বুধবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১

 


["ধর্মাধর্ম"-এর তৃতীয় পর্বের অষ্টম ও অন্তিম পর্বাংশ পড়ে নিতে পারেন এই সূত্র থেকে "ধর্মাধর্ম - ৩/৮"]


চতুর্থ পর্ব প্রথম পর্বাংশ - ০ থেকে ১৩০০ সি.ই.

 

৪.১.১ পূবের প্রজ্ঞা পশ্চিমে ও খ্রিষ্টধর্মের সূচনা

সেই সিন্ধু সভ্যতার কাল থেকেই পশ্চিম এশিয়ার আরব কিংবা মেসোপটেমিয়ার সঙ্গে ভারতের যে নিবিড় যোগাযোগ ছিল, সে কথা আমরা আগেই দেখেছি। পরবর্তীকালে সাংস্কৃতিক এবং দার্শনিক চিন্তাধারার আদান-প্রদানও লক্ষ্য করা যায়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রাক-বৌদ্ধ যুগেও ভারতীয় দর্শনের সঙ্গে গ্রীসের ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল। হয়তো ভারতীয় দার্শনিকরা এথেন্স, স্পার্টা বা করিন্থ গিয়েছিলেন, গ্রীক দার্শনিকদের উপনিষদের দর্শন শুনিয়েছিলেন। দিগ্বিজয়ী আলেজাণ্ডারের সমসাময়িক গ্রীক ঐতিহাসিক অ্যরিস্টোজেনাসের লেখা থেকে জানা যায়, বিখ্যাত গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস (৪৬৯-৩৯৯ বি.সি.ই)-এর সঙ্গে এথেন্সে কোন এক ভারতীয় পণ্ডিতের সাক্ষাৎ হয়েছিল। অনুমান করা হয়, ভারতীয় প্রজ্ঞার প্রভাবেই, পিথাগোরাস (৫৭০-৪৯৫ বি.সি.ই), প্লেটো (৪২৭-৩৪৭ বি.সি.ই) এবং পরবর্তী কালে এথেন্সের স্টোয়িসিজ্‌ম্‌ (Stoicism) দর্শনে - বি.সি.ই তৃতীয় শতাব্দীর শুরুর দিকে যার সূচনা - পুনর্জন্ম এবং আত্মার দেহান্তরের বিষয় এসেছিল।

 এর পরে, যিশুর জন্মের প্রায় দু’শ বছর আগে থেকে আলেকজান্দ্রিয়া এবং প্যালেস্টাইনের ইহুদিদের একাংশের মধ্যে এক উল্লেখযোগ্য এবং রহস্যময় কিছু ধর্মীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। মিশরের এই রহস্যময় ধার্মিকদের বলা হত থেরাপিউট (Therapeutae) এবং প্যালেস্টাইনে তাঁদের আধ্যাত্মিক ভাইয়েরা নিজেদের এসেনেস (Essenes) বা নাজারিনস (Nazarenes) বলতেন। সম্রাট অশোক তাঁর রাজত্বকালে পাঁচটি গ্রীক রাজার দরবারে বৌদ্ধ প্রচারকদের পাঠিয়েছিলেন এবং তাদের মধ্যে আলেকজান্দ্রিয়া ছিল অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু সে কথা আগেই বলেছি।

থেরাপিউট” এই ল্যাটিন শব্দের অর্থ, “যিনি ঈশ্বরের সেবক”, “যিনি মানুষকে সেবা করেন” এবং “পীড়িত মানুষকে আরোগ্য করেন”। এই সেবা শুধুমাত্র অসুস্থ মানুষকে সেবা করে আরোগ্য করা নয়। বরং দুঃখশোকে বিষণ্ণ অজ্ঞান অসুস্থকে, জ্ঞানের আলোকেও আরোগ্য করে তোলা। যে কথাটি গৌতমবুদ্ধ এবং তাঁর ধর্মের সারকথা। এই “থেরাপিউট” শব্দটি একটি ল্যাটিন শব্দ হলেও, এর “থেরা” শব্দটি বৌদ্ধদের প্রাচীনপন্থী “থেরবাদ” থেকেই হয়তো গ্রহণ করা হয়েছে। বৌদ্ধ অহর্ৎদের সঙ্ঘ-বাসের সময়, তাঁদের ভেষজ চিকিৎসারও যে চর্চা করতে হত, সে কথা আগেই বলেছি। যার ফলে পরবর্তীকালে “থেরাপিউটিক” (Theraputic) শব্দটি ডাক্তারি শাস্ত্রে চিকিৎসা এবং ওষুধকেও বোঝায়। থেরাপি (Therapy) শব্দটিও আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার নানান প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত – যেমন Physiotherapy, Psychotherapy ইত্যাদি।

আলেকজান্দ্রিয়া শহরের আশেপাশে এই ইহুদি থেরাপিউট গোষ্ঠীর মানুষেরা যে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের থেকে প্রভাবিত হয়েছিলেন, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। থেরাপিউটরা বৌদ্ধ অর্হৎ বা ভিক্ষুদের মতোই শহরের বাইরে বাস করতেন। তাঁরা কুশের আসনে বসে ধ্যান করতেন। তাঁরা মদ্য ও মাংস খেতেন না এবং ব্রহ্মচর্য পালন করতেন। তাঁরা সকলেই ছিলেন স্বেচ্ছা-ভিক্ষু বা সন্ন্যাসী এবং কোন কোন বিশেষ দিনে উপবাস করতেন। তাঁরা সাদা বস্ত্র পরতেন, এবং সকলে মিলে একসঙ্গে ধর্মকথা পাঠ কিংবা সুর করে শ্লোক উচ্চারণ করতেন। এমন অদ্ভূত আচরণের ধর্ম-সম্প্রদায়ের কথা, এর আগে মিশরে কেউ কোনোদিন দেখেনি এবং শোনেওনি।  

ইহুদি এসেনেস সম্প্রদায় বাস করতেন, ডেড সী (Dead Sea)-র পাড়ে পাহাড় কেটে বানানো কিছু গুহায়, প্রাচীন জেরিকো শহরের উল্টোদিকে। এই গুহাগুলি যে সময়ের, তার কিছুদিন আগেই ভারতের পশ্চিম উপকূলে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা গুহা-বিহারে থাকতে শুরু করেছিলেন এবং সেখানে চৈত্য বা স্তূপ নির্মাণ করে, নির্জনে ধ্যান করতে পছন্দ করতেন। বৌদ্ধদের মতো এসেনেস এবং থেরাপিউটরাও ছিলেন ব্রহ্মচর্য ব্রতধারী সন্ন্যাসী সম্প্রদায়। শুধু প্যালেস্টাইন কেন, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের কোন দেশে এবং কোন সংস্কৃতিতেই এমন অদ্ভূত সন্ন্যাসী সম্প্রদায়কে এর আগে কখনও দেখা যায়নি। যাঁরা অত্যন্ত কম পরিমাণে নিরামিষ আহার করেন, মদ্যপান করেন না, যৌনজীবন ত্যাগ করেছেন, এবং ঈশ্বর-জ্ঞানের সন্ধানে, দিনের অধিকাংশ সময় নিবিষ্ট চিন্তা (meditation) করেন।

আলেকজান্দ্রিয়া শহরের এক প্রাজ্ঞ মানুষ ছিলেন ফিলো (Philo)মার্কোটিস সাগরের তীরে কোন এক থেরাপিউট সঙ্ঘে তিনি কিছুদিন ছিলেন, তাঁর লেখা থেকে এই সকল তথ্য পাওয়া যায়। তিনি আরও লিখেছেন, জেরুজালেমের সলোমনের মন্দিরে তখন নিয়মিত পশুবলির প্রথা প্রচলিত ছিল, এসেনেস সম্প্রদায় এই প্রথার তীব্র বিরোধিতা করতেন। ইহুদিরা কোনদিনই মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী ছিলেন না। অতএব এসেনেস সম্প্রদায়ের ইহুদিরা মূর্তিপূজা সহ অ-ইহুদিদের কোন ধর্মীয় গোঁড়ামিই মানতেন না এবং এমনকি ইহুদি ধর্মের কিছু কিছু কঠোর নিয়মকেও অস্বীকার করতেন। যার ফলে সমসাময়িক প্রচলিত ধর্ম-বিশ্বাসী সম্প্রদায়গুলি, এবং তাঁদের পৃষ্ঠপোষক রাজন্যবর্গ, এসেনেসদের বিষ চোখে দেখতে শুরু করেন।

ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল বহুদিন ধরেই বহু জাতি, সংস্কৃতি ও ধর্মের সাক্ষী থেকেছে। এক সময়ের মিশর, ব্যাবিলন, মেসোপটেমিয়া সভ্যতা এবং পরবর্তী কালে পারস্য, গ্রীক এবং রোমান সভ্যতা। প্রত্যেকটি সভ্যতারই নিজস্ব ধর্ম দেব-দেবী, সংস্কার, উপাসনা, বিধিনিষেধ ছিল। তবে বিজয়ী রাজারা সাধারণতঃ বিজিত প্রজাদের ধর্মে হস্তক্ষেপ করতেন না। অতএব রোমান সাম্রাজ্যের বিস্তীর্ণ সীমার মধ্যে যেমন নানান জাতির বসবাস ছিল, তেমনই ছিল নানান ধর্মে বিশ্বাসীদের বিচিত্র আচরণ। এই ধর্মগুলির সবকটিতেই, বহু দেব-দেবীর মূর্তি (Polytheism) উপাসনার প্রচলন ছিল। এই উপাসনায় পুরোহিতদের প্রভাব ছিল অপরিসীম, কোন কোন সভ্যতায় রাজপুরোহিতের ক্ষমতা এবং প্রভাব রাজা বা সম্রাটের থেকে খুব কম ছিল না। ভারতের ব্রাহ্মণ্য পুরোহিতদের মতোই তাঁরাও যজমান এবং সাধারণ ভক্ত জনগণের থেকে প্রচুর ধনসম্পদ উপহার পেতেন (বলা ভাল, আদায় করতেন) এবং এই ধরনের উপাসনায় পশুবলি আবশ্যিক ছিল। সম্রাট অশোক পশুহিংসা নিষিদ্ধ করে, ব্রাহ্মণদের যেমন বিদ্বিষ্ট করে তুলেছিলেন, এসেনেসরাও তেমনি এই পুরোহিত সম্প্রদায় এবং শাসকগোষ্ঠীরও চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিলেন।

খ্রিষ্টিয় চতুর্থ শতকে, অখ্রিষ্টিয় (Non-Christian) এই সমস্ত ধর্মমতকে একত্রে খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীরা “পেগান ধর্ম” (Paganism) বলতে শুরু করেছিলেন। ল্যাটিন ভাষায় “পেগানাস” শব্দের অর্থ – গ্রামের মানুষ, দেহাতি। অর্থাৎ খ্রিষ্টানদের কাছে অখ্রিষ্টিয় ধর্মের মানুষরা – যাঁরা নেহাতই গ্রাম্য চাষাভুষো, তাঁরা অনেক দেবদেবীর মূর্তি পুজো করেন। পেগানিজমের প্রায় সমার্থক শব্দ “হিদেন” (heathen) – সাকারবাদী, ধর্মবোধহীন এবং বর্বর। যদিচ ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে বহু মানুষ আবার পেগান ধর্মে বিশ্বাসী হয়ে উঠছেন, তবে তাঁদের ধর্মবিশ্বাস এবং সংস্কার প্রাচীন পেগান ধর্ম থেকে অনেকটাই আলাদা এবং পরিবর্তিত। নতুন এই ধর্মের নাম – নব্য-পেগানধর্ম (Neo-Paganism)আমাদের আলোচ্য বিষয়ে নব্য-পেগান ধর্ম একান্তই অপ্রাসঙ্গিক, অতএব এসেনেসদের প্রসঙ্গেই আবার ফিরে যাওয়া যাক।

এসেনেস সম্প্রদায় বৌদ্ধসঙ্ঘের মতোই দুইভাগে বিভক্ত ছিল। একদিকে ছিলেন ব্রতধারী সংসারত্যাগী সন্ন্যাসীরা। যাঁরা জেরিকোর আশেপাশে দুর্গম এবং বিচ্ছিন্ন পাহাড়ের গুহায় ধর্মচর্চা করতেন, আর এক দিকে ছিলেন গ্রাম ও শহরের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ –গৃহীশিষ্যরা। গৃহীশিষ্যরা আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতোই সংসার ধর্ম এবং কাজ কর্ম করতেন, তার সঙ্গে ধার্মিক, পবিত্র এবং আধ্যাত্মিক জীবনেরও চর্চা করতেন। শোনা যায় যিশুর দীক্ষাগুরু জন (Baptist John) এসেনেস সম্প্রদায়ের নির্জনবাসী সন্ন্যাসী ছিলেন। এসেনেস সম্প্রদায়ে যোগ দেওয়ার সময় নবীন সন্ন্যাসীদের দীক্ষিত (baptized) করা হত। এই দীক্ষা দানের প্রক্রিয়াগুলির সঙ্গে, নবীন বৌদ্ধভিক্ষুদের সঙ্ঘে (৩.৩.২ অধ্যায়) অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়াগুলির সঙ্গে বেশ মিল পাওয়া যায়।

সালামিসের (কন্সট্যানসিয়া)-র সেন্ট এপিফেনিয়াস[1]-এর লেখা থেকে জানা যায়, এসেনেসদের নাজারিন, অথবা নাজারিনোও বলা হত। প্রাচীন ইজরায়েলে কিছু প্রাজ্ঞ মানুষকে নাজারাইটও বলা হত। এই নাজারাইটরা মন্দিরের উপাসনার সময় রক্তাক্ত বলি বা উৎসর্গের প্রথাকে তীব্র ধিক্কার এবং প্রতিবাদ করতেন। ফলতঃ মন্দিরের প্রাচীনপন্থী গোঁড়া পুরোহিতরা নাজারাইটদের রীতিমত ঘৃণা করতেন। তাঁরা তাঁদের ধর্মে বিশ্বাসী সকল মানুষকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, দিনে অন্ততঃ তিনবার যেন ভগবানের কাছে সকলে প্রার্থনা করে, “হে ঈশ্বর, নাজারাইটদের ওপর আপনার চরম অভিশাপ বর্ষণ করুন”। অতএব নাজারিন এবং নাজারাইট সংঘগুলির প্রতি, সনাতনপন্থী পুরোহিতসম্প্রদায় এবং তাঁদের পৃষ্ঠপোষক শাসকগোষ্ঠী তীব্র বিদ্বেষী হয়ে উঠছিলেন।

এরকম পরিস্থিতিতে, বি.সি.ই প্রথম শতাব্দীর শেষদিকে, এসেনেস এবং নাজারিন পণ্ডিতেরা ভবিষ্যৎ গণনা করে দেখেছিলেন, কিছুদিনের মধ্যেই তাঁদের মধ্যে আসছেন এক মহামানব। সেই মহামানবের নাম হবে যিশুখ্রিষ্ট - “খ্রিষ্ট” শব্দের অর্থ অভিষিক্ত; হিব্রু ভাষায় “মেশায়া” (Messiah) তাঁদের সকলের এই বিশ্বাস ছিল, এসেনেস ও নাজারিনতো বটেই, সমগ্র ইহুদি জাতিরই তিনিই হবেন পরিত্রাতা এবং (ধর্মীয়) রাজা। তাঁদের এই গোপন ও গভীর আনন্দের সংবাদ, দেশের রাজা, পুরোহিত সম্প্রদায় এবং প্রশাসনের কানেও পৌঁছে গিয়েছিল। সে কথা আসবে পরবর্তী অধ্যায়ে।

 বাইবেলের সুসমাচারে জন বলেছেন, ক্রুসবিদ্ধ করার সময়, প্রধান বিচারক পিলেট[2] ভগবান যিশুর ক্রসে স্বাক্ষর করে লিখেছিলেন, “জেসাস, এক নাজারিন, ইহুদিদের এক রাজা (Jesus the Nazarene, the King of the Jews)”যদিও অনেকে ইংরিজিতে এর অনুবাদ করেছেন, “জেসাস অব নাজারেথ”, অর্থাৎ যিশু, নাজারেথ শহরের বাসিন্দা। কিন্তু গবেষণা করে দেখা গেছে, সে সময় নাজারেথ জায়গাটি একেবারেই গুরুত্বহীন জনপদ ছিল। ভগবান যিশুকে “নাজারেথ-শহরবাসী” এমন পরিচয় দেওয়ার কোন তাৎপর্যই খুঁজে পাওয়া যায় না। বরং অন্যান্য অধিকাংশ ভাষার অনুবাদে যে, “জেসাস দা নাজারিন” বলা হয়েছে, অথবা নাজারাইট অর্থে “নাজারেথ” শব্দটির ব্যবহারই অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত। কারণ ধর্মান্ধ প্রাচীনপন্থী রোমান ও অন্যান্য অ-ইহুদিয় ধর্মের উচ্চ সংসদের পক্ষে, ভগবান যিশুকে ঘৃণিত নাজারিন বা নাজারাইটদের নেতা হিসেবেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পেছনে যথেষ্ট যুক্তি ছিল। হয়তো শাসকগোষ্ঠীর ধারণা হয়েছিল, দলনেতাকে দৃষ্টান্তমূলক চরম শাস্তি দিলেই, নাজারিনদের বাকি সবাই ভয়ে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।  

 

৪.১.২ ভগবান যিশুর শৈশবকাল

বাইবেলের নূতন বিধান (the New Testament)-এর মথি (Matthew) লিখিত সুসমাচার (Gospel)-এর দ্বিতীয় অধ্যায় থেকেঃ-

২:১  রাজা হেরোদের সময়ে, যিহূদিয়ার বৈৎলেহমে যীশুর জন্ম হইলে পর, পূর্ব্বদেশ হইতে পণ্ডিতেরা যিরূশালেমে আসিয়া বলিলেন, যিহূদিদের নবজাত রাজা কোথায়?

২:২  কারণ আমরা তাঁহার তারাটি উদয়কালে দেখিয়া তাঁহাকে প্রণিপাত করিতে আসিয়াছি।

২:৩  ইহা শুনিয়া রাজা হেরোদ ও তাঁহার সহিত যিরূশালেমের সকল লোক, উদ্বিগ্ন হইল।

২:৪  তিনি প্রধান পুরোহিত ও লোকদের ধর্ম্মগুরু সকলকে একত্র করিয়া সেই খ্রিষ্ট কোথায় জন্মিবেন, তাঁহাদের কাছে জিজ্ঞাসা করিলেন।

২:৫  তাঁহারা তাঁহাকে বলিলেন, যিহূদিয়ার অন্তর্গত বৈৎলেহমে, কারণ ভাববাদী দ্বারা এই রূপ লেখা আছে,-

২:৬  ‘বৈৎলেহম, যিহূদা-ভূমি, তুমি যিহূদার শাসনকর্ত্তাদের মধ্যে কোন অংশে ক্ষুদ্রতম নও, কারণ তোমার মধ্য হইতে এমন একজন নেতা আসিবেন যিনি আমার জাতি ইস্রায়েলকে পরিচালনা করিবেন’।

২:৭  তখন হেরোদ পণ্ডিতদের গোপনে ডাকিয়া, তারাটি কোন সময়ে দেখা গিয়াছিল তাহা তাঁহাদের নিকট হইতে বিশেষ করিয়া জানিয়া লইলেন;

২:৮  তোমরা গিয়া শিশুটির বিষয়ে সবিশেষ অনুসন্ধান কর এবং উদ্দেশ পাইলে আমাকে সংবাদ দিও, আমিও গিয়া যেন তাঁহাকে প্রণিপাত করিতে পারি, এই কথা বলিয়া তিনি বৈৎলেহমে তাঁহাদের পাঠাইয়া দিলেন।

২:৯  রাজার কথা শুনিয়া তাঁহারা চলিয়া গেলেন। আর যে তারাটি তাঁহারা উদয়কালে দেখিয়াছিলেন, তাহা তাঁহাদের অগ্রে অগ্রে, শিশুটি যেখানে ছিলেন সেই স্থানের উপরে আসিয়া স্থির হইয়া রহিল।

২:১০-১১  তারাটি দেখিয়া তাঁহারা অতিশয় আনন্দিত হইলেন এবং ঘরে প্রবেশ করিয়া শিশুটিকে তাঁহার মাতা মরিয়মের সঙ্গে দেখিতে পাইয়া, ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণিপাত করিলেন এবং আপনাদের পেটিকা খুলিয়া ‘স্বর্ণ, কুন্দুরু ও গন্ধরস’ তাঁহাকে উপহার দান করিলেন।

২:১২  পরে যেন হেরোদের নিকটে ফিরিয়া না যান, স্বপ্নে এই প্রত্যাদেশ পাইয়া তাঁহারা অন্য পথ দিয়া স্বদেশে চলিয়া গেলেন।

২:১৩   তাঁহারা চলিয়া গেলে পর, দেখ, প্রভুর এক দূত স্বপ্নে যোষেফকে দর্শন দিয়া বলিলেন, উঠ, শিশুটি ও তাঁহার মাতাকে লইয়া মিসরে পলায়ন কর; যত দিন আমি তোমাকে না বলিব, ততদিন সেইখানে থাক।

২:১৪   কারণ হেরোদ শিশুকে নাশ করিবার জন্য তাঁহার অন্বেষণে উদ্যত। তিনি উঠিয়া শিশু ও তাঁহার মাতাকে লইয়া রাত্রিযোগে মিসরে চলিয়া গেলেন।

২:১৫   এবং হেরোদের মৃত্যু পর্য্যন্ত সেখানে থাকিলেন; তাহাতে ভাববাদী দ্বারা প্রভু যে কথা বলিয়াছিলেন তাহা পূর্ণ হইল, - ‘আমি মিসর হইতে আমার পুত্রকে ডাকিয়া আনিলাম’।

২:১৬   পণ্ডিতেরা তাঁহাকে তুচ্ছ করিয়াছেন দেখিয়া হেরোদ অত্যন্ত উত্তেজিত হইলেন এবং তাঁহাদের নিকট যে সময়ের কথা বিশেষ করিয়া জানিয়া লইয়াছিলেন, সেই অনুসারে দুই বৎসর ও তাহার কম বয়সের যত বালক বৈৎলেহম ও তাহার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ছিল, তিনি লোক পাঠাইয়া তাহাদের সকলকে হত্যা করাইলেন।

২:১৭  তখন যে কথা ভাববাদী যিরমেয়ের দ্বারা কথিত হইয়াছিল তাহা পূর্ণ হইল, -

২:১৮  ‘রামা পল্লিতে ধ্বনিত এক রব শোনা গেল, ক্রন্দন ও তীব্র বিলাপ। রাহেল আপন সন্তানদের জন্য রোদন করিতেছেন, সান্ত্বনা প্রাপ্ত হইতে চান না, কারণ তাহারা আর নাই’।

২:১৯  হেরোদের মৃত্যু হইলে পর প্রভুর দূত মিসরে যোষেফকে স্বপ্নে দর্শন দিয়া বলিলেন,

২:২০  উঠ, শিশুটি ও তাঁহার মাতাকে লইয়া ইস্রায়েলের দেশে চল, কারণ যাহারা শিশুর প্রাণনাশের চেষ্টা করিতেছিল, তাহাদের মৃত্যু হইয়াছে।

২:২১   তিনি উঠিয়া শিশু ও তাঁহার মাতাকে লইয়া ইস্রায়েলের দেশে আসিলেন।

২:২২  কিন্তু আর্খিলায় আপন পিতা হেরোদের স্থলে যিহূদিয়াতে রাজত্ব করিতেছেন শুনিয়া সেখানে যাইতে ভয় করিলেন। স্বপ্নে প্রত্যাদেশ পাইয়া তিনি গালীল প্রদেশে চলিয়া গেলেন,

২:২৩  আর নাসরৎ নামক নগরে গিয়া বাস করিলেন; যেন ভাববাদীদের কথা পূর্ণ হয়, তিনি নাসরীয় বলিয়া আখ্যাত হইবেন।

(ধর্মপুস্তক–নূতন নিয়মের (The Holy Bible – Bengali – The Bible Society of India, Bangalore) প্রথম অধ্যায় থেকে উদ্ধৃত। (বানান অপরিবর্তিত)

খ্রিষ্টিয় ধর্মগ্রন্থ বাইবেলের অধ্যায়গুলিকে গসপেল (gospel) বলে, শব্দটির সাধারণ অর্থ “সুসমাচার” অর্থাৎ শুভ সংবাদ। বাইবেলের “নূতন বিধান” (New Testament)-এ যে চার জন সন্ন্যাসীর (Saints) সুসমাচার পাওয়া যায়, তাঁরা হলেন সেন্ট ম্যাথিউ (Matthew) (ম্যাথিউ বাংলা অনুবাদে মথি হয়েছেন!), সেন্ট মার্ক (Mark), সেন্ট লিউক (Luke) এবং সেন্ট জন (John)উপরে যে অংশটি উদ্ধৃত হয়েছে, সেটি সেন্ট ম্যাথিউ-এর সুসমাচারের দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথমাংশ।

সেন্ট ম্যাথিউ-এর প্রথম অধ্যায় থেকে যিশুর জন্ম এবং দ্বিতীয় অধ্যায়ে যিশুর শৈশবের বিশেষ কিছু ঘটনা জানতে পারা যায়। যেমন, জুডিয়া (যিহূদিয়া; Judea)-র বেথলেহেমে যিশুর যখন জন্ম হল, তখন সেখানকার রাজা ছিলেন হেরড। সে সময়ে তিনজন পূর্বদেশের প্রাজ্ঞমানুষ জেরুজালেম শহরে উপস্থিত হয়েছিলেন। তাঁরা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “ইহুদিদের রাজার কোথায় জন্ম হয়েছে? আমরা তাঁর তারা (star) পূর্বদিকে দেখেছি। আমরা দেখা করে, তাঁর পূজা করতে চাই”। এ কথা শুনে রাজা হেরড এবং জেরুজালেমের নাগরিকরা খুবই উদ্বিগ্ন হলেন। রাজা হেরড তাঁর প্রধান পুরোহিত এবং ধর্মগুরুদের ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এই খ্রিষ্ট কোথায় জন্মাবে”? তাঁরা রাজাকে বললেন, “জুডিয়ার বেথলেহেমে। কারণ ভবিষ্যদ্বক্তারা (ভাববাদী – Prophet, যাঁদের মাধ্যমে ঈশ্বর তাঁর ইচ্ছার কথা ও নির্দেশ ব্যক্ত করেন) লিখে গেছেন, ‘হে জুডিয়া ভূমির বেথলেহেম, আপনি কোন রাজকুমারের থেকে কম নন, কারণ আপনার ভূমিতে এমন একজন নেতা আবির্ভূত হবেন, যিনি আমার ইজরায়েলের মানুষদের শাসন করবেন’”।  রাজা হেরড কী করে জানলেন, “খ্রিষ্ট” বলে কেউ জন্মগ্রহণ করবেন? আগেই বলেছি, এসেনেস বা নাজারিন সম্প্রদায়ের প্রাজ্ঞলোকেরা যিশুর আবির্ভাবের ভবিষ্যদ্বাণী করে রেখেছিলেন, সেটি রাজা এবং পুরোহিত সম্প্রদায়ের অগোচর ছিল না।

যাই হোক, পুরোহিতদের কথা শুনে হেরড পূর্বদেশের তিন পণ্ডিতকে ডেকে খুঁটিয়ে জেনে নিলেন, তাঁরা ওই শিশুর তারাটি কতদিন আগে, কোথায় দেখেছেন। তারপর তাঁদের বললেন বেথলেহেমে গিয়ে খোঁজ করতে এবং শিশুর দেখা পেলে তাঁকে জানিয়ে যেতে, যাতে তিনিও গিয়ে শিশুকে প্রণাম জানাতে পারেন। রাজার কথা শুনে তিন পণ্ডিত বেথলেহেমে গেলেন এবং সেই শুভ তারা তাঁদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল শিশু যিশুর বাড়িতে, সেখানেই সেই তারা স্থির হয়ে রইল! মাতা মেরির কোলে যিশুকে দেখে তিন পূর্বদেশীয় পণ্ডিত ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করলেন, তারপর তিনজনেই শিশুকে তিনটি উপহার দিলেন। তারপর দেবতার নির্দেশে তাঁরা রাজা হেরডের সঙ্গে দেখা না করে, অন্য পথে ফিরে গেলেন।

যে তারাটির ভরসায় তিনজন প্রাচ্যের পণ্ডিত সুদূর পথ পার হয়ে শিশু যিশুকে দেখতে গিয়েছিলেন, সেটি কী বাস্তব, নাকি কোন পৌরাণিক গল্পকথা? পুরোটাই গল্পকথা নয়, জ্যোতির্বিজ্ঞানের গভীর গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ওই সময়ে একটি দুর্লভ গ্রহ-সংযোগের সন্ধান পেয়েছেন। ৭ বি.সি.ই-তে বৃহষ্পতি এবং শনি গ্রহদুটি একই সঙ্গে মীনরাশিতে অবস্থান করছিল এবং ওই বছরের ২৯শে মে, শনি ও বৃহষ্পতি প্রায় সমরেখায় (মাত্র ১০ কৌণিক দূরত্ব) চলে এসেছিল। এমন ঘটনা ওই বছরে আরও দুবার ঘটেছিল, ৩রা অক্টোবর আর ৫ই ডিসেম্বর। ওই তিনটি দিনে গ্রহ দুটি অস্বভাবিক উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল এবং সূর্যাস্তের পর যুগ্ম-তারা হয়ে পূর্বদিকে উদয় হত, সূর্যোদয়ের আগেই পশ্চিমে অস্ত যেত। পণ্ডিতেরা বলেন, এই দুই গ্রহ ও মীনরাশির সংযোগ ৭৯৪ বছর অন্তর ঘটে থাকে।

যদিও তারাটি পণ্ডিতদের আগে আগে গিয়ে যিশুর গৃহের সন্ধান নির্দেশ এবং তাঁর ঘরের ওপর “স্থির হয়ে” থাকা ব্যাপারটা, অবশ্যই কাল্পনিক। বিশেষ সেই তারাটি যখন তাঁদের পথ দেখিয়ে নিয়েই যাচ্ছিল, তাহলে পূর্বের পণ্ডিতরা খামোখা রাজা হেরডকে জিজ্ঞাসা করতে গেলেন কেন? বেথলেহেমের অন্যান্য সমবয়সী শিশুদের অনর্থক বিপদে ফেলতে

রোম সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ, জুডিয়ার রাজা হেরডের রাজত্বকাল ৩৭ বি.সি.ই-তে শুরু হয়েছিলে এবং তাঁর মৃত্যু হয় ৪ বি.সি.ই-তে। জুডাইজ্‌ম্‌ ধর্মে বিশ্বাসী রাজা হেরড বিপথগামী ইহুদি অর্থাৎ এসেনেস বা নাজারিনদের প্রতি তীব্র বিদ্বেষী ছিলেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল, সঠিক সন্ধান পেলে, ইহুদিদের ভবিষ্যৎ-রাজা শিশু যিশুখ্রিষ্টকে তিনি হত্যা করবেন। কিন্তু প্রাচ্যের পণ্ডিতেরা শিশু যীশুর সঙ্গে দেখা করার পর, তাঁর সঙ্গে দেখা না করাতে, হেরড ভয়ংকর রেগে উঠলেন। তিনি প্রাচ্য পণ্ডিতদের থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বেথলেহেম এবং তার আশপাশ অঞ্চলের সমস্ত দু’বছর বা তার কমবয়সী ইহুদি শিশুদের হত্যার আদেশ দিলেন। এই বিপদের আঁচ করে, আগে থেকেই দেবতারা (নাকি নাজারিন বা নাজারাইট প্রাজ্ঞ মানুষরা?) যিশু ও তাঁর মাতা-পিতাকে মিশরে গিয়ে আত্মগোপন করতে বলেছিলেন।

কিছুদিনের মধ্যেই হেরডের মৃত্যুর পর তাঁরা ইজরায়েলে ফিরে এসেছিলেন, কিন্তু জুডিয়ার সিংহাসনে হেরডের পুত্র আর্কিলিয়স রাজা হওয়াতে তাঁরা সেখানেও নিজেদের নিরাপদ মনে করলেন না। তাঁরা গালীল প্রদেশে চলে গেলেন। সেখানে “নাসরৎ” - নাজারেথ শহরে বাস করতে লাগলেন এবং সেখানকার প্রাজ্ঞ মানুষরা তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে “নাজারিন” বলেই সম্বোধন করতেন।

বাইবেলের উল্লেখ এবং রাজা হেরড ও তাঁর পুত্র আর্কিলিয়সের রাজত্বকালের হিসেব কষে, বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভগবান যিশুর জন্ম হয়েছিল ৭ বি.সি.ই-র কাছাকাছি। তাঁর প্রাণ সংশয়ের ভয়ে, আর্কিলিয়সের রাজত্ব কাল ৬ সি.ই. পর্যন্ত নাজারিনরা বালক যিশুকে তাঁদের কোন সঙ্ঘে বা মঠে গোপনে রেখে দিয়েছিলেন - অর্থাৎ ভগবান যিশুর তের বছর বয়স পর্যন্ত। এর পরে ভগবান যিশুর আর কোন সংবাদ পাওয়া যায় না। তাঁকে ইজরায়েলে আবার দেখা গিয়েছিল, যখন তাঁর বয়স ঊনত্রিশ বা তিরিশ বছর। এই ষোলো-সতের বছর তিনি কোথায় ছিলেন, কী করছিলেন? প্রায় এক হাজার নশো বছর ধরে, এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। সে উত্তর অকস্মাৎ অবিশ্বাস্যভাবে পাওয়া গেল ইজরায়েল থেকে বহুদূরের এক গ্রন্থাগারের তথ্যভাণ্ডার থেকে!

পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " ধর্মাধর্ম - ৪/২ "



[1] সালামিস (বা কন্সট্যানসিয়া)-এর এপিফেনিয়াস (Epiphanius of Salamis or Constantia) সি.ই. চতুর্থ শতাব্দীতে সাইপ্রাসের সালামি শহরের বিশপ ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি সেন্ট হন এবং সমস্ত অর্থডক্স ও রোমান ক্যাথলিক চার্চের পিতা বলে গণ্য হতেন।

[2] বাইবেল অনুযায়ী জুডিয়ার রোমান প্রশাসন-প্রধান (Governor) পন্টিয়াস পিলেট (Pontius Pilate) (২৬-৩৭ সি.ই.) ছিলেন ভগবান যিশুর বিচারসভার প্রধান বিচারক।

 


মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারি, ২০২৬

নতুন চাল

 এর আগের বড়োদের গল্প - " প্রসাদী ফুল "








অন্যদিন সন্ধে ছটায় ছুটি হলেও, শনিবার আমাদের আপিসে হাফ-ছুটি। মানে বিকেল চারটে নাগাদ ঝাঁপ পড়ে যায়। কিন্তু মাত্র দুঘন্টার তফাতে পুরো দিনের মধ্যে কেন হাফ-ছুটি বলা হয়, আজ পর্যন্ত  বুঝিনি। তবে ওই দিন চারটে নাগাদ আপিস থেকে বেরিয়ে যে হাঁফ ছেড়ে বাঁচি – সে কথাটা সত্যি। সেদিক থেকে দেখলে কথাটা হাঁফ-ছুটি অর্থাৎ হাঁফ নেওয়ার ছুটি বলাটাই বেশ যুক্তিযুক্ত। সে যাগ্‌গে, আসল কথায় আসি।

এই শনিবার আড়াইটে নাগাদ আমরা তিনজন শীদ্দার চেম্বারে গেলাম একটা আরজি নিয়ে। শীদ্দা, মানে শীতাংশুদা আমাদের কোঅর্ডিনেটর, অর্থাৎ ইমিজিয়েট বস। তিনজনের মধ্যে আমিই নাটের গুরু, তাই চেম্বারে ঢুকে বললাম, “শীদ্দা, আজকে একটু আগে ছেড়ে দেবেন – এই সোয়া তিনটে নাগাদ? আমরা তিনজন নবান্নে যাবো”।

রীতিমতো চমকে উঠে শীদ্দা বলল, “তার মানে? এসব হুজুগ তোদের মাথায় কে ঢোকালো? নিজের পায়ে নিজেই কুড়ুল মারতে চলেছিস – এ আমি বলে দিলাম...। ছুটির তো কোন প্রশ্নই নেই – বরং অফিস কেটে তোরা নবান্ন যাওয়ার হিড়িক তুলেছিস বলে, আমি হেড-অফিসে কমপ্লেন করব। সুখে থাকতে তোদের ভূতে কিলোয় না?”

নবান্নে যাওয়ার কথায় শীদ্দার কেন এত আপত্তি, আমাদের মাথায় ঢুকল না। নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে – আমরা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। শীদ্দা আবার বলল, “আর যদি যেতেই হয়, আজকের দিনের জন্যে ব্যাকডেটে ছুটির দরখাস্ত কর – তিনজনেই। তারপর যেখানে খুশি যা, যা খুশি কর - নবান্ন গিয়ে টিয়ার গ্যাস খা, পুলিশের লাঠির বাড়ি খা, জেলে যা – অফিসের কিচ্ছু যাবে আসবে না। পুলিশ ইনভেস্টিগেট করতে এলে বলব, “তোরা আজ ছুটিতে – ছুটির দিনে কোন এমপ্লয়ি কোথায় কোন অভিযান করছে, তার দায় অফিসের নয়...”।

আমাদের মধ্যে নীলু, মানে নীলকান্ত একটু একরোখা ধরনের। রেগে গেলে বসকেও দু কথা শুনিয়ে দিতে ছাড়ে না। একটু রাগী স্বরে বলল, “শীদ্দা, আপনি কোন নবান্নের কথা বলছেন? আমরা যাব বিজনের গ্রামের বাড়ি...। ওদের ওখানে এই অঘ্রাণের শেষে নতুন ধান ওঠা শুরু হয় – নতুন ধান দিয়ে নবান্ন পুজো হয় – নতুন চালের পিঠে-পুলি পায়েস হয়...। সেখানে টিয়ার গ্যাস খাওয়ার কথা আসছে কোথা থেকে? পুলিশের লাঠিই বা খেতে যাবো কোন দুঃখে?”

এবার শীদ্দার অবাক হবার পালা। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আমাকে বললেন, “বিজন, তোদের গ্রামের বাড়ি কোথায়?”

“গঙ্গার ওপাড়ে...”।

“কিন্তু গঙ্গার ওপাড়েই তো নবান্ন...”।

আমি এতটুকু আমতা-আমতা না করে, দৃঢ় স্বরে বললাম, “আজ্ঞে হ্যাঁ, শীদ্দা - গঙ্গার ওপাড়েই আমতায় আমাদের গ্রামের বাড়ি। এসপ্ল্যানেড থেকে চারটে নাগাদ একটা বাস আছে, সেটা ধরতে পারলে বাড়ি পৌঁছে যাবে সন্ধ্যে নাগাদ। কাল রোববারটা থেকে, সোমবার সকালে আমরা তিনজন সরাসরি অফিসে আসব। তবে সেদিন আসতে একটু দেরি হবে, এই ধরুন এগারোটা...। সেটা বলতে আর পারমিশান নিতেই আপনার কাছে আসা...”।    

শীদ্দা কিছু বলল না, হতবাক মুখে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। একটু পরে আমি আরও বললাম, “সেখানে সব বাড়িতেই এখন নবান্ন উৎসব শুরু হয়েছে। আর শুধু আমাদের ওদিকেই বা কেন? গঙ্গার দুপাড়ের গ্রামে গ্রামে – হিন্দু-মুসলিম সব বাড়িতেই এখন চলছে নবান্ন উৎসব – ঘরে ঘরে নতুন চালের সুবাস। সে চাল এক্কেবারে সেকুলার চাল, শীদ্দা। এই নবান্নে অন্য কোন চাল চলেই না...”।

 --০০— 

এর পরের বড়োদের গল্প - " একটি বাসি এবং বাজে ঘটনা "

সোমবার, ৫ জানুয়ারি, ২০২৬

এক যে ছিলেন রাজা - ৮ম পর্ব

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ " 



[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের সপ্তম পর্ব পড়া যাবে পাশের সূত্র থেকে - "এক যে ছিলেন রাজা - ৭ম পর্ব


১৭ 

অতিথিশালার প্রাঙ্গণে নটী বিদ্যুল্লতার সখিরা নিজেদের মধ্যে খেলায় মগ্ন ছিল। দ্বিতলের গবাক্ষ থেকে নটী বিদ্যুল্লতা ম্লানমুখে তাদের ক্রীড়াকৌতুক দেখছিল। হঠাৎ দূর থেকে অতিথিশালার দিকে মহর্ষি ভৃগু, আর তাঁর দুই সঙ্গীকে আসতে দেখে, সে দ্রুত সদরে নেমে এল। সখিদের সকলকে আদেশ দিল চপলতা ছেড়ে শান্ত হতে। তারপর দরজার সামনে জোড় হাতে মহর্ষির অপেক্ষা করতে লাগল। গৃহে প্রবেশ করতে করতে, মহর্ষি স্মিতমুখে জিজ্ঞাসা করলেন, “কেমন আছিস, মা? মুখটা যেন কিছুটা ম্লান দেখছি”?

নটী বিদ্যুল্লতা কিছু বলল না, প্রথমে মহর্ষিকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল, দুই আচার্যকেও প্রণাম করল। তারপর পুরু মখমলে আবৃত কাঠের উঁচু পৃষ্ঠিকায় আসন গ্রহণ করিয়ে, ইশারায় সখিদের বললেন, পাদ্য আনতে। অন্য আচার্যদের জন্যও আলাদা আসন ও পাদ্যের ব্যবস্থা করল তার দুই সখি। খুব যত্নের সঙ্গে মহর্ষির দুই পা ধুয়ে দেওয়ার পর, নটীবিদ্যুল্লতা তাঁর সুদীর্ঘ বেণী খুলে ফেলে, মুক্ত কেশগুচ্ছ দিয়ে মুছে দিলেন মহর্ষির পা। মহর্ষি স্মিতমুখে নটীবিদ্যুল্লতার মুখের দিকে তাকিয়ে উপভোগ করতে লাগলেন, পদসেবা। দুইপা মুছে দেওয়ার পর, ডানহাতে মহর্ষির বামচরণ স্পর্শ করে, হাঁটু মুড়ে মেঝেয় বসল নটীবিদ্যুল্লতা। বলল, “ভাল আছি পিতা। আপনার কাজ নিয়ে, কটাদিন খুব আনন্দে ছিলাম”অন্য আচার্যদের পদসেবা হয়ে যেতে নটী বিদ্যুল্লতা সকল সখিকে বললেন, অন্যত্র যেতে, আরো বললেন, কেউ যেন এখন এখানে না আসে। সকল সখিরা নিঃশব্দ দ্রুত পায়ে ভেতরে চলে গেল। তাদের চলে যাওয়ার পর, নটী বিদ্যুল্লতা বলল, “পরশু রাত থেকেই  মনটা বড়ো বিষণ্ণ, পিতা”।

“খুবই স্বাভাবিক মা, তুইও তো মানুষ, মন খারাপ হবে বৈকি! আজ রাত্রেই তোদের যদি ফিরে যেতে বলি, পারবি?”

“কেন পারবো না, পিতা? কিন্তু আমার কাজ শেষ হয়েছে কী? তিন মাত্রা প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলেন, আমি মাত্র দুই মাত্রা প্রয়োগ করতে পেরেছি”।

“যথেষ্ট করেছিস মা, বাকিটুকু আমরা সামলে নেব। তোকে আরো কিছু দিন আটকে রেখে, তোকে বিপদে ফেলতে চাই না। কার মনে কী আছে, বলা তো যায় না, মা”!

“ঠিকই বলেছেন, পিতা। মহারাজ বেণের মুখে শুনেছি, উপনগরপাল শক্তিধর আমার এ রাজ্যে হঠাৎ আসার ব্যাপারটা নিয়ে সন্দেহ করেছিলেন!”

“তাই নাকি?” মহর্ষি ভৃগু উদ্বিগ্নমুখে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী বলেছে”?

“উপনগরপাল শক্তিধর, মহারাজ বেণকে বলেছেন, “আমি কার আমন্ত্রণে এ রাজ্যে এসেছি? মহারাজ বেণের আমন্ত্রণে তো নয়! এ রাজ্যে আমার প্রবেশ করার সংবাদ পেয়ে, মহারাজ বেণ আমাকে তাঁর প্রাসাদের অতিথিশালায় থাকার আমন্ত্রণ করেছিলেন এবং আমি সে আমন্ত্রণ স্বীকার করেছিলাম। কিন্তু আমাকে যে বা যারা আমন্ত্রণ করেছিল, তারা আমার খোঁজ করল না কেন? আর আমিই বা তাদের সন্ধান করলাম না কেন?”

চিন্তিত মুখে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “তুই কী উত্তর দিলি, মা?”

ম্লান হেসে নটীবিদ্যুল্লতা বলল, “আমি উত্তর দিয়েছিলাম, 'কারো আমন্ত্রণে নয়, আমি এ রাজ্যে আসছিলাম, তীর্থ দর্শনে। হঠাৎ শুনলাম, আপনি সমস্ত মন্দিরের পুজা অর্চনা বন্ধ করে দিয়েছেন, মন্দির থেকে সকল দেবমূর্তি সরিয়ে ফেলার আদেশ দিয়েছেন। কী করব? উদ্দেশ্যহীন দেশভ্রমণ করব? নাকি নিজ দেশেই ফিরে যাব? এই দ্বিধায় যখন কালাতিপাত করছিলাম, তখনই পেলাম আপনার আমন্ত্রণ'। শঠতা আমাদের পেশা, পিতা”।

মহর্ষি ভৃগু নটীবিদ্যুল্লতার মাথায় হাত রাখলেন, বললেন, “ওভাবে, নিজেকে ছোট করিস না, মা। তোর এইটুকু শঠতা, তোর নিজের স্বার্থে নয়; পুরো এই রাজ্যবাসীর মঙ্গলের জন্যে। বহু মানুষ আছে, যারা শুধুমাত্র নিজের স্বার্থের জন্যে সারাজীবন শঠতা করে চলেছে কিন্তু আর বিলম্ব করিস না, তুই কাল প্রত্যূষেই রওনা হয়ে যাবি, মা। শক্তিধরকে আমাদের নির্দেশ আছে, তোর সঙ্গে যথেষ্ট নিরাপত্তারক্ষী দিয়ে, তোদের এই রাজ্যের সীমানা নিরাপদে পার করে দেবে”।

“তাই হবে, পিতা”।

মহর্ষি ভৃগু উঠে দাঁড়ালেন, বললেন,  “এখন আসি রে। খুব সাবধানে যাস, ভালো থাকিস। নিরাপদে এ রাজ্যের সীমানা অতিক্রম করে, আমাকে বার্তা পাঠাতে ভুলিস না। এদিককার কাজ হয়ে গেলে, তোর পিতার কাছে যাবো, কয়েকদিন থাকবো। তখন দেখা হবে আবার”

নটী বিদ্যুল্লতা চরণস্পর্শ করে প্রণাম করলেন, বললেন, “আপনার আশায় দিন গুনবো, পিতা। দুই আচার্যকেও প্রণাম করে বলল, “আপনাদের সঙ্গে আলাপ হল না, তবে কামনা করি আপনাদের গূঢ় কার্য নির্বিঘ্নে সিদ্ধ হোক”

আচার্য বিশ্ববন্ধু বললেন, “আপনার এই সাহায্যের জন্যে, আমাদের সকল রাজ্যবাসী এবং আমরাও সবাই কৃতজ্ঞ থাকবো”।

“ওকথা বলবেন না, আচার্য। আপনাদের কাজে লাগতে পেরে, আমিই কৃতজ্ঞ আপনাদের কাছে”। জোড়হাতে নটীবিদ্যুল্লতা দাঁড়িয়ে রইলেন, সদর দরজায়, মহর্ষি ও দুই আচার্য পথে নামলেন।

কিছুটা এগিয়ে এসে আচার্য রণধীর জিজ্ঞাসা করলেন, “গুরুদেব, আপনিই কী নটীবিদ্যুল্লতাকে আমন্ত্রণ করেছিলেন?” মহর্ষি ভৃগু উত্তর দিলেন না, মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।

আচার্য রণধীর আশ্চর্য হয়ে বললেন, “কিন্তু আমাদের মন্ত্রণার আগেই আপনি আমন্ত্রণ না করলে, এত তাড়াতাড়ি বিদ্যুল্লতা এখানে পৌঁছালো কী করে?”

মৃদু হাসলেন মহর্ষি ভৃগু, বললেন, “রাজা বেণকে রাজ্যচ্যুত করা নিয়ে, আগে আমার অন্য পরিকল্পনা ছিল। সে পরিকল্পনা অনেক ধীর ও সাবধানী। সেই পরিকল্পনা মতো মাসাধিক পূর্বেই আমি লতার সঙ্গে দেখা করে, সকল কথা বলে, আমাদের আশ্রমে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ বেণের পূজা-অর্চনা বন্ধ করার ঘোষণায়, তোমরা সকলেই যখন উত্তেজিত হয়ে উঠলে, আর আমিও দেখলাম, এই ঘোষণায় সাধারণ রাজ্যবাসীর ওপর প্রভাব হবে ভয়ানক। তখন তোমাদের সকলের সাহা্য্যে আমরা নতুন পরিকল্পনা করেছি”।

“কিন্তু রাজাবেণ যদি নটীবিদ্যুল্লতাকে আমন্ত্রণ না করতেন?”

“বৎস রণধীর, আমার পরিকল্পনা ছিল, আমাদের আশ্রমে কোন নৃত্য-গীত অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, রাজা বেণকে আমন্ত্রণ করবো। আমার ধারণা, সেখানে দুজনের পরিচয় ও মুগ্ধতা হতোই এবং তারপর শুরু হতো লতার কাজ। কিন্তু রাজাবেণ নিজের দুর্ভাগ্যকে নিজেই আমন্ত্রণ জানিয়ে বসল, আর অনেক সহজ হয়ে গেল আমাদের দুজনেরই কাজ”। অদূরেই রাজা বেণের প্রাসাদ ও তার সামনে লোকজন দেখে মহর্ষি ও আচার্যরা এই আলোচনা বন্ধ করলে।। 

অতিথিশালা থেকে ওঁদের বের হতে দেখে উপনগরপাল শক্তিধর এগিয়ে এল, বলল, “পিতা আসছেন, মহর্ষি। তিনি বলে পাঠিয়েছেন, আপনি দয়া করে যদি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন”।

সম্মতি জানিয়ে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “আমি আছি, বৎস। আর নটীবিদ্যুল্লতাকে আমি বলে এসেছি, কাল প্রত্যূষে নগর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্যে। তোমার আয়োজনও, নিশ্চয়ই সম্পূর্ণ করে ফেলেছ, বৎস?”

“আমার আয়োজন সম্পূর্ণ, মহর্ষি। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন আগামী দশদিনের মধ্যে নটীবিদ্যুল্লতা নিরাপদে আমাদের রাজ্যসীমা ছেড়ে ওঁর নিজরাজ্যে প্রবেশ করে যাবেন”।

“অতি উত্তম। এবার বলো তো, বৎস, রাজমাতার সংবাদ কী?”

“রাজমাতা...রাজমাতার কোন সংবাদ তো জানি না, মহর্ষি। আমরা রাজাবেণকে নিয়েই অত্যন্ত ব্যস্ত”!

“ও, তাই বুঝি? একমাত্র পুত্রের এই ভয়ানক অসুস্থতার বার্তা তিনি জানেন? একবারও দেখতে আসেননি”?

“প্রাসাদের মধ্যে থেকে বার্তা পাননি এমন হতে পারে না। তবে এই কদিনে তাঁকে দেখিনি, মহর্ষি”।

“অতি উত্তম, বৎস শক্তিধর। রাজমাতাকে তাঁর একমাত্র পুত্রের অসুস্থতার সংবাদ দেওয়াটা তোমার প্রশাসনিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে না আশা করি”!

মাথা নত করে, কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল উপনগরপাল শক্তিধর, তারপর পিছনে দাঁড়ানো দুই সহকারীকে বলল, “শুদ্ধনীল, সুপ্রকাশ, তোমরা এখনই যাও। রাজমাতার সংবাদ নিয়ে এসো। তাঁকে বলবে রাজাবেণ অসুস্থ, তিনি যদি রাজাকে দেখতে যেতে চান, আমরা সব ব্যবস্থা করে দেব”।

মহর্ষি ভৃগু অত্যন্ত উষ্মা ভরে বললেন, “বৎস শক্তিধর, তোমার এই অনুগ্রহের এখন আর কোন প্রয়োজন দেখি না। পুত্র রাজা হলেও মাতার কাছে সে পুত্রই থাকে। তাঁকে সংবাদ দেওয়ার জন্য তুমি না যেতে পারো, আমি যাচ্ছি। আর পুত্রকে দেখার জন্য তাঁকেও তোমার অনুমতির অপেক্ষা করতে হচ্ছে, এই বার্তায় আমি কিন্তু স্বস্তি পাচ্ছি না। ছোট্ট এই প্রাসাদের প্রশাসনেই, তোমার কর্তব্য-অকর্তব্যের বোধ স্পষ্ট নয়। অতএব সমগ্র রাজ্যের ক্ষেত্রে তোমাদের কী চিন্তাধারা সে কথা সহজেই অনুমান করা যায়। আমি এখনই রাজমাতার দর্শনে যাচ্ছি। তোমার কিংবা তোমার প্রশাসনের যদি কোন আপত্তিও থাকে, আমি সেই আপত্তি অস্বীকার করছি। এর জন্য তোমার প্রশাসন যা শাস্তি বিধান করবে, তার জন্যে আমি প্রস্তুত থাকবো”।

“প্রশাসনের কোন আপত্তি থাকতে পারে না, মহর্ষি। আপনি রাজামাতার দর্শন করতেই পারেন। আর আমাদের কর্তব্যে এই অবহেলার জন্যে আমি ক্ষমা চাইছি, মহর্ষি”।

“দোষ তোমার নয়, বৎস শক্তিধর। দোষ তোমাদের ঔদ্ধত্যের, তোমাদের অহঙ্কারের। অযোগ্য হাতে ভাগ্যক্রমে অতিরিক্ত ক্ষমতা এসে গেলে এমনই হয়”মহর্ষি ভৃগু আচার্য বিশ্ববন্ধু ও রণধীরকে অপেক্ষা করতে বলে, দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেলেন রাজমাতার প্রাসাদের দিকে। মহর্ষি ভৃগুকে এতটা বিচলিত ও ক্রুদ্ধ হতে কোনদিন দেখেননি আচার্য বিশ্ববন্ধু ও রণধীর। তাঁর নীরবে তাকিয়ে রইলেন শক্তিধরের দিকে। 

রাজাবেণের অসুস্থতার পর সব কিছুই যেন বদলে যাচ্ছে, মুঠিতে চেপে ধরতে যাওয়া শুষ্ক বালুর মতো, আঙুলের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে পরিস্থিতি। রাজাবেণের ছায়ায় দৃঢ় আত্মবিশ্বাসে তিনি যে উপনগরপালের পদ সামলাচ্ছিলেন, খুব দ্রুত সেই আত্মবিশ্বাসে ভাঙন আসছে। তার সহকারি এমনকি অধস্তন কর্মচারীদের চোখেও তিনি যেন আর সেই ভয় আর সম্ভ্রম দেখতে পাচ্ছেন না। আর ভয় চলে গেলে রাজ্য শাসনের রইল কী? বিষণ্ণ মুখে তিনি আচার্য বিশ্ববন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনার কী মনে হয়, আচার্য, রাজাবেণ কতদিনে সুস্থ হয়ে উঠবেন?”

“চিকিৎসাশাস্ত্রে আজকাল প্রভূত উন্নতি হয়েছে, একথা সত্যকিন্তু কোন চমৎকার করার সাধ্য এখনও আয়ত্তে আসেনি, বৎস শক্তিধর। সে করতে পারেন একমাত্র ঈশ্বর। কিন্তু তোমরা তো আবার ঈশ্বরে বিশ্বাস করো না। তাঁর সমস্ত উপাসনা বন্ধ করে দিয়েছো। ভেঙে ফেলেছ যাবতীয় দেব-দেবীর প্রতিমা। অতএব আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের ওপর আস্থা রেখে ধৈর্যধারণ ছাড়া আর তো কোন উপায় দেখি না”। 

১৮

মহিষীভবনে রাজমাতার ঘরের বাইরে দাসী পদ্মবালার সঙ্গে দেখা হল মহর্ষি ভৃগুর। তাঁকে দেখে দাসী পদ্মবালা প্রণাম করে বলল, “সেই এলেন ঠাকুর, কদিন আগে এলেন না? একটু অপেক্ষা করুন ঠাকুর, রাজকুমারীকে সংবাদ দিই”।

মহর্ষি সামনের অলিন্দে অপেক্ষা করতে লাগলেন। তাকিয়ে রইলেন প্রাঙ্গণের উদ্যানের দিকে। দ্বিপ্রহরের প্রখর রৌদ্রধারায় স্নান করছে, গাছপালা, লতাগুল্ম, ঘাস, ফুল। ঝাঁকড়া এক বকুল গাছের ছায়ায় একটি ময়ূর আর তিনটি ময়ূরী বসে আছে। মাঝে মাঝে সেই ময়ূর তীক্ষ্ণস্বরে ডেকে উঠছে “কে ও, কে ও, কে ও”?

“মহর্ষিঠাকুর, আপনি এসেছেন? কী সৌভাগ্য আমার”? রাজমাতার কণ্ঠ শুনে, মহর্ষি ফিরে তাকালেন এবং গৃহের দরজায় রাজামাতাকে দেখে চমকে উঠলেন। এ কী চেহারা হয়েছে মহারাণি এবং রাজমাতা সুনীথার? সেই দৃপ্ত, গর্বোদ্ধত সুন্দর শরীর ও মুখশ্রী, বয়েসের সঙ্গে, দিন-দিন আরও যেন মহিমান্বিত হয়ে উঠছিল! আজ সেই শরীর কিছুটা যেন ন্যুব্জ, শীর্ণ চেহারা। রক্তশূণ্য ফ্যাকাসে মুখের ত্বকে জরার নিষ্ঠুর আঁচড়। কোটরের মধ্যে অত্যন্ত ক্লান্ত দুই চক্ষুর চাহনি। দীর্ঘ প্রসাধনহীন এলোমেলো রুক্ষ চুল। পরনে একদা মহার্ঘ একটি শাড়ি, এখন দীর্ণ, বিবর্ণমহর্ষি কিছু বললেন না, দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

রাজমাতা ঘরের মধ্যে ডেকে, মহর্ষিকে কাঠের উঁচু আসনে বসালেন, সে আসন জীর্ণ, মলিন বস্ত্রে ঢাকা। মহর্ষি সেই আসনে বসার পর, রাজমাতা প্রণাম করলেন, তারপর অন্য একটি আসনে বসে, অত্যন্ত ক্ষীণ স্বরে বললেন, “মহারাজ অঙ্গ চলে যাওয়ার পর, আমি আপনারই শরণাপন্ন, মহর্ষিঠাকুর। আমি জানি অজস্র ব্যস্ততায় আপনি জড়িত। কিন্তু যখনই খুব অসহায় আর বিপন্ন বোধ করি, আপনাকে স্মরণ করি”।

মহর্ষি শান্তমুখে তাকিয়ে রইলেন, রাজমাতা সুনীথার মুখের দিকে, বললেন, “আমিও কখনও আপনার আদেশ অমান্য করিনি, মহারাণি। কিন্তু কিছুদিন আগে আপনি যখন আমায় ডেকে পাঠিয়েছিলেন, আমি আসিনি। তখন যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল, আমি এলে আপনি বিপন্ন হতেন। তবে...” দীর্ঘশ্বাস ফেলে, একটু দ্বিধার সঙ্গে মহর্ষি আবার বললেন, “...তবে আপনার এই অসহায় অবস্থার কথা আমি জানতাম না, মহারাণি। মাত্র এই কয় মাসে আপনার এই বিপর্যয়, আমি কল্পনাও করতে পারিনি”। মহারাণি সুনীথা হাসার চেষ্টা করলেন, মুখে হাসি ফুটল না, আরও করুণ দেখাল।

হাতের আঙুলের অমার্জিত নখের কালচে ময়লা দেখতে দেখতে, মহারাণি সুনীথা বললেন, “এ সবই আমার অধর্মের শাস্তি, মহর্ষি! আপনারা ধর্ম পথের দিশারি - আপনি, মহারাজ অঙ্গ। মহারাজ অঙ্গ যতদিন আমার সঙ্গে ছিলেন, তাঁর মহারাণি হয়ে, আমিও মহিমময়ী ছিলাম। আর আজ? আমার পুত্র রাজাবেণ আর আমি রাজমাতা...প্রতিটি ক্ষণে ধ্বংসের পথে দৌড়ে চলেছি, উন্মাদের মতো”!

মহারাণির পিছনে দাসী পদ্মবালা দাঁড়িয়েছিল, সে বলল, “রাজকুমারী, তুমি নিজেই নিজেকে ধ্বংস করে চলেছ। আহার প্রায় ত্যাগ করেছ, চোখে নিদ্রা নেই, প্রসাধন নেই, এতটুকু বিনোদন নেই। মহর্ষিঠাকুর, রাজকুমারীর এখন সর্বদা একটাই চিন্তা। এত লোকের অভিশাপ, এত লোকের দীর্ঘশ্বাস, এত অসহায় মানুষের আর্ত অশ্রুআমি বলি, সকালে বিকালে প্রাসাদের উদ্যানে চলো, সরোবরের তীরে গিয়ে একটু বসো। মনটা হাল্কা হবে”।

মহর্ষি ভৃগু বললেন, “পদ্মাদেবী সঠিক বলেছে, মহারাণি। সারাদিন ঘরে বসে অলস মস্তিষ্কের চিন্তায়, কেন নিজেকে আরো বিপন্ন করে তুলছেন? আপনার দায়িত্ব তো শেষ হয়ে যায়নি! এখনো অনেক কাজ যে আপনার বাকি রয়ে গেছে!”

অবাক দুই ম্লান চোখ তুলে রাজমাতা সুনীথা বললেন, “আমার দায়িত্ব? কী কাজ আর আমার করার আছে, মহর্ষিঠাকুর?”

“আপনার পুত্র রাজাবেণ অসুস্থ, শুনেছেন তো?”

রাজমাতার মুখ আরও মলিন হল, বললেন, “শুনেছি। পদ্মবালা সেই রাত্রেই সংবাদ দিয়েছিল। পদ্মবালা আরও বলল, কাউকেই দর্শনের অনুমতি দিচ্ছে না। রাজবেণের পক্ষে কোন রকম উত্তেজনাই নাকি বাঞ্ছনীয় নয়”

“সেই শুনে আপনি গেলেন না? আপনি মাতা পুত্রের সেবার অধিকার আপনার থেকে আর কার বেশি হতে পারে, মহারাণি?”

পদ্মবালা বলল, “না মহর্ষিঠাকুর, তা নয়। এই ঘটনার পক্ষকাল আগে, আমি আর রাজকুমারী, মহারাজ বেণের কক্ষে গিয়েছিলাম। রাজকুমারী কিছু অভিযোগ নিয়ে গিয়েছিল প্রতিকারের জন্যে...”।

“কিসের অভিযোগ”?

“এই যে চারদিকে নানান অত্যাচার, অনাচার হচ্ছে, রাজকুমারীর তাতে সায় নেই, এ কথা জানাতে। আর বিহিত চাইতে। কিন্তু মহারাজা বেণ যে ব্যবহারটা করল, সে আর বলার কথা নয়...”

“তুই থাম তো, পদ্মবালা। ওসব কথা আমি কবেই ভুলে গেছি। এখন আর ওসব কথায় আমার কী কাজ? ও এখন বড়ো হয়েছে, দেশের রাজা হয়েছে, যা ভাল মনে হয় করেছে...আমার কী?”

“তাই বই কী? সেই দিন থেকেই তোমার এই পাগলপারা অবস্থা। সে কেন, সে কী আর আমি বুঝিনা, রাজকুমারী? আমার কাছে লুকোবে? তোমাকে আমি সেই এতটুকু বয়েস থেকে কোলে পিঠে মানুষ করেছি, ভুলে যেও না রাজকুমারী”।

“বাজে বকিস না। কিচ্ছু হয়নি আমার, আমি দিব্যি আছি। তোর যতো উদ্ভট মনগড়া চিন্তা আর ভাবনা...”পদ্মবালা আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল, মহর্ষি হাতের ইশারায় তাকে থামতে নির্দেশ দিলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন, তাঁর সামনে মহারাণি সুনীথার এই মানসিক অসহায়তার উন্মোচন, আরও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। মহারাজ অঙ্গের মহারাণি হিসাবে তিনি ছিলেন সমস্ত রাজ্যবাসীর মাতা। প্রজাদের মঙ্গল-অমঙ্গল, সুখ-দুঃখের অংশভাক্‌ হয়ে তিনি উদারতার মহিমায় অধিষ্ঠিতা ছিলেন। এখন তিনি রাজমাতা হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সব হারিয়ে তিনি এখন নিঃসহায় পরিত্যক্তা, চূড়ান্ত অপ্রাসঙ্গিক। মহর্ষি ভৃগু উপলব্ধি করলেন এই নারীর দুর্বিষহ মানসিক যন্ত্রণা

তিনি খুব শান্ত স্বরে বললেন, “আপনি এইভাবে নিশ্চেষ্ট থাকতে পারেন না, মহারাণি। রাজাবেণকে আমি এখনই দেখে এলাম, তিনি গুরুতর অসুস্থ, অবস্থা সংকটজনক। ভিষক রয়েছেন, সেবক-সেবিকা সবাই রয়েছেন। কিন্তু মায়ের সেবার কাছে সে সব কিছু না। মা ছাড়া জগতে এমন কেউ আর আছে, যে এত নিবিড়ভাবে পুত্রের প্রিয়-অপ্রিয়, ভালো-মন্দ বুঝবে? নিয়মিত চিকিৎসার সঙ্গে মায়ের সেবা পেলে রাজাবেণের সুস্থ হওয়াটা শুধু সময়ের অপেক্ষা”।

মহর্ষি ভৃগুর এই কথায় মহারাণি সুনীথার বিষণ্ণ চোখেও এখন যেন আশার আলো জ্বলে উঠল! তাঁর মনের সমস্ত বেদনা, যন্ত্রণা আর অভিমান, বাঁধভাঙা অশ্রু হয়ে নামতে লাগল দুই চোখ বেয়ে। পদ্মবালার দুই চোখও জলে ভরে উঠল। রাজকুমারী সুনীথা এবং রাজাবেণ, দুজনেই তার বুকের পাঁজর, ওদের এই বিচ্ছেদ, তার মনেও এনেছিল অশান্তির ঝড়। মহর্ষি ভৃগু বেশ কিছুক্ষণ সময় দিলেন, তাকিয়ে রইলেন মহারাণি সুনীথার মুখের দিকে। মহারাণির এই নিঃসংকোচ অভিভূত অশ্রুপাতে তিনি নিশ্চিন্ত হলেন।

মহর্ষি ভৃগু বললেন, “মহারাণি, আপনি এই রাজ্যের রাজ্যলক্ষ্মী, সকল প্রজার মাতা। মহারাজা বেণ যতদিন রাজ্য পরিচালনায় সক্ষম না হতে পারছেন, আপনার পরামর্শ এবং নির্দেশ মেনে, মহারাজ অঙ্গের প্রাজ্ঞ মন্ত্রীগণ, অমাত্যগণ এবং নগরপাল সমবেতভাবে রাজ্যের প্রশাসন পরিচালনা করুন। আমার মনে হয় না, তাঁদের মতো নির্ভরযোগ্য এবং বিশ্বস্ত এই রাজ্যে আর কেউ আছেন”।

মহারাণি কান্নাভেজা চোখ তুলে, রুদ্ধস্বরে বললেন, “আর আপনি”?

মৃদু হেসে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “আমি? আমি রাজ্য পরিচালনার কী বুঝি, মহারাণি? আমি বুঝি জপ-তপ-যজ্ঞ-পুজা আর অধ্যয়ন। আমি চিরকাল মহারাজ অঙ্গের অন্তরঙ্গ অনুগ্রহ পেয়েছি, আজ থেকে আপনার অনুগ্রহও যদি পাই, ব্যস্‌, সেইটুকুই আমার কাছে যথেষ্ট”। মহারাণি সুনীথার মুখে এখন মৃদু হাসি, তিনি তাকিয়ে রইলেন মহর্ষির মুখের দিকে!

মহর্ষি ভৃগু এবার উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, “মহারাণি আপনি প্রস্তুত হোন, এখনই আপনাকে পুত্রের কাছে যেতে হবে। দেবীপদ্মবালা, মহারাণিকে যথাযোগ্য পরিধানে, অতি দ্রুত সাজিয়ে তোল। মহারাণির মর্যাদা রাখার দায়িত্ব তোমারও। মহারাণি, এক দুদিন আপনাকে হয়তো যাওয়া-আসা করতে হবে, তারপর রাজাবেণের অবস্থা বিচার করে, তাঁকে আপনার ভবনেই নিয়ে আসার ব্যবস্থা করবেন তাতে আপনার ও রাজাবেণ দুজনরেই সুবিধা হবে। এখন আসি। কিন্তু আপনারা বিলম্ব করবেন না”। মহারাণি তাঁর কাঠের আসন থেকে নেমে ঘরের মেঝেয় বসলেন, তারপর নিজেকে উজাড় করে, দুই চোখের জলে সিক্ত করে তুললেন মহর্ষির দুই চরণ।

মহর্ষিকে ছাড়তে বাইরের অলিন্দ পর্যন্ত এগিয়ে এল দাসী পদ্মবালা। মহিষীভবনের দরজা পর্যন্ত এসে, নীচু হয়ে বসে প্রণাম করল মহর্ষি ভৃগুকে। তারপর বলল, “আমরা রাজা অধর্মের প্রজা। এতদিন যে আপনাকে দেখেছি, মনে হত আপনি জাদুকর। আজ আমার সে ভুল ভাঙলো, আপনিই করুণাময় মহান ঈশ্বর! আপনি রুদ্ধ নদীতে স্রোত সঞ্চার করতে পারেন, আপনি অবসন্ন প্রাণে স্পন্দন জাগিয়ে তুলতে পারেন”!

ডানহাত তুলে আশীর্বাদের ভঙ্গি করে, মৃদু হাসলেন মহর্ষি ভৃগু। তারপর পাথর বাঁধানো পথে পা রাখলেন।

পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " এক যে ছিলেন রাজা - ৯ম পর্ব "






রবিবার, ৪ জানুয়ারি, ২০২৬

নবীন বরণ

 






এর আগের পর্ব পড়ে নিন এই সূত্র থেকে - ফাস-ক্লাস সিটিজেন


পরের দিন সকালে ক্লাসে গিয়ে অন্য সহপাঠীদের থেকে যা শুনলাম – তাতে হস্টেলের ভাষায় “ইয়ে” রগে উঠে যাবার যোগাড়! মারধোর আর নানান শারীরিক অত্যাচারের ফলে অনেকেরই সারা গায়ে ব্যথা। ফলে সকলেরই মুখে চোখে আতংক – আজ রাত্রে আরও কি ঘটবে, আর কতদিন চলবে র‍্যাগিং নামক এই সম্বর্ধনা?

তাদের মুখে শারীরিক অত্যাচারের যে নমুনা শুনলাম, “আমাকে বলল - অ্যাই ছানা, হামাগুড়ি দিয়ে খাটের নীচে ঢুকে পড় – ঢুকলি শুয়োরের বাচ্চা, কি করব ঢুকলাম, তারপর বলল – পিঠে করে খাটটা তুলে ফেল। তাও তুলে ফেললাম। তারপর কি করল জানিস, কম করে চার পাঁচজন হবে - লাফাতে লাগল আর নাচতে লাগল খাটের ওপর দাঁড়িয়ে। পারা যায় নাকি? আমি খাটটা মেঝেয় নামিয়ে দিলাম। তাতে একজন খাট থেকে নেমে এসে নীচু হয়ে বসে বাপ মা তুলে কাঁচা দিল – আর তার সঙ্গে কাঠের টি দিয়ে খোঁচা। বলল – আমরা নৌকো চড়া প্র্যাক্টিস করছি দেখছিস না? খাটের পায়া মেঝেয় ঠেকলে পিঠের চামড়া গুটিয়ে দেব, শালা। প্রায় ঘন্টাখানেক চলল এরকম। সারা গায়ে অসহ্য ব্যথা। দু কাঁধে আর পিঠে অসহ্য যন্ত্রণা। শালা, দু একদিন এরকম দেখবো, এরকম চললে কেটে পড়ব – দরকার নেই ইঞ্জিনীয়ারিং পড়ে। তবে হ্যাঁ যাবার আগে দুটোর মাথা আমি ফাটিয়ে যাবো, দেখে নিস”।

এরকম মারাত্মক র‍্যাগিং যেমন ছিল, তার সঙ্গে ছিল কিছু বিরক্তিকর ক্লান্তিকর র‍্যাগিংও, হস্টেলের ভাষায় বলত টেকনিক্যাল র‍্যাগিং। টেকনিকাল র‍্যাগিং যারা করত, তারা নিজেদের উচ্চস্তরের বুদ্ধিমান জীব হিসেবে ভীষণ শ্লাঘা অনুভব করত। মারকুটে র‍্যাগারদের আড়ালে তারা খুব তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করত।

বিশ ফুট বাই পনের ফুট একটা রুমের দৈর্ঘ, প্রস্থ আর উচ্চতা মাপার জন্যে দিত একটা পাঁচপয়সার কয়েন। কয়েনের ইউনিটে মেপে দিতে হবে ঘরটি। দৈর্ঘ প্রস্থ তাও ঠিক আছে, উচ্চতা মাপাই ছিল মারাত্মক বিপজ্জনক। তারা দেখত আর হ্যা হ্যা করে হাসত আমাদের দুর্গতিতে।

অথবা একটা কাল্পনিক মাছি, অবাধ্য আর চঞ্চল সেই কাল্পনিক মাছিটি ঘরের এক দেয়াল থেকে বিপরীত দেওয়ালে উড়ে যাবে বারবার। সেই কাল্পনিক মাছিটিকে ধরার জন্যে আমাদের ঘরের মধ্যে দৌড়ে যেতে হবে ঘন্টার পর ঘন্টা – আর দেয়ালের কাছে গিয়ে মক্ষিশিকারের অভিনয় করে বলতে হবে – “যাঃ শালা, ফস্কে গেল”।

দিনের পর দিন এইরকম পরিস্থিতিতে আমাদের মনে জমে উঠতে লাগল অবসাদ আর বিতৃষ্ণা। অনেকে চূড়ান্ত হতাশায় পড়া ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছিল। অনেকের মনে জমে উঠছিল ক্ষোভ আর রাগ, তারা বলত – দাঁড়া না, কিছুদিন যাক, এমন ক্যালান ক্যালাবো না, বাপের নাম খগেন করে ছেড়ে দেব, শালা।

এই র‍্যাগিংয়ের সময় আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। টুকটাক র‍্যাগিং প্রায় সবাই করলেও, বেশ কিছু ছেলে আছে যারা র‍্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে। সত্যি বলতে অসহ্য মারধোরের র‍্যাগিং করতে আসত, কতিপয় হাতে গোনা কিছু ছেলে। তাদের খপ্পর এড়িয়ে চলতে পারলে, হস্টেলের র‍্যাগিং ব্যাপারটা খুব একটা মারাত্মক ছিল না। তার ওপর আমার ভাগ্যটা ছিল অত্যন্ত সুপ্রসন্ন। র‍্যাগিং-বিরুদ্ধ বেশ কিছু ছেলের সুনজরে চলে আসাতে, তারাই আমায় বেশ বাঁচিয়ে দিত বার বার। তাদের মধ্যে যাদের নাম না করলেই নয়, অজয় গাঙ্গুলি (সিভিল৮২), বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য (মেক. ৮২), সুশোভন ভট্টাচার্য (মেক.৮২), উৎপল দাস (সিভিল.৮২), অরিজিৎ চৌধুরি (ইলেক. ৮২), সঞ্জীব সরকার (ইলেক. ৮২), আশিষ বিশ্বাস (সিভিল ৮২), সৌমিত্র বসাক (সিভিল ৮২) প্রমুখ। সুশোভনদার ব্যাপারটা বোঝা যায়, কারণ আমি তখন সুশোভনদার পাড়াতেই শ্রীগোপাল মল্লিক লেনে থাকতাম, কিন্তু বাকিরা কেন আমাকে ভালোবেসে ফেলেছিল, আজও ভাবলে কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে ওঠে। অজয়দার সঙ্গে অনেক বছর পরে কলকাতায় আবার কর্মসূত্রে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে উঠতে যাচ্ছিল, কিন্তু কোহিমা থেকে কলকাতা ফেরার পথে অজয়দার প্লেন ক্র্যাশ হয়ে যাওয়াতে, অজয়দা চলেই গেল অন্যলোকের যাত্রী হয়ে। অজয়দার সেই অসময়ের মৃত্যুটা আজও ভীষণ নাড়া দিয়ে যায়, অজয়দার কথা মনে পড়লে।

একবার আমাদের কাছে আগে থেকেই খবর এসেছিল, আজ রাত্রে “উদুম ক্যালানো” হবে ছানাদের। আমি ও আমার স্কুলের এবং এই কলেজের অভিন্নহৃদয় সহপাঠী-বন্ধু দেবপ্রিয় সেন (মেক.৮৩) ক্লাস শেষে, হস্টাইল হস্টেলে না ফিরে, কলেজ থেকেই পালালাম জলপাইগুড়ি শহরে। এর আগে কলেজে ভর্তি হবার সময় দুদিন রুবি বোর্ডিংয়ে থাকতে হয়েছিল। এবারও দুজনে উঠলাম রুবিতে। সঙ্গে ব্যাগ ট্যাগ কিচ্ছু নেই, দুজনে হাতে খাতা নিয়ে যখন রুবি বোর্ডিংএর রিসেপশানে পৌঁছে, আমরা রাত্রে থাকার জন্যে ঘরের কথা বললাম, কাউন্টারের ভদ্রলোক চোখ তুলে তাকালেন। কিছু বলতে হল না, তিনি নিজে থেকেই বলে গেলেন, “ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজ? ফার্স্ট ইয়ার? খুব র‍্যাগিং হইতাসে? কলকাতা থেকে আইসা হেই ছেলেগুলা এই সব কইরা কী যে উল্লাস পায়, বোঝন যায় না...”। রুম মিলল এবং রাত্রে মুগের ডাল, ঝুরঝুরে আলুভাজা আর ফুলকপি-আলুর তরকারি দিয়ে একপেট গরম ভাত খেয়ে বড়ো শান্তি পেলাম। খাওয়ার পর মৌরি মুখে দিয়ে, আমরা দুই বন্ধু সদর দরজায় দাঁড়িয়ে জলপাইগুড়ি শহরের শীতের নির্জন রাস্তার শোভা দেখছিলাম, ম্যানেজার মশাই কাছে এসে বললেন, "ঘরে ঢুইক্যা শুইয়া পড়েন গিয়া, আধা ঘন্টা আগে, আপনাগো কলেজের চার জন আইছিল, জিগাইছিল আমাগো কলেজের ছানা হেখানে কেউ আসে নাকি? আমি মিথ্যা কইরা কইলাম, না তো! আপনাগো অরা ছানা কয় নাকি? খি জ্বালাতন কন দিকি?’

মাস দেড়েক এইরকম সদা আতঙ্কময় বিভীষিকা সহ্যের পর ঘোষণা হল র‍্যাগিং পিরিয়ডের সমাপ্তি আর ফ্রেশার্স ওয়েলকামের বহুল কাঙ্খিত দিন। আমরা হাঁফ ছেড়ে দিন গুনতে লাগলাম। আর যেসব মর্বিড, বিকৃত সিনিয়ররা অসীম আনন্দ পাচ্ছিল র‍্যাগ করে, তারা দ্বিগুণ উৎসাহে উঠে পড়ে লেগে পড়ল শেষ কটা দিনের সদ্ব্যবহার করার জন্যে। 

সে যাই হোক যে কোন দুঃখ রাত্রির শেষে যেমন ঘটে যায় নূতন সূর্যোদয়, ঠিক সে ভাবেই শেষ হয়ে গেল আমাদের র‍্যাগিং পিরিয়ড। এসে গেল ফ্রেসার্স ওয়েলকাম – নবীন বরণ অনুষ্ঠানের দিন। অর্থাৎ ওইদিন আমরা সকলে ছানা থেকে পোনায় উত্তরিত হবো। সেদিন কলেজে হাফছুটি, বিকেল থেকেই সাজসাজ হস্টেলে। রঙিন কাগজের শিকলি, আর কাগজের নানান ফুল দিয়ে সেজে উঠতে লাগল হস্টেলের কমনরুম। কমনরুমের স্টিরিও রেকর্ড প্লেয়ারে চলছে উচ্চৈঃস্বরে গান – সে আওয়াজে কান পাতা দায়।

সূর্য পাটে নামার আগেই শুরু হয়ে গেল নেশার আয়োজন। সেখানে তরল আছে যেমন, তেমনই আছে শুষ্ক নেশার যোগাড়। যে যেমন রসের রসিক রসগ্রহণ করে রঙীন হয়ে উঠতে কোন বাধা নেই। যারা অতিরিক্ত নেশায় স্খলিতচরণ অথবা বিগতচেতন, তাদের প্রতি সকলে সহানুভূতিসম্পন্ন ও তারা বিশেষ আদরণীয়। বরং যারা ও রসে বঞ্চিত তারাই যেন অপাংক্তেয় এই অনুষ্ঠানে। কাজেই হাই ভোল্টেজ গানের সুরে, মাতাল যুবকের উদ্দাম নৃত্য আর চিৎকার শুরু হল। শব্দ, দৃশ্য আর গন্ধ দূষণের সে এক অদ্ভূত আয়োজন। পাকিস্তানের অনাবাসী ও লণ্ডন নিবাসী গায়িকা নাজিয়া হাসানের হিট গান “ডিসকো দিওয়ানে এ এ এ, আহা, আহা...” গমগমে উচ্চস্বরে বাজতে লাগল বারবার, লাগাতার। ্মাঝে মাঝে "বাংলায় ফিরে এস বাওয়া" ভাবনা থেকে বেজে উঠছিল, কিশোরকুমারের "ও আমার সজনি গো, কেন আছ দূরে দূরে..."।     

রাত্রি সাড়ে নটায় হস্টেলের ডাইনিং হলে ঘন্টা বেজে উঠল। আজ স্পেশাল মেনু, গ্র্যাণ্ড ফিস্ট। নিত্যদিনের খুব সাধারণ, স্বাদ-বর্ণ-গন্ধহীন রান্নার নিয়মরক্ষার পরিবর্তে আজ একদম অন্যরকম ভূরি ভোজ আহারের বন্দোবস্ত। যে রন্ধনকারী আশ্চর্য নিপুণ দক্ষতায় প্রত্যেকদিন স্বাদহীন ডাল ও তরকারি রান্না করত, আজ গ্র্যাণ্ড ফিস্টের দিনে সেই রন্ধনকারীই এত উত্তম স্বাদের সব পদ কিভাবে পরিবেশন করত সেও কম আশ্চর্য ব্যাপার নয়।

গ্র্যাণ্ডফিস্টে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে আমরা এবার জড়ো হলাম হস্টেলের সামনের মাঠে। পাশাপাশি দুটি হস্টেলে নবীনবর্ষের ছাত্রদের মধ্যে হবে প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতার বিচারক আমাদের সিনিয়ররা - প্রতিযোগিতা শেষে সফল প্রতিযোগীকে দেওয়া হবে পুরষ্কার, তার মাথায় তুলে দেওয়া হবে সেরার শিরোপা। প্রতিযোগিতার বিষয় – গালাগালি - চালু ভাষায় যারে কয় খিস্তি। সেও সাধারণ নয়, সে গালাগালি হতে হবে একদম অভিনব এবং অশ্লীলতম – তবেই মিলবে সেরার শিরোপা! রাত্রি এগারোটার পর কলেজ ক্যাম্পাসে নিয়মিত পাওয়ার কাট হত তখন। এগারোটার পরই শুরু হল সেই অদ্ভূত প্রতিযোগিতা – অন্ধকারে অন্ততঃ মুখগুলো দেখা যাবে না, কিছুটা হলেও রক্ষা হবে চক্ষুলজ্জা!

এসব মিটে যাওয়ার পর হস্টেলের স্বাভাবিক ছন্দে অভ্যস্ত হতে লাগল আমাদের জীবন যাত্রা। র‍্যাগিং পিরিয়ডের আতঙ্কের দিনগুলি পার করে এসে আমাদের উপলব্ধিতে এলো এক আমূল পরিবর্তন। অনুভব করলাম এই মাস দেড়েকে অনেকটাই বদলে গিয়েছে আমাদের মানসিক চরিত্র। আমাদের মুখের ভাষায় বাসা বেঁধেছে অশ্লীল লব্জ, অশ্লীল কথাবার্তা ও আলোচনায় বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই আর!

সারা দিন রাত পরিবারের বাঁধনহীন সীমাছাড়া স্বাধীনতা। কার্যত সে স্বাধীনতাও প্রায়শঃ উচ্ছৃঙ্খল ও দায়িত্বজ্ঞানহীন। অনেকে সীমাহীন নেশায় আসক্ত হল। কেউ কেউ আসক্ত হতে থাকল অসামাজিক ব্যাভিচারে। কয়েকজন আসক্ত হল নিরলস পাঠে। আর আমরা আসক্ত হলাম নিরঙ্কুশ আড্ডা আর সিনেমায়, লেখাপড়ার সঙ্গে সংযোগ রইল নামমাত্র।


এর পরের পর্ব - " খাইদাই গানগাই

শনিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২৬

অনেক কিছু পাওয়া

ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট " 


 এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প  - " অস্ত্রের ঝংকার "

তোয়ার ঘুম ভেঙেছে একটু আগে। বাবা মাঝে মাঝে বলেন, “আর্লি টু বেড আর আর্লি টু রাইজ, মেক্স আ ম্যান হেলদি এণ্ড ওয়াইজ।” ক্লাস টুতে পড়া তোয়া ইংরিজি ওই শব্দগুলোর মানে জানে, আর তার ঠাম্মি এ ছড়াটার যে বাংলা করেছে, সেটা আরো বেশী মজার!

“তাড়াতাড়ি করলে ঘুমু, ঠাম্মা দেবে অনেক চুমু 

উঠে পড়ো থাকতে ভোর, জ্ঞানের সাথে বাড়বে জোর”

 

অন্যদিনের মতো আজও খুব সক্কালে ঘুম ভেঙে উঠে তোয়া দেখল মা-বাবা ঘুমোচ্ছেন অন্যদিন ওঁরাও উঠে পড়েন, কিন্তু আজ রবিবার কিনা তাই একটু বেলা করবেন উঠতে তোয়া ঘুম ভেঙে বিছানায় উঠে বসতেই, খোলা জানালা দিয়ে তার বন্ধুরা ডাকাডাকি শুরু করে দিল। বুলবুলি বলল, 

“তোয়াদিদি, তোয়াদিদি, আজ কিন্তু তোকে, 

প্রথম ডেকেছি আমি, নতুন আলোর ঝোঁকে” 

শালিক যেমন খুব মজা করে, তেমন ঝগড়াও করে, সে বলল, 

“বলতো দেখি তোয়, 

তোর কী মনে হয়, 

আমিই বেশী হিংসুটি? 

 না ওই বুলবুল, কেলে ঝুঁটি”?

তোয়া মুখে হাত চাপা দিয়ে নিঃশব্দে দুলেদুলে হাসল কিছুক্ষণ, তারপর ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে ইশারায় বলল,

“অ্যাই, অ্যাই, চুপ চুপ, করিস না রে ঝগড়া। 

মা বাবার ভাঙলে ঘুম সব কিছুতেই ব্যাগড়া”!

খুব আআস্তে আআস্তে বিছানা থেকে নেমে, তোয়া মেঝেয় যেমনি পা দিল, মা আধখানা চোখ মেলে আলসে গলায় বললেন, “ছাদে যাচ্ছো যাও, কিন্তু আলসে দিয়ে ঝুঁকবে না”। তোয়া সবসময় দেখেছে ঠাম্মি, দাদুন, বাবাকে ফাঁকি দেওয়া যায়, কিন্তু মাকে – অসম্ভব! মাদুগ্গার মতো তিনচোখ না থাকলেও, মা সব দেখতে পান, সব বুঝতে পারেন। মেঝেয় নেমে মায়ের গালে হামি খেয়ে, তোয়া হাল্কা পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে, বারান্দা পেরিয়ে দৌড়ে উঠতে লাগল সিঁড়ি দিয়ে।

 

সক্কাল সক্কাল ছাদে উঠতে তোয়ার খুব মজা লাগে। আকাশ জুড়ে নরম নরম আলো। ঝিরঝিরে হাওয়া। চারিদিকের গাছপালার পাতায় পাতায় চলছে রান্নাবান্নার তোড়জোড়। হাতাখুন্তি, বাসনকোসন নাড়াচাড়ার শব্দ শোনার জন্যে সে কান পাতে, কিন্তু শুনতে পায় না।

তোয়ার কাকু বলেন, “তোর মা, ঠাম্মি রান্নাঘরে, আমাদের জন্যে যখন খাবার বানান, কত রকমের শব্দ হয় শুনিসনি? ঠুনঠান, ঘটরঘটর, ছ্যাঁক-তেলতেল ছোঁক-কলকল”? তোয়া ঘাড় নেড়ে সায় দেয়, শুনেছে তো, সে সময় কী সুন্দর রান্নার গন্ধও বেরোয়, সেই গন্ধে তো তোয়ার লোভ লাগে, খিদে খিদে পায়!

“একদম সেইরকম, রোদ্দুরের আলোর আগুনে, গাছের পাতার রান্নাঘরে গাছ তার নিজের জন্যে এবং আমাদের জন্যেও খাবার বানায়।”

“আমাদের জন্যেও?” অবাক হয়ে বড়োবড়ো চোখে তাকিয়েছিল তোয়া। “কই কোনদিন দেখিনি তো?”

কাকু আদর করে তোয়ার রেশমী কোমল চুল এলোমেলো করে দিয়ে হেসে বললেন, “ওরা কী আর ভাত-ডাল-তরকারি বানায়? ওরা বানায় চাল, গম, ডাল, সব আনাজ, সব রকম ফল - আম, জাম, লিচু, পেয়ারা।” একটু থেমে কাকু বলেছিলেন, “আরো কী জানিস, তোয়ারাণি, আমাদের রান্নায় যেমন সুন্দর গন্ধ হয়, তেমনি মাঝে মাঝে বেশ ঝাঁঝালো গ্যাসও হয়। সে ঝাঁজে নাক জ্বলে, চোখ জ্বলে, হ্যাঁচ্চো হয়। গাছেদের রান্নায় তেমন কোনদিন হয় না।”

“তাই?”

“হুঁ। বরং সেই গ্যাসে আমাদের শ্বাস নিতে আরাম হয়, আর সেই গ্যাস বাতাসে যতো বেশি থাকে, আমাদের শরীরও ততো চাঙ্গা থাকেশহর থেকে দূরে, যেখানে অনেক গাছপালা, সেখানে তাই জোরে জোরে শ্বাস নিতে হয়। এখন তো তুই ছোট্ট, বড়ো হলে জানবি ওই গ্যাসের নাম অক্সিজেন, আর গাছেদের এই রান্নার নাম সালোকসংশ্লেষ।”

কাকু প্রায়ই বাইরে চলে যায়, দুতিন মাস পরপর বাড়ি এসে, দিন দশেক থাকে। তখন তোয়ার জন্যে কিছুমিছু জিনিষ আনেই, আর আনে অনেক অনেক মজার মজার কথা। কাকু ছাড়া তোয়া তখন আর কাউকে চিনতেই পারে না।

সকালবেলা ছাদে উঠলেই তোয়ার কাকুর কথা মনে পড়ে খুব। কাকুর কথা মতো বুক ভরে খুব জোরে জোরে শ্বাস নেয়। আজ তার এই শ্বাস নেওয়া দেখে চড়ুই মিচকি মিচকি হাসল, বলল, 

“ও তোয়াদি, ও তোয়াদি, আর নিও না শ্বাস, 

বাতাসের অক্সিজেন ফুরিয়ে গেলেই, ব্যস

চড়ুইয়ের এই কথায়, তোয়া এবং অন্য সবাই হেসে ফেলল কিচিরমিচির করে, শুধু কাক গম্ভীর হয়ে বলল, “গুডমর্নিং তোয়াদিদি, তোমার আদরে না চড়ুই‍টা খুব ফাজিল হয়েছে, তোমাকেই আর মান্যি করে না।”

হাসতে হাসতে তোয়া বলল, 

“বারে, আমি বুঝি স্কুলের বড়োদিদিমণি? 

ভয় পেয়ে বলবে আমায়, “আজ্ঞে দিদি, আপনি?”“

তোয়ার কথায় কাক একটু দমে গেল, কিন্তু অন্যেরা বেশ মজা পেল। তোয়া কাককে আবার বলল, 

“মিষ্টি সুরে বলতে কথা, বলছি কতো বল, 

তুই শুধুই খুঁজিস দেখি ফাঁকি দেওয়ার ছল।”

কাকটা আরো অপ্রস্তুত হয়ে, একবার ঠোঁট আর একবার ঘাড় চুলকোল, তারপর বলল, 

“কা কা করি, খা খা করি, তার তো থাকে মানে, 

কাক ডেকেছে মিষ্টিসুরে, এমন কি কেউ জানে?”

কাকের এই কথা শুনে তোয়া হাততালি দিয়ে হাসতে লাগল খুব। আর অন্য পাখিরাও ডানা ঝাপটে ঝটপট বলে উঠল,

 “কাকদাদা গো কাকদাদা, তুমিই হলে সেরা, 

তোমার কথার সুরটি যেন মিষ্টি মধু ঘেরা” 

কথাগুলো বলে ফেলে কাক একটু লজ্জা পাচ্ছিল, কি জানি কী বলে ফেললাম!

এখন সকলের প্রশংসায় একটু গম্ভীর হয়ে বলল, 

“তোয়াদিদির ক্লাশে পড়ে শিখছি কত কী যে, 

কাকের গলায় মিঠে সুর শুনছি এখন নিজে”!

তোয়া হাসতে হাসতে বলল, 

“তোদের মতো মিষ্টি ডানা থাকতো যদি মোর, 

ফুড়ুৎ করে উড়ে যেতাম একটু হলেই ভোর। 

এদিক সেদিক ঘুরে এসে খেতাম মায়ের বকুনি, 

বইয়ে ভরা ব্যাগটি পিঠে স্কুল ছুটতাম তখুনি। 

যা কিছু সব বইয়ে পড়ি দিদিমণির কাছে, 

উড়ে উড়ে দেখে নিতাম কোনটা কোথায় আছে? 

সেই কবে তুই খেয়েছিলি কাদের ক্ষেতের ধান, 

বুলবুলি তোর ঘুঁচলো না দেখ আজও সে বদনাম। 

কে যেন সে কত আগে দেয়নি বুঝি খাজনা, 

তোর কথাতেই মানুষগুলো আজও বাজায় বাজনা”।

বুলবুলি খুব দুঃখী দুঃখী মুখ করে বলল, 

“ওসব কথায় দিই না গো কান, তোয়াদিদি বুঝলে, 

বুলবুলিঝাঁক পাবে না আর ধানের ক্ষেতে খুঁজলে। 

এখনও তাও উড়ে বেড়াই, দুচারটে বুলবুল, 

কবে কখন হারিয়ে যাবো, আর পাবেই না বিলকুল।”

তোয়াদিদি বড়ো বড়ো চোখে তাকিয়ে বলল, 

“সত্যি, এমন যদি হয়, 

মনে ভীষণ লাগে ভয়। 

আমরা আছি, গাছও আছে, নেই শুধু হায় পাখি, 

আমাদেরও জীবন দেখিস রইবে আধেক বাকি। 

সকালবেলার ঘুমটি ভাঙে তোদের ডাকটি শুনে,

 দুপুর বেলা ঘুম এসে যায় ঘুঘুর সুরের গুণে 

নিরিবিলি একলা বনেও, সঙ্গী থাকিস তোরা। 

তোদের পিছু ঘুরে ঘুরে সময় কাটাই মোরা”।

তোয়াদিদির এই কথায় টিয়া বলল, 

“তুমি ছাড়া তেমন কেউ দেখেই না গো মোদের। 

 ব্যাটারি দেওয়া খেলনা পাখি আছে দেখি ওদের! 

সে পাখিরা দেখতে যেন, আমরা অবিকল। 

ঘন ঘন ডিগবাজি খায়, বাপরে কী ধকল! 

তাদের মধ্যে কেউ কেউ সুরে বলে ছড়া; 

হামটিডামটি, জ্যাকএন্ডজিল যেমন তোমার পড়া”।

তোয়াদিদি খুব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল, 

“ধুর ধুর। ওসব দেখে মজা পায় পুঁচকি ছেলেমেয়ে। 

একটুখানি বড় হলেই, কেউ দেখেও না আর চেয়ে। 

কলের পুতুল হাতে নিয়ে, কদিন চমক লাগে ঠিকই। 

কিন্তু রোজই আমি অবাক হই, যত্তো তোদের দেখি”।


“সে তো তুমি, আমাদের ভালোবাসো বড়োই,

রোজই তুমি আমাদের আদর যত্ন করোই। 

গরমকালে কোথাও যখন, পাই না খাবার জল। 

আমরা বলি, সবাই মিলে তোয়ার বাড়ি চল। 

তোমার গামলা ভরা জলে, 

আমরা আসি দলে দলে। 

তোমার ওই জলেই আমরা সবাই মেটাই তৃষ্ণা। 

কিন্তু ওই কাক, যতো বলি, অমন করিস না! শুনবে না, 

নেয়ে খেয়ে জলটাকে করে তুলবেই ঘোলা”

তোয়াদিদি হাসতে হাসতে বলল, “কাকের তো নেই কান, থাকলে দিতাম কানমোলা”

কাক ঠোঁট আর ঘাড় চুলকে, একটু মিচকে হাসল, বলল, 

“গরমকালে নোংরা খেয়ে, আনচান করে গা। 

তোমার রাখা জল দেখে তাই থাকতে পারি না। 

গামলার জলে কাকচান সেরে বড্ড আরাম পাই, 

তোয়াদিদি গো, আমার পরে রাগ করতে নাই”। 

কাকের কথায় তোয়া দুলে দুলে খুব হাসতে লাগল, অন্য পাখিরাও কিচিরমিচিরে ভরে তুলল চারদিক।

তোয়া বলল, 

“রাগ করিনি মোটেই আমি, দুষ্টুসোনা কাক, 

আজ থেকে নয় তোর জন্যে এক উপায় করা যাক। 

আরেকখান গামলা এনে রাখবো ভরে জল, 

তখন যেন করিস না আর নতুন কোন ছল”।

চড়াই, শালিক, পায়রা, বুলবুলি, টিয়া সবাই এই ব্যবস্থায় খুব খুশি হল, বলল, 

“তোয়াদিদি, বেশ হবে, মজা হবে, এমন যদি হয়, 

তেষ্টা পেয়ে কষ্ট তবে হবার কথা নয়”।

 

কাকের সর্বদাই খিদে পায়। সে যেমন কা কা করে, তেমনি খা খা করে। ভোর থেকে উঠে নোংরা ঘেঁটে, আবর্জনা ঘেঁটে খেয়েছে কিছু মন্দ না, কিন্তু তাও তার আর তর সইছিল না, খিদেয় উড়ুউড়ু করছিল। ঠোঁট ফাঁক করে, দুবার খা খা ডেকে বলল, 

“তোয়াদিদি, তোয়াদিদি এবার আমি উড়বো, 

কোনখানে কী খাবার পাই সন্ধানে তার ঘুরবো”।

তোয়াদিদি কাকের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল, তারপর সবার দিকে তাকিয়ে বলল, 

“আচ্ছা, আচ্ছা, দুষ্টুসোনা কাক, এখন উড়েই তবে যাক। 

আমারও নিচের থেকে পড়বে এবার ডাক। 

আমাদের গল্পগাছা এই অব্দিই থাক। 

বিকেলবেলা আসিস সবাই একটু পেলে ফাঁক”।

টিয়া বলল, 

“ঠিক বলেছ, তোয়াদিদি, সময় হল যাবার, 

বাসায় আছে বাচ্চা দুটো তাদের জন্যে খাবার, 

যোগাড় করে নিয়ে যাবো ঘুরে বাদাড়বন, 

বিকেল বেলা ফেরার পথে কথা বলব অনেকক্ষণ”। 

কাক উড়ে গেল বাজারের দিকে, যেখানে অনেক নোংরা আর আবর্জনা জমা হয়, আর টিয়া উড়ে গেল সামনের বিরাট বাগানের দিকে।

ওদের উড়ে যাওয়া দেখতে দেখতে অন্য পাখিরা বলল, 

“তোয়াদিদি তুমিও এবার নিচেয় যাও, 

মুখটুখ ধুয়ে, চটপট করে খাবার খেয়ে নাও। 

তারপরে তো বসবে খুলে এত্তো এত্তো বই! 

দুপুর অব্দি তুমি আর সময় পাবে কই? 

আমরা যে কজন থাকি তোমার আশেপাশে। 

পড়ার ঘরের জানালায় বসি ঘুরে ঘুরে এসে 

তোমার দিকে চোখ রেখে কষ্ট যে পাই খুব, 

লেখায় পড়ায়, নাচে গানে, তোমার ছটা দিনই ডুব”

চড়াই, শালিক, পায়রা বুলবুলি সবাই উড়ে গেল হুশ করে। ওদের উড়ে যাওয়া ডানার দিকে তাকিয়ে তোয়া একটু হাসল, তারপর নিজের মনেই বলল, 

“রবিবারেই মেলে আমার বেশ কিছুটা ছুটি, 

তোদের কথা শুনতে তাই ভোরবেলাতেই উঠি। 

তোদের ডানায় পাই রে আমি মুক্ত আকাশ নীল। 

নিবিড় সবুজ গাছে ঘেরা শান্ত গভীর ঝিল। 

বদ্ধ মনে ভাসিয়ে আনিস সতেজ মুক্ত হাওয়া। 

ওইটুকুতেই পাখি রে, মোর অনেক কিছু পাওয়া”!

--০০--

গল্পটি "এক কুড়ি কিশোর" গ্রন্থে সংকলিত।  বইটি বাড়িতে বসেই পেয়ে যাবেন নীচের লিংক থেকে কিনলে "এক কুড়ি কিশোর "

এর পরের ছোটদের প্রবন্ধ - লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১০

 এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ "  এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ " এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও...