সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/৮

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/৭ "]

পঞ্চম পর্ব /পর্বাংশ  - ৮

৫.৩.১ ব্রাহ্মণ্য ধর্ম থেকে হিন্দু ধর্মে রূপান্তর

পশ্চিম ভারতের আঞ্চলিক দেবতা বাসুদেবের নাম প্রথম পাওয়া যায় খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে। এই সময়েই পশ্চিম ভারতের শাসক রাজা এবং মধ্য এশিয়া থেকে ভারতে আসা উপজাতি গোষ্ঠী প্রধান এবং রাজারাও দেবতা বাসুদেবের পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠেছিলেন।

পশ্চিম ভারতের – রাজস্থান ও গুজরাট অঞ্চলে পশুপালক জনগোষ্ঠীর দেবতা ছিলেন কৃষ্ণ। আবার তামিল লোকগাথায় “কৃষ্ণবর্ণের” মায়ণ নামে এক দেবতার নাম পাওয়া যায়, যিনি পশুপালক, বাঁশি বাজাতেন এবং গোপরমণীদের সঙ্গে ক্রীড়া করতেন। তাঁর প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায়, তামিল ভাষার “সঙ্গম” নামক লোকগাথার সংকলনে। তাঁর অন্য আরও নাম ছিল যেমন, “পরিপাতল” এবং “মল”।  ভগবান বিষ্ণুর তামিল নাম পেরুমল, পেরুমাল বা থিরুমলকে এই পরিপাতল ও মল নামেরই পরিবর্তিত রূপ বলে অনুমান করা হয়।  বিশ্‌দেব, যাঁর কথা এই গ্রন্থের দ্বিতীয় পর্বে উল্লেখ করেছি, ছিলেন মধ্যভারতের অনার্য গোষ্ঠীর দেবতা। গঙ্গা-যমুনা-গোমতী-শোণ প্রভৃতি নদীর উর্বর অববাহিকা অঞ্চলের মানুষের কাছে দেবতুল্য মহামানব ছিলেন শ্রীরাম। রামায়ণের বহু আগে থেকেই তাঁর বীরত্বের গাথা লোকমুখে প্রচলিত ছিল। বাল্মীকির প্রতিভায় সেই কাহিনীই মহাকাব্যিক হয়ে উঠেছে।   

অন্যদিকে মধ্য এবং দক্ষিণ ভারতের অনার্য জনগোষ্ঠীদের আরও কিছু দেবতা সাধারণ জনসমাজে, জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। যেমন পশুপতি, শিব, মহাদেব, স্কন্দ ও গণপতি, সৃষ্টির প্রতীক লিঙ্গ, নৃসিংহ, বরাহ, সিংহ, নাগ, গরুড়, পেচক, রাজহংস, ময়ূর, মূষিক[1], মৎস্য ইত্যাদি, এবং নদ-নদী - গঙ্গা, নর্মদা, গোদাবরী, পাহাড় – হিমালয়, মন্দর, মৈনাক[2], গাছপালা – বট, অশ্বত্থ, তুলসী, কদম্ব, বিল্ব ইত্যাদি। এখানে একটা খটকা অবশ্য থেকেই যাচ্ছে, এই অনার্য দেবতা বা দেব-আত্মাদের অনার্য মানুষরা কী নামে ডাকতেন[3]? সেটা আজ আর জানার কোন উপায় নেই, তার কারণ সংস্কৃতায়নের প্লাবনে সে ভাষা প্রায় অবলুপ্ত হয়ে গেছে। সিন্ধু সভ্যতার লিপির পাঠোদ্ধার হলে, কিছু আভাস হয়তো মিলতে পারে।     

ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পক্ষে খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে খ্রিষ্টিয় দ্বিতীয় শতাব্দী পর্যন্ত – কমবেশি এই আটশ বছরের পর্যায়টি - মোটেই অনুকূল পরিস্থিতি ছিল না। তার পরোক্ষ সমর্থন পাওয়া যায় ব্রাহ্মণ্য ধর্মের যুগ-ধারণা থেকেও।

আমরা আগের পর্বে ব্রাহ্মণ্য যুগ-ধারণায় চারটি যুগের - সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি - আলোচনা করেছি। এই যুগধর্মের লক্ষণগুলি নিয়ে তখন আলোচনা করিনি। সেই লক্ষণগুলি হল, সত্য যুগে চারপাদ পুণ্য, ত্রেতায় ত্রিপাদ, দ্বাপরে দ্বিপাদ এবং কলিযুগে একপাদ পুণ্য ও ত্রিপাদ পাপ বা অনাচার। মহাভারত থেকে আমরা জানতে পারি, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নর-দেহ ত্যাগের দিন থেকে দ্বাপর যুগের শেষ ও কলির শুরু। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ যদি ৯০০ বি.সি.ই-তে ঘটে থাকে, সেক্ষেত্রে মোটামুটি ৮৫০/৮৪০ বি.সি.ই-তে হতে পারে কলি যুগের সূচনা।  অর্থাৎ সেই সময় থেকেই আর্যাবর্তের সমাজে বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্য প্রভাবের বিপরীতে অন্যান্য ভাবনার প্রভাব শক্তিশালী হয়ে উঠছিল। সেই শক্তির প্রবল ধাক্কাটা এল ভগবান মহাবীর ও গৌতমবুদ্ধের আবির্ভাবে – অর্থাৎ খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। আর ব্রাহ্মণ্য মতে বেদ-বিরোধী বা ব্রাহ্মণ্য-বিদ্বেষী মতবাদ পাপাচার ছাড়া আর কিই বা হতে পারে? অতএব কলিযুগ হয়ে উঠল ত্রিপাদ পাপের ভারে ভারাক্রান্ত। এই কথাগুলিই আমরা তন্ত্রশাস্ত্রে স্বয়ং ভগবান মহাদেবের থেকেই শুনব, পরের পর্বে।       

যাই হোক, ব্রাহ্মণ্য-সমাজের এই প্রতিকূল পরিস্থিতির অনেকগুলি কারণের মধ্যে কয়েকটি হল,

১. ক্ষত্রিয় ছাড়া রাজা হওয়া যায় না, সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মন থেকে এমন ধারণা মুছে যেতে লাগল। কারণ নন্দবংশ থেকে ভারতজোড়া সাম্রাজ্য গড়ে তোলা মৌর্যরা কেউই ক্ষত্রিয় ছিলেন না। তাঁদের মধ্যে অনেকেই এবং পরবর্তী রাজাদের অধিকাংশই অক্ষত্রিয়, অনেকেই অনার্য – তাঁরা আর যাই করুন ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতায় আগ্রহী ছিলেন না। 

২. দেশের রাজা ক্ষত্রিয় না হওয়ায়, ব্রাহ্মণদের আধিপত্য ও সমৃদ্ধি অক্ষুণ্ণ থাকছিল না। কারণ ক্ষত্রিয় রাজা না হলে, রাজসূয় কিংবা অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন কে করবে? আর্য ধনী সম্প্রদায়ের যজ্ঞ থেকে জীবন ধারণ চলতে পারে, কিন্তু সমৃদ্ধি আসে না।         

৩. এই সময় পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুললেন, গ্রীক, পার্থিয়ান, শক, কুষাণ, পহ্লব, গুর্জর ইত্যাদি জাতি ও গোষ্ঠীর বিদেশী রাজারা। তাঁদের অনেকেই নিজস্ব ধর্ম নিয়ে এসেছিলেন, যাঁদের ছিল না, তাঁরা এ দেশীয় ধর্মের মধ্যে বৌদ্ধ বা অনার্যদের ধর্ম গ্রহণ করলেন।

৪. ব্রাহ্মণ্যধর্মের অসহিষ্ণু দুর্ভেদ্যতার এতদিন পূর্ণ সদ্ব্যবহার করছিল বৌদ্ধরা। কিন্তু বৌদ্ধদের ধর্মও পরবর্তী সময়ে অত্যন্ত জটিল তত্ত্বনির্ভর হয়ে উঠেছিল। ভগবান বুদ্ধের সহজ বাণীতে রাজা বিম্বিসার, অজাতশত্রু বা প্রসেনজিৎ মুগ্ধ হয়েছিলেন। ভগবান বুদ্ধের সরল বাণী ও আচার-আচরণ অনুসরণ করা স্থবিরবাদীনদের কথায় মুগ্ধ হয়েছিলেন সম্রাট অশোক। কিন্তু মহাযানী ধর্মমতের প্রবল উন্নাসিক পাণ্ডিত্যে বৌদ্ধরাও সাধারণ মানুষদের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করল।    

৫. এইরকম সময়েই জনপ্রিয় হয়ে উঠতে লাগল দেশীয় অনার্য ধর্মশাখাগুলি, ভাগবত, শৈব, পাশুপত্য, গাণপত্য ইত্যাদি। তাঁদের ধর্মে, মূর্তিপুজো আছে। মন্ত্র উচ্চারণ আছে, কিন্তু সেই মন্ত্রের কোন বাঁধা-ধরা ধর্মতত্ত্ব নেই। এই ধর্ম আচরণের জন্যে মোহ, মায়া, অহংকার, ঈর্ষা, হিংসা, কামনা, বাসনা এবং সংসার ত্যাগ করে নির্জনে তপস্যা, ধ্যান কিছুই করতে হয় না।

এই পুজো প্রকৃত অর্থে যেন উৎসব– যার যেমন সামর্থ্য, যার যেমন ইচ্ছে - একত্রে পালন করা যায়। ধনীরা  মহামূল্য অলংকার ও পোষাকে সেজে দরিদ্রদের অকাতরে দান করতে পারেন, তাঁদের বৈভবে সমাজের সাধারণ মানুষকে আশ্চর্য করে দিতে পারেন। সমাজের মানুষ তাঁকে ধন্য ধন্য করবে। বাড়বে তাঁর যশ – প্রতিপত্তি। সাধারণ মানুষ সকলেই এই উৎসবে মেতে উঠবে। তারা আনন্দ করবে, নানান বাদ্য বাজিয়ে নাচ-গান, কোলাহল করবে। তাদের কেউ যাবে মন্দিরে পুজো দিতে, কেউ যাবে মদ খেতে, কেউ যাবে পতিতাদের কাছে – সারা বছরের পরিশ্রম থেকে মুক্তি নিয়ে কয়েকটি দিনের উপভোগ।

এই পুজো ও উৎসবের একটি দিনের অনবদ্য এবং নির্ভরযোগ্য চিত্র পাওয়া যায় তামিল কাব্য “মাদুরাই মালিকা” থেকে। এই কাব্যের রচয়িতার নাম জানা যায় না, কিন্তু তাঁকে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই, এমন সুন্দর সহজ একটি বর্ণনার জন্য। এই কাব্য খ্রিষ্টিয় দ্বিতীয় শতাব্দীর পাণ্ড্য রাজা নেড়ুঞ্জেলিয়াণের সম্মানে লেখা হয়েছিল, সম্ভবতঃ আরো এক বা দুশ বছর পরে। এমন বাস্তব উৎসবের চিত্র উত্তর ভারতের কাব্যে খুব কমই পাওয়া যায়।

“কবি বিশাল তোরণ পথে শহরে ঢুকলেন, তোরণের স্তম্ভে, খোদিত রয়েছে দেবী লক্ষ্মী[4]র মূর্তি। দেবীর সর্বাঙ্গ ঘিয়ে প্রলিপ্ত। শহরবাসী তাঁকে এই সশ্রদ্ধ নৈবেদ্য দিয়েছে, কারণ এই দেবীই তাদের দিয়েছেন শহরের নিরাপত্তা এবং সমৃদ্ধি। সে দিনটা ছিল উৎসব পালনের দিন। মহান রাজার বিজয় ও বীরত্বকে স্মরণ করার দিন। শহরের চারদিকে অজস্র বর্ণময় ধ্বজা উড়ছে, সেনাপতিদের গৃহের শিখরেও ধ্বজা উড়ছে, এমনকি তড্ডি[5] বিক্রেতাও মহানন্দে তার দোকানে ধ্বজা ওড়াচ্ছে। প্রশস্ত রাস্তাগুলি দিয়ে আজ যেন মানুষের স্রোত বয়ে চলেছে। সকল জাতির মানুষ, বাজারে বিকিকিনি করছে এবং আশ্চর্য সব বাদ্যযন্ত্রের তালে তারা গানও করছে।

বিশাল ঢাকের বাদ্য বাজিয়ে, একটি রাজকীয় শোভাযাত্রা এগিয়ে চলেছে পথে, সেই শোভাযাত্রায় আছে হাতি এবং রথ – রথের ঘোড়াগুলি তেজ এবং শক্তিতে টগবগ করছে। তাদের পেছনে চলেছে বিজয়ী পদাতিকের দল।  চারদিকে শঙ্খ ধ্বনিত হচ্ছে। মনে হচ্ছে, বহুদিন বেঁধে রাখা কোন এক অতিকায় পশু হঠাৎ যেন ছাড়া পেয়ে উত্তাল সমুদ্রে নাচিয়ে তুলছে রণতরী – যতক্ষণ না তাকে আবার বন্দী করা যাবে, এই উদ্দীপনা থামবে না।

এর মধ্যেই পসারীরা মহোৎসাহে বিক্রি করে চলেছে তাদের পণ্য - মিষ্টান্ন, ফুলের মালা, সুগন্ধী রেণু এবং পানের খিলি। বয়স্কা মহিলারা ঘরে ঘরে মেয়েদের কাছে বিক্রি করছেন পুষ্পস্তবক এবং নানা রঙের পদক। অভিজাত মানুষেরা রথে চড়ে চলেছেন, তাঁদের পরনে উজ্জ্বল রঙিন বসন এবং অঙ্গে সুগন্ধী ফুলের মালা। তাঁদের কটিবন্ধে  সোনালী তরবারী-কোষগুলি ঝলমল করছে সূর্যের আলোয়। নানান অলঙ্কারে ভূষিতা সুন্দরী পুরনারীরা অলিন্দ ও গবাক্ষ থেকে রাজপথের শোভাযাত্রা লক্ষ্য করছেন।

বহু মানুষ মন্দিরে জড়ো হয়েছেন পুজো দিতে, তাঁরা সমবেত সুরে প্রার্থনা করছেন, পুষ্প ও মাল্যের নৈবেদ্য নিবেদন করছেন দেবদেবীর চরণে, সাধুদের প্রণাম করছেন শ্রদ্ধায়। শিল্পীরা তাদের বিপণিতে কাজ করছেন, তাঁরা শাঁখের বালা বানাচ্ছেন, স্বর্ণকার, তাম্রকার, পটশিল্পী, তন্তুবায় সকলেই এখন ব্যস্ত; ব্যস্ত বস্ত্র, ফুল, চন্দনের ব্যাপারীরাও। খাবারের বিপণিগুলিতেও ব্যস্ততার বিরাম নেই – টাটকা সবজি, কাঁঠাল, আম, চিনির মঠ, রান্না করা ভাত এবং মাংস, কী নেই সেখানে!

সন্ধ্যায় শহরের বারবনিতারা নৃত্য ও গীতে মনোরঞ্জন করছে, তাদের প্রিয় নাগরদের। তাদের গান ও বাঁশির সুরে রাজপথও যেন মত্ত হয়ে উঠেছে। মত্ত প্রাকৃতজন অতিরিক্ত পান করে পথেই গড়াগড়ি দিচ্ছে, অভিজাত মহিলারা এসেছেন মন্দিরের সন্ধ্যারতি দেখতে, তাঁদের হাতে জ্বলন্ত দীপ ও নৈবেদ্য, তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন তাঁদের সখীবৃন্দ ও সন্তানেরা। তাঁদের নৃত্য ও মন্ত্রোচ্চারণে গমগম করছে মন্দিরের নাটমণ্ডপ।

অবশেষে এল রাত্রি, নগর এখন নিদ্রামগ্ন – জেগে আছে শুধু প্রেত ও অশরীরি, আর সাহসী সিঁদকাটারা। তাদের হাতে দড়ির মই, ছুরি, মাটির দেয়ালে গর্ত করার ছেনি। কিন্তু নৈশ প্রহরীরাও সকলে সজাগ, নাগরিকরা নিশ্চিন্তেই নিশিযাপন করল নিজ নিজ গৃহে।

ভোর হল ব্রাহ্মণদের পবিত্র মন্ত্র উচ্চারণে। চারণ কবিরা পল্লীতে পল্লীতে গান গেয়ে নতুন দিনের সূচনা করলেন। ব্যবসায়ীরা তাদের বিপণি খুলে পসরা সাজাতে ব্যস্ত হয়ে উঠল। ভোরের পিপাসী রসিকদের জন্যে তড্ডি-বিক্রেতাও তার বিপণি খুলেছে। মত্তজনেরা আবার টলতে লাগল, চিৎকারে ভরে তুলল রাজপথ। নগরের ঘরে ঘরে দরজা খোলার শব্দ। মহিলারা বাড়ির অঙ্গন থেকে বিগত উৎসবের বাসি ফুল ঝাঁট দিয়ে সরাতে শুরু করলেন। এভাবেই নগর আবার ফিরে গেল তার প্রাত্যহিক ব্যস্ততায়”। [Wonder that was India – A L Basham -এর গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত – অনুবাদ - লেখক।]

পরের পর্ব - " ধর্মাধর্ম - ৫/৯ "


[1] রাজস্থানের বিকানিরে কর্ণি মাতা মন্দিরে অজস্র পবিত্র মূষিক আজও পূজিত হয়।  

[2] মৈনাক হিমালয়ের পুত্র এবং শিব জায়া পার্বতীর ভ্রাতা। ছোট এই পর্বত নাকি উড়তেও পারতেন।   

[3] সারা ভারতে তামিল ভাষাই প্রথম আঞ্চলিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তাই একমাত্র এই ভাষাতেই প্রাক-আর্য কিছু নাম পাওয়া গিয়েছে।

[4] দেবী লক্ষ্মী আজও আমাদের সমৃদ্ধি দেন, কিন্তু সে সময় তিনি নিরাপত্তাও দিতেন। অতএব অনুমান করা যায়, খ্রিস্টিয় দ্বিতীয় বা তৃতীয় শতাব্দীতে দক্ষিণ ভারতে দেবী লক্ষ্মী পূর্ণ দেবী রূপেই পূজিতা হতেন। পরবর্তীকালের হিন্দুধর্মে, তিনি নিরাপত্তার ব্যাপারটা তাঁর মাতা দেবী দুর্গার হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। 

[5] তড্ডি অর্থাৎ তাড়ি – তাল, খেজুর অথবা নারকেল গাছের রস থেকে বানানো মদ।


শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৫

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৪ 



১৫  

কিসের একটা আওয়াজে সুনেত্রর ঘুম ভেঙে গেল আচমকা। বিছানায় উঠে বসে আওয়াজটা কিসের বোঝার চেষ্টা করল। দেয়ালের ঘড়িতে দেখল পাঁচটা কুড়ি। তার মানে দু-ঘন্টাও ঘুমোয়নি সে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল স্ট্রিট লাইট নিভে গেছে। সূর্যোদয় হয়নি, কিন্তু মায়াবি আলোয় ভরে উঠেছে সামনের রাস্তা, গাছাপালা, টুকরো আকাশটাও। যদিও তার ঘরে আবছায়া। নির্জন রাস্তা দিয়ে হঠাৎই ঝমঝমিয়ে দৌড়ে গেল একটা মেটাডোর – পিঠে উপচে পড়া নানান শাক-সব্জির পসরা। তার ওপরে দুজন লোক বসে ঝিমোচ্ছে। শহুরে বাবুদের বাজারে টাটকা সবজি সরবরাহ করে ওরা – রোজই করে, আজ নতুন নয়। তার ঘুমটা ভেঙেছিল কি এরকমই কোন মেটাডোরের আওয়াজে?  

রাতের ঘন্টা দুয়েকের ঘুমটাও তেমন জমাট বাঁধেনি টের পেল সে, আধো তন্দ্রায়, আধো সুষুপ্তিতেই কেটেছে ওটুকু সময়। তন্দ্রা ভঙ্গ হয়ে চোখ মেলে তাকায়নি – কিন্তু ছেঁড়া ছেঁড়া অস্বস্তির ঘুমের অনুভবটা তার মাথায় তার দু চোখের কড়কড়ানিতে। বিছানা থেকে নেমে টেবিলে রাখা কাচের জগ থেকে গ্লাসে জল নিয়ে পান করল সুনেত্র। অন্যদিন তার ফোনের অ্যালার্ম বাজে সাড়ে ছটায়, শম্পাদিদি আসে সাতটা নাগাদ। অতএব আরও ঘন্টাখানেকের জন্যে টেনে আনা যায় চটকে যাওয়া ঘুমটাকে। সুনেত্র আবার শুয়ে পড়ল এবং চোখ বন্ধ করল ঘুমোনোর চেষ্টায়।

 চোখ বন্ধ করতেই তার মনে হল, মুখে কেউ স্বীকার করে না, কিন্তু একজন নারীর জীবনে দীর্ঘদিন মিশে ছিল যে জীবনসঙ্গীর জীবন – তার চলে যাওয়ার সম্পূর্ণ শূণ্যতাটুকু বুকের মধ্যে শুষে নেওয়া - বড়ো সহজ কাজ নয়। উপরন্তু সে নারীর মুম্বাই-প্রবাসী বড় সন্তানের কেমন যেন দায়সারা ভাব। ছোট সন্তান খোঁজ-খবর রাখে, কিন্তু সেও তো ছিল দিল্লি-প্রবাসী। সে নারীর প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে সে সন্তানেরও তো কোন লেনদেন নেই। সুনেত্রর মনে হয়েছিল, জীবনের এই সমস্ত একাকীত্বটুকু আত্মসাৎ করতে করতে মাও অচিরেই অসুস্থ হয়ে পড়বেন। এবং মনে-প্রাণে চাইবেন, আর কতদিন, এবার আমাকেও তুলে নাও ঠাকুর।       

অতএব মা এখানে এসে থাকতে শুরু করাতে খুব নিশ্চিন্ত বোধ করেছিল সুনেত্র। এখানে এসে মাকে সে আক্ষরিক অর্থে “ভাত-জল” করার কাজে নিযুক্তও করেনি, তার জন্যে ছিল শম্পাদিদি। শম্পাদিদিকে সুনেত্র দিদি বলে ঠিকই কিন্তু মহিলা তার থেকে মাস ছয়েকের ছোট। একবার শম্পাদিদি বেশ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, দিন তিনেকের জন্যে চেনাজানা এক হসপিট্যালে ভর্তি করতে হয়েছিল। সে সময়েই শম্পাদিদির সঠিক বয়েসটা সে জানতে পেরেছিল। এই তথ্যটি জেনেও “শম্পাদিদি” ডাকটা সে ছাড়েনি, কারণ শম্পাদিদির আচরণে, ব্যবহারে সে সত্যিই এক দিদির মমতা টের পায়। মা এসেও শম্পাদিদিকে অত্যন্ত আন্তরিকভাবেই গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর শম্পামাকে মা হাতে ধরে শিখিয়েছিলেন, সুনেত্রর প্রিয় রান্নার পদগুলি। অতএব আজ প্রায় তিন বছর হল, মা চলে যাওয়ার পরেও, সুনেত্র তার মায়ের হাতের রান্নারই স্বাদ পায় শম্পাদিদির রান্নায়। এমন সৌভাগ্য কজনার হয়?

বাবা মারা যাওয়ার পর, মা এখানে এসে থাকতে শুরু করাতে, সুনেত্রর দাদা – সুমিত্রর অত্যন্ত গাত্রদাহ হয়েছিল। সুমিত্রর বদ্ধমূল ধারণা হয়েছিল, মাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে, দাদাকে বঞ্চিত করে, সমস্ত সম্পত্তি এবং টাকাকড়ি হাতিয়ে নেওয়ার মতলব করছে সুনেত্র। সুনেত্রকে নয়, মাকে বার বার ফোন করত সুমিত্র, “তুমি যখন কলকাতার বাড়ি ছেড়ে সুনেত্রর ওখানেই গিয়ে উঠলে, মা, তাহলে এই বেলা বাড়িটা বিক্রি করে দেওয়াই ভালো। ফাঁকা-বাড়ি ফেলে রাখলে তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায়, জানো তো? এখন বেচলে যা দাম পাবে, দুবছর পরে তার অর্ধেকও পাবে না”।

মা উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি যদ্দিন রয়েছি, ও বাড়ি তো বিক্রি হবে না, সুমু। আমি চোখ বুজলে তোরা যা প্রাণ চায়, করিস, আমি দেখতে আসব না”।

মার এই উত্তরের পর সুনেত্রর দাদা বহুদিন তাদের সঙ্গে আর কোনরকম যোগাযোগ করেনি। অন্ততঃ সাত-আট মাস। অবশ্য সুনেত্র বা সুনেত্রর মাও কোন খোঁজ করেননি – আসলে মন থেকে যোগাযোগ রাখার কোন তাগিদ অনুভব করেননি। কিন্তু দাদা স্বয়ং এক বর্ষার দিনে অকস্মাৎ এসে হাজির হল সুনেত্রর কোয়ার্টারে। সুনেত্র কোয়ার্টারে তখন ছিল না, হসপিট্যালের ডিউটিতে ছিল। লাঞ্চের সময় ঘরে ফিরেই সে অবাক। জিজ্ঞেস করল, “হঠাৎ, কোন খবর না দিয়েই তুমি চলে এলে, দাদা? আমার এই কোয়ার্টারের ঠিকানা কী করে জানলে?”

রহস্যের হাসি হেসে দাদা নাটকীয় ভঙ্গীতে বলেছিল, “মন যখন টানে – তখন কোন বাধাকেই আর বিঘ্ন মনে হয় না, রে। চলে এলাম, বহুদিন মাকে দেখিনি। মনটা বড়ো চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। তোকেও দেখিনি কতদিন বল, সেই বাবার কাজের সময় শেষ দেখা। সত্যি বলতে, তোর ভাইপো-ভাইঝি আর বৌদিই আমাকে ঠেলে পাঠালো, বলল, দাদি বুঝি শুধু আংকলের মা? চিন্তা কর, টুকাই, টিংকু – টিংকু ছোটবেলায় তোর কেমন ন্যাওটা ছিল, মনে আছে? সেই টিংকু কী রকম পাকা-পাকা কথা শিখেছে, শুনলে তাজ্জব হয়ে যাবি”।

সুনেত্রর দাদার বরাবরই নাটক-থিয়েটার করার খুব শখ, সে পাড়ার ক্লাবেই হোক, ওর অফিসের রিক্রিয়েশন প্রোগ্রামেই হোক কিংবা মুম্বাইয়ের বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশনের কালচারাল প্রোগ্রামেই হোক - সুযোগ পেলেই নেমে পড়ে। সুনেত্র দু-তিনবার দেখেছে সে নাটক – যখন কলকাতায় থাকত। খুব ইম্প্রেসিভ মনে হয়নি তার – বড়ো বেশি নাটুকে মনে হয়েছিল – কিছুটা যাত্রা টাইপের। সে যাই হোক, কোন কোন বিষয়ে কারও প্যাশান থাকতেই পারে, সে নিয়ে সুনেত্রর কোন বক্তব্য নেই। কিন্তু ওর দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি আচার-আচরণে এবং কথাবার্তাতেও সেই নাটুকেপনা প্রায়ই প্রকট হয়ে ওঠে - সেটাই যা বিরক্তিকর।

সুনেত্র হালকা হেসে উত্তর দিয়েছিল, “সে ভালই তো। ঠিকই তো বলেছে”।

সেদিন বহু বছর পর, দু’ভাই একত্রে খাবার টেবিলে খেতে বসেছিল। খাবার পরিবেশন করছিলেন মা। খাওয়ার সময় সুমিত্র আরো অনেক কথাই বলেছিল।  

“এতদিন ধরে এতবড়ো কোম্পানিতে জব করছিস আর থাকিস এই ছোটা কোয়ার্টারে? কোম্পানি না দেয়, তুই নিজেও তো এর থেকে একটু বড়া কোয়ার্টার বা বাড়ি দেখে নিতে পারিস”।

“কী দরকার, দাদা? আমি আর মা – দুজনের জন্যে তিনটে শোবার ঘর, ড্রয়িং-ডাইনিং, দুটো টয়লেট, দুটো বারান্দা – খারাপ কি – আমার তো দিব্যি চলে যাচ্ছে, দাদা”।

“তুই সেই চিরকালের মেদামারা রয়ে গেলি, সুনু। চলে যাওয়াটা কোন কাজের কথা নয়, কথাটা হল দিল বড়া হোনা চাহিয়ে। এবার আমি মাকে নিয়ে যাচ্ছি, এর মধ্যে তুইও চলে আয় একদিন – দেখবি দুনিয়াটা কিতনা বড়া হ্যায়, কিতনা কুছ বাকি হ্যায় হাসিল করনে কে লিয়ে.. মানে...ওই কী যেন বলে... অর্জন করার...”।

“তুমি মাকে নিয়ে যাচ্ছো? হঠাৎ? এমন আচমকা?” সুনেত্র মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল, মা গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আছেন অন্যদিকে।

“তোকে তখন বললাম না, টুকাই, টিংকু, তাছাড়া তোর বৌদিও, আমাকে ঠেলে পাঠিয়ে দিল, মাকে নিয়ে যেতেই হবে”।

“ঠিক আছে, কথাটা কদিন আগে ফোনেও তো বলে দিতে পারতে...মায়ের রেডি হওয়ারও তো একটা ব্যাপার আছে...”।

“আরে ধুর, আমি আজই মাকে নিয়ে যাচ্ছি নাকি? আমার অফিসিয়াল কিছু অ্যাসাইনমেন্টে কলকাতায় এসেছিলাম, সেসব সেরে আমি মুম্বাই ফিরব পরশোরোজ । পরশুর ফ্লাইটে মায়ের টিকিটও কাটা হয়ে গেছে – সামকো সাড়ে ছে বাজে ফ্লাইট। ও নিয়ে তোকে চিন্তা করতে হবে না। কোম্পানির গেস্ট হাউসে উঠেছি। কাজেই দায়িত্ব শুধু আর আমার নয় আমার কোম্পানিরও। আমাদের পি.আর ম্যানেজার সব ইন্তেজাম করে দিয়েছে। পরশু সকালে সে নিজেই গাড়ি নিয়ে আসবে, এবং ব্যাগ-ব্যাগেজ নিয়ে মাকে নিয়ে আমাদের গেস্ট হাউসে নিয়ে যাবে  – সেখান থেকে আমরা একসাথ দমদম যাবো। তুই একদম টেনশন করিস না, সুনু, ওসব জমানা কি আর আছে – সেই কুলির মাথায় পোর্টমান্টো, হোল্ডঅল... ভারি ভারি টিনের সুটকেস, খাবার জলের কলসি...এই ছিল বাঙালির প্রবাস যাত্রা...” হা হা করে কিছুক্ষণ উচ্চস্বরে হেসে, সুমিত্র মাকে জিজ্ঞেস করল, “মনে আছে মা?”

বেশ বিরক্তি নিয়েই মা বললেন, “একদমই মনে নেই, বাবা। ছোটবেলায় ওসব পড়েছি গল্পের বইয়ে, আর দেখেছি পুরোন দিনের সাদা-কালো সিনেমায়। নিজের চোখে দেখিনি”।

মায়ের উত্তরে সুমিত্রর নাটকীয়তা বেশ দমে গেল, চাটনি খেতে খেতে হাতের ঘড়ি দেখে বলল, “অনেকটা দেরি হয়ে গেল, মা। খেয়ে উঠেই আমি বেরিয়ে পড়ব, অনেকটা পথ...। পরশু দিন তুমি তাহলে রেডি থেক মা। সকাল নটা-সাড়েনটা নাগাদ গাড়ি চলে আসবে - সঙ্গে থাকবে আমাদের ম্যানেজার গুরপ্রীত, পাঞ্জাবি ছোকরা, ভালো ছেলে। আমার থেকে ভালো বাংলা বলে – মুম্বাইতে বিশ বছরের ওপর হয়ে গেল, বাংলাটা প্রায় ভুলতেই বসেছি...”।

দাদা বেরিয়ে যাওয়ার পর, সুনেত্রকেও বেরোতো হল হসপিট্যালে, তাই তখন আর মায়ের সঙ্গে কথাবার্তার কোন সময় পায়নি সুনেত্র। সন্ধের পর হসপিট্যাল থেকে ফিরে ফ্রেস হওয়ার পর, ডাইনিং রুমে বসে সুনেত্র মাকে জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার বলো তো, মা? দাদা, একবারে হুট করে, তোমাকে নিতে চলে এল?”

মা চিন্তিত মুখে বলেছিলেন। “কী জানি, আমার জন্যে এতদিন পরে, ওদের সকলের হঠাৎ এত দরদ উথলে উঠল কেন, বুঝতে পারছি না”।  

সুনেত্র ব্রিফকেস খুলে চারটে পোস্ট-অফিসের হলুদ খাম, কিছু সাদা কাগজ আর একটা পেন দিল মায়ের হাতে, বলল, “আমার কিন্তু তেমন সুবিধে ঠেকছে না, মা। তোমার ব্যাগের মধ্যে এই খাম আর কাগজগুলো রেখে দাও। সাবধানে রেখ। খামগুলোতে আমার নাম-ঠিকানা লিখে দিয়েছি। কোনরকম অসুবিধে মনে হলেই দু কলম লিখে যে করে হোক পোস্ট করে দিও। যে অবস্থাতেই আমি থাকি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, আমি তোমার কাছে চলে আসব। তোমাকে নিয়ে আসব, মা”।

মায়ের এমন অসহায় আর বিপন্ন মুখ আগে কোনদিন দেখেনি সুনেত্র, খুব মৃদু স্বরে বললেন, “দুপুরে তুই আসার আগে আমাকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করছিল – কলকাতার বাড়িটার জন্যে কি ভাবছো? কতদিন বাড়িটাকে ফেলে রাখবে, এরপর তো ওটা হানাবাড়ি হয়ে উঠবে...। বাবার কত টাকার সেভিংস আছে – ব্যাংকে কত, পোস্ট-অফিসে কত? বাবার তো আবার পোস্ট-অফিসে ওপর খুব ঝোঁক ছিল, বলে মুখ বেঁকিয়ে হাসল”। মাথা নীচু করে মা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন, তারপর আবার বললেন, “ছোটবেলায় সুমু তো এমন হিংসুটে ছিল না, সুকু। এই বয়েসে এমন করছে কেন? কেন মনে হচ্ছে তোর বাবার বা আমার যা কিছু আছে - আমি তোকেই সব দিয়ে যাব, ওকে বঞ্চিত করে? এত বছর ও মুম্বাইতে রয়েছে - বিয়ের আগে প্রায় পাঁচবছর, বিয়ের পরেও হয়ে গেল প্রায় আট-ন বছর। কোনদিন তো আমাকে এবং তোর বাবাকে বলেনি, আমার এখানে এসো – কটা দিন ঘুরে যাও”।

সুনেত্র বাড়ি ফিরলে, মা আর সুনেত্র একসঙ্গে বসে চা খায় শম্পাদিদি জানে। চা বানিয়ে এনে শম্পাদিদি দুজনের হাতে চায়ের কাপ তুলে দিতে দিতে খুব সংকোচের সঙ্গে বলল, “তোমার বড় ছেলে কিন্তু তোমার কিংবা দাদাবাবুর মতো একদমই না, মাসিমা। কেমন যেন...”। কথা শেষ না করেই থেমে গেল।

“কেমন যেন কি, শম্পা?”

“না থাকগে ওসব কথা, দাদাবাবু আপনাকে তেল মাখিয়ে মুড়ি বাদাম দিই?”

“দাও, মা খাবে তো?”

“দু মুঠো খাব, আমার জন্যে তুই আলাদা বাটি করিস না, শম্পামা, সুনুর বাটিতেই বেশি করে দিস, আমি তুলে নেব”।

চায়ের কাপে কয়েকটা চুমুক দেওয়ার পর মা মুখ তুলে তাকালেন সুনেত্রর দিকে, গভীর উদ্বেগের সঙ্গে বললেন, “তুই কি এখানে বা কলকাতায় মাথা গোঁজার মতো নিজের কোন আস্তানা বানাবি না?”

“সে ভাবে ভাবিনি মা, কিন্তু কেন বলো তো?”

“দেখ সুমু যে ভাবে উঠে পড়ে লেগেছে, কলকাতার বাড়িটা বেচে দিতেই হবে। নয়তো ও বাড়ির যা দাম হতে পারে তার অর্ধেক টাকা তোকে সুমুকে মিটিয়ে দিয়ে বাড়িটা তোকেই নিতে হবে...”।

মায়ের কথা শুনে সুনেত্র সেদিন টের পেয়েছিল, এতদিন পরে বড়ো ছেলের অকস্মাৎ উদয়ে, মা কতখানি উদ্বিগ্ন এবং চিন্তিত হয়েছিলেন। সুনেত্র কিছু বলল না, মায়ের কথার অপেক্ষায় রইল।

“...ও বাড়ির দাম কত হবে আমি জানি না, কিন্তু অর্ধেক হিসেবে তুই যাই দাম দিবি ... ও সারাজীবন তোকে কথা শুনিয়ে যাবে - তুই ওকে ডাঁহা ঠকিয়েছিস। ও বাড়ির জন্যে কোন সেন্টিমেন্ট না রেখে, তোর নিজের ক্ষমতায় তুই নিজের জন্যে একটা ফ্ল্যাট বা বাড়ি যদি কিনে রাখিস, আমার মনে হয় তোর পক্ষে সেটাই স্বস্তির হবে”।

দুজনের কেউই বেশ কিছুক্ষণ কোন কথা বলল না। চা শেষ হয়ে গিয়েছিল, শম্পাদিদি বড়ো বাটিতে করে ওদের সামনে মুড়ি-মাখা রাখল রান্নাঘরে গেল। একমুঠো মুড়ি তুলে নিয়ে, মায়ের দিকে বাটিটা বাড়িয়ে দিয়ে সুনেত্র বলেছিল, “কয়েকমাস ধরেই একটা কথা ভাবছিলাম। হলদিয়ার এই খোলামেলা পরিবেশে থেকে, চাকরি শেষে কলকাতার সেই ভিড়-ভাড়, হই-হট্টগোলের মধ্যে ফিরে যেতে মন চাইছে না। চাকরি শেষ হতেও এখনো ধরো বিশ -বাইশ বছর...। ততদিনে মন হলদিয়াতেই আরও জমে যাবে, চেনা-পরিচিতি বাড়বে। চাকরির পরেও প্র্যাকটিস করতে ইচ্ছে হলে – তাতেও অসুবিধে হবে না। তাই ভাবছিলাম, হলদিয়াতে ছোট্ট একটু জমি কিনে, নিজের মনোমত বাড়ি যদি একটা বানিয়ে নিই মন্দ হয় না। কলকাতায় তো সে শখ মেটার কোন সম্ভাবনা নেই – সে শখ মেটাতে হলে কলকাতার বাইরে দৌড়তে হবে। বারাসাত পার হয়ে সে হাবড়া বা গাইঘাটা, নয়তো বারুইপুর পার হয়ে সেই জয়নগর, বহেড়ু...।  তার চেয়ে আমার এই হলদিয়াই ভাল”।

মা মুড়ি খেতে খেতে খুব মন দিয়ে শুনছিলেন সুনেত্রর কথা, সুনেত্র বিরতি দিতেই বললেন, “ভালো-মন্দ বিচার করে যা করার হয় তাড়াতাড়ি করে নে, বাবা, আমি বেঁচে থাকতে থাকতে। মনে হয় না, তোকে সংসারী দেখে যাওয়ার কপাল আমার হবে, কিন্তু চোখ বোজার আগে অন্ততঃ তোর নিজের মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই হয়েছে, এটুকু দেখে যেতে দে...”।

“সংসার করলে কখনো কখনো কী হয় সে তো দাদাকে দেখে কিছুটা বুঝছো মা, কিন্তু আমার বাড়ি দেখার সাধ আমি অপূর্ণ রাখব না, এ আমি তোমায় কথা দিলাম। এবং জীবনের শেষ কটা বছর আমার সেই বাড়িতেই তুমি বিরাজ করবে...”।

পরের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৬ "


বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/২

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১


  আগের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/১ "


  তৃতীয় স্কন্ধ - দ্বিতীয় পর্ব

উদ্ধবের সংক্ষেপে শ্রীকৃষ্ণমহিমা বর্ণনা (পূর্ব পর্বের পর...) 

শ্রীউদ্ধব বললেন, “তারপর একদিন বলদেবকে সঙ্গে নিয়ে কৃষ্ণ মথুরায় গেলেন, সেখানে রাজসিংহাসন থেকে টেনে নামিয়ে কংসের বিনাশ করলেন। সেখানে বন্দী মাতাপিতাকে উদ্ধার করে তাঁদের সন্তুষ্ট করলেনএরপর সন্দীপনিমুনির পাঠশালায় একবার মাত্র শুনে তিনি সর্ববেদ ও শাস্ত্র পাঠ শেষ করলেন। তারপর পঞ্চজন অসুরকে হত্যা করে, তিনি গুরুপুত্রকে উদ্ধার করে, গুরুদক্ষিণা দিলেন।

[এই পঞ্চজন অসুরের অস্থি থেকেই শ্রীকৃষ্ণের পূত পাঞ্চজন্য শঙ্খের উৎপত্তি।]                 

ভীষ্মকরাজকুমার রুক্মী, ভগিনী রুক্মীণীর সঙ্গে শিশুপালের বিয়ের সম্বন্ধ করেছিলেন। কৃষ্ণগতপ্রাণ রুক্মীণী কৃষ্ণকে সংবাদ পাঠালেন উদ্ধারের জন্যে। বিয়ের সভায় শিশুপালের সঙ্গে বরযাত্রী এসেছিল জরাসন্ধের মতো বীর সহস্র রাজা। তাদের সকলকে অপমান করে গান্ধর্বমতে বিয়ে করে রুক্মীণীকে তুলে এনেছিলেন কৃষ্ণ।

নাগ্নজিতীর স্বয়ংবরের শর্ত ছিল, সাতটা বিশাল ষাঁড়কে যে দমন করতে পারবে, সেই হবে নাগ্নজিতীর বর। কৃষ্ণ সাতটি ষাঁড়কে বশ করে, তাদের নাক বিদ্ধ করে দড়ি পড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন। তাতে উপস্থিত রাজারা খুব অপমান বোধ করেছিল এবং কৃষ্ণকে মারতে একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কৃষ্ণ তাদের সকলকে পরাস্ত করেছিলেন, অথচ তাঁর কোন আঘাত লাগেনি।

ভগবান কৃষ্ণ কারও অধীন নয়, তবুও স্ত্রৈণের মত প্রিয় পত্নী সত্যভামাকে খুশি করার জন্যে স্বর্গ থেকে পারিজাত তুলে এনে সত্যভামাকে উপহার দিয়েছিলেন। দেবরাজ ইন্দ্র রাগে অন্ধ হয়ে কৃষ্ণের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন।

নরকাসুর যখন যুদ্ধক্ষেত্রে বিশাল দেহ বিস্তার করে সমস্ত আকাশকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছিল, এই কৃষ্ণই তাঁর সুদর্শনচক্র দিয়ে তার মুণ্ডছেদ করেছিলেন। তারপর নরকাসুরের মা ধরিত্রীদেবীর অনুরোধে অন্য পুত্র ভগদত্তকে রাজ্যভার দিয়ে নরকাসুরের অন্তঃপুর থেকে বন্দিনী বহু রাজকুমারীকে উদ্ধার করেছিলেন। পরিত্রাতা কৃষ্ণকে দেখেই সদ্য মুক্তি পাওয়া রাজকুমারীরা মুক্তির মোহিত হয়ে, তাঁকে স্বামী হিসেবে পেতে উন্মুখ হয়ে উঠেছিল। তখন কৃষ্ণ তাঁর অদ্ভূত যোগমায়ায় নিজেকে বহুভাগে বিভক্ত করে সকল রাজকুমারীকেই স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন ও প্রত্যেককে দশটি করে পুত্র দান করেন।

কংসের বিনাশের পর জরাসন্ধ, কালযবন, শাল্বপ্রভৃতি বীররাজাগণ মথুরা আক্রমণ করলে, মুচুকুন্দ ও ভীমকে দিয়ে তিনিই তাদের বিনাশ করেন। একইভাবে তিনি প্রদ্যুম্ন, বলরামকে দিয়ে শম্বর, দ্বিবিদ, বল্কল প্রমুখ রাক্ষসদেরও বিনাশ করেছিলেন। তিনি নিজে দন্তবক্র ও মুরের বিনাশ করেছিলেন, বাণ্বরাজার অহংকার ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিলেন।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যুধিষ্ঠির ও দুর্যোধনের সমর্থনে যত রাজা সমবেত হয়েছিলেন। যাঁদের শক্তিতে আর অহংকারে সমস্ত পৃথিবী বিপর্যস্ত হচ্ছিল, তাঁদের সকলকেই তিনি বিনাশ করলেন, অর্জুন আর ভীমকে সামনে রেখেআবার তিনিই উত্তরার গর্ভে অভিমন্যুর পুত্র, পুরুবংশের শেষ উত্তরাধিকার পরীক্ষিৎকে রক্ষা করলেন। কারণ যুধিষ্ঠিরের পর পরীক্ষিৎই হবে প্রজাপালক ধার্মিক রাজা।

এইসব কিছুর পর তিনি প্রদ্যুম্নের নেতৃত্বাধীন দুর্ধর্ষ যদু সৈন্যের ধ্বংসের উপায়ও তিনি স্থির করে ফেললেন। যদু, বৃষ্ণি, ভোজ ও অন্ধকদের নিয়েই ছিল দুর্ভেদ্য যদু সৈন্য, তাদের সকলের মধ্যে খুব সদ্ভাব থাকলেও, ভগবান কৃষ্ণ স্থির করলেন, মত্ত অবস্থায় এরা নিজেদের মধ্যেই যুদ্ধ করে ধ্বংস হোক।  রাজপুরীর মধ্যে যদু ও ভোজ রাজকুমাররা একদিন খেলায় উন্মত্ত হয়ে, উপস্থিত মুনিদের উপেক্ষা ও অপমান করে বসল। অপমানিত মুনিরা কৃষ্ণের প্রশ্রয়েই তাদের অভিশাপ দিলেন।

এর মাস কয়েকপরে যদু, বৃষ্ণি, ভোজ ও অন্ধককুমাররা সকলে মহাসমারোহে প্রভাসতীর্থে যাত্রা করলেন। সেখানে স্নান করলেন, তীর্থজল দিয়ে পিতৃ ও দেব তর্পণ করলেন। ব্রাহ্মণদের প্রচুর সম্পদ, গরু, সোনা, রূপো, জীবিকার জমি ও বাসের জমি দান করলেন। ওই যদুবীরেরা গো ও ব্রাহ্মণের মঙ্গলের জন্য চিরদিন নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন। এখন তাঁরা সেই দান কর্মের ফল শ্রীভগবানে অর্পণ করে, মাটিতে শুয়ে ব্রাহ্মণদের প্রণাম করলেন”

যাদবদের উচ্ছৃখলতা  

ব্রাহ্মণদের অন্ন ভোজনের পর, ব্রাহ্মণের অনুমতি নিয়ে নিজেরা ভোজন করলেন। তারপর সকলে মিলে শুরু করলেন মদ্যপান। অতিরিক্ত মদ্যপানে উন্মত্ত হয়ে তারা একে অপরকে গালি দিতে লাগল, তাদের ক্রোধ বেড়ে উঠতে লাগল, তারা নিজেদের মধ্যেই যুদ্ধে প্রবৃত্ত হল এবং একসময় উন্মত্ত অবস্থাতেই সকলের বিনাশ হল।

এই ঘটনার কিছুদিন আগেই কৃষ্ণ দ্বারকা ত্যাগ করেছিলেন, আর আমাকে বলেছিলেন বদরিকাশ্রমে চলে যেতে। আমাকে বললেও আমি তাঁর সঙ্গ ছাড়তে পারিনি। যদুকুল ধ্বংস হবার পর, তিনি সরস্বতীর জলে আচমন করে একটি অশ্বত্থ গাছের তলায় গিয়ে বসলেন। সেই গোধুলিবেলায়, সরস্বতী নদীর তীরে, গাছে পিঠ রেখে, তিনি মাটিতে একলা বসে ছিলেন, তাঁর মুখ তখনও প্রসন্ন।

আমি তাঁর চরণ স্পর্শ করে প্রণাম করলাম। আমাকে দেখে তিনি মৃদু হেসে বললেন, “উদ্ধব, তোমার মনের কি ইচ্ছে আমি জানি।, তুমি এইজন্মে আমার কৃপা লাভ করেছ, অতএব এই জন্মই তোমার শেষ জন্ম। এই লোকে আমার সব কাজ সব শেষ হয়ে গেছে, এখন বৈকুণ্ঠে ফেরার সময় হয়ে এল। আমি চলে যাবার পর, উদ্ধব, যতদিন তুমি এই ভূলোকে থাকবে, আমার বিষয়ে লোককে উপদেশ দেওয়ার ভার আমি তোমাকেই দিয়ে গেলাম। কারণ, তুমি আমার থেকে এতটুকুও কম নও। তুমি বদরিকাশ্রমে যাও, সেখানেই তোমার কাজ শুরু করো”

ডান উরুর উপর, বাঁ পা রেখে, তিনি নিজের লীলা সংবরণের প্রতীক্ষায় বসেই রইলেন সেই অশ্বত্থ গাছের তলায়। সেইদিন সরস্বতী নদীর তীরে গোধুলির আলোয় তাঁর উজ্জ্বল প্রসন্ন মুখ দর্শন করে, আমি তাঁর নির্দেশে রওনা হলাম বদরিকা আশ্রমের দিকে। 

সৃষ্টিতত্ত্ব

শ্রীশুকদেব বললেন, “শ্রীকৃষ্ণের লীলা মাহাত্ম্য বর্ণনার পর উদ্ধব বদরিকা আশ্রমে যাবার জন্যে উদ্যত হচ্ছেন দেখে, বিদুর ভক্তিভরে বললেন, হে উদ্ধব, শ্রীভগবান আপনাকে নিজের তত্ত্বস্বরূপ পরমজ্ঞানের যে উপদেশ দিয়েছিলেন, আমাকে সেই উপদেশ দান করুন। কী উপায়ে আমি তাঁর একান্ত অনুগত থাকতে পারি, তাও আমার কাছে বর্ণনা করুনউদ্ধব বললেন, কুশারুনন্দন ঋষি মৈত্রেয় তোমার সকল জিজ্ঞাসার উত্তর দেবেন। তিনিই তোমার আরাধ্য গুরু ভগবান শ্রীকৃষ্ণও মর্ত্যলোক ত্যাগ করার আগে আমার সামনে এইরকমই নির্দেশ করে গিয়েছেন। অতএব, তুমি ঋষি মৈত্রেয়র সঙ্গে তাড়াতাড়ি সাক্ষাৎ করো। 

উদ্ধবের নির্দেশমতো হরিদ্বারে পৌঁছে, বিদুর পরমজ্ঞানী মহাঋষি মৈত্রেয়র সামনে উপস্থিত হলেন। পরম ভক্তিভরে বিদুর ঋষি মৈত্রেয়কে বললেন, “আমি ব্যাসদেবের কাছে ধর্মতত্ত্ব বহুবার শুনেছি, কিন্তু আমি বুঝেছি ওই সকল ধর্ম আচরণ, তুচ্ছ সুখের সন্ধান দেয় মাত্র। কিন্তু কৃষ্ণকথামৃতপানের সুযোগ যে কবার আমি পেয়েছি, তাতে আমার তৃপ্তি হয়নি। আপনি আমাকে সেই কৃষ্ণকথার অমৃত তত্ত্ব শোনানযে তত্ত্ব অন্তরে ঢুকে সংসারের প্রতি সমস্ত আসক্তি দূর করে, শ্রীকৃষ্ণের চরণে আশ্রয় লাভ করে পরমমুক্তির সন্ধান দেয়”

বিদুরের মুখে ব্যাকুল এই প্রশ্ন শুনে, কুশারুনন্দন মৈত্রেয় তাঁকে সমাদর করে বললেন, “হে বিদুর আপনি খুবই উত্তম প্রশ্ন করেছেন। এর উত্তর সঠিক বুঝতে গেলে, জানতে হবে, এই নিখিল বিশ্বের সৃষ্টির তত্ত্বটি। এই সমগ্র বিশ্ব যখন সাগরের জলে ডুবে ছিল, তখন শ্রী নারায়ণ যোগনিদ্রায় চোখ বন্ধ করে  অনন্তশয্যায় শুয়ে ছিলেন। বাইরে থেকে তাঁকে মনে হচ্ছিল যেন ঘুমিয়ে আছেন, কিন্তু অন্তরে তাঁর চিৎশক্তি পূর্ণমাত্রায় সজাগ ছিল। কাঠের দাহিকা শক্তি যেমন কাঠের মধ্যেই রুদ্ধ থাকে, ঠিক সেরকমই তাঁর মধ্যে নিরুদ্ধ ছিল জগতের সমস্ত ভূতের সূক্ষ্মস্বরূপ।  তিনি মায়ালীলা ত্যাগ করে আত্মস্বরূপে নিমগ্ন ও নিষ্ক্রিয়ভাবে বিরাজ করছিলেন।

এইভাবে তাঁর চার হাজার যুগ তিনি রইলেন যোগনিদ্রায়, তারপর একদিন সৃষ্টির ইচ্ছায় তিনি চোখ মেলে তাকালেন এবং নিজের অন্তরে সূক্ষ্মরূপে লীন হয়ে থাকা সমস্ত লোকসমূহের দিকে দৃষ্টি দিলেন। তাঁর এই দৃষ্টির আঘাতে সঞ্চারিত হল রজোগুণ আর এই রজোগুণের প্রভাবেই, কাল সমস্ত জীবের কর্মের ভাগ্য নির্দিষ্ট করে দিলসেই কালের নিয়মেই জেগে ওঠা জীবের সূক্ষ্মতত্ত্ব, উজ্জ্বল এক পদ্মকোষের আকারে তাঁর নাভিমূল থেকে উদ্গত হল। সেই পদ্মকোষের উজ্জ্বল আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল চারিদিকের অনন্ত জলরাশি। এই পদ্মই জীবের ভোগবস্তুর প্রকাশ করে থাকে।

তারপর সেই পদ্মকোষ থেকে আবির্ভূত হলেন বেদময় স্বয়ং ব্রহ্মা যেহেতু পদ্মকোষেই তাঁর স্বয়ং আবির্ভাব,  তাই তাঁকে স্বয়ম্ভূ বলা হয়। পদ্মের উপর বসে তিনি চারিদিকে কোন জগৎ দেখতে পেলেন না, চারিদিকে অখণ্ড  জলরাশি ও সীমাহীন তরঙ্গ দেখতে পেলেন। উদ্গ্রীব হয়ে ঘাড় ফিরিয়ে চারদিকে দেখার জন্যেই তাঁর চারটি মাথার সৃষ্টি হয়েছিল, তাই তাঁকে চতুর্মুখও বলা হয়ে থাকে। তিনি চারিদিকে জলরাশি দেখে খুবই হতাশ হলেন। তিনি নিজে সেই পদ্মে অবস্থান করেও তিনি সেই পদ্মের স্বরূপ ও তার সম্পূর্ণ আকার উপলব্ধি করতে পারলেন না। তাঁর মনে হল, আমি এই যে পদ্মের উপর বাস করছি, আমি কে? আর এই বিপুল জলরাশির মধ্যে পদ্মই বা কোথা থেকে সৃষ্টি হল? যে আধার থেকে এই পদ্মের সৃষ্টি হয়েছে, সে আধার নিশ্চয়ই জলের মধ্যেই কোথাও ডুবে আছে!

এই চিন্তা করে ব্রহ্মা পদ্মের মৃনালের ছিদ্রপথে জলের মধ্যে প্রবেশ করলেন। কিন্তু অন্ধকারের মধ্যে শত বছর  খুঁজেও তিনি তাঁর ও এই পদ্মের আবির্ভাবের কোন কারণ বুঝতে পারলেন না। দীর্ঘ অন্বেষণে ব্যর্থ হয়ে তিনি আবার ফিরে এলেন তাঁর পদ্মের আসনেই। তারপর মনকে সংযত করে সমাধিযোগে বসে রইলেন আরো শত বৎসর।  একশ বছর পর তাঁর যোগ সফল হলআগে দীর্ঘদিন বহু সন্ধানে করেও যাঁকে তিনি লাভ করতে পারেন নি, তাঁকে আজ নিজের মনের মধ্যেই বিরাজ করতে দেখলেন। তিনি দেখলেন, শ্যামলাবণ্য, পীতবসন এক দিব্য পুরুষকে; তাঁর মাথায় বহুরত্নখচিত মুকুট; তাঁর সর্ব অঙ্গে রত্নের অলংকার; শেষনাগের দেহের শয্যায় শুয়ে রয়েছেন; সেই দিব্য পুরুষের মাথার উপর ছাতার মতো ব্যাপ্ত রয়েছে শেষনাগের সহস্র ফণা।          

অবশেষে ব্রহ্মা সেই দিব্যপুরুষকে শ্রীহরি বলে চিনতে পারলেন। ব্রহ্মা সকলের আরাধ্য শ্রীবিষ্ণুর স্তব করলেন

পরের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৩ "



নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৫/৯

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম তৃতী...