বিদিত্বা

নিচায্য ইমাম্‌ শান্তিম্‌ অত্যন্তম্‌ এতি।। ১/১/১৭

“তিনজনের (মাতা, পিতা ও আচার্য) সঙ্গে উপদেশ লাভ করে, যিনি তিনবার নাচিকেত অগ্নি চয়ন করবেন এবং তিন-কর্মের অনুষ্ঠান করবেন, তিনি জন্ম-মৃত্যুকে অতিক্রম করবেন। তিনি ব্রহ্ম থেকে সৃষ্টি হওয়া পূজনীয় এবং সর্বপ্রকাশশীল জ্ঞান আত্মরূপে উপলব্ধি করে পরমা শান্তি লাভ করবেন”

[শৈশবে মাতার, বাল্যে পিতার এবং উপনয়নের পর আচার্যের সঙ্গে থেকে যে উপদেশ লাভ করা যায়।]

 

ত্রিণাচিকেতস্ত্রয়মেতদ্‌ বিদিত্বা

য এবং বিদ্বাংশ্চিনুতে নাচিকেতম্‌।

স মৃত্যুপাশান্‌ পুরতঃ প্রণোদ্য

শোকাতিগো মোদতে স্বর্গলোকে।। ১/১/১৮

ত্রিণাচিকেতঃ ত্রয়ম্‌ এতৎ বিদিত্বা

যঃ এবম্‌ বিদ্বান্‌ চিনুতে নাচিকেতম্‌।

সঃ মৃত্যুপাশান্‌ পুরতঃ প্রণোদ্য

শোকাতিগঃ মোদতে স্বর্গলোকে।। ১/১/১৮

“যিনি এই তিন (সমিৎসজ্জা, অগ্নিচয়ন, অগ্নিস্থাপন) জেনে, তিনবার নাচিকেত অগ্নি চয়ন করেন এবং নাচিকেত অগ্নির ধ্যান করেন, তিনি শরীরত্যাগের আগেই মৃত্যুর বন্ধন দূর করেন এবং দুঃখ-শোকের ঊর্ধে স্বর্গলোকের আনন্দ উপভোগ করেন” 

 

এষ তেঽগ্নির্নচিকেতঃ স্বর্গ্যো

যমবৃণীথা দ্বিতীয়েন বরেণ।

এতমগ্নিং তবৈব প্রবক্ষ্যন্তি

জনাসস্তৃতীয়ং বরং নচিকেতো বৃণীষ্ব।। ১/১/১৯

এষ তে অগ্নিঃ নচিকেতঃ স্বর্গ্যঃ

যম্‌ অবৃণীথাঃ দ্বিতীয়েন বরেণ।

এতম্‌ অগ্নিং তব এব প্রবক্ষ্যন্তি

জনাসঃ তৃতীয়ং বরং নচিকেতঃ বৃণীষ্ব।। ১/১/১৯

“হে নচিকেতা, তুমি দ্বিতীয় বরে যা প্রার্থনা করেছিলে, স্বর্গলাভের উপায়স্বরূপ যে অগ্নিবিষয়ের কথা তোমাকে বললাম, তোমার নামেই লোক সেই অগ্নির নাম বলবে। এখন তোমার তৃতীয় বর প্রার্থনা করো”।

 

যেয়ং প্রেতে বিচিকিৎসা মনুষ্যে

অস্তীত্যেকে নায়মস্তীতি চৈকে।

এতদ্বিদ্যামনুশিষ্টস্ত্বয়াঽহং

বরাণামেষ বরস্তৃতীয়ঃ।। ১/১/২০

যা ইয়ং প্রেতে বিচিকিৎসা মনুষ্যে

অস্তি ইতি একে ন অয়ম্‌ অস্তি ইতি চ একে।

এতৎ বিদ্যাম্‌ অনুশিষ্টঃ ত্বয়া অহং

বরাণাম্‌ এষঃ বরঃ তৃতীয়ঃ।। ১/১/২০

(নচিকেতা বললেন) “মৃত্যু হলেই মানুষের (মনে) এই যে সন্দেহ উদয় হয়, কেউ বলেন (পরলোকগত আত্মা) “আছে”, কেউ কেউ বলেন “নেই”, আপনার উপদেশ থেকে আমি এই বিষয়ে জানতে চাই, তিন বরের মধ্যে এই আমার তৃতীয় বর”।

 

দেবৈরত্রাপি বিচিকিৎসিতং পুরা

ন হি সুবিজ্ঞেয়মণুরেষ ধর্মঃ।

অন্যং বরং নচিকেতো বৃণীষ্ব

মা মোপরোৎসীরতি মা সৃজৈনম্‌।। ১/১/২১

দেবৈঃ অত্র অপি বিচিকিৎসিতম্‌ পুরা

ন হি সুবিজ্ঞেয়ম্‌ অণুঃ এষ ধর্মঃ।

অন্যম্‌ বরম্‌ নচিকেতঃ বৃণীষ্ব

মা মা উপরোৎসীঃ অতি মা সৃজ এনম্‌।। ১/১/২১

(যমরাজ বললেন) “এই বিষয়ে আগে দেবতারাও সংশয়ে ছিলেন, কারণ সূক্ষ্ম এই আত্মতত্ত্ব সহজে উপলব্ধি করা যায় না। তুমি অন্য বর প্রার্থনা করো নচিকেতা, আমাকে অনুরোধ করো না, এই বিষয়টি ছেড়ে দাও”।

 

দেবৈরত্রাপি বিচিকিৎসিতং কিল

ত্বং চ মৃত্যো যন্ন সুজ্ঞেয়মাত্থ

বক্তা চাস্য ত্বাদৃগন্যো ন লভ্যো

নান্যো বরস্তুল্য এতস্য কশ্চিৎ।। ১/১/২২

দেবৈঃ অত্র অপি বিচিকিৎসিতং কিল

ত্বং চ মৃত্যো যৎ ন সুজ্ঞেয়ম্‌ আত্থ।

বক্তা চ অস্য ত্বাদৃক্‌ অন্যঃ ন লভ্যঃ

ন অন্যঃ বরঃ তুল্যঃ এতস্য কঃ চিৎ।। ১/১/২২

(নচিকেতা বললেন) “দেবতাদেরও যখন এই বিষয়ে নিশ্চিত সংশয় ছিল, এবং হে যমরাজ, আপনিও বলছেন এই বিষয়টি সহজবোধ্য নয়, এ বিষয়ে আপনার মতো শ্রেষ্ঠ গুরু আর কাউকেই পাবো না, অতএব এই বরের তুল্য অন্য কোন বর আর কী হতে পারে?”  

 

শতায়ুষঃ পুত্রপৌত্রান্‌ বৃণীষ্ব

বহূন্‌ পশূন্‌ হস্তিহিরণ্যমশ্বান্‌।

ভূমের্মহদায়তনং বৃণীষ্ব,

স্বয়ং চ জীব শরদো যাবদিচ্ছসি।। ১/১/২৩

শত-আয়ুষঃ পুত্রপৌত্রান্‌ বৃণীষ্ব

বহূন্‌ পশূন্‌ হস্তি-হিরণ্যম্‌-অশ্বান্‌।

ভূমেঃ মহৎ-আয়তনং বৃণীষ্ব,

স্বয়ং চ জীব শরদঃ যাবৎ ইচ্ছসি।। ১/১/২৩

(মৃত্যুর গূঢ় রহস্য নিয়ে যমরাজ নচিকেতার সঙ্গে আলোচনায় ইচ্ছুক নন, তিনি নচিকেতাকে প্রলোভন দেখিয়ে নিরস্ত করার জন্যে বললেন) “তুমি পুত্র-পৌত্র নিয়ে শত বর্ষ আয়ুর বর নাও। অনেক গবাদিপশু, হাতি, অশ্ব এবং স্বর্ণ কিংবা বিস্তীর্ণ সাম্রাজ্য প্রার্থনা কর, কিংবা যত বছর ইচ্ছে, নিজে ততদিন জীবিত থাকো”। 

 

এতত্তুল্যং যদি মন্যসে বরং বৃণীষ্ব

বিত্তং চিরজীবিকাং চ।

মহাভূমৌ নচিকেতস্ত্বমেধি কামানাং

ত্বা কামভাজং করোমি।। ১/১/২৪

এতৎ তুল্যং যদি মন্যসে বরং বৃণীষ্ব

বিত্তং চিরজীবিকাং চ।

মহাভূমৌ নচিকেতঃ ত্বম্‌ এধি কামানাম্‌

ত্বা কামভাজং করোমি।। ১/১/২৪

“যদি এই বরের তুল্য অন্য বর মনে করো, প্রার্থনা করো। যদি সম্পদ (সোনা, ধনরত্ন) ও চিরজীবন চাও, তাও প্রার্থনা করতে পারো। হে নচিকেতা, তুমি বিশাল এক ভূখণ্ডের রাজা হও, তোমাকে আমি সমস্ত কাম্যবস্তু ভোগের অধিকারী করে দিচ্ছি”।


যে যে কামা দুর্লভা মর্ত্যলোকে

সর্বান্‌ কামাংশ্ছন্দিতঃ প্রার্থয়স্ব।

ইমা রামাঃ সরথাঃ সতূর্যা

ন হীদৃশা লম্ভনীয়া মনুষ্যৈঃ।

আভির্মৎপ্রত্তাভিঃ পরিচারয়স্ব

নচিকেতো মরণং মাঽনুপ্রাক্ষী।। ১/১/২৫

যে যে কামা দুর্লভা মর্ত্যলোকে

সর্বান্‌ কামান্‌ ছন্দিতঃ প্রার্থয়স্ব।

ইমাঃ রামাঃ সরথাঃ সতূর্যা

ন হি ঈদৃশা লম্ভনীয়া মনুষ্যৈঃ।

আভিঃ মৎ-প্রত্তাভিঃ পরিচারয়স্ব

নচিকেতঃ মরণম্‌ মা অনুপ্রাক্ষীঃ।। ১/১/২৫

“মর্তলোকে যা যা দুর্লভ কাম্যবস্তু আছে, সেই সমস্ত ইচ্ছেমতো কামনা করো। (তোমার সামনেই) এই যে সব সুন্দরী অপ্সরাগণ রথে চড়ে, বাদ্যযন্ত্র নিয়ে উপস্থিত রয়েছে, এরা অবশ্যই মানুষের জন্যে নয়, কিন্তু আমার বরে তুমি এদের সেবা উপভোগ করো। কিন্তু হে নচিকেতা, তুমি মরণবিষয়ে আর কোন প্রশ্ন করো না”। 

 

শ্বোভাবা মর্ত্যস্য যদন্তকৈতৎ

সর্বেন্দ্রিয়াণাং জরয়ন্তি তেজঃ।

অপি সর্বং জীবিতমল্পমেব

তবৈব বাহাস্তব নৃত্যগীতে।। ১/১/২৬

শ্বঃ-ভাবাঃ মর্ত্যস্য যৎ অন্তক এতৎ

সর্ব-ইন্দ্রিয়াণাং জরয়ন্তি তেজঃ।

অপি সর্বং জীবিতম্‌ অল্পম্‌ এব

তব এব বাহাঃ তব নৃত্যগীতে।। ১/১/২৬

(নচিকেতা বললেন) “হে অন্তক, আপনার বলা কামনার বস্তু কাল পর্যন্ত থাকবে না, (কামনা) সকল ইন্দ্রিয়ের শক্তি জারিত করতে থাকবে। তাছাড়া সকলেরই জীবন অল্প। অতএব রথ ইত্যাদি আপনারই থাকুক, নৃত্যগীত আপনারই থাকুক”।

 

ন বিত্তেন তর্পণীয় মনুষ্যো

লপ্স্যামহে বিত্তমদ্রাক্ষ্ম চেৎ ত্বা।

জীবিষ্যামো যাবদীশিষ্যসি

ত্বং বরস্তু মে বরণীয়ঃ স এব।। ১/১/২৭

ন বিত্তেন তর্পণীয় মনুষ্যো

লপ্স্যামহে বিত্তম্‌ অদ্রাক্ষ্ম চেৎ ত্বা।

জীবিষ্যামঃ যাবৎ ঈশিষ্যসি

ত্ব্ম্‌ বরঃ তু মে বরণীয়ঃ স এব।। ১/১/২৭

“বিত্ত নিয়ে মানুষ কখনো তৃপ্ত হয় না। আপনার দর্শন লাভেই আমার বিত্ত লাভ হয়ে গেছে। আর যতদিন আপনি যমপদে রয়েছেন, ততদিন আমার জীবনও থাকবে (তার জন্যে বর প্রার্থনার প্রয়োজন কী?) কিন্তু আমার প্রার্থনার বর ওইটাই”।  

 

অজীর্যতামমৃতানামুপেত্য

জীর্যন্‌ মর্ত্যঃ ক্বধঃস্থ প্রজানন্‌।

অভিধ্যায়ন্‌ বর্ণরতিপ্রমোদান্‌

অতিদীর্ঘে জীবিতে কো রমেত।। ১/১/২৮

অজীর্যতাম্‌ অমৃতানাম্‌ উপেত্য

জীর্যন্‌ মর্ত্যঃ কু-অধঃস্থ প্রজানন্‌।

অভিধ্যায়ন্‌ বর্ণ-রতি-প্রমোদান্‌

অতিদীর্ঘে জীবিতে কঃ রমেত।। ১/১/২৮

“নিম্নলোকে বাস করা জরা-মৃত্যুশীল মানুষ, জরাহীন অমর দেবতাদের সামনে উপস্থিত হয়ে, তাঁদের (কৃপায় শ্রেষ্ঠ জ্ঞান লাভ করা যায়) জেনেও, গান-কামনা-সুখের ভোগ অনিত্য বুঝেও, অতি দীর্ঘ জীবনের আনন্দ কে পায়?”

 

যস্মিন্নিদং বিচিকিৎসন্তি মৃত্যো

যৎ সাম্পরায়ে মহতি ব্রূহি নস্তৎ।

যোঽয়ং বরো গূঢ়মনুপ্রবিষ্টো

নান্যং তস্মান্নচিকেতা বৃণীতে।। ১/১/২৯

যস্মিন্‌ ইদম্‌ বিচিকিৎসন্তি মৃত্যঃ

যৎ সাম্পরায়ে মহতি ব্রূহি নঃ তৎ।

যঃ অয়ং বরঃ গূঢ়ম্‌ অনুপ্রবিষ্টঃ

না অন্যং তস্মাৎ নচিকেতা বৃণীতে।। ১/১/২৯

 “হে মৃত্যু, যে আত্মা এবং পরলোকের বিষয়ে লোকের মনে সংশয় রয়েছে, সেই বিষয়েই আমাকে বলুন। আত্মবিষয়ে নিহিত এই যে দুর্বোধ্য জ্ঞান, সেই বর ছাড়া অন্য কোন বর নচিকেতা প্রার্থনা করে না”।

প্রথম অধ্যায় প্রথম বল্লী সমাপ্ত

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ স্বামী গম্ভীরানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয় ও শ্রীযুক্ত অতুলচন্দ্র সেন, হরফ প্রকাশণী

চলবে... ১/২ বল্লী আসবে সামনের বুধবার।  

সোমবার, ২১ জুলাই, ২০২৫

লিটিং লিং - শেষ পর্ব

 



এর আগের পর্ব - " লিটিং লিং - পর্ব ১ "


 হঠাৎ ঘচাং করে গাড়ির চাকা লাফিয়ে উঠল গর্তে, সকলেই টাল খেল। বড়দাঠাকুর ছেলেকে চেপে ধরলেন বুকের কাছে। বউমাঠাকরুণ ও মণিদিদিমণির মাথা ঠকাস করে গাড়ির ছইয়ে ঠুকে গেল। দুজনেই নিজেদের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে, চোখাচোখি করে হাসতে লাগল। বড়দাঠাকুর পর্দা সরিয়ে ছইয়ের মধ্যে মুখ বাড়িয়ে উদ্বেগের স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, “পান্না ঠিক আছে তো? মণি, তোমাদের লাগে-টাগেনি তো?” বড়দাঠাকুরের পিছনে শালী, সামনে বসে আছে ভরতকা, পত্নীকে সরাসরি জিগ্যেস করাটা তাই সমীচিন নয়। ওই সামান্য সময়েই বৌমাঠাকরুণের ঘোমটার ভেতর থেকে বড়দাঠাকুরের চোখাচোখি হল, সে চোখের ভাষা পড়েও নিল দুজনে। সেই চাহনির ইঙ্গিত মণি লক্ষ্য করল, কিন্তু কিছুই যেন দেখেনি এমন মুখ করে ঠোঁট টিপে হাসতে লাগল। ভরতকার একটু বুঝি ঝিমুনি এসে গেছিল, গাড়ির এই আচমকা ঝাঁকুনিতে তার ঝিমুনি ছুটে গেল, একটু লজ্জাও পেল নিজের গাফিলতিতে।

সে তীব্র স্বরে ঝেঁকে উঠল, “শালোরা, চোকের মাতা খেয়েচু না কির‍্যা? খানাখন্দ চোকে পড়ে না? মাঠাকরেন, ঠিক আছেন তো? খোকাঠাউর ঠিক আছে তো? শালোরা চলছে যেন বুড়ো কানা গাধা, খানা খন্দ কিচুই চোখে পড়তেচে না”

বউমাঠাকরুন মুচকি হেসে বললেন, “ভরতকা, এমন চললে আমাদের মাথায় অনেক আলু গজিয়ে উঠবে, তখন আর তোমাকে রোদে জলে আলু চাষ করতে হবে না”

এই কথায় একটু অপ্রতিভ হয়েও ভরতকা হাসল হো হো করে, তার পর বলল, “আর হবে না, মাঠাকরেন, বলদদুটোকে কেমন চানকে নিয়ে যাই এবার, দেখই না”

 

আচমকা গাড়ির ঝাঁকুনিতে চমকে উঠেছে কোলের ছেলেটাও। নিশ্চিন্ত আরামে মায়ের কোলের ওমে ঘুমোচ্ছিল বেচারা, এখন ছোট্ট দুই হাতের মুঠি আর দুই পা ছুঁড়ে মাকে ব্যস্ত করে তুলল। ছেলের মুখের দিকে ঝুঁকে তাকিয়ে বউমাঠাকরুণ বলতে লাগলেন, “কু হয়েচে বাবা? ভোয় পেয়েচো, ভোয়? কিচ্চু হয়নি বাবা, মায়ের কোলেই তো রয়েচ, সোনা, কোন ভোয় নেই, ঘুমু করো”

নীলাভ সাদার মধ্যে গভীর কালো চোখের তারায় যে ভয় ফুটে উঠেছিল শিশুর, মায়ের চেনা মুখের দিকে তাকিয়ে, আর মায়ের কথার আওয়াজে সে ভয় কেটে গেল। ফোকলা মুখে হেসে ফেলল একগাল, তারপর মুঠি খুলে হাত বাড়িয়ে দিল মায়ের মুখের দিকে; নীচু হয়ে থাকা মায়ের নাক আর গাল খাবলাতে লাগল। মোচার কলির মতো ছোট্ট ছোট্ট আঙুলের পাতলা নখের খোঁচায়, গালে নাকে ব্যথা লাগে। এই কষ্টটুকুতেও মার আনন্দ, বরং খুব ব্যথা লাগার ভান করে আস্তে চেঁচিয়ে উঠলেন “আউ”তাতে ছেলে আরো আমোদ পেয়ে খল খল করে হাসতে লাগল, কথা বলার চেষ্টায় নানান আওয়াজ করে উঠল

“তবে রে, দুষ্টু ছেলে, মায়ের মুখে খিমচি দিয়ে খিলখিলিয়ে হাসি? দাঁড়াতো, দাঁড়াতো, আঙুলগুলো কামড়ে দিই” ছেলের আঙুলের কয়েকটা, মা মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে নিয়ে দুই ঠোঁটে হাল্কা চেপে ধরলেন। ছেলে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল মায়ের চোখের দিকে; মায়ের কণ্ঠস্বর, মায়ের ঠোঁটে ধরা পড়া তার আঙুলের ডগায় অদ্ভূত অনুভব। মা কী রেগে গেলেন? মাকি সত্যিই তাকে শাস্তি দিতে পারেন? ছেলের দুই চোখে সংশয়, অজানা আশংকা আর অভিমানে তার পাতলা দুই ঠোঁট ফুলে উঠল। তাই দেখে কোন মা পারেন রাগ করে থাকতে?

বউমাঠাকরুন ঘাড় দুলিয়ে দুলিয়ে বলতে লাগলেন, “উ বাবা, তোমাকে কে বকেছে বাবু? তোমার মা তোমাকে বকেছে? তোমার মা খুব দুট্টু আর বম্মাস, তাই না বাবু?  মায়ের কথার ভঙ্গিতে আর ঘাড় নাড়ায় শিশু নিঃসংশয় হল, তার মুখে একটু একটু হাসি ফুটে, আবার খলখল করে বেজে উঠল আনন্দে আর সেই সঙ্গে ভিজিয়ে দিল মায়ের কোল।

বউমাঠাকরুণ একইভাবে ছেলেকে আদর করতে করতে বললেন, “ওই যাঃ, তুমি হাসতে হাসতে হুসু করে ফেললে? অ্যাঁ, এত্ত দুত্তু হয়েছো আর বলতে পারো না, মা, মা, হুসু কব্বো? মণি, ওই পুঁটলিটা খুলে একটা ন্যাকড়া দে না, রে”? শেষের কথাটা বোনকে বলতে বলতে তিনি ছেলের ভেজা প্যাণ্টটা খুলে দিলেন, ন্যাংটাপুটো ছেলে ঘাড় ঘুরিয়ে আর চোখ ঘুরিয়ে দেখতে লাগল, মায়ের মুখ, মায়ের মাথার পিছনে চালচিত্রের মতো গাড়ির ছইয়ের নকশা। দুলছে, সবকিছুই দুলছে, গাড়ির চলার গতিতে দুলেই চলেছে। শিশু পাদুটো ভাঁজ করে, পায়ের বুড়ো আঙুলটা নিজের মুখে পুরে চুষতে লাগল।

মণি সেই দৃশ্য দেখে মজা পেল খুব, বলল, “তোর ছেলের কাণ্ড দ্যাখ, দিদি, আর কিছু না পেয়ে নিজের পায়ের বুড়ো আঙুল চুষছে”!

"ও আমার বিষ্ণুঠাকুর... মহর্ষি মার্কণ্ডেয় একদিন মহাপ্রলয়-সমুদ্রে ভেসে বেড়ানো, বটপাতায় বানানো ছোট্ট এক নৌকোতে শিশু বিষ্ণুকে ওইভাবেই দেখেছিলেন - দুই হাতে দুই পা মুখের কাছে এনে - পায়ের বুড়ো আঙুল চুষছিলেন শিশু বিষ্ণু - তাঁর মুখে ছিল জগৎ ভোলানো বির্নিমল হাসি ...। পুরাণের এই গল্পটা শুনিসনি"? মণির হাত থেকে কাপড়ের টুকরোটা নিয়ে ছেলেকে পরাতে পরাতে বউমাঠাকরুণ বললেন, “তুই দ্যাখ। আমি ওই দেখছি সারাদিন, ওর কিত্তিকলাপ দেখি আর খুব হাসি পায় মাঝে মাঝে। তবে একটা কী বল তো? ভুটকু আর যাই করুক, কান্নাকাটি খুব কম। এক একটা ছেলে থাকে না, এপাশ ফিরতে ভ্যাঁ, ওপাশ ফিরতে ভ্যাঁ  ভুটকু আমার তেমন নয়, ফোকলা মুখে সর্বদাই হাসি, কেবল খুব খিদে-টিদে পেলে একটু খুঁৎখুঁৎ করে, এই যা”

খিদের কথায় বউমাঠাকরুণ নিজের দুইস্তনে ভার অনুভব করলেন, ছেলেটা অনেকক্ষণ খায়নি, তাঁর দুই স্তনে জমে উঠেছে শিশুর জীবনসুধা। শুকনো কাপড় পরে শিশু এখন অনেকটাই স্বস্তি পেল এবং খিদেও অনুভব করতে লাগল। সে মুখে আওয়াজ করে হাত বাড়িয়ে দিল, মায়ের বুকে। বউমাঠাকরুণ ছেলেকে শাড়ির আঁচলের মধ্যে নিয়ে, নিজের স্তনভার হাল্কা করতে সন্তানের অধরে তুলে দিলেন বৃন্ত। শিশু দুইহাতে স্তন ধরে, পরম তৃপ্তিতে শুষতে লাগল মাতৃসুধা মণি কোন কথা বলছিল না, সে শুধু দেখছিল তার দিদির এই পূর্ণতা। তার মধ্যেও কোথাও জন্ম নিচ্ছিল এই পূর্ণতা লাভের স্বপ্ন, তার মনের মধ্যেও যেন ঘন্টা বাজতে লাগল, লিটিং লিং লিটিং লিং টিংলি টিং

 

 কুসুমগ্রামের পর পিচ রাস্তায় উঠে কিছুটা স্বস্তি, বেলা তখন বেশ চড়া। কুয়াশা ভাঙা শীতের রোদ্দুরে চারদিক উজ্জ্বল, পিচের রাস্তায় উঠে গাড়ি গড়াতে লাগল বেশ কিছুটা দ্রুত।

বৌমাঠাকরুণ মণিকে বললেন, “মণি, তোর জামাইবাবুকে জিগ্যেস করতো মুড়ি-টুড়ি কিছু দিই, দুটো মুখে দিক। বাড়ি পৌঁছতে ভাতখাবার বেলা পার হয়ে যাবে তো। হীরু ভেতরে আয়, নারকেল নাড়ু দিয়ে মুড়ি খাবি। ভরতকাকা মুড়ি খাবে, নাকি চিঁড়ে দেব, ভিজিয়ে গুড় দিয়ে মেখে খাবে?”

হীরু পর্দা ফাঁক করে, মাকে বলল, “আমাকে চারটে নাড়ু দেবে, আর মুড়িতে মুড়কি দেবে কিন্তু”

মা হেসে বললেন, “সে না হয় দেব, কিন্তু তুই ভেতরে আয়, বাইরে বসে খাবি নাকি”?

“এই তো আমি বাবার পাশে বেশ আছি, ভরতকাকাও আছে, আমি এখানেই খাবো”

মণিমাসি বললেন, “আমার কাছে আয় না, হীরু। একসঙ্গে খাই। বাইরে বসে কেউ খায় নাকি?”

হীরু উত্তর দিল, “কেন? বাবা খাবে, ভরতকাকা খাবে, তাহলে আমিও খাবো”

মণিমাসি বোঝানোর চেষ্টা করলেন, “বোকা ছেলে, ওঁরা তো বড়ো তুই কিনা ছোট; মা-মাসির কাছে বসেই, ছোটরা খায়”

খুব গম্ভীরভাবে হীরু উত্তর দিল, “আমি আর ছোটটি নেই, মাসি”

তার কথায় বাবা এবং ভরতকাকা হা হা করে খুব হাসলেন খানিকটা। মণিমাসি একটু অপ্রতিভ হলেন দেখে, বউমাঠাকরুণ মুখ টিপে হেসে বোনকে চাপা গলায় বললেন, “পান্না হবার পর থেকে, ও এখন অনেক বড়ো হয়ে গেছে। ভাইয়ের ওপর খুব দাদাগিরি ফলায় আজকাল, জানিস?”

ভরতকাকা গাড়ির গতি কমাতে কমাতে বললেন, “মাঠাকরেন, এক কাজ করি থালে, সামনের ওই অশথতলায় কিছুক্ষণ দাঁড়াই, পাশে পুষ্করিণীও আছে। ওখানে আমাদের ভোজনও হবে, বলদদুটোরও একটু জিরেন হবে”              

পর্দা ফাঁক করে, বউমাঠাকরুণ জায়গাটা দেখলেন; বেশ নিরিবিলি, ছায়া ছায়া জায়গা, পুকুরটাও বেশ ভাল, মনে হচ্ছে পরিষ্কার জল। তাঁর মনে ধরল জায়গাটা। বললেন, “সেই ভালো, ভরতকাকা। এক ভাবে ছইয়ের ভেতরে বসে বসে আমাদেরও মাজা ধরে গেছে”   

হীরুর মধ্যে আজকাল খুব একটা গাম্ভীর্য এসে গেছে, সে এখন অনেকটাই বড়ো, একজন ছোট্ট ভাইয়ের সে দাদা। সে এখন আর বাবা কিংবা মায়ের কোলে চড়তে চায় না, বিশেষ করে ভাই হবার পরবড়দাঠাকুর তাকে গ্রামের পাঠশালায় কদিন পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু সেখানকার পরিবেশ, লেখাপড়ার ধরণধারণ, তাঁর পছন্দ হয়নি। তিনি ঠিক করেছেন, ছেলেদের লেখাপড়া কলকাতাতেই করাতে হবে। তিনি সরকারি যে আপিসে চাকরি করেন, সেখানে বেতন দুশবত্রিশটাকা সাতচল্লিশ পয়সা। কলকাতায় পঞ্চাশ কি পঁচাত্তর টাকায় ছোট্ট একটা বাসা নিয়ে, সংসার চালানো মুশকিল হবে, কিন্তু ছেলেদের ভবিষ্যতের মুখ চেয়ে সেটুকু কষ্ট মানিয়ে নেওয়া যাবে। বড়দাঠাকুর কাউকে এখনো কিছুই বলেননি, এমনকি তাঁর ছেলেদের মাও জানেন না, কিন্তু মনে মনে তিনি সব ঠিক করে ফেলেছেন। পরিবারকে আপাততঃ বাপেরবাড়িতে রেখে তিনি কলকাতায় গিয়ে বাসা ঠিক করে আসবেন এবং মাসখানেকের মধ্যে পরিবার নিয়ে স্থিতু হবেন কলকাতায়। তাঁর ইচ্ছে আছে, এই জানুয়ারিতেই হীরুকে কলকাতার স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেবেন। এই পোষের সাত তারিখে হীরুর বয়েস ছয় পূর্ণ হবে।

“হা, হা, হা, বাঁ, বাঁ, বাঁ, বাস বাস হা, হা, হা” ডানদিকের বলদের পিঠে হাল্কা চাপড় দিতে দিতে, মাঝ রাস্তা ছেড়ে বাঁদিক ঘেঁষে বিশাল অশথের ঝিরঝিরে ছায়ায় গাড়ি দাঁড় করাল ভরতকাকা। দাঁড় করিয়েই ঝুপ করে নেমে পড়ল মাটিতে। গাড়ির সামনে গিয়ে জোয়াল ধরে বলল, “বড়দাঠাকুর, বড়োখোকাকে নিয়ে নেমে পড়েন, জোয়ালটা খুলে দেই, বলদদুটো একটু জিরিয়ে নিক”

বড়দাঠাকুর ছেলে হীরুকে নিয়ে নিচেয় নামতে, গাড়িতে ঝাঁকুনি লাগল, ভরতকাকা চেঁচিয়ে বলল, “মা ঠাকরেন, গাড়ি এবার নামাবো, দিদিমণিকে নিয়ে একটু সামলে বসবেন”খুব আস্তে আস্তে ভরতকাকা গাড়িটাকে ছেড়ে দিল, নিজের ভারে, গাড়ির পেছনটা মাটিতে ঠেকে গেল। বলদদুটো কাঁধের ভার মুক্ত হয়ে চঞ্চল হয়ে উঠল আরামে, তাদের শান্ত করার জন্যে, ভরতকাকা জিভে টক টক আওয়াজ করতে করতে বলতে লাগল, “হা, হা, হা”

অশথের মোটা একটা শেকড়ে বলদের রশিদুটো বেঁধে ফেলল ভরতকাকা, তারপর গাড়ির তলায় বেঁধে রাখা খড়ের বাণ্ডিল থেকে দুটো এনে, খুলে বিছিয়ে দিল বলদ দুটোর সামনে। বলদদুটো মাথা নামিয়ে খড় চিবোতে শুরু করতে, ভরতকাকা তাদের গলায় হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে বলল, “অবোলা জীবও তো কেষ্টরই জীব, নাকি বড়দাঠাকুর? শুধু খাটিয়ে হদ্দ করলেই হবে, একটু আধটু আরামও দিতে হবে না?”

পুকুরের জলে হাতপা-মুখ ধুয়ে ভরতকাকা আর বাবার সঙ্গে হীরু গাড়ির কাছেই আবার ফিরে এল। বউমাঠাকরুণ কাঁসার বাটিতে মুড়িমুড়কি মেখে রেখেছিলেন। সেই দেখে ভরতকাকা হা হা করে হেসে বলল, “দাঁড়াশ সাপের খোরাক হচ্ছে গোদা গোদা কোলা ব্যাং, তাকে কি আর ফড়িং খাওয়ালে চলে, বৌমাঠাকরেন? আমার এই গামছায় চিঁড়ে দাও দিকি মা, পুষ্করিণীর জলে ভিজিয়ে আনি, তারপর গুড় পাটালি যা হয় খানিক দিও। তোমার ও মুড়ি মুড়কি আমার দাঁতেই লেগে থাকবে, উদর পজ্জন্ত আর পৌঁছবে না”

বউমাঠাকরুণ মুখ টিপে হাসলেন, বললেন, “তুমি এত বাজে কথাও বলতে পারো, কাকা! মুড়িমুড়কি তোমার জন্যে নয়, দাঁড়াও তোমাকে চিঁড়েই দিচ্ছি”

মণিমাসি হীরু আর বড়দাঠাকুরকে মুড়িমুড়কির বাটি বাড়িয়ে দিলেনঅন্যদিকে বউমাঠাকরুণ, অন্য পুঁটলি খুললেনপুঁটলি থেকে ঢেঁকিতে কোটা লালচে মোটা চিঁড়ে, দুই হাতের আঁজলা ভরে তুলে ভরতকাকার পেতে দেওয়া গামছায় ঢালতে লাগলেন। পাঁচ আঁজলা দেওয়ার পরই ভরতকাকা হৈ হৈ করে উঠল, বলল, “আমাকে কি বক রাক্কোস ঠাউরেছো, মা? তোমার ও অন্নপুন্নার ভাণ্ডার শেষ হবার নয়, সে কি আর জানি না, মা”?

বউমাঠাকরুণ একটু শাসনের স্বরে বললেন, “কাকা, তোমাকে সকালে-দুপুরে রোজ আমিই ভাত বেড়ে দিই, আমি জানি না, তুমি কতটা খাবে”?

“সে কথা একশবার মা, মা জানবে না ছেলের উদরের খবর? তাও কখনো হয়? দাও মা, দাও। যা দেবে দাও”বউমাঠাকরুণ থেমে গিয়েছিলেন, আরো দু আঁজলা তুলে দিয়ে বললেন, “যাও, ভিজিয়ে আনো গেআমি গুড় আর পাটালি বার করছি”

চিঁড়েগুলো গামছার মধ্যে মুড়ে ভরতকাকা দৌড়ে চলে গেল, পুকুরের ঘাটে। চিঁড়ে সমেত গামছাটা পুকুরের জলে কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রেখে, সেটা তুলে এনে মেলে ধরল বউমাঠাকরুণের সামনে। মাটির হাঁড়ির থেকে দুমুঠি সোনারঙা আখের গুড় নিয়ে ঢেলে দিলেন ভেজা চিঁড়ের ওপর, তার ওপরে দিলেন চারটে গুড়ের পাটালি আর চিনির বাতাসা একমুঠো। ভরতকাকা গামছা তুলে নেবার পর, তার হাতে দিলেন চারটে নারকেলের নাড়ু। ভরতকাকা কিছু বলল না, তার দু চোখে আনন্দের হাসি।

দুটো নাড়ু মুখে পুরে চিবোতে চিবোতে বলল, “বউমাঠাকরুনের হাতে যেন কোন আগল নেই”তারপর গামছা মুঠি করে নিয়ে, ঘাসের ওপর বসল, অশথ গাছের তলায়। গুড় আর বাতাসা দিয়ে চিঁড়ে মেখে, ভেজা চিঁড়ে খেতে লাগল সপ, সপ, সঙ্গে পাটালির টাকনা। ছইয়ের ভেতর থেকে বউমাঠাকরুণ আর মণিমাসি, ভরতকাকার খাওয়া দেখছিল।

মণিমাসি বললেন, “মানুষটা খুব ভাল, না রে দিদি? তোকে খুব ভালোও বাসে”

বোনের শাড়ির আঁচল থেকে মুড়ি আর মুড়কি তুলে খেতে খেতে, আনমনে বউমাঠাকরুণ বললেন, “আমরা যাতে ভালো থাকি, তার জন্যে এই মানুষগুলো সারাদিন খেটে মরে। কিন্তু আমাদের ধর্মে নাকি আছে এরা অচ্ছ্যুত, ছোঁয়া অব্দি যাবে না। আগের জন্মের পাপে নাকি ওরা নীচু জাত, আর পুণ্যের ফলে আমরা বামুন। তোর জামাইবাবুর মা খুব কড়া, এতটুকুও বেচাল হতে দেন না। চিঁড়ে দিতে গিয়ে, এই যে আমি কাকার গামছাটা দুবার ছুঁয়ে ফেলেছিলাম; উনি দেখলে কুরুক্ষেত্রে বাধাতেন, আমারও, ভরতকাকারও। আমাকে এই অবেলায় চান করাতেন কিন্তু আমি জানি এমন মানুষ, আমাদের বামুন জাতেও খুব কম আছে। পুজো পালায় পায়ের সামনে মাটি ছুঁয়ে, আমায় যখন প্রণাম করে, এত খারাপ লাগে; মনে হয়, এটাই পাপ। বাবার বয়সি একজন মানুষ, আমি বামুনের মেয়ে কিংবা বউ বলেই, মেয়ের বয়সি আমাকে প্রণাম করবে? ঘোমটার আড়ালে মুখ ঢেকে, আমিও মনে মনে প্রণাম করি; বলি হে ঠাকুর, হে নারায়ণ, এমন নিয়ম তুমি বানিয়েছ? বিশ্বাস হয় না। কে জানে তোমার কেমন বিধান?”

দিদির কথায় মণিমাসিও দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তারপর চুপ করে দেখতে লাগল, শীতের হাওয়ায় ঝরে পড়তে থাকা অশথের শুকনো পাতা। বলদদুটো তখন খড়ের বাণ্ডিল শেষ করে, আশেপাশের ঘাস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছিল, তাদের চলাফেরায়, তাদের গলায় বাঁধা ঘন্টিতে আওয়াজ উঠছিল, লিটিং লিং লিটিং লিং টিংলি টিং

  

মাঝেরগাঁ থেকে বাঁক নিয়ে, ক্যানেলের বাঁধ পার করে বড় রাস্তা সোজা চলে গেছে মালম্বার দিকে, মালম্বা পার হয়েও কোথায় চলে গেছে... সে পথের শেষ নেই পথ কোথাও যায় না, হাত পা ছড়িয়ে অলস শুয়ে থাকে দিগন্ত থেকে দিগন্তে।  পথ চলে মানুষ, পথের ধারে ধারে গড়ে তোলে তার নানান গন্তব্যবড়দাঠাকুরদের গাড়ি ওদিকে যাবে না, ক্যানেলের বাঁধ পার করে, বাঁদিকে গড়ানে মেঠো রাস্তা নেমে গেছে ক্যানেলের ডানদিক দিয়ে। সেই গড়ানে রাস্তায় হুড়হুড়িয়ে নেমে এলো গাড়িটা। স্কুলের টিফিনে ছুটি পাওয়া কিছু ডেঁপো ছেলের দল, এই ক্যানেলের বাঁধে বসে আড্ডা দেয়, গুরুজনদের লুকিয়ে বিড়ি টানে। তাদের মধ্যে একজন চিনতে পেরেছে, বড়দাঠাকুরকে। সে চেঁচিয়ে উঠল,  ‘ন’জামাইবাবু? নদিদিরা এসেচে, বুঝি?’

বড়দাঠাকুর মুখ তুলে তাকালেন, মুখটা চেনা চেনা লাগল, কিন্তু নাম মনে করতে পারলেন না। ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। কিছু বললেন না। বিয়ের দিন আর তারপরে মোট বার তিনেক এই গ্রামে তিনি এসেছেন, তাঁর পক্ষে সবার নাম মনে রাখা সম্ভব নয়, কিন্তু এ গ্রামের জামাই হিসেবে, তাঁকে অনেকেই চেনে

ছইয়ের পিছনের পর্দা সরিয়ে, ভেতর থেকে বউমাঠাকরুন বললেন, ‘অ্যাই চিন্টু, স্কুল পালিয়ে এখানে বিড়ি টানতে এসেচিস, না? দাঁড়া হারুকাকে বলচি’

‘অ্যাই ন’দি, বাবাকে বলো না। বাবা শুনলে আর আস্ত রাখবে না আমাকে’

বউমাঠাকরুন আর মণিদিদিমণি মুখ টিপে হাসলেন একটু। বউমা নিজের গ্রামে ফিরে আসছেন। এই গ্রামেই তাঁর জন্ম, তাঁর শৈশবের, বাল্যের নানান দৌরাত্ম্যের অনেক সাক্ষী এই গ্রামের পথঘাট, গাছপালা, মাঠ প্রান্তর। মুখের থেকে সরে গিয়ে, তাঁর ঘোমটা এখন ভেঙে পড়েছে খোঁপার ওপর। শ্বশুরবাড়ির বড়ো বৌমা এবং দুই পুত্রসন্তানের জননী হিসেবে তাঁর শরীরী গাম্ভীর্য এতক্ষণে ঝরতে শুরু করেছে  তিনি এখন বাপ-মায়ের আদরের কন্যা তাঁর আনন্দময় মুখে নিরুদ্বেগ হাসি, তাঁর চোখের দৃষ্টিতে কৈশোরের চঞ্চলতা।

“চিন্টু, সাইকেল এনেছিস? একখুনি দৌড়ে যা, গিয়ে মা আর দাদাকে বল, জামাইবাবু এসে গেছে”

“এই যাচ্ছি ন’দি, তুমি ভেবো না”দাঁড় করানো সাইকেলটাকে টেনে ঘোরাতে ঘোরাতে উত্তর দিল চিন্টু। তারপর বাঁ হাতে সাইকেলের রড ধরে ঝুলতে ঝুলতে, হাফ প্যাডেলে সাইকেল চালিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল গাঁয়ের দিকে।            

এখান থেকে গ্রাম খুব দূর নয়, খুব জোর মাইলখানেক হবে। পর্দা খোলা ছইয়ের ভেতরে বসে বউমাঠাকরুন তাকিয়ে রইলেন পিছিয়ে যেতে থাকা রাস্তা, ঘাট, ক্যানেলের পাড়, মাঠ প্রান্তরের দিকে পথের ধারের বাবলা গাছ। হাওয়ায় উড়তে থাকা বাবুইয়ের খালি বাসা। শ্বশুরবাড়ির কড়া নিয়ম শৃঙ্খলা, ঘোমটা, পর্দার আড়াল থেকে মুক্ত হয়ে, শৈশবের এই গ্রামে অনেকদিন পর ফিরে এসে, তিনি যেন আবেগে ডুবে গেলেন। কোলে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা পুত্রের মুখের দিকে তাকিয়ে, তার মুখের ওপর তিনি শাড়ির আঁচল ঢেকে দিলেন, গাড়ির নিকে বড্ডো ধুলো। তারপর আবার তাকিয়ে রইলেন, রাস্তার দিকে।   

নিজের গ্রামের তুলনায় অনেক সম্পন্ন এই গ্রামটি বড়দাঠাকুর বেশ উপভোগ করেন। এই গ্রামে ছেলে মেয়েদের আলাদা আলাদা হাইস্কুল আছে। স্কুলের সামনে খেলার মাঠ আছে। একটা হেলথ সেন্টার আছে। গ্রামীণ ব্যাংকর একটি শাখাও খুলেছে সদ্য। এই গ্রামে ডাকঘর আছে। শোনা যাচ্ছে মেমারি আর বর্ধমান থেকে দুটো বাস রুট চালু হয়ে যাবে খুব শিগ্‌গিরি। বাস চালু হয়ে গেলে বর্ধমান, এমনকি কলকাতাও চলে আসবে হাতের কাছেই।

কলকাতার কথা মনে পড়তে, তিনি কোলের কাছে জড়সড়ো বসে থাকা বড় ছেলে হীরুর দিকে তাকালেন। একমাথা কালো চুলের ওপর লালচে ধুলোর হালকা আস্তর। চুলে হাত বুলিয়ে দিতে, বাবার দিকে তাকাল হীরু। বড়ো বড়ো চোখের দিকে তাকিয়ে বড়দাঠাকুর বললেন, “কলকাতা যাবি, হীরু”?

মস্ত ঘাড় হেলিয়ে হীরু বলল, “হ্যাঁ। কবে যাব, বাবা?”

বড়দাঠাকুর কোন উত্তর দিলেন না, পুত্রের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “খুব তাড়াতাড়ি, দেখা যাক।”

হীরুর আরও অনেক প্রশ্ন ছিল, সে সব ঢাকা পড়ে গেল, তার দুই মাসির আনন্দ চিৎকারে, “ওই তো, ন’দিদি আর জামাইবাবুর গাড়ি”

চিন্টুর কাছে খবর পেয়ে, বৌমাঠাকরুনের ছোট দুই বোন বাড়ি থেকে একটু এগিয়ে, মন্দিরতলায় এসে দাঁড়িয়েছিল। সেখানেই গাড়ি দাঁড় করাতে হল, বোনেরা শুনল না, নদির ছোটছেলে পান্নাকে তারা দেখেইনি। মণিদিদিও নেমে এল ছইয়ের ভেতর থেকে। সুভোদিদি পান্নাকে কোলে নিতেই, পান্না ঘুম ভাঙা অবাক চোখে দেখতে লাগল নতুন সেই মুখ। ওদের নামিয়ে দিয়ে বৌমাঠাকরুন, বড়দাঠাকুর আর হীরুকে নিয়ে গাড়ি এগিয়ে চলল, বাড়ির দিকে।

পান্নাকে কোলে নিয়ে সুভোমাসি হাঁটতে হাঁটতে বলল, “ও মা, ন’দির এ ছেলেটা কি ভালো রে! অচেনা কোলে এসেও একটু কাঁদে না! এ বাবা, আঙুলে কী হয়েছে, ন্যাকড়া বাঁধা কেন? এইটুকু কচি ছেলের আঙুল কাটল কী করে?”

নদিদির কাছে যেমন শুনেছিল মণিদিদি বলল, “ন’দি, ছেলে কোলে নিয়ে কুটনো কাটছিল, বাঁহাত বাড়িয়ে পান্না খামচে ধরেছিল বঁটির পাত। কচি আঙুল কেটে নাকি রক্তারক্তি ব্যাপার। ওষুধ দিয়ে শাড়ির পাড় বেঁধে রক্ত বন্ধ করতে হয়েছিল।

শ্বশুরবাড়ির সদরদুয়োরে গাড়ি এসে যখন দাঁড়াল, তখন বেলা হয়েছে বেশ। বড়দাঠাকুর বাঁ হাতের কব্জি ঘড়িতে দেখলেন, বেলা প্রায় পৌনে দুটো। শীতের দুপুর দেখ না দেখ শেষ হয়ে বিকেল হয়ে যাবে। বাড়ির সকলেই সদরে এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মায়ের হাতে বরণডালা, বড়বৌদির হাতে শাঁখ। গাড়ি থামতেই উলুধ্বনি দিয়ে উঠল সমবেত মেয়েরা। গাড়ি থেকে নেমে, বড়দাঠাকুর হীরুর হাত ধরে, পাশে বৌমাঠাকরুনকে নিয়ে সদর দরজার সামনে দাঁড়ালেন। বরণ করতে করতে, উলু থামিয়ে, বৌমাঠাকরুনের মা বললেন, “পান্না কোথায় গেল, অ্যাই সুভো পান্নাকে সোনার কোলে দে। পান্নাকে নিয়ে সোনা এই প্রথম বাড়ি আসছে! বরণ করতে হবে না?”

মেয়ে-জামাই, নাতিদের নিয়ে বড়মা বাড়ির ভেতরে ঢুকে যাওয়ার পর, সদরের রাস্তাটা একটু ফাঁকা হল। গ্রামের পাড়া-প্রতিবেশীর মেয়েবউরা যাঁরা এসে জমা হয়েছিলেন, তাঁদের কেউ কেউ বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেলেন, কেউ ফিরে গেলেন নিজের নিজের বাড়ি। বৌমাঠাকরুনের বাপের বাড়ির রাখাল, ভুবনমামা এসে দাঁড়িয়েছিল ভরতকাকার পাশে। বিয়ের পর বার তিনেক আসা যাওয়াতে দুজনের বেশ ভালোই ভাবসাব হয়ে উঠেছে। ভিড় কমতে ভুবনমামা আর ভরতকাকা গাড়ি ঘুরিয়ে, হাতে হাতে সব জিনিষপত্র নামিয়ে দিয়ে এল ভেতরবাড়ির দাওয়ায়। তারপর খালি গাড়ি নিয়ে চলল, গোয়াল বাড়ির দিকে। সেখানেই বলদরা বিশ্রাম নেবেগোয়ালে বলদের ব্যবস্থা করে, খামারে গাড়িটা রেখে, ভরতকাকার ছুটি। তারপর ভুবনমামা ভরতকাকাকে নিয়ে পুকুরে স্নান টান সেরে, ফিরে আসবে বৌমাঠাকরুনের বাড়িতে। অনেকটা পথ এসে, সকলেই যেমন ক্লান্ত, তেমনই গন্তব্যে পোঁছে যাওয়াতে সবাই নিশ্চিন্ত। গাড়ির গতিতে এখন আর কোন তাড়া নেই, হেলতে দুলতে চলতে লাগল বলদদুটো। তাদের গলার ঘন্টি বিলম্বিতে বাজতে লাগল, লিটিং লিং লিটিং লিং টিংলি টিং

--০০--

এর পরের পর্ব  - " মুখে নেই রা "    

ব্যাঘ্র যখন ব্যগ্র

 

এর আগের ছোটদের গল্প - " ভূতের মুখে রামনাম "



 তখন আমি তোমাদের মতোই ছোট্ট – সবুজ হাফপ্যান্ট আর হলুদ হাফহাতা জামা গায়ে দিই। ওই প্যাণ্ট আর জামা আমার ভীষণ প্রিয়, আমার রাঙা মাসীমা দিয়েছিলেন আমার দশবছরের জন্মদিনে। আর শীতকালে গায়ে থাকত লাল টুকটুকে ফুলহাতা সোয়েটার এটাও আমার ভীষণ প্রিয়, দিয়েছিল আমার মেজ পিসীমা। ক্লাসে আমি তখন তিন-চারটে নলওয়ালা চৌবাচ্চার জলে হাবুডুবু খাই। পিতা আর পুত্রের বয়েস গুলিয়ে পুত্রের থেকে পিতার বয়েস কম হিসাব করি। আর যে কোন সরল অঙ্কের  অতি চমকদার সমাধান বের করে অংকের মাষ্টারমশাইয়ের কানমলা খাই।  কানমলা খাওয়ার কথায় মনে পড়ল, সেকালে আমাদের কানদুটো অধিকাংশ সময়েই গুরুজনদের হাতেই ধরা থাকত। আমাদের দুষ্টুমিও যেমন সারাদিন চলত, তেমনি কানমলাও চলত সমানুপাতিক হারে। আমাদের সেই সব দুষ্টুমির গল্প বলতে শুরু করলে, তোমাদের হাতপা নিসপিস করবে দুষ্টুমি করার জন্যে, আর তোমাদের গুরুজনদের হাত নির্ঘাৎ নিসপিস করে উঠবে, তোমাদের কানমলা দেবার জন্যে

 

আমাদের অ্যানুয়াল পরীক্ষা হত শীতকালে। পরীক্ষার পর কনকনে সেই শীতের দিনগুলোতেই আমাদের ছোটখাটো মফস্বল শহরে জড়ো হত, দেদার মজার ব্যাপার-স্যাপার। আর তার মধ্যে সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিল সার্কাস। আমাদের কলেজ মাঠে বড়োদিনের কাছাকাছি এসে তাঁবু গাড়ত সার্কাসের দল। কোন এক রবিবারের দুপুরবেলা, মায়ের রান্না করা গরমমশলা দেওয়া কাঁকড়া-ফুলকপি-আলুর, আহা সে কী স্বাদ ঝোল দিয়ে মেখে একপেট ভাত। তার সঙ্গে খেজুর-আমসত্ত্ব-টোম্যাটোর চাটনি খেয়ে, আমরা দশবারো জন ভাইবোন সার্কাস দেখতে যেতাম। নানান বয়েসের ভাইপো-ভাইঝিদের নিয়ে আমাদের সঙ্গে যেতেন আমাদের ন’কাকা আর ছোটকাকা। সেদিন আমাদের সার্কাসের মজার সঙ্গে সঙ্গে মাথায় ঠকাঠক গাঁট্টা এবং কানমলাও জুটত বিস্তর।

আমাদের কাছে সার্কাস দেখার এই মজা তো ছিলই, তার থেকেও মজা ছিল সার্কাসের তাঁবুতে হানা দেওয়া। সার্কাসের দল বড়ো বড়ো গাড়ি নিয়ে শহরে আসার পরেও, সব যোগাড় যন্ত্র করে, তাঁবু খাটিয়ে গুছিয়ে বসতে বসতে দিন সাত দশ লেগেই যেত। আর সেই সময়টাতেই আমাদের কয়েকজন বন্ধুর বেজায় উৎসাহ বেড়ে উঠত। আমরা জলখাবার খেয়েই হাজির হতাম কলেজ মাঠের ধারে। সেখানে একধারে তখন বিশাল বিশাল কাঠের বল্লা আর রশা-রশি নিয়ে তাঁবু খাটানোর খুব তোড়জোড় অন্য দিকে সারি সারি খাঁচার মধ্যে বাঘ, ভালুক, হাতি, সিংহ, বাঁদর, কাকাতুয়া, কুকুর। আবার আরেকদিকে সারি সারি তাঁবুর মধ্যে সার্কাসের কসরত দেখানোর লোকজন থাকত। সেইসব তাঁবুর কাছাকাছি যেতে দেখলেই সার্কাসের লোকেরা আমাদের তাড়িয়ে দিত। বলত, “খোকারা, এখানে কী চাই? এখন নয়, এখন নয়, সার্কাস শুরু হলে, বাবা-কাকাদের সঙ্গে আসবে। যাও, যাও, এখন একদম ঘুরঘুর করবে না”

দুতিন দিন কিছুতেই সুবিধে করতে পারলাম না। শেষ অব্দি সার্কাসের দলেরই একজন ছোট্ট ছেলের সঙ্গে আমাদের আলাপ হল। তার নাম মুরুগান। আমাদের বয়সি হবে, সার্কাসের লোকেদের নানান ফাইফরমাস খাটে, আমাদের পাড়ার দোকান থেকে এটা সেটা জিনিষ কিনে নিয়ে যায়। দেখেই বোঝা যায় খুব গরিবের ছেলে। তার ভালো জামাপ্যান্টও ছিল না, কনকনে ডিসেম্বরের সকালেও তার সোয়েটার জুটত না। আমাদের সঙ্গে, বিশেষ করে আমার সঙ্গে তার বেজায় ভাব হয়ে গেল। একদিন মুরুগান সকাল সকাল বাজার করে ফিরছিল। আমি তাকে পাকড়াও করে, আমার জামা আর সোয়েটারটা জোর করে তাকে পরিয়ে দিলাম। আর তার জামাটা গায়ে চাপিয়ে, তার বাজারে ভরা থলেটা নিয়ে হাঁটা দিলাম সার্কাসের তাঁবুতে। যাবার সময় অবশ্য একপ্লেট ঘুগনি আর একটা পাঁউরুটি কিনে গণেশদার দোকানে তাকে বসিয়ে রেখে বললাম, “তুই এগুলো খা, আমি যাবো আর আসবো”

কোনদিন ভেতরে না ঢুকলেও, কদিন আশেপাশে ঘুরঘুর করার জন্যে কোনদিকে কী আছে, সেটা মোটামুটি জানাই ছিল। ওদের রান্নার জায়গাতে বাজারের থলেটা ঝুপ করে রেখে দিয়েই, আমি খাঁচাগুলোর দিকে দৌড় লাগালাম। বললে বিশ্বাস করবে না, জ্যান্ত বাঘ-সিংহ-ভালুকের এত কাছাকাছি, আমি কোনদিন যাইনি। আমার আর ওদের মধ্যে সামান্যই তফাৎ। একখানা গরাদ দেওয়া খাঁচার দেওয়াল! সিংহ আর ভালুকটা আমাকে মানুষ বলে গণ্যই করল না, আর কোন পাত্তাও দিল না। বাঘটা আমাকে দেখে বিশাল একটা হাঁই তুলল, নাকি মুখ ভেঙাল, ঠিক বুঝলাম না। তবে সে সারাক্ষণ আমার দিকেই তাকিয়ে হ্যা হ্যা করতে লাগল। বড়ো খাঁচাগুলো পার হয়ে অনেকগুলো ছোটছোট খাঁচা। কোনটায় সাদা ধবধবে কাকাতুয়া, সবুজ চন্দনা, টিয়া, একটু বড়ো সাইজের খাঁচায় দুটো বাঁদর। এসব পেরিয়ে দুটো হাতিও দেখলাম। মাটিতে পোঁতা লোহার গোঁজের সঙ্গে মোটা শেকল দিয়ে বাঁধা। তারা এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে খালি দুলছিল, আর শুঁড় নাড়ছিল। তাদের নড়াচড়ায় শিকলে আওয়াজ উঠছিল ঝমঝম করে। হাতিরা আমাকে দেখে, তাদের শুঁড় বাড়িয়েছিল। আমি কিন্তু ঘাবড়ে একটু দূরে সরে এসেছিলাম। অবাক হয়ে হাতিদের যখন মন দিয়ে দেখছি, সেই সময় আমার কানে এল, কেউ যেন বলছে, “আমি ব্যগ্র, আমি ব্যগ্র”আশে পাশে কাউকে দেখতে পেলাম না, কিন্তু পিছন ফিরেই আমি আঁতকে উঠলাম। সর্বনাশ, এ যে বাঘ! মনে হয় খাঁচা খোলা পেয়ে বেরিয়ে এসেছে, আর এসে দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক আমার পিছনেই!

ভয় পেলেও আমার একটা জিনিষ মনে হল, বাঘ কি কথা বলতে পারে? আর বাঘও কী আমাদের মতোই বাঙালী, যে বাংলায় কথা কয়? তবে দুটোর কোনটাই খুব অসম্ভব মনে হল না, কারণ ঠাকুমার কাছে পঞ্চতন্ত্রের অনেক গল্পেই শুনেছি বাঘ-ভালুকেরা দিব্যি কথা বলে। বরং অনেক মানুষের থেকেও ভালো বলে রাস্তায় ঘাটে হাটুরে বাটুরে লোকেরা যে ভাষায় কথা বলে, তাদের তুলনায় যথেষ্ট ভালো বাংলা বলে, আর সুন্দর সুন্দর উপদেশও দেয়। এই সব কথা মনে হওয়াতে মনে একটু সাহস হল, বললাম,

‘আপনি ব্যগ্র নন, ব্যাঘ্র’আমার কথায় বাঘটা বলল,

‘মোটেই না, ছোটবেলা থেকেই ব্যা ব্যা শুনে, ব্যা ব্যা খেয়ে আমরা grow করেছি, তাই আমরা ব্যাগ্র’আমি অবাক হয়ে বললাম,

‘ব্যাকরণ তো শুনতে হয়, পড়তে হয়। ব্যাকরণ আবার খাওয়াও যায় নাকি?’

‘তুমি বেশ বোকা আর বুদ্ধু বাচ্চা তো, ছাগলের দল ব্যা-ব্যা করলে, আমরা শুনি। আর তোমার মা আলু দিয়ে তাকে ঝোল বানিয়ে দিলে, রোববারে ভাত মেখে খাও না বুঝি?’ এবার আমি বুঝতে পারলাম, কিন্তু আমায় বোকা বলাতে আমি বেশ একটু রেগেই গিয়েছিলাম, আমি বিরক্ত হয়ে বললাম,

‘তাহলে, ব্যাঘ্র কথাটা কী ভুল’?

‘না, না। ওটাও ঠিক। ব্যা ব্যা খায়, কিন্তু ঘ্রাও ঘ্রাও ডাকে। তাই আমাদের ব্যাঘ্রও বলা যায়’

‘বাঘেরা সবাই খাঁচায় বন্দী, কিন্তু আপনি খাঁচায় না থেকে বাইরে কেন’?

‘যে বাগকে বাগে আনতে পারে, তাকে খাঁচায় পুরে দেয়। আমাকে বাগে আনতে পারেনি, কিনা? যেমন তোমাকেও তোমার বাড়ির লোকেরা, এমনকি এই সার্কাসের লোকেরাও বাগে আনতে পারেনি! তুমি ঠিক লুকিয়ে তাঁবুতে ঢুকে পড়েছ, সে রকম আর কী’! আমি একটু লজ্জা পেলাম, বললাম,

‘বারে, আমি তো দেখতে এসেছি। খাঁচার মধ্যে সিংহ, বাঘ কেমন থাকে’

‘আমিও তো তোমাকে দেখে খেতে এসেছি। বাচ্চা ছেলে কেমন খেতে’

‘সার্কাস থেকে তোমাকে খেতে দেয় না?’

‘দেয় বৈকি। রোজই কুমড়ো-পুঁইশাকের চচ্চড়ি, বাঁধাকপি-আলুর ঘ্যাঁট, ভাত আর ডাল। এমন খেলে আমাকেও ব্যা ব্যা করতে হবে। কোনদিন আর ঘ্রাও করতে পারবো বলে, তোমার মনে হয়’?

‘তা ঠিক। কিন্তু এই সার্কাসে আরো তো লোক রয়েছে, তাদের ছেড়ে আমাকে কেন’

‘বারে, তাও বুঝি জানো না? আমাদের দেখার জন্যে, তুমিই তো সব থেকে ব্যগ্র’

 

এই কথা  বলে, ব্যগ্রটা পা ভাঁজ করে, বাবু হয়ে ঘাসের উপর বসে পড়ল। বাঘকে এমন অদ্ভূতভাবে মানুষের মতো গুছিয়ে বসতে, আমি কোনদিন দেখিনি, এমনকি ছবিতেও দেখিনি। বসতে বসতে ব্যগ্র বলল,

‘না বাপু, চার পায়ে দাঁড়িয়ে তোমার সঙ্গে আর বকবক করতে পারিনা। এবার একটু বসি। তোমাকে খাবার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল, কিন্তু সে এখন আর হচ্ছে না’আমি বললাম,

‘কেন’?

‘ধুর ধুর, তুমি একদম অখাদ্য! তোমার রোগাভোগা চেহারা, গায়ে মাংসের ছিটেফোঁটা, সবটাই হাড়’

হাতের মাস্‌ল্‌ ফুলিয়ে আমি বললাম,

‘কে বলেছে আমার গায়ে মাংস নেই? এই তো দেখুন অনেক মাংস’!

   ‘ওটুকু মাংস আবার মাংস নাকি? ওতো আমার দাঁতের ফাঁকেই আটকে থাকবে, পেট পর্যন্ত আর পৌঁছোবে না’

‘ঠিক আছে ঠিক আছে। খান বা না খান সে আপনার ইচ্ছে। কিন্তু আমাকে অখাদ্য বলবেন না, আমার ছোটকা শুনলে...’

‘বলো কী? তার মানে তোমার ছোটকাও তোমাকে খাওয়ার চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু এদান্তিতে তিনিও তোমাকে অখাদ্যই বলেন, নাকি’! আমি ক্ষুণ্ণ মনে উত্তর দিলাম,  

‘বলেই তো, খুব বলে আর কানও মলে দেয়’

‘সে কি? এ তো ভারি অন্যায়। অখাদ্যও বলবে, আবার কানও মলে দেবে, এ তো ঠিক নয়। তা তোমার ছোটকা তোমার কান মলে দেন কেন? তুমি খুব দুষ্টুমি করো বুঝি’

‘তা একটু করি, তবে সে তেমন কিছু নয়’

‘আচ্ছা? তা তেমন কিছু নয়, এমন কিছু দুষ্টুমির দুএকটা নমুনা শোনাও দেখি, শুনি’

‘আমার বোনের একটা পুতুল ছিল, সেটাকে শুইয়ে দিলেই বড্ডো চোখ পিটপিট করতো?’

‘ভালোই তো, সুন্দর পুতুল’

‘না, না। চোখ পিটপিট করা মোটেই ভালো কথা নয়। আমি সন্ধ্যেবেলা পড়তে বসলেই ঘুমে চোখ পিটপিট করি বলে, মা খুব বকে’

‘অ, তাই বুঝি?’

‘হ্যাঁ, আর ছোটকার খুব প্রিয় একটা ফাউন্টেন পেন ছিল, সেটায় কখনও আমাকে হাত দিতে দিত না’

‘হাত দিতে দেয়নি, ঠিকই তো করেছে। তোমাকে দিলেই তো পেনটা খারাপ করে ফেলতে’

‘মোটেও ঠিক করেনি। যে কোন জিনিষ সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে হয়, বাবা বলেছে’

‘ও বাবা, বাবা তাই বলেছে?’

‘হ্যাঁ। ছোটকার পেনের নিবের খোঁচা দিয়ে বোনের পুতুলের চোখটাকে আমি ঠিক করার অনেক চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু হল না, বোনের পুতুলটাও গেল, আর ছোটকার পেনের নিবটাও বেঁকে বঁড়শি হয়ে গেল’

‘বোঝো। তখন কী করলে’?

‘কী আবার করবো? চিলেকোঠার ঘরে দুটোকেই লুকিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু বাড়ির লোক ঠিক খুঁজে পেয়ে গেল, আর কী করে যেন বুঝেও গেল, ওটা আমারই কীর্তি। তারপর আর কি? আমার জুটল, অনেক কিল, কানমলা আর গাঁট্টা। আর বোন পেয়ে গেল নতুন আরেকটা পুতুল আর ছোটকা নতুন ফাউন্টেন পেন! আমি নষ্ট করেছিলাম বলেই তো নতুন জিনিষগুলো পেল, সে কথাটা কেউ মনেও রাখল না’

শেষ কথাগুলো বলতে কষ্টে আমার গলাটা ধরে এল। সেই শুনে ব্যগ্র সহানুভূতি মাখানো গলায় বলল,

‘ইস, সত্যিই তো! ওরা পেলো নতুন পুতুল আর পেন, আর তুমি পেলে সেই পুরোনো একঘেয়ে কানমলা। তা এমন দুষ্টুমি কি আরও আছে, নাকি?’ আমি বেশ গর্বের সঙ্গে বললাম,

‘আছে বৈকি! সে সব তেমন কিছু নয়! আমার বড়দি স্কুলে গিয়ে ফুচকা, আচার, হজমিগুলি খাবে বলে, পয়সা সরিয়ে বুকশেলফের তাকে, বইয়ের পিছনে লুকিয়ে পয়সা জমাত। আর কেউ না জানলেও আমি জানতাম। দশপয়সা, সিকিটা, আধুলিটা এরকম আর কি? একদিন শুনলাম, কী একটা বাজে খরচের কথায়, বাবা মাকে বলছে, “আমার কি টাকার গাছ আছে নাকি, যে যাবো আর পাতা ছিঁড়ে টাকা করে নিয়ে আসবো’? এই কথা শুনে আমি বুঝলাম, টাকারও গাছ হয়। এবং আমাদের এমন একটা গাছ হলে, সকলেরই ভালোই হবে। আমাদের বাড়ির পিছনে বেশ কিছুটা জমি তখন খালিই পড়ে ছিল, ঠিক করলাম, ওখানেই চার/পাঁচটা গাছ লাগাবো, তাতে মায়ের হাত খরচের টাকার কিংবা বড়দির ফুচকা খাওয়ার পয়সার অভাব হবে না! বড়দির বইয়ের আড়াল থেকে সব পয়সা সরিয়ে নিয়ে, একদিন নির্জন দুপুরে, সব কটা পয়সা জমিতে পুঁতে দিলামবেশ কদিন ধরে রোজ দুবেলা জলও দিতাম। এর কদিন পর আমাদের মালি রামসুভগকাকা, তার দেশ থেকে ফিরে এল। পিছনের জমিতে ঢ্যাঁড়সের বীজ বুনতে গিয়ে, সেই মাটি খুঁড়ে সব পয়সা পেয়ে, তার সে কী আনন্দ! একমুঠো কাদামাখা পয়সা হাতে নিয়ে, রামসুভগকাকা মায়ের সামনে গিয়ে বলল, “মাইজি, মাইজি, হনুমানজিকা কিরিপাসে হামকো খাজানা মিল গয়ি।” তার এই কথায় সারা বাড়ি জুড়ে হৈচৈ পড়ে গেল, আর আমার কপালে জুটল সেই গাঁট্টা আর কানমলা’

‘হুঁম, টাকার গাছ হলে, সবার সমস্যা যে মিটে যেত, তোমার এই সুবুদ্ধিটা কেউ বুঝতেই পারল না? কী জানো, ছোটরা ছোট্টতো, তাই তারা ভেতরের খবর অনেক কিছু জানে। আর বড়োরা যত বই পড়ে, তত মুখ্যু হয়, আর ছোটদের কান মলে বেজায় মাতব্বরি করে।’

এরপর বাঘটা দু পায়ে সোজা উঠে দাঁড়ালো। আমার হাত ধরে বলল,

‘চলো, সার্কাসে সবার সঙ্গে তোমার আলাপ করিয়ে দিই। আমাকে ভয় পেও না, আমি একজন জোকার। বাঘের পোশাক পরে ছোটদের নানান মজা দেখাই। এখন আমাদের সঙ্গে একটু মজা করে নাও। এখানে এসেছ জানলে, বাড়ি ফিরে রোজকার মতো তোমার কানমলা আর গাঁট্টা না হয় পাওনা থাকুক’

-০০-

এর পরের ছোটদের গল্প - " মায়া

গল্পটি আমার "এক কুড়ি কিশোর" গ্রন্থে সংকলিত। 

নতুন পোস্টগুলি

নামকরণ

     এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২   "        শাশুড়িমায়ের জিম্মায় ফুটকিকে রেখে বিজলি আজই স্কুলে জয়েন করলেন। মাসখানেকের...