এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
আরেকটি ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
এই উপন্যাসের আগের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩০ "
৩৭
সুকরা গ্রাম পার হয়ে, আধ-ক্রোশটাক যাওয়ার পর, রাজপথে ওঠার পথটা দেখিয়ে দিয়ে মারুলা চলে গেল দক্ষিণে আস্থানের দিকে।
তারপর শুধু ভল্লা আর রামালি। ছোট ছোট ঝোপ-ঝাড় বিছানো বিস্তীর্ণ
মাঠ চারদিকে। তার মাঝখান দিয়ে ধুসর অজগরের মতো পথ চলেছে এঁকেবেঁকে। ওদের সামনে – পুবের আকাশে আধখানা চাঁদ ঝুলে আছে। মাথার ওপরে ঘন কালো নির্ভাঁজ টানটান বিছানো চাদরের বুকে অজস্র
অভ্রকুচির মতো চিকচিক করছে নক্ষত্রের বুটি – ওটাই আকাশ! রামালি রণপা চড়ে ভল্লার
সঙ্গে পাল্লা দিয়েই হাঁটছিল – আর দু চোখ দিয়ে শুষে নিচ্ছিল আশ্চর্য এক অনুভূতি।
ছোটবেলা থেকে নোনাপুর গ্রামের বাইরে সে যায়নি কোনদিন। মায়ের মুখটা তার মনেই পড়ে না। বাবার মুখটা মনে পড়ে,
কিন্তু ঝাপসা। এবং এতদিন তার জীবনটাও ছিল ঝাপসা। নিত্য অবহেলা, কুকথা আর মমতাহীন
সম্পর্কের শিকলে তার মনটা বাঁধা পড়েছিল বড্ডো সংকীর্ণ
গণ্ডীতে। আজ এই উন্মুক্ত প্রান্তরের মাঝখানে, উদার আকাশের নীচে – পায়ের তলায়
পড়ে থাকা সীমানা ছাড়ানো পথে চলতে চলতে, এই প্রথম তার নিজেকে মুক্ত মনে হল।
শৈশব পার করে তার বালক বয়েসের সমস্ত স্মৃতিই বিভীষিকাময়। বালকের
স্বভাবসুলভ চাপল্য, তার কাকির কাছে ছিল গুরুতর অপরাধ। একই ধরণের অপরাধ করে, তার বন্ধু
আহোক, বিশুন, বাপালি, হানো, শল্কুরাও তাদের
মায়ের কাছে মার খেয়েছে, মায়ের অভিশাপও কুড়িয়েছে। কিন্তু একটু পরেই সেই মায়েরাই আবার
পুত্রদের কোলে টেনে নিয়ে চোখের জল মুছিয়েছে, আদর করেছে। কিন্তু তার কাকি? তার মারের
মধ্যে থাকত মাতৃত্বহীন নিষ্ঠুরতা। “বাপ-মাখেকো ছেলে, তুই মরিস না কেন? মরলে যে আমার
হাড় জুড়োয়” কাকির সেই অভিশাপ ছিল অন্তরের কথা। প্রচণ্ড মার খেয়ে ভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে
যাওয়া রামালি, কোনদিন দূর থেকে কাকির ডাক শোনেনি “রামালি কোথায় গেলি বাবা, ঘরে আয় খাবার
বাড়ছি”…। দিনের পর দিন গড়িয়ে গেছে সকাল থেকে সন্ধ্যায় - কিন্তু না – কখনও কাকির ব্যবহারে
অনুতাপের লেশ দেখেনি। খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে, কাকা তাকে নিয়ে বাড়ি ফিরলে, কাকির চোখে
দেখেছে তীব্র ঘৃণা, দাঁতে দাঁত চেপে বলতে শুনেছে, “মরিসনি এখনও আক্কুটে ছেলে? বাপের
পিণ্ডি গিলে আমায় উদ্ধার করো”।
লজ্জায় অপমানে ঘৃণায় কতদিন সে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছে বনে,
যে বনে এখন তার বাস। প্রথম প্রথম ছটফট করত দারুণ ভয়ে আর খিদেয়। ধীরে ধীরে সে ভয় কেটে
গেল, সে বড়ো হতে লাগল। চিনে ফেলল বনের পশুপাখি, সরীসৃপ, কীটপতঙ্গ। তারাই যেন তার খেলার
সাথী। বিষধর সাপও হয়ে উঠল তার বন্ধু – একটু বদরাগী, এই যা।
আহোক, বিনাই, শল্কু, হানো, মইলির মায়েরা তাকে
প্রায়ই ডাকত…রান্নাঘরের কোনায় বসিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে পেট ভরে খাওয়াত। বলত, কাকি তাড়িয়ে
দিলে চুপিচুপি চলে আসবি, বাবা। আমাদের দুবেলা দুমুঠো জুটলে – তোরও জুটবে। পোড়া কপাল
তোর বাবা, নইলে অমন লক্ষ্মী-জনার্দনের মতো মা-বাবা চলে যায়? রামালির চোখে জল চলে আসার
উপক্রম হত - কিন্তু না কোনদিন কাঁদেনি। বরং
চোরের মতো রান্নাঘরের কোনায় বসে বসে সে অনুভব করত – মাতৃত্ব কেমন।
বিনাইয়ের মাকে খুব মনে পড়ে রামালির। পথে ঘাটে দেখা হলেই, রামালির
হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতেন বাড়িতে। রান্নাঘরের কোনে একটা পিঁড়িতে
বসিয়ে বলতেন, কোত্থাও যাবি না। চুপ করে বস
- একপা নড়লে মেরে ঠ্যাং খোঁড়া করে দেব। চুপ করে বসে, রামালি দেখত
উনুনের গরমে ঘেমে-নেয়ে কী ভাবে বিনাইয়ের মা – ছেলেমেয়ে, স্বামী শ্বশুর, শাশুড়ির জন্যে খাবার বানাতেন। শ্বাশুড়ি ও মেয়েরা পাশে থেকে তাঁকে সাহায্য
করত ঠিকই… কিন্তু তাঁর আচরণে সে দেখতে পেত মমতামাখা এক আশ্চর্য কর্তৃত্ব! চিনেছিল ওটাই
মাতৃত্ব। মা।
প্রতিবেশী মায়েদের অনুকম্পাতে রামালির বাল্য জীবনটা এভাবেই কোনরকমে
উৎরে গেল। কিন্তু সেই উৎরে যাওয়াটা আদৌ নিষ্কণ্টক হয়নি - সেটা কৈশোরে
এসে রামালি টের পেয়েছিল। ছোটবেলা থেকেই তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল হানো
আর শল্কু। কিন্তু তারাই একটু বড় হয়ে পাড়ার সকলের সামনে সুযোগ পেলেই তাকে টিটকিরি
দিত। বিশেষ করে ডাণ্ডা-গুলি কিংবা চোরচোর অথবা কানামাছি খেলায় রামালির কাছে ওরা
হেরে গেলে। বলত, মা-খেগো, আমাদের বাড়িতে গিলে এত বড়ো হলি, হতভাগা অন্নদাস, নির্লজ্জ
ভিখিরি...। অন্যান্য সাথীরা বিশেষ করে বিনাইরা, প্রতিবাদ করলে, আরও ক্ষেপে উঠত ওরা
– অশ্রাব্য গালিতে ছাড়িয়ে যেত বন্ধুত্বের সকল সীমানা...রামালি কিছু বলেনি কোনদিন।
যোগ্য উত্তর দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তার ছিল
না। কিন্তু তার মনের মধ্যে জমছিল প্রচণ্ড ক্রোধ – কাকি, হানো, শল্কুদের ওপর।
রাজপথে উঠে এসে ভল্লা বলল, “কীরে ব্যাটা, এতটা পথ
এলি, কোন কথা নেই, কী ভাবছিস?”
রামালি ভল্লার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে
হাসল, বলল, “না, সেরকম কিছু না। জীবনে কোনদিন এরকম গভীর রাত্রে ফাঁকা মাঠের মধ্যে
দিয়ে দৌড়ে চলিনি ভল্লাদাদা। বিশেষ করে এই রণপাজোড়া। তোমার থেকে শিখে বনের পথে দু-তিন
ক্রোশ হেঁটেছি – কিন্তু এরকম দীর্ঘ পথচলা – যেন শেষ নেই – এ আশ্চর্য অভিজ্ঞতা”।
“ঠিক বলেছিস আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। আমাদের জীবন বন্দী
ছিল - আমার যেমন ছোট্টগ্রাম পিপুলতলায়, তোর তেমনি নোনাপুরে। তার বাইরে বেরিয়ে দেখেছি - কী বিশাল এই রাজ্য - কতরকমের প্রকৃতি, কত
মানুষজন। কত ধরনের চরিত্র আর পেশা... আশ্চর্য অভিজ্ঞতা তো বটেই...”।
“তোমার গ্রামের নাম পিপুলতলা?”
“হ্যাঁ। আমার আসল নাম ডামল”।
“ডামল? তাহলে ভল্লা নামটা?”
“ওটা ছদ্ম নাম, প্রশাসনের দেওয়া। এই কাজটার জন্যে
বিশেষ নাম”। ভল্লা হেসে উত্তর দিল।
“আচ্ছা? এখানে তোমার কাজটা কী সেটা কিন্তু আজও
স্পষ্ট বুঝলাম না, ভল্লাদাদা”।
“কেন? না বোঝার কী আছে? রাজার বিরুদ্ধে, প্রশাসনের
বিরুদ্ধে তোদের নিয়ে বিদ্রোহ করছি?”
রামালি হেসে বলল, “সে তো বুঝতে পেরেছি। কিন্তু
প্রশাসনের বিরুদ্ধে তুমি আমাদের খেপাচ্ছ, আবার প্রশাসন তোমাকেই পূর্ণ সমর্থন করে
যাচ্ছে – কেন? সেটাই তো আমার মোটা মাথায় ঢুকছে না, ভল্লাদাদা”।
ভল্লা হেসে ফেলল, বলল, “মোটা মাথা শুধু তোর নয়,
আমারও। আমাকে যখন প্রথম এই কাজের কথা বলা হয়েছিল – আমিও বুঝতে পারিনি। মান্যবর সহকারী
রাজ্যাধিকারিককে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ঠিক তোর মতোই। উত্তরে তিনি বললেন, আমাদের অস্ত্র-শস্ত্রের
কর্মশালায় – সর্বদাই নতুন নতুন অস্ত্র-শস্ত্র বানানো হচ্ছে। নতুন বলতে - আরো হালকা
কিন্তু পোক্ত বল্লমের দণ্ড, ভল্ল এবং বল্লমের আরও নিশিত ফলা। এরকম তির-ধনুক –
তিরের ফলা, খড়্গ...সবকিছুই আরও উন্নত হচ্ছে। মানে অস্ত্র ব্যবহারের সুবিধে হচ্ছে,
এবং আরও ধারালো হচ্ছে”।
“ভালো তো। তাতে সমস্যা কিসের?”
“ওখানেই তো সমস্যা রে, রামালি। ধর গতদশ বছর ধরে
যত অস্ত্র-শস্ত্র বানানো হয়েছে, আজকের নতুন অস্ত্র-শস্ত্রের তুলনায় সেগুলো গাব্দা
ভারি আর ভোঁতা। তার ওপর পুরোনো অস্ত্রের লোহার ফলায় চট করে জং ধরে যায় – নষ্ট হয়ে
যায় তাড়াতাড়ি”।
“হবেই তো”।
“এইবার তুই আমাকে বল, পুরোনো এই অস্ত্রগুলো তুই কি জমিয়ে রেখে দিবি? অত জায়গা কোথায়? ওগুলো কী তুই ফেলে দিবি?
কোথায় ফেলবি? যারা কুড়িয়ে পাবে – তারা সকলেই তো অস্ত্র চালাতে শুরু করবে – রাজ্যে
সন্ত্রাস শুরু হয়ে যাবে”।
“ঠিক, আমাদের যুদ্ধ-বিমুখ রাজা যুদ্ধ করে রাজ্যের
সীমা বাড়ানোয় আগ্রহী নন। বহুকাল যুদ্ধ হচ্ছে না, অতএব বিস্তর অস্ত্র-শস্ত্র জমে
উঠছে”।
“বাঃ ঠিক ধরেছিস। এবার প্রশাসনের উচ্চতম মহল থেকে
সিদ্ধান্ত এসেছে – নকল যুদ্ধ বানাও, সে যুদ্ধে পুরোন অস্ত্র সরবরাহ করো উপযুক্ত
মূল্যের বিনিময়ে। খালি হোক রাজধানীর অস্ত্র ভাণ্ডার – রাজধানীর কোষাগার ভরে উঠুক পুরোনো
অস্ত্র বিক্রির অর্থে”।
রামালি কিছু বলল না। অনেকক্ষণ পর বলল, “এবার বুঝেছি,
তোমার কাজ প্রশাসনের হয়ে কিন্তু প্রশাসনের বিরুদ্ধে ওই অস্ত্র-শস্ত্র ব্যবহার করে –
রাজকোষের সঞ্চয় বাড়ানো। আর সেই কারণেই তোমার এই বিপ্লব-বিপ্লব খেলা”।
“হ্যাঁ, তবে এটা হল গৌণ দিক। এতে লাভের গুড় তেমন লোভনীয় হবে না। কিন্তু
অন্য রাজ্যের বিপ্লবীদের হাতে এই অস্ত্র-শস্ত্র দিয়ে সাহায্য করতে পারলে, প্রশাসনের লাভের গুড় কলসি উপচে পড়বে”।
“তার মানে বটতলির মিলা, জনারাই তোমার প্রধান লক্ষ্য?”
“অনেকটা তাই। আমরা পূবের লোকেরা খুব মাছ খাই, তোরা মাছ খাস?”
“খাই। তবে মাছের জন্যে আহামরি কোন আগ্রহ নেই। কিন্তু হঠাৎ একথা কেন?”
“বলছি। আমরা যখন অনেক মাছ ধরি, তখন পুকুরে বা নদীতে জাল ফেলি
– তাতে প্রচুর মাছ ওঠে। কিন্তু একটা-দুটো মাছ ধরতে হলে – ছিপ ফেলি। ছিপের আগায় বঁড়শিতে
কিছু টোপ দিই, মাছকে লোভ দেখানোর জন্যে। মাছ সেই খাবার খেতে এলে, বঁড়শির কাঁটা তার
মুখে আটকে যায় – এক ঝটকায় জল থেকে ছিপ তুললেই আমরা একটা মাছ পেয়ে যাই। এখানে আমাদের
দল গড়া, তোদের মহড়া এবং তিনজন রক্ষীকে মেরে আস্থানে ডাকাতি …এ
দৃষ্টান্তগুলো পাশের রাজ্যের গ্রামগুলোতে যত ছড়িয়ে পড়বে, আমাদের অস্ত্রের ব্যবসাও তত
ফুলে-ফেঁপে উঠবে”।
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন