শুক্রবার, ১ আগস্ট, ২০২৫

সুরক্ষিতা পর্ব - ১০

 এই উপন্যাসের আগের পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ৯



১০


স্কুলে তাঁর কাজের চাপ বাড়ছে। তিনি এখন অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড মিসট্রেস। মাস ছয়েক পরে এখন যিনি হেডমিস্ট্রেস, কণিকাদি, রিটায়ার করবেন। খুব চান্স আছে, কণিকাদির পর শুভময়ীদেবীর হেডমিস্ট্রেস হওয়ার। সেক্ষেত্রে কাজের প্রেসার আরো বাড়বে, বাড়বে দায়িত্ব। বেড়ে যাবে এডুকেশান বোর্ড, কাউন্সিল, স্কুল কমিটির মিটিং সামলানোর টেনসান। এরই মাঝে বেশ কিছুদিন ধরেই একটা কথা শুভময়ীদেবীর বারবার মনে আসছে, বিরক্তিকর মাছির মতো, তাড়িয়ে দিলেও বারবার যেমন ফিরে আসে। কথাটা হল, বিট্টুর কি হবে? কতদিন, আর কতদিন সম্ভব এভাবে বিট্টুকে সামলে চলা এবং তার সঠিক দেখভাল করা? 

বিট্টুর বয়েস বাড়ছে প্রকৃতির সমস্ত নিয়ম মেনেই। আজ সে তার বয়েস প্রায় পনের। তার শরীরে এখন নবীন যৌবনের সূচনা। তার গালে নরম দাড়ি, নাকের নীচে চিকন গোঁফের উন্মেষ। দিন পনের-কুড়ি অন্তর তার মাথার চুলের সঙ্গে তার গোঁফ-দাড়ি বাড়িতেই ছেঁটে দেন শুভময়ী দেবী। এই বয়সের সুস্থ ও স্বাভাবিক ছেলেরা লেখাপড়া, বন্ধু-বান্ধবী, খেলাধুলো, সিনেমা, গান, ফাজলামি নিয়ে চঞ্চল থাকে। বিট্টুর কোন কাজ নেই, বাইরের জগৎ থেকে সে বিচ্ছিন্ন, অচঞ্চল নিয়ন্ত্রণহীন আলাদা এক সত্ত্বা। অথচ নিষ্ঠুর নিষ্ঠার সঙ্গে প্রকৃতি তার শরীরে, তার মনে সাজিয়ে তুলছে যৌবন, জীবধর্ম মেনে তার শরীরে গড়ে উঠছে নতুন জীবন সৃষ্টির সমস্ত সরঞ্জাম ও আয়োজন! বাড়ছে নিত্যনতুন জটিলতা। সে নিজে বিপন্ন হচ্ছে, বিপন্ন করছে ছবিকে, নিজের পরিবারকে। অসুস্থ হয়ে পড়ছে বারবার। কাজেই বিট্টুর এখন দরকার প্রফেসনাল কেয়ার। 

তাছাড়া আজকাল আরও একটা চিন্তা শুভময়ীদেবীর মগজে বাসা বাঁধছে, সেটা হল তাঁদের, তাঁর আর বিট্টুর বাবার মৃত্যুর পর কী হবে বিট্টুর? হয়তো আজই নয় কিন্তু পাঁচ, দশ, বিশ বছর বাদে, ঠিক কবে তাঁরা চলে যাবেন কে বলতে পারবে? সেদিন কার কাছে, কার ভরসায় রেখে যাবেন বিট্টুকে? আজ পর্যন্ত খুব স্বাভাবিক ভাবেই কোন মিরাক্‌ল্‌ ঘটেনি এবং ঘটার কোন সম্ভাবনাও নেই, যাতে বিট্টু স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে। কাজেই কি হবে ওর ভবিষ্যৎ? 

এইসব চিন্তার মধ্যেই বিট্টুর বাবা ট্রান্সফার হয়ে গেলেন চেন্নাই। কোম্পানীর রিজিওনাল ম্যানেজার হিসেবে তাঁর প্রমোশন হওয়াতে, তাঁকে সমস্ত দক্ষিণ ভারতের ব্যবসা সামলাতে হবে এখন থেকে। শুভময়ীদেবী প্রস্তাব করেছিলেন, প্রমোশন অ্যাক্সেপ্ট না করার জন্য, অন্য কেউ যাক না। এই বয়সে কলকাতা ছেড়ে, অতদূরে যাওয়া, কী এমন জরুরি? বিশেষ করে বিট্টুর এইরকম অবস্থায়? বিট্টুর ভালোমন্দ সমস্ত দায়িত্ব এখন থেকে শুভময়ীদেবীর? কেন, বিট্টুর এই অবস্থার জন্যে কি শুভময়ীদেবী দায়ী? মা হয়ে নিজের সন্তানকে তিনি এইভাবে বড়ো হতে দেখছেন, তাঁর এই যন্ত্রণা ভাগ করে নেওয়ার মতো কেউ থাকবে না তাঁর পাশে? বাবা হিসেবে কোন ফিলিংস যদি নাও থাকে, কর্তব্যবোধটুকুও কিভাবে লোপ পেয়ে যায়? এই সব ভেবে দিশাহারা হয়ে যাচ্ছেন শুভময়ীদেবী। এক এক সময় তাঁর মনে হয়, তাঁর স্বামীর এমন আচরণ, শুধু তাঁকেই শাস্তি দেবার জন্যে। তিনি তাঁর স্বামী ও শাশুড়ির নির্দেশ মতো স্কুলের চাকরি ছেড়ে বিট্টু-অন্ত-প্রাণ মা এবং গৃহবধূ হতে চাননি বলেই আজও এতদিন পরেও, এও একধরনের প্রতিশোধ ছাড়া আর কি হতে পারে!

কোন এক বহুজাতিক সংস্থার কোটি কোটি টাকার ব্যবসাকে আর বেশী বেশী কোটিতে দাঁড় করানোটা কি এতই জরুরি! আর তিনি যে ঘরের অধিকাংশ কাজ সামলেও কয়েক হাজার মেয়েকে বড়ো হতে, মানুষ হতে সাহায্য করে চলেছেন, তার কোন মূল্যই নেই কারো কাছে! আজকাল শুভময়ী দেবী নিজেকে ভীষণ একলা অনুভব করেন। কোন ধরনের অ্যাপ্রিসিয়েসনহীন, কোন প্রত্যাশাহীন এমন একটা দীর্ঘ লড়াই, একদম একা একা লড়ে যেতে, তিনি আর যেন পেরে উঠছেন না। কেউ একজন, যদি কেউ একজন থাকত তাঁর পাশে। যার থেকে কোন সাহায্য না পেলেও, তাঁর কাছে দিনের শেষে অন্ততঃ একবার বসলেও যদি পাওয়া যেত একটু শান্ত অবসর। তাহলেই বেঁচে যেতেন তিনি, ফিরে পেতেন লড়ে চলার নতুন শক্তি।  

তিনি কথাবার্তা বলতে লাগলেন নানান প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। এর আগেও অনেক জায়গা থেকেই তাঁদের কাছে অনেকে এসেছিল। যে ক্লিনিকে বিট্টুর রেগুলার চেকআপ করানো হয়, কোন প্রবলেম হলেই। যেখানে বিট্টুকে নিয়ে দৌড়ে যান ট্রিটমেন্টের জন্যে, তারাও রেফার করেছিল এরকম বেশ কতকগুলি প্রতিষ্ঠানের নাম। তখন আমল দেননি তাঁরা কেউই। মনে হয়েছিল নিজের সন্তান সে যেমনই হোক, তাঁদের কাছেই থাকুক। আজ যতদিন যাচ্ছে শুভময়ীদেবী অসহায় বোধ করছেন, অসম্ভব এক ক্লান্তি তাঁকে ঘিরে থাকছে সারাটাক্ষণ। যে ক্লান্তি থেকে তাঁর আর যেন মুক্তি নেই।

শনিবার, রবিবার, ছুটির দিন করে তিনি একা একাই আজকাল ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। এই প্রতিষ্ঠানগুলি, তাঁর বিতানের মতো ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নিয়ে সারাটা দিন প্রফেসনাল ট্রেনিং দিয়ে চলেছে, ফিজিক্যাল এবং মেন্টাল দুটোই, তার সঙ্গে প্রয়োজনীয় কেয়ার। কেয়ার মানে কিন্তু আদরের প্রশ্রয় নয়। তাঁরা যথাসম্ভব চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এদের মধ্যেও একধরনের আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার। বেশ কয়েকদিন ঘোরাঘুরি করার পর শুভময়ীদেবীর মনে হল, তিনি হয়তো ভুলই করেছেন, বিতানকে আরো আগেই এ ধরনের কোন প্রতিষ্ঠানে দিয়ে দিলে হয়তো ভালই হত। বিতান তার মতো আরো অনেকের সঙ্গে থাকতে থাকতে, এঁনাদের ট্রেনিং পেয়ে সুস্থ নিশ্চয়ই হয়ে উঠত না, কিন্তু এতটা রিপালসিভ না হয়ে, অনেক সোশাল হয়ে উঠতে পারত ওর নিজের মতো করে। হয়ে উঠতে পারত অনেক বেশি কমিউনিকেটিভ। আজকে বিতানকে নিয়ে যে নিত্যনতুন সমস্যা গড়ে উঠছে, হয়তো সেটা এড়ানো যেত। বেশ কয়েকটি জায়গায় ঘোরাঘুরি করে তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রায় মনস্থির করে ফেললেন। পাকা কথা দেবার আগে বিতানের বাবার সঙ্গে কথা বলা জরুরি। এক রবিবার সকালে তিনি ফোন করলেন, “হ্যালো। কেমন আছ, কেমন? শরীর ঠিক আছে তো”?

“হুঁ। ঠিক আছে”।

“খাওয়া দাওয়ার কোন অসুবিধে নেই তো, স্পাইসি ফুড অ্যাভয়েড করবে, পারলে একদম খাবে না, সাবধানে থেক কিন্তু”।         

“ঠিক আছে, ঠিক আছে। কোন অসুবিধে নেই”।

“ওষুধগুলো রেগুলার নিও, ভুলে যেও না।”।

“হুঁ, নোবো”। এত নিরুত্তাপ, সংক্ষিপ্ত জবাবের পর শুভময়ীদেবী আসল কথাটা কিভাবে বলবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। একবারের জন্যেও ওর কি জানার ইচ্ছে হয় না, কিংবা সামান্য কৌতূহলও হয় না, বিট্টু কেমন আছে! আমি কেমন আছি? তবুও বলতে তো তাঁকে হবেই। তিনি খুব দ্বিধার সঙ্গে আবার কথা বললেন, “শুনছ”?

“হুঁ”।

“তোমার “একান্ত সহায়” সোসাইটির কথা মনে আছে? ডাক্তার বাগচি যার কথা বার বার বলতেন”?

“আছে, কেন”?

“তুমি তো জান বিট্টুর কি কি প্রবলেম, ও মাঝে মাঝেই খুব অ্যাগ্রেসিভ হয়ে উঠছে। সামলানো মুশকিল হয়ে যাচ্ছে আমাদের পক্ষে। ভাবছি, “একান্ত সহায়”তে বিট্টুকে এবার অ্যাডমিশন করিয়ে দেব।”।

“ভালোই তো”।

“তুমি কি বলছ, ওখানে দেওয়াটা ঠিক হবে”?

“আমার বলায় কি আসে যায়? যা ভালো বোঝো করো”। ব্যস এইটুকুই, ফোনটা কেটে গেল ওপ্রান্ত থেকে।

একজন পিতা কিভাবে এত শীতল হতে পারে, কিভাবেই বা থাকতে পারে এমন দায়িত্বহীন। শুভময়ীদেবী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন মোবাইলের দিকে। তারপর সিদ্ধান্ত নিলেন নেক্সট মান্থের পয়লা তারিখেই তিনি বিট্টুকে অ্যাডমিশান করিয়ে দেবেন “একান্ত সহায়ে”। 


এই উপন্যাসের পরের পর্ব - " সুরক্ষিতা পর্ব - ১১ " 

বৃহস্পতিবার, ৩১ জুলাই, ২০২৫

মায়া

 

এর আগের ছোটদের গল্প - " ব্যাঘ্র যখন ব্যগ্র "





প্রায় মাস তিনেক হল, আমার বোন ছুটির একটি মেয়ে হয়েছে জেনেও, ওদের বাড়ি যেতে পারিনি। খুবই খারাপ লাগে। কিন্তু কিছু করারও ছিল না। তার কয়েকদিন আগেই মা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তাঁকে নিয়ে হাসপাতাল, ডাক্তার, ওষুধ আর দৌড়োদৌড়িতেই ভীষণ ব্যস্ত ছিলাম। তারপর যা হল, সে তো আরও ভয়ংকর। মা চলেই গেলেন। সে সময়টা যে কী অবস্থার মধ্যে দিয়ে গেছি, ভাবলে এখনও মন খারাপ হয়ে যায়। সব কাজকর্ম, শ্রাদ্ধশান্তি একা হাতেই সামলাতে হল। ওই সময় ছুটি আর আমার ভগ্নীপতি, বিভাস পাশে থাকলে, একটু মনের জোর পেতাম। কিন্তু ছুটির সে সময় আসার উপায় ছিল না। বিভাস একদিন এসেছিল কিন্তু থাকতে পারেনি। সকালে এসে রাত্রের ট্রেনেই ফিরতে হয়েছিল তাকে। ছুটির এই সময়ে, তাকে ছেড়ে বিভাস থাকবেই বা কী করে?

মায়ের অসুস্থতা আর ওই শ্রাদ্ধশান্তির কাজে বেশ কিছুদিন অফিস কামাই হয়েছিল। কাজেই হুট করে আবার ছুটি নিয়ে ছুটির কাছে যাওয়াটা সম্ভব হচ্ছিল না। উপরন্তু পাড়ার বয়স্ক কজন উপদেশ দিলেন, মা হচ্ছেন মহাগুরু। মায়ের মৃত্যু মানে মহাগুরু নিপাত। এই সময় একটু সাবধানে চলাফেরা করা উচিৎ। তাছাড়া এই অবস্থায় সদ্যজাতা শিশুর কাছেও যাওয়াটা নাকি উচিৎ নয়। মন থেকে বিশ্বাস না করলেও, একটু ভয়ই পেয়েছিলাম। সে সময়ের মানসিক দুর্বলতার জন্যেই বোধ হয়, মনে হয়েছিল, আমার বোনের বা তার মেয়ের কোন অমঙ্গল যদি সত্যিসত্যিই ঘটে যায়!

আসলে মা যেদিন মারা গেলেন, তার দশদিন পরেই ছুটির মেয়ে হল। বোনের শাশুড়িমা নাতনীর নাম রেখেছেন, টিপ। টিপের জন্মের সময়ে কিছু জটিলতা হওয়ায়, ছুটিও বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। এখন অনেকটাই সেরে উঠেছে, কিন্তু তাও ট্রেন জার্নির এতটা ধকল নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার মচলন্দনগর থেকে জলপাইগুড়ির মোহিতপুর, আসা যাওয়ার ধকলটাও তো নেহাত কম নয়। তাছাড়া আমার  মা-হারা এই একার সংসারে শিশু মেয়েকে সে সামলাবেই বা কী করে? বিভাসের মা খুবই মমতাময়ী মহিলা, তিনি ছুটিকে নিজের মেয়ের মতোই যত্নআত্তি করেন।

যাই হোক ছুটি আর বিভাসের বারবার ডাকাডাকিতে, আমি শেষ অব্দি ওদের বাড়ি যেতে রাজি হলাম। দিন সাতেকের ছুটি নিয়ে রওনা হলাম জলপাইগুড়ি। পাশের বাড়ির কাকিমাকে চাবি দিতে গিয়েছিলাম, আমি ছুটি নিয়ে ছুটির বাড়ি যাচ্ছি শুনে খুব খুশি হলেন না, বললেন, একটা বছর কাটিয়ে গেলে পারতিস। বললাম, ঘুরেই আসি একবার। ছুটি বড্ডো কান্নাকাটি করছে, বারবার বলছে, দাদা একবারটি আয়।  

 

মোহিতপুর বাসস্ট্যাণ্ডে বিভাস আমার জন্যে সাইকেল নিয়ে অপেক্ষা করছিল। বাস থেকে নেমে, আমার ব্যাগটা হ্যান্ডেলে ঝুলিয়ে বিভাসের পিছনের উঠে বসলাম। বিভাস জিগ্যেস করল, “সাইকেলে যেতে পারবি, নাকি রিকশা করবো”? বিভাস আর আমি কলকাতায় একই কলেজে পড়তাম। খুবই ভালো বন্ধু, তারপর তো ছুটির সঙ্গে ওর বিয়ে হল। আমি একটু হেসে বললাম, “তোর ঘাড়ে চেপে যাওয়ার মজাই আলাদা, সাইকেল ছেড়ে রিকশায় চড়তে যাবো কোন দুঃখে?” কথা না বাড়িয়ে বিভাস সাইকেল চালু করল, আমি জিগ্যেস করলাম, “কাল রাত্রে বলছিলি, টিপের গাটা একটু গরম গরম লাগছে, জ্বর-টর আসেনি তো?”

“নাঃ জ্বর-টর নয়। কিন্তু মেয়েটা কাল প্রায় সারারাতই ঘুমোয়নি। বারবার আমার নয়তো ছুটির ফোনটা হাতে নিয়ে কী যে বলতে চাইছিল বুঝলাম না। একটু হয়তো শুল, আমরাও শুলাম। আধঘন্টা না যেতেই উঠে পড়ে, আমাকে নয় ওর মাকে থাবড়া দিয়ে জাগিয়ে ফোন দেখায়”।

“ফোনে কোন গেম-টেম বা সিনেমা দেখে ভালো লেগেছে হয়তো, বারবার দেখতে চাইছে। আজকাল বাচ্চাদের ফোনের ওপর খুব ঝোঁক”।

“না রে, আমরাও তাই ভেবেছিলাম। খাবার সময় ওকে ভোলানোর জন্যে কয়েকটা গানের ভিডিও দেখান হয়, সেগুলো দেখিয়ে শান্ত করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু দেখেইনি, বরং বিরক্ত হচ্ছিল খুব...অন্য কিছু করতে বলছিল, সেটা কী, বুঝতে বুঝতেই রাত কাবার হয়ে গেল।”

“বাব্বা, একরত্তি মেয়ের এত কৌতূহল?” কিছুক্ষণ আমরা কেউ কথা বললাম না। বিভাস সাইকেল চালাতে লাগল। কেন জানি না আমার মনে হল, বিভাস সাইকেলটা খুব আস্তে চালাচ্ছে, এখনই একদৌড়ে গিয়ে মেয়েটাকে বুকের মধ্যে নিয়ে খুব আদর করতে ইচ্ছে হচ্ছিল। বিভাস বড়ো রাস্তা থেকে বাঁদিকের ছোট ঢালু রাস্তায় নামতে নামতে বলল, “আমার মনে হচ্ছে, তোর আসার অপেক্ষাতেই ও এত ছটফট করছে!”

 “যাঃ। আমাকে তো দেখেইনি। চেনেই না। তাছাড়া তিনমাসের একটা শিশু, মামা কী বস্তু, খায় না মাথায় মাখে বুঝতে পারে নাকি?”

“তা ঠিক। কিন্তু যেদিন থেকে আমাদের এখানে তুই আসছিস, এ কথা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেদিন থেকেই ও যেন খুব চঞ্চল হয়ে উঠেছে”।

“তাই?”

“হুঁ। কাল মনে হয়নি। এখন মনে হচ্ছে, মেয়েটা গতকাল ফোনে হয়তো তোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলছিল। কদ্দূর এলি, ট্রেন লেট কী না, ট্রেনে খাওয়াদাওয়া কী করলি...এসব জানার কৌতূহল হচ্ছিল হয়তো!”

“কী বলছিস? এমন হতে পারে নাকি?”

“জানি না, মনে হল, তাই বললাম। হতেও তো পারে”!

আমারও টিপ বলে ছোট্ট একরত্তি ওই মেয়েটাকে দেখার জন্যে মনটা ভীষণ উদ্গ্রীব হয়ে উঠেছে।

 

কিছুটা দূর থেকেই ওদের দেখতে পেলাম। বিভাসের মা, ছুটি আর ছুটির কোলে ছোট্ট টিপ। গ্রিল-গেটের বাইরেই ওঁরা দাঁড়িয়েছিলেন। বিভাস সাইকেল নিয়ে সামনে দাঁড়াতেই, বিভাসের মা বললেন, “ওফ্‌, মেয়ে বটে; অচেনা অদেখা মামাকে দেখার জন্যে কী ছটফটই না করছে! ঘরে থাকতে দিচ্ছে না”।

ছুটি মিষ্টি হেসে বলল, “আয়। ভাল আছিস, দাদা”?

আমি সাইকেল থেকে নেমে মাসিমা, বিভাসের মাকে প্রণাম করলাম। ছুটির কোল থেকে টিপ হাত বাড়াল আমার কাছে আসবে বলে। ওকে কোলে নিতে ইচ্ছে হচ্ছিল খুব, কিন্তু ভয়ও পাচ্ছিলাম। সারারাতের ট্রেন জার্নি, তারপরে ভোরবেলার বাসে এতটা এলাম! সারা গায়ে – জামাকাপড়ে ধুলোময়লার তো অন্ত নেই। এই অবস্থায় শিশুকে কোলে নেওয়া মোটেই উচিৎ নয়।

আমি টিপকে বললাম, “একটু দাঁড়াও মা, জামাকাপড় ছেড়ে, মুখহাত ধুয়ে তোমায় কোলে নেব। বিচ্ছিরি ধুলো আর নোংরা সারা গায়ে”।

বিভাসের মা বললেন, “ঠিক বলেছ বাবা, আমি বলি কি, গরম জলে চানটাও সেরে নাও, স্বস্তি পাবে। এতটা পথ জার্নি করে এলে। চলো চলো, ঘরে চলো”

আমরা সবাই বাড়িতে ঢুকলাম, বিভাস সাইকেলে আমার ব্যাগটা নিয়ে পেছনে আসতে লাগল।

 

স্নান সেরে এসে পরিষ্কার পাজামা পাঞ্জাবি পরেই আমি ডাক দিলাম, “কই রে, আমার টিপ সোনা কই?” ছুটি টিপকে কোলে নিয়ে সামনে এলো, বলল, “ওফ্‌, মেয়ে সেই থেকে বাথরুমের দরজার দিকে তাকিয়ে আছে...কখন তুই বেরোবি। এ রাম, চুল আঁচড়ালি না?” চুল আঁচড়ানোর কথা আমার মনেই ছিল না, আসলে আমিও টিপকে কোলে নিতে চাইছিলাম, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।

চুলের ওপর হাত বুলিয়ে বললাম, “ঠিক আছে। কে আর দেখবে এখানে, তোরাই তো। এচো, এচো, ছোনা মাটা...” বলে হাত বাড়িয়ে খুব সাবধানে আমি টিপকে কোলে নিলাম। টিপও উদ্গ্রীব ছিল, টুক করে কোলে এসে, আমার গলা জড়িয়ে ধরল। ছুটি হেসে বলল, “বাবাঃ, মায়ের চেয়েও মামা বেশি আদরের...টিপকে নিয়ে তুই বোস, দাদা, আমি তোর জলখাবার আনছি। মা, লুচি আর বেগুন ভাজছেন”।

আমি টিপকে দুহাতে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বললাম, “তাই যা। আমি ততক্ষণ টিপের সঙ্গে একটু ভাব করি”।

টিপকে কোলে নিয়ে আমি বাইরের বারান্দায় এলাম। এতক্ষণ টিপ আমার গলা জড়িয়ে কাঁধে মুখ রেখেছিল, এবার সে গলা ছেড়ে আমার মুখের দিকে তাকাল। তার দু চোখের দিকে তাকিয়ে আমার অদ্ভূত এক অনুভূতি হল। হাল্কা নীলচে সাদা টলটলে চোখের মধ্যে ঘন কালো চোখের তারা, আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। কী দেখছে? কী খুঁজছে আমার মুখে?

“এত দিন লাগল তোর এখানে আসতে? ছুটি পাসনি, না? এমন আর কক্‌খনো করিস না...”।

কে বলল কথাটা? আশেপাশে ঘাড় ঘোরালাম। কেউ কোত্থাও নেই। সামনের ঘাসে আর গাছের ডালে কিছু চড়ুই, শালিক, ঘুঘু আর কাক ওড়াওড়ি করছে। আমার ঘাড় থেকে শিরশিরে একটা অনুভূতি পিঠের দিকে নামতে লাগল। এই কণ্ঠস্বর আমার খুবই পরিচিত। ভীষণ পরিচিত। হাজার লোকের কণ্ঠস্বরের মধ্যেও এই স্বর আমি ঠিক চিনে ফেলতে পারি! আমি টিপের মুখের দিকে আবার তাকালাম। আগের মতোই সে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তার পবিত্র পাতলা রাঙা দুই ঠোঁটে এখন মুচকি হাসি।

“এমন কক্‌খনো করিস না আর, তোকে দেখতে যে, বড্ডো ইচ্ছে করে, বাবা। ছুটি-ছাটা পেলেই চলে আসবি, কেমন?”

আমি তাকিয়ে রইলাম শিশুর চোখের দিকে। টিপ কথাগুলো বলেনি। তাঁর দুই ঠোঁট এতটুকুও নড়েনি। কিন্তু আমার চেতনায় কথাগুলো বেজে উঠল। কীভাবে জানি না। এখন টিপ তার দুই হাত বাড়িয়ে মোচার ছোট্টছোট্ট কলির মতো আঙুলগুলি রাখল আমার গালে, কপালে।

আমার দুই চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে এল, আমি অস্ফুট স্বরে বলে উঠলাম, “মা”!

টিপ ফোকলা মুখে ছোট্ট ছোট্ট হাত চাপা দিয়ে হেসে উঠল খিলখিল করে, অপূর্ব স্বর্গীয় সেই হাসি। আমি বুকের মধ্যে চেপে ধরলাম টিপকে। “চিনতে পেরেছিস তাহলে?” কথাটা স্পষ্ট শুনলাম, আর শুনে আমার দু চোখ ঝাপসা করে নেমে এল অশ্রুধারা!

..০০..

   এর পরের ছোটদের গল্প - " ছোট্ট হওয়া "

বুধবার, ৩০ জুলাই, ২০২৫

ভেন্টিলেশান

 এর আগের বড়োদের গল্প - " বুনো ওল "






[বিছানায় টানটান শুয়ে ঠ্যাং নাচাচ্ছিল পৈলান, পৈলান মণ্ডলঘাড়ের নিচে ভাঁজ করা হাত। বেশ হাল্কাপুল্কা মেজাজ। এখন সবে ভোর। আরেকটু বেলা হলেই লোকজন আসা শুরু হবে। সঠিক কতদিন তা মনে নেই, তবে অনেকদিন কেটে গেল বিছানায় শুয়ে। আজকে একটু বেরোবে ভাবছে। নিঃশব্দে দরজা ঠেলে যে ঢুকল, সে বেঁটেখাটো, লাল্টুস দেখতে একজন। তার নাম হুহু!]

 

হুহুঃ               সুপ্রভাত! আপনার ঘুম ভেঙে গেছে, দেখছি! তাহলে একটু চা দিয়ে যাই, প্রভু’?

পৈলানঃ           সুপ্পোভাত? এখানে গুডমন্নিং বলার রেওয়াজ নেই নাকি হে? তার ওপর আবার পোভু? এমন তো শুনি নাই কভু? হা হা হা হা। বলি যাত্রা-পালা হচ্ছে নাকি বলো তো, পৌরাণিক পালার রিহার্শল করছো? আমি বাপু, ওসব একদম পছন্দ করি না। আমি খাঁটি বাঙালি, বাংলা মায়ের দামাল ছেলে। আমি গুডমন্নিং, স্যার, এই সব শুনতেই অভ্যস্ত। ওই সব আলফাল বকে আমার মেজাজ খিচড়ে দিও না, বুঝলে?

হুহুঃ               আজ্ঞে হ্যাঁ, প্রভু...ইয়ে মানে, স্যার। আর ভুল হবে না। আজ্ঞে, এখানে নতুন নতুন তো, সড়গড় হতে একটু সময় লাগবে বৈকি। তবে স্যার, ওই যে বলছিলাম, চা দেবো, না কফি দেবো, স্যার?

পৈলানঃ           চা-ই দাও। সকাল সকাল কফিটা তেমন জমে না। আমার চাটা কেমন হয় জানো তো? চিনি ছাড়া, হাল্কা লিকার, মিষ্টির বড়ি - দুটো

হুহুঃ               লিকার চায়ে মিষ্টির বড়ি? তাহলে একটা কথা জিগ্যেস করি, স্যার? আপনি লিকার চা কী ভালোবেসে খান? নাকি নাচার হয়ে খান?

পৈলানঃ           চিনি ছাড়া লিকার চা শখ করে, কে খায় চাঁদ? সাড়ে চারশোর ওপর সুগার, তার ওপর বুকজ্বলা অম্বল। বাধ্য হয়ে খাই। তিন চামচ চিনি, ঘন দুধের সর জমে ওঠা চা। তবে না চা খেয়ে আরাম, চা খেয়ে মজা!

হুহুঃ               সে আর বলতে, স্যার? কিন্তু এখানে স্যার নো সুগার, নো অম্বল। এক কাপ নিয়ে আসছি খেয়ে দেখুন, স্যার। এখানকার সুগারে সুগার হয় না। এখানকার চায়ে চাইলেও চোঁয়া ঢেঁকুর কিংবা অম্বল হয় না।

পৈলানঃ        গ্রান্টিক দিচ্ছ? তবে হলেই বা, আমার আর কী হবে? তোমারই ভোগান্তি হবে। ডাক্তারবাবুকে বলে তোমার চাকরিটা খাবো। তেমন তেমন হলে জেলেও ভরে দেব। বিনা বিচারে সতের বছর। আমাকে বিভভান্ত করার চেষ্টা এবং আমাকে হোত্তা করা চক্কান্ত..., এমন কেস খাওয়াবো না, টের পেয়ে যাবে বাছাধন!

হুহুঃ               [হেসে] না স্যার। গ্যারান্টি। একবার তো ট্রাই করে দেখুন। [দরজার দিকে ফিরতে যায়]

পৈলানঃ           ওহে, শোনো হে, শোনো। হন হন করে তো চললে, বলি নামটা কী তোমার? কী বলে ডাকব?

হুহুঃ               হে হে, স্যার। আমার নাম? আমার নাম শুনে হাসবেন, স্যার।

পৈলানঃ            হে হে...  সে না হয় হাসলামই, কিন্তু নামটা কী শুনিই না।

হুহুঃ               হুহু, স্যার। হুহু গন্ধর্ব

পৈলানঃ          [ভুরু কুঁচকে] হুহু? বেশ বেআক্কেলে নামটা তো, হে! বাঙালি যে নও, সে তো বুঝতেই পারছি। ইউপি না বিহার, নাকি তেলেগু? তা এখানে জুটলে কোত্থেকে?

হুহুঃ               আমরা বহিরাগত নই, স্যার! এইখানেই আমাদের বরাবরের বাসবহুদিনের।

পৈলানঃ        তবে যে একটু আগে বললে, এখানে নতুন নতুন, সড়গড় হতে সময় লাগবে! তোমার রকম সকম আমার একটুও ভাল ঠেকছে না, হে। তোমার ওপর আমার নজর থাকবে, এই বলে দিলাম। এখন যাও, চাটা নিয়ে এসো, তারপর তোমার হচ্ছে...তোমার ওই গন্ধটাও ধরবো।

হুহুঃ               হে হে, গন্ধ নয় স্যার, গন্ধর্ব। [হুহু হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে]

 

[পৈলান বিছানা থেকে নেমে মেঝেয় দাঁড়ালনিজেকে খুব হাল্কা মনে হচ্ছে তার, যেন কোন ভার নেই! ফাঁকা ঘরে কিছুটা নেচেও নিল আপন মনেতার এই হুমদো চেহারাটার জন্যে গত বছর তিরিশেক নানান অসুবিধে হচ্ছিল, কিন্তু এখন আর সে সব নেই। নিজেকে বিশ-বাইশ বছরের ছোকরা মনে হচ্ছে। ঘরের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে দেওয়ালে টোকা মেরে...]

পৈলানঃ         এ ঘরের দেওয়ালগুলো কাচের, নাকি পেলাস্টিকের, কে জানে! একটাও জানালা নেই। বাইরের কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বাইরে কি কুয়াশা হয়েচে, নাকি মেঘ করেচে? সুজ্যি ওঠার নাম নেই। সেই থেকে মনে হচ্ছে যেন ভোর। মেঘে মেঘে বেলা কত হল কে জানে? এ ঘরে, ব্যাটারা একটা ঘড়িও দেয়নি। ওই গন্ধধরবো নাকি, ব্যাটাকে বলতে হবে একটা ঘড়ি দিতে। আরেকটা...আরেকটা কি যেন, হ্যাঁ মনে পড়েছে, ফোন, ইন্টারকম। না, না ইন্টারকম নয় কলিংবেল হলেই ভালো। বেলটা হাতের কাছে রেখে দিলেই ল্যাঠা চুকে যাবে। বারবার উঠে ফোন ডায়াল করতে হবেনা। তবে ব্যাটাদের ঘরদোর, বিছানাপত্র বেশ ভালোই। বেশ একটা ঠাণ্ডাঠাণ্ডা ভাব আছে। দেওয়ালে ইস্প্লিট কিংবা কোন এসি দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু...অ, বুঝেছি, এখানে সেন্টাল এসি। শালা সবকিছুই কেন্দ - সেন্টালের হাতে!  

                   [হুহু হাতে ট্রের ওপর চায়ের কাপ নিয়ে ঢুকল]

                   অ্যাই। শোনো হে, তোমাকে কটা কথা বলবো বলেই ভাবছিলাম। ঘরে একটা ঘড়ি রাখোনি কেন বলতো? এটাও কী আমাকে বলে দিতে হবে? তোমার ম্যানেজার কে আছে? ডেকে দিও তো। আর ওই সঙ্গে একটা কলিং বেলও যেন ব্যবস্থা করে। আশ্চর্য। এতটুকু সাধারণ কমন সেন্স যদি থাকে!  আর এই ঘরটাতে জানালা নেই কেন, হে? বাইরের আলো হাওয়া একটু পাওয়া যেত। 

হুহুঃ               আজ্ঞে স্যার এই যে আপনার চা, একটু চুমুক দিয়ে দেখুন তো। মনোমত হল কিনা?

[চায়ের কাপ হাতে নিয়ে সুড়ুৎ শব্দে লম্বা চুমুক দিয়ে]

পৈলানঃ           আঃ। বেড়ে হয়েছে চাটা। মাইরি। মনে হচ্ছে সেই ইয়ং বয়সে যেমন খেতাম আর কি। যেমন মিঠে, তেমনি কড়া লিকারে ঘন দুধ। না তোমাকে যতটা অকম্মা মনে হচ্ছিল, ততটা নও। কিন্তু সেই সুগার আর অম্বলের ব্যাপারটা কিন্তু আমি ভুলছি না, মনে রেখো।

হুহুঃ                ওসব, একদম ভুলে যাবেন স্যার। কোনদিন যে ছিল এমন মনেও হবে না।

পৈলানঃ           বাইরে কি, কুয়াশা করে আছে? নাকি মেঘলা? সেই থেকে সুজ্যি দেখা যাচ্ছে না কেন?

হুহুঃ               আজ্ঞে স্যার, এখানে সবসময় এরকমই – ভোরের আলোর মতো। রোদ্দুরের ধাঁধানো আলোও হয় না, আবার অমবস্যার মিশমিশে অন্ধকারও হয় না।

পৈলানঃ          অ, সব চাইনিজ এলইডি মাল- বুজে গেছি, আমাকে আর বোকা বুঝিও না হে, তোমার চালবাজির কথায় আমি ভুলছি না। ম্যানেজারকে বলে এক্ষুনি একটা ঘড়ি, ওই সঙ্গে ক্যালেন্ডার আমার চাই। আজকে কত তারিখ আর এখন কটা বাজছে, বলো দেখি।

হুহুঃ               আজ্ঞে, এখানে ঘড়ি পাওয়া যায় না, স্যার। ক্যালেণ্ডারও না। এখানে কেউ সময়ও মাপে না, কারো মেয়াদও ফুরোয় না, স্যার। এখানে আসতেই যা কষ্ট, তারপরেই ব্যস - হয়ে গেল। সময় থমকে যায়!

পৈলানঃ          [ভুরু কুঁচকে ধমকের সুরে] কোথায় এসেছি আমি? কিসের কী হয়ে গেল? কী সব আবোলতাবোল বকছো বলো তো?

হুহুঃ               মানে স্যার, ব্যাপারটা চট করে বুঝে ওঠা ভারি শক্ত। নতুন নতুন তো, কদিন থাকুন, ধীরে ধীরে সবই বুঝে যাবেন। এখানে এলে সবাই অনাদি আর অনন্ত হয়ে যায়

পৈলানঃ          [খুব রেগে। আঙুল তুলে] অ্যাই শালা, অনাদি, অনন্তর নাম তুলে আমাকে ভয় দেখাচ্ছিস? ওদের সব খবর আমি জানতাম বলেই, ওদের দুটোরই আমি খবর লিয়ে লিয়েচিলাম, হ্যাঁ[একটু থেমে] অ, তাই বল, এইবার বুঝেচি, তোরা সব শালা কোন দলের লোক। কিন্তু ভালো কথা বলচি শোন, আমাকে একদম ঘাঁটাস না। সেই থেকে আমাকে তাপ্পি মারচিস? শালা, তোরা আমায় কিডন্যাপ করে এনেচিস, না? [চাটা শেষ করে, হুহুর হাতে খালি কাপটা ধরিয়ে দিল]

হুহুঃ               ব্রেকফাস্টে কী খাবেন, স্যার? মাংসের হালকা ঝোল আর মাংসেরপুর দেওয়া পাঁউরুটি টোস্ট, দিই?

পৈলানঃ           সোজা কথার উত্তর দিবি না, না? তুই খুব হারামি, জানিস তো? সাত হারামির এক হারামি বললেও কম বলা হয়। তোর নামটা বললি গানধরবো! তখন বুঝিনি, আমিও শ্লা টিউবলাইট মেরে গেচি, এখন বুঝছি তুই পাক্কা টেররিস্ট। শুরুর থেকেই তুই আমাকে, গান ধরবো, গান ধরবো করে থেট করচিস, বন্দুক ধরবি? ভেবেছিস আমি গেঁড়ে ভোঁৎনা? ভয় দেখালেই সিঁটিয়ে কাদা? এখন আবার মাংসের ইস্টু, সেন্ডউইচ টুচ খাইয়ে আমার মন ভুলোতে চাচ্চিস? আমার পছন্দ-অপছন্দ সবই তোদের খবরে আছে, কেমন?

হুহুঃ               আপনি খুব বিচলিত হয়ে উঠছেন, স্যার। সবার সব খবরই, আমাদের রাখতে হয়, সেটাই আমাদের কাজ স্যার। যে যেমন কাজ করে, সে তেমনই ফল পায়, এ নিয়ম স্যার, আমাদেরও, আপনাদেরও। বিচলিত হবেন না স্যার। খাবারের সঙ্গে এবার কফি এনে দিই স্যার? আরাম করে খান।

পৈলানঃ           [ভুরু কুঁচকে] অ্যাই, বিচলিত আবার কী রে? তোকে আগেই বললাম না, বাংলায় বল।

হুহুঃ               হে হে। বিচলিত-র বাংলা টেনসান, স্যার।

পৈলানঃ        টেনসান? অ তাই বল। অ্যাঁ কী বললি, টেনসান? শালা তুই আমাকে টেনসান শেখাচ্চিস? আমার মোবাইলটা কোতায়? আমার মোওওবাইলটা কোতায়? ওটা আমাকে একবার দে, তারপর তোদের কেমন টেনসনে দৌড় করাই দেখ। আমার ছেলেরা একবার খবর পেলে না? তোদের হাঁড়ির হাল করে ছাড়বে জেনে রেখে দে।

হুহুঃ               আপনার খাবারটা আমি নিয়ে আসি, স্যার। আরাম করে খানখেতে খেতে না হয় আপনার কথার উত্তর দেওয়া যাবে। [হুহু বেরিয়ে গেল]

পৈলানঃ          [চিন্তিত মুখে, পায়চারি করতে করতে] ছিলাম তো শালা কলকাতার সেরা নাস্সিং‌ হোমে। কতদিন ছিলাম, সে তো মনেও নেই ছাতা। কখন ঘুমোতাম, কখন জাগতাম কে জানে। মাঝে মাঝে চোখ মেলে দেখতাম মাথার ওপর সিলিংয়ের ফুটোয় লুকোনো মিটমিটে আলো। বিছানায় শুয়ে আচি বুঝতে পারতাম। আড়ষ্ট ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার ক্ষমতাও ছিল না। তবে সারা গায়ে, নাকে, মুখে গুচ্ছের নল লাগানো ছিল দেখতাম। ডানপাশের দেওয়ালে একটা টিভির মতো নীল পর্দার বাস্কো! বাস্কো নয়, বাস্কো নয়, কি যেন বলে, হ্যাঁ মনে পড়েচে মনিটর মনিটর। স্কুলে ন বছর পড়েছিলাম, সব কেলাসে আমিই মনিটর হতাম। মনিটর মানেই মাতব্বর। মাতব্বরি ব্যাপারটা আমার জন্ম থেকেই। সেই ভাঙিয়েই তো এত ক্ষমতা আর দাপট। আমার নাম শুনলে, পোয়াতি মেয়েদের গবভোপাত হয়ে যায়। মায়ের কোলে ঘুমকাতুরে খোকারা ডুকরে কেঁদে ওঠে। বিরোধী দলের নেতাদের ধুতি হলুদ হয়ে কেচ্ছা কেলেংকারি হয়। কিন্তু এ ব্যাটারা কারা? কোন দলের? আমাকে তুলে এনেছে বুঝতে পারচিকিন্তু কী চায় কি আমার থেকে! দু-চার পেটি হলে, তেমন পবলেম নেই। সে আমার ঘরেই গোয়ালের মাচায় রাখা আচে। কিন্তু না হলে? এ জায়গাটা কোথায়? এখান থেকে বেরোনোর উপায় কী? তবে হ্যাঁ, একবার বেরোতে পারলে, শালাদের গুষ্টির ষষ্টিপুজো যদি না করে ছাড়ি তো আমার নাম পৈলেন নয়। ওই গান ধরবোটা এবার এলেই, একটু ধাতানি দিয়ে কথা বলতে হবে। আমার ধাতানি হজম করার লোক এ তল্লাটে তেমন আর কই?

[ট্রে হাতে হুহু ঢুকল। প্লেটে স্যাণ্ডউইচ টোস্ট, বোওলে মাংসের স্টু আর কাপে গরম কফি]

হুহুঃ               একদম গরম গরম খেয়ে নিন, স্যার।

পৈলানঃ           হুঁ। তেমন খিদে মনে হচ্চিল না, কিন্তু গন্ধটা হেবি ছেড়েচে, তাতেই কেমন যেন খিদেটা চনমনে হয়ে উঠেচেতোদের পেটের মধ্যে কী মতলবটা আচে বুঝতে পারচি না, তবে ভয় পেয়ে আমি পেটে না খেয়ে দুব্বল হবো, এমন আহাম্মক আমায় ভাবিসনি, রে!

                   [স্যাণ্ডউইচে কামড় দিয়ে, এক চামচ সুপ নিল]

                   বাঃ। রান্নাবান্না তো ভালই তোদের ক্যান্টিনে। তা তোদের মতলবটা কী খুলে বলবি? আমাকে এখানে এনে বন্দী রেখে তোদের লাভটা কী হবে? এই এত দামি ঘর, এই রকম খাওয়া দাওয়া...তোদের বস কে আচে? তাকে বল না, এসব ভাঁটের খরচা আর সময় নষ্ট না করে, সামনে এসে ঝেড়ে কাশতে!

হুহুঃ               না, না, আপনাকে বন্দী রাখা হয়েচে, এ আপনার ভ্রান্ত ধারণা স্যার! আপনি তো বন্দী নন। আপনি মুক্ত হয়েই তো এখানে এসেছেন! বরং এতদিন যেখানে ছিলেন, সেখানেই আপনি বন্দী ছিলেন!

পৈলানঃ           এখানে বন্দী নই? এই ঘরের বাইরে, যেখানে খুশি আমি যেতে পারি? কী ফালতো বকচিস মাইরি।

হুহুঃ              হ্যাঁ স্যার। যেখানে খুশি আপনি যেতে পারেন। কোন বাধা নেই। তবে এই লোকে পনের দিনের মেয়াদ, তার পরে অন্য লোক।

পৈলানঃ           অ তোর ওই সময় ডিউটি চেঞ্জ হয়ে যাবে বুঝি? অন্য লোক আসবে? তবে পনের দিন তো অনেক দিন রে? তার আগেই আমি চলে যাবো। আচ্ছা, আমি যদি বন্দী না হই, তাহলে আমার মোবাইলটা দিচ্চিস না কেন?

হুহুঃ             এখানে ওটার কাজ কী, স্যার? টালির টুকরো। এখানে নেট ওয়ার্ক নেই, মোবাইল থাকা না থাকা সমান।

পৈলানঃ           এ জায়গাটা কলকাতা থেকে অনেক দূরে?

হুহুঃ               তা স্যার, বেশ খানিকটা দূরেই।

পৈলানঃ           [মুখ ভেংচে] বেশ খানিকটা দূরে, আবে কতটা দূরে বল না?  হতভাগা, আমাকে বন্দী করেই যদি না রাখবি, তাহলে কলকাতা ছেড়ে এখানে নিয়ে এলি কী করতে?

হুহুঃ               আজ্ঞে মুক্তি পেলে এখানেই আসতে হয় প্রথমে, তারপর অন্য লোকে। হে হে, আপনি এতদিন যে ফাঁদে বন্দী ছিলেন, তারপরে আপনাকে কে আবার বন্দী করবে?

পৈলানঃ         আমি বন্দী ছিলাম? হারামজাদা, এমন দেব না কানের গোড়ায়। আমাকে বন্দী করতে পারে এমন কারো ক্ষমতা ছিল বাংলায়?

হুহুঃ               হে হে ছিলেন বৈকি, স্যার। সে এমনই বন্দী, বুঝতেও পারেননি। এই এখন যেমন বুঝতে পারছেন না, যে আপনি মুক্ত। আর আপনি স্যার এখন বাংলাতেও আর নেই।

পৈলানঃ           (চমকে) বাংলাতেও নেই মানে? আমি তাহলে এখন কোথায়? বিহার, ইউপি না দিল্লিতে? কী ভজকট বকচিস মাইরি!

হুহুঃ               ওসব নয়, ওসব নয়, হে হে এ একেবারে অন্যলোকের জায়গা। তবে এ লোকে সবাইকেই একবার আসতেই হয়। 

পৈলানঃ           হতভাগা জেনে রাখ, অন্যলোকের এলাকাতে আমি একলা যাই না। আমার সঙ্গে সাঙ্গপাঙ্গ থাকে, তাদের হাতে দানা থাকে, নারকেল থাকে। বলা নেই কওয়া নেই, অন্য লোকের এলাকায় এনেচিস কেন বে, আঁটকুড়ির ব্যাটা?

হুহুঃ             আপনি স্যার, সেই থেকে অনেক আকথা কুকথা বলছেন, সেটা না বললেই ভালো, স্যার। আমি আপনার নাড়ি নক্ষত্র, হাঁড়ির খবর সব জানি, কিন্তু আপনি আমার কিছুই জানেন না। কার মধ্যে কী লুকিয়ে আছে কে জানে, স্যার? আর কী কথায় কখন কী ঘটে যায়, কে বলতে পারে? এখানে আবার সব কথার এবং কাজের হিসেবও রাখা হয়, সেটাই মুশকিল।

পৈলানঃ           (সুড়ুৎ সুড়ুৎ করে স্যুপ খেতে খেতে) (জনান্তিকে) ব্যাটাকে অ্যাত হড়কাচ্চি, তাও হেব্বি ক্যাজুয়াল রয়েছে কিন্তু। উলটে মাঝে মাঝে, আমাকেই দেখচি কচি করে হড়কে দিচ্চে হারামীটার পেছনে বেশ লম্বা হাত আচে বোঝা যাচ্চেহয়তো সিবিআই, ইডি। বুঝেচি, এ শালা নিগ্‌ঘাৎ কেন্দের চক্কান্ত। যাই হোক মাথা গরম করে লাভ হবে না মনে হচ্চেব্যাটাকে অন্য ভাবে ম্যানেজ করা যায় কিন দেখি।

                   (স্যুপ স্যাণ্ডউইচ শেষ, এবার কফির কাপে চুমুক দিয়ে) (প্রকাশ্যে) তা বাপু, তোমার ওপর যতোই রাগটাগ করি না কেন, একটা কথা মানতেই হবে, রান্নার হাতটা খাসা। কিসের মাংস ঠিক বুঝলাম না, তবে খুব তার হয়েচে রান্নায়! কোথাকার ঠাকুর হে? আর মাংসটাই বা কিসের?

হুহুঃ               ঠাকুর বলে এখানে কেউ নেই, রান্নাটান্নাও করতে হয় না, স্যার। যে যেমন কর্ম করে, তার মনোমত ঠিকঠাক জিনিষ এখানে তৈরি হয়েই থাকে।

পৈলানঃ           এতো বেশ বেড়ে জায়গা মাইরি। এর পর যেন বলে বসো না, যে এর জন্যে কোন খরচাও হয় না!

হুহুঃ             হে হে, স্যার ঠিকই ধরেছেন, সত্যিই কোন খরচা নেই। সারা জীবনের লুঠপাট, চুরিচামারি করে জমানো পয়সায় ছ্যাদলা ধরে। তারপর সাত ভূতে কামড়াকামড়ি করে সে পয়সার ষষ্ঠীপুজো করে।

পৈলানঃ           তা ঠিক, তবু মন তো মানে না। পোথম পোথম তোমার ওপর একটু বিরক্ত হয়েচিলাম ঠিকই, এখন দেখচি তোমার মধ্যে অনেক গুণ আচে হে। আর পৈলেন মণ্ডল গুণের কদর জানে। ঐ যে অনন্ত, ব্যাটার অনেক গুণ ছিল, খালপাড়ের বস্তি থেকে একদিন ভোরবেলা ফেরার সময় ওকে দেখেছিলাম। আর দেখেই বুঝেছিলাম ওর ভেতরে মাল আচেতুলে এনে সঙ্গে রাখলাম কদিন। ঝট করে তৈরি হয়ে গেল, জান?

হুহুঃ               হে হে, সে আপনার হাত যশ।

পৈলানঃ           সেই অনন্ত, আস্তাকুঁড় থেকে তুলে এনে, দু বছরে রাজার ব্যাটা কেরাসিনওয়ালা বানিয়ে দিলাম! আর সেই কিনা এলো আমার পেছনে কাটি করতে? এমন বিশ্বেসঘাতক! দিলেম শালাকে টপকে।

হুহুঃ               জানি, স্যার।

পৈলানঃ           আর ওই অনাদি? আমার বিরোধী দলে ছিল, ওখানে ব্যাটাকে ল্যাজেগোবরে অবস্থা করে ছেড়েছিল। যে কোনদিন লাশ হয়ে ভুরভুরি কাটত পোড়ো সেপটিক ট্যাংকে। একদিন মাঝ রাত্রে ধড়াস করে পায়ে এসে পড়ল, পলুদা বাঁচাও। আমার চোখের কোলটা কেমন যেন ঝাপসা হয়ে উঠল।

হুহুঃ               হে হে, সে আর বলতে? আপনার দয়ার শরীর।

পৈলানঃ         আরে তা নয়, তা নয়। পেটে জল পড়লে আমার মনটা কেমন যেন মাখো মাখো হয়ে যায়। সেই অনাদি অনন্তর সঙ্গে ভিড়ে ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাবার ছক কষছিল। দিলাম শালার ঘন্টা বাজিয়ে।

হুহুঃ               হে হে, আপনিই তো শেষ বিচারের মালিক। এই তুলছেন, এই খালাস করছেন।

পৈলানঃ         ছেঁদো গ্যাস দিয়ে লাভ নেই, গন্ধকাজের কথাটা শোন। এখানে কত পাস? বলি ফিউচারের কথা কিছু ভেবেছিস? সারা জীবন এভাবেই কাটাবি? নাকি দু পয়সা কামিয়ে, একটু রোখঠোক রোয়াবি দেখিয়ে রাজার হালে থাকবি?

হুহুঃ               আজ্ঞে, সে আর বলতে? আর উণিশ বিশ হলেই খালে লাশ - একেবারে খাল্লাস।

পৈলানঃ           আরে তা কেন? সবাই কী আর ওদের মতো নাকি? ও নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না।

হুহুঃ         সে কথা একশবার, আমাদের ভাবনা তো আপনি ভেবেই রেখেছেন। আপনার নিজের দলেরই আটত্রিশজন এখন মাটির তলায় কংকাল হয়ে নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে। আর ষোলজনের, বানিয়ে তোলা মামলায় যাবজ্জীবন চলছে।

পৈলানঃ           (ভুরু কুঁচকে) বেশ ছোকরা হে, তুই! আমার থেকেও তোর দেখি সব হিসেব একেবারে মুখস্থ!

হুহুঃ               আজ্ঞে তা তো হবেই! আপনার হরেক লীলা, সব কী আর আপনার মনে রাখা ঠিক হয়? এরপর আছে বিরোধী দলের একশ আটত্রিশ জন, আর নিরীহ আম জনগণ গোটা চল্লিশেক তো হবেই! তার মধ্যে আছে আটজন বাচ্চা ছেলেমেয়েও। 

পৈলানঃ           (কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে) সব কী আর মনে আছে? কাজের মধ্যে অমন দু চারটে হয়েই যায়। আর ওসব না করলে লোকে মান্যিগণ্যিই বা করবে কেন? আর পাব্লিকের মনে ভয়ভক্তিই বা আসবে কোত্থেকে, হে? ওটাই তো আমাদের পোফেসন, ওটাই তো আমাদের ইউএসপি। ওটুকু না থাকলে, পলিটিক্যাল ন্যাতারা আমাদের দিয়ে ঘরও মোছাবে না, হে।

হুহুঃ               আর পলিটিক্যাল হাতটা যদি মাথায় না থাকে, ক্ষমতার ল্যাজ নাড়াই বা থাকবে কোথায়?

পৈলানঃ           তুই বেশ চালাকচতুরও আচিস, অ্যাঁ? ভেজা বেড়ালটা সেজে থাকিস, দেখে বোঝাই যায় না। এখনই কিছু বলতে হবে না। ভালো করে চিন্তা ভাবনা করে দেখ। এখান থেকে সটকে নিয়ে একবারটি আমায় কলকাতায় নিয়ে চল, তারপর তোর লাইফ কেমন বানিয়ে দিই দেখবি! হে হে, এটুকু না বোঝার মতো বোকা তো তুই নস, রে!

হুহুঃ               আজ্ঞে, ভাবনা চিন্তার বাকি আর কী রাখলেন বলুন দেখি?

পৈলানঃ        বলিস কী রে, ভাবনা চিন্তা করেই ফেলেছিস? বা বেশ বেশ। তা বেরোবার আগে লাঞ্চের ব্যবস্থা কিছু করেচিস নাকি? দুপুরে ওই মাংসের কষা আর খান কতক পরোটা বানাবি নাকি? যাওয়ার আগে এ পাড়ার খাবারটা জমিয়ে খেয়েই যায়। আচ্ছা, ওই মাংসটা কিসের বল তো হে, অমন স্বাদ এর আগে কোনদিন পাই নি।

হুহুঃ               ও তেমন কিছু না, স্যার। যেমন সস্তা, তেমনি সহজেই পাওয়া যায়। মানে এ মাংসের কোনদিন অভাব হয় না, স্যার। হালাল কিংবা ঝটকা; গরু না শুয়োর –এসব কোন লাফড়াও নেই, স্যার!।

পৈলানঃ           বলিস কী রে? সস্তায় এমন মাংস, কিসের বল তো?

হুহুঃ               আপনি জানেন, স্যার, আপনার খুবই প্রিয় মাংস। ওটা নরমাংস, স্যার।

পৈলানঃ           অ তাই বল! অ্যাঁঃ কী বললি? নরমাংস? আরে ছ্যাঃ ছ্যাঃ তোর পেটে পেটে এই ছিল, গন্ধ?

হুহুঃ              কেন স্যার? কিছু অন্যায় করে ফেললাম নাকি, স্যার? একটা মানুষখেকো বাঘ, কিংবা একটা হাঙর সারা জীবনেও অতো মানুষ খেতে পারে না স্যার, এই ক বছরে আপনি যা খেয়েছেন।

পৈলানঃ           হ্যাক থুঃ থুঃ। ছিঃ ছিঃ। কোন শালা বলে আমি নরমাংস খেয়েছি? লাশ ফেললেই তার মাংস খাওয়া হয়ে যায়? আমার মতো একজন সমাজসেবীকে তুই নরমাংস খাওয়ালি?

হুহুঃ               এ হে হে, আপনি এত ছ্যাছ্যা থুথু করছেন কেন স্যার, মানুষ কি এতই অখাদ্য স্যার? বাঘ ভাল্লুক স্যার কখনো কখনো মানুষ মারে পেটের জ্বালায়, আপনি মারেন, স্যার ক্ষমতা আর টাকার জ্বালায়। ইলেকশনের আগে পরে, এলাকা দখলের সময়, কত মানুষ মেরেছেন স্যার, মনে পড়ে? ছেলে-মেয়ে বুড়ো-বুড়ি, যুবক-যুবতী - তাদের মাংস একটু আধটু একটু খেয়ে দেখতে দোষ কী, স্যার? 

পৈলানঃ           তোকে আমি ফাঁসিতে চড়াবো। তোকে আমি... আমি...ওয়াক ওয়াক...ওরে বাবা আমার কেমন গা গুলোচ্ছে...ইস...ইস...ছ্যাঃ ছ্যাঃ...ওয়াক ওয়াক...

হুহুঃ            সে কি, স্যার? কত লোকের গলা কেটে, শরীরে ছুরি চালিয়ে দু'হাত রক্তে মাখামাখি করেছেন, লোকদের ধমকেচেন কতবার - তেরা খুন পি যাউঙ্গা...বলে।  দুপুরের খাওয়ার পাতে একবাটি সেই রক্ত এনে দেব স্যার? ও কি স্যার, অমন করছেন কেন? মরতে খুব কষ্ট হচ্ছে বুঝি?      


[আলো নিভে গেল, কিছুক্ষণ পৈলানের ‘ওয়াক ওয়াক, থু থু’ আর হুহুর ‘ঘাবড়াবেন না স্যার, সব ঠিক হয়ে যাবে। মানুষ মারতে কোনদিন কষ্ট পাননি, আর এখন নিজে মরতে এত কষ্ট... প্রথম প্রথম অমন হতে পারে স্যার’ শোনা যেতে লাগল...। 

তারপর হুহুর কণ্ঠের বদলে একটি মেয়ের কণ্ঠ শোনা গেল, ‘স্যার, স্যার একটু শান্ত হোন স্যার, ও স্যার, স্যার...’আলো জ্বলে উঠলে দেখা গেল, নার্সিং হোমের বেডে পৈলেন শুয়ে শুয়ে ছটফট করছে, তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে একটি নার্স, নাম পিংকি পৈলানের সারা গায়ে নাকে মুখে নানান টিউব, সে সব খুলে সে উঠে পড়তে চাইছে।]

 

পিংকিঃ          বীণাদি, শিখাদি একবার আসবে গো, পেশেন্ট হঠাৎ কেমন করছে দেখে যাও। সামলাতে পারছি না। ও বীণাদি, ও শিখাদি।

                   [আরো দুই নার্স বীণা আর শিখা দৌড়ে ঢুকল কেবিনে]

বীণাঃ              ও মা, এ আবার কী হল রে? কোমার পেশেন্ট এমন কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করে এই প্রথম দেখছি শিখা তুই স্যারকে বরং একবার ফোন কর। আমি আর পিংকি ততক্ষণ দেখছি একে শান্ত করা যায় কি না

                   [শিখা মোবাইলে ডায়াল করতে লাগল]

শিখাঃ             যাচ্চলে, নেট ওয়ার্ক সীমার বাইরে বলছে।

বীণাঃ              যাচ্ছেতাই নেট ওয়ার্ক। আবার কর

শিখাঃ             দাঁড়া দাঁড়া রিং হচ্ছে...রিং হচ্ছে...রিং হচ্ছে...যাঃ, স্যার তুললেন না।

বীণাঃ            ছেড়ে দে, এখন আর তাড়া নেই। পেশেন্ট ঠাণ্ডা মেরে গেছে...এখন আর কোমা নয়, একদম ফুলস্টপ।

পিংকিঃ           তাহলে, ভেন্টিলেশান খুলে দিই?

বীণাঃ          পাগল হয়েছিস? ভেণ্টিলেশন চলুক...বড়ো বড়ো ডাক্তাররা আসুক, তাঁরা যা করার করবেনরাত এখনো ঢের বাকি, যা একটু ঘুমিয়ে নে। কাল সকাল থেকে আবার কোমার ডিউটি... এ কোমা কবে কমবে, কে জানে? 

 

[তিনজন বেডের দুপাশে দাঁড়িয়ে পৈলানের দিকে তাকিয়ে রইল। পর্দা নেমে এল]

 

..০০..   

এর পরের বড়োদের গল্প - মশা-ই          

নতুন পোস্টগুলি

নামকরণ

     এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২   "        শাশুড়িমায়ের জিম্মায় ফুটকিকে রেখে বিজলি আজই স্কুলে জয়েন করলেন। মাসখানেকের...