ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "
ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১ "
ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "
ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "
ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "
"ধর্মাধর্ম" গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -
গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২
(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)
অথবা
+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।
[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/৮ "]
পঞ্চম পর্ব /পর্বাংশ - ৯
৫.৩.১ ব্রাহ্মণ্য ধর্ম থেকে হিন্দু ধর্মে রূপান্তর (শেষাংশ)
৬. অতএব অস্তিত্ব রক্ষা এবং হারিয়ে যাওয়া প্রতিপত্তি ফিরিয়ে আনার
তাগিদে ব্রাহ্মণ্য ধর্মকে বেতসবৃত্তি অবলম্বন করতে হল। যাঁরা ক্ষমতার শীর্ষে অথবা
যাঁরা প্রশাসনের উচ্চস্তরে অধিষ্ঠিত তাঁদের ঘনিষ্ঠ হতে ব্রাহ্মণ্য নিয়মকে শিথিল
করতেই হল। রাজা যেই হোন, বৈশ্য, শূদ্র অথবা বিদেশী যবন বা ম্লেচ্ছ – ভিন্ন পরিচয়ে তাঁরাও
ব্রাহ্মণ্য ধর্মে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলেন। আগে যাঁদের “পতিত-ক্ষত্রিয়” বা
“সংকর-ক্ষত্রিয়” বলে অবহেলায় ব্রাহ্মণ্য সমাজ দূরে রেখেছিল, এখন তাঁরাই
“ব্রহ্মক্ষত্রিয়”, “নাগক্ষত্রিয়”, “উগ্রক্ষত্রিয়” ইত্যাদি
বিচিত্র নামে ব্রাহ্মণ্য সমাজে সসম্মানে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করলেন। উপরন্তু
পৌরাণিক কিছু বিখ্যাত রাজবংশ, যেমন সূর্য, চন্দ্র ইতাদির সঙ্গে যুক্ত করে, ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা এই সব রাজাদের
ঘনিষ্ঠ বৃত্তেও ঢুকে পড়তে সমর্থ হলেন। তাঁরা রাজাদের প্ররোচিত করলেন, রাজসূয়, বাজপেয় বা অশ্বমেধ যজ্ঞের
আয়োজনে। এই আয়োজনে একদিকে পূর্ণ হল রাজাদের আত্মশ্লাঘা এবং অন্যদিকে
পুনর্প্রতিষ্ঠা পেল ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের প্রতিপত্তি ও বিপুল বিত্ত।
শুধুমাত্র রাজ-বৃত্তেও নয়, ব্রাহ্মণরা আরো নমনীয় হল অনার্য ধর্মবিশ্বাসের প্রতি। ততদিনে তারা চিনে ফেলেছে ভারতবর্ষের প্রতিটি প্রত্যন্ত অঞ্চল, বুঝে ফেলেছে দেশের আঞ্চলিক জনগনের মনোভাব। উপলব্ধি করতে পেরেছে, অনার্য মানুষের পরিশ্রমে উৎপন্ন শস্য এবং অজস্র সামগ্রী ছাড়া সমাজের অস্তিত্বই থাকবে না। অতএব অনার্য জনগণের বিদ্বেষ এবং বিতৃষ্ণা দূর করার লক্ষ্যে তাঁরা অনার্যদের প্রতিটি দেব-আত্মা, প্রতিটি ধর্মবিশ্বাস আত্মসাৎ করে নতুন উৎসাহে লেগে পড়লেন, সর্ব ভারতীয় ধর্মভাবনা রচনায়, যার নাম পুরাণ। তার জন্যে তাঁরা ধীরে ধীরে বৈদিক অনেক দেবতাকেই গুরুত্বহীন করে তুলতে এতটুকু দ্বিধা করলেন না। আবার কিছু কিছু বৈদিক দেবতাকে নব-রূপে মহিমান্বিত করে তুললেন, বেশ কিছু গৌণ বৈদিক দেবতাকে বসালেন প্রথম সারিতে। নতুন এই দেবতাদের নব নব মহিমাতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল আমাদের ধর্মধারণা – যাকে আমরা হিন্দু ধর্ম বলে থাকি।
সেই হিন্দু ধর্ম নিয়েই এবার আলোচনা করা যাক।
৫.৩.২ হিন্দু দেব-দেবী
আর্যদের ভারতে প্রবেশ মোটামুটি ১৫০০ বি.সি.ই-তে, প্রাচীনতম ঋগ্বেদের
সংকলনের সময় কাল ১০০০ বি.সি.ই-র কিছু আগে বা পরে এবং পরবর্তী ৫০০ বছরের মধ্যে
সংকলিত হয়েছে ব্রাহ্মণ, উপনিষদ এবং আরণ্যক বিভাগ সহ আরও তিনটি বেদ। ঋগ্বেদের সময়
দেবতাদের সংখ্যা ছিল মাত্র আট বা নয়, খুব জোর দশ জন। পরবর্তী বেদগুলিতে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল
প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। কিন্তু আরও তিনশ বছর পর অর্থাৎ মোটামুটি খ্রী.পূ.
দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে এই দেবতাদের সংখ্যায় বিস্ফোরণ ঘটতে লাগল।
দেবদেবীরা শুধু যে সংখ্যাতেই বৃদ্ধি পেলেন, তা নয়, তাঁদের গুণগত পার্থক্য অর্থাৎ
মহাবিশ্বের যাবতীয় বিষয়ে তাঁদের প্রভাব, প্রতিপত্তি, কর্তব্য, দায়িত্ব এবং অধিকার বেড়ে গেল বহুগুণ। এই পর্যায়ে যে তিনজন
দেবতাদের মধ্যে প্রধানতম হয়ে উঠলেন, তাঁদের একত্রে ত্রিদেব বলা হয় – ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর।
এই তিন দেবতার নামই আমরা বৈদিক সাহিত্যে
জেনেছি। বেদের ব্রহ্ম ছিলেন, সকল দেবতাদের দেবতা – যাঁর আরেক নাম হিরণ্যগর্ভ। আমরা
জেনেছিলাম,
তিনিই
একমাত্র সত্য,
তিনিই
বিভক্ত হয়ে অন্যান্য দেব-দেবী হয়েছেন। এই ব্রহ্মের অধিষ্ঠান ছিল ব্রহ্মলোকে –
দ্যুলোকের উচ্চতম স্তরে। [এই স্তরের ঊর্ধে কী আছে জিজ্ঞাসা করায় বাচক্নু-কন্যা
গার্গীকে মুণ্ডপাতের হুমকি দিয়েছিলেন মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য, সে কথা আশা করি ভুলে যাননি
(অধ্যায় ৪.৪.৯)]। বিষ্ণু ছিলেন বৈদিক সূর্য-দেবতা - দ্বাদশ আদিত্যের মধ্যে সর্ব
কনিষ্ঠ। বৈদিক সূর্য বা দ্বাদশ আদিত্য যেহেতু দ্যুলোকের দেবতা, অতএব বিষ্ণুর অধিষ্ঠান হল, দ্যুলোকের সর্বোচ্চ স্তরে, অর্থাৎ বৈকুণ্ঠলোকে। আর
মহেশ্বর হলেন বৈদিক অগ্নির রুদ্ররূপ। তিনি পৃথ্বীলোকের দেবতা, অতএব তাঁর অধিষ্ঠান হল এই
পৃথিবীর উচ্চতম স্তরে, হিমালয়
পর্বতশ্রেণীর মধ্যে কৈলাস পর্বতে।
৫.৩.২.১ ব্রহ্মা
হিন্দুদের মধ্যে ব্রহ্মা খুব একটা জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেননি। তাঁর
অন্যতম কারণ হয়তো, তাঁর
নামের সঙ্গে পরমাত্মা ব্রহ্মের নাম-সাযুজ্য। পুরুষোত্তম ব্রহ্ম তথা হিরণ্যগর্ভ, বেদ ও উপনিষদের অব্যক্ত
নিরাকার ঈশ্বর। তাঁকে বর্ণনা করা যায় না, ধারণা করা যায় না, তিনি অবাঙ্মনসোগোচর, তাঁকে শুধুমাত্র উপলব্ধি
করা যায়। উপনিষদ এবং বেদান্তের ব্রহ্ম ধারণা এবং হিন্দু ধর্মের ব্রহ্মা ধারণা
কিন্তু মোটেই এক বিষয় নয়। কারণ হিন্দুদের ব্রহ্মা সাকার। তাঁর চতুর্মুখ, মাথায় জটা। তিনি তাঁর
চারটি অঙ্গ থেকে চতুর্বণের সৃষ্টি করেছেন। তাঁর মন থেকে জন্ম নিয়েছেন সপ্তর্ষি সহ
অনেক ঋষি ও নারদ, মনু
– যাঁরা পৃথিবীর যাবতীয় প্রাণী ও উদ্ভিদের স্রষ্টা। কিন্তু এই অপার ঐশ্বর্য থাকলেও
ভগবান ব্রহ্মা অত্যন্ত সরল দেবতা ছিলেন। দৈত্য, দানব, রাক্ষস ও মানুষদের অনেকেই তপস্যা
করে ব্রহ্মাকে বেশ সহজেই সন্তুষ্ট করেছে এবং বহুবার এমন সব বর আদায় করে নিয়েছে, যার ফলে দেবতা এবং
মানুষদের বারবার বিপদে পড়তে হয়েছে। পরিস্থিতি সামলাতে হয়েছে হয় বিষ্ণু নয় শিবকে।
তাঁর এই সারল্য এবং সহজেই সন্তুষ্ট হয়ে ওঠার কারণেই হয়তো তাঁর প্রভাব খর্ব হয়েছে, কমেছে জনপ্রিয়তা।
মহাভারত ও পুরাণগুলিতে বিষ্ণু বা শিবের মাহাত্ম্য প্রসঙ্গে ব্রহ্মার উল্লেখ এসেছে বারবার, তার থেকেই তাঁর অনেক কাহিনী ও উপাখ্যান জানা যায়। এই প্রসঙ্গে হিন্দু পুরাণগুলি নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করে নেওয়া যাক। হিন্দুদের পুরাণ সংখ্যা ঠিক কতগুলি সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ আছে, তবে আঠারোটি প্রধান পুরাণ গ্রন্থকে প্রায় সকলেই মেনে নিয়েছেন, সেগুলিকে মহাপুরাণ বলা হয়। এই মহাপুরাণগুলির সংক্ষিপ্ত পরিচয় এখানে দেওয়া হলঃ-
মহাপুরাণ সারণি
মহাপুরাণের নাম সংক্ষিপ্ত বিষয় পরিচয় প্রধান দেবতা
১ অগ্নি নানা বিষয়ের আলোচনা, গাছ-পালা, উদ্ভিদ, বাস্তুশাস্ত্র ইত্যাদি। অগ্নি
২ ভাগবত বিষ্ণুর অবতার বিবরণ, মহিমা গাথা ও ধর্মতত্ত্ব। বিষ্ণু
৩ ব্রহ্ম নানান প্রাচীন কাহিনী, ধর্মতত্ত্ব, ব্রহ্মের কথা সামান্যই। ব্রহ্মা
৪ ব্রহ্মাণ্ড নানান কাহিনী, ধর্মতত্ত্ব, রাজনীতি, শাসন প্রণালী ইত্যাদি। শিব
৫ ব্রহ্মবৈবর্ত প্রধানতঃ বিষ্ণুর নানান মহিমা গাথা ও ধর্মতত্ত্ব। বিষ্ণু
৬ গরুড় প্রধানতঃ বিষ্ণুর নানান মহিমা গাথা ও ধর্মতত্ত্ব। বিষ্ণু
৭ কূর্ম বিষ্ণু ও শিবের উপাখ্যান, তীর্থ ব্যাখ্যা এবং ধর্মতত্ত্ব। বিষ্ণু
৮ লিঙ্গ লিঙ্গ অর্থাৎ শিবের মাহাত্ম্য, শৈব ধর্মতত্ত্ব। শিব
৯ মার্কণ্ডেয় মহাভারত ও নানান পুরাণ নিয়ে আলোচনা ও ধর্ম তত্ত্ব। বিষ্ণু ও শিব
১০ মৎস্য বিষ্ণুর দশ অবতারের উপাখ্যান। বিষ্ণু
১১ নারদ প্রধানতঃ বিষ্ণু মাহাত্ম্য। বিষ্ণু
১২ পদ্ম বিষ্ণু এবং শিবের নানানমাহাত্ম্য, তীর্থ কথা, বিবিধ তত্ত্ব। বিষ্ণু ও শিব
১৩ শিব শিবের মাহাত্ম্য। শিব
১৪ স্কন্দ কার্তিক ও শিবের মাহাত্ম্য। শিব
১৫ বামন প্রধানতঃ বিষ্ণুর মাহাত্ম্য। বিষ্ণু
১৬ বরাহ প্রধানতঃ বিষ্ণুর মাহাত্ম্য। বিষ্ণু
১৭ বায়ু প্রধানতঃ শিব মাহাত্ম্য । শিব
১৮ বিষ্ণু প্রধানতঃ বিষ্ণু মাহাত্ম্য। বিষ্ণু
উপরের সারণি থেকে বহুল প্রচলিত অষ্টাদশ মহাপুরাণগুলির বিষয়ভিত্তিক বিচার করলে, দেখা যায়, আঠারোটির মধ্যে বিষ্ণু-মহিমা বিবৃত মহাপুরাণের সংখ্যা নটি এবং শিব-মহিমার পাঁচটি। তাছাড়া একটি করে মহাপুরাণ ব্রহ্মা এবং অগ্নির। বাকি দুটি বিষ্ণু, শিব ও অন্যান্য নানান ঘটনা নিয়ে রচিত। অতএব মোট মহাপুরাণের শতকরা ৫০ ভাগ ভগবান বিষ্ণুর ভাগে, শতকরা ২৭.৭৮ ভাগ ভগবান শিবের ভাগে। ভগবান ব্রহ্মার ভাগে মাত্র শতকরা ৫.৫৫ ভাগ। এর থেকেই বোঝা যায়, ভগবান বিষ্ণুর ভক্ত বিদগ্ধ পণ্ডিতরা ভাগবত ধর্মের প্রচারে কতটা নিষ্ঠাবান ছিলেন। আর উল্টোদিকে ভগবান ব্রহ্মার ভক্ত ভাগ্য খুবই সঙ্গীন।
ভারতবর্ষের মন্দিরের হিসাব থেকেও এই চিত্র পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ভগবান
বিষ্ণু ও মহাদেবের বিখ্যাত মন্দিরগুলি ছেড়ে দিলেও, প্রতিটি হিন্দুপাড়ায় ছোট-ছোট
মন্দির আছে অজস্র, সেক্ষেত্রে
ব্রহ্মার মন্দিরের সংখ্যা গোটা ভারতবর্ষে সাকুল্যে মাত্র ছটি, একটি আজমীড়ে পুষ্কর
সরোবরের তীরে;
রাজস্থানের
বারমের; খোখান, (কুলু, হিমাচল); কুম্ভকোনম (তাঞ্জাভুর, তামিলনাড়ু); পানাজি (গোয়া) এবং
তিরুপাত্তুরে (তামিলনাড়ু)।
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন