বৃহস্পতিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

সুরক্ষিতা - পর্ব ১৪

  এই উপন্যাসের আগের পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১৩ "





১৪

 ছবি রান্নাঘরে চলে যেতে শুভময়ীদেবী আরাম করে কফির মাগে চুমুক দিলেন। পাটা ছড়িয়ে দিলেন, বারান্দার রেলিংয়ের ধাপিতে। বারান্দার বাইরে একটানা বৃষ্টি ঝরছে – খুব জোরে নয় কিন্তু ঝিরঝির কিংবা রিমঝিম তালে। এমন বৃষ্টি দেখেই অনেকটা সময় কাটিয়ে দেওয়া যায়, মনে হল শুভময়ীদেবীর। অনেকটা মানে কতটা? কতক্ষণ? দশমিনিট, পনের মিনিট...তারপর নির্ঘাৎ একঘেয়ে লাগবে। সেক্ষেত্রে এত বড়ো দিনটা – যাকে সাহেবি ভাষায় বলে রেনি ডে – এই বারান্দায় – এই চেয়ারে বসেই সারাটাদিন কাটানো সম্ভব? ব্যাপারটা ভাবতেই শুভময়ীদেবী হাঁফিয়ে উঠলেন, তাড়াতাড়ি কফির মাগ শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন। কিছু একটা করতেই হবে। এভাবে চুপচাপ বসে সময় নষ্ট করার কোন অর্থ হয় না। সময় বহিয়া যায় – নদীর স্রোতের প্রায়। যা কিছু পেণ্ডিং কাজ আজ শেষ করে ফেলা যায় – শেষ করতে না পারলেও – অন্ততঃ সমাপ্তির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।

পেণ্ডিং কাজ তাঁর বেশ কিছু আছে অফিসে – কিন্তু সে জায়গাটি আজ অগম্য – যাওয়া যাবে না – অতএব সে কাজ নিয়ে চিন্তা করে লাভ নেই। যেহেতু এই ঘরের বাইরে তিনি যেতে পারছেন না, অতএব ঘরে এমন কি কি কাজ আছে – যা তিনি এখন শেষ করতে পারেন? হঠাৎই তাঁর মনে হল, বই পড়া যায়।

মাস খানেকের বেশিই হল, তাঁর হাতে একটি বই এসেছে, নাম ধর্মাধর্ম– বেশ গাব্দা চেহারার বই। বইটা দেখেই তাঁর মনে বিতৃষ্ণা এসেছিল। কিন্তু যে ভদ্রলোক বইটি দিয়ে গেলেন, তাঁর নাম নিমাইবাবু – বহুদিনের পরিচিত। তিনি বহু স্কুলের লাইব্রেরিতেই বই সাপ্লাই করেন – আবার লাইব্রেরির জন্যে অনেক স্যাম্পল্‌ বইও দিয়ে যান – যেগুলি পড়ে লাইব্রেরিয়ান এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষিকারা লাইব্রেরির জন্যে বই সিলেক্ট করেন ও রেকমেণ্ড করেন।

শুভময়ীদেবী বইটা হাতে নিয়েই বলেছিলেন, “এই বই নিয়ে আমি কী করব? ধর্ম-টর্ম নিয়ে লেখা – এসব আমার একদমই চলে না”।

নিমাইবাবু হেসে বললেন, “এর আগে কোনদিন আপনাকে উটকো কোন বইয়ের স্যাম্পল্‌ দিয়েছি, ম্যাডাম? এই বইটা দিচ্ছি – তার কারণ এই বইটিতে আশ্চর্য এক অঙ্ক আছে…”।

শুভময়ীদেবী অবাক হয়ে বলেছিলেন, “ধর্মের বইয়ে অঙ্ক? সে তো আরও মারাত্মক”।

নিমাইবাবু আবার বললেন, “এই বইটা সে অর্থে ধর্মের বইও নয় – আবার অঙ্কের বইও নয়। কিন্তু আবার দুটোই। ঠিক বোঝাতে পারলাম না। ভদ্রলোক পেশায় ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, সেসব ছেড়েছুড়ে দিয়ে এখন লেখা-টেখা নিয়েই আছেন। এই বইটি ম্যাডাম – উনি পাঁচটি পর্বে ভাগ করেছেন, প্রত্যেকটি পর্বের একটা করে টাইম-ফ্রেম আছে। যেমন ধরুন – প্রথম পর্ব শুরু হচ্ছে ৭০,০০০ বিসিই থেকে ১২,০০০ বিসিই, দ্বিতীয় পর্বের সময়কাল ১২,০০০ থেকে ৬০০ বিসিই, এভাবেই চতুর্থ পর্ব শেষ করেছেন ১৩০০ সিইতে – মানে ভারতে মুসলিম শাসন শুরুর ঠিক আগে পর্যন্ত। এই সময়কালের মধ্যে মানুষ কী ভাবে সভ্য হয়েছে, চাষবাস শিখেছে, ব্যবসাবাণিজ্য শিখেছে এবং তার পাশাপাশি কিভাবে তাদের জীবনে এসেছে শিল্প-কলা-সংস্কৃতি-সাহিত্য -বিজ্ঞান। এবং এই সব কিছুর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মনে এসেছে ধর্ম চেতনা, বিশ্বাস, রীতিনীতি – রিচুয়াল্‌স্‌ - একদম অঙ্কের মতো। শেষ পর্বে তিনি সাম-আপ করেছেন - পুরো বিষয়টি – সেখানে থেকে তিনি ডিরাইভ করে দেখিয়েছেন – আজকের দিনে - ২০২৫ সালেও – বিজ্ঞানেসভ্যতায় আমরা ভীষণ উন্নতি করেছি ঠিকই – কিন্তু মানসিকতায় ১৩০০ সিইর পরে আর তেমন এগোতেই পারিনি। আমার কথা বিশ্বাস করুন, ম্যাডাম, বাংলা ভাষায় ধর্মের বই, ইতিহাসের বই – অজস্র আছে। আমাকে পড়তেই হয়, পড়েওছি অনেক – কিন্তু এমন বই এর আগে আর পাইনি। আমার অনুরোধ পড়ে দেখুন”।

এর পরে আর নিমাইবাবুর কথা ফেলতে পারেননি শুভময়ীদেবী। বাড়ি এনে বইটা শুরু করেছিলেন – এবং সত্যি কথা বলতে প্রথম তিনটি পর্ব শেষ করেছিলেন প্রায় এক নিশ্বাসে – অত বড় বড় চ্যাপ্টার মাত্র দশদিনে। এবং তাঁর মনে হয়েছিল নিমাইবাবু বইটি সম্পর্কে এতটুকুও অত্যুক্তি করেননি। কিন্তু চতুর্থ পর্বের মাঝামাঝি থেকেই – বইটা ভীষণ একঘেয়ে হয়ে উঠেছে। অবশ্য লেখক সে কথা বলেওছেন – ৬৫০ থেকে ১৩০০ সিই ভারতের রাজনৈতিক অবক্ষয়ের কাল – সেই বিশৃঙ্খলার কথা পড়তে পড়তে অধৈর্য হয়ে ওঠাই স্বাভাবিক। শুভময়ীদেবী সেইখানে এসেই এখন আটকে আছেন – আজ চেষ্টা করে দেখা যাক কতটা এগোনো যায়।

বসার ঘর থেকে বইটা এনে তিনি বারান্দাতেই আবার বসলেন। বইটি খুলে – বুকমার্ক ছিল – দক্ষিণাপথ বা দাক্ষিণাত্যের রাজবংশ থেকে পড়া শুরু করলেন। এর আগে ছিল উত্তরভারতের অজস্র রাজবংশ ও তাদের নিরন্তর যুদ্ধ কাহিনী। মিনিট কুড়ি পড়ার পর তিনি কিছুটা হাঁফিয়ে উঠলেন। নিমাইবাবুর কথা মনে পড়ল – লেখক ভারতের ইতিহাসটাকে দেখেছেন নিখুঁত অঙ্কের মতোই – কিন্তু এই চতুর্থ পর্বে এসে সে অঙ্ক হারিয়ে গিয়েছে। প্রায় তের হাজার বছর ধরে এগিয়ে চলা ভারতীয় সভ্যতার নিরন্তর প্রগতি – শুধু থমকে গিয়েছে তাই নয় – এলোমেলো লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। এবং সেই সুযোগে ঘটে গিয়েছে মুসলিম আক্রমণ ও আগ্রাসন। লেখক নিরপেক্ষ মনে এই সবের বিশ্লেষণ করে পৌঁছচ্ছেন নতুন কিছু সিদ্ধান্তে। সেটা কি? খুব কৌতূহল হচ্ছে জানতে।

মন্দ নয়, ভালই লাগছে বইটা – এই বিষয়ের বই তিনি এত মনোযোগে বহুদিন পড়েননি। কিন্তু এ বই বর্ষার দিনে সময় কাটানোর বই নয়। শুভময়ীদেবী বই থেকে মুখ তুলে বাইরে তাকালেন – এবং আশ্চর্য হলেন – বৃষ্টি একেবারেই ধরে গেছে – যদিও আকাশের মুখ ভার। যে কোন মুহূর্তে আবার নামতে পারে। হঠাৎই তাঁর মাথায় এল ছোট্ট একটা অ্যাডভেঞ্চার করার ইচ্ছে – যাকে দুষ্টুমিও বলতে পারা যায়।

বৃষ্টি থেমে গেছে। ছবি রান্নাঘরের কাজে ব্যস্ত। তিনি যদি পার্সটা নিয়ে নিঃশব্দে নেমে যান – এবং পাড়ার দোকান থেকে গোটা ছয়েক ডিম কিনে আনেন। কী করবে ছবি? চমকে যাবে না? আশ্চর্য হবে না? হতাশ হয়ে বলবে না, মামীমা, তুমি যেন একটা কি! বলা নেই কওয়া নেই – এভাবে কেউ এই দুর্যোগের দিনে বাইরে বের হয়? যদি কিছু একটা হয়ে যেত – পেছল রাস্তায় পড়ে গিয়ে হাত-পা-কোমরে চোট পেতে? বাইরে কারোর কাছে আমি মুখ দেখাতে পারতাম? সবাই বলত, তুই থাকতে মামীমাকে ওভাবে ছেড়ে দিলি কোন আক্কেলে, ছবি? সমস্ত ব্যাপারটা ভেবে শুভময়ীদেবী মজা পেলেন খুব এবং একটুও দেরি না করে, ঘর থেকে পার্সটা নিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়লেন দরজা খুলে।

তাঁদের কমপ্লেক্সের সিকিউরিটি তাঁকে দেখে অবাক হল, জিজ্ঞেস করল, “ম্যাডাম আপনি? কোথায় চললেন? রাস্তায় তো জল জমে আছে”।

শুভময়ীদেবী মুচকি হেসে বললেন, “এই যাবো একটু – টুকটাক কিছু কেনার আছে …”।

“ম্যাক্সিমাম দোকানই বন্ধ, দু-একটা খোলা আছে, দেখুনছবিদি নেই? বাড়ি গেছে নাকি?”

শুভময়ীদেবীর ভয় ছবি তাঁর গলার শব্দ পেয়ে বারান্দায় না চলে আসে – তাহলেই তাঁর অ্যাডভেঞ্চার কাহিনীর দফারফা! তিনি আড় চোখে তিনতলার বারান্দার দিকে তাকালেন – না ছবি নেই। সিকিউরিটির কথার উত্তর না দিয়ে রাস্তায় নামলেন।

সিকিউরিটি ঠিকই বলেছিল রাস্তায় জল দাঁড়িয়ে আছে এবং অধিকাংশ দোকানই বন্ধ। রাস্তার লেভেলে যে দোকানগুলো – সেগুলোর ভেতরে জল ঢুকে গেছে। হাঁটুর নীচে অব্দি জমা জল ঠেলে হাঁটতে হাঁটতে তাঁর বালিকা বয়সের কথা মনে পড়ল। বহুদিন এমন হয়েছে, স্কুল চলাকালীন এমন বৃষ্টি হয়েছে – স্কুল ছুটির পর রাস্তায় নেমে দেখেছেন হাঁটু পর্যন্ত জল। সেই দৃশ্যে তাঁর এবং তাঁর সহপাঠী-বন্ধুরা চিৎকার করে উঠতেন আনন্দে। তারপর হাতে জুতো নিয়ে সবাই মিলে কথা বলতে বলতে, জল ভেঙে ভেঙে হাঁটতেন। চলার গতি অত্যন্ত ধীর – আজকে তাঁর মনে হল – তিনি ও তাঁর বন্ধুরা জলের তলায় দেখতে না পাওয়া পথে হোঁচট খাওয়ার ভয়ে নয় – আসলে তাঁরা ধীরে ধীরে হাঁটতেন এই জলবিহার যেন চট করে শেষ না হয়ে যায়…।

বাঁদিকে গাড়ি বারান্দার নীচে একটা দোকান খোলা রয়েছে দেখে – সেদিকে এগিয়ে গেলেন শুভময়ীদেবী। দোকানদারের চেহারা দেখে মনে হল – বিহারী।

বিহারী ভদ্রলোক অবাক চোখে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “বলুন মা-জী”

“ডিম আছে? ছটা ডিম নেব”?

প্লাস্টিকের একটা পাৎলা ব্যাগ ফুঁ দিয়ে খুলতে খুলতে বিহারী দোকানদার বলল, “ডিম লিতে আপনি চলে এলেন, মা-জী? ছবিদিদি নাই”?

শুভময়ীদেবী বেশ অস্বস্তিতে পড়লেন, বিহারী ভদ্রলোক কি এ পাড়ার সবাইকেই চেনেন? কই তিনি তো ওঁনাকে চেনেন না? প্লাস্টিকের ব্যাগে ছটা ডিম ভরে – ব্যাগের মুখটা টাইট করে বেঁধে দিলেন বিহারী ভদ্রলোক। শুভময়ীদেবী জিজ্ঞেস করলেন, “কত দাম”।

মাছি তাড়ানোর মতো হাত নেড়ে বিহারী ভদ্রলোক বললেন, “ও আমি ছবিদিদির থেকে লিয়ে লিব, মা-জী। আপনি সাবধানে লিয়ে যান”।

“বাঃ মজা! ডিম লিব আমি – আর দাম দেবে ছবিদিদি? কেন?”

“বাত তো একহি হল না…” বিহারী ভদ্রলোক হাসতে হাসতে বললেন, “ছত্রিশ টাকা”।

 

টাকাকড়ির হিসেব মিটতে শুভময়ীদেবী ডিম নিয়ে রওনা হলেন তাঁদের কমপ্লেক্সের দিকে, একইভাবে জল ভেঙে। কমপ্লেক্সের গেট দিয়ে ঢুকেই তিনতলার বারান্দার দিকে তাকালেন – ছবি দাঁড়িয়ে আছে। অবাক চোখে তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে।

সিকিউরিটি ছেলেটি বলল, “ছবিদিদি জিজ্ঞেস করছিলেন, আপনি কোথায় গেলেন…”

শুভময়ীদেবী কিছু বললেন না, সাবধানে এগোলেন, তাঁর ব্লকের সিঁড়ির দিকে। তাঁর পাজামা ভিজে সপ সপ করছে – জড়িয়ে ধরেছে তাঁর পায়ের গোছ। জলও ঝরছে টপটপ করে। স্যান্ডেলটা বোধহয় চামড়ার – নয়তো রেক্সিনের - এতক্ষণ জলে ভিজে কেমন যেন ল্যাতপেতে হয়ে গেছে – তাঁর পায়ের চেটোর সঙ্গে তার ঠিক বনিবনা হচ্ছে না। খুব সাবধানে পা ফেলেও – সিঁড়ির প্রথম ধাপেই স্লিপ করল তাঁর স্যাণ্ডেলটা। তিনি হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তেও সামলে নিয়ে ধপ করে বসে পড়লেন সামনের মেঝেতে। নাহলে নাকে চোট তো পেতেনই – হয়তো চশমার কাচ-টাচ ভেঙে বড়ো বিপদ ঘটে যেত।

শুভময়ীদেবীর পড়ে যাওয়ার আওয়াজে সিকিউরিটি দৌড়ে এল চেঁচাতে চেঁচাতে – “ছবিদি, ম্যাডাম পড়ে গেছে, শিগ্‌গির নীচেয় এসো”। পাশের বন্ধ-দরজা ফ্ল্যাটগুলি থেকেও বেশ কয়েকজন ভদ্রলোক ও মহিলা বেরিয়ে এল দরজা খুলে। “কী হয়েছে? আরে রে রে, ম্যাডাম পড়ে গেলেন কী করে…খুব বেশি চোট লাগেনি তো?”

অপ্রস্তুত হেসে শুভময়ীদেবী বললেন, “না, না পাটা স্লিপ করে পড়ে গেছি…তেমন কিছু নয়…”।

ছবি নিঃশব্দে তাঁর পিছনে এসে দাঁড়াল, অস্ফুট স্বরে বলল, “তুমি ডিম আনতে গিয়ে এই কাণ্ড বাধালে?! উঠে দাঁড়াতে পারবে, আমার কাঁধে ভর দিয়ে? নাকি ধরব?”

“তাই পারেন নাকি? ওঁনাকে শক্ত করে ধর না দু হাতে…” এক প্রতিবেশী মহিলা ঝাঁজালো গলায় বললেন।

মহিলার কথার ভঙ্গিতে শুভময়ীদেবী উঠে দাঁড়ালেন – একটাও কথা না বলে ছবির কাঁধে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন, তিনি যতক্ষণ নীচেয় বসে থাকবেন…ওই ভদ্রলোক ও মহিলারা অনবরত ছবিকে দোষারোপ করে, তাকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলবে।

তাঁরা দুজনে নির্বিঘ্নে ফার্স্ট ল্যাণ্ডিংয়ে পোঁছে যেতে, নীচেয় দাঁড়ানো ভদ্রলোকদের একজন বললেন, “সব ঠিক আছে তো, ম্যাডাম? ডাক্তারকে কল দেব কি?”

ল্যাণ্ডিংয়ে দাঁড়িয়ে শুভময়ীদেবী হাত তুলে বললেন, “একদম ঠিক আছি। খামোখা আপনাদের ব্যতিব্যস্ত করে তুললাম… অসুবিধে নেই, আমি চলে যাবো…”।

ল্যাণ্ডিং ঘুরে দ্বিতীয় ফ্লাইটে পা দিতেই নীচের মানুষরা যে যার ঘরের দিকে চলে যাচ্ছিল। একজন মহিলা বললেন, “কী দিনকালই না পড়ল। এই দুর্যোগের দিনে, মহিলা দোকানে বেরিয়েছেন ডিম কিনতে আর কাজের লোক ঘরের সোফায় বসে বসে মোবাইল ঘাঁটছে…। কাজের লোক রেখে লাভ কী?”। যথেষ্ট চাপা স্বরে বললেও কথাগুলো শুভময়ীদেবী এবং ছবির কানে পৌঁছল। ছবির মুখের দিকে মুখ তুলে তাকাতেও পারলেন না শুভময়ীদেবী।  

                            এই উপন্যাসের পরের পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১৫ "


                                   

বুধবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

চুরি বিদ্যে মহাবিদ্যে...

 



এর আগের পর্ব - সনাতনীর সন্ধানে   ]


আমাদের কলকাতার ছোট্ট বাসা বাড়ির ততোধিক ছোট পরিসরে মায়ের ভান্ডার থেকে হরলিক্স, মাখন এবং বিস্কুট চুরি করে ধরা না পড়াটাই আশ্চর্য ছিল। প্রায় প্রত্যেকবারই ধরা পড়তামপ্রচুর বকাবকি এবং পিঠের ওপর মায়ের চড়টা চাপড়টা বরাদ্দ থাকতচড়চাপড় খেয়ে মুখ গোমড়া করে ওঘরে চলে যেতাম আর দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে থাকতাম বিছানায়। এর মানে আমি খুব রেগে গেছি মায়ের ওপর। একটু পরেই মা আসতেন পাশের ঘরেবিছানার একপাশে বসতেন, পিঠে হাত রাখতেন। আমার রাগ আরো বেড়ে যেত, মায়ের হাত সরিয়ে দিতাম ঝটকা দিয়ে – মা মুখ টিপে হাসতেন, বলতেন –

-‘ইস, ফর্সা পিঠে কেমন লাল লাল দাগ হয়ে গেছে। খুব লেগেছে না? ছি ছি, এমন ঘুনুসোনাকে কেউ এভাবে মারে’? আমার কণ্ঠ তখন আবেগে রুদ্ধ, ভীষণ মমতায় মা আমার পিঠে হাত বোলাতেনরুদ্ধ আবেগ কান্না হয়ে উঠে আসত, আমি ফুঁপিয়ে উঠতাম, পিঠ ফুলে ফুলে উঠতমা আবার বলতেন-

–‘কে মেরেছে, বাবা, তোমাকে? কে এত কষ্ট দিল আমার ঘুনুসোনাকে?’ পিঠ ফিরিয়ে থেকেই শেষ অভিমানটুকু উজাড় করে দিয়ে কান্নাভাঙা গলায় আমি চেঁচিয়ে উঠতাম –

-‘কে আবার, মা - আমার মা, তুমিই তো মারলে আমাকে...’। ভারি গলায় মা বললেন-

-‘উঁহু, তাহলে ও তোমার মা নয়, ও রাক্কুসী। মা এমন মারতেই পারে না ঘুনুসোনাকে...’। নিমেষের মধ্যে সমস্ত রাগ অভিমান ভুলে যেতাম, আমি লাফিয়ে উঠে বসতাম মায়ের সামনাসামনি, বলতাম-

-‘মোটেও রাক্কুসি নয় - মা। আমার মা...’। কান্না ভেজা চোখে তাকিয়ে দেখি মায়ের চোখেও জল। বুকের কাছে টেনে নিয়ে মা বলতেন-

-‘কেন চুরি করিস বলতো? সব তো তোদেরই জন্যে। আমারও এমন রাগ হয়ে যায়...’

কলকাতায় মায়ের ছোট্ট ভান্ডার পার হয়ে গিয়ে মামাবাড়িতে দিদিমার বৃহত্তর ভান্ডারের সন্ধান দিয়েছিল বন্নিদিদি। সেখানেও বন্নিদিদির পূর্ণসহযোগিতায় চৌর্যবৃত্তির হাতযশ বেড়ে উঠেছিল সন্দেহ নেই। কিন্তু এসবই ছিল নিজস্বাপহারণ - নিজের জিনিষই চুরি করা। কারণ এসব খাদ্যদ্রব্য মা কিংবা দিদিমা আমাদের মনোরঞ্জনের জন্যেই সংগ্রহে রাখতেন। দিদিমার ভান্ডারেও আমাদের চৌর্যবৃত্তি ধরা পড়ে দিদিমার থাবড়ি খেয়েছি অনেক, আর খেদোক্তি শুনেছি বিস্তর – ‘পোড়ারমুখো (আমাকে আর বন্নিদিদির ক্ষেত্রে পোড়ারমুখি), এসব তো তোদের জন্যেই বানানো। তা সে আকাচা কাপড়ে ছোঁয়াছুঁয়ি না করলে চলছিল না’? আচারের বয়াম আকাচা কাপড়ে ছুঁলে, আচার নাকি বিগড়ে যায়। 

সে যাই হোক, এইবার ডাক এল পরস্বাপহরণের।

তখনকার দিনে সম্বৎসরে একবারই ধান হতো। ধান কাটার পর শীতকালে বেবাক নেড়া পড়ে থাকত ধূসর মাঠ কে মাঠ। কেউ কেউ টুকটাক চাষবাস করতেন সর্ষে, আলু, আখ, মুসুরডাল...। খাপছাড়া সবুজের দেখা মিলত এখানে সেখানে। দেখবার মতো ছিল – সর্ষের ক্ষেতগুলি - সবুজ পশমিনার ওপর উজ্জ্বল হলুদের অনবদ্য বুটির কাজ। হিমেল উত্তুরে হাওয়া এসে যখন দোলা দিয়ে যেত সর্ষে ফুলের বৃন্তে - মুগ্ধ হয়ে দেখা ছাড়া অন্য কোন বর্ণনা আসত না মনে। বড়ো হয়ে সেই বর্ণনা শুনেছি কণিকা বন্দোপাধ্যায়ের মন্মোহিনী কণ্ঠে – ‘...আকাশের লাগে ধাঁধা, রোদের আলো ওই যে বাঁধা। বুঝি ধরার কাছে আপনাকে সে মাগলো – সর্ষে ক্ষেতের ফুল হয়ে তাই জাগলো, নীলদিগন্তে...’। এমন নিখুঁত রূপকল্প রচনা রবি ঠাকুরের পক্ষেই সম্ভব। যতবার গানটি কানে আসে চোখের ওপর দুলতে থাকে উজ্জ্বল হলুদের সেই শামিয়ানা...।

আখের ক্ষেত ছিল মাঠে বেশ কয়েকটি। সবচেয়ে নিরাপদ, লোকালয় থেকে নির্জন দূরত্বে একটি আখের ক্ষেত নির্বাচন করে আমরা পাঁচজন রওনা হলাম এক মধ্যদ্বিপ্রহরে। আমরা দুইভাই, মামাতো দুইভাই, আর মামাতো বড়ো দাদার পাড়ার এক বন্ধু। আমাদের মধ্যে মামাতো বড়ো দাদা আর তার বন্ধু সবার বড়ো, আর আমি সবচেয়ে ছোট। আমি আর পিঠোপিঠি মামাতো দাদা হাফপ্যান্ট পড়া আর বাকিরা ডোরাকাটা পায়জামা। জানিনা কেন, এই পায়জামাগুলোকেই গ্রামে সবাই ফুলপ্যান্ট বলত, আর ফুলপ্যান্টকে বলত সুট। দাদারা ছোট ভাঁজ করা ছুরি নিয়েছিল, আমরা হাফপ্যান্টের বাচ্চা বলে আমাদের ছুরি মেলে নি।

 আমরা যখন আখের সুউচ্চ বহির্বেষ্টনী সাবধানে এড়িয়ে ক্ষেতের অন্দরে ঢুকলাম, দেখলাম সে ক্ষেতের আখ খেতে এমন কিছু আর বাকি নেই। মাঝখানটা বেশ ফাঁকা, আখের চিবোনো ছিবড়ে আর আখের খোসা স্তূপাকারে ছড়ানো যত্র তত্র। অর্থাৎ আমরা এ কাজেও পথিকৃৎ হতে পারলাম না, আমাদের আগেও অনেকেই এই ক্ষেতের রসাস্বাদন করে গেছে। অনুশোচনার অবকাশ ছিল না, তাই ঝপাঝপ গোটা দশেক আখ ছুরির আঘাতে ধরাশায়ী হল এবং টুকরো হয়ে চলে এল সাফসুফ হয়ে। আমরা নিজের নিজের হাত ও দাঁতের সহযোগিতায় নেমে পড়লাম ইক্ষুর রসগ্রহণে। ঘন্টাখানেকের মধ্যেই আমাদের যা ছিবড়ে জমা হয়ে উঠল তাতে আমরা সকলেই আড়ালে বসে লুকোতে পারতাম অনায়াসে। পেটের মধ্যে আখের রস টলমল করছে, আখের খোসা ছাড়াতে গাল ও ঠোঁটের ভেতর আর মাড়ি ছিঁড়ে জ্বালা করছিল, রসে চ্যাটচ্যাট করছিল কনুই অব্দি হাত আর মুখের চারপাশ। শুনেছি আখের রস নাকি জন্ডিসের অব্যর্থ পথ্য, কিন্তু সেদিন ধরা পড়লে আমাদের কেস যে জন্ডিস হতো - সেটাও ব্যর্থ হতো না নিশ্চিৎ।    

ক্ষেত মালিকের নিশ্চয়ই ইচ্ছে ছিল বাড়িতেই আখের গুড় বানিয়ে নেওয়ার। যে গুড়ের থেকে আমাদের এই বঙ্গভূমির একাংশের প্রাচীন যুগেই নাম হয়েছিল গৌড় এবং গৌড়িয় মাধ্বীর সুখ্যাতি পৌঁছেছিল মহাভারতের সুরারসিকদের কাছেও। কিন্তু যেদিন তাঁর অন্তঃসারহীন আখের খেতের সম্যক হদিশ তিনি পেয়েছিলেন, তাঁর অন্তঃকরণে কি অনুভূতি হয়েছিল এবং আমাদের কি পরিমাণ শাপশাপান্ত করেছিলেন - সে চিন্তা করলে আজও মনের ভিতর অস্বস্তি হয় ভীষণ।

সে দিন রাতে ভাত খাবার সময় কোন তরকারিই মুখে রোচে নি - এমন ঝালআসলে ঝাল-টাল কিচ্ছু না আমার মুখের ভিতরে যা অবস্থা তাতে সামান্য নুনের স্পর্শেও জ্বলে উঠছিল। কেন এবং কি করে হল - মা ও মাসীমাদের জেরার চোটে আমার জেরবার হাল, অবশেষে বড়মামীমার হস্তক্ষেপে মীমাংসা হল দুধ ভাতের প্রেসক্রিপ্সনে। বন্নিদিদি কিন্তু ছাড়েনি - আমার পেট থেকে কথা বের করে নিয়েছিল সেই রাত্রেই এবং ‘বেশ হয়েছে, খুব ভালো হয়েছে, আর যাবি আমাকে না বলে?’ বলেও, আমাকে অনেকখানি মধু এনে দিয়েছিল লুকিয়ে – আঙুলে করে লাগিয়ে দিয়েছিল গালে আর ঠোঁটের ভিতরে।

এই ঘটনার পরে আমার মতো বাচ্চারা ব্রাত্য হয়ে গেলাম দাদাদের দল থেকে। বাস্তবিক আমার জন্যে প্রায় ধরা পড়ার উপক্রম হচ্ছিল সক্কলের। কিন্তু আমরাও হার মানলাম না। আমাদের আলাদা একটা দল তৈরি হয়ে গেল গোপনে এবং আমাদের প্রথম অ্যাকশন প্ল্যান হল আলুপোড়া খাওয়া। কচুপোড়া ব্যাপারটা তাও শুনেছিলাম – উত্তর কলকাতায় ‘কচু পোড়া খেলে যা’ লব্জটা তখন প্রায়ই শোনা যেত – কিন্তু আলুপোড়া কোনদিন শুনিনি। শোনা তো সামান্য কথা, একেবারে চেখে দেখার সুযোগ আসছে জেনে রীতিমত উত্তেজিত হয়ে উঠলাম।

 আলুপোড়া অভিযানের দিন সকালে – সাজসাজ রব পড়ে গেল আমাদের মধ্যে - কিন্তু অত্যন্ত গোপনে। আলু পোড়াবার জন্যে ঘুঁটে, কেরোসিন তেল, দেশলাই। টেস্টের জন্যে নুন, লংকা ও গোলমরিচের গুঁড়ো, শিশিতে সামান্য সর্ষের তেল, যদি আলু কাটাকুটি করতে লাগে বলে দুটো ছুরি। এরইমধ্যে আমি বারবার জিগ্যেস করছিলাম – ‘কিরে আসল জিনিষ, আলু নিবি না’? – ‘ধূর, ওতো মাঠে...’। ওদের কথাবার্তার কোন হদিশ পাই না, এসে থেকে তো মাস খানেক হতে চলল মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছি বিস্তর, মাঠে আবার আলু কোথায়? পাছে আমাকে সবাই বোকা ভাবে, এই চিন্তা করে চেপে গেলাম, মনে মনে নিশ্চিত ছিলাম, এ মিশন ব্যর্থ হবে এবং সময়ে আমার দূরদর্শীতায় সকলে মুগ্ধ হতে বাধ্য।

নির্দিষ্ট সময়ে আলাদা আলাদা ভাবে যার যার দায়িত্ব অনুযায়ী জিনিষপত্র নিয়ে আমরা রওনা হলাম। গ্রামের বাইরে একটা জায়গায় আমরা জড়ো হয়ে রওনা হলাম মাঠের দিকে। আমি এতক্ষণ লক্ষ্য করছিলাম কেউ আলু নেয় নি। আসার পথে এত দোকান গেল, সব দোকানেই আলু পাওয়া যায়, সে সব ছেড়ে এই মাঠে আলু নিয়ে কে বসে আছে কে জানে – টেরটি পাবে বাছাধনেরা।  

চুপচাপ হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা গিয়ে একটা মাঠে সবাই গিয়ে থেমে গেলাম। সে মাঠে আলুর কোন চিহ্ন নেই। গোটা মাঠে আধা সবজে আধা হলদে হয়ে যাওয়া চারাগাছে ভর্তি, আমার হাঁটুর হাইট হবে বড়ো জোর। একটাই বিশেষত্ব নজরে এল - এর মাটিটা। দুপাশে সামান্য নালি কেটে গাছের গোড়াগুলো উঁচু করে ঝুরো ঝুরো মাটিতে ঢাকা। 

আমাদের দলের একজন একটা গাছ কে নিষ্ঠুর ভাবে টেনে তুলতেই শেকড়ের সঙ্গে বেরিয়ে এল বেশ একমুঠো আলু – ছোট বড় মাঝারি সাইজের। অবাক কান্ড – তার আগে শিব্রাম চকরবরতির লেখায় পড়েছিলাম, আলু হয় বড় বড় গাছে ...টুসকি দিয়ে খুব সাবধানে আলু পাড়তে হয়...আর এইখানে মাটির ভিতরে সেই আলু? 

এহেন অবাক কান্ডে আমি যারপরনাই অভিভূত হলাম এবং আমাদের বাচ্চা দলের সাফল্য সম্পর্কে আমার আর সন্দেহের অবকাশ রইল না। সেই বিকেলে ঘুঁটে ও মাঠের শুকনো আগাছার কাঠকুটো জোগাড় করে আলু পোড়া বানানো হলআধপোড়া, ঝামাপোড়া, আধকাঁচা, দরকচা আলুই ক্যাঁচক্যাঁচ করে খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে আমরা যখন ফেরার পথ ধরলাম, সূর্য তখন পাটে বসার আগে একটু থমকে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন - এই ছোঁড়াগুলো ফাঁকা মাঠে করছেটা কি? 

আমাদের নিরাপদ ও সাকসেসফুল মেডেন মিশন আমাদের সাহস ও আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়িয়ে দিল। 

আমরা যখন বাড়ি পৌঁছলাম, বন্নিদিদি সদর দরজায় সন্ধ্যার প্রদীপ দেখাচ্ছিল। চালধোয়ার ধুচুনির মধ্যে প্রদীপ, তার অসংখ্য ছিদ্র দিয়ে প্রদীপের বহুধা আলো ঠিকরে পড়ছে চারদিকে। কি একটা মন্ত্র পড়ছিল বিড়বিড় করে, মুখে কথা না বলে ভুরু তুলে জিজ্ঞেস করল ‘কোন চুলোয় যাওয়া হয়েছিল শুনি’? আমি বললাম ‘এই তো বেড়াতে’বন্নিদিদি তুলসীতলায় প্রদীপটা নামিয়ে মাথা নীচু করে নমস্কার করল তিনবার। আমি প্যান্টের পকেট থেকে দুটো আলুপোড়া বন্নিদিদির দিকে বাড়িয়ে দিতে, বন্নিদিদি বলল, ‘দাঁড়া, দাঁড়া, তোর আকাচা কাপড়, ছুঁয়ে দিস না। আলুপোড়া কোথায় পেলি? মাঠে আলু চুরি করতে গিয়েছিলি? সেদিন আখ চুরি, আজ আলু - কি শুরু করেছিস? তুই এই গ্রামের ছেলে নোস - কলকাতায় থাকিস। ভালো স্কুলে পড়িস। নপিসিমা-পিসেমশাই তোকে এইসব করার জন্যে এখানে নিয়ে এসেছে? তোর এই কাজের জন্যে তোর বাবা-মাকে কেউ যদি পাঁচকথা শোনায় - তোর ভাল লাগবে তো’? 

সেই সন্ধ্যায় তুলসীমঞ্চের সামনে, মুখের ওপর খেলা করা প্রদীপের স্নিগ্ধ আলোয় - বন্নিদিদির কথাগুলো আমাকে এমন এক সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল যার ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। আজ পর্যন্ত জীবনের প্রত্যেকটি বেপথু মুহূর্তে, দীপের সীমিত আলোয় বন্নিদিদির দীপ্ত মুখের সেই কথাগুলি সঠিক পথের দিশারী হয়ে আমার কাছে ফিরে এসেছে বারবার।  

[পরের পর্ব " লোকশিল্পীর বিলুপ্তি "]  

সনাতনীর সন্ধানে

 



[এর আগের পর্ব - রতনে রতন চেনে]


এমন নয় যে মামার বাড়ি বা গ্রাম বাংলা আমার কাছে নতুন জায়গা। এর আগেও গেছি। কিন্তু এইবারটা একটু অন্যরকম। অন্যান্য বার আমাদের থাকার সময় হত সীমিত, সাতদিন বড়জোর দশদিন। কলকাতার আবদ্ধ জীবনের থেকে মুক্তির রসাস্বাদন শুরু হবার আগেই যেন ফেরার আয়োজন চালু হয়ে যেত। এবারে থাকাটা একদম আলাদা সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী অনির্দিষ্টকালের জন্য।

পৌঁছোনোর পরদিন সকাল সকাল ঘুম থেকে টেনে তুলে দিল ছোটমাসিমা - হাতে ধরিয়ে দিল একটা কাঁসার গেলাস ধরে দেখলাম সেটা কনকনে ঠান্ডা। এমনিতেই কলকাতার চেয়ে অনেক বেশী ঠান্ডা এখানে। গেলাসটা হাতে ধরতে আমার হাড়গোড় পর্যন্ত কেঁপে উঠল ঠান্ডায়। ফিকে বাদামি রঙের, সরস্বতীপুজোর পায়েসের গন্ধ মাখা পানীয় – সঠিক বললে - সার্ভড অ্যাজ চিল্ড। হাল্কা চুমুক দিতেই দাঁতের গোড়া ঝাঁকিয়ে উঠল ঝনঝন করে, কিন্তু রসনার স্বাদকোরকগুলি রীতিমত নড়েচড়ে বসল এমন একটি অনাস্বাদিত রসের অভূতপূর্ব আস্বাদ পেয়ে। পানীয়টি খেজুর গাছের রস – আর এ জিনিষ যে আমাদের কলকাতায় মিলবে না সেটা গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করতেও ছাড়ল না ছোটমাসিমাবাবা আমার পাশেই বসেছিলেন, তিনিও মাসিমার কথায় কোন প্রতিবাদ করলেন না। অথচ ওই বয়সেই অনেক বয়স্ক লোকের মুখেই শুনেছিলাম – ‘কি পাওয়া যায় না, হে - পয়হা ফেললে বাঘের দুদও মেলে কলকেতায়’!

সেদিন সকালেই বাবা নিমের ডাল দিয়ে দাঁতন করলেনবিষাক্ত কেমিক্যালযুক্ত পেস্ট আর প্লাস্টিকের বুরুশের থেকে অন্ততঃ একদিন প্রাকৃতিক মুক্তি পাবার জন্যে। বাবার দেখাদেখি বায়না ধরলাম আমিও। ভাবলাম না জানি এও কোন অজানা জগৎ খুলে দেবে আমার সামনে। খেজুররসে সদ্যতৃপ্ত রসনা সেদিন চমকে উঠেছিল আমার এ হেন অবিমৃষ্যকারিতায়, আর আমার অন্তরাত্মার হাতে পায়ে ধরে বারবার বলেছিল ‘ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি’বারবার মানা করা সত্ত্বেও শুনিনি বলে, ছোটমাসিমা আমার কি অবস্থা দাঁড়ায় দেখতে সামনেই দাঁড়িয়েছিল। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত তিক্ত হয়ে উঠেছিলাম, কিন্তু বাবার মতো গম্ভীরভাবে পায়চারি করতে করতে নিমের ডালেই দাঁত মেজেছিলাম সেদিন এবং সেই বয়সেই বুঝে গিয়েছিলাম - ইগো বড় বালাই।

সেদিন বিকেলেই বাবা ফিরে গেলেন কলকাতায়। ছোটমামা বাবাকে এগিয়ে দিতে গেলআমরা সদর দরজায় দাঁড়িয়ে রইলাম যতক্ষণ বাবাকে দেখা যায়। দিদিমা, দুই মাসিমা, মামাতো দিদি এবং সবার পিছনে বড়োমামা - সকলেই ছিলেন আমাদের সঙ্গে। বাবা যখন রাস্তার মোড়ে আড়ালে চলে গেলেন, দিদিমা হাত জোড় করে নমস্কার করে বললেন ‘সব ভালো রেখো, মা বিপত্তারিণী’, ঘোমটা দেওয়া মায়ের গম্ভীর মুখ আর চোখে জল টলটল করছিল। ভীষণ মন খারাপ করতে লাগল বাবার জন্যে।

আমি অচিরেই আমার মামাতো দিদির একান্ত ভক্ত হয়ে উঠলাম। বহ্নি আমার উচ্চারণে হয়ে গেল বন্নিদিদি। কাজে অকাজে বন্নিদিদির সঙ্গী হবার জন্যে আমি উদ্গ্রীব থাকতাম, আর বন্নিদিদিও আমার মতো একটি অনুরক্ত ভাই পেয়ে যারপরনাই হ্লাদিতা হয়েছিল সন্দেহ নেই।

দুপুরে দিদিমা, মা-মাসিমার দিবানিদ্রার অবসরে আমি বন্নিদিদির একান্ত সঙ্গী হিসেবে দিদিমার কড়ির বয়ামে সুরক্ষিত কুলের আচার, আমের মিষ্টি ও টক আচার, আমচূর ইত্যাদির নিয়মিত অংশীদার হতে পেরেছিলাম। মাঝে মাঝে কোথা থেকে কে জানে বন্নিদিদি কৎবেল জোগাড় করে আনত। সকালে সর্ষের তেল, বিট নুন, গুড় দিয়ে মেখে রেখে দিত রোদ্দুরে - কিন্তু সকলের চোখের আড়ালে। দুপুরে সেই জারিয়ে ওঠা কৎবেলের গন্ধেই মুখের ভিতরটা রসস্থ হয়ে উঠত। তর্জনীর ডগায় অল্প একটু মাখা নিয়ে বন্নিদিদি টেষ্ট করত, তার চোখ ছোট্ট হয়ে যেত কুঁচকে, আর জিভে টক করে আওয়াজ তুলে বলত –‘দারুউউণ’। তারপর আমার জিভেও একটু লাগিয়ে দিয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করত - কেমন? অদ্ভূত স্বাদে আমার মোহিত রসনা তখন জবাবরহিত, তাই ঘাড় নাড়িয়ে বন্নিদিদির রসবোধকে পূর্ণ সমর্থন করে বন্নিদিদির বাটির দিকে তাকাতে, বন্নিদিদি আদ্দেকের বেশ কিছুটা কম আমার হাতে তুলে দিয়ে বলত-

– ‘বেশী খাসনি, বদহজম হবে। আর তোর পেট খারাপ হলে মা আমার পিঠ ফাটাবে...’।  বন্নিদিদির মা মানে আমার মামিমা।

একদিন সকালবেলা নটা সাড়ে নটা নাগাদ ছোট্ট একটি বালতি হাতে বন্নিদিদি আমাকে বলল ‘আমার সঙ্গে যাবি তো চ, গোয়ালে যাব গাই দুইতে’। আমার বিশ্বাসই হয়নি। বন্নিদিদি কতো বড়ো আমার চেয়ে – মেরেকেটে বছর তিন কি চারেকের হবে। সে ওই বড়ো বড়ো শিংওলা গরুগুলোকে সামলাতে পারবে? এই বুঝি পেটে শিং দিয়ে গুঁতিয়ে দিল - এই ভয়েই তো আমি সারা!

বাড়ি থেকে মিনিট পাঁচেক দূরেই মামাদের খামার বাড়ি, তার একধারে টালির চাল দেওয়া টানালম্বা গোয়াল ঘর। বুকসমান উঁচু মাটির চাতালে ছটা পোড়ামাটির লাল রংয়ের ডাবা বসানো। মেঝেয় ছটা খোঁটা পোঁতা আছে, গরু মোষ বাঁধার জন্যে। চারিদিক গোময় এবং গোমূত্রলিপ্ত অর্থাৎ হিন্দুশাস্ত্র মতে পবিত্রদুধসাদা বাছুরটা গোয়ালের বাইরে বাধাঁ ছিল, বড়ো বড়ো কালো চোখ মেলে দেখছিল তার মাকে আর ছটফট করছিল মায়ের কাছে যাবার জন্যে। গোয়ালে খোঁটায় বাঁধা মা গাইটি - যার দিদিমা নাম রেখেছিলেন গৌরী - বারবার ডেকে উঠছিল হাম মা...

ভুবনমামা - মামাবাড়ির রাখাল - লম্বা পাতবঁটিতে ঘস ঘস করে গরুমোষের খাবার ‘ছানি’ কুচোচ্ছিল খড়ের আঁটি কেটে কেটে। সে মুখ তুলে তাকাল, বলল - ‘এতক্কনে এলে বন্নিদিদি, সেই থিকে তোমার গউরি ডেকে ডেকে সারা -’। মামাবাড়ির বাসন মাজা, ঘর নিকোনো, ঘুঁটে দেওয়ার কাজ করে বিধবা ভামিমাসী - সত্যভামা – আমাদের দেখে হাসল। তার দুহাতে গোবর লেগে, একটা ঝুড়িতে গোবর তুলে রাখছে সে, দুপুরে ঘুঁটে দেবে বলে।

বন্নিদিদি খোঁটা থেকে বাছুরটাকে খুলে দিতেই বাছুরটা ছুট্টে চলে গেল তার মায়ের কাছে। মাথার ঢুঁ দিয়ে দিয়ে মায়ের পালান চুষতে শুরু করল আর গৌরী ঘাড় ঘুরিয়ে ধূসর রঙের লম্বা জিভ দিয়ে চাঁটতে লাগল তার সন্তানের গা, পিঠ আর সদা চঞ্চল লেজটিসেইসময় বা তার কিছুদিন পরে কংগ্রেসের ভোটের সিম্বল ছিল ‘গাইবাছুর’ – অবিকল যেন এই গৌরী আর তার বাছুরের ছবি। সেই সিম্বলকে প্রত্যক্ষ জেনেছিলাম বন্নিদিদির সঙ্গে মামাবাড়ির গোয়ালে। 

মিনিট চারপাঁচেক পরেই বন্নিদিদি বাছুরটাকে টেনে সরিয়ে আনল, আমাকে দড়িটা ধরিয়ে দিয়ে বলল –‘শক্ত করে ধরে রাখ, কাছে আসতে দিস না’বলেই উবু হয়ে বসে গেল গৌরীর নীচে বালতিটা রেখে। দুটি বাঁট দুহাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দিয়ে চেপে চেপে দুধ দুইতে শুরু করলফিনকি দিয়ে ঝরে পড়া সফেন দুধে খালি বালতি আস্তে আস্তে ভরে উঠতে লাগল – এই দুধ আমাদের পুষ্টি দেবে, দেবে লাবণ্য ও শক্তিকারণ দিদিমার মুখে শুনেছি “দুধে লাবণ্য বৃদ্ধি, ঘৃতে বৃদ্ধি বল। মাংসে মাংস বৃদ্ধি, শাকে বৃদ্ধি মল” সমস্ত দুধ নিংড়ে নিয়ে প্রায় পৌনে-বালতি ভরা দুধ নিয়ে বন্নিদিদি উঠে এল, আমাকে বলল বাছুরটাকে ছেড়ে দিতে - ছেড়ে দিলাম। অবুঝ ক্ষুধার্ত বাছুরটা আবারও ছুটে গেল তার মায়ের কাছে। গৌরী তখন নিঃস্ব – তার রিক্ত পালানে নিজের সন্তানের স্পর্শও তখন বিরক্তিকর।

এর আগে গরুর রচনা পড়েছি। সে অনুযায়ী গুনে গুনে বুঝে নিয়েছি তার শিং, পা, ক্ষুর লেজের চুলচেরা হিসেব। আমাদের পুষ্টিবিধানের জন্যে তার নিরলস দুগ্ধ সরবরাহের উপকারী প্রয়াসের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ ছিল সেই সব রচনায়। বাড়িতে দেখেছি যে কোন যজ্ঞ অনুষ্ঠানে, পঞ্চগব্য আবশ্যিক উপচার এবং শুনেছি বহুল প্রচলিত মন্ত্রে গোমাতার স্তব ও স্তুতিসেদিন বুঝেছিলাম চরম এক বঞ্চনাকে কি সুচারুভাবেই না ঢেকে রাখা হয়েছে মানবসভ্যতার উন্মেষ থেকে!

এই শোষণ, দোহন ও বঞ্চনার ইতিহাস ততটাই প্রাচীন, যতটা প্রাচীন মানুষের সামাজিক ইতিহাস। সবল শোষণ করে অবলকে, সক্ষম দোহন করে অক্ষমকে এবং একে আড়াল করার জন্যে আবহমানকাল ধরে চলে আসছে পাপ-পুণ্য, পূর্বজন্মের সুকৃতি-দুষ্কৃতির খতিয়ান। নির্বলের হতাশা এবং সবলের সম্ভাব্য বিবেক দংশন যদি কোনভাবেই ঢাকা না দেওয়া যায়, তাহলেও হাতে তো থাকছেই - কপালের লিখন – ‘নেকন, নেকন, বুয়েচ হে, সবই কপালের নেকন’!

এতটা স্পষ্ট উপলব্ধি সেদিনই আমার ঘটে গিয়েছিল মোটেই তা নয়, কিন্তু চেতনায় এই রূপটা যে একটা অস্পষ্ট আকার নিচ্ছিল এটা সত্যি। কলকাতার বাসায় আমাদের ছোট্ট সীমিত সংসারে, উত্তর কলকাতার মধ্যবিত্ত পাড়ায় এবং স্কুলের ছকবাঁধা নিত্যনৈমিত্তিক জীবনে এই চেতনার আভাস আসাও – অন্ততঃ সেই বয়সে – একপ্রকার অসম্ভবই ছিল আমার মনে হয়।

সে যাই হোক, বাড়ি এসে মাকে বন্নিদিদি আর আমার কৃতিত্বের কথা সবিস্তারে জানাতে, মা বলল প্রাচীনকালে মেয়েরাই নাকি গাই দুইত মানে দোহন করত আর সংস্কৃতের দোহন শব্দ থেকেই নাকি দুহিতা শব্দ এসেছে – যার মানে কন্যা বা মেয়ে। তার মানে বন্নিদিদি ভারতবর্ষের এক কন্যার সনাতন প্রতিরূপ এবং প্রতিভূ! আশ্চর্য!

 

এমন ভাবেই প্রত্যেকটি দিন - নিত্যনতুন এবং অভিনব স্বাদ রূপ রস নিয়ে ধরা দিতে লাগল আমার কাছে। চিনে নিতে লাগলাম আমার জীবনের ভিত্তি আর সম্পর্কের সব শিকড়গুলি। গোগ্রাসে আত্মসাৎ করছিলাম এর সবকিছু। গড়ে উঠতে লাগল এক ভিন্ন মাত্রার জীবনবোধ। যে বোধ আমার চেনাশোনা শহরের জীবনযাপন পদ্ধতির থেকে অনেকটাই আলাদা।

 

-০০-

[এর পরের পর্ব  "চুরি বিদ্যে মহাবিদ্যে"]  

মঙ্গলবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

পাখির চোখ

 



এর আগের পর্ব - " বিদায়বেলার মালাখানি "


 

উত্তর কলকাতার এই পাড়াতে সব বাড়িই একশ-দেড়শ বছরের পুরোনোঅধিকাংশ বাড়িগুলোরই ওপরতলায় বাড়িওয়ালা নিজে থাকেন। নিচের ঘরগুলোতে ভাড়াটে। ভাড়াটেরা অর্থ কৌলীন্য অনুযায়ী একঘর, দুঘর নিয়ে ভাড়া থাকে। এজমালির পাইখানা, চানের ঘর। বারন্দায় তোলা উনুনে রান্না। টাইম কলে দিনে তিনবার জল আসে। সেসময় জলের ভাগ নিয়ে ভাড়াটেদের মধ্যে নিত্য আকচাআকচি। ভাড়াটে মানেই যেন চালচুলোহীন, গাঁঞি-গোত্রহীন কিছু মানুষ। এদের সম্পূর্ণ বিশ্বাস করা উচিৎ নয়, মাসের শুরুতে ভাড়ার টাকাটা হাতে এলে সংসারের কিছুটা সুসার হয় বলেই, বাধ্য হয়ে ভাড়াটে বসানো। বনেদি উত্তর কলকাতার বাড়িওয়ালাদের মুখের উচ্চারণেও এই তাচ্ছিল্য ভাবটা বেশ বোঝা যায়, “ভাড়াট্যে”। তাঁদের এই কথাতেই বোঝা যায় এক পাড়া এবং এক বাড়িতে থাকলেও ভাড়াটে আর বাড়িওয়ালার সামাজিক অবস্থানে আসমান –জমিন ফারাক!         

“ভাড়াট্যে” বসা এই বাড়িগুলির নিয়মিত মেরামতি হয় বলে অবস্থা কিছুটা ভালই। কিছু বাড়ি আছে যাদের বহুদিন মেরামতি হয় না, হানাবাড়ির দশা, সেই বাড়িগুলি মেস। গ্রাম –মফস্বল থেকে আসা মেসের বোর্ডাররা এই বাড়িগুলিতে থাকে। শনি-রবিবার অথবা ছুটির দিনগুলিতে ফাঁকা থাকলেও, সপ্তাহের অন্যদিনগুলিতে মেস বাড়িগুলোতে বেশ চেঁচামেচি আর হৈচৈ শোনা যায়। মেসের ছোকরা চাকর, তাদের নাম কার্তিক, অথবা শ্যামল, কিংবা ভোলা বা পচাসন্ধেবেলা অফিস ফেরা বাবুদের বারবার হাঁক শোনা যায়। “অ্যাই, ভোলা আমার ঘরে দুটো চা দিয়ে যা”“কেতো, তোকে যে বললাম, ধনেরচাল দেওয়া দুটো পান আনতে”! “অ্যাই হারামজাদা শ্যামলা, এক প্যাকেট কাঁচি আনতে কতবার বললাম, কথা কানে যাচ্ছে না, নাকি?” তাদের উচ্চস্বরের উওরও শোনা যায়, “এই যাচ্ছি, বাবু”।

 অচ্যুত যে বাড়ির একতলায়, বাসা নিয়েছে, সেটার ওপর তলাতেও ভাড়াটেই থাকে - বাড়িওয়ালা নয়। বাড়িওয়ালা থাকে এখান থেকে সামান্য দূরে অন্য বাড়িতে। বাড়িওয়ালা নিজে ডাক্তার, বেশ বড়োলোক, নিজের গাড়ি আছে! বাড়িতে ফোন আছে! তিনি কেন ভাড়াটেদের সঙ্গে থাকতে যাবেন? একবাড়িতে দুটো মাত্র ভাড়াটে পরিবার, সেদিক থেকে ঝুট-ঝামেলা বেশ কম। যদিও উপরের ভাড়াটেরা বাঙাল! খাইসে বলে, ইসে বলে। এ পাড়ায় ভাড়াটেদের মধ্যে আরো কয়েকটি বাঙাল পরিবার আছে। পাড়ায় সকলের সঙ্গে সকলের মেলামেশা, আলাপ-পরিচয় আছে, কিন্তু তার মধ্যেও আছে অদ্ভূত কিছু গণ্ডি! ভাড়া না দেওয়া স্বচ্ছল ঘটি বাড়িওয়ালা এবং ভাড়া দেওয়া হীনমন্য ঘটি বাড়িওয়ালা। দেশের গ্রামে জমিভিটেওয়ালা ঘটি ভাড়াটে। শিকড় ছিঁড়ে আসা উদ্বাস্তু বাঙাল ভাড়াটে। প্রত্যেকের মনে মনে আর্থ সামাজিক সূক্ষ্ম পর্দার একটা আড়াল রয়েই গেছে, যদিও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষে সকলেই একে অপরের পরিপূরক!       

 এসব সত্ত্বেও গ্রাম থেকে সদ্য আসা নতুন পাতা সংসারের পক্ষে পাড়াটা মন্দ নয়, ভালোই এখান থেকে পায়ে হাঁটা পথে অজস্র স্কুল, কলেজ। মেডিক্যাল কলেজ, ইউনিভার্সিটি। শেয়ালদা স্টেশনও পায়ে হাঁটা দূরত্বে। ট্রামে চড়লে হাওড়া স্টেশন পৌঁছোতে মিনিট কুড়ি লাগে। অচ্যুতের কলকাতার এই বাসায় দুটো ঘর, আর ছোট্ট একটা রান্নার জায়গা। দক্ষিণে রাস্তার দিকে লম্বা বারান্দায় কোমর ভর পাঁচিলের ওপর লোহার জাল দিয়ে ঘেরা। স্নানঘর, পাইখানা একতলাতেই, ওপরের ভাড়াটের সঙ্গে ভাগাভাগিএই বাড়ির বাইরের দিকে আরেকটা ঘর আছে। সে ঘরের লাগোয়া পানের দোকান। সেটা ভাড়া নিয়েছে শম্ভুচরণ, সেই পানের দোকানটা চালায় দোকানের পিছনের ছোট্ট ঘরটাতে সন্ধের পর বসে তাসের আড্ডা। একটু কান পাতলে তখন শোনা যায় “টু ক্লাব্‌স্‌”, “থ্রি হার্ট্‌স্‌”-এর ডাক।  সকাল আট-সাড়ে আটটা থেকে বেলা দেড়টা কি দুটো, আবার বিকেল পাঁচটা থেকে রাত এগারোটা অব্দি পানের দোকান খোলা থাকে। শম্ভুদার দোকান খোলার সময় থেকে, রেডিও চলতে থাকে নিরন্তরভেসে আসে বাংলা গান, হিন্দি গানঅনুরোধের আসর, রম্যগীতি, ভুলে বিসরে গীত...। দোকানে কত লোকের যে আনাগোনা। কেউ পান-বিড়ি-সিগারেট কিনে চলে যায়কেউ কেউ পান মুখে নিয়ে সিগারেট টানতে টানতে, ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দেয়। রাজনীতি, খেলাধুলো, সিনেমার আলোচনা আর রেডিওর গানে, প্রায় সারাদিন জমজমাট পানের দোকান।

বেলা সাড়ে নটায় ভাত খেয়ে অচ্যুত অফিসে বেরোনোর পর, সোনা পান্নাকে কোলে নিয়ে, হীরুকে পড়াতে বসেনদিন পনের পর স্কুলের অ্যাডমিশান টেস্ট। “অ্যাডমিশন”, “টেস্ট” এই শব্দগুলো সোনার কাছে একদম আনকোরা। দাদু কিংবা জ্যাঠামশাই অথবা বাবা, কেউ গিয়ে হেডমাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে কথা বলে, ছেলে-মেয়েকে ক্লাসে বসিয়ে দিয়ে এলেই, ছেলে মেয়েদের স্কুল শুরু হয়ে যায়, এমনই তিনি দেখেছেন বাপেরবাড়ি কিংবা শ্বশুরবাড়ির গ্রামে। বিশাল এই শহরের নিয়ম তেমন নয়। তিরিশজন ছেলে নেবে, অ্যাডমিশন টেস্ট দেবে অন্ততঃ তিনশ জন। যে স্কুলের যত নাম, তত বেশি কম্পিটিশান। এই “কম্পিটিশন” কথাটাও তাঁর কাছে নতুন। হীরুর ষোলো ঘর অব্দি মোটামুটি মুখস্থ হয়েছে, কিন্তু সতের, আঠের আর ঊণিশের ঘরের নামতা প্রায় কিছুই পারছে না। এরপরে আছে চার সংখ্যার যোগ। তিনসংখ্যার বিয়োগ। গুণ, ভাগ। এরপর আছে ভার্বের প্রেজেন্ট, পাস্ট, পাস্টপারফেক্ট টেন্‌স্‌-এর চার্ট – গো ওয়েন্ট গন, ডু ডিড ডান, রিড রেড রেড, টিচ টট টট। বাংলা বানান, বিভীষিকা, মুমূর্ষু, বিজীগিষা...। সোনা নিজেও মাঝে মাঝে খেই হারিয়ে ফেলেন, এইটুকু ছোট ছেলের পক্ষে এত কিছু মনে রাখা সম্ভব? আর এখনই যদি সব শিখে ফেলে, তাহলে অ্যাডমিশন পাওয়ার পর স্কুলে কী পড়বে?

 

 

বঙ্কিম চাটুজ্জ্যে স্ট্রিটে পাশাপাশি দুটো সরকারি স্কুলেরই খুব সুনাম। হিন্দুস্কুল আর সংস্কৃত স্কুল। তাদের ঘিরে চারপাশেই বইয়ের দোকান, পরিবেশও ভালো। অচ্যুত ছেলে হীরুকে সঙ্গে নিয়ে এক রোববার দুটো স্কুলেই নিয়ে গেছিলেন। তাঁদের বাসা থেকে স্কুলদুটো খুব দূরে নয়, পায়ে হাঁটা পথে মিনিট দশেকের দূরত্ব সেদিন রোববার, তাই স্কুলের ভেতরে ঢুকতে পারেননি, কিন্তু স্কুলের উঠোন থেকে থেকে ঘাড় উঁচু করে স্কুলের বাড়ি দেখে হীরু অবাক হয়েছিল খুব। এত্তো বড়ো বাড়ি! কত্তো জানালা, দরজা, লম্বা টানা বারান্দা, সারি সারি ঘর। এইসব স্কুলে কতো ছেলে পড়ে?

গ্রামের একতলা বাড়ির ছোট্ট স্কুলে দিন কয়েক যাওয়ার অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই স্কুলকে কিছুতেই মেলাতে পারছিল না হীরু। স্কুলের সামনে কোন মাঠ নেই। শান বাঁধানো উঠোনের ধারে ধারে কিছু গাছপালা আছে, কিন্তু সে কেমন যেন সাজানো গোছানো। সোজা খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সব গাছ। সে গাছের ডালে ঝুলে দোল খাওয়া যাবে না, যেমন দোল খাওয়া যেত তাদের গ্রামের বটের ঝুড়ি ধরে, কিংবা আম বা তেঁতুলের ডাল ধরে। স্কুলে জলখাবারের কিংবা ছুটির ঘন্টা পড়লে, ছেলেরা ক্লাস ছেড়ে দৌড়ে মাঠে যাবে না? দৌড়োদৌড়ি করে খেলবে কোথায়?

হীরুর অবাক মুখের দিকে তাকিয়ে অচ্যুত খুব তৃপ্তি পান, পথ চলতে চলতে তিনি বলতে থাকেন, এই স্কুল থেকে পাশ করা অনেক ছেলে বড়ো হয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে...হীরু শুনছে, কিন্তু সবটুকু তার চেতনায় ঢুকছে না...তার নিজের গ্রাম, মামারবাড়ির গ্রাম, আর এই কিছুদিন আগে আসা অদ্ভূত অচেনা এই শহর, এর বাইরে দেশ আবার কী বস্তু? সেটা কী এর থেকেও বড়ো কিছু? তার মুখটা কেমন? তাদের বাসায় সে দেখেছে, কালো কালো গোল সুইচ, যার তলার দিকটা সাদা। সুইচ টিপলেই আলো জ্বলে ওঠে, ঘর উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে এই স্কুলে পড়তে হবে কেন? দেশের কী বিজলি বাতি নেই? নাকি সুইচ নেই?

স্কুল দেখা হয়ে গেলে, অচ্যুত ছেলেকে নিয়ে বাঁদিকে কলেজ স্ট্রিটের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, “ওই দ্যাখ, রাস্তার ওপারে প্রেসিডেন্সি কলেজ, আর ওইটা হল হেয়ার স্কুল। ডেভিড হেয়ার বলে একজন সায়েব ছিলেন, তার কথা তোকে বাড়ি গিয়ে বলবো। ওই দ্যাখ, সেই হেয়ার সায়েবের মূর্তি। ওই হেয়ার সায়েবই এই স্কুলগুলো প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কত বিখ্যাত বিখ্যাত মনীষীরা এই স্কুল থেকে আর ওই কলেজ থেকে লেখাপড়া করেছেন তার আর শেষ নেই”

হীরু জিজ্ঞাসা করল, “মনীষী মানে?”

“মনীষী মানে...খুব বিদ্বান, লেখাপড়া জানা মানুষতবে শুধু লেখাপড়া জানলেই মনীষী হয় না – সেই মানুষকে দেশের ও দশের মঙ্গলের জন্যে কাজ করতে হয়। তবেই তাঁরা মনীষী হন।  এই স্কুলে পড়তে হবে, হীরু। বড়ো হয়ে তোকেও ওই রকম বিরাট মানুষ হতে হবে। লোকে দেখে বলবে, হ্যাঁ হীরু, সত্যিই হীরের টুকরো”

হেয়ার স্কুলের উল্টোদিকের গেট দিয়ে কলেজ স্কোয়ারে ঢুকলেন। জলের ধারে বুকভর লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা। পার্কের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অচ্যুত কলকাতা ইউনিভার্সিটির গুরুগম্ভীর বিশাল প্রাসাদ দেখিয়ে বললেন, “স্কুল দেখলি, ওই প্রেসিডেন্সি কলেজ দেখলি আর এই হচ্ছে কলকাতা ইউনিভার্সিটিদেশের মধ্যে অন্যতম সেরা লেখাপড়ার জায়গা”

কিছুটা হেঁটে যাওয়ার পর হীরু দেখল, বড়ো একটা চত্বরে সাদা পাথরে বানানো একটি বসে থাকা মূর্তি। রেলিং ঘিরে সুন্দর করে সাজানো। মূর্তিটি দেখিয়ে অচ্যুত পুত্রকে জিজ্ঞাসা করলেন, “চিনতে পারছিস? কে বলতো?”

“বিদ্যাসাগর। বর্ণপরিচয়ে ছবি দেখেছি”।  

“গুড, ঠিক বলেছিস। ছোটদের জন্যে বর্ণপরিচয় লিখেছেন, কিন্তু ওঁর মতো পণ্ডিত দেশে আর তেমন খুব একটা নেই। দেশের জন্যে, কত যে বড়ো বড়ো কাজ করে গেছেন, সে সব বড়ো হয়ে জানতে পারবি। নমস্কার কর”। হীরুর সঙ্গে অচ্যুত নিজেও জোড়হাতে নমস্কার করলেন। কথা বলতে বলতে জলের ধারের রাস্তা দিয়ে আরো এগিয়ে গেলেন। গাছপালার আড়ালে আরেকটি দাঁড়ানো মূর্তি। মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, “এঁনাকে এখন চিনবি না, আরেকটু বড়ো হয়ে চিনবি। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। খুব বড়ো বিজ্ঞানী ছিলেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়েছেন, কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে পড়েছেন, পড়িয়েছেন। ওঁদের মতো হতে হবে – অন্ততঃ চেষ্টা তো করতে হবে! নমস্কার কর”।

আরেকটু এগিয়ে ছোট্ট গেট দিয়ে বেরিয়ে, কলেজস্কোয়ারের বাইরে এলেন অচ্যুত। সামনে মির্জাপুর স্ট্রিট। ওপারে পুঁটিরামের মিষ্টির দোকান। ঠিক কোনায় ইস্ট বেঙ্গল এম্পোরিয়াম, কাপড়ের দোকান।

রাস্তা পার হয়ে, মির্জাপুর আর কলেজস্ট্রীটের মোড় থেকে সোজা দক্ষিণে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, “ওপারে ওই দ্যাখ, উঁচু পাঁচিল ঘেরা ওই লাল রঙের বাড়িগুলো? ওটা মেডিকেল কলেজ। আমাদের দেশের প্রথম মেডিকেল কলেজ। ওখানে ডাক্তারি পড়ানো হয়। খুব ভালো ভালো ছেলেরা ওখানে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পায়। এখান থেকে পাশ করে তারা ডাক্তার হয়। সাধারণ মানুষ ডাক্তারকে ভগবান মনে করে। অসুস্থ মানুষেরা তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে ভরসা পায়আমার স্বপ্ন তুইও ওই কলেজে পড়বি, বড়ো ডাক্তার হবি। পারবি না? ঘাড়ে স্টেথিস্কোপ দুলিয়ে গটমট করে হেঁটে যাবি হাসপাতালের লম্বা বারান্দা ধরেগায়ে থাকবে ধবধবে সাদা অ্যাপ্রন। রোগীর আত্মীয়-পরিজনেরা তোকে ঘিরে ধরবে, উৎকণ্ঠায় জিজ্ঞাসা করবে, “ডাক্তারবাবু, রুগী সেরে উঠবে তো?” তুই তাদের আশ্বাস দিবি, ভারিক্কি গলায় বলবি “ভাববেন না, সব ঠিক হয়ে যাবে”“নিজের কল্পনার আনন্দে অচ্যুত নিজেই হাসতে হাসতে হীরুর মুখের দিকে তাকালেন। হীরু বাবার সবকথা ঠিকঠাক না বুঝলেও, তার মধ্যে সঞ্চারিত হতে লাগল বাবার স্বপ্ন আর আবেগ। 

 

অজস্র কলপাইপ আর স্যানিটারি দোকান, আরপুলি লেনের মোড় পার হয়ে, প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিটের মোড়ে এসে থামলেন, অচ্যুত। ছেলেকে বললেন, “ওপারে দেখ, সেই কোথায় শুরু হয়েছিল, আর এইখানে ওই মেডিকেলের পাঁচিল শেষ হল। কত্তো বড়ো কলেজ দেখলি? এখানে ডাক্তারি পড়াও হয় আবার রুগীদের চিকিৎসাও হয়। এখানে কিন্তু তোকে ঢুকতেই হবে, হীরু। তার জন্যে খুব মন দিয়ে পড়াশুনো করতে হবে। চল, ওপারে অঞ্জনদার চেম্বারে যাই। উনিও ডাক্তার, ডাক্তার অঞ্জন সামন্ত, এমবিআমাদের পাশের গাঁয়ের লোক। আমার থেকে বছর চার-পাঁচের বড়ো। জ্যাঠামশাই বলবি, কেমন? জ্যাঠামশাই বললাম বলে হুট করে প্রণাম করতে যাস না যেন। ওরা আগুড়ি, আর আমরা বামুন”।

 

এপারে প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিটের ঠিক কোনায় শিবমন্দির আর কলেজস্ট্রিট পার হয়ে, উল্টোদিকেই “বাঙালী পাঁঠার দোকান”দোকানের মধ্যে মা কালীর প্রতিমা। তার দুটো তিনটে দোকান পরে আরোগ্য ফার্মেসি। কাঠের পাল্লা ঠেলে ভেতরে ঢুকেই দুপাশে কাঠের বেঞ্চ বেঞ্চে দুজন বসে আছে, চেহারা দেখেই বোঝা যায়, তারা অসুস্থ। তার ওপাশে ওষুধের আলমারিঅন্যপাশে টেবিলের ওধারে চেয়ারে ডাক্তারবাবু বসে রয়েছেন। তাঁর চেয়ারের পেছনে পর্দা ঝোলানো একটা ঘর। তাঁর পাশের চেয়ারে বসে আছে আরো একজন রোগীডাক্তারবাবু কানে স্টেথোস্কোপ লাগিয়ে তার বুক পিঠ পরীক্ষা করতে করতে, দুবার বললেন, “নিঃশ্বাস, জোরে জোরে”লোকটি জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল। অচ্যুতকে দেখে ডাক্তারবাবু চোখ আর হাতের ইশারায় বললেন, বসো। বুকপিঠ দেখা হয়ে গেলে, ডাক্তারবাবু গলার কাছে টিপে ধরে বললেন, “হাঁ করুন, অ্যা...”। ডাক্তারবাবুর দেখানো মতো লোকটি জিভ বের করে “অ্যা...” করল। তারপর ডাক্তারবাবু লোকটির দু চোখের তলায় টান দিয়ে দেখলেন, তারপর ঘুরে বসে হাতে পেন নিয়ে কাগজে খসখস করে লিখতে লিখতে জিজ্ঞাসা করলেন, “সকাল থেকে কবার বমি হয়েছে?”

“আজ্ঞে তিনবার, যা খাচ্ছি সবই বেরিয়ে যাচ্ছে। মাথায় যন্ত্রণাকাশি হচ্ছে খুব”

“পায়খানা পরিষ্কার হয়েছে?”

“আজ্ঞে না, বারবার বেগ আসছে, কিন্তু পুরো হচ্ছে না”।

“হুঁ। নিতাই!” ডাক্তারবাবুর ডাক শুনে, পিছনের পর্দা সরিয়ে একজন লোক বেরিয়ে এল, ডাক্তারবাবুর হাত থেকে কাগজটা নিয়ে আবার চলে গেল পর্দার আড়ালে। ডাক্তারবাবু চেয়ারে বসা রোগীকে বললেন, “যান, একটু অপেক্ষা করুন। নিতাই ওষুধ বানিয়ে, সব বুঝিয়ে দেবে। তারপর কী খবর তোমার অচ্যুত? এটি কে, পুত্র? ভেরি গুড। কী নাম রে, তোর?”

অচ্যুত ছেলেকে বললেন, “নাম বলো, জ্যাঠামশাইকে”।

“আজ্ঞে হীরকরঞ্জন মুখার্জি” হীরু বলল, তার উত্তরের পর অচ্যুত একগাল হেসে বললেন, “বাড়িতে আমরা হীরু বলে ডাকি”।

ডাক্তারবাবুও একটু হাসলেন, ভুরু নাচিয়ে বললেন, “কলকাতা কেমন লাগছে রে, হীরু?” তারপর হীরুর উত্তরের প্রতীক্ষা না করে অচ্যুতকে জিজ্ঞাসা করলেন, “বাসা গুছিয়ে ফেলেছো? একদিন যাবো তোমার বাসা দেখতে, গোপাল মল্লিকের গলিতে তো?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ, দাদা। সময় করে একদিন এসে নিয়ে যাবো আপনাকে, আরেকটু গুছিয়ে নিই”।

“বেশ, বেশ সেই ভালো। আর এদিকের কী খবর? ছেলেকে কোন স্কুলে ভর্তি করাচ্ছো”?

“দেখি। কোথায় চান্স পায়। হিন্দু, সংস্কৃত, হেয়ার...”।

“খুব শক্ত হে। শুনেছি ছেলেপুলেদের একেবারে নিংড়ে নেয়। যদি না পারে, একটা বছর নষ্ট হবে। ও ছাড়াও অন্য দু একটা স্কুলেও চেষ্টা রেখো”।

“তা ঠিক”।

নিতাই নামের লোকটি পর্দা সরিয়ে বের হয়ে এল, তার হাতে কাচের চ্যাপ্টা বোতল, গোলাপীরঙের ওষুধ ভরা। তার গায়ে সাদা কাগজের খাঁজকাটা শেকল চিপকানো। বেঞ্চে বসে থাকা রোগীকে ডেকে ওষুধ বুঝিয়ে দিল খাঁজকাটা শেকলের খাঁজে খাঁজে আঙুল রেখে সে বলল, “একদাগ সকালে, একদাগ দুপুরে আর একদাগ রাত্রে, খাবার পর। সঙ্গে দিল কয়েকটা কাগজের পুরিয়া। দুপুরে একটা, রাত্রে একটা। সামান্য খাবার জলে গুলে, ঢুক করে খেয়ে নিতে হবে। তিনদিন চলুক। তারপর কেমন থাকেন জানাবেন। চারটাকা চল্লিশ পয়সা”লোকটি টাকাপয়সা গুনে দিয়ে, ওষুধ নিয়ে বেরিয়ে গেল দোকান থেকে। নিতাই পরের রোগীকে ডাকল, “পরাণ মণ্ডল”। বেঞ্চ থেকে উঠে পরাণ ডাক্তারবাবুর পাশের চেয়ারে বসল। ডাক্তারবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “কোথায় কষ্ট?”

অচ্যুত উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “আমি এখন তবে আসি দাদা, আপনি ব্যস্ত রয়েছেন”।

“ঠিক আছে। মাঝে মাঝে এসো হে সময় করে, দেশ ঘরের গল্প করা যাবে!”

“আসবো দাদা, নিশ্চয়ই আসবো”।

 

“সব দেখিয়ে আনলাম, জানো?” ঘরে ঢুকে গায়ের জামা ছাড়তে ছাড়তে অচ্যুত স্ত্রীকে বললেন। সোনা ছেলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী সব দেখিয়ে আনলে, ছেলেকে?”

“ওদের স্কুল, মেডিকেল কলেজ। কলকাতা ইউনিভার্সিটি। কলেজ স্কোয়ার। অঞ্জন ডাক্তারের চেম্বার”।

“ডাক্তারের চেম্বার কেন?” সোনা অবাক হলেন, কিছুটা ভয়ও পেলেন।

“ওই যে গো, তোমায় বলেছিলাম না, আমাদের পাশের গ্রামের অঞ্জনদা ডাক্তার। তার চেম্বার আছে বউবাজারের কাছে। তার সঙ্গে দেখা করে এলাম একবার। হীরুর স্বচক্ষে একজন ডাক্তার দেখা হল”।

“ডাক্তার ডাক্তার করে অত উতলা হয়ো না তো? ওসব এখন ঢের দেরি। আগে তো স্কুলে ভর্তি হোক”।

“সে হোক না, কিন্তু লক্ষ্যটা ঠিক করতে না পারলে সবটাই বৃথা। সেই পাখির চোখের মতো!”

“পাখির চোখ কী, বাবা?”

হীরু বাবার গায়ে গা ঠেকিয়ে বসে জিজ্ঞাসা করল। অচ্যুত ছেলের পিঠে হাত রেখে আরো কাছে টেনে নিয়ে বললেন, “এ সব হচ্ছে, মহাভারতের কথা। আচার্য দ্রোণ, হস্তিনাপুরের সব রাজপুত্রদের অস্ত্রবিদ্যা শেখাতেন। অস্ত্রবিদ্যা মানে তির ছোঁড়া, তলোয়ার চালিয়ে যুদ্ধ করা এই সব আর কি। সবাই শিখছে। বেশ কিছুদিন শেখার পর, একদিন গুরু দ্রোণাচার্য ঠিক করলেন, তাঁর সব শিষ্যদের পরীক্ষা নেবেন। করলেন কী, বড়ো একটা গাছের অনেক উঁচু ডালে মাটির একটা পাখি রেখে দিয়ে বললেন, ওটাকে তির দিয়ে বিঁধতে হবে। এক এক করে সবাইকে ডাকলেন, বললেন মাটির ওই পাখিকে তিরে বিঁধতে হবে। তোমরা সবাই মনঃসংযোগ করো”।

“মনঃসংযোগ মানে?” হীরু জিজ্ঞাসা করল।

অচ্যুত বললেন, “মনঃসংযোগ মানে, ইয়ে...খুব মন দেওয়া...খুব মন দিয়ে কোন একটা কাজ করা। মনঃসংযোগ না হলে কোন কাজই ঠিকঠাক করা যায় না। গুরু দ্রোণাচার্য বললেন, তোমরা মনঃসংযোগ করো, তারপর তোমরা কে কী দেখছো বলো। কেউ বলল, পাখিতো দেখছিই, কিন্তু তার সঙ্গে আপনাকে দেখছি। আমাদের সব ভাইদের দেখছি। আকাশ দেখছি, গাছপালা দেখছি। গাছের ডালপালা দেখছি, পাতা দেখছি। তাদের উত্তরে দ্রোণাচার্য খুশি হলেন না। সবার শেষে এলেন অর্জুন। তাঁকে গুরু দ্রোণাচার্য জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কী দেখছো, অর্জুন? অর্জুন বললেন, পাখির চোখ ছাড়া আর কিচ্‌ছু দেখছি না, গুরুদেব! দ্রোণাচার্য বললেন, সে কি? আর কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছো না? অর্জুন বললেন, আজ্ঞে না, গুরুদেব, কই আর তো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। দ্রোণাচার্য বললেন, মাটির ওই পাখিটিকে তির মেরে নামিয়ে আনতে পারো? তাঁর কথা শেষ হবার আগেই মাটির পাখিটি মাটিতে এসে পড়ল, তার চোখে বিঁধে আছে অর্জুনের তির। দ্রোণাচার্য আনন্দে শিষ্য অর্জুনকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, তুমিই আমার শিক্ষাকে সম্পূর্ণ করেছো, অর্জুন। সেই জন্যেই বলছিলাম, আসল কথাটা হচ্ছে লক্ষ্য - পাখির চোখপ্রথম দিন থেকেই লক্ষ্য যদি স্থির না করা যায়, পুরো কাজটাই এলোমেলো হয়ে যায়”।

এতক্ষণ বাপ আর ছেলের কথা শুনছিলেন সোনা। তাঁর কোলে শুয়ে পান্নাও চুপ করে বাবা আর দাদার কথা শুনছিল। ছেলেটা কী বোঝে কে জানে, কিন্তু চুপ করে সব কিছু শোনেসোনা কোলে ছেলেকে নাচাতে নাচাতে বললেন, “স্কুলটা কেমন দেখলি, হীরু? ভালো? তোদের সেই গাঁয়ের স্কুলের থেকে ভালো?” হীরু এতক্ষণ বাবার উপদেশের চাপে কিছুটা ক্লান্তি অনুভব করছিল, এখন মায়ের প্রশ্নে ভীষণ উত্তেজিত হয়ে, দু হাত ছড়িয়ে বলল, “বিরাআআআট স্কুলগো, মাকত্তো ঘর। কত্তো লম্বা বারান্দা! এক...দুই...তিন...চার তলা বাড়ি”। আঙুলের কড়গুণে সে তলার হিসেব দিল মাকে, বলল, “এই এত্তো চওড়া সিঁড়ি। বারান্দার একধারে ধাপি বানানো, তার ওপর খাবার জলের কল। পরপর কত্তোগুলো কল! ওমা, ছেলেরা কী সারাদিন জলই খায়, নাকি? তাহলে পড়ে কখন?”

সোনা স্নিগ্ধ চোখে তাকিয়ে হীরুর কথা শুনছিলেন, এখন হেসে ফেললেন, বললেন, “ভালো লাগল, স্কুলটা?” বড়ো করে সম্মতির ঘাড় নাড়ল হীরু, তারপর বলল, “জানো তো মা, একজন লোক স্কুলের উঠোনে বসে পেতলের ঘটি মাজছিল, তার এত্তোবড়ো ভুঁড়ি। আমাকে দেখে বলল, কী দেখছো খোখা? খোখা কী মা?”

সোনা একটু অবাক হলেন, অচ্যুতের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কে গো?”

“স্কুলের দারোয়ান-টারোয়ান হবে, স্কুলের ভেতরেই ওরা থাকে তোখোখা মানে খোকা, হিন্দুস্থানী তো, ওরা ওইরকমই উচ্চারণ করে”।  সোনা কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “বাবা, স্কুলে দারোয়ান আছে?”

“বা রে, থাকবে না? অতবড়ো স্কুল। একজন নাকি, অনেক দারোয়ান আছে। তা নাহলে এতো ছেলেদের সামলাবে কী করে? ওদের কত কাজ জানো? স্কুলের ঘন্টা দেওয়া, স্কুলের গেট সামলানো। আরো কত কী!”

সোনা ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হ্যারে, তোর স্কুল পছন্দ হয়েছে?” বিশাল ঘাড় হেলিয়ে হীরু বলল।

“হ্যাঁ”।

“ওই স্কুলেই পড়বি?”

“হ্যাঁ”।

“খুব শক্ত হবে নিশ্চয়ই, ভর্তি হতে পারবি?” মায়ের চোখে চোখ রেখে হীরু বলল, “পারবো, মা।” তারপর মায়ের কাছে সরে গিয়ে ভাইয়ের পেটে সুড়সুড়ি দিতে দিতে বলল, “পান্নাও ওই স্কুলে পড়বে, মা?”

সোনা পান্নার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী রে, দাদার সঙ্গে একসঙ্গে স্কুলে যাবি?” মায়ের কোলে শুয়ে থাকা পান্না কি বুঝলো কে জানে? দাদার সুড়সুড়ি আর মায়ের কথায় হেসে উঠল কলকল করে।

অচ্যুত মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন তাঁর এই ছোট্ট পরিবারের দিকে। তাঁর দুচোখে এখন স্বপ্ন, তাঁর স্থির লক্ষ্য এখন পাখির নির্দিষ্ট চোখে।

 ..০০..

এর পরের পর্ব -পরিবর্তিনি সংসারে... "


নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৪/শেষ পর্বাংশ

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম তৃতী...