সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬

মুদ্রা ও টাকাকড়ি - শেষ পর্ব

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "



এর আগের পর্ব - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ৬ 


শেষ পর্ব 


ভারতে কাগজের টাকা (cuurency note) 

ওয়ারেন হেস্টিংস কলকাতা শহরে ভারতের প্রথম ব্যাংকের প্রতিষ্ঠা করেন ১৭৭৩ সালে, সে ব্যাংকের নাম ছিল “ General Bank of Bengal and Bahar”বেঙ্গলের সঙ্গে “বাহার” শুনে জায়গাটা কোথায় – এমন কৌতূহল হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু জায়গাটি প্রকৃতপক্ষে আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য বিহার। সেসময় দেহাতি উচ্চারণে “বিহার”-কে হেস্টিংস ও তাঁর গোরা সঙ্গীরা “বেহার” শুনেছিল বলেই হয়তো এই বিপত্তি! যাই হোক এই ব্যাংক থেকেই প্রথম কাগজের নোটের প্রচলন শুরু হয়। সরকারিভাবে এই নোটের পৃষ্ঠপোষকতা থাকলেও এই ব্যাংক এবং তার নোট অচিরেই ১৭৭৫ সালে বন্ধ হয়ে যায়। এখানে মনে রাখতে হবে “সরকারিভাবে” মানে ব্রিটিশ সরকার নয়, সে সময় ভারতের শাসনকর্তা ছিল কোম্পানি-রাজ অর্থাৎ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি।

এর পরেও ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনেক প্রচেষ্টা ও ব্যর্থতার পর ১৮০৬ সালে কলকাতায় পঞ্চাশ লাখ সিক্কা রুপি মূলধন নিয়ে খোলা হল ব্যাংক অফ বেঙ্গল। সিক্কা কথাটা এখন সাধারণ মুদ্রা হিসেবেই ব্যবহৃত হয়, ক্রিকেট খেলার আগে “টস” করাকে হিন্দিতে “সিক্কা উছালনা” বলে। কিন্তু সে সময় “সিক্কা” ছিল খাঁটি রূপোর মূল্যবান মুদ্রা। এই মুদ্রা ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি প্রধানতঃ বাংলা, বিহার ও ঊড়িষ্যা – অর্থাৎ বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির জন্যে প্রচলন করেছিল।

কোম্পানি-রাজ এই ব্যংককে দিল কাগজের নোট ছাপা এবং বাজারে নোট চালু করার অনুমতি। এই সময়ে বেঙ্গল ব্যাংক থেকে তিন ধরনের নোট প্রকাশ করেছিল, যেমন (১) এক-পার্শ্বিক নোট (unifaced), (২) বাণিজ্যিক নোট (commerce) এবং (৩) “ব্রিটানিয়া” নোট (Britannia)। প্রথম অবস্থায় এক-পার্শ্বিক নোট অর্থাৎ যা কিছু লেখার কাগজের একদিকেই লেখা থাকত, উলটো দিক থাকত সাদা (blank).

নীচেয় “ব্যাঙ্কবেঙ্গল” থেকে প্রকাশিত সিক্কা ২৫০ টাকার একটি নোটের অত্যন্ত বিরল একটি নমুনা দিলাম। এই চিত্রটির জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই “livehistoryindia.com/story/forgotten-treasures/indias-first-currency-note” ওয়েবসাইটের Author Krutika Haraniya-কে।   

 

Two hundred and Fifty Sicca Rupee note of Bank of Bengal with cancelled mark

 ব্যাংক অফ বেঙ্গলের প্রথম এক-পার্শ্বিক (unifaced) নোট     

    ব্যাংক অফ বেঙ্গলের প্রথম বাণিজ্যিক (commerce) নোটের উভয় পিঠ।

 

   ব্যাংক অফ বেঙ্গলের প্রথম ব্রিটানিকা (Britannica) নোটের উভয় পিঠ।

কলকাতার পর দ্বিতীয় প্রেসিডেন্সি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৪০ সালে বোম্বেতে (আধুনিক মুম্বাই) এবং তৃতীয়টি হল ১৮৪৩ সালে ম্যাড্রাসে (আধুনিক চেন্নাই)।  

 ব্যাংক অফ বম্বের প্রথম নোটের উভয় পিঠ

১৮৫৭-র প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের পরপরই ভারতের শাসনব্যবস্থা ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে তুলে নিল ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এবং ব্রিটিশ-অধীনস্থ ভারতের রাণি হলেন তৎকালীন ইংল্যাণ্ডের রানি ভিক্টোরিয়া। শাসন ক্ষমতা অধিগ্রহণের পর ১৮৬৭ সালে সবকটি প্রেসিডেন্সি ব্যাংককে বন্ধ করে দেওয়া হল, এবং কাগজের নোট প্রচলনের পূর্ণ দায়িত্ব নিল ভারত সরকার (Government of India).

ভারত সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম যে নোটগুলি ছাপা হয় – সেগুলিকে ভিক্টোরিয়া সিরিজ (Victoria Series) বলা হয়, কারণ এই নোটগুলিতে তৎকালীন রাণি ভিক্টোরিয়ার ছবি থাকত। এই নোটগুলিও ছিল একপার্শ্বিক (unifaced) নোট। টাকার মূল্য দুটি ভাষায় থাকত, এবং নিরাপত্তার জন্যে নোটের উপর Government of India লেখা জলছবি (water mark) থাকত, দুই আধিকারিকের স্বাক্ষর এবং ঢেউ-খেলানো কিছু রেখা থাকত। আর থাকত নোটের  রেজিস্ট্রেশন নাম্বার। এই নোটের জন্যে হাতে বানানো কাগজ আসত ইংল্যাণ্ডের বিখ্যাত কাগজ কারখানা Laverstoke Mill, Hampshire থেকে। নীচেয় কয়েকটি নোটের নমুনা –

 Image : Rupees Ten   Image : Rupees Hundred

দশ টাকার নোট                     একশ টাকার নোট 

 প্রথম দিকে এই নোটগুলি বিভিন্ন সার্কল বা অঞ্চল বিশেষে প্রকাশ করা হত এবং সেই হিসেবে নোটের স্থানীয় ভাষাও পালটে দেওয়া হত – অর্থাৎ ইংরিজি ভাষাটা সর্বদাই থাকত, সঙ্গে থাকত উত্তর ভারত হলে হিন্দি বা উর্দু, পূর্ব ভারতে বাংলা, দক্ষিণ ভারতে তামিল ইত্যাদি। এর পরে এল সবুজ (green series) রঙের চার ভাষার নোট, তারপরে এল লাল (red series) রঙের আট ভাষার নোট। এই নোটগুলি আর অঞ্চল ভিত্তিক নয়, সারা ভারতেই ব্যবহারের জন্য প্রকাশ করা হয়েছিল।    

Image : Green Underprint Rs.500           Image : Red Underprint Rupees Fifty           

পাঁচশ টাকার চার ভাষার সবুজ নোট        পঞ্চাশ টাকার আট ভাষার লাল নোট

এই ধরনের নোটগুলি ১৯২৩ সাল পর্যন্ত চালু ছিল, তার পরে এল রাজা সিরিজের নোট। এই নোটের মূল্যমানও সব মানুষের কথা চিন্তা করে প্রকাশ করা হল, যেমন Rs ৫, 10, 50, 100, 500, 1000 এবং 10,000-এর নোট। নীচেয় রইল এক হাজার ও দশ হাজার টাকার ছবি - 

 



  ১৯৩৫ সালের ১লা এপ্রিল, ভারতে রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইণ্ডিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং এর কেন্দ্রীয় অফিসটি হয় কলকাতা শহরে। এতদিন পর্যন্ত চলতে থাকা লণ্ডনে ইম্পিরিয়াল ব্যাংক এবং এদেশের নানা আঞ্চলিক ব্যাংকের মুদ্রা বা নোট প্রকাশের ক্ষমতাকে অধিগ্রহণ করে, এই বিষয়ের সমস্ত ব্যবস্থাই কেন্দ্রীভূত করা হল এই রিজার্ভ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে। ব্রিটিশ শাসিত সমগ্র ভারতের অর্থ ব্যবস্থা এবং নীতি নির্ধারণের ক্ষমতা রইল কেন্দ্রীয় রিজার্ভ ব্যাংকের হাতে। এতদিনের কলকাতা, বোম্বাই, ম্যাড্রাস, লাহোর, রেঙ্গুন, কানপুর, করাচির আঞ্চলিক ব্যাংকগুলিকেও যুক্ত করে নেওয়া হল রিজার্ভ ব্যাংকের শাখা এবং সহযোগী হিসেবে। দিল্লি তখন ব্রিটিশ-রাজের রাজধানী হলেও, দিল্লিকে এর বাইরেই রাখা হয়েছিল।    

Image : Rupees Five

রিজার্ভ ব্যাংক থেকে প্রকাশিত প্রথম নোট

রিজার্ভ ব্যাংক নোট বা মুদ্রা প্রকাশের পূর্বপন্থাই অনুসরণ করল, অর্থাৎ রাজা সিরিজের নোটই প্রকাশ করতে লাগল এবং স্বাভাবিকভাবেই রাজা বদলের সঙ্গে তাল রেখে ছবি বদলে টাকাও ছাপা হয়েছে বার বার। তবে দেশের চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী কম মূল্যমানের, যেমন এক বা দুটাকার নোটও প্রকাশ করেছে তারা।  

  Image : Rupee One - Obverse Image : Rupee One -Reverse

চতুর্থ জর্জের নামে ছাপা এক টাকার নোটের উভয় পিঠ (১৯৪০)

George VI Frontal

ষষ্ঠ জর্জের নামে ছাপা দশ টাকার নোট (১৯৪৩)

 

এই নোটগুলি ১৫ই আগষ্ট ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পরেও ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ভারতে চালু ছিল। এরপর এই নোটগুলি বাতিল করে স্বাধীন ভারতের নোট চালু হয়ে যায়। সে কথা আসবে পরের পর্বে।  

স্বাধীন ভারতের নোট ও আধুনিক নোটহীনতা

মুদ্রা এবং নোটের সুদীর্ঘ ইতিহাসে সর্বদাই রাজা কিংবা শাসকের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় থেকেছে। সে আধিপত্য এসেছে শাসকের ক্ষমতাজনিত আবেগ বা অহংকার থেকে, এবং আজও বহু রাজতান্ত্রিক বা একনায়ক-তান্ত্রিক দেশের পক্ষেই সেটা যুক্তিগ্রাহ্য। কিন্তু গণতান্ত্রিক দেশে এই পরিসরটা  অনেকটাই অন্যরকম – দেশের গৌরব, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মহান নেতাদের স্মারক সম্মান প্রভৃতি প্রদর্শনই এই নোটগুলির মুখ্য উদ্দেশ্য।   

১৫ই আগস্ট ১৯৪৭-এর মধ্য রাত্রে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি পাওয়া ভারত কিন্তু মুদ্রা কিংবা নোট ব্যবস্থায় যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপ নিতে পেরেছিল। যদিও ২৬শে জানুয়ারি ১৯৫০ সালে গণপ্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পথ চলা শুরু হলেও, স্বাধীন ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক অন্তর্বতীকালীন নোটের প্রচলন শুরু করেছিল।

 

স্বাধীন ভারতের প্রথম এক টাকার নোট

এই নোট ছাপানোর আগে চিন্তা করা হয়েছিল, জাতির জনক গান্ধীর ছবি ছাপা হবে। কিন্তু তারপরে ঠিক হয়, স্বাধীন দেশের জাতীয় প্রতীক ব্যবহার করাই সমীচীন, জনমতও এই পক্ষেই সায় দিয়েছিল। এর পরেই গান্ধীর চিত্রের পরিবর্তে সারনাথের অশোকস্তম্ভের উপরে স্থাপিত সিংহমূর্তিটির ছবি নোটে মুদ্রিত হয়। এবং এর পরবর্তী নোটেও মূলতঃ এই নীতিই গৃহীত হয়ে থাকে।

 

যদিও সে সময় তুলনামূলক বিচারে নোটের নকশা বৃটিশ যুগের মতোই রইল, শুধু রাজার চিত্রের বদলে এল ভারতের জাতীয় প্রতীক। ওপরের দুটি নোট লক্ষ্য করলে দুটির মধ্যে মিল ও তফাৎটুকু সহজেই বোঝা যাবে।

১৯৫৪ সালে বড়ো অংকের কিছু নোট ছাপা হয় ভারতের সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে এমন কিছু বিখ্যাত স্থাপত্যর চিত্র দিয়ে –

   

হাজার টাকার নোটে তাঞ্জোরের মন্দির, পাঁচ হাজারের নোটে গেটওয়ে অফ ইণ্ডিয়ার ছবি।

 ষাটের দশকের অর্থনৈতিক সঙ্কট কালে (এর কারণ দুটি যুদ্ধ – ১৯৬২-তে চিনের সঙ্গে এবং ১৯৬৫-তে পাকিস্তানের সঙ্গে) নোটের সাইজ অনেকটাই ছোট করে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৬৯ সালে মহাত্মা গান্ধির জন্মশতবার্ষিকীর স্মরণে প্রকাশিত হল নতুন একশ টাকার নোট -

  

গান্ধীজীর জন্মশতবার্ষিকী স্মারক নোট।  

  এরপর ব্যয় সংকোচের উদ্দেশে যথাক্রমে ১৯৭২ ও ১৯৭৫ সালে প্রকাশ করা হল ২০ ও ৫০ টাকার নোট।

    

এরপর ১৯৯৬ সাল থেকে শুরু হয়েছে গান্ধী সিরিজের নোট সমূহ। প্রতিবার নতুন নোট প্রকাশের সময় নোটের মূল ডিজাইনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না হলেও যুক্ত করা হয় নিরাপত্তাজনিত নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য। ২০১৬ সালে প্রকাশিত ৫০০ টাকার নতুন নোটের উভয় পিঠের বৈশিষ্ট্যগুলি নীচেয় দেওয়া হল -    

১. অর্ধস্বচ্ছ সংখ্যায় নোটের মূল্যমান।

২. সুপ্তভাবে চিত্রিত নোটের মূল্যমান।

৩. দেবনাগরী ভাষায় নোটের মূল্যমান।

৪. মাঝখানে মহাত্মা গান্ধীর ডানদিকে তাকানো মুখের ছবি।

৫. RBI লেখা নিরাপত্তা সূত্র – নোটটিকে নাড়াচাড়া করলে এই সূত্রের রঙ নীল ও সবুজ হতে থাকে।

৬. নোটের প্রতিজ্ঞা পত্র, গভর্নরের স্বাক্ষর, এবং RBI -এর প্রতীক।

৭. ইলেক্ট্রোটাইপ ওয়াটার মার্ক দিয়ে গান্ধীর ছবি টাকার মূল্যমান।

৮. নোটের রেজিস্ট্রেশন নাম্বার ছোট থেকে বড় ফন্টে লেখা – বাঁদিকের ওপরে এবং ডানদিকের নীচেয়।

৯. রুপি সিম্বল সহ টাকার মূল্যমান – নাড়াচাড়া করলে এটির রঙও নীল ও সবুজ হতে থাকে।

১০. অশোক স্তম্ভ প্রতীক।

১১.একটি বৃত্তের মধ্যে ব্রেল পদ্ধতিতে লেখা ৫০০

১২. বাঁদিকে ও ডানদিকে পাঁচটি করে দাগ একটু উঁচু করে ছাপা।  

 ওপরের বারোটি বৈশিষ্ট্যই নিরাপত্তাজনিত কারণে - যাতে জাল নোট ছাপানো দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে; আবার ১০, ১১, ১২ বৈশিষ্ট্যগুলি দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের নোট চিনতে সুবিধার জন্যও বটে।

     ১. নোটটির মুদ্রণ বছর।

২. স্বচ্ছ ভারত প্রতীক ও স্লোগান।

৩. ভাষার প্যানেল।

৪. ভারতের জাতীয় পতাকা সহ লাল কিল্লার ছবি

৫. দেবনাগরি সংখ্যায় টাকার মূল্যমান। 

 

বৈদ্যুতিন লেনদেন (Electronic Transactions) 

মুদ্রা ও নোটের পাশাপাশি ভারতে বৈদ্যুতিন মাধ্যমে টাকার লেনদেনের সূত্রপাত হল আশির দশকে, তার নাম ডেবিট কার্ড। ১৯৮৭ সালে ডেবিট কার্ডের সূচনা করেছিল সিটি ব্যাংক এবং একই সঙ্গে HSBC ব্যাংক চালু করেছিল ATM (অটোমেটেড টেলার মেশিন)। এরপর নব্বইয়ের দশক থেকে ভারতের অধিকাংশ ব্যংকই ডেবিট কার্ড ও এটিএম ব্যবস্থা চালু করে। ব্যাংকের সেভিংস ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত এই ডেবিট কার্ড ব্যবহার করে নগদ টাকার ব্যবহার না করেও জিনিষপত্র কেনাকাটা, হোটেলে রেস্টুরেন্টে ভূরিভোজ, প্লেন বা ট্রেনের টিকিট কাটা সবই সম্ভব হয়ে উঠতে লাগল। ডেবিট কার্ড যেন আলিবাবার চিচিং-ফাঁক মন্ত্র – নিজের অফিসে বা বাড়িতে বসে কম্পিউটার, ল্যাপটপ থেকেই বুক করে নেওয়া যায় টিকিট। টিকিট কাউন্টারে গিয়ে লাইন দিয়ে টিকিট কাটার প্রয়োজন নেই অথবা ব্যাংকে গিয়ে প্রয়োজন নেই লাইন দিয়ে নগদ টাকা তোলার। যদি পকেটে থাকে ডেবিট কার্ড এবং ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে থাকে পর্যাপ্ত টাকা, তাহলে হোটেলে খেতে গিয়ে বাজেটের অতিরিক্ত খাওয়া হয়ে গেলেও দুশ্চিন্তা নেই। পুজোর বাজার করতে গিয়েও নগদ টাকার বাজেট করতে হয় না – মনে-ধরে-যাওয়া শাড়ি-জামা-কাপড় কিনে ফেলাই যায় - কারণ পকেটে আছে ডেবিট কার্ড।

ডেবিট কার্ডের প্রায় সমসময়েই এসে গেল ক্রেডিট কার্ড ব্যবস্থাও। নব্বইয়ের দশকে অনেক ব্যাংকই ক্রেডিট কার্ডের প্রচলন শুরু করে দিল। এই কার্ড পদ্ধতির মূল মন্ত্র হল ভারতের লোকায়ত দর্শনের জনক চার্বাক ঋষির প্রচলিত উপদেশ – “ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ”। ক্রেডিট কার্ডের যোগাযোগ সরাসরি কোন ব্যাংকের সেভিংস অ্যাকাউন্টের সঙ্গে নয়। বিগত কয়েক বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব, চাকরি, ব্যবসা বা উপার্জনের স্থায়িত্ব ও গুরুত্ব অনুযায়ী ক্রেডিট কার্ড পেয়ে যেতে পারে যে কোন গ্রাহক। অর্থাৎ পুরোটাই ঋণ –  ঋণসীমার মধ্যে থেকে যা খুশি খরচ করা যায়, পিছনে উপদেশ দেওয়ার অথবা চোখ রাঙাবার কেউ রইল না। মোটামুটি ৫০/৫১ দিনের মধ্যে ক্রেডিট-কার্ড-দাতা ব্যাংকের পাঠানো ঋণের হিসেবটি চুকিয়ে দিতে পারলেই – কোন চিন্তা নেই।  

প্রথম তিন-চার মাস হিসেব চোকাতে না পারলেও দিন চলে যাবে, তবে ঋণের হিসাব চড়তে থাকবে ২.৫%-৩% অথবা তারও বেশি মাসিক সুদে। তার পরেও ঋণ শোধ না করতে পারলে, বাড়িতে এবং অফিসে এসে হানা দেবে উদার ঋণদাতার বলিষ্ঠ লোকজন – তারা সকলেই চোখ রাঙিয়ে ধমক-ধামক দেওয়ায় দক্ষ। তাদের অত্যাচারে ঋণ শোধ করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না – হয়তো সর্বস্বান্ত হয়েই। তখন ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ" ভুলে, মনে পড়বে চণ্ডীদাসের গান, “সুখ-দুখ দুটি ভাই, সুখের লাগিয়া যে করে পীরিতি দুখ যায় তার ঠাঁই”।

এর মধ্যেই আধুনিক ভারতে বেশ কিছু ঘটনা ঘটে গেল –

১. ১৯৯৫ সালের ৩১শে জুলাই ভারতীয় জনগণের জন্যে প্রথম মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্কের প্রচলন হল। ২. ১৯৯৫ সালের ১৫ই আগস্ট ভারতের সর্বসাধারণের জন্যে প্রথম ইন্টারনেট পরিষেবা নিয়ে এল বিদেশ সঞ্চার নিগম লিমিটেড (VSNL)।

 

সূত্রপাতের পর থেকেই ইন্টারনেট এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক পরিষেবার উন্নতি হতে লাগল অতি দ্রুত। সরকারি পরিষেবার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নামল ভারতের এবং বিদেশের অনেকগুলি টেলিকমিউনেকেশন সংস্থা – একক এবং যৌথভাবে। কারণ সূচনাকালেই বোঝা গিয়েছিল, ভারতের বিপুল জনসংখ্যার প্রেক্ষীতে এই পরিষেবা প্রদান – শুধু সেবা নয়, অত্যন্ত লোভনীয় ব্যবসাও বটে। সেই লোভের কারণেই বিভিন্ন পরিষেবা বৃত্তে ঢুকে পড়ল পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি। ভারতের উচ্চতম ন্যায়ালয়ের বিচারে অনেক বড়ো বড়ো নেতা-নেত্রী ও ব্যবসাদারকে কারারুদ্ধ থাকতে হল দীর্ঘদিন। কিছুদিনের জন্য ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবসাতে নামল কিছুটা শূণ্যতা। পিছিয়ে পড়ল VSNL BSNL এর মতো সরকারি সংস্থাগুলিও।

 

এই শূণ্যতার সুযোগেই, ২০১৬ সালে এই ব্যবসাতে নতুন উদ্যোগ ও উদ্যমে নেমে পড়ল জিও (Jio)। তাদের আগ্রাসী পদক্ষেপে অনেকটাই পিছিয়ে পড়ল এই ব্যবসার পুরানো খেলোয়াড়রা, যেমন এয়ারটেল (Airtel) (১৯৯৫), BSNL (২০০০)। নতুন আরেকটি কোম্পানি – ভি (Vi) এই ব্যবসায় নামল ২০১৮ সালে। ৩১শে অক্টোবর ২০২৫ সালের মধ্যে সতেরোটি টেলিকম কোম্পানি – যারা প্রায় শুরু থেকেই এই ব্যবসায় যুক্ত ছিল – পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল।

 

যাই হোক ২০১৬ সালেই Jio এসে ফাইবার কানেকশনের মাধ্যমে এনে ফেলল দ্রুতগতির ৪জি (4G Fourth generation wireless network) এবং তার সঙ্গে সঙ্গে আনল WiFi (Wireless Fidelity) connection। এই দুয়ের সংযোগে মোবাইল ফোন হয়ে উঠল আধুনিক জীবনের এক অনিবার্য অঙ্গ। কোনরকম তারের সংযোগ ছাড়াই – ফোনে কথা বলা যায়, গান শোনা যায়, সিনেমা দেখা যায়, খেলা দেখা যায়...মোবাইল ফোনগুলি হয়ে উঠল স্মার্টফোন।

এই উন্নত পরিষেবার উপর ভর করে ১১ই এপ্রিল, ২০১৬ সালে এসে গেল ইউপিআই (UPI – Unified Payments Interface) পরিষেবা। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ডঃ রঘুরাম রাজন এই পরিষেবার উদ্বোধন করলেন। এই পরিষেবার মাধ্যমে কোন তারের সংযোগ ছাড়াই – সারাদিন-রাত, সপ্তাহের সাতদিন (২৪/৭) – মোবাইল ফোন থেকেই ব্যাংকের যাবতীয় কাজ সেরে ফেলা যায়। পথে ঘাটে, ঘরে-অফিসে, ট্রেনে-বাসে অর্থাৎ যে কোন অবস্থায় নিজের ব্যাংক অ্যাকাঊন্টের ব্যালান্স চেক করা, কিংবা নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে যাকে খুশি টাকা ট্রান্সফার করা, মাসের নানান খরচ – ইলেকট্রিকের বিল, গ্যাস বুকিং, ছেলেমেয়ের স্কুল-কলেজের ফি, হসপিট্যালের বিল, ইন্সিওরেন্সের প্রিমিয়াম... এমনকি ফুটপাথের দোকান থেকে ৭/১০ টাকার একভাঁড় চায়ের দাম মেটানো - সবকিছুই এখন হাতের মুঠোর মধ্যে – UPI transactions – সময় লাগে মাত্র কয়েক সেকেণ্ড, খুব বেশি হলে মিনিটখানেক। হাতে নগদ মুদ্রা নেই, নেই কাগজের নোট – আছে শুধু একটি মোবাইল ফোন।

 

পরিসংখ্যান বলছে, এই ইউপিআই বা ডিজিট্যাল টাকার লেনদেনে ভারত এখন বিশ্বের শীর্ষে। অনেকটাই পিছিয়ে আছে আমেরিকা বা ইওরোপের মতো বিশ্বের প্রথম সারির উন্নত দেশগুলি। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভারতে এই ডিজিট্যাল লেনদেনের মাসিক হিসাব নাকি ছিল প্রায় ২৪ লক্ষ কোটি টাকা এবং প্রতিমাসে প্রায় ৫০ কোটি মানুষ ব্যক্তিগত ভাবে এবং প্রায় ৬.৫ কোটি ছোট ব্যবসায়ী ডিজিট্যাল লেনদেনেই বেশি বিশ্বাস রাখে।

 

অর্থাৎ ধীরে ধীরে আমরা ঢুকে পড়ছি মুদ্রাহীন, নোটহীন, অধরা এবং স্পর্শহীন এক অর্থ ব্যবস্থার জগতে। 


 আগের পর্বে বলেছিলাম, কোন এক যুগের কয়েকটি মুদ্রা পেলেই, একালের বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, প্রত্নবিদ,  ঐতিহাসিক, সমাজবিজ্ঞানী, এমনকি অপরাধ-বিজ্ঞানীরাও খুঁজে পান অজস্র তথ্য ও তত্ত্বের ভাণ্ডার। আমাদের এই ডিজিট্যাল যুগে কোন মুদ্রা নেই – অতএব কোন কারণে আমাদের এই সভ্যতা যদি হারিয়ে যায় – পরবর্তী যুগের মানুষরা খুঁজেও পাবে না আমাদের এই অত্যাধুনিক অর্থনৈতিক ইতিহাস। কিন্তু সে কথা ভেবে দুঃখ করার এক কানাকড়িও মূল্য নেই আর।    


সমাপ্ত 


কৃতজ্ঞতাঃ 

https://www.rbi.org.in/commonman/english/Currency/Scripts/Ancient.aspx 

বং Wikipedia.   

এর পরের গল্প " মানিকজোড় "

এর পরের ছোটদের প্রবন্ধ গল্প - " আগুনের পরশমণি



রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬

একটি শিশিরবিন্দু....

   

এর আগের রম্যকথা - " ...দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু " 


যতদূর মনে পড়ে আমি তখন ক্লাস থ্রী বা ফোরে পড়ি, সাল ১৯৬৮ কিংবা ৬৯, ডোনেশানের জন্যে বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়াল কমিটির প্রতিনিধিরা এসেছিলেন আমাদের স্কুলেও। পরেরদিন বাবার থেকে টাকা এনে জমা করেছিলাম, কত ঠিক মনে নেই, তবে দশটাকার বেশি বলে মনে হয় না। তখন তের পয়সার ট্রাম ভাড়ায় ধর্মতলা থেকে শ্যামবাজার যাওয়া চলত, আর পাঁঠার মাংসের দর ছিল পঁচিশ-তিরিশ টাকা কিলো। কাজেই দশ টাকাও তখনকার দিনে নেহাত কম ছিল না! স্কুল থেকে আমাদের হাতে দিয়েছিল ভাঁজ করা একটি সুন্দর লিফলেট। তাতে লেখা ছিল কন্যাকুমারীতে কিভাবে গড়ে উঠছে বিবেকানন্দ স্মৃতি মন্দির। আর ছিল মন্দিরের একটি ছবি। নীল আকাশ আর নীল সমুদ্রের পটভূমিকায় গেরুয়া রঙের সেই মন্দির দাঁড়িয়ে আছে সমুদ্রের মাঝখানে একখানি পাথরের দ্বীপে।

১৯৮২ সালে কন্যাকুমারীর ভারতভূমি থেকে বিবেকানন্দ রকে যাবার লঞ্চে ওঠার মুখে সেই ছবিটিই আবার যেন দেখতে পেলাম। তবে এখন আর ছবি নয় পূর্ণাঙ্গ দৃশ্য। সাধারণতঃ কল্পনার সঙ্গে বাস্তবের মিল কম হয়ে থাকে বলে আমরা মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে থাকি। কিন্তু এবারে যে দৃশ্য দেখলাম, তা কল্পনার চেয়েও অনেকটাই বেশি। তিনদিকে অনন্ত সুনীল সমুদ্র। পিছনে শরতের নীল আকাশ, আকাশে হাল্কা-পুল্কা ছিট-ছাট সাদা মেঘ। মাঝখানে মাটি আর গিরি রঙের সুন্দর স্থাপত্য। জবরজং নকশা নেই, অজস্র মূর্তির কাহিনী নেই, ছিমছাম সুন্দর। সমস্ত পরিবেশের সঙ্গে ওতপ্রোত মিশে গেছে। অন্যরকম কিছু হলে চোখে লাগত নির্ঘাৎ।

 গুরুদেব শ্রীরামকৃষ্ণের দেহরক্ষার পর বেশ কিছুদিন পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত নরেন্দ্রনাথ দুবছর টানা ভারতভ্রমণ করে ১৮৯২ সালের ডিসেম্বরে কন্যাকুমারী পৌঁছেছিলেন। শোনা যায় কন্যাকুমারী মন্দিরে বসে পূর্বদিকে সমুদ্রের মধ্যে এই পাথর তাঁর চোখে পড়ে। কথিত আছে, ওই পাথরে বসেই কুমারী পার্বতী শিবকে স্বামীরূপে পাবার জন্যে দীর্ঘদিন তপস্যা করেছিলেন। নরেন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল ওই পবিত্র পাথরে বসে তিনিও ধ্যান করবেন। কপর্দ্দকহীন নরেন্দ্রনাথকে বিনা পয়সায় পার করে দিতে কোন জেলে নৌকাই তখন রাজি হয়নি। অগত্যা অদম্য নরেন্দ্রনাথ শীতের সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এবং সাঁতরে পার হয়েছিলেন প্রায় শপাঁচেক মিটার দূরত্ব! তিনদিন ২৫ থেকে ২৭শে ডিসেম্বর তিনি সেই পাথরে বসে ধ্যান করেছিলেন। পর্যালোচনা করেছিলেন তাঁর সমগ্র ভারত ভ্রমণের ফলাফল এবং স্থির করেছিলেন তাঁর পরবর্তী কর্ম পরিকল্পনা। অনেকেই অবিশ্যি এই ঘটনাকে কল্পকাহিনী বলে উড়িয়ে দিয়েছেন, কারণ বিবেকানন্দের নিজস্ব রচনায় এবং সেই সময়কার কোন চিঠিপত্রেই এমন কোন ঘটনার সমর্থন পাওয়া যায় নি।

 সিমলের নরেন্দ্রনাথ দত্ত থেকে স্বামী বিবেকানন্দে উত্তরণের পথে শ্রী রামকৃষ্ণ ছাড়া আর কোন বাঙালীর তেমন কোন অবদানের কথা শোনা যায় না, বরং শোনা যায় অনেক বিরুদ্ধতার কথা। তাঁর শিকাগো ধর্ম মহা সম্মেলনে যোগদান এবং বিশ্বের দরবারে বেদান্ত দর্শনের কথা তুলে ধরার পিছনে মানসিক এবং ব্যবহারিক সাহায্য ছিল অজস্র অবাঙালী ভারতীয়ের। মাদ্রাজের আলাসিঙ্গা পেরুমল, ক্ষেত্রীর মহারাজা অজিত সিংয়ের মতো ব্যক্তিদের সহযোগিতা ছাড়া তাঁর বিবেকানন্দ হয়ে ওঠা সহজ হত না।

 বিবেকানন্দের মৃত্যুর প্রায় ষাট বছর পরে তাঁর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে, বিবেকানন্দের আদর্শে উদ্বুদ্ধ শ্রীযুক্ত একনাথ রানাডের এই উদ্যোগও কম অলৌকিক নয়। একদিকে তিনি গড়ে তুললেন বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়ালের মতো অদ্ভূত স্মারক, যা আজ ভারতের অন্যতম দর্শনীয় তীর্থস্থান। অন্যদিকে গড়ে তুললেন বিবেকানন্দ কেন্দ্র, যেখানে বিবেকানন্দের আদর্শে গড়ে উঠবে আধুনিক যুব সমাজ, বড়ো হয়ে তারা গড়ে তুলবে বিবেকানন্দের স্বপ্নের ভারতবর্ষ।

 বিবেকানন্দ রকে দাঁড়ালাম, আমাদের পিছনে পড়ে রয়েছে আমাদের বিশাল দেশ ভারতবর্ষ। ওখান থেকে চাক্ষুষ করলাম, তিন সমুদ্রের অদ্ভূত সঙ্গম। বাঁদিকে বঙ্গোপসাগরের সবুজাভ জলরাশি, ডানদিকে ফিকে নীল আরব সাগর আর সামনে গভীর নীল ভারত মহাসাগর। এই প্রশস্ত প্রস্তরদ্বীপের গায়ে এসে অনবরত আছড়ে পড়ছে সমুদ্রের বড়ো বড়ো ঢেউ। এই ঢেউগুলি কোন সাগরের? তারা কি জানে আমরা তাদের কি নাম দিয়েছি?  আরেকবার উপলব্ধি হল এই বিশাল পৃথিবীতে কি সামান্য আর ক্ষুদ্র আমাদের অস্তিত্ব!

 বিশাল প্রান্তরে, পাহাড়ের চূড়ায় সূর্যোদয় দেখেছিলাম, দেখেছিলাম সূর্যাস্তও। কিন্তু একই জায়গায় দাঁড়িয়ে এমনটা আর কোথাও দেখিনি। বঙ্গোপসাগরে স্নান সেরে যে শিশু সূর্যের উদয় হয়েছিল, দিনান্তে সেই সূর্যই ক্লান্ত হয়ে ডুব দিলেন আরব সাগরের জলে।

 পরদিন ভোরে আরেকবার সূর্যোদয় দেখে আমরা সকালের ট্রেনে রওনা হলাম ত্রিবান্দ্রম। ঘন্টা তিনেকের জার্নি শেষে আমরা ত্রিবান্দ্রম পৌঁছে বিকেলের দিকে দেখতে গেলাম কোবালাম বীচ। কন্যাকুমারীতে যে সূর্যোদয় দেখেছিলাম, এখানে এসে দেখলাম সেই সূর্যাস্ত। অজস্র নারকেল গাছের সবুজ, সোনালী বালুর চর, সুনীল আরব সাগরের জল, বিকেলের আকাশে অস্তগামী সূর্যের বিচিত্র রঙের খেলা। সাগরের বেলাভূমি নিয়ে এতদিন যে রোমান্টিক সব বর্ণনা পড়েছি বা সিনেমার পর্দায় দেখেছি, তার নিখুঁত দৃশ্য এই কোবালাম বীচ। পণ্ডিচেরী, রামেশ্বরম, কন্যাকুমারীতে সমুদ্রতট আছে, নেই এমন স্বর্গতুল্য বেলাভূমি। লবণাম্বু সাগরের মধ্যম ঢেউয়ে সমুদ্রস্নান সেরে আরো নমকীন হলাম কিনা জানিনা, তবে সম্পূর্ণ হল আমার সমুদ্রপাঠ। মনের মধ্যে পাহাড়ের প্রতি যে পক্ষপাতিত্ব ছিল, সেটা আর রইল না, প্রকৃত প্রকৃতিপ্রেমিকের মতো দুজনকেই ভাগ করে দিলাম আমার মুগ্ধতা।

 ত্রিবান্দ্রম থেকে বাসে সারা রাতের জার্নি শেষে কোয়েমবাতোর হয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম নীলগিরির রাণী উডাগামন্ডলম, যার আদুরে নাম উটি। পশ্চিমঘাট পর্বতমালার অংশ নীলগিরি পাহাড়ের চোখ জুড়োনো সবুজ ইউক্যালিপটাস, পাইনের জঙ্গল, চা বাগান, নীল জলের লেক, সব মিলিয়ে সুন্দর শহর। সবচেয়ে উঁচু পর্বত চূড়া দোদাবেতা ২৬২৩ মি, দারজিলিংযের পথে ঘুমের উচ্চতা ২২৫৭ মি আর দারজিলিং ২০৪৫ মি, উচ্চতায় অনেকটাই বেশিএতসব সৌন্দর্য থাকলেও অজস্র পাহাড়ের অনন্ত বিস্তার নেই, নেই কাঞ্চনজঙ্ঘার রাজসিক সিংহাসন।  চারদিন উটিতে ভালোই লাগল, কিন্তু কোন নতুনত্ব মনে ধরা দিল না।

 উটি থেকে আমরা এবার গাড়িতে নেমে এলাম মাইশোর। ঘন্টা পাঁচেকের পথে মাঝে পড়ল বান্দিপুর রিজার্ভ ফরেস্ট। মুদুমালাই চেকপোস্টের ফরেস্ট গার্ডদের কাছে খবর পাওয়া গেল এই ফরেস্টে বাঘ আছে, আছে চিতা। ভাগ্যে থাকলে দেখা মিলতেও পারে। আমাদের গাড়ির সারথিও চেষ্টার কসুর করল না, কিন্তু দেখা মিলল না কোন বাঘের। বাঘেরা নিশ্চয়ই জাতীয় সড়কের চেয়ে ঘন জঙ্গলের রাস্তাই বেশি পছন্দ করে। তবে চিতল হরিণের দল, সম্বর আর অনেক ময়ুর দেখা দিল পথের দুপাশে।

মাইশোর শহরের রাজবাড়ির জাঁকজমক, চামুণ্ডি হিলসে চামুণ্ডি দেবীর মন্দির দর্শন ও শহর দর্শনের পর মাইশোর আর্ট গ্যালারিতে ঘনিষ্ঠ জানাশোনা হল রাজা রবি বর্মার ছবির সঙ্গে। ত্রিবান্দ্রাম আর্ট গ্যালারিতেও বেশ কয়েকখানি ছবি দেখেছিলাম, কিন্তু এখানে অনেক। রামায়ণ, মহাভারত, পৌরাণিক নানান কাহিনীর ছবি ছাড়াও, এখানে বেশ কয়েকটি ছবি রয়েছে সাধারণ জীবনের নারী। আজও মনে আছে একটি ছবি। এক মহিলার বুকের কাছে বাঁহাতে ধরে থাকা প্রদীপের শিখাটি ডান হাতে আড়াল করা। মহিলার মুখে আর বুকের ওপর এবং পিছনের দেয়ালে সেই দীপের আলো আর ছায়ার অদ্ভূত মিশ্রণ। অসাধারণ সেই ছবিতে রাজা রবি বর্মার অবিশ্বাস্য রং আর তুলির দক্ষতা ভোলা যায় না। মনে থাকবে সারা জীবন।

 বৃন্দাবন গার্ডেনের মিউজিক্যাল ফাউন্টেন দেখতে আমরা যেদিন গেছিলাম, সেদিন ছিল মাইশোরের দশেরা উৎসব। অজস্র জনসমাগম এবং চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলার সে ছিল এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা।

 মাইশোর দর্শনের পর সকালের ট্রেন ধরে আমরা রওনা হলাম ব্যাঙ্গালোর। ট্রেনের রিজার্ভ কামরাতেও শান্তি পাওয়া গেল না এত ভিড়। মাইশোরের দশেরা উৎসব দেখে ঘরে ফেরা দেহাতি লোকের ভিড়ে অসহায় টিকিট চেকারও রণে ভঙ্গ দিল। রিজার্ভড আসনে বসার আশা ত্যাগ করে বাবা মা কোনমতে একটু বসার জায়গা পেলেন, আমাদের দুই ভাই দাঁড়ানোর মতো আশ্রয় পেলাম টয়লেটের সামনে প্যাসেজে। প্রায় চার ঘন্টার এই ট্রেন জার্নিতে নড়া চড়া করাও বিড়ম্বনা, এমনই নিশ্ছিদ্র সেই ভিড়।

 ট্রেনের যাত্রা পথে অনেক স্টেশন পার হল – মান্ড্য, মাড্ডুর, চানাপটনা, রামনগর, বিরডি। সেদিন এই সব স্টেশনের কোন গুরুত্ব ছিল না আমার কাছে। তখন কে আর জানত আমাকে আবার কর্মসূত্রে এই অঞ্চলে ফিরে আসতে হবে। বেশ কিছুদিন থাকতেও হবে ছোট্ট শহর এই চানাপটনায়। সে সব সুদূর ভবিষ্যতের কথা। সেদিন আমাদের ট্রেন ব্যাঙ্গালোর শহরে ঢুকল প্রায় ঘন্টা দুয়েক লেট করে।

 ব্যাঙ্গালোর শহর দেখা হল। আর সিনেমা দেখা হল। সেই সময়ে ব্যাঙ্গালোরের সুনাম ছিল সিনেমাহলের প্রাচুর্যের জন্যে। একই বাড়ির তিনটে ফ্লোরে তিনটে হল অনেকগুলি ছিল এবং তাদের মধ্যে অধিকাংশই অত্যাধুনিক। আমাদের কলকাতায় ওই রকম হল ছিল না বললেই চলে, আর আধুনিক হল বলতে ধর্মতলার সাকুল্যে তিনটে কি মেরে কেটে চারটে হল। ব্যাঙ্গালোর সাঙ্গ করে আমরা ঘরে ফেরার দিকে রওনা হলাম – আবার ম্যাড্রাস।

মাদ্রাজের প্রায় তের কিমি লম্বা বিশ্বের দ্বিতীয় দীর্ঘতম মেরিনা বীচ দেখে তেমন মজা পেলাম না। হয়তো এর আগে অনেক ধরণের সমুদ্র দেখা হয়ে গেছে এবং কোবালাম বীচের সৌন্দর্যের ধারে কাছে আসতে পারে না বলে। যাবার সময় দেখলে প্রথম দেখা সমুদ্রতট হিসেবে নিশ্চয়ই মুগ্ধ হতাম, অবাক হতাম।

 টলেমি এবং পেরিপ্লাসের বর্ণনা থেকে জানা যায় সে কালে মামল্লপুরম বন্দরের খুব রমরমা ছিল। আমাদের তাম্রলিপ্তি বন্দরও তো প্রায় সমসাময়িক। কে জানে কত বাঙালি নাবিক এবং তামিল নাবিক যাওয়া আসা করেছে এই দুই বন্দরে! আজ সমুদ্রের লোনা হাওয়ায় ক্ষয়ে যেতে থাকা পরিত্যক্ত মামল্লপুরমের মন্দির, পঞ্চরথ, এবং পাথরে খোদাই অজস্র শিল্প দেখে কিছুটা আঁচ করা যায়, সেই সব দিনের গৌরব।

 একদিন খুব ভোরে আমরা রওনা দিলাম পূর্বঘাট পর্বতমালার ছোট্ট তিরুমালা পাহাড়ের চূড়ায় বিশ্বের ব্যস্ততম ও ধনীতম বালাজি তিরুপতি ভেংকটেশ্বরস্বামী মন্দির দর্শনে। তিরুপতি শহর তিরুমালা পাহাড়ের ঠিক নীচে, সেখান থেকে “তিরুমালা তিরুপতি দেবস্থানম” –এর ছোট ছোট বাস অনবরত নিয়ে চলেছে ৮৫৩ মি উঁচু পাহাড়ের ওপর। পাহাড়ের মাথায় বিস্তীর্ণ সমতল। মাঝখানে ঈপ্সিত মন্দির, চারদিকে দোকানপাট জমজমাট। গৃহস্থ সরঞ্জাম থেকে খাবার দাবার কি না পাওয়া যায় সে সব দোকানে।

 মন্দিরের দরজা সামনে হলেও সে পথে যাওয়া যাবে না। সে পথে যেতে গেলে হয় ভি আই পি হতে হবে অথবা মাথাপিছু একশ টাকার টিকিট কাটতে হবে। বিনি পয়সায় দর্শনও সম্ভব, সেক্ষেত্রে লোহার খাঁচায় ঘুরে ঘুরে আসতে হবে মানুষের সুদীর্ঘ লাইনের পিছনে। মাত্র একশ টাকার বিনিময়ে ভি আই পি হতে মা কিছুতেই রাজি হলেন না, অগত্যা আমরা আম জনতার লাইনে সামিল হলাম। প্রায় ঘন্টা তিনেক লোহার খাঁচার নানান গোলকধাঁধায় ঘুরে আমরা দর্শন পেলাম বাবা তিরুপতির। সামান্য কয়েক মূহুর্তের দর্শন, পিছনের এবং আশেপাশের মন্দির সঞ্চালকদের নিরন্তর ধাক্কায় তার বেশী দাঁড়াবার জো নেই।

 বাবা তিরুপতির মন্দিরে পুজো দিয়ে তাঁর আশীর্বাদ ও প্রসাদী লাড্ডু নিয়ে আমরা ফিরে এলাম মাদ্রাজ। এখান থেকেই আমাদের আগামীকাল ঘরে ফেরার ট্রেন। দীর্ঘ একুশদিনের যাত্রা শেষ, এবার ঘরে ফেরার জন্যে মন অস্থির। বাড়ি গিয়ে নিজের ঘরে পা ছড়িয়ে বসা আর ভাতের সঙ্গে বিউলিডাল আর আলুপোস্ত মেখে খাওয়ার শান্তি ফিরে পাওয়া।


যা দেখলাম, যা পেলাম তার হিসেব করার সময় এখন নয়। তার হিসেব করতে হবে অনেক দূরে অনেক দিনের পর। ততদিনে মন থেকে মুছে যাবে পথ চলার ছোটখাটো বাধা-বিঘ্ন, দুঃখ-কষ্টের স্মৃতি। মনে থাকবে শুধু বিচিত্র প্রকৃতি, যুগ যুগ ধরে গড়ে ওঠা মহিমময় ইতিহাস নিয়ে তীর্থস্থান, মানুষের গড়ে তোলা অসাধারণ শিল্পসৃজন। আর সবার ওপরে মনে থাকবে চলার পথে মনে থাকা আর মনে না থাকা অগণিত মানুষ।

এর পরের পর্ব - " বিচিত্র ঐক্য "



শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১৩

   ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের দ্বাদশ পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/১২ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.) 

ত্রয়োদশ পর্বাংশ 

৪.৭.২ কাশ্মীর

কাশ্মীরের ইতিহাসের সব থেকে নির্ভরযোগ্য নথি কলহনের “রাজতরঙ্গিণী”। কিন্তু কলহনের এই অমূল্য গ্রন্থের রচনাকাল ১১৫০ সি.ই., অতএব খুব স্বাভাবিক ভাবেই সপ্তম শতাব্দী বা তারও আগেকার ঘটনার ব্যাপারে রাজতরঙ্গিণী আমাদের খুব একটা সাহায্য করতে পারে না। সম্রাট অশোকের সময় কাশ্মীর মৌর্য সাম্রাজ্যেরই অংশ ছিল, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা করা যায়, কারণ সম্রাট অশোক কাশ্মীরে অনেকগুলি বৌদ্ধবিহার ও স্তূপ নির্মাণ করিয়েছিলেন এবং শ্রীনগর শহরের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অশোকের মৃত্যুর পর, শোনা যায়, তাঁর এক পুত্র জালুক বা জলোকা স্বাধীন কাশ্মীর রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার কয়েক শতাব্দী পরে কণিষ্ক এবং তাঁর পরবর্তী কুষাণ রাজারা কাশ্মীর শাসন করেছিলেন। গুপ্ত সাম্রাজ্যের আমলে কাশ্মীর স্বাধীন রাজ্য থাকলেও, হুণরাজ মিহিরকুল কাশ্মীরেই তাঁর রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

 ৪.৭.২.১ কাশ্মীরের করকোটক রাজবংশ

রাজা হর্ষবর্ধনের সঙ্গে কাশ্মীরের রাজা দুর্লভবর্ধনের ঘনিষ্ঠ মিত্রতা ছিল। এই রাজা দুর্লভ ছিলেন নাগ-করকোটক বংশের রাজা, এবং শোনা যায় তাঁরা নাকি পৌরাণিক গো-নন্দ বংশের বংশধর। রাজা দুর্লভ রাজা হর্ষকে ভগবান বুদ্ধের একটি “দাঁত”-এর অবশেষ উপহার দিয়েছিলেন, যেটি কনৌজের স্তূপে রাজা হর্ষ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর রাজত্বকালেই হুয়ান সাং কাশ্মীরে ৬৩১-৬৩৩ সি.ই. দু বছর ছিলেন।

এই বংশের সব থেকে শক্তিশালী এবং উদ্যোগী রাজা ছিলেন, ললিতাদিত্য মুক্তাপীড় (৭২৪-৭৬০ সি.ই.)। ললিতাদিত্য পাঞ্জাবের বেশ বড়ো একটা অংশ জয় করেছিলেন এবং তাঁর দিগ্বিজয়ের মধ্যে গৌড় এবং তিব্বতও ছিল। যদিও তিনি গৌড় অথবা তিব্বতে রাজ্য বিস্তার করেননি। মুক্তাপীড় চীনের সম্রাটের সভায় রাজদূত পাঠিয়েছিলেন। জানা যায় কাশ্মীরের সঙ্গে চীনের তার আগে থেকেই সুসম্পর্ক ছিল, কারণ মুক্তাপীড়ের পূর্ববর্তী রাজা চন্দ্রাপীড়কে সমসাময়িক চীন সম্রাট বিভূষিত করে সম্মান জানিয়েছিলেন। ললিতাদিত্য অনেকগুলি হিন্দু এবং বৌদ্ধ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার মধ্যে সূর্যদেবের–মার্তণ্ড মন্দির বিখ্যাত।

ললিতাদিত্যর নাতি জয়াপীড় বিনয়াদিত্য (৭৭৯-৮১০ সি.ই.) ককোটক বংশের পরবর্তী উল্লেখযোগ্য রাজা। জয়াপীড় নেপাল এবং পৌণ্ড্রবর্ধন (উত্তরবঙ্গ) পর্যন্ত অভিযান করেছিলেন। তিনি বিদ্যোৎসাহী রাজা ছিলেন, তাঁর সভায় বেশ কয়েকজন বিদ্বান ও পণ্ডিত মনীষীর নাম জানা যায়, যেমন উদ্ভাট, বামন এবং দামোদরগুপ্ত। জীবনের শেষ দিকে তিনি নাকি অর্থলিপ্সু এবং প্রজাপীড়ক রাজা হয়ে উঠেছিলেন, তার কারণ হয়তো বিভিন্ন অভিযানের জন্যে বিপুল অর্থব্যয় এবং রাজকোষ শূন্য হয়ে ওঠা! জয়াপীড়ের পরের রাজারা গুরুত্বহীন এবং দুর্বল হয়ে উঠেছিলেন এবং যার ফলে কিছুদিনের মধ্যে করকোটক বংশের পর নবম শতাব্দীর মাঝামাঝি উৎপল বংশের সৃষ্টি হয়েছিল।

 ৪.৭.২.২ কাশ্মীরের অন্যান্য রাজবংশ

উৎপল বংশের প্রথম রাজা অবন্তিবর্মন ৮৫৫ সি.ই.-তে রাজত্ব শুরু করেছিলেন। করকোটকদের রেখে যাওয়া শূন্যগর্ভ রাজকোষের জন্যে তিনি রাজ্যবিস্তার ছেড়ে, মন দিয়েছিলেন রাজ্যের আর্থিক উন্নতিতে। তিনি কাশ্মীরের সেচ ব্যবস্থার বিপুল উন্নতি করেছিলেন। এমনকি বাঁধ দিয়ে বিতস্তা (ঝিলাম) নদীর বন্যাকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেই জলও সেচের কাজে ব্যবহার করেছিলেন। রাজা অবন্তিবর্মনের নাম কাশ্মীরের মানুষ আজও মনে রেখেছেন, তাঁদের শহর অবন্তিপুরের নামে। অবন্তিবর্মনের পর কাশ্মীরের রাজা হয়েছিলেন তাঁর পুত্র শংকরবর্মন– ৮৮৩ সি.ই.-তে। শংকরবর্মন পিতার পথ অনুসরণ না করে রাজ্য জয় এবং অভিযানে মন দিয়েছিলেন। শংকরবর্মনের মৃত্যু হয়েছিল ৯০২ সি.ই.-তে। শংকরবর্মনের পুত্র গোপালবর্মন রাজা হলেও তিনি একটি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ৯০৪ সি.ই.-তে নিহত হন, তারপরেও ৯৩৯ সি.ই. পর্যন্ত উৎপল বংশের গুরুত্বহীন অস্তিত্বটুকুই অবশিষ্ট ছিল।

৯৩৯ সি.ই.-তে ব্রাহ্মণেরা রাজা গোপালবর্মনের মন্ত্রীর পুত্র প্রভাকরদেবকে রাজা নির্বাচিত করেছিলেন। তাঁর ৯৪৮ সি.ই. পর্যন্ত রাজত্বে রাজ্যে শান্তি এবং শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু ৯৪৯ সি.ই.-তে তাঁর পুত্র সংগ্রাম এবং অন্যান্য বংশধরকে হত্যা করে, নিজেই সিংহাসনে বসেছিলেন তাঁর মন্ত্রী পর্বগুপ্ত। এই বংশের সব থেকে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব একজন মহিলা, নাম দিদ্দা। দিদ্দা ছিলেন ভীমশাহির নাতনি এবং পুঞ্চের রাজা লোহার রাজসিংহর কন্যা। তিনি রাজা ক্ষেমগুপ্তর রানি হিসেবে (৯৫০-৯৫৮ সি.ই.), তারপর পুত্রের অভিভাবিকা হিসেবে এবং পরে নিজের হাতেই (৯৮০-১০০৩ সি.ই.) রাজ্যের শাসনভার তুলে নিয়েছিলেন।

রানি দিদ্দা মৃত্যুর আগেই, তাঁর ভাইয়ের পুত্র সংগ্রামরাজাকে সিংহাসনের উত্তরাধিকার দিয়েছিলেন। সুতরাং ১০০৩ সি.ই.-তে রাণির মৃত্যুর পর কাশ্মীরের রাজা হলেন লোহার বংশের সংগ্রামরাজ (১০০৩-২৮ সি.ই.)। সংগ্রামরাজ খুব সফল রাজা হয়ে উঠতে পারেননি, যার ফলে কাশ্মীরে বিশৃঙ্খলা এবং অরাজক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। অনেকেই রাজা হয়ে কিছুদিনের জন্যে সিংহাসনে বসেছেন, আবার কেউ না কেউ এসে তাঁদের সরিয়েও দিয়েছেন। যাই হোক এই ভাবে ১৩৩৯ সি.ই. পর্যন্ত কাশ্মীরে যে হিন্দু রাজত্ব কোনরকমে চলছিল, তার সমাপ্তি হল মুসলিম অভিযানকারী শাহ্‌ মিরের হাতে, তিনি শামসুদ্দিন রাজ বংশের সূচনা করলেন।

 ৪.৭.৩ বঙ্গ

নানান প্রত্ন-নিদর্শন থেকে স্পষ্ট ধারণা করা যায়, চতুর্থ এবং পঞ্চম শতাব্দীতে বঙ্গ গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর থেকে বঙ্গ কয়েকটি (সম্ভবতঃ চারটি) স্বাধীন রাজ্যে ভাগ হয়ে যায়। অন্ততঃ তিনজন রাজার নাম জানা যায়, যাঁরা দুর্বল গুপ্তদের বশ্যতা অস্বীকার করেছিলেন, যেমন ধর্মাদিত্য, গোপচন্দ্র এবং সমাচারদেব। ষষ্ঠ শতাব্দীতে বঙ্গের গৌড় অঞ্চল (পশ্চিম এবং উত্তর-পূর্ব বঙ্গ) মৌখরিদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ল।

 ৪.৭.৩.১ শশাঙ্ক

গৌড়ের সব থেকে বিতর্কিত রাজার নাম শশাঙ্ক। তাঁর সঙ্গে থানেশ্বরের পুষ্যভূতি এবং কনৌজের মৌখরিদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীতা ছিল। রাজা শশাঙ্কের পূর্বপুরুষ কিংবা তাঁর পরবর্তী কোন রাজাদের নামও শোনা যায় না। তবে অনুমান করা হয়, গুপ্ত রাজত্বের শেষ দিক থেকেই গৌড়ের সঙ্গে মৌখরিদের বিবাদের সূত্রপাত। সে সময় শশাঙ্ক  সম্ভবতঃ গুপ্তদের সামন্তরাজা ছিলেন। পরবর্তী সময়ে গুপ্তদের শক্তি হ্রাস হওয়াতে, শশাঙ্ক স্বাধীন রাজা হয়ে উঠেছিলেন এবং গুপ্ত এবং মৌখরিদের শত্রুতা কাজে লাগিয়ে, গৌড়ের সীমা পশ্চিমে বাড়াতে সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। প্রথমেই তিনি মালবের গুপ্ত-রাজ দেবগুপ্তর সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করলেন এবং যৌথভাবে মৌখরি রাজ্য আক্রমণ করলেন। এই যুদ্ধে মৌখরি রাজ গ্রহবর্মন নিহত হলেন, এবং তাঁর স্ত্রী রাজ্যশ্রীকে, যিনি থানেশ্বরের রাজা প্রভাকর বর্ধনের কন্যা ছিলেন, কনৌজের কারাগারে বন্দিনি করে রাখলেন।

প্রভাকর বর্ধনের জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজ্যবর্ধন বিশাল সৈন্য নিয়ে কনৌজ আক্রমণ করলেন, তাঁর বোনকে উদ্ধার করতে। রাজ্যবর্ধন দেবগুপ্তকে পরাজিত করলেন, কিন্তু ৬০৬ সি.ই.-তে নিজেই নিহত হলেন শশাঙ্কের হাতে। পূষ্যভূতি বংশের ঘনিষ্ঠ মিত্র, কবি বাণভট্ট এবং হুয়েনসাং–এর লেখা থেকে জানা যায়, শশাঙ্ক নাকি রাজ্যবর্ধনকে বিশ্বাসঘাতকতা করে হত্যা করেছিলেন। যাই হোক শশাঙ্ক খুব বেশি দিন কনৌজ অধিকারে রাখতে পারেননি।

রাজ্যবর্ধনের ভাই হর্ষবর্ধন নিশ্চয়ই তাঁর দাদা এবং বোনের প্রতি অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু শশাঙ্কের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা স্পষ্ট করে কিছুই জানা যায় না। এটুকু জানা যায়, হর্ষের সঙ্গে কামরূপের রাজা ভাস্করবর্মনের মৈত্রী সম্পর্ক ছিল। শশাঙ্কের রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ (মুর্শিদাবাদ জেলা, পঃবঙ্গ)। শশাঙ্কর রাজ্য গঞ্জাম (উড়িষ্যা) পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। শশাঙ্ক মারা যান হয় ৬১৯ অথবা ৬৩৭ সি.ই.-তে। সম্ভবতঃ শশাঙ্কের মৃত্যুর পর ভাস্করবর্মন কর্ণসুবর্ণ অধিকার করেছিলেন, এবং শশাঙ্কের উত্তরসূরিকে সিংহাসন চ্যুত করেছিলেন।

 ৪.৭.৩.২ বঙ্গের পালবংশ

শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বঙ্গে অরাজক অবস্থা চলেছিল বহুদিন, সংস্কৃতে যাকে “মাৎস্যন্যায়” যুগ বলা হয়ে থাকে। শশাঙ্কের মৃত্যুর কিছুদিন পরে হুয়েন সাং বঙ্গে এসেছিলেন। তাঁর বর্ণনা থেকে পাওয়া যায়, বঙ্গে তখন প্রধান রাজ্য ছিল চারটি পুণ্ড্রবর্ধন (উত্তরবঙ্গ), কর্ণসুবর্ণ (পশ্চিমবঙ্গের মধ্যভাগ), সমতট (দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গ) এবং তাম্রলিপ্তি (তমলুক–মেদিনিপুর এবং উড়িষ্যার পূর্বাংশ)। ভাস্করবর্মন কর্ণসুবর্ণ অধিকার করলেও, কর্ণসুবর্ণের প্রশাসনিক দায়িত্বে মনোনিবেশ করেছিলেন বলে মনে হয় না, তিনি করদ রাজ্য থেকে কর আদায়েই সন্তুষ্ট ছিলেন। ভাস্করবর্মনের পরে কনৌজের যশোবর্মন সম্পূর্ণ বঙ্গ অধিকার করেছিলেন বলে শোনা যায়, এমনকি কাশ্মীরের রাজা ললিতাদিত্য জয়াপীড়ও কিছুদিনের জন্যে বঙ্গ অধিকার করেছিলেন।

এইরকম অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি কোন সময়ে “জনগণ এই অরাজক (মাৎস্যন্যায়) পরিস্থিতি - প্রত্যেকেই যেন তার প্রতিবেশীর সহজ শিকার – থেকে মুক্তির জন্যে গোপালকে রাজা করলেন”! কোন দিক থেকেই গোপালের বংশ বা তাঁর পারিবারিক পটভূমি নিয়ে কোন কথাই শোনা যায় না। এমনকি গোপাল রাজা হয়েও, কোন পৌরাণিক কিংবা প্রাচীন রাজবংশের সঙ্গেও নিজেকে যুক্ত করেননি। যদিও অনেক পরবর্তীকালের লিপিতে পালবংশকে সৌরবংশের উত্তরসূরি বলে দাবি করা হয়েছে। গোপালকে বঙ্গ (পূর্ববঙ্গ) এবং গৌড়ের (পশ্চিমবঙ্গের) প্রভু বলা হলেও, তাঁর রাজনৈতিক কৃতিত্বের কোন তথ্য পাওয়া যায় না এবং অনুমান করা হয়, তাঁর রাজত্বকাল ৭৫০-৭৭০ সি.ই.।

গোপালের পর রাজা হয়েছিলেন তাঁর পুত্র ধর্মপাল (৭৭০-৮১০ সি.ই.)। তাঁর সময়েই পালরাজ্য প্রায় সাম্রাজ্য হয়ে উঠেছিল। তাঁর সমসাময়িক প্রতিহার রাজারা ছিলেন, বৎসরাজা (৭৩৮-৭৮৪ সি.ই.) এবং দ্বিতীয় নাগভাট (৮০৫-৮৩৩ সি.ই.)। দাক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূটবংশীয় রাজা ছিলেন ধ্রুব (৭৭৯-৭৯৩ সি.ই.) এবং তৃতীয় গোবিন্দ (৭৯৩ – ৮১৪ সি.ই.)। উত্তর ভারতের সার্বভৌম অধিকার পাওয়ার জন্যে এই রাজারা দীর্ঘদিন নিজেদের মধ্যে বারবার যুদ্ধ করেছেন, কিন্তু শেষ অব্দি প্রতিহাররাই আয়ত্ত্বে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। তবে কিছুদিনের জন্যে ধর্মপাল কনৌজ অধিকার করে চক্রায়ুধকে সামন্তরাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। এবং কখনো কখনো সমগ্র উত্তরভারত অধিকার করলেও স্থায়ীভাবে এবং স্বস্তিতে সাম্রাজ্য ভোগ করতে পারেননি।

ধর্মপালের পর রাজা হয়েছিলেন তাঁর পুত্র দেবপাল (৮১০ -৮৫০ সি.ই.), কিছু লিপি থেকে জানা যায়, তিনি উড়িষ্যা, প্রাগজ্যোতিষ বা কামরূপ, হুণ, গুর্জর এবং দ্রাবিড়দের পরাজিত করেছিলেন। তবে লিপি যাই বলুক, কামরূপ এবং উড়িষ্যা ছাড়া, তাঁর সম্পূর্ণ রাজত্বকাল ধরেই তাঁকে গুর্জর-প্রতিহার, রাষ্ট্রকূটদের সঙ্গে যুদ্ধ করে যেতে হয়েছে। দেবপালের মৃত্যুর পর পালরাজ্য বা সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে সংকীর্ণ ছোট এবং দুর্বল হয়ে পড়েছিল। দেবপালের পর পালবংশের রাজারা হলেন, প্রথম বিগ্রহপাল (৮৫০–৮৫৪ সি.ই.) এবং নারায়ণপাল (৮৫৪-৯০৮ সি.ই.)। নারায়ণপালের পর কামরূপ এবং উড়িষ্যা স্বাধীন রাজ্য হয়ে উঠেছিল। নারায়ণপালের পর রাজা হয়েছিলেন রাজ্যপাল (৯০৮-৯৪০ সি.ই.) এবং তারপর দ্বিতীয় গোপালের (৯৪০-৯৬০ সি.ই.) সময় পালরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল মগধ এবং উত্তরবঙ্গ। রাজ্যপালের সঙ্গে রাষ্ট্রকূট রাজকুমারীর সম্ভবতঃ বিবাহ হয়েছিল, হয়তো এই বৈবাহিক সম্পর্ক পালরাজাদের কিছুদিন স্বস্তি দিয়েছিল। কিন্তু প্রতিহারদের পতনের পর অনেকগুলি নতুন রাজবংশ উত্তরভারতে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, যেমন বুন্দেলখণ্ডের চান্দেল, চেদির (মধ্যপ্রদেশের) কলচুরি, মালবের পরমার, গুজরাটের চালুক্য এবং শাকম্ভরির (রাজপুতানা) চাহমান বা চৌহান। এই রাজবংশগুলির মধ্যে চান্দেল এবং কলচুরি বঙ্গ আক্রমণ করেছিলেন দ্বিতীয় গোপাল এবং দ্বিতীয় বিগ্রহপালের (৯৬০-৯৮৮ সি.ই.) রাজত্বে। সে সময় পালরাজাদের ক্ষমতা খুবই সীমিত হয়ে পড়েছিল। এরপর প্রথম মহীপাল (৯৮৮-১০৩৮ সি.ই.) পালরাজ্যের কিছুটা শক্তি ফিরিয়ে এনেছিলেন, কিন্তু বারবার চোল এবং কলচুরিদের আক্রমণের বিরুদ্ধে খুব একটা কিছু করতে পারেননি। তাঁর পরবর্তী পালরাজারা হলেন, নয়পাল (১০৩৮-১০৫৫ সি.ই.), তৃতীয় বিগ্রহপাল (১০৫৫-১০৭০ সি.ই.) এবং দ্বিতীয় মহীপাল (১০৭০-১০৭৫ সি.ই.)। উত্তরবঙ্গের একটি বিদ্রোহ সামলাতে গিয়ে সেখানেই দ্বিতীয় মহীপালের পরাজয় এবং মৃত্যু ঘটে, উত্তরবঙ্গের রাজা হন এক কৈবর্ত, দিব্য। এরপর পালরাজারা বাংলার ইতিহাসেও গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছিলেন।

পালরাজারা সকলেই বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন এবং বৌদ্ধধর্মের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। প্রধানতঃ পাল রাজাদের সময়েই বিহার ও বঙ্গে বৌদ্ধধর্মের প্রভাব বাকি ভারতবর্ষের তুলনায় অনেকটাই বেশি ছিল। পালরাজাদের পতনের পরপরই বৌদ্ধধর্মের প্রাধান্য ভারতবর্ষ থেকে প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল। পালরাজাদের আমলে বেশ কয়েকটি বৌদ্ধ বিহার নির্মিত হয়েছিল, যেমন বিক্রমশীলা, ওদন্তপুরি, রক্তমৃত্তিকা, সোমপুরা ইত্যাদি। এ সময়েই বাংলার সঙ্গে তিব্বত, নেপাল এবং বার্মার নিবিড় যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল।

পালরাজাদের সময়ে বাংলায় সংস্কৃতের গুরুত্ব বেড়ে উঠেছিল, যদিও মাগধী প্রাকৃত, অপভ্রংশ এবং বাংলাও প্রচলিত ছিল। এই সময়েই বাংলা ভাষার নিজস্ব লিপির প্রচলন হয়েছিল। প্রথম বাংলা ভাষার গ্রন্থ “চর্যাপদ” এই সময়কালেই রচিত।

 ৪.৭.৩.৩ বঙ্গের সেনবংশ

বঙ্গ থেকে পালবংশকে মুছে দিয়ে নতুন সেনবংশের সূত্রপাত করেছিলেন সামন্তসেন। যতদূর জানা যায় সেনরা দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটপ্রদেশ থেকে বঙ্গের রাঢ় অঞ্চলে এসেছিলেন। তাঁরা নিজেদের কর্ণাট-ক্ষত্রিয় এবং ব্রহ্ম-ক্ষত্রিয় নামে পরিচয় দিতেন এবং বলতেন সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা বীরসেন ছিলেন চন্দ্রবংশের বংশধর। সামন্তসেনের পৌত্র বিজয়সেন দীর্ঘ বাষট্টি বছর রাজত্ব করেছিলেন, (১০৯৫ -১১৫৮ সি.ই.)। তাঁর সময়েই সেনরাজ্য বিস্তার লাভ করেছিল এবং সম্পূর্ণ বঙ্গ সেন রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তিনি একসময় গঙ্গার তীর ধরে যুদ্ধ অভিযানে বেরিয়েছিলেন এবং পশ্চিমের বহু রাজ্যই নাকি তাঁর অধীনতা স্বীকার করে নিয়েছিল। অন্যদিকে তিনি হয়তো  কামরূপ এবং কলিঙ্গও অধিকার করেছিলেন।

 বিজয়সেনের পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর পুত্র বল্লাল সেন, তাঁর মাতা ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের শূর বংশের রাজকুমারী বিলাসদেবী। বল্লাল সেন কোন নতুন রাজ্য জয় করেননি, কিন্তু পিতার রাজ্য অক্ষত রাখতে পেরেছিলেন। পিতা বিজয়সেনের মতোই বল্লালসেনও শৈব ছিলেন। কথিত আছে বল্লালসেন বঙ্গের বর্ণ প্রথার সংস্কার করেছিলেন এবং তিনিই কৌলিন্য প্রথার প্রচলন করেছিলেন। কিন্তু এই প্রবাদের কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি পাওয়া যায় না। বল্লালসেন পণ্ডিত এবং বিদ্বান রাজা ছিলেন বলে শোনা যায়। তাঁর গুরুদেবের নির্দেশে তিনি দুটি গ্রন্থ সংকলন শুরু করেছিলেন - “দানসাগর” এবং “অদ্ভুতসাগর” - কিন্তু শেষ করতে পারেননি।

বল্লালসেনের পুত্র লক্ষ্মণসেনের যুদ্ধ জয়ে আগ্রহ ছিল। তিনি অভিযানে বেরিয়ে যে যে অঞ্চল জয় করেছিলেন, সেখানে বিজয়স্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করিয়েছিলেন। এরকম বিজয়স্তম্ভের নিদর্শন পাওয়া গেছে, বেনারস এবং এলাহাবাদে। সমসময়ে ওই দুই অঞ্চলের রাজা ছিলেন গাড়োয়াল বংশীয় শক্তিশালী রাজা জয়চন্দ্র। অতএব বেনারস ও এলাহাবাদ বিজয়ের কথা সত্যি হলে, তাঁকে বীর একথা মানতেই হয়। কিন্তু মুসলিম সেনাপতি মহম্মদ ইব্‌ন্‌ বখতিয়ার খিলজি বিহার জয় করে, যখন নদিয়া আক্রমণ করেছিলেন, সেসময় রাজা লক্ষ্মণসেন নাকি প্রাসাদের পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গঙ্গা পথে পূর্ববঙ্গে পালিয়েছিলেন! ১১৯৯ সি.ই.-তে নদিয়ার এই ঘটনায় রাজা লক্ষ্মণসেনের বীরত্বের কোন নিদর্শন পাওয়া যায়নি।

যদিও সম্পূর্ণ ঘটনাটি চিন্তা করলে পুরোটাই অবিশ্বাস্য মনে হয়। কারণ বখতিয়ার খিলজি বিহার জয় করেছিলেন ১১৯৭ সি.ই.-তে, শোনা যায়, তিনি সেখানে “মুণ্ডিতমস্তক ব্রাহ্মণ ও বৌদ্ধদের গণহত্যা করিয়েছিলেন”। তারপর তিনি নদিয়ার – লক্ষ্মণ সেনের তৎকালীন রাজধানী - দিকে এগিয়েছিলেন। বঙ্গ-বিহারের সীমান্ত থেকে রাজধানী নদিয়া পর্যন্ত বখতিয়ার খিলজি (শোনা যায় তাঁর সঙ্গে মাত্র আঠারোজন অশ্বারোহী সৈন্য ছিল) কোথাও কোন বাধা পেলেন না, সরাসরি রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করতে সক্ষম হলেন! এই বিষয়েই মনে ঘোরতর সন্দেহ আসে। সেনরাজাদের প্রশাসনিক এবং সামরিক ও নিরাপত্তা আধিকারিকদের চরম দুর্নীতি ও ষড়যন্ত্র ছাড়া এমন ঘটনা কী করে সম্ভব?

সে যাই হোক, লক্ষ্মণসেন এর পরেও ১২০৬ পর্যন্ত পূর্ববঙ্গে রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর পরেও সেনবংশ পূর্ববঙ্গে আরও প্রায় পঞ্চাশ বছর রাজত্ব করার পর, সমগ্র বঙ্গ মুসলিম অধীনে চলে গিয়েছিল। সম্প্রতি কিছু সূত্র থেকে জানা যায় লক্ষ্মণসেনের এক পুত্র রূপসেন ভাগ্যান্বেষণে উত্তর-পশ্চিম ভারতে চলে গিয়েছিলেন এবং পাঞ্জাবে ছোট্ট একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তার রাজধানী ছিল রূপনগর (রোপার)। পরবর্তীকালে, তাঁর বংশধরেরা আরও উত্তরে মান্ডি (হিমাচল প্রদেশ) অঞ্চলে দীর্ঘদিন রাজত্ব করেছিলেন[1]

পিতা বল্লাল সেনের মতো লক্ষ্মণসেনও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, তাঁর সভাকবি ছিলেন বিখ্যাত কবি জয়দেব এবং ধোয়ি। জয়দেবের কাব্য “গীতগোবিন্দ”-এর কথা আগেই বলেছি। ধোয়ির কাব্য “পবন-দূত”, মহাকবি কালিদাসের লেখা “মেঘদূত”-এর অক্ষম অনুসরণ। লক্ষ্মণসেন তাঁর পিতার অসমাপ্ত কাব্যগ্রন্থ “অদ্ভুতসাগর” সম্পূর্ণ করেছিলেন।


পরের পর্ব - " ধর্মাধর্ম - ৪/১৪ "


[1] কর্মসূত্রে দীর্ঘদিন হিমাচলের কুলু ও মাণ্ডি অঞ্চলে আমাকে বাস করতে হয়েছিল এবং সেই সময়েই বেশ কয়েকজন স্থানীয় “সেন-মহাশয়”-এর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। তাঁদের কেউই বাংলার সঙ্গে তাঁদের কোনরকম যোগসূত্রের কথা কোনদিনই শোনেননি, বরং আমার কৌতূহলে তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বেশ বিরক্তই হয়েছিলেন। কিন্তু আমার কৌতূহল তাতে নিবৃত্ত হয়নি, মাণ্ডি অঞ্চলের অনেক তথ্য ঘেঁটে রূপসেনের ঘটনাটি জানতে পারি। এই ঘটনার সঙ্গে হয়তো অনেক মিথ জড়িয়ে রয়েছে, কিন্তু রোপার ও মাণ্ডির সঙ্গে বাংলার সেনবংশের কোন একটা ঐতিহাসিক যোগসূত্র যে ছিল, সেটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। তার সমর্থনে একটি লিংক এখানে শেয়ার করলাম - https://hpmandi.nic.in/history/  


শুক্রবার, ৩ এপ্রিল, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৪

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১


  আগের পর্ব ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৩ "


 

শৌনক জিজ্ঞাসা করলেন, “হে সূত, দেবর্ষি চলে যাবার পর, মহামুনি বেদব্যাস তাঁর ইচ্ছার কথা যা শুনলেন, সে বিষয়ে কী করলেন?”

সূত বললেন, “সরস্বতী নদীর পশ্চিমতীরে ঋষিদের যজ্ঞ অনুষ্ঠানের অনুকূল শম্যাপ্রাস নামে এক বিখ্যাত আশ্রম আছে। সেই আশ্রমে অন্যান্য ব্রাহ্মণদের সঙ্গে আসনে উপবেশন করে, মহামুনি বেদব্যাস আচমন করে সমাধিযোগে চিত্তকে স্থির করলেন। ভক্তিযোগে তাঁর নির্মল চিত্ত নিশ্চল হওয়ার পর তিনি পূর্ণপুরুষ ভগবান ও তাঁর অধীন মায়াকে উপলব্ধি করলেন। এই মায়ায় মুগ্ধ জীব ত্রিগুণের অতীত নিজের স্বরূপ বুঝতে না পেরে, “আমিই কর্তা, আমিই ভোক্তা” ইত্যাদি ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে অনর্থ লাভ করে। তিনি আরও উপলব্ধি করলেন, অধোক্ষজে ভক্তি হলে, সমস্ত অনর্থের নিষ্পত্তি হয়। এই কারণেই তিনি অজ্ঞ লোকের হিত কামনায় শ্রীভাগবৎসংহিতা রচনা করলেন। এই ভাগবত শুনতে শুনতেই শ্রীকৃষ্ণের চরণে ভক্তির উদয় হয় এবং জীবের শোক, মোহ ও ভয় দূর হয়ে যায়। তিনি ভক্তি প্রধান শ্রীভাগবৎসংহিতা রচনা করে, নিজের পুত্র যোগীশ্রেষ্ঠ শুকদেবকে এই গ্রন্থ পাঠ করালেন”

শৌণক জিজ্ঞাসা করলেন, “মহাযোগী শুকদেব সর্বদাই নিবৃত্তিমার্গে বিচরণ করে থাকেন; কোন বিষয়েই তাঁর প্রবৃত্তি বা আসক্তি ছিল না, সুতরাং তিনি কিসের হেতু এই গ্রন্থ পাঠ করলেন”?

সূত বললেন, “এও শ্রীহরির অলৌকিক গুণমাধুর্য। হরিভক্তগণ শ্রীশুকদেবের অত্যন্ত প্রিয়, তিনি শাস্ত্র ইত্যাদির ব্যাখ্যা উপলক্ষে তাঁদের সঙ্গে শ্রীহরির গুণকীর্তন করতে ভালবাসেন। এই কারণেই তিনি শ্রীহরির গুণ কীর্তন মাধুর্যে আকৃষ্ট হয়ে, এই সুবৃহৎ ভাগবতসংহিতা পাঠ করেছিলেন।

এখন আমি আপনাদের রাজর্ষি পরীক্ষিতের জন্ম, কর্ম ও মুক্তি, যার থেকে কৃষ্ণকথার প্রসঙ্গও আসবে এবং পাণ্ডুপুত্রদের মহাপ্রস্থানের আখ্যান বর্ণনা করব, শুনুন।  


অশ্বত্থামার শাস্তিবিধান

কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধ তখন প্রায় শেষ। কুরু এবং পাণ্ডব পক্ষের অনেক বীর এই যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দিয়েছেন। মহাবীর ভীমের গদার আঘাতে, দুর্যোধনের উরুভঙ্গ হয়েছে। বহু প্রিয়জন, আপনজন হারিয়ে পঙ্গু দুর্যোধন এখন বিষণ্ণ ও বিধ্বস্ত। তাঁকে খুশী করার জন্যে আচার্য দ্রোণের পুত্র অশ্বত্থামা একটি বীভৎস কাণ্ড করে ফেললেন। দ্রৌপদীর ঘুমিয়ে থাকা পাঁচ শিশু পুত্রের মাথা কেটে নিয়ে এলেন দুর্যোধনের সামনে, তাঁর আশা শত্রুপক্ষের এই নিদারুণ ক্ষতি দেখে দুর্যোধন যদি একটু শান্তি পান। কিন্তু দুর্যোধন মোটেই খুশী হলেন না বরং আরো হতাশার মধ্যে ডুবে গেলেন। অশ্বত্থামার মতো বীর তাঁর পক্ষে আছে ভেবে, একসময় তিনি গর্ব বোধ করতেন। আজ সেই অশ্বত্থামার এই উৎকট দুর্মতি দেখে তিনি নিজেকেই ধিক্কার দিলেন বারবার।  তীব্র ঘৃণায় তিনি মুখ ফিরিয়ে রইলেন।

[মহাভারতেও আছে দ্রৌপদীর পাঁচ শিশু বা বালক পুত্রকে হত্যা করার জন্যে দুর্যোধন অশ্বত্থামাকে তীব্র ভর্ৎসনা করেছিলেন, ধিক্কার দিয়েছিলেন। বলেছিলেন এই কাজ সনাতনী যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধ। অর্থাৎ পরমশত্রুর শিশুপুত্রদেরও হত্যা করে, তাদের নির্বংশ করাটা ভারতের যুদ্ধনীতি ছিল না। কিন্তু পরবর্তীযুগে বিধর্মীদের সঙ্গে যুদ্ধকালে এই নীতির কারণে সনাতনী যোদ্ধাদের বারবার মাশুল গুনতে হয়েছে।]           

এদিকে জননী দ্রৌপদী, তাঁর নিরীহ পাঁচপুত্রের হত্যার সংবাদে ভেঙে পড়লেন। শোকে, দুঃখে পাগলিনীর মতো তিনি বিলাপ করতে লাগলেন। তাঁর এই করুণ অবস্থা দেখে অর্জুন প্রতিজ্ঞা করলেন, অশ্বত্থামাকে তিনি হত্যা করে, তিনি এর প্রতিশোধ নেবেন। বললেন, হে কৃষ্ণা, যেদিন আমি ঐ অশ্বত্থামার কাটা মাথা নিয়ে আসব, সেদিন ওই মাথার ওপর বসে তুমি স্নান করো, সেই দিন তোমার পুত্রশোকের জ্বালা কমবে। এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে আর দ্রৌপদীকে বারবার সান্ত্বনা দিয়ে, অর্জুন আবার যুদ্ধ সাজে সাজলেন, চড়ে বসলেন তাঁর কপিধ্বজ রথে। এবারেও সেই রথের সারথি হলেন, স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ।

দূর থেকে কপিধ্বজ রথ আসতে দেখেই, শিশু হত্যাকারী অশ্বত্থামা বুঝতে পারলেন, অর্জুন আর শ্রীকৃষ্ণ আসছেন, তাঁকেই হত্যা করতে। ভয়ে তিনি পালাতে লাগলেন, প্রাণপণে ছুটিয়ে দিলেন, তাঁর রথের ঘোড়া। অনেকক্ষণ এই ভাবে দৌড়তে দৌড়তে, অশ্বত্থামার ঘোড়াগুলি ক্লান্ত হয়ে পড়ল, তাদের গতি কমে আসতে লাগল। অশ্বত্থামা বুঝতে পারলেন, পালিয়ে বাঁচা যাবে না, যদি কোনভাবে অর্জুনকে আটকে রাখা যায়, অথবা হত্যা করা যায়, তবেই প্রাণ রক্ষা সম্ভব। বাঁচার একমাত্র রাস্তা প্রতি-আক্রমণ। অশ্বত্থামা ঘুরে দাঁড়ালেন, তাঁর কাছে সবচেয়ে ভয়ংকর যে তির ছিল, তার নাম ব্রহ্মশির। এই ব্রহ্মশিরের প্রয়োগ করার নিয়ম তাঁর জানা থাকলেও, এর নিবারণের নিয়ম তাঁর জানা ছিল না। কিন্তু তাঁর তখন এতসব ভাবনার অবকাশ নেই, বাঁচার একমাত্র আশায় তিনি অর্জুনের প্রতি ব্রহ্মশির নিক্ষেপ করলেন।

ব্রহ্মশিরের তেজে চারদিক ঝলসে উঠল। মহাবীর অর্জুনও চমকে উঠলেন এই অস্ত্রের তেজে। তিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জিগ্যেস করলেন, “হে কৃষ্ণ, চারিদিকে এই যে প্রচণ্ড তেজ, সবদিক মনে হচ্ছে যেন গ্রাস করে ফেলবে, এ সব কী, কোথা থেকে হল”?

শ্রীকৃষ্ণ খুব শান্তভাবে, বললেন, “হে পার্থ, এ হচ্ছে ব্রহ্মশির, ব্রহ্মাস্ত্র। আচার্য দ্রোণের পুত্র অশ্বত্থামা এই তির আমাদের দিকে নিক্ষেপ করেছেনঅশ্বত্থামা এই তির শুধু ছুঁড়তেই জানেন, একে নিরস্ত করতে শেখেননি। তোমার কাছেও ব্রহ্মাস্ত্র রয়েছে, অর্জুন, এবং তুমি ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ ও নিবারণ দুটোই জানো। কাজেই তুমি তোমার ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করে, ওই ব্রহ্মাস্ত্রের তেজ নিবারণ করো। কারণ, এই অস্ত্রে এই জগতের বহু নিরীহ জীবের অকারণ বিনাশ আমি চাই না”

[তখনকার যুগে প্রকৃত বীরদের ভয়ানক অস্ত্র প্রয়োগ এবং নিবারণ অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণের বিধিও জানতে হত। আজকের যুগে নিউক্লিয়ার অস্ত্র প্রয়োগের টেকনোলজি বিশ্বে অনেকেই জানে, কিন্তু তাকে নিবারণ করার উপায় কি কারো জানা আছে?]     

অর্জুন তাই করলেন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে প্রদক্ষিণ করে, তাঁর নিজের ব্রহ্মাস্ত্র নিয়োগ করলেন, অশ্বত্থামার অস্ত্রের তেজ নিবারণের জন্যে।

ব্রহ্মাস্ত্র নিবারণের পর অর্জুন, ভীত, পরাস্ত অশ্বত্থামাকে বলির পশুর মতো, দড়ি দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেললেন।  তারপর রথে চাপিয়ে ফিরে চললেন হস্তিনাপুরের দিকে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, “হে প্রিয়সখা অর্জুন, তুমি অশ্বত্থামাকে হত্যা করছো না কেন? ধরিত্রীর বোঝা স্বরূপ এই পাপিষ্ঠকে রথে চড়িয়ে তুমি কোথায় নিয়ে চললে”?

অর্জুন বললেন, “হে কৃষ্ণ, ওকে হত্যা করা আমার পক্ষে অসম্ভব। কারণ ওর পিতা ছিলেন আমার গুরু”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন, “কিন্তু তুমি তো পাঞ্চালীর কাছে প্রতিজ্ঞা করে এসেছ, যে তুমি ওর কাটা মুণ্ড নিয়ে আসবে। যে নীচ, ঘুমন্ত শিশু এবং বালককে হত্যা করতে পারে, তাকে ক্ষমা করতে চাও কোন ধর্মের নীতিতে? এই অশ্বত্থামা ব্রাহ্মণের কলঙ্ক। এই ব্রাহ্মণকে হত্যা করলে কোন পাপ হয় না। কারণ অশ্বত্থামা যে পাপ করেছে, তার শাস্তি মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না”

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বারবার অর্জুনকে এই কথা বলে উত্তেজিত করার চেষ্টা করলেন, কিন্তু অর্জুন অশ্বত্থামাকে হত্যা করলেন না।

শোকবিহ্বলা দ্রৌপদী যে শিবিরে ছিলেন, অর্জুন বন্দী অশ্বত্থামাকে সেইখানে নিয়ে গিয়ে দ্রৌপদীর সামনে নিক্ষেপ করলেনদড়িতে আবদ্ধ পশুর মতো নির্জীব এই অশ্বত্থামাকে দেখে দ্রৌপদীর মনে মায়া হলতিনি অর্জুনকে প্রণাম করে বললেন, “হে স্বামী, অশ্বত্থামাকে, মুক্ত করো, ওঁকে ছেড়ে দাও। এই অশ্বত্থামা ব্রাহ্মণ, তোমার গুরুর পুত্র। আচার্য দ্রোণ যুদ্ধক্ষেত্রে মারা গিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সেই আচার্যই তো আমাদের সামনে রয়েছেন তাঁর এই পুত্রের রূপে। এঁকে হত্যা করলে এঁর বৃদ্ধা মা গৌতমী, আমার মতোই শোকে পাগল হয়ে যাবেন। সে আমি আদৌ চাই না। এই অশ্বত্থামার জঘন্য একটা পাপের শাস্তি বিধান করতে গিয়ে, আরো একটা পাপ কর্মে প্রবৃত্ত হওয়া উচিত নয়, হে বীরশ্রেষ্ঠ”

[এও এক আশ্চর্য ক্ষতিকারক ভারতীয় ধর্মনীতি - পুত্রহন্তারকের প্রতিও এত মমত্ববোধ!]   

অর্জুন ও দ্রৌপদীর এই ধর্ম ও ন্যায় বিচারকে উপস্থিত সকলেই সমর্থন করলেও, ভীম সম্মত হলেন না। তিনি বললেন, “নিদ্রিত পাঁচটি নিষ্পাপ শিশুকে যে হত্যা করতে পারে, তাকে হত্যা করাই একমাত্র বিচার এবং আমিই এই অশ্বত্থামাকে হত্যা করব”।  এই বলে তিনি অশ্বত্থামাকে হত্যা করতে উদ্যত হলে, দ্রৌপদী তাঁকে নিরস্ত করতে গেলেন। তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভীমকেও নিরস্ত করে, অর্জুন এবং উপস্থিত সকলের প্রতি মৃদু হেসে বললেন, “ব্রাহ্মণ অধম হলেও তাঁকে বধ করা যায় না এবং স্বজন হত্যাকারীর শাস্তি মৃত্যু – এই দুটি বিধিই আমার তৈরি। হে পার্থ, তুমি আবার অশ্বত্থামাকে বধ করবে বলে দ্রৌপদীর কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। অতএব সবার সব দিক যাতে রক্ষা হয়, সে ব্যবস্থা এখন তোমাকেই করতে হবে”

ভগবানের পরমভক্ত অর্জুন, শ্রীকৃষ্ণের এই ইঙ্গিত বুঝতে পেরে খড়্গ দিয়ে অশ্বত্থামার মাথার চুল এবং চুলের সঙ্গে তাঁর মাথার মণি কেটে নিলেন। তারপর তাঁকে শিবির থেকে বের করে দিয়ে, রাজ্য ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। সর্বহারা ব্রাহ্মণের জনসমক্ষে এই অসম্মান ও নির্বাসন, তাঁর মৃত্যুর সমান”

[অশ্বত্থামার মাথার মণি ব্যাপারটা ঠিক কি বোঝা যায় না। জন্ম থেকেই তাঁর মাথায় বা কপালে কি কোন টিউমার ছিল? শ্রীকৃষ্ণের ইঙ্গিতে অর্জুন সেই টিউমার কেটে ফেললেন, তাতে অশ্বত্থামার মৃত্যু হল না - কিন্তু মৃত্যু-তুল্য অভিঘাতই বা হল কী করে?

মহাভারতে কর্ণের ক্ষেত্রে অনুরূপ ঘটনার কথা আছে। সূর্য-তনয় কর্ণ নাকি জন্ম থেকেই (রক্ষা) কবচধারী ছিলেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে দেবরাজ ইন্দ্র সেই কবচ কর্ণের থেকে দান হিসাবে গ্রহণ করে নেওয়ার ফলে কর্ণের (সূর্যের থেকে পাওয়া) দৈবী-রক্ষণশক্তি বিনষ্ট হয়। এই কবচ ব্যাপারটাই বা কি, সেটাও বোঝা যায় না।]      

পরের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৫ "


নতুন পোস্টগুলি

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ৮

   এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য " ...