শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬

মানিকজোড়

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "



এর আগের পর্ব - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - শেষ পর্ব 


 

প্রত্যেকবার পুজোর সময় বড়দাদু এবং ছোড়দাদুর এই বাড়িতে আত্মীয় পরিজনের বিরাট এক জমায়েত হয়। নাতি-নাতনি, ছেলে, মেয়ে, বৌমা এবং জামাইদের উপস্থিতিতে এই জমায়েত হয়ে ওঠে জমজমাট। পুজোর কটাদিন হইহুল্লোড়, আনন্দ, খাওয়াদাওয়া তো হয়ই – সে আর নতুন কি? সব বাড়িতেই হয়। তাছাড়াও হয় অন্তাক্ষরী, ধাঁধার খেলা, ভাষায় ভাসো, শব্দজব্দের মতো নানান মজার মজার খেলা। আর সবার শেষে হয়, ছোড়দাদুর গল্প। সে গল্পটা উনি বলেন, মা দুগ্‌গার বিসর্জনের পর। পুজোর আনন্দ যখন শেষ, সকলেরই মন-টন খারাপ। আগামীকাল ভোরে সব্বাইকে চলে যেতে হবে যার যার নিজের নিজের কাজের জায়গায়। কেউ যাবে ব্যাঙ্গালুরু, কেউ পুনে। কেউ বা সিঙ্গাপুর, আবার কেউ লণ্ডন।

এবারও তাই হয়েছে। আজ সন্ধের পর বিজয়া দশমীর প্রণাম-ট্রণাম সেরে, কুচো নিমকি, ঠাম্মিদের বানানো নারকেলের নাড়ু আর নিরিমিষ ঘুগনি খেয়ে সব্বাই গোল হয়ে ঘিরে বসল, ছোড়দাদু আর বড়দাদুকে। ছোড়দাদু গল্প শুরু করেছিলেন। মিঠুর মতো ক্লাস টুয়ে পড়া পুঁচকে থেকে বড়োরা সবাই মন দিয়ে শুনছিল সে গল্প। ছোড়দাদুর গল্প বলার এমনই জাদু, সকলেই মুগ্ধ হয়ে যায়। এমনকি বড়ো ঠাম্মি আর ছোট ঠাম্মিও, সিঁথিঁতে একগাদা সিঁদুর, কপালে এত্তো বড়ো সিঁদুরের টিপ পরে, মাথায় লাল নকশাপাড় শাড়ির আল্গা ঘোমটা টেনে চুপ করে বসে সে গল্প শোনেন। ছোট ঠাম্মি নাকের ডগায় নেমে আসা চশমার উপর দিয়ে, নিজের কত্তার দিকে তাকিয়ে থাকেন, আর পানখাওয়া রাঙা টুকটুকে ঠোঁটে মুচকি হাসি নিয়ে গল্পের মজা নেন।

আজকে গল্প শুনতে শুনতে, একদম শেষের দিকে ঘরের সব্বাই এমন চমকে উঠল, অথবা বলা ভাল আঁতকে উঠল, সে আর বলার নয়। সে সময় রঘুনাথদা ঘরে এসেছিল কী একটা জিগ্‌গেস করতে, কথা শেষ করতে পারল না, “কত্তাবাবুরা, দাদা-দিদিমণিদের আগে খাবে, নাকি...” বলেই, চোখ উল্টে ধড়াস করে পড়ল দরজার সামনেই। তারপর সে এক হুলস্থূল ব্যাপার!

নাঃ এভাবে নয়, শুরু থেকে না বললে, ব্যাপারটা কী সাংঘাতিক, বোঝা যাবে না।

 

*    *    *

 

শান্তিপুর শহর থেকে পশ্চিমে সাত আটমাইল গেলেই বড়হুজুরপুর গ্রামে সান্যালদের বিশাল বাড়ি। একসময়ে এই অঞ্চলের জমিদার ছিলেন, এই সান্যালদের প্রপিতামহ, বৃদ্ধপ্রপিতামহরা। আশেপাশের গ্রামের প্রজারা, তাঁদের বড়হুজুর বলত, আর তার থেকেই এই গ্রামের নাম বড়হুজুরপুর। তা সে জমিদারি প্রথা বহুদিন আগেই লোপ পেয়ে গেলেও, এই গ্রামের নামটা আর ওই বড় বাড়িটা রয়ে গেছে একই রকম। আর রয়ে গেছে দুর্গাপুজো, একই রকম একচালা ঠাকুর। হাতের আর বুকের গুলি পাকানো সবুজ রঙের অসুর। আর অসুরের ডান হাত কামড়ে ধরা ঘোড়ার মতো দেখতে লাল টুকটুকে সিঙ্গি।

বড়দাদু আর ছোড়দাদু এই বাড়িরই ছেলে। যমজ। বড়দাদু আর ছোড়দাদুর বয়েসের তফাৎ মাত্র তিন মিনিট। আর সেই ছোট্টবেলা থেকে আজ এই বৃদ্ধ বয়েস পর্যন্ত বড়দাদুর দুঃখ, ছোড়দাদু তাঁকে “দাদা” বলেন না। ওঁদের দাদু, ঠাম্মা, বাবা-মা সকলেই অনেকবার ছোড়দাদুকে বকাবকি করেছেন, বলেছেন, তিন মিনিটই হোক আর তিন বছর, আগে জন্মেছে, মানেই অগ্রজ, অর্থাৎ দাদা। দাদা বলবি। তাতে ছোড়দাদু বলতেন এবং আজও বলেন, ছোঃ বোঁচা আমার তিন মিনিট আগে জন্মে কী এমন বেশি শিখে ফেলেছে, যে ওকে দাদা বলতে হবে? তাও যদি আমার থেকে দুটো চারটে হাত-পা বেশি গজিয়ে যেত তো বুঝতাম! বড়োদাদুর ডাক নাম বোঁচা, ভাল নাম নৃপেন্দ্রনাথ। আর ছোড়দাদুর নাম খ্যাঁদা, ভাল নাম খগেন্দ্রনাথ।

বড়োদাদুর যতোই দুঃখ-টুঃখ থাক, দুই ভাইয়ের মধ্যে ভাব-ভালোবাসার কখনো অভাব হয়নি। যাকে বলে গলায়-গলায়। ওঠা-বসা, খাওয়া-ঘুমোনো, স্কুলে যাওয়া কলেজে যাওয়া, সবই একসঙ্গে। তবে লেখাপড়ার শেষে চাকরি জীবনে তাঁদের আলাদাই থাকতে হয়েছিল। বড়দাদু রেলের বড়ো অফিসার ছিলেন, আজ দিল্লি, কাল চেন্নাই, পরশু মুম্বাই করে বেড়াতেন। আর ছোড়দাদু ছিলেন একটি ব্যাংকের জাঁদরেল ম্যানেজার। তিনিও এদেশের এদিক সেদিক কম ঘোরাঘুরি করেননি। চাকরি জীবনে সারা বছরে তাঁদের দেখা সাক্ষাৎ হত কমই, মেরেকেটে বছরে বার তিন চারেক। এক হত পুজোর সময় এই বাড়িতে, তাছাড়া ছেলেমেয়েদের স্কুল কলেজের ছুটিছাটাতে, এক ভাই অন্য ভাইয়ের বাড়িতে কদিনের জন্যে ছুটি কাটিয়ে আসতেন সপরিবারে।

রিটায়ারমেন্টের পর তাঁদের ছেলেমেয়েরা প্রস্তাব করেছিল, কলকাতা কিংবা দিল্লিতে বাড়ি বা ফ্ল্যাট নিয়ে সবাই মিলে একসঙ্গে থাকতে। দুভাই সে কথায় কানই দেননি, বলেছিলেন, পাগল না মাথা-খারাপ? এতদিন পেটের দায়ে এদিক সেদিক ঘুরে ঘুরে মাথার মধ্যে চক্কর লেগে গেছে, এবার বড়োহুজুরপুরে থিতু হয়ে সেটাকে বাগে আনতে হবে। তাছাড়া এমন সবুজ মাঠ-ঘাট, আকাশ-বাতাসের নির্মল শ্বাস-প্রশ্বাস ছেড়ে কলকাতা-দিল্লীর ধোঁয়া গিলতে যাওয়ার কোন মানে হয়? এই গ্রামে ফিরে আসার আগেই দুই ভাইয়ের ছেলে মেয়েদের সকলেই চাকরি বাকরি নিয়ে, বিয়ে থা করে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে বিভিন্ন শহরে। অতএব দুই ভাই তাঁদের স্ত্রীদের নিয়ে  গ্রামে ফেরার সময় খুব কড়া করে ছেলে-মেয়েদের বলে দিয়েছিলেন, সারা বছর বাইরে থাকো, ক্ষতি নেই, কিন্তু পুজোর সময় বাড়ি না এলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে। কী খারাপ হবে, তাঁরা বলেননি। তবে বাচ্চাদের নিয়ে পুজোর সময়, সকলে মিলে এত আনন্দ আর হৈ হুল্লোড় হয়, যে না এলে যে খুব খারাপ লাগবে, সেটা বলাই বাহুল্য।

সেই হৈ হুল্লোড়ের শেষদিকে, একাদশীর সন্ধ্যেয় ছোড়দাদুর দায়িত্ব সক্কলকে একটা গল্প শোনানো। সে গল্প এমন হতে হবে, সবারই যেন শুনতে ভালো লাগে, বাচ্চা থেকে বয়স্কবড়োরা যেন মনে না করে, এটা তো বাচ্চাদের জন্যে। অথবা ছোটরা যেন মনে না করে, এটা বড়োদের জন্যে। ব্যাপারটা খুবই শক্ত, কিন্তু ছোড়দাদু এই বড়োহুজুরপুরে আসার পর থেকে, আটবছর ধরে এমন গল্পই বলে চলেছেন, যে গল্পে সকলেই মজা পায়, কিংবা চমকে ওঠে।

আজও তিনি শুরু করলেন, “তখন আমরা, মানে বোঁচা আর আমি এখানকার ষোড়শীবালা স্মৃতি বিদ্যামন্দিরে ক্লাস সেভেনে পড়ি। লেখাপড়ায় খুব খারাপ ছিলাম না। বোঁচা আর আমার মধ্যেই ক্লাসের ফার্স্ট আর সেকেণ্ড পজিসনটা নিয়ে খুব লড়ালড়ি হত। কোনবার বোঁচা, কোনবার আমি ফার্স্ট হতাম। সেকেণ্ড হলে বোঁচা আমাকে মুখ ভেঙিয়ে জিভ বের করে বলত, হতভাগা, আমার হোমটাস্কের খাতা মুখস্থ করে তুই ফার্স্ট হয়েছিস! আর আমি বলতাম, য্যাঃ য্যাঃ, আমার হোমটাস্কের খাতা এবার থেকে তোকে আর দেখাবই না, দেখি কেমন করে তুই পরের বার সেকেণ্ড হতে পারিস!

তখন আমরা ক্লাস সেভেনে পড়িকলকাতা বা শহরের স্কুলে যেমন গরমের ছুটি পড়ে, আমাদের এই গ্রামের দিকে তখন বর্ষার ছুটি পড়ত। বর্ষার সময়ে জলে কাদায় কাঁচা রাস্তাগুলো নষ্ট হয়ে যেত, মাঠ-ঘাট, খাল-বিল-পুকুর জলে ডুবে একাকার হয়ে থাকত। তাছাড়া গ্রামের লোকদের প্রধান কাজ তো চাষবাস, ওই সময় স্কুল ছুটি থাকলে তাঁদেরও কাজের সুবিধে হত।

তবে আমাদের এই বর্ষার সময়টা খুব একঘেয়ে লাগত। বৃষ্টি আর বৃষ্টি, চারদিকেই থৈথৈ করছে জল। ফুটবল-নিয়ে জলভরা মাঠে আর কতক্ষণ খেলা যায়? ঘরে বসে পড়ার বই কিংবা গল্পের বই পড়ে কাঁহাতক সময় কাটানো যায়? বাড়িতে বসে থেকে থেকে, আমাদের মাথায় নানারকম দুষ্টুমির বুদ্ধি আসত আর দুষ্টুমি করে ঠাকুমার তুলতুলে হাতে মার খেয়ে, প্রচুর মোয়া আর পাটালি খেতাম”

বড়দাদুর বড় নাতি, মিন্টু বলল, “ও ছোড়দাদু, ঠাকুমার হাতে মারও খেতে, তারপরে আবার মোয়া আর পাটালিও খেতে?”

ছোড়দাদু চোখ মটকে হেসে বললেন, “ওইটেই তো মজা ছিল রে, মিন্টু। ঠাকুমা রেগে-টেগে গিয়ে পিঠে গুপ গুপ করে কিল দিতেন, দু চারটে। তারপরেই মনের দুঃখে প্রায় কেঁদে ফেলতেন, আহা, খ্যাঁদাটাকে মারলাম! ভাঁড়ার ঘর থেকে মুড়ি বা খইয়ের মোয়া, কিংবা গুড়ের পাটালি বের করে এনে, কোলের কাছে বসিয়ে খাওয়াতেন। পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস  করতেন, হ্যা রে, খুব লাগেনি তো? সারাদিন এত ফচকেমি করিস কেন, বল তো মুখপোড়া! আরেকটা মোয়া দিচ্ছি, আস্তে আস্তে খা”। রান্নাঘরের পিঁড়ে থেকে মা-কাকিমারা আমাদের দেখতেন, আর মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হেসে খুন হতেন।

সেবার এরকম বর্ষার ছুটিতে আমরা যখন ঘরে বসে বসে দুর্দান্ত দুষ্টু হয়ে উঠছি, সে সময় খবর এল, পিসিমার বাড়িতে ওঁর গুরুদেব এসেছেন। পিসিমা আমাদের সকলকেই একবার যেতে বলেছেন। ঠাকুমা, বাবা, কাকা, মা, কাকিমাদের মধ্যে জোর আলোচনা চলল, পুঁটু যখন যাওয়ার জন্যে খবর পাঠিয়েছে, তখন কারো একবার যাওয়া উচিৎ। আমাদের পিসিমার ডাকনাম পুঁটু। আমাদের বাবারা ছিলেন তিনভাই আর এক বোন - এই পুঁটুপিসিমা। পিসিমা সবার ছোট বলে দাদাদের খুব আদরের বোন ছিলেন। বাবা তো পিসিমাকে ভীষণ ভালোবাসতেন। পিসিমার এই গুরুদেব ছিলেন, একেবারে সিদ্ধ পুরুষ। পাঁচ-ছ বছর অন্তর তিনি পিসিমার বাড়ি আসতেন। দিন পনের থেকে অন্য কোথাও চলে যেতেন। তবে পিসিমা বলতেন, উনি হিমালয় থেকে আসতেন এবং আবার হিমালয়েই ফিরে যেতেন”

বড়োদাদুর ছোট নাতি, পিকলু বলল, “সিদ্ধ মানে? আলু সেদ্ধ, ডিম সেদ্ধ হয় শুনেছি, সেরকম কিছু?”

ছোড়দাদু হা হা করে হাসলেন খানিক, তারপর বললেন, “আমরাও তাই ভেবেছিলাম প্রথমে। কিন্তু ইনি হলেন সিদ্ধ, সেদ্ধ নয়। সিদ্ধ পুরুষ মানে অনেকদিন নির্জনে তপস্যা, ধ্যানট্যান করে যিনি নানান অলৌকিক সব ক্ষমতা পেয়েছেন। এক কথায় সিদ্ধপুরুষ মানে সাংঘাতিক ব্যাপার একটা। তিনি সন্তুষ্ট হলে, যা চাইবি, তাই পেয়ে যাবি। আর রেগে গেলে, হয়তো ছাই হয়ে পড়ে থাকবি, তাঁর পায়ের কাছে”!

ছোড়দাদুর কথা শুনে, বড় ঠাম্মি এবং ছোট ঠাম্মি দুজনেই জোড়হাত কপালে ঠেকালেন। তারপর ছোট ঠাম্মি একটু চাপা গলায় বললেন, “এসব নিয়ে ঠাট্টা ইয়ার্কি করা মোটেই ভাল কথা নয়। একবার তো ফল পেয়েছ, তাতেও তোমার  শিক্ষা হল না?”

ঠাম্মির কথায় কোন উত্তর না দিয়ে ছোড়দাদু আবার বলতে শুরু করলেন, “অনেক আলোচনার পর সাব্যস্ত হল, পিসিমার বাড়ি আমরা দুজন যাবো। আর কারো পক্ষেই এসময় পুঁটুর বাড়ি যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আমরা তো জানতাম, আমরা যাবোই, কিন্তু একা একা আমরা দুভাই যাবো, এটা কল্পনাও করতে পারিনি। পিসিমা আমাদের দুই ভাইকে খুবই ভালোবাসতেন। তাছাড়া তাঁর ছেলেমেয়ের সঙ্গেও আমাদের খুব ভাব ছিল। অতএব এমন একটা সুযোগ পেয়ে আমরা দুজনেই আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম।

ঠিক হল আমরা পরশুদিন ভোর বেলা গরুর গাড়িতে রওনা হবো। যাদবকাকা গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাবেন এবং তিনিই হবেন যাওয়া-আসার পথে আমাদের একমাত্র গার্জেন! পিসিমার বাড়ি আমাদের গ্রাম থেকে খুব দূরে নয়, এখনকার হিসেবে পনের-ষোলো কিলোমিটার। মাঝে গোটা দুই গ্রাম পড়ে, সেই দুটো পেরিয়ে আরো ছ-সাত কিলোমিটার গেলেই, পিসিমার গ্রাম। মাঝে খুব বেশি সময় নেই, আমাদের যাওয়ার আয়োজন নিয়ে, আমরা ছাড়া, বাকি সকলেরই হঠাৎ ব্যস্ততা বেড়ে উঠল

ঠিক সময়েই আমরা রওনা হলাম, গাড়ি বোঝাই জিনিষপত্র নিয়ে। গাড়িতে যা জিনিষপত্র ছিল, তাতে গ্রামের হাটে একটা মুদির দোকান অনায়াসে খুলে বসা যেতগুড়ের টিন দুটো, পিসেমশাই ভালোবাসেন। ঘানিতে বানানো দুটিন খাঁট সরষের তেল, পিসিমার শ্বশুরমশাইয়ের এই তেল খুব পছন্দের। গোবিন্দভোগ চাল এক বস্তা, পিসিমার শাশুড়ি, এই চালের পায়েস খেতে খুব ভালোবাসেন। এছাড়া আমাদের গাছের গোটা দশেক নারকেল, আমাদের ক্ষেতের গোটা পাঁচেক কুমড়ো, লাউ, ছাঁচিকুমড়ো। তার সঙ্গে আমাদের গ্রামের নানুকাকার দোকানের রসগোল্লা একটিন, ঘরে বানানো কুলের আচার, মোয়া, পাটালি, তিলকুট। এ ছাড়া আমাদের রাস্তায় খিদে পেলে, চালভাজা, পাটালি, মোয়ার পুঁটলি। আমাদের তেষ্টা পেলে খাওয়ার জলের কুঁজো। গরুরগাড়ির ছইয়ের ভেতর জিনিষপত্রে বোঝাই হয়ে গেল, আমরা দুভাই বসলাম, যাদবকাকার দু পাশে। 

২ 

আমাদের গাড়ি পিসিমার গাঁয়ের সীমানায় ঢুকতেই পিসিমাদের রাখাল ছেলেটি, নাম কুঞ্জ, আমাদের দেখে চিনতে পেরেছিল। “অ মাঠাকরেণ , আপনার ভাইপো এয়েচে বটে” বলেই সে ছুট লাগাল পিসিমাদের বাড়ি। কাজেই যাদবকাকা বেলা এগারোটা নাগাদ, আমাদের গরুর গাড়িটা যখন পিসিমাদের খামার বাড়িতে ঢুকিয়ে দিল, তখন সেখানে অনেক লোক দাঁড়িয়ে গেছে। পিসিমা নিজে, পিসতুতো দাদা আর বোন, ওদের দুই কাকা, খুড়তুতো ভাইবোনেরা, তাছাড়া পাড়ার প্রচুর বউ, মেয়ে আর বাচ্চাবাচ্চা ছেলেমেয়ের দল। গাড়ি থামতেই আমরা দু ভাই লাফ দিয়ে মাটিতে নামলাম। পিসিমাকে দুজনেই প্রণাম করলাম। পিসিমা আমাদের চিবুক ছুঁয়ে আঙুলের ডগায় চুমো খেয়ে, আশীর্বাদ করলেন।

তারপর একটু রাগ-রাগ গলায় বললেন, “হাতপা-দুলিয়ে দু ভাই চলে এলি, মাকে নিয়ে আসতে পারলি না? কটা দিন আমার কাছে থেকে যেত!” পিসিমা এরপর গাড়ু থেকে জল ঢেলে দিলেন, দুই গরুর চার চার খুরে। ওদিকে যাদবকাকা ওদের কাঁধ থেকে গাড়ির জোয়াল খুলে নেওয়াতে, গরুদুটো বেশ আরাম পেল। তারপর যে কাণ্ডটা করল, তাতে আমাদের লজ্জায় মাথা কাটা গেল!”

মিন্টু খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস  করল, “কেন? কী করেছিল ওরা?”

ছোড়দাদু মুচকি হেসে বললেন, “এতটা রাস্তা জিনিষপত্র সমেত আমাদের টেনে আনতে গরুদুটোর খুব কষ্ট হচ্ছিল। এখন কাঁধের ভার নেমে যাওয়াতে, আর খুরে ঠাণ্ডা জলের স্পর্শে, দুটোই আরামে গোবর নেদে দিল। পিসিমাদের খামারের একেবারে মাঝখানে! আমরা লজ্জা পাবো না?”

মিন্টু ঠিক বুঝল না, জিজ্ঞেস  করল, “নেদে দিল, মানে?” বড় ঠাম্মি, মুখে আঁচল চাপা দিয়ে খুব হাসতে লাগলেন। ছোট ঠাম্মি বললেন, “ছোটদের সামনে ও আবার কী কথা? তোমার বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পেয়ে যাচ্ছে”!

ছোড়দাদু খুব গম্ভীর মুখে বললেন, “বেশ তবে তোদের ভাষাতেই বলি, গরুদুটো একইসঙ্গে আরামে পটি করে ফেলল”

ছোড়দাদুর মেয়ে, নীহারিকা হাসতে হাসতে বললেন, “বাবা, তুমি না Zআআআতা”।

পুঁচকি নাতনী মিঠু নাক-মুখ কুঁচকে বলল, “ইস্‌, এম্যাঅ্যাঅ্যা, ছিঃ”।

ছোড়দাদু চোখ বড়ো বড়ো করে মিঠুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “ছিঃ নয় রে, মিঠু মা। গরুদুটো উঠোনের মাঝখানে পটি করে দেওয়ার জন্যে পিসিমা যে কী খুশি হয়েছিলেন, সে আর বলার নয়। পিসিমার কাজের মেয়ে ভামিনীদিদি সামনেই ছিল। পিসিমা হৈচৈ করে তাকে বললেন, “অ ভামি, চট করে গোবরের ঝুড়িটা এনে, গোবরের তাল দুটো তুলে রাখ, মা। এ আমার দাদার গোবর...”।

এতক্ষণ পিসেমশাই বাড়িতে ছিলেন না, এখন ঢুকলেন। ঢুকেই পিসিমার কথা শুনে মুচকি হেসে বললেন, “বলো কী? তোমার দাদার গোবর?”

আমাদের সরল পিসিমা পিসেমশাইয়ের ঠাট্টাটা বুঝতে পারলেন না, চোখ ঘুরিয়ে বললেন, “তা নয় তো, কী?” ছোড়দাদুর এই কথায়, বড়দাদু থেকে বড়োরা সব্বাই, হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়লেন। ছোটঠাম্মিও কিছুক্ষণ খুব হাসলেন, তারপর ছোড়দাদুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “এত বানিয়ে বানিয়েও বলতে পারো...”!

সবাই হাসলেও ছোড়দাদু হাসেননি, তিনি ছোটঠাম্মির কথার উত্তরে বললেন, “বানিয়ে বললাম? বোঁচা তো রয়েছে, ওকেই জিজ্ঞেস  কর না, বানিয়ে বললাম কী না? সে যাগ্‌গে, আমরা দুভাই পিসেমশাইকে এবং বাড়ির বড়োদের সকলকে প্রণাম করলাম, তাঁরাও আমাদের আশীর্বাদ করলেন।

মুখ হাত ধোয়ার পর, আমরা জলখাবার খেলাম। তারপর পিসতুতো দাদা আর বোনের সঙ্গে একটু এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করলাম। আমাদের সঙ্গে ওদের খুড়তুতো ভাই-বোনেরাও ছিল। দুপুর দেড়টা নাগাদ পিসিমাদের বাড়ির পিছনের পুকুরে আমরা সব ভাইবোন মিলে অনেকক্ষণ সাঁতার কাটলাম। তারপর টানা বারান্দায় সার দিয়ে শতরঞ্চিতে বসে, পুকুরের টাটকা রুইমাছের ঝোল ভাত, আলুপোস্ত, চুনোমাছ আর তেঁতুল দিয়ে বানানো টক খেলাম, খুব মজা করে। আমাদের খাবার পর, পিসেমশাইয়ের মা, তাঁকে আমরা ভালোঠাম্মা বলতাম, কড়া নির্দেশ দিলেন, ছোটরা সব্বাই ওপরের বড়ো ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়। ফচকেমি, ফাজলামি করলে কিন্তু সবার পিঠ ফাটাবো।

ভালো ঠাম্মার ভয়ে, ওপরের বড়ো ঘরে আমরা গিয়ে শুলাম। ছোটরা সবাই ঘুমিয়ে পড়ল, কিন্তু আমাদের দুই ভাইয়ের আর পিসতুতো দাদা, কানুদার ঘুম এল না। উসখুস করতে লাগলাম, কতক্ষণে বড়োদের আর ভালো ঠাম্মা, পিসিমাদের খাওয়া হবে, আর তাঁরা ঘুমোতে যাবেন। আমরা ওপরের ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে নীচেয় লক্ষ্য করছিলাম, আর তিনজনে খুব গুরুতর বিষয়ে গম্ভীর আলোচনা করছিলাম”।

ছোটঠাম্মি বললেন, “তোমরা গম্ভীর আলোচনা করছিলে? বাবা, তা কী গুরুতর আলোচনা হচ্ছিল, শুনি?”

ছোড়দাদু বললেন, “কানুদার থেকে পিসিমার গুরুদেবের খবর-টবর নিচ্ছিলাম, আর কী! তিনি ভোর চারটের সময় ওঠেন। উঠেই মুখে এত্তোবড়ো একটা নিমের দাঁতন, আর হাতে জলভরা গাড়ু নিয়ে মাঠে বেরিয়ে যান। ফেরেন একেবারে চান-টান সেরে। আসার সময় গাড়ুতে জল ভরে আনেন। আর চিৎকার করে গান করেন। শ্যামাসঙ্গীত। কানুদা বলল, “গুরুদেবের গলাখানা হেঁড়ে, আর সুরের কোন বালাই নেই। ওর থেকে আমাদের ছিদাম কাকা, দারুণ গান করেন, শুনতে বেশ ভালো লাগে”। এই ছিদাম কাকার আসল নাম, শ্রীদাম ভট্টাচার্যি, কানুদাদের গাঁয়েই থাকেন, মা কালীর খুব ভক্ত।

আমাদের মধ্যে এই সব নিয়ে আলোচনা যত হচ্ছিল, ততই আমাদের কৌতূহল বাড়ছিল। একসময়, নীচেয় সকলের খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেল। পিসিমাদের কোন সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। রান্নাঘরে ওঠার সিঁড়ির পাশে এঁটো থালাবাসনের স্তূপের ওপর একদল কাক ঝটাপটি করছিল, আর খুঁটে খুঁটে এঁটো-কাঁটা খাচ্ছিল। আমরা বুঝতে পারলাম, এবার সময় হয়েছে।

আস্তে আস্তে আমরা উঠে পড়লাম। কাঠের ভারি দরজাটা অল্প ফাঁক করে, তিনজনে বাইরে এলাম। দরজাটা আবার চেপে দিলাম। তারপর তিনজনে সিঁড়ি দিয়ে চুপিচুপি নামতে লাগলাম। কানুদা আগে, আমরা পিছনে। কানুদা মাঝে মাঝে থেমে যাচ্ছিল, আর চারদিকে মাথা তুলে দেখে নিচ্ছিল, কেউ দেখে ফেলল নাকি! গণ্ডগোল কিছু হল না, আমরা তিনজনে নিঃশব্দে ভেতরবাড়ি ছেড়ে, বারবাড়িতে চলে এলাম। ওখানেই বসার ঘরে পিসিমার গুরুদেব অবস্থান করছেন”

 

৩ 

“গুরুদেবের ঘরের সামনে গিয়ে দেখি দরজাটা বন্ধ। কানুদা হালকা চাপ দিল খুলল না। কানুদা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে, ফিসফিস করে বলল, ওদিকের জানালায় চল, দেখা যায় কী না দেখি। বারান্দা দিয়ে আমরা ঘরের ডানদিকে গেলাম। পরপর দুটো জানালা। প্রথমটা চেপে বন্ধ করা, অন্যটার পাল্লাদুটো অল্প ফাঁক করে আলগা ভেজানো। লোহার গরাদের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে কানুদা একটু ঠেলতেই, পাল্লাদুটো আর একটু ফাঁক হয়ে গেল। আর ঘরের ভেতর থেকে খুব চিকন গলায় কেউ চেঁচিয়ে উঠল, “কে রে, ওখানে?”। তারপরেই গুরুগম্ভীর আওয়াজে আরেকজন বলল, “ওদের আসতে দে”। চিকনগলা লোকটির মুখ উঁকি দিল জানালায়, বলল, “দরজার দিকে আয়, বাবা ডাকছেন”।

আমরা ফিরে চললাম, দরজার দিকে। কানুদা ফিসফিস করে বলল, “যে লোকটা উঁকি মারল, ও হল তারানাথ আর যিনি গম্ভীর গলায় আমাদের ঘরে আসতে বললেন, তিনিই মায়ের গুরুদেব”।

দরজা খুলে তারানাথ দাঁড়িয়েছিল, আমরা তিনজনে ঘরে ঢুকতেই সে আবার দরজা বন্ধ করে দিল। ঘরে ঢুকেই আমরা গুরুদেবকে একটু দূর থেকেই প্রণাম করলাম। ঘরের মধ্যে আবছা আলো। গুরুদেব মেঝেয় পাতা একটা আসনে বসে আছেন, পদ্মাসনে, টানটান শরীর। দুটো চোখই বন্ধ। অন্যান্য সাধু মহারাজ, বা গুরুদেবদের মতো এঁনার কোন সাজসজ্জা নেই। মানে মাথায় জটা, রক্তাম্বর, গলায় হাতে রুদ্রাক্ষের মালা, কপালে গাঢ় সিঁদুরের টিপ, কিচ্ছু নেই। গায়ে সাধারণ একটা ফতুয়া, তার রঙ গেরুয়া, আর পরনে খুব সাধারণ সাদা ধুতি। কাজেই সাধুমহারাজদের চেহারা দেখেই যে ভয় জেগে ওঠে সেটা হল না। আবার খুব একটা যে ভক্তি হল, তাও না। আসলে আমাদের মনে বোধহয় ভয় না জাগলে, ভক্তিভাব আসে না। যাঁর চেহারা, আচার-আচরণ যত ভয়ংকর হয়, তাঁর প্রতি আমাদের ভক্তির মাত্রাটাও তত বাড়তে থাকে।

আমাদের চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, পিসিমার গুরুদেব বললেন, “কাছে এসে বস, তোরা পুঁটি মায়ের আদরের ভাইপো, বোঁচা আর খ্যাঁদা, তাই না?”

আমরা গুটিগুটি পায়ে আরেকটু সামনে এগিয়ে মেঝেতেই বসলাম। পিসিমার গুরুদেব চোখ বন্ধ করেই বসেছিলেন। আমরা বসার পর হঠাৎ বললেন, “হাওয়াতে মিশে ছিল দুটো গ্যাস, সেই দুটো গ্যাস মিলে কী যে হয়ে গেল, ও ছাড়া আমাদের জীবন বাঁচে না!”

বোঁচা আমার মুখের দিকে একবার তাকাল, তারপর বলল, “জল - এইচটুও”গুরুদেব মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন। তারপর আবার বললেন, “ব্যাটারি থাকলে টর্চ জ্বলে, রেডিও বাজে। ব্যাটারি হল শক্তির উৎস। ব্যাটারি না হলে তো টর্চ জ্বলবে না, রেডিও চলবে না। আবার কিছুটা মাটি, জল, বাতাস আর সূর্যের আলো মিলিয়ে এমন ব্যাটারিও হয়, যা দিয়ে এই সমস্ত জীবজগৎ চলছে তো চলছেই, হাজার লক্ষ বছর ধরে”

বোঁচা আমার কানেকানে কিছু বলল, যা শুনে আমি ঘাড় নেড়ে সায় দিলাম, তারপর বোঁচা বলল, “সালোকসংশ্লেষ”।

“ঠিক। ফটোসিন্থেসিস। এটা বিজ্ঞান। সায়েন্স। আর যদি বলি, মাটি, জল, উত্তাপ, বায়ু আর আকাশ নিয়েই আমাদের শরীর, তাহলে সেটা আর বিজ্ঞান বা সায়েন্স থাকে না, তাই না? সেটা বুজরুকি!”

আমরা দুভাই একটু থতমত খেয়ে গেলাম। আমাদের এই গুরু-টুরু ব্যাপারে যে বিশ্বাস নেই সেটা ঠিকই। কিন্তু গুরুদেব সেটা বুঝেই যে আমাদের এসব কথা বলছেন, সে কথা বুঝতে বাকি রইল না।

বোঁচা বলল, “ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম – পঞ্চভূত”।

“পঞ্চভূত। আর পঞ্চভূত মানেই ভুত, প্রেত, দত্যি, দানো, রাক্ষস, খোক্কস, আত্মা-টাত্মা – সবই আজগুবি ব্যাপারস্যাপার। সেখানে বিজ্ঞান নেই, সায়েন্স নেই”।

আমাদের আর উত্তর দেবার কিছু নেই। মাথা নীচু করে, চুপচাপ বসে রইলাম।

“সিদ্ধ মানে আলুসেদ্দ, পটল সেদ্দ কিংবা ডিম সেদ্দ! ভাতের মধ্যে কিংবা গরম জলে ফুটছে ফুটছে...সেদ্দ হচ্ছে, নাকি সিদ্ধ হচ্ছে!” একটু থেমে আবার বললেন, “আমরা সাধকরাও সিদ্ধ হই। তার অনেকরকম আছে। মোটামুটি আট রকমের। প্রথমে অণিমা। সাধকরা অণুর মতো ছোট্ট হয়ে যেতে পারে, তাকে আর দেখাই যাবে না। আমাকে দেখতে পাচ্ছিস”?

গুরুদেবের কথায় আমরা মুখ তুলে তাকালাম। তাঁর আসন শূণ্য - শুধু ফতুয়া আর ধুতি পড়ে আছে আসনের ওপর। আমরা হতভম্ব হয়ে বসে রইলাম, হাঁ করে।

একটু পরেই তিনি আবার সশরীরে আগের মতোই আসনে বসে বললেন, “দ্বিতীয় সিদ্ধি, নাকি তোরা সেদ্ধ বলবি, লঘিমা। সাধক হাল্কা হয়ে হাওয়ায় ভেসে থাকতে পারে, এই দ্যাখ আমি এখানে”।

গুরুদেবের ডাক শুনে আমরা তিনজনে হাঁ করে ছাদের দিকে তাকালাম, গুরুদেবের মাথা ছাদের থেকে একটু নীচে, ভেসে রয়েছেন শূণ্যে! সেখান থেকেই বললেন, “তৃতীয় সিদ্ধি গরিমা, এতে সাধক নিজের ভার বাড়িয়ে তুলতে পারেন। ঠাকুমার কাছে শিবি আর সেই পায়রার গল্প শুনিস্‌নি?”

আমি বেশ ভয়ে ভয়ে বললাম, “হ্যাঁ শুনেছি, মহাভারতে আছে। ধর্মরাজ, শিবির পরীক্ষা নিতে এসেছিলেন”।

গুরুদেব ওই অবস্থাতেই বললেন, “শুনেছিস কিন্তু বুঝিসনি। দাঁড়িপাল্লায় উঠেও মহারাজ শিবির ওজন, পায়রার ওজনের সমান হয়নি! কেন? ধর্মরাজ সিদ্ধ পুরুষ, তিনি গরিমা সিদ্ধিতে পায়রা হয়েও নিজের ভার রাজা শিবির থেকেও বাড়িয়ে তুলেছিলেন”।

বলতে বলতে গুরুদেব মেঝেয় নেমে এলেন, তাঁর পায়ের চাপে চকচকে কাঁসার ঘটিটা চিঁড়ে চ্যাপ্টা হয়ে পড়ে রইল, যেন একটা কাঁসার পাত। আসনে একইভাবে বসে গুরুদেব আবার বললেন, “চতুর্থ মহাসিদ্ধির নাম মহিমা। এর প্রভাবে যোগী পাহাড়ের মতো বিশাল হয়ে উঠতে পারে। বলতে না বলতে তিনি বেলুনের মতো যেন ফুলে উঠলেন, তাঁর মাথা ছাদের সিলিং ছুঁইছুঁই। পদ্মাসনে বসা, তাঁর ভাঁজ করা দুই হাঁটু, ঘরের দুপাশের দেওয়ালে ঠেকে গেল। ওই অবস্থাতেই বললেন, “পঞ্চম মহাসিদ্ধির নাম প্রাপ্তি। এই অবস্থায় সাধক বহু দূর থেকে যে কোন বস্তু তুলে আনতে পারেন। এই নে, দেখ তো এ দুটো তোদের প্রিয় ফাউন্টেন পেন কী না?”

গুরুদেব লম্বা হাত বাড়িয়ে আমাদের সামনে মুঠি খুলতেই আমরা পেনদুটো দেখলাম, কাঁপা কাঁপা হাতে তুলে নিলাম পেনদুটোএই পেনদুটো আমাদের দুই ভাইয়েরই খুব প্রিয়। গতবছর জন্মদিনে আমাদের বড়োমামা দিয়েছিলেনআমাদের ঘরের আলমারির ড্রয়ারে একটা বাক্সের মধ্যে পেনদুটো রাখা ছিল, কারণ ওদুটো আমরা রোজ ব্যবহার করতাম না! সেই পেন এখন গুরুদেবের হাতে...!

আমাদের অবাক হওয়ার পালা তখনও শেষ হয়নি, গুরুদেব নিজের আসনে বসে, চোখ বন্ধ রেখেই বলে চলেছেন, “আটটি মহাসিদ্ধির ষষ্ঠটি হল প্রাকাম্য। এই অবস্থায় সাধক বা যোগী যেমন ইচ্ছে তেমন অর্থ বা ক্ষমতা অর্জন করতে পারে। সপ্তম হল বশিত্ব। বশিত্ব সিদ্ধি লাভ করলে, সাধক যে কোন মানুষকে নিজের ইচ্ছে মতো কাজ করিয়ে নিতে পারে”।

কানুদার কাছে আমরা পরে জেনেছিলাম, ওই সময় “ধনধান্যে পুষ্পেভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা” গানটি, আমি আর বোঁচা, গুরুদেবকে নেচে নেচে গেয়ে শুনিয়েছিলাম। আমাদের অবিশ্যি কিছুই মনে নেই! পিসিমার গুরুদেব আমাদের দুজনের ওপর বশিত্ব প্রয়োগ করে, বশ করেছিলেন, কানুদাকে করেননি”!

ছোড়দাদু এই সময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু চুপ করে রইলেন। ঘরের সব্বাই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ছোড়দাদুর দিকে। মিন্টু অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস  করল, “ও দাদু, তারপর? তারপর কী হল বল না”!

ছোড়দাদু একবার বড়দাদুর দিকে তাকালেন। তারপর বেশ করে কেশে গলাটা সাফ করে নিলেন। বড়দাদুও গলাটা ঝেড়ে নিলেন বেশ কয়েকবার।

তারপর ছোড়দাদু বললেন, “এর পর গুরুদেব বললেন “মহাসিদ্ধির আট নম্বর হল ঈশিত্ব। এই অবস্থায় যোগী বা সাধক ঈশ্বরের অংশ হয়ে ওঠেন। মরা মানুষকে বাঁচিয়ে তুলতে পারেনঅন্ধকে দৃষ্টি দিতে পারেন। এমনকি মানুষের মাথাটা খুলে নিয়ে, তার হাতে ধরিয়েও দিতে পারেন...”

এই সময়েই দরজায় এসে দাঁড়াল রঘুনাথদা, তার একহাতে কেটলি, আর অন্য হাতের বিশাল ট্রেতে অনেকগুলি খালি কাপ, হাসি হাসি মুখে বলল, “বড়দের জন্য চা এনেছি। বড়দের চা দিয়ে, ছোটদের জন্যে চিকেন সুপ আনছি...বব্‌ড়রা ক্‌কী ব্ব্‌বাচ্চাদের আগে খ্‌খাবে...” কিন্তু বড়দাদু আর ছোড়দাদুর দিকে তাকিয়ে শেষের কথাগুলো বলতে বলতে, ভয়ে রঘুনাথদার চোখদুটো কেমন উলটে গেল, কথাগুলোও জড়িয়ে গেল, তারপর ধড়াম করে পড়ে গেল মেঝেতে! তার হাতের কেটলি থেকে চা উল্টে মেঝেয় গড়াতে লাগল, ঝনঝন শব্দে ট্রে আর কাপ উলটে, ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল কাপগুলো। এত আওয়াজের মধ্যেও ঘরের সব্বাই স্থির আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে নিশ্চল বসেই রইল নিজের নিজের জায়গায়, সকলের দৃষ্টি বড়দাদু আর ছোড়দাদুর দিকে

বড়দাদু খুলে ফেলা নিজের মাথাটি গলার ওপর বসাতে বসাতে বললেন, “এ গল্পটা বাচ্চাদের সামনে না বললেই পারতিস, খ্যাঁদা। তুই আর কোনদিন মানুষ হবি না, হতভাগা”।

ছোড়দাদু ততক্ষণে নিজের খুলে-ফেলা মাথাটি নিজের গলায় সেট করে নিয়ে বললেন, “সারা জীবন রোজ রোজ অল্প অল্প ভয়ে অস্থির হওয়ার থেকে, একবার বেশ জমিয়ে ভয় পাওয়া ভাল। ওতে ভ্যাক্সিন, মানে টিকার কাজ দেয়। পিকু, দ্যাখ দ্যাখ রঘুনাথদার কী হল দ্যাখ, বাবা। আর টুকলি, চট করে একটু জল আর গরম দুধ নিয়ে আয় না, মা, রঘুনাথদার জন্যে!”

                                                    ..০০..

      

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ২

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


"@শুধু _তুই .কম" উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১


২য় পর্ব 

ছোটবেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সুনেত্রদের বিরাট পরিবারের একত্র জমায়েত হতো তাদের দেশের বাড়িতেইকাজেকর্মে, পুজোপার্বণের অনুষ্ঠানে তাদের দেশের বাড়িটা জমজমাট হয়ে উঠত পিসতুতো মামাতো খুড়তুতো অনেক ভাইবোনদের হৈ চৈ হট্টগোলে। সুনেত্ররা দুভাই – বোন নেই আর ওদিকে সুকন্যারা দু বোন – কোন ভাই নেই। কাজেই সুনেত্র আর সুকন্যার বাড়তি ঘনিষ্ঠতা সকলেরই চোখে পড়ত। একটু বাড়তি খুনসুটি, একটু আলাদা রকমের পিছনে লাগা। এরকম হতেই পারে, অনেক ভাইবোনের মধ্যে এমন একটু পক্ষপাতিত্বের ভালো লাগা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সেভাবে কিছু মনেও হয়নি কোনদিন।

সেবার ছোটকার বিয়ের সময় তাদের পরিবারের জমায়েতটা খুব জমে উঠেছিল। ওরকম আনন্দ আর হুল্লোড়ময় জমায়েত আর কোনদিন হয়নি তাদের পরিবারে। এরপরেও আরেকবার জমায়েত হয়েছিল ঠিকই – কিন্তু সেটা সুনেত্রর ঠাকুমার মৃত্যুর পর তাঁর কাজে। সেটা তো কোন আনন্দ অনুষ্ঠান নয়। কাজেই ছোটকার বিয়েটাই তাদের দেশের বাড়ির সর্বশেষ আনন্দ সম্মিলন বললে ভুল বলা হয় না।  সুনেত্র তখন উণিশের কোঠায়। স্কুলের গণ্ডি ছেড়ে সবে কলেজে ঢুকেছে - মেডিকেলে ফার্স্ট ইয়ার। সে তখন কৃতী ছাত্র আর হবু ডাক্তার হিসেবে পরিবারের সকলেরই চোখের মণি। আগে থেকেই পুত্রহীনা পিসিমার তার প্রতি আলাদা একটা দুর্বলতা ছিল, সেটা আরো বেড়ে গিয়েছিল সুনেত্রর এই সাফল্যে।

সেবার সুকন্যার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে তার দুই আঁখিতে সুনেত্র হদিস পেয়েছিল অদ্ভূত এক অনুভবের। সুকন্যার সঙ্গে ছেলেমানুষী খুনসুটি করতে এবারে আর তার একটুও ইচ্ছে হচ্ছিল না। তার মনে হয়েছিল সুকন্যা অন্ততঃ তার সঙ্গে একটু ধীর স্থির হোক, বাচালতা কম করুক আর তার চোখের তারায় নেমে আসুক গভীর আলোর উদ্ভাস। কিন্তু তেমন কিছু হয়নি, সুকন্যা আগের মতোই চঞ্চল আর হাল্কা হাসির পিছনে লাগাতেই ব্যস্ত ছিল সারাটাক্ষণ

বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হতে সকলেই ফিরে গিয়েছিল নিজের নিজের জায়গায়। সুনেত্রও তার হস্টেলে ফিরে গিয়েছিল। সারাটাদিন ক্লাসের ব্যস্ততার পর হস্টেলে ফিরে গ্রে”জ অ্যানাটমির বিশাল বইয়ের পৃষ্ঠায় সে চোখ রাখত ঠিকই, কিন্তু পড়া হত না এক লাইনওতার মনে আসত সুকন্যাকে।  অবুঝ এক রাগ হত তার মনে, সুকন্যা কেন বুঝল না, সুকন্যা কেন সাড়া দিল না তার অনুভবে। সুকন্যা এতটা অবুঝ কেন? কেন সে বুঝতে পারল না, সুনেত্র তাকে বিশেষভাবে পেতে চেয়েছিল! এরকম ভাবনা তার যেমন হত, তেমনই আবার এক পাপবোধও উঠে আসত তার মনে। পিসিমা কী ভাববেন, সুনেত্রর মা কী ভাববেন? একথা যদি তাঁরা জানতে পারেন তাঁরা কি “ছিঃ” বলবেন না। বলবেন না, “সুনু, তোকে যে আমরা বিশ্বাস করেছিলাম, বাবা, শেষ অব্দি তুই এমন করলি”? দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুনেত্র ভাবত – “এই ভালবাসা গোপনই থাক তার অন্তরে, সুকন্যা বোঝেনি সে এক দিক থেকে ভালই হয়েছে”। মা ও পিসিমার বিশ্বাস নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলার মানে হয় না কোন।

এভাবেই চলে যাচ্ছিল দিনগুলো। সুকন্যার প্রতি অস্ফুট ভালোবাসার সঙ্গে মাখামাখি সুপ্ত এক পাপবোধ - দুটোই জিইয়ে নিয়ে সুনেত্র কাটিয়ে দিতে পেরেছিল বছর দুয়েক। সেবার সুকন্যা হায়ার সেকেণ্ডারি পরীক্ষা দিয়ে কলকাতায় তাদের বাড়িতে এসে ছিল বেশ কদিন। সুনেত্র তখন হস্টেলে। বাড়ি থেকে মা ইনল্যান্ড লেটারে চিঠি লিখতেন, তার মধ্যেই সুকন্যাও লিখেছিল। চিটিটা এরকম,   

 

“কল্যাণীয়েষু,

স্নেহের সুনু,

পত্রপাঠ কেমন আছিস জানাবিঈশ্বরের নিকট তোর সর্বাঙ্গীণ কুশল কামনা করি। ভালো থাকিস, সাবধানে থাকিস

তোর লেখাপড়ার চাপ কেমন জানাবিলেখাপড়ায় একদম ফাঁকি দিবি না। মনে রাখিস এখন তুই আর বাড়িতে নেই। কাজেই পড়তে বসার জন্যে আমি আর নিত্য তাগিদ তোকে দিতে পারব না। এখন তোকেই নিজের ভালো মন্দ বুঝে চলতে হবে। মন দিয়ে নিয়মিত লেখাপড়া করিসতাই বলে বেশি রাত্রি জাগিস না। রাত্রি এগারোটার পর আর পড়বার প্রয়োজন নেই। পরেরদিন কলেজের ক্লাস করাও একান্ত জরুরি মনে রাখিস

খাওয়াদাওয়া সময়মতো নিয়মিত করবিহস্টেলের রান্না তোর মনঃপূত হয় না নিজের কাছে বাটার, পাঁউরুটি এনে রাখবি। গতবার যে আমের জেলি নিয়ে গেছিলি সেটা কি ফুরিয়ে গেছে? এবার বাড়ি এলে আবার দেব, চিন্তা করিস না।

কদিন হল সুকু এসে আমাদের কাছে রয়েছে। বলছে ওর পরীক্ষা মোটামুটি হয়েছে। রেজাল্ট বের হলেই বোঝা যাবে – কেমন হয়েছে। দিনরাত পায়ে পায়ে ঘুরছে, আর বক বক করছে - তোর কথা খুব হয়।

যদি লেখাপড়ার খুব ক্ষতি না হয়, সুকু থাকতে থাকতে একবার আসতে চেষ্টা করিস। দু” একদিন থেকেই চলে যাবি। মেয়েটা সারাদিন আমার সঙ্গে একঘেয়ে কাটায় – তুই এলে খুশি হবে।

আজ আর বেশি লিখব না, সুকুর জন্যে জায়গা রাখতে হবে, ও কিছু লিখবে বলছে।

ভালোবাসা নিস, আদর নিস। সাবধানে থাকিস।

ইতি

আশীর্বাদিকা মা।

 

কি ডাকবাবু,

এখনও তো পুরো ডাক্তার হও নি, তাই ডাকবাবু ডাকলাম। পুরো হলেই তারটা জুড়ে দেব। সে তার, বিনার তার না ইলেকট্রিকের তার সে পরে দেখা যাবে। কিন্তু এই যে আমি হায়ার সেকেণ্ডারির মতো কঠিন এক পরীক্ষা দিয়ে তোমাদের বাড়ি থানা গেড়েছি আজ প্রায় দিন চারেক হতে চলল, তোমার টিকি দেখা যাচ্ছে না কেন? দেশে কি আর কেউ ডাক্তার হচ্ছে না নাকি? নাকি ওখানে কোন ডাক্তারনির কুনজরে পড়েছ। বাড়ির কথা মনেই পড়ছে না? আমার মতো পচা মেয়ের কথা না হয় নাই শুনলে, মামীমার কথাটা তো ভাবতে হয় নাকি? চটপট চলে এসো দেখি কদিনের জন্যে, তোমার চুলের মুঠি আর কানের জন্যে আমার হাত একদম নিসপিস করছে। তাই বলে আবার ভয় পেয়ো না যেন। “ভয় পেয়ো না, ভয় পেয়ো না, তোমায় আমি মারব না, সত্যি বলছি কুস্তি করে তোমার সঙ্গে পারব নামনটা আমার বড্ড নরম, হাড়ে আমার রাগটি নেই, তোমায় আমি চিবিয়ে খাব, এমন আমার সাধ্যি নেই”

তোমাকে অবিশ্যি কচমচিয়ে চিবিয়ে খাওয়াই যেত, যদি তুমি অখাদ্য না হতে,

ইতি তোমার সুকু”।

শুক্রবার দুপুরে বাস ধরে ধর্মতলা, সেখান থেকে বাড়ি পৌঁছতে সুনেত্রর রাত হয়ে গেল। শনিবারটা থেকে রবিবারের দুপুরে খাওয়াদাওয়া করে বাস ধরে হস্টেলে ফিরে এসেছিল সুনেত্র। কিসের জন্যে গিয়েছিল সুনেত্র শুধুমাত্র মায়ের ডাকে? নাকি দোলাচলে থাকা তার মনের মধ্যে, ভালোবাসার পাল্লাটাই ভারি কিনা সেটা পরখ করতে গিয়েছিল? নাকি খুঁজতে চেয়েছিল সুকুর মধ্যেও কোন নতুন ভাবনার সঞ্চার?

শুক্রবার রাত্রে বাবা, মা, দাদা সকলেই ছিলেন।  হস্টেলে থাকা এবং খাওয়া নিয়ে মায়ের জেরার জবাব দিতেই জেরবার সুনেত্র। সেদিন তাই কথাবার্তা হল না। কিন্তু সুকন্যার চোখে এবার অদ্ভূত এক আলো আবিষ্কার করেছিল সুনেত্র। যে আলোর সন্ধান সে করেছিল সেই ছোটকার বিয়ের সময়, সেদিন ছিল না - আজ আছে। কিসের যেন সংকোচ - সরাসরি কথা বলতে পারছিল না তারাব্যাপারটা  মায়ের দৃষ্টি এড়ায়নি, মা বলেছিলেন, “কি ব্যাপার রে তোদের? এই এত ভাব, এত ঝগড়া, এখন আবার কোন কথাবার্তা বলছিস না”?

“মামীমা, ডাক্তার হলে না, ছেলেদের লেজ গজায়, তাই কথাবার্তাও কম বলে”মা আর বাবা খুব হাসলেন। তার দাদা সুমিত্রও।

সুনেত্র অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “কী কথা বলব? কী চিঠি লিখেছে দেখনি, মা? আমাকে বলেছে ডাকবাবু, পুরো ডাক্তার হলে নাকি আমার তারটা ও জুড়ে দেবে। সে তার বীণার না ইলেকট্রিকের সে পরে দেখা যাবে। বীণার বানানটা কি জানো – লিখেছে বএ হ্রস্বই, দন্ত্য নএ আকার...”। সুনেত্র ছাড়া সকলেই খুব হাসল।

সুকন্যা লাজুক হেসে বলেছিল, “এঃমা। বীণা বানানটা ভুল হয়েছিল বুঝি, তাহলে ঠিক বানানটা কি”? সুনেত্রর দাদা সুকন্যার মাথায় হালকা টোকা মেরে বলেছিল, “বএ দীর্ঘঈ মূর্ধ্য ণএ আকার – হ্যারে, হায়ার সেকেণ্ডারিতে পাস করতে পারবি তো”?

পরের পর্ব - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ৩ "


বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৬

  এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 


  আগের পর্ব ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৫ "


ভীষ্মের কৃষ্ণবন্দনা ও দেহত্যাগ

সূত বললেন, “হে বিপ্রগণ, শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকায় ফেরার উদ্যোগে ভেঙে পড়লেন ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির। তাঁর মন ধর্ম থেকে বিচলিত হয়ে গেল।

তিনি স্নেহ ও মোহের বশে বিলাপ করতে করতে শ্রীকৃষ্ণের কাছে বললেন, “হে কৃষ্ণ, তুমি আমাদের ছেড়ে যেও না। আমি ভীষণ পাপ করেছি। এই যুদ্ধে আমি কত ব্রাহ্মণ, বন্ধু, জ্ঞাতি, ভাই, গুরু এবং পিতৃতুল্য ব্যক্তিকেও হত্যা করেছি। হাজার হাজার বছর নরকবাসেও আমার এই পাপমুক্তি হবে না। আমি তো কোনদিনই রাজা ছিলাম না, হে কৃষ্ণ। অতএব, প্রজাদের মঙ্গলের জন্যে এই যুদ্ধ করেছি, তাও বলা চলে না। আমি এই যুদ্ধ করেছি শুধুমাত্র রাজ্যলোভে। এই যুদ্ধে আমি বহু নারীর স্বামী, পুত্র, ভ্রাতা কিংবা পিতাকে হত্যা করে, তাদের গৃহস্থ ধর্মের অপূরণীয় ক্ষতি করেছি। অশ্বমেধ যজ্ঞ করলে এই পাপ থেকে মুক্ত হওয়া যায়, এমন শাস্ত্রকথায় আমার আর বিশ্বাস নেই। কাদা দিয়ে যেমন দূষিতজলকে শুদ্ধ করা যায় না, তেমনি অশ্বমেধের যজ্ঞে ঘোড়াকে আহুতি দিলেই, এতগুলি নরহত্যার পাপ খণ্ডন হতে পারে না

শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে সঙ্গে নিয়ে, কুরুক্ষেত্রে দেবব্রত ভীষ্ম যেখানে শরশয্যায় শুয়ে আছেন, সেখানে নিয়ে গেলেন। তাঁদের সঙ্গে গেলেন সমবেত মুনি, ঋষি ও পাণ্ডবদের চার ভাই। ভরতবংশের এই শ্রেষ্ঠ মানুষটিকে দেখার জন্যে সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিলেন পর্বত, নারদ, ধৌম্য, বৃহদশ্ব, ভরদ্বাজ, অনেক শিষ্য নিয়ে পরশুরাম, বশিষ্ঠ, অসিত, গৌতম, অত্রি, কৌশিক, সুদর্শন, শুকদেব, কশ্যপ, আঙ্গিরস। সেখানে আমিও সেদিন উপস্থিত ছিলাম। সকল মুনি ঋষিদের এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে দেখে ভীষ্মের চোখে জল চলে এলতিনি আবেগ রুদ্ধ কণ্ঠে সকলকে প্রণাম জানালেন। বন্দনা করলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে। পাণ্ডবদের পাঁচ ভাই মহামতি ভীষ্মকে প্রণাম করে তাঁর পাশে বিষণ্ণ মুখে বসলেন।

তাঁদের ম্লানমুখে বসে থাকতে দেখে, মহামতি ভীষ্ম স্নেহস্বরে বললেন, হে পাণ্ডুর পুত্রেরা, সারা জীবন তোমরা ব্রাহ্মণ, ধর্ম এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা করেও, এমন বিষাদগ্রস্ত কেন? মহাবীর পাণ্ডু যখন মারা যান, তোমরা তখন শিশুমাত্র। বধূমাতা পৃথা তোমাদের মানুষ করার জন্যে কি কষ্টই না সহ্য করেছেন! এসবই ঘটেছে কালের নিয়মে। কালের নিয়মেই জীবের সুখদুঃখের দিন আসে আবার চলেও যায়। তোমাদের সঙ্গে আছে যুধিষ্ঠিরের ধর্মবল, ভীমের বাহুবল, অর্জুনের অস্ত্রবল আর সবার উপরে আছেন সাক্ষাৎ শ্রীকৃষ্ণের মিত্রবল। এর চেয়ে আশ্চর্য ঘটনা আর কী হতে পারে?

হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, আমাদের বংশের উত্তরাধিকারী হিসেবে তুমিই যোগ্য রাজা এবং রাজ্য চালনায় তুমি যথেষ্ট দক্ষ। এই জগৎ ঈশ্বরের অধীন, মনে এই বিশ্বাস রেখে তুমি প্রজাপালন করো। তোমাদের একান্ত মিত্র এই শ্রীকৃষ্ণই সেই পরম ঈশ্বর, তাঁর প্রতি ভক্তি রেখে তোমরা নিশ্চিন্তে রাজ্য শাসন করো। এই শ্রীকৃষ্ণের মনের কী ইচ্ছে, সে কথা তিনলোকের কেউই বুঝতে পারেন না, তোমরা কী করে বুঝবে? ইনি যে এখন যাদবদের মধ্যে যাদব হয়েই রয়েছেন, এ কথা খুব কম লোকেই জানেন। একথা জানেন দেবর্ষি নারদ এবং কপিলমুনি, আর কয়েকজন। ইনি সকলের আত্মা, ইনি সকলকে সমান ভাবে দেখেন। এঁনার মনে অহংকার নেই, কারোর প্রতি বিদ্বেষ নেই।

শ্রীকৃষ্ণ, যিনি সাক্ষাৎ ঈশ্বর, তাঁকে তোমরা সাধারণ মামাতো ভাই মনে করেছ। ভালোবেসেছ, বিশ্বাস করেছ, ভরসা করেছ। যখন যে কাজে তোমরা ওঁনাকে নিয়োগ করেছ, উনি বিনা দ্বিধায় সে কাজ করেছেন। কখনো তোমরা সম্মানীয় মন্ত্রী হিসেবে ওঁনার মন্ত্রণা নিয়েছ। কখনো রাজদূত হিসেবে হস্তিনাপুরের রাজসভায় পাঠিয়েছ। আবার রথের সামান্য সারথিপদেও তোমরা ওঁনাকে নিযুক্ত করেছ! লক্ষ্য করে দেখ, ওঁনার মনে উঁচু কাজ, নীচু কাজ এমন কোন দ্বিধা নেইওঁনার দৃষ্টিতে সবাই সমান; আপন-পর, শত্রু-মিত্র, উঁচু-নীচু কোন ভেদ নেই”

[এইখানে মহামতি ভীষ্ম ভারতের অসাধারণ ভক্তিমার্গের দিশাটি ভক্তদের মনে জাগিয়ে তুললেন। ঈশ্বর তাঁর ভক্তদের নানারূপে দেখা দিতে পারেন। পরবর্তী কালে আমরা দেখব মাকালী কন্যারূপে ভক্তকবির ঘরের বেড়া বেঁধেছেন। কখনো অভিমানী ভক্তকবি গেয়েছেন, "মাগো, গেছিস কি তুই মরে, গয়া গিয়ে আসি গে তোর শ্রাদ্ধ-শান্তি করে", অথবা রবীন্দ্রনাথ গেয়েছেন, "তাই তোমার আনন্দ আমার পর, তুমি তাই এসেছ নীচে। আমায় নইলে, ত্রিভুবনেশ্বর, তোমার প্রেম হত যে মিছে"। ভারতের ঈশ্বর সর্বদাই উদাসীন করুণাময় নয়, তিনি নিষ্ঠুর হাতে সর্বদা দণ্ড বিধান করেন না, তিনি ভক্তের মনে প্রিয়রূপে বিরাজও করেন।]              

মহামতি ভীষ্ম সামান্য বিরামের পর, শ্রীকৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে আবার বললেন, “হে পাণ্ডুর পুত্রগণ, তোমরা ওঁনার মহিমা উপলব্ধি করো যদিও আমি তোমাদের শত্রুপক্ষের, তাও ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমার কাছে এসেছেন। উনি জানেন আমি ওঁনার একান্ত ভক্ত এবং আমি আসন্ন মৃত্যুর অপেক্ষায় রয়েছিতাই ভক্তের প্রতি একান্ত করুণায়, উনি নিজে এসেছেন আমায় দেখা দিতে! আমি তোমাদের প্রতি বিশেষ স্নেহশীল জেনে উনি তোমাদেরকেও এখানে নিয়ে এসেছেন। এই যুদ্ধের কারণে তোমরা যে মানসিক যন্ত্রণায় রয়েছ, আমার সান্নিধ্যে সে সব মুছে যাক, এও ওঁনার মনের ইচ্ছা। 

হে কৃষ্ণ, তোমার ঐ সদাপ্রসন্ন মুখ দেখে আর তোমার ঐ করুণাঘন দৃষ্টিতে আমি জীবনের সমস্ত যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেলাম হে কৃষ্ণ, আমি ধন্য, আমি কৃতার্থ, পরম আনন্দে আমি আপ্লুতআমার একটাই নিবেদন, যতক্ষণ না আমার মৃত্যু আসে, তুমি আমার এই শরশয্যার পাশে প্রতীক্ষা করো, আমি দু চোখ ভরে তোমায় যেন দেখতে পাই”

এরপর মহামতি ভীষ্ম মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে রাজধর্ম, দানধর্ম, মোক্ষধর্ম, স্ত্রীধর্ম, ভগবৎ ধর্ম এবং আরো অনেক বিষয়ে উপদেশ দিলেন। এই সব আলোচনা হতে হতেই মহামতি ভীষ্মের ইচ্ছামৃত্যুর সময় উত্তরায়ণের কাল ঘনিয়ে এল। কথাবার্তা শেষ করে মহামতি ভীষ্ম এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখের দিকে এবং সমস্ত মন প্রাণ তাঁকেই সমর্পণ করলেন।

কিছুক্ষণ ধ্যানমগ্ন থাকার পর তিনি আবার বললেন, “হে যাদব শ্রেষ্ঠ, তুমি মহান পরমানন্দ স্বরূপ। আমি তোমাতে আমার কামনাহীন মতি সমর্পণ করলাম। হে অর্জুনের সারথি, তোমার তমালকান্তি অপরূপ দেহে নতুন সূর্যের মতো উজ্জ্বল পীত বসন অপূর্ব মানিয়েছে। তোমার ঐ সদাপ্রসন্ন মুখ দেখে আমি মুগ্ধ হলাম। হে কৃষ্ণ, তোমার প্রতি আমার অহৈতুকি ভক্তি যেন সর্বদা অচল থাকে, এই প্রার্থনা করি।

হে কৃষ্ণ, যুদ্ধের সময় তুমি অর্জুনের রথে ছিলে। আমার ছোঁড়া তিরে তোমার গায়ের কবচ বার বার ছিঁড়ে যাচ্ছিল। তোমার চুলের থেকে ঝরে পড়া ঘামের সঙ্গে ঘোড়ার ক্ষুরের ধুলো মিশে তোমার মুখে অদ্ভূত আলপনা সৃষ্টি হচ্ছিল বারবার।

হে কৃষ্ণ, বন্ধু অর্জুনের কথায়, যুদ্ধের শুরুতে আমাদের দুই পক্ষের মাঝখানে তুমি রথ স্থাপনা করেছিলে। যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রোণ আর আমাকে দেখে, বিষণ্ণ অর্জুন যখন যুদ্ধে বিরত হয়েছিল, তুমি ওকে পরমাত্মা তত্ত্ব উপদেশ দিয়ে ওর মোহ দূর করেছিলে। আর উপদেশ দেওয়ার সময়, তোমার নিষ্ঠুর কালদৃষ্টি দিয়ে আমাদের আয়ু নাশ করেছিলে।

হে মধুসূদন, তুমি প্রতিজ্ঞা করেছিলে, এই যুদ্ধে তুমি নিজে অস্ত্র ধরবে না। আর আমিও প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, তোমাকে আমি অস্ত্র ধরাবোই। আমার তিরের আঘাতে অর্জুন যখন ব্যতিব্যস্ত, অস্থির। তুমি হঠাৎ রথ থেকে লাফিয়ে নেমে এলে মাটিতে, তারপর দুই হাতে রথের চাকা তুলে ক্রুদ্ধ সিংহের মতো দৌড়ে আসছিলে আমাকে হত্যা করতে। আমার তিরের আঘাতে তোমার কবচ ছিন্নভিন্ন হল, তোমার শরীর হল রক্তাক্ত। তবু তোমার কি ক্রোধ! তোমার পায়ের চাপে তখন মাটি কাঁপছে থর থর করে, তোমার গায়ের উড়নি উড়ে গেল কোথায়। লোকে বলে তুমি অর্জুনের পক্ষ নিয়ে আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলে। আমি জানি হে নাথ, তুমি তোমার ভক্তের প্রতিজ্ঞা রক্ষার জন্যেই নিজের প্রতিজ্ঞাও বিসর্জন দিতে গিয়েছিলেভক্তের প্রতি তোমার এই করুণার কোন তুলনা হয় না, হে মধুসূদন।

হে কৃষ্ণ, অর্জুনের রথে ঘোড়ার লাগাম আর চাবুক হাতে তোমার সেই উজ্জ্বল উপস্থিতি, এখনো আমার মনে গাঁথা হয়ে আছে। সীমাহীন তোমার ঐশ্বর্য, অনন্ত তোমার লীলা। হে জনার্দন, আমার শেষের সময় ঘনিয়ে এল, এখন দয়া করে তোমার চরণ কমলে স্থান দাও  বর দাও, তোমাতে আমার যেন অবিচল ভক্তি থাকে চিরদিন”

মহামতি ভীষ্ম এইভাবে, তাঁর মন, বাক্য, কর্ম ও বৃত্তির সমাপ্তি করলেন। তারপর নিজের আত্মাকে পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণে সমর্পণ করে পরম ব্রহ্মে লীন হয়ে গেলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে শরশয্যায় পড়ে রইল তাঁর নশ্বর দেহ।  যুধিষ্ঠির, তাঁর চার ভাই এবং উপস্থিত ঋষি মুনিরা সমবেত ভাবে পবিত্র সেই মরদেহের সৎকার করলেন।

মহামতি ভীষ্মের অন্ত্যেষ্টির পর সকলে হস্তিনাপুর নগরে ফিরে এলেন। সেখান থেকে সমবেত ঋষি, মুনিরা ফিরে গেলেন তাঁদের নিজ নিজ আশ্রমে। যুধিষ্টির জ্যাঠামশাই ধৃতরাষ্ট্র ও পুত্রশোকে দুঃখিনী গান্ধারীকে অনেক সান্ত্বনা দিলেন, তারপর ধৃতরাষ্ট্র ও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অনুমতি নিয়ে রাজ্যভার গ্রহণ করে, যথা বিধি রাজসিংহাসনে বসে প্রজাপালন শুরু করলেন”    


শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকায় ফেরা

শৌনক বললেন, “হে সূত, পরম ধার্মিক যুধিষ্ঠির শত্রুদের বধ করে অনুজদের সঙ্গে কিভাবে রাজ্যপালন করলেন, সে বিষয়ে সবিস্তার বর্ণনা করুন”

সূত বললেন, “জ্ঞাতিবিরোধের আগুনে কুরুবংশ দগ্ধ হয়ে যাওয়ার পর, লোকপালক শ্রীহরি পরীক্ষিতের প্রাণ রক্ষা করে সেই কুরুবংশকেই আবার অঙ্কুরিত করলেন এবং ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে নিজ রাজ্যে আবার প্রতিষ্ঠা করে পরমপ্রীতি লাভ করলেন। মহামতি ভীষ্ম ও শ্রীকৃষ্ণের উপদেশে যুধিষ্ঠিরের চিত্তে আবার দিব্যজ্ঞানের উদয় হল এবং তাঁর মন থেকে “আমিই এই যুদ্ধের কর্তা”, “আমিই সকল জ্ঞাতিহত্যার জন্য দায়ী” এই ভ্রান্ত মোহ দূর হয়ে গেল। তিনি শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশ অনুসরণ করে, সকল ভ্রাতাদের সঙ্গে সমগ্র পৃথিবী শাসন করতে লাগলেন। তাঁর রাজ্যে মেঘ সুষ্ঠু বৃষ্টি উপহার দিল, পৃথিবী প্রচুর শস্যশালিনী হয়ে উঠল এবং গাভীরা প্রচুর দুগ্ধ উৎপন্ন করল। নদী, সমুদ্র ও পর্বত সকলেই সুস্থ জীবনের অনুকূল হয়ে উঠল। অরণ্যের বনষ্পতি, লতা ও ওষধি প্রচুর ফল ও পুষ্পে সুশোভন হয়ে উঠল। দেশের রাজা অজাতশত্রু হওয়ার কারণে, জীবের মানসিক, শারীরিক ও আধ্যাত্মিক ত্রিতাপ দূর হয়ে গেল।          

অবশেষে শ্রীকৃষ্ণ প্রিয়সখা পাণ্ডব ও ভগিনী সুভদ্রার সঙ্গে হস্তিনাপুরে কয়েকমাস থেকে, সকলকে পরিতুষ্ট করে, যুধিষ্ঠিরের কাছে বিদায়ের অনুমতি নিলেন। তিনি যেদিন দ্বারকার উদ্দেশে রওনা হলেন, হস্তিনাপুরের সকল নর নারী, আবালবৃদ্ধবনিতা তাঁর বিরহে ব্যাকুল হয়ে উঠল। মহারাজ যুধিষ্ঠির ও চার ভাই তাঁকে বিদায়কালে আলিঙ্গন করলেন। সুভদ্রা, দ্রৌপদী, কুন্তী, উত্তরা, গান্ধারী, সত্যবতী সকলেই তাঁর আসন্ন বিদায়ের কথা ভেবে ব্যাকুল হলেন। ধৃতরাষ্ট্র, যুযুৎসু, কৃপাচার্য, আচার্য ধৌম্য সকলেই অশ্রুসজল চোখে তাঁকে বিদায় জানালেন। শ্রীকৃষ্ণকথা ভক্তিভরে একবার মাত্র শুনলে তাঁকে আর ভোলা যায় না। সেই শ্রীকৃষ্ণকে হস্তিনাপুরবাসী এতদিন দেখেছেন, তাঁর সঙ্গে থেকেছেন, তাঁর স্পর্শও পেয়েছেন। তাঁদের পক্ষে শ্রীকৃষ্ণের এই বিদায়ক্ষণটিকে সহ্য করা কীভাবে সম্ভব?

শ্রীকৃষ্ণ রাজপ্রাসাদ ছেড়ে পদব্রজে চললেন নগরের রাজপথে। পথের দুপাশের সুন্দর বাড়িগুলির ছাদ থেকে পুরনারীগণ তাঁর ওপর ফুলের পাপড়ি নিবেদন করতে লাগলেন। পথের দুপাশে জোড়হাতে, অশ্রুসিক্ত চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল, সব বয়সের শহরবাসী। বিদায়কালে চোখের জলে যদি তাঁর কোন অমঙ্গল হয়, সেই ভয়ে পুরনারীরা কষ্ট হলেও চোখের জল সংবরণ করলেন।

তারপর তিনি তাঁর  রথে উঠলেন। তাঁর মাথায় সাদা ছাতা ধরলেন তাঁর প্রিয়সখা অর্জুন। সে ছাতার দণ্ড মণিময়, ছাউনি মুক্তামালায় সাজানো। উদ্ধব আর সাত্যকি তাঁর দুপাশে দাঁড়িয়ে চামর ব্যজন করতে লাগলেন। শুভক্ষণে চারদিকে বেজে উঠল শাঁখ, মৃদঙ্গ, ভেরী, ঘন্টা, দুন্দুভি।  শ্রীকৃষ্ণের রথ চলতে লাগল, কিন্তু গতি খুব ধীর। তাঁকে বিদায় দিতে, শহরের রাজপথ জনাকীর্ণতাঁর মুখে মোহন হাসি, সকলের দিকে তাঁর করুণাঘন দৃষ্টিসুন্দর রথের ওপর তাঁর অপরূপ মনোহর রূপের দিকে, নারী পুরুষ সকলেই মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল।

তাঁর কানে এলো, প্রাসাদের অলিন্দে দাঁড়িয়ে কুরুনারীদের আলাপ, “ওলো, ইনি কে জানিস, ইনিই সেই কৃষ্ণভগবান। সৃষ্টির আগে, জগতে একা ইনিই স্বরূপে থাকেন। এঁনার থেকেই সমস্ত বিশ্বচরাচরের সৃষ্টি। আবার প্রলয়ের কালে, জগৎ যখন ধ্বংস হয়ে যায়, সমস্ত জীবের আত্মা এঁনার মধ্যেই মিশে যায়। ইনিই সেই সনাতন পরমপুরুষ। যাঁর শুরু নেই, শেষও নেই। সামনে থেকে প্রণাম করার এমন সু্যোগ আর পাব কিনা জানি না আয় লো, আয়, এঁনাকে আমরা প্রণাম করি।

প্রিয়সখি, এঁনার ওই করুণা দৃষ্টিতে আমাদের মনের সব ময়লা মুছে যাচ্ছে। সাধু-মুনিরা যুগ যুগ তপস্যা করে, যোগসাধনা করে, ওঁনার পদ্মের মতো পা দুটোই শুধু দেখতে পান। অথচ আমরা আজ নিজের চোখে দেখছি ওঁর ওই মোহন রূপ, ওই মধুর হাসি আর করুণাসিন্ধু ওই দুই চোখের দৃষ্টি। আমরা কি কম ভাগ্যবতী, বল?

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শুধু সৃষ্টি করেই ক্ষান্ত হননি, বেদমন্ত্রে জীবকে ধর্ম পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। কোন কর্ম কর্তব্য, কোন কর্ম অন্যায় তাও তিনি নির্দেশ করেছেনএই সবই তিনি জীব পালনের জন্যেই করেছেন। তমোগুণে আচ্ছন্ন রাজারা যখন প্রজাদের অমঙ্গল করে, ক্ষতি করে, ধর্মনাশ করে; তাঁদের বিনাশের জন্যে এই কৃষ্ণভগবানই বারবার জগতে জন্ম নেনসত্ত্বমূর্তিতে তিনি নিজে আসেন সকলের সামনে, জগতে ঐশ্বর্য আর ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্যে।  করুণাময় ভক্তবৎসল ভগবান, সাধারণ ভক্তদের মনে সঞ্চার করেন ভক্তি, ভরসা, বিশ্বাস আর ধর্ম।

ওলো, আমার খুব হিংসে হয় যদুবংশের ওপর, মধুবন আর দ্বারকাপুরীর ওপর। কেন জানিস। ওই বংশেই যে উনি জন্ম নিয়েছেন! ধন্য হয়ে গেছে যাদবরা, তাঁর লীলায় ধন্য হয়েছে মধুবন, ধন্য হচ্ছে দ্বারকাপুরী। কি ভাগ্য বলতো দ্বারকার প্রজাদের? ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ওই অপরূপ রূপ তারা সকাল সন্ধ্যে রোজ দেখে। প্রত্যেকদিন তারা সামনে থেকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরণ বন্দনার সুযোগ পায়।

আরো ভাবতো, সখি, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেইসব পত্নীদের কথা! কত যুগের কঠিন তপস্যা করে, তবেই না তাঁরা পরমপুরুষকে স্বামীরূপে পেয়েছেন! নিজের হাতে শিশুপালদের মতো নৃশংস রাজাকে হত্যা করে, তিনিই উদ্ধার করেছিলেন, রুক্মিণী, জাম্ববতী, নাগ্নজিতীকে। তাঁরা এখন প্রদ্যুম্ন, শাম্ব ও আম্বের মতো গুণবান পুত্রের জননী। নরকাসুরকে হত্যা করেও তিনি উদ্ধার করেছিলেন সহস্র রমণী। তাঁরা নরকাসুরের অধীনে কি দুঃখের জীবন কাটিয়েছে, বল। তাঁদের সকলের হারানো সম্মান, যোগ্য অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছেন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। 

সই, এমন ভাবিস না, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শুধু ভক্তবৎসল করুণাসাগর। ভগবান ভালোবাসা ও প্রেমেরও রাজা। এই কৃষ্ণভগবান প্রেমেরও পারাবার। দেবরাজ ইন্দ্রের সঙ্গে প্রচণ্ড যুদ্ধ করে স্বর্গ থেকে পারিজাত এনেছিলেন, কার জন্যে জানিস? আমি জানি লো, আমি জানি, পরমপ্রিয়া রুক্মিণীর জন্যে...”

(সূত বললেন,) "নগরের মহাতোরণের কাছে এসে পড়ায়, কুরুললনাদের সেই আলাপ আর তিনি শুনতে পেলেন না। তিনি ঘাড় ফিরিয়ে মৃদুহাস্যে তাঁদের দিকে একবার তাকালেন, তারপর রওনা হলেন দ্বারকার পথে। তাঁর সঙ্গে রইল উদ্ধব আর সাত্যকি। সামনে আর পিছনে রইল চতুরঙ্গ সেনার দুটি দল। মহারাজা যুধিষ্ঠির, তাঁর পথের নির্বিঘ্ন নিরাপত্তার জন্যে এই সৈন্যদল পাঠিয়েছিলেন”

[মহামতি ভীষ্ম এমন কি সাধারণ পুরললনাদেরও ঈশ্বরের প্রতি তাঁদের বিমুগ্ধ মনোভাবের নিখুঁত চিত্রবৎ বর্ণনাগুলি, ভাগবত-পুরাণের অপূর্ব সাহিত্যগুণের পরিচয় দেয়। আজকের নীরস, উদ্ধত এবং অতীব স্থূল প্রোপাগাণ্ডার তুলনায় সাহিত্যরসে পরিপূর্ণ সেকালের এমন ঈশ্বরমহিমা-প্রচার মনোহরণ করে বৈকি - সে আমি ভক্ত হই বা না হই - সে আমি আস্তিক বা নাস্তিক হই, কিচ্ছু এসে যায় না তাতে।] 

পরের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৭ "

                  

বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬

পয়লা বৈশাখ

 

এর আগের রম্যকথা - " বিচিত্র ঐক্য " 


পয়লা বৈশাখ, ১৩৬৬ বঙ্গাব্দ

    সেই কালে মোকাম কলকেতার নানান অঞ্চলে চড়কের মেলা বসিত। আমাদের শৈশবে কিংবা বাল্যে দেখা আমাদের গেরামের মেলার সহিত তাহার বিস্তর ফারাক। কলকেতার মেলায় অনেক বেশি জাঁকজমক। কাঠের নাগরদোলা। কাঠের হাতিঘোড়ায় বসিয়া বন বন করিয়া ঘুরিবার মেরি-গো-রাউণ্ড। চোখধাঁধানো মনোহারি পসরা কিংবা খাদ্যসামগ্রী, সব ব্যাপারেই কলকেতার মেলা বিশিষ্ট। কাঁচের ও চিনামাটির তৈরি সায়েব-মেম পুতুল। রূপার তবক দেওয়া মিঠা পান। নানান রঙের সিরাপ দেওয়া, বরফ শীতল রঙিন সরবৎ। মালাই কুলফি। যুবা বয়েসে বন্ধু বান্ধবের পাল্লায় পড়িয়া কলকেতার মেলা বেশ কয়েকবার দেখিয়া অবাক হইয়াছিলাম, কিন্তু তাহাতে প্রাণের সাড়া পাই নাই। বরং মজা পাইয়াছিলাম অন্যত্র।

    কলকেতার চেতলার হাট মশারি আর মাছের জালের জন্যে বহুদিন হইতেই বিখ্যাত। কিন্তু আমি চেতলার যে মোহজালে মুগ্ধ হইলাম তাহা সংয়ের সাজ। পয়লা বোশেখের আগে ও পয়লা বোশেখের দিন চেতলার সং দেখিতে জন সমাগম হইত বিস্তর। কার্বাইড গ্যাসের চোখধাঁধানো উজ্জ্বল আলোয় বিচিত্র বেশে বেশ কিছু লোক সাজিয়া উঠিত কলকেতার বাবুদের নষ্টামি, আখড়ার মহারাজদের ধ্যাষ্টামি, কূলবধুদের গোপন ভ্রষ্টামি, মোহান্ত এলোকেশী সম্বাদ; এসব নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ তো ছিলই। তাহার উপর আরো থাকিত নির্ভেজাল হাসির উপস্থাপন। বুকফাটা কান্না, দমফাটা হাসি, আহ্লাদে আটখানা, কাজের ভারে কুঁজো। সন্ধ্যার পর জেলেপাড়ার সঙদের সেই মিছিল সমাবেশ, উপস্থিত জনগণের সহিত আমরাও অত্যন্ত উপভোগ করিতাম।

    পয়লা বোশেখের দিন সকালে ভৃত্যের মাথায় বেতের ধামায় লাল শালুমোড়া জাব্দা খাতা, শ্রীগণেশ ও শ্রীলক্ষ্মীর মূর্তি, লক্ষ্মীদেবীর ঝাঁপি লইয়া বাবুদের কেরানীরা দলে দলে আসিতেন কালীঘাটের কালী মন্দিরে। মন্দিরে পুজার ভিড়ে রীতিমতো হট্টগোল উপস্থিত হইত। দাপুটে বাবুদের কেরানীরা অর্থের দাপট দেখাইতে কসুর করিতেন না, তাঁহাদের উৎকোচে মন্দিরের পুরোহিতগণের মধ্যে হুড়াহুড়ি পড়িয়া যাইত। এই পুরোহিতগণ মাকালীর সহিত সরাসরি যোগাযোগ ঘটাইয়া সম্বৎসরের ব্যবসার সুবন্দোবস্ত করিয়া দিবার আশ্বাস দিতেন। পুজার পর তাঁহারা জাব্দা খাতায় আলতাকালিতে উপরে ‘ওঁমা’, তাহার নিচে ‘শ্রীশ্রীকালিমাতা সহায়’ লিখাইয়া লইতেন। তাহার নিচে স্বস্তিকা চিহ্ন আর একদম নিচের দুই কোণায় আলতায় ডোবানো রৌপ্যমুদ্রার দুই পিঠের মোহর।

    কলকেতা শহরে সে সব মেলা আজিকালি আর তেমন দেখি না। লোকে আজিকালি অন্ধকার ঘরে টিকিট কাটিয়া বায়োস্কোপ দেখে। তাহারা নায়ক নায়িকাদের গান আর মেকি হাসিকান্নায় মজিয়া থাকে। শুনিয়াছি কলকাতার নব্য বাবুরা এখন চড়কের মেলা, সং ইত্যাদির আনন্দকে “ছোটলোকি” বলে। বলে এসব সেকেলে ফক্কুড়ি দেখিয়া সময় নষ্ট করিবার মতো সময় তাহাদের নাই। হবে হয়তো। আমাদের যৌবনে আমরা তো এসব খুবই উপভোগ করিতাম। আজিকালি বয়স হইয়াছে, এ যুগের ছোকরাদের মতিগতি আর বোধগম্য হয় না।  

    আমার গিন্নি পয়লা বোশেকের ছুটির দুপুরে বড়োই তরিবতে রন্ধন করেন। সজনে ডাঁটার শুক্ত, রুই মাছের মুড়ো দেওয়া ভাজা মুগের ডাল, ঝিরিঝিরি আলুভাজা, পটল-আলুর মাখোমাখো তরকারি, রক্তরাঙা ঝোলের মধ্যে দুইখানি অর্ধগোলক আলু সহ অনেকটা কচিপাঁঠা, কাঁচা আমের পাতলা অম্বল। সবার শেষে মিঠে দধি। এইরূপ আকণ্ঠ মধ্যাহ্ন ভোজের পর, গালে গিন্নির হাতের পান লইয়া, পয়লা বোশেখের দুপুরটি দিবানিদ্রায় অতিবাহিত করি, জানালা দরোজা বন্ধ প্রায় অন্ধকার ঘরে।

    দিবানিদ্রা সারিয়া বারান্দায় যখন বসি, পথের আলো জ্বালাইবার জন্য পুরসভার কর্মচারিরা লম্বা আঁকশি হাতে দৌড়াইয়া চলে। পাড়ার যতো বাড়ির দরোজায় দরোজায় বেলফুলের মালা লইয়া ফিরিওয়ালা ডাক পাড়ে “বেইলফুউউল”। তাহার চিকন কণ্ঠের সুরে ও বেলফুলের সৌরভে প্রথম বৈশাখের সন্ধ্যাটি বড়ো মধুর হইয়া উঠে। তাহার পশ্চাতে আসে মালাইবরফ এবং কুলফি মালাইয়ের ফিরিওয়ালা। পাড়ার বখাটে ছোকরার দল তাহাকে আড়ালে ডাকিয়া সিদ্ধি মিশ্রিত কুলফি মালাই খাইয়া অকারণ হাসিতে পাড়া মাতায় তোলে।

    সন্ধ্যা একটু গড়াইলে, পাটভাঙা ধুতি আর গিলে করা আদ্দির পাঞ্জাবি পড়িয়া রাশভারি মুখে বাহির হই। পায়ের পাম্পশুতে মচ মচ ধ্বনি তুলিয়া যখন হাঁটি নিজের ভারিক্কি চালে নিজেই অবাক হই। গেরামে থাকিতে যাহারা আমাকে ‘আত্তাঁ’ বলিয়া চিনিত, তাহারা আমার এই ‘আত্মারামবাবু’ মার্কা চেহারা দেখিলে কিরূপ ভিমরি খাইত কল্পনা করিয়া, বড়ো আল্লাদ পাই।

    কালেজ স্ট্রিটের মেডিক্যাল কলেজের বিপরীতে কল পাইপের বিপণিগুলির অধিকাংশই আমাদের দেশজ সুহৃদদের মালিকানা। হালখাতা উপলক্ষে এই সব বিপণির উদার হৃদয় মালিকেরা অতিথি আপ্যায়নের বিপুল আয়োজন করিয়া থাকে।

    দোকানের প্রবেশ পথেই একজন কর্মচারী পিচকারি হইতে মাথায় মুখে গায়ে ফ্যাঁস ফ্যাঁস করিয়া গোলাপজল ছিটাইয়া দেয়। সদ্য গ্রাম হইতে আসিয়া কলকেতা নিবাসী হইবার পর যেবার প্রথম হালখাতা অনুষ্ঠানে আসিয়াছিলাম, এই ঘটনায় অত্যন্ত বিরক্ত হইয়াছিলাম। বলা নাই কওয়া নাই, খামোখা আমার গাত্রে জল ছিটাইয়া দেওয়া, এ কী ধরনের রসিকতা? সৌভাগ্যক্রমে সেই ক্ষণে বিপণির মালিকপুত্র “আসুন খুড়ামহাশয়” বলিয়া আমার হাতে ঝাউপাতায় মোড়া গোলাপকলি উপহার দিয়া ভিতরে বসাইয়াছিল। নচেৎ সেদিন হয়তো কুরুক্ষেত্র বাধাইয়া নিজেকেই হাস্যাস্পদ করিতাম। বসিবার পর দেখিয়াছিলাম ওই কর্মচারি সকলকেই ওই জল ছিটাইতেছে, ও তাহাতে গোলাপের সুবাস। ক্রোধ প্রশমিত হইলে, নিজ গাত্রেও ওই গোলাপজলের সুবাস উপলব্ধি করিয়া চমকিত হইয়াছিলাম।

    বিপণির ভিতরের প্রাত্যহিক ব্যবসায়িক পরিবেশ আজ নাই উজ্জ্বল আলোর নিচে ফরাস পাতা, তাহাতে ধবধবে চাদর বিছানো। ফরাসে বসিয়া অশীতিপর এক মুসলিম বৃদ্ধ সানাই বাজাইতেছেন। তাঁহার সহিত তবলায় একজন সঙ্গত করিতেছেন। সেই সানাইয়ের মাঙ্গলিক সুর যেন নতুন বর্ষের শুভদিনের সূচনা করিতেছে। কিন্তু আশ্চর্য, সেই সুরের প্রতি উপস্থিত কাহারো মনোযোগ নাই। সকলেই নিজেদের মধ্যে বাক্যালাপে ব্যস্ত। সকলের হাতেই কি এক পানীয়ের বোতল, তাহাতে সরু পাইপ বসানো। সেই পাইপে ঠোঁট লাগাইয়া হাল্কা চুমুকে সকলে পানীয়ের মজা লইতেছে। এই পানীয় কি সুরা জাতীয় কিছু? কলকেতার বাবুরা কি প্রকাশ্য সন্ধ্যালোকে নির্লজ্জের মতো মদ্যপান করিয়া থাকে?

    এই সব ভাবিতে ভাবিতে বিপণির মালিক অমিয়ভূষণ মহাশয়, আমার কাছে আসিয়া নমস্কার করিয়া বলিলেন, ‘সব ভালো তো আত্তাঁ, কোন রকম সংকোচ করবা না। আরে একি, তোমাকে কোল্ডিংক দেয় নি? অ্যাই ব্যাচা, এদিকে একটা কোল্ডিংক নে আয়। বাড়ির সব খপর ভালো? বাচ্চা পরিবার, সবাই? হে হে হে, খুব ভালো। আরে আসুন আসুন বিপত্তারণবাবু, আজকাল আপনার আর দ্যাকাই পাওয়া যায় না, আমি ওদিকটা একবার দেকে আসি, যেদিকটা না দেকবো, সেকানেই ...বোয়লে না?” অমিয়ভূষণবাবু অন্যদিকে যাইবার পরেই ব্যাচা নামের ছোকরাটি আমার হাতে এক বোতল শীতল পানীয়ের মধ্যে সরু পাইপ ডুবাইয়া দিয়া গেল। অন্যদের দেখাদেখি কায়দা করিয়া আমিও পাইপে অধর চাপিয়া পানীয় টানিয়া লইলাম। স্বাদ মন্দ নয়। স্বাদ ও গন্ধে মদ বলিয়াও মনে হইল না, কারণ ইহার পূর্বে ছোকরাকালে কুসঙ্গে পড়িয়া দু একদিন ব্রান্ডির স্বাদ লইয়াছিলাম।    

    কিন্তু ও কী ও, আমার এ কী হইল? পানীয় গলাধঃকরণের পরই পেটের মধ্যে বিশাল উদ্গারের উদ্গম হইল। আমি রোধ করিতে পারিলাম না, আমার কণ্ঠ হইতে অদ্ভূত এক শব্দ নির্গত হইল। মনে হইল আমার উদরের অজ বালক পুনর্জীবন পাইয়া তাহার মাতার সন্ধানে ডাকিতেছে। আমার আশেপাশে উপবিষ্ট, বিশিষ্ট জনের দুই চারিজন আমার বাণীতে চমকিত হইলেন, ঘাড় ফিরাইয়া আমার আপাদমস্তক মাপিয়া লইলেন। ইহার পর ওই ভুল আর করি নাই, পাইপে হাল্কা টানে অল্প পানীয় পান করিতে লাগিলাম। তাহাতেও ছোট ছোট উদ্গার উঠিতেছিল, কিন্তু আমি সেগুলিকে নাসিকা পথে ছাড়িতে লাগিলাম। তাহাতে নাসিকা জ্বলিতে লাগিল, কিন্তু সম্মান রক্ষা হইল। এমন পানীয় মনুষ্যজাতির সভ্যতায় কোন মহৎ উদ্দেশ্য সাধিত করিবে, বলিতে পারি না।

    অমিয়ভূষণবাবুর বিপণি হইতে দুইখানি বাঙ্গালা ক্যালেণ্ডার ও দুই বাস্কো মিষ্টান্ন লইয়া বিদায় লইলাম। তাহার পর আরো ছয়খানি পরিচিত বিপণিতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করিয়া টানা রিকশয় গৃহে ফিরিলাম। আমার বগলে তখন পাঁচখানি বাঙ্গালা ক্যালেণ্ডার ও দুই হাতে নয় বাস্কো মিষ্টান্ন। আরো দুইখানি হাত থাকিলে, আরো কয়েকটি বিপণিতে যাইতে পারিতাম ভাবিয়া আক্ষেপ হইল। কিন্তু বিধির বিধানে হাত মাত্র দুইখানি!

    রাত্রের রন্ধন হইতে মুক্তি পাইয়া আমার গৃহিণী আনন্দিতা হইলেন। দুই পুত্র ও দুই কন্যা সহ আমরা সকলে নয়খানি বাস্কো উদরসাৎ করিয়া পরিতৃপ্ত হইলাম। গৃহিণীর বানানো একখানি পান গালে লইয়া বাহিরের বারান্দায় দাঁড়াইলাম। ভাবিলাম পয়লা বোশেখের মঙ্গলরাত্রি বড়ো আনন্দে যাপিত হইল।

    জানি না কেন এই সময় মনে পড়িল সেই শীর্ণ বৃদ্ধ সানাইশিল্পীর কথা। তাঁহার সানাইবাদনের প্রতি আমাদের কাহারো বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। একদল শূকরের সম্মুখে ছড়ানো মুকুতার মতো তাঁহার শিল্প প্রয়াস তিনি বিতরণ করিতেছিলেন, শুধুমাত্র তাঁহার নিজের ও পরিবারের উদরপূর্তির প্রত্যাশায়। একজন শিল্পীর, নামজাদা নাই বা হইলেন, এ হেন অবহেলা আমরা না করিলেও পারিতাম।

    পয়লা বৈশাখে নববর্ষের এই শুভ দিনটিতে তাঁহার সানাইয়ের সেই মাঙ্গলিক সুর কলকেতার স্বার্থ সন্ধানী মানুষের অন্তরে এতটুকুও দাগ রাখিতে পারিল না। আগামী কল্য দোসরা বৈশাখ, আর পাঁচটা সাধারণ কর্মব্যস্ত দিনের সহিত এতটুকুও ফারাক থাকিবে না। সকালে গৃহিণীর প্রস্তুত মৎস্যের ঝোল-ভাত নাকে মুখে গুঁজিয়া দপ্তরে যাইব। দিনগত পাপক্ষয় করিতে করিতে আরও একটি বৎসর পার হইয়া জীবনে আরও এক পয়লা বৈশাখ আসিবে, ভাবিতে ভাবিতে কখন ঘুমাইয়া পড়িলাম মনেও নাই।

-   ০০ –


[আত্মারাম বাগচি মহাশয়ের স্মৃতিকথার আংশিক পরিমার্জিত রূপ “পয়লা বৈশাখ"; বানান ও শব্দ ব্যবহার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বাগচি মহাশয়ের জন্ম প্রাক-স্বাধীনতা যুগে, কর্ম উত্তর-স্বাধীনতার দিনগুলিতে।] 

এর পরের রম্যকথা - " পাইলট "

নতুন পোস্টগুলি

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ৮

   এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য " ...