শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

গীতা - ১৭শ পর্ব

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "



এর আগের ষোড়শ অধ্যায়ঃ দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগযোগ পাশের সূত্রে গীতা - ১৬শ পর্ব "


সপ্তদশ অধ্যায়ঃ শ্রদ্ধাত্রয়বিভাগযোগ


অর্জুন উবাচ

যে শাস্ত্রবিধিমুৎসৃজ্য যজন্তে শ্রদ্ধয়ান্বিতাঃ

তেষাং নিষ্ঠা তুম কা কৃষ্ণ সত্ত্বমাহো রজস্তমঃ।।

অর্জুন উবাচ

যে শাস্ত্রবিধিম্‌ উৎসৃজ্য যজন্তে শ্রদ্ধয়া অন্বিতাঃ।

তেষাং নিষ্ঠা তুম কা কৃষ্ণ সত্ত্বম্‌ আহো রজঃ তমঃ।।

অর্জুন বললেন- হে কৃষ্ণ, যাঁরা শাস্ত্রবিধি ত্যাগ করলেও নিষ্ঠার সঙ্গে যজ্ঞ উপাসনা করেন, তাঁদের সেই নিষ্ঠা কেমন, সাত্ত্বিক, রাজসিক না তামসিক?

 

শ্রীভগবানুবাচ

ত্রিবিধা ভবতি শ্রদ্ধা দেহিনাং সা স্বভাবজা।

সাত্ত্বিকী রাজসী চৈব তামসী চেতি তাং শৃণু।।

শ্রীভগবান্‌ উবাচ

ত্রিবিধা ভবতি শ্রদ্ধা দেহিনাং সা স্বভাবজা।

সাত্ত্বিকী রাজসী চ এব তামসী চ ইতি তাং শৃণু।।

শ্রীভগবান বললেন- মানুষের স্বাভাবিক শ্রদ্ধা তিন ধরনের, সাত্ত্বিকী, রাজসী ও তামসী। এই তিন শ্রদ্ধার কথা তোমাকে এখন বলছি, শোনো।

 

সত্ত্বানুরূপা সর্বস্য শ্রদ্ধা ভবতি ভারত।

শ্রদ্ধাময়োঽয়ং পুরুষো যো যচ্ছ্রদ্ধঃ স এব সঃ।।

সত্ত্ব অনুরূপা সর্বস্য শ্রদ্ধা ভবতি ভারত।

শ্রদ্ধাময় অয়ং পুরুষঃ যঃ যৎ শ্রদ্ধঃ স এব সঃ।।

হে অর্জুন, মানুষের স্বভাব সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই তিন প্রকারের হওয়ায়, সকল মানুষের শ্রদ্ধাও সেই অনুসারে তিন প্রকারের হয়। শ্রদ্ধাবান মানুষ, যিনি যেরূপ শ্রদ্ধাযুক্ত, তিনি সেই রূপই হন।

   

যজন্তে সাত্ত্বিকা দেবান্‌ যক্ষরক্ষাংসি রাজসাঃ।

প্রেতান্‌ ভূতগণাংশ্চান্যে যজন্তে তামসা জনাঃ।।

যজন্তে সাত্ত্বিকা দেবান্‌ যক্ষরক্ষাংসি রাজসাঃ।

প্রেতান্‌ ভূতগণাং চ অন্যে যজন্তে তামসা জনাঃ।।

সাত্ত্বিক মানুষ দেবতাদের পূজা করেন, রাজসিক ব্যক্তি যক্ষ ও রাক্ষসগণকে পূজা করেন। এবং তামসিক মানুষ ভূত, প্রেত ও অন্যান্যদের পূজা করেন।

 

৫,৬

অশাস্ত্রবিহিতং ঘোরং তপ্যন্তে যে তপো জনাঃ।       অশাস্ত্রবিহিতং ঘোরং তপ্যন্তে যে তপো জনাঃ।

দম্ভাহঙ্কারসংযুক্তা কামরাগবলান্বিতাঃ।।               দম্ভ-অহঙ্কার-সংযুক্তা কাম-রাগ-বল-অন্বিতাঃ।।

কর্শয়ন্তঃ শরীরস্থং ভূতগ্রামমচেতসঃ।                কর্শয়ন্তঃ শরীরস্থং ভূতগ্রামম্‌ অচেতসঃ।

মাঞ্চৈবান্তঃশরীরস্থং তান্‌ বিদ্ধ্যাসুরনিশ্চয়ান্‌।।          মাং চ এব অন্তঃশরীরস্থং তান্‌ বিদ্ধি                                                               অসুরনিশ্চয়ান্‌।।

যে দাম্ভিক ও অহংকারী ব্যক্তিরা এবং কামনা, আসক্তি ও শক্তির মোহে আচ্ছন্ন বিবেকহীন ব্যক্তিরা শরীরের সমস্ত ইন্দ্রিয়কে এবং দেহের ভিতর আত্মস্বরূপ আমাকে অমান্য ক’রে শাস্ত্রবিরুদ্ধ তপস্যার ভয়ানক অনুষ্ঠান করে, তাদেরকে নিশ্চিতভাবে আসু্রিকবুদ্ধি বলে জানবে।

  

আহারস্ত্বপি সর্বস্য ত্রিবিধো ভবতি প্রিয়ঃ।

যজ্ঞস্তপস্তথা দানং তেষাং ভেদমিমং শৃণু।।

আহারঃ তু অপি সর্বস্য ত্রিবিধঃ ভবতি প্রিয়ঃ।

যজ্ঞঃ-তপঃ-তথা দানং তেষাং ভেদম্‌ ইমং শৃণু।।

এই তিন স্বভাবের মানুষের আহার তিন প্রকারের হয়, প্রিয় বস্তুও তিন প্রকারের হয়। যজ্ঞ, তপস্যা, দান এই সমস্তই তিন প্রকারের হয়। এই তিনের প্রভেদ তোমাকে এখন আমি বলব। 

 

আয়ুঃসত্ত্ববলারোগ্যসুখপ্রীতিবিবর্ধনাঃ।

রস্যাঃ স্নিগ্ধাঃ স্থিরা হৃদ্যা আহারাঃ সাত্ত্বিকপ্রিয়াঃ।।

আয়ুঃ-সত্ত্ব-বল-আরোগ্য-সুখ-প্রীতি-বিবর্ধনাঃ।

রস্যাঃ স্নিগ্ধাঃ স্থিরা হৃদ্যা আহারাঃ সাত্ত্বিকপ্রিয়াঃ।।

যে আহার মানুষের আয়ু, উদ্যম, প্রাণশক্তি, সুস্বাস্থ্য, সুখ ও প্রীতি বৃদ্ধি করে; সরস, স্নিগ্ধ, পুষ্টিকর ও তৃপ্তিকর সেই আহারই সাত্ত্বিক ব্যক্তিদের প্রিয় আহার।

  

কট্বম্ললবণাত্যুষ্ণতীক্ষ্ণরুক্ষবিদাহিনঃ।

আহারা রাজসস্যেষ্টা দুঃখশোকাময়প্রদাঃ।।

কটু-অম্ল-লবণা-অত্যুষ্ণ-তীক্ষ্ণ-রুক্ষ-বিদাহিনঃ।

আহারা রাজসস্যেষ্টা দুঃখশোকাময়প্রদাঃ।।

অত্যন্ত তিক্ত ও টক, তীব্র লবণাক্ত, অতি উষ্ণ ও অত্যন্ত ঝাল, অতি শুষ্ক ও তীক্ষ্ণ জ্বালাকর আহার দুঃখ, শোক ও অসুখের কারণ হয়, এই প্রকারের আহার রাজসিক ব্যক্তিদের প্রিয়।

 

১০

যাতযামং গতরসং পূতি পর্যুসিতঞ্চ যৎ।

উচ্ছিষ্টমপি চামেধ্যং ভোজনং তামসপ্রিয়ম্‌

যাত-যামং গতরসং পূতি পর্যুসিতং চ যৎ।

উচ্ছিষ্টম্‌ অপি চ অমেধ্যং ভোজনং তামস-প্রিয়ম্‌

অর্ধ সিদ্ধ, রসহীন, দুর্গন্ধময়, বাসী, উচ্ছিষ্ট ও নিষিদ্ধ খাদ্য তামসিক ব্যক্তিদের প্রিয় হয়।

 

১১

অফলাকাঙ্ক্ষিভির্যজ্ঞো বিধিদিষ্টো য ইজ্যতে।

যষ্টব্যমেবেতি মনঃ সমাধায় স সাত্ত্বিকঃ।।

অফল-আকাঙ্ক্ষিভিঃ যজ্ঞঃ বিধিদিষ্টঃ য ইজ্যতে।

যষ্টব্যম্‌ এব ইতি মনঃ সমাধায় স সাত্ত্বিকঃ।।

ফলের প্রত্যাশা না রেখে, ‘যজ্ঞ অনুষ্ঠানই একান্ত কর্তব্য’, মনে এই প্রত্যয় নিয়ে, সনিষ্ঠা শাস্ত্রবিধি পালন করে যজ্ঞের যে অনুষ্ঠান, সেই যজ্ঞই সাত্ত্বিক।

 

১২

অভিসন্ধায় তু ফলং দম্ভার্থমপি চৈব যৎ।

ইজ্যতে ভরতশ্রেষ্ঠ তং যজ্ঞং বিদ্ধি রাজসম্‌।।

অভিসন্ধায় তু ফলং দম্ভ-অর্থম্‌ অপি চ এব যৎ।

ইজ্যতে ভরতশ্রেষ্ঠ তং যজ্ঞং বিদ্ধি রাজসম্‌।।

কিন্তু হে অর্জুন, ফলের একান্ত অভিসন্ধিতে, নিজের দম্ভপ্রকাশের জন্যে যে যজ্ঞের অনুষ্ঠান, সেই যজ্ঞকে রাজসিক যজ্ঞ বলেই জানবে।

 

১৩

বিধিহীনমসৃষ্টান্নং মন্ত্রহীনমদক্ষিণম্‌।

শ্রদ্ধাবিরহিতং যজ্ঞং তামসং পরিচক্ষতে।।

বিধিহীনম্‌ অসৃষ্ট-অন্নং মন্ত্রহীনম্‌ অদক্ষিণম্‌।

শ্রদ্ধাবিরহিতং যজ্ঞং তামসং পরিচক্ষতে।।

শাস্ত্রের নিয়ম না মেনে, অন্নদান না করে, মন্ত্রের উচ্চারণ ছাড়া, দক্ষিণাহীন ও শ্রদ্ধাহীন যজ্ঞকে তামসিক যজ্ঞ বলা হয়।

 

১৪

দেবদ্বিজগুরুপ্রাজ্ঞপূজনং শৌচমার্জবম্‌।

ব্রহ্মচর্যমহিংসা চ শারীরং তপ উচ্যতে।।

দেব-দ্বিজ-গুরু-প্রাজ্ঞ-পূজনং শৌচম্‌ আর্জবম্‌।

ব্রহ্মচর্যম্‌-অহিংসা চ শারীরং তপঃ উচ্যতে।।

দেবতা, ব্রাহ্মণ, গুরুজন ও প্রাজ্ঞগণের পূজা, চিত্তের পবিত্রতা, সরলতা, ব্রহ্মচর্য ও অহিংসা – এইগুলিকে শারীরক বা কায়িক তপস্যা বলে।

 

১৫

অনুদ্বেগকরং বাক্যং সত্যং প্রিয়হিতঞ্চ যৎ।

স্বাধ্যায়াভ্যসনং চৈব বাঙ্ময়ং তপ উচ্যতে।।

অনুদ্বেগকরং বাক্যং সত্যং প্রিয়হিতং চ যৎ।

স্বাধ্যায়-অভ্যসনং চ এব বাঙ্ময়ং তপ উচ্যতে।।

যে বাক্য কারো মনে উদ্বেগ সৃষ্টি করে না, যে বাক্য সত্য, প্রিয় ও মঙ্গলকর এবং বেদ পাঠ ও শাস্ত্র আলোচনাকে বাঙ্ময় বা বাচিক তপস্যা বলে।

 

১৬

মনঃপ্রসাদঃ সৌমত্বং মৌনমাত্মবিনিগ্রহঃ।

ভাবসংশুদ্ধিরিত্যেতৎ তপো মানসমুচ্যতে।।

মনঃপ্রসাদঃ সৌমত্বং মৌনম্‌ আত্মবিনিগ্রহঃ।

ভাবসংশুদ্ধিঃ ইতি এতৎ তপঃ মানসম্‌ উচ্যতে।।

মনের প্রসন্নতা, সৌম্যভাব, বাক্‌সংযম, আত্ম নিয়ন্ত্রণ, চিত্তের ভাবশুদ্ধি – এই সকলকে মানসিক তপস্যা বলা হয়।

 

১৭

শ্রদ্ধয়া পরয়া তপ্তং তপস্তৎ ত্রিবিধং নরৈঃ।

অফলাকাঙ্ক্ষিভির্যুক্তৈঃ সাত্ত্বিকং পরিচক্ষতে।।

শ্রদ্ধয়া পরয়া তপ্তং তপঃ তৎ ত্রিবিধং নরৈঃ।

অফলাকাঙ্ক্ষিভিঃ যুক্তৈঃ সাত্ত্বিকং পরিচক্ষতে।।

ফলের কামনা শূণ্য, একনিষ্ঠ ব্যক্তিরা পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে, কায়িক, বাচিক ও মানসিক এই তিন প্রকারে যে তপস্যা করেন, তাকেই সাত্ত্বিক তপস্যা বলে।

 

১৮

সৎকারমানপূজার্থং তপো দম্ভেন চৈব যৎ।

ক্রিয়তে তদিহ প্রোক্তং রাজসং চলমধ্রুবম্‌।।

সৎকার-মান-পূজা-অর্থং তপঃ দম্ভেন চ এব যৎ।

ক্রিয়তে তৎ ইহ প্রোক্তং রাজসং চলম্‌ অধ্রুবম্‌।।

প্রশংসা, প্রতিপত্তি, পূজা ও অর্থ লাভের কামনায়, অহংকারের সঙ্গে যে তপস্যা করা হয়, তাকে রাজসিক তপস্যা বলে, এই তপস্যা ক্ষণস্থায়ী ও অনিশ্চিত।

 

১৯

মূঢ়গ্রাহেণাত্মনো যৎ পীড়য়া ক্রিয়তে তপঃ।

পরস্যোৎসাদনার্থং বা তৎ তামসমুদাহৃতম্‌।।

মূঢ়গ্রাহেণ আত্মনঃ যৎ পীড়য়া ক্রিয়তে তপঃ।

পরস্য উৎসাদনার্থং বা তৎ তামসম্‌ উদাহৃতম্‌।।

অসম্ভব বিষয়ের কামনায় এবং অপরের ক্ষতিসাধনের জন্যে নিজের শরীরের পক্ষেও একান্ত কষ্টকর যে তপস্যা করা হয়, তাকে তামসিক তপস্যা বলা হয়। 

 

২০

দাতব্যমিতি যদ্দানং দীয়তেঽনুপকারিণে।

দেশে কালে চ পাত্রে চ তদ্দানং সাত্ত্বিকং স্মৃতম্‌।।

দাতব্যম্‌ ইতি যৎ দানং দীয়তে অনুপকারিণে।

দেশে কালে চ পাত্রে চ তৎ দানং সাত্ত্বিকং স্মৃতম্‌।।

দানের পরিবর্তে কিছু পাবার আশা না করে, উপযুক্ত স্থানে, উপযুক্ত সময়ে এবং উপযুক্ত পাত্রে, ‘দান করা কর্তব্য’ এই চিন্তায় যে দান করা হয়, তাকেই সাত্ত্বিক দান বলা হয়।

 

২১

যৎ তু প্রত্যুপকারার্থং ফলমুদ্দিশ্য বা পুনঃ।

দীয়তে চ পরিক্লিষ্টং তদ্দানং রাজসং স্মৃতম্‌।।

যৎ তু প্রতি-উপকারার্থং ফলম্‌-উদ্দিশ্য বা পুনঃ।

দীয়তে চ পরিক্লিষ্টং তৎ দানং রাজসং স্মৃতম্‌।।

দানের পরিবর্তে কিছু পাবার আশায় অথবা পুণ্য ফলের প্রত্যাশায়, অনিচ্ছাসত্ত্বেও যে দান করা হয়, সেই দানকে রাজসিক দান বলে।

 

২২

অদেশকালে যদ্দানমপাত্রেভ্যশ্চ দীয়তে।

অসৎকৃতমবজ্ঞাতং তৎ তামসমুদাহৃতম্‌।।

অদেশকালে যৎ দানম্‌ অপাত্রেভ্যঃ চ দীয়তে।

অসৎকৃতম্‌ অবজ্ঞাতং তৎ তামসম্‌ উদাহৃতম্‌।।

অযোগ্য স্থানে, অসময়ে এবং অযোগ্য পাত্রে, দুর্ব্যবহার এবং অবজ্ঞার সঙ্গে যে দান করা হয়, সেই দানকে তামসিক দান বলে।

 


২৩

ওঁ তৎসদিতি নির্দেশো ব্রহ্মণস্ত্রিবিধঃ স্মৃতঃ।

ব্রাহ্মণাস্তেন বেদাশ্চ যজ্ঞাশ্চ বিহিতাঃ পুরা।।

ওঁ তৎ সৎ ইতি নির্দেশঃ ব্রহ্মণঃ ত্রিবিধঃ স্মৃতঃ।

ব্রাহ্মণাঃ তেন বেদাঃ চ যজ্ঞাঃ চ বিহিতাঃ পুরা।।

ওঁ, তৎ, সৎ - ব্রহ্মের এই তিনটি নাম নির্দেশ করা হয়ে থাকে। এই তিন নির্দেশ অনুসরণ ক’রেই পুরাকালে যজ্ঞের কর্তা ব্রাহ্মণ, যজ্ঞের কারণ বেদ এবং যজ্ঞের ক্রিয়া স্থির করা হয়েছে।

 

২৪

তস্মাদোমিত্যুদাহৃত্য যজ্ঞদানতপঃক্রিয়াঃ।

প্রবর্তন্তে বিধানোক্তাঃ সততং ব্রহ্মবাদিনাম্‌।।

তস্মাৎ ওম্‌ ইতি উদাহৃত্য যজ্ঞ-দান-তপঃ-ক্রিয়াঃ।

প্রবর্তন্তে বিধান উক্তাঃ সততং ব্রহ্মবাদিনাম্‌।।

সেই কারণেই ‘ওঁ’ এই শব্দ উচ্চারণ ক’রে ও শাস্ত্রবিধি অনুসরণ ক’রে, বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণগণ সর্বদা যজ্ঞ, দান ও তপস্যার অনুষ্ঠান করেন।

 

২৫

তদিত্যনভিসন্ধায় ফলং যজ্ঞতপঃক্রিয়াঃ।

দানক্রিয়াশ্চ বিবিধাঃ ক্রিয়ন্তে মোক্ষকাঙ্ক্ষিভিঃ।।

তৎ ইতি অনভিসন্ধায় ফলং যজ্ঞ-তপঃ-ক্রিয়াঃ।

দান-ক্রিয়াঃ চ বিবিধাঃ ক্রিয়ন্তে মোক্ষকাঙ্ক্ষিভিঃ।।

 ‘তৎ’ এই শব্দ উচ্চারণ ক’রে এবং কোন ফলের প্রত্যাশা না ক’রে, পরম মুক্তি লাভের জন্য জ্ঞানীব্যক্তিগণ নানান যজ্ঞ অনুষ্ঠান, দান ও তপস্যা করেন।

 

২৬

সদ্ভাবে সাধুভাবে চ সদিত্যেতৎ প্রযুজ্যতে।

প্রশস্তে কর্মণি তথা সচ্ছব্দঃ পার্থ যুজ্যতে।।

সৎ-ভাবে সাধু-ভাবে চ সৎ ইতি এতৎ প্রযুজ্যতে।

প্রশস্তে কর্মণি তথা স-শব্দঃ পার্থ যুজ্যতে।।

হে পার্থ, ‘সৎ’ এই শব্দ দিয়ে অস্তিত্ব ও সাধুতা বোঝানো হয়। আবার যে কোন মঙ্গলকর শুভ কর্মেও এই ‘সৎ’ শব্দ প্রয়োগ করা যায়।

 

২৭

যজ্ঞে তপসি দানে চ স্থিতিঃ সদিতি চোচ্যতে।

কর্ম চৈব তদর্থীয়ং সদিত্যেবাভিধীয়তে।।

যজ্ঞে তপসি দানে চ স্থিতিঃ সৎ ইতি চ উচ্যতে।

কর্ম চ এব তৎ-অর্থীয়ং সৎ ইতি এব অভিধীয়তে।।

যজ্ঞ, তপস্যা এবং দানে যে পরম নিষ্ঠা তাকেও ‘সৎ’ বলা হয়ে থাকে, ‘তৎ’ অর্থাৎ পরমেশ্বরে নিবেদিত সমস্ত কর্মকেই ‘সৎ’ বলা হয়ে থাকে।

 

২৮

অশ্রদ্ধয়া হুতং দত্তং তপস্তপ্তং কৃতঞ্চ যৎ।

অসদিত্যুচ্যতে পার্থ ন চ তৎ প্রেত্য নো ইহ।।

অশ্রদ্ধয়া হুতং দত্তং তপঃ তপ্তং কৃতং চ যৎ।

অসৎ ইতি উচ্যতে পার্থ ন চ তৎ প্রেত্য নো ইহ।।

হে পার্থ, যজ্ঞ, দান, তপস্যা কিংবা যে কোন কর্ম, অশ্রদ্ধায় অনুষ্ঠিত হলে, তাকে অসৎ বলা হয়ে থাকে। এই সমস্ত কর্ম থেকে না পরলোকে কোন ফললাভ হয়, না ইহলোকে। 


শ্রদ্ধাত্রয়বিভাগযোগ সমাপ্ত

এর পরের পর্ব  - " গীতা - ১৮শ পর্ব "

বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/৮

ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  



["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের সপ্তম পর্বাংশ -
 " ধর্মাধর্ম - ৪/৭ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.) 

অষ্টম পর্বাংশ 


৪.৪.৯ সামাজিক পরিস্থিতি

বৈদিক এবং ব্রাহ্মণ্য সমাজের শাস্ত্রীয় মতে যদিও মূলমন্ত্র ছিল অনাড়ম্বর, মিতব্যয়ীতা এবং ত্যাগ, কিন্তু বাস্তব সমাজে তার প্রচলন ছিল বলে মনে হয় না। আড়ম্বর করার মতো অর্থনৈতিক সাধ্য যাদের ছিল না, তারাই বাধ্য হয়েই অনাড়ম্বর, মিতব্যয়ীতা এবং ত্যাগের মন্ত্র মেনে চলত, অর্থাৎ সমাজের নিম্নস্তরের মানুষেরা। শাস্ত্র রচয়িতা ব্রাহ্মণ পুরোহিত শ্রেণী যজ্ঞের আয়োজন করে, রাজাদের থেকে দানগ্রহণ করে প্রভূত সম্পদের অধিকারী এবং রীতিমতো বিত্তশালী হয়ে উঠতেন। তাছাড়াও ব্রাহ্মণশ্রেণি রাজকর্মচারী পদে এমনকি বাণিজ্য করেও যথেষ্ট সম্পদশালী হয়ে উঠতেন। অতএব, ব্রাহ্মণ্যধর্ম বা পরবর্তী হিন্দু ধর্মে যে চতুর্বর্গ অর্থাৎ জীবনের চারটি লক্ষ্য স্থির করা হয়েছিল, ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ – তাদের মধ্যে অর্থ উপার্জনেই বেশি নজর ছিল।

প্রাথমিক ব্রাহ্মণ্য সমাজে বৈশ্য এবং শূদ্রদের অবস্থানের কথা আগেই বলেছি। কিন্তু পরবর্তী কালে অক্ষত্রিয় এবং শূদ্র রাজাদের আমলে সমাজে বৈশ্য এবং শূদ্রদের প্রভাব এবং সম্মান যথেষ্ট বেড়ে উঠেছিল। তার কারণ অবশ্য নিবিড় বৈদেশিক এবং আভ্যন্তরীণ বাণিজ্য। বিশেষ করে মৌর্য আমলে প্রায় গোটা ভারতবর্ষ যখন একই প্রশাসনিক বন্ধনে আবদ্ধ ছিল, সেসময় বিভিন্ন অঞ্চলের দক্ষ কারিগর ও শিল্পী এমনকি কৃষকরাও তাদের পরিশ্রম বা দক্ষতার যোগ্য মূল্য পেতে শুরু করেছিল। যার ফলে সৃষ্টি হল দক্ষ শূদ্র কারিগরদের বিভিন্ন জাতি। যেমন, স্বর্ণকার, মণিকার, তন্তুকার, তৈলকার, কর্মকার, সূত্রধর, স্থপতি, ভাস্কর, এমন বহু জাতি। গোপ ও আহির - যারা গোপালন করত এবং দুধ ও বিভিন্ন দুগ্ধজাত দ্রব্যের বাণিজ্য করত। সম্পন্ন কৃষিজীবিরা আগেই বৈশ্য ছিলেন এখন তাঁদের মধ্যেও নানান বিশেষজ্ঞ (Specialist) জাতির উদ্ভব হল, যেমন যাঁরা রেশমের গুটি কিংবা সুপুরি বা পানের চাষ করতেন। এই চাষের উৎপাদন ছিল সরাসরি বাণিজ্যিক (cash crop)সমাজে আরেকটি জাতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন – তাঁরা হলেন নাপিত। হিন্দু সমাজের নানান অনুষ্ঠানে নাপিতের গুরুত্ব তখন এবং আজও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

মৌর্যদের সময় থেকে গুপ্ত সাম্রাজ্যের কাল পর্যন্ত বৈদেশিক বাণিজ্য এবং সেই বাণিজ্যের ফলে, দেশে প্রভূত সম্পদের আমদানি হচ্ছিল, রাজ্য এবং সাম্রাজ্যগুলির রাজস্ব আয়ের বড়ো অংশ আসত এই বাণিজ্য থেকে। আগেই বলেছি, এই বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত বণিক সম্প্রদায় এবং শ্রেষ্ঠী সমিতিগুলি। রাজ্যের রাজনীতি এবং প্রশাসনেও তাঁদের প্রভাব কিছু কম ছিল না। অতএব তাঁদের বর্ণ বৈশ্য হলেও, সামাজিক অবস্থানে তাঁরা ক্ষত্রিয়ের সমতুল্যই হয়ে উঠলেন।

অতএব চতুর্বর্ণের একমাত্রিক বর্ণের সমাজ এখন হয়ে উঠল বহুমাত্রিক জটিল সামাজিক বিন্যাস। এর সঙ্গে মানানসই করে সামাজিক বিধি-বিধানেও অনেক আপোষ করতে হল, নতুন নিয়ম বানিয়ে তুলতে হল বারবার।

সমাজে মহিলাদের অবস্থান সম্পর্কে খুব প্রত্যক্ষ আভাস তেমন পাওয়া যায় না। যদিও ব্রাহ্মণ্যধর্মে বা স্মৃতিশাস্ত্রে উল্লেখ করা হয়েছিল, মহিলারা সর্বদাই পুরুষ-নির্ভর। বাল্যাবস্থা পর্যন্ত তাঁরা পিতার অধীন, বিবাহের পর স্বামীর এবং বার্ধক্যে তাঁদের পুত্রের অধীন থাকতে হবে। তবে মহিলারা অন্তঃপুরবাসিনী পর্দানশীন ছিলেন এমনও মনে হয় না। নানান সাহিত্যে, চিত্রকলায় মহিলাদের যে বর্ণনা বা চিত্র পাওয়া যায়, আচরণে বা জীবনযাত্রায় তাঁরা হয়তো মোটামুটি স্বাধীনতা উপভোগ করতেন। বহু উচ্চবংশীয় মহিলাই বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে বৌদ্ধ সংঘে যোগ দিয়েছিলেন, একথা আমরা আগেই দেখেছি। তাঁদের মধ্যে শিক্ষার প্রচলনও ছিল বোঝা যায়। অনেক উচ্চশিক্ষিতা ব্রাহ্মণ্য মহিলাদেরও নাম পাওয়া যায়, তার মধ্যে বৃহদারণ্যক উপনিষদের “গার্গী”ই হয়তো ছিলেন অন্যতমা। তিনি ঋষি গর্গবংশীয়া, তাঁর পিতার নাম বাচক্‌নু। ব্রহ্ম প্রসঙ্গে তাঁর ও যাজ্ঞবল্ক্যের তর্কের ঘটনাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বৃহদারণ্যকের তৃতীয় অধ্যায়ের ষষ্ঠ ব্রাহ্মণের উদ্ধৃতি থেকে দেখে নেওয়া যাক, -

তারপর গার্গী, বচক্‌নুর কন্যা, জিজ্ঞাসা করলেন, “যাজ্ঞবল্ক্য, জগতের সবকিছুই যদি জলের সঙ্গে ওতপ্রোত[1] জড়িত থাকে, তাহলে জল কার সঙ্গে জড়িত?”

বায়ুর সঙ্গে, গার্গি”।

তাহলে বায়ু কার সঙ্গে জড়িত?”         আকাশের সঙ্গে, গার্গি”।

তাহলে আকাশ কার সঙ্গে জড়িত?”       গন্ধর্বলোকের সঙ্গে, গার্গি”।

কিন্তু গন্ধর্বদের জগত কার সঙ্গে জড়িত?” “সূর্যের সঙ্গে, গার্গি”।

তাহলে সূর্য কার সঙ্গে জড়িত?”          চন্দ্রের সঙ্গে, গার্গি”।

কিন্তু চন্দ্র কার সঙ্গে জড়িত?”            নক্ষত্রদের সঙ্গে, গার্গি”।

নক্ষত্ররা কার সঙ্গে জড়িত?”             দেবলোকের সঙ্গে, গার্গি”।

তাহলে দেবলোক কার সঙ্গে জড়িত?”     ইন্দ্রলোকের সঙ্গে, গার্গি”।

ইন্দ্রলোক কার সঙ্গে জড়িত?”            বিরাজলোকের সঙ্গে, গার্গি”।

তাহলে বিরাজলোক কার সঙ্গে জড়িত?”   হিরণ্যগর্ভলোকের সঙ্গে, গার্গি”।

হিরণ্যগর্ভলোক তাহলে কার সঙ্গে জড়িত?”

যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, “আর না, গার্গি, তোমার প্রশ্ন নিয়ে আর এগিও না, যাতে তোমার মাথা দেহচ্যুত হয়। তুমি এমন এক দেবতার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছ, যাঁর বিষয়ে কোন প্রশ্ন চলতে পারে না। অতএব, গার্গি, তোমার প্রশ্ন নিয়ে আর এগিও না”। এই কথা শুনে বচক্‌নু-কন্যা গার্গী চুপ করে গেলেন”। (স্বামী মাধবানন্দ কৃত বৃহদারণ্যক উপনিষদের ইংরিজি অনুবাদ থেকে – বাংলা অনুবাদ লেখক।)

হিরণ্যগর্ভ ব্রহ্মের আরেক নাম। জগতের যাবতীয় বিষয়ের আদি হলেন ব্রহ্ম, কিন্তু তিনি নিজে অনাদি ও অনন্ত, অতএব তাঁর আগে এবং পরে আর কিছুই নেই, কোন প্রশ্নও নেই, কোন উত্তরও নেই। এই প্রশ্নোত্তর পর্ব চলছিল বিদেহরাজ রাজর্ষি জনকের রাজসভায়। এই সভায় যাজ্ঞবল্ক্য নিজেকে ব্রহ্মজ্ঞ বলে দাবি করেছিলেন, তাঁকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, তাবড় তাবড় বিদগ্ধ পণ্ডিতেরা। তাঁদের মধ্যে জরৎকারু বংশের আর্তভাগ, লাহ্যায়নি ভুজ্যু, উষস্ত, কহোল কৌষীতকেয়, গার্গী, উদ্দালক আরুণি, বাচরুবী এবং আরও অনেকে। সেই আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং রাজা জনক, যিনি নিজেও ছিলেন ব্রহ্মজ্ঞ এবং রাজর্ষি। ভারতের বৈদিক রাজাদের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন ব্রহ্মজ্ঞ রাজার মধ্যে রাজা জনক ছিলেন অন্যতম। এই রাজা জনকই সীতাদেবীর পালকপিতা এবং ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের শ্বশুর।

এই সভায় গার্গী কি অব্যয়, অনির্বচনীয়, অপ্রশ্ননীয় ব্রহ্মতত্ত্বকে খোঁচা দেওয়ার জন্যেই শেষ প্রশ্নটি রেখেছিলেন?  কারণ রাজর্ষি জনকের নক্ষত্র সভায় আমন্ত্রিত একজন ব্রহ্মজ্ঞ বিদূষী হয়ে - ব্রহ্মের পরে আর কোন প্রশ্ন থাকতে পারে না - এ তত্ত্ব তাঁর অজানা থাকার তো কথা নয়! উত্তরে ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য সাধারণ ভাবে বলতেই পারতেন, ব্রহ্মের পরে আর কিছু জিজ্ঞাস্য থাকতে পারে না। তা না বলে “মাথা দেহচ্যুত” হওয়ার (নাকি করার?) ধমক দিতে হল কেন? তিনি কি বিদূষী গার্গীর প্রশ্নে ব্রহ্মতত্ত্বের প্রতি সন্দেহের আভাস পেয়েই এমন কঠোর উত্তরে, প্রকাশ্য সভায় সম্ভাব্য সকল বিরোধী প্রশ্নকে সমূলে বিনাশ করলেন? কে জানে?  

মহিলাদের প্রচুর দানের স্বীকৃতি পাওয়া যায় বৌদ্ধ শাস্ত্র থেকে। সাঁচী, ভারহুতের শিলালিপিতে অনেক মহিলার দানের কথা লেখা আছে। তবে মহিলারা এই অর্থ কোথা থেকে পেয়েছিলেন, তাঁদের নিজস্ব আয়, নাকি পৈতৃক বা স্বামীর সম্পত্তি ব্যবহার করেছিলেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোন তথ্য পাওয়া যায় না। সম্রাট অশোকের পত্নী কারুবাকীও বৌদ্ধবিহার নির্মাণ করিয়েছেন এবং প্রচুর দান করেছিলেন, সে কথা আগেই বলেছি।

৪.৪.১০ শিল্প-দক্ষতা                          

৪.৪.১০.১ পাথরের স্তম্ভ

সম্রাট অশোকের স্তম্ভ-নির্দেশের কথা আগেই বলেছি। এবার এই স্তম্ভগুলির বিশেষত্ব নিয়ে দুচার কথা বলা প্রয়োজন। এই স্তম্ভের পাথরগুলির অধিকাংশই বেনারস থেকে প্রায় চল্লিশ কি.মি. দক্ষিণ পশ্চিমের চুনার অঞ্চল থেকে, কিছু মথুরা অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় তিরিশটি স্তম্ভ বা তার ধ্বংসাবশেষ এখনও পর্যন্ত পাওয়া গেছে। অতএব চুনার কিংবা মথুরা থেকে এই পাথরগুলি, উত্তর ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে এমনকি নেপালের তরাই অঞ্চলেও বহন করে নিয়ে যাওয়া, আশ্চর্য দক্ষতার পরিচয়। কারণ, স্তম্ভের পাথরগুলিতে কোন জোড় (joint) ছিল না, দৈর্ঘে প্রায় চল্লিশ ফুট (প্রায় বারো মিটার) মনোলিথিক (monolithic) পাথর। প্রত্যেকটির ওজন প্রায় পঞ্চাশ টন। কোন হাইওয়ে ছিল না, বারো বা ষোল চাকার লো-বেড (Low bed) ট্রেলার ছিল না, ক্রেনও ছিল না। তবুও এই পাথরগুলি কয়েকশ কিলোমিটার বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলদ বা মোষে টানা গাড়িতে – অসমান পাথর কিংবা ইঁট বিছানো রাস্তা দিয়ে। সেতু ছাড়াই পার করতে হয়েছিল বেশ কিছু বড়ো এবং ছোট ছোট অজস্র নদী! তারপরেও নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে গিয়ে, ভারি এই পাথরগুলিকে স্থাপনা (erection) করা হয়েছিল নিখুঁত। এই কারিগরি দক্ষতা মিশরের পিরামিড বানানোর থেকে খুব কম কী?

 

৪.৪.১০.২ লৌহ স্তম্ভ

দিল্লির কাছেই মেহেরোলিতে কুতুব মিনারের সামনে একটি লৌহ স্তম্ভ স্থাপনা করিয়েছিলেন, খুব সম্ভবতঃ দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত, বিক্রমাদিত্য। এর কথাও আগেই বলেছি। এই স্তম্ভটি শিল্পের দিক থেকে উল্লেখযোগ্য না হলেও, কারগরি দক্ষতায় অবশ্যই অনন্য। এটির উচ্চতা প্রায় তেইশ ফুট (প্রায় সাত মিটার) এবং এটির মধ্যেও কোন জোড় নেই। তার থেকেও বড়ো কথা, প্রায় ষোলশ বছরের রোদ-বৃষ্টি উপভোগ করে এই লোহার স্তম্ভ আজও অটুট দাঁড়িয়ে আছে এবং তার গায়ে জং বা মর্চের (rust) চিহ্নমাত্র নেই! এমন নয় যে ভারতীয় কারিগররা তখন স্টেনলেস স্টিল বানানো আবিষ্কার করে ফেলেছিল। কিন্তু প্রায় একশভাগ বিশুদ্ধ লোহা বানানোর দক্ষতা যে তাঁরা অর্জন করেছিলেন, সে বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। আধুনিক লৌহ শিল্পে যাঁরা আছেন, তাঁরা সকলেই জানেন, লৌহ-আকর (iron ore) থেকে বিশুদ্ধ লোহা বানাতে কতখানি দক্ষতা এবং কারিগরি জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।

 

৪.৪.১১ স্থাপত্য

আগেই বলেছি হরপ্পা সভ্যতা এবং মৌর্যযুগের মধ্যে ভারতবর্ষে উল্লেখযোগ্য কোন স্থাপত্য নিদর্শন আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। সে রাজা যুধিষ্ঠিরের চোখ ধাঁধানো ইন্দ্রপ্রস্থের প্রাসাদ হোক, কিংবা শ্রীরামচন্দ্রের অযোধ্যার প্রাসাদ বা লঙ্কেশ্বর রাবণের প্রাসাদ এবং তাঁর স্বর্ণপুরীই হোক। পরবর্তীকালে এই ধরনের বর্ণময় প্রাসাদগুলির প্রত্ন-নিদর্শন পাওয়া গেলে, ভারতের ইতিহাস হয়তো আরেকটু ঋদ্ধ হবে।

 

৪.৪.১১.১ স্তূপ

আদিম যুগ থেকেই ভারতবর্ষের অধিকাংশ অঞ্চলে মৃতদেহ সমাধি দেওয়া হত। সম্ভবতঃ অনার্যদের মধ্যে মৃতদেহ সমাধি দেওয়ার প্রচলন ছিল, এবং মৃতদেহ দাহ-সংস্কারের প্রচলন শুরু হয়েছিল আর্য সমাজে।  এই সমাধিগুলি মাটি দিয়ে ছোট আকারের অর্ধ-গোলকাকৃতি ঢিবি[2] বা স্তূপের মত বানানো হত। পরবর্তীকালে সমাধির পাশে পাথরের বড় ফলক (Menhir) খাড়া করে রাখা হত মৃতের স্মৃতির ও তাঁর আত্মার প্রতি শ্রদ্ধার উদ্দেশে। বৌদ্ধরা সম্ভবতঃ প্রাচীন ভারতের এই রীতিটাই গ্রহণ করেছিলেন, তবে অনেক শিল্পসম্মতভাবে। ভগবান বুদ্ধের মৃত্যুর পর তাঁর দেহভস্ম অনেকগুলি রাজ্যই নিয়ে গিয়েছিল, এবং সকলেই তাঁদের রাজ্যে স্তূপ বানিয়েছিল। সেই স্তূপগুলির অস্তিত্ব এখন আর নেই এবং পরবর্তী কালে ভগবান বুদ্ধের অস্থি বৃহত্তর স্তূপগুলিতে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল।

সম্রাট অশোকের সময়ে বানিয়ে তোলা সাঁচি, ভারহুত, সারনাথ এবং কৃষ্ণা উপত্যকার অমরাবতীর স্তূপগুলিকে পরবর্তী কালে অনেক বড়ো করে বানিয়ে তোলা হয়েছিল। মোটামুটি ২০০ বি.সি.ই-তে সাঁচীস্তূপ, অশোকের স্তূপের আকারের প্রায় দ্বিগুণ করে বানানো হয়েছিল। স্তূপের অর্ধগোলকের ব্যাস প্রায় একশ কুড়ি ফিট। এই স্তূপের চারদিকে পুরোনো কাঠের রেলিং সরিয়ে পাথরের রেলিং বানানো হয়েছিল, যার উচ্চতা প্রায় ন ফিট। পাথরের গায়ের অলংকরণে বুদ্ধের জীবনের নানান ঘটনা ও সমসাময়িক সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার অনেক চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। তারও পরে মোটামুটি ১০০ বি.সি.ই-তে বানিয়ে তোলা হয়েছিল সাঁচীস্তূপের চার দিকের চারটি তোরণ দ্বার। পাথরে বানানো দ্বারগুলি সারা বিশ্বেই বিখ্যাত, তাদের অদ্ভূত সুন্দর অলংকরণ এবং পাথরে খোদিত অনবদ্য চিত্রগুলির জন্য। পাথরের কাজে ভারতীয় ভাস্করদের দক্ষতা এবং সূক্ষ্ম শিল্পবোধের সূচনা হয়তো এই সময় থেকেই। একই কথা প্রযোজ্য মোটামুটি একই সময়ে অনেক বড়ো করে বানানো ভারহুত স্তূপের ক্ষেত্রেও। অমরাবতী স্তূপ ২০০-৩০০ সি.ই.তে সম্পূর্ণ হয়েছিল, এই স্তূপের আকার সাঁচি স্তূপের থেকেও বড়ো এবং আরও বিশদে অলংকৃত। সারনাথের প্রথম বানানো স্তূপের ওপর বারবার নির্মাণ হয়ে, শেষ নির্মাণ হয়েছিল গুপ্তদের সময়ে। অন্যগুলির তুলনায়, এই স্তূপের উচ্চতা অনেক বেশি, এবং নিচের অর্ধগোলক ডোমের (dome) ওপরে একটি বেলনাকার (cylindrical) ডোম এই স্তূপের বিশেষত্ব।


 পরের পর্ব - " ধর্মাধর্ম - ৪/৯ "



[1] ওতপ্রোত শব্দের অর্থ সমস্ত দিক দিয়েই পরষ্পর জড়িয়ে থাকা। যে কোন বস্ত্রের প্রত্যেকটি সুতো অন্য প্রত্যেকটি সুতোর সঙ্গে যেমন ওতপ্রোত জড়িয়ে থাকে, তেমনই পঞ্চভূত, অর্থাৎ ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোমের সঙ্গে জগতের যাবতীয় বস্তু ওতপ্রোত জড়িয়ে আছে।

[2] ঢিবি” শব্দটি অবশ্যই অনার্য শব্দ। বাংলার রাঢ় অঞ্চলের পরিত্যক্ত জনপদের ধ্বংসস্তূপের প্রচলিত নাম “পাণ্ডুরাজার ঢিবি”। এই শব্দের সংস্কৃত প্রতিশব্দ স্তূপ।


বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

এক যে ছিলেন রাজা - ১৫শ পর্ব

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "


      


[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের আগের পর্ব - এক যে ছিলেন রাজা - ১৪শ পর্ব "



২৮

 বিলম্বিত মধ্যাহ্ন ভোজনের পর প্রাসাদের অতিথিশালায় কিঞ্চিৎ বিশ্রাম করছিলেন মহর্ষি ভৃগু। আচার্য বিশ্ববন্ধু ছিলেন, সংলগ্ন কক্ষে। এখন সূর্য অস্তগামী, দ্বিপ্রহরের রৌদ্রতাপের পর, মধ্য আশ্বিনের বৈকালিক পরিবেশ আরামদায়ক ও মনোরম। মহর্ষি ভৃগু গবাক্ষ পথে সম্মুখের উদ্যানের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে, আচার্য বিশ্ববন্ধুকে ডাকলেন। তাঁর ডাক শুনে আচার্য বিশ্ববন্ধু মহর্ষির কক্ষে প্রবেশ করে বললেন, “আদেশ করুন, মহর্ষি”!

স্মিতমুখে আচার্য বিশ্ববন্ধুর দিকে তাকিয়ে মহর্ষি বললেন, “যতই বিলাসবহুল হোক বৎস, কক্ষ আমাদের আবদ্ধই রাখে! সামনের ওই মুক্ত উদ্যানে চলো স্বল্প পদচারণা করে আসি। শরতের স্নিগ্ধ বাতাস অঙ্গে নিয়ে, তোমার সঙ্গে কিছু জরুরি পরামর্শ সেরে নিই। সন্ধ্যার পর আমি মহারাণির সাক্ষাৎ প্রার্থী হবো, তুমিও যাবে আমার সঙ্গে। অত্যন্ত গোপন সেই আলোচনার পক্ষে, এই কক্ষ আদৌ নিরাপদ নয়!”

কক্ষ থেকে বেরিয়ে সম্মুখের উদ্যানের পথে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে, আচার্য বিশ্ববন্ধু বললেন, “রাজ অতিথিশালা অত্যন্ত সুরক্ষিত, সেই কক্ষের মধ্যে গোপন আলোচনা নিরাপদ নয় কেন, মহর্ষি?”

স্মিতমুখে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “স্বদেশ এবং বিদেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অস্থায়ী বাসের জন্য এই কক্ষগুলি নির্মিত হয়েছে, বৎস। সেই অতিথিদের সকলেই সরল এবং নিরীহ হবেন, এমন সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। তাঁদের গতিবিধি এবং আলাপের উপর গোপন পর্যবেক্ষণের জন্য এই কক্ষের দেওয়ালগুলি বিশেষভাবে নির্মাণ করা হয়। আপাতদৃষ্টিতে নিভৃত ও নিরাপদ মনে হলেও, হতে পারে, বিশ্বস্ত কোন গুপ্তচর অসীম ধৈর্যে দেওয়ালের ওপাশে কান পেতে বসে আছে, অথবা সূক্ষ্মছিদ্র পথে লক্ষ্য রাখছে আমাদের গতিবিধি ও আচরণ!”

“কী সাংঘাতিক, মহর্ষি! কিন্তু আমাদের উপর পর্যবেক্ষণ করার প্রয়োজন কী?”

“বলো কী, বৎস, প্রয়োজন নেই? যতদিন পৃথু রাজা না হচ্ছেন, এই রাজ্যের সিংহাসনের প্রত্যাশী অনেকেই!”

“অনেকেই? আমার ধারণা ছিল, একজনই - রাজাবেণের মিত্র শক্তিধর”!

মহর্ষি হেসে ফেলে বললেন, “তোমরা বৈদ্যরা অত্যন্ত সরল, শত্রু হোক বা মিত্র, তাদের ইষ্ট ছাড়া তোমরা কিছুই চিন্তা করো না। সিংহাসন লাভের দৌড়ে শক্তিধর আছে, কিন্তু সে আপাততঃ অনেকটাই পিছিয়ে! এখন তার লোকবল সীমিত, প্রশাসনিক সহযোগিতা এবং জনগণের আস্থা অর্জন করাও তার পক্ষে কষ্টসাধ্য! তার থেকে অনেক শক্তিশালী দাবিদার মহামন্ত্রী বিমোহন”।

“মহামন্ত্রী বিমোহন?” অবাক হয়ে বিশ্ববন্ধু মহর্ষির মুখের দিকে তাকালেন, বললেন, “তিনি মহারাজ অঙ্গের অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন, উপরন্তু তিনি নিজেও এখন যথেষ্ট বৃদ্ধ, এই বয়সে তাঁর রাজ্যলাভের ইচ্ছা? আশ্চর্য?”

“তাঁর নিজের জন্য কেন হবে, বৎস বিশ্ববন্ধু? তুমি ভুলে যাচ্ছো, তাঁর একটি পুত্র আছে। সে যুবক। সে আমাদের আশ্রমের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন কৃতী ছাত্র এবং বর্তমানে দক্ষিণের একটি রাজ্যের মন্ত্রীপদে আসীন”।

“হ্যাঁ মহর্ষি, মনে পড়েছে। আমাদের থেকে একাদশবর্ষের অনুজ – নাম শ্রীগোত্রপাদ! মহামন্ত্রী তাঁকে সিংহাসনে বসাতে চাইছেন?”

মহর্ষি ভৃগু মৃদু হাসলেন, বললেন, “রাজনীতির অন্দরমহলে নিঃস্বার্থ বলে কিছু হয় না, বৎস! কিন্তু এখন ওসব কথা থাক। আজ সন্ধ্যাকালে মহারাণির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, তাঁকে রাজ্য পরিচালনা থেকে অব্যাহতির কথা জানাবো। ওই সঙ্গে জানাবো, রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে, নব নির্মিত উদ্যানবাটিকায় তাঁদের বাস করার কথা!”

আচার্য বিশ্ববন্ধু বললেন, “বাঃ, তার অর্থ রাজমাতার প্রস্তাবে মন্ত্রীমণ্ডলী সম্মত? রাজ্যশাসন থেকে অব্যাহতি পেলে, রাজমাতা স্বস্তি পাবেন, কিন্তু প্রাসাদ ত্যাগে সম্মত হবেন কী? এই সুখ, এই বিলাস, ত্যাগ করা সামান্য বিষয় নয়”!

মহর্ষি ভৃগু হাসলেন, বললেন, “তোমার তাই ধারণা, বৎস? আমার ধারণা তিনি যদি প্রথম প্রস্তাবে স্বস্তি পান, তবে নির্দ্বিধায় উদ্যানবাটিকায় যেতেও সম্মতা হবেন”।

অবাক হয়ে আচার্য বিশ্ববন্ধু জিজ্ঞাসা করলেন, “শাসনভার থেকে মুক্ত হয়ে তিনি স্বস্তি পাবেন না, গুরুদেব? সকালে স্বয়ং তিনিই তো আপনাকে এই অনুরোধ করেছিলেন!”

“ক্ষমতার শীর্ষে থাকা এবং না থাকার পার্থক্য মহারাণি সুনীথা, খুব ভাল করেই জানেন, বৎস। তিনি রাজকন্যা, এবং বিবাহের পর রাজরাণী হওয়ায়, সুদীর্ঘকাল ক্ষমতার মাহাত্ম্য খুব নিকট থকে উপভোগ করেছেন। কিন্তু মহারাজ অঙ্গের অন্তর্ধানের পর, তিনি রাজমাতা হয়ে, কিছুকাল ক্ষমতাচ্যুতির অসহায় যন্ত্রণাও ভোগ করেছেন। তিনি সকালে যখন আমাকে শাসনভার থেকে মুক্তি চাইলেন, আমার ধারণা, পুত্রের অসুস্থতার হতাশা থেকে, আবেগে বলে ফেলেছেন, অন্তর থেকে বলেননি। অথবা এমনও হতে পারে, তিনি আমাদের পরীক্ষা করতে চাইছিলেন!”

“পরীক্ষা? কিসের পরীক্ষা, গুরুদেব?”

“জড়বৎ এবং দুরারোগ্য অসুস্থ এক পুত্রের প্রৌঢ়া মাতার হাতে রাজকার্য পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত রাখতে, আমরা সকলেই সত্য সত্যই আগ্রহী কী না?  আগ্রহী হলেও সে আগ্রহ কতদিনের?”

“তাহলে উপায়? মহারাণি যদি রাজ্যভার ত্যাগ করতে সম্মতা না হন”? উদ্যানের মধ্যে পায়ে চলা পথে, দুজনে শ্লথ গতিতে পাশাপাশি হাঁটছিলেন, গভীর চিন্তায় মহর্ষি ভ্রূ কুঞ্চিত করে বললেন, “সম্মতা না হওয়ার কোন সুযোগ আমি তাঁকে দেব না, বৎস। আমি মন্ত্রীমণ্ডলীর সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করবো। সে সিদ্ধান্ত সাধারণতঃ অনড় এবং সেই সিদ্ধান্তের অন্যথা করতে হলে, পুনরানুমোদনের জন্য মন্ত্রীমণ্ডলকেই আবার অনুরোধ করতে হবে! সেই অনুরোধ কি, মহারাণি এবং রাজমাতা সুনীথার মর্যাদার হানি ঘটাবে না?”

“অবশ্যই ঘটাবে, গুরুদেব!”

“অতএব, ওই বিষয়ে আমি বিশেষ চিন্তিত নই। আমি চিন্তিত তাঁর স্থান পরিবর্তনের অভিমত নিয়ে। আর এই বিষয়ে তোমার সহায়তা আমার একান্ত প্রয়োজন”।

“আমার সহায়তা, গুরুদেব? কী সাহায্য আমি করতে পারি?”

“দেশব্যাপী সুখ্যাত আয়ুর্বেদাচার্য বিশ্ববন্ধুকে রাজমাতার মনে এই বিশ্বাস এনে দিতে হবে, উদ্যানবাটিকার নতুন পরিবেশ রাজাবেণের স্বাস্থ্যের পক্ষে অত্যন্ত অনুকূল। নিজের একান্ত অভিলাষ অনুযায়ী নির্মিত এই উদ্যানবাটিকায় বাস করলে, রাজাবেণের মনে উদ্দীপন হতে পারে। ধীরে ধীরে তাঁর স্নায়ুবৈকল্যের নিরাময় হতেও পারে”।

“বুঝেছি মহর্ষি। আপনি সহায় হলে, রাজমাতার মনে এই বিশ্বাস অবশ্য সঞ্চার করতে পারবো”!

“অতি উত্তম, বৎস। শুরুটা তুমিই করবে, তারপর পরিস্থিতি অনুযায়ী আমাদের ভাবনায় পরিবর্তন আনা যাবে! এখন চল, আমরা ফিরে যাই, প্রস্তুত হয়ে মহারাণি সুনীথার সাক্ষাতে যেতে, আমাদের বিলম্ব না হয়ে যায়!” ফেরার পথে অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বললেন না।

উদ্যান থেকে বের হবার একটু আগে আচার্য বিশ্ববন্ধু বললেন, “একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো, মহর্ষি?”

স্মিতমুখে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “সপুত্র মহারাণি সুনীথাকে আমি প্রাসাদ থেকে দূরে নিয়ে যেতে চাইছি, কেন, তাই তো?” আচার্য বিশ্ববন্ধু অবাক হলেন না, গুরুদেবের এই ক্ষমতার জন্যেই তিনি সকলের গুরুদেব, সর্বজন শ্রদ্ধেয়। তিনি হেসে সম্মতির ঘাড় নাড়লেন। মহর্ষি ভৃগু বললেন, “অনেক কারণ, বৎস, অনেক। ক্ষমতাহীনা মহারাণিকে প্ররোচিত করে, আমাদের বিপক্ষীয়রা আমাদের বিরোধীতা করতে পারে! প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ করা যাঁর দীর্ঘদিনের অভ্যাস, তিনি সুযোগ পেলেই, তাঁর অভিমত প্রকাশ্যে আনতে দ্বিধা করবেন না। তাঁর সঙ্গে সাধারণ প্রজাদের দীর্ঘদিনের মাতা-পুত্র সম্পর্ক, তাঁর কাছে তাদের অবারিত দ্বার। প্রশাসনিক দায়িত্ব না থাকায়, তিনি এখন তাদের প্রতি আরও বেশি উদার হস্ত হয়ে উঠবেন। তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে, তিনি অপমানিতা বোধ করবেন, প্রজারা বিক্ষুব্ধ হবে, তারা আমাদের প্রশাসনিক নিরপেক্ষতায় সন্দিহান হয়ে উঠবে! কারণ তিনি যে রাজমাতা ও মহারাণি! তাঁর জ্ঞাতে এবং অজ্ঞাতেও - প্রশাসন বারবার বিপন্ন হবে!

উপরন্তু তিনি এখন এই রাজভবনের অন্দরমহলে সর্বময়ী কর্ত্রী এবং এর পরেও তিনি তাই থাকবেন! এ বিষয়ে মন্ত্রীমণ্ডলীর কোন নিয়ন্ত্রণ চলে না! অতএব অন্দরমহলের প্রতিটি বিষয়ে তাঁর হস্তক্ষেপ থাকবেই। তাতেও পরিস্থিতি ক্রমাগতঃ জটিল হয়ে উঠতে থাকবে! আমাদের নবীন রাজা ও নবীনা রাণির জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠতে খুব দেরি হবে না। খুব সংক্ষেপে যদি শুনতে চাও, বৎস, তাহলে বলি, আমি মহারাণি সুনীথাকে এই রাজভবনের অন্দরমহল ও বারমহলের সব কিছু থেকেই বিচ্ছিন্ন রাখতে চাই!”

পরের পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১৬শ পর্ব "



নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৪/১২

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু -  "  ধর্মাধর্ম - ১/১  " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - "  ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম ...