রবিবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৫

অদৃশ্য বন্ধু


এর আগের ছোটদের গল্প - " মিশন চশমা (রহস্য)



  

নন্দস্যারের কাছে আমরা ফিজিক্স আর ম্যাথ্‌স্‌ পড়ি। নন্দস্যার ভীষণ ভালো পড়ান। আর আমরাই লাস্টব্যাচ বলে, পড়াতে পড়াতে উনি প্রায়ই সময়ের কথা ভুলে যানআটটা থেকে সাড়ে নটা আমাদের সময়, কিন্তু দশটার সময় ওঁনার মেয়ে যখন এসে বলে “বাপি, তুমি আর কতক্ষণ পড়াবে? মা কিন্তু রাগ করছে”। তখন উনি ব্যস্তসমস্ত হয়ে ঘড়ির দিকে তাকান, আর বলেন, “এঃহে, এত দেরি করিয়ে দিলাম তোদের...যা, যা বাড়ি যা, অনেক রাত হল। বাকিটা না হয় পরশু হবে”।

আজও তাই হল। রাত তখন প্রায় সোয়া দশটা। আমি সন্তোষ, ডাকনাম সন্তু, শরৎ আর দীপু নন্দস্যারের বাড়ি থেকেই ফিরছিলাম। আমাদের একই পাড়ায় বাড়ি, কয়েকটা বাড়ির এদিক আর ওদিক। কাজেই আমরা একসঙ্গেই ফিরি গল্প করতে করতে। বড়ো রাস্তা থেকে আমাদের পাড়ার গলির মুখটায় যখন এসে পড়েছি, সনাতনদার সঙ্গে দেখা হল। সনাতনদার মুদির দোকান। আমাদের গলির একেবারে মুখেই কোণের বাড়িটায় উনি থাকেন, আর ওঁনার দোকান ওই বাড়ির একতলায়। এতরাত্রে দোকানে কোন খদ্দের নেই, দোকানের সামনে সনাতনদা দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমাদের দেখে বললেন, “কী, কোচিং পড়ে বাড়ি ফেরা হচ্ছে?”

আমি হেসে বললাম, “হ্যাঁ”।

শরৎ বলল, “আপনি এখনও দোকান বন্ধ করেননি?”

সনাতনদা উত্তর দিলেন, “এই করব, এইবার”।

আমরা কথা বলতে বলতেই গলিতে ঢুকে বাড়ির দিকেই হাঁটছিলাম। পেছন থেকে সনাতনদা ডাকলেন, “অ্যাই সন্তু, শরৎ, একটু দাঁড়াও তো ভাই। একটা কথা আছে”। আমরা ফিরে দাঁড়ালাম।

সনাতনদা আমাদের কাছে এগিয়ে এসে একটু চাপা স্বরে বললেন, “কদিন ধরেই একটা অদ্ভূত ব্যাপার লক্ষ্য করছি। কাউকে বলতে ঠিক ভরসা হচ্ছে না”।

আমি কৌতূহলী হয়ে বললাম, “কী ব্যাপার বলুন তো”?

সনাতনদা বললেন, “তেমন কিছু নয় হয়তো, কিন্তু মন থেকে খটকাটা যাচ্ছে না। সনৎবাবুকে চেন তো, ভেতরের দিকে থাকেন?”

আমরা তিনজনেই একসঙ্গেই বললাম, “চিনি বৈকি! কেন, কী করেছেন উনি?”

সনৎকাকু আর তাঁর বুড়ি মা আমাদের পাড়াতেই থাকেন, এই গলির একেবারে শেষের দিকে। বিয়ে-থা করেননি। নাম করা এক কলেজের লাইব্রেরিয়ান। পাড়ায় তেমন মেশেন না, কোন সাতেপাঁচেও থাকেন না। ওঁনার একমাত্র নেশা বই পড়া। ছুটির দিনে ওঁনার বাড়ির দিকে গেলেই দেখা যায়, বসার ঘরের জানালার পাশে বসে বই পড়ছেন। সরস্বতী পুজোর চাঁদা চাইতে গেলে, ওঁনার ওই ঘরে ঢুকে দেখেছি, ঘরটা বইয়ের জঙ্গল। আলমারি, সোফা, টেবিল, ঘরের মেঝে, সর্বত্র বই ডাঁই করা আছে।  আর আমরা কিছু চাওয়ার আগেই, উনি যা চাঁদা দেন সে আমাদের কল্পনার থেকেও বেশি! গতবার দিয়েছিলেন পাঁচশো একটাকা! তার আগের বারে তিনশ একান্ন! সেই সনৎকাকু আবার কী করলেন?

সনাতনদা থুতনি চুলকোতে চুলকোতে বললেন, “উনি রোজই সন্ধে সাড়ে সাতটা, আটটা নাগাদ গাড়িতে ফেরেন। ওঁনার গাড়িটা, দেখেছ তো? যেটা উনি নিজেই চালান, সেই গাড়িতেই অফিসে যান এবং ফেরেন”।  

সনৎকাকু রিসেন্টলি গাড়ি কিনেছেন এবং সেটা যে উনি নিজেই চালান, সে কথা আমরা সবাই জানি। একটু ভয় পেয়েই আমি জিগ্যেস করলাম, “সে কী? কাউকে ধাক্কা-টাক্কা মেরেছেন, নাকি?”

“নারে বাবা, সে সব কিছু নয়। তবে কদিন ধরেই দেখছি, তা প্রায় দিন পনের তো হবেই! ফেরার সময়, এই মোড়ে এসে গাড়িটা কয়েক সেকেণ্ডের জন্যে দাঁড় করান, তারপর সামনের বাঁদিকের দরজাটা খুলে দেন। একটু অপেক্ষা করে, বাঁ হাত নেড়ে বলেন, “ওকে, কাল আবার দেখা হবে”। তারপর দরজাটা টেনে বন্ধ করে, গলির ভেতরে ঢুকে যান”।

এর মধ্যে আশ্চর্য হবার কী আছে, আমরা কেউই বুঝতে পারলাম না। তিনজনে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম, তারপর দীপু বলল, “কোন বন্ধু-টন্ধু হবেন, একই জায়গায় হয়তো চাকরি করেন। এই পাড়াতেই থাকেন। একসঙ্গে ফেরেন। এতে অবাক হওয়ার কী আছে?”

সনাতনদা বললেন, “সে কী আর আমিও বুঝি না? তেমন তো হতেই পারে। সে হলে কী আর মাঝরাতে তোমাদের ডেকে এত কথা বলি? আমি কিন্তু কোনোদিনই ওঁনার পাশের সিটে কাউকে বসে থাকতে দেখিনিবা কাউকে গাড়ি থেকে নামতেও দেখিনি। অথচ উনি রোজই এই কাণ্ডটি করেন”

সনাতনদার কথাটা এতই অদ্ভূত, আমাদের বিশ্বাসই হল না। আমি বললাম, “যাঃ, তাই আবার হয় নাকি সনাতনদা? নিশ্চয়ই থাকেন কেউ, আপনি লক্ষ্য করেননি”।

সনাতনদা একটু যেন রেগে গেলেন, “বললেই হল, আমি লক্ষ্য করিনি? গত পনেরদিন ধরে আমি দেখছি। গতকাল তো আমি গাড়ির পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলাম”।

শরৎ বলল, “কাউকে দেখেননি?”

সনাতনদা বললেন, “তবে আর বলছি কী? ব্যাপারটা আমার মোটেই ভাল ঠেকছে না। সনৎবাবু পাগল-টাগল হয়ে যাচ্ছেন না তো! তাহলে এই যে উনি গাড়ি চালিয়ে রোজ যাচ্ছেন, আসছেন, বলতে নেই...কবে কোথাও একটা কিছু ঘটিয়ে ফেললে...?”

সনাতনদার এই কথায়, আমরা কেউই কোন উত্তর দিতে পারলাম না, চুপ করে রইলাম। সনাতনদা আমাদের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, “রাত হয়েছে, এখন বাড়ি যাও। কথাটা তোমাদের মাথায় দিয়ে রাখলাম, ঠাণ্ডা মাথায় একটু চিন্তা করে দেখতবে এখনই পাঁচকান করার দরকার নেই”

আমরা আর কথা বাড়ালাম না, চুপচাপ বাড়ির দিকে আবার হাঁটা শুরু করলাম। শরতের বাড়িটাই সবার আগে পড়ে, কলিং বেল টিপে দরজা খোলার অপেক্ষা করতে করতে বলল, “মাথাটা কার খারাপ হয়েছে, সেটাই আমাদের দেখতে হবে, বুঝলি সন্তু? সনাতনদার না সনৎকাকুর”!

আমি আর দীপু হেসে ফেললাম শরতের কথায়। আমি হাত নেড়ে শরকে বললাম, “ওকে, কাল আবার দেখা হবে”।

আমার বলার ধরনে দীপু এবং শরৎ হো হো করে হেসে উঠল, শরৎ বলল, “হ্যারে, তোরা আমায় দেখতে পাচ্ছিস তো?”

 

সনাতনদার কথাটা আমরা ভুলেই গেছিলাম, কিন্তু সনাতনদাই ভুলতে দিলেন না। পরশুদিন আমরা আবার যখন নন্দস্যারের ওখান থেকে পড়ে ফিরছিলাম, আমাদের ডেকে জিগ্যেস করলেন, “কী হে, কিছু চিন্তাভাবনা করলে?” আমরা কিছুই করিনি, আর করার আছেটাই বা কী? আমরা সনাতনদার কথায় তেমন গুরুত্ব না দিয়ে, উত্তর দিলাম, “ভাববেন না, সনাতনদা। সব ঠিক হয়ে যাবে”। বলেই তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে বাড়ির দিকে এগোলাম।

কিন্তু তার কয়েক দিন পরেই, নিজের চোখেই যা দেখলাম তাতে সনাতনদার কথাটার গুরুত্ব না দিয়ে আর থাকতে পারলাম না। শুক্রবার সকালবেলা আমাদের বাড়িতে হঠাৎ মামা-মামিমা এসে উপস্থিত। তখন সাড়েনটা বাজে। বাবা অফিসে বেরোনর জন্যে রেডি। মা আমাকে আড়ালে ডেকে বললেন, “তোর বাবার তো এখন সময় হবে না, চট করে সনাতনের দোকান থেকে এক কিলো ময়দা আর এক প্যাকেট সাদা তেল এনে দে তো! তোর মামারা এসেছে, কখানা লুচি ভেজে দিই”।

আমি সনাতনদার দোকানে গিয়ে দেখি বেশ ভিড়। এসময় অনেক লোক ও মহিলা জিনিষপত্র কিনতে এসেছেন। সকলেরই তাড়া আছে, সবাই বলছেন, “সনাতন, সেই থেকে দাঁড়িয়ে আছি, এবার আমায় ছাড়”। সনাতনদাও জিনিষ ওজন করতে করতে আর দামের হিসেব করতে করতে বার বার বলছেন, “এই দিই, এরপর আপনারটাই ধরব”।

আমি দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম, ভিড়টা একটু কমলে ভেতরে ঢুকব। সেই সময়েই দেখলাম আমাদের গলির ভেতর থেকে সনৎকাকুর গাড়িটা বেরিয়ে আসছে। আগে তেমন লক্ষ্য করিনি, কিন্তু আজ মন দিয়ে লক্ষ্য করতে লাগলাম। গাড়িটা আস্তে আস্তে মোড়ের কাছে এল, দাঁড়িয়ে গেল। সনৎকাকু হাত বাড়িয়ে এপাশের দরজাটা খুলে বললেন, “গুড মর্নিং। কতক্ষণ? আজ আমার একটু দেরি হয়ে গেল”তার একটু পরে আবার হাত বাড়িয়ে উনি দরজাটা টেনে বন্ধ করলেন। তারপর বাঁদিকে মোড় নিয়ে চলে গেলেন। যে পাশের দরজাটা উনি খুললেন এবং বন্ধ করলেন, সেপাশেই আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিন্তু, নাঃ কাউকে দেখতে পেলাম না। কেউ ওঠেনি, উঠে সনৎকাকুর পাশের সিটে বসেওনি। সনৎকাকুর কথার কোন উত্তরও দেয়নি।

আমি বেশ ঘাবড়েই গেলাম। সনাতনদা তার মানে ঠিকই দেখেছেন, উনি এ সময় দোকানে ব্যস্ত থাকেন বলে, সকালের ব্যাপারটা হয়তো লক্ষ্য করেননি! সনৎকাকু যাবার সময় সকালে যাকে গাড়িতে তোলেন, তার মানে রাত্রে তাকেই নামিয়ে দেন! আর সেটাই সনাতনদার চোখে পড়েছে! আমি ময়দা আর তেল নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম, দোকানের ভিড়ের মধ্যে সনাতনদার সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলার কোন সুযোগ ছিল না।

 

 স্কুলে টিফিনের সময় শরৎ আর দীপুকে পুরো ব্যাপারটা বললাম। শুনে ওরাও কেমন ভেবলে গেল। শরৎ বলল, “তার মানে, সনাতনদা ঠিকই দেখেছেন? এখন তাহলে দেখা যাচ্ছে সনাতনদা পাগল নয়, সনৎকাকুই! কিন্তু সনৎকাকুর মতো লোক পাগল, এটা ঠিক হজম হচ্ছে না, রে!” আমাদের মধ্যে দীপু কথা ভীষণ কম বলে, কিন্তু যখন বলে খুব ভেবেচিন্তে বলে।

দীপু শরতের কথায় বলল, “অসম্ভব। সনৎকাকু পাগল হতেই পারেন না। এর পেছনে নিশ্চয়ই কোন রহস্য আছে! সেটা আমাদেরই বের করতে হবে!”

আমি বললাম, “রহস্য? তুই আবার এর মধ্যে রহস্য কোথায় পেলি? কাউকে দেখা যাচ্ছে না, অথচ উনি তাকে দুবেলা গাড়িতে তুলছেন, নামাচ্ছেন, কথা বলছেন...”! হঠাৎ আমার একটা কথা মনে হল, বললাম, “তুই কী বলতে চাইছিস? অশরীরী? ভূত?”

দীপু মাথা নেড়ে বলল, “ভূত কিনা জানি না, তবে রহস্য কিছু একটা তো আছেই! সেটাই তো বুঝতে চাইছি”। আমরা চুপ করে রইলাম। আমি চিন্তা করতে লাগলাম, এই কলকাতা শহরে, আমাদের পাড়ায় জলজ্যান্ত একজন ভূত বাস করছে। যে কিনা সনৎকাকুর সঙ্গে গাড়ি চড়ে ঘুরে বেড়ায়! এবং সনৎকাকুও মহানন্দে তাকে গাড়িতে তুলে নেয়! এক আধ দিন নয়, রোজ?

কিছুক্ষণ চিন্তা করে দীপু বলল, “স্কুল ছুটির পর কাল একবার কলেজস্ট্রিট যাবো ভাবছিলাম। যাবি?”

আমি বললাম, “কী কিনতে, বই?”

দীপু বলল, “হুঁ বই। বাড়িতে বলে আসিস, কাল ফিরতে দেরি হবে। সনৎকাকুর কলেজটাও কলেজস্ট্রিটে না? ফেরার সময় আমরা যদি ওঁনার গাড়িতে ফিরতে চাই, উনি আমাদের নেবেন না?”

আমি আর শরৎ মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম, বুঝলাম দীপুর বই কিনতে যাওয়াটা একটা অজুহাত, আসলে ও সনৎকাকুর গাড়িতেই চড়তে চাইছে!

আমি একটু ভয়ে ভয়েই বললাম, “ওই গাড়িতে? কিন্তু...সেটা কি ঠিক হবে? বিশেষ করে ওই গাড়িতেই যখন...”!

দীপু আমার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল, বলল, “কি রে, ভয় পেলি নাকি?”

ব্যাপারটা এর আগেও দেখেছি, ভয় পাওয়ার সময়, কেউ যদি ফট করে বলে বসে, “কি রে, ভয় পেলি নাকি?” শুনলেই কেমন যেন সাহসটা বেড়ে যায় চট করে!

আমি ঢোঁক গিলে বললাম, “ধুস্‌, ভয় পেতে যাব কেন? এমনিই বলছিলাম”।

টিফিন শেষের ঘন্টা পড়ে যেতে আমরা উঠে পড়লাম, ক্লাসে যেতে হবে।  


 

সন্ধে ছটা নাগাদ সনৎকাকুর কলেজের গেটের সামনে আমাদের ঘুরঘুর করতে দেখে বিহারি দারোয়ানজি জিজ্ঞাসা করলেন, “কা ভইল, বাবুয়া? কা কাম?”

শরৎ বলল, “ইয়ে মানে, আমরা সনৎস্যারের সঙ্গে দেখা করতে চাই। এখন কী ঢোকা যাবে?”

দারোয়ানজি বললেন, “ইখন তো কালেজ ছুটি হইয়ে গেল, অন্দরে যিবার অ্যালাউন্স নাহি। সোনোতবাবু আভি গাড়ি লিয়ে নিকলোবে...”

সনৎস্যার যে বেরিয়ে যাননি, সে খবরটাই আমাদের দরকার ছিল। আমরা আর কিছু বললাম না, নিশ্চিন্ত হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। প্রায় আধ ঘন্টা অপেক্ষার পর সনৎস্যারেরটা গাড়িটা দেখলাম, আস্তে আস্তে গেটের কাছে আসছে। দারোয়ানজিও আমাদের বললেন, “ও আয়া সোনোতবাবুর গাড়ি...”। আমরা গেটের ফাঁক দিয়ে গলে, ভেতরে ঢুকে দাঁড়ালাম, দারোয়ানজি কিছু বললেন না। দারোয়ানজি গেট খুলতে লাগলেন। গেটের সামনে এসে সনৎকাকু একটু দাঁড়ালেন, শরৎ ওঁনার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “কাকু, একটা বই কিনতে এখানে এসেছিলাম। এখন ফিরতে পারছি না, বাসে-টাসে যা ভিড়...আপনার গাড়িতে যদি আমাদের...”।

সনৎকাকু একটু অবাক হলেন, “শরৎ না? তোমরা এতদূরে বই কিনতে এসেছ? কজন আছ তোমরা?”

“আমরা তিনজন, কাকু!”

সনৎকাকু একটু চিন্তা করে বললেন, “উঠে পড়ো”।

শরৎ আর দীপু গাড়ির পিছনের সিটে উঠে পড়ল, আমি গাড়ির সামনের দরজাটা খোলার জন্যে হাত দিতেই সনৎকাকু বেশ চমকে উঠে বললেন, “ওকি করছ, সন্তোষ? ওখানে বসবে কী করে? পেছনে যাও...”।

দীপু একটু সরে মাঝখানে চলে যেতে আমিও পিছনেই বসলাম। আমি উঠে দরজা বন্ধ করতেই সনৎকাকু গাড়ি চালু করলেন। গেট দিয়ে বেরোনর সময়, দারোয়ানজি হাত তুলে কাকুকে নমস্কার করলেন।

বড়ো রাস্তায় পড়ে বাঁদিকে মোড় নিয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে, সনৎকাকু একবার বাঁদিকে তাকিয়ে যা বললেন, তাতে আমরা হতভম্ব হয়ে গেলাম। সনৎকাকু বললেন, “চিনতে পারিস্‌নি? আমাদের পাড়াতেই থাকে তো। সন্তোষ, শরৎ আর দীপাঞ্জন। ভাল ছেলে। তিনজনে সর্বদা একসঙ্গেই ঘোরে - থ্রি মাস্কেটিয়ার্স”, বলে একটু হাসলেন। অথচ আমরা নিশ্চিত সামনের বাঁদিকের সিটে কেউ নেই।

আমরা যতটা অবাক হয়েছি, আমি অন্ততঃ তার থেকে বেশি ভয় পেয়েছি। মনে হচ্ছিল, দরজা খুলে চলন্ত গাড়ি থেকে লাফ দিই। কিন্তু সে তো আর সম্ভব নয়! তবে একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেল, অশরীরী যিনি, তিনিও এই কলেজেই কাজ করেন। একসঙ্গে আসেন, এক সঙ্গে ফেরেন। কিন্তু অশরীরী কলেজের কোন কাজটা করে? সনৎকাকুর কথাবার্তা কিন্তু শেষ হয়নি। তিনি গাড়ি চালাতে চালাতে অনর্গল বকবক করে যেতে লাগলেন। সে কথাগুলো কিন্তু নিজের মনে কথা বলা নয়, ঠিক যেন অন্য কারো সঙ্গে কথার পিঠে কথা বলছেন। মাঝে মাঝে হাসছেনও। সারা রাস্তা আমরা কেউই একটাও কথা বললাম না। আমি তো ভয়ে কাঠ হয়ে বসে বসে সনৎকাকুর কথা শুনতে লাগলাম, আর কতক্ষণে পাড়ায় পৌঁছোব সেই চিন্তা করতে লাগলাম।

অবশেষে আমরা পাড়ায় ঢুকলাম এবং প্রত্যেকদিনের মতোই সনাতনদার দোকানের সামনে গাড়িটা দাঁড়াতেই, আমরা তিনজনেই হুড়মুড়িয়ে নেমে পড়লাম। সনৎকাকু রোজকার মতো আজও বাঁহাত নেড়ে বললেন, “ও কে, কাল আবার দেখা হবে”। তারপর হাত বাড়িয়ে দরজা বন্ধ করতে করতে বললেন, “ও, তোমরাও নেমে পড়লে নাকি?”

শরৎ একটু তোৎলাতে তোৎলাতে বলল, “এই তো এইটুকু আ-আমরা হেঁ-হেঁটেই যাবো, থ্যা-থ্যাংকিউ কাকু”।

সনৎকাকু শরতের মুখের দিকে তাকালেন, তারপর বললেন, “কি ভয় পেয়ে গেছ নাকি?” তারপর একটু হেসে আবার বললেন, “শোনো, এক কাজ করো, এই রোববার বিকেলের দিকে তোমরা তিনজনেই আমার বাড়ি চলে এসো। কিছুটা যখন জেনেই গেছ, পুরোটা না জানলে ভয় পাওয়ারই কথাকিন্তু তোমাদের মতো ছেলেরা ভয় পেলে চলবে...?”

সনৎকাকু আরো কিছু হয়তো বলতেন, কিন্তু সময় পেলেন না। এই সময় তাঁর গাড়ির পেছনে একটা সাইকেল রিকশ এসে এমন প্যাঁক প্যাঁক ভেঁপু বাজাতে লাগল, সনৎকাকুর দাঁড়ানোর উপায় রইল না। গাড়ি চালু করতে করতে সনৎকাকু বললেন, “রোববার বিকেলে, আমি ওয়েট করব”। শরৎ বলল, “আচ্ছা, যাব”।

সনাতনদা আমাদের তিনজনকে সনৎকাকুর গাড়ি থেকে নামতে দেখে দোকান ছেড়ে দৌড়ে এলেন। বললেন, “কী ব্যাপার বল তো? মনে হচ্ছে তোমরা কিছু একটা করে ফেলেছ? কিছু বুঝতে পারলে?”

শরৎ কিছু বলতে যাচ্ছিল, দীপু শরতের হাত ধরে থামাল, বলল, “এখনও কিছুই হয়নি সনাতনদা, রোববার বিকেল অব্দি অপেক্ষা করতে হবেতারপর যা হবার হবে!”

সনাতনদা আঁতকে উঠলেন, বললেন, “বলো কী? খী সর্বনাআআশ, তাহলে কী হবে গো!”

 

 

রোববার বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ আমরা তিন মূর্তি হাজির হলাম সনৎকাকুর বাড়ি। দীপু দরজায় বেল টিপতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই সনৎকাকু দরজা খুলে বললেন, “এসো ভেতরে এসো, তোমাদের জন্যেই ওয়েট করছিলামযে যেমন পার চেয়ারে বসে পর” বসার ঘরে ঢুকে বইয়ের স্তূপের ফাঁকে ফাঁকে রাখা চেয়ারে আমরা বসলাম, সনৎকাকু বসলেন একটা সোফায়। সেই সোফারও অধিকাংশই বইয়ে বোঝাই। আমরা কেউ কোন কথা বললাম না।

সনৎকাকু আরাম করে বসে, আমাদের তিনজনের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “সেদিন গাড়িতে আসার সময় তোমাদের লক্ষ্য করছিলাম। সন্তোষ আর শরৎ একটু ভিতু টাইপের আছ, না? কিন্তু দীপাঞ্জন একদম স্টেডিতখনই আমার মনে হয়েছিল, তোমাদের আসল ব্যাপারটা বলা উচিৎ। কারণ আজ তোমরা জেনেছ। এবং জেনেশুনেই তোমরা সেদিন কলেজস্ট্রিট গিয়েছিলে, আমার গাড়িতে চাপবে বলে, কি তাই না?” সনৎকাকুর কথায় আমরা লজ্জা পেয়ে, নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম।

সনৎকাকু বললেন, “আরেঃ, লজ্জা পাচ্ছ কেন? তোমাদের কৌতূহল হবে না তো কী নব্বই বছরের বুড়োদের হবে? নাকি তোমরা ল্যাম্প পোস্ট বা শহীদ বেদীর মত, নির্বিকার উদাসীন হবে? তোমাদের এই সরল কৌতূহল দেখেই আজ আমি তোমাদের ডেকেছি, সব বলব বলে। সন্তোষ আর শরৎকে ভিতু বললাম ঠিকই, কিন্তু ততটা নয়। সনাতন যেমন, রোজই দেখে, আর ভয়ে চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে থাকে। এটা যদি কলকাতা শহরের জোরালো আলোওয়ালা গলি না হয়ে, গাঁয়ের অন্ধকার মেঠো পথ হত, সনাতন নির্ঘাৎ ভূত ভূত করে ভিরমি খেত। যাগ্‌গে, যে জন্যে তোমাদের ডাকা, সেই কথাটাই এবার বলি”।

একটুক্ষণ চুপ করে থেকে সনৎকাকু বলতে শুরু করলেন, “কাঞ্চন আর আমি। ঠিক তোমাদেরই মতো ভীষণ বন্ধু, স্কুলের এক্কেবারে নিচু ক্লাস থেকে। লেখাপড়াতে মন্দ ছিলাম না, আবার দুষ্টুমি-ফচকেমি যে একেবারেই করতাম না, তাও না। এক কথায় আমরা গুড বয় কিংবা ব্যাড বয় কোন দলেই নই, কিন্তু বলতে পারো স্ট্যাণ্ডার্ড-বয় ছিলাম।

আমরা ওপার থেকে চলে আসা বাঙাল তো, তাই কলকাতা ছাড়া আমাদের কোন বাড়ি নেই। কিন্তু কাঞ্চনরা ঘটি, ওদের হুগলিতে দেশের বাড়ি ছিল, ছিল কেন বলছি, এখনও আছেকাঞ্চনরা স্কুলের গরমের ছুটিতে প্রত্যেকবারই দেশের বাড়ি যেত। ওর সঙ্গে যাওয়ার জন্যে আমি বাড়িতে বায়না করলেও, কোনদিন অনুমতি পাইনি। কিন্তু যেবার মাধ্যমিক দিলাম, সেবার অনুমতি মিলল। সে বছর থেকে আমার মা-বাবা আমার গায়ের ছেলেমানুষী গন্ধটা হয়তো আর পাননি! অতএব, কাঞ্চনের সঙ্গে প্রথমবার ওদের দেশের বাড়ি, গ্রামের বাড়ি ঘুরতে চললাম।

প্রথম কদিন বেশ মজাতেই কাটল। সবই কেমন নতুন ধরনের। ওদের বাড়ি, গ্রামের পুকুর, পুরোন কারুকার্যওয়ালা ভাঙা মন্দির, খেত, খামার, ধানের গোলা, গরুরগাড়ি – যা দেখছি অবাক হয়ে যাচ্ছি। ওদের বাড়ির সবার সঙ্গেই খুব ভাব হয়ে গেল, বড়োরাও খুব আদর যত্ন করতে লাগলেন। এর মধ্যেই পরিচয় হল, কাঞ্চনের ছোটকার সঙ্গে। অদ্ভূত লোক, কিছুটা খ্যাপাটে ধরনের। কিন্তু কাঞ্চনের মুখে শুনেছি দারুণ জিনিয়াস। বাড়ির বাইরের দিকের একটা ঘরে সারাদিন কী সব নিয়ে গবেষণা করতেন। চান, খাওয়া আর ঘুমোনোর সময় ওই ঘরের দরজায় তালা দিয়ে, তবে বাইরে আসতেন। আমি একদিন বায়না করলাম, ছোটকা তুমি কী নিয়ে গবেষণা করছো, দেখাও। প্রথমে না, না, করছিলেন, অনেকবার ঝুলোঝুলি করার পর রাজি হলেন। বললেন, ঠিক আছে, তুই আর কাঞ্চন কাল সকালে আটটা নাগাদ আসবি, কিন্তু ঠিক মিনিট পনেরর জন্যে।

পরদিন সকালে আমি আর কাঞ্চন ওঁনার ঘরে গেলাম। বন্ধ দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ করতে উনি দরজা খুলে ভেতরে আসতে বললেন, আমরা ঢোকা মাত্র আবার দরজা বন্ধ করে দিলেন। তারপর পইপই করে বললেন, কোন জিনিষে যেন হাত না দিই। আমরা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। বিশাল একটা টেবিলের ওপর নানারকমের কাচের ফ্লাস্ক, বিকার, পিপেট, বুনসেন বার্নার, টেস্ট টিউব...তাতে নানান রঙের কেমিক্যাল। দেয়ালের ধারে কাঠের র‍্যাক। সেখানে বড়োবড়ো কাচের জারে নানা রকমের অ্যাসিড, আর কেমিক্যাল। সবার গায়ে লেবেল করে ইংরিজিতে লেখা আছে। শুধু দুটো জারের গায়ে বাংলায় লেখা - একটা জারে লেখা “নিসা”, তার পাশেরটায় “সাসা”অন্য একধারে মস্ত মস্ত খাঁচার ভেতরে প্রচুর গিনিপিগ আর ইঁদুর। গিনিপিগগুলো শান্তশিষ্ট, কিন্তু ইঁদুরগুলো ভীষণ চঞ্চল। 

আমাদের সব দেখাতে দেখাতে ছোটকা বলছিল, এখন দুটো ওষুধের ফর্মুলা আবিষ্কার করেছি। গিনিপিগ আর ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা করব। সাকসেসফুল হলেই, ব্যস্‌, কেল্লা ফতে। কিসের ফর্মুলা আবিষ্কার করেছ, ছোটকা, জিগ্যেস করতে, ছোটকা হাসল, কিছু বলল না।  অনেকবার ঘ্যানঘ্যানে বায়না করার পর বলল, কাউকে বলিস না। একটাতে বয়েস বাড়বে না। আর অন্যটাতে শরীর সর্বদাই চাঙ্গা থাকবে, কোন অসুখ করবে না। আমি বললাম সেকেণ্ডটাই ভালো, কিন্তু প্রথমটা দিয়ে কী হবে? ছোটকা উত্তেজিত হয়ে বলল, বলিস কী, বয়েস না বাড়লে লোকজন কত অ্যাক্টিভ থাকবে সেটা ভাব। কেউ বৃদ্ধ হয়ে অথর্ব হয়ে পড়বে না। আমি তর্ক করলাম না, কিন্তু ছোটকার কথাটা মনঃপূত হল না। আরও কিছুটা থাকার পরেই ছোটকা বলল, আর নয়, যা দেখার সব দেখিয়ে দিয়েছি, এবার তোরা বের হ, আমার অনেক কাজ আছে! আমাদেরও ঘরের ভেতরে থাকতে আর ভালো লাগছিল না। কী রকম বিচ্ছিরি গন্ধ ঘরের ভেতর। একদিকে এত কেমিক্যাল, তার সঙ্গে অতগুলো ইঁদুর আর গিনিপিগের গন্ধ মিশে উৎকট একটা গন্ধ, বন্ধ ঘরের ভেতরে।

দরজার কাছে এসে ছোটকাকে জিগ্যেস করলাম, ওই “নিসা” আর “সাসা” লেখা জার দুটোতে কী আছে, ছোটকা? ছোটকা বলল, ওদুটো আমার নয়, আমার এক স্যারের বানানো। প্রথমটায় অদৃশ্য হওয়া যায়, দ্বিতীয়টায় আবার ফিরে আসা যায়। আমি আর কাঞ্চন দুজনেই বলে উঠলাম, আরিব্বাস। ও ছোটকা আমাদের একটিবার টেস্ট করাও। ছোটকা দারুণ রেগে গিয়ে বলল, বেরো আমার ঘর থেকে, ফাজলামি পেয়েছিস? ওটা কী চা না কফি, যে টেস্ট করবি? বলেই আমাদের দুজনকে ঘর থেকে ঠেলে বের করে দিয়ে, দরজায় খিল তুলে দিল।

ছোটকা আমাদের ধমকে বের করে দিল ঠিকই, কিন্তু আমাদের মাথায় ওটাই বসে গেল। যে করে হোক একবার ট্রাই করতেই হবে। অদৃশ্য হওয়ার মজাটা কেমন দেখতেই হবে।

দুজনে মিলে অনেক আলোচনা করে আমরা ঠিক করলাম, রাত্রে ছোটকা ও ঘরে তালা দিয়ে এ বাড়িতে যখন শুতে আসে, তখনই কাজটা সারতে হবে। ছোটকার থেকে চাবি চুরির দায়িত্ব কাঞ্চনের”

দীপু জিজ্ঞাসা করল, “সনৎকাকু, গাড়িতে আপনার সঙ্গে যিনি যাওয়া আসা করেন, তিনিই কী সেই কাঞ্চনকাকু?”

সনৎকাকু বিষণ্ণ হেসে বললেন, “ঠিকই ধরেছ। ওই দিন রাত্রে চাবি চুরি করে, আমরা দুটো কাঁচের বোতল ভরে “নিসা” আর “সাসা” নিয়ে এসেছিলাম। পরের দিন সকালে জলখাবারের পর, দুজনে দু ঢোঁক করে “নিসা” খাওয়ার পর সত্যিসত্যিই অদৃশ্য হয়ে টই-টই করে ঘুরে বেড়ালাম গোটা গ্রাম। ওফ্‌, কী আনন্দ যে হয়েছিল, সে আর বলার নয়।

কাঞ্চনদের গাঁয়ে এক খিটখিটে বুড়ি ছিল, তিনকূলে তার কেউ নেই। সারাক্ষণ খেটে মরত আর গাল পাড়ত পাড়া-প্রতিবেশীর ছেলে-বউদের। সবাই অতিষ্ঠ। সেই বুড়ি পাড়ার টিউবওয়েল টিপে জল ভরছিল বালতিতে, আমরা বার বার সে বালতি উলটে দিচ্ছিলাম। বেশ কয়েকবার এমন হওয়ার পর বুড়ি হাত-পা ছুঁড়ে ডুকরে কেঁদে উঠল, “আ মা গ...এ কোন ভূতের পাল্লায় পড়িছি গ...বারবার আমার আমার বালতি উলটে দিতেছে...”বুড়ি খুব জব্দ হয়েছিল সেদিন। তারপর অবিশ্যি আমি আর কাঞ্চন বালতি ভরা জল রেখে এসেছিলাম বুড়ির ঘরের দাওয়াতে।

হারু গয়লা দুধ দোওয়ার সময় বাছুরটাকে একটু দূরে খোঁটায় বেঁধে রেখেছিল, যাতে সে এসে মায়ের দুধ সব খেয়ে না ফ্যালে। আমরা বাছুরের বাঁধনটা খুলে দিলাম। বাছুরটা দৌড়ে গিয়ে জোর সে ঢুঁ মারল হারু গয়লার পিঠে। হারু গয়লা খুব অবাক হল, বলল, “হতভাগা, কী করে ছাড়া পেলি র‍্যা?” উঠে গিয়ে বাছুরটাকে টেনে সরিয়ে আবার খোঁটায় বেঁধে রাখল। আমরাও আবার খুলে দিলাম! হারু ভীষণ অবাক হয়ে ভ্যাবলা তাকিয়ে বসে রইল, বাছুরটাকে বলল, “তরে আজ ভূতে পেইছে নাকি র‍্যা?” বাছুরটা মহানন্দে মায়ের দুধ খেতে লাগল, আর তার মাও খুব খুশিতে বাছুরের গা চাঁটতে লাগল।   

কিন্তু গোল বাধল ফিরে এসে “সাসা” খাবার সময়। আমি দু ঢোঁক খেয়ে বোতলটা কাঞ্চনকে দিতে যাব, সে সময়েই ঘরে ঢুকল, ছোটকা। চেঁচিয়ে উঠে জিগ্যেস করল, কী খাচ্ছিস রে, সনৎ, কাঞ্চন কই? ছোটকার গলা পেয়ে কাঞ্চন এমন চমকে উঠল, বোতলটা দিল ফেলে। মেঝেয় পড়ে ঠাস্‌ করে বোতলটা ভেঙে “সাসা” গড়াতে লাগল মেঝেয়। কী ভয়ংকর কাণ্ড হল চিন্তা করে, আমি ছোটকাকে বললাম, “ছোটকা তোমার ঘর থেকে শিগ্‌গির “সাসা”-র জারটা নিয়ে এস। তা নাহলে কাঞ্চনকে সারা জীবন অদৃশ্য থাকতে হবে”।

ছোটকা আমার চারপাশে কাঞ্চনকে খুঁজতে খুঁজতে বললেন, “সর্বনাশ যা হবার হয়ে গেছে। তার মানে তোরাই গতরাত্রে আমার ঘরে ঢুকেছিলি, ও দুটো চুরি করতে! ইঁদুরের গন্ধ পেয়ে একটা বেড়ালও ঢুকেছিল, তোদের পিছনে, সেটা আর লক্ষ্য করিসনি। তোরা বেরিয়ে আসার পরও, বেড়ালটা ঘরেই ছিল। বেরোতে না পেরে সারা রাত গোটা ঘরে হুলস্থূল কাণ্ড করেছে। “নিসা” এবং “সাসা” দুটো জারই মেঝেয় পড়ে ভেঙে গেছে। কাঞ্চনকে দেখতে পাওয়ার আর আশা নেই”। বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়লেন ছোটকা। আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কাঞ্চনও চেঁচিয়ে উঠল, “ছোটকা, কী বলছ তুমি? তাহলে আমার কী হবে?”

ছোটকা কাঞ্চনের কথা শুনতে পেল না, কাঁদতে কাঁদতে আক্ষেপ করতে লাগল, “কেন যে তোদের ঘরে ঢুকিয়ে সব দেখাতে গেলাম”!

দু-একদিন পরেই আমরা সবাই ফিরে এলামকাঞ্চনও এল, কিন্তু ওকে দেখা গেল না। বছর সাত-আটেক আগে কাঞ্চনের বাবা-মাও পরপর চলে গেলেন। এখন আমি ছাড়া কাঞ্চনের আর কেউ নেই।

ওদের বাড়িতে নীচের ঘরে ও একলাই থাকে। এ বাড়ি থেকে সিধুদা গিয়ে ওকে খাবার-দাবার দিয়ে আসে। সিধুদা আমাদের বাড়িতে আছে বহু বছর। কাঞ্চনকে খুব ভালও বাসে।  ছুটির দিনে কাঞ্চন নিজেই চলে আসে এ বাড়িতে। আমার সঙ্গেই ও কলেজে যায়, ওখানেই ঘোরাঘুরি করে, তা নইলে সারাদিন সময় কাটাবে কী করে...! আমাদের ছোট্ট একটা ভুলের জন্যে কাঞ্চনের জীবনটা ধ্বংস হয়ে গেল। এবং তার জন্যে সম্পূর্ণ দায়ি আমিই!”

সনৎকাকু মাথা নীচু করে বসে রইলেন অনেকক্ষণ। ওঁনার দু চোখে জল।

একটু পরে দীপু বলল, “কাকু, ওই “নিসা” মানে কী নিরাকার সালসা?”

সনৎকাকু আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কী করে জানলে? ঠিকই বলেছ। কাঞ্চনের ছোটকার মুখে পরে শুনেছিলাম“সাসা” মানে সাকার সালসা”

দীপু বলল, “আমাদের চিলেকোঠার ঘরে, আমার দাদামশাইয়ের একটা বিরাট ট্রাংক রাখা আছে। শুনেছি তিনি খুব নাম করা বৈদ্য ছিলেন। নাম চণ্ডীপ্রসাদ সেনশর্মা। বহুদিন হল তিনি মারা গেছেন, তখন আমি খুবই ছোট! ওই ট্রাংকে আমি দাদুর হাতে লেখা অনেকগুলি খাতা দেখেছি।  যার মধ্যে ওই সালসা, মানে ওষুধদুটোর নামও পড়েছিলাম”।

হঠাৎ সনৎকাকু বাঁদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে কী যেন শুনলেন, তারপর বললেন, “তোমাদের বলা হয়নি, আমার পাশেই কাঞ্চন বসে আছে। এতক্ষণ সে আমাদের সব কথাই শুনছিল। দীপুর দাদামশাইয়ের নাম শুনে ও বলছে, উনিই ছিলেন কাঞ্চনের ছোটকার গুরু। ওই খাতা যদি, ওর ছোটকার হাতে দেওয়া হয়, ওর ছোটকা হয়তো আবার সাসা বানিয়ে ফেলতে পারবেন। তাহলে কাঞ্চনকে আবার সবাই দেখতে পাবে! অবিশ্যি তোমার, বা তোমার বাবা-মায়ের ওই খাতাগুলো দিতে যদি কোন আপত্তি না থাকে!”

দীপু বলল, “আমার মনে হয়না মা-বাবার কোন আপত্তি হবে। এমনিতেই ওই বই নিয়ে আমরা আর কী করবো? তাছাড়া সত্যিই যদি ওই ওষুধ খাইয়ে কাঞ্চনকাকুকে দেখতে পাওয়া যায়, তার থেকে আনন্দের আর কী হতে পারে?”

শরৎ বলল, “তুই দেখে নিস, দীপুওই ওষুধেই কাজ হবে। এ সবই কাঞ্চনকাকুর ভাগ্য। তা নইলে সনাতনদা আমাদেরই প্রথম এসব কথা বলবেন কেন? আর আমরাই বা কৌতূহলী হয়ে সনৎকাকুর পিছু নেব কেন?”

সনৎকাকু বললেন, “কাঞ্চন তোমাদের বলতে বলছে, আজ থেকে তোমরাও ওর বন্ধু”।

 

 

পরের শনিবারেই ভোর ভোর আমরা সনৎকাকুর গাড়িতে রওনা হলাম কাঞ্চনকাকুর দেশের বাড়ির উদ্দেশে। অবিশ্যি সেটা খুব সহজ হয়নি। বাড়ির অনুমতি পেতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। শেষ অব্দি কাঞ্চনকাকুর কথা শুনে এবং সনৎকাকু আমাদের বাড়ি এসে অনুরোধ করাতে আমাদের বাবা-মায়েরা নিমরাজি হলেন। দীপুকে অবিশ্যি খুব বেগ পেতে হয়নি। ওর দাদামশাইয়ের ডায়রি পড়ে দীপুর বাবা নাকি বলেছিলেন “স্ট্রেঞ্জ”, তারপর অনুমতি দিয়ে বলেছিলেন, “এমন যে হতে পারে, সেটা অবিশ্বাস্য। কিন্তু এসব জিনিষ বাজারে চালু হয়ে গেলে বিপদ। শয়তান লোকেরা এ জিনিষের অপব্যবহার করে নানান দুষ্কর্ম করবে। সনৎবাবু, আমার অনুরোধ কাঞ্চনবাবু ফিরে আসুন, কিন্তু তারপরে এ জিনিষ নষ্ট করে দেওয়াই ভালো। ওই সালসা আর ওই ডায়রি– দুটোই। এমনিতেই মানুষের বিপদ-আপদের শেষ নেই। তার ওপর আরও বিপদ না বাড়ানোই ভাল”।

সকাল সাড়ে নটা নাগাদ আমরা কাঞ্চনকাকুর দেশের বাড়ি পৌঁছলাম। সনৎকাকু গাড়ি থেকে নেমে চার দিকে তাকিয়ে আক্ষেপের সুরে বললেন, “এঃ কী অবস্থা হয়েছে রে, কাঞ্চন। সেই জমজমাট বাড়ির এই অবস্থা! সবই কেমন জরাজীর্ণ আর দৈন্য দশা”। সনৎকাকুর ডাক শুনে বৃদ্ধ এক ভদ্রলোক বেড়িয়ে এলেনসনৎকাকু প্রণাম করতে আমরাও সবাই প্রণাম করলাম। বৃদ্ধ খুব অবাক হয়ে বললেন, “আপনাদের কাউকেই চিনতে পারলাম না তো”!

সনৎকাকু বললেন, “প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগেকার কথা, কাকু, চিনতে পারবেন কী করে? আমি সনৎ আপনার ভাইপো কাঞ্চনের বন্ধু, মনে পড়ছে, কাকু?” বৃদ্ধ বেশ অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন সনৎকাকুর দিকে, তারপর খুব আক্ষেপের সুরে বললেন, “মনে পড়বে না, আবার? ওই ঘটনার পরেই তো এ বাড়ির এমন দুর্দশা শুরু হল। বড়দা আর বড়বৌদি কোনদিনই আমাকে ক্ষমা করতে পারেননি আজও আমি তাঁদের অভিশাপ বয়ে চলেছি”

কথা বলতে বলতে আমরা বাড়ির ভেতরে ঢুকলাম, একটা ঘরে আমরা সবাই বসলাম, বৃদ্ধ আমাদের উল্টোদিকে বসে জিজ্ঞাসা করলেন, “তা এতদিন পরে হঠাৎ কী মনে করে?” সনৎকাকু বললেন, “আমার সঙ্গে কাঞ্চনও এসেছে, কাকু। আপনিই পারেন ওকে আবার সাকার করে তুলতে”। বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন, “ও সব আমি বহুদিন ছেড়ে দিয়েছি, সনৎ। আর আমি ওই সালসা বানাব কী করে? আমি তো তার ফর্মুলা জানি না”।

“আপনার শ্রীযুক্ত চণ্ডীপ্রসাদ সেনশর্মার কথা মনে আছে তো?” সনৎকাকু বললেন। 

বৃদ্ধ দু হাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে বললেন, “ওফ্‌, তিনি তো নমস্য পূজনীয় ব্যক্তি, আমার গুরুদেব ছিলেন”। 

“আমাদের এই দীপুর দাদামশাই ছিলেন, শ্রীযুক্ত চণ্ডীপ্রসাদতাঁর বেশ কিছু ডায়রি ওদের কাছে রয়ে গেছে। তার মধ্যে ওই সালসা বানানোর কথা লেখা আছে” বৃদ্ধ অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলেন, আমাদের সকলের দিকে, তারপর বললেন, “কই দেখি”? দীপু তার ব্যাগ থেকে দুটো ডায়রি বের করে বৃদ্ধের হাতে দিল। বৃদ্ধ হাতে নিয়ে দু চারপাতা উল্টে বললেন, “আরেঃ কী আশ্চর্য, এতো তাঁরই হাতে লেখা ডায়রি! এতদিন পর তাঁর লেখা ডায়রি আমাদের হাতে এসে পড়বে, এতো অবিশ্বাস্য”। বৃদ্ধ ডায়রির মধ্যে ডুবে গেলেন। মন দিয়ে অনেকগুলি পৃষ্ঠা পড়ার পর, হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, “ওফ্‌, এতদিনে  আমার শাপমুক্তি হবে। বড়দা আর বড়বৌদি ওপর থেকে আমাকে আশীর্বাদ করবেন। কাঞ্চনকে আমরা আবার দেখতে পাবো”! বলতে বলতে বৃদ্ধ ডায়রি দুটো হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে, আমাদের কথা তাঁর মনেও রইল না।

আমরা হতভম্ব হয়ে বসে রইলাম অনেকক্ষণ, অবিশ্যি বৃদ্ধের মনের অবস্থাটাও আমরা সকলেই অনুভব করতে পারলাম। এমন সময় ঘরে এলেন, এক বৃদ্ধা, ঢুকেই জিজ্ঞাসা করলেন, “কাঞ্চন এসেছিস? ছোড়দা বলছিল!”

“হ্যাঁ পিসিমা, কাঞ্চন এসেছে, আমি কাঞ্চনের বন্ধু সনৎ”। বৃদ্ধা সন্দেহের চোখে জিজ্ঞাসা করলেন,

“তুমি কী করে চিনলে, আমি কাঞ্চনের পিসিমা?”

“কাঞ্চন পাশেই রয়েছে যে, ওই বলল। তা নইলে আমি আর চিনব কী করে বলুন। পঁয়ত্রিশ বছর পর দেখা”।

“কাঞ্চন রয়েছিস?” বলেই বৃদ্ধা কেঁদে ফেললেন, ধরা গলায় বললেন, “দেখতে না পাই রয়েছিস জেনেই বড়ো স্বস্তি পেলাম, বাবা। যা, তোরা সব মুখে হাতে জল দিয়ে আয়, আমি জলখাবারের ব্যবস্থা করি”।

 

সেই সকালের পর থেকে আমরা আর বৃদ্ধের দেখা পেলাম না। আমরা জলখাবার সেরে গ্রামটা একটু ঘুরে দেখে এলাম। দুপুরের খাওয়ার সময়েও বৃদ্ধ এলেন না, সনৎকাকু জিজ্ঞাসা করাতে বৃদ্ধা বললেন, “ছোড়দার খাবার আমি ওর ঘরেই দিয়ে এসেছি তবে মনে হয় না খাবে বলে, কাঞ্চনের ওষুধ বানাতে পারলে, ছোড়দা বলল, তবেই জলস্পর্শ করবেঠাকুর নিশ্চয়ই মুখ তুলে চাইবেন”। সত্যি বলতে আমাদেরও খুব টেনশান হচ্ছিল। আজ দুবার - জলখাবার আর দুপুরের খাওয়ার সময়, অদৃশ্য কাঞ্চনকাকুর সামনে রাখা খাবারের থালা খালি হয়ে যেতে দেখে, সত্যিই অদৃশ্য থাকার কষ্ট কিছুটা যেন টের পেলাম। একই সঙ্গে বেশ ভয়-ভয় মাখা কষ্টের এমন অনুভূতি জীবনে কোনদিন পাইনি! আর ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি, এমন অভিজ্ঞতায় তোমাদের যেন কখনো পড়তে না হয়

রাত্রে কাঞ্চনকাকুর পিসিমা আমাদের খেতে ডাকতে, সবাই খাবার ঘরে গেলাম। দেখলাম সকলের জন্যেই আসন পাতা রয়েছে, তার সামনে ভাত-তরকারি সাজানো থালা। বৃদ্ধা হাত দিয়ে একটা আসন দেখিয়ে বললেন, “কাঞ্চন এটায় বস, আর প্রথমেই এক চুমুকে এই বাটির জলটা খেয়ে নে”। বাটিটা শূণ্যে উঠে গেল এবং বাটির জল শেষ হতে না হতে, আমাদের সামনে উপস্থিত হল, সম্পূর্ণ অচেনা এক ব্যক্তি। এমন আশ্চর্য ঘটনা জীবনে আর দেখতে পাবো বলে মনে হয় না। সনৎকাকু এবং বৃদ্ধা দুজনেই একসঙ্গেই বলে উঠলেন, “কাঞ্চন?” অচেনা ব্যক্তিও অবাক হয়ে তাকালেন, বললেন, “তোমরা আমায় দেখতে পাচ্ছো, ছোট পিসিমা?”

“দেখতে তো পাচ্ছি, কিন্তু তুই আমাদের সেই কাঞ্চন তো? এমন বয়স্ক হয়ে গেলি কী করে?”

“হবো না? তোমাদের বয়েস বেড়েছে, আর আমার বাড়েনি? তোমাদের চোখে আমার সেই পনের বছরের চেহারাটাই তো রয়ে গেছে!” বৃদ্ধা কাঞ্চনকাকুর মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে ডাকলেন, “ছোড়দা, দেখে যাও, তোমার সালসায় কাঞ্চনকে আবার আমরা ফিরে পেয়েছি”। বৃদ্ধ দরজায় এসে দাঁড়ালেন। কাঞ্চনকাকুর দিকে তাকিয়ে অবিশ্বাসের সুরে জিগ্যেস করলেন, “সত্যিই তুই কাঞ্চন”? তারপর যা হল তাতে আমাদের সকলের চোখেই জল এসে গেল। কাঞ্চনকে বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধা দুজনেই বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বৃদ্ধ বললেন, “এতদিনে তোর সঙ্গে আমারও শাপমুক্তি হল রে। বড়দা-বৌদি নিশ্চয়ই আমাকে এবার ক্ষমা করে দেবেন”।

**

 পরের দিন দুপুরের খাওয়া সেরে আমরা কলকাতার দিকে রওনা দিলাম, সামনের সিটে সনৎকাকুর পাশে আমিই বসলাম। কারণ এবারে কাঞ্চনকাকু আমাদের সঙ্গে ফিরলেন না। বললেন, “আমি আর কলকাতায় গিয়ে কী করবো? বরং এখানেই থেকে বুড়োবুড়ির সেবা করি। তবে সনৎ আর তোমরা সবাই লম্বা ছুটি নিয়ে এখানে চলে আসবে। দীপু, সন্তু আর শরৎ তোমাদের কাছে আমাদের ঋণের শেষ নেই। আমি কলকাতায় যাবো, তোমাদের বাবা-মাকেও আমাদের এখানে নিয়ে আসবো”। আসার পথে আমাদের কেউই কোন কথা বলিনি, সকলেই অদ্ভূত এই অভিজ্ঞতার চিন্তায় ডুবে রইলাম।

..০০..

 এর পরের ছোটদের গল্প - " পায়রা "


শনিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৫

ধর্মাধর্ম - ১/২

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "




আগের পর্ব এই সূত্রে - ধর্মাধর্ম - ১/১


প্রথম পর্ব (৭০,০০০ বিসিই থেকে ১২,০০০ বিসিই) 

২য় পর্বাংশ

১.২.২ বিজ্ঞানের স্ফুলিঙ্গ

তবে অবরে সবরে ইরেক্টাসদের কপাল অবিশ্যি খুলেও যেত। যেমন হয়েছিল সেদিন। সকাল সকাল অরণ্যে খাদ্য সন্ধানে[1] গিয়ে হঠাৎ তাদের চোখে পড়ল দলছুট একলা এক বুনো শুয়োর[2] ঝোপঝাড়ের আড়ালে বড়ো এক পাথরে পিঠ দিয়ে সেটা শুয়ে আছে। পশুটার লক্ষণ দেখে দলের বয়স্ক এবং অভিজ্ঞরা বুঝে গেল এর আয়ু বেশিক্ষণ নেই। পশুটার যথেষ্ট বয়েস হয়েছে, হয়তো তার নিজেরই দলের যুবক বরাহের সঙ্গে প্রাণপণ লড়াইতে মারাত্মক জখম হয়েছে। সে এখন অত্যন্ত দুর্বল - মৃত্যুর প্রহর গুনছে। ভাগ্য ভাল এখনও কোন হায়না বা শৃগাল এর সন্ধান পায়নি, রক্তের গন্ধে তারা যে কোন মূহুর্তে চলে আসতে পারে, আর তাহলেই এমন সুযোগ ফেলে পালাতে হবে ইরেক্টাসদের।

ইরেক্টাসদের দল একহাতে লাঠি বা বাঁশ নিয়ে চটপট ঘিরে ধরল শুয়োরটাকে। অন্য হাতে মাটিতে পড়ে থাকা পাথরের টুকরো তুলে দাঁড়িয়ে রইল। সকলেই উত্তেজনায় টানটান, অপেক্ষা করতে লাগল সর্দারের সংকেতের। এবং সংকেত আসতেই সকলে একসঙ্গে ছুঁড়তে শুরু করল পাথরের টুকরো। চার-পাঁচজন সতর্ক ভঙ্গিতে আরও এগিয়ে গেল পশুটার দিকে, তারপর পশুটার পিঠে মাথায় লাঠির বাড়ি লাগাতে শুরু করল দমাদ্দম। দুর্বল পশুটা এবার ভয় পেল, তার ঘোলাটে চোখে এখন যুগপৎ রাগ এবং ভয়। কোনরকমে সে উঠে দাঁড়াল, তারপর পাথরের টুকরোর আঘাতে অতিষ্ঠ হয়ে দৌড় লাগাল ইরেক্টাসদের ব্যূহ ভেদ করে। প্রথমে একটু হকচকিয়ে গেলেও ইরেক্টাসের দল তাড়া করে গেল দুর্বল শুয়োরটার পিছনে, পিছনে রয়ে গেল মাত্র দুজন।

শুয়োরটা পালানোর সময় তার দাঁতের আঘাতে জখম করে দিয়েছে একজন ইরেক্টাসকে, সে মাটিতে পড়ে কাতরাতে লাগল, তার উরুর ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছে দরদর করে। তার এই অবস্থা দেখে তরুণ এক ইরেক্টাস, ওখানেই রয়ে গেল। আশেপাশের ঝোপঝাড় থেকে লতাপাতা, এনে চটপট প্রলেপ বানিয়ে ঢেকে দিল আহতের ক্ষত। রক্ত ক্ষরণ বন্ধ হতে আহত মানবটি আচ্ছন্ন অবস্থায় শুয়েই রইল ঘাসে। তরুণ বসে রইল আহতের পাশে, সে এখন কিছুটা নিশ্চিন্ত। তার দলের লোকেরা শুয়োরটাকে মেরে নিশ্চয়ই তাড়তাড়ি ফিরবে, ততক্ষণ আহত লোকটিকে নিয়ে তাকে ওখানেই অপেক্ষা করতে হবে।

হঠাৎই তার নাকে এসে লাগল শুকনো পাতা-ডালাপালা পোড়ার গন্ধ। এ গন্ধ সে চেনে, অরণ্যে আগুন লাগলে দূর থেকে এই গন্ধেই তারা টের পায়। আতঙ্কে সে উঠে দাঁড়াল, কোনদিকে কোথায় আগুন লেগেছে? তার দল কে জানে অরণ্যের কতদূরে ঢুকে পড়েছে, সে এখন কী করবে? আহত লোকটিকে নিয়ে সে কোন দিকে যাবে? অসহায় ভয়ে চারপাশে খুঁজতে খুঁজতে, সে দেখতে পেল, বুনো শুয়োরটা যে বড়ো পাথরে পিঠ দিয়ে শুয়েছিল, তার সামনের ঝোপঝাড়গুলিতে আগুন ধরেছে, বড়সড়ো নয়, ধিকিধিকি জ্বলছে, তারই হাল্কা ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে।

তার মনে হল, এই আগুন বাড়তে বাড়তে তাদের হয়তো গ্রাস করবে। প্রচণ্ড আতঙ্কে সে চিৎকার করে উঠল, তারপর উন্মাদের মতো, পাথর ছুঁড়তে লাগল জ্বলতে থাকা ঝোপগুলোর দিকে। রাগে চিৎকার করতে করতে বেশ অনেকক্ষণ পাথর ছোঁড়ার পর, সে হঠাৎই লক্ষ্য করল আগুন আর জ্বলছে না, ধোঁয়াও বন্ধ হয়েছে। ভারি অবাক হল, আগুন কী নিভে গেল? আগুন কী নেভানো যায়? ঠিক বিশ্বাস হল না যেন। সন্তর্পণে ঝোপের কাছে এগিয়ে গিয়ে সে দেখল, তার ছোঁড়া পাথরের স্তূপের মধ্যে আগুন সত্যিই নিভে গেছে।

একটু নিশ্চিন্ত হয়ে সে নিচু হয়ে কয়েকটা পাথরের টুকরো হাতে নিয়ে চিন্তা করতে লাগল, জখম পশুটা যখন এই বড় পাথরটার নিচে শুয়েছিল, তখন নিশ্চয়ই আগুন ছিল না। যদি থাকত, শুয়োরটা নিশ্চয়ই এখানে নিরাপদ আশ্রয় ভাবত না। তাহলে তারপরে আগুন কী করে জ্বলল? ভাবতে ভাবতে দু হাতের দুটো পাথরে একটু ঘষাঘষি করতেই সে ভয়ে আঁতকে উঠে ফেলে দিল পাথর দুটো। কী ভয়ংকর, এই পাথরগুলোতেই যে আগুন রয়েছে!  অদ্ভূত দুই পাথরের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল তরুণ ইরেক্টাস। তারপর নিচু হয়ে বসে সেই পাথরদুটো আবার তুলে নিল হাতে। তারা নদীর ধারে যে নুড়ি পাথর সংগ্রহ করে, এই পাথরগুলো তেমন নয়। পাথরের গা অনেকটাই মসৃণ, রংটাও বেশ কিছুটা আলাদা। খুব সন্তর্পণে পাথরদুটো আবার ঘষতেই ফস করে আবার স্ফুলিঙ্গ দেখতে পেল। এবার অতটা ভয় লাগল না, বার বার ঘষতে ঘষতে বেশ বড়ো বড়ো ফুলকির ছিটে বেরোতে লাগল পাথর থেকে। মাটি থেকে তুলে এই পাথরগুলোই যখন তারা পশুটার দিকে ছুঁড়ছিল, কিছু কিছু পাথর কি অন্য পাথরে লেগে ফুলকি ছিটকে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে শুকনো ঘাস পাতায়?

হঠাৎ কিছু মনে হতে তরুণ ইরেক্টাস মাটিতে বেশ কিছু শুকনো ঘাস-কুটোকাটা-পাতা যোগাড় করে একটা স্তূপ বানাল। তারপর পাথর দুটো ঘষে শুকনো পাতার খুব কাছাকাছি ফুলকি সৃষ্টি করতে লাগল। এই ফুলকি থেকে কী শুকনো পাতা-কাঠ-কুটোয় আগুন ধরানো সম্ভব? সেটাই সে আবিষ্কার করতে চাইছিল। অনেকক্ষণ ধরে ঘষে ঘষে যখন সে অধৈর্য হয়ে উঠছিল, মনে হচ্ছিল, আগুন এভাবে জ্বলে না, জ্বলতে পারে না। “ধুস এই পণ্ডশ্রম করে আর লাভ নেই” এমনই বিরক্তিতে পাথর দুটো শেষবারের মতো জোরে ঘষতেই তার জোরালো ফুলকিতে শুকনো পাতায় আগুন ধরে গেল। ভয় পেয়ে সে প্রায় উলটে পড়ে যাচ্ছিল আর কি, কিন্তু একটু লক্ষ্য করে দেখল ভয় পাওয়ার মতো তেমন কিছু ঘটেনি। জ্বলতে থাকা শুকনো পাতার ওপর কিছু কাঠকুটো শুকনো ঘাস ধরতে সেগুলোতেও আগুন ধরে গেল। তার মানে সে ছোট্ট একটা আগুন তৈরি করতে পেরেছে, আগুনটা কিছুক্ষণ জ্বলতে দিয়ে, সে এবার পাথর দিয়ে কিছুটা মাটি চাপা দিয়ে দিতে সে আগুন নিভেও গেল সহজেই।

সেই তরুণ ইরেক্টাস বেশ মজা পেল। এতদিন সে বড়োদের মুখে শুনেছে, দু একবার নিজের চোখেও দূর থেকে দেখেছে অরণ্যের মধ্যে আগুনের তাণ্ডবলীলা। সেই আগুনই খুব ছোট্ট হয়ে, তার হাতে কী বশ মানল? সে পিছন ফিরে দেখল তার আহত সঙ্গী এখন নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে ঘাসের ওপর শুয়ে। সে ঘাসের ওপর বসে বারবার দুই পাথর ঘষে রপ্ত করতে লাগল আগুন জ্বালানো আর নেভানোর খেলা।

শেষ দুপুরে তার দলের মানবেরা যখন প্রবল হইচই করতে করতে বড়ো আর মোটা গাছের ডালের সঙ্গে লতার দড়ি দিয়ে বাঁধা বিশাল শুয়োরটাকে বয়ে আনল, ততক্ষণে সে দক্ষ হয়ে উঠেছে আগুন জ্বালানো ও নেভানোর প্রক্রিয়ায়। আর দেরি না করে বড়ো পাতায় মুড়িয়ে লতার বাঁধনে বেঁধে সে বেশ কিছু পাথর কাঁধে ঝুলিয়ে নিল। তারপর দু তিনজন মিলে আহত সঙ্গীকে নিয়ে তারা সব্বাই রওনা হল তাদের রাতের আশ্রয়ের দিকে। আজ তাদের বড়ো আনন্দের দিন। মহাভোজের আনন্দে তাদের আর যেন তর সইছিল না, তারা প্রচণ্ড উৎসাহে চিৎকার করতে করতে দৌড়তে লাগল। এই চিৎকার শুধু আনন্দের নয়, প্রবল এই চিৎকারে দূরে থাকবে পিছু নেওয়া শ্বাপদের দলও!

শিকার করা পশুকে নিয়ে বাসায় যখন তারা ফিরল, তখন প্রায় সন্ধ্যে হয়ে এসেছিল। গহন অরণ্যের কোনে কোনে জমে উঠছিল রহস্যময় রাতের আঁধার। বয়স্ক পুরুষ ও মহিলারা যাঁরা বাসাতেই থাকেন শিশু এবং বাচ্চাদের সামলাতে, তাঁরাও আজ আনন্দিত। এতবড়ো জন্তু শিকার হয়েছে, গোটা দলকে অন্ততঃ দু-তিনদিন খাদ্যের চিন্তা করতে হবে না। কিন্তু তাঁরা উদ্বিগ্ন, এখনই অন্ধকার নেমে আসবে, তখন রক্ত মাংসের গন্ধে চলে আসবে হিংস্র শ্বাপদের দল। তাঁরা সকলকে তাড়া দিলেন “তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি, ছালটাল ছাড়িয়ে বাচ্চাদের আগে খাইয়ে ওদের ঘুম পাড়াতে হবে, তারপর বড়োরা খাবে... আজ রাত জাগতে হবে সবাইকে, পাহারা দিতে হবে...তাড়াতাড়ি...”।

সেই তরুণ ছেলেটি, তার নাম দেওয়া যাক অগ্নি, হাসল, মাকে বলল, “অত চিন্তা করো না, মা। আমি ব্যবস্থা করছি। কোন বজ্জাত জন্তুর ক্ষমতা হবে না এদিকে আসার”। “তুই আবার কী করবি”, ছেলের ছেলেমানুষি কথায় মা বিরক্তই হলেন। কিন্তু সকলেই যখন মৃত পশুকে সাফ করে খাবার উপযুক্ত করে তুলতে ব্যস্ত তখন বাসার চারদিকে জ্বলে উঠল বেশ কয়েকটি অগ্নিকুণ্ড। সেই আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠল উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ। প্রথমে সকলে বেশ ভয় পেলেও একটু পরে সকলেই ভরসা পেল অগ্নির কথায় এবং কৃতিত্বে। সেদিনের গভীর রাত পর্যন্ত মহাভোজটা জমে উঠল আনন্দ-উত্তেজনায়।

কিছুটা দূর থেকে বন্য পশুদের চাপা গর্জন শোনা যাচ্ছিল, ওরাও আজ আশ্চর্য ও ভীত। দুপেয়ে এই মানবগুলো আগুন জ্বালিয়ে ফেলল কেমন করে? ওদের ডাক শুনতে শুনতে অগ্নির মা, ছেলের মাথার চুলগুলি এলোমেলো করে দিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, “জানোয়ারগুলোকে আজ খুব জব্দ করেছিস, অগ্নি। এমন রোজ পারবি তো?” অগ্নি শুয়োরের এক টুকরো মাংস চিবোতে চিবোতে বলল, “পারবো মা”।

এভাবেই মানব জীবনে কিছুটা স্বস্তি আর নিরাপত্তা এনে দিয়েছিল আগুনের ব্যবহার। কিন্তু এই যুগান্তকারী ঘটনার কোন ইতিহাস নেই।    

১.২ আগুনের সীমিত ব্যবহার

দুটো পাথরে ঠোকাঠুকি করলে ছোটখাটো যে আগুনের ফুলকি দেখা যায়, তা দিয়ে কিন্তু আগুন জ্বালানো যায় না। আগুন জ্বালানোর জন্য অনেক বড়ো ফুলকির দরকার হয়, আর যে দুটো পাথর ঘষে আগুন জ্বালানোর মতো ফুলকি তৈরি করা যেত তারা প্রধানতঃ হল ফ্লিন্ট (Flint) আর পাইরাইট (Pyrite) পাথর। এই পাইরাইট যদি লোহা মিশ্রিত হয়, তবে তার ফুলকি হয় সবচেয়ে জোরদার। চক বা চুণাপাথরের (Lime stone) মধ্যে কেলাসিত (crystallized) একটি বিশেষ কোয়ার্জ (Quartz) পাথরকে ফ্লিন্ট বলে।

 

উপরের ছবিটি প্রস্তর যুগের একটি ফ্লিন্ট পাথরের অস্ত্র[3]। এই ফ্লিন্ট পাথরের বিশেষত্ব হল, একটা বিশেষ দিক থেকে আঘাত করলে, বেশ পাতলা, মসৃণ অথচ শক্ত স্তরে ভেঙে যায়। তারপর একটু ঘষাঘষি করলে, পাথরের ধারালো অস্ত্র বানিয়ে তোলা যেত সহজেই। প্রস্তর যুগের মানুষেরা যখন পাথরের অস্ত্রশস্ত্রই বহুল ব্যবহার করত, তাদের কাছে ফ্লিন্ট পাথরের অস্ত্র ছিল সব থেকে কাজের জিনিষ। আর পাইরাইট একধরনের খনিজ পাথর, প্রধানত লোহা বা তামার সালফাইড; পাললিক (sedimentary) পাথরের স্তরে মাঝে মধ্যেই পাওয়া যায়। বহুদিন পরে মানুষ যখন লোহা আবিষ্কার করতে পেরেছিল, তখনও লোহা আর এই ফ্লিন্ট পাথরের ঘর্ষণে আগুনের ফুলকি ব্যবহার করেই আগুন জ্বালাত। সত্যি বলতে ইলেক্ট্রনিক লাইটার আবিষ্কারের আগে, সেই সেদিন পর্যন্ত আমরা যে গ্যাসলাইটারে লোহার চাকায় চাপ দিয়ে আগুন জ্বালতাম, তার নিচেয় থাকত ফ্লিন্ট পাথরের ছোট্ট একটা কুচি, যাকে চলতি বাংলায় আমরা চকমকি পাথর বলি। অতএব ইরেক্টাস প্রজাতির সেই ছোকরা মানব দৈবাৎ যে পাথরে আগুনের ফুলকি খুঁজে পেয়ে আশ্চর্য হয়েছিল, সেটি ছিল এই Flint stone-এর টুকরো।

তবে আশ্চর্যের বিষয় হল, কয়েক লক্ষ বছর ধরে ইরেক্টাস এবং নিয়াণ্ডারথাল মানব প্রজাতি নিয়মিত আগুন ব্যবহার করলেও (অধ্যায় ১.১-এর সারণি দেখুন), তারা আগুনের সীমাহীন সম্ভাবনার কথা চিন্তাই করতে পারেনি। শুরুর দিন থেকেই তারা আগুনের ব্যবহার করেছিল রাতের অন্ধকারে বন্যপশুদের আক্রমণ থেকে তাদের আশ্রয়গুলিকে নিরাপদ রাখতে। আর প্রচণ্ড ঠাণ্ডার দিনে আগুনের তাপে হাত-পা গা সেঁকে একটু আরাম উপভোগ করতে। এছাড়া আগুনের অন্য কোন ব্যবহারের নিদর্শন প্রত্নবিজ্ঞানীরা খুঁজে পাননি।

কিন্তু আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ - পঞ্চান্ন হাজার বছর আগে আগুনের আরেকটি চমকপ্রদ গুণ আবিষ্কার করে ফেলেছিল, আমাদের পূর্বপুরুষ - হোমো স্যাপিয়েন্স প্রজাতির মানুষ। সেটাও একটা দৈবাৎ ঘটনা, কিন্তু তার ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। পৃথিবীতে আমরা যে আজ শ্রেষ্ঠ এবং সব থেকে বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি, তার সূচনা হয়েছিল সেই দিনটিতেই। কল্পনায় সেদিনের ঘটনাটার দিকে একটু চোখ ফেলা যাক। তারপর আলোচনা করা যাবে এই আবিষ্কারের আশ্চর্য ফলাফলের।

১.২.১ দাবানলের অভিজ্ঞতা

এবার আমি পৌঁছে গেছি আজ থেকে পঞ্চাশ - পঞ্চান্ন হাজার বছর আগের এক রাতে। ছোট্ট এক পাহাড়ের মাথায় বসে, পাহাড়তলির জঙ্গলে আমি ভয়ংকর এক দাবানল দেখছি। আমার সামনে বেশ বড়ো একটা গুহা আর তার সামনে অনেকটা সমতল জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে হোমো স্যাপিয়েন্স প্রজাতির একটি বড়ো দল। ছেলে-মেয়ে, ছোকরা-ছুকরি, প্রৌঢ়া-প্রৌঢ়, বুড়োবুড়ি সবাই বসে বসে নিরীক্ষণ করছে, নিচের অরণ্যের তাণ্ডব দহন। চোখ ঝলসানো কমলা রঙ আর তার সঙ্গে উজ্জ্বল হলুদের লকলকে শিখায় আকাশের গায়েও যেন আগুনের রঙ ধরেছে। ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী বয়ে তপ্ত বাতাস আমাদের শরীরেও মাঝেমাঝে জানান দিয়ে যাচ্ছে ওই আগুনের তীব্রতার আঁচ।

ছোট বড়ো গাছের কাণ্ড আর ডালপালা দাউ দাউ আগুনে ফট-ফট, মটমট শব্দে ফাটছে। তাদের ডালে ডালে বাসা বেঁধে থাকা পাখিরা তীব্র ভয়ে ডাকতে ডাকতে উড়ে পালাচ্ছে। আর কত পাখি যে বৃষ্টির ফোঁটার মতো ঝরে পড়ছে আগুনের মধ্যে, তার কোন হিসেব নেই। জঙ্গলের জন্তু জানোয়ারেরাও চিৎকার করতে করতে দিশাহারা হয়ে দৌড়চ্ছে। কত প্রাণী জ্বলতে জ্বলতে পড়ে গেল আগুনের মধ্যে, তারও কোন ইয়ত্তা নেই। তপ্ত বাতাস বয়ে আনছে তাদের মরণ আর্তনাদের আওয়াজ, আর রোম ও চামড়া পোড়া উৎকট গন্ধ। সে আওয়াজ আর গন্ধ মৃত্যুভয়ের কাঁপন তুলছে মানুষগুলোর পাঁজরেও। ওই আগুন উঠে এসে ছোট্ট এই পাহাড়ের মাথার বসতিকেও গ্রাস করে নেবে না তো? তাঁরাও কী নিচের ওই জন্তু জানোয়ারের মতো চিৎকার করতে করতে ঝলসে পুড়ে মারা যাবেন?

সারারাত পুরো দলটা দু চোখে আতঙ্ক নিয়ে তাকিয়ে রইলেন নিচের আগুনের দিকে। অবুঝ শিশুরা ছাড়া কেউই ঘুমোনোর কথা ভাবতেও পারেননি। এই দলের প্রবীণতম মানুষটিও ঠায় বসেছিলেন গুহামুখের বাইরে। নিঃশব্দে তাকিয়ে ছিলেন নিচের জঙ্গলের দিকে।

তেমন কোন বিপদ অবিশ্যি ঘটল না। শেষ রাতের দিকে আগুন ঝিমিয়ে এল, যদিও অজগর সাপের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছিল সর্বত্র। মধ্যবয়স্ক এক মানুষ, খুব ক্লান্তির মধ্যেও স্বস্তির সুরে বৃদ্ধকে বললেন, “এবার মনে হচ্ছে, আগুনটা নিভে যাওয়ার মতো হয়েছে, তাই না বাবা?”

এই বৃদ্ধের পাঁচ পুত্র, সাত কন্যা। তাদের মধ্যে তাঁর বড়ো কন্যাই এই দলের নেত্রী। তিনি রাতজাগা ঘোলাটে চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে ঘড়ঘড়ে গলায় বললেন, “মনে তো হচ্ছে তাই। জন্তুদের ভয় দেখাতে রোজ রাত্রে আমরা যে আগুন জ্বালি। সেই আগুনই কী ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে, দেখলি?" বৃদ্ধের দুর্বল ঘাড়ের ওপর মাথা নড়তে লাগল, কাঁপতে থাকা দুই হাত জড়ো করে তিনি আগুনকে প্রণাম করলেন, বললেন, “রুষ্ট হলে এক রাত্রের মধ্যে, আগুন জ্বালিয়ে ছাই করে দিতে পারেন এত বড়ো একটা জঙ্গল। চোখের পলকে ঝলসে, পুড়িয়ে মারতে পারেন ভয়ংকর সব জন্তুকেও...। তিনি অগ্নি, তিনি রুদ্র, তিনি ভয়ংকর। কিন্তু কী উজ্জ্বল সুন্দর তাঁর এই ধ্বংসের রূপ ...”।

ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে নিচের জঙ্গলের পরিস্থিতি মানুষগুলোর চোখে পরিষ্কার হয়ে উঠল ধীরে ধীরে। বিস্তীর্ণ ওই জঙ্গলের থেকেই মানুষের এই দলটি তাঁদের খাদ্য আহরণ করেন, কখনো কখনো শিকার করেন ছোট ছোট প্রাণী। কিন্তু আজ সেই জঙ্গল দগ্ধ, নিঃস্ব, সেখানে কোথাও কোন প্রাণের সাড়া নেই। সবুজ অরণ্য আজ ঢাকা পড়েছে ধূসর ছাইয়ের তলায়। 

দলের ছোকরাদের মধ্যে একজন তার পাশে বসে থাকা মধ্যবয়স্কা মহিলাকে বলল, “আমাদের খাবারের যা যোগাড় আছে তাতে আজকের দিনটা হয়তো টেনেটুনে চলে যাবে, মা। কিন্তু কাল? নিচের জঙ্গল থেকে বহুদিন আর কিছুই পাওয়া যাবে না। আমাদের আজই এখান থেকে বেরিয়ে পড়তে হবে, নতুন জঙ্গলের খোঁজে। নয়তো...”।

মধ্যবয়স্কা মহিলাই ওই বৃদ্ধার বড়ো কন্যা - এ দলের নেত্রী। তিনি পুত্রের কথার না বলা অংশটুকু অনেক আগেই বুঝেছিলেন, ‘নয়তো মরতে হবে অনাহারে’। কিন্তু এই সংকট থেকে সহজে পরিত্রাণ পাওয়ার হদিশ তাঁরও জানা নেই। তিনি তাঁর বৃদ্ধ পিতার দিকে তাকালেন কোন পরামর্শের আশায়। কিন্তু বৃদ্ধও কোন উত্তর দিলেন না, তাঁর দুর্বল কাঁধের উপর নড়বড়ে মাথাটি নড়তেই লাগলো।

এই সময়েই পায়ে চলা পথে হেঁটে এক তরুণ নিচের থেকে উঠে এল সমতলে। এসময় পাহাড়তলি থেকে উঠে আসা এতই অপ্রত্যাশিত সকলেই অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। সে এসে দলনেত্রীর পাশে বসল, বলল, “ভোরের আলো ফোটার একটু আগেই আমি নিচেয় গিয়েছিলাম, মাসি”।

বৃদ্ধ ও দলনেত্রীকে ঘিরে বসে থাকা দলের সমস্ত পুরুষ ও মহিলারা তরুণের কথা শুনে আরও বিস্মিত হল। তাদের সকলের চোখে একই প্রশ্ন, কেন গিয়েছিলি? কী করতে? এসময় একা একা কেউ নিচেয় যায়? কী দেখলি সেখানে?

কেউ জিজ্ঞাসা না করলেও তরুণ বলল, “গোটা জঙ্গলটাই বিলকুল সাফ হয়ে গেছে, মাসি। মাটিতে পড়ে আছে ছাই আর পোড়া কাঠের স্তূপ। আগুনের আঁচে ঝলসে কালো হয়ে যাওয়া প্রাণহীন বিশাল গাছগুলো আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও কোন পাখির ডাক নেই। ছোট বড়ো কোন প্রাণীর কোন সাড়াশব্দ নেই। পোকামাকড়, প্রজাপতি, ফড়িং, এমনকি একটা পোকাও দেখতে পেলাম না কোথাও। সমস্ত জঙ্গলটা নিষ্প্রাণ, বোবা হয়ে গেছে একদম”। তরুণ একটু থামল। সকলেই তার কথা শুনছিল, কেউ কোন কথা বলল না, অপেক্ষায় রইল তরুণের মুখের দিকে তাকিয়ে।

তরুণ একটু ইতস্ততঃ করে বলল, “কাল সন্ধেয় আমার তেমন খাওয়া হয়নি, আমার বড্ডো খিদে পেয়েছিল, মাসি”। তরুণ এই ছেলেটি দলনেত্রীর এক বোনের ছেলে। এই ছেলেটি ওর বয়সী অন্য ভাইদের মতো দুর্দান্ত সবল নয়। বরং একটু শান্ত, ভিতু ভিতু, দল থেকে সর্বদাই আলাদা থাকে। অন্য সবাই যখন দলবেঁধে জঙ্গলের এদিক সেদিক খাবার খুঁজে বেড়ায়, এই ছেলেটা তখন পাথরের ওপর বসে, পাহাড় দেখে, আকাশ দেখে, পাখি দেখে, প্রজাপতি দেখে সময় নষ্ট করে। তাকে শোধরানোর চেষ্টাতেও বড়োরা এখন ক্ষান্তি দিয়েছে। অপদার্থ একটা - ওকে দিয়ে কিছু হবার নয়। তবুও মা-মাসির মন - দুর্বল নিরীহ এই ছেলের প্রতি একটু যেন বেশিই প্রশ্রয় তাঁদের। দলনেত্রী কিছুটা অধৈর্য হয়েই জিজ্ঞাসা করলেন, “খিদে পেয়েছিল তো নীচেয় গিয়েছিলি কী করতে?”

১.২.২ ঝলসানো মাংসের স্বাদ

কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে থেকে, তরুণ বলল, “ভীষণ খিদে পেয়েছিল, বিশ্বাস করো মাসি। কিন্তু চারদিকে কিচছু ছিল না খাবার মতো। একটা ফল, একটা কন্দ, এমনকি এতটুকু শাকপাতাও নয়। এধারে ওধারে পড়ে আছে অজস্র পশুর দেহ - পোড়া, ঝলসে যাওয়া। তাদের গায়ে লোম নেই, চামড়া নেই। দগদগে মাংসের স্তূপ। কোনটা কোন জন্তু চট করে চেনাও যাচ্ছে না। যাদের মাথার শিং আর পায়ের ক্ষুর বা থাবাগুলো আস্তো আছে, শুধু তাদেরই চেনা যাচ্ছে”।

সামান্য বিরতি নিয়ে, তরুণ মাসির মুখের দিকে একবার তাকাল, তারপর আবার বলতে শুরু করল, “আমার সঙ্গে বাঘনখের ছুরিটা ছিল, সেই ছুরি দিয়ে শিংওয়ালা একটা হরিণের গা থেকে এক চাকলা মাংস কেটে নিলাম। সে মাংস এতই নরম, এতটুকু কষ্ট হল না ছাড়াতে! প্রথমে একটু ঘেন্না হচ্ছিল, কিন্তু তাও মুখে দিলাম। একদম অন্যরকম স্বাদ। একটু পোড়া পোড়া গন্ধ, কাঁচা রক্ত-মাংসের গন্ধ প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু সে মাংস তুলতুলে নরম, চিবোতে, দাঁতে কাটতে এতটুকু অসুবিধে হল না। খারাপ লাগল না, মাসি। খুব খিদে পেয়েছিল, মাসি, অনায়াসে ভরপেট মাংস খেয়ে ফেললাম”।

দলের সবাই অস্ফুট আওয়াজে শিস দিয়ে উঠে বলল, “ইসসসস, শেষ পর্যন্ত তুই পোড়া মাংস খেলি? ছি ছি ছি, তোর কী এতটুকু ঘেন্না-পিত্তি নেই রে?” 

সে কথায় কান না দিয়ে, তরুণ খুব উৎসাহের সঙ্গে আরো বলল, “আমি বলি কি, মাসি। চলো না, আমরা সবাই মিলে পাহাড়তলিতে যাই, বেশ কয়েকটা ঝলসানো পশু তুলে আনি ওপরে। তাতে আমাদের তিন-চারদিন সহজেই চলে যাবে। এর মধ্যে নতুন জঙ্গলের সন্ধানে আমরা কিছুটা সময়ও পেয়ে যাবো...”।

বৃদ্ধ এতক্ষণ শুনছিলেন তরুণের কথা, শ্লেষ্মা জড়ানো গলায় তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন, “হতভাগা, অপদার্থ, করেছিস কী? অগ্নির মুখের গ্রাস তুই চুরি করেছিস? তিনি ক্রুদ্ধ হলে, কী করতে পারেন গতকাল রাত্রে চোখের সামনে দেখলি না? এরপরেও তোর এমন দুর্বুদ্ধি হল কী করে?” পাঁজর কাঁপিয়ে কয়েকবার শ্বাস টেনে তিনি আবার বললেন, “তুই তো মরবিই, মারবি আমাদের সকলকে, আমাদের গোটা দলকে। হতভাগা, তোর জন্যে আমাদের সকলকে অগ্নির রোষানলে জ্বলতে হবে”।  বৃদ্ধ ক্রোধে এতটাই উত্তেজিত হয়ে উঠলেন যে, তাঁর সমস্ত শরীর কাঁপতে লাগল থরথর করে।           

দলনেত্রী বৃদ্ধ পিতার অবস্থা দেখে উদ্বিগ্ন হলেন, বললেন, “বাবা, তুমি এত উত্তেজিত হয়ো না তো। সারারাত তুমি একভাবে বসে আছো, এতটুকুও ঘুমোওনি। ভেতরে গিয়ে একটু বিশ্রাম করো দেখি, আমি এদিকটা সামলাচ্ছি”। তিনি দুই তরুণীকে ইশারা করলেন, বৃদ্ধকে ধরে গুহার ভিতরে নিয়ে যেতে। মেয়েদুটির কাঁধে ভর রেখে গুহার দিকে হাঁটতে হাঁটতে সেই বৃদ্ধ তখনো বলে চললেন, “ওই ছোঁড়াকে দূর করে দে দল থেকে! দলের ভালো চাস তো এরকম দুরাচারকে প্রশ্রয় দিস না। হতভাগাকে শেয়ালে শকুনে ছিঁড়ে খাক, ওই হবে ওর সঠিক শাস্তি। তা নাহলে এই দলের প্রত্যেকে মরবে - জ্বলে ছাই হয়ে যাবে সব্বাই...”।

বৃদ্ধ পিতার গুহার ভেতরে না যাওয়া পর্যন্ত, দলনেত্রী কোন কথা বললেন না। তারপর বোনপোকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুই ওই পোড়া মাংস খেলি? তোর ভালো লাগলকাঁচা টাটকা রক্ত মাংস ছাড়া অন্য কোন মাংস খাবার কথা আমি তো ভাবতেই পারি না”! প্রৌঢ়া নেত্রীর কথা সব্বাই সমর্থন করল, অনেকে সেই যুবককে উপহাস করে বলল, “তাই না বটে, পোড়া মাংস আবার কেউ খায় নাকি? থুঃ থুঃ। কোন পশুকেও কোনদিন পোড়া মাংস খেতে দেখিনি। তুই তো পশুরও অধম হয়ে গেলি!”।

প্রৌঢ়া নেত্রী হাত তুলে সবাইকে চুপ করার আদেশ দিলেন, সবাই থামলে তিনি বললেন, “আমি অবশ্য অতটা বিরুদ্ধে যেতে চাইছি না। কারণ, আমরা এখন ভীষণ সংকটে, জঙ্গল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, জ্যান্ত পশুরা পালিয়ে গেছে দূরের কোন জঙ্গলে। নতুন জঙ্গল খুঁজে আমাদের সকলের বেঁচে থাকার মতো যথেষ্ট খাবার যোগাড় করতে বেশ কদিন সময় লাগবে। ততদিন, যদি একদম অখাদ্য না হয়, আমরা সবাই নিচেয় গিয়ে ব্যাপারটা দেখে আসতেই পারি”।

কয়েকজন বৃদ্ধ বাবার এবং অগ্নির রোষের কথা মনে করিয়ে দিল, কিন্তু প্রৌঢ়া নেত্রী সে কথায় কান দিলেন না। তিনি জানেন এই পরিস্থিতিতে এত বড়ো দলটাকে সুস্থ ভাবে বাঁচিয়ে রাখাটা অনেক বেশি জরুরি। অনাহারে যদি দলের অধিকাংশ মারাই যায়, তখন অগ্নির রোষে কী আর এমন এসে যাবে? তরুণ বোনপোর কথাগুলো পুরোটা মেনে নিতে পারেননি ঠিকই, কিন্তু অস্বীকার করে উড়িয়ে দেওয়ার জোরও পাচ্ছেন না।  শিশু আর বৃদ্ধদের দেখা শোনার জন্যে কয়েকজন মহিলা থেকে গেল, দলের বাকিরা দ্রুত নেমে গেল পাহাড়তলির দিকে, সকলের সামনে সেই যুবক আর নেত্রী মহিলা। সকলের হাতে বাঘ কিংবা ভালুকের নখ দিয়ে তৈরি নানান আকারের ফলা।

 ফেলে যাওয়া সেই হরিণের পা থেকে বেশ কয়েকটা টুকরো মাংসের ফালি কেটে তুলল সেই তরুণ। একে একে বাড়িয়ে দিল প্রৌঢ়া নেত্রী, তার মা ও অন্যান্য মাসীদের দিকে। অধীর আগ্রহে অন্য সকলে তাকিয়ে রইল তাঁদের দিকে। মহিলারা জিভে ঠেকিয়ে স্বাদ নিলেন, গন্ধ নিলেন, তারপর দাঁতে কেটে চিবোতে লাগলেন মাংসের টুকরো। একদম অন্য রকম স্বাদ। একটু পোড়া পোড়া গন্ধ, কিন্তু তাতেও পশুর নিজস্ব গন্ধ সামান্য হলেও টের পাওয়া যাচ্ছে। তবে সব থেকে আশ্চর্য – মাংস এতই নরম, এ মাংস পূর্ণ বয়স্ক হরিণের বলে মনেই হচ্ছে না, মনে হচ্ছে খুব বাচ্চা কোন হরিণের। তাঁদের আচরণে দলের অন্য সকলেই কিছুটা ভরসা পেল, তারাও সবাই নিজেদের ফলা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল মাংস কেটে কেটে তুলতে।

পোড়া মাংসের অভিনব স্বাদ নিতে নিতে প্রৌঢ়া দলনেত্রী এবং তাঁর বোনেরা, দলের অন্য সকলের দিকেই লক্ষ্য রাখছিলেন। তাঁরা দেখলেন, শিকার করে আনা বড়ো একটা হরিণকে শেষ করতে যে সময় লাগে, তার অর্ধেক সময়েই দু দুটো প্রমাণ সাইজের আধপোড়া হরিণ শেষ করে দিয়েছে তাঁর দলটা। তার মানে ঝলসে যাওয়া এই পশুর মাংস ছাড়িয়ে খেতে অনেক কম সময় লাগছে। এই মাংস শিশু এবং নড়বড়ে দাঁত বৃদ্ধদের পক্ষেও অসুবিধের হবে না।

প্রৌঢ়া নেত্রী সবাইকে নির্দেশ দিলেন, যতগুলো সম্ভব এমন ঝলসানো পশু নিয়ে উপরে গুহার মধ্যে সংগ্রহ করতে, তারপর তরুণ বোনপোর কাঁধে হাত রাখলেন, বললেন, “তোর থেকে আমরা এ এক নতুন শিক্ষা পেলাম। বিপদের সময় জীবন ধারনের জন্যে প্রচলিত ভাবনা চিন্তাগুলোকে সরিয়ে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। আর এ কথাও ঠিক, আগুনে ঝলসানো পশু খাবার পক্ষে খুবই সুবিধের।  কিন্তু এমন তো রোজ হবে না। আর একবার আগুন লাগলে পুরো জঙ্গলই তো সাফ হয়ে যাবে! মাংস ছাড়া আমাদের আর কোন খাবারও জুটবে না। কাজেই এমন সুবিধে আমাদের ভাগ্যে রোজ রোজ না আসাই মঙ্গলের”।

“কিন্তু, মাসি, আমাদের দরকার মতো আমরা তো শিকার করে এনেও, আগুনে ঝলসে নিতে পারি!” যুবকের এই কথায় প্রৌঢ়া নেত্রী ভীষণ বিরক্ত হলেন, রূঢ়ভাবে বললেন, “অমন কথা মুখে আনলি কী করে, হতভাগা? অগ্নি আমাদের তাপ দেন, আলো দেন, রাতের অন্ধকারে পশুদের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করেন। তিনি এই জঙ্গলকে কেন জ্বালিয়ে ছাই করলেন, সে তাঁর খেয়াল। কিন্তু সেই অগ্নিকে আমরা ব্যবহার করবো এমন একটা নোংরা কাজে? আমাদের শিকার করে আনা পশু ঝলসাতে? ছি, ছি, এমন কথা কোনদিন যেন আর না শুনি”। তরুণ বোনপো মাথা নিচু করে রইল, কিছু বলল না। প্রৌঢ়া নেত্রী আবার বললেন, “তাছাড়া ঝলসানো এই মাংস খেয়ে আমাদের শরীর কেমন থাকে, সেটাও তো বোঝা দরকার। আমাদের বাপ-ঠাকুরদাদের কেউ কখনো কাঁচা মাংস ছাড়া অন্য কিছু মুখেও তোলেননি, এই পোড়া মাংস যদি আমাদের পেটে সহ্য না হয়? না বাপু, যুগ যুগ ধরে যেমনটা চলে আসছে, সে পথেই চলা ভাল।”

ওই ঝলসানো মাংস যে তাঁদের অনভ্যস্ত পেটে সহ্য হয়েছিল এবং অতি সহজে হজমও হয়েছিল, সে কথা বলাই বাহুল্য। এবং অচিরেই যুগ যুগ ধরে প্রচলিত কাঁচা খাবার খাওয়ার প্রবণতা থেকেও মানুষ সম্পূর্ণ সরে এসেছিল। যদিও সেই প্রৌঢ়া দলনেত্রী আর তাঁর তরুণ বোনপো সেদিন কল্পনাই করতে পারেননি, এই আকস্মিক ঘটনা মানুষকে কোন সুদূরপ্রসারী সভ্যতার পথ দেখিয়ে দিল। পরবর্তী কয়েক হাজার বছরের মধ্যে মানুষ আগুনে ঝলসে, পুড়িয়ে, সেঁকে - শুধুমাত্র মাংস নয়, কন্দ, মূল, নানান আনাজও খেতে শুরু করেছিল। শিখে গিয়েছিল ফুটন্ত জলে সেদ্ধ করে খাবার বানানোর অজস্র প্রণালী। যাকে আমরা বলি রন্ধন। মানুষ এই রন্ধন প্রক্রিয়ায় যত সড়গড় হয়েছে, ততই প্রকৃতি থেকে আবিষ্কার করেছে নিত্য নতুন খাদ্য সম্ভার। তার মেনু ততই সমৃদ্ধ হয়েছে সুদীর্ঘ খাদ্যতালিকায়। 


পরের পর্ব এই সূত্রে - ধর্মাধর্ম - ১/৩        




[1] জঙ্গলে আদিম মানুষের জীবনধারণের পেশা অনুযায়ী বিশেষজ্ঞরা এই মানুষদের নাম দিয়েছেন hunter–gatherer বা hunter–foragerএই পর্যায়ে সংগ্রহ করাটাই ছিল আদিম মানবদের জীবনধারণের প্রধান উপায়। এই সংগ্রহ বলতে ফল-মূল-কন্দ-শাক-পাতা যেমন থাকত, তেমনি থাকত পাথরের টুকরো, গাছের শক্ত ডাল, বাঁশ, এমনকি বড়ো বড়ো জন্তুদের পায়ের হাড়, দাঁত, নখ এমন নানান জিনিষ। এগুলি তারা ধীরে ধীরে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে শিখছিল, মৃত পশুদের দাঁত বা নখ ব্যবহার করত ছুরি হিসেবে, মাংস বা ফলের শক্ত খোসা কাটতে।       

[2] উল্লিখিত কাল্পনিক ঘটনায় আমি একটি বুনো শুয়োরের কথা বলেছি, এটি বুনো গোরুও হতে পারে, বাইসন হতে পারে, নীলগাই হতে পারে। আসলে যে সময়ের কথা বলেছি তখন ধর্মভিত্তিক খাদ্যাখাদ্য বিচার – গরু শুয়োর, ভেজ-ননভেজ – করে বিলাসিতার কোন অবকাশ ছিল না। সুস্থভাবে বেঁচে থাকাটাই ছিল চরম বিলাসিতা।

[3] চিত্র ঋণ Wikipedia


নতুন পোস্টগুলি

নামকরণ

     এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২   "        শাশুড়িমায়ের জিম্মায় ফুটকিকে রেখে বিজলি আজই স্কুলে জয়েন করলেন। মাসখানেকের...