এই সূত্রে - " ঈশোপনিষদ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "
এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ "
উদ্ধবের সংক্ষেপে শ্রীকৃষ্ণমহিমা বর্ণনা (পূর্ব পর্বের পর...)
শ্রীউদ্ধব বললেন, “তারপর একদিন
বলদেবকে সঙ্গে নিয়ে কৃষ্ণ মথুরায় গেলেন, সেখানে রাজসিংহাসন থেকে টেনে নামিয়ে কংসের
বিনাশ করলেন। সেখানে বন্দী মাতাপিতাকে উদ্ধার করে তাঁদের সন্তুষ্ট করলেন। এরপর সন্দীপনিমুনির পাঠশালায়
একবার মাত্র শুনে তিনি সর্ববেদ ও শাস্ত্র পাঠ শেষ করলেন। তারপর পঞ্চজন অসুরকে
হত্যা করে, তিনি গুরুপুত্রকে উদ্ধার করে, গুরুদক্ষিণা দিলেন।
[এই পঞ্চজন অসুরের অস্থি থেকেই শ্রীকৃষ্ণের পূত পাঞ্চজন্য শঙ্খের উৎপত্তি।]
ভীষ্মকরাজকুমার রুক্মী, ভগিনী
রুক্মীণীর সঙ্গে শিশুপালের বিয়ের সম্বন্ধ করেছিলেন। কৃষ্ণগতপ্রাণ রুক্মীণী কৃষ্ণকে
সংবাদ পাঠালেন উদ্ধারের জন্যে। বিয়ের সভায় শিশুপালের সঙ্গে বরযাত্রী এসেছিল
জরাসন্ধের মতো বীর সহস্র রাজা। তাদের সকলকে অপমান করে গান্ধর্বমতে বিয়ে করে
রুক্মীণীকে তুলে এনেছিলেন কৃষ্ণ।
নাগ্নজিতীর স্বয়ংবরের শর্ত ছিল,
সাতটা বিশাল ষাঁড়কে যে দমন করতে পারবে, সেই হবে নাগ্নজিতীর বর। কৃষ্ণ সাতটি ষাঁড়কে
বশ করে, তাদের নাক বিদ্ধ করে দড়ি পড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন। তাতে উপস্থিত রাজারা খুব
অপমান বোধ করেছিল এবং কৃষ্ণকে মারতে একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কৃষ্ণ তাদের সকলকে
পরাস্ত করেছিলেন, অথচ তাঁর কোন আঘাত লাগেনি।
ভগবান কৃষ্ণ কারও অধীন নয়, তবুও
স্ত্রৈণের মত প্রিয় পত্নী সত্যভামাকে খুশি করার জন্যে স্বর্গ থেকে পারিজাত তুলে
এনে সত্যভামাকে উপহার দিয়েছিলেন। দেবরাজ ইন্দ্র রাগে অন্ধ হয়ে কৃষ্ণের সঙ্গে যুদ্ধ
করেছিলেন।
নরকাসুর যখন যুদ্ধক্ষেত্রে বিশাল
দেহ বিস্তার করে সমস্ত আকাশকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছিল, এই কৃষ্ণই তাঁর
সুদর্শনচক্র দিয়ে তার মুণ্ডছেদ করেছিলেন। তারপর নরকাসুরের মা ধরিত্রীদেবীর অনুরোধে
অন্য পুত্র ভগদত্তকে রাজ্যভার দিয়ে নরকাসুরের অন্তঃপুর থেকে বন্দিনী বহু রাজকুমারীকে
উদ্ধার করেছিলেন। পরিত্রাতা কৃষ্ণকে দেখেই সদ্য মুক্তি পাওয়া রাজকুমারীরা মুক্তির
মোহিত হয়ে, তাঁকে স্বামী হিসেবে পেতে উন্মুখ হয়ে উঠেছিল। তখন কৃষ্ণ তাঁর অদ্ভূত
যোগমায়ায় নিজেকে বহুভাগে বিভক্ত করে সকল রাজকুমারীকেই স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন ও
প্রত্যেককে দশটি করে পুত্র দান করেন।
কংসের বিনাশের পর জরাসন্ধ,
কালযবন, শাল্বপ্রভৃতি বীররাজাগণ মথুরা আক্রমণ করলে, মুচুকুন্দ ও ভীমকে দিয়ে তিনিই
তাদের বিনাশ করেন। একইভাবে তিনি প্রদ্যুম্ন, বলরামকে দিয়ে শম্বর, দ্বিবিদ, বল্কল
প্রমুখ রাক্ষসদেরও বিনাশ করেছিলেন। তিনি নিজে দন্তবক্র ও মুরের বিনাশ করেছিলেন,
বাণ্বরাজার অহংকার ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিলেন।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যুধিষ্ঠির
ও দুর্যোধনের সমর্থনে যত রাজা সমবেত হয়েছিলেন। যাঁদের শক্তিতে আর অহংকারে সমস্ত
পৃথিবী বিপর্যস্ত হচ্ছিল, তাঁদের সকলকেই তিনি বিনাশ করলেন, অর্জুন আর ভীমকে সামনে
রেখে। আবার তিনিই উত্তরার গর্ভে
অভিমন্যুর পুত্র, পুরুবংশের শেষ উত্তরাধিকার পরীক্ষিৎকে রক্ষা করলেন। কারণ
যুধিষ্ঠিরের পর পরীক্ষিৎই হবে প্রজাপালক ধার্মিক রাজা।
এইসব কিছুর পর তিনি প্রদ্যুম্নের
নেতৃত্বাধীন দুর্ধর্ষ যদু সৈন্যের ধ্বংসের উপায়ও তিনি স্থির করে ফেললেন। যদু,
বৃষ্ণি, ভোজ ও অন্ধকদের নিয়েই ছিল দুর্ভেদ্য যদু সৈন্য, তাদের সকলের মধ্যে খুব
সদ্ভাব থাকলেও, ভগবান কৃষ্ণ স্থির করলেন, মত্ত অবস্থায় এরা নিজেদের মধ্যেই যুদ্ধ
করে ধ্বংস হোক। রাজপুরীর মধ্যে যদু ও ভোজ
রাজকুমাররা একদিন খেলায় উন্মত্ত হয়ে, উপস্থিত মুনিদের উপেক্ষা ও অপমান করে বসল।
অপমানিত মুনিরা কৃষ্ণের প্রশ্রয়েই তাদের অভিশাপ দিলেন।
এর মাস কয়েকপরে যদু, বৃষ্ণি, ভোজ
ও অন্ধককুমাররা সকলে মহাসমারোহে প্রভাসতীর্থে যাত্রা করলেন। সেখানে স্নান করলেন,
তীর্থজল দিয়ে পিতৃ ও দেব তর্পণ করলেন। ব্রাহ্মণদের প্রচুর সম্পদ, গরু, সোনা, রূপো,
জীবিকার জমি ও বাসের জমি দান করলেন। ওই যদুবীরেরা গো ও ব্রাহ্মণের মঙ্গলের
জন্য চিরদিন নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন। এখন তাঁরা সেই দান কর্মের ফল শ্রীভগবানে
অর্পণ করে, মাটিতে শুয়ে ব্রাহ্মণদের প্রণাম করলেন”।
যাদবদের উচ্ছৃখলতা
ব্রাহ্মণদের অন্ন ভোজনের পর, ব্রাহ্মণের অনুমতি নিয়ে নিজেরা ভোজন করলেন। তারপর সকলে মিলে শুরু করলেন মদ্যপান। অতিরিক্ত মদ্যপানে উন্মত্ত হয়ে তারা একে অপরকে গালি দিতে লাগল, তাদের ক্রোধ বেড়ে উঠতে লাগল, তারা নিজেদের মধ্যেই যুদ্ধে প্রবৃত্ত হল এবং একসময় উন্মত্ত অবস্থাতেই সকলের বিনাশ হল।
এই ঘটনার কিছুদিন আগেই কৃষ্ণ
দ্বারকা ত্যাগ করেছিলেন, আর আমাকে বলেছিলেন বদরিকাশ্রমে চলে যেতে। আমাকে বললেও আমি
তাঁর সঙ্গ ছাড়তে পারিনি। যদুকুল ধ্বংস হবার পর, তিনি সরস্বতীর জলে আচমন করে একটি অশ্বত্থ
গাছের তলায় গিয়ে বসলেন। সেই গোধুলিবেলায়, সরস্বতী নদীর তীরে, গাছে পিঠ রেখে, তিনি
মাটিতে একলা বসে ছিলেন, তাঁর মুখ তখনও প্রসন্ন।
আমি তাঁর চরণ স্পর্শ করে প্রণাম করলাম। আমাকে দেখে
তিনি মৃদু হেসে বললেন, “উদ্ধব, তোমার মনের কি ইচ্ছে আমি জানি।, তুমি এইজন্মে আমার
কৃপা লাভ করেছ, অতএব এই জন্মই তোমার শেষ জন্ম। এই লোকে আমার সব কাজ সব শেষ হয়ে
গেছে, এখন বৈকুণ্ঠে ফেরার সময় হয়ে এল। আমি চলে যাবার পর, উদ্ধব, যতদিন তুমি এই
ভূলোকে থাকবে, আমার বিষয়ে লোককে উপদেশ দেওয়ার ভার আমি তোমাকেই দিয়ে গেলাম। কারণ,
তুমি আমার থেকে এতটুকুও কম নও। তুমি বদরিকাশ্রমে যাও, সেখানেই তোমার কাজ শুরু করো”।
ডান উরুর উপর, বাঁ পা রেখে, তিনি নিজের লীলা সংবরণের প্রতীক্ষায় বসেই রইলেন সেই অশ্বত্থ গাছের তলায়। সেইদিন সরস্বতী নদীর তীরে গোধুলির আলোয় তাঁর উজ্জ্বল প্রসন্ন মুখ দর্শন করে, আমি তাঁর নির্দেশে রওনা হলাম বদরিকা আশ্রমের দিকে।
সৃষ্টিতত্ত্ব
শ্রীশুকদেব বললেন, “শ্রীকৃষ্ণের
লীলা মাহাত্ম্য বর্ণনার পর উদ্ধব বদরিকা আশ্রমে যাবার জন্যে উদ্যত হচ্ছেন দেখে,
বিদুর ভক্তিভরে বললেন, হে উদ্ধব, শ্রীভগবান আপনাকে নিজের তত্ত্বস্বরূপ পরমজ্ঞানের
যে উপদেশ দিয়েছিলেন, আমাকে সেই উপদেশ দান করুন। কী উপায়ে আমি তাঁর একান্ত অনুগত
থাকতে পারি, তাও আমার কাছে বর্ণনা করুন। উদ্ধব বললেন, কুশারুনন্দন ঋষি মৈত্রেয় তোমার সকল জিজ্ঞাসার উত্তর দেবেন।
তিনিই তোমার আরাধ্য গুরু। ভগবান
শ্রীকৃষ্ণও মর্ত্যলোক ত্যাগ করার আগে আমার সামনে এইরকমই নির্দেশ করে গিয়েছেন।
অতএব, তুমি ঋষি মৈত্রেয়র সঙ্গে তাড়াতাড়ি সাক্ষাৎ করো।
উদ্ধবের নির্দেশমতো হরিদ্বারে
পৌঁছে, বিদুর পরমজ্ঞানী মহাঋষি মৈত্রেয়র সামনে উপস্থিত হলেন। পরম ভক্তিভরে বিদুর
ঋষি মৈত্রেয়কে বললেন, “আমি ব্যাসদেবের কাছে ধর্মতত্ত্ব বহুবার শুনেছি, কিন্তু আমি
বুঝেছি ওই সকল ধর্ম আচরণ, তুচ্ছ সুখের সন্ধান দেয় মাত্র। কিন্তু কৃষ্ণকথামৃতপানের
সুযোগ যে কবার আমি পেয়েছি, তাতে আমার তৃপ্তি হয়নি। আপনি আমাকে সেই কৃষ্ণকথার অমৃত
তত্ত্ব শোনান। যে তত্ত্ব অন্তরে ঢুকে সংসারের
প্রতি সমস্ত আসক্তি দূর করে, শ্রীকৃষ্ণের চরণে আশ্রয় লাভ করে পরমমুক্তির সন্ধান
দেয়”।
বিদুরের মুখে ব্যাকুল এই প্রশ্ন
শুনে, কুশারুনন্দন মৈত্রেয় তাঁকে সমাদর করে বললেন, “হে বিদুর আপনি খুবই উত্তম
প্রশ্ন করেছেন। এর উত্তর সঠিক বুঝতে গেলে, জানতে হবে, এই নিখিল বিশ্বের সৃষ্টির
তত্ত্বটি। এই সমগ্র বিশ্ব যখন সাগরের জলে ডুবে ছিল, তখন শ্রী নারায়ণ যোগনিদ্রায়
চোখ বন্ধ করে অনন্তশয্যায় শুয়ে ছিলেন।
বাইরে থেকে তাঁকে মনে হচ্ছিল যেন ঘুমিয়ে আছেন, কিন্তু অন্তরে তাঁর চিৎশক্তি
পূর্ণমাত্রায় সজাগ ছিল। কাঠের দাহিকা শক্তি যেমন কাঠের মধ্যেই রুদ্ধ থাকে, ঠিক
সেরকমই তাঁর মধ্যে নিরুদ্ধ ছিল জগতের সমস্ত ভূতের সূক্ষ্মস্বরূপ। তিনি
মায়ালীলা ত্যাগ করে আত্মস্বরূপে নিমগ্ন ও নিষ্ক্রিয়ভাবে বিরাজ করছিলেন।
এইভাবে তাঁর চার হাজার যুগ তিনি
রইলেন যোগনিদ্রায়, তারপর একদিন সৃষ্টির ইচ্ছায় তিনি চোখ মেলে তাকালেন এবং নিজের
অন্তরে সূক্ষ্মরূপে লীন হয়ে থাকা সমস্ত লোকসমূহের দিকে দৃষ্টি দিলেন। তাঁর এই
দৃষ্টির আঘাতে সঞ্চারিত হল রজোগুণ আর এই রজোগুণের প্রভাবেই, কাল সমস্ত জীবের
কর্মের ভাগ্য নির্দিষ্ট করে দিল। সেই
কালের নিয়মেই জেগে ওঠা জীবের সূক্ষ্মতত্ত্ব, উজ্জ্বল এক পদ্মকোষের আকারে
তাঁর নাভিমূল থেকে উদ্গত হল। সেই পদ্মকোষের উজ্জ্বল আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল
চারিদিকের অনন্ত জলরাশি। এই পদ্মই জীবের ভোগবস্তুর প্রকাশ করে থাকে।
তারপর সেই পদ্মকোষ থেকে আবির্ভূত
হলেন বেদময় স্বয়ং ব্রহ্মা। যেহেতু
পদ্মকোষেই তাঁর স্বয়ং আবির্ভাব, তাই তাঁকে
স্বয়ম্ভূ বলা হয়। পদ্মের উপর বসে তিনি চারিদিকে কোন জগৎ দেখতে পেলেন না, চারিদিকে
অখণ্ড জলরাশি ও সীমাহীন তরঙ্গ দেখতে
পেলেন। উদ্গ্রীব হয়ে ঘাড় ফিরিয়ে চারদিকে দেখার জন্যেই তাঁর চারটি মাথার সৃষ্টি
হয়েছিল, তাই তাঁকে চতুর্মুখও বলা হয়ে থাকে। তিনি চারিদিকে জলরাশি দেখে খুবই হতাশ
হলেন। তিনি নিজে সেই পদ্মে অবস্থান করেও তিনি সেই পদ্মের স্বরূপ ও তার সম্পূর্ণ
আকার উপলব্ধি করতে পারলেন না। তাঁর মনে হল, আমি এই যে পদ্মের উপর বাস করছি, আমি
কে? আর এই বিপুল জলরাশির মধ্যে পদ্মই বা কোথা থেকে সৃষ্টি হল? যে আধার থেকে এই
পদ্মের সৃষ্টি হয়েছে, সে আধার নিশ্চয়ই জলের মধ্যেই কোথাও ডুবে আছে!
এই চিন্তা করে ব্রহ্মা পদ্মের
মৃনালের ছিদ্রপথে জলের মধ্যে প্রবেশ করলেন। কিন্তু অন্ধকারের মধ্যে শত বছর খুঁজেও তিনি তাঁর ও এই পদ্মের আবির্ভাবের কোন
কারণ বুঝতে পারলেন না। দীর্ঘ অন্বেষণে ব্যর্থ হয়ে তিনি আবার ফিরে এলেন তাঁর পদ্মের
আসনেই। তারপর মনকে সংযত করে সমাধিযোগে বসে রইলেন আরো শত বৎসর। একশ বছর পর তাঁর যোগ সফল হল। আগে দীর্ঘদিন বহু সন্ধানে করেও
যাঁকে তিনি লাভ করতে পারেন নি, তাঁকে আজ নিজের মনের মধ্যেই বিরাজ করতে দেখলেন।
তিনি দেখলেন, শ্যামলাবণ্য, পীতবসন এক দিব্য পুরুষকে; তাঁর মাথায় বহুরত্নখচিত
মুকুট; তাঁর সর্ব অঙ্গে রত্নের অলংকার; শেষনাগের দেহের শয্যায় শুয়ে রয়েছেন; সেই
দিব্য পুরুষের মাথার উপর ছাতার মতো ব্যাপ্ত রয়েছে শেষনাগের সহস্র ফণা।
অবশেষে ব্রহ্মা সেই দিব্যপুরুষকে
শ্রীহরি বলে চিনতে পারলেন। ব্রহ্মা সকলের আরাধ্য শ্রীবিষ্ণুর স্তব করলেন।
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন