শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬

আগুনের পরশমণি - পর্ব ১

  ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "



এর আগের পর্ব - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - শেষ পর্ব 

এর আগের গল্প - " মানিকজোড় "


প্রথম পর্ব

 

আগুন, আগুন, দাউ দাউ আগুন জ্বলছে পাহাড়তলিতে। আগুনের হল্কা, ধোঁয়া, আর ছাই উড়ছে হাওয়ায়। গাছের মোটা মোটা ডাল আর গুঁড়ি ফাটছে ফট ফট শব্দে। বড়ো বড়ো গাছের ডাল দাউ দাউ করে জ্বলতে জ্বলতে ভেঙে পড়ছে মাটিতে, তীব্র আগুনের শিখা লক লক করে উঠছে থেকে থেকে। জঙ্গলের মধ্যে বাস করা পশুর দল দৌড়ে চলেছে দিগ্বিদিকেএখন হিংস্র বাঘের পাশে পাশে দৌড়চ্ছে হরিণের পাল। বুনো শুয়োরের সঙ্গে দৌড়চ্ছে বুনো মহিষের দল। কেউ কেউ দিশাহারা হয়ে ঢুকে পড়ছে আগুনের মধ্যে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জ্বলতে জ্বলতে পড়ে যাচ্ছে আগুনের মধ্যে আর উঠে দাঁড়াচ্ছে না।

গুহার মুখে বসে এক বৃদ্ধ মানুষ দেখছিলেন, দলের যুবক যুবতী, বাচ্চা বাচ্চা ছেলে মেয়েরা চঞ্চল হয়ে উঠছিল বারবার, পাহাড়তলিতে ওই আগুনের দৃশ্য দেখে, তাদের চোখে, তাদের আচরণে প্রচণ্ড আতঙ্ক। এই গুহাতে থাকা কী উচিৎ হবে? ওই আগুন যদি উঠে আসে এই পাহাড়ের চূড়াতেও, যদি গ্রাস করে নেয় আদিম মানুষের এই নিশ্চিন্ত আবাসটুকু? দিনের বেলায় আগুনের প্রকোপটা খুব স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না, কিন্তু রাতের অন্ধকারে সেই আগুনের তীব্র উজ্জ্বল রঙের প্রবাহে মুগ্ধ হয়ে গেল্ সেই মানুষগুলো। কী অপূর্ব সুন্দর রং, কি অপূর্ব তার আভা, আগুনের উজ্জ্বল গোলাপী আভায় উদ্ভাসিত হয়ে রইল সারা আকাশ। সেই ভয়ংকর অথচ সুন্দর অগ্নিকাণ্ডের দিকে নেশাগ্রস্তের মতো তাকিয়ে থেকে তারা সকলেই সারারাত কাটিয়ে দিল। ভোরের দিকে সে আগুন স্তিমিত হয়ে এল অনেকটাই, অজস্র ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে আকাশের দিকে, ধোঁয়ার আবরণে আচ্ছন্ন জঙ্গল। বাতাসে ধোঁয়ার গন্ধ। বিনিদ্র দুই চোখ জ্বালা করছে ধোঁয়ার স্পর্শে।

এক প্রৌঢ়া মহিলা বৃদ্ধের পাশেই বসেছিলেন, বললেন, “বাবা, মনে হচ্ছে, আগুন নিভে গেছে”। 

অশক্ত জরাগ্রস্ত শরীরের ভারে দুই হাঁটুর উপর নত হয়ে আসা মাথা তুলে বৃদ্ধ মানুষটি বললেন, “ও ভাবে বোলো না, ও ভাবে বোলো না, বলো অগ্নিদেব। করজোড়ে, নতজানু হয়ে বলো, হে অগ্নিদেব, তুমি শান্ত হও। হে প্রভু, শান্ত করো তোমার রোষ। হে দেবতা, তোমার ক্রোধের প্রচণ্ড তেজ জগতে কেউই সহ্য করতে পারে না। তুমি নিরস্ত হও। প্রসন্ন হও, হে অগ্নিদেব, তুমি প্রশমিত হয়ে আমাদের কল্যাণ দাও” প্রৌঢ়া  মহিলা নতজানু হয়ে, করজোড়ে কণ্ঠ মেলালো বৃদ্ধ মানুষটির সঙ্গে। তাদের ওই মন্ত্র উচ্চারণ করতে দেখে দলের অন্য সকলেও এসে বসল তাদের ঘিরে। গুহার সামনের চাতালে বসে তারা দেখল, গত পরশুও যে জঙ্গল থেকে তারা পশু শিকার করে আনত, সংগ্রহ করে আনত গাছের ফল, মূল, কন্দ, ক্ষত সারানোর ওষধি, সেই জঙ্গল আজ নিঃস্ব, পড়ে আছে শুধু ছাই আর জ্বলন্ত অঙ্গারের স্তূপ।

প্রৌঢ়া মহিলাই এই দলের নেত্রী। তার কাছাকাছি এসে বসেছিল তার থেকে একটু কমবয়সের আরো চারপাঁচজন  মহিলা। তাদের একজন বললেন, “গুহায় সঞ্চিত সব খাবার দাবার প্রায় শেষ, এতগুলো লোক এখন কী খাবে? গত পরশুদিন শিকার করে আনা পশুমাংসে কাল সারাটাদিন চলে গেছে। টেনেটুনে আজকের দিনটাও হয়তো চলে যাবে। কিন্তু আজ রাত্রে, কিংবা কাল সকাল থেকে কী খাবে এতগুলো মানুষ? এখনই শিকারে যাওয়া দরকার, তা না হলে এতগুলো লোকের অনাহার অনিবার্য”। 

সে কথা প্রৌঢ় মহিলার বুঝতে অসুবিধে হল না, বড়দের কথা না হয় ছেড়েই দেওয়া গেল, কিন্তু বাহাত্তর জনের এই দলে আছে অন্ততঃ চোদ্দ জন বালক বালিকা, তাদের ক্ষুধা কিভাবে শান্ত হবে? অসহায় চোখে তিনি উপস্থিত সকলের মুখের দিকে তাকালেন, কিন্তু কোন উত্তর খুঁজে পেলেন না। বৃদ্ধ মানুষটির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু আশার কথা যেন শুনতে চাইলেন প্রৌঢ়া মহিলা। 

বৃদ্ধ মানুষটি শ্লেষ্মা জড়িত ঘড়ঘড়ে গলায় বললেন, “দেবতার রোষ, এর থেকে মুক্তি দেখাতে পারেন একমাত্র দেবতাই। তাঁকে প্রসন্ন করো, তাঁকে সন্তুষ্ট করোকিছু একটা উপায় তিনি ঠিক করে রেখেছেন। এতগুলো অসহায় মানুষকে তিনি অনাহারে মরতে দেবেন না নিশ্চয়ই”। 

বৃদ্ধ মানুষটির এই কথার থেকে, এই দুরবস্থা থেকে উদ্ধারের কোন উপায় পাওয়া গেল না, সকলেই অসহায় চোখে তাকিয়ে রইল ধোঁয়া ওঠা জঙ্গলের দিকে। অনেকক্ষণ পর একটি যুবক হঠাৎ কথা বলে উঠল, “আজ খুব ভোরে আমি নীচেয় গিয়েছিলাম”, অজানা আশঙ্কায় সবাই শিউরে উঠল, সবাই ফিরে তাকাল সেই যুবকের দিকে। সকলের চোখেই একই জিজ্ঞাসা, কেন গিয়েছিলি? কি দেখলি সেখানে? 

সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে সে বলল, “দেখলাম, চারিদিকে ছাইয়ের স্তূপ, তারমধ্যে পড়ে আছে অনেক অনেক পশুর দগ্ধ দেহ। আশে পাশে জীবনের কোন অস্তিত্বই নেই আর। একটা পাখির ডাকও শুনতে পেলাম না। এমন নিঃশব্দ প্রাণহীন জায়গা আগে কোনদিন দেখিনি আমি। আমার খুব খিদে পেয়েছিল, গতকাল প্রায় কিছুই খাওয়া হয়নি আমার”

যুবক এই পর্যন্ত বলে একটু থামল। প্রৌঢ়া মহিলারা নিজেদের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন, প্রায় সকলেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেনএই যুবক প্রৌঢ়া নেত্রীর এক বোনের ছেলে। সবার থেকে আলাদা। একটু দুর্বল, অন্য ভাইয়েরা যেমন বলিষ্ঠ শক্তিমান, এ ততটা নয়, কেমন যেন ভাবুক ধরনের। অন্য সব যুবকেরা খাবার সময় যেমন হামলে পড়ে, ও তেমন নয়, ও অপেক্ষা করে। সকলে খাওয়ার ভাগ তুলে নেওয়ার পর, যেটুকু বাঁচে, তাতেই ও খুশি থাকে। তার মা সেটা লক্ষ্য করে, প্রয়োজনে নিজের ভাগের থেকে তুলে দেন ছেলেকে। কাল নিচের দাবানলের আতঙ্কে খেয়াল করেননি, তাই গতকাল যুবক ছেলেটি অভুক্ত থেকেছে! 

যুবক আবার বলতে শুরু করল, “কিচ্ছু পেলাম না, না ফল, না মূল, না কন্দ। এক জায়গায় বেশ বড়োসড়ো কয়েকটা হরিণ মরে পড়ে আছে দেখলাম, চামড়াহীন অর্ধদগ্ধ, মাথার শিং ছাড়া তাদের চেনবার উপায় নেই। পাথরের ছুরি দিয়ে কেটে সামনের পা থেকে অনেকটা মাংস কেটে নিলাম। আধপোড়া মাংস এতই নরম কাটতে কোন অসুবিধে হল না, অসুবিধে হল না, দাঁতে ছিঁড়ে চিবোতে। একটু পোড়া পোড়া গন্ধ, কিন্তু কাঁচা রক্ত মাংসের গন্ধ নেই, আর কি নরম, তুলতুলে, চিবোতেই যেন মিলিয়ে যেতে লাগল মুখের ভিতর। অনেকটা মাংস খেয়ে ফেললাম। ফিরে এসে দেখি, দাদু অগ্নিদেবের মন্ত্র পড়ছেন”। প্রৌঢ়া মাসিমার দিকে তাকিয়ে যুবক বলল, “মাসিমা, আমরা কয়েকজন মিলে যদি ওই আধপোড়া পশুদের ওপরে বয়ে আনতে পারি, আমাদের বেশ কয়েকদিনের খাবারের সমস্যা মিটে যাবে। আর তার মধ্যে আমরা নিশ্চয়ই কোন বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে নিতে পারবো”। 

যুবকের কথা শেষ হবার আগেই, বৃদ্ধ শিউরে উঠলেন, ভীষণ উত্তেজিত হয়ে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠস্বরে বললেন, “মূর্খ, উদ্ধত যুবক, তুই জানিস না কী ভয়ানক পাপ তুই করেছিস। ওই পশু প্রভু অগ্নিদেবের শিকার, তাঁর অগ্নিপ্রভায় ওইসকল পশু দগ্ধ হয়ে মারা গেছেঅগ্নিদেবের খাবার তুই চুরি করেছিস, এর পরিণাম মোটেই ভালো হবে না”। তারপর নিজের পুত্র-কন্যা-পৌত্র-পৌত্রীদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “সাবধান হ, সাবধান হ। লোভের বশে এমন পাপ করিস না। ওই অজ্ঞান ছোকরার কথায় ভুলেও অগ্নিদেবের আহারে ভাগ বসাতে যাস না। মরবি, সকলে একসঙ্গে মরবি, দেবতার রোষে কেউ পরিত্রাণ পাবি না”।  

বৃদ্ধের কথা যুবকের মনঃপূত হল না, সে অধৈর্য হয়ে বলে উঠল, “কিন্তু দাদু, অগ্নিদেব তাঁর একার আহারের জন্য এতগুলি পশুকে কেন পুড়িয়ে মেরে ফেললেন? তিনি কেমন দেবতা? আর মেরেই যখন ফেলেছেন, আমাদের আহারের জন্য, তার থেকে দশ-বিশ খানা যদি আমরা সরিয়েই আনি, তাতেই বা তিনি ক্রুদ্ধ হবেন কেন? তিনি না আমাদের দেবতা, আমরা যদি সুস্থ শরীরে বেঁচেই না থাকি - যদি অনাহারে মারাই যাই, তাঁকে দেবতা বলে কে মনে রাখবে”?

বৃদ্ধ প্রচণ্ড ক্রোধে কাঁপতে লাগলেন, তাঁর আর সেই শক্তি নেই, না হলে এক ঘুঁষিতে ভেঙে দিতে পারতেন এই উদ্ধত যুবকের নাক। তিনি নিজের মেয়েদের বললেন, “তোদের আস্কারা পেয়েই, ওর এই দশা। ওকে সংযত কর, নয়তো অগ্নিদেবের রোষে আমরা সবাই ধ্বংস হবো”। 

প্রৌঢ়া নেত্রী গম্ভীর আদেশের সুরে বললেন, “আপনি শান্ত হোন বাবা, আমি দেখছি কী করা যায়। আপনি বরং গুহার ভিতরে গিয়ে বিশ্রাম নিনকাল সারারাত আপনার এতটুকুও বিশ্রাম হয়নি।” ঈশারা পেয়ে দুই পুত্রের কাঁধে ভর দিয়ে, তিনি গুহার দিকে চলে গেলেন। বৃদ্ধের গুহায় ঢোকা অব্দি অপেক্ষা করে, যুবক বোনপোর দিকে তাকিয়ে প্রৌঢ়া নেত্রী জিজ্ঞাসা করলেন, “তুই ওই পোড়া মাংস খেলি? তোর ভালো লাগল?  কাঁচা টাটকা মাংস ছাড়া অন্য কোন মাংস খাবার কথা আমি তো ভাবতেই পারি না”। 

প্রৌঢ়া নেত্রীর কথা প্রায় সবাই সমর্থন করল, অনেকে সেই যুবককে উপহাস করে বলল, “ছিঃ, পোড়া মাংস আবার কেউ খায় নাকি? থুঃ থুঃ। তোর কি কোন রুচি অরুচি নেই, রে? কোন পশুকেও কোনদিন পোড়া মাংস খেতে দেখিনি। তুই তো পশুরও অধম”। 

প্রৌঢ়া নেত্রী হাত তুলে সবাইকে চুপ করার আদেশ দিলেন, সবাই থামলে তিনি বললেন, “আমি অবশ্য অতটা বিরুদ্ধে যেতে চাইছি না। কারণ, আমরা এখন ভীষণ সংকটে, জঙ্গল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, জ্যান্ত পশুরা পালিয়ে গেছে দূরের অন্য কোন জঙ্গলে। নতুন জঙ্গল খুঁজে আমাদের সকলের বেঁচে থাকার মতো যথেষ্ট শিকার যোগাড় করতে বেশ কদিন সময় লাগবে। ততদিন, যদি একদম অখাদ্য না হয়, আমরা সবাই নীচেয় গিয়ে ব্যাপারটা বুঝে আসতেই পারি”

বৃদ্ধবাবার এবং তাঁর অগ্নিদেবের রোষের কথা দু একজন বলল, কিন্তু প্রৌঢ়া নেত্রী সে কথায় কান দিলেন না। তিনি জানেন এই পরিস্থিতিতে এত বড়ো দলটাকে সুস্থ ভাবে বাঁচিয়ে রাখাটা অনেক বেশি জরুরি, অনাহারে যদি সবাই মারাই যায়, তখন প্রভু অগ্নিদেবের রোষে কী আর এমন এসে যাবে? যুবক বোনপোর কথাগুলো পুরোটা মেনে নিতে পারেননি ঠিকই, কিন্তু অস্বীকার করে উড়িয়ে দেওয়ার জোরও পাচ্ছেন না।  শিশু আর দু একজন অসুস্থদের দেখা শোনার জন্যে কয়েকজন মহিলা থেকে গেল, দলের বাকিরা চলল পাহাড়তলির দিকে, সকলের সামনে সেই যুবক আর নেত্রী মহিলা। তাদের সকলের হাতে পাথরের তৈরি নানান আকারের ফলা।

 ফেলে যাওয়া সেই হরিণের পা থেকে পাথরের ফলা দিয়ে কেটে কেটে বেশ কয়েকটা টুকরো মাংস কেটে তুলল সেই যুবক, বাড়িয়ে দিল প্রৌঢ়া নেত্রী, তার মা ও অন্যান্য মাসিদের দিকে। অধীর আগ্রহে অন্য সকলে তাকিয়ে রইল তাদের দিকে। সকলেই জিভে ঠেকিয়ে স্বাদ নিলেন, গন্ধ নিলেন, তারপর দাঁতে কেটে চিবোতে লাগলেন মাংসের টুকরো। একদম অন্য রকম স্বাদ। একটু পোড়া পোড়া গন্ধ, কিন্তু তাতে পশুর নিজস্ব গন্ধ নেই বললেই চলে। অনেক সময় কিছু কিছু পশুর গায়ে খুব উৎকট গন্ধ হয়, সে গন্ধ অনেকটাই কম লাগছে। আর সব থেকে আশ্চর্য এত নরম মাংস, পূর্ণ বয়স্ক হরিণের মাংস বলে মনেই হচ্ছে না, মনে হচ্ছে খুব বাচ্চা কোন হরিণের। তাঁদের আচরণে দলের অন্য সকলেই কিছুটা ভরসা পেল, তারাও সবাই নিজেদের পাথরের ফলা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল মাংস কেটে কেটে তুলতে।

পোড়া মাংসের অভিনব স্বাদ নিতে নিতে প্রৌঢ়া নেত্রী এবং তাঁর বোনেরা, দলের অন্য সকলের দিকেই লক্ষ্য রাখছিলেন। তাঁরা দেখলেন, শিকার করে আনা বড়ো একটা হরিণকে শেষ করতে যে সময় লাগে, তার অর্ধেক সময়েই দু দুটো প্রমাণ সাইজের আধপোড়া হরিণ শেষ করে দিয়েছে তাঁর দলটা। তার মানে ঝলসে যাওয়া এই পশুর মাংস ছাড়িয়ে খেতে অনেক কম সময় লাগছে। এই মাংস শিশু এবং নড়বড়ে দাঁত বৃদ্ধদের পক্ষেও অসুবিধের হবে না। প্রৌঢ়া নেত্রী সবাইকে নির্দেশ দিলেন, যতগুলো সম্ভব এমন ঝলসানো পশু নিয়ে উপরে গুহার মধ্যে সংগ্রহ করতে। 

তারপর যুবক বোনপোর কাঁধে হাত রাখলেন, বললেন, “তোর থেকে আমরা এক নতুন বিষয় শিখলাম। আগুনে ঝলসানো পশু খাবার পক্ষে খুব সুবিধের। বাবা বলেছিলেন, এ অগ্নিদেবের রোষ, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে এ তাঁর আশীর্বাদ। কিন্তু এমন তো রোজ রোজ হতে পারে না! জঙ্গলে তো আর নিয়মিত আগুন লাগবে না, আর একবার আগুন লাগলে জঙ্গলই তো সাফ হয়ে যাবে! কাজেই এমন সুবিধে রোজ রোজ আমাদের ভাগ্যে জোটার কোন আশা নেই”।

“কিন্তু, আম্মা, আগুন যদি জ্বালানো যেত, আমরা তো শিকার করে এনে, ঝলসে নিতে পারতাম, আমাদের দরকার মতো!” 

যুবকের এই কথায় প্রৌঢ়া নেত্রী খুব বিরক্ত হলেন, রূঢ়ভাবে বললেন, “মূর্খ বাচালের মতো কথা বলিস না। প্রকৃতিতে ঝড়, বৃষ্টি, সূর্য, চন্দ্রের মতো, আগুনও দেবতার দান। এই আগুন নিজেই অগ্নিদেবতা। সেই আগুন তুই দরকার মতো জ্বালাবি, নেভাবি? তোর স্পর্ধার তো সীমা নেই, দেখছিআমরা সবাই দেবতার অধীন, সেই দেবতাকে তুই বশে আনতে চাস? বাবা, ঠিকই বলেছেন, আমরাই আদর দিয়ে দিয়ে তোকে মাথায় তুলে দিয়েছি। এমন কথা আর কক্ষণো যেন না শুনি, এমন অমঙ্গলের কথা চিন্তা করলে, এই দলে আর তোর জায়গা হবে না, বলে দিলাম”।

যুবক মাথা নীচু করে রইল, আর কিছু বলল না, তবে তার মাথার মধ্যে চিন্তাটা ঘুরতেই লাগল। তার মনে হল অগ্নিদেবতার কী এমন গরজ পড়ল, যে তিনি আমাদের জন্য অজস্র পশু ঝলসে রেখে দিলেন? আর তার জন্যে তিনি, গোটা জঙ্গলটাকেই পুড়িয়ে ছাই করে দিলেন! কাল কী খাব সেটা একবারও ভাবলেন না? এটা কি সত্যিই অগ্নিদেবতার আশীর্বাদ, নাকি নিছক একটা দুর্ঘটনা? 

                                                         

ঝলসানো পশু শুধু যে খাওয়ার সুবিধে তাই নয়, কাঁচা মাংসের থেকে অনেক বেশিদিন রাখাও যায়। অতএব গুহাবাসী এই দলটি বেশ কটাদিন সময় পেয়ে গেল, বেশ কিছুটা দূর পর্যন্ত জঙ্গলের সন্ধান করার এবং পেয়েও গেল মনোমত পশু এবং পর্যাপ্ত ফলমূল ভরা গভীর এক জঙ্গল। সেদিন ভোর ভোর তাদের একটা বড়দল পাথরের সমস্ত অস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়ল, সেই জঙ্গলে শিকার করতে। জঙ্গলের সবই ভালো, কিন্তু খুব পাথুরে, যেখানে সেখানে গভীর গাছপালার ভিতরে হাতির পিঠের মতো বড়ো বড়ো পাথর মাথা তুলে পড়ে আছে। এই পাথরের সুবিধে, অসুবিধে দুইই আছে। শিকারীর সুবিধে লুকিয়ে থাকতে, অসুবিধে শিকার খুঁজতে, কারণ পাথরের আড়ালে পশুরা লুকিয়ে থাকলে, চট করে দেখতে পাওয়া যায় না। 

এমনই এক বড়ো পাথরের আড়ালে শুকনো ঘাসপাতা আর ঝোপঝাড়ের মধ্যে হঠাৎ চোখে পড়ল দলছুট একটা বয়স্ক বুনো শুয়োর লুকিয়ে আছে। দলের লোক এবং মহিলারা অর্ধচন্দ্রের মতো গোল হয়ে, অস্ত্র বাগিয়ে নিচু হয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে চলল ঘন ঘাসের মধ্যে গা ঢাকা দিয়ে তাকে ঘিরে শিকারী মানুষগুলোর অস্তিত্ব পশুটা বুঝে ফেলেছে, সে এখন সতর্ক, তার শরীর টানটান উত্তেজনায়, স্থির চোখে সে লক্ষ্য রাখছে, মানুষগুলোর গতিবিধি। শিকারী মানুষগুলোর বৃত্তটা যতো ছোট হয়ে আসতে লাগল, দুপক্ষের উত্তেজনার পারদ ততই চড়ছে। হঠাৎ শিকারীদের সঙ্গে শিকারের চোখাচোখি হতেই, মূহুর্তের জন্য সমস্ত কিছু থেমে গেল। 

মানুষগুলো একসঙ্গে বিকট চিৎকার করে, একইসঙ্গে ছুঁড়ে দিল পাথরের তীক্ষ্ণ ফলকগুলি। পশুটা আহত হয়েছে ঠিকই কিন্তু গুরুতর নয়, বরং তীব্র গতি ও শক্তিতে একজন মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তীক্ষ্ণ দাঁতে চিরে দিল পেট, তারপর দৌড়ে পালাতে লাগল, বনের অন্য দিকে। পশুটার সারা গায়ে তো বটেই, নাকে আর চোখেও পাথরের ফলায় গভীর ক্ষত, তীব্র রক্তপাত হচ্ছে। আহত এই শিকার কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্লান্ত হয়ে পড়বে, কমে আসবে তার পালাবার গতি, লড়াইয়ের শক্তি। শিকারী মানুষগুলো পেয়ে গেছে সাফল্যের স্বাদ, এত বড়ো শূকরের মাংস, তাদের গোটা দলের পক্ষে যথেষ্ট। তারা পিছনের দিকে তাকাল না, আহত সঙ্গীকে ফেলে রেখেই দৌড়ে গেল আহত শিকারের দিকে।

না সকলে গেল না, রয়ে গেল সেই যুবক, সে অতি দ্রূত সেই সঙ্গীকে ঘাসের ওপর শুইয়ে দিয়ে, যোগাড় করে আনল নানান গাছের পাতা, শেকড়। পাথরে ঘষে সবুজ পাতার রস আর প্রলেপ করে দিল সঙ্গীর ক্ষতে। সঙ্গী এখন অনেকটাই শান্ত, সুস্থ; তার দৃষ্টিতে কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা। যুবক সেই সঙ্গীর পাশে এসে বসল। এতক্ষণের ব্যস্ততায় সে খেয়াল করেনি, হঠাৎ তার নাকে এল গাছের শুকনো পাতা ডালাপালা পোড়ার গন্ধ। চমকে উঠল যুবক, আবার কী অরণ্যে আগুন ধরল? সর্বনাশ, তা যদি হয়, তাহলে তারা সকলেই তো পুড়ে মরবে এই জঙ্গলের মধ্যে। তার দলের অন্য লোকেরা কোথায়, অরণ্যের কত ভিতরে? চারপাশে তাকিয়ে দেখল, যে বড় পাথরটাকে পিছনে রেখে শূকরটা দাঁড়িয়েছিল, সেই পাথরের কোলে শুকনো পাতা, শুকনো ঝোপঝাড়ের ডালপালায় আগুন জ্বলছে, খুব বড়ো সড়ো নয়, ধিকি ধিকি। এই কী তবে অগ্নিদেবের অভিশাপ? 

সেদিন সে এবং তার দলের লোকেরা তাঁর মাংস চুরি করেছিল বলেই, দেবতা প্রতিশোধের আয়োজন করছেন। যুবক ধীর পায়ে এগিয়ে গেল বড়ো পাথরটার দিকে। যে পাতাগুলো জ্বলছিল, যে ডালপালাগুলো জ্বলছিল, তার ওপর পাথর ছুড়তে লাগল, বেশ কিছুটা ভয়ে, অনেকটা আক্রোশে। এভাবে কোন দেবতাই পারেন না, মানুষের বেঁচে থাকার উপর খবরদারি করতে। কিছুক্ষণ পর পাথরে চাপা পড়ে নিভে গেল আগুন, সামান্য ধোঁয়া উঠতে লাগল পাথরের স্তূপের ভিতর থেকে। যুবক আশ্চর্য হল, তাহলে আগুনকে নিভিয়ে ফেলাও যায়? সেক্ষেত্রে আগুন জ্বালানো যাবে না কেন?

আগুন নিভে যাবার পর, সেই যুবক বড়ো পাথরের খুব কাছে গিয়ে দেখল তাদের ছোঁড়া পাঁচ ছটা পাথরের ফলক এদিকে সেদিকে ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে। তার মধ্যে একটা ফলক তার। এর অর্থ তার ছোঁড়া পাথরের ফলক লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে, এত কাছে থেকে এত বড়ো শিকারকে সে আহত করতে পারেনি বুঝে, যুবক লজ্জা পেল যেন। ওই বড়ো পাথরটাই যেন তার শিকার, হাতের শক্তি আর লক্ষ্যবেধের ক্ষমতা বাড়ানোর জন্যে সে পাথরের টুকরো ছুড়তে লাগল বারবার। হাতের সমস্ত শক্তি দিয়ে সে পাথর ছুঁড়তেই লাগল, ছুঁড়তেই লাগল। কিছুক্ষণ পরে, হঠাৎ লক্ষ্য করল, তার ছোঁড়া পাথরের আঘাতে, বড়ো পাথরটার গায়ে বার বার আগুনের ফুলকি দেখা যাচ্ছে। সে আবার ভয় পেল, ওই পাথরের বুকে কী আগুন আছে? তার দাদু, মা, মাসিরা যে অগ্নি দেবতার কথা বলেন, ওই পাথরের মধ্যেই কি তাঁর নিবাস? নাকি ওই পাথর তাঁর আশীর্বাদে পবিত্র?

আর সে পাথর ছুঁড়ল না, ধীরে ধীরে বড়ো পাথরটার কাছে গিয়ে নীচু হয়ে বসল। তার মনে হল, তাদের লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া পাথরের আঘাতে যে আগুনের ফুলকি তৈরি হয়েছিল, তার থেকেই শুকনো ঘাস পাতায় আগুন ধরে যায়নি তো? তারা তখন শূকর শিকারের উত্তেজনায় কেউ লক্ষ্যই করেনি। আগুন আশে পাশে ছড়িয়ে যাওয়ার পরই তার নাকে গন্ধ এসেছিল, সে লক্ষ্য করেছিল। সেই যুবক হাতে একটা ছোট্ট পাথর তুলে, বড়ো পাথরের গায়ে ঠুকল এবং প্রত্যেকবার ঠিকরে উঠতে লাগল ফুলকি । এবার সে নিশ্চিত হল, ওই বড় পাথরটা অন্য পাথরের থেকে আলাদা, ওই পাথরের বুকে আগুন আছে। এবার সে বড়ো সেই পাথরটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে, এক জায়গায় একটা ফাটল দেখতে পেল। সেই ফাটলের মধ্যে পাথরের ফলক ঢুকিয়ে বেশ কয়েকবার ঠুকতেই ভেঙে বেরিয়ে এল মাঝারি সাইজের কয়েকটা পাথর।

সেই আগুনে পাথরের টুকরোগুলো হাতে নিয়ে ঘষতেই বেরিয়ে এল আগুনের ফুলকি। এবার সে শুকনো পাতা কাঠকুটো যোগাড় করে, একটা স্তূপ বানালো, তার খুব কাছে দুটো আগুনে পাথর ঘষে ঘষে বার কয়েক ফুলকি দিতেই দপ করে শুকনো পাতায় আগুন জ্বলে উঠল। একবার আগুন ধরে যেতেই তার ওপর কাঠকুটো ধরে বেশ ছোট্ট একটা আগুনের কুণ্ড বানিয়ে ফেলতেও অসুবিধে হল না। আনন্দে সেই যুবক অদ্ভূত চিৎকার করে উঠল, তার সঙ্গী ওষধির গুণে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে ছিল, যুবকের চিৎকারে সে ভয় পেয়ে গেল। আরো ভয় পেয়ে গেল যুবকের সামনে জ্বলতে থাকা আগুন দেখে। বন্যশূকরের দাঁতের আঘাতের যন্ত্রণায় সে যে চিৎকার করেছিল, তার থেকে অনেক বেশি চিৎকার করে উঠল আগুনের ভয়ে। যুবক প্রথমে তাকে শান্ত করল, তারপর পাথর দিয়ে চেপে চেপে নিভিয়ে ফেলল তার জ্বালিয়ে তোলা আগুনের কুণ্ডআহত সঙ্গী আশ্বস্ত হল, যুবকের অদ্ভূত ক্ষমতা দেখে আশ্চর্য হল অনেক বেশি।

সেই প্রকাণ্ড শূকর, তারসঙ্গে ছোট খাটো আরো কিছু পশু শিকার করে এবং আহত সঙ্গীকে মাচায় শুইয়ে নিয়ে, পুরো দলটি যখন তাদের গুহার আবাসে ফিরল, সূর্য ডুবতে তখন আর দেরি নেই। দলের অধিকাংশই তখন ক্লান্ত আর বিধ্বস্ত। ঠিক হল, সঞ্চিত খাবার গুহায় যা আছে, আর ছোটখাটো পশুগুলো খেয়েই রাতটা কাটিয়ে দেওয়া যাক। কাল সকালে উঠে বুনো শুয়োরের ছাল চামড়া ছাড়িয়ে যা ব্যবস্থা করার করা যাবে। সারাদিনের পরিশ্রম আর উত্তেজনায় হাক্লান্ত সেই দলের মানুষগুলো, সন্ধে নামার একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়ল গুহার ভিতর।

 প্রৌঢ়া মহিলার ঘুম খুব পাতলা, তার ওপর তাঁর খুব ভোরে ওঠার অভ্যেস। পরদিন ভোরে উঠে, গুহার বাইরে এসে দেখলেন, তাঁর বোনপো, সেই যুবক, গুহার বাইরে শুকনো পাতার একটা বড়সড় স্তূপ বানিয়েছে, আর যোগাড় করেছে, এক বোঝা শুকনো গাছের ডালপালা। অবাক হয়ে তিনি কিছুক্ষণ তার ব্যস্ততা লক্ষ্য করলেন, কিছুই বুঝতে না পেরে তিনি জিগ্যেস করলেন, “কী ব্যাপার বলতো, এই কাক ভোরে উঠে কী করছিস কি, ডালপালা দিয়ে”?

“কালকে যে বুনো শুয়োরটা শিকার করে নিয়ে এসেছ, ওটাকে ঝলসাবো”। 

সন্দিগ্ধ চোখে ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে প্রৌঢ়া মহিলা বললেন, “তার মানে? আগুন পাবি কোথায়?” 

যুবক দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে বলল, “আগুন পেয়েছি, দেখ না কী করি! তুমি শুধু ওদের কয়েকজনকে বলো না শুয়োরটাকে এখানে এনে, এই যে এইখানে ঝুলিয়ে দেবে”। হাত বাড়িয়ে শুকনো পাতার স্তূপের দুপাশে খাড়া করা মোটা মোটা গাছের ডাল দুটো দেখিয়ে দিল যুবক। অবিশ্বাস আর বিরক্তিতে প্রৌঢ়া মহিলার ভুরু কুঁচকে উঠল। কিন্তু কিছু বললেন না, কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন যুবকের চোখের দিকে। তাঁদের কথার আওয়াজে আরো কয়েকজন গুহা থেকে বেরিয়ে এসেছিল, প্রৌঢ়া তাদের বললেন, গত দিনের শিকার করা মরা শুয়োরটাকে যুবকের কথা মতো ঝুলিয়ে দিতে। আগুন নিয়ে এই ছেলে খেলা তাঁর পছন্দ না হলেও, তাঁর মনে একটা কৌতূহলও হচ্ছিল, কী করে দেখাই যাক না।

জনা ছয়েক সবল পুরুষ ধরাধরি করে পশুটাকে ঝুলিয়ে দিল, দু পাশের খাড়া করা মোটা মোটা দুই ডালের মাথায়। তারপর সেই যুবক উবু হয়ে বসে, গত কাল দূরের জঙ্গল থেকে যোগাড় করে আনা পাথরের টুকরোর গায়ে, তার পাথরের অস্ত্র-ফলক ঠুকতে শুরু করল। ঝিলিক দিয়ে উঠল স্ফুলিঙ্গ। যারা যুবকের কাছাকাছি দাঁড়িয়েছিল, তারা ভয়ে লাফ দিয়ে সরে গেল অনেকটা দূরে। যুবক নিবিষ্ট মনে বার কয়েক পাথরে পাথর ঠুকতে ঠুকতে হঠাৎ দপ করে জ্বলে উঠল শুকনো পাতার স্তূপ। জ্বলে উঠল আগুন। শুকনো পাতার মধ্যে কয়েকটা শুকনো গাছের ডাল গুঁজে দিতে, সেগুলোও ধরে উঠল, আগুনের শিখা বড়ো হয়ে, ছুঁয়ে ফেলল মরা পশুর শরীর, পুড়তে লাগল তার রোম, চামড়া

পশুটার সামনের দুই পা আর পেছনের দুই পা বাঁধা অবস্থায়, গাছের একটা মোটা ডালে ঝুলছিল। তার ফলে, আগুনের শিখার স্পর্শে দগ্ধ হচ্ছিল তার পিঠ, কাঁধবেশ কিছুক্ষণ দগ্ধ হবার পর, সেই যুবক লম্বা পাথরের ফলা নিয়ে কেটে নিল কাঁধের কিছুটা অংশ। তারপর তপ্ত, নরম সেই মাংস গাছের বড়ো একটা পাতার ওপর নিয়ে, প্রৌঢ়া মহিলার কাছে নিয়ে গেল যুবক। বলল, “মাসি, খেয়ে দেখ তো সেদ্ধ হল কিনা?”

গরম গরম এবং নরম মাংসের স্বাদ ও গন্ধে নেত্রী আশ্চর্য হলেন, তিনি যুবকের দিকে তাকিয়ে গর্বের সঙ্গে বললেন, “সত্যিই অপূর্ব, তুই অগ্নিদেবের আশীর্বাদ পেয়েছিস”।  সেদিন শিশু থেকে জরাগ্রস্ত বৃদ্ধ, দলের সকলেই, সেই দগ্ধ মাংসের স্বাদ নিয়ে তৃপ্ত হল।

এই ঘটনার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ প্রভাব যে মানব সভ্যতাকে কোথায় নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাবে, সে কথা সেদিনের সেই মানুষগুলির বোঝার সাধ্য ছিল না। কিন্তু এই ঘটনা যে মানব সভ্যতার আদিতে অন্যতম এক শ্রেষ্ঠ পদক্ষেপ ছিল, আজ সে কথা স্বীকার করতে কোন দ্বিধা নেই । 

 

বিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রচুর মত বিরোধ থাকলেও, সকলে একটা বিষয়ে নিশ্চিত যে প্রায় ১,২৫,০০০ বছর আগে মানুষ আগুনের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহার করতে শুরু করেছিল। কেউ কেউ বলেন ৪,০০,০০০ বছর আগে। যাঁরা এই আগুনের ব্যবহার শুরু করেছিলেন, তাঁরা ছিলেন আমাদের এই বর্তমান মানব প্রজাতির পূর্বপুরুষ। আমাদের এই মানব প্রজাতিকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে হোমো-স্যাপিয়েনস (Homo-Sapiens), আর যাঁরা এই কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন, তাঁরা ছিলেন হোমো-ইরেক্টাস  (Homo-erectus)ইরেক্ট কথার মানে খাড়া বা ঋজু, মানবজাতির যে গোষ্ঠী প্রথম দুইপায়ে সোজা দাঁড়িয়ে চলাফেরা থেকে শুরু করে সব কাজ করতে পারত তাদের হোমো ইরেক্টাস বলা হত। এই প্রজাতির মানবগোষ্ঠী বহু বছর আগেই এই পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। জার্মানির ল্যান্ডিস মিউজিয়মের বিজ্ঞানীরা হোমো-ইরেক্টাসদের চেহারা কেমন হতে পারে, তার একটি ছবি বানিয়েছেন। নিচের ছবিতে দেখে নিতে পারো, আমাদের সেই পূর্বপুরুষদের চেহারা।

আজ আমাদের রোজকার জীবনে আগুনের ব্যবহার এমন ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গেছে যে, আগুন যে আমাদের কতো বড়ো বন্ধু, সে কথা আমরা ভাবিই না। আগুন থেকে কোন বিপদ বা দুর্ঘটনা হলেই, আমরা যেন টের পাই তার ভয়ংকর ক্ষমতার কথা। এই আগুনের ব্যবহার কেন মানবসভ্যতায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ পদক্ষেপ, সেইকথাই এখন তোমাদের বলব। 

বদলে দিল মানুষের স্বভাবঃ

দেড়-দু লাখ বছর আগে মানুষেরা বেঁচে থাকত প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে কিন্তু প্রকৃতির উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে। শীত-গ্রীষ্মের প্রকোপ, ঝড়ঝঞ্ঝা, আলো-অন্ধকার, নানান কীটপতঙ্গ থেকে শুরু করে প্রবল বন্যপ্রাণীদের আক্রমণ সমস্ত দিক দিয়েই প্রবল প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেই চলত, সেই মানবজাতির জীবনযাত্রা। আগুন এনে দিল উত্তাপ এবং তার সঙ্গে সঙ্গে আলো। আগুন এবং তার ধোঁয়াকে অধিকাংশ প্রাণী এবং কীটপতঙ্গই ভয় করে, গুহার মুখে কিংবা চারদিকে আগুনের বলয় জ্বেলে রাখলে সারা রাত তাদের উৎপাত থেকে নিশ্চিন্তে ঘুমোন যায়। প্রচণ্ড শীতের রাতে আগুনের উত্তাপ মানুষকে নিরাপদ স্বস্তি দিল। দিন-রাত এবং শীত-গ্রীষ্মের পরিবেশে, আবহাওয়ায় যে তাপের (Ambient temperature) তারতম্য ঘটে, তার সঙ্গে শরীরের উত্তাপের (Body temperature) সামঞ্জস্য রাখার জন্যেই স্তন্যপায়ী প্রাণিদের শরীরে লোমের বাহুল্য। আগুনের ব্যবহার মানুষের শরীরের সেই তাপমাত্রার ওঠাপড়া অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করল, তার ফলে মানুষের শরীরে লোমের পরিমাণও কমতে লাগলকোন কোন বিজ্ঞানীরা বলেন, যে সব মানবগোষ্ঠী গোরিলা বা শিম্পাঞ্জীদের মতো গাছের ওপর বাস করত, আগুনের ব্যবহার শিখে তারা মাটিতে ডালপালা দিয়ে ঘর বানিয়ে থাকা শুরু করেছিল। এই সব পরিবর্তন দু এক বছরে হয়েছিল, তা নয়, কিন্তু হাজার হাজার বছর ধরে হোমো ইরেক্টাসরা আজকের হোমোস্যাপিয়েন হবার দিকে এগোতে লাগল।  

বদলে দিল খাদ্যঃ

সেই যুগে মানুষের খাদ্য ছিল জঙ্গলের কাঁচা ফল, মূল, শিকড় আর শিকার করা পশুর কাঁচা মাংস। কয়েকটা মাত্র ফল ছাড়া কাঁচা শাকসব্জি মূল, কন্দের সেলুলোজ ও স্টার্চ আমাদের হজম হয় না। আগুনে সেদ্ধ হয়ে, সেই সব সব্জি খেতেও যেমন সুবিধে হল, হজম হয়ে শরীরে সহজ পুষ্টিও সরবরাহ করতে লাগল। আগে যে সব কন্দ, বা শস্য দানা খাওয়ার কথা মানুষ ভাবতেই পারত না, সেই রকম অজস্র খাদ্য ঢুকে পড়ল তার খাদ্য তালিকায়। তার মধ্যে রয়েছে চাল, গম, যব, ভুট্টা, নানান ডাল – যা আজও সারা বিশ্বের মানব জাতির প্রধান খাদ্য। শস্যের খাদ্য রহস্য বুঝে ফেলার পর মানুষ ধীরে ধীরে শিখে ফেলতে লাগল চাষবাস রান্না করা শস্যদানা, সব্জি, মাংস সহজে হজম হওয়ার জন্য, অনেক কম পরিমাণ খাদ্য থেকেও শরীরে অনেক বেশি পুষ্টির যোগান হতে লাগল। বিজ্ঞানীরা বলেন, শুধুমাত্র কাঁচা শাকসব্জি খেয়ে, শরীরকে তাজা আর কর্মক্ষম রাখতে হলে, মানুষকে দিনে অন্ততঃ সাড়ে ন ঘন্টা খেতে হত। শীতকালে চিড়িয়াখানায় গেলে দেখবে, জলহস্তী, গণ্ডার, হাতি, জিরাফ এই সব প্রাণীরা সারাদিনই মুখ নাড়িয়ে খেয়ে চলেছে।

 তীক্ষ্ণ হতে থাকল মগজাস্ত্রঃ

আগুনের ব্যবহার শিখে রান্না করা খাবার গ্রহণের পরিমাণ কমে যাওয়ায় মানুষের পৌষ্টিক তন্ত্র অনেক হাল্কা হতে লাগল; সেদ্ধ খাবার চিবোনো অনেক সহজ হয়ে যাওয়ায়, চোয়ালের পেশী এবং দাঁতের গঠন বদলে গিয়ে, মানুষের মুখ ও মাথার গঠনও বদলাতে লাগল। খাবার সময় কমে গিয়ে এবং খাবারের বৈচিত্র্য বেড়ে যাওয়ার ফলে, শুধু খাওয়া, ঘুম আর বেঁচে থাকার চিন্তা ছাড়াও মানুষের হাতে অনেকটা সময় বেঁচে রইল। সেই সময়টা ব্যবহার হতে লাগল নানান চিন্তা ভাবনায়, অতএব বেড়ে গেল মস্তিষ্কের ব্যবহার। সেই চিন্তাভাবনা যত সুসংহত হল, মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ হতে লাগল দ্রুত। আগে শুধু কাঁচা খাদ্য খেতে এবং হজম করতে যে পরিমাণ পুষ্টি-শক্তি ক্ষয় হত, এখন সেই উদ্বৃত্ত পুষ্টি মস্তিষ্কের শক্তি বাড়িয়ে চলল। অভিনব চিন্তা ভাবনা থেকে মানুষ ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল আরো উন্নতির দিকে; আরো সুস্থ, নিরাপদ, নিশ্চিন্ত জীবনের দিকে।      

নীচের প্রথম ছবিটি হোমো হ্যাবিলিস যারা পাথরের অস্ত্র ব্যবহার করতে শিখেছিল, দ্বিতীয় হোমো ইরেক্টাস যারা আগুনের ব্যবহার শিখেছিল, আর তৃতীয়টি আমাদের অত্যন্ত নিকট আত্মীয় হোমো স্যাপিয়েন্স। এদের নাক, মুখ, চোয়াল, ভুরু এবং মাথার গঠনের পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো নয় কী?     

   

   হোমো হ্যাবিলিস            হোমো ইরেক্টাস        প্রথম যুগের হোমো স্যাপিয়েন্স।

এর পরে - " আগুনের পরশমণি - শেষ পর্ব "


শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ৩

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


"@শুধু _তুই .কম" উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 


৩য় পর্ব 

 

“পুরোনো সব কথা মনে পড়ছে, সুনুদা, না? আমারও।” সুকন্যার কথায় সুনেত্রর চিন্তায় ছেদ পড়ল“বেশ ছিল সেই দিনগুলো, না? খুব সিম্পল বাট আন্তরিক, তাই না? জেঠুমণির কাছে ধরা পড়ে তোমার সব চিঠিগুলো পুড়িয়ে ফেলতে হয়েছিল। তোমাকে তো বলেছিলাম। এখন খুব আপশোষ হয়। যদি না পোড়াতাম – আজ মাঝে মাঝে পড়তে পারতাম – হাতের মধ্যে ফিরে পেতে পারতাম সেই দিনের টুকরোগুলো। তোমার কাছে আছে, আমার লেখা সব চিঠি”?

“নাঃ”। দীর্ঘশ্বাস চেপে সুনেত্র উত্তর দেয়।

“কেন? কী করলে, সে সব”?

“তোর বিয়ের বেশ কিছুদিন পর এক রবিবারের বিকেলে সব ছিঁড়ে ফেলে দিলাম”।

“এঃ, মা। আপশোষ হয় না”?

“হয় তো”।

“চিঠিগুলো থাকলে আজকে আমাকে ব্ল্যাকমেল করতে পারতে। তাই না”?  অবাক হয়ে সুকন্যার দিকে তাকাল সুনেত্র – সুকন্যার দু চোখের তারায় হাসি, “আচ্ছা, বাবা আচ্ছা। ব্ল্যাকমেল না হয় নাই করতে, মাঝে মাঝে পড়ে দীর্ঘশ্বাস তো ছাড়তে পারতে – সেও তো এক রকমের প্রাণায়াম হতে পারত, নাকি – কপালভাতি নাই বা হল। ব্ল্যাকমেলের কথায় এমন তাকালে – ঘোর কলিকাল, না হলে ভস্ম হয়ে যেতে পারতাম – এতক্ষণ গাড়ির এই সিটে পড়ে থাকত আমার সামান্য একটু ছাই। তোমাকেই তখন গাড়ি ড্রাইভ করতে হত, আমার হিরোটিকে পিছনে নিয়ে”

“এত বাজে কথাও বলতে পারিস - একই রকম রয়ে গেলি, কনি। এত বয়েস হল, তাও”?

“বয়েস? সে আবার হল কোথায়? তোমার বয়েস বাহান্ন – বাহান্ন বছর সাড়ে তিনমাস মোটামুটি। আর আমার? আমার ডিওবি তোমার মনে আছে”? সুকন্যার চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক, পরীক্ষা নিতে চায় নাকি সুনেত্রর?

“চৌষট্টির থার্ড ডিসেম্বর”। সুনেত্র হেসে জবাব দেয় “কিছুই ভুলিনি, রে”।

“তুমি ভুলবে? ভবি কখনো ভোলে? মানুষের তিনশ ছ খানা হাড়ের হিসেব থেকে শুরু করে চোখ কান নাক গলা সবকটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, ভেতরের কলকব্জা - সব তোমাদের মনে রাখতে হয় – বাপরে। কার কাছে খাপ খুলতে গিয়েছিলাম, আমি”? নিজের রসিকতায় নিজেই হাস সুকন্যা। সুনেত্র হাসল নাহলদিয়া শহরের কাছাকাছি চলে এসেছে তারা। সুনেত্র সামনের দিকে চুপ করে তাকিয়ে থাকল।

“বয়েসের কথা হচ্ছিল না, এই বয়েসটা কিন্তু মারাত্মক সাসেপ্টিব্‌ল্‌। একজন মানু্ষের জীবনে দুবার এই সাংঘাতিক ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার চান্স থাকে, জানো তো? অসুখটা সাংঘাতিক তো বটেই কিন্তু আনন্দদায়ক এবং ভয়ংকর ইনফেক্সাসও”!

“কি অসুখ? কিসের ভাইরাস” সুনেত্র অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল। সুকন্যা একবার তাকা সুনেত্রর দিকে তারপর ভীষণ গম্ভীর ভাবে বলল, “লেগ স্লিপিং – বাংলায় বললে পদস্খলন। প্রথম যৌবনে এক-দু'বার আর শেষ যৌবনে আরেকবার - খুব ভালনারেব্‌ল্‌” – অর্থাৎ ব্যাপারটা মোটেই ভাল না রে, বল?

“ওফ্‌, তুই সত্যিই ইনকরিজিব্‌ল্‌...”। দিবাকরের কল এসে যাওয়াতে, সুনেত্র কথা শেষ করতে পারল না, ফোন কানেক্ট করে বলল, “হ্যাঁ, দিবাকর বলো কী অবস্থা”?

সামান্য গড়বড় হয়েছিল, গাড়ি ঠিক করে নিয়েছি, স্যার।”

“আচ্ছা, আচ্ছা, ভেরি গুড। তুমি তাহলে চলে আসছো তো”?

“আজ আর যাচ্ছি না, স্যার, অনেক রাত হল...কাল সকালে পৌঁছে যাবো।”

“ওকে, ওকে, কাল সাড়ে নটার মধ্যে চলে এলেই হবে, নো প্রবলেম”।

“থ্যাংক ইউ স্যার, গুডনাইট”। 

“হ্যাঁ, হ্যাঁ গুডনাইট, ভাই, গুডনাইট”। ফোন অফ করে দিল সুনেত্র।

“গাড়ি ঠিক হয়ে গেছে”? সুকন্যা জিজ্ঞেস করল। 

স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে সুনেত্র বলল, “হ্যাঁ, গাড়িটা আজ রাত্রে ও ওর বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছে, কাল সকালে আসবে নটা সাড়ে নটার মধ্যে”।

“যাক, ভালো হয়েছে। তোমার টেনসানটা দূর হল”। 

কথা বলতে বলতে তারা সিটি সেন্টার পৌঁছে গিয়েছিল, সুনেত্র বলল, “আমাকে কোন একটা পয়েন্টে নামিয়ে দে না। অটো ধরে আমি চলে যাবো”।

“পাগল হয়েছ নাকি? আজ রাত্রে তোমায় ছাড়ছি না। আমার হিরোটির সঙ্গেও তোমার আলাপ-পরিচয় কিছুই হল না - তোমাকে আমি যত্রতত্র নামিয়ে দেব? ভাবলে কী করে? আর নামাতেই যদি হয়... তোমাকে অনেক নীচেয় – অধঃপাতের শেষ সীমায় নামাবো, সুনুদা, ও নিয়ে তুমি ভেবো না। তোমাকে আজ যখন ধরতে পেরেছি, আমার কাছেই তুমি থাকবে। কাল সকালে ব্রেকফাস্টের পরে আমাদের ড্রাইভার, অনিমেষ তোমাকে ছেড়ে দিয়ে আসবে – ডোন্ট ওরি। শুনেছি বিয়ে-থা করোনি। তোমার ঘরে বউ নেই, এণ্ডিগেণ্ডি সাত-আটটা ছেলেমেয়েও নেই, যে তুমি ঘরে ঢুকলেই তারা দৌড়ে এসে তোমাকে ঘিরে ধরে বলবে, "ও মা, বাপি এয়েচে, বাপি এয়েচে, আমাদের জন্যে কী এনেচো, বাপি? ঘরে ফিরে আজ রাত্তিরে তোমার কাজ তো একটাই, বিছানায় একা একা শুয়ে এপাশ ওপাশ করা। আর ফোঁস ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আজকের এই "হঠাৎ-দেখা-হয়ে-যাওয়ার" ঘটনাটি নিয়ে কল্পনার জাল বোনা। বরং আরও কিছুক্ষণ আমার নিবিড় সঙ্গ পাওয়ার অনুভবটুকু সঙ্গে নিয়ে কাল সকালে বেরিয়ে যেও - লাভ বই লোকসান হবে না, কথা দিলাম"।       

সুনেত্র এবার সত্যিই বেশ বিরক্ত হল, বলল, "তোর বাচালতা কিন্তু সীমা ছাড়াচ্ছে, কনি। ভালো লাগছে না, বিরক্তিকর হয়ে উঠছিস। তাছাড়া ভদ্রলোক কী ভাববেন, উনি বিব্রত হবেন...এত রাত্রে একজন উটকো লোকের উপস্থিতিতে..."।  

“বিব্রত? বিব্রত কিসের। আজ আপনার সেবা করবে বলে, আপনার কনি ব্রত মেনেছে, তার জন্যে আমি বিব্রত হবো? মাত্র একখান মাথা নিয়ে আমি দশমাথাওয়ালা দর্পী রাবণ হয়ে উঠতে পারব, এতটা আশা আমার থেকে প্লিজ করবেন না, সুনেত্রসায়েব”। পিছনদিকে সুকন্যার স্বামী উঠে বসেছেন, তিনিই বললেন কথাগুলো, তিনি আরও বললেন, “আপনার নাম ওদের বাড়িতে সকলের মুখে এতো শুনেছি, যেন সবাই মিলে বীজমন্ত্র জপ করছেন, ওঁ তৎ সৎ - ওঁ সু নু। রীতিমত জেলাসি ফিল করতাম। ইংরিজিতে কথাটা হয়তো সুসভ্য হল, হয়ত মার্জিতও হল, কিন্তু মাইরি বলছি, আমার মনের ভাবটা ওতে প্রকাশ পেল না। বাংলা করে বলি, মনের কোষ্ঠকাঠিন্যটুকু সাফ হোক - আমার রীতিমত গা জ্বালা করত। সেই মানুষের আজ দর্শন পেলাম, ভাবা যায়? সুকু, একদম ঠিক বলেছে, আজ রাত্রে শুধু সেলিব্রেসন...”

“তুমি তার মানে মটকা মেরে পড়েছিলে? আর আমাদের কথা সব শুনছিলে”? সুকন্যা বলল। 

“ইয়েস, শুনছিলাম। উঁহু, তোমরা একটা কথাও তো অশ্রাব্য কিছু বলনি....আমি শুনলে আপত্তি কোথায়? আর বললেই বা শুনব না কেন? অশ্রাব্য কথাও কখনো কখনো বেশ সুখশ্রাব্য হয়ে ওঠে না কি”? বলে উচ্চৈস্বরে হেসে উঠলেন ভদ্রলোক। তারপর পিছন থেকে হাত বাড়িয়ে বললেন – “আই অ্যাম শশাঙ্ক মিত্র – আপনার সুকন্যার মতো একটি সুন্দর শশকে সারাজীবন অঙ্কে ধরে রাখার চেষ্টায় রয়েছি, আর আজ থেকে আপনার মিত্র হতে পারলে রিয়্যালি খুব আনন্দ পাবো।” সুনেত্রর বাড়ানো হাত ধরে উষ্ণ ভাবে হাসলেন ভদ্রলোক। “লেট আস সেলিব্রেট ইয়োর প্রেজেন্স অ্যাট আওয়ার প্লেস – প্লিজ না বলবেন না”।

“ও কে”। সুনেত্র হেসে শশাঙ্কর হাতে হাত রাখল, “বাট আপনার সেলিব্রেসন মানে কি ড্রিংকস? সেক্ষেত্রে আমি কিন্তু আপনাকে বেশ হতাশ করব বলেই আশা রাখি”।

“অ। সে সুখবরটিও সুকু আপনাকে দিয়ে দিয়েছে? নিশ্চয়ই বলেছে তার সঙ্গীটি একটি জলজ্যান্ত পিপে বিশেষ”।

“আমাকে কিছুই বলতে হয়নি, স্যার। আমি গাড়ি ড্রাইভ করছি, আর পিছনের সিটে তার হিরোটি ভর সন্ধ্যেবেলা সুখে লাট খাচ্ছে – এ দৃশ্য সেল্‌ফ্‌ এক্সপ্লেনেটারি – কাউকে বোঝাতে হয় না”। সুকন্যা একটু বিরক্ত ভাবেই কথাটা বলল।

“ও কে, ম্যাডাম। আই অ্যাপলজাইজ অ্যাণ্ড নাও লেট মি প্রুভ দ্যাট আই ক্যান অলসো বি এ গুড হোস্ট”!

কথা বলতে বলতে সুকন্যা একটা বাড়ির বন্ধ গেটের সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে দুবার হর্ন দিল। ভেতর থেকে এসে গেট খুলে দিল একজন বয়স্ক দারোয়ান, সুকন্যা গাড়িটা ভেতরে ঢুকিয়ে দাঁড় করাল, বলল, “আমি বাপু এই সময় আর গ্যারেজে গাড়ি তুলতে পারছি না। রামশরণকে বলে দাও রাত্রে গাড়ি এখানেই থাকুক। অনিমেষ এসে কাল সকালে গ্যারেজে তুলে দেবে খন। সুনুদা এসো। আজ রাতটুকু এখানেই কাটিয়ে দাও কোনমতে”।

“আমাদের এই গরীবখানায়, কি বলো”? উচ্চস্বরে হেসে উঠল শশাঙ্ক। “তুমি সুনেত্রসায়েবকে নিয়ে ভেতরে চলো, আমি গ্যারেজে গাড়ি তুলে দিচ্ছি...”।

পরের পর্ব - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ৪ "


বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৭

   এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 


  আগের পর্ব "  ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৬ "


পরীক্ষিতের জন্ম

শ্রীশৌণক বললেন, “কৃষ্ণ অশ্বত্থামার ব্রহ্মাস্ত্রে হতপ্রায় উত্তরার গর্ভরক্ষা করলেন, এ কথা তো বললেন। এখন সেই বিজ্ঞ মহাত্মা পরীক্ষিতের জন্ম, কর্ম ও মৃত্যুর পর তাঁর যে গতি হয়েছিল, সে সম্পর্কে শ্রীশুকদেবের কাছে যেমন শুনেছেন, সেই সমস্ত ঘটনা আমাদের বর্ণনা করুন”

সূত বললেন, “কৃষ্ণের চরণপদ্মে একান্ত অনুরক্ত এবং কামনার বস্তুতে একান্ত অনাসক্ত যুধিষ্ঠির প্রজাদের পিতার মতোই পালন করতে লাগলেন। তাঁর মন সর্বদাই মুকুন্দে অর্পিত, অতএব ফুলের মালা ও চন্দন যেমন ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে খুশি করতে পারে না, তেমনই সম্পদ, যজ্ঞের অনুষ্ঠান, প্রিয়তমা মহিষী, অনুগত ভ্রাতৃগণ, পৃথিবীর আধিপত্য কোন কিছুতেই তিনি সন্তুষ্ট হতে পারলেন না।

হে ভৃগুনন্দন শৌণক, পরীক্ষিৎ যখন মাতৃগর্ভে ব্রহ্মাস্ত্রের তেজে দগ্ধ হচ্ছিলেন, সেই সময় তিনি এক অঙ্গুষ্ঠপ্রমাণ পুরুষকে দেখতে পেয়েছিলেন। ওই পুরুষের মাথায় উজ্জ্বল মুকুট। তিনি অত্যন্ত সৌম্যদর্শন, শ্যামবর্ণ, বিদ্যুতের মতো পীতবসনে আবৃত কিন্তু নির্বিকার। তিনি গর্ভের চারদিকে উল্কাবর্ণের এক গদা বারবার ঘোরাচ্ছিলেন। সূর্য যেমন হিমরাশিকে বিনাশ করেন, তেমনই ভগবান নিজের গদার সাহায্যে সেই ব্রহ্মাস্ত্রকে নিস্তেজ করলেন। গর্ভের শিশু তাঁকে সামনে দেখে, যখন ভাবছে, ইনি কে? তখনই অনন্তস্বরূপ ভগবান শ্রীহরি সেই শিশুর সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলেন।        

যথাসময়ে শুভলগ্নে উত্তরার কোলে উজ্জ্বল এক পুত্রের জন্ম হল। এই পুত্র পাণ্ডুবংশের একমাত্র বংশধর। মহারাজ যুধিষ্ঠির প্রসন্নমনে ধৌম্য, কৃপ প্রমুখ ব্রাহ্মণদের স্বস্তি বচনে নবজাত কুমারের জাতকর্ম করলেন। তিনি সৎ ব্রাহ্মণদের প্রচুর সোনা, গাভি, বাসভূমি, ক্ষেত্রভূমি, হাতি, ঘোড়া এবং অন্ন দান করলেন। ব্রাহ্মণেরা সন্তুষ্ট হয়ে, মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে বললেন, “হে মহারাজ, এই শিশুর গর্ভাবস্থাতেই অমোঘ অস্ত্রের আঘাতে মৃত্যুযোগ ছিল, ভগবান বিষ্ণুর মহাপ্রভাবে এই শিশুর প্রাণরক্ষা হয়, অতএব ইনি বিষ্ণুরাত নামে বিখ্যাত হবেন। এই শিশু অসাধারণ গুণের আধার ও পরমভক্ত হয়ে উঠবেন। বড় হয়ে এই শিশু, মনুপুত্র ইক্ষ্বাকুর মতো প্রজাপালক হবেন। দশরথের পুত্র শ্রীরামচন্দ্রের মতো ব্রাহ্মণের রক্ষক ও সত্যের পুজারী হবেন। উশীনরের পুত্র রাজা শিবির মতো মহাদাতা ও দুর্বলের আশ্রয় হয়ে উঠবেন। দুষ্মন্তের পুত্র মহারাজ ভরতের মতো বংশের নাম উজ্জ্বল করবেন। অর্জুনের মতো মহাবীর হবেন। ইনি যযাতির মতো ধার্মিক হবেন এবং প্রহ্লাদের মতো কৃষ্ণভক্ত হবেন।

সামান্য এক ভ্রান্তির কারণে, ঋষিপুত্রের অভিশাপে তক্ষকের দংশনে এঁনার মৃত্যু হবে। এই মৃত্যুর কথা জানার পর সমস্ত আসক্তি ত্যাগ করে, শ্রীহরিতে ইনি মন প্রাণ সমর্পণ করবেন। ব্যাসদেবের পুত্র মুনিশ্রেষ্ঠ শুকদেবের কাছে ইনি পরমতত্ত্ব লাভ করে, শ্রীকৃষ্ণের পরমপদে আশ্রয় পাবেন”

শুক্লপক্ষে চাঁদের কলা যেমন শোভা পায়, সেই শিশু দিন দিন তেমনি বড় হতে লাগলেন। মায়ের গর্ভে বাস করার সময়, এই শিশু যে পরমপুরুষকে দেখেছিলেন, তাঁকে কিন্তু ভুলতে পারেননি। যে কোন মানুষকেই তিনি খুব মন দিয়ে লক্ষ্য করতেন এবং ভাবতেন এই লোকই সেই মহাপুরুষ নয় তো? এইভাবেই তাঁর মনের দৃষ্টিতে তিনি সকলকে পরীক্ষা করতেন বলে, তাঁর নাম হল পরীক্ষিৎ। যুধিষ্ঠির ও চার ঠাকুদার তত্ত্বাবধানে এবং তাঁদের পরম স্নেহের ছায়ায় পরীক্ষিৎ বড় হয়ে উঠতে লাগলেন দিন দিন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ধার্মিক, কৃষ্ণভক্ত, বুদ্ধিমান ও সকলের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন।

এরই মধ্যে মহারাজ যুধিষ্ঠির কুরুক্ষেত্রে স্বজন হত্যার পাপ মুক্তির জন্যে আরও একবার অশ্বমেধ যজ্ঞ অনুষ্ঠানের মনস্থ করলেন। কিন্তু তাঁর কাছে যথেষ্ট অর্থের তখন অভাব ছিল, কারণ তিনি প্রজাদের থেকে নির্দিষ্ট কর ছাড়া অন্য কোন শুল্ক নেবার পক্ষপাতী ছিলেন না। তখন শ্রীকৃষ্ণের উপদেশে চারভাই উত্তরদিকে গিয়ে মরুত্ত রাজার যজ্ঞে পরিত্যক্ত অনেক সোনার বাসনপত্র সংগ্রহ করে নিয়ে এলেন। সেই সোনার বিনিময়ে অশ্বমেধ যজ্ঞের যোগাড় সম্পন্ন হল।

মহারাজ যুধিষ্ঠিরের নিমন্ত্রণে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আবার হস্তিনাপুরে এলেন। তাঁর উপস্থিতিতে, ব্রাহ্মণেরা তিনটি অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠানে শ্রীকৃষ্ণকেই অর্চনা করলেন। এই যজ্ঞ শেষে শ্রীকৃষ্ণ কয়েকমাস হস্তিনাপুরেই বাস করে সকলকে আনন্দ দিলেন। তারপর মহারাজ যুধিষ্ঠিরের অনুমতি নিয়ে তিনি অর্জুনকে সঙ্গে নিয়ে দ্বারকায় ফিরে গেলেন”


বিদুরের ঘরে ফেরা

শ্রীসূত বললেন, “ইতিমধ্যে বিদুর তীর্থযাত্রায় বেরিয়ে মৈত্রেয় মুনির কাছে আত্মার গতিস্বরূপ শ্রীহরির সকল তত্ত্ব অবগত হয়ে হস্তিনাপুরে ফিরে এলেন। কুশারুতনয় মৈত্রেয়কে কয়েকটি প্রশ্ন করেই বিদুরের গোবিন্দের প্রতি প্রগাঢ় ভক্তির উদয় হয়েছিল। এখন দূর থেকে তাঁর ফেরার সংবাদ পেয়েই যুধিষ্ঠির ও তাঁর ভাইয়েরা, ধৃতরাষ্ট্র, যুযুৎসু, সঞ্জয়, কৃপাচার্য্য, কুন্তী, গান্ধারী, দ্রৌপদী, সুভদ্রা, উত্তরা, আর আর অনেক আত্মীয়পরিজন বিদুরকে সঙ্গে আনার জন্যে এগিয়ে গেলেনবিদুরকে দেখে তাঁদের সকলেরই দেহে যেন প্রাণ ফিরে এল। তাঁকে আলিঙ্গন করে, অভিবাদন করে সকলের চোখ আনন্দে অশ্রুসজল হয়ে উঠল। রাজা যুধিষ্ঠির তাঁর পুজো করলেন, ভোজন এবং বিশ্রামেরও ব্যবস্থা করলেন।

তারপর বিদুর সকলের সামনে এসে বসলে, বিনীত যুধিষ্ঠির তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “হে পিতৃব্য, দীর্ঘ তীর্থ ভ্রমণের সময়, আমাদের কথা কি আপনার কখনো মনে পড়েনি? পক্ষীমাতা যেমন পাখার আবরণে তার শাবকদের রক্ষা করে, পোষণ করে, আপনিও ঠিক তেমনি আমাদের সকলকে বিষপ্রয়োগ, অগ্নিদহনের মতো বিপদ থেকে বহুবার রক্ষা করেছেন। আপনার অন্তরে সর্বদাই ঈশ্বরের অধিষ্ঠান, আপনি নিজেই তীর্থ স্বরূপ। মলিন জীবগণের সংস্পর্শে যখন তীর্থ দূষিত হয়ে পড়ে, আপনার মতো ব্যক্তিদের পায়ের ছোঁয়ায় সেই তীর্থ আবার হারানো মাহাত্ম্য ফিরে পায়। আপনার তীর্থভ্রমণে কোন স্বার্থ নেই, বরং আপনার মতো ঈশ্বরভক্তদের কল্যাণে তীর্থ সার্থকতা পায়। আপনার সেই সার্থক তীর্থভ্রমণ আমাদের বর্ণনা করুন।

হে পিতৃব্য, বহুকাল দ্বারকার যদুকুলের কোন সংবাদ পাইনি। তাঁরা সকলে কুশলে আছেন তো? যদুকুলের প্রাণস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণ কুশলে আছেন তো? অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের প্রিয়সখা, সেও বহুকাল দ্বারকায় রয়েছে, তারও সংবাদ কুশল তো? আপনার সঙ্গে যদুকুলের কারোর সম্প্রতি সাক্ষাৎ হয়েছিল কি? আপনি কি কোন সংবাদ দিতে পারেন”?

বিদুর তাঁর দীর্ঘ তীর্থভ্রমণের অনেক কথাই বললেন, কিন্তু এড়িয়ে গেলেন যুধিষ্ঠিরের শেষ প্রশ্নগুলি। যদুবংশধ্বংসের যে সংবাদ তিনি শুনেছেন, সে কথা যুধিষ্ঠিরকে এখনই বললে তার পক্ষে এ সংবাদ সহ্য করা সম্ভব হবে না, এই বিবেচনায় তিনি নীরব থাকলেন। তিনি বড়োভাই ধৃতরাষ্ট্রকে অনেক ধর্মতত্ত্ব উপদেশ করলেন।

কিছুদিন হস্তিনাপুরে থেকে বিদুর দেখলেন যুধিষ্ঠির রাজ্যগ্রহণ করে, ভাইদের সঙ্গে সুযোগ্য পৌত্র পরীক্ষিতের প্রতি স্নেহে পরম আনন্দে রাজ্যসুখ ভোগ করছে একদিন তিনি বড়ভাই ধৃতরাষ্ট্রকে বললেন, “হে রাজন, আপনার পিতা, ভ্রাতা, বন্ধু, পুত্রগণ সকলেই কালের প্রভাবে মৃত্যু বরণ করেছে। এখন আপনিও বার্ধক্যের শেষ পর্যায়ে, আপনার পরমায়ু প্রায় শেষ হতে চলল। আপনি চিরদিন অন্ধ ছিলেন, এখন কানেও কম শোনেন এবং আপনার বুদ্ধিও ক্ষীণ হয়ে এসেছেআপনার দাঁত পড়ে গেছে, হজমশক্তিও হ্রাস পেয়েছে। এই অবস্থায় আপনার পরের ঘরে পরের দয়ায় জীবনধারণ করা ছাড়া অন্য উপায় নেই।  কিন্তু আপনি কার ঘরে রয়েছেন?  আপনি কিসের আশায় আপনার পুত্রদের যারা হত্যা করেছে তাদের দেওয়া অন্নে আপনার এই শরীর রক্ষা করছেন?  যাদের হত্যা করার জন্য জতুগৃহে আগুন লাগানো হয়েছিল, যাদের হত্যা করার জন্যে বিষাক্ত মিষ্টি দেওয়া হয়েছিল। রাজ্য ও ধন পাশার খেলার নামে চুরি করে, যাদের রাজ্য থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, তাদের অন্নে বেঁচে থাকার আপনার কি প্রয়োজন?  এখনো সময় আছে, হে রাজন, কাউকে কিছু না বলে, ঘর ছেড়ে উত্তর দিকে চলে যান। নিস্পৃহ ও বিবেক অনুসারে জীবনের বাকি কয়েকটা দিন শ্রীহরির চিন্তায় মগ্ন থাকুন। তিনি পরমপুরুষ, তাঁর চরণে আশ্রয় নিন”

বিদুরের এই কথায়, ধৃতরাষ্ট্রের মোহভঙ্গ হল, তিনি সমস্ত মায়া ও মমতা বন্ধন ছিন্ন করে, কাউকে কিছু না বলে হিমালয়ের পথে রওনা হলেনতাঁর সঙ্গে রইলেন পতিব্রতা স্ত্রী গান্ধারী আর ছোটভাই মহাত্মা বিদুর।

সন্ধ্যা আরতির পর যুধিষ্ঠির ঘরে ফিরে গুরুজনদের প্রণাম করতে গিয়ে ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী ও বিদুরকে দেখতে পেলেন না। ঘরের দরজায় বসে থাকা সঞ্জয়কে জিজ্ঞেস করলেন, “সঞ্জয়, তুমি কি জান, জ্যেষ্ঠতাত ধৃতরাষ্ট্র, মাতা গান্ধারী ও খুল্লতাত বিদুর কোথায় গেলেন? তাঁর পুত্রদের আমি হত্যা করেছি, অতএব তাঁদেরকেও হত্যা করতে পারি, এই আশঙ্কাতেই কি তাঁরা ঘর ছাড়লেন? আমাদের শৈশবে পিতাকে হারানোর পর, এই মহাত্মা বিদুর আমাদের কত বিপদ থেকে বাঁচিয়েছেন। তিনিও আমাদের বিশ্বাস করতে পারলেন না”? 

সঞ্জয়  চোখের জল মুছে বললেন, “হে মহারাজ, আমি যখন নিদ্রামগ্ন ছিলাম, সেই সময়েই ওঁনারা গৃহত্যাগ করেছেন। কাজেই আমিও ওঁনারা কোথায় গেছেন, কী উদ্দেশে গেছেন কিছুই জানি না। আমি জানি না, আর আমি ওঁনাদের পদসেবা করতে পারবো কিনা”

যুধিষ্ঠির ও সঞ্জয় যখন উদ্বিগ্নমনে এইরকম শোক করছেন, সেই সময়ে উপস্থিত হলেন দেবর্ষি নারদ। নারদকে দেখে যুধিষ্ঠির ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন।

তাঁকে প্রণাম ও পুজো করে বললেন, “হে দেব, আমরা ভীষণ উদ্বিগ্ন। অন্ধ ও বৃদ্ধ জ্যেষ্ঠতাত ধৃতরাষ্ট্র, পুত্রশোকে কাতর মাতাগান্ধারী আর খুল্লতাত বিদুর কোথায় চলে গেলেন, কিছুই বুঝতে পারছি না। আপনি এসেছেন, শুভ দৈবের মতো। আপনি নিশ্চয়ই বলতে পারবেন, তাঁরা কোথায় গেছেন, কেন গেছেন, কারণ আপনি অন্তর্যামী”

যুধিষ্ঠিরের এই ব্যাকুল কথায় দেবর্ষি নারদ বললেন, “হে রাজা যুধিষ্ঠির, এই জগৎ ঈশ্বরের অধীনকাঠের পুতুল নিয়ে খেলতে থাকা বালক যেমন তার ইচ্ছে মতো পুতুলকে খুলে ফেলে আবার যুক্ত করে, ভগবানও তাঁর ইচ্ছে মতো জীবকে কখনো জগত থেকে আলাদা করে দেন, কখনো যোগ করেন। যে শক্তিতে সত্ত্ব, রজঃ ও তমোগুণের বৈষম্য হয়, তাকে বলে কাল। যে বাসনা ও সংস্কারের বশীভূত হয়ে জীব বারবার জন্ম নেয়, তাকে বলে কর্ম। আর যে উপাদানে জীবদেহের নির্মাণ হয় তাকে গুণ বলে।  এই পঞ্চভূতে নির্মিত দেহ, কাল, কর্ম ও গুণের অধীন। কালরূপ অজগর যাকে গ্রাস করেছে, সে ব্যক্তি অন্য কাউকে যেমন রক্ষা করতে পারে না। সেরকমই কাল, কর্ম ও গুণের বশীভূত দেহ অপরকে রক্ষা করতে সমর্থ হয় না।

[সনাতন ধর্মে কাল, কর্ম ও গুণ তিনটি বিষয় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, দেবর্ষি এই তিনটি বিষয়েরই সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দিলেন দেবর্ষি।]

আপনি তাঁদের আশ্রয় এবং জীবিকা নিয়ে চিন্তিত হবেন না। কারণ, ভগবান সমস্ত জীবের জীবিকার সংস্থান করেই রেখেছেন। ছোট ছোট মাছ, বড়ো মাছের খাদ্য। তৃণ, শষ্প মৃগাদি ও গবাদির খাদ্য। মৃগাদি অন্যন্য প্রাণীও মানুষের খাদ্য। মহারাজ, এইভাবে সমস্ত জীবই একে অপরের জীবিকার স্বাভাবিক উপায়। যত ভোক্তা জীব আছে, ভগবান সকলেরই আত্মা। আবার যত ভোগ্য আছে, তাদেরও আত্মা একই ভগবান। এই জগতের কোন কিছুই ভগবানের থেকে আলাদা নয়। আমরা বুঝতে পারি না, তাই সবকিছুর মধ্যেই পার্থক্য দেখতে পাই। কিন্তু আসল তত্ত্বটি হল, ভগবান একতিনি তাঁর মায়ায় বহুভাগে বিভক্ত হয়েছেন। হে মহারাজ, মহামায়াবী ভগবান এখন অসুর বিনাশের জন্যে কালরূপে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়ে দ্বারকায় বাস করছেন। তাঁর কার্য প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, সামান্য কিছু আর বাকি আছে। অতএব যতদিন ভগবান পৃথিবীতে থাকেন, আপনারাও তাঁর অপেক্ষা করুন।

[কি সর্বনাশ, দেবর্ষি নারদ বললেন, "মৃগাদি অন্যন্য প্রাণীও মানুষের খাদ্য!!" অথচ আজ আমরা নিরামিষ ভোজনকে বলছি ধর্মের একমাত্র পথ আর আমিষ ভোজনকারীরা অনাচারী অধার্মিক! আজকের সনাতন ধর্মের ধর্মরক্ষকগণ দেবর্ষি নারদের থেকেও ধর্মপ্রাণ? ]           

রাজা ধৃতরাষ্ট্র, রাজ্ঞী গান্ধারী ও ধর্মাত্মা বিদুর হিমালয়ের দক্ষিণভাগে ঋষিগণের আশ্রমে গিয়েছেন। সুরধনী গঙ্গা যেখানে সাতভাগে বিভক্ত হয়েছেন, সেই সপ্ততীর্থে তাঁরা স্নান করে প্রত্যেকদিন হোম করেন এবং একমাত্র জলপান করে জীবনধারণ করছেন। তাঁরা ধন, জন ও পুত্রদের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করে আত্মাকে প্রশান্ত করে সংযম অভ্যাস করছেন। তাঁরা শ্রীহরির ভাবনায় নিজেদের উৎসর্গ করে সত্ত্ব, রজঃ ও তমোগুণের প্রভাব দূর করে ধ্যান অবস্থা পেয়েছেন। যতক্ষণ দেহরূপ এই ঘট সচেতন থাকে, তখন ঘটে আবদ্ধ আকাশ আর বাইরের মহাকাশের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। এই ঘট ভেঙে গেলে, দেহের আকাশ, মহাকাশের সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। এই ভাবেই মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র তাঁর এই জীবাত্মাকে শুদ্ধচৈতন্য ব্রহ্মে লীন করতে চলেছেন।

[ধৃতরাষ্ট্রের মতো স্নেহান্ধ ও অন্যায়-সহায়ক রাজার দেহরূপ ঘট ভেঙে গেলে, অর্থাৎ তাঁর মৃত্যু হলে তাঁর জীবাত্মা  যদি শুদ্ধ চৈতন্য ব্রহ্মে লীন হয়ে যেতে পারে, তাহলে মৃত্যুর পর আমাদের জীবাত্মা ব্রহ্মপদে লীন হবে না কেন? আমরা রাজা ধৃতরাষ্ট্রের তুলনায় কতটুকুই বা অন্যায় করেছি সারা জীবনে?]        

অতএব, হে রাজা যুধিষ্ঠির, আপনি তাঁদের আশ্রয় এবং জীবিকা নিয়ে উদ্বেগ ত্যাগ করুন ও বৃথা শোক করবেন না। আপনি তাঁদের মোক্ষপথে বাধা সৃষ্টি করে, তাঁদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টাও করবেন না। রাজা ধৃতরাষ্ট্র সমস্ত কর্ম ত্যাগ করেছেন এবং আজ থেকে পঞ্চম দিনে তিনি দেহত্যাগ করবেনতাঁর দেহ যোগ অগ্নিতে ছাই হয়ে যাবে। যোগের আগুনে যখন তাঁর দেহ ও পাতার কুটির জ্বলবে, সেই আগুনেই দেহত্যাগ করবেন পতিব্রতা রাজ্ঞী গান্ধারী। মহাত্মা বিদুর এই আশ্চর্য ঘটনা প্রত্যক্ষ করবেন। বড়োভাইয়ের এই পরমগতি লাভের দৃশ্যে তিনি আনন্দ পাবেন, আবার দুঃখও পাবেন। তারপর তিনিও বেরিয়ে পড়বেন তীর্থভ্রমণে”

এই কথা বলে, দেবর্ষি নারদ বীণায় সুরতুলে শ্রীহরির মহিমা কীর্তন করতে করতে পথে বেরিয়ে পড়লেন এবং যুধিষ্ঠিরও তাঁর নির্দেশ হৃদয়ে অনুভব করে শোক পরিত্যাগ করলেন। 

পরের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৮ "

নতুন পোস্টগুলি

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ৮

   এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য " ...